• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২২ এপ্রিল ২০২০

কর্ণাটকের বেলুরুতে অবস্থিত চেন্নাকেশব বিষ্ণু মন্দিরের দ্বাররক্ষী রূপে জয় ও বিজয়ের মূর্তি কে ?

কর্ণাটকের বেলুরুতে অবস্থিত চেন্নাকেশব বিষ্ণু মন্দিরের দ্বাররক্ষী রূপে জয় ও বিজয়ের মূর্তি৷

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, জয় ও বিজয় ছিলেন শ্রী বিষ্ণুর বাসক্ষেত্র বৈকুণ্ঠধামের দুই দ্বাররক্ষী বা দ্বারপাল৷ একদা অভিশাপিত হয়ে উভয়কেই মর্তলোকে মরণশীল হয়ে একাধিক জন্ম নেন এবং প্রতিবারেই বিষ্ণুর অবতার দ্বারা নিহত হন৷ তারা পৃৃৃথিবীতে সত্যযুগে হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু , ত্রেতাযুগে রাবণ ও কুম্ভকর্ণ এবং শেষ জন্মে দ্বাপরযুগে শিশুপাল ও দন্তবক্র নামে অবতারজন্ম গ্রহণ করেন৷

ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ অনুসারে জয় ও বিজয় দুজনেই ছিলেন কলিদেবের পুত্র, আবার কলিদেব ছিলেন বরুণ দেব ও তার অন্যতমা পত্নী স্তুতিদেবীর পুত্র৷ জয় ও বিজয়ের কাকা তথা বরুণ দেবের ভ্রাতা পেশায় বৈদ্য ছিলেন৷


বৈকুণ্ঠের দ্বারপালের দ্বারা চতুর্কুমারের বিষ্ণুলোকে প্রবেশে বাধা দান এবং শাপপ্রাপ্তিকালে বিষ্ণু ও শ্রীলক্ষ্মীর আগমন
ভাগবত পুরাণের একটি কাহিনী অনুসারে একদা ব্রহ্মা ও গায়ত্রীদেবীর মানসপুত্র চতুর্কুমার তথা সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার একসঙ্গে বিষ্ণুর দর্শন পেতে বৈকুণ্ঠে এসে হাজির হন৷ তাদের তপস্যার জেরে তাঁরা দীর্ঘায়ীযুক্ত হলেও শিশুসদৃৃশ দেখতে ছিলো, কিন্তু দ্বারপাল জয় ও বিজয় এবিষয়ে বিশেষ অবগত ছিলেন না৷ ফলে তারা চতুর্কুমারকে শিশু ভেবে বৈকুণ্ঠের দ্বারের সম্মুখে আটকে দেন ও ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন৷ তারা চতুর্কুমারকে এও বলেন যে বিষ্ণুদেব এখন শয্যাগ্রহণ করছেন ফলে তিনি এখন দর্শন দিতে অপারক৷ জয় ও বিজয়ের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে চতুর্কুমার তাদের প্রত্যুত্তরের বলেন যে বিষ্ণু তার দর্শনপ্রার্থীদের ও ভক্তদের জন্য সর্বদা উপলব্ধ থাকেন৷



এই বলে তারা দুই দ্বারপালকে অভিশাপ দেন যে তারা দুজনেই মরণশীল মানবরূপে ভূলোকে জন্মগ্রহণ করবেন তাঁদের সাধারণ মানুষের মতোই জন্মমৃত্যুর মায়াচক্রে জীবন অতিবাহিত করতে হবে৷ বিষ্ণু তাদের সম্মুখে প্রকট হলে জয় ও বিজয় তাকে অনুরোধ করেন এই শাপমোচনের কোনো উপায় করতে৷ বিষ্ণু বলেন ব্রহ্মাপুত্র চতুর্কুমারের শাপ বিফল করার কোনো পন্থা নেই বরং নিস্তারের দুটি পথ আছে৷ দ্বারপালগণ সেই উপায় জিজ্ঞাসা করলে বিষ্ণু বলেন হয় তাদেরকে সাধারণ মানুষ হয়ে সাতটি জন্মে পৃথিবীতে বিষ্ণুর সেবক হয়ে জন্ম নিতে হবে নতুবা দ্বিতীয় মতে তিনটি জন্মে পৃথিবীতে বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতারের শত্রু হয়ে জন্ম নিতে হবে৷ এই দুটির যেকোনো একটি শর্ত পূরণ করে তবেই তারা আবার স্থায়ীভাবে বৈকুণ্ঠে প্রবেশ করতে পারবে৷ জয় এবং বিজয় উভয়ই সাতটি জন্ম অবধি শ্রীবিষ্ণুর থেকে দূরে থাকার কথা ভাবতেও পারতেন না, তাই তারা তিন জন্ম বিষ্ণুর একাধিক অবতারের শত্রুরূপে জন্মগ্রহণ করাকে স্বাচ্ছন্দবোধ করে শর্তপূরণের জন্য প্রস্তুত হন৷


পৃৃথিবীতে প্রথম জীবনে তারা কৃতযুগে মহর্ষি কশ্যপ এবং প্রজাপতি দক্ষর কন্যা দিতির দুই পুত্র হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু নামে জন্মগ্রহণ করেন৷ সত্যযুগে বিষ্ণুর অবতার বরাহ অবতার বধ করেন হিরণ্যাক্ষকে এবং ঐ যুগেই বিষ্ণুর
নৃসিংহ অবতার বধ করেন হিরণ্যকশিপুকে৷ দ্বিতীয় জীবনে ত্রেতাযুগে তাঁরা ঋষি বিশ্রবা ও রাক্ষসী নিকষার দুই পুত্র রাবণ ও কুম্ভকর্ণ নামে জন্মগ্রহণ করেন৷ ঐ যুগেই বিষ্ণুর রামাবতার তাদের হত্যা করেন৷ তৃতীয় জীবনে দ্বাপরযুগে তারা শিশুপাল ও দন্তবক্র নামে জন্মলাভ করেন এবং কৃষ্ণের হাতে নিহত হন৷


এটা লক্ষ্য করা যায় যে প্রতি জন্মে জয় ও বিজয়ের মর্তে অবতারের শক্তি হ্রাস হতে থাকে৷ সত্যযুগে হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু হত্যা করতে বিষ্ণুকে আলাদা দুটি অবতাররূপে জন্ম নিতে হয়৷ আবার ত্রেতাযুগে রাম একা রাবণ ও কুম্ভকর্ণকে বধ করে৷ একইভাবে দ্বাপরযুগে দন্তবক্র ও শিশুপাল হত্যা করা কৃষ্ণরূপে অবতার গ্রহণের মূল লক্ষ্য কখনোই ছিলো না৷ দন্তবক্র ও শিশুপালের মৃত্যুর পরে জয় ও বিজয় চতুর্কুমারের শাপ থেকে মুক্ত হন৷ ফলে
বৈষ্ণবীয় রীতি অনুসারে আধুনিক কালে (সংস্কৃৃৃত মতে কলিযুগে ) তারা আবার বৈকুণ্ঠের দ্বারপাল রূপে আত্মনিয়োজিত হন৷


অন্ধ্রপ্রদেশের বেঙ্কটেশ্বর মন্দিরে, ওড়িশার পুরী জগন্নাথ মন্দিরে এবং শ্রীরঙ্গমে রঙ্গনাথ মন্দিরের প্রবেশপথের দুই ধারে দ্বারপালরূপে জয় ও বিজয়ের মূর্তি রয়েছে৷




Post curtesy by: Rumkha Das Jowel
Share:

২৫ অক্টোবর ২০১৭

চূড়‌ালার কা‌হিনী

পৌরা‌ণিক সা‌হি‌ত্যে আমরা দেখ‌তে পাই , দুইজন মহীয়সী নারী অতুল বৈভ‌রের ম‌ধ্যে জীবনযাপন করেও ব্রহ্মজ্ঞান লাভ ক‌রে‌ছি‌লেন । একজন ঋতধ্বজ রাজার পত্নী মদালসা , আর একজন মালবরাজ শি‌খিধ্ব‌জের পত্নী চূড়ালা । গৃহসংসা‌রের সহস্র প্র‌লোভ‌নের মধ্যে থে‌কেও অ‌বিচ‌লিতভা‌বে আধ্যা‌ত্মিক সাধনা যে কত বড় তপস্যা , তা মদালসার মত চূড়ালাও দে‌খি‌য়ে‌ছেন ।

চূড়ালা তপ‌স্বিনী হ‌লেও রাজম‌হিষীর নিত্য কর্ম্মসাধ‌নে তাঁর বিন্দুমাত্র ক্রটি ছিল না । স্বামীর স‌হিত সর্ব‌বিষ‌য়ে সহ‌যো‌গিতা‌তেও তাঁর কোন ভুলভ্রান্ত্রি হত না । চূড়ালার সাধনা ছিল নিভৃ‌তে - এই সাধনার সন্ধান তাঁর স্বামীও রাখ‌তেন না । চূড়ালা যে দিব্যজ্ঞান লাভ ক‌রে‌ছি‌লেন - তাঁর অ‌ঙ্গে দিব্য‌জ্যো‌তি‌তে তা প্র‌তিফ‌লিত হত । অ‌ঙ্গের অসামান্য জ্যোতি কোথা হ‌তে আ‌সল , শি‌খিধ্বজ তা বুঝ‌তে পার‌তেন না । তি‌নি ভাব‌তেন - বু‌ঝি রাজ‌ভো‌গেই ঐ কা‌ন্তি তাঁর অ‌ঙ্গে সঞ্চা‌রিত হ‌য়ে‌ছে ।

চূড়ালা অবশ্য রাজ‌ভোগ্য উপকরণ কিছুই বর্জ্জন ক‌রেন নাই - অনাসক্তভা‌বে তি‌নি ভোগ কর‌তেন । তাঁর কা‌ছে স্বর্ণপাত্র ও মা‌টির পাত্র কোন প্র‌ভেদ ছিল না । রাজ‌র্ষি জনক যেভা‌বে রা‌জৈশ্ব‌র্য্যের ম‌ধ্যেই সাধনা ক‌রে‌ছি‌লেন , চূড়ালাও সেইভা‌বেই যোগ , ধ্যান , তপ - জপ ইত্যা‌দি অনুষ্ঠানে সাধনা কর‌তেন ।

পরম সা‌ধিকা মীরাবাঈ চরম প্রেমভ‌ক্তি লাভ কর‌লে ভোগাসক্ত স্বামীর অনুব‌র্ত্তিনী হ‌য়ে থাক‌তে পা‌রেন নি । কিন্তু চূড়ালা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ ক‌রেও তা পে‌রে‌ছি‌লেন । অরুন্ধতী , অনসূয়া , লোপামুদ্রা ইত্যা‌দি ঋ‌ষিপত্নীর জীব‌নে এইরূপ সমস্যাই ঘটে নি ।

চূড়ালার স‌হিত ধর্ম্মপ‌থে শি‌খিধ্ব‌জের কোন যোগ ছিল না । আশ্চ‌র্য্যের বিষয় , তবু কেবল চূড়ালার সংস‌র্গেই শি‌খিধ্ব‌জের ম‌নে ক্র‌মে বৈরা‌গ্যের উদয় হল । ম‌নে বৈরা‌গ্যের উদয় হওয়ামাত্র শি‌খিধ্বজ রাজসংসার ত্যাগ ক‌রে নিকটবর্ত্তী এক আশ্রমে চ‌লে গে‌লেন ।

চূড়াল‌া দেখ‌লেন - বিনা সাধনায় সহসা যে বৈরা‌গ্যের উদয় হ‌য়ে‌ছে , তা স্থায়ী হয় না । অথচ রাজার ম‌নে পরম ধ‌নের জন্য যে পিপাসা জ‌ন্মে‌ছে , তা নষ্ট হ‌য়ে যায় , তাও বাঞ্ছনীয় নয় ।

চূড়ালা রাজ্যম‌ধ্যে প্রচার কর‌লেন , রাজা তীর্থপ‌রিক্রমায় যাত্রা ক‌রে‌ছেন । যত‌দিন না ফি‌রেন , তত‌দিন তি‌নিই রাজ্যপালন কর‌বেন । চূড়ালা সারাদিন নিয়মমত ধর্ম্মানুসা‌রে রাজকার্য্য কর‌তেন । রা‌ত্রিকা‌লে পুরুষ‌বে‌শে রাজার আশ্রমে গি‌য়ে রাজা‌কে জ্ঞান ও উপ‌দেশ দি‌তেন । পুরুষ‌বেশী চূড়ালাই রাজার গুরু হ‌লেন । ক্র‌মে রাজা সংসা‌রের অসারতা সম্যক্- রূ‌পে বুঝ‌তে লাগ‌লেন । চূড়ালা গুরুরূ‌পে রাজা‌কে রাজসংসা‌রে ফি‌রে যে‌তে আ‌দেশ দি‌লেন , কিন্তু রাজা আর ফিরতে চাই‌লেন না ।

চূড়াল‌ি এইবার রাজাকে ব্রহ্ম‌বিদ্যা সম্ব‌ন্ধে উপ‌দেশ দি‌তে লাগ‌লেন । ক্র‌মে রাজার ব্রহ্মজ্ঞান জ‌ন্মে । এই ব্রহ্মজ্ঞা‌ন লাভ ক‌রে রাজা বু‌ঝতে পা‌র‌লেন - রাজধর্ম্মপালন ব্রহ্মজ্ঞানের বি‌রোধী নয় , ব্রহ্মজ্ঞানীর প‌ক্ষে সংসা‌রে আর সন্ন্যা‌সে কোন প্র‌ভেদ নাই , ব‌নে ও ভব‌নে কোন পার্থক্য নাই , স্বর্ণ ও শিখাখ‌ণ্ডে কোন তফাৎ নেই ।

তখন চূড়ালা আত্মপ্রকাশ ক‌রে রাজা‌কে আবার রাজসংসা‌রে ফি‌রে আন‌লেন । শি‌খিধ্বজও রাজ‌র্ষি জন‌কের মত রাজধর্ম্ম পালন কর‌তে লাগলেন ।

( যোগ‌বা‌শিষ্ঠ রামায়ণ ও বিষ্ণুপুরাণ )

Courtesy by: Joy Shree Radha Madhav
Share:

গ‌জেন্দ্র মোক্ষণ লীলা

অযুত যোজন উচ্চ ত্রিকূট পর্বত অতীব রমণীয় স্থান ছিল । তার চা‌রদি‌কে ছিল ক্ষীর সাগ‌রের প‌রি‌বেষ্টন । বিশাল পর্বতমালায় তিন‌টি শৃঙ্গ তার অনুপম সৌন্দ‌র্যের অঙ্গস্বরূপ ছিল । এই স্বর্ণময় , রে‌ৗপ্যময় ও লৌহময় তিন‌টি শৃঙ্গ , সমুদ্র , দিক্ সকল ও আকা‌শেও শোভাম‌ণ্ডিত ক‌রে রাখত । পর্বতমালা , বৃক্ষ , লতা , গুল্ম পরি‌শো‌ভিত ছিল ।

চতু‌র্দি‌ক থে‌কে সমু‌দ্রের ঢেউ এ‌সে পর্ব‌তের পাদবন্দনা করত । পর্ব‌তে হ‌রিতবর্ণ মরকত প্রস্ত‌রের উপর চা‌রদি‌কের ভূ‌মি শ্যামল ছিল । পব‌র্তের গুহায় সিদ্ধ , চারণ গন্ধর্ব , বিদ্যাধর , নাগ , কিন্নর ও অপ্সরা সক‌লের আগমন হত । তা‌দের সংগী‌তের সুর যখন পর্ব‌তে প্র‌তিধ্ব‌নিত হত তখন অন্যান্য অহংকারী সিংহকুল ভিন্ন সিংহের গর্জন ম‌নে ক‌রে অ‌সহিষ্ণু হ‌য়ে আরও জো‌রে গর্জন ক‌রে উঠত ।

পর্বত উপত্যকা ছিল বন্য পশু‌দের নিবাসস্থান । দেবকাননসম অরণ্যভূ‌মিতে বৃক্ষে বৃ‌ক্ষে সুন্দর পা‌খি‌দের সুমধুর ডাক শোনা যেত । তা‌দের মধুর কলকাক‌লি প‌রি‌বেশ‌কে আনন্দময় ক‌রে রাখত । পর্ব‌তে বহু সুন্দর ঝরনা ও নদীসহ অ‌নেকগু‌লি স‌রোবরও ছিল । তা‌দের তটভূ‌মি ম‌ণিময় বাল‌ুকণা দ্বারা সু‌শো‌ভিত ছিল । দেবাঙ্গনাসকল স্নান করায় তা‌দের অঙ্গস্পর্শ লাভ ক‌রে স‌রোব‌রের জল সুর‌ভিত হ‌য়ে থাকত । সেই সকল নদী ও স‌রোব‌বের সুগন্ধযুক্ত জলকণাবাহী বায়ু অ‌তিশয় সুখসেব্য ছিল ।

পর্বতরাজ ত্রিকূ‌টের পাদ‌দে‌শে ভগবদ্ভক্ত মহাত্মা বরু‌ণের ঋতুমান না‌মে এক‌টি উদ্যান ছিল যা দেবাঙ্গনাস‌ক‌লের ক্রীড়াস্থলরূ‌পে প‌রি‌চিত ছিল । উদ্যান‌টি সারা বছর পুষ্প ও ফ‌লে সমৃদ্ধ থাকত । বি‌ভিন্ন বৃক্ষ‌শো‌ভিত সেই উদ্যা‌নে প‌ক্ষীর কূজন ও ভ্রম‌রের গুঞ্জন অতীব ম‌নোরম ম‌নে হত । সেই উদ্যা‌নে এক বিশাল স‌রোবর ছিল । সরোব‌রে ম‌নোহর স্বর্ণকমল ফু‌টে থাকত । এই পরম আনন্দময় পরি‌বে‌শে স‌রোব‌রের এক বর্ণনাতীত সৌন্দর্য ছিল ।

এই পব‌র্তের গভীর জঙ্গ‌লে এক বিশাল হস্তীবা‌হিনী ছিল । গ‌জেন্দ্র সেই বা‌হিনীর প্রধানরূ‌পে প‌রি‌চিত ছিল । এক‌দিন গ‌জেন্দ্র কন্টকাকীর্ণ কীচক বাঁশ , বেত আ‌দি বিশাল লতা , গুল্ম ও নানা বৃক্ষ লণ্ডভণ্ড ক‌রে ঘু‌রে বেড়া‌চ্ছিল । তার সেই উদ্মত্ত আচরণ ও মদস্রাবগন্ধ অন্যান্য হস্তীসকলর, সিংহ , ব্যাঘ্র , সর্প আ‌দি হিংস্র জন্তুসকল‌কে ভ‌য়ে তার থে‌কে দূরে স‌রি‌য়ে রেখেছিল । কিন্তু তার অভয় লাভ ক‌রে অন্যান্য নিরীহ পশুগণ ওই অঞ্চ‌লে নির্ভ‌য়ে বিচরণ কর‌তে লাগল । প্রবল গ্রীষ্মা‌ধি‌ক্যে গজেন্দ্র অনুগামী হস্তীবা‌হিনী পদভা‌বে পর্বত‌কেও ক‌ম্পিত ক‌রে এ‌গি‌য়ে যা‌চ্ছিল ।

গণ্ডস্থল থে‌কে নির্গত মদস্রাবগন্ধ ভ্রমরকু‌ল‌কে প্রলুব্ধ ক‌রে‌ছিল আর তাই তারা গ‌জেন্দের সঙ্গ ছাড়‌ছিল না । তৃষ্ণাকুল হস্তীবা‌হিনীকে স‌ঙ্গে নি‌য়ে মদ‌বিহ্বল ন‌য়নে গ‌জেন্দ্র দূর থে‌কে পদ্ম‌রেণুগন্ধবাহী বায়ুর আঘ্রা‌ণ লাভ ক‌রে সেই সরোব‌রের তী‌রে অ‌তি দ্রুতগ‌তি‌তে উপনীত হল । স্বর্ণকমল ও রক্তব‌র্ণের কম‌লের কেশ‌রে সুর‌ভিত মধুর নির্মল স‌রোব‌রে সে অবতরণ করল আর শুড় দি‌য়ে সেই জল পান ও স্নান করল । সে অন্য হস্তীবা‌হিনী সদস্য‌দেরও জ‌লে স্নান ক‌রি‌য়ে দিল ও তা পানও করাল । শ্রীভগবা‌নের মায়ায় মো‌হিত হ‌য়ে গ‌জেন্দ্র ক্র‌মেই উন্মত্তসম আচরণ কর‌তে লাগল । তার বিপদ যে এত স‌ন্নি‌কটে তা সে জান‌তেও পারল না ।

গণ্ডস্থল থে‌কে নির্গত মদস্রাবগন্ধ ভ্রমরকু‌ল‌কে প্রলুব্ধ ক‌রে‌ছিল আর তাই তারা গ‌জেন্দের সঙ্গ ছাড়‌ছিল না । তৃষ্ণাকুল হস্তীবা‌হিনীকে স‌ঙ্গে নি‌য়ে মদ‌বিহ্বল ন‌য়নে গ‌জেন্দ্র দূর থে‌কে পদ্ম‌রেণুগন্ধবাহী বায়ুর আঘ্রা‌ণ লাভ ক‌রে সেই সরোব‌রের তী‌রে অ‌তি দ্রুতগ‌তি‌তে উপনীত হল । স্বর্ণকমল ও রক্তব‌র্ণের কম‌লের কেশ‌রে সুর‌ভিত মধুর নির্মল স‌রোব‌রে সে অবতরণ করল আর শুড় দি‌য়ে সেই জল পান ও স্নান করল । সে অন্য হস্তীবা‌হিনী সদস্য‌দেরও জ‌লে স্নান ক‌রি‌য়ে দিল ও তা পানও করাল । শ্রীভগবা‌নের মায়ায় মো‌হিত হ‌য়ে গ‌জেন্দ্র ক্র‌মেই উন্মত্তসম আচরণ কর‌তে লাগল । তার বিপদ যে এত স‌ন্নি‌কটে তা সে জান‌তেও পারল না ।

গ‌জেন্দ্র যখন উন্মত্তসম ব্যবহার কর‌ছিল তখন দৈব‌প্রে‌রিত এক অ‌তি বলবান কুমির ( গ্রাহ ) স‌ক্রো‌ধে তার পা কাম‌ড়ে ধরল । অ‌তি বলবান গ‌জেন্দ্রও তার সমস্ত শক্তি দি‌য়ে নি‌জে‌কে কুমি‌রের কামড় থে‌কে মুক্ত কর‌তে পারল না । হস্তীবা‌হিনীও দলপ‌তিকে কু‌মি‌রের কামড় থে‌কে ছা‌ড়ি‌য়ে আন‌তে সক্ষম হল না । গ‌জেন্দ্র ও কুমির উভ‌য়েই পূর্ণশ‌ক্তি প্র‌য়োগ ক‌রে‌ছিল । কা‌জেই উভয় পক্ষ শ‌ক্তিশা‌লী হওয়ায় টানাহেঁচড়া চল‌তেই থাকল ।

এভা‌বে সহস্র বৎসর অ‌তিক্রান্ত হয়ে গেল । এই যু‌দ্ধ দেবতা‌দেরও আশ্চর্য করল । অব‌শে‌ষে দেখা গেল যে প্রবল পরাক্রমশালী গ‌জেন্দ্র শারী‌রিক ও মান‌সিক শ‌ক্তি হা‌রি‌য়ে অবসন্ন হ‌য়ে পড়ছে । এই অবস্থায় গ‌জেন্দ্র বুঝ‌তে পারল যে কু‌মিররূ‌পে কালই তা‌কে গ্রাস কর‌তে উদ্যত হ‌য়ে‌ছে আর তা‌কে রক্ষা কেবল শ্রীভগবানই কর‌তে পা‌রেন । এইবার সে নিজ বু‌দ্ধি‌তে মন‌কে চিত্তভূ‌মিতে স্থির ক‌রে পূর্ব জ‌ন্মের সংর‌ক্ষিত শ্রেষ্ঠ স্তোত্রসকল দ্বারা শ্রীভগবা‌নের স্তু‌তি কর‌তে লাগল ।

তখন ভ‌ক্তের রক্ষার জন্য সর্বাত্মা সর্ব‌দেবস্বরূপ ভগবান শ্রীহ‌রি স্বয়ং আ‌বির্ভূত হ‌লেন । জগদাত্মা শ্রীহ‌রি গ‌জেন্দ্র‌কে অ‌তি কাতর অবস্থায় দেখ‌লেন আর উচ্চা‌রিত স্তু‌তি শ্রবণ ক‌রে বেদময় গরু‌ড়ে আ‌রোহণ ক‌রে চক্রপা‌ণি শ্রীভগবান‌কে আ‌সতে দে‌খে গ‌জেন্দ্র তার শুঁড় দি‌য়ে এক‌টা কমল তু‌লে কাতর স্ব‌রে বলে উঠল - ' হে নারায়ণ ! হে জগদ্গুরু ! হে শ্রীভগবান ! আপনা‌কে প্রণাম । '

শ্রীহ‌রি গরুড় থে‌কে অবতরণ ক‌রে করুণা পূর্বক স্বয়ং জ‌লে নে‌মে তৎক্ষণাৎ গ‌জে‌ন্দ্রের স‌ঙ্গে কু‌মির‌কে আকর্ষণ ক‌রে স‌রোব‌রের তী‌রে নি‌য়ে এ‌লেন । সেইখা‌নে দেবতাগণও উপ‌স্থিত হ‌য়ে‌ছি‌লেন । তাঁ‌দের সম্মু‌খেই চক্রদ্বার‌া শ্রীভগবান কু‌মি‌রের মুখ‌কে ছিন্ন‌ভিন্ন ক‌রে গ‌জেন্দ্র‌কে মুক্ত কর‌লেন । শ্রীহ‌রির কা‌র্যে সন্তুষ্ট দেবতাগণ পুষ্পবৃ‌ষ্টি কর‌তে লাগ‌লেন । স্ব‌র্গে দুন্দ‌ুভি বে‌জে উঠল , গর্ন্ধবগণ নৃত্যগীত কর‌তে লাগল এবং ঋ‌ষি , চারণ ও সিদ্ধগণ ভগবান পুরু‌ষোত্তমের স্তু‌তি কর‌তে লাগ‌লেন ।

শ্রীভগবানের স্পর্শ লাভ ক‌রে সেই কু‌মির তৎক্ষণাৎ পরমসুন্দর দিব্য দেহ ধারণ কর‌ল । কু‌মির পূবূজ‌ন্মে ' হূহূ ' না‌মে এক শ্রেষ্ঠ গর্ন্ধব ছিল । ঋ‌ষি দেব‌লের অ‌ভিশা‌পে তার কুমির দেহ ধারণ করা । শ্রীভগবা‌নের কৃপায় সে শাপমুক্ত হ‌ল । তার সমস্ত পাপ - তাপ বিনষ্ট হল । শ্রীভগবা‌নের প্রণাম ও স্তু‌তি ক‌রে সে তৎক্ষণাৎ গন্ধর্বলো‌কে গমন করল ।

গ‌জেন্দ্রও শ্রীভগবা‌নের স্পর্শলাভ ক‌রে অজ্ঞা‌নের বন্ধন থে‌কে মু‌ক্তি পেল । সে ভগবানসদৃশ রূপ ধারণ ক‌রে পীতবসন চতুর্ভুজ মূ‌র্তি লাভ করল । এই গ‌জেন্দ্র পূর্বজ‌ন্মে দ্র‌বিড় দে‌শের পাণ্ড্যবং‌শের রাজা ছি‌লেন । তাঁর নাম ছিল ইন্দ্রদ্যুম্ন । একবার রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজ্য ত্যাগ ক‌রে মলয় পর্ব‌তে বাস কর‌ছি‌লেন । তি‌নি শ্রীভগবা‌নের উত্তম উপাসক ও যশস্বী ছি‌লেন । মলয় পর্ব‌তে নিবাসকা‌লে তি‌নি তপস্বীসম বসন ও জটা ধারণ ক‌রে‌ছিলেন ।

এক‌দিন যখন তি‌নি স্নান ক‌রে মৌনব্রত ধারণ ক‌রে একাগ্র‌চিত্তে শ্রীভগবা‌নের পূজা কর‌ছি‌লেন তখন দৈবব‌শে মহাযশস্বী অগস্ত্য মু‌নির স‌শিষ্য আগমন হ‌য়ে‌ছিল । রাজা ইন্দ্রদ্যু‌ম্নের আচরণ মহামু‌নি‌কে ক্রোধা‌ন্বিত করল আর তি‌নি গমনকা‌লে অ‌ভিশাপ দি‌লেন - ' শিক্ষাভা‌বে অহংকারী রাজা নিজ কর্তব্য ভু‌লে গি‌য়ে ব্রাহ্মণ‌কে অপমান ক‌রে‌ছে । সে হস্তীসম জড়বু‌দ্ধি তাই সে সেই ঘোর অন্ধকারময় হস্তী‌যো‌নি‌তেই গমন করুক । ' তাই রাজা ইন্দ্রদ্যু‌ম্নের হস্তীজন্ম হ‌য়ে‌ছিল কিন্তু শ্রীভগবা‌নের আরাধনার প্রভা‌বে তার শ্রীভগবা‌নের স্মৃ‌তি অক্ষত ছিল ।

ভগবান শ্রীহ‌রি এইভা‌বে গ‌জেন্দ্র‌কে উদ্ধার ক‌রে তাঁ‌কে তাঁর পার্ষদ কর‌লেন । গন্ধর্ব , সিদ্ধ ও দেবগণ তাঁর এই লীলার কীর্তন কর‌তে লাগলেন এবং ভগবান শ্রী‌বিষ্ণ‌ু তাঁর পার্ষদ গ‌জেন্দ্র‌কে নি‌য়ে গরু‌ড়ে আ‌রোহণ ক‌রে বৈকু‌ন্ঠে প্রত্যাগমণ করলেন ।

জয় রা‌ধে ।

জয় ভ‌ক্তের জয় ।

জয় শ্রীভগবা‌নের জয় ।
Writer: Joy Shree Radha Madhav
Share:

নৃগরাজ উপাখ্যান

দানবীর‌দের ম‌ধ্যে অগ্রগণ্য রাজা নৃগ মহারাজ ইক্ষ্বাকুর পুত্র ছি‌লেন । বলা হ‌য়ে থা‌কে যে রাজা নৃগ কর্তৃক দান করা ধেনুর সংখ্যা পৃ‌থিবীর ধূ‌লিকণ‌া ,আকা‌শের নক্ষত্র ও বর্ষার ধারার সমতুল্য ছিল । সৎ উপায়ে অ‌র্জিত ধনসম্প‌ত্তি দ্বারা তি‌নি তাঁর রাজত্বকা‌লে এই দান ক‌রে‌ছি‌লেন । দান করা ধেনুসকল দুগ্ধবতী , তরুণ , সহস স্বভাব , সুন্দরদর্শন , সুলক্ষণা ও ক‌পিলা সবৎসা হত ।

‌ধেনু সকলকে দানের প‌ূ‌র্বে সুবর্ণম‌ণ্ডিত শৃঙ্গ ও রৌপ্যম‌ণ্ডিত খুরযুক্ত ক‌রে বস্ত্র‌ালংকার ও মাল্য বিভূ‌ষিতা করা হত । কেবল সেই সকল ব্রাহ্মণসন্তান দান গ্রহ‌ণের উপযুক্ত ব‌লে বি‌বে‌চিত হ‌তেন যাঁর‌া যুবাবস্থায়ই প্র‌তি‌ষ্ঠিত , সদ্গুণসম্পন্ন , ক্লেশযুক্ত প‌রিজন সহায়ক , দম্ভর‌হিত তপস্বী , বেদ পা‌ঠে নিত্যযুক্ত , শিষ্য‌দের নিত্য বিদ্যাদা‌নে স‌চেষ্ট ও স‌চ্চরিত্র ।

দা‌নের পূ‌র্বে ব্রাহ্মণ‌দেরও বস্ত্রাভূষ‌ণে অলংকৃত করা হত । তি‌নি ধেনু ছাড়া ভূ‌‌মি , সুবর্ণ , বাসগৃহ , অশ্ব , হস্তী , দাসীসহিত কন্যা , পর্বতসম তিল , রৌপ্য , শয্যা , বস্ত্র , রত্ন , গৃহসামগ্রী , রথ আ‌দিও প্রভূত দান কর‌ে‌ছি‌লেন আর জনগ‌ণের কল্যা‌ণে বহু যজ্ঞ সম্প‌াদন ক‌রে‌ছি‌লেন ও কূপ পুষ্কারা‌দিও খন ক‌রি‌য়ে দি‌য়ে‌ছি‌লেন ।

এমন দানবী‌রের জীব‌নেও কিঞ্চিত অসতর্কতা হেতু দান করা দ্র‌ব্যের জন্য বিষম ধর্মসংকট নে‌মে এ‌সে‌ছিল । কো‌নো এক অপ্রতিগ্রাহী তপস্বী ব্রাহ্ম‌ণের ধেনু দলছুট হ‌য়ে নৃহরাজ‌ার ধেনুসকলের স‌ঙ্গে মি‌শে গি‌য়ে‌ছিল । ঘটনা তাঁর অজ্ঞা‌তে ঘ‌টে‌ছিল । সেই ধেনু উত্তমরূ‌পে স‌জ্জিতা হ‌য়ে নৃগ রাজা কর্তৃক এক অন্য ব্রাহ্মণ‌কে দান করা হ‌য়ে যায় ।

এমন দানবী‌রের জীব‌নেও কিঞ্চিত অসতর্কতা হেতু দান করা দ্র‌ব্যের জন্য বিষম ধর্মসংকট নে‌মে এ‌সে‌ছিল । কো‌নো এক অপ্রতিগ্রাহী তপস্বী ব্রাহ্ম‌ণের ধেনু দলছুট হ‌য়ে নৃহরাজ‌ার ধেনুসকলের স‌ঙ্গে মি‌শে গি‌য়ে‌ছিল । ঘটনা তাঁর অজ্ঞা‌তে ঘ‌টে‌ছিল । সেই ধেনু উত্তমরূ‌পে স‌জ্জিতা হ‌য়ে নৃগ রাজা কর্তৃক এক অন্য ব্রাহ্মণ‌কে দান করা হ‌য়ে যায় ।

দানগ্রহণ ক‌রে প্রসন্ন চি‌ত্তে যখন ব্রাহ্মণ ধেনুসহ প‌থে যা‌চ্ছি‌লেন তখন ধেনুর প্রকৃত প্রভু ধেনুকে চি‌হ্নিত ক‌রে তা তাঁর ধেনু ব‌লে দাবী ক‌রেন । ঘটনা দানগ্রাহী ব্রাহ্মণ‌কে সমস্যায় ফে‌লে । তি‌নি যে‌হেতু সেই ধেন‌ু রাজা নৃগ কর্তৃক দানরূ‌পে লাভ ক‌রে‌ছি‌লেন , তাই ধেনু তাঁর নি‌জের ব‌লে ব‌লেন । প্রসঙ্গ ক্রমশ জ‌টিল হ‌য়ে যায় যখন দুইজ‌নেই সেই ধেনুর দা‌বি ছা‌ড়‌তে অস্বীকার ক‌রেন ।

কল‌হে লিপ্ত হ‌য়ে ব্রাহ্মণদ্বয় ধেনুসহ রাজা নৃ‌গের কা‌ছে বিচা‌রের জন্য উপস্থিত হন । প্র‌তিগ্রাহী ব্রাহ্মণ বল‌লেন - ' রাজা নৃগ আমা‌কে ধেনু দান ক‌রেছেন তাই ধেনুর অ‌ধিকার আমার । ' প্রকৃত স্বামী বল‌লেন - ' তাই য‌দি হয় তা হ‌লে রাজা নৃগ আমার ধেনু অপহরণ ক‌রে‌ছেন । ' তাঁ‌দের বক্তব্য রাজা নৃগ‌কে বিপ‌দে ফেলল । তি‌নি ধর্মসংক‌টের মু‌খে দাঁ‌ড়ি‌য়ে দুইজ‌নের কা‌ছেই দা‌বি ত্যাগ করবার জন্য অনুনয় - বিনয় কর‌লেন ।

তি‌নি এও বল‌লেন যে যি‌নি দা‌বি ত্যাগ করবেন তাঁ‌কে এক লক্ষ ধেনু দান কর‌বেন । তি‌নি আরও বল‌লেন যে অজা‌ন্তে কৃত অপরাধের জন্য তাঁ‌কে কৃপা করুন আর অশু‌চি নর‌কে প‌তিত হ‌তে যা‌তে না হয় তাই করুন । প্রকৃত প্রভু অপ্র‌তিগ্রাহী ব্রাহ্মণ ছি‌লেন । তি‌নি ব‌লে গে‌লেন যে এর বদ‌লে অন্য কিছু নেওয়া সম্ভব নয় । এই ব‌লে তি‌নি স্থ‌ান ত্যাগ কর‌লেন । প্র‌তিগ্রাহী ব্রাহ্মণ বল‌লেন যে এই ধেনুর প‌রিব‌র্তে এক লক্ষ উৎকৃষ্ট ধেনু কেন আরও দশ সহস্র গাভীও চাই না । তি‌নিও এই ব‌লে স্থান ত্যাগ কর‌লেন ।

কা‌লের নিয়‌মে যথাকা‌লে রাজা নৃ‌গের আয়ুঃ‌শেষ হ‌ল আর যমদূতগণ তাঁ‌কে যমাল‌য়ে নি‌য়ে গেল । যমরাজ তাঁ‌কে জিজ্ঞাসা কর‌লেন - ' কী আ‌গে ভোগ কর‌তে চান ? শুভকর্মফল না অশুভ কর্মফল ? আপনার দানক‌র্মের উপা‌র্জ্জিত দী‌প্তিমান লো‌কের অন্ত দেখা যা‌চ্ছে না । ' রাজা নৃগ বল‌লেন - ' হে যমরাজ ! আ‌মি আ‌গে অশুভ কর্মফল ভোগ কর‌তে চাই । ' যমরাজ ' তাই হোক ' বলবার স‌ঙ্গে সঙ্গে রাজা নৃগ এক গি‌রগি‌টিরূ‌পে এক কূ‌পে প‌তিত হ‌লেন ।

রাজা নৃগ‌কে কূপম‌ধ্যে গির‌গি‌টিরূ‌পে যদুবংশীয় রাজকুমারগণ প্রথ‌মে দে‌খেন । রাজকুমার শাম্ব , প্রদ্যুম্ন আ‌দি সকল চিত্ত‌বি‌নোদন নি‌মিত্ত উপব‌নে গমন ক‌রে‌ছি‌লেন আর তৃষ্ণার্ত হ‌য়ে কূপ স‌ন্নিক‌টে এ‌সে‌ছি‌লেন । সেই প্রাণী‌কে উদ্ধার করতে অসমর্থ হ‌য়ে তাঁর পিতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ‌কে এই সংবাদ দেন ও রাজা নৃগ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বারা উদ্ধারপ্রাপ্ত হন ।

অতঃপর সেই গি‌রগি‌টি শ্রীভগবা‌নের স্পর্শ লাভ ক‌রে তপ্তকাঞ্চনবর্ণ এক স্বর্গীয় দেবমূ‌র্তি‌তে প‌রিব‌র্তিত হ‌য়ে যান । তাঁর অ‌ঙ্গে অদ্ভূত বস্ত্রালংকার ও পুষ্পমাল্য শোভায়মান ছিল । সর্বজ্ঞ শ্রীভগবান সবই জান‌তেন তবুও সর্বসাধার‌ণের কল্যা‌ণে তাঁর কাছ থে‌কেই পূর্ণ বিবরণ পে‌লেন । রাজা নৃ‌গের পাপকর্মফল ভোগ হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছিল । তি‌নি স‌চ্চিদাননন্দ সর্বান্তর্যামী বাসু‌দেব শ্রীকৃষ্ণ‌কে স্তবস্তু‌তি ক‌রে প্রণাম নি‌বেদন কর‌লেন ও উত্তম বিমা‌নে আ‌রোহণ ক‌রে চ‌লে গে‌লেন ।

নৃগরাজ উপাখ্যান দানী‌কে আরও সর্তক হ‌তে ব‌লে । ব্রাহ্মণ‌দের দান করবার সময়ে আরও সাবধান হওয়া প্র‌য়োজন কারণ ব্রাহ্ম‌ণের ধন হলাহল থে‌কেও মারাত্মক । হলাহল বি‌ষের চিকিৎসা হওয়া সম্ভব কিন্তু ব্রাহ্ম‌ণের ধন অপহ‌রণের কে‌া‌নো চিকিৎসা হয় না । অ‌গ্নি নির্বাপণ জলদ্বারা সম্ভব হয় কিন্তু ব্রাহ্ম‌ণের ধনরূপ অর‌ণি থে‌কে যে অ‌গ্নি প্রজ্ব‌লিত হয় তা সমস্ত কুল‌কে সমূলে উৎপা‌টিত ক‌রে । এই পরম সত্য শ্রীভগবান স্বয়ং সমর্থন ক‌রেন ।

জয় শ্রীরাধা‌গো‌বিন্দের জয় ।

জয় হোক সক‌লের ।
Writer: Joy Shree Radha Madhav
Share:

২৭ নভেম্বর ২০১৫

বিশ্বামিত্র

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে বিশ্বামিত্র মহারাজ গাধির পুত্র। উল্লেখ্য গাধির সত্যবতী নামে একটি কন্যা ছিল। এই কন্যার সাথে ঋচিক নামক এক ঋষির সাথে বিবাহ হয়। বিশ্বামিত্রের জন্ম সম্পর্কিত বিষয় ঋচীক চরিত্রের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। ইনি ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেও তপস্যার দ্বারা ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছিলেন। যথাসময়ে বিশ্বামিত্র উত্তরাধিকার সূত্রে রাজত্ব লাভ করেন। একবার তিনি মৃগয়ায় গিয়ে দারুণ পিপাসার্ত হয়ে বশিষ্ঠ মুনির আশ্রয়ে উপস্থিত হন। এখানে ইনি বশিষ্ঠের কামধেনু দেখে তা পাবার জন্য বশিষ্ঠের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন।
ত্রিশঙ্কু সসরীরে স্বর্গে যাবার ইচ্ছাকে কার্যকরী করার সূত্রে ইনি নিজ তপোবলে শূন্যে দ্বিতীয় স্বর্গ তৈরি করা শুরু করেন। এই সময় সপ্তর্ষিমণ্ডলেরও জন্ম হয়। দেবতারা এই দৃশ্য দেখে অত্যন্ত ভীত হয়ে বিশ্বামিত্রের কাছে আসেন। অবশেষে স্থির হয় যে- ত্রিশঙ্কু জ্যোতিশ্চক্রের বাইরে দেবতুল্য নক্ষত্ররূপে বিরাজ করবে এবং অন্যান্য নক্ষত্রসমূহ তাঁকে অনুসরণ করবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে তপস্যার বিঘ্ন হওয়ায় বিশ্বামিত্র পশ্চিমাংশের পুস্করতীর্থবনে তপস্যা শুরু করেন। এই সময় অযোদ্ধার রাজা অম্বরীষ এক যজ্ঞের আয়োজন করেন। ইন্দ্র এই যজ্ঞের পশু হরণ করলে- যজ্ঞের পুরোহিত এর বিকক্প হিসাবে নরবলি দিতে বলেন। অম্বরীষ অনুসন্ধান করে বলির উপযুক্ত ব্যক্তি হিসাবে ঋচীকের মধ্যমপুত্র শুণঃশেফকে নির্বাচন করেন। রাজা শুণঃশেফকে ধরে আনার সময় বিশ্বামিত্রের আশ্রমে উপস্থিত হলে- শুণঃশেফ বিশ্বামিত্রের কাছে প্রাণভিক্ষা করেন। বিশ্বমিত্র তখন শুণঃশেফকে অগ্নিদেবের স্তব করতে বলেন। এই স্তবে অগ্নিদেব সন্তুষ্ট হয়ে যজ্ঞের আগুন থেকে তাঁকে রক্ষা করেন। পরে বিশ্বামিত্র তাঁকে পোষ্যপুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন। এরপর বিশ্বামিত্রের কঠোর তপস্যায় সন্তষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তাঁকে ঋষিত্ব প্রদান করেন। কিন্তু বিশ্বামিত্র এবারেও সন্তুষ্ট না হয়ে আবার তপস্যা শুরু করেন।
ইন্দ্র বিশ্বামিত্রের কঠোর তপস্যা ভঙ্গ করার জন্য মেনকা নামক অপ্সরাকে পাঠান। প্রথমে তেজস্বী বিশ্বামিত্রের কাছে মেনকা যেতে রাজি হন নাই। কিন্তু ইন্দ্রের আদেশে তাঁকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বামিত্রের কাছে যেতেই হয়। তবে যাবার আগে মেনকা ইন্দ্রের কাছে এরূপ বর প্রার্থনা করেন, যেন বিশ্বামিত্রের ক্রোধাগ্নি তাকে দগ্ধ করিতে না পারে। এরপর মেনকার অনুরোধে তাকে সাহায্য করার জন্য, বায়ু তার সাথে যায়। মেনকা তপস্যারত বিশ্বামিত্রের সামনে গিয়ে ক্রীড়া-কৌতুক শুরু করে। একসময় বায়ু মেনকার বসন অপহরণ করলে বিশ্বামিত্র তা দেখে মুগ্ধ হন এবং মেনকার সাথে মিলিত হন। কিছুদিন পর মেনকা গর্ভবতী হলে, মেনকা হিমালয়ের পাদদেশে একটি কন্যা সন্তান প্রসব করে এবং সদ্যজাতা কন্যাকে মালিনী নদীর তীরে নিক্ষেপ করিয়া দেবরাজসভায় প্রস্থান করে। এই সময় কিছু শকুন এই কন্যাকে রক্ষা করেন। কণ্ব মুনি শকুন পাখি পরিবেষ্টিত অবস্থায় এই কন্যাকে পেয়ে আশ্রমে নিয়ে আসেন। শকুন্ত পাখি দ্বারা রক্ষিত হয়েছিল বলে কন্যার নাম রাখেন শকুন্তলা।
বিশ্বামিত্র এবার স্থান ত্যাগ করে উত্তরদিকে যান এবং হিমালয়ের কৌশিকী নদীর তীরে আশ্রম নির্মাণ করে তপস্যা করতে থাকেন। এবার তিনি ব্রহ্মার বরে মহর্ষিত্ব লাভ করেন। সেই সাথে ব্রহ্মা তাঁকে ইন্দ্রিয় জয় করতে বললেন। ব্রহ্মার কথা অনুসারে তিনি আবার তপস্যা শুরু করেন। ইন্দ্র এই তপস্যা ভাঙার জন্য রম্ভা নামক অপ্সরাকে পাঠান। এবার ইনি রম্ভাকে সহচরী হিসাবে গ্রহণ না করে অভিশাপের দ্বারা পাথরে পরিণত করেন। কিন্তু ক্রোধের বশে এই অভিশাপ দেওয়ায় তাঁর তপস্যার ফল নষ্ট হয়- ফলে তিনি আবার তপস্যা শুরু করেন। দীর্ঘ তপস্যার পর ব্রহ্মা তাঁকে ব্রাহ্মণত্ব দান করেন।
বশিষ্ঠ মুনি রাজা হরিশচন্দ্রের প্রশংসা করলে- ইনি তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য কৌশলে রাজার সকল সম্পত্তি হরণ করেন। এরপর ইনি রাজার কাছে দক্ষিণা প্রার্থনা করেন। দক্ষিণার অর্থ সংগ্রহ করার জন্য হরিশচন্দ্র কাশীতে উপস্থিত হন। সেখানে যথাসময়ে দক্ষিণার অর্থ সংগ্রহ করতে না পেরে রাজা তাঁর স্ত্রী-পুত্রকে এক ব্রাহ্মণের কাছে এবং নিজেকে এক চণ্ডালের কাছে বিক্রয় করেন। এই সময় রাজার পুত্র সাপের কামড়ে মৃত্যুবরণ করলে- মৃত পুত্রকে নিয়ে রাজমহিষী শ্মশানে আসেন। শ্মশানে হরিশচন্দ্রের সাথে রাজমহিষীর দেখা হলে উভয়ই বিলাপ করতে থাকেন। এরপর বিশ্বামিত্র উপস্থিত হয়ে হরিশচন্দ্রের আত্মত্যাগের প্রশংসা করে, তাঁর মৃত পুত্রের জীবনদান করেন এবং রাজ্যপাট ফিরিয়ে দেন।
মার্কেণ্ডয় পুরাণের হরিশচন্দ্রের উপাখ্যান মতে- বশিষ্ঠ মুনি বার বত্সর গঙ্গায় বসবাসের পর জল থেকে উঠে এসে হরিশচন্দ্রের বিবরণ শুনে- বিশ্বামিত্রকে বক পাখি হওয়ার অভিশাপ দেন। বিশ্বামিত্রও তাঁকে আড়ি পাখি হওয়ার অভিশাপ দেন। পরে আড়ি-বক যুদ্ধ শুরু করলে- পৃথিবী ধ্বংসের উপক্রম হয়। পরে ব্রহ্মার মধ্যস্থতায় এই বিরোধের অবসান ঘটে। এরপরে বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ পরস্পরের মিত্র হয়ে যান।
রামায়ণের মতে- বিশ্বামিত্রের যজ্ঞনাশের জন্য রাক্ষসেরা সচেষ্ট হলে- রাজা দশরথের অনুমতিক্রমে ইনি রাম-লক্ষ্মণকে নিজের আশ্রমে নিয়ে যান। পথে তিনি এঁদের দুজনকে অবলা ও অতিবলা মন্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্রদান করেন। রাম এই সকল অস্ত্রের সাহায্যে তাড়কা রাক্ষসীকে হত্যা করেন। এরপর বিশ্বামিত্র এই দুই ভাইকে নিয়ে মিথিলা নগরীর পথে রওনা হন। পথে ইনি রামের স্পর্শ দ্বারা অহল্যার অভিশাপ মোচন করান। মিথিলা নগরীতে পৌঁছে ইনি রামকে দিয়ে হরধনু ভঙ্গ করান এবং সীতার সাথে রামের এবং লক্ষ্মণের সাথে উর্মিলার বিবাহ দেন। ইনি শীলাবতীর সাথে মিলিত হলে এঁর একটি পুত্র সন্তান জন্মে। এই পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল কতি। পরবর্তীতে কতি থেকে কাত্যায়নি বংশের পত্তন হয়েছিল।

Written by :  Prithwish Ghosh
Share:

২১ নভেম্বর ২০১৫

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি পর্ব ০৩

অম্বা

১.১. দুর্গা দেবীর অপর নাম।
১.২. জনৈকা অপ্সরা বিশেষ।
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– কাশীরাজের প্রথমা কন্যা। এঁর অপর দুই বোনের নাম হলো– অম্বিকা ও অম্বালিকা। ভীষ্ম চরিত্রের সাথে অম্বা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।


অম্বালিকা


হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– কাশীরাজের কনিষ্ঠা কন্যা। এঁর অপর দুই বানের নাম হলো- অম্বা ও অম্বিকা। ভীষ্ম তাঁর সৎভাই বিচিত্রবীর্যের জন্য এই তিন বোনকে স্বয়ংবর সভা থেকে অপহরণ করেন। ভীষ্মের সৎমাতা সত্যবতীর পুত্র বিচিত্রবীর্যের সাথে অম্বিকা ও অম্বালিকাকে বিবাহ দেন। এই দুই বানের সাথে বিচিত্রবীর্যের অপরিমিত যৌনাচারের ফলে, সাত বৎসর বয়সে যক্ষ্মারোগে তাঁর মৃত্যু হয়। এই দুই বোনের কোনো সন্তান না থাকায়- এঁদের শাশুড়ী সত্যবতী বংশরক্ষার জন্য তাঁর অপর পুত্র ব্যাসদেবের সাথে সহবাস করতে বলেন। ব্যাসদেব মাতৃ আজ্ঞা রক্ষার জন্য এঁরা এই সহবাসে রাজী হন। এক নির্দিষ্ট রাতে ব্যাসদেব অম্বিকার কাছে সঙ্গমের জন্য আসেন। ব্যাসদেব ছিলেন বিরাটকায় পুরুষ। অম্বিকা ঋষিকে দেখে ভয়ে চোখ বন্ধ করে রইলেন। এবং সঙ্গম শেষ না হওয়া পর্যন্ত চোখ খুললেন না। অম্বিকার ঘর থকে বের হয়ে এসে ঋষি তাঁর মাকে বললেন যে– এই কন্যার একটি অন্ধ পুত্র-সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, কারণ সঙ্গমকালে কন্যা চোখ বন্ধ করে ছিল। পরে ইনি এক অন্ধপুত্র প্রসব করেন। এই অন্ধপুত্রই হলেন মহাভারতে অন্যতম চরিত্র ধৃতরাষ্ট্র।

সত্যবতী অন্ধ-সন্তানের কথা শুনে ভাবলেন, রাজ্য রক্ষায় অন্ধ-সন্তান অপারগ হবে। তাই ঋষিকে বললেন যে, অম্বালিকাকে সে একটি সন্তান দান করুক। ঋষি মাতৃ-আজ্ঞায় এক নির্দিষ্টরাতে অম্বালিকার শয়নকক্ষে এলেন। অম্বালিকাও ঋষিকে দেখে প্রচণ্ড ভয় পলেন। কিন্তু চোখ বন্ধ করলে অন্ধ সন্তান হবে এই ভয়ে– চোখ খুলে রাখলেন। কিন্তু সেই বিরাটকায় পুরুষের প্রবল সঙ্গমের প্রচণ্ডতায় ও ভয়ে অম্বালিকা পাণ্ডুবর্ণের হয়ে গেলেন। অম্বালিকার ঘর থেকে বের হয়ে এসে ঋষি তাঁর মাকে বললেন যে– এই কন্যার একটি পুত্র-সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। তবে এই পুত্র পাণ্ডুবর্ণের হবে। এই পুত্র হলেন মহাভারতে অন্যতম চরিত্র পাণ্ডু। শেষ জীবনে ইনি তাঁর মধ্যমা ভগ্নি অম্বিকার সাথে বনে চলে যান এবং তপস্যায় জীবন অতিবাহিত করেন।


অম্বিকা


হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– কাশীরাজের মধ্যমা কন্যা ও ধৃতরাষ্ট্রের মা। এঁর অপর দুই বানের নাম হলো– অম্বা ও অম্বালিকা। অম্বালিকা চরিত্রের সাথে অম্বিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– কাশীরাজের মধ্যমা কন্যা ও ধৃতরাষ্ট্রের মা। এঁর অপর দুই বানের নাম হলো– অম্বা ও অম্বালিকা। অম্বালিকা চরিত্রের সাথে অম্বিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– কাশীরাজের মধ্যমা কন্যা ও ধৃতরাষ্ট্রের মা। এঁর অপর দুই বানের নাম হলো– অম্বা ও অম্বালিকা। অম্বালিকা চরিত্রের সাথে অম্বিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

অরুণ

ইনি মহর্ষি কশ্যপ মুনির ঔরসে ও বিনতার গর্ভে অণ্ডরূপে জন্মেছিলেন। উল্লেখ্য বিনতা দুটি ডিম প্রসব করেছিলেন। দীর্ঘদিন ডিম দুটি ফুটে কোনো সন্তান বের হচ্ছে না দেখে, অধৈর্য হয়ে বিনতা এর একটি ডিম অকালে ভেঙে ফেলেন। এই ডিম থেকে ঊরুহীন অবস্থায় অরুণের জন্ম হয়। তাই এর অপর নাম হয়েছিল অনূরু বা ঊরুহীন। জন্মের পর অরুণ তাঁর মাকে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে- পাঁচশত বৎসর বিনতা তাঁর সপত্নী কদ্রুর দাসী হিসাবে থাকবেন। যদি অসময়ে ইনি অপর ডিমটি না ভাঙেন, তবে ওই ডিম থেকে জন্ম হওয়া সন্তান- তাঁর এই দাসত্ব থেকে মুক্ত করবেন। অরুণ সূর্যের রথের সারথি ছিলেন। সপ্ত অশ্বযোগে ইনি এই রথ পরিচালনা করতেন। এর অপর ভাইয়ের নাম ছিল গরুড়। এঁর স্ত্রীর নাম ছিল শ্যেনী। এঁদের সম্পাতি ও জটায়ু নামে দুটি সন্তান ছিল।


অরুণোদয়-সপ্তমী

অরুণোদয়ে স্থিতা সপ্তমী/মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস। মাঘমাসের শুক্লা সপ্তমীকে এই নামে অভিহিত করা হয়। হিন্দু মতে –মাঘ মাসের শুক্লা সপ্তমী সূর্যগ্রহণতুল্য তিথি। ঐ তিথিতে সূর্য উঠার সময় স্নান করলে মহাফল হয়।


অরুন্ধতী

কর্দম প্রজাপতির ঔরসে দেবাহুতির গর্ভে এঁর জন্ম হয়েছিল। বশিষ্ঠ মুনির সাথে এঁর বিবাহ হয়। ইনি অতিশয় বিদুষী হিসাবে খ্যাত ছিলেন। পতিভক্তিতে ইনি অদ্বিতীয়া ছিলেন। এই কারণে, অগ্নিকে কামনা করে স্বাহা এর রূপ ধরতে ব্যর্থ হন। ইনি নক্ষত্ররূপে বশিষ্ঠের পাশে অবস্থান করছেন। হিন্দু বিবাহে কুশণ্ডিকাকালে মন্ত্র উচ্চারণের সময় নববধূকে এই নক্ষত্র দেখানো হয়।


অর্জুন


হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে এই নামে একাধিক চরিত্র পাওয়া যায়। যেমন–

১. মাহিষ্মতী পুরীতে অর্জুন নামক একজন রাজা ছিলেন। এঁর পিতার নাম ছিল কৃর্তবীর্য। এই কারণে ইনি কার্তবীর্য বা কার্তবীর্যার্জুন নামে পরিচিত ছিলেন।



বালির রাজপথে অর্জুন


২. মহাভারতের অন্যতম চরিত্র। এঁর অপরাপর নাম– অরিমর্দন, কপিকেতন, কপিধ্বজ, কিরীটী, কৃষ্ণসখ, কৃষ্ণসারথি, কৌন্তেয়, গাণ্ডিবধন্বা, গাণ্ডিবী, গুড়াকেশ, চিত্রযোধী, জিষ্ণু, তৃতীয় পাণ্ডব, ধনঞ্জয়, পার্থ, ফল্গুন, ফাল্গুনি, বিজয়, বীভৎসু, শব্দবেধী, শব্দভেদী, শুভ্র, শ্বেতবাহ, শ্বেতবাহন, সব্যসাচী।

পাণ্ডু নামক রাজা কিমিন্দম মুনির অভিশাপের (যে কোন নারীর সাথে সঙ্গম করতে গেলে– পাণ্ডু মৃত্যুবরণ করবেন) কারণে স্ত্রীসংগম থেকে বিরত থাকেন। এই কারণে ইনি তাঁর স্ত্রীদ্বয়ের গর্ভে সন্তান লাভ করতে পারলেন না। এরপর ইনি তাঁর স্ত্রী কুন্তী'কে ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের জন্য অন্য পুরুষকে গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। কুন্তী সন্তান কামনায় তিনবার তিনজন দেবতাকে আহ্বান করেছিলেন। শেষবারে তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে আহ্বান করেন। এর ফলে ইন্দ্রের ঔরসে তিনি অর্জুনকে জন্ম দেন। উল্লেখ্য এঁর পূর্বে একই ভাবে কুন্তী পাণ্ডুর অনুরোধে আরও দুটি সন্তান লাভ করেছিলেন। এরা হলেন- ধর্মের ঔরসে যুধিষ্ঠির ও পবনের ঔরসে ভীম। সেই কারণে অর্জুন তৃতীয় পাণ্ডব নামে পরিচিত হয়ে থাকেন। অবশ্য তবে তারও আগে অবিবাহিতা অবস্থায় সূর্যের ঔরসে কুন্তীর গর্ভে জন্মেছিল কর্ণ। কিন্তু তখন তিনি পাণ্ডুর স্ত্রী ছিলেন না বলে- কর্ণ পাণ্ডব হিসাবে স্বীকৃতি পান নি।

অর্জুন প্রথমে কৃপাচার্যের কাছে, পরে দ্রৌণাচার্যের কাছে অন্যান্য পাণ্ডব ও ধৃতরাষ্ট্রের সন্তানদের সাথে অস্ত্রবিদ্যা ও যুদ্ধনীতি শিক্ষা করেন। ইনি দ্রৌণাচার্যের সকল শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কথিত আছে দ্রৌণাচার্য তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা এবং অর্জুনকে বিশেষ যত্নের সাথে অস্ত্রশিক্ষা দান করছিলেন। ধনুর্বিদ্যায় সমকালীন সকল বীরদের মধ্যে ইনি শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কৌরবসভায় অস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শনকালে দ্রৌণাচার্য সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে ব্রহ্মশির নামক অমোঘ অস্ত্র দান করেন। গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণকে পরাজিত করে- তাঁর কাছ থেকে তিনি চাক্ষুষী বিদ্যা (যার প্রভাবে যে কোন অদৃশ্য বস্তুকে দেখা সম্ভব হতো) লাভ করেন।

দ্রুপদ-কন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরসভায় অন্যান্য পাণ্ডবদের সাথে ছদ্মবেশে ইনি উপস্থিত হন। এই সভায় একমাত্র তিনিই চক্রমধ্য-মৎস্যকে বিদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে সূত্রে ইনি দ্রৌপদীকে লাভ করেন। কিন্তু মাতৃ-আজ্ঞায় পঞ্চপাণ্ডব একত্রে তাঁকে বিবাহ করেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে যাতে ভ্রাতৃবিরোধ না ঘটে, সে কারণে- নারদ নিয়ম করে দেন যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, দ্রৌপদী একজন মাত্র পাণ্ডবের স্ত্রী হিসাবে থাকবেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অধীকারপ্রাপ্ত পাণ্ডব ব্যতীত অন্য কোন পাণ্ডব দ্রৌপদীকে গ্রহণ করলে বা দ্রৌপদীর সাথে অধিকারপ্রাপ্ত পাণ্ডবের বিহারকালে অন্য পাণ্ডব দর্শন করলে- তাঁকে ১২ বৎসর বনবাসী থাকতে হবে। ঘটনাক্রমে একবার এক ব্রাহ্মণকে সাহায্য করার জন্য- অর্জুন অস্ত্রাগারে প্রবেশ করলে- সেখানে যুধিষ্ঠিরের সাথে দ্রৌপদীকে এক শয্যায় দেখতে পান। এই কারণে ইনি ১২ বৎসর বনবাসের জন্য গৃহত্যাগ করেন। বনবাসকালে ইনি বিভিন্নস্থানে ভ্রমণ করে বেড়ান। এই সময়ে ইনি পরশুরামের সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তাঁর কাছ থেকে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করেন। এই ভ্রমণকালে ইনি নাগকন্যা উলূপী ও মণিপুর-রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করেন। তাঁর ঔরসে উলূপীর গর্ভে ইরাবান এবং চিত্রাঙ্গদার গর্ভে বভ্রুবাহনের জন্ম হয়।

এরপর অর্জুন দক্ষিণসাগরের দিকে যাত্রা করেন, পঞ্চতীর্থকে কুমীরমুক্ত করেন। উল্লেখ্য এই তীর্থে অভিশপ্ত অপ্সরা বর্গা ও তাঁর চার সখী কুমিররূপে থাকতেন। অর্জুনের স্পর্শে তাঁরা অভিশাপমুক্ত হন। এরপর অর্জুন দ্বারকায় এলে শ্রীকৃষ্ণের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়। সেখানে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে ও সহায়তায় তাঁর বোন সুভদ্রাকে হরণ করে অর্জুন বিবাহ করেন। সুভদ্রার গর্ভে তাঁর অভিমন্যু নামে একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে। ১২ বৎসর পর পুনরায় পাণ্ডবদের সাথে ইনি মিলিত হন। এই সময় দ্রৌপদীর সাথে মিলিত হলে, শ্রুতকর্মা নামক একটি পুত্রসন্তান জন্মে।

এই সময় একদিন অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ যমুনাতীরে ভ্রমণ করার সময় অগ্নি এসে খাণ্ডববন দগ্ধ করার জন্য অর্জুনের সাহায্য প্রার্থনা করেন। অর্জুন তাকে সাহায্য করতে রাজি হলেন। কিন্তু একই সাথে জানালেন যে, উক্ত বন দগ্ধ করতে গেলে দেবতাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। এবং আরও বললেন যে, দেবতাদের সাথে যুদ্ধ করতে গেলে যে ধরনের অস্ত্র প্রয়োজন, সে ধরনের অস্ত্র তাঁর কাছে নেই। অগ্নিদেব তখন তাঁর সখা বরুণকে অনুরোধ করে– তাঁর কাছ থেকে গাণ্ডীবধনু, অক্ষয় তূণীদ্বয় ও কপিধ্বজা রথ এনে দিলেন। এই সকল অস্ত্রের সাহায্যে কৃষ্ণ ও অর্জুন দেবতাদের পরাস্ত করেন। পরে শর নিক্ষেপে অর্জুন খাণ্ডববন দগ্ধ করেন।
[২২৩-২৪ অধ্যায়। আদিপর্ব। মহাভারত]

এরপর অক্ষক্রীড়ায় যুধিষ্ঠির রাজ্যচ্যুত হলে, অন্যান্য ভাইদের সাথে ইনি ১৩ বৎসরের জন্য বনবাসে যান। এই সময়ে কিরাতবেশী মহাদেব-এর সাথে তাঁর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে অর্জুনকে পাশুপাত অস্ত্র প্রদান করেন। এরপর ইন্দ্র, বরুণ, কুবের ও যমের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তাঁদের শ্রেষ্ঠ অস্ত্রসমূহ লাভ করেন। এরপর তাঁর পিতা ইন্দ্র তাঁকে স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে ইনি গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে নৃত্যগীতি শিক্ষা করেন। স্বর্গবাসকালে উর্বশী তাঁকে প্রেম নিবেদন করলে- ইনি তাঁকে মাতৃজ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করেন। এই কারণে, উর্বশী তাঁকে এক বৎসর নপুংসক অবস্থায় অতিবাহিত হওয়ার অভিশাপ দেন। এরপর ইনি ইন্দ্রের কাছে অস্ত্রশিক্ষা সমাপ্ত করেন। শিক্ষা শেষে ইনি গুরুদক্ষিণা বাবদ- ইন্দ্রের শত্রু নিবাতকবচ নামক তিন কোটি দানবকে তাদের সমুদ্র মধ্যস্থ দুর্গসহ ধ্বংস করেন এবং পৌলম ও কালকেয় অসুরদের বিনাশ করেন। এই কারণে ইন্দ্র সন্তুষ্ট হয়ে- তাঁকে অভেদ্য দিব্যকবচ, হিরণ্ময়ী মালা, দেবদত্ত শঙ্খ, দিব্যকিরীট, দিব্যবস্ত্র ও ভরণ উপহার দেন। পাঁচ বৎসর ইন্দ্রলোকে থাকার পর ইনি বনে এসে ভাইদের সাথে যোগ দেন।

এরপর দ্বৈতবনে থাকাকালে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন দুর্যোধনকে বন্দী করেন। এই কারণে চিত্রসেনের সাথে অর্জুনের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে অর্জুন চিত্রসেনকে পরাজিত করে দুর্যোধনকে উদ্ধার করেন।

সিন্ধুরাজ দ্রৌপদীকে হরণ করলে, অর্জুন ও ভীম মিলে তাঁকে শাস্তি দেন। এরপর এঁরা মৎস্যরাজ বিরাট-ভবনে উপস্থিত হন। সেখানে উর্বশীর শাপে অর্জুন নপংশুক হয়ে বৃহন্নলা নাম ধারণ করেন। এই বেশে বিরাট-কন্যা উত্তরাকে ইনি নৃত্যগীত শেখানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে এক বৎসর অতিবাহিত করেন। পাণ্ডবদের এই অজ্ঞাতবাসের শেষাংশে দুর্যোধন বিরাটরাজের গোধন হরণ করলে বৃহন্নলারূপী অর্জুন কৌরব-সৈন্যদের পরাস্ত করে গোধন উদ্ধার করেন। যুদ্ধ শেষে বিরাটরাজ অর্জুনের সাথে উত্তরার বিবাহ ঠিক করেন। কিন্তু শিষ্যা কন্যার মত বলে ইনি নিজ পুত্র অভিমন্যুর সাথে উত্তরার বিবাহ দেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি কৃষ্ণকে উপদেষ্টা ও তাঁর রথের সারথি হিসাবে লাভ করেন। এরপর অর্জুন স্বজনবধে বিমুখ হলে- কৃষ্ণ তাঁকে উপদেশ দিয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেন। এই উপদেশসমূহের সংকলনই হলো- শ্রীমদ্ভগভদ্গীতা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি অসংখ্য কৌরব-সৈন্যকে হত্যা করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দশম দিনে এঁর শরাঘাতে ভীষ্ম শরশয্যা গ্রহণ করে- ইচ্ছামৃত্য গ্রহণ করেন। এছাড়া যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে ভগদত্তকে, চতুর্দশ দিনে অভিমন্যু বধের প্রতিজ্ঞা স্বরূপ জয়দ্রুতকে, পঞ্চদশ দিনে দ্রোণাচার্যকে, ষোড়শ দিনে মগধরাজ দণ্ডধারকে ও সপ্তদশ দিনে কর্ণকে হত্যা করেন।

যুদ্ধজয়ের পর যুধিষ্ঠির অশ্বমেধযজ্ঞের আয়োজন করেন। যজ্ঞের অশ্ব রক্ষার জন্য অর্জুন যাত্রা করে ত্রিগর্ত, প্রাগ্‌জ্যোতিষপুর ও সিন্ধুদেশ জয় করেন। মণিপুরে নিজপুত্র বভ্রুবাহনের সাথে যুদ্ধে ইনি প্রাণ হারালে– অর্জুনের স্ত্রী নাগকন্যা উলূপী নাগলোক থেকে সঞ্জীবনী এনে তাঁকে জীবিত করে তোলেন। এরপর ইনি অশ্বসহ স্বরাজ্যে ফিরে সেন। এরপর শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু ও যাদবকুলের বিনাশের সংবাদ পেয়ে ইনি দ্বারকায় যান। অর্জুন সেখানকার নারীদের নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে আসার সময়- পথে আভীর দস্যুরা যাদব-নারীদের লুণ্ঠন করে। কৃষ্ণের মৃত্যু ও নিজ দৈবশক্তি হানির ফলে ইনি দস্যুদের বাধা দিতে পারেন নাই।

পাণ্ডবরা অর্জুনের পৌত্র (অভিমন্যুর পুত্র) পরীক্ষিত্কে রাজা করে মহাপ্রস্থানে গমন করেন। পথে লোহিত সাগরের তীরে অগ্নিদেবের অনুরোধে অর্জুন গাণ্ডীবধনু ও অক্ষয় তূণ দুটি পরিত্যাগ করেন। হিমালয় পার হয়ে মহাস্থানের পথে যেতে যেতে- দ্রৌপদী, সহদেব, নকুলের পতনের পর অর্জুনের মৃত্যু হয়। ভীমের প্রশ্নে উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেন, –অর্জুন একদিনে শত্রু-সৈন্য বিনষ্ট করবার প্রতিজ্ঞা করে তা রক্ষা করতে অসমর্থ হয়েছিলেন এবং অন্যান্য ধনুর্ধরদের অবজ্ঞা করতেন বলেই এঁর পতন হয়েছে।

অর্বাবসু

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– ইনি ছিলেন মহর্ষি রৈভ্যের সন্তান। এঁরা ছিলেন দুই ভাই। এর অপর ভাইয়ের নাম ছিল পরাবসু। উভয় ভাই অত্যন্ত যত্নের সাথে পিতা রৈভ্যর কাছে বেদ শিক্ষা করেন। ফলে উভয়কেই ব্রাহ্মণ ও দেবতারা অত্যন্ত সম্মান করতো।

অন্যদিকে রৈভ্যের প্রতিবেশী ছিলেন ভরদ্বাজ নামক প্রখ্যাত ঋষি। এই ঋষি ও তাঁর পুত্র যবক্রীত বেদ অধ্যয়ন না করে তপস্যার দ্বারা বেদজ্ঞান লাভের চেষ্টা করেছিলেন বলে, অন্যান্য ঋষিরা ভরদ্বাজ ও যবক্রীতকে সম্মান করতেন না। বিষয়টি লক্ষ্য করে যবক্রীত কঠোর তপস্যা শুরু করেন। এই তপস্যায় ইনি কোন গুরুর সাহায্য নিলেন না। এই তপস্যায় ইনি এতই কঠোরভাবে নিমগ্ন হয়ে পড়লেন যে, ইন্দ্র অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়লেন এবং তাঁকে গুরুর কাছে বেদ শিক্ষার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু যবক্রীত ইন্দ্রের কথা না শুনে তপস্যা চালিয়ে যেতে লাগলেন। এরপর ইন্দ্র যক্ষ্মারুগী ব্রাহ্মণের রূপ ধরে গঙ্গা তীরে এসে বার বার মুঠি মুঠি বালি পানিতে ফেলতে লাগলেন। এই দেখে যবক্রীত ব্রাহ্মণরূপী ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। এর উত্তরে ইন্দ্র বললেন, তুমি যেমন বেদজ্ঞ হওয়ার আশায় বৃথা তপস্যা করছ, আমিও তেমনি বালু দিয়ে গঙ্গায় সেতু বাঁধার চেষ্টা করছি। যবক্রীত পরে ইন্দ্রের পরিচয় জানতে পেরে তাঁর কাছে বিদ্বান হওয়ার বর প্রার্থনা করলেন। তখন ইন্দ্র খুশী হয়ে পিতাপুত্রকে বেদজ্ঞ হবার বর দান করেলেন। এরপর যবক্রীত এই বিষয়টি তাঁর পিতা ভরদ্বাজকে জানালে, ভরদ্বাজ যবক্রীতকে বললেন, অভীষ্ট বর পেয়ে তুমি অহঙ্কারী ও ক্ষুদ্রমনা হবে, ফলে তোমার মৃত্যু হবে।

এর কিছুদিন পর, একদিন যবক্রীত পরাবসুর সুন্দরী স্ত্রীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কামনা করলেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে পরাবসুর স্ত্রী ভয় পেয়ে সেখানে থেকে পালিয়ে যান। এই সংবাদ পেয়ে রৈভ্য অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর দুইগাছি জটা ছিন্ন করে আগুনে নিক্ষেপ করলে এক সুন্দরী নারী ও একটি রাক্ষস সৃষ্টি হয়। যবক্রীতকে হত্যা করার জন্য রৈভ্য উভয়কে আদেশ করেন। এরপর রৈভ্য প্রেরিত সেই নারী যবক্রীতকে রূপ দ্বারা মুগ্ধ করে তাঁর কমণ্ডলু চুরি করে। কমণ্ডলুহীন হয়ে যবক্রীত আত্মরক্ষার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এই সময় রৈভ্য প্রেরিত রাক্ষস শূল তুলে তাঁকে হত্যা করার জন্য অগ্রসর হয়। যবক্রীত বিপদ বুঝতে পেরে দৌড়ে ভরদ্বাজের অগ্নিহোত্র গৃহে আশ্রয় নিতে গেলে- সেই ঘরের অন্ধ রক্ষী তাঁকে সবলে ধরে রাখে। ফলে রাক্ষস অনায়াসে শূলের আঘাতে যবক্রীতকে হত্যা করে। ভরদ্বাজ পুত্রের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে রৈভ্যকে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে- কনিষ্ঠ পুত্রের হাতেই রৈভ্যের মৃত্যু হবে। এরপর ভরদ্বাজ আগুনে আত্মহত্যা করেন।

এর কিছুদিন পর রাজা বৃহদ্যুম্নের একটি যজ্ঞ করার আয়োজন করেন। উক্ত যজ্ঞের কাজে রাজা অর্বাবসু ও পরাবসুকে নিযুক্ত করেন। একদিন রাত্রে পরাবসু আশ্রমে ফেরার সময় বনের মধ্যে রৈভ্যকে দেখে হরিণ মনে করে হত্যা করেন। পিতার হত্যার পর পরাবসু তাঁর বড় ভাই অর্বাবসুকে পিতৃহত্যার কথা বলেন। এরপর পরাবসুর কথামতো অর্বাবসু আশ্রমে গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করে রাজা বৃহদ্দ্যুম্নের যজ্ঞে যোগদান করেন। কিন্তু রাজা ভাইয়ের পিতৃহত্যার অপরাধে- অর্বাবসুকে বিতারিত করেন। এরপর অর্বাবসু বনে গিয়ে সূর্যের উপাসনা করতে লাগলেন। উপাসনার ফলে সূর্য ও দেবতারা খুশি হয়ে অর্বাবসুকে বর প্রদান করেন। এই বরে রৈভ্য, ভরদ্বাজ ও যবক্রীত পুনর্জীবিত হন এবং পরবাসুর পাপ দূর হয়।

পুনর্জীবন লাভ করার পর যবক্রীত দেবতাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি বেদাধ্যায়ী ও তপস্বী হওয়া সত্ত্বেও রৈভ্য তাঁকে কেমন করে হত্যা করার ক্ষমতা লাভ করলেন? উত্তরে দেবতারা বললেন- গুরুর সাহায্য না নিয়ে কেবল তপস্যার ফলে বেদশিক্ষা করেছিলেন যবক্রীত। কিন্তু রৈভ্য অতি কষ্টে গুরুর কাছে দীর্ঘকাল বেদপাঠ করেছিলেন। সে কারণে ক্ষমতার বিচারে রৈভ্য ছিলেন শ্রেষ্ঠ স্থানে।



অর্যমা

ঋগ্বেদ এর মতে- আদিত্যেদের একজন। ঋগ্বেদের ২য় মণ্ডলের ২৭ সূক্তে ছয়জন আদিত্যের নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন মিত্র, অর্যমা, ভগ, বরুণ, দক্ষ এবং অংশ। কশ্যপ -এর ঔরসে অদিতি'র গর্ভে এঁর জন্ম হয়েছিল। দ্বাদশমূর্তি রূপে সূর্য দ্বাদশ আদিত্য-এ বিভাজিত।

প্রাচীন ভারতীয় আর্য এবং ইরানীয় আর্যরা মিত্রের পূজা করতেন। ইরানীয় আর্যরা মিথ্র (আলো বা সূর্য) হিসেবে পূজা করতেন। ভারতীয় আর্যরাও মিত্রকে আলো বা দিনের দেবতা হিসেবে মান্য করতেন



অশ্বত্থামা

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে দুটি ক্ষেত্রে এই নাম পাওয়া যায়। যেমন–
১. একটি হাতির নাম পাওয়া যায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডব পক্ষের রাজা ইন্দ্রবর্মার হস্তির নাম ছিল অশ্বত্থামা। এই হাতির মৃত্যু হলে— যুদ্ধের কৌশল হিসাবে যুধিষ্ঠির দ্রোণাচর্যের সামনে নাম উচ্চারণ করেছিলেন।

২. পিতার নাম দ্রোণাচার্য ও মাতার নাম কৃপী। ইনি জন্মের পরপরই অশ্বের মতো শব্দ করেছিলেন বলে- এঁর এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ অশ্বের ন্যায় স্থাম যাহার/ বহুব্রীহি সমাস– এই অর্থে সকার স্থানে তকারাদেশে নাম হয়েছিল অশ্বত্থামা। মহাদেব, যম, কাম ও ক্রোধের মিলিত অংশে এঁর জন্ম হয়েছিল। ইনি অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন। এঁর চোখ ছিল পদ্ম-পলাশের মতো। তাঁর মাথায় একটি সহজাত মণি ছিল। এঁর পরিধেয় বস্ত্র ছিল নীল।

ইনি তাঁর পিতার কাছ থেকে বেদাদিশাস্ত্র ও ধনুর্বেদ শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। পরে পিতা-মাতার সাথে ইনি হস্তিনাপুরে কৃপাচার্যের (কৃপী'র ভাই ও অশ্বত্থামার মামা) কাছে আসেন। এই সময় ভীষ্ম দ্রোণাচার্যকে কুরু-পাণ্ডবদের অস্ত্র শিক্ষায় নিয়োগ করলে তাঁদের সাথে ইনিও অস্ত্র শিক্ষা গ্রহণ করেন। পুত্রের প্রতি অত্যধিক স্নেহবশত ইনি অন্যান্য শিষ্যদের চেয়ে অশ্বত্থামাকে অধিকতর শিক্ষা প্রদান করেন। এর ফলে অশ্বত্থামা বহু গুপ্ত অস্ত্র প্রয়োগের কৌশল পিতার কাছ থেকে শিখেছিলেন। পিতার কাছ থেকে নারায়ণ প্রদত্ত নারায়ণাস্ত্র ও ব্রহ্মশির নামক অস্ত্র লাভ করেন। পাণ্ডবদের বনবাসকালে দুর্যোধন কর্তৃক সম্মানিত হয়ে ইনি হস্তিনাপুরে অবস্থান করেন। এই সময় ভূমণ্ডলে অজেয় হওয়ার আশায় ইনি দ্বারকায় গিয়ে কৃষ্ণের কাছে ব্রহ্মশির অস্ত্রের বিনিময়ে সুদর্শনচক্র প্রার্থনা করেন। কৃষ্ণ তাঁর মনোভাব বুঝতে পেরে তাঁকে উক্ত চক্র উত্তোলন করতে বললে- ইনি তা উত্তোলনে অক্ষম হন এবং লজ্জিত হয়ে নতশিরে প্রত্যাগমন করেন।

দ্রোণাচার্য বিরাটরাজার গো-হরণের সময় ইনি দুর্যোধনের সাথে গিয়েছিলেন। বৃহন্নলাবেশী অর্জুনকে দেখে কর্ণ আস্ফালন করতে থাকলে, ইনি অর্জুনের শক্তির কথা উল্লেখ করে কর্ণকে তিরস্কার ও অপমান করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি তাঁর পিতার সাথে দুর্যোধনের পক্ষাবলম্বন করেন। যুদ্ধের আরম্ভে, দম্ভের সাথে ইনি প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন- দশদিনে ইনি পাণ্ডব সৈন্য নিধন করবেন। বলাবাহুল্য তিনি তা পারেন নি। দুর্যোধন এঁর হাতে এক অক্ষৌহিনী (২১৮৭০ গজ ও গজারোহী, ২১৮৭০ রথ ও রথী, ৬৫৬১০ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১০৯৩৫০ পদাতিক ) সৈন্যের ভার অর্পণ করেছিলেন। এঁর রথের পতাকায় সিংহের লেজ অঙ্কিত ছিল।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দ্রোণাচার্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলে- শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের সকল সৈন্যকে 'অশ্বত্থামা নিহত হয়েছে'- এইরূপ ঘোষণা দিতে বলে। সেইভাবে এই বাক্য ঘোষিত হতে থাকলে দ্রোণাচার্য প্রথমে তা অবিশ্বাস করে বলেন যে,- যুধিষ্ঠির বললে তবেই তিনি তা বিশ্বাস করবেন। এরপর কৃষ্ণ ও ভীমের প্ররোচনায় যুধিষ্ঠির দ্রোণের উদ্দেশ্যে 'অশ্বত্থামা হতঃ- কুঞ্জর ইতি' (অশ্বত্থামা -নামক হাতী নিহত হয়েছে) বাক্য উচ্চারণ করেন। উল্লেখ্য পাণ্ডব পক্ষের রাজা ইন্দ্রবর্মার হস্তির নাম অশ্বত্থামা ছিল এবং তা পূর্বেই নিহত হয়েছিল। যুধিষ্ঠির কুঞ্জর ইতি শব্দটি আস্তে বলাতে দ্রোণচার্য মনে করেন যে তাঁর পুত্র অশ্বত্থামার মৃত্যু সংবাদ দেওয়া হয়েছে। এরপর দ্রোণাচার্য অস্ত্র ত্যাগ করলে– ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁকে হত্যা করেন। অশ্বত্থামা তাঁর পিতার এরূপ মৃত্যুর কথা শুনে নারায়ণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কিন্তু কৃষ্ণের উপদেশে সকলে রথ ও অস্ত্রাদি ত্যাগ করে অস্ত্রের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ালে এই অস্ত্র বিফল হয়। এরপর ইনি পিতার হত্যাকারী ধৃষ্টদ্যুম্নকে হত্যা করার জন্য বার বার চেষ্টা সত্বেও ভীম, অর্জুন ও সাত্যকির কারণে তা সম্ভব হয় নি। এই সময় অসংখ্য পাণ্ডব সৈন্য ধ্বংস করার পরও কৃষ্ণার্জুনকেও হত্যা করতে সক্ষম হলেন না। এরপর অর্জুন-কর্ণের যুদ্ধে অর্জুনের বীরত্ব দেখে ইনি দুর্যোধনকে পাণ্ডবদের সাথে সন্ধির প্রস্তাব দিতে বলেন। দুর্যোধন সে কথা না শুনে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন।

অর্জুন কর্তৃক কর্ণ নিহত হলে- দুর্যোধন তাঁর কাছে নূতন সেনাপতি নিয়োগের পরামর্শ নিতে এলে- ইনি শল্যকে সে পদ দিতে বলেন। দুর্যোধনের উরুভঙ্গের পর ইনি সেনাপতিত্বে অভিষিক্ত হন। সেনাপতি পদ লাভ করার পর ইনি চিত্কার করতে করতে অগ্রসর হলে- কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা তাঁকে অনুসরণ করে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা সন্ধ্যার দিকে একটি বনে প্রবেশ করেন। একটি প্রকাণ্ড গাছের নীচে কৃপাচার্য ও কৃপবর্মা ঘুমিয়ে পড়লেও পাণ্ডবদের প্রতি ক্রোধের কারণে অশ্বত্থামা ঘুমাতে পারলেন না। সেই সময় ইনি দেখলেন যে- একটি বিশাল পেঁচা রাত্রির অন্ধকারে অসংখ্য ঘুমন্ত কাককে হত্যা করছে। এ দৃশ্য দেখার পর ইনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, রাত্রের অন্ধকারে পাণ্ডবশিবিরে প্রবেশ করে এইভাবে পাণ্ডবদের হত্যা করবেন। এই কাজের জন্য ইনি কৃপাচার্য ও কৃতবর্মাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তাঁর কাজে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করলেন। প্রথমে এঁরা রাজী না হলেও শেষ পর্যন্ত ইনি তাঁদেরকে তাঁর অনুগামী হতে বাধ্য করলেন। পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশের মুখে ইনি মহাদেবের আরাধনা করলে, স্বয়ং মহাদেব আবির্ভুত হয়ে তাঁকে খড়্গ প্রদান করেন। উল্লেখ্য, এই সময় পঞ্চপাণ্ডব, কৃষ্ণ ও সাত্যকি গঙ্গাতীরে অবস্থান করছিলেন। এরপর কৃপাচার্য ও কৃতবর্মাকে দ্বার রক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করে ইনি পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করে প্রথমে ধৃষ্টদ্যুম্নকে হত্যা করেন। এরপর খড়্গাঘাতে- উত্তমৌজাঃ, যুধামনু্যকে হত্যা করলে, অন্যান্য পাণ্ডব-বীরেরা জেগে উঠেন এবং তাঁরা অশ্বত্থামাকে আক্রমণ করেন। কিন্তু অশ্বত্থামা পাল্টা আঘাতে সবাইকে হত্যা করতে সক্ষম হন। এরপর ইনি দ্রৌপদীর পুত্রদের, শিখণ্ডী ও অন্যান্য পাণ্ডব বীরদের হত্যা করেন। এই সময় যারা ভয়ে শিবির থেকে পলায়নের চেষ্টা করেন তাঁদেরকেও কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা হত্যা করেন। এই সময় কৃতবর্মার অসতর্কতার কারণে ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি কোন প্রকারে পালাতে সক্ষম হন। পরদিন যুধিষ্ঠিরকে সকল বিষয় জানালে, দ্রৌপদী পুত্র ও ভ্রাতৃশোকে প্রতিজ্ঞা করে বলেন যে, অশ্বত্থামাকে পরাজিত করে তাঁর সহজাতমণি যদি যুধিষ্ঠির ধারণ না করতে পারেন, তবে তিনি প্রায়োপবেশনে প্রাণ ত্যাগ করবেন। এরপর ভীম অশ্বত্থামাকে হত্যা করার জন্য অগ্রসর হলে তাঁকে সাহায্য করার জন্য যুধিষ্ঠির অর্জুনকে সাথে নিয়ে অগ্রসর হন।

অশ্বত্থামা এই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর প্রথমে দুর্যোধনকে সংবাদ দান করলে, আনন্দে ইনি তাঁকে আশীর্বাদ করে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ইনি ভাগীরথীর তীরে ব্যাসদেবের কাছে যান। এঁকে খুঁজতে খুঁজতে যুধিষ্ঠির ভীম ও অর্জুন সেখানে উপস্থিত হলে- ইনি পাণ্ডব নিধনের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ করেন। কৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুনও প্রতিষেধক হিসাবে একই অস্ত্র প্রয়োগ করলে- উভয় অস্ত্রের কারণে পৃথিবী ধ্বংসের উপক্রম হয়। সে কারণে দেবর্ষি নারদ ও মহর্ষি ব্যাস এই দুই অস্ত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উভয়ের অস্ত্র সংবরণ করতে বলেন। অর্জুন ব্রহ্মচর্য পালনের কারণে অস্ত্র প্রতিহারে সমর্থ হলেও, অশ্বত্থামা সদা সত্পথে না থাকায় ইনি তাঁর অস্ত্র প্রত্যাহার করতে পারলেন না। ফলে উক্ত অস্ত্র ব্যর্থ হয়ে অর্জুনের পুত্রবধু উত্তরার গর্ভস্থ শিশুকে হত্যা করে। পরে কৃষ্ণ যোগবলে শিশুটিকে জীবিত করেন।

অশ্বত্থামা এর পরে পাণ্ডবদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে তাঁর সহজাত মণি প্রদান করেন। এরপর দুঃখিত মনে বনে গমন করেন। অশ্বত্থামা বিবাহ করেন নি। ব্রাহ্মণ হয়েও ইনি পিতার মতো ক্ষাত্রবৃত্তি অবলম্বন করেছিলেন।


অশ্বপত

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– ইনি মুদ্রা দেশের রাজা ছিলেন। ইনি সন্তান লাভের জন্য সাবিত্রী'র আরাধনা করেন। দেবীর বরে এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করলে ইনি এই কন্যার নাম রাখেন সাবিত্রী। এই সাবিত্রীই হলো- মহাভারতে বর্ণিত সাবিত্রী-সত্যবান উপাখ্যানের নায়িকা।


অশ্বমেধ

ভারতীয় আর্যদের পালিত যজ্ঞ বিশেষ। অশ্ব বলি দিয়ে এই হোম বা যজ্ঞ করা হতো। বড় বড় রাজারাই এই যজ্ঞ করতেন।

নিরানব্বইটি যজ্ঞ করার পর সর্বসুলক্ষণাক্রান্ত একটি অশ্বের কপালে জয়পত্র বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হতো। যজ্ঞের ঘোড়ার বর্ণনায় বলা হয়েছে― এই ঘোড়া হবে কৃষ্ণবর্ণের, মুখ সুবর্ণতুল্য, মুখের দুই পাশে থাকবে অর্ধচন্দ্র চিহ্ন অঙ্কিত, পুচ্ছ হবে বিদ্যুতের মতো প্রভাযুক্ত, পেট হবে কুন্দ ফুলের ন্যায় শ্বেতবর্ণ। এর হরিৎবর্ণের পা থাকবে এবং কান হবে সিঁদুরের মতো রক্তিম। জিহ্বা হবে প্রজ্জ্বলিত আগুনের মতো, চোখ হবে তেজস্কর এবং সর্বাঙ্গ জুড়ে থাকেব সুগন্ধ।

এই ঘোড়া হবে অত্যন্ত বেগবান। এইরূপ ঘোড়া এক বৎসর ধরে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়াত। এই সময়, এই ঘোড়াকে রক্ষা করার জন্য এর সাথে সৈন্যসামন্ত থাকতো। কেউ ওই ঘোড়াকে ধরলে এর সাথের সৈন্যরা তার সাথে যুদ্ধ করে সে ঘোড়াকে উদ্ধার করতো। এইভাবে বৎসরান্তে ঘোড়াটি ফিরে এলে, ঘোড়ার অধিকারী রাজা রাজচক্রবর্তী উপাধি প্রাপ্ত হতেন। ঘোড়া ফিরে এলে ব্রাহ্মণেরা শাস্ত্রমতে তাকে হত্যা করতো। রাত্রে রাজপত্নীরা এই ঘোড়াকে রক্ষা করতেন।

এই যজ্ঞে অশ্বকে বলিদানকালে বাঁধার জন্য একুশটি কাঠের যূপ তৈরি করা হতো। এর ছয়টি যূপ বেলকাঠের, ছয়টি খদির কাঠের, ছয়টি পলাশ কাঠের, দুটি দেবদারু কাঠের এবং একটি শ্লাষ্মতক কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো। এই যজ্ঞে অশ্ব ছাড়াও প্রায় তিনশত গরু, ছাগল এবং মেষও বলি দেওয়া হতো।এরপর অশ্ব বলি দেওয়া হতো। যজ্ঞের অশ্বের বক্ষঃস্থলের মেধ অগ্নিতে সংস্কার করা হত এবং দেহের অবশিষ্টাংশ দ্বারা হোম করা হতো।

আর্যরা মনে করতেন, এই যজ্ঞের ফলে ব্রহ্মহত্যাসহ সর্বপ্রকার পাপের ক্ষয় এবং স্বর্গ ও মোক্ষ লাভ হবে। যজ্ঞশেষে ব্রাহ্মণদের দক্ষিণা এবং নিমন্ত্রিত রাজা ও অন্যান্য বর্ণের অতিথিদের উপহার দেওয়া হতো।

রামচন্দ্র ও যুধিষ্ঠির এই যজ্ঞ করেছিলেন। রাজা দশরথ পুত্র-কামনায় এই যজ্ঞ করেছিলেন। কথিত আছে শত অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে ইন্দ্রত্ব লাভ করা যায়। এই কারণে ইন্দ্র তাঁর ইন্দ্রত্ব রক্ষার জন্য শতমেধ যজ্ঞের বাধা দিতেন। এই কারণেই ইন্দ্র দিলীপ ও সগররাজের শততম অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব অপহরণ করেছিলেন।

ব্রহ্মপুরাণে কলিকালে এই যজ্ঞ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। অবশ্য আমেরের রাজা সেওয়ার জয়সিংহ অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন।

অশ্বসেন

দ্রোণাচার্য-এর রথের সারথির নাম।

নাগ বিশেষ। এর পিতার নাম তক্ষক। কৃষ্ণ ও অর্জুন কর্তৃক খাণ্ডববন দহনকালে এর মা একে গলধকরণ করে বাইরে আনার চেষ্টা করলে অর্জুন তার শিরোশ্ছেদ করেন। এই সময় ইন্দ্র ঝড়বৃষ্টি সৃষ্টি করে অর্জুনকে মোহাচ্ছন্ন করলে অশ্বসেন মুক্ত হয়। অগ্নি, কৃষ্ণ ও অর্জুন তাকে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে― সে নিরাশ্রয় হবে।

কর্ণার্জুন যুদ্ধের সময় অশ্বসেন মাতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য অর্জুনকে হত্যা করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে, কর্ণের অজ্ঞাতে তাঁর তূণে প্রবেশ করেছিল। কর্ণ যখন অর্জুনের উদ্দেশ্যে বাণ নিক্ষেপ করেন, তখন কৃষ্ণ এই বিষয়ে অবগত হয়ে রথ নিচু করেন। ফলে অশ্বসেন বাণ হয়ে অর্জুনের মুকুট দগ্ধ করে। এরপর অশ্বসেন কর্ণের কাছে গিয়ে আত্মপরিচয় দিয়ে তাকে পুনরায় বাণরূপে ব্যবহার করতে অনুরোধ করে। কিন্তু কর্ণ একবাণ দুইবার ব্যবহার না করতে এবং অন্যের সাহায্যে জয়লাভে অসম্মত হওয়ায়, অশ্বসেন নিজেই অর্জুনকে হত্যা করার জন্য ধাবিত হয় এবং অর্জুনের অস্তরাঘাতে নিহত হয়।


অশ্বায়ুর্বেদ
অশ্বের আয়ুর্বেদ বিষয়ক শাস্ত্র। শালিহোত্র তাঁর পুত্র সুশ্রুতকে ঘোড়ার চিকিৎসা বিষয়ক এই শাস্ত্র প্রদান করেছিলেন।


অশ্বিনী
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে–
১. প্রজাপতি দক্ষের কন্যা। এঁর সাথে চন্দ্রের বিবাহ হয়েছিল। চন্দ্রের ছিল ২৭টি স্ত্রী। এই স্ত্রীরা সবাই নক্ষত্র। চন্দ্রের ২৭টি নক্ষত্র-স্ত্রীর মধ্যে অশ্বিনী ছিলেন প্রথম।
২. অশ্বিনী কুমারের অপর নাম।


অশ্বিনীকুমার
অশ্বিনী (অশ্ব রূপিণী সূর্যপত্নী সংজ্ঞা) এবং তাঁর কুমার (পুত্র)। এই অর্থে অশ্বিনীকুমার।
স্বর্গের চিকিৎসক। এঁর পিতার নাম সূর্য ও মাতার নাম সংজ্ঞা।

সংজ্ঞা সূর্যের অসহ্য তেজ সহ্য করতে না পেরে, সূর্যকে দেখলে চোখ নামিয়ে ফেলতেন। এই জন্য সূর্য ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন যে, সংজ্ঞা তাঁর চক্ষু সংযমন করার জন্য প্রজাদের সংযমনকারী যম-কে প্রসব করবেন। এরপর এই অভিশাপের সূত্র সংজ্ঞা মৃত্যু দেবতা যমকে প্রসব করেন। এরপর তিনি অত্যন্ত ভীতা হয়ে চপলভাবে সূর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগলেন। তাঁর এই চপল চক্ষু দেখে সূর্য বললেন যে, তিনি চঞ্চলস্বভাবা একটি নদী প্রসব করার অভিশাপ দেন। এই অভিশাপের সূত্রে সংজ্ঞা, যমী নামক কন্যার জন্ম দেন। এই কন্যা যমুনা নামে প্রবাহিত হয়। এই কারণে যমী'কে অনেক সময় যমুনা বলা হয়।

যম ও যমী (যমুনা) জন্মের পর, স্বামীর রূপ ও ক্রোধ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য, ইনি নিজের অনুরূপ ছায়া নামক এক নারীকে সৃষ্টি করেন। এরপর সূর্য ও নিজের পুত্র-কন্যার পরিচর্যার ভার ছায়ার উপর অর্পণ করে, পিতৃগৃহে যান। কিন্তু সংজ্ঞার পিতা বিশ্বকর্মা অসন্তুষ্ট হয়ে কন্যাকে সূর্যের কাছে ফিরে যেতে বলেন। এরপর ইনি স্বামীর কাছে না গিয়ে উত্তর কুরুবর্ষে ঘোটকীর রূপ ধারণ করে ভ্রমণ করতে থাকেন।

ছায়া নিজের সন্তানদের মত সংজ্ঞার সন্তানদের প্রতিপালন করতেন না। এতে যম একদিন ক্রুদ্ধ হয়ে ছায়াকে পদাঘাত করতে উদ্যত হয়েও পরমুহূর্তেই যম ছায়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু ছায়া ক্ষমা না করে যমকে অভিশাপ দিলেন যে, তাঁর পা খসে যাবে। যম পিতার কাছে গিয়ে বিমাতার এই ব্যবহারের কথা বলেন। সুর্য নিজ পুত্র যমকে অভিশাপ থেকে মুক্ত না করে বলেন যে, তাঁর পায়ের মাংস নিয়ে কৃমিরা মাটিতে প্রবেশ করবে। এরপর যম, সংজ্ঞা যে তাঁর আপন মা নয়― সে কথা সূর্যকে জানালেন। সমস্ত বিবরণ গোপন রেখে ছলনা করবার জন্য সূর্য ছায়াকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হলে, ছায়া সমস্ত কথা স্বীকার করে, সংজ্ঞার পিতৃগৃহে গমনের সমস্ত সংবাদ সূর্যকে বলে দেন।

এরপর সূর্য বিশ্বকর্মা'র কাছে গিয়ে, তাঁর স্ত্রীর (সংজ্ঞা) গৃহত্যাগের কারণ জানতে পারেন। এরপর সূর্য সমাধিস্থ হয়ে সংজ্ঞার অবস্থান এবং অশ্বীরূপ সম্পর্কে জানতে পারলেন। এরপর সূর্য বিশ্বকর্মা'র কাছে গিয়ে নিজের তেজ কমিয়ে অশ্বরূপ ধারণ করে ঘোটকীরূপিণী সংজ্ঞার সাথে মিলিত হলেন। এই মিলনের ফলে প্রথমে যুগল দেবতা অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও পরে রেবন্তের জন্ম হয়।

―মার্কেণ্ডেয় পুরাণ, বৈবস্বত ও সাবর্ণির উপখ্যান।

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে এরা অশ্বিনীকুমারদ্বয় নামে খ্যাত। পরবর্তী সময়ে এরা চিকিৎসাবিদ্যায় সুপণ্ডিত হয়ে উঠলে– স্বর্গবৈদ্য উপাধিতে ভূষিত হন। চিকিৎসা বিষয়ক এদের রচিত গ্রন্থের নাম হলো চিকিৎসা-সার-তত্ত্ব।

এরা দেখতে একইরকম ছিলেন এবং সবসময় এক সাথেই থাকতেন। অত্যন্ত রূপবান হিসাবে এঁরা খ্যাতি লাভ করেছিলেন। পাণ্ডুপত্নী মাদ্রী ক্ষেত্রজ সন্তান লাভের জন্য কুন্তীর শেখানো মন্ত্রের সাহায্যে এই দুই ভাইকে আহ্বান করেছিলেন। উভয় দেবতার সাথে মিলিত হয়ে মাদ্রী দুটি সন্তান লাভ করেছিলেন। এই সন্তানদ্বয় হলো– নকুল ও সহদেব।

এঁরা একটি সুবর্ণ রথে দিনে তিনবার ও রাতে তিনবার পৃথিবী পরিভ্রমণ করেন। আশ্বিনীকুমারদ্বয় সম্পর্কে বেশ মতভেদ রয়েছে। যেমন–
১. নিরুক্তকার যস্কের মতে : চন্দ্র ও সূর্য।
২. বেদের মতে : পৃথিবী ও স্বর্গ, দিবা ও রাত্রি, সূর্য ও চন্দ্র, বিবস্বান ও কারণ্যুর পুত্র, আকাশের পুত্র, সিন্ধুগর্ভ সম্ভূত, দক্ষ সম্ভূত ইত্যাদি।

এঁর অপরাপর নাম : অব্দিজ, অরুণাত্মজ, অর্কতনয়, অর্কনন্দন, অর্কপুত্র, অর্কসূত, অর্কসূনু, অশ্বিনীকুমার, অশ্বিনীপুত্র, অশ্বিনীসূত, অশ্বিনীসূত।


অশ্বী
হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র। ঋগ্বেদের মতে– ত্বষ্টার দুটি যমজ সন্তান ছিল। এর একটি ছিল কন্যা, অপরটি ছিল পুত্র। কন্যার নাম ছিল সরণ্যু এবং পুত্রের নাম ছিল ত্রিশিরা। বিবস্বানের সাথে সরণ্যুর বিবাহ হয়েছিল। এঁদের যম এবং যমী নামে যমজ পুত্র-কন্যা জন্মেছিল।

সরণ্যু বিবস্বানের তেজ সহ্য করতে না পেরে, নিজের মত করে একটি নারী সৃষ্টি করে স্বামীর কাছে উক্ত সন্তানদ্বয় রেখে– অশ্বিনীর (ঘোটকী) রূপ ধারণ করে ভ্রমণ করতে থাকেন। বিবস্বান উক্ত নারীকে স্ত্রী ভেবে তাঁর সাথে মিলিত হন। ফলে উক্ত নারীর গর্ভে মনু নামক একটি তেজস্বী সন্তান জন্মগ্রহণ করে। বিবস্বান পরে সরণ্যুর পলায়ন বৃত্তান্ত জানতে পেরে– ঘোড়ার রূপ ধরে অশ্বিনীরূপী সরণ্যুর সাথে মিলিত হন। এর ফলে দুটি কুমারের জন্ম হয়। এঁদের একজনের নাম নাসত্য ও অপরের নাম দস্র। অশ্বীদ্বয় নামে এঁদের স্তব করা হয়।


অসমঞ্জ

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র। এর অপর নাম অংশুধর।
সগর রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র। এঁর মায়ের নাম কেশিনী। সগর রাজার দুটি স্ত্রী ছিল। সগরের অপর স্ত্রীর নাম ছিল সুমতি। একবার সগর পুত্র পাওয়ার আশায় দুই পত্নীকে সাথে নিয়ে হিমালয়ে তপস্যা করেন। এরপর ভৃগুর বরে সুমতির গর্ভে অসমঞ্জ ও কেশিনীর গর্ভে ষাট হাজার পুত্র জন্মে। অসমঞ্জ যৌবনের প্রারম্ভে দুর্দান্ত ছিলেন। এজন্য এঁর পিতা এঁকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেন। সগরের যজ্ঞের জন্য নির্বাচিত অশ্ব অন্বেষণের জন্য তাঁর ষাট হাজার পুত্র যখন কপিলমুনির ক্রোধে ভস্মীভূত হয়, তখন অসমঞ্জের পুত্র অংশুমান কপিলমুনিকে সন্তুষ্ট করে যজ্ঞের অশ্ব ফিরিয়ে আনেন।



অসিক্লী


হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– ইনি ছিলেন প্রজাপতি বীরণের কন্যা । পিতার নামানুসারে এঁর অপর নাম বৈরণী। ইনি দক্ষের স্ত্রী ছিলেন। দক্ষের ইচ্ছা পূরণের নিমিত্তে এঁরই গর্ভে মহামায়া জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পৌরাণিক কাহিনিতে এই কন্যা সতী নামে খ্যাত।


অসিত

১. সূর্যবংশীয় ভরতের পুত্র।
২. জনৈক মুনি। ইনি অসিতদেবল নামে সর্বাধিক পরিচিত।


অসিতদেবল

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– ইনি সরস্বতী নদীর তীরে আদিত্যতীর্থে বসবাস করতেন। ইনি ছিলেন গার্হস্থ্য-ধর্মী তপস্বী। একবার ভিক্ষু জৈগীষব্য মুনি দেবলের আশ্রমে এসে যোগনিরত অবস্থায় বাস শুরু করেন। ইনি সারাদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে শুধুমাত্র খাওয়ার সময় হাজির হতেন। ফলে অসিতদেবলের সাথে তাঁর বিশেষ পরিচয় ঘটার সুযোগ হলো না। একদিন অসিতদেবল খাবারের সময়ও এই তপস্বীকে দেখতে না পেয়ে, একটি কলস নিয়ে আকাশপথে মহাসমুদ্রে এসে দেখলেন– তপস্বী সেখানে উপস্থিত আছেন। ইনি তাঁর ধ্যানে বিঘ্ন না ঘটিয়ে আশ্রমে ফিরে এসে দেখলেন তপস্বী তাঁর আগেই আশ্রমে ফিরে এসেছেন। এরপর কৌতুহলবশত ইনি অন্তরীক্ষ, পিতৃলোক, যমলোক, সূর্যলোক ইত্যাদি পরিভ্রমণ করে, প্রত্যেক স্থানে তপস্বীকে দেখতে পেলেন। অবশেষ এই তপস্বী ব্রহ্মলোকে এসে হারিয়ে গেলেন। অসিতদেবল তাঁর অল্প তপস্যার কারণে সেখানে প্রবেশ করতে পারলেন না। এরপর ইনি আশ্রমে ফিরে এসে তাঁর কাছে মোক্ষধর্ম গ্রহণ করে সিদ্ধি লাভ করেন। ইনি অসিত, অসিতদেবল ও দেবল এই তিন নামে খ্যাত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন– হিমালয় কন্যা একপর্ণা।


অসিতলোমা
দানব বিশেষ। কশ্যপ মুনির ঔরসে ও দনুর গর্ভে এঁর জন্ম হয়েছিল। মহিষাসুরের সাথে দুর্গাদেবীর যুদ্ধের সময় অসিতলোমা দুর্গার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যুদ্ধে ব্রহ্মার বরে ইনি দুর্গার বিরুদ্ধে জয়ী হন। পরে ইনি বরুণের সাথে যুদ্ধে অবর্তীর্ণ হয়ে তাঁকেও পরাজিত করেন। এরপর ইনি সকল দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করলে, দেবতারা মহাদেবের শরণাপন্ন হন। মহাদেব সকল দেবতাদের সাথে করে বিষ্ণুর কাছে যান। বিষ্ণু এই দানবকে বিনাশ করার জন্য তাঁর শরীর থেকে অষ্টাভূজা মহালক্ষ্মীর সৃষ্টি করেন। এই মহালক্ষ্মীর হাতে অসিতলোমা নিহত হন।
















Share:

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি পর্ব ০২

অঞ্জনা

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে— বিশ্বামিত্রের দ্বারা অভিশপ্ত, কুঞ্জরতনয়া নামক এক বানরীরূপী বিদ্যাধরী গর্ভে অঞ্জনার জন্ম হয়। সুমেরুর রাজা কেশরীর সাথে অঞ্জনার বিবাহ হয়। পবনদেবের ঔরসে এবং এঁর গর্ভে- হনুমানের জন্ম হয়েছিল।

অণীমাণ্ডব্য

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– জনৈক মৌন ঋষি। এঁর প্রকৃত নাম ছিল মাণ্ডব্য। একদিন ইনি তাঁর আশ্রমের প্রবেশদ্বারের কাছে যোগাভ্যাসে মগ্ন ছিলেন। এমন সময় একদল চোর চুরি করে নগরপালের তাড়া খেয়ে এই আশ্রমে প্রবেশ করে এবং আশ্রমের এক কোণে লুকিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর নগরপাল ওই চোরগুলিকে খুঁজতে খুঁজতে আশ্রমে এসে উপস্থিত হন। নগরপাল মুনিকে চোরদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে, এই ঋষি মৌন-যোগাভ্যাসে থাকার জন্য কোন উত্তর করলেন না। বেগতিক দেখে চোরেরা চুরিকৃত মালামাল রেখেই পালিয়ে যায়। নগরপাল মুনির কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে, আশ্রম তল্লাসী করে চুরিকৃত দ্রব্যাদি পায়। ফলে নগরপাল চোরদের আশ্রয়দাতা হিসাবে, বিচারের জন্য মুনিকে রাজদরবারে নিয়ে আসে। রাজা বিচার করে এই মুনির শূলদণ্ডের আদেশ দেন।

যথাসময়ে এই আদেশ কার্যকর করার জন্য এঁকে শূলে চড়ানো হয়। কিন্তু শূলে দীর্ঘকাল কাটানোর পরও, তাঁর মৃত্যু না হলে− রাজা এসে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং তাঁকে মুক্তি দেন। কিন্তু তাঁকে শূল থেকে নামানোর চেষ্টা করা সময় দেখা গেল যে, শূল থেকে ইনি বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন না। ফলে শূলের বাইরের অংশটুকু কেটে বাদ দেওয়া হয়। এই ভাবে শূলবিদ্ধ অবস্থায় ইনি বহুতীর্থ পরিভ্রমণ করেন। এই থেকে তাঁর নাম হয় অণীমাণ্ডব্য। উল্লেখ্য অণী অর্থ-শূলের অগ্রভাগ।

মুনি অত্যন্ত গ্লানি নিয়ে, একদিন যমরাজের কাছে তাঁর এই শাস্তির কারণ জানতে চাওয়ায়− যমরাজ বলেন যে, 'বাল্যকালে আপনি একটি পতঙ্গের মলদ্বারে তৃণ প্রবেশ করিয়েছিলেন- সেই পাপের ফল আপনাকে ভোগ করতে হচ্ছে।' মুনি এতে রাগান্বিত হয়ে বললেন. 'লঘু পাপে আপনি আমাকে গুরু দণ্ড দিয়েছেন। এই কারণে, আপনাকে শাস্তি স্বরূপ শূদ্রযোনিতে জন্মগ্রহণ করতে হবে।' এই অভিশাপের কারণে, পরবর্তী কালে যমরাজ, বিচিত্রবীর্যের প্রথমা স্ত্রী অম্বিকার শূদ্র দাসীর গর্ভে এবং ব্যাসদেবের ঔরসে বিদুররূপে জন্মেছিলেন। মুনি এরপর একটি আইন প্রবর্তন করেন। আইনটি হলো চৌদ্দ বৎসরের পূর্বে অজ্ঞানকৃত পাপের জন্য কেউ দণ্ডভোগ করবে না এবং পঞ্চদশ বর্ষ অবধি কর্ম্মানুসারে ফললাভ হবে।

অণূহ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– ভরতবংশীয় বিভ্রাজের পুত্র। স্ত্রীর নাম ছিল কৃত্বী। এঁদের পুত্রের নাম ছিল ব্রহ্মদত্ত।

অত্রি
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– ইনি ছিলেন ব্রহ্মার মানস পুত্র। মহাভারতের শান্তিপর্বের অষ্টাধিকদ্বিশততম অধ্যায়ের প্রজাপতিবিবরণ-সৃষ্টিবিস্তারে বলা হয়েছে– 'প্রথমে কেবল একমাত্র সনাতন ভগবান্ ব্রহ্মা বিদ্যামান ছিলেন। অনন্তর তাঁহার মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু ও বশিষ্ঠ এই সাত অগ্নিতুল্য পুত্রের উৎপত্তি হয়।

মার্কেণ্ডয় পুরাণের মতে– নয়জন মানস পুত্রের সৃষ্টি করলেন। তাঁদের নাম ভৃগু, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, অঙ্গিরা,মরীচি, দক্ষ, অত্রি, বশিষ্ঠ । এঁর স্ত্রীর নাম অনসূয়া। এঁদের তিনটি পুত্র সন্তান ছিল। এঁরা ছিলেন- চন্দ্র, দুর্বাসা এবং দত্তাত্রেয়। [সৃষ্টির কথা, মার্কণ্ডেয় পুরাণ]

অত্রির বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন– প্রাচীনবর্হি। প্রাচীনবর্হির মোট দশজন পুত্র ছিল– এঁরা প্রচেতা নামে পরিচিত।
[অষ্টাধিকদ্বিশততম অধ্যায়। প্রজাপতিবিবরণ-সৃষ্টিবিস্তার। শান্তিপর্ব। মহাভারত]




অত্রিজ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– অত্রিজাত অর্থে চন্দ্রের অপর নাম অত্রিজ। অত্রি মুনির চোখের জল থেকে চন্দ্রের উৎপন্ন হয়েছিল বলে চন্দ্রকে এই নামে ডাকা হয়। এর অপরাপর নাম অত্রিজাত, অত্রিনেত্রজে, অরত্রিনেত্রপ্রসূত, অরত্রিনেত্রপ্রভব, অরত্রিনেত্রভব, অরত্রিনেত্রভূ।


অদিতি

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র। ইনি ছিলেন দক্ষের কন্যা এবং মহর্ষি কশ্যপের স্ত্রী। এর গর্ভে- বারজন দেবতার জন্ম হয়েছিল। এঁর গর্ভে জন্মগ্রহণকারী দেবতারা আদিত্য নামে খ্যাত। সাধারণভাবে এঁরা দ্বাদশ আদিত্য নামে পরিচিত। এঁরা হলেন- অর্যমা, ত্বষ্টা, ধাতা, পূষা, বরুণ, বিবস্বান, বিষ্ণু, ভগ, মিত্র, রুদ্র, সবিতা ও সূর্য। তৈত্তিরিয়ে আদিত্যের সংখ্যা ৮। এরা হলেন— অংশ, অর্যমা, ইন্দ্র, ধাতা, বরুণ, বিবস্বান, ভগ ও মিত্র। ঋকবেদে আদিত্যের সংখ্যা মোট ৬। এরা হলেন— অং, অর্যমা, দক্ষ, বরুণ, ভগ ও মিত্র।

দেবতাদের সমুদ্রমন্থনে যে কুণ্ডল উত্থিত হয়েছিল, ইন্দ্র তা এঁর হাতে অর্পণ করেছিলেন। বামন অবতারে বিষ্ণু এঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পারিজাত নিয়ে বিষ্ণু ও ইন্দ্রের মধ্যে যে বিবাদ হয়েছিল, ইনি তা মিটিয়ে দিয়েছিলেন।

এঁর অন্যান্য নাম:
১.দেবতারা এঁর গর্ভে জন্মেছিলেন বলে- এঁর অপর নাম- দেবমাতা।
২. অমৃতদের (দেবতা) সু (প্রসবকারিণী), এই অর্থে এঁর অপর নাম- অমৃতসু।

অদিতির বারটি পুত্রকে অদিতিজ নামে অভিহিত করা হয়। এই পুত্ররা হলেন- ইন্দ্র, বিষ্ণু, সূর্য, ত্বষ্টা, বরুণ, অংশ, অর্যমা, রবি, পুষা, মিত্র, বরদমনু ও পর্জন্য। একই অর্থে এঁদের অন্যান্য নাম অদিতিতনয়, অদিতিনন্দন, অদিতিপুত্র, অদিতিসূত।


অনিরুদ্ধ

ইনি ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ-এর নাতি ও প্রদ্যুম্নের পুত্র। যুদ্ধে এঁর গতি কেউই রোধ করতে পারত না বলে এঁর নাম হয়েছিল অনিরুদ্ধ। ভোজকটের রাজা রুক্মীর পৌত্রী সুভদ্রার সাথে এঁর প্রথম বিবাহ হয়। এঁর গর্ভে এঁর বজ্র নামে একটি পুত্র সন্তান জন্মে। এরপর দৈত্যরাজ বাণের কন্যা ঊষার সাথে এঁর বিবাহ হয়। যদুবংশ ধ্বংসের সময় ইনি নিহত হয়েছিলেন।


অপ্সরা

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে− অপ্ (জল) থেকে এদের উৎপন্ন হয়েছিল বলে এঁদের নাম- অপ্সরা। দেবাসুরের সমুদ্রমন্থনকালে এঁরা সমুদ্র থেকে উত্থিত হয়েছিলেন। দেব-দানব কেউ এদের গ্রহণ না করায়− এঁরা সর্বসাধারণের স্ত্রীরূপে গণ্য হলেন। অবশ্য অধিকাংশ অপ্সরার স্বামী ছিলেন গন্ধর্বরা। অপ বা জল থেকে উৎপন্ন হন নি, এমন কিছু অতুলনীয় নারীকেও অপ্সরা হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এদের মধ্যে স্বর্গের কিছু স্বাধীনা অপ্সরাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

মনুসংহিতার মতে− এঁদেরকে সপ্তম মনু সৃষ্টি করেছিলেন। এদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ হাজার। কামদেবতা ছিলেন এঁদের অধিপতি। অপ্সরারা নৃত্যকলায় পারদর্শী ছিলেন। অধিকাংশ সময় গন্ধর্বরাদের সাথে এঁরা ইন্দ্র-এর সভায় নর্তকী হিসাবে যোগদান করতেন। দেবতাদের এঁরা বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন। বিশেষ করে যখন কোনো মানুষ, তপস্যা দ্বারা নিজেকে দেবতুল্য করে তুলতে আগ্রহী হয়ে উঠতেন, তখনই এদের তপস্যা ভঙ্গ করার জন্য দেবতারা এদেরকে নিয়োগ করতেন। এঁরা পাশা খেলায় পারদর্শী ছিলেন। এঁরা মায়ারূপিণী। নিজেদের শরীর নানাভাবে পরিবর্তিত করতে সক্ষম ছিলেন। এরা পুরাকালে- নানাভাবে মানুষদেরকে সাহায্য করতেন।


হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিগুলোতে যে সকল অপ্সরার নাম পাওয়া যায়, সেগুলো হলো− অদ্রিকা, অরুণা, অলম্বুষা, অসিতা, উর্বশী, ঘৃতাচী, জানপদী, তিলোত্তমা, নাগদত্তা, পুঞ্জিকাস্থলা, বিদু্যত্পর্ণা, বিশ্বাচী, পঞ্চচূড়া, পূর্বচিত্তি, মিশ্রকেশী, মেনকা, রক্ভা, রুচিরা, সুকেশী, সুবাহু, সুমধ্যা, সোমা, হেমা।





অবতার
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– মানুষ, অতিমানব বা প্রাণীর আকারে আবির্ভূত হিন্দু দৈবশক্তি (বিশেষত বিষ্ণু)। এই অর্থে- অবতার। (রামচন্দ্র নারায়ণের অবতার ছিলেন)।

হিন্দু ধর্মমতে দেবতারা সৃষ্টির কল্যাণের জন্য কখনো কখনো মানুষ বা অন্য কোনো মূর্তিতে আবির্ভূত হতেন। দেবতাদের এরূপ আবির্ভাবকে অবতার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এরূপ বিষ্ণুর দশ অবতার সম্পর্কে হিন্দু পুরাণে উল্লেখ রয়েছে।

সত্যযুগে আবির্ভূত চার অবতার:
১. মৎস্য অবতার,
২. কূর্ম অবতার,
৩. বরাহ অবতার
৪. নৃসিংহ অবতার।

ত্রেতাযুগের তিন অবতার :
৫. বামন অবতার,
৬. পরশুরাম অবতার
৭. রামচন্দ্র

দ্বাপর যুগের অবতার :
৮. কৃষ্ণ : ইনি দ্বাপর যুগের একমাত্র অবতার। এঁর সময় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

কলি যুগের অবতার :
৯. বুদ্ধ
১০. কল্কি অবতার।



অভিমন্যু

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে এই নামে একাধিক চরিত্র পাওয়া যায়। যেমন–

১. তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের ঔরসে ও সুভদ্রার গর্ভে এঁর জন্ম হয়েছিল। ইনি নির্ভীক ও মন্যুমান (ক্রোধী বা তজস্বী) বলে তাঁর নাম অভিমন্যু [মন্যুকে (ক্রোধকে) অভিগত/দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস।]।

ইনি শৈশবেই তাঁর পিতা অর্জুনের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন। অর্জুনের ইচ্ছায় ইনি বিরাটরাজের কন্যা উত্তরাকে বিবাহ করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি যখন অংশ নেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ষোল বৎসর। এই যুদ্ধের প্রথমাবস্থায়, ইনি বহু কুরুসৈন্যকে হত্যা করেছিলেন। যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে দ্রোণাচার্য অভেদ্য চক্রব্যূহ রচনা করেন। একমাত্র অর্জুনই এই চক্রব্যূহ ভেদ করতে সক্ষম ছিলেন। এ ছাড়া অভিমন্যু এই চক্রব্যূহে প্রবেশের কৌশল জানতেন, কিন্তু নির্গমের কৗশল জানতেন না। কিন্তু এই সময় অর্জুন সংশপ্তকদের সাথে যুদ্ধের কারণে অন্যত্র ছিলেন। দ্রোণাচার্যকে বাধা দেবার কোনো উপায় না দেখে অভিমন্যু এই ব্যূহ ভেদ করার জন্য যুধিষ্ঠিরের কাছে আবেদন করেন। কোনো উপায় না দেখে এবং অভিমন্যুর জিদের কারণে যুধিষ্ঠির শেষ পর্যন্ত ব্যূহ ভেদ করার অনুমতি দেন এবং যুধিষ্ঠির তাঁকে এই আশ্বাসও দিয়েছিলেন যে, অভিমন্যুকে তিনি রক্ষা করবেন।

ব্যূহে প্রবেশ করে ইনি শল্যপুত্র রুক্ষ্মরথ, কর্ণের এক ভাই ও দুর্যোধনের পুত্র লক্ষ্মণ প্রভৃতিকে হত্যা করেন। ক্রমে ক্রমে অভিমন্যু অপরাজেয় হয়ে উঠলে– জয়দ্রথ ব্যূহমুখ রুদ্ধ করে পাণ্ডবদের সকল সাহায্য বন্ধ করে দেন। এরপর দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, বৃহদ্বল ও কৃতবর্মা- এই ছয়জন অভিমন্যুকে বেষ্টন করেন। একে একে অভিমন্যুর সকল অস্ত্র ও রথ ধ্বংস হলে- দুঃশাসনের পুত্র তাঁর মস্তকে গদাঘাত করেন এবং শেষ পর্যন্ত দুঃশাসনের হাতে ইনি নিহত হন। তৎকালীন রীতি অনুসারে অভিমন্যু-হত্যার এই প্রক্রিয়াটি অন্যায় ছিল। অবশ্য পরে এই অন্যায় যুদ্ধের প্রতিশোধ নিয়েছিলেন– অভিমন্যুর পিতা অর্জুন। অভিমন্যুর মৃত্যুকালে উত্তরা গর্ভবতী ছিলেন। এঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র পরীক্ষিতের জন্ম হয়েছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের সকল পুত্র নিহত হলে– একমাত্র পরীক্ষিতই পাণ্ডবদের বংশ রক্ষা করেছিলেন।

২. বিষ্ণুপুরাণের মতে, চাক্ষুষ মনুর পুত্রের নাম। এঁর মায়ের নাম ছিল নচলার।
৩. রাধিকার স্বামী আয়ানের পূর্বনাম ছিল- অভিমন্যু।


অম্বরীষ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে এই নামে এই একাধিক চরিত্র পাওয়া যায়। যেমন–

১. ইনি সূর্যবংশীয় রাজা নাভাগের অত্যন্ত বিষ্ণুভক্ত পুত্র। রাজা হিসাবে ইনি অত্যন্ত প্রজাবৎসল ছিলেন। এ কারণে বিষ্ণু, এই রাজার রাজ্য রক্ষার জন্য তাঁকে সুদর্শন-চক্র দান করেছিলেন।

একবার অম্বরীষ বর্ষব্যাপী ব্রত উদ্যাপন শেষে, তিন দিনের উপবাসকাল সমাপ্ত করেন এবং দ্বাদশী তিথিতে পারণে বসার উদ্যোগ নেন। এমন সময় দুর্বাসা মুনি তাঁর কাছে খাদ্য প্রার্থনা করেন। রাজা তাতে সম্মতি জানালে– দুর্বাসা স্নান করতে গেলেন। স্নান থকে এঁর ফিরতে দেরি হলে– সমাগত ব্রাহ্মণদের অনুমতি নিয়ে রাজা আসনে বসে বিষ্ণুপাদোদক পান করেন। দুর্বাসা স্নান থেকে ফিরে সমস্ত বিষয় জেনে ক্রোধে তাঁর জটা ছিন্ন করে ভূতলে নিক্ষেপ করেন। এই জটা থেকে এক উগ্রদেবতার উদ্ভব হয়। উক্ত দেবতা আবির্ভূত হয়েই অম্বরীষকে হত্যা করতে উদ্যত হলে, বিষ্ণু প্রদত্ত সুদর্শন চক্র সেখানে এসে উগ্রদেবকে ভষ্মীভূত করে দুর্বাসাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। দুর্বাসা এই চক্রের আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শ্রীকৃষ্ণের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। শ্রীকৃষ্ণ অম্বরীষের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর দুর্বাসা অম্বরীষের কাছে ক্ষমা চেয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলে– ইনি রক্ষা পান। এর কিছুদিন পর অম্বরীষ তাঁর পুত্রদের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে তপস্যার জন্য বনবাসী হন।
২. পুলহ-নামক জনৈক ব্রহ্মর্ষির পুত্র।
৩. নরক বিশেষ।
৪. মান্ধাতার ঔরসে বিন্দুমতীর গর্ভে এঁর জন্ম হয়েছিল। এঁর অপর নাম হলো ধর্মসেন।
৫. সূর্যবংশীয় সুশ্রুকের পুত্র। ইনি একটি যজ্ঞের আয়োজন করলে, ইন্দ্র যজ্ঞের পশু অপহরণ করেন। পরে তিনি যজ্ঞ সম্পন্ন করার জন্য ঋচিক মুনির পুত্র শুনঃশেফকে ক্রয় করেছিলেন।
৬. মহাদেব ও বিষ্ণুর অপর নাম।

অম্বষ্ঠ-বৈদ্য

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে একটি বর্ণ বিশেষ। বৈদ্য শব্দের অর্থ –চিকিৎসক। প্রাচীনকালে এদের বৃত্তি ছিল চিকিৎসা করা। ধীরে ধীরে এই শব্দ জাতিবাচক শব্দে পরিণত হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে অম্বষ্ঠ ও বৈদ্য নামক দুটি জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় পরবর্তীকালে উভয় জাতি এক সাথে মিশে এই অম্বষ্ঠ-বৈদ্য নামে পরিণত হয়।





















Share:

১৪ নভেম্বর ২০১৫

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি পর্ব ০১

অউম
বানান বিশ্লেষণ : অ+উ+ম্+অ
উচ্চারণ : o.um (ও.উম্)
অ =ও। (উ ধ্বনির পূর্ববর্ণ অ, ও-তে পরিণত হয়েছে)
উম্ =ছন্। (ন রুদ্ধ ধ্বনিতে উচ্চারিত হবে)
হিন্দু মতে, অ-উ-ম এই তিনটি মূল ধ্বনির সমন্বয়ে প্রণবের উৎপত্তি। যোগীদের মতে, ধ্যানে একাগ্রতা আনার জন্য ওঁ-এর উচ্চারণের পূর্বে অ-কারের উচ্চারণ করা হয়। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহাদেব‒ এই তিন জনের গুণবাচক ধ্বনি-প্রতীক। এর প্রতীক পাশে দেখানো হলো।

কাশীতে এই নামে রক্ষিত শিবলিঙ্গ বিশেষ। শিবের (মহাদেব) প্রতীকরূপে এই শিবলিঙ্গকে পূজা করা হয়।


অওঘড়

হিন্দু ধর্মের একটি বিশেষ ভাবাদর্শে বিশ্বাসী সন্ন্যাসীদের নিয়ে গঠিত একটি সম্প্রদায়। দশনামী ব্রহ্মগিরি নামক সন্ন্যাসী গোরক্ষনাথের প্রভাবে এই শ্রেণীর সন্ন্যাসীদের উদ্ভব হয়েছিল। গুজরাট অঞ্চলে এদের গদি আছে। গদির প্রধানকে বলা হয় মোহান্ত। গদির সন্ন্যাসীদের ভিতর থেকে মোহান্ত নিয়োগ পদে আসীন হন এবং আমৃত্যু তিনি ওই পদে থাকেন। মোহান্তের মৃত্যুর পর সন্ন্যাসীদের ভিতর থেকে নতুন মোহান্ত নির্বাচিত হন।


অংশা
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে– কংসবধের জন্য কৃষ্ণ যখন বিষ্ণুর অবতার রূপে মর্তধামে আসেন, সে সময়ে বিষ্ণুর অনুরোধে দুর্গাও যশোদার ।

হিন্দু ধর্ম মতে- বিষ্ণুর দ্বাপর যুগ-এর একজন অবতার এবং মোট দশম অবতারের অষ্টম অবতার। বসুদেবের ঔরসে দেবকীর অষ্টম গর্ভে কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল। কংস নামক এক অত্যাচারী রাজার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে, ব্রহ্মা সকল দেবতাদের নিয়ে সমুদ্রের ধারে বসে বিষ্ণুর আরাধনা শুরু করেন। বিষ্ণু সে আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর সাদা ও কালো রঙের দুটি চুল দিয়ে বললেন যে, বসুদেবের ঔরসে দেবকীর সন্তান হিসাবে কৃষ্ণ হয়ে জন্মাবেন। কৃষ্ণের প্রতীক হলো কালো চুল। তাঁর সহযোগী হবে বলরাম, এর প্রতীক সাদা চুল। এই জন্মে তিনি কংসাসুরকে হত্যা করবেন। উল্লেখ্য বসুদেবের অপর স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে বলরাম জন্মেছিলেন।

দেবকীর পিতা দেবক ও কংসের পিতা উগ্রসেন আপন দুই ভাই ছিলেন। সেই সূত্রে কংস ছিলেন দেবকীর কাকাতো ভাই অর্থাৎ কংস ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের মামা। দেবর্ষি নারদ এসে কংসকে কৃষ্ণ-বলরাম-এর জন্মের কারণ বর্ণনা করে যান। এই সংবাদ পেয়ে কংস দেবকীর গর্ভজাত সকল সন্তানকে জন্মের পরপরই হত্যা করতে থাকলেন। কৃষ্ণ-এর জন্ম হয় দ্বাপর যুগের শেষে ভাদ্র-রোহিণী নক্ষত্রে, এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাত্রিতে। জন্মের পরপরই বসুদেব কংসের ভয়ে এই শিশুটিকে ব্রজধামে নন্দের বাড়িতে রেখে আসেন এবং তাঁর সদ্যজাতা কন্যাকে আনেন। ব্রহ্ম-বৈববর্ত পুরাণের মতে এই কন্যা ছিলেন দুর্গা। এই পুরাণে এই সদ্যজাতা কন্যাকে অংশা নামে অভিহিত করা হয়েছে। বিষ্ণুর অনুরোধে তিনি যশোদার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

[ব্রহ্ম-বৈবর্ত্ত, শ্রীকৃষ্ণ খণ্ড, সপ্তম অধ্যায়]


অংশুমান
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– ইনি ছিলেন সূর্যবংশীয় রাজা অসমঞ্জ-এর পুত্র ও সগর রাজার পৌত্র। সগর-এর অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া দেবরাজ ইন্দ্র অপহরণ করে- পাতালে ধ্যানমগ্ন কপিল মুনির আশ্রমে রেখে যান। সগরের ৬০ হাজার পুত্র ওই অপহৃত ঘোড়ার সন্ধান করতে করতে― কপিল মুনির আশ্রমে আসেন। সেখানে ওই ঘোড়াকে দেখতে পেয়ে সগরের পুত্ররা ধ্যানমগ্ন কপিল মুনিকে ঘোড়াচোর মনে করে তাঁকে নানাভাবে লাঞ্ছিত করেন। ফলে ক্ষুব্ধ কপিল মুনি যোগবলে সগর-পুত্রদের ভস্মীভূত করেন। দীর্ঘসময় অতিবাহিত হওয়ার পরও সগর-পুত্ররা ফিরে না এলে, সগর তাঁর পৌত্র অংশুমানকে অনুসন্ধানে পাঠান। অংশুমান কপিল মুনির আশ্রমে এসে, স্তব করে মুনিকে সন্তুষ্ট করেন এবং যজ্ঞের ঘোড়াকে নিয়ে আসেন। এই সময় ইনি সগর-এর ভস্মীভূত পুত্রদের উদ্ধারের উপায় মুনির কাছ থেকে জেনে নেন। উপায়টি হলো― স্বর্গের গঙ্গা নদীকে এনে তার জল ওই পুত্রদের ভস্ম স্পর্শ করালে, পুত্ররা উদ্ধার পাবে। সগর-এর মৃত্যুর পর ইনি গঙ্গাকে আনার জন্য তপস্যা করেন। কিন্তু সাফল্য লাভ করতে পারেন নি। এরপর তিনি কিছুদিন রাজত্ব করার পর, তাঁর পুত্র দিলীপের রাজ্যভার অর্পণ করে তপস্যার জন্য যান। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। উল্লেখ্য দিলীপের পুত্র ভগীরথ এই কাজ সম্পন্ন করেছিলেন।



অংহা

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র। ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ৬৩ সংখ্যক সূত্রের সপ্তম শ্লোকে আছে, সুদাস নামক রাজার শত্রু ছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র অংহাকে পরাজিত করে তার সকল সম্পদ ধ্বংস করেছিলেন।

অকম্পন

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র। রাময়ণের মতে– ইনি ছিলেন রাবণের সেনাপতি ও মামা। সুমালীর ঔরসে কেতুমতীর গর্ভে ইনি জন্মগ্রহণ করেন। ইনি ছিলেন সুমালীর দ্বিতীয় পুত্র। উল্লেখ্য সুমালীর মোট ১৪টি সন্তান ছিল। দণ্ডকারণ্যে রামের হাতে খর, দূষণ ও ত্রিশিরা-সহ প্রায় ১৪ হাজার রাক্ষস সৈন্য নিহত হলে– ইনি এই সংবাদ রাবণকে দেন এবং রাবণকে জানান যে, দেবতা ও অসুরদের মধ্যে এমন কেউ নেই যিনি রামকে যুদ্ধে পরাজিত করতে পারেন। এঁরই প্ররোচনায় রাবণ সীতাকে অপহরণ করেছিলেন। লঙ্কা যুদ্ধের সময় হনুমানের নিক্ষেপ করা একটি বিশাল গাছের আঘাতে ইনি নিহত হন।


অকালবোধন

এর সরলার্থ অসময়ে আহ্বান বা অসময়ে জাগরণ। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে- রাবণবধের জন্য শরৎকালের আশ্বিন মাসে রামচন্দ্র, দুর্গা-দেবীকে জাগিয়েছিলেন। এই জাগরণকেই অকালবোধন বলা হয়। এই জাগরণের কারণেই বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য দুর্গা পূজার আদি সময় হিসাবে বসন্তকাল নির্ধারিত রয়েছে। এই পূজা বাসন্তী পূজা নামে খ্যাত।



অকৃতব্রণ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে− অকৃতব্রণ ছিলেন কশ্যপ বংশীয় একজন ঋষি এবং পরশুরামের অনুচর। মহাভারতের মতে− যুধিষ্ঠির মহেন্দ্রাঞ্চলে লোমশমুনির কাছে অবস্থানকালে অকৃতব্রণ তাঁর কাছে পরশুরামের ক্ষত্রিয়বিনাশ কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন।

অক্ষয়কুমার

ইনি রাবণের ঔরসে মন্দোদরীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। রাবণ সীতাকে অপহরণ করলে, রামের আদেশে হনুমান সীতাকে খোঁজার জন্য লঙ্কায় আসেন। হনুমান সীতার সাথে দেখা করে, তাঁর কাছ থেকে অভিজ্ঞান নিয়ে অশোক বন বিনষ্ট করেন। এই সংবাদ পেয়ে-হনুমানকে শাস্তি দেওয়ার জন্য রাবণ পাঁচজন সেনাপতির সাথে অক্ষয়কুমারকে পাঠান। এই সময় অন্যান্য সেনাপতির সাথে ইনিও হনুমানের হাতে নিহত হন।



অক্ষয় বট
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা বড় বট গাছকে অক্ষয় বট নামে অভিহিত করা হয়। সকল দেশের সনাতন ধর্মে বড় গাছের পূজা করার রীতি লক্ষ্য করা যায়। ভারতবর্ষে বটগাছ ছাড়াও তুলসি, অশ্বত্থ গাছের পূজার চল আছে।

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে, দশরথের প্রেতাত্না সীতাদেবীর হাত থেকে চালের অভাবে বালুকার পিণ্ড গ্রহণ করেছিলেন। এর সাক্ষী ছিল ফল্গুনদী, তুলসী গাছ ও অক্ষয়বট । রামচন্দ্র ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে যখন ফল্গুনদী ও তুলসী গাছকে প্রশ্ন করেন, তখন তারা মিথ্যা কথা বলে। ফলে সীতাদেবী তাদের অভিশাপ দেন। কিন্তু অক্ষয়বট সত্য কথা বলায়, সীতাদেবী তাকে আশীর্বাদ করেন ।

সনাতন হিন্দু ধর্মমতে তীর্থের বৃহৎ বটগাছে জল দিলে এবং পূজা করলে মনষ্কামনা পূর্ণ হয়। প্রাচীন কাব্যগ্রন্থে বৈতরণী নদীর তীরে অক্ষয় বটের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সীতাকুণ্ডে একটি অক্ষয় বট আছে। সীতাকুণ্ডের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান শিবচতুদরর্শী মেলায় নানা ধরনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সাথে অক্ষয়বটেরও পূজা করা হয়।

নিরঞ্জন নদীর পাড়ের যেখানে বুদ্ধ (গৌতম) বোধিত্ব লাভ করেছিলেন, সেখানে প্রথম বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ করেন সম্রাট অশোক। এই মন্দিরের পাশে একটি অক্ষয়বট আছে। হিন্দু তীর্থক্ষেত্রে একটি অক্ষয়বট আছে।



অক্ষোভ্য

১. তারা দেবীর মাথায় অবস্থিত সাপ বিশেষ।
২ শিব ধ্যানমগ্ন অবস্থায় চঞ্চল হন নি বলে এই নামে খ্যাত হয়েছেন।
৩. পঞ্চতম বৌদ্ধ ধ্যানীপুরুষ। বৌদ্ধ তান্ত্রিক গ্রন্থগুলোতে এদের উল্লেখ রয়েছে। এদের বাহন হাতি এবং চিহ্ন বজ্র। এদের রঙ নীল। অক্ষোভ্যদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে দেবতার মর্যাদা দেওয়া হয়। এর ভিতরে অন্যতম দেবতা হলেন হেরুক।



অক্ষৌহিণী
প্রাচীন ভারতীয় রাজ্যসমূহে বা হিন্দু পৌরাণিক গ্রন্থে বর্ণিত সেনাশক্তি বিশেষ। যে সেনাদলে- ১,০৯,৩৫০ সংখ্যক পদাতিক সৈন্য, ৬৫,৬১০ সংখ্যক অশ্ব ও অশ্বারোহী সৈন্য, ২১,৮৭০ সংখ্যক গজ (হাতি) ও গজারোহী সৈন্য, ২১,৮৭০ রথ ও রথী থাকবে, তাকেই এক অক্ষৌহিণী বলা হবে। এক অক্ষৌহিণী সৈন্যদল গঠিত হতো বিভিন্ন একক সংখ্যক সৈন্যদল দ্বারা। নিচে এই সেনাশক্তির এককসমূহের বিবরণ তুলে ধরা হলো।

পত্তি : ১ গজ ও গজারোহী, ১ রথ ও রথী, ৩ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ৫ পদাতিক।
সেনামুখ : পত্তির তিনগুণ। অর্থাৎ ৩ গজ ও গজারোহী, ৩ রথ ও রথী, ৯ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১৫ পদাতিক।
গুল্ম : সেনামুখের তিনগুণ। অর্থাৎ ৯ গজ ও গজারোহী, ৯ রথ ও রথী, ২৭ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ৪৫ পদাতিক।
গণ : গুল্মের তিনগুণ। অর্থাৎ ২৭ গজ ও গজারোহী, ২৭ রথ ও রথী, ৮১ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১৩৫ পদাতিক।
বাহিনী : গণের তিনগুণ। অর্থাৎ ৮১ গজ ও গজারোহী, ৮১ রথ ও রথী, ২৪৩ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ৪০৫ পদাতিক।
পৃতনা : বাহিনীর তিনগুণ। অর্থাৎ ২৪৩ গজ ও গজারোহী, ২৪৩ রথ ও রথী, ৭২৯ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১২১৫ পদাতিক।
চমূ : পৃতনার তিনগুণ। অর্থাৎ ৭২৯ গজ ও গজারোহী, ৭২৯ রথ ও রথী, ২১৮৭ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ৩৬৪৫ পদাতিক।
অনীকিনী : চমূর তিনগুণ। অর্থাৎ ২১৮৭ গজ ও গজারোহী, ২১৮৭ রথ ও রথী, ৬৫৬১ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১০৯৩৫ পদাতিক।
অক্ষৌহিণী : অনীকিনীর দশগুণ। অর্থাৎ ২১৮৭০ গজ ও গজারোহী, ২১৮৭০ রথ ও রথী, ৬৫৬১০ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১০৯৩৫০ পদাতিক।
[সূত্র : অক্ষৌহিণী-পরিমাণ। দ্বিতীয় অধ্যায়। আদিপর্ব। মহাভারত]



অগস্ত্য (ঋষি)

অগকে (পর্বত) স্তম্ভিত করে যে/উপপদ তৎপুরুষ সমাস।
সমার্থক শব্দাবলী : অগ্নিমারুতি, আগ্নেয়, উর্বশীয়, কলসী, কলসীসূত, কুম্ভজ, কুম্ভজন্মা, কুম্ভযোনি, কুম্ভসম্ভব, কূট, ঘটযোনি, ঘটোত্ভব, ঘটজ, বিন্ধ্যকূট, পীতাদ্ধিট, মান, মৈত্রাবরুণ, মৈত্রাবরুণি। পৌরাণিক কাহিনীতে— অগস্ত্য নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত।


হিন্দু পৌরাণিক ঋষি বিশেষ। বিন্ধ্যপর্বতকে স্তম্ভিত করে ইনি এই নামে অভিহিত হয়ে থাকেন। ঋকবেদের মতে— কোনো এক যজ্ঞকালে, অপ্সরী ঊর্বশী'কে দেখে যজ্ঞকুম্ভে আদিত্য ও বরুণ-এর বীর্যপাত হয়। ফলে, যজ্ঞকুম্ভ থেকে বশিষ্ঠ ও অগস্ত্য-এর জন্ম হয়। সে হিসাবে অগস্ত্যকে মিত্র (তেজময় সূর্য) ও বরুণের পুত্র বলা হয়। ভাগবতে- অগস্ত্যকে পুলস্তের পুত্র বলা হয়েছে।



লোপামুদ্রা

অগস্ত্য প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি কখনো বিবাহ করবেন না। একদিন ভ্রমণ করতে করতে তিনি একটি গুহামুখে এসে উপস্থিত হন, গুহার ভিতরে তাঁর পূর্বপুরুষদের অধোমুখে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেলেন। পূর্ব-পুরুষদের কাছে এরূপ অবস্থার কারণ জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন যে, অগস্ত্য বংশ রক্ষা করছে না বলেই, তাঁরা এই শাস্তি ভোগ করছে। এরপর অগস্ত্য তাঁর পূর্ব-পুরুষদেরকে আশ্বাস দিলেন যে, তিনি বিবাহ করে সন্তান উৎপাদন করবেন। এরপর বিবাহের উপযুক্ত কন্যা পাওয়া উদ্দেশ্যে, তিনি পৃথিবীর সকল প্রাণীর সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠ অংশ নিয়ে একটি নারী নির্মাণ করলেন। সকল প্রাণীর সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠ অংশের লোপ (অপহরণ) করে সৃষ্টি হয়েছিল বলে এই নারীর নাম রাখা হয়েছিল লোপামুদ্রা।

অগস্ত্য তাঁর সৃষ্ট লোপামুদ্রাকে প্রতিপালনের জন্য বিদর্ভরাজের উপর ভার দিলেন। এই কন্যা বিবাহযোগ্যা হলে, অগস্ত্য তাঁকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করলেন। একদিন ঋতুস্নান শেষে লোপামুদ্রা অগস্ত্যের কাছে এলে, অগস্ত্য সন্তান কামনায় তাঁকে আহ্বান করলেন। লোপামুদ্রা বললেন যে, পিতৃগৃহে (বিদর্ভরাজের গৃহে) যেরূপ তিনি যেরূপ অলঙ্কারে বিভূষিতা হয়ে শয়ন করতেন, তেমনি করে বিভূষিতা করতে হবে। নইলে তাঁকে অগস্ত্য কখনোই পাবেন না। অগস্ত্যের কাছে যথেষ্ঠ পরিমাণ সম্পদ না থাকায়, ইনি ভিক্ষায় বের হলেন। কিন্তু কোথাও যথেষ্ঠ অর্থ না পেয়ে, অনেকের পরামর্শে ইনি দানবরাজ ইল্বলের কাছে এলেন।


ইল্বল

জনৈক অসুর বিশেষ। হ্লাদের ঔরসে এবং ধমনীর গর্ভে ইনি জন্ম গ্রহণ করেন। এর অপর ভাইয়ের নাম ছিল বাতাপি। একবার এক তপস্বী ব্রাহ্মণের কাছে ইল্বল এমন একটি বর চেয়েছিলেন, যাতে তাঁর একটি ইন্দ্রের মতো পুত্র জন্মে। ব্রাহ্মণ এতে সম্মত না হলে, ইল্বল প্রথমে মায়াবলে তাঁর ভাই বাতাপি-কে মেষে রূপান্তরিত করেন। এরপর উক্ত মেষের মাংস রান্না করে ব্রাহ্মণকে খেতে দিলেন। ব্রাহ্মণের খাওয়া শেষে, ইল্বল বাতাপি'র নাম ধরে ডাকলে, বাতাপি ব্রাহ্মণের পেট ফুঁড়ে বের হয়ে আসেন। ফলে, ব্রাহ্মণের মৃত্যু হয়। এইভাবে, ইল্বল ও বাতাপি সম্মিলিতভাবে অনেক ব্রাহ্মণকে হত্যা করেছিলেন।

ইল্বল তাঁকে যথেষ্ঠ আদর আপ্যায়ন করে ভোজনের জন্য অনুরোধ করলেন। একই ভাবে ইল্বল অগস্ত্যকে হত্যা করার জন্য মেষরূপী বাতাপি'র মাংস— অগস্ত্যকে দিয়েছিলেন। অগস্ত্যের খাওয়া শেষে ইল্বল বাতাপি'কে উচ্চস্বরে ডাকতে লাগলেন। কিন্তু বাতাপি অগস্ত্যের পেট থেকে বের হলো না। তখন অগস্ত্য জানালেন যে, বাতাপি সম্পূর্ণরূপে হজম হয়ে গেছে। এতে ইল্বল ভীত হয়ে, অগস্ত্যকে তার বাঞ্ছনীয় সম্পদ দান করে বিপদমুক্ত হন। এরপর লোপামুদ্রাকে অলঙ্কারে বিভূষিতা করে তাঁর সাথে মিলিত হলেন। যথা সময়ে এঁদের একটি পুত্রের জন্ম হলো। এই পুত্রের নাম রাখলেন— দৃঢ়স্যু।

দৃঢ়স্যুর অপর নাম ছিল— ইধ্মবাহ। ইনি মহাতাপসী এবং কবি ছিলেন। এ ছাড়া ইনি বেদসহ অন্যান্য শাস্ত্রে অত্যন্ত অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। এই পুত্র তাঁর পিতৃপুরুষদের মুক্ত করেন। সন্তান জন্মাবার পর কিছুদিন তিনি আশ্রমে বাস করেছিলেন। এরপর তিনি যোগবলে দেহত্যাগ করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, ইনি দক্ষিণাকাশে নক্ষত্ররূপে বিরাজ করছেন। ভাদ্রের ১৭ কিম্বা ১৮ তারিখে দক্ষিণাকাশে নক্ষত্ররূপে উদিত হন।


অগস্ত্যের জীবনের সাথে বহু পৌরাণিক কাহিনী জড়িত আছে। যেমন—
ক. অগস্ত্যযাত্রা : ভারতের আর্য্যাবর্ত ও দাক্ষিণাত্যের মধ্যস্থলে বিস্তৃত একটি পর্বতের নাম বিন্ধ্য। পৌরাণিক যুগে বিন্ধ্যপর্বত সমস্ত পর্বতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও মাননীয় ছিল। একদিন দেবর্ষি নারদ বিন্ধ্যের কাছে এসে বলেন যে, সুমেরু পর্বতের সমৃদ্ধি বিন্ধ্যের অপেক্ষা বেশি। সমস্ত দেবতা সুমেরুতে দিন যাপন করেন ও সূর্য সমস্ত নক্ষত্রকে নিয়ে এই পর্বত পরিভ্রমণ করেন। এ কথা শোনার পর বিন্ধ্য সূর্যকে বললেন যে, উদয়াস্তকালে সুমেরু পর্বতের মতো করে তাঁকেও প্রদক্ষিণ করতে হবে। সূর্য এতে অসম্মত হলে, বিন্ধ্য নিজ দেহকে বর্ধিত করে সূর্যের পথ রোধ করে ফেললেন। ফলে সূর্যের উত্তাপে পর্বতের একদিকে জ্বলে পুড়ে যেতে থাকলো, অন্যদিকে প্রচণ্ড শীত ও অন্ধকারে জীবন বিপন্ন হয়ে পড়লো। দেবতারা এর প্রতিকারের উপায় না দেখে অগস্ত্যের শরণাপন্ন হলেন, অগস্ত্য বিন্ধ্যপর্বতের কাছে এলেন। উল্লেখ্য অগস্ত্য ছিলেন বিন্ধ্যপর্বতের গুরু। অগস্ত্যকে দেখে বিন্ধ্য গুরুভক্তিতে তাঁর মস্তক অবনত করলে, অগস্ত্য তাঁকে বললেন যে,— যতক্ষণ তিনি প্রত্যাবর্তন না করবেন, ততক্ষণ সে (বিন্ধ্য) এরূপ অবনতমস্তকে থাকবে। বিন্ধ্যকে এই অবস্থায় রেখে অগস্ত্য ১লা ভাদ্র তারিখে দক্ষিণদিকে যাত্রা করেন এবং কখনোই আর সেখানে ফিরে আসেন নি। অগস্ত্যের এই চির-প্রস্থানের কাহিনী অনুসারে বাংলাতে অগস্ত্যযাত্রা বাগধারা প্রচলিত রয়েছে।


খ. অগস্ত্য কর্তৃক রামকে অস্ত্র দান : রাম বনবাসকালে, অগস্ত্যের আশ্রমে উপস্থিত হলে— ইনি রামকে বৈষ্ণবধনু, ব্রহ্মাস্ত্র, অক্ষয়তূণ দান করেন এবং এঁরই পরামর্শে, রাম গোদাবরী তীরে পঞ্চবটী বনে কুটির নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন।


গ. রাজা নহুষের পতন: একবার ইন্দ্র ব্রহ্মহত্যার অভিশাপে সমুদ্রের মধ্যে বসবাস করছিলেন। এই সময় রাজা নহুষকে স্বর্গের রাজা করা হয়। রাজত্ব লাভের পর, নহুষ ইন্দ্রের পত্নী শচীকে ভোগ করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। শচী নহুষের কামনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বৃহস্পতি-র শরণাপন্ন হন। বৃহস্পতির পরামর্শে শচী নহুষকে বলেন যে, যদি নহুষ সাতজন ঋষি দ্বারা পরিচালিত রথে আরোহণ করে তাঁর কাছে আসেন, তবেই তিনি তাঁকে (নহুষকে) গ্রহণ করবেন। নহুষ সেই ব্যবস্থামতে রথে আরোহণ করেন। ওই রথের সাতজন ঋষির মধ্যে, অগস্ত্যও ছিলেন। হঠাৎ নহুষের পা অগস্ত্যের দেহ স্পর্শ করলে, ক্রুদ্ধ অগস্ত্য রাজাকে ‘সর্প হও’ অভিশাপ দেন। অভিশাপগ্রস্থ নহুষ, অগস্ত্যের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে, অগস্ত্য বলেন,— যুধিষ্ঠির -এর স্পর্শে সে শাপ মুক্ত হবে।


ঘ. অগস্ত্যর সমুদ্র পান : ইন্দ্র কর্তৃক বৃত্রাসুর নিহত হওয়ার পর, কালকেয় এবং অন্যান্য অসুররা দেবতাদের ভয়ে সমুদ্রের মধ্যে লুকিয়ে প্রাণ রক্ষা করে। কিন্তু প্রতি রাত্রে এরা সমুদ্র থেকে উঠে এসে দেবতাদের উপর অত্যাচার চালাতো। এই অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেবতারা অগস্ত্যের শরণাপন্ন হন। দেবতাদের অনুরোধে অগস্ত্য সমুদ্রের সমস্ত পানি পান করলে, দেবতারা শুকনো সমুদ্রতলের অসুরদেরকে হত্যা করতে সমর্থ হন।





অগ্নি
হিন্দু মতে অগ্নি তিন প্রকার

ক. ভৌমাগ্নি: কাঠ বা পৃথিবীর পদার্থ থেকে উৎপন্ন আগুন।
খ. দিব্যাগ্নি: জল, বায়ু থেকে উৎপন্ন আগুন। যেমন: আকশের বিদ্যুৎ, বজ্র প্রভৃতি।
গ. জঠরাগ্নি: কোষ্ঠাগ্নি, ক্ষুধা, খাদ্যের পরিপাকের জন্য উদরের উৎপন্ন আগুন।
সমার্থক শব্দাবলি: জঠরজ্বালা, জঠরাগ্নি, জঠরানল।

এছাড়া মানব দেহ বা মনের বিভিন্ন চাহিদাকেও অগ্নিতুল্য কামনা বা অভিব্যক্তিকে রূপকার্থে 'অগ্নি' হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যেমন−

যৌবন-অগ্নি: যৌবন সম্ভোগের প্রবল ইচ্ছা, যা কামভাবকে উত্তেজিত দশায় রাখে।
প্রেমাগ্নি: ভালবাসার প্রবল ইচ্ছা, গভীর বিরহ, না পাওয়া প্রেমের জন্য প্রবল উত্তাপ ইত্যাদি।
ক্রোধাগ্নি: অগ্নিতুল্য ক্রোধ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে – অগ্নি নামক শক্তির দেবতা। ঋগ্বেদের সূচনা হয়েছে অগ্নিকে দিয়ে। প্রথম মণ্ডলের প্রথম সূক্তের প্রথম শ্লোকে বলা হয়েছে– 'হে অগ্নি যজ্ঞের পুরোহিত এবং দীপ্তিমান; অগ্নি দেবগণের আহ্বানকারী ঋত্বিক এবং প্রভূতরত্নধারী; আমি অগ্নির স্তুতি করি। এই দেবতার উদ্দেশ্যে ঋগ্বেদে দুইশত সূক্ত পাওয়া যায়। অগ্নি ছাড়া যজ্ঞ হয় না, তাই অগ্নিকে বেদে 'পুরোহিত' বলা হয়েছে। ঋগ্বেদের ১।৩১।১ অংশে– অঙ্গিরা ঋষিদের আদি ঋষি হিসাবে অগ্নিকে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋগ্বেদে অগ্নির উৎপত্তির ঊৎস হিসাবে বলা হয়েছে- অরণিদ্বয় থেকে জন্ম [১।৭।৪]। এই কারণে ঋগ্বেদে অগ্নিকে বলা হয়েছে–দ্বিমাতৃ [১।৩১।২]।

মহাভারতের মতে– ধর্মের ঔরসে বসুভার্যার গর্ভে অগ্নির জন্ম। ঋক্‌বেদের মতে– পরমপুরুষের মুখ থেকে অগ্নির উৎপন্ন হয়েছিল। অগ্নিকে পৃথিবীর পুত্রও বলা হয়। দুটি শুকনো কাঠের ঘর্ষণে অগ্নির উৎপন্ন হয়। এই কাঠ দুটিকে অরণি বলা হয়। সুতরাং অরণিদ্বয় অগ্নির পিতা-মাতা। জন্ম মাত্রই অগ্নি তাঁর পিতা-মাতাকে ভক্ষণ করেন। অগ্নিকে জলের গর্ভ বা ভ্রূণও বলা হয়ে থাকে। এঁর জন্মস্থান আকাশ অথবা পৃথিবী।

হরিবংশে আছে– অগ্নির অঙ্গ কালো বস্ত্রে আবৃত, সঙ্গে থাকে ধূম্রপতাকা ও জ্বলন্ত বর্শা। এঁর বাহন ছাগ। এঁর চারটি হাত। দুই বা ততোধিক অরুণ বা পিঙ্গল বর্ণের অশ্বচালিত উজ্জ্বল রথে ইনি ভ্রমণ করেন। সপ্তবসু এঁর রথের চক্র। অগ্নি পূর্ব-দক্ষিণ কোণের অধিপতি, এই কারণে, এই কোণকে অগ্নিকোণ বলা হয়। ইনি পিতৃলোকের অধিপতি, দেবতাদের জন্য যজ্ঞভাগ বহনকারী এবং দূত ও যজ্ঞের সারথী। অগ্নির সাতটি শিখা আছে। এই শিখাগুলির নাম হলো― করালী, ধামিনী, নীললোহিতা, পদ্মরাগা, লোহিতা, শ্বেতা, সুবর্ণা।

অগ্নি রাজা নহুষের মনুষ্যরূপ সেনাপতি ছিলেন। [ঋগ্বেদ ১।৩১। ১০]

অগ্নিকে নিয়ে বেশ কিছু কাহিনী প্রচলিত আছে। যেমন–
দেবতারা ব্রহ্মার কাছে খাদ্য প্রার্থনা করলে, ব্রহ্মা বিষ্ণুর কাছে পরামর্শের জন্য যান। বিষ্ণু অগ্নিকে বলেন যে, যজ্ঞ উপলক্ষে প্রদত্ত হবি দেবতাদের আহার হবে। এরপর ব্রাহ্মণেরা হবি প্রদান শুরু করেন। কিন্তু সেই হবি দেবতাদের কাছে পৌঁছুতো না। তাই দেবতারা আবার ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা তখন দেবতাদেরকে প্রকৃতি দেবীর পূজা করতে বলেন। পরে সমবেত পূজায় প্রকৃতি দেবী সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মাকে বর প্রার্থনা করতে বলেন। ব্রহ্মা প্রার্থনা করেন, যেন প্রকৃতি দেবী অগ্নির দাহিকা শক্তি ও অগ্নির স্ত্রী হয় এবং অগ্নি তাঁর (প্রকৃতি দেবী) সাহায্য ছাড়া হোমীয় দ্রব্য ভস্ম করতে না পারে। কিন্তু প্রকৃতি দেবী (স্বাহা) তাতে রাজী না হয়ে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণু স্বাহাকে বলেন যে, দ্বাপরে আমি যখন পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করবো তখন, তুমি নগ্নজিৎ রাজার কন্যারূপে (নাগ্নজিতী) জন্মগ্রহণ করে আমাকে স্বামী হিসাবে লাভ করবে। দ্বাপর যুগের উক্ত ঘটনার পূর্ব পর্যন্ত তুমি অগ্নির দাহিকা শক্তি রূপে কাজ করবে। উল্লেখ্য স্বাহা নগ্নজীতের কন্যা হিসাবে দ্বাপরে জন্মগ্রহণ করেন এবং পিতার নামানুসারে তাঁর নাম হয় নাগ্নজিতী। বিষ্ণু অবতার হিসাবে কৃষ্ণরূপে জন্মগ্রহণ করলে― কৃষ্ণের সাথে তাঁর বিবাহ হয়।
দক্ষের কন্যা স্বাহা অগ্নিকে কামনা করে ব্যর্থ হন। অগ্নি এই সময় সপ্তর্ষিদের স্ত্রীদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কামার্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু এই নারীদের পাবেন না বলে তিনি দুঃখে বনে যান। স্বাহা এই সংবাদ জেনে একে একে ছয়জন ঋষির স্ত্রীর রূপ ধারণ করে অগ্নির কাছে যান। সপ্তর্ষিদের স্ত্রীদের মধ্যে বশিষ্ঠ মুনির স্ত্রী অরুন্ধতী ছিলেন তীব্র তাপসিনী। এই কারণে স্বাহা অরুন্ধতী’র রূপ ধরতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অগ্নির সাথে স্বাহা ছদ্মবেশে মিলিত হন। প্রতিবারের মিলনের পর অগ্নির স্খলিত বীর্য স্বাহা একটি কুণ্ডে নিক্ষেপ করেন। পরে এই কুণ্ড থেকে স্কন্দ (কার্তিকেয়)-এর জন্ম হয়। এই ঘটনার পর ঋষিরা তাঁদের স্ত্রীদের দুশ্চরিত্রা জ্ঞানে ত্যাগ করেন। স্বাহা পরে সব স্বীকার করে নিলে এবং স্কন্দের অনুরোধে ঋষিরা তাঁদের স্ত্রীদের গ্রহণ করেন। স্বাহা অগ্নির সাথে বাস করার জন্য স্কন্দের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে, স্কন্দ বলেন যে, হোমাগ্নিতে আহুতি প্রদানকালে স্বাহা অগ্নির সাথে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলেই তাঁর অগ্নির সাথে থাকা সম্ভব হবে।
মহাভারতের মতে― এক রাক্ষস, পুলোমা নামক এক নারীকে বিবাহ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলে, পুলোমার পিতা তাতে সম্মত না হয়ে, মহর্ষি ভৃগুর হাতে কন্যাকে সম্প্রদান করেন। রাক্ষস এই কথা জানতে পেরে, পুলোমার সন্ধানে ভৃগুর কুটিরে আসেন। ভৃগু তখন সেখানে না থাকায়, অগ্নির কাছ থেকে পুলোমার পরিচয় জেনে নিয়ে রাক্ষস তাকে অপহরণ করেন। এই সময় চ্যাবন ঋষি পুলোমার গর্ভে ছিলেন। ইনি গর্ভ্যচ্যুত হয়ে রাক্ষসকে দগ্ধ করেন। ভৃগু গৃহে প্রত্যাবর্তনের পর অগ্নিকে 'সর্বভুক্ হও' অভিশাপ দেন। এরপর অগ্নি নিজেকে অগ্নিহোত্র যজ্ঞ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেন। ফলে দেবতারা হব্য থেকে বঞ্চিত হতে থাকলে- ব্রহ্মা অগ্নিকে বলেন যে, কেবলমাত্র গুহ্যদেশের শিখা ও ক্রব্যাদ (মাংসভক্ষক) শরীর সর্বভুক হবে এবং মুখে যে আহুতি দেওয়া হবে, তাই দেবগণের ভাগরূপে গৃহীত হবে। [৫-৭ অধ্যায়। আদিপর্ব। মহাভারত]
অগ্নি শ্বেতকী রাজার যজ্ঞে অতিরিক্ত হবি ভক্ষণ করে কঠিন উদরাময় রোগে আক্রান্ত হন। নিরুপায় হয়ে অগ্নি, ব্রহ্মার কাছে গেলে— ব্রহ্মা তাঁকে খাণ্ডববনের সমস্ত জীবজন্তু, দৈত্যদানব, সর্প ইত্যাদি ভক্ষণ করার উপদেশ দেন। কিন্তু খাণ্ডববন দেব-রক্ষিত বলে ইন্দ্র তাতে বাধা দেন। তখন অগ্নি কৃষ্ণ ও অর্জুনের সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু তাঁরা দেবতাদের সাথে যুদ্ধ করবার উপযুক্ত অস্ত্রের অভাব জানালে― অগ্নি বরুণ দেবতার কাছ থেকে অর্জুনের জন্য কপিধ্বজ রথ, গাণ্ডীব-ধনু ও অক্ষয় তূণী এবং কৃষ্ণের জন্য সুদর্শনচক্র ও কৌমদকী গদা এনে দেন। এর পর এঁরা দুজন খাণ্ডববন দগ্ধ করতে সমর্থ হন। উক্ত বনের সমস্ত জীবজন্তু, দৈত্যদানব, সর্প ইত্যাদি ভক্ষণ করে অগ্নি রোগমুক্ত হন। [২২৩-২৪ অধ্যায়। আদিপর্ব। মহাভারত]

অগ্নির স্ত্রীগণ মহিষ্মতীর রাজা নীলের একটি সর্বাঙ্গসুন্দরী কন্যা ছিল। এই রাজকুমারী প্রতিদিন নিষ্ঠার সাথে অগ্নির পূজা করতেন। এই কন্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অগ্নি ব্রাহ্মণবেশে এই কন্যার সাথে বিহার করতেন এবং সকলের ঘরেই যেতেন। রাজা নীল এদের শাসন করলে- অগ্নি ক্রোধে প্রজ্জলিত হয়ে উঠলেন। এতে রাজা অত্যন্ত ভীত হয়ে- রাজকন্যার সাথে অগ্নির বিবাহ দেন। এই নগরীকে অগ্নি সব সময় রক্ষা করে চলতেন। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞের সময় সহদেব মাহিষ্মতী নগরী আক্রমণের সময় অগ্নিকে স্তব দ্বারা তুষ্ট করে, রাজা নীলকে অধিকার করেছিলেন। [৩০ অধ্যায়। সভাপর্ব। মহাভারত]
অগ্নিদেবতা দক্ষের কন্যা স্বাহাকে বিবাহ করেছিলেন। স্বাহার গর্ভে তাঁর তিনটি পুত্র জন্মে। এরা ছিলেন- পাবক, পবমান ও শুচী। এ ছাড়া অগ্নিবেশ্য নামে আরও একটি পুত্রের কথা জানা যায়।


অগ্নির তিনটি রূপ। রূপ তিনটি হলো –
১. আকাশে সূর্য,
২. বায়ুময় অন্তরীক্ষে বিদ্যুৎ
৩. পৃথিবীতে আগুন।

কিন্তু বিভিন্ন অর্থে অগ্নির আরও সমার্থ রয়েছে। এই নামগুলো হলো–

ঋক্‌বেদে অগ্নিকে বিভিন্ন নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নামগুলো হলো– অর্চিষ্মান, ঘৃতপৃষ্ঠ, জ্বালাকেশ, জ্বালাময়, নীলপৃষ্ঠ, তীক্ষ্ণ দংষ্ট্রা, পিঙ্গলাশ্মশ্রু, বৈশ্বানর, মধুজিহ্বা, সপ্তজিহ্বা, হিরণাদন্ত, হিরণ্যকেশ।

অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনিতে অগ্নির অন্যান্য যে নাম পাওয়া যায়, সেগুলো– অ, অব্জহস্তু, অনল, ছাগরথ, তোমারধর, ধূমকেতু, পাবক, বহ্নি, বৈশ্বানর, ভরণা, রোহিতাশ্ব, হুতভুজ, হুতাশ, হুতাশন।

জুহু : জুহু' নামে হাতায় করে যজ্ঞে ঘৃতাহুতি দেওয়া হতো বলে এর নাম জুহু।
পুরোহিত: অগ্নি ছাড়া যজ্ঞ হয় না বলে একে পুরোহিত বলা হয়।
প্রমন্থ : দুটি কাঠের ঘর্ষণে অগ্নির উৎপত্তি বলে এর নাম প্রমন্থ।
বহুজন্মা : গৃহে গৃহে অগ্নি অধিষ্ঠিত বলে এর নাম- বহুজন্মা।
হব্যবাহক : দেবতাদের হব্য পৌঁছে দেয় বলে, এর নাম হব্যবাহক।

অগ্নিবেশ

হিন্দু পৌরাণিক কাব্য মহাভারতের মতে– তিনি ছিলেন ভরদ্বাজের শিষ্য। একে বলা হয়েছে অগ্নসম্ভূত। তিনি ভরদ্বাজের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র শিক্ষা করেন। এই অস্ত্রটি তিনি ভরদ্বাজের পুত্র দ্রোণকে দান করেন।
[মহাভারত। আদিপর্ব। ১৩০ অধ্যায়]


অঙ্গারপর্ণ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে, অঙ্গারপর্ণ ছিলেন কুবেরের বন্ধু এবং দেবরাজ ইন্দ্রের রথের সারথী। এর উদ্যানের নামও ছিল অঙ্গারপর্ণ। এঁর একটি চিত্রময় রথ ছিল, এই কারণে এর অপর নাম ছিল চিত্ররথ।

পঞ্চপাণ্ডব একচক্রা থেকে পাঞ্চালের পথে যাওয়ার সময়, অঙ্গারপর্ণ সোমাশ্রয়ণ তীর্থে সখীদের সাথে নিয়ে জল-বিহার করছিলেন। এমন সময় পাণ্ডবরা, সেখানে উপস্থিত হলে, জল-বিহারে বিঘ্ন ঘটে। এ কারণে অঙ্গারপর্ণ রেগে যান এবং অর্জুনের সাথে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পরেন। শেষ পর্যন্ত এই তর্ক-বিতর্ক যুদ্ধ পরিণত হয়। যুদ্ধে অর্জুন অঙ্গারপর্ণকে পরাজিত কর বন্দী করেন এবং তাঁর রথ পুড়িয়ে দেন। এর থেকে অঙ্গারপর্ণের নাম হয়- দগ্ধরথ। এরপর অঙ্গারপর্ণের স্ত্রী কুম্ভীনসী যুধিষ্ঠিরের কাছে স্বামীর মুক্তির আবেদন করেন। যুধিষ্ঠিরের আদেশে অর্জুন তাঁকে ছেড়ে দেন।

পরে অর্জুনের সাথে তাঁর সখ্য স্থাপিত হয়। তিনি পঞ্চপাণ্ডবের প্রত্যেককে গন্ধর্বদেশীয় ঘোড়া উপহার দেন এবং অর্জুনকে চাক্ষুষ বিদ্যা শিক্ষা দান করেন। এই বিদ্যার পরিবর্তে অর্জুন তাঁকে কিছু আগ্নেয়াস্ত্র দান করেন। এঁরই পরামর্শে পাণ্ডবেরা ধৌম্যকে পৌরহিত্যে বরণ করেন।

অঙ্গিরা 
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে— ব্রহ্মার মুখনিঃসৃত মানসপুত্রের একজন এবং সপ্তর্ষিদের মধ্যেও একজন। তাঁকে দশজন প্রজাপতির মধ্যে— একজন ধরা হয়। ইনি ঋগ্বেদ-এর বহু শ্লোকের রচয়িতা। ইনি কর্দম ঋষির কন্যা শ্রদ্ধাকে বিবাহ করেছিলেন। কোনো কোনো মতে ইনি দক্ষ-এর কন্যা স্মৃতিকে বিবাহ করেছিলেন। এঁর দুই পুত্রের নাম উতথ্য এবং বৃহস্পতি।
অঙ্গিরা কঠোর তপস্যা দ্বারা অগ্নির চয়েও অধিকতর তেজস্বী হয়ে ওঠলে, অগ্নিহীন অবস্থায় জলে প্রবেশ করেন এবং অগ্নির কাছে গিয়ে জগতের কল্যাণে তাঁকে প্রকাশিত হওয়ার অনুরোধ করেন। অগ্নি এর পরিবর্তে অঙ্গিরাকে অগ্নিত্ব দান করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু অঙ্গিরা তাতে সম্মত না হয়ে, অগ্নির কাছে একটি সন্তান প্রার্থনা করেন। অগ্নি তখন তাতে সম্মত হয়ে সন্তান প্রদান করেন। এই সন্তানই বৃহস্পতি নামে খ্যাতি লাভ করেন।
এই ঋষির নামানুসারে সপ্তর্ষি নক্ষত্রমণ্ডলের একটি নক্ষত্রের নামকরণ করা হয়েছে অঙ্গিরা (নক্ষত্র)।


অজিত
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– পুলহ ঋষির পুত্র।

অজিতগণ
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– প্রজাপতি ব্রহ্মা সৃষ্টির পূর্বে জয় নামক বারো জন দেবতার সৃষ্টি করেন। এঁরা সৃষ্টিতে ব্রহ্মাকে সাহায্য না করে- ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন। প্রজাবৃদ্ধি না হওয়াতে ব্রহ্মার অভিশাপে সপ্তমন্বন্তরে এঁরা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এ সময় এঁদের নাম ছিল- অজিতগণ, তুষিতগণ, সত্যগণ, হরিগণ, বৈকুণ্ঠগণ, সাধ্যগণ ও আদিত্যগণ।





Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।