• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

০৬ এপ্রিল ২০২১

দুষ্টু নিমাই শিষ্ট 'শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্য'

 শ্রী গৌর হরির পিতা জগন্নাথ মিশ্র ও মাতা শচী দেবী। জগন্নাথ মিশ্রের পরপর আট কন্যা হয়। কিন্তু কেহই জীবিত ছিলনা। তার পরে এক পুত্র হয়। নাম তার বিশ্বরূপ। পুত্রের বয়স যখন আট বছর তখন জগন্নাথ মিশ্রের বাবা-মায়ের নিকট হতে একটা পত্র আসল। তাতে লেখাছিল যে, সত্বর যেন স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সিলেট তাঁদের কাছে আসেন। পিতার মাতার এই আজ্ঞা পেয়ে শচী দেবী ও জগন্নাথ মিশ্র শ্রীহট্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং কিছুদিন পর নিজ গৃহে মাতা-পিতার নিকট পৌছান।

১৪০৬ শকাব্দের মাঘ মাসে শচী দেবী আবার গর্ভস্ত হলেন। শোভা দেবী (শাশুড়ীমাতা) রাত্রিতে স্বপ্ন দেখেন যে, কোন মহাপুরুষ তাঁকে বলছেন যে, পুত্রবধুর গর্ভে স্বয়ং ভগবান প্রবেশ করেছেন এবং শচীদেবীকে নবদ্বীপ পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য বলেন। এইজন্য জগন্নাথকে শচীদেবীসহ নবদ্বীপে যাওয়ার জন্য শোভা দেবী আদেশ করলেন। জগন্নাথ মিশ্র মহাশয় শচীদেবীকে নিয়ে নবদ্বীপের বাড়ীতে আসলেন। শচীর দেবীর গর্ভ দশমাস উত্তীর্ণ হল তবু পুত্র কন্যা কিছুই হল না। ক্রমে একাদশমাস, দ্বাদশ মাস উত্তীর্ণ হল তবুও সন্তানের জন্ম হল না। ১৪০৭ শকাব্দের ফাল্গুন মাস আসল জগন্নাথ মিশ্র ব্যস্ত হয়ে শ্বশুর নীলাম্বর চক্রবর্তীকে ডাকালেন।

নীলাম্বর পন্ডিত গননা করে বললেন অতি সত্বর শচীর সন্তান হবে। তার গর্ভে কোন এক মহাপুরুষ জন্ম নেবেন। একথা শুনিয়া সকলে স্বস্তি পেলেন।

চৌদ্দশত সাত শকে মাস যে ফাল্গুন।

পৌর্নমাসী সন্ধ্যাকালে হৈল শুভক্ষণ,

সিংহ রাশী, সিংহ লগ্ন উচ্চ প্রহসন।

ষড়বর্গ অষ্টবর্গ সবর্ব শুভক্ষণ।

অর্থাৎ ১৪০৭ শকাব্দে জাহ্নবী তীরস্থ পরীশোভিত নবদ্বীপ নগরে। মনোহর ফাল্গুন মাসে, নির্মল পূর্ণিমা সন্ধ্যায় শ্রী গৌরাঙ্গদেব অবতীর্ণ হলেন। যখন পূর্ণিমা সন্ধ্যায় পূর্বদিকে একখানা উজ্জ্বল থালার মত চন্দ্র উদিত হল। অমনি গৌরাঙ্গ সিংহ রাশিতে পূবর্বফাল্গুনী লক্ষত্রে মাতৃগর্ভ হতে অবির্ভত হলেন। নবদ্বীপবাসী প্রফুল্ল মনে হরিধ্বনি করতে লাগলেন। এভাবে হরিধ্বনির সহিত গৌরাঙ্গ দেব অবিভূত হয়ে ছিলেন। নীম বৃক্ষের তলে জন্ম হয়েছিল বলে শচীমাতা ছেলের নাম নিমাই রাখলেন।

সেসময় নবদ্বীপ বুদ্ধিমান ও নৈয়ায়িক পন্ডিত দ্বারা পূর্ণছিল। ভক্তির লেশ ছিল না। এমনই সময় শ্রী গৌরহরি ভক্তিরস বিতরণের জন্য নদীয়ায় অবর্তীর্ণ হলেন।

কলোহ প্রথম সন্ধ্যায়ং গৌরাঙ্গ অহর মহীতটে।

ভাগীরথী তটে ভূবী ভবিষ্যামী সনাতন। --- ব্রহ্ম পূরাণ, অর্থাৎ কলির প্রথম সন্ধ্যায় গৌরাঙ্গরূপে এই ধরাতলে ভগীরথী তীরে আবির্ভূত হব।

চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি দোলপূর্ণিমার রাত্রে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদিয়ার মায়াপুরে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম। তাঁর পিতামাতা ছিলেন অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার অন্তর্গত নবদ্বীপের অধিবাসী জগন্নাথ মিশ্র ও শচী দেবী। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ওড়িশার জাজপুরের আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র ওড়িশা থেকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন।

চৈতন্যদেবের পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত। তর্কশাস্ত্রে নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিতের খ্যাতি ছিল অবিসংবাদিত। জপ ও কৃষ্ণের নাম কীর্তনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যে ছেলেবেলা থেকেই বজায় ছিল, তা জানা যায় তাঁর জীবনের নানা কাহিনি থেকে। কিন্তু তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সংস্কৃত গ্রন্থাদি পাঠ ও জ্ঞানার্জন। 

পিতার মৃত্যুর পর গয়ায় পিণ্ডদান করতে গিয়ে নিমাই তাঁর গুরু ঈশ্বর পুরীর সাক্ষাৎ পান। ঈশ্বর পুরীর নিকট তিনি গোপাল মন্ত্রে দীক্ষিত হন। এই ঘটনা নিমাইয়ের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর পণ্ডিত থেকে ভক্ত রূপে তাঁর অপ্রত্যাশিত মন পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় বৈষ্ণব সমাজ আশ্চর্য হয়ে যান। অনতিবিলম্বে নিমাই নদিয়ার বৈষ্ণব সমাজের এক অগ্রণী নেতায় পরিণত হন।

কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাসব্রতে দীক্ষিত হওয়ার পর নিমাই 'শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য' নাম গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি জন্মভূমি বাংলা ত্যাগ করে কয়েক বছর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান পর্যটন করেন। এই সময় তিনি অবিরত কৃষ্ণনাম জপ করতেন। জীবনের শেষ চব্বিশ বছর তিনি অতিবাহিত করেন জগন্নাথধাম পুরীতে। ওড়িশার সূর্যবংশীয় সম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপরুদ্র দেব চৈতন্যমহাপ্রভুকে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন। মহারাজা প্রতাপরুদ্র চৈতন্যদেব ও তাঁর সংকীর্তন দলের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছিলেন। জীবনের শেষপর্বে চৈতন্যদেব ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতেন এবং অধিকাংশ সময়েই ভাবসমাধিস্থ থাকতেন।

তিনি শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য ছিলেন ভাগবত পুরাণ ও ভগবদ্গীতা-য় উল্লিখিত দর্শনের ভিত্তিতে সৃষ্ট বৈষ্ণব ভক্তিযোগ মতবাদের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা। তিনি বিশেষত রাধা ও কৃষ্ণ রূপে ঈশ্বরের পূজা প্রচার করেন এবং 'হরে কৃষ্ণ' মহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন। সংস্কৃত ভাষায় 'শিক্ষাষ্টক' নামক প্রসিদ্ধ স্তোত্রটিও তাঁরই রচনা। গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতানুসারে, ভাগবত পুরাণের শেষের দিকের শ্লোকগুলিতে রাধারানির ভাবকান্তি সংবলিত শ্রীকৃষ্ণের চৈতন্য রূপে অবতার গ্রহণের কথা বর্ণিত হয়েছে।

চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমের নাম গৌরাঙ্গ বা নিমাই। তাঁর গাত্রবর্ণ স্বর্ণালি আভাযুক্ত ছিল বলে তাঁকে গৌরাঙ্গ বা গৌর নামে অভিহিত করা হত। অন্যদিকে নিম বৃক্ষের নিচে জন্ম বলে তাঁর নামকরণ হয়েছিল নিমাই। ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বাংলা সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। সেযুগে একাধিক কবি চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্য চরিতামৃত, বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের চৈতন্য ভাগবত, এবং লোচন দাস ঠাকুরের চৈতন্যমঙ্গল।

ছেলেবেলায় দুষ্টুমি করাটা সকলেরই মজ্জাগত। দুষ্টুমী না করলে ছেলেবেলা সার্থক হয় না। এবার এমন একজন বিখ্যাত মানুষের নাম শোনাব, যাঁর দুষ্টুমিতে সারা নবদ্বীপ ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিল।

ঠাকুরদা, মধুকর মিশ্র ওড়িশার যাজপুর থেকে রাজা ভ্রমরের অত্যাচারের ভয়ে ,অবিভক্ত বাংলার শ্রীহট্টে এসে বসবাস শুরু করেন। এই শ্রীহট্টই হলো এখনকার সিলেট। পরে, মধুকর মিশ্রের ছেলে জগন্নাথ মিশ্র সংস্কৃত শেখার জন্য নদীয়া জেলার নবদ্বীপে এসে সেখানেই থেকে যান।

পড়াশুনো শেষ হলে, জগন্নাথ মিশ্র, নীলাম্বর চক্রবর্তীর মেয়ে শচীদেবীকে বিয়ে করেন। এঁদের পরপর সাত মেয়ে হলেও সব কটা অকালে মারা যায়। পরে, দুই ছেলে -- বিশ্বরূপ আর বিশ্বম্ভর কিন্তু অকালে মারা যান নি। সেকালে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যেত সবার। ষোলো বছরে বিশ্বরূপের বিয়ের কথা হলে, তিনি সন্ন্যাসী হয়ে সংসার ছেড়ে চলে যান।

জগন্নাথ মিশ্র ভাবলেন- অল্প বয়সে বেশী পড়াশোনার করার ফলেই বড় ছেলের এই হাল! একে তো সাত মেয়ে মারা গেছে, তার ওপর বড় ছেলে বিবাগী হয়ে চলে গেল, ফলে বিশ্বম্ভর কে আর পড়াশোনা করতেই পাঠালেন না!

বিশ্বম্ভরের ডাক নাম ছিল নিমাই! 

কিন্তু, মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক! দুষ্টু নিমাই পরে কি হয়েছিল, সেটা বলছি!

তার আগে ওর ছেলেবেলার কথা বলে নিই! খুব মজা পাবে।

ওহো! নিমাইয়ের জন্ম তারিখটা তো বলতেই ভুলে গেছি। ১৪৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৮ ই ফেব্রুয়ারি দোলপূর্ণিমার সন্ধে ৬ টা থেকে ৭টার মধ্যে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদিয়ার মায়াপুরে নিমাইয়ের জন্ম।

পাঁচ বছর থেকেই মহা দুষ্টুমি শুরু করেছিল এই নিমাই। তখনকার সব লোক গঙ্গাতে স্নান করতে যেতেন। একটা বিশ্বাস তখনও ছিল, এখনও আছে! গঙ্গাতে স্নান করলে নাকি সব পাপ দূর হয়। তাছাড়া, তখন তো আর ঘরে ঘরে স্নানঘরে শাওয়ার, বাথটাব ছিল না! ফলে লোকে গঙ্গাতেই স্নান করত। আর সেখানেই শুরু হত নিমাইয়ের দুষ্টুমি! ব্রাহ্মণরা স্নান করে উঠলেই গায়ে গোবোর মেশান কাদা ছুঁড়ে দিতেন। কারও শিবঠাকুর নিয়ে পালিয়ে যেতেন। বাচ্চা মেয়েদের চুলে ওকরা নামের একটা কাঁটা ওয়ালা ফলের বীচি ছুঁড়ে দিতেন। চুল জট পাকিয়ে যেত। সে এক কেলেঙ্কারী!

জগন্নাথ মিশ্র সাধে কি, দুঃখ করে লিখেছিলেন --

“এহি যদি সর্বশাস্ত্রে হবে গুণবান্।

ছাড়িয়া সংসার সুখ করিবে পয়ান।।

অতএব ইহার পড়িয়া কার্য্য নাই।

মূর্খ হৈয়া ঘরে মোর থাকুক নিমাঞি।।”

তোমরা ভাবছ, আমি বানান ভুল করেছি? আরে না! এটা ১৪৭৩ সালে লেখা! তখনকার বানান গুলো এরকমই ছিল। আমি ওটা অবিকল তুলে দিয়েছি।

ওই বাচ্চা মেয়েরা নিজেদের বাবা মার কাছে গিয়ে বলত ---

“বলে মোরে চাহে বিভা* করিবারে”

*বিভা = বিবাহ বা বিয়ে।

পরে আর এক মেয়ে বলছে--

“পূর্বে শুনিলাম যেন নন্দের কুমার।

সেইমত কি তোমার পুত্রের ব্যাবহার।।”

আর একজন ব্রাহ্মণ জগন্নাথ মিশ্রকে বলছেন ---

“সন্ধ্যা করি যেই জলেতে নামিয়া।

ডুব দিয়া লৈয়া যায় চরণ ধরিয়া।।”

বোঝো কাণ্ড নিমাইয়ের! 

ওই পাঁচ বছর বয়সেই ডুব সাঁতার শিখে গেছিল। ব্রাহ্মণ, স্নান সেরে জপ করছেন জলে নেমে আর নিমাই ডুব সাঁতার দিয়ে ব্রাহ্মণের পা টেনে আবার জলে ফেলে নাকানী চোবানী খাওয়াচ্ছেন! 

“কেহ বলে মোর শিবলিঙ্গ করে চুরি।

কেহ বলে মোর লয়ে পলায়ে উত্তরী*।।”

*উত্তরী= উত্তরীয় বা গায়ে দেওয়ার চাদর!

এবার দিনে দিনে বেড়েই চলল, নিমাইয়ের দুষ্টুমী! একদিন এঁটো রান্নার হাঁড়ির ওপর বসে খালি দুলতে লাগল! আর সঙ্গে ঠন্ ঠনা ঠন্ আওয়াজ !!

মা, শচী দেবী বকলেন! বললেন -- ভদ্রতা জানিস না? 

নিমাই নাকি এর উত্তরে বলেছিলেন -- (এটা পরে অন্য লোকে লিখেছেন)

“প্রভু বলে মোরে, না দিস পড়িতে।

ভদ্রাভদ্র মূর্খ বিপ্র জানিবে কি মতে।।

মূর্খ আমি না জানি যে ভাল মন্দ স্থান।

সর্বত্র আমার এক অদ্বিতীয় স্থান।।”

এখন আর জগন্নাথ বাবুর কোনো উপায় থাকল না! গ্রামের সকলের পরামর্শে, নিমাইকে গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে পাঠিয়ে দিলেন পড়তে! 

শচী দেবীর হলো বিপদ! ছেলে আর বই ছেড়ে ওঠে না! শচী দেবী ভাবলেন- ছেলে পাগল হয়ে গেছে!

এ ব্যাপারে লেখা আছে --

“কিবা স্নানে কি ভোজনে কিবা পর্যটনে।

নাহিক প্রভুর আর চেষ্টা শাস্ত্র বিনে।।

আপনি করেন প্রভু সুত্রের টিপ্পনী।

ভুলিয়া পুস্তক রসে সর্বে দেবমণি।।

না ছাড়েন শ্রীহস্তে পুস্তক একক্ষণে।.....

পুঁথি ছাড়িয়া নিমাঞি না জানে কোনো কর্ম।

বিদ্যারস ইহার হয়েছে সর্বধর্ম।।

একবার যে সুত্র পড়িয়া প্রভু যায়।

আরবার উল্টিয়া প্রভু সবারে ঠেকায়।।”

এই দুষ্টু নিমাই কালে কালে হয়ে উঠলেন মস্ত পণ্ডিত! নাম হলো চৈতন্যদেব!


লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh

Share:

০৮ মে ২০১৭

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিরীহ বৈষ্ণব ছিলেন না

Image may contain: 7 peopleমহাপ্রভু যখন প্রবলভাবে হরিনাম আন্দোলন শুরু করেছেন তখন কিছু গোঁড়া ব্রাহ্মণ তাঁর এবং ভক্তদের বিরুদ্ধে চাঁদ কাজীর কাছে অভিযোগ করে। নবদ্বীপের মুসলমান কাজী ব্রাহ্মণদের এই অভিযোগটিতে প্রভূত গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রথমে তিনি মহাপ্রভুর অনুগামীদের উচ্চস্বরে হরিনাম সংকীর্তন করতে নিষেধ করেন। কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর অনুগামীদর কাজীর সেই নির্দেশ অমান্য করতে নির্দেশ দেন, এবং তাঁরা পূর্বের মতোই সংকীর্তন করে যেতে থাকেন। কাজী তখন সেই সংকীর্তন বন্ধ করার জন্য তাঁর পেয়াদা পাঠান এবং তারা সংকীর্তন কারীদের কয়েকটি মৃদঙ্গ ভেঙে দেয়। এই ঘটনার কথা শুনে মহাপ্রভু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি এক বিরাট আইন-অমান্য আন্দোলন করেন। তিনি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভারতবর্ষে প্রথম আইন-অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। হাজার হাজার মৃদঙ্গ এবং করতাল সহ লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিয়ে এক বিরাট শোভাযাত্রার আয়োজন করেন, এবং কাজীর আইন অমান্য করে এই শোভাযাত্রা নবদ্বীপের পথে পথে হরিনাম কীর্তন করতে করতে কাজীর বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।

অবশেষে যখন শোভাযাত্রাটি কাজীর বাড়িতে এসে পৌঁছায়, তখন ভয়ে কাজী তাঁর বাড়ির উপরতলার একটি ঘরে লুকিয়ে থাকেন। সেই বিশাল জনসমাবেশ কাজীর বাড়ির সামনে সমবেত হয়ে প্রচণ্ড ক্রোধ প্রকাশ করতে থাকে, কিন্তু মহাপ্রভু তাদের শান্ত হতে বলেন। মহাপ্রভুর আশ্বাস পেয়ে অবশেষে কাজী তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে এবং তাদের মধ্যে কোরান ও হিন্দু-শাস্ত্র সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা হয়। সেই আলোচনায় তিনি গো-বধের ভয়াবহ পরিনাম তুলে ধরেন।

“তোমরা জীয়াইতে নার-বধমাত্র সার।
নরক হইতে তোমার নাহিক নিস্তার।।
গো-অঙ্গে যত লোম, তত সহস্র বৎসর।
গো-বধী রৌরব মধ্যে পচে নিরন্তর।।”

এভাবে মহাপ্রভু শাস্ত্র যুক্তির মাধ্যমে গো-বধ এবং সবধরণের যজ্ঞ নিষিদ্ধ করলেন। তিনি একমাত্র যজ্ঞ হিসেবে হরিনাম সংকীর্তনকে জগতমাঝে প্রতিষ্ঠা করলেন। তখন কাজী মহাপ্রভুর চরণাশ্রয় গ্রহণ করলেন এবং ঘোষণা করলেন যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রবর্তিত সংকীর্তন যজ্ঞে কেউ যেন কখনও বাধা না দেয়, এবং তিনি তাঁর উইলে লিখে যান যে, তাঁর বংশের কেউ যদি সংকীর্তনে বাধা দেয়, তাহলে সে তৎক্ষণাৎ বংশচ্যুত হবে। নবদ্বীপে মায়াপুরের সন্নিকটে এখনও শ্রীচাঁদ কাজীর সমাধী আছে।
এই ঘটনা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিরীহ বৈষ্ণব ছিলেন না। বৈষ্ণব হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবানের ভক্ত এবং প্রয়োজন হলে তিনি সিংহবিক্রমে যথার্থ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।


courtesy by:  প্রশ্ন করুন, উত্তর পাবেন। সনাতন ধর্মের হাজারও প্রশ্ন এবং উত্তর

Share:

মহাপ্রভুর লীলা: গদাধর নিত্যানন্দ প্রভুর জন্য রান্না করলেন

No automatic alt text available.গদাধর পণ্ডিত জগন্নাথপুরীতে ক্ষেত্র সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি টোটা গোপীনাথের সেবা করতেন। এই বিগ্রহটি খুবই সুন্দর ছিল, ঠিক যেন বৃন্দাবনের কৃষ্ণ। মহাপ্রভু এ বিগ্রহকে আলিঙ্গন করতেন। একদিন নিত্যান্দন প্রভু বঙ্গদেশ থেকে শালি ধানের চাল নিয়ে এলেন। গদাধর বললেন, ‘তুমি কি এগুলো বৈকুণ্ঠ থেকে আমার গোপীনাথের জন্য নিয়ে এসেছ? তোমাকে এখানে থাকতেই হবে, গোপীনাথের প্রসাদ না পেয়ে যেতে পারবে না। গদাধর গোপীনাথের জন্য অন্ন, ডাল, কচি শাক-পাতা আর কিছু তেঁতুল পাতা দিয়ে ভোগ প্রস্তুত করলেন। তেঁতুল পাতা রান্না করা খুব সহজ নয়, এর জন্য খুবই দক্ষ রাঁধুনি হওয়া চাই। গদাধরের রান্না ছিল অসাধারণ। গদাধর নিত্যানন্দের আলিঙ্গন করলেন। তিনি একটি ব্রত গ্রহণ করেছিলেন- যে নিত্যানন্দের নিন্দা করত, গদাধর তার মুখ দর্শন করতেন না। যে নিত্যানন্দের পছন্দ করত না, গদাধর তার সঙ্গ করতেন না। তিনি নিতাইকে খুবই ভালবাসতেন। 
আসলে গদাধর ছিলেন স্বয়ং রাধারানী। তিনি গৌরলীলায় গদাধররূপে এসেছেন। বৈদিক প্রথা অনুযায়ী, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী বড় ভাইয়ের সঙ্গে মেশেন না। কিন্তু রাধারানী গদাধররূপে আসায় বলরামের সঙ্গে সেই সম্পর্ক এখানে ছিল না। সে সুযোগ গদাধর স্বাভাবিকভাবেই নিত্যানন্দের সঙ্গে মিশতেন। তাঁরা কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দন করতে লাগলেন। এটি ছিল খুবই দুর্লভ মুহুর্ত। তখন হঠাৎ মহাপ্রভু সেখানে আবির্ভূত হলেন। তিনি বললেন, ‘এই মহাভোজে আমি নিমন্ত্রণ পেলাম না কেন? তোমার আমায় নিমন্ত্রণ না করলে কি হবে, আমি জোর করে হলেও প্রসাদ পাব। তোমার আমাকে এই কৃপা থেকে বঞ্চিত করতে পার না। প্রসাদটুকু সমান তিন ভাগে ভাগ কর। আমি তোমাদের সঙ্গে প্রসাদ গ্রহণ করতে চাই। তখন মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ আর গদাধর তিন জনে মিলে গোপীনাথের প্রসাদ গ্রহণ করলেন। এই লীলাটি খুবই অসাধারণ। শ্রীচৈতন্যদেব গদাধরের প্রশংসা করতে লাগলেন, ‘তোমার রান্নার তুলনা হয় না। তেঁতুল পাতা কে রান্না করতে পারে; আমি জানি না তুমি কে, কিন্তু তুমি যাই রান্না কর অমৃতের মতো লাগে। 
চৈতন্যলীলায় গদাধর স্বয়ং রাধারানী, তাই তিনি যে রান্নায় খুব পারদর্শী হবেন, তাতে আর সন্দেহ কী; কেউ যদি পরম কৃপাময় শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ ও গদাধরের একত্রে প্রসাদ গ্রহণ লীলা শ্রবণ করেন, যদি তাদের মধ্যে অন্তহীন কৃষ্ণপ্রেমের প্রীতি বিনিময় কথা শ্রবণ করেন, তাহলে তিনি নিঃসন্দেহে খুব শীঘ্রই গৌরাঙ্গের চরণপদ্ম লাভ করবেন। 

গ্রন্থ : গৌরাঙ্গ
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী
প্রাপ্তিস্থান: নিকটস্থ ইসকন মন্দির
Share:

শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী, শিক্ষা ও কিছু লীলা


যদি গৌর না হইত তবে কি হইত 
কেমনে ধরিতাম দে ।। 
রাধার মহিমা প্রেম রস সীমা 
জগতে জানাত কে ।।

সেই দুষ্ট বালকটির নাম নিমাই। নিম বৃক্ষের নিচে জন্মগ্রহন করায় তার এই নাম। ১৪০৭ শকাব্দ (ইং ১৪৮৬ সালের ফেব্রুয়ারী), তখন ফাল্গুনী পূর্ণিমার সন্ধ্যা। চন্দ্রগ্রহণ চলছিল। ভারতীয় বৈদিক রীতি অনুসারে, চন্দ্রগ্রহণের সময় দিনান্তে মানুষ সাধারণত গঙ্গা অথবা কোন পবিত্র নদীতে গিয়ে স্নান করেন এবং জড় কলুষ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করেন। সকলে তখন সর্বশ্রেষ্ঠ বৈদিক মহামন্ত্র “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে” জপ-কীর্তন করছিলেন। দিব্য হরিনামের মঙ্গল ধ্বনিতে চারিদিক মাতিয়ে পশ্চিম বাংলার নবদ্বীপের শ্রীধাম মায়াপুর নামক স্থানে আবির্ভূত হন কলিযুগের পাবনাবতার, সকলের সৌভাগ্যের উদয়কারী সেই মায়াপুরচন্দ্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু।
মাতার নাম শ্রী শচীদেবী, পিতা শ্রী জগন্নাথ মিশ্র। কয়েকটি কন্যা সন্তানের পাশাপাশি মহান এই ব্রাহ্মন দম্পতির দুটি পুত্র সন্তান-শ্রী বিশ্বরূপ ও শ্রী বিশ্বম্ভর। শ্রীবিশ্বরূপ সন্ন্যাস গ্রহনের পর শচী-জগন্নাথের একমাত্র অবলম্বন হল বিশ্বম্ভর (নিমাই)। যাঁকে ভক্তরা ভালোবেসে ‘মহাপ্রভু’ বলেও সম্বোধন করেন। মহপ্রভু ৪৮ বছর তাঁর অপ্রাকৃত লীলাবিলাস করেন। তাঁর জীবনের প্রথম ২৪ বছর তিনি নবদ্বীপে শৈশব ও গার্হস্থ্য লীলা ও পরবর্তী ২৪ বছর জগন্নাথ পুরী সহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে কলিযুগের একমাত্র যুগধর্ম হরিনাম প্রচার ও কৃষ্ণভক্তিবিজ্ঞান শ্রীমদ্ভাগবত শিক্ষা দেওয়ার জন্য সন্ন্যাস লীলা সম্পাদন করেন। মহাপ্রভু কেবল শ্রীমদ্ভাগবতের বানীই প্রচার করেননি, তিনি ভগবদ্গীতার মূল তত্ত্বও অত্যন্ত ব্যবহারিকভাবে শিক্ষাদান করেছেন। শ্রীচেতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং। দুর্ভাগ্যবশত, শ্রীকৃষ্ণে সরাসরি নির্দেশ এবং ভগবদগীতার শিক্ষা সত্ত্বেও অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা ভ্রন্তিবশত তাঁকে একজন মহান ঐতিহাসিক ব্যক্তি বলে মনে করে, এবং তাঁকে পরমেশ্বর ভগবান বলে মেনে নিতে পারে না। এ সমস্ত নির্বোধ লোকেরা বিভিন্ন প্রবঞ্চক অভক্তদের দ্বারাও প্রতারিত হয়। শ্রীকৃষ্ণের অপ্রকটের পর তথাকথিত অনেক বড় বড় পণ্ডিত ভগবদগীতার ভাষ্য প্রণয়ন করেছে, এবং তাদের প্রায় সকলেই স্বার্থসিদ্ধির ভাবনায় প্রভাবিত ছিল। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জনসাধারনকে ভগবদ্ভক্তি সম্বন্ধে শিক্ষাদান করার জন্য ভক্তরূপে অবতরণ করেন। তিনি এসেছেন সকলকে শিক্ষা দিতে যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বকারণের পরম কারণ পরমেশ্বর ভগবান এবং ঐকান্তিক ভক্তি সহকারে তাঁর সেবা করাই হচ্ছে জীবনের পরম উদ্দেশ্য। এবারে আমি শ্রীচেতন্য মহাপ্রভুর কিছু অপ্রাকৃত লীলা তুলে ধরব যাতে তাঁর পরমেশ্বরত্ব ও করুণা প্রকাশ পেয়েছে।

লীলা ১: একবার একটি চোর নিমাইয়ের গায়ের গহনা চুরি করার জন্য তাঁকে চুরি করে নিয়ে যায়। কিন্তু ভগবান খুব মজা করে সেই হমভম্ব চোরের কাঁধে ঘুরে বেড়ালেন। সেই চোরটি তাঁর গহনা-অলঙ্কার খুলে নেওয়ার জন্য একটি নির্জন জায়গা খুজে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু ভগবানের মায়ার প্রভাবে সেই চোরটি ঘুরতে ঘরতে ঠিক জগন্নাথ মিশ্রের বাড়ির সামনে একই স্থানে আবার উপস্থিত হল এবং ধরা পড়ার ভয়ে শিশুটিকে রেখে পালিয়ে গেল। উৎকণ্ঠিত পিতা মাতা ও আত্মীয়-স্বজনেরা হারিয়ে যাওয়া নিমাইকে ফিরে পেয়ে আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠলেন।
লীলা ২: এক সময়ে এক তীর্থযাত্রী ব্রাহ্মন জগন্নাথ মিশ্রের বাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন, এবং তিনি যখন ভগবানের ভোগ নিবেদন করছিলেন তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেখানে এসে সেই নৈবেদ্য খেতে শুরু করেন। একটি শিশু সেটি স্পর্শ করেছে বলে সেই নৈবেদ্য ফেলে দিয়ে ব্রাহ্মণ আবার ভোগ বানিয়ে তা ভগবানকে নিবেদন করলেন। এবারও মহাপ্রভু এসে সেই ভোগ খেতে শুরু করলেন। এইভাবে তিনবারই একই ঘটনা ঘটার পর শিশুটিকে ঘরের ভিতর বিছানায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেওয়া হল। রাত প্রায় বারোটার সময় যখন সকলে গভীর নিদ্রায় মগ্ন সেই ব্রাহ্মন তখন বিশেষভাবে রান্না করা ভোগ ভগবানকে নিবেদন করলেন এবং ঠিক আগেরই মতো শিশু মহাপ্রভু তাঁর নিবেদন নষ্ট করে দিলেন। ব্রাহ্মণ তখন কাঁদতে শুরু করলেন। কিন্তু সকলে যেহেতু গভীর নিদ্রায় মগ্ন ছিল তাই কেউ সেই কান্না শুনতে পেল না। তখন শিশু মহাপ্রভু সেই সৌভাগ্যশালী ব্রাহ্মণের কাছে তাঁর স্বরূপ উদঘাটন করলেন এবং ব্রাহ্মণ দেখলেন যে, সেই শিশুটি হচ্ছে ব্রজেন্দ্রনন্দন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং। ব্রাহ্মনকে এই ঘটনাটি সম্বন্ধে কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করে দিয়ে শিশু মহাপ্রভু তাঁর মায়ের কোলে ফিরে গেলেন।

লীলা ৩: একবার মহপপ্রভু শ্রীনিবাস ঠাকুরেরর বাড়িতে এক অপূর্ব অলৌকিক লীলা প্রদর্শন করেন। তখন প্রবলভাবে সংকীর্তন হচ্ছিল। তিনি ভক্তদের জিজ্ঞাসা করলেন যে, তাঁরা কি খেতে চান, এবং তাঁরা জানালেন যে, তাঁরা আম খেতে চান, তখন তিনি আমের আটিঁ চাইলেন। তখন আমের সময় ছিল না, আঁটিটি যখন তাঁর কাছে আনা হল, তখন তিনি সেটি শ্রীনিবাস ঠাকুরের অঙ্গনে পুঁতলেন এবং তৎক্ষণাৎ সেই আঁটিটি অঙ্কুরিত হয়ে ক্রমন্বয়ে বর্ধিত হতে লাগল। অচিরেই সেটি একটি আম গাছে পরিণত হল এবং সেই গাছে এত সুপক্ব আম ধরল যে, ভক্তরা তা খেয়ে শেষ করতে পারলেন না। গাছটি শ্রীনিবাস ঠাকুরের অঙ্গনেই রইল এবং ভক্তরা সেটি থেকে তাঁদের যত ইচ্ছে আম নিয়ে খেল। ভক্তরা মহাপ্রভুর এই অপ্রাকৃত লীলা দেখে হরিধ্বনি দিতে লাগল। এখনও সেই গাছ শ্রীনিবাস অঙ্গনে বিদ্যমান।

লীলা ৪: মহাপ্রভু যখন প্রবলভাবে হরিনাম আন্দোলন শুরু করেছেন তখন কিছু গোঁড়া ব্রাহ্মণ তাঁর এবং ভক্তদের বিরুদ্ধে চাঁদ কাজীর কাছে অভিযোগ করে। নবদ্বীপের মুসলমান কাজী ব্রাহ্মণদের এই অভিযোগটিতে প্রভূত গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রথমে তিনি মহাপ্রভুর অনুগামীদের উচ্চস্বরে হরিনাম সংকীর্তন করতে নিষেধ করেন। কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর অনুগামীদর কাজীর সেই নির্দেশ অমান্য করতে নির্দেশ দেন, এবং তাঁরা পূর্বের মতোই সংকীর্তন করে যেতে থাকেন। কাজী তখন সেই সংকীর্তন বন্ধ করার জন্য তাঁর পেয়াদা পাঠান এবং তারা সংকীর্তন কারীদের কয়েকটি মৃদঙ্গ ভেঙে দেয়। এই ঘটনার কথা শুনে মহাপ্রভু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি এক বিরাট আইন-অমান্য আন্দোলন করেন। তিনি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভারতবর্ষে প্রথম আইন-অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। হাজার হাজার মৃদঙ্গ এবং করতাল সহ লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিয়ে এক বিরাট শোভাযাত্রার আয়োজন করেন, এবং কাজীর আইন অমান্য করে এই শোভাযাত্রা নবদ্বীপের পথে পথে হরিনাম কীর্তন করতে করতে কাজীর বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। অবশেষে যখন শোভাযাত্রাটি কাজীর বাড়িতে এসে পৌঁছায়, তখন ভয়ে কাজী তাঁর বাড়ির উপরতলার একটি ঘরে লুকিয়ে থাকেন। সেই বিশাল জনসমাবেশ কাজীর বাড়ির সামনে সমবেত হয়ে প্রচণ্ড ক্রোধ প্রকাশ করতে থাকে, কিন্তু মহাপ্রভু তাদের শান্ত হতে বলেন। মহাপ্রভুর আশ্বাস পেয়ে অবশেষে কাজী তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে এবং তাদের মধ্যে কোরান ও হিন্দু-শাস্ত্র সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা হয়। সেই আলোচনায় তিনি গো-বধের ভয়াবহ পরিনাম তুলে ধরেন। “তোমরা জীয়াইতে নার-বধমাত্র সার। নরক হইতে তোমার নাহিক নিস্তার।। গো-অঙ্গে যত লোম, তত সহস্র বৎসর। গো-বধী রৌরব মধ্যে পচে নিরন্তর।।” এভাবে মহাপ্রভু শাস্ত্র যুক্তির মাধ্যমে গোবধ এবং সবধরণের যজ্ঞ নিষিদ্ধ করলেন। তিনি একমাত্র যজ্ঞ হিসেবে হরিনাম সংকীর্তনকে জগতমাঝে প্রতিষ্ঠা করলেন। তখন কাজী মহাপ্রভুর চরণাশ্রয় গ্রহণ করলেন এবং ঘোষণা করলেন যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রবর্তিত সংকীর্তন যজ্ঞে কেউ যেন কখনও বাধা না দেয়, এবং তিনি তাঁর উইলে লিখে যান যে, তাঁর বংশের কেউ যদি সংকীর্তনে বাধা দেয়, তাহলে সে তৎক্ষণাৎ বংশচ্যুত হবে। নবদ্বীপে মায়াপুরের সন্নিকটে এখনও শ্রীচাঁদ কাজীর সমাধী আছে। এই ঘটনা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিরীহ বৈষ্ণব ছিলেন না। বৈষ্ণব হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবানের ভক্ত এবং প্রয়োজন হলে তিনি সিংহবিক্রমে যথার্থ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

লীলা ৫: মহাপ্রভুর নির্দেশে শ্রীনিত্যানন্দ এবং হরিদাস ঠাকুর সর্বত্র হরিনাম প্রচার করেন। ঐ সময়ের সর্ব সবনিকৃষ্ট পতিত হচ্ছেন দুই ভাই-জগাই ও মাধাই। পৃথিবীতে এমন কোন পাপ নেই যা তারা করেনি; মাংসাহার, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট-সবকিছু। সারাদিন মদের নেশার বিভোর হয়ে থাকত এই দুইজন। তাদের এই পতিত দশা দেখে নিত্যানন্দ প্রভু এবং হরিদাস ঠাকুর তাদেরকে হরিনাম করতে অনুরোধ করলেন। অনুরোধ শুনে মাতাল দুটি অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল এবং অশ্লীল গালাগালি দিতে দিতে তাদেঁরকে তাড়া করতে শুরু করল। পরের দিন আবার তাঁরা দুই মাতালের কাছে গিয়ে ভগবানের নাম কীর্তন করতে অনুরোধ করলেন। পুনরায় ক্রুদ্ধ হয়ে মাধাই একটি কলসির কানা দিয়ে নিত্যানন্দ প্রভুর মাথায় আঘাত করল, এবং সেই আঘাতের ফলে প্রভুর কপাল কেটে দরদর ধারায় রক্ত ঝরে পড়তে লাগল। কিন্তু নিত্যানন্দ প্রভু এতই করুনাময় যে, এই কাজের জন্য কোন রকম প্রতিবাদ না করে তিনি বললেন “তুমি যে আমাকে কলসির কানা ছুড়ে মেরেছ তাতে আমি কিছু মনে করিনি, কিন্তু আমার একমাত্র অনুরোধ যে তুমি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির নাম কীর্তন কর। ইতিমধ্যে নিত্যানন্দ প্রভুর আঘাতের সংবাদ পেয়ে মহাপ্রভু অত্যন্ত ক্রোধিত হয়ে সুদর্শন চক্রকে আহ্বান করলেন দুই পাপীকে সংহার করার জন্য। কিন্তু নিত্যানন্দ প্রভু তাদের হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা চাইলেন এবং মহাপ্রভুকে তাঁর অবতরনের উদ্দেশ্য মনে করিয়ে দিলেন। মহাপ্রভু অবতরনের উদ্দেশ্য হচ্ছে কলিযুগের সমস্ত অধপতিত মানুষকে কৃষ্ণপ্রেম প্রদানের মাধ্যমে উদ্ধার করা এবং এই দুই ভাই-জগাই মাধাই হচ্ছে সেই অধপতিত মানুষের আদর্শ দৃষ্টান্ত। প্রকৃতপক্ষে, বৈদিক সমাজের বিলুপ্তি ও বর্তমান যুগের প্রভাবে অধিকাংশ মানুষই একেকটি জগাই মাধাইয়ে পরিণত হয়েছে। তবুও আমাদের মতো জগাই মাধাইদের জন্য একমাত্র সৌভাগ্যের বিষয় হল হরিনাম মহামন্ত্রকে জীবনের সম্বলরূপে গ্রহন করা। জগাই মাধাই সমস্ত পাপকর্ম বর্জন করে পরম দয়ালু ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চরণে আশ্রয় গ্রহন করল এবং কৃষ্ণপ্রেম লাভ করল। পাপী তাপী যত ছিল হরিনামে উদ্ধারিল তার সাক্ষী জগাই আর মাধাই।।
এভাবে মহাপ্রভু সবচেয়ে পতিত ব্যাক্তিদেরও কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ করেছেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন কলিযুগের অধপতিত জীবদের সৌভাগ্য আনয়নকারী সুহৃদ। যে দুর্লভ বস্তু-কৃষ্ণপ্রেম হাজার হাজার বছর তপস্যা করে লাভ করা যায় না, যা গোলোক বৃন্দাবনের সবচেয়ে গোপনীয় বস্তু, সেই কৃষ্ণপ্রেম আপামর মানুষকে অকাতরে তিনি বিতরণ করেছেন অত্যন্ত করুণার বশবর্তী হয়ে। শুধুমাত্র দিব্য হরিনাম উচ্চারণের মাধ্যমেই এই দুর্লভতম কৃষ্ণপ্রেম লাভ করা যায়।
আর, এই হরিনামকে বিশ্বপরিসরে ছড়িয়ে দিয়েছেন মহাপ্রভুরই এক অন্তরঙ্গ প্রেরিত দূত, আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) এর প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি অভয়চরনারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। মহাপ্রভু ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন “পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম, সর্বত্র প্রচার হইবে মোর নাম।” তাঁর এই ভবিষ্যত বাণীকে সার্থক রূপদান করেছেন শ্রীল প্রভুপাদ। তাঁরই কৃপাতে সাদা-কালো, ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদশূণ্য হয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করছে। তিনিই প্রকৃত জাতিসংঘ গঠন করেছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অপার করুণায়। এই হরিনামের ফলেই সবাই লাভ করছে দিব্য আনন্দ ও সুখি জীবন। আসুন সবাই এখন আমরা এই মুহূর্ত থেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই প্রতিদিন হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন করতে এবং কৃষ্ণ সেবায় নিজেদেরকে নিযুক্ত রাখতে। “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।” শ্রীল প্রভুপাদ কী জয় !! শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কী জয় !!! নিতাই গৌর প্রেমানন্দে..হরি হরি বোল !!!


 


Courtesy: প্রশ্ন করুন, উত্তর পাবেন। সনাতন ধর্মের হাজারও প্রশ্ন এবং উত্তর

Share:

১৮ ডিসেম্বর ২০১৬

দুষ্টু নিমাই শিষ্ট 'শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্য'

Image may contain: 1 person, closeupশ্রী গৌর হরির পিতা জগন্নাথ মিশ্র ও মাতা শচী দেবী। জগন্নাথ মিশ্রের পরপর আট কন্যা হয়। কিন্তু কেহই জীবিত ছিলনা। তার পরে এক পুত্র হয়। নাম তার বিশ্বরূপ। পুত্রের বয়স যখন আট বছর তখন জগন্নাথ মিশ্রের বাবা-মায়ের নিকট হতে একটা পত্র আসল। তাতে লেখাছিল যে, সত্বর যেন স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সিলেট তাঁদের কাছে আসেন। পিতার মাতার এই আজ্ঞা পেয়ে শচী দেবী ও জগন্নাথ মিশ্র শ্রীহট্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং কিছুদিন পর নিজ গৃহে মাতা-পিতার নিকট পৌছান।

১৪০৬ শকাব্দের মাঘ মাসে শচী দেবী আবার গর্ভস্ত হলেন। শোভা দেবী (শাশুড়ীমাতা) রাত্রিতে স্বপ্ন দেখেন যে, কোন মহাপুরুষ তাঁকে বলছেন যে, পুত্রবধুর গর্ভে স্বয়ং ভগবান প্রবেশ করেছেন এবং শচীদেবীকে নবদ্বীপ পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য বলেন। এইজন্য জগন্নাথকে শচীদেবীসহ নবদ্বীপে যাওয়ার জন্য শোভা দেবী আদেশ করলেন। জগন্নাথ মিশ্র মহাশয় শচীদেবীকে নিয়ে নবদ্বীপের বাড়ীতে আসলেন। শচীর দেবীর গর্ভ দশমাস উত্তীর্ণ হল তবু পুত্র কন্যা কিছুই হল না। ক্রমে একাদশমাস, দ্বাদশ মাস উত্তীর্ণ হল তবুও সন্তানের জন্ম হল না। ১৪০৭ শকাব্দের ফাল্গুন মাস আসল জগন্নাথ মিশ্র ব্যস্ত হয়ে শ্বশুর নীলাম্বর চক্রবর্তীকে ডাকালেন। নীলাম্বর পন্ডিত গননা করে বললেন অতি সত্বর শচীর সন্তান হবে। তার গর্ভে কোন এক মহাপুরুষ জন্ম নেবেন। একথা শুনিয়া সকলে স্বস্তি পেলেন।
চৌদ্দশত সাত শকে মাস যে ফাল্গুন।

পৌর্নমাসী সন্ধ্যাকালে হৈল শুভক্ষণ,
সিংহ রাশী, সিংহ লগ্ন উচ্চ প্রহসন।
ষড়বর্গ অষ্টবর্গ সবর্ব শুভক্ষণ।
অর্থাৎ ১৪০৭ শকাব্দে জাহ্নবী তীরস্থ পরীশোভিত নবদ্বীপ নগরে। মনোহর ফাল্গুন মাসে, নির্মল পূর্ণিমা সন্ধ্যায় শ্রী গৌরাঙ্গদেব অবতীর্ণ হলেন। যখন পূর্ণিমা সন্ধ্যায় পূর্বদিকে একখানা উজ্জ্বল থালার মত চন্দ্র উদিত হল। অমনি গৌরাঙ্গ সিংহ রাশিতে পূবর্বফাল্গুনী লক্ষত্রে মাতৃগর্ভ হতে অবির্ভত হলেন। নবদ্বীপবাসী প্রফুল্ল মনে হরিধ্বনি করতে লাগলেন। এভাবে হরিধ্বনির সহিত গৌরাঙ্গ দেব অবিভূত হয়ে ছিলেন। নীম বৃক্ষের তলে জন্ম হয়েছিল বলে শচীমাতা ছেলের নাম নিমাই রাখলেন।

সেসময় নবদ্বীপ বুদ্ধিমান ও নৈয়ায়িক পন্ডিত দ্বারা পূর্ণছিল। ভক্তির লেশ ছিল না। এমনই সময় শ্রী গৌরহরি ভক্তিরস বিতরণের জন্য নদীয়ায় অবর্তীর্ণ হলেন।
কলোহ প্রথম সন্ধ্যায়ং গৌরাঙ্গ অহর মহীতটে।
ভাগীরথী তটে ভূবী ভবিষ্যামী সনাতন। ----ব্রহ্ম পূরাণ
অর্থাৎ কলির প্রথম সন্ধ্যায় গৌরাঙ্গরূপে এই ধরাতলে ভগীরথী তীরে আবির্ভূত হব।
চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি দোলপূর্ণিমার রাত্রে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদিয়ার মায়াপুরে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম। তাঁর পিতামাতা ছিলেন অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার অন্তর্গত নবদ্বীপের অধিবাসী জগন্নাথ মিশ্র ও শচী দেবী। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ওড়িশার জাজপুরের আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র ওড়িশা থেকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন।

চৈতন্যদেবের পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত। তর্কশাস্ত্রে নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিতের খ্যাতি ছিল অবিসংবাদিত। জপ ও কৃষ্ণের নাম কীর্তনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যে ছেলেবেলা থেকেই বজায় ছিল, তা জানা যায় তাঁর জীবনের নানা কাহিনি থেকে। কিন্তু তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সংস্কৃত গ্রন্থাদি পাঠ ও জ্ঞানার্জন। পিতার মৃত্যুর পর গয়ায় পিণ্ডদান করতে গিয়ে নিমাই তাঁর গুরু ঈশ্বর পুরীর সাক্ষাৎ পান। ঈশ্বর পুরীর নিকট তিনি গোপাল মন্ত্রে দীক্ষিত হন। এই ঘটনা নিমাইয়ের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর পণ্ডিত থেকে ভক্ত রূপে তাঁর অপ্রত্যাশিত মন পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় বৈষ্ণব সমাজ আশ্চর্য হয়ে যান। অনতিবিলম্বে নিমাই নদিয়ার বৈষ্ণব সমাজের এক অগ্রণী নেতায় পরিণত হন।

কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাসব্রতে দীক্ষিত হওয়ার পর নিমাই 'শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য' নাম গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি জন্মভূমি বাংলা ত্যাগ করে কয়েক বছর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান পর্যটন করেন। এই সময় তিনি অবিরত কৃষ্ণনাম জপ করতেন। জীবনের শেষ চব্বিশ বছর তিনি অতিবাহিত করেন জগন্নাথধাম পুরীতে। ওড়িশার সূর্যবংশীয় সম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপরুদ্র দেব চৈতন্যমহাপ্রভুকে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন। মহারাজা প্রতাপরুদ্র চৈতন্যদেব ও তাঁর সংকীর্তন দলের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছিলেন। জীবনের শেষপর্বে চৈতন্যদেব ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতেন এবং অধিকাংশ সময়েই ভাবসমাধিস্থ থাকতেন।

তিনি শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য ছিলেন ভাগবত পুরাণ ও ভগবদ্গীতা-য় উল্লিখিত দর্শনের ভিত্তিতে সৃষ্ট বৈষ্ণব ভক্তিযোগ মতবাদের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা। তিনি বিশেষত রাধা ও কৃষ্ণ রূপে ঈশ্বরের পূজা প্রচার করেন এবং হরে কৃষ্ণমহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন। সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষাষ্টক নামক প্রসিদ্ধ স্তোত্রটিও তাঁরই রচনা। গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতানুসারে, ভাগবত পুরাণের শেষের দিকের শ্লোকগুলিতে রাধারানির ভাবকান্তি সংবলিত শ্রীকৃষ্ণের চৈতন্য রূপে অবতার গ্রহণের কথা বর্ণিত হয়েছে।

চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমের নাম গৌরাঙ্গ বা নিমাই। তাঁর গাত্রবর্ণ স্বর্ণালি আভাযুক্ত ছিল বলে তাঁকে গৌরাঙ্গ বা গৌর নামে অভিহিত করা হত। অন্যদিকে নিম বৃক্ষের নিচে জন্ম বলে তাঁর নামকরণ হয়েছিল নিমাই। ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বাংলা সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। সেযুগে একাধিক কবি চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীরচৈতন্য চরিতামৃত,বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের চৈতন্য ভাগবত, এবং লোচন দাস ঠাকুরের চৈতন্যমঙ্গল।

ছেলেবেলায় দুষ্টুমি করাটা সকলেরই মজ্জাগত। দুষ্টুমী না করলে ছেলেবেলা সার্থক হয় না। এবার এমন একজন বিখ্যাত মানুষের নাম শোনাব, যাঁর দুষ্টুমিতে সারা নবদ্বীপ ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
ঠাকুরদা, মধুকর মিশ্র ওড়িশার যাজপুর থেকে রাজা ভ্রমরের অত্যাচারের ভয়ে ,অবিভক্ত বাংলার শ্রীহট্টে এসে বসবাস শুরু করেন। এই শ্রীহট্টই হলো এখনকার সিলেট। পরে, মধুকর মিশ্রের ছেলে জগন্নাথ মিশ্র সংস্কৃত শেখার জন্য নদীয়া জেলার নবদ্বীপে এসে সেখানেই থেকে যান।

পড়াশুনো শেষ হলে, জগন্নাথ মিশ্র, নীলাম্বর চক্রবর্তীর মেয়ে শচীদেবীকে বিয়ে করেন। এঁদের পরপর সাত মেয়ে হলেও সব কটা অকালে মারা যায়। পরে,দুই ছেলে- বিশ্বরূপ আর বিশ্বম্ভর কিন্তু অকালে মারা যান নি। সেকালে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যেত সবার। ষোলো বছরে বিশ্বরূপের বিয়ের কথা হলে, তিনি সন্ন্যাসী হয়ে সংসার ছেড়ে চলে যান।

জগন্নাথ মিশ্র ভাবলেন- অল্প বয়সে বেশী পড়াশোনার করার ফলেই বড় ছেলের এই হাল! একে তো সাত মেয়ে মারা গেছে, তার ওপর বড় ছেলে বিবাগী হয়ে চলে গেল, ফলে বিশ্বম্ভর কে আর পড়াশোনা করতেই পাঠালেন না!!!!!! বিশ্বম্ভরের ডাক নাম ছিল নিমাই! 
কিন্তু, মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক!!!!!! দুষ্টু নিমাই পরে কি হয়েছিল, সেটা বলছি!!!! তার আগে ওর ছেলেবেলার কথা বলে নিই! খুব মজা পাবে।

ওহো! নিমাইয়ের জন্ম তারিখটা তো বলতেই ভুলে গেছি। ১৪৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৮ ই ফেব্রুয়ারি দোলপূর্ণিমার সন্ধে ৬ টা থেকে ৭টার মধ্যে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদিয়ার মায়াপুরে নিমাইয়ের জন্ম।
পাঁচ বছর থেকেই মহা দুষ্টুমি শুরু করেছিল এই নিমাই। তখনকার সব লোক গঙ্গাতে স্নান করতে যেতেন। একটা বিশ্বাস তখনও ছিল, এখনও আছে! গঙ্গাতে স্নান করলে নাকি সব পাপ দূর হয়। তাছাড়া, তখন তো আর ঘরে ঘরে স্নানঘরে শাওয়ার, বাথটাব ছিল না! ফলে লোকে গঙ্গাতেই স্নান করত। আর সেখানেই শুরু হত নিমাইয়ের দুষ্টুমি! ব্রাহ্মণরা স্নান করে উঠলেই গায়ে গোবোর মেশান কাদা ছুঁড়ে দিতেন। কারও শিবঠাকুর নিয়ে পালিয়ে যেতেন। বাচ্চা মেয়েদের চুলে ওকরা নামের একটা কাঁটা ওয়ালা ফলের বীচি ছুঁড়ে দিতেন। চুল জট পাকিয়ে যেত। সে এক কেলেঙ্কারী!!!!!! 

জগন্নাথ মিশ্র সাধে কি, দুঃখ করে লিখেছিলেন!!!!!!!:-
“এহি যদি সর্বশাস্ত্রে হবে গুণবান্।
ছাড়িয়া সংসার সুখ করিবে পয়ান।।
অতএব ইহার পড়িয়া কার্য্য নাই।
মূর্খ হৈয়া ঘরে মোর থাকুক নিমাঞি।।”
তোমরা ভাবছ, আমি বানান ভুল করেছি? আরে না! এটা ১৪৭৩ সালে লেখা!!!!! তখনকার বানান গুলো এরকমই ছিল। আমি ওটা অবিকল তুলে দিয়েছি।
ওই বাচ্চা মেয়েরা নিজেদের বাবা মার কাছে গিয়ে বলত: ---
“বলে মোরে চাহে বিভা* করিবারে”
*বিভা= বিবাহ বা বিয়ে।
পরে আর এক মেয়ে বলছে:-
“পূর্বে শুনিলাম যেন নন্দের কুমার।
সেইমত কি তোমার পুত্রের ব্যাবহার।।”
আর একজন ব্রাহ্মণ জগন্নাথ মিশ্রকে বলছেন ---
“সন্ধ্যা করি জলেতে নামিয়া।
ডুব দিয়া লৈয়া যায় চরণ ধরিয়া।।”
বোঝো কাণ্ড নিমাইয়ের!! ওই পাঁচ বছর বয়সেই ডুব সাঁতার শিখে গেছিল। ব্রাহ্মণ, স্নান সেরে জপ করছেন জলে নেমে আর নিমাই ডুব সাঁতার দিয়ে ব্রাহ্মণের পা টেনে আবার জলে ফেলে নাকানী চোবানী খাওয়াচ্ছেন! 
“কেহ বলে মোর শিবলিঙ্গ করে চুরি।
কেহ বলে মোর লয়ে পলায়ে উত্তরী*।।”
*উত্তরী= উত্তরীয় বা গায়ে দেওয়ার চাদর!
এবার দিনে দিনে বেড়েই চলল, নিমাইয়ের দুষ্টুমী! একদিন এঁটো রান্নার হাঁড়ির ওপর বসে খালি দুলতে লাগল! আর সঙ্গে ঠন্ ঠনা ঠন্ আওয়াজ !!
মা, শচী দেবী বকলেন! বললেন:- ভদ্রতা জানিস না? নিমাই নাকি এর উত্তরে বলেছিল -- (এটা পরে অন্য লোকে লিখেছেন)
“প্রভু বলে মোরে, না দিস পড়িতে।
ভদ্রাভদ্র মূর্খ বিপ্র জানিবে কি মতে।।
মূর্খ আমি না জানি যে ভাল মন্দ স্থান।
সর্বত্র আমার এক অদ্বিতীয় স্থান।।”
এখন আর জগন্নাথ বাবুর কোনো উপায় থাকল না! গ্রামের সকলের পরামর্শে, নিমাইকে গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে পাঠিয়ে দিলেন পড়তে! 
শচী দেবীর হলো বিপদ! ছেলে আর বই ছেড়ে ওঠে না! শচী দেবী ভাবলেন- ছেলে পাগল হয়ে গেছে!!!!
এ ব্যাপারে লেখা আছে --
“কিবা স্নানে কি ভোজনে কিবা পর্যটনে।
নাহিক প্রভুর আর চেষ্টা শাস্ত্র বিনে।।
আপনি করেন প্রভু সুত্রের টিপ্পনী।
ভুলিয়া পুস্তক রসে সর্বে দেবমণি।।
না ছাড়েন শ্রীহস্তে পুস্তক একক্ষণে।.....
পুঁথি ছাড়িয়া নিমাঞি না জানে কোনো কর্ম।
বিদ্যারস ইহার হয়েছে সর্বধর্ম।।
একবার যে সুত্র পড়িয়া প্রভু যায়।
আরবার উল্টিয়া প্রভু সবারে ঠেকায়।।”
এই দুষ্টু নিমাই কালে কালে হয়ে উঠলো মস্ত পণ্ডিত! নাম হলো চৈতন্যদেব!

Courtesy by: Prithwish Ghosh
Share:

২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

ভক্তিযোগই হচ্ছে ভগবানকে লাভ করার -সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা

শ্রীমৎ ভগবদ্গীতায় চারটি যোগের কথা বলা হয়েছে ----
১.কর্মযোগ
২. জ্ঞানযোগ
৩. ধ্যানযোগ
৪. ভক্তিযোগ।
-
কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ এবং ধ্যানযোগের মাধ্যমে ভগবানকে আংশিক ভাবে জানা যায়। কিন্ত ভগবদ্গীতায় ভগবান বলেছেন -- “ভক্ত্যা মামভিজানাতি” অথাৎ ভক্তির দ্বারাই ভগবানকে পূর্ণরূপে জানা যায়। তাই ভক্তিযোগই হচ্ছে ভগবানকে লাভ করার -সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা।
-
নীচে ভক্তির নয়টি পন্থা অনুশীলন করে ভগবানকে লাভ করেছেন তাঁদের দৃষ্টান্ত দেওয়া হল --
১. শ্রবণ --- মহারাজ পরীক্ষিত কেবল শ্রবণের মাধ্যমে ভগবদ্ধাম লাভ করেন। তিনি শ্রীল শুকদেবের নিকট থেকে কেবলমাত্র ৭ (সাত) দিন শ্রীকৃষ্ণ মহিমা শ্রবণ করেছিলেন।
২. কীর্তন --- শ্রীল শুকদেব গোস্বামী কীর্তনের মাধ্যমে ভগবানকে লাভ করেন। তাঁর পিতা মহান ঋষি ব্যাসদেবের নিকট থেকে লব্দ অপ্রাকৃত সংবাদ- ভগবৎ গুন অবিকৃতভাবে কীর্তনের মাধ্যমে।
৩. স্মরণ --- মহারাজ প্রহ্লাদ ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত দেবর্ষি নারদ মুনির উপদেশ অনুসারে সর্বদা ভগবানকে স্মরণের মাধ্যমে পরম গতি প্রাপ্ত হন।
৪. বন্দনা --- কেবল স্তবের দ্বারা ভগবানের বন্দনা করার মাধ্যমে অক্রুর পরমপদ প্রাপ্ত হন।
৫. অর্চন --- (পূজা)- মহারাজ পৃথু কেবল ভগবানের পূজা করার মাধ্যমে সর্বোচ্চ সিদ্ধি প্রাপ্ত হন।
৬. পাদসেবন (সেবা) --- সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, লক্ষীদেবী কেবল একস্থানে উপবেশন করে শ্রী নারায়ণের পাদসেবা করে সাফল্য লাভ করেন।
৭. দাস্য (আজ্ঞা পালন) --- শ্রীরামচন্দ্রের সেবক মহাভক্ত হনুমান কেবল ভগবানের আজ্ঞা পালনের মাধ্যমে পরম গতি লাভ করেন।
৮. সখ্য ( ভগবানের সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন) --- মহাবীর অর্জুন ভগবানের সঙ্গে সখ্যতা করার মাধ্যমে পূর্ণ সিদ্ধি অর্জন করেন। অত্যন্ত প্রীত হয়ে ভগবান অর্জুন ও অর্জুনের ভবিষ্যৎ অনুগামী মানুষদের জন্য ভগবদ্গীতার অমৃতময় জ্ঞান উপদেশ করেন।
৯. আত্মনিবেদন --- মহারাজ বলি তাঁর যথা সর্বস্ব এমনকি নিজ দেহটিকে ও ভগবানকে নিবেদনের মাধ্যমে পূর্ণ সাফল্য প্রাপ্ত হন।
অম্বরীষ মহারাজ উপরোক্ত নয়টি ভক্তির পন্থাই অনুশীলন করতেন এবং এভাবেই তিনিও পরমপদ প্রাপ্ত হন।মূলতঃ সকলের হৃদয়ে ভগবানের প্রতি ভক্তি গুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু জড় জাগতিক সঙ্গের প্রভাবে তা জড় কলুষের দ্বারা আবৃত হয়ে রয়েছে। এই জড় কলুষ থেকে আমাদের হৃদয়কে নির্মল করতে হবে। তাহলে সুপ্ত কৃষ্ণ ভক্তি জাগ্রত হবে। সেটিই হচ্ছে ভক্তিযোগের পূর্ণ পন্থা। ভক্তিযোগ অনুশীলন করতে হলে সদ্গুরুর তত্তাবধানে কতগুলো বিধিনিষেধ পালন করতে হবে। যেমন - সূর্য উদয়ের পূর্বে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে আরতি করা, হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন করা। ফুল তুলে ভগবানের শ্রীচরণে নিবেদন করা, ভোগ রান্না করে তা ভগবানকে নিবেদন করা, ভক্ত সঙ্গ করা, নিরন্তর শুদ্ধ ভক্তের কাছ থেকে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবন করা, এই ভক্তিযোগ অনুশীলন করলে আমাদের হৃদয়ের কলুষতা দূরীভূত হয়। আমরা কৃষ্ণ ভক্তির স্তরে উন্নীত হতে পারি। তাই সদ্গুরুর তত্ত্বাবধানে বিধিবদ্ধ ভাবে ভক্তিযোগ অবলম্বন করলে অবশ্যই কৃষ্ণ ভক্তি লাভ করা যায়।

Written by : Prithwish Ghosh
Share:

২৯ ডিসেম্বর ২০১৫

চৈতন্য মহাপ্রভু


জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৪৮৬
জন্মস্থান - মায়াপুর (অধুনা নদিয়া জেলা, পশ্চিমবঙ্গ)
পূর্বাশ্রমের নাম - নিমাই মিশ্র
মৃত্যু ১ - ৫৩৪, পুরী (বর্তমান ওড়িশা)
গুরু - কেশব ভারতী
দর্শন - গৌড়ীয় বৈষ্ণব
শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার
চৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬ – ১৫৩৪) ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। তিনি অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার মনে করেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতানুসারে, ভাগবত পুরাণের শেষের দিকের শ্লোকগুলিতে রাধারানির ভাবকান্তি সংবলিত শ্রীকৃষ্ণের চৈতন্য রূপে অবতার গ্রহণের কথা বর্ণিত হয়েছে। চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমের নাম গৌরাঙ্গ বা নিমাই। তাঁর গাত্রবর্ণ স্বর্ণালি আভাযুক্ত ছিল বলে তাঁকে গৌরাঙ্গ বা গৌর নামে অভিহিত করা হত। অন্যদিকে নিম বৃক্ষের নিচে জন্ম বলে তাঁর নামকরণ হয়েছিল নিমাই। ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বাংলা সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। সেযুগে একাধিক কবি চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্য চরিতামৃত, বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের চৈতন্য ভাগবত এবং লোচন দাস ঠাকুরের চৈতন্যমঙ্গল। তাঁর পিতামাতা ছিলেন জগন্নাথ মিশ্র ও শচী দেবী। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ওড়িশার জাজপুরের আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র ওড়িশা থেকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন। চৈতন্যদেবের পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত। তর্কশাস্ত্রে নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিতের খ্যাতি ছিল অবিসংবাদিত। জপ ও কৃষ্ণের নাম কীর্তনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যে ছেলেবেলা থেকেই বজায় ছিল, তা জানা যায় তাঁর জীবনের নানা কাহিনি থেকে। কিন্তু তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সংস্কৃত গ্রন্থাদি পাঠ ও জ্ঞানার্জন। পিতার মৃত্যুর পর গয়ায় পিণ্ডদান করতে গিয়ে নিমাই তাঁর গুরু ঈশ্বর পুরীর সাক্ষাৎ পান। ঈশ্বর পুরীর নিকট তিনি গোপাল মন্ত্রে দীক্ষিত হন। এই ঘটনা নিমাইয়ের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর পণ্ডিত থেকে ভক্ত রূপে তাঁর অপ্রত্যাশিত মন পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় বৈষ্ণব সমাজ আশ্চর্য হয়ে যান। অনতিবিলম্বে নিমাই নদিয়ার বৈষ্ণব সমাজের এক অগ্রণী নেতায় পরিণত হন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মতে, চৈতন্য মহাপ্রভু ঈশ্বরের তিনটি পৃথক পৃথক রূপের আধার: প্রথমত, তিনি কৃষ্ণের ভক্ত; দ্বিতীয়ত, তিনি কৃষ্ণভক্তির প্রবক্তা; এবং তৃতীয়ত, তিনি রাধিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ কৃষ্ণের স্বরূপ।
Courtesy by: Prithwish Ghosh
Share:

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪

হরিনামের জোয়ারে বাংলায় পরম ভক্তিবাদের প্রতিষ্টা করেছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু


শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬ – ১৫৩৪) ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। তিনি অধুনাপশ্চিমবঙ্গের নদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার মনে করেন। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য ছিলেন ভাগবত পুরাণ ওভগবদ্গীতা-য় উল্লিখিত দর্শনের ভিত্তিতে সৃষ্ট বৈষ্ণব ভক্তিযোগ মতবাদের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা। তিনি বিশেষত রাধা ও কৃষ্ণ রূপে ঈশ্বরের পূজা প্রচার করেন এবং হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন। সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষাষ্টক নামক প্রসিদ্ধ স্তোত্রটিও তাঁরই রচনা। গৌড়ীয় বৈষ্ণবমতানুসারে, ভাগবত পুরাণের শেষের দিকের শ্লোকগুলিতে রাধারানির ভাবকান্তি সংবলিত শ্রীকৃষ্ণের চৈতন্য রূপে অবতার গ্রহণের কথা বর্ণিত হয়েছে।[


চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমের নাম গৌরাঙ্গ বা নিমাই। তাঁর গাত্রবর্ণ স্বর্ণালি আভাযুক্ত ছিল বলে তাঁকে গৌরাঙ্গ বা গৌর নামে অভিহিত করা হত। অন্যদিকে নিম বৃক্ষের নিচে জন্ম বলে তাঁর নামকরণ হয়েছিল নিমাই। ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বাংলা সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। সেযুগে একাধিক কবি চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্য চরিতামৃত, বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের চৈতন্য ভাগবত এবং লোচন দাস ঠাকুরের চৈতন্যমঙ্গল।
চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি দোলপূর্ণিমার রাত্রে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদিয়ার মায়াপুরে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম। তাঁর পিতামাতা ছিলেন অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার অন্তর্গত নবদ্বীপের অধিবাসী জগন্নাথ মিশ্র ও শচী দেবী। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ওড়িশার জাজপুরের আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র ওড়িশা থেকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন।
চৈতন্যদেবের পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত। তর্কশাস্ত্রে নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিতের খ্যাতি ছিল অবিসংবাদিত। জপ ও কৃষ্ণের নাম কীর্তনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যে ছেলেবেলা থেকেই বজায় ছিল, তা জানা যায় তাঁর জীবনের নানা কাহিনি থেকে। কিন্তু তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সংস্কৃত গ্রন্থাদি পাঠ ও জ্ঞানার্জন। পিতার মৃত্যুর পর গয়ায় পিণ্ডদানকরতে গিয়ে নিমাই তাঁর গুরু ঈশ্বর পুরীর সাক্ষাৎ পান। ঈশ্বর পুরীর নিকট তিনি গোপাল মন্ত্রে দীক্ষিত হন। এই ঘটনা নিমাইয়ের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর পণ্ডিত থেকে ভক্ত রূপে তাঁর অপ্রত্যাশিত মন পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় বৈষ্ণব সমাজ আশ্চর্য হয়ে যান। অনতিবিলম্বে নিমাই নদিয়ার বৈষ্ণব সমাজের এক অগ্রণী নেতায় পরিণত হন।
কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাসব্রতে দীক্ষিত হওয়ার পর নিমাই শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নাম গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি জন্মভূমি বাংলা ত্যাগ করে কয়েক বছর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান পর্যটন করেন। এই সময় তিনি অবিরত কৃষ্ণনাম জপ করতেন। জীবনের শেষ চব্বিশ বছর তিনি অতিবাহিত করেন জগন্নাথধাম পুরীতে। ওড়িশার সূর্যবংশীয় হিন্দু সম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপরুদ্র দেব শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে ভগবান কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন। মহারাজা প্রতাপরুদ্র চৈতন্যদেব ও তাঁর সংকীর্তন দলের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছিলেন। ভক্তদের মতে, জীবনের শেষপর্বে চৈতন্যদেব ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতেন এবং অধিকাংশ সময়েই ভাবসমাধিস্থ থাকতেন।
গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মতে, চৈতন্য মহাপ্রভু ঈশ্বরের তিনটি পৃথক পৃথক রূপের আধার: প্রথমত, তিনি কৃষ্ণের ভক্ত; দ্বিতীয়ত, তিনি কৃষ্ণভক্তির প্রবক্তা; এবং তৃতীয়ত, তিনি রাধিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ কৃষ্ণের স্বরূপ। ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত চৈতন্য জীবনীগ্রন্থগুলির বর্ণনা অনুসারে, তিনি একাধিকবার অদ্বৈত আচার্য ও নিত্যানন্দ প্রভুকে কৃষ্ণের মতো বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন।
Share:

০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪

চৈতন্য আন্দোলন


শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভূ ভারতের নদীয়া জেলার মায়াপুরে ১৮ ফেব্রুয়ারী ১৪৮৬ খ্রীস্টাব্দ জন্মগ্রহন করেন । তিনি মূলত একটি আন্দোলনের আগ্রপথিক হিসাবে কাজ করেন। তিনি প্রধানত ভারতের বাংলা(বাংলাদেশ সহ) ও পূর্ব উড়িষ্যা অঞ্চলের মানুষের মাঝে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কিত একটি আন্দোলনএর উদোক্তা ছিলেন। তাঁর পিতামাতা ছিলেন অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার অন্তর্গত নবদ্বীপের অধিবাসী জগন্নাথ মিশ্র ও শচী দেবী।চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ওড়িশার জাজপুরের আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র ওড়িশা থেকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন।

চৈতন্যদেবের পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমের নাম গৌরাঙ্গ বা নিমাই। তাঁর গাত্রবর্ণ স্বর্ণালি আভাযুক্ত ছিল বলে তাঁকে গৌরাঙ্গ বা গৌর নামে অভিহিত করা হত। অন্যদিকে নিম বৃক্ষের নিচে জন্ম বলে তাঁর নামকরণ হয়েছিল নিমাই। ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বাংলা সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। সেযুগে একাধিক কবি চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্য চরিতামৃত, বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের চৈতন্য ভাগবত, এবং লোচন দাস ঠাকুরের চৈতন্যমঙ্গল।

প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত। তর্কশাস্ত্রে নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিতের খ্যাতি ছিল অবিসংবাদিত। জপ ও কৃষ্ণের নাম কীর্তনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যে ছেলেবেলা থেকেই বজায় ছিল, তা জানা যায় তাঁর জীবনের নানা কাহিনি থেকে।চৈতন্য এর আন্দোলন শুরু হয় নবদ্বীপ থেকে যা তার জন্মভূমি ও তার এ আন্দোলনের শুরুতে তিনি একটি গ্রুপ করেন যারা কৃষ্ণের নামগান করতে থাকেন । কিন্তু তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সংস্কৃত গ্রন্থাদি পাঠ ও জ্ঞানার্জন। পিতার মৃত্যুর পর গয়ায় পিণ্ডদান করতে গিয়ে নিমাই তাঁর গুরু ঈশ্বর পুরীর সাক্ষাৎ পান। ঈশ্বর পুরীর নিকট তিনি গোপাল মন্ত্রে দীক্ষিত হন। এই ঘটনা নিমাইয়ের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর পণ্ডিত থেকে ভক্ত রূপে তাঁর অপ্রত্যাশিত মন পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় বৈষ্ণব সমাজ আশ্চর্য হয়ে যান। অনতিবিলম্বে নিমাই নদিয়ার বৈষ্ণব সমাজের এক অগ্রণী নেতায় পরিণত হন।
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য ছিলেন ভাগবত পুরাণ ও ভগবদ্গীতা-য় উল্লিখিত দর্শনের ভিত্তিতে সৃষ্ট বৈষ্ণব ভক্তিযোগ মতবাদের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা। তিনি বিশেষত রাধা ও কৃষ্ণ রূপে ঈশ্বরের পূজা প্রচার করেন এবং হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন। সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষাষ্টক নামক প্রসিদ্ধ স্তোত্রটিও তাঁরই রচনা। গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতানুসারে, ভাগবত পুরাণের শেষের দিকের শ্লোকগুলিতে রাধারানির ভাবকান্তি সংবলিত শ্রীকৃষ্ণের চৈতন্য রূপে অবতার গ্রহণের কথা বর্ণিত হয়েছে।
কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাসব্রতে দীক্ষিত হওয়ার পর নিমাই শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নাম গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি জন্মভূমি বাংলা ত্যাগ করে কয়েক বছর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান পর্যটন করেন। এই সময় তিনি অবিরত কৃষ্ণনাম জপ করতেন। জীবনের শেষ চব্বিশ বছর তিনি অতিবাহিত করেন জগন্নাথধাম পুরীতে। ওড়িশার সূর্যবংশীয় হিন্দু সম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপরুদ্র দেব চৈতন্য মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন। মহারাজা প্রতাপরুদ্র চৈতন্যদেব ও তাঁর সংকীর্তন দলের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছিলেন। ভক্তদের মতে, জীবনের শেষপর্বে চৈতন্যদেব ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতেন এবং অধিকাংশ সময়েই ভাবসমাধিস্থ থাকতেন।

ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত চৈতন্য জীবনীগ্রন্থগুলির বর্ণনা অনুসারে, তিনি একাধিকবার অদ্বৈত আচার্য ও নিত্যানন্দ প্রভুকে কৃষ্ণের মতো বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন।
-- বিভিন্ন মাধ্যম হতে তথ্য নেওয়া ।

<কৃষ্ণকমল>
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।