সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

ষষ্ঠ অধ্যায়ঃ ধ্যানযোগ বা অভ্যাসযোগ

                                              ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়

শ্রীভগবানুবাচ -

অনাশ্রিতঃ কর্ম্মফলং কার্য্যং কর্ম্ম করোতি যঃ।
স সন্ন্যাসী চ যোগী চ ন নিরগ্নির্বচাক্রিয়ঃ।।১


অর্থঃ- (১) শ্রীভগবান্‌ বলিলেন - কর্ম্মফলে আকাঙ্ক্ষা না করিয়া যিনি কর্ত্তব্য-কর্ম্ম করেন, তিনিই সন্ন্যাসী, তিনিই যোগী। যিনি যজ্ঞাদি শ্রৌতকর্ম্ম ত্যাগ করিয়াছেন অথবা সর্ব্ববিধ শারীরকর্ম্ম ত্যাগ করিয়াছেন, তিনি নহেন।

যং সংন্যাসমিতি প্রাহুর্যোগং তং বিদ্ধি পাণ্ডব।
ন হ্যসংন্যস্তসঙ্কল্পো যোগী ভবতি কশ্চন।।২


নিরগ্নি - অগ্নিসাধ্য শ্রৌতকর্ম্মত্যাগী। ধর্ম্মশাস্ত্রে উক্ত আছে যে, সন্ন্যাসাশ্রমীর অগ্নি রক্ষা করিবার প্রয়োজন নাই। তিনি ‘নিরগ্নি’ হইয়া, সর্ব্ব কর্ম্ম ত্যাগ করিয়া ভিক্ষা দ্বারা শরীর রক্ষা করিবেন, অক্রিয় - শারীরকর্ম্মত্যাগী অর্দ্ধমুদিতনেত্র যোগী (বলদেব)।


অর্থঃ- (২) হে পাণ্ডব, যাহাকে সন্ন্যাস বলে, তাহাই যোগ বলিয়া জানিও, কেননা, সঙ্কল্পত্যাগ না করিলে কেহই যোগী হইতে পারে না।


সন্ন্যাস - কর্ম্মযোগ - ধ্যানযোগ


গীতার মতে সন্ন্যাসের স্থূলকথা ফলসন্ন্যাস, কামনা-ত্যাগ - কেবল কর্ম্মত্যাগ নহে। ধ্যানযোগ বা চিত্তনিরোধ-যোগেরও স্থূলকথা সঙ্কল্পত্যাগ, কামনাত্যাগ; কারণ, সঙ্কল্পই চিত্তবিক্ষেপের হেতু। আবার কর্ম্মযোগেরও মূলকথা - কামনা ত্যাগ। সুতরাং সন্ন্যাস, ধ্যানযোগ, কর্ম্মযোগ - এ তিনই এক, তিনেরই মূলকথা সঙ্কল্পত্যাগ, ইহারই সাধারণ নাম গীতোক্ত যোগ। সুতরাং এখানে যোগ বলিতে ধ্যানযোগ ও কর্ম্মযোগ উভয়ই বুঝায়, বস্তুতঃ গীতার মতে ধ্যানযোগ কর্ম্মযোগের অঙ্গীভূত।

আরুরুক্ষোমুনের্যোগং কর্ম্ম কারণমুচ্যতে।
যোগারূঢ়স্য তস্যৈব শমঃ কারণমুচ্যতে।।৩


অর্থঃ- (৩) যোগে আরোহণেচ্ছু মুনির পক্ষে নিষ্কামকর্ম্মই যোগ-সিদ্ধির কারণ, যোগারূঢ় হইলে চিত্তের শমতাই ব্রাহ্মীস্থিতিতে নিশ্চল থাকিবার কারণ।

যদা হি নেন্দ্রিয়ার্থেষু ন কর্ম্মস্বনুযজ্যতে।
সর্ব্বসঙ্কল্পসন্ন্যাসী যোগারূঢ়স্তদোচ্যতে।।৪


অর্থঃ- (৪) যখন সাধক সর্ব্বসঙ্কল্প ত্যাগ করায় রূপরসাদি ইন্দ্রিয় ভোগ্যবিষয়ে এবং কর্ম্মে আসক্ত হন না, তখন তিনি যোগারূঢ় বলিয়া উক্ত হন।

উদ্দরেদাত্মনাত্মানং নাত্মানমবসাদয়েৎ ।
আত্মৈব হ্যাত্মনো বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ।।৫


অর্থঃ- (৫) আত্মার দ্বারাই আত্মাকে বিষয়কূপ হইতে উদ্ধার করিবে, আত্মাকে অবসর করিবে না (নিম্নদিকে যাইতে দিবে না)। কেননা, আত্মাই আত্মার বন্ধু এবং আত্মাই আত্মার শত্রু।

বন্ধুরাত্মাত্মনস্তস্য যেনাত্মৈবাত্মনা জিতঃ।
অনাত্মনস্তু শত্রুত্বে বর্ত্তেতাত্মৈব শত্রুবৎ।।৬


অর্থঃ- (৬) যে আত্মাদ্বারা আত্মা বশীভূত হইয়াছে, সেই আত্মাই আত্মার বন্ধু। অজিতাত্মার আত্মা শত্রুবৎ অপকারে প্রবৃত্ত হয়।


এখানে রূপকভাবে বলা হইইয়াছে যে, আত্মার দ্বারা আত্মাকে উদ্ধার করিবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আত্মা একটিই এবং সে নিজেই। সুতরাং এ কথার অর্থ এই যে, নিজেই নিজেকে প্রকৃতির বন্ধন হইতে উদ্ধার করিবে, নিজেকে অধোগামী করিবে না, জীব নিজেই নিজের শত্রু, নিজেই নিজের মিত্র।

জিতাত্মনঃ প্রশান্তস্য পরমাত্মা সমাহিত।
শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু তথা মানাপমানয়োঃ।।৭


অর্থঃ- (৭) জিতেন্দ্রিয়, প্রশান্ত অর্থাৎ রাগদ্বেষাদিশূন্য ব্যক্তির পরমাত্মা শীত-গ্রীষ্ম, সুখ-দুঃখ, অথবা মান-অপমান প্রাপ্ত হইলেও সমাহিত থাকে (অর্থাৎ অবিচলিতভাবে আপন সম-শান্ত-স্বরূপে অবস্থান করে)।

জ্ঞানবিজ্ঞানতৃপ্তাত্মা কূটস্থো বিজিতেন্দ্রিয়ঃ।
যুক্ত ইত্যুচ্যতে যোগী সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চনঃ।।৮


অর্থঃ- (৮) যাঁহার চিত্ত শাস্ত্রাদির উপদেশজাত জ্ঞান ও উপদিষ্ট তত্ত্বের প্রত্যক্ষ অনুভূতির দ্বারা পরিতৃপ্ত, যিনি বিষয়-সন্নিধানেও নির্ব্বিকার ও জিতেন্দ্রিয়, মৃৎপিণ্ড পাষাণ ও সুবর্ণখণ্ডে যাঁহারা সমদৃষ্ট, ঈদৃশ যোগীকে যুক্ত (যোগসিদ্ধ) বলে।

সুহৃন্মিত্রার্ষ্যুদাসীনমধ্যস্থদ্বেষ্যবন্ধুষু।
সাধুষ্বপি চ পাপেষু সমবুদ্ধির্বিশিষ্যতে।।৯


অর্থঃ- (৯) সুহৃৎ, মিত্র, শত্রু, উদাসীন, মধ্যস্থ, দ্বেষ্য, বন্ধু, সাধু ও অসাধু - এই সকলের প্রতি যাঁহার সমান বুদ্ধি, তিনিই প্রশংসনীয় অর্থাৎ তিনি সর্ব্ববিষয়ে সকলের প্রতি রাগদ্বেষশূন্য, তিনিই শ্রেষ্ঠ।


সর্ব্ববিষয়ে সমচিত্ততাই যোগের শ্রেষ্ঠ ফল। এই সমচিত্ততা লাভ করা অবশ্য সহজ নহে। চঞ্চল মনকে স্থির করিয়া আত্মসংস্থা করার এক বিশিষ্ট উপায় ধ্যানযোগ বা অভ্যাসযোগ।

যোগী যুঞ্জীত সততমাত্মানং রহসি স্থিতঃ
একাকী যতচিত্তাত্মা নিরাশীরপরিগ্রহঃ।।১০


অর্থঃ- (১০) যোগী একাকী নির্জ্জন স্থানে থাকিয়া সংযতচিত্ত, সংযতদেহ, আকাঙ্ক্ষাশূন্য ও পরিগ্রহশূন্য হইয়া চিত্তকে সতত সমাধি অভ্যাস করাইবেন।

শুচৌ দেশে প্রতিষ্ঠাপ্য স্থিরমাসনমাত্মনঃ।
নাত্যুচ্ছ্রি তং নাতিনীচং চেলাজিনকুশোত্তরম্।।১১
তত্রৈকাগ্রং মনঃ কৃত্বা যতচিত্তেন্দ্রিয়ক্রিয়ঃ।
উপবিশ্যাসনে যুঞ্জ্যাদ্ যোগমাত্মবিশুদ্ধয়ে।।১২


অর্থঃ- (১১-১২) পবিত্র স্থানে নিজ আসন স্থাপন করিবে; আসন যেন অতি উচ্চ অথবা অতি নিম্ন না হয়। কুশের উপরে ব্যাঘ্রাদির চর্ম্ম এবং তাহার উপর বস্ত্র পাতিয়া আসন প্রস্তুত করিতে হয়; সেই আসনে উপবেশন করিয়া চিত্ত ও ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া সংযমপূর্ব্বক মনকে একাগ্র করিয়া আত্মশুদ্ধির জন্য যোগ অভ্যাস করিবে।


সমং কায়শিরোগ্রীবং ধারয়ন্নচলং স্থিরঃ।
সংপ্রেক্ষ্য নাসিকাগ্রং স্বং দিশশ্চানবলোকয়ন্।।১৩
প্রশান্তাত্মা বিগতভীর্ব্রহ্মচারিব্রতে স্থিতঃ।
মনঃ সংযম্য মচ্চিত্তো যুক্ত আসীত মৎপরঃ।।১৪


অর্থঃ- (১৩-১৪) শরীর (মেরুদণ্ড), মস্তক ও গ্রীবা সরলভাবে ও নিশ্চলভাবে রাখিয়া সুস্থির হইয়া আপনার নাসাগ্রবর্ত্তী আকাশে দৃষ্টি রাখিবে, এদিক্‌ ওদিক্‌ তাকাইবে না; (এইরূপে উপবেশন করিয়া) প্রশান্ত-চিত্ত, ভয়বর্জ্জিত, ব্রহ্মচর্য্যশীল হইয়া মনঃসংযমপূর্ব্বক মৎপরায়ণ মদ্গতচিত্ত হইয়া সমাধিস্থ হইবে।


নাসিকাগ্রং সংপ্রেক্ষ্য - টীকাকারগণ বলেন, ঠিক নাসাগ্রই যে অবলোকন করিতে হইবে এরূপ অর্থ নহে, দৃষ্টি এদিক্‌ ওদিক্‌ না পড়ে এই জন্যই নাসাগ্রবর্ত্তী আকাশে দৃষ্টি রাখিতে হইবে। কেহ কেহ বলেন, ইহার অর্থ ভ্রূমধ্যে দৃষ্টি রাখিয়া, কেননা নিম্নদিক হইতে ধরিলে নাসাগ্র বলিতে ভ্রূমধ্য বুঝায়। মৎপর, মচ্চিত্ত হইয়া - আমিই একমাত্র প্রিয়, বিষয়াদি নয় - এইরূপ ভাবনাদ্বারা আমাতেই চিত্ত নিবিষ্ট করিয়া।

যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগীনিয়তমানসঃ।
শান্তিং নির্ব্বাণপরমাং মৎসংস্থামধিগচ্ছতি।।১৫


অর্থঃ- (১৫) পূর্ব্বোক্ত প্রকারে নিরন্তর মনঃসমাধান করিতে করিতে মন একাগ্র হইয়া নিশ্চল হয়। এইরূপ স্থিরচিত্ত যোগী নির্ব্বাণরূপ পরম শান্তি লাভ করেন। এই শান্তি আমাতেই স্থিতির ফল।

নাত্যশ্নতস্তু যোগোহস্তি ন চৈকান্তমনশ্নতঃ।
ন চাতিস্বপ্নশীলস্য জাগ্রতো নৈব চার্জ্জুন।।১৬


অর্থঃ- (১৬) হে অর্জ্জুন, কিন্তু যিনি অত্যধিক আহার করেন অথবা যিনি একান্ত অনাহারী, তাঁহার যোগ হয় না; অতিশয় নিদ্রালু বা অতিজাগরণশীলের যোগসমাধি হয় না।

যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্ম্মসু।
যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা।।১৭


অর্থঃ- (১৭) যিনি পরিমিতরূপ আহার-বিহার করেন, পরিমিতরূপ কর্ম্মচেষ্টা করেন, পরিমিতরূপে নিদ্রিত ও জাগ্রত থাকেন, তাঁহার যোগ দুঃখনিবর্ত্তক হয়।

যদা বিনিয়তং চিত্তমাত্মন্যেবাবতিষ্ঠতে।
নিস্পৃহঃ সর্ব্বকামেভ্যো যুক্ত ইত্যুচ্যতে তদা।।১৮


অর্থঃ- (১৮) যখন চিত্ত বিশেষরূপে নিরুদ্ধ হইয়া আত্মাতেই অবস্থিতি করে, তখন যোগী সর্ব্বকামনাশূন্য হয়। ঈদৃশ যোগী পুরুষই যোগসিদ্ধ বলিয়া কথিত হন।

যথা দীপো নিবাতস্থো নেঙ্গতে সোপমা স্মৃতা।
যোগিনো যতচিত্তস্য যুঞ্জতো যোগমাত্মনঃ।।১৯


অর্থঃ- (১৯) নির্ব্বাত প্রদেশে স্থিত দীপশিখা যেমন চঞ্চল হয় না, আত্মবিষয়ক যোগাভ্যাসকারী সংযতচিত্ত যোগীর অচঞ্চল চিত্তের উহাই দৃষ্টান্ত।

যত্রোপরমতে চিত্তং নিরুদ্ধং যোগসেবয়া।
যত্র চৌবাত্মনাত্মানং পশ্যন্নাত্মনি তুষ্যতি।।২০


অর্থঃ- (২০) যে অবস্থায় যোগাভ্যাসদ্বারা নিরুদ্ধ চিত্ত উপরত (সর্ব্ববৃত্তিশূন্য, নিষ্ক্রিয়) হয় এবং যে অবস্থায় আত্মাদ্বারা আত্মাতেই আত্মাকে দেখিয়া পরিতোষ লাভ হয় (তাহাই যোগ শব্দ বাচ্য জানিও)।

সুখমাত্যন্তিকং যত্তদ্ বুদ্ধিগ্রাহ্যমতীন্দ্রিয়ম্।
বেত্তি যত্র ন চৌবায়ং স্থিতশ্চলতি তত্ত্বতঃ।।২১


অর্থঃ- (২১) যে অবস্থায় ইন্দ্রিয়ের অগোচর, কেবল শুদ্ধ বুদ্ধিগ্রাহ্য যে নিরতিশয় সুখ (আত্মানন্দ) যোগী তাহাই অনুভব করেন এবং যে অবস্থায় স্থিতি লাভ করিয়া আত্মস্বরূপ হইতে বিচলিত হন না, তাহাই যোগশব্দবাচ্য জানিবে।

যং লব্ধ্বা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ।
যস্মিন্ স্থিতো ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে।।২২


অর্থঃ- (২২) যে অবস্থা লাভ করিলে যোগী অন্য কোন লাভ ইহার অপেক্ষা অধিক সুখ-কর বলিয়া বোধ করেন না এবং যে অবস্থায় স্থিতি লাভ করিলে মহাদুঃখেও বিচলিত হন না (তাহাই যোগশব্দবাচ্য জানিবে)।


আত্মানন্দ পরম সুখকর, এমন কোন সুখ নাই যাহা ইহা অপেক্ষা অধিক সুখকর বলিয়া বোধ হইতে পারে, এবং এমন কোন দুঃখ নাই যাহাতে আত্মজ্ঞানীকে বিচলিত করে পারে - কেননা, তিনি আত্মারাম, বাহ্য সুখদুঃখের অতীত।

তং বিদ্যাদ্দুঃখসংযোগবিয়োগং যোগসংজ্ঞিতম্।
স নিশ্চয়েন যোক্তব্যো যোগোহনির্ব্বিণ্নচেতসা।।২৩


অর্থঃ- (২৩) এইরূপ অবস্থায় (চিত্তবৃত্তিনিরোধে) দুঃখসংযোগের বিয়োগ হয়, এই দুঃখ-বিয়োগই যোগশব্দবাচ্য। এই যোগ নির্ব্বেদশূন্য চিত্তে অধ্যবসায় সহকারে অভ্যাস করা কর্ত্তব্য।

সংকল্পপ্রভবান্ কামাংস্ত্যক্ত্বা সর্ব্বানশেষতঃ।
মনসৈবেন্দ্রিয়গ্রামং বিনিয়ম্য সমন্ততঃ।।২৪
শনৈঃ শনৈরুপরমেদ্ বুদ্ধ্যা ধৃতিগৃহীতয়া।
আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ।।২৫


অর্থঃ- (২৪-২৫) সংকল্পজাত কামনাসমূহকে বিশেষরূপে ত্যাগ করিয়া, মনের দ্বারা (চক্ষুরাদি) ইন্দ্রিয়সমূহকে বিষয় ব্যাপার হইতে নিবৃত্ত করিয়া, ধৈর্য্যযুক্ত বুদ্ধিদ্বারা মন ধীরে ধীরে নিরুদ্ধ করিবে এবং এইরূপ নিরুদ্ধ মনকে আত্মাতে নিহিত করিয়া (আত্মাকারবিশিষ্ট করিয়া) কিছুই ভাবনা করিবে না।

যতো যতো নিশ্চরতি মনশ্চঞ্চলমস্থিরম্।
ততস্ততো নিয়ম্যৈতদাত্মন্যেব বশং নয়েৎ।।২৬


অর্থঃ- (২৬) মন স্বভাবতঃ চঞ্চল, অতএব অস্থির হইয়া উহা যে যে বিষয়ে ধাবিত হয়, সেই সেই বিষয় হইতে উহাকে প্রত্যাহার করিয়া আত্মাতেই স্থির করিয়া রাখিবে।


যোগশাস্ত্রে এই প্রক্রিয়াকে প্রত্যাহার বলে।

প্রশান্তমনসং হ্যেনং যোগিনং সুখমুত্তমম্।
উপৈতি শান্তরজসং ব্রহ্মভূতমকল্মষম্।।২৭


অর্থঃ- (২৭) এইরূপ যোগসিদ্ধ পুরুষ চিত্তবিক্ষেপক রজোগুণবিহীন এবং চিত্তলয়ের কারণ তমোগুণ বর্জ্জিত হইয়া ব্রহ্মভাব লাভ করেন, ঈদৃশ প্রশান্তচিত্ত যোগীকে নির্ম্মল সমাধি-সুখ আশ্রয় করে।


যোগসিদ্ধির ফল নির্ম্মল ব্রহ্মানন্দ ও সর্ব্বত্র সমত্ববুদ্ধি।

যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগী বিগতকল্মষঃ।
সুখেন ব্রহ্মসংস্পর্শমত্যন্তং সুখমশ্নুতে।।২৮


অর্থঃ- (২৮) এই রূপে সদা মনকে সমাহিত করিয়া নিষ্পাপ হওয়ায় যোগী ব্রহ্মানুভবরূপ নিরতিশয় সুখ লাভ করেন।

সর্ব্বভূতস্থমাত্মানং সর্ব্বভূতানি চাত্মনি।
ঈক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্ব্বত্র সমদর্শনঃ।।২৯


অর্থঃ- (২৯) এইরূপ যোগযুক্ত পুরুষ সর্ব্বত্র সমদর্শী হইয়া আত্মাকে সর্ব্বভূতে এবং সর্ব্বভূতকে আত্মাতে দর্শন করিয়া থাকেন।

যো মাং পশ্যতি সর্ব্বত্র সর্ব্বং চ ময়ি পশ্যতি।
তস্যাহং ন প্রণশ্যামি স চ মে ন প্রণশ্যতি।।৩০


অর্থঃ- (৩০) যিনি আমাকে সর্ব্বভূতে অবস্থিত দেখেন এবং আমাতে সর্ব্বভূত অবস্থিত দেখেন, আমি তাহার অদৃশ্য হই না, তিনিও আমার অদৃশ্য হন না।

সর্ব্বভূতস্থিতং যো মাং ভজত্যেকত্বমাস্থিতঃ।
সর্ব্বথা বর্ত্তমানোহপি স যোগী ময়ি বর্ত্ততে।।৩১


অর্থঃ- (৩১) যে যোগী সমত্ববুদ্ধি অবলম্বনপূর্ব্বক সর্ব্বভূতে ভেদজ্ঞান পরিত্যাগ করিয়া সর্ব্বভূতস্থিত আমাকে ভজনা করেন, তিনি যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, আমাতেই অবস্থান করেন।

আত্মৌপম্যেন সর্ব্বত্র সমং পশ্যতি যোহর্জ্জুন।
সুখং বা যদি বা দুঃখং স যোগী পরমো মতঃ।।৩২


অর্থঃ- (৩২) হে অর্জ্জুন, সুখই হউক, আর দুঃখই হউক, যে ব্যক্তি আত্মসাদৃশ্যে সর্ব্বত্র সমদর্শী সেই যোগী সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ইহাই আমার অভিমত।

অর্জ্জুন উবাচ -

যোহয়ং যোগস্ত্বয়া প্রোক্তঃ সাম্যেন মধুসূদন।
এতস্যাহং ন পশ্যামি চঞ্চলত্বাৎ স্থিতিং স্থিরাম্।।৩৩


অর্থঃ- (৩৩) অর্জ্জুন বলিলেন, - হে মধুসূদন, তুমি এই যে সমত্বরূপ যোগতত্ত্ব ব্যাখ্যা করিলে, মন যেরূপ চঞ্চল তাহাতে এই সমত্বভাব স্থায়ী হয় বলিয়া আমার বোধ হয় না।

চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দৃঢ়ম্।
তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্।।৩৪


অর্থঃ- (৩৪) হে কৃষ্ণ, মন স্বভাবতঃই চঞ্চল, ইন্দ্রিয়াদিরবিক্ষেপজনক মহাশক্তিশালী (বিচারবুদ্ধি বা কোনরূপ মন্ত্রৌষধিরও অজেয়), দৃঢ় (লৌহবৎ কঠিন, অনমনীয়); এই হেতু আমি মনে করি বায়ুকে আবদ্ধ করিয়া রাখা যেরূপ দুঃসাধ্য, মনকে নিরোধ করাও সেইরূপ সুদুস্কর।

ভবগান্ উবাচ -

অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্।
অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে।।৩৫


অর্থঃ- (৩৫) শ্রীভবগান্‌ বলিলেন, হে মহাবাহো! মন স্বভাবতঃ চঞ্চল, উহাকে নিরোধ করা দুস্কর, তাহাতে সংশয় নাই। কিন্তু হে কৌন্তেয়, অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা উহাকে বশীভূত করা যায়।

অসংযতাত্মনা যোগো দুস্প্রাপ ইতি মে মতিঃ।
বশ্যাত্মনা তু যততা শক্যোহবাপ্তুমুপায়তঃ।।৩৬


অর্থঃ- (৩৬) অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা যাহার চিত্ত সংযত হয় নাই তাহার পক্ষে যোগ দুস্প্রাপ্য, ইহা আমারও মত; কিন্তু বিহিত উপায় অবলম্বন করিয়া সতত যত্ন করিলে চিত্ত বশীভূত হয় এবং যোগলাভ হইতে পারে।

অর্জ্জুন উবাচ -

অযতিঃ শ্রদ্ধয়োপেতো যোগাচ্চলিতমানসঃ।
অপ্রাপ্য যোগসংসিদ্ধিং কাং গতিং কৃষ্ণ গচ্ছতি।।৩৭


অর্থঃ- (৩৭) অর্জ্জুন কহিলেন, - হে কৃষ্ণ, যিনি প্রথমে শ্রদ্ধাসহকারে যোগাভ্যাসে প্রবৃত্ত হন, কিন্তু যত্নের শিথিলতাবশতঃ যোগ হইতে ভ্রষ্টচিত্ত হওয়ায় যোগসিদ্ধি লাভে অসমর্থ হন, তিনি কি প্রকার গতি প্রাপ্ত হন?

কচ্চিন্নোভয়বিভ্রষ্টশ্ছন্নাভ্রমিব নশ্যতি।
অপ্রতিষ্ঠো মহাবাহো বিমুঢ়ো ব্রহ্মণঃ পথি।।৩৮


অর্থঃ- (৩৮) হে মহাবাহো, তিনি ব্রহ্মপ্রাপ্তির উপায়ভূত যোগমার্গে অকৃতকার্য্য হওয়াতে মোক্ষ হইতে বঞ্চিত হন, এবং কাম্য কর্মের ত্যাগহেতু স্বর্গাদি হইতেও বঞ্চিত হন, সুতরাং ভোগ মোক্ষরূপ পুরুষার্থদ্বয় ভ্রষ্ট হইয়া, ছিন্ন মেঘখণ্ডের ন্যায় (মেঘখণ্ড যেমন মূল মেঘরাশি হইতে ছিন্ন হইয়া অপর মেঘরাশি প্রাপ্ত না হইলে মধ্যস্থলে বিলীন হইয়া যায় তদ্রুপ) নষ্ট হন না কি?

এতন্মে সংশয়ং কৃষ্ণ ছেত্তুমর্হস্যশেষতঃ
ত্বদন্যঃ সংশয়স্যাস্য ছেত্তা ন হ্যুপপদ্যতে।।৩৯


অর্থঃ- (৩৯) হে কৃষ্ণ, তুমি আমার সংশয় নিঃশেষরূপে ছেদন করিয়া দাও, কেননা, তুমি ভিন্ন আমার এই সংশয়ের অপনেতা আর কেহ নাই।

শ্রীভগবান্ উবাচ -

পার্থ নৈবেহ নামুত্র বিনাশস্তস্য বিদ্যতে।
নহি কল্যাণকৃৎ কশ্চিদ্দুর্গতিং তাত গচ্ছতি।।৪০


অর্থঃ- (৪০) শ্রীভগবান্‌ বলিলেন - হে পার্থ, যোগভ্রষ্ট ব্যক্তির ইহলোকে কি পরলোকে কুত্রাপি বিনাশ নাই। কারণ, হে বৎস, শুভকর্মকারী পুরুষ কখনও দুর্গতি প্রাপ্ত হন না।


যোগাভ্যাসের যে কোনরূপ চেষ্টামাত্রই শুভকর্ম। সম্পূর্ণ সিদ্ধি লাভ না হওয়াতে তাহার পুনর্জন্ম নির্ধারিত হয় না বটে, কিন্তু শুভকর্মজনিত অন্যরূপ শুভফল তিনি প্রাপ্ত হন, তাহার সদ্গতিই লাভ হয়।

প্রাপ্য পুণ্যকৃতাং লোকানুষিত্বা শাশ্বতীঃ সমাঃ।
শুচীনাং শ্রীমতাং গেহে যোগভ্রষ্টোহভিজায়তে।।৪১


অর্থঃ- (৪১) যোগভ্রষ্ট পুরুষ পুণ্যকর্ম্মকারীদিগের প্রাপ্য স্বর্গলোকাদি প্রাপ্ত হইয়া তথায় বহু বৎসর বাস করিয়া পরে সদাচার সম্পন্ন ধনীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন।


যিনি বিষয়-ভোগে বিরত হইয়া যোগাভ্যাসে রত ছিলেন, তিনি পরজন্মে ধনীর গৃহে যান কেন? - তাহার সম্পূর্ণ বিষয়বৈরাগ্য জন্মে নাই বলিয়া, মৃত্যুকালে ভোগবাসনা বলবতী ছিল বলিয়া।

অথবা যোগিনামেব কুলে ভবতি ধীমতাম্।
এতদ্ধি দুর্ল্লভতরং লোকে জন্ম যদীদৃশম্।।৪২


অর্থঃ- (৪২) পক্ষান্তরে, যোগভ্রষ্ট পুরুষ জ্ঞানবান্‌ যোগীদিগের কুলে জন্মগ্রহণ করেন। জগতে ঈদৃশ জন্ম অতি দুর্লভ (যেমন ব্যাসতনয় শুকদেবের)।

তত্র তং বুদ্ধিসংযোগং লভতে পৌর্ব্বদেহিকম্।
যততে চ ততো ভূয়ঃ সংসিদ্ধৌ কুরুনন্দন।।৪৩


অর্থঃ- (৪৩) হে কুরুনন্দন, যোগভ্রষ্ট পুরুষ সেই জন্মে পূর্ব্বজন্মের অভ্যস্ত মোক্ষবিষয়ক বুদ্ধি লাভ করেন এবং মুক্তিলাভের জন্য পুনর্ব্বার যত্ন করেন।

পুর্ব্বাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিয়তে হ্যবশোহপি সঃ।
জিজ্ঞাসুরপি যোগস্য শব্দব্রহ্মাতিবর্ত্ততে।।৪৪


অর্থঃ- (৪৪) তিনি অবশ হইয়াই পূর্ব্বজন্মের যোগাভ্যাসজনিত শুভ সংস্কারবশতঃ যোগমার্গে আকৃষ্ট হন। যিনি কেবল যোগের স্বরূপ-জিজ্ঞাসু, তিনিই বেদোক্ত কাম্যকর্ম্মাদির ফল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ফল লাভ করেন (যিনি যোগের স্বরূপ জানিয়া যোগাভ্যাস-পরায়ণ তাঁহার আর কথা কি?)

প্রযত্নাত্ যতমানস্তু যোগী সংশুদ্ধকিল্বিহঃ।
অনেকজন্মসংসিদ্ধস্ততো যাতি পরাং গতিম্।।৪৫


অর্থঃ- (৪৫) সেই যোগী পূর্ব্বাপেক্ষাও অধিকতর যত্ন করেন, ক্রমে যোগাভ্যাসদ্বারা নিস্পাপ হইয়া বহু জন্মের চেষ্টায় সিদ্ধিলাভ করিয়া পরম গতি লাভ করেন।

তপস্বিভ্যোহধিকো যোগী জ্ঞানিভ্যোহপি মতোহধিকঃ।
কর্স্মিভ্যশ্চাধিকো যোগী তস্মাদ্ যোগী ভবার্জ্জুন।।৪৬


অর্থঃ- (৪৬) যোগী তপস্বিগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানিগণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, কর্ম্মিগণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ট, ইহাই আমার মত; অতএব হে অর্জ্জুন, তুমি যোগী হয়।

যোগিনামপি সর্ব্বেষাং মদ্গতেনান্তরাত্মনা।
শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ।।৪৭


অর্থঃ- (৪৭) যিনি শ্রদ্ধাবান্‌ হইয়া মদ্গচিত্তে আমার ভজনা করেন, সকল যোগীর মধ্যে তিনিই আমার সহিত যোগে সর্বাপেক্ষা অধিক যুক্ত, ইহাই আমার অভিমত অর্থাৎ ভগবানে ঐকান্তিক ভক্তিপরায়ণ যোগীই শ্রেষ্ট সাধক।


এই অধ্যায়ে প্রধানতঃ ধানযোগ বা সমাধি-যোগের প্রক্রিয়া ও ধ্যানযোগীর লক্ষণ বর্ণিত হইয়াছে। এই হেতু ইহাকে ধ্যানযোগ বা অভ্যাসযোগ বলে।


ইতি শ্রীমদ্‌ভগবদ্‌গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে
শ্রীকৃষ্ণার্জ্জুনসংবাদে অভ্যাসযোগোনাম ষষ্ঠোহধ্যায়ঃ।


ভিডিও গীতা কীর্তনঃ https://www.youtube.com/watch?v=FjfZCFyeKUQ


সংগৃহীতঃhttp://geetabangla.blogspot.com/
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger