তদনন্তর অরিন্দম কৃষ্ণ, অর্জ্জুন ও ভীম গতজীবিত ও প্রসুপ্তের ন্যায় পতিত জরাসন্ধকে পরিত্যাগ করিয়া নিষ্ক্রান্ত হইলেন। কৃষ্ণ জরাসন্ধের পতাকাশালী রথ সংযোজিত এবং তাহাতে ভ্রাতৃদ্বয়কে আরোপিত করিয়া বান্ধবগণকে কারামুক্ত করিলেন। মহীপালগণ মহাভয় হইয়ে পরিত্রাণ পাইয়া কৃষ্ণের নিকট গমনপূর্ব্বক রত্ন দ্বারা তাঁহার সমুচিত সম্মান করিলেন। অক্ষত, শস্ত্রসম্পন্ন, জিতারি বাসুদেব সেই দিব্যরথে আরোহণ করিয়া রাজগণের সহিত গিরিব্রজ হইতে প্রস্থান করিলেন। ভীমার্জ্জুন দুই যোদ্ধা তাহাতে আরূঢ় এবং কৃষ্ণ তাহার সারথি হওয়াতে সেই রথ সমধিক শোভিত হইয়াছিল। যে রথ তারকাজালের ন্যায় সমুজ্জ্বল, ইন্দ্র এবং বিষ্ণু যাহাতে আরোহণ করিয়া সংগ্রাম করিতেন, যদ্দ্বারা পুরন্দর নবনবতিবার দানবগণকে নিহত করিয়াছিলেন, তপ্ত-কাঞ্চনের ন্যায় যাহার আভা, মেঘনির্ঘোষের ন্যায় যাহার শব্দ, সেই কিঙ্কিণীজালজড়িত অপূর্ব্ব রথ প্রাপ্ত হইয়া তাঁহারা সাতিশয় পরিতুষ্ট হইলেন। মাগধেরা মহাবাহু কৃষ্ণকে ভীম ও অর্জ্জুনের সহিত সেই রথে আরূঢ় দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইল। বায়ুবেগশালী সেই রথ দিব্য ঘোটকে সংযুক্ত ও কৃষ্ণ কর্ত্তৃক অধিষ্ঠিত হইয়া অতীব শোভমান হইয়াছিল। সেই দেবনির্ম্মিত রথ শক্রধনুর ন্যায় প্রভাসম্পন্ন দৃষ্ট হইতে লাগিল।
০৪ জুলাই ২০১৪
জরাসন্ধ বধ । জরাসন্ধবন্দীকৃত রাজগণের মুক্তি । জরাসন্ধপুত্র সহদেবের রাজ্যাভিষেক । সকৃষ্ণ ভীমার্জুনের স্বপুরে আগমন
জরাসন্ধ বধ
বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর কৌশলাভিজ্ঞ ভীমসেন জরাসন্ধবধাভিলাষে বাসুদেবকে কহিলেন, “হে কৃষ্ণ! এই পাপাত্মার কক্ষদেশ এরূপ বসনবদ্ধ আছে যে, ইহাকে প্রাণবিযুক্ত করা সহজ ব্যাপার নহে।” পুরুষব্যাঘ্র বাসুদেব জরাসন্ধবধাভিলাষে সত্বর হইয়া রকোদরকে কহিলেন, “হে ভীম! তোমার যে দৈববল ও বাহুবল আছে, আশু তাহা জরাসন্ধকে প্রদর্শন কর।” মহাবল ভীম এই প্রকার অভিহিত হইয়া, জরাসন্ধকে উৎক্ষিপ্ত করিয়া ঘূর্ণিত করিতে লাগিলেন; শতবার ঘূর্ণিত করিয়া জানু দ্বারা আকুঞ্চনপূর্ব্বক তাঁহার পৃষ্ঠদেশ ভঙ্গ ও নিষ্পেষণপূর্ব্বক সিংহনাদসহকারে তাঁহার চরণদ্বয় করকবলিত করিয়া দ্বিধা বিভক্ত করিলেন। নিষ্পিষ্যমাণ জরাসন্ধের আর্ত্তরবে এবং ভীমসেনের গর্জ্জনে মগধবাসী সমস্ত লোক ত্রস্ত ও গর্ভিণীর গর্ভস্রাব হইয়া গেল। ভীমসেনের ভয়ঙ্কর নিনাদে মাগধেরা বোধ করিল যে, হয় হিমালয়, না হয় মহীতল বিদীর্ণ হইতেছে।
তদনন্তর অরিন্দম কৃষ্ণ, অর্জ্জুন ও ভীম গতজীবিত ও প্রসুপ্তের ন্যায় পতিত জরাসন্ধকে পরিত্যাগ করিয়া নিষ্ক্রান্ত হইলেন। কৃষ্ণ জরাসন্ধের পতাকাশালী রথ সংযোজিত এবং তাহাতে ভ্রাতৃদ্বয়কে আরোপিত করিয়া বান্ধবগণকে কারামুক্ত করিলেন। মহীপালগণ মহাভয় হইয়ে পরিত্রাণ পাইয়া কৃষ্ণের নিকট গমনপূর্ব্বক রত্ন দ্বারা তাঁহার সমুচিত সম্মান করিলেন। অক্ষত, শস্ত্রসম্পন্ন, জিতারি বাসুদেব সেই দিব্যরথে আরোহণ করিয়া রাজগণের সহিত গিরিব্রজ হইতে প্রস্থান করিলেন। ভীমার্জ্জুন দুই যোদ্ধা তাহাতে আরূঢ় এবং কৃষ্ণ তাহার সারথি হওয়াতে সেই রথ সমধিক শোভিত হইয়াছিল। যে রথ তারকাজালের ন্যায় সমুজ্জ্বল, ইন্দ্র এবং বিষ্ণু যাহাতে আরোহণ করিয়া সংগ্রাম করিতেন, যদ্দ্বারা পুরন্দর নবনবতিবার দানবগণকে নিহত করিয়াছিলেন, তপ্ত-কাঞ্চনের ন্যায় যাহার আভা, মেঘনির্ঘোষের ন্যায় যাহার শব্দ, সেই কিঙ্কিণীজালজড়িত অপূর্ব্ব রথ প্রাপ্ত হইয়া তাঁহারা সাতিশয় পরিতুষ্ট হইলেন। মাগধেরা মহাবাহু কৃষ্ণকে ভীম ও অর্জ্জুনের সহিত সেই রথে আরূঢ় দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইল। বায়ুবেগশালী সেই রথ দিব্য ঘোটকে সংযুক্ত ও কৃষ্ণ কর্ত্তৃক অধিষ্ঠিত হইয়া অতীব শোভমান হইয়াছিল। সেই দেবনির্ম্মিত রথ শক্রধনুর ন্যায় প্রভাসম্পন্ন দৃষ্ট হইতে লাগিল।
তদনন্তর অরিন্দম কৃষ্ণ, অর্জ্জুন ও ভীম গতজীবিত ও প্রসুপ্তের ন্যায় পতিত জরাসন্ধকে পরিত্যাগ করিয়া নিষ্ক্রান্ত হইলেন। কৃষ্ণ জরাসন্ধের পতাকাশালী রথ সংযোজিত এবং তাহাতে ভ্রাতৃদ্বয়কে আরোপিত করিয়া বান্ধবগণকে কারামুক্ত করিলেন। মহীপালগণ মহাভয় হইয়ে পরিত্রাণ পাইয়া কৃষ্ণের নিকট গমনপূর্ব্বক রত্ন দ্বারা তাঁহার সমুচিত সম্মান করিলেন। অক্ষত, শস্ত্রসম্পন্ন, জিতারি বাসুদেব সেই দিব্যরথে আরোহণ করিয়া রাজগণের সহিত গিরিব্রজ হইতে প্রস্থান করিলেন। ভীমার্জ্জুন দুই যোদ্ধা তাহাতে আরূঢ় এবং কৃষ্ণ তাহার সারথি হওয়াতে সেই রথ সমধিক শোভিত হইয়াছিল। যে রথ তারকাজালের ন্যায় সমুজ্জ্বল, ইন্দ্র এবং বিষ্ণু যাহাতে আরোহণ করিয়া সংগ্রাম করিতেন, যদ্দ্বারা পুরন্দর নবনবতিবার দানবগণকে নিহত করিয়াছিলেন, তপ্ত-কাঞ্চনের ন্যায় যাহার আভা, মেঘনির্ঘোষের ন্যায় যাহার শব্দ, সেই কিঙ্কিণীজালজড়িত অপূর্ব্ব রথ প্রাপ্ত হইয়া তাঁহারা সাতিশয় পরিতুষ্ট হইলেন। মাগধেরা মহাবাহু কৃষ্ণকে ভীম ও অর্জ্জুনের সহিত সেই রথে আরূঢ় দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইল। বায়ুবেগশালী সেই রথ দিব্য ঘোটকে সংযুক্ত ও কৃষ্ণ কর্ত্তৃক অধিষ্ঠিত হইয়া অতীব শোভমান হইয়াছিল। সেই দেবনির্ম্মিত রথ শক্রধনুর ন্যায় প্রভাসম্পন্ন দৃষ্ট হইতে লাগিল।
জরাসন্ধবন্দীকৃত রাজগণের মুক্তি
অনন্তর কৃষ্ণ গরুড়কে স্মরণ করিবামাত্র তিনি সমাগত হইলেন। বিস্তৃতানন, মহানাদ গরুত্মান্ সমারূঢ় হইলে সেই দিব্য রথ উন্নত চৈত্যবৃক্ষের উপমেয় হইয়া উঠিল। সহস্রকিরণাবৃত মধ্যাহ্নসহস্রাংশুর ন্যায় প্রাণিগণের দুর্নিরীক্ষ্য সেই রথ তেজোদ্বারা সমধিক দীপ্যমান হইল। তাহার দিব্য ধ্বজ বৃক্ষেও সংলগ্ন হইত না এবং বাণেও বিদ্ধ হইত না, এক্ষণে মানবের দৃশ্যমান হইতে লাগিল। যে রথ রাজা বসু বাসব হইতে, রহদ্রথ বসু হইতে, পরিশেষে জরাসন্ধ রহদ্রথ হইতে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, পুরুষব্যাঘ্র অচ্যুত ভীম ও অর্জ্জুনের সহিত সেই মেঘনাদ রথে আরোগণ করিয়া প্রয়াণ করিলেন। তদনন্তর পুণ্ডরীকাক্ষ বাসুদেব গিরিব্রজ হইতে নির্গত হইয়া বহিঃপ্রদেশে উপস্থিত হইলেন। তখন তথায় ব্রাহ্মণ প্রভৃতি নগরবাসীরা সৎকার ও বিধিবিহিত কর্ম্ম দ্বারা তাঁহার সমীপবর্ত্তী হইলেন। বন্ধনবিমুক্ত রাজারাও স্তুতিপূর্ব্বক মধুসূদনের পূজা করিয়া কহিতে লাগিলেন, “হে মহাবাহো! ভীমার্জ্জুনের সহিত আপনি যে ধর্ম্ম রক্ষা করিলেন, অদ্য যে দুঃখরূপ পঙ্কে পঙ্কিল জরাসন্ধরূপ হ্রদে নিমগ্ন নৃপতিগণের উদ্ধারসাধন করিলেন, ইহা আশ্চর্য্যের বিষয় নহে। হে বিষ্ণো! হে যদুনন্দন! আপনি দারুণ গিরিদুর্গে অবসন্ন দুর্ভাগ্যদিগের মোচনজনিত দীপ্ত যশোরাশি প্রাপ্ত হইলেন। আপনি নৃপতিগণের দুষ্কর কর্ম্ম করিলেন, এক্ষণে এই ভৃত্যদিগকে কি করিতে হইবে, অনুমতি করুন।”
জরাসন্ধপুত্র সহদেবের রাজ্যাভিষেক
মনস্বী হৃষীকেশ তাঁহাদিগকে কহিলেন, “রাজা যুধিষ্ঠির রাজসূয়-যজ্ঞ করিতে অভিলাষ করিয়াছেন, আপনারা সেই সাম্রাজ্যচিকীর্ষু ধার্ম্মিকের সাহায্য করেন, ইহাই প্রার্থনা।” নৃপতিগণ “তাহাই করিব” বলিয়া স্বীকার করিলেন। জরাসন্ধনন্দন সহদেব অমাত্যের সহিত পুরোহিতকে অগ্রবর্ত্তী করিয়া অতি বিনীতভাবে প্রণিপাতসহকারে বহুরত্নপ্রদানপূর্ব্বক নরদেব বাসুদেবের উপাসনা করত তাঁহার শরণাপন্ন হইলেন। পুরুষোত্তম কৃষ্ণ ভয়ার্ত্ত সহদেবকে অভয় প্রদান করিয়া, তৎপ্রদত্ত মহামূল্য রত্নসমুদয় গ্রহণ করিলেন। কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জ্জুন একত্র হইয়া সানন্দে সৎকারপূর্ব্বক তাঁহাকে সেই মগধরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। মহাবাহু সহদেব মহাত্মগণ কর্ত্তৃক অভিষিক্ত হইয়া রাজধানী প্রবেশ করিলেন।
সকৃষ্ণ ভীমার্জুনের স্বপুরে আগমন
এ দিকে শ্রীমান্ পুরুষোত্তম ভুরি ভুরি রত্নজাত সংগ্রহ করিয়া ভীমার্জ্জুনের সহিত ইন্দ্রপ্রস্থে প্রস্থিত হইলেন এবং তথায় উপস্থিত হইয়া রাজা যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া আনন্দের সহিত কহিতে লাগিলেন, “মহারাজ! বৃকোদর বলবান্ জরাসন্ধকে নিপাতিত করিয়াছেন, কারারুদ্ধ ভূপতিগণও বন্ধনমুক্ত হইয়াছেন। ভাগ্যক্রমে ভীমসেন এবং ধনঞ্জয় কৃতকার্য্য হইয়া অক্ষত-শরীরে স্বনগরে আগমন করিয়াছেন।” রাজা যুধিষ্ঠির শ্রবণমাত্র অতিমাত্র আহ্লাদিত হইয়া বাসুদেবকে সমুচিত পূজা ও ভ্রাতৃদ্বয়কে আলিঙ্গন করিলেন। ভীমার্জ্জুন জরাসন্ধকে নিহত করিয়া জয়লাভ করিয়াছেন, ইহাতে সভ্রাতৃক যুধিষ্ঠিরের আর আহ্লাদের সীমা রহিল না। অনন্তর তাঁহারা বয়ঃঅনুসারে সৎকার ও পূজা করিয়া ভূপতিগণকে বিদায় করিলেন, ভূপতিগণ যুধিষ্ঠির কর্ত্তৃক অনুজ্ঞাত হইয়া প্রফুল্লচিত্তে উচ্চাবচ যানে আরোহণ করিয়া স্ব স্ব দেশে গমন করিলেন। বুদ্ধিমান্ শত্রুনিসুদন কৃষ্ণ পাণ্ডবগণ দ্বারা চিরশত্রু জরাসন্ধকে বিনষ্ট করিয়া, ধর্ম্মরাজের অনুজ্ঞা লইয়া, কুন্তী, কৃষ্ণা, সুভদ্রা, ভীমসেন, ধনঞ্জয় এবং ধৌম্যকে আমন্ত্রণ করিয়া, ধর্ম্মরাজ-প্রদত্ত মনস্তুল্যগামী সেই দিব্য রথে দশদিক্ মুখরিত করিয়া, নিজনগরে যাত্রা করিলেন। তাঁহার গমনসময়ে অজাতশত্রু যুধিষ্ঠির প্রভৃতি পাণ্ডবগণ তাঁহাকে প্রদক্ষিণ করিলেন। রাজা যুধিষ্ঠির জরাসন্ধের বধসাধন ও গিরিদুর্গ হইতে বধার্থানীত নরপতিদিগের উদ্ধার করাতে তাঁহার যশোরাশি ক্রমে চারিদিকে বিস্তৃত হইয়া উঠিল। হে ভরতবংশাবতংস জনমেজয়! এইরূপে পাণ্ডবগণ দ্রৌপদীর প্রীতিবর্দ্ধন ও তৎকালোচিত ধর্ম্মকামার্থোপেতভাবে প্রজা পালন করত পরম-সুখে বাস করিতে লাগিলেন।
জরাসন্ধবধপর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত
গরুড়ের অমৃতহরণ, গরুড়ের জন্মরহস্য,গরুড়সহ দেবগণের যুদ্ধ,গরুড়ের অমৃতহরণ-গরুড়ের বিষ্ণুবাহনত্বলাভ,ইন্দ্রের সহিত গরুড়ের মিত্রতা | বিনতার দাস্যমুক্তি
ত্রিংশ অধ্যায়
গরুড়ের অমৃতহরণ
গরুড়ের অমৃতহরণ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাবল-পরাক্রান্ত গরুড় পাদস্পর্শ মাত্রেই তরুশাখা ভগ্ন হইল দেখিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা ধারণ করিলেন। বিহঙ্গমরাজ শাখাভঙ্গ করিয়া বিস্ময়বিস্ফারিত লোচন ইতস্ততঃ অবলোকন করিতেছেন, ইত্যবসরে দেখিতে পাইলেন, তপঃপরায়ণ বালখিল্য ঋষিগণ অধঃশিরা হইয়া বৃক্ষশাখায় লম্বমান রহিয়াছেন। গরুড় তদ্দর্শনে অতিমাত্র ভীত হইয়া মনে করিলেন, শাখা ভূতলে পতিত হইলে নিশ্চয়ই ঋষিদিগের প্রাণনাশ হইবে; অতত্রব গজ ও কচ্ছপকে নখ দ্বারা দৃঢ়রূপে ধারণ করিয়া ঋষিগণের প্রাণরক্ষার্থে ঐ অতি বিশাল বৃক্ষশাখা চঞ্চুপুট দ্বারা গ্রহণ করিলেন। মহর্ষিগণ গরুড়ের অলৌকিক কর্ম্ম দর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া কারণ নির্দ্দেশপূর্ব্বক তাঁহার এই নাম রাখিলেন, “যেহেতু, এই বিহঙ্গম অতি গুরুভার গ্রহণ করিয়া অবিচলিতচিত্তে গগনমার্গে উড্ডীন হইল, অতএব অদ্যাবধি ইহার নাম গরুড় বলিয়া প্রসিদ্ধ হইবে।” অনন্তর গরুড় পক্ষ-পবন দ্বারা পার্শ্বস্থ সমস্ত পর্ব্বত বিচালিত করিয়া বায়ুবেগে গমন করিতে লাগিলেন।
গরুড় গজ-কচ্ছপ লইয়া বালখিল্য ঋষিগণের প্রাণরক্ষার্থে এইরূপে নানাদেশ ভ্রমণ করিলেন; কিন্তু কুত্রাপি উপবেশনের উপযুক্ত স্থান পাইলেন না। পরিশেষে গন্ধমাদন পর্ব্বতে উপনীত হইয়া স্বীয় পিতা মহর্ষি কশ্যপকে তপস্যায় অভিনিবিষ্ট দেখিলেন। ভগবান্ কশ্যপ সেই বলবীর্য্যতেজঃ সম্পন্ন, মন ও বায়ুসম বেগবান্, অচিন্তনীয়, অনভিভবনীয়, সর্ব্বভূতভয়ঙ্কর, প্রদীপ্ত অগ্নিশিখার ন্যায় সমুজ্জ্বল, অধৃষ্য, দুর্জ্জয়, সর্ব্বপর্ব্বতবিদারণক্ষম, সমুদ্রশোষণে সমর্থ, সর্ব্বলোকসংহারে পটু, কৃতান্তসম ভীমদর্শন, উত্তুঙ্গ [অতূ্যচ্চ] গিরিশৃঙ্গাকার, দিব্যরূপী, বিহঙ্গমরাজ গরুড়কে অভ্যাগত দেখিয়া এবং তাঁহার অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, “হে পুৎত্র! তুমি সহসা সাহসের কর্ম্ম করিও না, তাহাতে অশেষবিধ ক্লেশ পাইবার সম্ভাবনা। সূর্য্যমরীচিমাত্রপায়ী [সূর্যকিরণমাত্রসেবী] বালখিল্যগণ রোষপরবশ হইলে তোমাকে এইদণ্ডে ভস্মসাৎ করিবেন।” এই কথা বলিয়া মহর্ষি কশ্যপ পুৎত্রবাৎসল্যপ্রযুক্ত মহাভাগ বালখিল্য ঋষিদিগকে প্রসন্ন করিতে লাগিলেন। হে মহর্ষিগণ! প্রজাদিগের হিতোদ্দেশে গরুড় এই মহৎ কর্ম্ম সাধন করিতে অধ্যবসায় করিয়াছে, তোমরা অনুজ্ঞা কর।” বালখিল্যগণ মহর্ষি কশ্যপের অভ্যর্থনায় সেই বৃক্ষশাখা পরিত্যাগপূর্ব্বক তপশ্চরণার্থ পর্ব্বতশ্রেষ্ঠ পবিত্র হিমালয়ে প্রস্থান করিলেন।
বালখিল্য গমন করিলে বিনতানন্দন নিজ পিতা কশ্যপকে নিবেদন করিলেন, “ভগবন্! আমি এখন এই বিশাল বৃক্ষশাখা কোথায় নিক্ষেপ করি, আমাকে কোন নির্ম্মানুষ দেশ নির্দ্দেশ করিয়া দিন।” তখন কশ্যপ মানুষশূন্য নিরবচ্ছিন্ন তুষাররাশিসমাকীর্ণ এক পর্ব্বত কহিয়া দিলেন। পক্ষিরাজ শাখা ও গজ-কচ্ছপ লইয়া বায়ুবেগে সেই পর্ব্বত অভিমুখে যাত্রা করিলেন। গরুড় যে শাখা লইয়া গমন করিলেন, উহা এমত স্থুল যে, শতগোচর্ম্মনির্ম্মিত রজ্জু দ্বারাও বন্ধন বা বেষ্টন করা যায় না। পতগেশ্বর গরুড় অনতিবিলম্বে শতসহস্র যোজনান্তরে স্থির সেই মহাপর্ব্বতে উপনীত হইয়া পিতার আদেশানুসারে তদুপরি প্রকাণ্ড বৃক্ষশাখা নিক্ষেপ করিলেন। তদীয় পক্ষপবনে আহত হইয়া গিরিরাজ কম্পিত হইল, তরুগণ পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিল এবং যে-সকল মণিকাঞ্চনময় শৈলশৃঙ্গ পর্ব্বতের শোভা সম্পাদন করিত, তাহারা বিশীর্ণ হইয়া ইতস্ততঃ পতিত হইতে লাগিল। বৃক্ষশ্রেণী পরস্পরের শাখাঘাতে অভিহত হইয়া সৌদামিনীমণ্ডিত নবীন নীরদের ন্যায় কাঞ্চনময় কুসুমসমূহে সুশোভিত হইল। গৈরিকরাগরঞ্জিত পাদপ-সকল অবিরল ভূতলে পতিত হইয়া অপূর্ব্ব শোভাধারণ করিল। তৎপরে গরুড় সেই গিরিশৃঙ্গে উপবিষ্ট হইয়া গজ-কচ্ছপ ভক্ষণ করিলেন। খগরাজ এইরূপে সেই কূর্ম্ম ও কুঞ্জরকে উপযোগ করিয়া তথা হইতে মহাবেগে উড্ডীন হইলেন।
অনন্তর দেবতাদিগের উপর অতি ভয়ঙ্কর উৎপাত আরম্ভ হইল। ইন্দ্রের বজ্র ভয়ে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। অন্তরীক্ষ হইতে ধূম ও অগ্নিশিখার সহিত উল্কাপাত হইতে লাগিল। বসু, রুদ্র, আদিত্য, সাধ্য, মরুৎ ও অন্যান্য দেবগণের অস্ত্র সকল পরস্পর বিক্রম প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিল। দেবাসুর-সংগ্রামেও এরূপ অভূতপূর্ব্ব দুর্ঘটনা কদাচ ঘটে নাই। বায়ু প্রবলবেগে প্রবাহিত হইতে লাগিল, শত সহস্র উল্কাপাত হইতে লাগিল এবং মেঘশূন্য নভোণ্ডল অতি গভীররবে গর্জ্জন করিতে আরম্ভ করিল। অধিক কি বলিব, যিনি দেবাদিদেব [পর্জ্জন্যদেব] তিনিও অনবরত শোণিতবর্ষণ করিতে লাগিলেন। দেবতাদিগের গলদেশের মাল্য ম্লান ও তেজোরাশি ক্রমশঃ হ্রাস হইয়া গেল। প্রলয়কালীন অতিভীষণ মেঘের ন্যায় ঘনাবলী মুষলধারে রক্তবৃষ্টি করিতে লাগিল। ধূলিজাল গগনমার্গে উড্ডীন হইয়া দেবগণের মুকুটসকল প্রভাহীন করিল।
অনন্তর দেবরাজ ইন্দ্র ও সমস্ত দেবগণ এইরূপ অতি নিদারুণ উৎপাত দর্শনে ভীত ও বিস্মিত হইয়া বৃহস্পতিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ভগবন্! যুদ্ধে আমাদিগকে আক্রমণ করে, এরূপ শত্রু ত’ লক্ষ্য হয় না। তবে কোথা হইতে এতাদৃশ ঘোরতর উৎপাত সহসা উপস্থিত হইল?” বৃহস্পতি কহিলেন, “হে দেবেন্দ্র! তোমারই অপরাধ ও প্রমাদবশতঃ মহাত্মা বালখিল্যগণের তপোবলে বিনতাগর্ভে মহর্ষি কশ্যপের পক্ষিরূপী এক পুৎত্র জন্মিয়াছে। সেই কামরূপী মহাবল বিনতানন্দন অমৃতহরণে সমর্থ। তাহাতে সকলই সম্ভব হয়। সে অনায়াসে অসাধ্য সাধন করিতে পারে।”
ইন্দ্র তদীয় বাক্য শ্রবণ করিয়া অমৃতরক্ষকদিগকে আদেশ করিলেন, “মহাবীর্য্য মহাবল এক পক্ষী অমৃতহরণে উদ্যত হইয়াছে, আমি তোমাদিগকে সতর্ক করিয়া দিতেছি, দেখিও, যেন সে বলপূর্ব্বক অমৃত হরণ করিতে না পারে। বৃহস্পতি কহিয়াছেন, সে অতুল-বলশালী” তাহা শুনিয়া দেবতারা বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া অতি সাবধানে অমৃত বেষ্টন করিয়া রহিলেন এবং ইন্দ্রও বজ্রহস্ত হইয়া তথায় অবস্থান করিলেন। বিচিত্র বসন-ভূষণে বিভূষিত, পাপস্পর্শরহিত, নিরুপম, বলবীর্য্যসম্পন্ন, অসুরপুরবিদারণে পটু সুরগণ; কাঞ্চনময়, বৈদূর্য্যমণিময় ও চর্ম্মাত্মক, মহামূল্য প্রভাভাস্বর [তেজধারা দীপ্ত], সুদৃঢ় কবচ; তীক্ষ্ণধার ভয়ঙ্কর বিবিধ অস্ত্র-শস্ত্র; ধূম অগ্নি ও স্ফুলিঙ্গ [অগ্নিকণা] সহিত চক্র; পরিঘ, ত্রিশূল, পরশু, বহুবিধ সুতীক্ষ্ণ শক্তি; নির্ম্মল করবাল [তরোয়াল] এবং উগ্রদর্শন গদা এই সমস্ত অস্ত্র-শস্ত্র লইয়া অমৃতরক্ষার্থে সেইস্থানে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তাঁহারা এইরূপে স্ব স্ব অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক যুদ্ধার্থে সুসজ্জিত হইয়া সূর্য্যকিরণ বিকাশিত বিগলিতান্ধকার আকাশমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইয়াছিলেন।
গরুড় গজ-কচ্ছপ লইয়া বালখিল্য ঋষিগণের প্রাণরক্ষার্থে এইরূপে নানাদেশ ভ্রমণ করিলেন; কিন্তু কুত্রাপি উপবেশনের উপযুক্ত স্থান পাইলেন না। পরিশেষে গন্ধমাদন পর্ব্বতে উপনীত হইয়া স্বীয় পিতা মহর্ষি কশ্যপকে তপস্যায় অভিনিবিষ্ট দেখিলেন। ভগবান্ কশ্যপ সেই বলবীর্য্যতেজঃ সম্পন্ন, মন ও বায়ুসম বেগবান্, অচিন্তনীয়, অনভিভবনীয়, সর্ব্বভূতভয়ঙ্কর, প্রদীপ্ত অগ্নিশিখার ন্যায় সমুজ্জ্বল, অধৃষ্য, দুর্জ্জয়, সর্ব্বপর্ব্বতবিদারণক্ষম, সমুদ্রশোষণে সমর্থ, সর্ব্বলোকসংহারে পটু, কৃতান্তসম ভীমদর্শন, উত্তুঙ্গ [অতূ্যচ্চ] গিরিশৃঙ্গাকার, দিব্যরূপী, বিহঙ্গমরাজ গরুড়কে অভ্যাগত দেখিয়া এবং তাঁহার অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, “হে পুৎত্র! তুমি সহসা সাহসের কর্ম্ম করিও না, তাহাতে অশেষবিধ ক্লেশ পাইবার সম্ভাবনা। সূর্য্যমরীচিমাত্রপায়ী [সূর্যকিরণমাত্রসেবী] বালখিল্যগণ রোষপরবশ হইলে তোমাকে এইদণ্ডে ভস্মসাৎ করিবেন।” এই কথা বলিয়া মহর্ষি কশ্যপ পুৎত্রবাৎসল্যপ্রযুক্ত মহাভাগ বালখিল্য ঋষিদিগকে প্রসন্ন করিতে লাগিলেন। হে মহর্ষিগণ! প্রজাদিগের হিতোদ্দেশে গরুড় এই মহৎ কর্ম্ম সাধন করিতে অধ্যবসায় করিয়াছে, তোমরা অনুজ্ঞা কর।” বালখিল্যগণ মহর্ষি কশ্যপের অভ্যর্থনায় সেই বৃক্ষশাখা পরিত্যাগপূর্ব্বক তপশ্চরণার্থ পর্ব্বতশ্রেষ্ঠ পবিত্র হিমালয়ে প্রস্থান করিলেন।
বালখিল্য গমন করিলে বিনতানন্দন নিজ পিতা কশ্যপকে নিবেদন করিলেন, “ভগবন্! আমি এখন এই বিশাল বৃক্ষশাখা কোথায় নিক্ষেপ করি, আমাকে কোন নির্ম্মানুষ দেশ নির্দ্দেশ করিয়া দিন।” তখন কশ্যপ মানুষশূন্য নিরবচ্ছিন্ন তুষাররাশিসমাকীর্ণ এক পর্ব্বত কহিয়া দিলেন। পক্ষিরাজ শাখা ও গজ-কচ্ছপ লইয়া বায়ুবেগে সেই পর্ব্বত অভিমুখে যাত্রা করিলেন। গরুড় যে শাখা লইয়া গমন করিলেন, উহা এমত স্থুল যে, শতগোচর্ম্মনির্ম্মিত রজ্জু দ্বারাও বন্ধন বা বেষ্টন করা যায় না। পতগেশ্বর গরুড় অনতিবিলম্বে শতসহস্র যোজনান্তরে স্থির সেই মহাপর্ব্বতে উপনীত হইয়া পিতার আদেশানুসারে তদুপরি প্রকাণ্ড বৃক্ষশাখা নিক্ষেপ করিলেন। তদীয় পক্ষপবনে আহত হইয়া গিরিরাজ কম্পিত হইল, তরুগণ পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিল এবং যে-সকল মণিকাঞ্চনময় শৈলশৃঙ্গ পর্ব্বতের শোভা সম্পাদন করিত, তাহারা বিশীর্ণ হইয়া ইতস্ততঃ পতিত হইতে লাগিল। বৃক্ষশ্রেণী পরস্পরের শাখাঘাতে অভিহত হইয়া সৌদামিনীমণ্ডিত নবীন নীরদের ন্যায় কাঞ্চনময় কুসুমসমূহে সুশোভিত হইল। গৈরিকরাগরঞ্জিত পাদপ-সকল অবিরল ভূতলে পতিত হইয়া অপূর্ব্ব শোভাধারণ করিল। তৎপরে গরুড় সেই গিরিশৃঙ্গে উপবিষ্ট হইয়া গজ-কচ্ছপ ভক্ষণ করিলেন। খগরাজ এইরূপে সেই কূর্ম্ম ও কুঞ্জরকে উপযোগ করিয়া তথা হইতে মহাবেগে উড্ডীন হইলেন।
অনন্তর দেবতাদিগের উপর অতি ভয়ঙ্কর উৎপাত আরম্ভ হইল। ইন্দ্রের বজ্র ভয়ে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। অন্তরীক্ষ হইতে ধূম ও অগ্নিশিখার সহিত উল্কাপাত হইতে লাগিল। বসু, রুদ্র, আদিত্য, সাধ্য, মরুৎ ও অন্যান্য দেবগণের অস্ত্র সকল পরস্পর বিক্রম প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিল। দেবাসুর-সংগ্রামেও এরূপ অভূতপূর্ব্ব দুর্ঘটনা কদাচ ঘটে নাই। বায়ু প্রবলবেগে প্রবাহিত হইতে লাগিল, শত সহস্র উল্কাপাত হইতে লাগিল এবং মেঘশূন্য নভোণ্ডল অতি গভীররবে গর্জ্জন করিতে আরম্ভ করিল। অধিক কি বলিব, যিনি দেবাদিদেব [পর্জ্জন্যদেব] তিনিও অনবরত শোণিতবর্ষণ করিতে লাগিলেন। দেবতাদিগের গলদেশের মাল্য ম্লান ও তেজোরাশি ক্রমশঃ হ্রাস হইয়া গেল। প্রলয়কালীন অতিভীষণ মেঘের ন্যায় ঘনাবলী মুষলধারে রক্তবৃষ্টি করিতে লাগিল। ধূলিজাল গগনমার্গে উড্ডীন হইয়া দেবগণের মুকুটসকল প্রভাহীন করিল।
অনন্তর দেবরাজ ইন্দ্র ও সমস্ত দেবগণ এইরূপ অতি নিদারুণ উৎপাত দর্শনে ভীত ও বিস্মিত হইয়া বৃহস্পতিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ভগবন্! যুদ্ধে আমাদিগকে আক্রমণ করে, এরূপ শত্রু ত’ লক্ষ্য হয় না। তবে কোথা হইতে এতাদৃশ ঘোরতর উৎপাত সহসা উপস্থিত হইল?” বৃহস্পতি কহিলেন, “হে দেবেন্দ্র! তোমারই অপরাধ ও প্রমাদবশতঃ মহাত্মা বালখিল্যগণের তপোবলে বিনতাগর্ভে মহর্ষি কশ্যপের পক্ষিরূপী এক পুৎত্র জন্মিয়াছে। সেই কামরূপী মহাবল বিনতানন্দন অমৃতহরণে সমর্থ। তাহাতে সকলই সম্ভব হয়। সে অনায়াসে অসাধ্য সাধন করিতে পারে।”
ইন্দ্র তদীয় বাক্য শ্রবণ করিয়া অমৃতরক্ষকদিগকে আদেশ করিলেন, “মহাবীর্য্য মহাবল এক পক্ষী অমৃতহরণে উদ্যত হইয়াছে, আমি তোমাদিগকে সতর্ক করিয়া দিতেছি, দেখিও, যেন সে বলপূর্ব্বক অমৃত হরণ করিতে না পারে। বৃহস্পতি কহিয়াছেন, সে অতুল-বলশালী” তাহা শুনিয়া দেবতারা বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া অতি সাবধানে অমৃত বেষ্টন করিয়া রহিলেন এবং ইন্দ্রও বজ্রহস্ত হইয়া তথায় অবস্থান করিলেন। বিচিত্র বসন-ভূষণে বিভূষিত, পাপস্পর্শরহিত, নিরুপম, বলবীর্য্যসম্পন্ন, অসুরপুরবিদারণে পটু সুরগণ; কাঞ্চনময়, বৈদূর্য্যমণিময় ও চর্ম্মাত্মক, মহামূল্য প্রভাভাস্বর [তেজধারা দীপ্ত], সুদৃঢ় কবচ; তীক্ষ্ণধার ভয়ঙ্কর বিবিধ অস্ত্র-শস্ত্র; ধূম অগ্নি ও স্ফুলিঙ্গ [অগ্নিকণা] সহিত চক্র; পরিঘ, ত্রিশূল, পরশু, বহুবিধ সুতীক্ষ্ণ শক্তি; নির্ম্মল করবাল [তরোয়াল] এবং উগ্রদর্শন গদা এই সমস্ত অস্ত্র-শস্ত্র লইয়া অমৃতরক্ষার্থে সেইস্থানে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তাঁহারা এইরূপে স্ব স্ব অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক যুদ্ধার্থে সুসজ্জিত হইয়া সূর্য্যকিরণ বিকাশিত বিগলিতান্ধকার আকাশমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইয়াছিলেন।
একত্রিংশ অধ্যায়
গরুড়ের জন্মরহস্য
গরুড়ের জন্মরহস্য
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! ইন্দ্রের কি অপরাধ ও তাঁহার অনবধানতাই বা কিরূপ? বালখিলা ঋষিগণের তপঃপ্রভাবে গরুড়ের সম্ভব ও মহর্ষি কশ্যপের পক্ষিরূপী পুৎত্র, ইহারই বা কারণ কি? ঐ পক্ষিরাজ কিরূপে সর্ব্বভূতের অবধ্য, অনভিভবনীয়, কামবীর্য্য ও কামচারী হইলেন? আমার এই সকল বিষয় শ্রবণ করিতে নিতান্ত কৌতূহল জন্মিয়াছে, যদি পুরাণে বর্ণিত থাকে, কীর্ত্তন কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাশয়! আপনি আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, পুরাণে এই সমস্ত বর্ণিত আছে, আমি সংক্ষেপে কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। কোন সময়ে প্রজাপতি কশ্যপ পুৎত্রবাসনায় এক মহাযজ্ঞ আরম্ভ করেন। তাঁহার যজ্ঞানুষ্ঠানকালে ঋষিগণ, দেবগণ ও গন্ধর্ব্বগণ সাহায্যদান করিবার নিমিত্ত তথায় সমাগত হইয়াছিলেন। মহর্ষিকশ্যপ দেবরাজ ইন্দ্রকে এবং বাললিখ্য মুনগণ ও অন্যান্য দেবতাদিগকে যজ্ঞীয় কাষ্ঠভার আহরণ করিতে নিয়োগ করিলেন। ইন্দ্র আপন বীর্য্যানুরূপ প্রচুর কাষ্ঠভার আনয়নকালে পথিমধ্যে দেখিলেন, অঙ্গুষ্ঠ-প্রমাণ বালখিল্যগণ সকলে সমবেত হইয়া বহুকষ্টে একটি পত্রবৃন্ত আহরণ করিতেছেন। তাঁহারা অতি খর্ব্বাকৃতি, দুর্ব্বল ও নিরাহার; সুতরাং জলপূর্ণ এক গোষ্পদে মগ্ন হইয়া ক্লেশ পাইতেছিলেন। বলদৃপ্ত পুরন্দব্রতদ্দর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া তাঁহাদিগকে উপহাস ও অবমাননা করিলেন এবং লঙ্ঘন করিয়া অতি সত্বর-পদে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। ঋষিগণ এইরূপে অবমানিত হইয়া সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইলেন এবং ইন্দ্রের ভয়াবহ এক অতি মহৎ যজ্ঞ আরম্ভ করিলেন। তাঁহারা ঐ যজ্ঞে এই কামনায় আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন যে, আমাদিগের তপঃপ্রস্তাবে ইন্দ্র হইতে অধিকতর শৌর্য্যবীর্য্য-সম্পন্ন, কামরূপী, কামবীর্য্য, কামগামী, সর্ব্বদেবের অধিপতি অন্য এক দারুণ ইন্দ্র উৎপন্ন হউন।
দেবরাজ ইন্দ্র তাহা জানিতে পারিয়া প্রজাপতি কশ্যপের শরণাগত হইলেন। কশ্যপ ইন্দ্রেমুখে সমুদয় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া বালখিল্য মুনিগণের নিকট গমন করিয়া কার্য্যসিদ্ধির প্রার্থনা করিলেন। সত্যবাদী বালখিল্য মুনিগণ তৎক্ষণাৎ “অভীষ্টসিদ্ধি হইবে” এই কথা বলিলেন। তখন প্রজাপতি কশ্যপ তাঁহাদিগকে মধুর-সম্ভাষণে পরিতৃপ্ত করিয়া সাদর বচনে কহিতে লাগিলেন, “দেখ, ব্রহ্মার নিয়োগক্রমে ইনি ত্রিভুবনের ইন্দ্র হইয়াছেন, তোমরা আবার ইন্দ্রান্তর প্রার্থনা করিতেছ, তাহা করিলে ব্রহ্মার নিয়ম অন্যথা করা হইবে, কিন্তু তোমাদিগের সঙ্কল্প মিথ্যা হয়, ইহাও আমার অভিপ্রেত নহে; অতএব তোমরা যে ইন্দ্রের নিমিত্ত কামনা করিতেছ, তিনি পতগেন্দ্র হউন। হে ঋষিগণ! দেবরাজ প্রার্থনা করিতেছেন, তোমরা তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হও।” এইরূপ অভিহিত হইয়া বালখিল্যগণ কশ্যপকে যথাবিধি পূজা করিয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, “হে প্রজাপতে! আমরা ইন্দ্রার্থে এবং তোমার পুৎত্রার্থে এই মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছি, এক্ষণে এই কর্ম্মের ভার তোমার প্রতি অর্পিত হইল, তুমিই ইহা প্রতিগ্রহ করিয়া যাহা শ্রেয়স্কর হয়, করি।”
ঐকালে কল্যাণবতী, কীর্ত্তিমতী, ব্রতপরায়ণা, দক্ষসুতা বিনতা দীর্ঘকাল তপোনুষ্ঠান করণানন্তর ঋতুস্নান করিয়া পুৎত্র বাসনায় স্বামিসন্নিধানে আগমন করিলেন। মহর্ষি কশ্যপ বিনতাকে সন্নিহিতা দেখিয়া কহিলেন, “দেবি! অদ্য তোমার মনোরথ পূর্ণ হইবে, বালখিল্য মুনিগণের তপঃপ্রভাবে ও আমার সঙ্কল্পবলে তোমার গর্ভে মহাভাগ ও ভুবনবিজয়ী দুই বীর পুৎত্র জন্মিবে। তাহারা ত্রিভুবন-পূজিত ও ত্রিলোকীর অধীশ্বর হইবে। তুমি প্রমাদশূন্য হইয়া এই সুমহোদয় গর্ভধারণ কর। সর্ব্বলোক সৎকৃত কামরূপী ঐ দুই বিহঙ্গম সমস্ত পক্ষিজাতির উপর ইন্দ্রত্ব করিবে।” অনন্তর মহর্ষি কশ্যপ অতিপ্রীতমনে ইন্দ্রকে কহিলেন, “সেই দুই মহাবীর্য্য বিহঙ্গম তোমার ভ্রাতা ও সহায় হইবে এবং তাহারা তোমার কখন কোন অপচয় করিবে না। তোমার সকল সন্তাপ দূর হউক, তুমিই ইন্দ্র থাকিবে, কিন্তু হে বৎস! তুমি অহঙ্কারপরতন্ত্র হইয়া যেন আর কদাচ ব্রহ্মবাদী ঋষিদিগকে পরিহাস বা অবমাননা করিও না। তাঁহাদিগের বাক্য বজ্রস্বরূপ এবং তাঁহারা অতিশয় কোপনস্বভাব।”
দেবরাজ ইন্দ্র মহর্ষি কশ্যপ কর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া নিঃশঙ্কচিত্তে সুরলোকে প্রস্থান করিলেন। বিনতাও চরিতার্থ হইয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। পরে কশ্যপ-বনিতা বিনতা যথাকালে অরুণ ও গরুড় নামে দুই পুৎত্র প্রসব করিলেন। অরুণ অঙ্গবৈকল্য-প্রযুক্ত সূর্য্যের সারথি হইয়াছেন, তদীয় ভ্রাতা গরুড় পক্ষিগণের ইন্দ্রত্বপদে অভিষিক্ত হইয়াছেন। হে ভৃগুনন্দন! সেই বিনতানন্দন গরুড়ের অতি বিচিত্র চরিত্র কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাশয়! আপনি আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, পুরাণে এই সমস্ত বর্ণিত আছে, আমি সংক্ষেপে কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। কোন সময়ে প্রজাপতি কশ্যপ পুৎত্রবাসনায় এক মহাযজ্ঞ আরম্ভ করেন। তাঁহার যজ্ঞানুষ্ঠানকালে ঋষিগণ, দেবগণ ও গন্ধর্ব্বগণ সাহায্যদান করিবার নিমিত্ত তথায় সমাগত হইয়াছিলেন। মহর্ষিকশ্যপ দেবরাজ ইন্দ্রকে এবং বাললিখ্য মুনগণ ও অন্যান্য দেবতাদিগকে যজ্ঞীয় কাষ্ঠভার আহরণ করিতে নিয়োগ করিলেন। ইন্দ্র আপন বীর্য্যানুরূপ প্রচুর কাষ্ঠভার আনয়নকালে পথিমধ্যে দেখিলেন, অঙ্গুষ্ঠ-প্রমাণ বালখিল্যগণ সকলে সমবেত হইয়া বহুকষ্টে একটি পত্রবৃন্ত আহরণ করিতেছেন। তাঁহারা অতি খর্ব্বাকৃতি, দুর্ব্বল ও নিরাহার; সুতরাং জলপূর্ণ এক গোষ্পদে মগ্ন হইয়া ক্লেশ পাইতেছিলেন। বলদৃপ্ত পুরন্দব্রতদ্দর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া তাঁহাদিগকে উপহাস ও অবমাননা করিলেন এবং লঙ্ঘন করিয়া অতি সত্বর-পদে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। ঋষিগণ এইরূপে অবমানিত হইয়া সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইলেন এবং ইন্দ্রের ভয়াবহ এক অতি মহৎ যজ্ঞ আরম্ভ করিলেন। তাঁহারা ঐ যজ্ঞে এই কামনায় আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন যে, আমাদিগের তপঃপ্রস্তাবে ইন্দ্র হইতে অধিকতর শৌর্য্যবীর্য্য-সম্পন্ন, কামরূপী, কামবীর্য্য, কামগামী, সর্ব্বদেবের অধিপতি অন্য এক দারুণ ইন্দ্র উৎপন্ন হউন।
দেবরাজ ইন্দ্র তাহা জানিতে পারিয়া প্রজাপতি কশ্যপের শরণাগত হইলেন। কশ্যপ ইন্দ্রেমুখে সমুদয় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া বালখিল্য মুনিগণের নিকট গমন করিয়া কার্য্যসিদ্ধির প্রার্থনা করিলেন। সত্যবাদী বালখিল্য মুনিগণ তৎক্ষণাৎ “অভীষ্টসিদ্ধি হইবে” এই কথা বলিলেন। তখন প্রজাপতি কশ্যপ তাঁহাদিগকে মধুর-সম্ভাষণে পরিতৃপ্ত করিয়া সাদর বচনে কহিতে লাগিলেন, “দেখ, ব্রহ্মার নিয়োগক্রমে ইনি ত্রিভুবনের ইন্দ্র হইয়াছেন, তোমরা আবার ইন্দ্রান্তর প্রার্থনা করিতেছ, তাহা করিলে ব্রহ্মার নিয়ম অন্যথা করা হইবে, কিন্তু তোমাদিগের সঙ্কল্প মিথ্যা হয়, ইহাও আমার অভিপ্রেত নহে; অতএব তোমরা যে ইন্দ্রের নিমিত্ত কামনা করিতেছ, তিনি পতগেন্দ্র হউন। হে ঋষিগণ! দেবরাজ প্রার্থনা করিতেছেন, তোমরা তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হও।” এইরূপ অভিহিত হইয়া বালখিল্যগণ কশ্যপকে যথাবিধি পূজা করিয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, “হে প্রজাপতে! আমরা ইন্দ্রার্থে এবং তোমার পুৎত্রার্থে এই মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছি, এক্ষণে এই কর্ম্মের ভার তোমার প্রতি অর্পিত হইল, তুমিই ইহা প্রতিগ্রহ করিয়া যাহা শ্রেয়স্কর হয়, করি।”
ঐকালে কল্যাণবতী, কীর্ত্তিমতী, ব্রতপরায়ণা, দক্ষসুতা বিনতা দীর্ঘকাল তপোনুষ্ঠান করণানন্তর ঋতুস্নান করিয়া পুৎত্র বাসনায় স্বামিসন্নিধানে আগমন করিলেন। মহর্ষি কশ্যপ বিনতাকে সন্নিহিতা দেখিয়া কহিলেন, “দেবি! অদ্য তোমার মনোরথ পূর্ণ হইবে, বালখিল্য মুনিগণের তপঃপ্রভাবে ও আমার সঙ্কল্পবলে তোমার গর্ভে মহাভাগ ও ভুবনবিজয়ী দুই বীর পুৎত্র জন্মিবে। তাহারা ত্রিভুবন-পূজিত ও ত্রিলোকীর অধীশ্বর হইবে। তুমি প্রমাদশূন্য হইয়া এই সুমহোদয় গর্ভধারণ কর। সর্ব্বলোক সৎকৃত কামরূপী ঐ দুই বিহঙ্গম সমস্ত পক্ষিজাতির উপর ইন্দ্রত্ব করিবে।” অনন্তর মহর্ষি কশ্যপ অতিপ্রীতমনে ইন্দ্রকে কহিলেন, “সেই দুই মহাবীর্য্য বিহঙ্গম তোমার ভ্রাতা ও সহায় হইবে এবং তাহারা তোমার কখন কোন অপচয় করিবে না। তোমার সকল সন্তাপ দূর হউক, তুমিই ইন্দ্র থাকিবে, কিন্তু হে বৎস! তুমি অহঙ্কারপরতন্ত্র হইয়া যেন আর কদাচ ব্রহ্মবাদী ঋষিদিগকে পরিহাস বা অবমাননা করিও না। তাঁহাদিগের বাক্য বজ্রস্বরূপ এবং তাঁহারা অতিশয় কোপনস্বভাব।”
দেবরাজ ইন্দ্র মহর্ষি কশ্যপ কর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া নিঃশঙ্কচিত্তে সুরলোকে প্রস্থান করিলেন। বিনতাও চরিতার্থ হইয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। পরে কশ্যপ-বনিতা বিনতা যথাকালে অরুণ ও গরুড় নামে দুই পুৎত্র প্রসব করিলেন। অরুণ অঙ্গবৈকল্য-প্রযুক্ত সূর্য্যের সারথি হইয়াছেন, তদীয় ভ্রাতা গরুড় পক্ষিগণের ইন্দ্রত্বপদে অভিষিক্ত হইয়াছেন। হে ভৃগুনন্দন! সেই বিনতানন্দন গরুড়ের অতি বিচিত্র চরিত্র কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
গরুড়সহ দেবগণের যুদ্ধ
গরুড়সহ দেবগণের যুদ্ধ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে দ্বিজেন্দ্র! দেবতারা সকলে সমবেত হইয়া অতি সাবধানে অমৃত রক্ষা করিতেছেন, এই অবসরে গরুড় অতিসত্বর তাঁহাদিগের নিকট উপস্থিত হইলেন। দেবতারা সেই মহাবল গরুড়কে দেখিয়া ভীত ও কম্পিত হইলেন এবং আপনারাই পরস্পর অস্ত্রাঘাত করিতে লাগিলেন। তথায় অপ্রমেয়-বল ও অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল বিশ্বকর্ম্মাও অমৃতরক্ষার্থে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মুহূর্ত্তকাল গরুড়ের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিয়া পরিশেষে তদীয় পক্ষ, নখ ও চঞ্চুপুট দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত ও মূর্চ্ছিত হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন। পরে গগনচারী বিহগরাজ পক্ষপবনে ধূলিপ্রবাহ উত্থাপিত করিয়া সমস্ত লোক ও দেবগণকে আচ্ছন্ন করিলেন। দেবতারা ধূলিজালে আকীর্ণ হইয়া মোহপ্রাপ্ত হইলেন এবং তৎকালে অমৃতরক্ষকেরাও অন্ধপ্রায় হইলেন। এইরূপে গরুড় দেবলোক আলোড়িত করিয়া পক্ষতাড়ন ও তুণ্ডপ্রহারে দেবগণকে বিদীর্ণকলেবর করিলেন। তখন সহস্রলোচন ইন্দ্র পবনকে আদেশ করিলেন, “দেখ পবন! তুমি এই রজোবর্ষণ নিরাকরণ [অপসারণ, দূরীকরণ] কর, ইহা তোমারই কর্ম্ম।” বায়ু তৎক্ষণাৎ তাহা অপসারিত করিলেন।
অনন্তর অন্ধকার নিরস্ত হইলে দেবগণ পক্ষিরাজ গরুড়কে প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। সুরগণ বধ করিতে উদ্যত হইলে মহাবলপরাক্রান্ত গরুড় মহামেঘের ন্যায় সর্ব্বভূত-ভয়ঙ্কর ঘোরতর গর্জ্জন করিতে করিতে নভোমণ্ডলে উত্থিত হইলেন। দেবতারা গরুড়কে অন্তরীক্ষে আরূঢ় দেখিয়া পট্টিশ, পরিঘ,শূল, গদা, প্রজ্বলিত ক্ষুরপ্র ও সূর্য্যাকৃতি চক্র ইত্যাদি নানা শস্ত্র দ্বারা তাঁহাকে আকীর্ণ করিলেন।
পক্ষিরাজ গরুড় দেবগণ কর্ত্তৃক এইরূপে আহত হইয়াও তুমুল সংগ্রাম করিতে কিছুমাত্র বিচলিত বা সঙ্কুচিত হইলেন না; বরং পক্ষদ্বয়ও বক্ষঃস্থলের অধিকতর আঘাতে তাঁহাদিগকে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত করিলেন। সুরগণ এইরূপে গরুড়যুদ্ধে পরাভূত ও রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া পলায়ন করিতে লাগিলেন। গন্ধর্ব্ব ও সাধ্যগণ পূর্ব্বদিকে, রুদ্র ও বসুগণ দক্ষিণদিকে, আদিত্যগণ পশ্চিমদিকে এবং অশ্বিনীকুমার দুইজনে উত্তরদিকে প্রস্থান করিলেন।
অনন্তর পতগেন্দ্র গরুড় অশ্বক্রন্দ, রেণুক, ক্রথন, তপন, উলুক, শ্বসন, নিমেষ, প্ররুজ ও পুলিন এই সমস্ত যক্ষের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। প্রলয়কালে মহাদেব রোষপরবশ হইলে যেরূপ অতি ভীষণ হয়েন, বিনতানন্দনও সেইরূপ অত্যুগ্র হইয়া পক্ষ. নখ ও তুণ্ডাগ্র দ্বারা সকলকে ছিন্ন-ভিন্ন করিলেন। সেই মহাবল মহোৎসাহ বীরপুরুষেরা ক্ষত-বিক্ষত হইয়া রুধিরবর্ষী ধারাধরের [মেঘ] ন্যায় শোভমান হইলেন।
খগেশ্বর সেই সমস্ত যক্ষদিগের প্রাণ-সংহার করিয়া, যেস্থানে অমৃত রহিয়াছে, তথায় উপস্থিত হইলেন এবং দেখিলেন, অমৃতের চতুষ্পার্শ্বে অগ্নি প্রজ্বলিত হইতেছে। সেই অগ্নির শিখা অতি ভয়ঙ্কর এবং তদ্দ্বরা আকাশমণ্ডল আচ্ছন্ন হইয়াছে, দেখিলে বোধ হয় যেন, বিভাবসু বায়ু কর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়া সূর্য্যদেবকে দগ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। অনন্তর মহাত্মা গরুড় শতাধিক অষ্টসহস্র মুখ নির্গত করিলেন এবং ঐ সকল মুখ দ্বারা নদী পান করিয়া প্রবলবেগে তথায় আগমনপূর্ব্বক নদীজলে ঐ জ্বলন্ত অনল নির্ব্বাণ করিলেন। অগ্নি নির্ব্বাণ হইলে গরুড় তাহার মধ্যে প্রবেশ করিবার নিমিত্ত অন্য এক শরীর ধারণ করিলেন।
অনন্তর অন্ধকার নিরস্ত হইলে দেবগণ পক্ষিরাজ গরুড়কে প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। সুরগণ বধ করিতে উদ্যত হইলে মহাবলপরাক্রান্ত গরুড় মহামেঘের ন্যায় সর্ব্বভূত-ভয়ঙ্কর ঘোরতর গর্জ্জন করিতে করিতে নভোমণ্ডলে উত্থিত হইলেন। দেবতারা গরুড়কে অন্তরীক্ষে আরূঢ় দেখিয়া পট্টিশ, পরিঘ,শূল, গদা, প্রজ্বলিত ক্ষুরপ্র ও সূর্য্যাকৃতি চক্র ইত্যাদি নানা শস্ত্র দ্বারা তাঁহাকে আকীর্ণ করিলেন।
পক্ষিরাজ গরুড় দেবগণ কর্ত্তৃক এইরূপে আহত হইয়াও তুমুল সংগ্রাম করিতে কিছুমাত্র বিচলিত বা সঙ্কুচিত হইলেন না; বরং পক্ষদ্বয়ও বক্ষঃস্থলের অধিকতর আঘাতে তাঁহাদিগকে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত করিলেন। সুরগণ এইরূপে গরুড়যুদ্ধে পরাভূত ও রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া পলায়ন করিতে লাগিলেন। গন্ধর্ব্ব ও সাধ্যগণ পূর্ব্বদিকে, রুদ্র ও বসুগণ দক্ষিণদিকে, আদিত্যগণ পশ্চিমদিকে এবং অশ্বিনীকুমার দুইজনে উত্তরদিকে প্রস্থান করিলেন।
অনন্তর পতগেন্দ্র গরুড় অশ্বক্রন্দ, রেণুক, ক্রথন, তপন, উলুক, শ্বসন, নিমেষ, প্ররুজ ও পুলিন এই সমস্ত যক্ষের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। প্রলয়কালে মহাদেব রোষপরবশ হইলে যেরূপ অতি ভীষণ হয়েন, বিনতানন্দনও সেইরূপ অত্যুগ্র হইয়া পক্ষ. নখ ও তুণ্ডাগ্র দ্বারা সকলকে ছিন্ন-ভিন্ন করিলেন। সেই মহাবল মহোৎসাহ বীরপুরুষেরা ক্ষত-বিক্ষত হইয়া রুধিরবর্ষী ধারাধরের [মেঘ] ন্যায় শোভমান হইলেন।
খগেশ্বর সেই সমস্ত যক্ষদিগের প্রাণ-সংহার করিয়া, যেস্থানে অমৃত রহিয়াছে, তথায় উপস্থিত হইলেন এবং দেখিলেন, অমৃতের চতুষ্পার্শ্বে অগ্নি প্রজ্বলিত হইতেছে। সেই অগ্নির শিখা অতি ভয়ঙ্কর এবং তদ্দ্বরা আকাশমণ্ডল আচ্ছন্ন হইয়াছে, দেখিলে বোধ হয় যেন, বিভাবসু বায়ু কর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়া সূর্য্যদেবকে দগ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। অনন্তর মহাত্মা গরুড় শতাধিক অষ্টসহস্র মুখ নির্গত করিলেন এবং ঐ সকল মুখ দ্বারা নদী পান করিয়া প্রবলবেগে তথায় আগমনপূর্ব্বক নদীজলে ঐ জ্বলন্ত অনল নির্ব্বাণ করিলেন। অগ্নি নির্ব্বাণ হইলে গরুড় তাহার মধ্যে প্রবেশ করিবার নিমিত্ত অন্য এক শরীর ধারণ করিলেন।
ত্রয়স্ত্রিংশ অধ্যায়
গরুড়ের অমৃতহরণ-গরুড়ের বিষ্ণুবাহনত্বলাভ
গরুড়ের অমৃতহরণ-গরুড়ের বিষ্ণুবাহনত্বলাভ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, পক্ষিরাজ অতি ভয়ঙ্কর স্বর্ণময় কলেবর ধারণ করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং দেখিলেন, অমৃতের নিকট লৌহময় ক্ষুরের ন্যায় তীক্ষ্ণধার একখানি শাণিত চক্র নিরন্তর ভ্রমণ করিতেছে। অগ্নিতুল্য প্রদীপ্ত ও সূর্য্যসম তেজস্বী ঐ ঘোররূপ যন্ত্র অমৃতহরণার্থ আগত ব্যক্তিব্যূহের [ব্যুহাকারে সুরক্ষিত লোকদিগের] কণ্ঠনালী ছেদন করিবার নিমিত্ত নিম্মিত হইয়াছে। গরুড় অঙ্গসঙ্কোচপূর্ব্বক ক্ষণমাত্রেই তাহার মধ্যাবকাশ [মধ্যের সামান্য ফাঁক] দ্বারা প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, সেই চক্রের অধঃস্থলে জ্বলন্ত অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল, মহাবীর্য্য, মহাঘোর, নিয়ত ক্রুদ্ধ ও নির্নিমেষনেত্র দুই সর্প অমৃত রক্ষা করিতেছে। তাহাদিগের বিদ্যুতের ন্যায় মুখ হইতে অনবরত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতেছে এবং চক্ষুদ্বয় নিরন্তর বিষ উদ্গার করিতেছে। তাহাদিগের একতর যাহার প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করে, সে তৎক্ষণাৎ ভস্মসাৎ হইয়া যায়। তখন বিহঙ্গমরাজ ধূলিনিক্ষেপপূর্ব্বক ঐ উভয় সর্পের নয়নদ্বয় আচ্ছন্ন করিলেন এবং অদৃশ্যভাবে আকাশ হইতে তাহাদিগের কলেবর ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া অমৃতগ্রহণপূর্ব্বক অতি দ্রুতবেগে গগনমণ্ডলে উত্থিত হইলেন। কিন্তু তিনি স্বয়ং অমৃতপান না করিয়া সূর্য্যপ্রভা আবরণপূর্ব্বক অপরিশ্রান্তমনে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।
বিনতানন্দন অমৃত হরণ করিয়া আকাশপথে গমন করিতেছেন, এই অবসরে অবিনাশী দেবাদিদেব নারায়ণের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎকার হইল। নারায়ণ গরড়ের লোকাতিশায়িনী ক্রিয়া দর্শনে পরম সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে অভিলষিত বর প্রদান করিব।” গরুড় কহিলেন, “আমি আপনার উপরিভাগে অবস্থান করিতে বাসনা করি।” এই বলিয়া পুনর্ব্বার নারায়ণকে কহিলেন, “আর আমি যাহাতে অমৃতপান ব্যতিরেকে অজর ও অমর হইতে পারি, এইরূপ বর প্রদান করুন।” বিষ্ণু কহিলেন, “তোমার অভীষ্ট সিদ্ধ হউক।” তখন গরুড় আপনার অভিলষিত বরলাভ করিয়া নারায়ণকে কহিলেন, “ভগবন্! প্রার্থনা কর, আমিও তোমাকে বর প্রদান করিব।” নারায়ণ মহাবল গরুড়কে কহিলেন, “তুমিও আমার বাহন হও” এবং স্বপ্রদত্ত বরের অন্যথা না হয়, এইজন্য পুনর্ব্বার কহিলেন, “তোমাকে আমার রথের ধ্বজ হইয়া থাকিতে হইবে।” পতগেশ্বর “তথাস্তু” বলিয়া বায়ুবেগে গমন করিলেন।
দেবরাজ ইন্দ্র অমৃতাপহারক পক্ষীকে অন্তরীক্ষে গমন করিতে দেখিয়া রোষভরে বজ্র প্রহার করিলেন। গরুড় বজ্রাঘাতে আহত হইয়াও হাস্যমুখে কহিলেন, “দেখ দেবরাজ! বজ্রাঘাতে আমার কিছুমাত্র ব্যথা জন্মে নাই; কিন্তু যে মুনির অস্থি হইতে এই বজ্রের উৎপত্তি হইয়াছে, তাঁহার, বজ্রাস্ত্রের ও তোমার সম্মানের নিমিত্ত আমি একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিতেছি, এই পক্ষের অন্ত নাই।” এই বলিয়া পক্ষিরাজ একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিলেন। দেবগণ ঐ উৎসৃষ্ট পক্ষটি অতি সুন্দর দেখিয়া হৃষ্টমনে কহিলেন. “এই পর্ণ (অর্থাৎ পক্ষ) অতি সুন্দর, অতএব অদ্যাবধি গরুড়ের নাম সুপর্ণ হইল।” সহস্রাক্ষ ইন্দ্র এইরূপ অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার দর্শনে বিস্মিত হইয়া মনে করিলেন, এই পক্ষী সামান্য পক্ষী নহে, ইনি অবশ্যই কোন মহাপ্রাণী হইবেন। এইরূপ কল্পনা করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, “ওহে বিহঙ্গম! আমি তোমার অলৌকিক বলবীর্য্য জানিতে এবং অনন্ত কালের নিমিত্ত তোমার সহিত মিত্রত্ব সংস্থাপন করিতে বাসনা করি।”
বিনতানন্দন অমৃত হরণ করিয়া আকাশপথে গমন করিতেছেন, এই অবসরে অবিনাশী দেবাদিদেব নারায়ণের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎকার হইল। নারায়ণ গরড়ের লোকাতিশায়িনী ক্রিয়া দর্শনে পরম সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে অভিলষিত বর প্রদান করিব।” গরুড় কহিলেন, “আমি আপনার উপরিভাগে অবস্থান করিতে বাসনা করি।” এই বলিয়া পুনর্ব্বার নারায়ণকে কহিলেন, “আর আমি যাহাতে অমৃতপান ব্যতিরেকে অজর ও অমর হইতে পারি, এইরূপ বর প্রদান করুন।” বিষ্ণু কহিলেন, “তোমার অভীষ্ট সিদ্ধ হউক।” তখন গরুড় আপনার অভিলষিত বরলাভ করিয়া নারায়ণকে কহিলেন, “ভগবন্! প্রার্থনা কর, আমিও তোমাকে বর প্রদান করিব।” নারায়ণ মহাবল গরুড়কে কহিলেন, “তুমিও আমার বাহন হও” এবং স্বপ্রদত্ত বরের অন্যথা না হয়, এইজন্য পুনর্ব্বার কহিলেন, “তোমাকে আমার রথের ধ্বজ হইয়া থাকিতে হইবে।” পতগেশ্বর “তথাস্তু” বলিয়া বায়ুবেগে গমন করিলেন।
দেবরাজ ইন্দ্র অমৃতাপহারক পক্ষীকে অন্তরীক্ষে গমন করিতে দেখিয়া রোষভরে বজ্র প্রহার করিলেন। গরুড় বজ্রাঘাতে আহত হইয়াও হাস্যমুখে কহিলেন, “দেখ দেবরাজ! বজ্রাঘাতে আমার কিছুমাত্র ব্যথা জন্মে নাই; কিন্তু যে মুনির অস্থি হইতে এই বজ্রের উৎপত্তি হইয়াছে, তাঁহার, বজ্রাস্ত্রের ও তোমার সম্মানের নিমিত্ত আমি একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিতেছি, এই পক্ষের অন্ত নাই।” এই বলিয়া পক্ষিরাজ একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিলেন। দেবগণ ঐ উৎসৃষ্ট পক্ষটি অতি সুন্দর দেখিয়া হৃষ্টমনে কহিলেন. “এই পর্ণ (অর্থাৎ পক্ষ) অতি সুন্দর, অতএব অদ্যাবধি গরুড়ের নাম সুপর্ণ হইল।” সহস্রাক্ষ ইন্দ্র এইরূপ অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার দর্শনে বিস্মিত হইয়া মনে করিলেন, এই পক্ষী সামান্য পক্ষী নহে, ইনি অবশ্যই কোন মহাপ্রাণী হইবেন। এইরূপ কল্পনা করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, “ওহে বিহঙ্গম! আমি তোমার অলৌকিক বলবীর্য্য জানিতে এবং অনন্ত কালের নিমিত্ত তোমার সহিত মিত্রত্ব সংস্থাপন করিতে বাসনা করি।”
চতুস্ত্রিংশ অধ্যায়
ইন্দ্রের সহিত গরুড়ের মিত্রতা
ইন্দ্রের সহিত গরুড়ের মিত্রতা
গরুড় কহিলেন, “হে দেবরাজ! তোমার স্বেচ্ছাক্রমে অদ্যাবধি তোমার সহিত আমার মিত্রত্ব-সংস্থাপন হইল। আমার বল নিতান্ত দুঃসহ ও একান্ত মহৎ। যদিচ স্বকীয় গুণকীর্ত্তন ও বল-প্রশংসা করা পণ্ডিতমণ্ডলীর অনুমোদিত নহে, বিশেষতঃ অকারণে আত্মপ্রশংসা অতিশয় অন্যায়, তথাপি তুমি আমার সখা এবং আগ্রহাতিশয়সহকারে জিজ্ঞাসা করিতেছ, এই নিমিত্ত কহিতে প্রবৃত্ত হইলাম, শ্রবণ কর। আমার বলের কথা অধিক কি বলিব, আমি পর্ব্বতকাননাদিসহিতা এই সসাগরা বসুন্ধরাকে অক্লেশে একপক্ষে বহন করিতে পারি। আর যদি তুমি ঐ পক্ষ অবলম্বন কর, তবে তোমাকেও লইয়া যাইতে পারি। চরাচর বিশ্বকে বহন করিতে হইলেও আমার কিছুমাত্র পরিশ্রম বোধ হয় না।”
গরুড় এইরূপে স্বীয় বলের পরিচয় প্রদান করিলে সর্ব্বলোকহিতকারী দেবরাজ কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! তুমি যাহা কহিলে, তোমাতে সকলই সম্ভব; এক্ষণে আমার সহিত সখ্যসংস্থাপন কর এবং অমৃতে যদি প্রয়োজন না থাকে, তবে আমাকে প্রত্যর্পণ কর; এই অমৃত যাহাদিগকে অর্পণ করিবে, তাহারাই আমাদিগের উপর উপদ্রব করিবে।” গরুড় কহিলেন, “হে সহস্রলোচন! আমি কোন কারণবশতঃ এই অমৃত লইয়া যাইতেছি, প্রার্থনা করিলে ইহার বিন্দুমাত্রও কাহাকে প্রদান করিব না; কিন্তু আমি যেস্থানে ইহা রাখিব, তুমি তৎক্ষণাৎ তথা হইতে অপহরণ করিও।” ইন্দ্র কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! আমি তোমার এই কথা শ্রবণ করিয়া যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইলাম, এক্ষণে আমার নিকটে অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।” তখন গরুড় কদ্রুপুৎত্রদিগের দৌরাত্ম্য ও মাতার ছলকৃত দাসীভাব স্মরণ করিয়া কহিলেন, “আমি সকলের ঈশ্বর হইয়াও তোমার নিকট বর প্রার্থনা করিতেছি, যেন মহাবল সর্পসকল আমার ভক্ষ্য হয়।” দানবনিসূদন ইন্দ্র “তথাস্তু” বলিয়া দেবদেব যোগীশ্বর মহাত্মা হরির নিকট গমন করিলেন। চক্রপাণি দেবরাজ-মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া গরুড়াভিলষিত বিষয়ে অনুমোদন করিলেন।
গরুড় এইরূপে স্বীয় বলের পরিচয় প্রদান করিলে সর্ব্বলোকহিতকারী দেবরাজ কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! তুমি যাহা কহিলে, তোমাতে সকলই সম্ভব; এক্ষণে আমার সহিত সখ্যসংস্থাপন কর এবং অমৃতে যদি প্রয়োজন না থাকে, তবে আমাকে প্রত্যর্পণ কর; এই অমৃত যাহাদিগকে অর্পণ করিবে, তাহারাই আমাদিগের উপর উপদ্রব করিবে।” গরুড় কহিলেন, “হে সহস্রলোচন! আমি কোন কারণবশতঃ এই অমৃত লইয়া যাইতেছি, প্রার্থনা করিলে ইহার বিন্দুমাত্রও কাহাকে প্রদান করিব না; কিন্তু আমি যেস্থানে ইহা রাখিব, তুমি তৎক্ষণাৎ তথা হইতে অপহরণ করিও।” ইন্দ্র কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! আমি তোমার এই কথা শ্রবণ করিয়া যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইলাম, এক্ষণে আমার নিকটে অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।” তখন গরুড় কদ্রুপুৎত্রদিগের দৌরাত্ম্য ও মাতার ছলকৃত দাসীভাব স্মরণ করিয়া কহিলেন, “আমি সকলের ঈশ্বর হইয়াও তোমার নিকট বর প্রার্থনা করিতেছি, যেন মহাবল সর্পসকল আমার ভক্ষ্য হয়।” দানবনিসূদন ইন্দ্র “তথাস্তু” বলিয়া দেবদেব যোগীশ্বর মহাত্মা হরির নিকট গমন করিলেন। চক্রপাণি দেবরাজ-মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া গরুড়াভিলষিত বিষয়ে অনুমোদন করিলেন।
বিনতার দাস্যমুক্তি
অনন্তর ভগবান্ ত্রিদশেশ্বর গরুড়কে পুনর্ব্বার কহিলেন, “তুমি অমৃত স্থাপন করিলেই আমি তাহা অপহরণ করিব।” এই বলিয়া সাদর-সম্ভাষণে তাঁহাকে বিদায় দিলেন। গরুড় অনতিবিলম্বে স্বীয় জননী-সন্নিধানে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক হৃষ্টমনে সর্পদিগকে কহিলেন, “এই আমি অমৃত আহরণ করিয়াছি; এক্ষণে ইহা এই কুশের উপর রাখিতেছি, তোমরা শীঘ্র স্নানপূজা করিয়া পান কর। দেখ, তোমরা যাহা কহিয়াছিলে, তাহা আমি সম্পাদন করিলাম; অতএব অদ্যাবধি আমার মাতা দাস্যবৃত্তি হইতে মুক্ত হউন।” সর্পগণ “তথাস্তু” বলিয়া স্নান করিতে গমন করিল। এই অবসরে দেবরাজ ইন্দ্র অমৃত অপহরণ করিয়া স্বর্গে প্রস্থান করিলেন। সর্পেরা স্নান, পূজা ও মঙ্গলাচরণ সমাপন করিয়া প্রফুল্লমনে অমৃতপান করিতে আসিয়া দেখিল, গরুড় যে কুশাসনে অমৃত রাখিব বলিয়াছিলেন, তথায় অমৃত নাই। পরে বিবেচনা করিল, আমরা যেমন ছলক্রমে বিনতাকে দাসী করিয়াছিলাম, তেমনি ছলে অমৃত হরণ করিয়াছে। তখন নাগগণ এই স্থানে অমৃত রাখিয়াছিল, এই বিবেচনা করিয়া সেই কুশাসন অবলেহন করিতে লাগিল। তাহাতেই তাহাদিগের জিহ্বা দুই খণ্ডে বিভক্ত হইয়াছে এবং পরম পবিত্র অমৃত কুশে সংস্পৃষ্ট হইয়াছিল বলিয়া তদবধি কুশের নাম পবিত্র হইয়াছে। মহাত্মা গরুড় এইরূপে অমৃতের হরণ ও আহরণ করিয়াছিলেন এবং সর্পদিগকে দ্বিজিহ্ব [দুইটি জিহ্বাযুক্ত] করিয়াছিলেন।
অনন্তর খগরাজ পরিতুষ্ট-মনে সেই কাননে বিহার করিয়া ভুজঙ্গমগণ ভক্ষণপূর্ব্বক স্বীয় জননী বিনতাকে আনন্দিত করিলেন। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণগণ-সন্নিধানে এই অপূর্ব্ব উপাখ্যান শ্রবণ বা পাঠ করিবে, সে মহাত্মা খগরাজ গরুড়ের চরিত-কীর্ত্তন-প্রযুক্ত পাপস্পর্শশূন্য হইয়া স্বর্গারোহণ করিবে, সন্দেহ নাই।
অনন্তর খগরাজ পরিতুষ্ট-মনে সেই কাননে বিহার করিয়া ভুজঙ্গমগণ ভক্ষণপূর্ব্বক স্বীয় জননী বিনতাকে আনন্দিত করিলেন। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণগণ-সন্নিধানে এই অপূর্ব্ব উপাখ্যান শ্রবণ বা পাঠ করিবে, সে মহাত্মা খগরাজ গরুড়ের চরিত-কীর্ত্তন-প্রযুক্ত পাপস্পর্শশূন্য হইয়া স্বর্গারোহণ করিবে, সন্দেহ নাই।
বিনতার দাসীভাবপ্রাপ্তি, সূর্য্যের সরর্বসংহারক মূর্ত্তিধারণ, কদ্রু কর্ত্তৃক ইন্দ্রস্তব, ইন্দ্রের বারিবর্ষণ, বিনতার দাসীত্বমুক্তির উপায় অনুসন্ধান, অমৃত আহরণে গরুড়ের যাত্রা,
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
বিনতার দাসীভাবপ্রাপ্তি
বিনতার দাসীভাবপ্রাপ্তি
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কদ্রু ও বিনতা সমুদ্র অতিক্রম করিয়া অতিসত্বর তুরগ-সমীপে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, অশ্বটি শশাঙ্ক [চন্দ্র]-কিরণের ন্যায় শুভ্রবর্ণ, কেবল তাহার পুচ্ছদেশের কেশগুলি কৃষ্ণবর্ণ। তদবলোকনে বিনতা অতিমাত্র বিষণ্ণ হইলেন। পরে কদ্রু তাঁহার দাসীর কার্য্য করিতে আদেশ দিলেন। বিনতা পণে পরাজিতা হইয়াছেন, সুতরাং তাঁহাকে অগত্যা সপত্নীর দাস্যকর্ম্ম আশ্রয় করিতে হইল।
এই সময় গরুড় অবসর বুঝিয়া মাতার প্রযত্ন-ব্যতিরেকে স্বয়ং অণ্ডবিদারণপূর্ব্বক বহির্গত হইলেন। মহাসত্ত্ব, মহাবল সম্পন্ন, সৌদামিনীসমনেত্র, কামরূপ, কামবীর্য্য, কামচারী বিহঙ্গমরাজ প্রদীপ্ত হুতাশনরাশির ন্যায় স্বকীয় প্রভামণ্ডলে সহসা দশদিক্ আলোকময় করিয়া আকাশে আরোহণ ও ঘোরতর বিরাব [বিকট শব্দ] পরিত্যাগপূর্ব্বক ভয়ঙ্কর প্রকাণ্ড কলেবর ধারণ করিলেন। তাহা দেখিয়া দেবগণ ভীত ও বিস্মিত হইলেন। পরে তাঁহারা আসনস্থ বিশ্বরূপী ভগবান অগ্নির শরণাগত হইয়া যথাবিধি প্রণতিপূর্ব্বক অতি বিনীতবচনে কহিলেন, “হে হুতাশন! তুমি আর পরিবর্দ্ধিত হইও না, তুমি কি আমাদিগকে দগ্ধ করিতে ইচ্ছা করিয়াছ? ঐ দেখ, পর্ব্বতাকার প্রজ্বলিত অগ্নিরাশি ইতস্ততঃ প্রসূত হইতেছে।” অগ্নি কহিলেন, “হে অসুর-নিসূদন সুরগণ! তোমাদিগের আপাততঃ যাহা বোধ হইতেছে, উহা বস্তুতঃ সেরূপ নহে। আমার তুল্য তেজস্বী বলবান্ বিনতানন্দন গরুড় জন্মগ্রহণ করিয়া কলেবর বৃদ্ধি করিতেছেন; তাঁহার তেজোরাশি নিরীক্ষণ করিয়া তোমরা মোহাবিষ্ট হইয়াছ। ঐ নাগকুলান্তক কশ্যপাত্মজ সর্ব্বদা দেবতাদিগের হিতানুষ্ঠান ও দৈত্যরাক্ষসদিগের অনিষ্ট চেষ্টা করিবেন। অতএব তোমাদিগের কোন ভয় নাই, আইস, আমরা সমবেত হইয়া গরুড়ের নিকট যাই।”
অনন্তর দেবগণ ও ঋষিগণ তৎসন্নিধানে গমন করিয়া গরুড়কে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। “হে মহাভাগ পতগেশ্বর! তুমি ঋষি, তুমি দেব, তুমি প্রভু, তুমি সূর্য্য, তুমি প্রজাপতি, তুমি ব্রহ্মা, তুমি ইন্দ্র, তুমি হয়গ্রীব, তুমি শর, তুমি জগৎপতি, তুমি সুখ, তুমি দুঃখ, তুমি বিপ্র, তুমি অগ্নি, তুমি পবন, তুমি ধাতা, তুমি বিধাতা, তুমি বিষ্ণু, তুমি অমৃত, তুমি মহদ্যশঃ, তুমি প্রভা, তুমি আমাদের পরিত্রাণস্থান, তুমি বল, তুমি সাধু, তুমি মহাত্মা, তুমি সমৃদ্ধিমান্, তুমি অন্তক, তুমিই স্থিরাস্থির সমস্ত পদার্থ, তুমি অতি দুঃসহ, তুমি উত্তম, তুমি চরাচরস্বরূপ, হে প্রভূতকীর্ত্তে গরুড়! ভূত ভবিষ্যৎ ও বর্ত্তমান তোমা হইতেই ঘটিতেছে, তুমি স্বকরমণ্ডলে দিবাকরের শোভা প্রাপ্ত হইয়াছ, তুমি স্বকীয় প্রভাপুঞ্জে সূর্য্যের তেজোরাশি সমাক্ষিপ্ত করিতেছ, হে হুতাশনপ্রভ! তুমি কোপাবিষ্ট দিবাকরের ন্যায় প্রজাসকলকে দগ্ধ করিতেছ, তুমি সর্ব্বসংহারে উদ্যত যুগান্তবায়ুর ন্যায় নিতান্ত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করিয়াছ। আমরা মহাবল-পরাক্রান্ত, বিদ্যুৎসমানকান্তি, গগনবিহারী, অমিত-পরাক্রমশালী, খগকুলচূড়ামণি গরুড়ের শরণ লইলাম। হে জগৎপ্রভো! তোমার তপ্তসুবর্ণসম রমণীয় তেজোরাশি দ্বারা এই জগন্মণ্ডল নিরন্তর সন্তপ্ত হইতেছে। তুমি ভয়বিহ্বল ও বিমানারোহণপূর্ব্বক আকাশপথে ইতস্ততঃ পলায়মান সুরগণকে পরিত্রাণ কর। হে খগবর! তুমি পরমদয়ালু মহাত্মা কশ্যপের পুৎত্র, অতএব ক্রোধ সংবরণ করিয়া জগতের প্রতি দয়া প্রকাশ কর। তুমি ঈশ্বর, এক্ষণে ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক আমাদিগকে অনুকম্পা কর। আমরা বিষম বিপদে আক্রান্ত হইয়াছি। তোমার বজ্রনির্ঘোষ-সদৃশ ঘোররবে নভোমণ্ডল, দিঙ্মণ্ডল, দেবলোক, ভূলোক ও আমাদিগের হৃদয় সতত কম্পমান হইতেছে। তুমি অগ্নিতুল্য স্বীয় শরীরের সঙ্কোচ কর। কুপিত কৃতান্তের ন্যায় তোমার অতি ভীষণ কলেবর দর্শনে আমাদের মন ব্যথিত ও শঙ্কিত হইতেছে। হে ভগবান্ খগাধিপতে! প্রসন্ন হইয়া শরণাগতজনের সুখাবহ হও।”
এই সময় গরুড় অবসর বুঝিয়া মাতার প্রযত্ন-ব্যতিরেকে স্বয়ং অণ্ডবিদারণপূর্ব্বক বহির্গত হইলেন। মহাসত্ত্ব, মহাবল সম্পন্ন, সৌদামিনীসমনেত্র, কামরূপ, কামবীর্য্য, কামচারী বিহঙ্গমরাজ প্রদীপ্ত হুতাশনরাশির ন্যায় স্বকীয় প্রভামণ্ডলে সহসা দশদিক্ আলোকময় করিয়া আকাশে আরোহণ ও ঘোরতর বিরাব [বিকট শব্দ] পরিত্যাগপূর্ব্বক ভয়ঙ্কর প্রকাণ্ড কলেবর ধারণ করিলেন। তাহা দেখিয়া দেবগণ ভীত ও বিস্মিত হইলেন। পরে তাঁহারা আসনস্থ বিশ্বরূপী ভগবান অগ্নির শরণাগত হইয়া যথাবিধি প্রণতিপূর্ব্বক অতি বিনীতবচনে কহিলেন, “হে হুতাশন! তুমি আর পরিবর্দ্ধিত হইও না, তুমি কি আমাদিগকে দগ্ধ করিতে ইচ্ছা করিয়াছ? ঐ দেখ, পর্ব্বতাকার প্রজ্বলিত অগ্নিরাশি ইতস্ততঃ প্রসূত হইতেছে।” অগ্নি কহিলেন, “হে অসুর-নিসূদন সুরগণ! তোমাদিগের আপাততঃ যাহা বোধ হইতেছে, উহা বস্তুতঃ সেরূপ নহে। আমার তুল্য তেজস্বী বলবান্ বিনতানন্দন গরুড় জন্মগ্রহণ করিয়া কলেবর বৃদ্ধি করিতেছেন; তাঁহার তেজোরাশি নিরীক্ষণ করিয়া তোমরা মোহাবিষ্ট হইয়াছ। ঐ নাগকুলান্তক কশ্যপাত্মজ সর্ব্বদা দেবতাদিগের হিতানুষ্ঠান ও দৈত্যরাক্ষসদিগের অনিষ্ট চেষ্টা করিবেন। অতএব তোমাদিগের কোন ভয় নাই, আইস, আমরা সমবেত হইয়া গরুড়ের নিকট যাই।”
অনন্তর দেবগণ ও ঋষিগণ তৎসন্নিধানে গমন করিয়া গরুড়কে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। “হে মহাভাগ পতগেশ্বর! তুমি ঋষি, তুমি দেব, তুমি প্রভু, তুমি সূর্য্য, তুমি প্রজাপতি, তুমি ব্রহ্মা, তুমি ইন্দ্র, তুমি হয়গ্রীব, তুমি শর, তুমি জগৎপতি, তুমি সুখ, তুমি দুঃখ, তুমি বিপ্র, তুমি অগ্নি, তুমি পবন, তুমি ধাতা, তুমি বিধাতা, তুমি বিষ্ণু, তুমি অমৃত, তুমি মহদ্যশঃ, তুমি প্রভা, তুমি আমাদের পরিত্রাণস্থান, তুমি বল, তুমি সাধু, তুমি মহাত্মা, তুমি সমৃদ্ধিমান্, তুমি অন্তক, তুমিই স্থিরাস্থির সমস্ত পদার্থ, তুমি অতি দুঃসহ, তুমি উত্তম, তুমি চরাচরস্বরূপ, হে প্রভূতকীর্ত্তে গরুড়! ভূত ভবিষ্যৎ ও বর্ত্তমান তোমা হইতেই ঘটিতেছে, তুমি স্বকরমণ্ডলে দিবাকরের শোভা প্রাপ্ত হইয়াছ, তুমি স্বকীয় প্রভাপুঞ্জে সূর্য্যের তেজোরাশি সমাক্ষিপ্ত করিতেছ, হে হুতাশনপ্রভ! তুমি কোপাবিষ্ট দিবাকরের ন্যায় প্রজাসকলকে দগ্ধ করিতেছ, তুমি সর্ব্বসংহারে উদ্যত যুগান্তবায়ুর ন্যায় নিতান্ত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করিয়াছ। আমরা মহাবল-পরাক্রান্ত, বিদ্যুৎসমানকান্তি, গগনবিহারী, অমিত-পরাক্রমশালী, খগকুলচূড়ামণি গরুড়ের শরণ লইলাম। হে জগৎপ্রভো! তোমার তপ্তসুবর্ণসম রমণীয় তেজোরাশি দ্বারা এই জগন্মণ্ডল নিরন্তর সন্তপ্ত হইতেছে। তুমি ভয়বিহ্বল ও বিমানারোহণপূর্ব্বক আকাশপথে ইতস্ততঃ পলায়মান সুরগণকে পরিত্রাণ কর। হে খগবর! তুমি পরমদয়ালু মহাত্মা কশ্যপের পুৎত্র, অতএব ক্রোধ সংবরণ করিয়া জগতের প্রতি দয়া প্রকাশ কর। তুমি ঈশ্বর, এক্ষণে ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক আমাদিগকে অনুকম্পা কর। আমরা বিষম বিপদে আক্রান্ত হইয়াছি। তোমার বজ্রনির্ঘোষ-সদৃশ ঘোররবে নভোমণ্ডল, দিঙ্মণ্ডল, দেবলোক, ভূলোক ও আমাদিগের হৃদয় সতত কম্পমান হইতেছে। তুমি অগ্নিতুল্য স্বীয় শরীরের সঙ্কোচ কর। কুপিত কৃতান্তের ন্যায় তোমার অতি ভীষণ কলেবর দর্শনে আমাদের মন ব্যথিত ও শঙ্কিত হইতেছে। হে ভগবান্ খগাধিপতে! প্রসন্ন হইয়া শরণাগতজনের সুখাবহ হও।”
চতুর্ব্বিংশ অধ্যায়
সূর্য্যের সরর্বসংহারক মূর্ত্তিধারণ
সূর্য্যের সরর্বসংহারক মূর্ত্তিধারণ
গরুড় দেবতা ও ঋষিদিগের এইরূপ স্তুতিবাদ শ্রবণ করিয়া এবং আপনার অতি প্রকাণ্ড কলেবর অবলোকন করিয়া স্বীয় তেজঃপুঞ্জের প্রতিসংহার করিলেন এবং কহিলেন, “আমি আত্মতেজের সঙ্কোচ করিতেছি, আর কাহাকেও ভীত হইতে হইবে না।” এই বলিয়া বিহঙ্গরাজ গরুড় অরুণকে আত্মপৃষ্ঠে আরোহণ করাইয়া পিতৃগৃহ হইতে সমুদ্রের অপরপারবর্ত্তিনী স্বীয় জননীর সন্নিধানে গমন করিলেন। ঐ সময় সূর্য্যদেব দেবতাদিগের প্রতি কূপিত হইয়া প্রখর করজাল বিস্তারপূর্ব্বক ত্রিলোকী দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছেন দেখিয়া খগরাজ স্বীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা অরুণকে পূর্ব্বদিকে স্থাপন করিলেন।
রুরু কহিলেন, “সূর্য্য কি নিমিত্তে ত্রিলোক দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন এবং দেবতারাই বা তাঁহার কি অপকার করিয়াছিলেন যে, তিনি তাঁহাদিগের প্রতি এইরূপ কুপিত হইলেন?” প্রমতি কহিলেন, “যৎকালে চন্দ্র ও সূর্য্য রাহুকে প্রচ্ছন্নভাবে অমৃত পান করিতে দেখিয়া দেবতাদিগের নিকট প্রকাশ করিয়া দেন, তদবধি তাঁহাদিগের সহিত রাহুর বৈরানুবন্ধ হওয়াতে ঐ ক্রুরগ্রহ রাহু মধ্যে মধ্যে সূর্য্যদেবকে গ্রাস করিত। পরে ভগবান্ সূর্য্য এই অভিপ্রায়ে রোষাবিষ্ট হইলেন যে, আমি দেবতাদিগেরই হিতানুষ্ঠানের নিমিত্ত রাহুর কোপে পড়িলাম এবং তজ্জন্য কেবল আমিই একাকী বহু অনর্থকর পাপের ফলভাগী হইলাম, বিপৎকালে কাহাকেও সাহায্য করিতে দেখি না। রাহু যখন আমাকে গ্রাস করে, দেবতারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াও তাহা অনায়াসে সহ্য করিয়া থাকে; অতএব আমি অদ্য সমস্ত লোক বিনাশ করিব, সন্দেহ নাই। দিবাকর এইরূপ অভিসন্ধি করিয়া অস্তাচল চূড়াবলম্বী হইলেন এবং বিশ্বসংসার সংহার করিবার মানসে স্বকীয় তেজোরাশি পরিবর্দ্ধিত করিতে লাগিলেন। তদনন্তর মহর্ষিগণ দেবতাদিগের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, “অদ্য নিশীথসময়ে সর্ব্বলোকভয়াবহ মহাদাহ আরম্ভ হইবে।”
তখন দেবগণ মহর্ষিদিগের সমভিব্যাহারে সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার নিকট উপনীত হইয়া বিনীতবচনে নিবেদন করিলেন, “ভগবান্! কোথা হইতে ভয়ঙ্কর মহাদাহ উপস্থিত হইল? সূর্য্য লক্ষিত হইতেছে না, অথচ সর্ব্বলোকক্ষয় উপস্থিত। না জানি, সূর্য উদিত হইলে কি দুর্দ্দশা ঘটিবে।” পিতামহ কহিলেন, “দিবাকর সর্ব্বসংহারে উদ্যত হইয়াছেন। তিনি উদিত হইয়া ক্ষণকালমধ্যেই আমাদিগের সমক্ষে সমস্ত লোক ভস্মসাৎ করিবেন; কিন্তু ইতিপূর্ব্বেই আমি ইহার প্রতি বিধান করিয়া রাখিয়াছি। মহাত্মা কশ্যপের অরুণ নামে এক মহাবীর্য্যসম্পন্ন পুৎত্র জন্মিয়াছে। সে সূর্য্যের সম্মুখে থাকিয়া তাঁহার সারথ্য-কার্য্য করিবে এবং তদীয় তেজঃ প্রতিসংহার করিবে; তাহা হইলেই দেবগণ, ঋষিগণ ও সমস্ত লোকের মঙ্গললাভের সম্ভাবনা।” প্রমতি কহিলেন, “তদনন্তর অরুণ পিতামহের আদেশানুসারে সূর্য্য উদিত হইলেই তাঁহাকে আবরণ করিয়া তদীয় সম্মুখে উপবিষ্ট রহিলেন। সূর্য্যদেব যে কারণে কোপাক্রান্ত হইয়াছিলেন এবং অরুণ যে নিমিত্ত তাঁহার সারথ্য-স্বীকার করেন, তাহা আদ্যোপান্ত সমুদয় কীর্ত্তন করিলাম। এক্ষণে পূর্ব্বোল্লিখিত প্রশ্নের প্রত্যুত্তর প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর।
রুরু কহিলেন, “সূর্য্য কি নিমিত্তে ত্রিলোক দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন এবং দেবতারাই বা তাঁহার কি অপকার করিয়াছিলেন যে, তিনি তাঁহাদিগের প্রতি এইরূপ কুপিত হইলেন?” প্রমতি কহিলেন, “যৎকালে চন্দ্র ও সূর্য্য রাহুকে প্রচ্ছন্নভাবে অমৃত পান করিতে দেখিয়া দেবতাদিগের নিকট প্রকাশ করিয়া দেন, তদবধি তাঁহাদিগের সহিত রাহুর বৈরানুবন্ধ হওয়াতে ঐ ক্রুরগ্রহ রাহু মধ্যে মধ্যে সূর্য্যদেবকে গ্রাস করিত। পরে ভগবান্ সূর্য্য এই অভিপ্রায়ে রোষাবিষ্ট হইলেন যে, আমি দেবতাদিগেরই হিতানুষ্ঠানের নিমিত্ত রাহুর কোপে পড়িলাম এবং তজ্জন্য কেবল আমিই একাকী বহু অনর্থকর পাপের ফলভাগী হইলাম, বিপৎকালে কাহাকেও সাহায্য করিতে দেখি না। রাহু যখন আমাকে গ্রাস করে, দেবতারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াও তাহা অনায়াসে সহ্য করিয়া থাকে; অতএব আমি অদ্য সমস্ত লোক বিনাশ করিব, সন্দেহ নাই। দিবাকর এইরূপ অভিসন্ধি করিয়া অস্তাচল চূড়াবলম্বী হইলেন এবং বিশ্বসংসার সংহার করিবার মানসে স্বকীয় তেজোরাশি পরিবর্দ্ধিত করিতে লাগিলেন। তদনন্তর মহর্ষিগণ দেবতাদিগের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, “অদ্য নিশীথসময়ে সর্ব্বলোকভয়াবহ মহাদাহ আরম্ভ হইবে।”
তখন দেবগণ মহর্ষিদিগের সমভিব্যাহারে সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার নিকট উপনীত হইয়া বিনীতবচনে নিবেদন করিলেন, “ভগবান্! কোথা হইতে ভয়ঙ্কর মহাদাহ উপস্থিত হইল? সূর্য্য লক্ষিত হইতেছে না, অথচ সর্ব্বলোকক্ষয় উপস্থিত। না জানি, সূর্য উদিত হইলে কি দুর্দ্দশা ঘটিবে।” পিতামহ কহিলেন, “দিবাকর সর্ব্বসংহারে উদ্যত হইয়াছেন। তিনি উদিত হইয়া ক্ষণকালমধ্যেই আমাদিগের সমক্ষে সমস্ত লোক ভস্মসাৎ করিবেন; কিন্তু ইতিপূর্ব্বেই আমি ইহার প্রতি বিধান করিয়া রাখিয়াছি। মহাত্মা কশ্যপের অরুণ নামে এক মহাবীর্য্যসম্পন্ন পুৎত্র জন্মিয়াছে। সে সূর্য্যের সম্মুখে থাকিয়া তাঁহার সারথ্য-কার্য্য করিবে এবং তদীয় তেজঃ প্রতিসংহার করিবে; তাহা হইলেই দেবগণ, ঋষিগণ ও সমস্ত লোকের মঙ্গললাভের সম্ভাবনা।” প্রমতি কহিলেন, “তদনন্তর অরুণ পিতামহের আদেশানুসারে সূর্য্য উদিত হইলেই তাঁহাকে আবরণ করিয়া তদীয় সম্মুখে উপবিষ্ট রহিলেন। সূর্য্যদেব যে কারণে কোপাক্রান্ত হইয়াছিলেন এবং অরুণ যে নিমিত্ত তাঁহার সারথ্য-স্বীকার করেন, তাহা আদ্যোপান্ত সমুদয় কীর্ত্তন করিলাম। এক্ষণে পূর্ব্বোল্লিখিত প্রশ্নের প্রত্যুত্তর প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর।
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
কদ্রু কর্ত্তৃক ইন্দ্রস্তব
কদ্রু কর্ত্তৃক ইন্দ্রস্তব
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, “তৎপরে মহাবলপরাক্রান্ত কামচারী বিহঙ্গমরাজ গরুড় সমুদ্রের অপরপারস্থ স্বকীয় জননী-সন্নিধানে গমন করিলেন। তথায় তাঁহার মাতা বিনতা পণে পরাজিতা হইয়া আপন সপত্নীর দাস্যবৃত্তি অবলম্বনপূর্ব্বক দুঃসহ দুঃখে কালক্ষেপ করিতেছিলেন। একদা বিনতা পুৎত্রের নিকট উপবিষ্টা আছেন, এমত সময়ে কদ্রু তাঁহাকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, “দেখ বিনতে! সমুদ্রের মধ্যে এক পরম রমণীয় দ্বীপ আছে, ঐ দ্বীপে নাগগণ বাস করে, তথায় আমাকে লইয়া চল।” বিনতা আজ্ঞাপ্রাপ্তিমাত্রে কদ্রুকে পৃষ্ঠদেশে আরোহণ করাইয়া চলিলেন এবং গরুড়ও মাতৃনির্দ্দেশক্রমে কদ্রুপুৎত্র নাগগণকে পৃষ্ঠে লইয়া তাঁহার অনুসরণ করিলেন। বিনতানন্দন গরুড় সূর্য্যাভিমুখে গমন করাতে পন্নগগণ দুঃসহ তপনতাপে অত্যন্ত সন্তপ্ত হইয়া মূর্চ্ছিত হইতে লাগিল।
কদ্রু স্বীয় পুৎত্রদিগের তাদৃশ দুরবস্থা দেখিয়া বৃষ্টিবাসনায় সুরপতি ইন্দ্রকে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। “হে শচীপতে সহস্রলোচন দেবরাজ! তুমি বল, নমুচি ও বৃত্রাসুরকে নষ্ট করিয়াছ। এক্ষণ তোমাকে নমস্কার করি। প্রচণ্ড-রবিকিরণসন্তপ্ত মদীয় পুৎত্রদিগের উপর বারিবর্ষণ কর। হে সুরপতে! সম্প্রতি তোমা ব্যতিরেকে আমাদিগের প্রাণরক্ষার আর কোন উপায়ান্তর নাই; যেহেতু, তুমিই প্রচুর বারিবর্ষণ করিতে সমর্থ। তুমি বায়ু, তুমি মেঘ, তুমি অগ্নি, তুমি গগন মণ্ডলে সৌদামিনীরূপে প্রকাশমান হও এবং তোমা হইতেই ঘনাবলী পরিচালিত হইয়া থাকে; তোমাকেই লোকে মহামেঘ বলিয়া নির্দ্দেশ করে; তুমিই ঘোর ও প্রকাণ্ড বজ্র জ্যোতিঃস্বরূপ, তুমি আদিত্য, তুমি বিভাবসু, তুমি অত্যাশ্চর্য্য মহাভূত, তুমি নিখিল দেবগণের অধিপতি, তুমি বিষ্ণু, তুমি সহস্রাক্ষ, তুমি দেব, তুমি পরমগতি, তুমি অক্ষয় অমৃত, তুমি পরমপূজিত, সৌম্যমূর্ত্তি, তুমি মুহূর্ত্ত, তুমি তিথি, তুমি বল, তুমি ক্ষণ, তুমি শুক্লপক্ষ, তুমি কৃষ্ণপক্ষ, তুমি কলা, কাষ্ঠা, ত্রুটি, মাস,ঋতু, সংবৎসর ও অহোরাত্র; তুমি সমস্থ পর্ব্বত ও বন সমাকীর্ণা বসুন্ধরা; তুমি তিমিরবিরহিত ও সূর্য্যসংস্কৃত আকাশ, তুমি তিমি-তিমিঙ্গিলসহিত ও উত্তুঙ্গতরঙ্গ-কুলসঙ্কল মহার্ণব, তুমি অতি যশস্বী, এই নিমিত্তই প্রতিভাসম্পন্ন মহর্ষিগণ প্রশান্তমনে তোমার আরাধনা করিয়া থাকেন। আর তুমি স্তবে পরিতুষ্ট হইয়া যজমানের হিতসাধনার্থে যজ্ঞীয় পবিত্র হবিঃ ও সোমরস পান করিয়া থাক। ব্রাহ্মণেরা একমাত্র পারত্রিক শুভলাভের প্রত্যাশায় সতত তোমার উপাসনা করিয়া থাকেন। হে বিপুলবিক্রমশালিন্! অখিল বেদ বেদাঙ্গ তোমারই অচিন্তনীয় অনন্ত মহিমা কীর্ত্তন করে এবং যজ্ঞপরায়ণ দ্বিজাতিগণ তোমার স্বরূপ অবধারণের নিমিত্ত প্রযত্ন-সহকারে সতত সে সকল বেদ-বেদাঙ্গের মীমাংসা করিয়া থাকেন।
কদ্রু স্বীয় পুৎত্রদিগের তাদৃশ দুরবস্থা দেখিয়া বৃষ্টিবাসনায় সুরপতি ইন্দ্রকে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। “হে শচীপতে সহস্রলোচন দেবরাজ! তুমি বল, নমুচি ও বৃত্রাসুরকে নষ্ট করিয়াছ। এক্ষণ তোমাকে নমস্কার করি। প্রচণ্ড-রবিকিরণসন্তপ্ত মদীয় পুৎত্রদিগের উপর বারিবর্ষণ কর। হে সুরপতে! সম্প্রতি তোমা ব্যতিরেকে আমাদিগের প্রাণরক্ষার আর কোন উপায়ান্তর নাই; যেহেতু, তুমিই প্রচুর বারিবর্ষণ করিতে সমর্থ। তুমি বায়ু, তুমি মেঘ, তুমি অগ্নি, তুমি গগন মণ্ডলে সৌদামিনীরূপে প্রকাশমান হও এবং তোমা হইতেই ঘনাবলী পরিচালিত হইয়া থাকে; তোমাকেই লোকে মহামেঘ বলিয়া নির্দ্দেশ করে; তুমিই ঘোর ও প্রকাণ্ড বজ্র জ্যোতিঃস্বরূপ, তুমি আদিত্য, তুমি বিভাবসু, তুমি অত্যাশ্চর্য্য মহাভূত, তুমি নিখিল দেবগণের অধিপতি, তুমি বিষ্ণু, তুমি সহস্রাক্ষ, তুমি দেব, তুমি পরমগতি, তুমি অক্ষয় অমৃত, তুমি পরমপূজিত, সৌম্যমূর্ত্তি, তুমি মুহূর্ত্ত, তুমি তিথি, তুমি বল, তুমি ক্ষণ, তুমি শুক্লপক্ষ, তুমি কৃষ্ণপক্ষ, তুমি কলা, কাষ্ঠা, ত্রুটি, মাস,ঋতু, সংবৎসর ও অহোরাত্র; তুমি সমস্থ পর্ব্বত ও বন সমাকীর্ণা বসুন্ধরা; তুমি তিমিরবিরহিত ও সূর্য্যসংস্কৃত আকাশ, তুমি তিমি-তিমিঙ্গিলসহিত ও উত্তুঙ্গতরঙ্গ-কুলসঙ্কল মহার্ণব, তুমি অতি যশস্বী, এই নিমিত্তই প্রতিভাসম্পন্ন মহর্ষিগণ প্রশান্তমনে তোমার আরাধনা করিয়া থাকেন। আর তুমি স্তবে পরিতুষ্ট হইয়া যজমানের হিতসাধনার্থে যজ্ঞীয় পবিত্র হবিঃ ও সোমরস পান করিয়া থাক। ব্রাহ্মণেরা একমাত্র পারত্রিক শুভলাভের প্রত্যাশায় সতত তোমার উপাসনা করিয়া থাকেন। হে বিপুলবিক্রমশালিন্! অখিল বেদ বেদাঙ্গ তোমারই অচিন্তনীয় অনন্ত মহিমা কীর্ত্তন করে এবং যজ্ঞপরায়ণ দ্বিজাতিগণ তোমার স্বরূপ অবধারণের নিমিত্ত প্রযত্ন-সহকারে সতত সে সকল বেদ-বেদাঙ্গের মীমাংসা করিয়া থাকেন।
ষড়্বিংশ অধ্যায়
ইন্দ্রের বারিবর্ষণ
ইন্দ্রের বারিবর্ষণ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দেবরাজ ইন্দ্র কদ্রুকৃত স্তব শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া নীলবর্ণ জলদজালে দিঙ্মণ্ডল আচ্ছন্ন করিলেন এবং মেঘদিগকে অনবরত মুষলধারে বারিবর্ষণ করিতে আদেশ দিলেন। জলদগণ ইন্দ্রের আদেশ পাইয়া ঘোরতর গভীর গর্জ্জনপূর্ব্বক মুহুর্মুহুঃ সৌদামিনীস্ফুরণ ও প্রচুর বারিবর্ষণ করিতে লাগিল। তৎকালে বোধ হইল যেন, আকাশে প্রলয়কাল উপস্থিত হইয়াছে কিংবা মেঘনির্ঘোষ, বিদ্যুৎ প্রকাশ ও বাহুচালিত নীরধারা দ্বারা যেন আকাশমণ্ডল নৃত্য করিতেছে। সেই মেঘাচ্ছন্ন দুর্দ্দিনে চন্দ্র-সূর্য্য এককালে অন্তর্হিত হইলেন। তখন নাগগণ যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইল। বিশ্বমণ্ডলী সলিলভারে মগ্নপ্রায় হইল। সুশীতল বিমল জলধারা রসাতলে প্রবিষ্ট হইতে লাগিল। পরিশেষে সর্পগণ মাতার সহিত রামণীয়কদ্বীপে উপনীত হইল।
সপ্তবিংশ অধ্যায়
বিনতার দাসীত্বমুক্তির উপায় অনুসন্ধান
বিনতার দাসীত্বমুক্তির উপায় অনুসন্ধান
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগগণ প্রচুর জলধারায় অভিষিক্ত হইয়া অতি প্রহৃষ্টমনে সুপর্ণ [গরুড়] পৃষ্ঠে আরোহণপূর্ব্বক সেই মকর সমূহের আকর-ভূমি, বিশ্বকর্ম্মবিরচিত রামণীয়কদ্বীপে উপনীত হইল; তথায় যাইয়া প্রথমতঃ অতি ভয়ঙ্কর লবণ-মহার্ণব অবলোকন করিল; পরে সেই দ্বীপের অন্তর্ব্বর্ত্তী পরমশোভাকর এক পবিত্র কাননে প্রবেশ করিয়া বিহার করিতে লাগিল। ঐ কানন সাগর-জলে নিরন্তর অভিষিক্ত হইতেছে; উহাতে বহুবিধ বিহঙ্গমগণ সর্ব্বদা মধুরস্বরে কলরব করিতেছে; বৃক্ষশ্রেণী নিরন্তর ফল-পুষ্পে সুশোভিত রহিয়াছে; ঘন-সন্নিবিষ্ট তরুরাজি, সুরম্য হর্ম্ম্য [অট্টালিকা] পদ্মাকর [যেখানে পদ্ম জন্মে] সরোবর ও স্বচ্ছসলিলপূর্ণ অলৌকিক হ্রদসমূহ সর্ব্বদা উহার অপূর্ব্ব শোভা সম্পাদন করিতেছে; তথায় সুগন্ধ সমীরণ অনুক্ষণ ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতেছে; অত্যুন্নত চন্দন ও অন্যান্য বহুবিধ বৃক্ষগণ সতত বিরাজিত রহিয়াছে; ঐ সকল বৃক্ষ বায়ুবেগ-সহকারে বিকম্পিত হইয়া অবিরত পুষ্পবর্ষণ করিতেছে; মধুকরগণ মধুগন্ধে অন্ধ হইয়া মৃদু মধুরবে আগন্তুক ব্যক্তির মনোহরণ করিতেছে। ঐ উদ্যান গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরাদিগের প্রীতিস্থান এবং উহা দেখিলে তদ্দণ্ডেই অন্তঃকরণে আনন্দের সঞ্চার হইয়া থাকে।
কদ্রুপুৎত্রেরা সেই কাননে কিয়ৎক্ষণ বিহার করিয়া মহাবল পরাক্রান্ত গরুড়কে কহিল, “দেখ, তুমি আমাদিগকে অন্য কোন নির্ম্মল জলসম্পন্ন সুরম্য দ্বীপে লইয়া চল। তুমি সমস্ত মনোহর স্থান অবশ্যই জান; কারণ, তুমি গগনে উড্ডীন হইলে কোন রমণীয় স্থান তোমার নয়নের অগোচর থাকে না।” গরুড় সর্পদিগের এইরূপ আদেশবাক্য শ্রবণ করিয়া অতিবিষণ্ণমনে স্বীয় জননী-সন্নিধানে নিবেদন করিলেন, “মাতঃ! আমাকে কি কারণে সর্পগণের আদেশ প্রতিপালন করিতে হইবে, তাহা বল।” বিনতা কহিলেন, “বৎস! আমি দুরদৃষ্টক্রমে নাগগণের মায়াজালে পতিত ও পণে পরাজিত হইয়া সপত্নীর দাস্যবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছি।” গরুড় মাতৃসন্নিধানে এই কারণ শ্রবণ করিয়া অতিশয় পরিতাপ পাইলেন ও অনতিবিলম্বে সর্পগণের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, “হে নাগগণ! কোন্ বস্তু আহরণ বা কিরূপ পৌরুষ প্রকাশ করিলে আমরা দাসত্ব-শৃঙ্খল হইতে মুক্ত হইতে পারি, তাহা জানিতে ইচ্ছা করি।” তাহা শ্রবণ করিয়া সর্পেরা কহিল, “হে বিহঙ্গমরাজ! যদি তুমি পৌরুষ প্রকাশ করিয়া অমৃত আহরণ করিতে সমর্থ হও, তাহা হইলেই দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে পারিবে।”
কদ্রুপুৎত্রেরা সেই কাননে কিয়ৎক্ষণ বিহার করিয়া মহাবল পরাক্রান্ত গরুড়কে কহিল, “দেখ, তুমি আমাদিগকে অন্য কোন নির্ম্মল জলসম্পন্ন সুরম্য দ্বীপে লইয়া চল। তুমি সমস্ত মনোহর স্থান অবশ্যই জান; কারণ, তুমি গগনে উড্ডীন হইলে কোন রমণীয় স্থান তোমার নয়নের অগোচর থাকে না।” গরুড় সর্পদিগের এইরূপ আদেশবাক্য শ্রবণ করিয়া অতিবিষণ্ণমনে স্বীয় জননী-সন্নিধানে নিবেদন করিলেন, “মাতঃ! আমাকে কি কারণে সর্পগণের আদেশ প্রতিপালন করিতে হইবে, তাহা বল।” বিনতা কহিলেন, “বৎস! আমি দুরদৃষ্টক্রমে নাগগণের মায়াজালে পতিত ও পণে পরাজিত হইয়া সপত্নীর দাস্যবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছি।” গরুড় মাতৃসন্নিধানে এই কারণ শ্রবণ করিয়া অতিশয় পরিতাপ পাইলেন ও অনতিবিলম্বে সর্পগণের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, “হে নাগগণ! কোন্ বস্তু আহরণ বা কিরূপ পৌরুষ প্রকাশ করিলে আমরা দাসত্ব-শৃঙ্খল হইতে মুক্ত হইতে পারি, তাহা জানিতে ইচ্ছা করি।” তাহা শ্রবণ করিয়া সর্পেরা কহিল, “হে বিহঙ্গমরাজ! যদি তুমি পৌরুষ প্রকাশ করিয়া অমৃত আহরণ করিতে সমর্থ হও, তাহা হইলেই দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে পারিবে।”
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
অমৃত আহরণে গরুড়ের যাত্রা
অমৃত আহরণে গরুড়ের যাত্রা
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, গরুড় এইরূপ অভিহিত হইয়া মাতার নিকট যাইয়া কহিলেন, “জননি! আমি অমৃত আহরণ করিতে চলিলাম; পথে কি আহার করিব, বলিয়া দাও।” বিনতা বলিলেন, “বৎস! সমুদ্রমধ্যে বহুসহস্র নিষাদ বাস করে, তুমি তাহাদিগকে ভোজন করিয়া অমৃত আনয়ন কর; কিন্তু হে বৎস! দেখিও, যেন ব্রাহ্মণবধে কদাচ তোমার বুদ্ধি না জন্মে। অনলসমান ব্রাহ্মণগণ সর্ব্বজীবের অবধ্য। ব্রাহ্মণ কুপিত হইলে অগ্নি, সূর্য্য, বিষ ও শস্ত্রতুল্য হয়েন। ব্রাহ্মণ সর্ব্বজীবের গুরু; এই নিমিত্ত ব্রাহ্মণ সর্ব্বভূতের আদরণীয়। অতএব হে বৎস! তুমি অতিশয় কুপিত হইয়াও যেন কোনক্রমে ব্রাহ্মণের হিংসা বা তাঁহাদিগের সহিত বিদ্রোহাচরণ করিও না। নিত্যনৈমিত্তিক জপহোমাদি ক্রিয়াকলাপে নিয়ত, বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ ক্রুদ্ধ হইলে যেরূপ দগ্ধ করিতে পারেন, কি অগ্নি কি সূর্য্য, কেহই সেরূপ পারেন না। ব্রাহ্মণ সর্ব্বজীবের অগ্রজাত, সর্ব্ববর্ণের শ্রেষ্ঠ এবং সর্ব্বভূতের পিতা ও গুরু।”
গরুড় মাতৃসন্নিধানে ব্রাহ্মণের এইরূপ অভাবনীয় প্রভাব অবগত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাতা! ব্রাহ্মণের কীদৃশ আকার, কি প্রকার স্বভাব ও কিরূপই বা পরাক্রম? ব্রাহ্মণ কি হুতাশনের ন্যায় সর্ব্বদা প্রদীপ্ত কিংবা অতিশয় সৌম্যমূর্ত্তি? যে-সকল শুভলক্ষণ দ্বারা ব্রাহ্মণকে চিনিতে পারা যায়, তুমি হেতুনির্দ্দেশপূর্ব্বক তাহা আমাকে বিশেষরূপে কহিয়া দাও।” বিনতা কহিলেন, “যিনি তোমার জঠরদেশে প্রবেশ করিলে বড়িশের ন্যায় নিতান্ত দুঃসহ ক্লেশদায়ক হইবেন এবং প্রজ্বলিত অঙ্গারের ন্যায় কণ্ঠদাহ করিবেন, তিনিই সুব্রাহ্মণ। তুমি অতিমাত্র ক্রুদ্ধ হইয়াও ব্রাহ্মণকে বধ করিতে প্রবৃত্ত হইও না।” বিনতা পুৎত্রবাৎসল্য প্রযুক্ত গরুড়কে পুনর্ব্বার কহিলেন, “বৎস! যিনি তোমার জঠরদেশে জীর্ণ হইবেন না, তাহাকেই সুব্রাহ্মণ বলিয়া জানিবে।” সর্পবঞ্চিতা পরমদুঃখিতা বিনতা পুৎত্রের অতুল পরাক্রম বুঝিতে পারিয়াও অতি প্রীতমনে তাঁহাকে আশীর্ব্বাদ করিলেন, “বৎস! বায়ু তোমার দুই পক্ষ রক্ষা করুন, চন্দ্র ও সূর্য্য তোমার পৃষ্ঠ, অগ্নি মস্তক এবং বসুগণ ত্বদীয় সর্ব্বাঙ্গ সর্ব্বদা নির্ব্বিঘ্নে রাখুন। হে পুৎত্র! আমিও তোমার স্বস্তি-শান্তি-বিষয়ে তৎপর হইয়া নিরন্তর ত্বদীয় শুভানুধ্যানে এই স্থানেই রহিলাম। তুমি কার্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত নিরাপদে প্রস্থান কর।”
গরুড় মাতৃবাক্য-শ্রবণানন্তর পক্ষদ্বয় বিস্তারপূর্ব্বক গগনমার্গে উড্ডীন হইয়া বুভুক্ষা [ক্ষুধা] প্রযুক্ত সাক্ষাৎ কৃতান্তের ন্যায় নিষাদ-পল্লীতে উপনীত হইলেন এবং নিষাদ-সংহারের নিমিত্ত ধূলিরাশি দ্বারা নভোমণ্ডল আচ্ছন্ন ও সমুদ্রের জল শোষণ করিয়া সমীপস্থ সমস্ত মহীধরগণকে বিচালিত করিতে লাগিলেন। পরিশেষে বিহঙ্গরাজ প্রকাণ্ড মুখব্যাদানপূর্ব্বক নিষাদনগরীর পথ রুদ্ধ করিয়া বসিলেন। বিষাদসাগরে নিমগ্ন নিষাদগণ প্রবলবাত্যাহত ধূলিপটলে অন্ধপ্রায় হইয়া ভুজঙ্গভোজী গরুড়ের অতি-বিস্তীর্ণ আননাভিমুখে ধাবমান হইল। যেমন প্রবল বায়ুবেগে সমস্ত বন ঘূর্ণিত হইলে পক্ষিগণ আকাশমার্গে উঠে, সেইরূপ নিষাদেরাও গরুড়ের অতি বিশাল মুখবিবরে প্রবিষ্ট হইল। পরিশেষে ক্ষুধার্ত্ত বিহঙ্গরাজ মুখ মুদ্রিত করিয়া বহুসংখ্যক নিষাদ ভক্ষণ করিলেন।
গরুড় মাতৃসন্নিধানে ব্রাহ্মণের এইরূপ অভাবনীয় প্রভাব অবগত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাতা! ব্রাহ্মণের কীদৃশ আকার, কি প্রকার স্বভাব ও কিরূপই বা পরাক্রম? ব্রাহ্মণ কি হুতাশনের ন্যায় সর্ব্বদা প্রদীপ্ত কিংবা অতিশয় সৌম্যমূর্ত্তি? যে-সকল শুভলক্ষণ দ্বারা ব্রাহ্মণকে চিনিতে পারা যায়, তুমি হেতুনির্দ্দেশপূর্ব্বক তাহা আমাকে বিশেষরূপে কহিয়া দাও।” বিনতা কহিলেন, “যিনি তোমার জঠরদেশে প্রবেশ করিলে বড়িশের ন্যায় নিতান্ত দুঃসহ ক্লেশদায়ক হইবেন এবং প্রজ্বলিত অঙ্গারের ন্যায় কণ্ঠদাহ করিবেন, তিনিই সুব্রাহ্মণ। তুমি অতিমাত্র ক্রুদ্ধ হইয়াও ব্রাহ্মণকে বধ করিতে প্রবৃত্ত হইও না।” বিনতা পুৎত্রবাৎসল্য প্রযুক্ত গরুড়কে পুনর্ব্বার কহিলেন, “বৎস! যিনি তোমার জঠরদেশে জীর্ণ হইবেন না, তাহাকেই সুব্রাহ্মণ বলিয়া জানিবে।” সর্পবঞ্চিতা পরমদুঃখিতা বিনতা পুৎত্রের অতুল পরাক্রম বুঝিতে পারিয়াও অতি প্রীতমনে তাঁহাকে আশীর্ব্বাদ করিলেন, “বৎস! বায়ু তোমার দুই পক্ষ রক্ষা করুন, চন্দ্র ও সূর্য্য তোমার পৃষ্ঠ, অগ্নি মস্তক এবং বসুগণ ত্বদীয় সর্ব্বাঙ্গ সর্ব্বদা নির্ব্বিঘ্নে রাখুন। হে পুৎত্র! আমিও তোমার স্বস্তি-শান্তি-বিষয়ে তৎপর হইয়া নিরন্তর ত্বদীয় শুভানুধ্যানে এই স্থানেই রহিলাম। তুমি কার্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত নিরাপদে প্রস্থান কর।”
গরুড় মাতৃবাক্য-শ্রবণানন্তর পক্ষদ্বয় বিস্তারপূর্ব্বক গগনমার্গে উড্ডীন হইয়া বুভুক্ষা [ক্ষুধা] প্রযুক্ত সাক্ষাৎ কৃতান্তের ন্যায় নিষাদ-পল্লীতে উপনীত হইলেন এবং নিষাদ-সংহারের নিমিত্ত ধূলিরাশি দ্বারা নভোমণ্ডল আচ্ছন্ন ও সমুদ্রের জল শোষণ করিয়া সমীপস্থ সমস্ত মহীধরগণকে বিচালিত করিতে লাগিলেন। পরিশেষে বিহঙ্গরাজ প্রকাণ্ড মুখব্যাদানপূর্ব্বক নিষাদনগরীর পথ রুদ্ধ করিয়া বসিলেন। বিষাদসাগরে নিমগ্ন নিষাদগণ প্রবলবাত্যাহত ধূলিপটলে অন্ধপ্রায় হইয়া ভুজঙ্গভোজী গরুড়ের অতি-বিস্তীর্ণ আননাভিমুখে ধাবমান হইল। যেমন প্রবল বায়ুবেগে সমস্ত বন ঘূর্ণিত হইলে পক্ষিগণ আকাশমার্গে উঠে, সেইরূপ নিষাদেরাও গরুড়ের অতি বিশাল মুখবিবরে প্রবিষ্ট হইল। পরিশেষে ক্ষুধার্ত্ত বিহঙ্গরাজ মুখ মুদ্রিত করিয়া বহুসংখ্যক নিষাদ ভক্ষণ করিলেন।
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
শাপগ্রস্ত গজ-কচ্ছপবৃত্তান্ত
শাপগ্রস্ত গজ-কচ্ছপবৃত্তান্ত
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, এক ব্রাক্ষণ ভার্য্যা সমভিব্যাহারে গরুড়ের কণ্ঠদেশে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তিনি জ্বলন্ত অঙ্গারের ন্যায় তাঁহার কণ্ঠদাহ করিতে লাগিলেন। তখন গরুড় মাতৃবাক্য স্মরণ করিয়া কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! আমি মুখব্যাদান [প্রসারণ—বড়রকমের হা ] করিতেছি, তুনি অতি সত্বর বহির্গত হও; ব্রাহ্মণ সর্ব্বদা পাপচরণতৎপর হইলেও আমার অবধ্য।” ব্রাক্ষণ খগাধিরাজ গরুড়ের এই কথা শ্রবণ করিয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, “তবে আমার ভার্য্যা, নিষাদীও আমার সহিত বহির্গত হউক।” গরুড় কহিলেন, “ভাল, তুমি নিষাদীকে সঙ্গে লইয়া অবিলম্বে আমার আস্যবিবর [মুখগহ্বর] হইতে বহির্গত হও। তুমি এখনও আমার উদরে প্রবেশ করিয়া ভস্মাবশেষ হও নাই। অতএব বিলম্ব না করিয়া শীঘ্র আত্মরক্ষা কর।” তখন ব্রাক্ষণ নিষাদীর সহিত নিষ্ক্রান্ত হইয়া গরুড়কে সংবর্দ্ধনা করিয়া অভিলষিত প্রদেশে প্রস্থান করিলেন।
এইরূপে ব্রাহ্মণ ও তদীয় ভার্য্যা নিষাদী বহির্গত হইলে খগরাজ স্বকীয় পক্ষজাল বিস্তার করিয়া প্রবলবেগে অন্তরীক্ষে উত্থিত হইলেন এবং অনতিবিলম্বে স্বীয় পিতা কশ্যপকে দেখিতে পাইলেন। মহর্ষি কশ্যপ আপন সন্তানের সন্দর্শন পাইয়া কুশলপ্রশ্নানন্তর জিজ্ঞাসা করিলেন, “বৎস! মনুষ্যলোকে তোমার পর্য্যাপ্ত আহার-লাভ হইয়া থাকে?” তখন গরুড় কহিলেন, “পিতাঃ! আমার মাতা ও ভ্রাতা কুশলে আছেন এবং আমারও সর্ব্বাঙ্গীণ মঙ্গল বটে; কিন্তু মর্ত্ত্যলোকে আমার প্রচুর আহারদ্রব্য প্রাপ্ত হওয়া দুষ্কর হইয়াছে।” আরও কহিলেন, “নাগেরা আমাকে অমৃত আহরণ করিতে প্রেরণ করিয়াছে; আমি জননীর দাসীভাব মোচন করিবার নিমিত্ত অদ্য তাহা আনয়ন করিব; মাতা নিষাদগণকে ভক্ষণ করিতে কহিয়াছিলেন, বহুসংখ্যক নিষাদ ভক্ষণ করিয়াছি, তথাপি আমার সমুচিত তৃপ্তিলাভ হয় নাই; অতএব হে ভগবান্! এক্ষণে অপর কোন ভক্ষ্যদ্রব্য নির্দ্দেশ করিয়া দিন, যাহা আহার করিলে আমি অমৃত আহরণ করিতে সমর্থ হইব। হে প্রভো! বলবতী ক্ষুৎপিপাসায় আমার কণ্ঠতালু শুষ্কপ্রায় হইয়াছে।”
তখন মহর্ষি কশ্যপ কহিলেন, “বৎস! অনতিদূরে ঐ পবিত্র সরোবরটি দেখিতেছ. উহা দেবলোকেও বিখ্যাত। ঐ স্থলে দেখিতে পাইবে, এক হস্তী অবাঙ্মুখ [অধোবদন—নিম্নমুখ] হইয়া কূর্ম্মরূপী স্বকীয় জ্যেষ্ঠ সহোদরকে আকর্ষণ করিতেছে। উহাদিগের আকারের পরিমাণ ও জন্মান্তরীণ বৈরবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর।”
বিভাবসু নামে অতি কোপনস্বভাব এক মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার কনিষ্ঠ সহোদর মহাতপা সুপ্রতীক ভ্রাতার সহিত একান্নে থাকিতে নিতান্ত অনিচ্ছুক; এই নিমিত্ত তিনি আপন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নিকট সর্ব্বদা পৈতৃক ধনবিভাগের কথা উত্থাপন করিতেন। একদা বিভাবসু ক্রুদ্ধ হইয়া সুপ্রতীককে কহিলেন, “দেখ, অনেকেই মোহপরবশ হইয়া পৈতৃকধন বিভাগ করিতে অভিলাষ করে; কিন্তু বিভাগানন্তর ধনমদে মত্ত হইয়া পরস্পর বিরোধ আরম্ভ করে। স্বার্থপর মূঢ় ব্যক্তিরা স্বীয় ধন অধিকার করিলে শত্রুপক্ষ মিত্রভাবে প্রবেশ করিয়া তাহাদিগের আত্মবিচ্ছেদ জন্মাইয়া দেয় এবং ক্রমশঃ দোষ দর্শাইয়া পরস্পরের রোষবৃদ্ধি ও বৈরভাব বদ্ধমূল করিতে থাকে। এইরূপ হইলে তাহাদিগের সর্ব্বদাই সর্ব্বনাশ ঘটিবার সম্ভাবনা। এই কারণে ভ্রাতৃগণের ধনবিভাগ সাধুদিগের অভিপ্রেত নহে। কিন্তু তুমি নিতান্ত অনভিজ্ঞের ন্যায় ঐ কথারই বারংবার উত্থাপন করিয়া থাক। আমি বারণ করিলেও তাহাতেও কর্ণপাত কর না; অতএব তুমি বারণযোনি [হস্তি-জন্ম] প্রাপ্ত হও।” সুপ্রতীক এইরূপে শাপগ্রস্ত হইয়া বিভাবসুকে কহিলেন, “তুমিও কচ্ছপযোনি প্রাপ্ত হও।”
এইরূপে সুপ্রতীক ও বিভাবসু পরস্পরের শাপপ্রভাবে গজত্ব ও কচ্ছপত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন। এক্ষণে তাঁহারা রোষদোষে তির্য্য্গযোনি-প্রাপ্ত, পরস্পর বিদ্বেষরত এবং শরীরের গুরুত্ব ও বলদর্পে একান্ত দর্পিত হইয়া জন্মান্তরীণ বৈরাসুসারে এই সরোবরে অবস্থান করিতেছেন। ঐ দেখ, গজের বৃংহিত [সক্রোধ ধ্বনি] শব্দে মহাকায় কচ্ছপ সরোবর আলোড়িত করিয়া জলমধ্য হইতে সত্বর উত্থিত হইতেছে। গজ তাহাকে দেখিতে পাইয়া অতি প্রকাণ্ড শুণ্ডাদণ্ড [শুঁড়] আস্ফালনপূর্ব্বক জলে অবগাহন করিতেছে। উহার শুণ্ডদণ্ড, লাঙ্গুল ও পদচতুষ্টয়ের তাড়নে সরোবরে অবস্থান করিতেছেন। উহার শুণ্ডাদণ্ড, লাঙ্গুল ও পদচতুষ্টয়ের তাড়নে সরোবর বিক্ষোভিত হইতেছে। অতি-পরাক্রান্ত কূর্ম্মও মস্তক উন্নত করিয়া যুদ্ধার্থে অভ্যাগত হইতেছে। গজের কলেবর ছয় যোজন উন্নত ও দ্বাদশ যোজন আয়ত। কূর্ম্ম তিন যোজন উন্নত ও তাহার পরিধি দশ যোজন। হে বৎস! উহারা পরস্পরের বিনাশে কৃতসঙ্কল্প হইয়া যুদ্ধে মত্ত হইয়াছে, উহাদিগকে ভক্ষণ করিয়া আপনার অভীষ্টসিদ্ধি কর। যাও, তুমিও এই মহাগিরিসদৃশ ঘোররূপী হস্তীকে ভোজন করিয়া অমৃত আহরণ কর।”
মহর্ষি কশ্যপ গরুড়কে ভক্ষ্যদ্রব্য নির্দ্দেশ করিয়া দিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন, “বৎস! দেবতাদিগের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলে তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে। পূর্ণকুম্ভ, গো, ব্রাহ্মণ এবং আর যে কিছু মাঙ্গল্যবস্তু আছে, সে সকলই তোমার শুভপ্রদ হউক। হে মহাবলপরাক্রান্ত! যৎকালে তুমি দেবতাদিগের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবে, তখন ঋক্, যজু:, সাম এই তিন বেদ, যজ্ঞীয় পবিত্র বহিঃ ও রহস্য [বেদের শক্তি—দৈবশক্তি] তোমার বলাধান করিবে।” গরুড় পিতার আশীর্ব্বাদ গ্রহণ করিয়া অনতিদূরে সেই নির্ম্মল জলপূর্ণ হ্রদ দেখিতে পাইলেন এবং তাহাতে নানাবিধ জলচর পক্ষিসকল কলরব করিতেছে দেখিলেন। তখন তিনি পিতৃবাক্য স্মরণ করিয়া এক নখে গজ ও অপর নখে কচ্ছপকে গ্রহণ করিয়া সত্বরে আকাশপথে উত্থিত হইলেন; অনন্তর অলম্ব নামক তীর্থে সমুপস্থিত হইয়া দেববৃক্ষগণের উপর আরোহণ করিতে ইচ্ছা করিলেন। বিটপি-মণ্ডলী [বৃক্ষশ্রণী] গরুড়ের পক্ষ-পবনে [পাখার বাতাস] আহত হইয়া শাখাভঙ্গভয়ে শঙ্কিত ও কম্পিত হইতে লাগিল। বিহঙ্গরাজ সেই অভীষ্টফলপ্রদ দিব্য সুবর্ণময় তরুদিগকে ভঙ্গভয়ে কম্পিত দেখিয়া অতীব উন্নত অন্যান্য বৃক্ষের সমীপে গমন করিলেন। সেই পরম রমণীয় বৃক্ষগুলির সুস্বাদু ফলসকল কাঞ্চনময় ও রজতময়, শাখাসমুদয় প্রবালময় এবং উহাদিগের মূলদেশ সর্ব্বদা সাগরজলে প্রক্ষালিত হইতেছে। তম্মধ্যে অত্যুচ্চ এক বটবিটপী পক্ষিরাজ গরুড়কে আগমন করিতে দেখিয়া কহিল, “হে গরুত্মন! তুমি আমার এই শত যোজন-বিস্তীর্ণ, অতিপ্রকাণ্ড শাখায় উপবেশন করিয়া গজ-কচ্ছপ ভক্ষণ কর।” মহীধর-তুল্য-কলেবর পতগেশ্বর প্রবলবেগে বহুসহস্রপক্ষিসেবিত সেই বৃক্ষশাখায় আরোহণ করিবামাত্র তাহা ভগ্ন হইল।
এইরূপে ব্রাহ্মণ ও তদীয় ভার্য্যা নিষাদী বহির্গত হইলে খগরাজ স্বকীয় পক্ষজাল বিস্তার করিয়া প্রবলবেগে অন্তরীক্ষে উত্থিত হইলেন এবং অনতিবিলম্বে স্বীয় পিতা কশ্যপকে দেখিতে পাইলেন। মহর্ষি কশ্যপ আপন সন্তানের সন্দর্শন পাইয়া কুশলপ্রশ্নানন্তর জিজ্ঞাসা করিলেন, “বৎস! মনুষ্যলোকে তোমার পর্য্যাপ্ত আহার-লাভ হইয়া থাকে?” তখন গরুড় কহিলেন, “পিতাঃ! আমার মাতা ও ভ্রাতা কুশলে আছেন এবং আমারও সর্ব্বাঙ্গীণ মঙ্গল বটে; কিন্তু মর্ত্ত্যলোকে আমার প্রচুর আহারদ্রব্য প্রাপ্ত হওয়া দুষ্কর হইয়াছে।” আরও কহিলেন, “নাগেরা আমাকে অমৃত আহরণ করিতে প্রেরণ করিয়াছে; আমি জননীর দাসীভাব মোচন করিবার নিমিত্ত অদ্য তাহা আনয়ন করিব; মাতা নিষাদগণকে ভক্ষণ করিতে কহিয়াছিলেন, বহুসংখ্যক নিষাদ ভক্ষণ করিয়াছি, তথাপি আমার সমুচিত তৃপ্তিলাভ হয় নাই; অতএব হে ভগবান্! এক্ষণে অপর কোন ভক্ষ্যদ্রব্য নির্দ্দেশ করিয়া দিন, যাহা আহার করিলে আমি অমৃত আহরণ করিতে সমর্থ হইব। হে প্রভো! বলবতী ক্ষুৎপিপাসায় আমার কণ্ঠতালু শুষ্কপ্রায় হইয়াছে।”
তখন মহর্ষি কশ্যপ কহিলেন, “বৎস! অনতিদূরে ঐ পবিত্র সরোবরটি দেখিতেছ. উহা দেবলোকেও বিখ্যাত। ঐ স্থলে দেখিতে পাইবে, এক হস্তী অবাঙ্মুখ [অধোবদন—নিম্নমুখ] হইয়া কূর্ম্মরূপী স্বকীয় জ্যেষ্ঠ সহোদরকে আকর্ষণ করিতেছে। উহাদিগের আকারের পরিমাণ ও জন্মান্তরীণ বৈরবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর।”
বিভাবসু নামে অতি কোপনস্বভাব এক মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার কনিষ্ঠ সহোদর মহাতপা সুপ্রতীক ভ্রাতার সহিত একান্নে থাকিতে নিতান্ত অনিচ্ছুক; এই নিমিত্ত তিনি আপন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নিকট সর্ব্বদা পৈতৃক ধনবিভাগের কথা উত্থাপন করিতেন। একদা বিভাবসু ক্রুদ্ধ হইয়া সুপ্রতীককে কহিলেন, “দেখ, অনেকেই মোহপরবশ হইয়া পৈতৃকধন বিভাগ করিতে অভিলাষ করে; কিন্তু বিভাগানন্তর ধনমদে মত্ত হইয়া পরস্পর বিরোধ আরম্ভ করে। স্বার্থপর মূঢ় ব্যক্তিরা স্বীয় ধন অধিকার করিলে শত্রুপক্ষ মিত্রভাবে প্রবেশ করিয়া তাহাদিগের আত্মবিচ্ছেদ জন্মাইয়া দেয় এবং ক্রমশঃ দোষ দর্শাইয়া পরস্পরের রোষবৃদ্ধি ও বৈরভাব বদ্ধমূল করিতে থাকে। এইরূপ হইলে তাহাদিগের সর্ব্বদাই সর্ব্বনাশ ঘটিবার সম্ভাবনা। এই কারণে ভ্রাতৃগণের ধনবিভাগ সাধুদিগের অভিপ্রেত নহে। কিন্তু তুমি নিতান্ত অনভিজ্ঞের ন্যায় ঐ কথারই বারংবার উত্থাপন করিয়া থাক। আমি বারণ করিলেও তাহাতেও কর্ণপাত কর না; অতএব তুমি বারণযোনি [হস্তি-জন্ম] প্রাপ্ত হও।” সুপ্রতীক এইরূপে শাপগ্রস্ত হইয়া বিভাবসুকে কহিলেন, “তুমিও কচ্ছপযোনি প্রাপ্ত হও।”
এইরূপে সুপ্রতীক ও বিভাবসু পরস্পরের শাপপ্রভাবে গজত্ব ও কচ্ছপত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন। এক্ষণে তাঁহারা রোষদোষে তির্য্য্গযোনি-প্রাপ্ত, পরস্পর বিদ্বেষরত এবং শরীরের গুরুত্ব ও বলদর্পে একান্ত দর্পিত হইয়া জন্মান্তরীণ বৈরাসুসারে এই সরোবরে অবস্থান করিতেছেন। ঐ দেখ, গজের বৃংহিত [সক্রোধ ধ্বনি] শব্দে মহাকায় কচ্ছপ সরোবর আলোড়িত করিয়া জলমধ্য হইতে সত্বর উত্থিত হইতেছে। গজ তাহাকে দেখিতে পাইয়া অতি প্রকাণ্ড শুণ্ডাদণ্ড [শুঁড়] আস্ফালনপূর্ব্বক জলে অবগাহন করিতেছে। উহার শুণ্ডদণ্ড, লাঙ্গুল ও পদচতুষ্টয়ের তাড়নে সরোবরে অবস্থান করিতেছেন। উহার শুণ্ডাদণ্ড, লাঙ্গুল ও পদচতুষ্টয়ের তাড়নে সরোবর বিক্ষোভিত হইতেছে। অতি-পরাক্রান্ত কূর্ম্মও মস্তক উন্নত করিয়া যুদ্ধার্থে অভ্যাগত হইতেছে। গজের কলেবর ছয় যোজন উন্নত ও দ্বাদশ যোজন আয়ত। কূর্ম্ম তিন যোজন উন্নত ও তাহার পরিধি দশ যোজন। হে বৎস! উহারা পরস্পরের বিনাশে কৃতসঙ্কল্প হইয়া যুদ্ধে মত্ত হইয়াছে, উহাদিগকে ভক্ষণ করিয়া আপনার অভীষ্টসিদ্ধি কর। যাও, তুমিও এই মহাগিরিসদৃশ ঘোররূপী হস্তীকে ভোজন করিয়া অমৃত আহরণ কর।”
মহর্ষি কশ্যপ গরুড়কে ভক্ষ্যদ্রব্য নির্দ্দেশ করিয়া দিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন, “বৎস! দেবতাদিগের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলে তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে। পূর্ণকুম্ভ, গো, ব্রাহ্মণ এবং আর যে কিছু মাঙ্গল্যবস্তু আছে, সে সকলই তোমার শুভপ্রদ হউক। হে মহাবলপরাক্রান্ত! যৎকালে তুমি দেবতাদিগের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবে, তখন ঋক্, যজু:, সাম এই তিন বেদ, যজ্ঞীয় পবিত্র বহিঃ ও রহস্য [বেদের শক্তি—দৈবশক্তি] তোমার বলাধান করিবে।” গরুড় পিতার আশীর্ব্বাদ গ্রহণ করিয়া অনতিদূরে সেই নির্ম্মল জলপূর্ণ হ্রদ দেখিতে পাইলেন এবং তাহাতে নানাবিধ জলচর পক্ষিসকল কলরব করিতেছে দেখিলেন। তখন তিনি পিতৃবাক্য স্মরণ করিয়া এক নখে গজ ও অপর নখে কচ্ছপকে গ্রহণ করিয়া সত্বরে আকাশপথে উত্থিত হইলেন; অনন্তর অলম্ব নামক তীর্থে সমুপস্থিত হইয়া দেববৃক্ষগণের উপর আরোহণ করিতে ইচ্ছা করিলেন। বিটপি-মণ্ডলী [বৃক্ষশ্রণী] গরুড়ের পক্ষ-পবনে [পাখার বাতাস] আহত হইয়া শাখাভঙ্গভয়ে শঙ্কিত ও কম্পিত হইতে লাগিল। বিহঙ্গরাজ সেই অভীষ্টফলপ্রদ দিব্য সুবর্ণময় তরুদিগকে ভঙ্গভয়ে কম্পিত দেখিয়া অতীব উন্নত অন্যান্য বৃক্ষের সমীপে গমন করিলেন। সেই পরম রমণীয় বৃক্ষগুলির সুস্বাদু ফলসকল কাঞ্চনময় ও রজতময়, শাখাসমুদয় প্রবালময় এবং উহাদিগের মূলদেশ সর্ব্বদা সাগরজলে প্রক্ষালিত হইতেছে। তম্মধ্যে অত্যুচ্চ এক বটবিটপী পক্ষিরাজ গরুড়কে আগমন করিতে দেখিয়া কহিল, “হে গরুত্মন! তুমি আমার এই শত যোজন-বিস্তীর্ণ, অতিপ্রকাণ্ড শাখায় উপবেশন করিয়া গজ-কচ্ছপ ভক্ষণ কর।” মহীধর-তুল্য-কলেবর পতগেশ্বর প্রবলবেগে বহুসহস্রপক্ষিসেবিত সেই বৃক্ষশাখায় আরোহণ করিবামাত্র তাহা ভগ্ন হইল।
সর্পরক্ষার সংক্ষিপ্ত কথা,অরুণ ও গরুড়ের জন্ম, সমুদ্রমন্থনের প্রশ্ন, সমুদ্রমন্থনারম্ভ, রাহুর মস্তকচ্ছেদ । দেবাসুর-সংগ্রাম, নাগগণের প্রতি অভিশাপ, সমুদ্রবর্ণন, কদ্রু-বিনতার সাগরতীরে গমন,
পঞ্চদশ অধ্যায়
সর্পরক্ষার সংক্ষিপ্ত কথা
সর্পরক্ষার সংক্ষিপ্ত কথা
উগ্রশ্রবাঃ মহর্ষি শৌনককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ব্রহ্মজ্ঞানপারদর্শিন্! পূর্ব্বকালে সর্পগণ স্বীয় জননীর নিকট এইরূপ শাপগ্রস্ত হইয়াছিল যে, রাজা জনমেজয়ের যজ্ঞে অগ্নি তাহাদিগকে দগ্ধ করিবেন। ভুজঙ্গরাজ বাসুকি সেই শাপবিমোচনের অভিসন্ধি করিয়া মহাত্মা জরৎকারুকে স্বীয় ভগিনী প্রদান করেন। জরৎকারু বিধিপূর্ব্বক তাঁহার পাণিগ্রহণ করিয়া তদ্গর্ভে আস্তীক নামে পুৎত্র উৎপাদন করেন। মহাত্মা আস্তীক বেদবেদাঙ্গশাস্ত্রে পারদর্শী, সর্ব্বভূতে সমদৃষ্টি ও তপশ্চর্য্যায় নিতান্ত অনুরক্ত ছিলেন। তিনি পিতৃকুল মাতৃকুল উভয় কুলের দাহভয় নিবারণ করেন। পাণ্ডুকুলোদ্ভব রাজা জনমেজয় বহুকালের পর সর্পসত্র নামে এক মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। সেই সর্পকুলকালান্তক যজ্ঞ আরব্ধ হইলে মহাতপ আস্তীক ভ্রাতৃগণ, মাতুলগণ ও অন্যান্য সর্পগণকে রক্ষা করিয়াছিলেন।
জরৎকারু পুৎত্রোৎপাদন ও তপশ্চর্য্যা দ্বারা পিতৃলোকের উদ্ধারসাধন, বিবিধ ব্রতানুষ্ঠান ও বেদাধ্যয়ন দ্বারা মুনিগণের তুষ্টি সম্পাদন এবং নানাবিধ যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা দেবগণের পরিতোষ সমাধান করিলেন। তিনি এইরূপে পুৎত্রোৎপাদন, ব্রহ্মচর্য্য ও যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা পিতৃঋণ, ঋষিঋণ ও দেবঋণ স্বরূপ গুরুতর ভার হইতে মুক্ত হইয়া পূর্ব্বপুরুষগণের সহিত স্বর্গে আরোহণ করেন। হে ভৃগুবংশাবতংস! আমি যথাক্রমে এই আস্তীকোপাখ্যান কহিলাম, এক্ষণে আর কি কহিতে হইবে, আজ্ঞা করুন।
জরৎকারু পুৎত্রোৎপাদন ও তপশ্চর্য্যা দ্বারা পিতৃলোকের উদ্ধারসাধন, বিবিধ ব্রতানুষ্ঠান ও বেদাধ্যয়ন দ্বারা মুনিগণের তুষ্টি সম্পাদন এবং নানাবিধ যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা দেবগণের পরিতোষ সমাধান করিলেন। তিনি এইরূপে পুৎত্রোৎপাদন, ব্রহ্মচর্য্য ও যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা পিতৃঋণ, ঋষিঋণ ও দেবঋণ স্বরূপ গুরুতর ভার হইতে মুক্ত হইয়া পূর্ব্বপুরুষগণের সহিত স্বর্গে আরোহণ করেন। হে ভৃগুবংশাবতংস! আমি যথাক্রমে এই আস্তীকোপাখ্যান কহিলাম, এক্ষণে আর কি কহিতে হইবে, আজ্ঞা করুন।
ষোড়শ অধ্যায়
অরুণ ও গরুড়ের জন্ম
অরুণ ও গরুড়ের জন্ম
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি যাহা কীর্ত্তন করিলে, পুনর্ব্বার তাহাই সবিস্তরে বর্ণন কর; আস্তীকবৃত্তান্ত বিশেষরূপে শ্রবণ করিতে আমাদিগের নিতান্ত ঔৎসুক্য হইয়াছে। আস্তীকোপাখ্যানটি অতি সুললিত ও সুমধুর বোধ হইল। ইহা শুনিয়া আমার পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়াছি। ফলতঃ তুমি পুরাণকীর্ত্তনবিষয়ে স্বীয় পিতার ন্যায় পাণ্ডিত্য প্রকাশ করিয়াছ। তোমার পিতা যেমন অনন্য বিষয়ানুরক্ত হইয়া প্রত্যহ আমাদিগকে পুরাণ শ্রবণ করাইতেন, এক্ষণে তুমিও সেইরূপ অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া আমাদিগকে পুরাণ শ্রবণ করাও।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে মহাত্মন্! আমি পিতার নিকট আস্তীকোপখ্যান যেরূপ শুনিয়াছি, অবিকল সেইরূপ কহিতেছি, শ্রবণ করুন। সত্যযুগে দক্ষপ্রজাপতির কদ্রু ও বিনতা নামে দুই পরমাসুন্দরী কন্যা ছিলেন। মহর্ষি কশ্যপ ঐ দুই কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। একদা তিনি সেই ধর্ম্মপত্নীদ্বয়ের প্রতি অতিমাত্র প্রসন্ন হইয়া তাঁহাদিগকে বরপ্রদান করিতে চাহিলেন। “পরস্পর সমান-পরাক্রান্ত, এইরূপ সহস্রনাগ আমার পুৎত্র হউক” বলিয়া কদ্রু বর প্রার্থনা করিলেন; কিন্তু বিনতা এই বর চাহিলেন, “আমার দুইটি মাত্র পুৎত্র হউক, কিন্তু তাহারা যেন বল, বিক্রম ও শরীরে কদ্রু-পুৎত্র অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হয়।” মহর্ষি কশ্যপ “তথাস্তু” বলিয়া তাঁহাদিগকে সেই অভিলষিত বর প্রদান করিলেন। বিনতা স্বামিসন্নিধানে স্বাভিলষিত বর সংপ্রাপ্ত হইয়া সাতিশয় সন্তুষ্টা ও কৃতার্থম্মন্যা হইলেন। কদ্রু তুল্যতেজস্বী পুৎত্র-সহস্র-লাভে আপনাকে কৃতকৃত্য জ্ঞান করিলেন। মহাতপা কশ্যপ পত্নীদিগকে “তোমরা স্বীয় প্রযত্নে গর্ভধারণ করিও” এই আদেশ দিয়া অরণ্যানী প্রবেশ করিলেন।
বহুকালের পর কদ্রু অণ্ড-সহস্র ও বিনতা অণ্ডদ্বয় প্রসব করিলেন। পরিচারিকাগণ সেই সমুদয় অণ্ড উপস্বেদযুক্ত [তাপসংযুক্ত– ডিমে তা দেওয়া হয় এইরূপ।] ভাণ্ডমধ্যে পঞ্চশত বৎসর রাখিলেন। তৎপরে কদ্রু-প্রসূত অণ্ডসহস্র হইতে এক একটি পুৎত্র বহির্গত হইল। কিন্তু বিনতার অণ্ডদ্বয় তদবস্থই রহিল। পুৎত্রার্থিনী বিনতা তদ্দর্শনে সাতিশয় লজ্জিতা হইয়া স্ব-প্রসূত অণ্ডদ্বয়ের অন্যতর ভেদ করিয়া দেখিলেন যে, পুৎত্রের পূর্ব্বার্দ্ধকায়মাত্র সুসঙ্ঘটিত হইয়াছে, অন্যার্দ্ধ অতিশয় অপক্কাবস্থায় রহিয়াছে। তখন সেই সদ্যঃ-প্রসূত পুৎত্র সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া স্বীয় জননীকে অভিসম্পাত করিলেন, “লোভ-পরতন্ত্র হইয়া অপক্কাবস্থায় অণ্ড-ভেদনপূর্ব্বক আমাকে তন্মধ্য হইতে বাহির করা তোমার নিতান্ত অসদৃশ কর্ম্ম হইয়াছে; অতত্রব তুমি যে সপত্নীর সহিত স্পর্দ্ধাপ্রযুক্ত এই অন্যায্য কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে, পঞ্চাশৎ বৎসর তোমাকে সেই সপত্নীর দাসী হইয়া থাকিতে হইবে।” আরও বলিলেন, “এই অপর অণ্ডমধ্যে তোমার যে পুৎত্র আছে, যদি অকালে অণ্ডভেদ না কর এবং তাহাকেও আমার ন্যায় হীনাঙ্গ বা বিকলাঙ্গ না কর, তবে সেই তোমাকে দাসীত্ব হইতে মোচন করিবে। যদি তুমি আপন পুৎত্রকে বিশিষ্টরূপে বল বিক্রমশালী করিতে চাও, তবে ধৈর্য্যধারণপূর্ব্বক ইহার জন্মকাল প্রতীক্ষা কর। ইহার জন্মের আরও পঞ্চশত বৎসরকাল বিলম্ব আছে।”
অরুণ এইরূপে জননীকে শাপ প্রদান করিয়া আকাশপথে আরোহণপূর্ব্বক সূর্য্যদেবের সারথ্যকার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। সর্পভোজী গরুড়ও যথাকালে জন্মিলেন। তিনি জন্মিবামাত্র ক্ষুধাতুর হইয়া স্বীয় জননী বিনতাকে পরিত্যাগপূর্ব্বক বিধাতৃবিহিত স্বকীয় আহার-সংগ্রহার্থে আকাশমণ্ডলে উড্ডীয়মান হইলেন।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে মহাত্মন্! আমি পিতার নিকট আস্তীকোপখ্যান যেরূপ শুনিয়াছি, অবিকল সেইরূপ কহিতেছি, শ্রবণ করুন। সত্যযুগে দক্ষপ্রজাপতির কদ্রু ও বিনতা নামে দুই পরমাসুন্দরী কন্যা ছিলেন। মহর্ষি কশ্যপ ঐ দুই কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। একদা তিনি সেই ধর্ম্মপত্নীদ্বয়ের প্রতি অতিমাত্র প্রসন্ন হইয়া তাঁহাদিগকে বরপ্রদান করিতে চাহিলেন। “পরস্পর সমান-পরাক্রান্ত, এইরূপ সহস্রনাগ আমার পুৎত্র হউক” বলিয়া কদ্রু বর প্রার্থনা করিলেন; কিন্তু বিনতা এই বর চাহিলেন, “আমার দুইটি মাত্র পুৎত্র হউক, কিন্তু তাহারা যেন বল, বিক্রম ও শরীরে কদ্রু-পুৎত্র অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হয়।” মহর্ষি কশ্যপ “তথাস্তু” বলিয়া তাঁহাদিগকে সেই অভিলষিত বর প্রদান করিলেন। বিনতা স্বামিসন্নিধানে স্বাভিলষিত বর সংপ্রাপ্ত হইয়া সাতিশয় সন্তুষ্টা ও কৃতার্থম্মন্যা হইলেন। কদ্রু তুল্যতেজস্বী পুৎত্র-সহস্র-লাভে আপনাকে কৃতকৃত্য জ্ঞান করিলেন। মহাতপা কশ্যপ পত্নীদিগকে “তোমরা স্বীয় প্রযত্নে গর্ভধারণ করিও” এই আদেশ দিয়া অরণ্যানী প্রবেশ করিলেন।
বহুকালের পর কদ্রু অণ্ড-সহস্র ও বিনতা অণ্ডদ্বয় প্রসব করিলেন। পরিচারিকাগণ সেই সমুদয় অণ্ড উপস্বেদযুক্ত [তাপসংযুক্ত– ডিমে তা দেওয়া হয় এইরূপ।] ভাণ্ডমধ্যে পঞ্চশত বৎসর রাখিলেন। তৎপরে কদ্রু-প্রসূত অণ্ডসহস্র হইতে এক একটি পুৎত্র বহির্গত হইল। কিন্তু বিনতার অণ্ডদ্বয় তদবস্থই রহিল। পুৎত্রার্থিনী বিনতা তদ্দর্শনে সাতিশয় লজ্জিতা হইয়া স্ব-প্রসূত অণ্ডদ্বয়ের অন্যতর ভেদ করিয়া দেখিলেন যে, পুৎত্রের পূর্ব্বার্দ্ধকায়মাত্র সুসঙ্ঘটিত হইয়াছে, অন্যার্দ্ধ অতিশয় অপক্কাবস্থায় রহিয়াছে। তখন সেই সদ্যঃ-প্রসূত পুৎত্র সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া স্বীয় জননীকে অভিসম্পাত করিলেন, “লোভ-পরতন্ত্র হইয়া অপক্কাবস্থায় অণ্ড-ভেদনপূর্ব্বক আমাকে তন্মধ্য হইতে বাহির করা তোমার নিতান্ত অসদৃশ কর্ম্ম হইয়াছে; অতত্রব তুমি যে সপত্নীর সহিত স্পর্দ্ধাপ্রযুক্ত এই অন্যায্য কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে, পঞ্চাশৎ বৎসর তোমাকে সেই সপত্নীর দাসী হইয়া থাকিতে হইবে।” আরও বলিলেন, “এই অপর অণ্ডমধ্যে তোমার যে পুৎত্র আছে, যদি অকালে অণ্ডভেদ না কর এবং তাহাকেও আমার ন্যায় হীনাঙ্গ বা বিকলাঙ্গ না কর, তবে সেই তোমাকে দাসীত্ব হইতে মোচন করিবে। যদি তুমি আপন পুৎত্রকে বিশিষ্টরূপে বল বিক্রমশালী করিতে চাও, তবে ধৈর্য্যধারণপূর্ব্বক ইহার জন্মকাল প্রতীক্ষা কর। ইহার জন্মের আরও পঞ্চশত বৎসরকাল বিলম্ব আছে।”
অরুণ এইরূপে জননীকে শাপ প্রদান করিয়া আকাশপথে আরোহণপূর্ব্বক সূর্য্যদেবের সারথ্যকার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। সর্পভোজী গরুড়ও যথাকালে জন্মিলেন। তিনি জন্মিবামাত্র ক্ষুধাতুর হইয়া স্বীয় জননী বিনতাকে পরিত্যাগপূর্ব্বক বিধাতৃবিহিত স্বকীয় আহার-সংগ্রহার্থে আকাশমণ্ডলে উড্ডীয়মান হইলেন।
সপ্তদশ অধ্যায়
সমুদ্রমন্থনের প্রশ্ন
সমুদ্রমন্থনের প্রশ্ন
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে তপোধন! ঐ সময়ে উচ্চৈঃশ্রবা কদ্রু ও বিনতার সমীপ দিয়া গমন করিতেছিল। দেবগণ অমৃতমন্থনকালে উৎপন্ন সেই সর্ব্বোৎকৃষ্ট ও সর্ব্ব-সুলক্ষণ-সম্পন্ন হয়-রত্নকে গমন করিতে দেখিয়া প্রশংসা করিতে লাগিলেন।
শৌনক কহিলেন, হে সূতপুৎত্র! তুমি কহিলে, সেই মহাবীর্য্য অশ্বরাজ সুধা-মন্থনসময়ে উৎপন্ন হয়; অতএব জিজ্ঞাসা করিতেছি, বল, দেবগণ কি কারণে ও কোন্ স্থানে অমৃত-মন্থন করিয়াছিলেন?
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, সুমেরু নামে এক পরম রমণীয় মহীধর আছে। যাহার সুবর্ণময় শৃঙ্গ-পরম্পরার প্রভাজাল প্রদীপ্ত সূর্য্যের প্রভামণ্ডলকে তিরস্কৃত করে, যে অপ্রমেয় ভূধর দেবগণ ও গন্ধর্ব্বগণের আবাস-স্থান, যাহাতে দুর্দ্দান্ত হিংস্র-জন্তুগণ সর্ব্বদা বিচরণ করে, যে পর্ব্বত প্রতিদিন রজনীযোগে নানা প্রকার ওষধি দ্বারা আলোকময় হয় এবং যে পর্ব্বত উন্নতি দ্বারা অমরলোক আচ্ছন্ন করিয়া রহিয়াছে, নানাবিধ নদ নদী ও তরুলতাগণ যাহাকে সুরভিত করিয়াছে, মনোহর বিহঙ্গমগণ যাহার বৃক্ষশাখায় বসিয়া সর্ব্বদা সুমধুরস্বরে কলরব করিতেছে, যে সুবর্ণময় মহীধর প্রাকৃত-জনসমূহের মনেরও অগোচর, একদা, তপোনিয়মানুরক্ত, প্রবলপরাক্রান্ত দেবগণ সেই পর্ব্বতের নানারত্ন সুশোভিত শিখরদেশে উপবেশনপূর্ব্বক অমৃতপ্রাপ্তিবিষয়ক মন্ত্রণা করিতেছিলেন। ভগবান্ ভূতভাবন নারায়ণ দেবতাদিগকে এইরূপে মন্ত্রণা করিতে ব্যাসক্ত দেখিয়া ব্রহ্মাকে কহিলেন, “দেবগণ ও অসুরগণ একত্র হইয়া জলধিমন্থন করিতে আরম্ভ করুন। মন্থন করিলে সমুদ্র হইতে অমৃত উত্থিত হইবে।” তদনন্তর দেবগণকে কহিলেন, “হে সুরগণ! তোমরা সমুদ্র-মন্থন কর, কিন্তু বহুবিধ ওষধি এবং রত্নসমূহ পাইয়াও মন্থনে ক্ষান্ত হইও না। ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক অনবরতই মন্থন করিতে থাকিবে, তাহা হইলেই তোমাদের অমৃতলাভ হইবে, সন্দেহ নাই।”
শৌনক কহিলেন, হে সূতপুৎত্র! তুমি কহিলে, সেই মহাবীর্য্য অশ্বরাজ সুধা-মন্থনসময়ে উৎপন্ন হয়; অতএব জিজ্ঞাসা করিতেছি, বল, দেবগণ কি কারণে ও কোন্ স্থানে অমৃত-মন্থন করিয়াছিলেন?
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, সুমেরু নামে এক পরম রমণীয় মহীধর আছে। যাহার সুবর্ণময় শৃঙ্গ-পরম্পরার প্রভাজাল প্রদীপ্ত সূর্য্যের প্রভামণ্ডলকে তিরস্কৃত করে, যে অপ্রমেয় ভূধর দেবগণ ও গন্ধর্ব্বগণের আবাস-স্থান, যাহাতে দুর্দ্দান্ত হিংস্র-জন্তুগণ সর্ব্বদা বিচরণ করে, যে পর্ব্বত প্রতিদিন রজনীযোগে নানা প্রকার ওষধি দ্বারা আলোকময় হয় এবং যে পর্ব্বত উন্নতি দ্বারা অমরলোক আচ্ছন্ন করিয়া রহিয়াছে, নানাবিধ নদ নদী ও তরুলতাগণ যাহাকে সুরভিত করিয়াছে, মনোহর বিহঙ্গমগণ যাহার বৃক্ষশাখায় বসিয়া সর্ব্বদা সুমধুরস্বরে কলরব করিতেছে, যে সুবর্ণময় মহীধর প্রাকৃত-জনসমূহের মনেরও অগোচর, একদা, তপোনিয়মানুরক্ত, প্রবলপরাক্রান্ত দেবগণ সেই পর্ব্বতের নানারত্ন সুশোভিত শিখরদেশে উপবেশনপূর্ব্বক অমৃতপ্রাপ্তিবিষয়ক মন্ত্রণা করিতেছিলেন। ভগবান্ ভূতভাবন নারায়ণ দেবতাদিগকে এইরূপে মন্ত্রণা করিতে ব্যাসক্ত দেখিয়া ব্রহ্মাকে কহিলেন, “দেবগণ ও অসুরগণ একত্র হইয়া জলধিমন্থন করিতে আরম্ভ করুন। মন্থন করিলে সমুদ্র হইতে অমৃত উত্থিত হইবে।” তদনন্তর দেবগণকে কহিলেন, “হে সুরগণ! তোমরা সমুদ্র-মন্থন কর, কিন্তু বহুবিধ ওষধি এবং রত্নসমূহ পাইয়াও মন্থনে ক্ষান্ত হইও না। ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক অনবরতই মন্থন করিতে থাকিবে, তাহা হইলেই তোমাদের অমৃতলাভ হইবে, সন্দেহ নাই।”
অষ্টাদশ অধ্যায়
সমুদ্রমন্থনারম্ভ
সমুদ্রমন্থনারম্ভ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দেবগণ অমৃত-মন্থনে আদেশ পাইয়া মন্থর-ভূধরকে মন্থনদণ্ড করিতে মনস্থ করিলেন, কিন্তু গগনস্পর্শী শিখরমালায় সুশোভিত, বহুতর লতাজালে জড়িত, নানাজাতীয় বিহঙ্গমনিনাদে নিনাদিত, বহুবিধ-ব্যালকুল [সর্পসমূহ] সমাকীর্ণ, অপ্সরাগণ ও কিন্নরগণ কর্ত্তৃক নিরন্তর সেবিত, একাদশ সহস্র যোজন উন্নত এবং তৎপরিমাণে ভূগর্ভে নিখাত [প্রোথিত- যতটুকু পোঁতা] গিরিবর মন্দরের উত্তোলনে অশক্ত হইয়া ব্রহ্মা ও নারায়ণের সমীপে গিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, “আপনারা আমাদিগের হিতসাধনার্থে কোন সদুপায় নির্দ্ধারণ ও মন্দরোদ্ধরণে প্রযত্ন করুন।”
অপ্রমেয়াত্মা ভগবান্ বিষ্ণু ও ব্রহ্মা দেবতাদিগের প্রার্থনায় সম্মতিপ্রকাশপূর্ব্বক ভুজঙ্গাধিপতি অনন্তদেবকে মন্দরোত্তোলনে অনুমতি করিলেন। মহাবল-পরাক্রান্ত অনন্ত তাঁহাদের আদেশ পাইয়া সমস্ত বন ও বনবাসিগণের সহিত সেই গিরিবরের উদ্ধরণ করিলেন। অনন্তর দেবগণ অনন্তদেবের সহিত নীরনিধিতীরে সমুপস্থিত হইয়া সমুদ্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “আমরা অমৃতলাভের জন্য তোমার জল মন্থন করিব।” অর্ণব কহিলেন, “মন্দর-ভ্রমণ দ্বারা আমাকে অনেক ক্লেশ সহ্য করিতে হইবে, অতএব আমিও যেন লাভের অংশ পাই।” তদনন্তর সমস্ত দেবগণ ও অসুরগণ কূর্ম্মরাজকে কহিলেন, “তুমি এই গিরিবরের অধিষ্ঠান [আধার] হও।” কূর্ম্মরাজ তথাস্তু বলিয়া স্বীয়পৃষ্ঠে মন্দরগিরি ধারণ করিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র কূর্ম্মরাজ-পৃষ্ঠে অধিষ্ঠিত গিরিরাজকে যন্ত্রসহকারে চালিত করিলেন।
এইরূপে দেবগণ মন্দর-গিরিকে মন্থনদণ্ড ও বাসুকিকে মন্থন-রজ্জু করিয়া অম্ভোনিধিমন্থন করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবল-পরাক্রান্ত দানবদল রজ্জুভূত বাসুকির মুখদেশ ও সুরগণ পুচ্ছদেশ ধারণ করিলেন। ভগবান্ অনন্তদেব সাক্ষাৎ নারায়ণের অংশস্বরূপ, এই নিমিত্ত তিনি আপন দুঃসহ বিষবেগ সংবরণ করিলেন। মন্থনকালে দেবগণ নাগরাজকে এমত বলপূর্ব্বক আকর্ষণ করিতে লাগিলেন যে তাঁহার মুখ হইতে নিরন্তর অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সহিত নিঃশ্বাসবায়ু নির্গত হইতে লাগিল। ঐ ধূমাগ্নি-সহিত নিশ্বাসবায়ু সচপলা মেঘমালারূপে পরিণত হইয়া, নিতান্ত শ্রান্ত ও একান্ত সন্তপ্ত দেবাসুরগণের উপর বারিবর্ষণ করিতে লাগিল এবং সেই গিরিবরের শৃঙ্গ হইতে পুষ্পবৃষ্টি হইতে লাগিল।
দেবাসুরগণ মন্দর-ভূধর দ্বারা এইরূপে সমুদ্রমন্থনে প্রবৃত্ত হইলেন। মথ্যমান মহোদধি হইতে ঘোরতর ঘনঘটার গভীর গর্জ্জনের ন্যায় ভয়ঙ্কর শব্দ উঠিল। মন্দরাদ্রির মর্দ্দনে সমুদ্রস্থ শত শত জলচরগণ বিনিষ্পিষ্ট হইয়া পঞ্চত্ব পাইল এবং পাতাল তলস্থ অন্যান্য নানাবিধ জলজন্তুগণও প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল। সেই গিরিরাজ অনবরত ভ্রাম্যমাণ হওয়াতে তাহার শিখরস্থ প্রকাণ্ড বৃক্ষ-সকল পরস্পর সংঘৃষ্ট হইয়া বিহঙ্গকুলের সহিত ভূতলে পতিত হইতে লাগিল। মন্দরগিরি সেই সকল তরুগণের পরস্পর সঙ্ঘর্ষণে সমুদ্ভুত হুতাশন-শিখা দ্বারা সমাবৃত হইয়া তড়িৎপটলাবৃত [বিদ্যুৎশ্রেণীবেষ্টিত] নবীন নীরদের ন্যায় সাতিশয় শোভমান হইল। পরে ঐ অনল ক্রমে ক্রমে প্রবল হইয়া অরণ্যানীবিনির্গত কুঞ্জর, কেশরিগণ ও অন্যান্য বন্যজন্তুগণকে দগ্ধ করিতে লাগিল। সঙ্ঘর্ষণজ হুতাশন এইরূপে পর্ব্বতস্থ সমস্ত জীবজন্তুগণকে দগ্ধ করিতে আরম্ভ করিলে সুরপতি ইন্দ্র মেঘ সমুদ্ভুত সলিল-সেচন দ্বারা তাহা নির্ব্বাণ করিলেন।
অনন্তর নানাবিধ মহীরুহগণের নির্য্যাস ও মহৌষধিরস গলিয়া সমুদ্রে পতিত হইতে লাগিল। অমৃতসম-গুণসম্পন্ন সেই সমস্ত বৃক্ষনির্য্যাস ও কাঞ্চননিস্রাবের [গলিত সোনার ধারা- সোনার কস] প্রভাবে দেবগণ অমরত্ব প্রাপ্ত হইলেন। সমুদ্রজল পূর্ব্বোক্ত বহুবিধ উৎকৃষ্ট রস দ্বারা মিশ্রিত হইয়া ক্ষীররূপে পরিণত হইল। সেই ক্ষীর হইতে ঘৃত উৎপন্ন হয়।
তদনন্তর দেবগণ পদ্মাসনস্থ ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, “ভগবান্! নারায়ণ ব্যতিরেকে আমরা সকলে নিতান্ত পরিশ্রান্ত হইয়াছি। কোন্ কালে মন্থন আরম্ভ করিয়াছিলেন, কিন্তু এ পর্য্যন্ত অমৃত সমুত্থিত হয় নাই।” তখন ব্রহ্মা নারায়ণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “তুমি ইহাদের বলাধান কর; তুমি ব্যতিরেকে এ বিষয়ে আর গত্যন্তর নাই।” নারায়ণ কহিলেন, “যাঁহারা এই কার্য্যে ব্যাপৃত আছেন, আমি তাঁহাদের সকলকেই বল প্রদান করিতেছি, তাঁহারা সকলে একত্রিত হইয়া অম্ভোনিধিকে আলোড়িত করুন।”
সমস্ত দেব-দানবগণ বিষ্ণুর এই বাক্য শ্রবণ করিবামাত্র বলপ্রাপ্ত হইলেন এবং সকলে একত্র হইয়া পুনর্ব্বার পূর্ব্বাপেক্ষা প্রবলরূপে জলনিধি মন্থন করিতে আরম্ভ করিলেন। তদনন্তর মথ্যমান মহাসাগর হইতে সুশীতলরশ্মি-সম্পন্ন, সৌম্যমূর্ত্তি, নির্ম্মল শীতাংশু [চন্দ্র] উৎপন্ন হইলেন। তৎপরে ঘৃত হইতে শ্বেত পদ্মোপবিষ্টা লক্ষ্মী ও সুরাদেবী উঠিলেন। উচ্চৈঃশ্রবা নামে শ্বেতবর্ণ হয়-রত্ন ও ঘৃত হইতে উৎপন্ন হইল। পরে মহোজ্জল কৌস্তুভ-মণি ঘৃত হইতে সমুৎপন্ন হইয়া নারায়ণের বক্ষঃস্থলে লম্বমান হইল। লক্ষ্মী, সুরাদেবী, চন্দ্র ও মনোজব [মনের ন্যায় গতিশীল] অশ্বোত্তম উচ্চৈঃশ্রবা সূর্য্যমার্গাবলম্বনপূর্ব্বক সুরপক্ষে গমন করিলেন। পরিশেষে মূর্ত্তিমান্ ধন্বন্তরি অমৃত-পূর্ণ শ্বেতবর্ণ কমণ্ডলু হস্তে লইয়া সমুদ্র হইতে আবির্ভূত হইলেন। দৈত্যগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার নিরীক্ষণ করিয়া “এই অমৃত আমার, এই অমৃত আমার” এই বলিয়া ঘোরতর কোলাহল করিতে আরম্ভ করিল। তদনন্তর শ্বেতকায়, দন্তচতুষ্টয়-বিশিষ্ট ঐরাবত নামে মহাগজ সমুৎপন্ন হইল। বজ্রধর ইন্দ্র তাহাকে অধিকার করিলেন। সুরাসুর তথাপি ক্ষান্ত না হইয়া অনবরতই মন্থন করিতে লাগিলেন। তাহাতে কালকুট গরল উৎপন্ন হইল। সধূম জ্বলদগ্নির ন্যায় সেই ভয়ঙ্কর গরল ধরণীতল আকুল করিল। কালকূটের কটুগন্ধ আঘ্রাণ করিয়া ত্রিলোকী মূর্চ্ছিত হইল। ব্রহ্মা তদবলোকনে ভীত হইয়া অনুরোধ করাতে সাক্ষাৎ মন্ত্রমূর্ত্তি ভগবান্ ভবানীপতি তৎক্ষণাৎ ঐ বিষম বিষরাশি পান করিয়া কণ্ঠে ধারণপূর্ব্বক ত্রৈলোক্য রক্ষা করিলেন। তদবধি তিনি নীলকণ্ঠ নামে খ্যাত হইয়াছেন।
দানবগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার-নিরীক্ষণে হতাশ হইয়া অমৃত ও লক্ষ্মীলাভার্থ দেবতাদিগের সহিত ভয়ঙ্কর বিরোধ আরম্ভ করিল। তখন ভগবান্ নারায়ণ মোহিনী-মায়া আশ্রয় করিয়া নারীরূপ ধারণপূর্ব্বক অসুরসমূহের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। মূঢ়মতি দানবদল মোহিনীরূপধারী ভগবানের অপূর্ব্ব রূপলাবণ্যদর্শনে মোহিত ও তদ্গতচিত্ত হইয়া তাঁহাকে অমৃত সমর্পণ করিল।
অপ্রমেয়াত্মা ভগবান্ বিষ্ণু ও ব্রহ্মা দেবতাদিগের প্রার্থনায় সম্মতিপ্রকাশপূর্ব্বক ভুজঙ্গাধিপতি অনন্তদেবকে মন্দরোত্তোলনে অনুমতি করিলেন। মহাবল-পরাক্রান্ত অনন্ত তাঁহাদের আদেশ পাইয়া সমস্ত বন ও বনবাসিগণের সহিত সেই গিরিবরের উদ্ধরণ করিলেন। অনন্তর দেবগণ অনন্তদেবের সহিত নীরনিধিতীরে সমুপস্থিত হইয়া সমুদ্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “আমরা অমৃতলাভের জন্য তোমার জল মন্থন করিব।” অর্ণব কহিলেন, “মন্দর-ভ্রমণ দ্বারা আমাকে অনেক ক্লেশ সহ্য করিতে হইবে, অতএব আমিও যেন লাভের অংশ পাই।” তদনন্তর সমস্ত দেবগণ ও অসুরগণ কূর্ম্মরাজকে কহিলেন, “তুমি এই গিরিবরের অধিষ্ঠান [আধার] হও।” কূর্ম্মরাজ তথাস্তু বলিয়া স্বীয়পৃষ্ঠে মন্দরগিরি ধারণ করিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র কূর্ম্মরাজ-পৃষ্ঠে অধিষ্ঠিত গিরিরাজকে যন্ত্রসহকারে চালিত করিলেন।
এইরূপে দেবগণ মন্দর-গিরিকে মন্থনদণ্ড ও বাসুকিকে মন্থন-রজ্জু করিয়া অম্ভোনিধিমন্থন করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবল-পরাক্রান্ত দানবদল রজ্জুভূত বাসুকির মুখদেশ ও সুরগণ পুচ্ছদেশ ধারণ করিলেন। ভগবান্ অনন্তদেব সাক্ষাৎ নারায়ণের অংশস্বরূপ, এই নিমিত্ত তিনি আপন দুঃসহ বিষবেগ সংবরণ করিলেন। মন্থনকালে দেবগণ নাগরাজকে এমত বলপূর্ব্বক আকর্ষণ করিতে লাগিলেন যে তাঁহার মুখ হইতে নিরন্তর অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সহিত নিঃশ্বাসবায়ু নির্গত হইতে লাগিল। ঐ ধূমাগ্নি-সহিত নিশ্বাসবায়ু সচপলা মেঘমালারূপে পরিণত হইয়া, নিতান্ত শ্রান্ত ও একান্ত সন্তপ্ত দেবাসুরগণের উপর বারিবর্ষণ করিতে লাগিল এবং সেই গিরিবরের শৃঙ্গ হইতে পুষ্পবৃষ্টি হইতে লাগিল।
দেবাসুরগণ মন্দর-ভূধর দ্বারা এইরূপে সমুদ্রমন্থনে প্রবৃত্ত হইলেন। মথ্যমান মহোদধি হইতে ঘোরতর ঘনঘটার গভীর গর্জ্জনের ন্যায় ভয়ঙ্কর শব্দ উঠিল। মন্দরাদ্রির মর্দ্দনে সমুদ্রস্থ শত শত জলচরগণ বিনিষ্পিষ্ট হইয়া পঞ্চত্ব পাইল এবং পাতাল তলস্থ অন্যান্য নানাবিধ জলজন্তুগণও প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল। সেই গিরিরাজ অনবরত ভ্রাম্যমাণ হওয়াতে তাহার শিখরস্থ প্রকাণ্ড বৃক্ষ-সকল পরস্পর সংঘৃষ্ট হইয়া বিহঙ্গকুলের সহিত ভূতলে পতিত হইতে লাগিল। মন্দরগিরি সেই সকল তরুগণের পরস্পর সঙ্ঘর্ষণে সমুদ্ভুত হুতাশন-শিখা দ্বারা সমাবৃত হইয়া তড়িৎপটলাবৃত [বিদ্যুৎশ্রেণীবেষ্টিত] নবীন নীরদের ন্যায় সাতিশয় শোভমান হইল। পরে ঐ অনল ক্রমে ক্রমে প্রবল হইয়া অরণ্যানীবিনির্গত কুঞ্জর, কেশরিগণ ও অন্যান্য বন্যজন্তুগণকে দগ্ধ করিতে লাগিল। সঙ্ঘর্ষণজ হুতাশন এইরূপে পর্ব্বতস্থ সমস্ত জীবজন্তুগণকে দগ্ধ করিতে আরম্ভ করিলে সুরপতি ইন্দ্র মেঘ সমুদ্ভুত সলিল-সেচন দ্বারা তাহা নির্ব্বাণ করিলেন।
অনন্তর নানাবিধ মহীরুহগণের নির্য্যাস ও মহৌষধিরস গলিয়া সমুদ্রে পতিত হইতে লাগিল। অমৃতসম-গুণসম্পন্ন সেই সমস্ত বৃক্ষনির্য্যাস ও কাঞ্চননিস্রাবের [গলিত সোনার ধারা- সোনার কস] প্রভাবে দেবগণ অমরত্ব প্রাপ্ত হইলেন। সমুদ্রজল পূর্ব্বোক্ত বহুবিধ উৎকৃষ্ট রস দ্বারা মিশ্রিত হইয়া ক্ষীররূপে পরিণত হইল। সেই ক্ষীর হইতে ঘৃত উৎপন্ন হয়।
তদনন্তর দেবগণ পদ্মাসনস্থ ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, “ভগবান্! নারায়ণ ব্যতিরেকে আমরা সকলে নিতান্ত পরিশ্রান্ত হইয়াছি। কোন্ কালে মন্থন আরম্ভ করিয়াছিলেন, কিন্তু এ পর্য্যন্ত অমৃত সমুত্থিত হয় নাই।” তখন ব্রহ্মা নারায়ণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “তুমি ইহাদের বলাধান কর; তুমি ব্যতিরেকে এ বিষয়ে আর গত্যন্তর নাই।” নারায়ণ কহিলেন, “যাঁহারা এই কার্য্যে ব্যাপৃত আছেন, আমি তাঁহাদের সকলকেই বল প্রদান করিতেছি, তাঁহারা সকলে একত্রিত হইয়া অম্ভোনিধিকে আলোড়িত করুন।”
সমস্ত দেব-দানবগণ বিষ্ণুর এই বাক্য শ্রবণ করিবামাত্র বলপ্রাপ্ত হইলেন এবং সকলে একত্র হইয়া পুনর্ব্বার পূর্ব্বাপেক্ষা প্রবলরূপে জলনিধি মন্থন করিতে আরম্ভ করিলেন। তদনন্তর মথ্যমান মহাসাগর হইতে সুশীতলরশ্মি-সম্পন্ন, সৌম্যমূর্ত্তি, নির্ম্মল শীতাংশু [চন্দ্র] উৎপন্ন হইলেন। তৎপরে ঘৃত হইতে শ্বেত পদ্মোপবিষ্টা লক্ষ্মী ও সুরাদেবী উঠিলেন। উচ্চৈঃশ্রবা নামে শ্বেতবর্ণ হয়-রত্ন ও ঘৃত হইতে উৎপন্ন হইল। পরে মহোজ্জল কৌস্তুভ-মণি ঘৃত হইতে সমুৎপন্ন হইয়া নারায়ণের বক্ষঃস্থলে লম্বমান হইল। লক্ষ্মী, সুরাদেবী, চন্দ্র ও মনোজব [মনের ন্যায় গতিশীল] অশ্বোত্তম উচ্চৈঃশ্রবা সূর্য্যমার্গাবলম্বনপূর্ব্বক সুরপক্ষে গমন করিলেন। পরিশেষে মূর্ত্তিমান্ ধন্বন্তরি অমৃত-পূর্ণ শ্বেতবর্ণ কমণ্ডলু হস্তে লইয়া সমুদ্র হইতে আবির্ভূত হইলেন। দৈত্যগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার নিরীক্ষণ করিয়া “এই অমৃত আমার, এই অমৃত আমার” এই বলিয়া ঘোরতর কোলাহল করিতে আরম্ভ করিল। তদনন্তর শ্বেতকায়, দন্তচতুষ্টয়-বিশিষ্ট ঐরাবত নামে মহাগজ সমুৎপন্ন হইল। বজ্রধর ইন্দ্র তাহাকে অধিকার করিলেন। সুরাসুর তথাপি ক্ষান্ত না হইয়া অনবরতই মন্থন করিতে লাগিলেন। তাহাতে কালকুট গরল উৎপন্ন হইল। সধূম জ্বলদগ্নির ন্যায় সেই ভয়ঙ্কর গরল ধরণীতল আকুল করিল। কালকূটের কটুগন্ধ আঘ্রাণ করিয়া ত্রিলোকী মূর্চ্ছিত হইল। ব্রহ্মা তদবলোকনে ভীত হইয়া অনুরোধ করাতে সাক্ষাৎ মন্ত্রমূর্ত্তি ভগবান্ ভবানীপতি তৎক্ষণাৎ ঐ বিষম বিষরাশি পান করিয়া কণ্ঠে ধারণপূর্ব্বক ত্রৈলোক্য রক্ষা করিলেন। তদবধি তিনি নীলকণ্ঠ নামে খ্যাত হইয়াছেন।
দানবগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার-নিরীক্ষণে হতাশ হইয়া অমৃত ও লক্ষ্মীলাভার্থ দেবতাদিগের সহিত ভয়ঙ্কর বিরোধ আরম্ভ করিল। তখন ভগবান্ নারায়ণ মোহিনী-মায়া আশ্রয় করিয়া নারীরূপ ধারণপূর্ব্বক অসুরসমূহের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। মূঢ়মতি দানবদল মোহিনীরূপধারী ভগবানের অপূর্ব্ব রূপলাবণ্যদর্শনে মোহিত ও তদ্গতচিত্ত হইয়া তাঁহাকে অমৃত সমর্পণ করিল।
ঊনবিংশ অধ্যায়
রাহুর মস্তকচ্ছেদ
রাহুর মস্তকচ্ছেদ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, অনন্তর সমস্ত দৈত্যগণ একত্রিত হইয়া নানাপ্রকার অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক দেবগণকে আক্রমণ করিল। তদবলোকনে মহাপ্রভাবশালী ভগবান নারায়ণ নরদেব সমভিব্যাহারে দানবেন্দ্রদিগকে বঞ্চনা করিয়া অমৃত হরণ করিলেন। অনন্তর দেবগণ বিষ্ণুর নিকট হইতে সেই অমৃত লইয়া পরমাহ্লাদে পান করিতে বসিলেন। দেবগণ অমৃত পান করিতে আরম্ভ করিলে রাহু নামে এক দুষ্ট দানব অবসর বুঝিয়া দেবরূপ ধারণপূর্ব্বক সুরগণের সহিত অমৃতপান করিতে বসিয়াছিল। অমৃত রাহুর কণ্ঠদেশমাত্র গমন করিয়াছে, এমত সময়ে চন্দ্র ও সূর্য্য দেবতাদিগের হিতসাধনার্থে ঐ গুপ্তবিষয় ব্যক্ত করিয়া দিলেন। ভগবান্ চক্রপাণি স্বীয় সুদর্শনাস্ত্র দ্বারা তৎক্ষণাৎ সেই দুষ্ট দানবের শিরচ্ছেদন করিলেন।
রাহুর পর্ব্বত-শিখরাকার প্রকাণ্ড মস্তক ছেদনমাত্রে গগনমণ্ডলে আরোহণ করিয়া ভীষণ-নাদে গর্জ্জন করিতে লাগিল। তাহার কবন্ধকলেবর সকাননা, সদ্বীপা, সপর্ব্বতা বসুন্ধরাকে কম্পিত করিয়া ভূপৃষ্ঠে পতিত হইল। তদবধি চন্দ্র ও সূর্য্যের সহিত রাহুমুখের চিরশত্রুতা জন্মিল। এই নিমিত্তই অদ্যাপি ঐ রাহু মুখ তাঁহাদিগকে গ্রাস করিয়া থাকে। পরিশেষে ভগবান্ নারায়ণ মোহিনীবেশ পরিত্যাগ করিয়া অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক দানবগণকে আক্রমণ করিলেন।
রাহুর পর্ব্বত-শিখরাকার প্রকাণ্ড মস্তক ছেদনমাত্রে গগনমণ্ডলে আরোহণ করিয়া ভীষণ-নাদে গর্জ্জন করিতে লাগিল। তাহার কবন্ধকলেবর সকাননা, সদ্বীপা, সপর্ব্বতা বসুন্ধরাকে কম্পিত করিয়া ভূপৃষ্ঠে পতিত হইল। তদবধি চন্দ্র ও সূর্য্যের সহিত রাহুমুখের চিরশত্রুতা জন্মিল। এই নিমিত্তই অদ্যাপি ঐ রাহু মুখ তাঁহাদিগকে গ্রাস করিয়া থাকে। পরিশেষে ভগবান্ নারায়ণ মোহিনীবেশ পরিত্যাগ করিয়া অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক দানবগণকে আক্রমণ করিলেন।
দেবাসুর-সংগ্রাম
তদনন্তর লবণার্ণব-তীরে দেবাসুরগণের ঘোরতর সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। প্রাস, তোমর, ভিন্দিপাল প্রভৃতি সহস্র সহস্র তীক্ষ্মাগ্র শস্ত্রবর্ষণে রণস্থল আচ্ছন্ন হইল। খড়্গ, চক্র, গদা, শক্তি প্রভৃতি শস্ত্রাঘাতে দানবগণ রুধির বমনপূর্ব্বক মূর্চ্ছিত হইয়া রণশায়ী হইল। তাহাদিগের তপ্ত-কাঞ্চনাকার মস্তক কপাল পট্টিশাঘাতে ছিন্নভিন্ন হইয়া অনবরত ধরণীতলে পতিত হইতে লাগিল। যুদ্ধে হত দানবগণ রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া ধাতুরাগরঞ্জিত গিরিকূটের [পর্ব্বতশৃঙ্গের] ন্যায় ভূমিশয্যায় শয়ান রহিল। পরস্পরের শস্ত্র প্রহার দেখিয়া রণস্থলে হাহাকার শব্দ উঠিল। দেবগণ দূর হইতে লৌহময় পরিঘাঘাত ও নিকটে দৃঢ়মুষ্টি প্রহার করিয়া রণ করিতে আরম্ভ করিলেন। দানবেরাও ঐরূপ যুদ্ধ করিতে লাগিল। সংগ্রামের কলকলধ্বনি গগনমণ্ডল আচ্ছাদিত করিল। চারিদিকে কেবল ‘ছিন্ধি, ভিন্ধি, প্রধাব ঘাতয়, পাতয়, মারয়’ [ছেদন কর, ভগ্ন কর, বেগে দৌড়াইয়া অগ্রসর হও, আঘাত কর, পাতিত কর, বধ কর] ইত্যাদি ঘোরতর শব্দমাত্র শ্রুত হইতে লাগিল।
এইরূপে ভয়ঙ্কর সংগ্রাম হইতেছে, এমত সময়ে নর ও নারায়ণ রণস্থলে আগমন করিলেন। ভগবান্ নারায়ণ নরদেবের হস্তে দিব্য ধনুঃ সন্দর্শন করিয়া দানবকুল-ধূমকেতু স্বীয় চক্রাস্ত্র স্মরণ করিলেন। মহাপ্রভাবশালী, সূর্য্যসম-তেজস্বী, অপ্রতিহতবীর্য্য, ভীমদর্শন সেই অরিনিসূদন সুদর্শনচক্র স্মরণ মাত্রে নভোমণ্ডল হইতে অবতীর্ণ হইল। আজানুলম্বিতবাহু, ভগবান চক্রপাণি সেই প্রজ্বলিত হুতাশনাকার, ভয়ঙ্কর চক্র বিপক্ষপক্ষে প্রক্ষেপ করিলেন। নারায়ণ-বিক্ষিপ্ত ভীষণ সুদর্শনাস্ত্র মহাবেগে ধাবমান হইয়া সহস্র সহস্র দানবদলের প্রাণসংহার করিল। কোন স্থলে সমুজ্জ্বল হুতাসনের ন্যায় প্রজ্বলিত হইয়া দৈত্যকুল নিপাত করিল, কোথাও বা আকাশমণ্ডলে ও ধরাতলে পরিভ্রমণপূর্ব্বক পিশাচের ন্যায় তাহাদিগের রুধির পান করিতে লাগিল।
নবমেঘাকৃতি, মহাবল-পরাক্রান্ত দানবেরাও আকাশে উত্থিত হইয়া সহস্র সহস্র পর্ব্বত-নিক্ষেপ দ্বারা দেবগণকে আকুলিত করিল। তৎকালে ভগ্নসানু অতি প্রকাণ্ড মহীধরগণ পরস্পরাভিঘাতে ভয়ঙ্কর শব্দ করিয়া ঘোরতর মেঘের ন্যায় চতুর্দ্দিকে পতিত হইতে লাগিল। দুর্দ্দান্ত দানবগণ এইরূপ গভীর গর্জ্জনপূর্ব্বক নিরন্তর পর্ব্বত-বর্ষণ করিয়া সকাননা, সদ্বীপা মেদিনীকে কম্পান্বিত করিল। তখন নরদেব সুবর্ণমুখ শিলীমুখ [শাণিত শর– চোখা বাণ ] দ্বারা দানববিক্ষিপ্ত পর্ব্বতসমূহ বিদারণপূর্ব্বক নভোমণ্ডল ব্যাপ্ত করিলেন। মহাবলপরাক্রান্ত দানবগণ দেবগণ কর্ত্তৃক ভগ্নবল হইয়া এবং আকাশমণ্ডলে জ্বলন্তাগ্নিসদৃশ সুদর্শন-চক্রকে ক্রুদ্ধ দেখিয়া কেহ ভূগর্ভে, কেহ বা লবণার্ণগর্ভে প্রবিষ্ট হইল।
সুরগণ এইরূপে জয়লাভ করিয়া যথোচিত সৎকারপুবঃসর মন্দরগিরিকে স্বস্থানে সংস্থাপন করিলেন। জলধরগণ নভোমণ্ডল এবং সুরলোক নিনাদিত করিয়া যথাস্থানে প্রতিগমন করিল। অনন্তর ইন্দ্রাদি দেবগণ আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইয়া সেই অমৃতপূর্ণ কমণ্ডলু সুরক্ষিত করিয়া নারায়ণের নিকট সমর্পণ করিলেন।
এইরূপে ভয়ঙ্কর সংগ্রাম হইতেছে, এমত সময়ে নর ও নারায়ণ রণস্থলে আগমন করিলেন। ভগবান্ নারায়ণ নরদেবের হস্তে দিব্য ধনুঃ সন্দর্শন করিয়া দানবকুল-ধূমকেতু স্বীয় চক্রাস্ত্র স্মরণ করিলেন। মহাপ্রভাবশালী, সূর্য্যসম-তেজস্বী, অপ্রতিহতবীর্য্য, ভীমদর্শন সেই অরিনিসূদন সুদর্শনচক্র স্মরণ মাত্রে নভোমণ্ডল হইতে অবতীর্ণ হইল। আজানুলম্বিতবাহু, ভগবান চক্রপাণি সেই প্রজ্বলিত হুতাশনাকার, ভয়ঙ্কর চক্র বিপক্ষপক্ষে প্রক্ষেপ করিলেন। নারায়ণ-বিক্ষিপ্ত ভীষণ সুদর্শনাস্ত্র মহাবেগে ধাবমান হইয়া সহস্র সহস্র দানবদলের প্রাণসংহার করিল। কোন স্থলে সমুজ্জ্বল হুতাসনের ন্যায় প্রজ্বলিত হইয়া দৈত্যকুল নিপাত করিল, কোথাও বা আকাশমণ্ডলে ও ধরাতলে পরিভ্রমণপূর্ব্বক পিশাচের ন্যায় তাহাদিগের রুধির পান করিতে লাগিল।
নবমেঘাকৃতি, মহাবল-পরাক্রান্ত দানবেরাও আকাশে উত্থিত হইয়া সহস্র সহস্র পর্ব্বত-নিক্ষেপ দ্বারা দেবগণকে আকুলিত করিল। তৎকালে ভগ্নসানু অতি প্রকাণ্ড মহীধরগণ পরস্পরাভিঘাতে ভয়ঙ্কর শব্দ করিয়া ঘোরতর মেঘের ন্যায় চতুর্দ্দিকে পতিত হইতে লাগিল। দুর্দ্দান্ত দানবগণ এইরূপ গভীর গর্জ্জনপূর্ব্বক নিরন্তর পর্ব্বত-বর্ষণ করিয়া সকাননা, সদ্বীপা মেদিনীকে কম্পান্বিত করিল। তখন নরদেব সুবর্ণমুখ শিলীমুখ [শাণিত শর– চোখা বাণ ] দ্বারা দানববিক্ষিপ্ত পর্ব্বতসমূহ বিদারণপূর্ব্বক নভোমণ্ডল ব্যাপ্ত করিলেন। মহাবলপরাক্রান্ত দানবগণ দেবগণ কর্ত্তৃক ভগ্নবল হইয়া এবং আকাশমণ্ডলে জ্বলন্তাগ্নিসদৃশ সুদর্শন-চক্রকে ক্রুদ্ধ দেখিয়া কেহ ভূগর্ভে, কেহ বা লবণার্ণগর্ভে প্রবিষ্ট হইল।
সুরগণ এইরূপে জয়লাভ করিয়া যথোচিত সৎকারপুবঃসর মন্দরগিরিকে স্বস্থানে সংস্থাপন করিলেন। জলধরগণ নভোমণ্ডল এবং সুরলোক নিনাদিত করিয়া যথাস্থানে প্রতিগমন করিল। অনন্তর ইন্দ্রাদি দেবগণ আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইয়া সেই অমৃতপূর্ণ কমণ্ডলু সুরক্ষিত করিয়া নারায়ণের নিকট সমর্পণ করিলেন।
বিংশ অধ্যায়
নাগগণের প্রতি অভিশাপ
নাগগণের প্রতি অভিশাপ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ঋষিবর! অমৃতমন্থনসময়ে শ্রীমান্ অতুলতেজা উচ্চৈঃশ্রবানামক যে অশ্বরাজ জলনিধি হইতে সমুত্থিত হয়, তাহার সমস্ত বিবরণ বিশেষরূপে বর্ণিত হইল। কদ্রু সেই অশ্বরাজকে অবলোকন করিয়া স্বীয় সপত্নী বিনতাকে কহিলেন, “বিনতে! বল দেখি, উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্বের কিরূপ বর্ণ?” বিনতা কহিলেন, “উচ্চৈঃশ্রবাঃ শুক্লবর্ণ; তোমার কি বোধ হয়? আইস, এ বিষয়ে দুইজনে পণ করি।” কদ্রু কহিলেন, “হে মধুরহাসিনি! আমি বোধ করি, এই অশ্বের পুচ্ছ কৃষ্ণবর্ণ; আইস, এ বিষয়ে এই পণ করা যাউক যে, যাহার অনুমান মিথ্যা হইবে, সে দাসী হইয়া থাকিবে।” তাঁহারা এইরূপে পরস্পর দাস্যবৃত্তি অবলম্বনে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়া “কল্য এই অশ্বকে দেখিব” এই বলিয়া স্ব স্ব আবাসে প্রত্যাগমন করিলেন। কদ্রু নিজ নিকেতনে আগমন করিয়া কৌটিল্য [কুটিলতা –গুপ্ত ষড়যন্ত্র] করিবার মানসে স্বীয় সহস্র পুৎত্রের প্রতি আজ্ঞা করিলেন, “তোমাদিগকে কৃষ্ণরূপ ধারণপূর্ব্বক উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্বের পুচ্ছদেশে লম্বমান হইয়া তৎপুচ্ছের কৃষ্ণত্ব সম্পাদন করিতে হইবে। দেখিও যেন, আমাকে দাসীত্ব-শৃঙ্খলে বদ্ধ হইতে না হয়।” যে-সকল ভূজঙ্গম তদীয় আজ্ঞা-প্রতিপালনে পরাঙ্মুখ হইল, তিনি তাহাদিগকে এই অভিসম্পাত করিলেন, “তোমরা পাণ্ডুবংশাবতংস রাজর্ষি জনমেজয়ের সর্পসত্রে অগ্নিতে দগ্ধ হইবে।” সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা কদ্রুদত্ত সেই অতি নিষ্ঠুর শাপ স্বকর্ণে শ্রবণ করিলেন। পরে সর্পসংখ্যার আতিশষ্যপ্রযুক্ত কদ্রুদত্ত শাপ প্রজাবর্গের পরম শ্রেয়স্কর হইয়াছে বিবেচনা করিয়া অন্যান্য দেবগণের সহিত সাতিশয় আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিলেন এবং কহিলেন, “এই সকল মহাবল হিংস্র সর্পগণের বিষ অতিশয় তীব্র ও বীর্য্যশালী; সেই তীব্র বিষে প্রজাগণের সর্ব্বদাই অনিষ্ট-ঘটনা হইয়া থাকে; অতএব কদ্রু ইহাদিগকে এই শাপ দিয়া উত্তম কর্ম্ম করিয়াছেন। তাহারা যেমন সর্ব্বদা প্রজাগণের অহিতাচরণ করে, তেমনি দৈব তাহাদিগের উপর প্রাণান্তিক দণ্ডপাত করিয়াছেন।”
ব্রহ্মা দেবগণের সহিত এইরূপ আনন্দ প্রকাশ করিয়া কদ্রুকে সমুচিত সম্মান প্রদান করিলেন এবং মহর্ষি কশ্যপকে স্বীয় সন্নিধানে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, “হে পুণ্যশালিন্! যে সকল তীক্ষ্মবিষ মহাফণ ভুজঙ্গমগণ তোমার ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, কদ্রু তাহাদিগকে শাপ প্রদান করিয়াছেন, অতএব হে বৎস! এ বিষয়ে তোমার ক্রোধ করা বিধেয় নহে। যজ্ঞে সর্পকুল বিনষ্ট হইবে, ইহা পূর্ব্বাপর বর্ণিত আছে।” ব্রহ্মা কশ্যপ প্রজাপতিকে এইরূপে প্রসন্ন করিয়া তাঁহাকে বিষহরী বিদ্যা প্রদান করিলেন।
ব্রহ্মা দেবগণের সহিত এইরূপ আনন্দ প্রকাশ করিয়া কদ্রুকে সমুচিত সম্মান প্রদান করিলেন এবং মহর্ষি কশ্যপকে স্বীয় সন্নিধানে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, “হে পুণ্যশালিন্! যে সকল তীক্ষ্মবিষ মহাফণ ভুজঙ্গমগণ তোমার ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, কদ্রু তাহাদিগকে শাপ প্রদান করিয়াছেন, অতএব হে বৎস! এ বিষয়ে তোমার ক্রোধ করা বিধেয় নহে। যজ্ঞে সর্পকুল বিনষ্ট হইবে, ইহা পূর্ব্বাপর বর্ণিত আছে।” ব্রহ্মা কশ্যপ প্রজাপতিকে এইরূপে প্রসন্ন করিয়া তাঁহাকে বিষহরী বিদ্যা প্রদান করিলেন।
একবিংশ অধ্যায়
সমুদ্রবর্ণন
সমুদ্রবর্ণন
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কদ্রু ও বিনতা এইরূপে পরস্পর দাস্যবৃত্তি পণ করিয়া এবং তজ্জন্য সাতিশয় অমর্ষাবিষ্ট ও রোষপরবশ হইয়া সেই রাত্রি অতিবাহিত করিলেন। পরদিবস প্রভাতে সূর্য্যোদয় হইবামাত্র তাঁহারা দুইজনে অনতিদূরবর্ত্তী উচ্চৈঃশ্রবাঃ তুরঙ্গমকে দেখিবার মানসে কিয়দ্দুর গমন করিয়া অপ্রমেয়, অচিন্তনীয়, অগাধ, সর্ব্বভূতভয়াবহ, পরমপবিত্র অম্ভোনিধি অবলোকন করিলেন। যে জলধি তিমি [সমুদ্রের সুবৃহৎ মৎস্য], তিমিঙ্গিল [তিমিকে যে গিলিয়া থাকে– তিমি অপেক্ষাও বড় মাছ], মৎস্য, কচ্ছপ, মকর, নক্র-চক্র [দলবদ্ধ কুম্ভীর] প্রভৃতি সহস্র সহস্র ভয়ঙ্কর, বিকৃতাকার জলচরগণে এবং ভীষণাকার সর্পগণে নিরন্তর সমাকীর্ণ; চন্দ্র, লক্ষ্মী, উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্ব, পাঞ্চজন্য শঙ্খ, অমৃত, বাড়বানল ও সর্ব্বপ্রকার রত্ন যাহা হইতে উৎপন্ন; পর্ব্বতাধিরাজ মৈনাক ও জলাধিরাজ বরুণদেব যাহাতে সতত বাস করেন, যে সমুদ্র দানবগণের পরম মিত্র ও স্থলচর জন্তুগণের সাতিশয় ভয়াবহ শত্রু; যাহাতে ভয়ঙ্কর জলজন্তুসকল সর্ব্বদা ঘোরতর শব্দ করিতেছে এবং বায়ুবেগে অনবরত পর্ব্বতাকার তরঙ্গমালা সমুত্থিত হইতেছে, দেখিলে বোধ হয় যেন, সমুদ্র তরঙ্গরূপ হস্ত উত্তোলনপূর্ব্বক নিরন্তর নৃত্য করিতেছে; চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধি অনুসারে যাহার হ্রাস বৃদ্ধি হইয়া থাকে; অমিততেজাঃ ভগবান্ নারায়ণ বরাহরূপ ধারণপূর্ব্বক মধ্যে প্রবেশ করিয়া যাহার জল বিক্ষোভিত ও আবিল করিয়াছিলেন এবং যাহাতে যোগনিদ্রা অনুভব করিয়াছিলেন; ব্রত পরায়ণ ব্রহ্মর্ষি অত্রি শতবৎসরেও যাহার তলস্পর্শ করিতে পারেন নাই; অসুরগণ অরাজক যুদ্ধে পরাভূত হইয়া যাহার মধ্যে বাস করে; যে সমুদ্র স্বীয় গর্ভস্থ বাড়বানলকে সর্ব্বদা তোয়রূপ হবিঃ প্রদান করিতেছে, সহস্র সহস্র মহানদী পরস্পর স্পর্দ্ধা করিয়া যেন অভিসারিকার ন্যায় যাহাতে সতত সমাবেশ করিতেছে।
দ্বাবিংশ অধ্যায়
কদ্রু-বিনতার সাগরতীরে গমন
কদ্রু-বিনতার সাগরতীরে গমন
সৌতি কহিলেন, নাগগণ মাতৃশাপ শ্রবণানন্তর পরামর্শ করিল, “আমাদিগের জননীর অন্তঃকরণে স্নেহের লেশমাত্র নাই, সুতরাং তাঁহার মনোভিলাষ সফল না হইলে রোষপরবশ হইয়া আমাদিগকে ভস্মসাৎ করিবেন; কিন্তু মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইলে প্রসন্না হইয়া আমাদিগের শাপ-বিমোচন করিতে পারেন। অতএব চল, সকলে একমত হইয়া উচ্চৈঃশ্রবার পুচ্ছ কৃষ্ণবর্ণ করি।” নাগেরা এই অভিসন্ধি করিয়া ঐ অশ্বের পুচ্ছদেশে কৃষ্ণকেশরূপে পরিণত হইল। ইত্যবসরে দক্ষতনয়া কদ্রু ও বিনতা গগনমার্গে উঠিয়া বায়ুবেগে বিচলিত, গভীর নিনাদযুক্ত, তিমিঙ্গিলমকর-সার্থ [শ্রেণী– দল–ঝাঁক] সঙ্কুল, বহুবিধ ভীষণ জন্তুগণে সমাকীর্ণ, সকল রত্নের আকর, বরুণদেবের আবাসস্থান, নাগগণের বাসভবন, স্থানে স্থানে স্রোতস্বতীগণে পরিপূর্য্যমান, অপ্রমেয়, অচিন্তনীয়, অগাধ, অতি দুর্দ্ধর্ষ, অক্ষোভ্য, পবিত্রজলবিশিষ্ট, রমণীয় জলনিধি দর্শন করিতে করিতে পরম প্রীতি সহকারে তাহার অপর পারে উপস্থিত হইলেন।
রুরু-চরিত, ডুণ্ডুভ-উপাখ্যান, রুরুর সর্পমাত্র হিংসার কারণ, আস্তীকপর্ব্ব-খগম-ঋষিবৃত্তান্ত, সর্পযজ্ঞের প্রশ্ন, জরৎকারু-চরিত্র, জরৎকারুর বিবাহ
অষ্টম অধ্যায়
রুরু-চরিত
সূত কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! ভৃগুনন্দন চ্যবন সুকন্যার গর্ভে পরমতেজস্বী প্রমতি নামে এক পুৎত্র উৎপাদন করেন। ঘৃতাচীর গর্ভে প্রমতির রুরু-নামক এক সন্তান হয়। রুরুর ঔরসে প্রমদ্বরার গর্ভে শুনক নামে তনয় জন্মে। সেই মহাতেজা রুরুর সমস্ত বৃত্তান্ত সবিস্তর বর্ণনা করিতেছি, শ্রবণ করুন।
পূর্ব্বকালে সর্ব্বভূতহিতৈষী, সর্ব্ববিদ্যাবিশারদ, তপোনিরত স্থূলকেশ নামে এক মহর্ষি ছিলেন। ঐ সময়ে গন্ধর্ব্বরাজ বিশ্বাবসুর সংযোগে অপ্সরা মেনকা গর্ভবতী হইয়াছিল। অকরুণা মেনকা প্রসবকাল উপস্থিত দেখিয়া মহর্ষি স্থূলকেশের আশ্রমে গমন এবং তথায় গর্ভবিমোচন করিয়া নদীতীরে পলায়ন করিল। সেই গর্ভে এক পরমা সুন্দরী কুমারী জন্মিয়াছিল। তপোধনাগ্রণী স্থূলকেশ কিয়ৎক্ষণ পরে আশ্রমে উপস্থিত হইয়া সেই সুরকন্যাতুল্য সদ্যঃপ্রসূত কন্যাকে অসহায়া নির্জ্জনে পতিতা দেখিয়া কারুণ্যরসে আর্দ্রচিত্ত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ তাহাকে গ্রহণ করিয়া ঔরসকন্যা-নির্ব্বিশেষে লালন পালন করিতে লাগিলেন। তিনি স্বয়ং তাহার জাতকর্ম্মাদি সমস্ত কর্ম্ম বিধিপূর্ব্বক নির্ব্বাহ করিলেন। কন্যা সেই আশ্রমে শশিকলার ন্যায় দিনে দিনে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। মহর্ষি স্থূলকেশ সেই কন্যাকে কি রূপে, কি গুণে, কি শীলে সর্ব্বপ্রকারেই সমস্ত প্রমদাগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দেখিয়া তাহার নাম প্রমদ্বরা রাখিলেন।
একদা প্রমতিনন্দন রুরু স্থূলকেশের আশ্রমে সেই প্রমদ্বরাকে নিরীক্ষণ করিয়া অত্যন্ত কামাতুর হইলেন। পরে আপন বয়স্যগণ দ্বারা পিতার নিকট স্বীয় অভিলাষ জানাইলেন। প্রমতি তদনুসারে মহর্ষি স্থূলকেশের নিকট গিয়া আপন পুৎত্রের নিমিত্ত সেই কন্যা প্রার্থনা করিলেন। মহর্ষি স্থূলকেশ ফল্গুনী নক্ষত্রযুক্ত দিবসে বিবাহের দিন নির্দ্ধারিত করিয়া রুরুকে প্রমদ্বরা সম্প্রদান করিলেন।
একদা বরবর্ণিনী প্রমদ্বরা আপন সহচরীগণ সমভিব্যাহারে ক্রীড়াকৌতুক করিতে করিতে দৈবগত্যা প্রসুপ্ত ও কেলিভূমিতে পতিত এক কৃষ্ণসর্পকে পাদাহত করিল। সর্প ক্রুদ্ধ হইয়া বিষাক্ত দশন-পংক্তি দ্বারা তৎক্ষণাৎ তাহাকে দংশন করাতে সে বিবর্ণা, বিচেতনা ও ভ্রষ্টাভরণা হইয়া ছিন্নমূল কদলীর ন্যায় ভূতলে পড়িল। তদীয় সখীগণ তাহাকে মুক্তকেশা, ভ্রষ্টবেশা ও ভূপৃষ্ঠে পতিতা দেখিয়া বিষাদ-সাগরে নিমগ্ন হইয়া হাহাকার করিতে লাগিল। কিন্তু প্রমদ্বরা ভূজঙ্গবিষে অভিভূতা ও বিবর্ণা হইয়াও পুনর্ব্বার পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর রমণীয় হইয়া উঠিল। ফলতঃ তখন তাহাকে বোধ হইতে লাগিল, যেন অকাতরে নিদ্রা যাইতেছে।
তদীয় পিতা মহর্ষি স্থূলকেশ ও অন্যান্য মহর্ষিগণ প্রমদ্বরাকে বিগতাসু ও ভূতলে পতিত দেখিলেন। তদনন্তর স্বস্ত্যাত্রেয়, মহাজানু, কুশিক, শঙ্খমেখল, উদ্দালক, কঠ, শ্বেত, ভারদ্বাজ, কৌণকূৎস, আর্ষ্টিষেন, গৌতম, প্রমতি, রুরু ও অন্যান্য তপোবনবাসী তপোধনগণ কারুণ্য-রস-পরবশ হইয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। পরে সেই পরমাসুন্দরী কন্যাকে আশীবিষ বিষার্দ্দিত মৃত ও ভূতলে পতিত দেখিয়া সকলেই রোদন করিতে লাগিলেন। রুরু প্রিয়তমাকে তদবস্থ দেখিয়া নিতান্ত উদ্ভ্রান্ত ও একান্ত কাতর হইয়া তথা হইতে বহির্গমন করিলেন।
পূর্ব্বকালে সর্ব্বভূতহিতৈষী, সর্ব্ববিদ্যাবিশারদ, তপোনিরত স্থূলকেশ নামে এক মহর্ষি ছিলেন। ঐ সময়ে গন্ধর্ব্বরাজ বিশ্বাবসুর সংযোগে অপ্সরা মেনকা গর্ভবতী হইয়াছিল। অকরুণা মেনকা প্রসবকাল উপস্থিত দেখিয়া মহর্ষি স্থূলকেশের আশ্রমে গমন এবং তথায় গর্ভবিমোচন করিয়া নদীতীরে পলায়ন করিল। সেই গর্ভে এক পরমা সুন্দরী কুমারী জন্মিয়াছিল। তপোধনাগ্রণী স্থূলকেশ কিয়ৎক্ষণ পরে আশ্রমে উপস্থিত হইয়া সেই সুরকন্যাতুল্য সদ্যঃপ্রসূত কন্যাকে অসহায়া নির্জ্জনে পতিতা দেখিয়া কারুণ্যরসে আর্দ্রচিত্ত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ তাহাকে গ্রহণ করিয়া ঔরসকন্যা-নির্ব্বিশেষে লালন পালন করিতে লাগিলেন। তিনি স্বয়ং তাহার জাতকর্ম্মাদি সমস্ত কর্ম্ম বিধিপূর্ব্বক নির্ব্বাহ করিলেন। কন্যা সেই আশ্রমে শশিকলার ন্যায় দিনে দিনে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। মহর্ষি স্থূলকেশ সেই কন্যাকে কি রূপে, কি গুণে, কি শীলে সর্ব্বপ্রকারেই সমস্ত প্রমদাগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দেখিয়া তাহার নাম প্রমদ্বরা রাখিলেন।
একদা প্রমতিনন্দন রুরু স্থূলকেশের আশ্রমে সেই প্রমদ্বরাকে নিরীক্ষণ করিয়া অত্যন্ত কামাতুর হইলেন। পরে আপন বয়স্যগণ দ্বারা পিতার নিকট স্বীয় অভিলাষ জানাইলেন। প্রমতি তদনুসারে মহর্ষি স্থূলকেশের নিকট গিয়া আপন পুৎত্রের নিমিত্ত সেই কন্যা প্রার্থনা করিলেন। মহর্ষি স্থূলকেশ ফল্গুনী নক্ষত্রযুক্ত দিবসে বিবাহের দিন নির্দ্ধারিত করিয়া রুরুকে প্রমদ্বরা সম্প্রদান করিলেন।
একদা বরবর্ণিনী প্রমদ্বরা আপন সহচরীগণ সমভিব্যাহারে ক্রীড়াকৌতুক করিতে করিতে দৈবগত্যা প্রসুপ্ত ও কেলিভূমিতে পতিত এক কৃষ্ণসর্পকে পাদাহত করিল। সর্প ক্রুদ্ধ হইয়া বিষাক্ত দশন-পংক্তি দ্বারা তৎক্ষণাৎ তাহাকে দংশন করাতে সে বিবর্ণা, বিচেতনা ও ভ্রষ্টাভরণা হইয়া ছিন্নমূল কদলীর ন্যায় ভূতলে পড়িল। তদীয় সখীগণ তাহাকে মুক্তকেশা, ভ্রষ্টবেশা ও ভূপৃষ্ঠে পতিতা দেখিয়া বিষাদ-সাগরে নিমগ্ন হইয়া হাহাকার করিতে লাগিল। কিন্তু প্রমদ্বরা ভূজঙ্গবিষে অভিভূতা ও বিবর্ণা হইয়াও পুনর্ব্বার পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর রমণীয় হইয়া উঠিল। ফলতঃ তখন তাহাকে বোধ হইতে লাগিল, যেন অকাতরে নিদ্রা যাইতেছে।
তদীয় পিতা মহর্ষি স্থূলকেশ ও অন্যান্য মহর্ষিগণ প্রমদ্বরাকে বিগতাসু ও ভূতলে পতিত দেখিলেন। তদনন্তর স্বস্ত্যাত্রেয়, মহাজানু, কুশিক, শঙ্খমেখল, উদ্দালক, কঠ, শ্বেত, ভারদ্বাজ, কৌণকূৎস, আর্ষ্টিষেন, গৌতম, প্রমতি, রুরু ও অন্যান্য তপোবনবাসী তপোধনগণ কারুণ্য-রস-পরবশ হইয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। পরে সেই পরমাসুন্দরী কন্যাকে আশীবিষ বিষার্দ্দিত মৃত ও ভূতলে পতিত দেখিয়া সকলেই রোদন করিতে লাগিলেন। রুরু প্রিয়তমাকে তদবস্থ দেখিয়া নিতান্ত উদ্ভ্রান্ত ও একান্ত কাতর হইয়া তথা হইতে বহির্গমন করিলেন।
নবম অধ্যায়
ডুণ্ডুভ-উপাখ্যান
ডুণ্ডুভ-উপাখ্যান
সৌতি কহিলেন, সেই সকল মহাত্মা দ্বিজগণ তথায় উপবিষ্ট হইলে, রুরু সাতিশয় দুঃখিত হইয়া অরণ্যানী প্রবেশপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন এবং শোকে একান্ত ব্যাকুল হইয়া স্বীয় প্রিয়তমা প্রমদ্বরাকে স্মরণ করিয়া করুণস্বরে এইরূপে বিলাপ করিতে লাগিলেন – “আমার ইহা অপেক্ষা আর দুঃখের বিষয় কি হইতে পারে যে, আমার ও বন্ধুবর্গের শোকবর্দ্ধিনী সেই সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী রমণী ধরাতলে পড়িয়া আছে? আমি যদি দান, তপশ্চরণ ও গুরুজনের শুশ্রূষা করিয়া থাকি, তবে আমার প্রিয়া পুনঃসঞ্জীবিত হউক। আমি জন্মাবধি আত্মসংযম ও ব্রতানুষ্ঠান করিয়া যে-সকল পুণ্যসঞ্চয় করিয়াছি, এক্ষণে আমার প্রাণপ্রিয়া প্রমদ্বরা সেই পুণ্যবলে ভূমিশয্যা হইতে গাত্রোত্থান করুক।”
রুরু স্বীয় প্রিয়তমা প্রমদ্বরাকে উদ্দেশ করিয়া এইরূপে বিলাপ করিতেছেন, ইত্যবসরে দেবদূত তৎসন্নিধানে আসিয়া কহিলেন, “রুরু! তুমি দুঃখার্ত্ত হইয়া যেরূপ প্রার্থনা করিতেছ, উহা নিতান্ত অসম্ভব; যেহেতু, মনুষ্য একবার কালগ্রাসে পতিত হইলে আর কদাচ পুনর্জ্জীবিত হয় না। এই প্রমদ্বরা গন্ধর্ব্বের ঔরসে অপ্সরাগর্ভে জন্মগ্রহণ করে, এক্ষণে আয়ুঃশেষ হইয়াছে বলিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। অতএব হে বৎস! তুমি আর শোকসাগরে নিমগ্ন হইও না। পূর্ব্বে দেবগণ এই বিষয়ে একটি উপায় নির্দ্দেশ করিয়াছেন, যদি তাহা করিতে পার, তবে পুনর্ব্বার প্রমদ্বরাকে লাভ করিতে পারিবে।” রুরু কহিলেন, “হে দেবদূত! দেবগণ এই বিষয়ে কি উপায় স্থির করিয়াছেন, যথার্থ করিয়া বল, আমি এই দণ্ডেই তদনুযায়ী কর্ম্ম করিব।” দেবদূত কহিলেন, “হে ভৃগুনন্দন! তুমি স্বীয় ভার্য্যাকে আপনার পরমায়ুর অর্দ্ধেক প্রদান কর, তাহা হইলেই সে পুনর্জ্জীবিতা হইবে।” রুরু কহিলেন, “আচ্ছা আমি প্রমদ্বরাকে আপন পরমায়ুর অর্দ্ধভাগ প্রদান করিলাম, সে মৃত্যুশয্যা হইতে গাত্রোত্থান করুক।” তখন গন্ধর্ব্বরাজ ও দেবদূত উভয়ে-যম-সমীপে গমন করিয়া নিবেদন করিলেন, “হে ধর্ম্মরাজ! যদি আপনি অনুমতি করেন, তবে রুরুর মৃতভার্য্যা প্রমদ্বরা স্বীয় ভর্ত্তার অর্দ্ধায়ু লইয়া পুনর্জ্জীবিত হয়।” ধর্ম্মরাজ কহিলেন, “হে দেবদূত! যদি তোমার ইচ্ছা হইয়া থাকে, তবে রুরুপত্নী রুরুর অর্দ্ধ পরমায়ু পাইয়া পুনর্জ্জীবিত হউক।” ধর্ম্মরাজ এই কথা কহিবামাত্র প্রমদ্বরা রুরুর অর্দ্ধ পরমায়ু প্রাপ্ত হইল এবং তৎক্ষণাৎ সুপ্তোত্থিতার ন্যায় ধরাতল হইতে গাত্রোত্থান করিল। এইরূপে প্রমদ্বরা পুনর্জ্জীবিত হইলে, রুরুর পিতা এবং প্রমদ্বরার পিতা উভয়ে আনন্দ-সাগরে মগ্ন হইয়া শুভলগ্নে পুৎত্র-কন্যার বিবাহবিধি নির্ব্বাহ করিলেন। তাঁহারাও পরস্পরের হিতসাধনে তৎপর হইয়া পরমানন্দে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। রুরু এইরূপে কমলসমপ্রভা সুদুর্লভা প্রিয়তমাকে পুনর্লাভ করিয়া সর্পবংশ ধ্বংস করিতে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলেন। সর্প অবলোকন করিবামাত্র তিনি ক্রোধে কম্পান্বিত-কলেবর হইয়া শস্ত্রাঘাতে তাহাকে বিনাশ করিতেন।
একদা তিনি এক নিবিড় অরণ্যানী প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, এক অতি জীর্ণ-কলেবর ডুণ্ডুভ সর্প শয়ন করিয়া রহিয়াছে। রুরু তাহাকে দেখিবামাত্র ক্রোধান্ধ হইয়া যমদণ্ডের ন্যায় নিজ দণ্ড উদ্ধৃত করিয়া তাহার নিধন-সাধনে উদ্যত হইলেন। ডুণ্ডুভ তাঁহাকে জিঘাংসু দেখিয়া কহিল, “হে তপোধন! আমি ত’ তোমার কোন অপরাধ করি নাই, তবে কেন অকারণে রোষপরবশ হইয়া আমার প্রাণবধে উদ্যত হইতেছ?”
রুরু স্বীয় প্রিয়তমা প্রমদ্বরাকে উদ্দেশ করিয়া এইরূপে বিলাপ করিতেছেন, ইত্যবসরে দেবদূত তৎসন্নিধানে আসিয়া কহিলেন, “রুরু! তুমি দুঃখার্ত্ত হইয়া যেরূপ প্রার্থনা করিতেছ, উহা নিতান্ত অসম্ভব; যেহেতু, মনুষ্য একবার কালগ্রাসে পতিত হইলে আর কদাচ পুনর্জ্জীবিত হয় না। এই প্রমদ্বরা গন্ধর্ব্বের ঔরসে অপ্সরাগর্ভে জন্মগ্রহণ করে, এক্ষণে আয়ুঃশেষ হইয়াছে বলিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। অতএব হে বৎস! তুমি আর শোকসাগরে নিমগ্ন হইও না। পূর্ব্বে দেবগণ এই বিষয়ে একটি উপায় নির্দ্দেশ করিয়াছেন, যদি তাহা করিতে পার, তবে পুনর্ব্বার প্রমদ্বরাকে লাভ করিতে পারিবে।” রুরু কহিলেন, “হে দেবদূত! দেবগণ এই বিষয়ে কি উপায় স্থির করিয়াছেন, যথার্থ করিয়া বল, আমি এই দণ্ডেই তদনুযায়ী কর্ম্ম করিব।” দেবদূত কহিলেন, “হে ভৃগুনন্দন! তুমি স্বীয় ভার্য্যাকে আপনার পরমায়ুর অর্দ্ধেক প্রদান কর, তাহা হইলেই সে পুনর্জ্জীবিতা হইবে।” রুরু কহিলেন, “আচ্ছা আমি প্রমদ্বরাকে আপন পরমায়ুর অর্দ্ধভাগ প্রদান করিলাম, সে মৃত্যুশয্যা হইতে গাত্রোত্থান করুক।” তখন গন্ধর্ব্বরাজ ও দেবদূত উভয়ে-যম-সমীপে গমন করিয়া নিবেদন করিলেন, “হে ধর্ম্মরাজ! যদি আপনি অনুমতি করেন, তবে রুরুর মৃতভার্য্যা প্রমদ্বরা স্বীয় ভর্ত্তার অর্দ্ধায়ু লইয়া পুনর্জ্জীবিত হয়।” ধর্ম্মরাজ কহিলেন, “হে দেবদূত! যদি তোমার ইচ্ছা হইয়া থাকে, তবে রুরুপত্নী রুরুর অর্দ্ধ পরমায়ু পাইয়া পুনর্জ্জীবিত হউক।” ধর্ম্মরাজ এই কথা কহিবামাত্র প্রমদ্বরা রুরুর অর্দ্ধ পরমায়ু প্রাপ্ত হইল এবং তৎক্ষণাৎ সুপ্তোত্থিতার ন্যায় ধরাতল হইতে গাত্রোত্থান করিল। এইরূপে প্রমদ্বরা পুনর্জ্জীবিত হইলে, রুরুর পিতা এবং প্রমদ্বরার পিতা উভয়ে আনন্দ-সাগরে মগ্ন হইয়া শুভলগ্নে পুৎত্র-কন্যার বিবাহবিধি নির্ব্বাহ করিলেন। তাঁহারাও পরস্পরের হিতসাধনে তৎপর হইয়া পরমানন্দে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। রুরু এইরূপে কমলসমপ্রভা সুদুর্লভা প্রিয়তমাকে পুনর্লাভ করিয়া সর্পবংশ ধ্বংস করিতে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলেন। সর্প অবলোকন করিবামাত্র তিনি ক্রোধে কম্পান্বিত-কলেবর হইয়া শস্ত্রাঘাতে তাহাকে বিনাশ করিতেন।
একদা তিনি এক নিবিড় অরণ্যানী প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, এক অতি জীর্ণ-কলেবর ডুণ্ডুভ সর্প শয়ন করিয়া রহিয়াছে। রুরু তাহাকে দেখিবামাত্র ক্রোধান্ধ হইয়া যমদণ্ডের ন্যায় নিজ দণ্ড উদ্ধৃত করিয়া তাহার নিধন-সাধনে উদ্যত হইলেন। ডুণ্ডুভ তাঁহাকে জিঘাংসু দেখিয়া কহিল, “হে তপোধন! আমি ত’ তোমার কোন অপরাধ করি নাই, তবে কেন অকারণে রোষপরবশ হইয়া আমার প্রাণবধে উদ্যত হইতেছ?”
দশম অধ্যায়
রুরুর সর্পমাত্র হিংসার কারণ
রুরুর সর্পমাত্র হিংসার কারণ
রুরু কহিলেন, “হে ভুজঙ্গম! এক দুষ্ট সর্প আমার প্রাণতুল্যা প্রেয়সীকে দংশন করিয়াছিল, সেই অবধি আমি এই অনুল্লঙ্ঘনীয় দৃঢ়-প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে, সর্প দেখিতে পাইলেই তাহার প্রাণসংহার করিব; অতএব আমি তোমাকে হত্যা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। অদ্য আমার হস্তে তোমার প্রাণসংহার হইবে।” ডুণ্ডুভ কহিল, “হে ব্রহ্মন্! যে-সকল সর্পেরা মনুষ্যদিগকে দংশন করে, তাহারা স্বতন্ত্র জাতি; ডুণ্ডুভেরা সেরূপ নহে। ইহারা কখন কাহারও হিংসা করে না; অতএব হে মহর্ষে! কেবল সর্পনামের গন্ধমাত্র পাইয়া নিরপরাধ ডুণ্ডুভগণকে বধ করা তোমার সমুচিত কর্ম্ম হয় না। ডুণ্ডুভদিগের সুখভোগাভিলাষ অন্যান্য ভুজঙ্গমের সদৃশ নহে; কিন্তু ইহারা অনর্থ-ঘটনার সময় তাহাদের সমভাগী, অতএব তুমি ধার্ম্মিক হইয়া এবম্ভূত হতভাগ্য নিরপরাধ ডুণ্ডুভদিগকে বধ করিও না।”
রুরু ভয়ার্ত্ত ডুণ্ডুভের এই কাতরোক্তি-শ্রবণে অত্যন্ত দয়ার্দ্র হইয়া তাহার প্রাণসংহারে পরাঙ্মুখ হইলেন এবং শান্তবাক্যে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে ভুজঙ্গম! তুমি কে, কি কারণেই বা সর্পযোনি প্রাপ্ত হইয়াছ, আমাকে বল।” সর্প কহিল, “আমি পূর্ব্বে সহস্রপাদনামা মুনি ছিলাম। ব্রহ্মশাপগ্রস্ত হইয়া ভুজঙ্গ-কলেবর ধারণ করিয়াছি।” ইহা শুনিয়া রুরু কহিলেন, “হে ভুজঙ্গোত্তম! ব্রাহ্মণ কি নিমিত্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তোমাকে শাপ প্রদান করিয়াছিলেন, আর কত কালই বা তোমাকে এই শরীরে থাকিতে হইবে সবিস্তর শুনিতে ইচ্ছা করি।”
রুরু ভয়ার্ত্ত ডুণ্ডুভের এই কাতরোক্তি-শ্রবণে অত্যন্ত দয়ার্দ্র হইয়া তাহার প্রাণসংহারে পরাঙ্মুখ হইলেন এবং শান্তবাক্যে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে ভুজঙ্গম! তুমি কে, কি কারণেই বা সর্পযোনি প্রাপ্ত হইয়াছ, আমাকে বল।” সর্প কহিল, “আমি পূর্ব্বে সহস্রপাদনামা মুনি ছিলাম। ব্রহ্মশাপগ্রস্ত হইয়া ভুজঙ্গ-কলেবর ধারণ করিয়াছি।” ইহা শুনিয়া রুরু কহিলেন, “হে ভুজঙ্গোত্তম! ব্রাহ্মণ কি নিমিত্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তোমাকে শাপ প্রদান করিয়াছিলেন, আর কত কালই বা তোমাকে এই শরীরে থাকিতে হইবে সবিস্তর শুনিতে ইচ্ছা করি।”
একাদশ অধ্যায়
আস্তীকপর্ব্ব-খগম-ঋষিবৃত্তান্ত
আস্তীকপর্ব্ব-খগম-ঋষিবৃত্তান্ত
ডুণ্ডভ কহিল, “সত্যবাদী ও তপোবীর্য্য-সম্পন্ন খগম নামে এক ব্রাহ্মণ আমার বাল্যকালের সখা ছিলেন। একদা তিনি অগ্নিহোত্র-কার্য্যানুষ্ঠানে অত্যন্ত আসক্ত আছেন, এমত সময়ে আমি বালস্বভাবসুলভ কৌতুকের পরতন্ত্র হইয়া তৃণ-নির্ম্মিত ভুজঙ্গম দ্বারা তাঁহাকে বিভীষিকা প্রদর্শন করিয়াছিলাম। তদ্দর্শনে তিনি মূর্চ্ছিত হইয়া মেদিনীপৃষ্ঠে পতিত হইলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে চৈতন্য-প্রাপ্ত হইলে ক্রোধে দুই চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া আমাকে কহিলেন, ‘তুমি আমাকে ভয় প্রদর্শন করিবার নিমিত্ত যাদৃশ বীর্য্যহীন সর্প নির্ম্মাণ করিয়াছ, আমি তোমাকে শাপ দিতেছি, তুমি সেইরূপ নির্বীর্য্য সর্প হও।’ আমি তদীয় তপঃপ্রভাব অবগত ছিলাম; অতএব অত্যন্ত উদ্বিগ্নচিত্তে তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলাম, ‘ভ্রাতঃ! আমি সখা বলিয়া পরিহাসার্থ তোমার প্রতি এই কুকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াছি; অতএব এক্ষণে ক্ষমা-প্রদর্শন-পুরঃসর আমাকে শাপ হইতে বিমূক্ত কর।’
“খগম আমাকে এইরূপ ব্যাকুলিত দেখিয়া বারংবার দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক কহিলেন, ‘আমি যাহা কহিয়াছি, তাহা কদাচ মিথ্যা হইবার নহে; অতএব এক্ষণে যাহা কহিতেছি, তাহা সাবধানে শুনিয়া সর্ব্বকাল মনে করিয়া রাখিবে। মহাত্মা প্রমতির রুরু নামে এক পরম-পবিত্র পুৎত্র জন্মিবে, তাঁহাকে দর্শন করিলেই তোমার শাপ-বিমোচন হইবে।’ আপনি সেই প্রমতি-পুৎত্র রুরু, আজি আমি আপনার সন্দর্শন পাইয়াছি, এক্ষণে আমি স্বীয় পূর্ব্বরূপ লাভ করিয়া আপনাকে কিছু হিতোপদেশ দিতেছি, শুনুন।”
শাপভ্রষ্ট সহস্রপাদ এই বলিয়া সর্প-কলেবর পরিত্যাগ পূর্ব্বক নিজ ভাস্বরমূর্ত্তি পুনঃপ্রাপ্ত হইলেন এবং কহিলেন, “হে মহাত্মন্ রুরো! অহিংসা পরম ধর্ম্ম নিমিত্ত ব্রাহ্মণদিগের কখন কোন জীবহিংসা করা উচিত নহে। বেদে এইরূপ কথিত আছে যে, ব্রাহ্মণরা সর্ব্বদা শান্তমূর্ত্তি, বেদবেদাঙ্গবেত্তা ও সর্ব্বজীবের অভয়প্রদ হইবেন। অহিংসা, সত্যবাক্য, ক্ষমা ও বেদবাক্য-ধারণ এইগুলি ব্রাহ্মণের পরম ধর্ম্ম। দণ্ডধারণ, উগ্রত্ব ও প্রজাপালন এই সমস্ত ক্ষত্রিয়ের পরম ধর্ম্ম। আপনি ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণের ক্ষৎত্রিয়ধর্ম্ম অবলম্বন করা অনুচিত। দেখুন, পূর্ব্বকালে রাজা জনমেজয়ের যজ্ঞে সর্পকুল বিনষ্ট হইতে আরম্ভ হইয়াছিল; কিন্তু তপোবলসম্পন্ন বেদবেদাঙ্গপারগ, ব্রাহ্মণাগ্রগণ্য আস্তীক মহাশয় ভয়ার্ত্ত সর্পগণকে পরিত্রাণ করেন।”
“খগম আমাকে এইরূপ ব্যাকুলিত দেখিয়া বারংবার দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক কহিলেন, ‘আমি যাহা কহিয়াছি, তাহা কদাচ মিথ্যা হইবার নহে; অতএব এক্ষণে যাহা কহিতেছি, তাহা সাবধানে শুনিয়া সর্ব্বকাল মনে করিয়া রাখিবে। মহাত্মা প্রমতির রুরু নামে এক পরম-পবিত্র পুৎত্র জন্মিবে, তাঁহাকে দর্শন করিলেই তোমার শাপ-বিমোচন হইবে।’ আপনি সেই প্রমতি-পুৎত্র রুরু, আজি আমি আপনার সন্দর্শন পাইয়াছি, এক্ষণে আমি স্বীয় পূর্ব্বরূপ লাভ করিয়া আপনাকে কিছু হিতোপদেশ দিতেছি, শুনুন।”
শাপভ্রষ্ট সহস্রপাদ এই বলিয়া সর্প-কলেবর পরিত্যাগ পূর্ব্বক নিজ ভাস্বরমূর্ত্তি পুনঃপ্রাপ্ত হইলেন এবং কহিলেন, “হে মহাত্মন্ রুরো! অহিংসা পরম ধর্ম্ম নিমিত্ত ব্রাহ্মণদিগের কখন কোন জীবহিংসা করা উচিত নহে। বেদে এইরূপ কথিত আছে যে, ব্রাহ্মণরা সর্ব্বদা শান্তমূর্ত্তি, বেদবেদাঙ্গবেত্তা ও সর্ব্বজীবের অভয়প্রদ হইবেন। অহিংসা, সত্যবাক্য, ক্ষমা ও বেদবাক্য-ধারণ এইগুলি ব্রাহ্মণের পরম ধর্ম্ম। দণ্ডধারণ, উগ্রত্ব ও প্রজাপালন এই সমস্ত ক্ষত্রিয়ের পরম ধর্ম্ম। আপনি ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণের ক্ষৎত্রিয়ধর্ম্ম অবলম্বন করা অনুচিত। দেখুন, পূর্ব্বকালে রাজা জনমেজয়ের যজ্ঞে সর্পকুল বিনষ্ট হইতে আরম্ভ হইয়াছিল; কিন্তু তপোবলসম্পন্ন বেদবেদাঙ্গপারগ, ব্রাহ্মণাগ্রগণ্য আস্তীক মহাশয় ভয়ার্ত্ত সর্পগণকে পরিত্রাণ করেন।”
দ্বাদশ অধ্যায়
সর্পযজ্ঞের প্রশ্ন
সর্পযজ্ঞের প্রশ্ন
রুরু কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! ভূপতি জনমেজয় কি নিমিত্ত সর্পকুল ধ্বংস করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, আর কি জন্যই বা ধীমান্ আস্তীক মুনি তাহাদিগকে রক্ষা করিলেন, আমি সবিশেষ শুনিতে ইচ্ছা করি।” “আপনি ব্রাহ্মণদিগের মুখে আস্তীক-বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিবেন” এই বলিয়া মহর্ষি সহস্রপাদ অন্তর্হিত হইলেন। রুরু তিরোহিত ঋষিকে অন্বেষণ করিয়া সমস্ত বন ভ্রমণ করিলেন। পরিশেষে নিতান্ত ক্লান্ত ও একান্ত মোহপরতন্ত্র এবং অচেতনপ্রায় হইয়া ধরাতলে পড়িলেন। অনন্তর চৈতন্য-লাভ করিয়া সহস্রপাদের উপদেশবাক্য পুনঃ পুনঃ স্মরণ করিতে করিতে স্বকীয় আশ্রমে প্রত্যাগমন করিলেন এবং স্বীয় জনক-সন্নিধানে সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করাতে তিনি তাঁহাকে আস্তীকাখ্যান সবিস্তর শ্রবণ করাইলেন।
ত্রয়োদশ অধ্যায়
জরৎকারু-চরিত্র
জরৎকারু-চরিত্র
শৌনক কহিলেন, “হে সৌতে! মহারাজ জনমেজয় কি নিমিত্ত সর্পযজ্ঞ করিয়া সর্পগণকে ধ্বংস করিয়াছিলেন এবং কি কারণেই বা তপোধনাগ্রগণ্য আস্তীক মুনি প্রদীপ্ত হুতাশন হইতে ভুজঙ্গমদিগকে রক্ষা করিয়াছিলেন, তাহা সবিশেষ বর্ণন কর। যে রাজা সর্পসত্রের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, তিনি কাহার পুৎত্র এবং সেই দ্বিজবর আস্তীক মুনিই বা কাহার পুৎত্র, ইহাও বর্ণন কর।” “হে মুনিবর! আমি আপনার নিকট অতি বিস্তীর্ণ আস্তীকোপাখ্যান আনুপূর্ব্বিক বর্ণনা করিতেছি, শ্রবণ করুন।” শৌনক কহিলেন, “হে সূতপুৎত্র! প্রাচীন মহর্ষি আস্তীকের ঐ মনোহর উপাখ্যান আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ জন্মিয়াছে।”
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, আমার পিতা নৈমিষারণ্যবাসী বিপ্রগণ কর্ত্তৃক অভ্যর্থিত হইয়া সর্ব্বপাপবিনাশক ব্যাসোক্ত ঐ পুরাতন ইতিহাস তাঁহাদিগকে শ্রবণ করাইয়াছিলেন। আমি তৎসমীপে যে প্রকার শ্রবণ করিয়াছি, অবিকল সেইরূপ বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। তপোধন আস্তীকের পিতা জরৎকারু মুনি সাক্ষাৎ প্রজাপতিসদৃশ ব্রহ্মচারী, ঊর্দ্ধরেতা ও পরম ধার্ম্মিক ছিলেন। তিনি সর্ব্বদা ব্রতানুষ্ঠান, উগ্রতপস্যা ও আহারসংযমে একান্ত তৎপর থাকিতেন। সেই তপোবলসম্পন্ন মহাত্মা সর্ব্বদা তীর্থপর্য্যটন ও তীর্থে অবগাহন করিয়া অবনীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন এবং যেস্থানে সায়ংকাল উপস্থিত হইত, সেই স্থানে অবস্থিতি করিতেন। এইরূপে বহুকাল আহার নিদ্রা পরিত্যাগ ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিয়া তিনি শীর্ণকলেবর হইয়া ছিলেন; তথাপি বায়ুমাত্র ভক্ষণপূর্ব্বক কঠোর ব্রতের অনুষ্ঠান করিতেন।
একদা জরৎকারু মুনি ভ্রমণ করিতে করিতে কোন স্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, কতিপয় ব্যক্তি ঊর্দ্ধপাদ ও অধোমস্তক হইয়া মহাগর্ত্তে লম্বমান রহিয়াছেন; তদ্দর্শনে তিনি কৃপাপরবশ হইয়া তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসিলেন; “আপনারা কে? কি নিমিত্তই বা মূষিকচ্ছিন্নমূল উশীরস্তম্ব [বেণার মূলের গুচ্ছ] মাত্র অবলম্বন করিয়া অধোমুখে এই মহাগর্ভে লম্বমান রহিয়াছেন?” পিতৃগণ কহিলেন, “আমরা যাযাবর [অতিশয় পর্য্যটনশীল- যাহারা একস্থানে স্থির থাকে না।] নামে ঋষি; সন্তানক্ষয় হওয়াতে অধঃপতিত হইতেছি। আমার নিতান্ত হতভাগ্য! আমাদিগের জরৎকারু নামে এক পুৎত্র আছে, সেই দুর্ম্মতি পুৎত্রার্থ দার পরিগ্রহ না করিয়া সংসারসুখে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক অহর্নিশ কেবল তপস্যায় কালাতিপাত করিতেছে। সুতরাং কুলক্ষয় উপস্থিত দেখিয়া এই মহাগর্ত্তে লম্বমান রহিয়াছি; আমাদিগের বংশবর্দ্ধন জরৎকারু থাকিতেও আমরা অনাথ ও দুষ্কৃতীর ন্যায় হইয়াছি; তুমি কে, কি নিমিত্তই বা আমাদিগের দুঃখ দেখিয়া বান্ধবের ন্যায় অনুশোচনা করিতেছ, জানিতে বাসনা করি।”
জরৎকারু তাঁহাদিগের কাতরোক্তি শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “আপনারা আমার পূর্ব্বপুরুষ, আমারই নাম জরৎকারু; এক্ষণে আজ্ঞা করুন, কি করিব?” পিতৃগণ কহিলেন, “বৎস! তোমার এবং আমাদিগের পারত্রিক মঙ্গল-সম্পাদন করিবার নিমিত্ত কুলরক্ষা-বিষয়ে যত্নবান হও। লোকে পুৎত্রৎপাদন দ্বারা যেরূপ সদ্গতিসম্পন্ন হয়, ধর্ম্মফল দ্বারা সেরূপ সদ্গতি লাভ করিতে পারে না। অতএব হে পুৎত্র! আমাদিগের নির্দ্দেশানুসারে দারপরিগ্রহ করিয়া সন্তানোৎপাদনে যত্নবান্ হও। ইহা করিলেই আমদিগের পরম হিতসাধন করা হইবে।”
জরৎকারু কহিলেন, “আমি সম্ভোগার্থে দারপরিগ্রহ বা জীবিকার্থে ধনোপার্জ্জন করিব না, কেবল আপনাদিগের হিতসাধনার্থে বিবাহ করিতে সম্মত হইলাম; কিন্তু তদ্বিষয়ে এই এক প্রতিজ্ঞা রহিল যে, যদি কন্যা আমার সনাম্নী হয় এবং তাহার বন্ধুবান্ধবগণ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক আমাকে সেই কন্যা ভিক্ষাস্বরূপ সম্প্রদান করে, তাহা হইলেই আমি তাহাকে যথাবিধি বিবাহ করিব; কিন্তু আমি অত্যন্ত দরিদ্র, বোধ করি, দরিদ্রকে কন্যা সম্প্রদান করিতে কেহই সম্মত হইবে না। হে পিতামহগণ! আমি এই নিয়মে দারপরিগ্রহ করিতে যত্নবান্ হইব, অন্যথা এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতে পারিব না। এইরূপে পরিণীতা ভার্য্যার গর্ভে সন্তান জন্মিলে আপনারা উদ্ধার হইবেন এবং অক্ষয় স্বর্গলাভ করিয়া পরম-সুখে কালযাপন করিতে পারিবেন।”
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, আমার পিতা নৈমিষারণ্যবাসী বিপ্রগণ কর্ত্তৃক অভ্যর্থিত হইয়া সর্ব্বপাপবিনাশক ব্যাসোক্ত ঐ পুরাতন ইতিহাস তাঁহাদিগকে শ্রবণ করাইয়াছিলেন। আমি তৎসমীপে যে প্রকার শ্রবণ করিয়াছি, অবিকল সেইরূপ বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। তপোধন আস্তীকের পিতা জরৎকারু মুনি সাক্ষাৎ প্রজাপতিসদৃশ ব্রহ্মচারী, ঊর্দ্ধরেতা ও পরম ধার্ম্মিক ছিলেন। তিনি সর্ব্বদা ব্রতানুষ্ঠান, উগ্রতপস্যা ও আহারসংযমে একান্ত তৎপর থাকিতেন। সেই তপোবলসম্পন্ন মহাত্মা সর্ব্বদা তীর্থপর্য্যটন ও তীর্থে অবগাহন করিয়া অবনীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন এবং যেস্থানে সায়ংকাল উপস্থিত হইত, সেই স্থানে অবস্থিতি করিতেন। এইরূপে বহুকাল আহার নিদ্রা পরিত্যাগ ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিয়া তিনি শীর্ণকলেবর হইয়া ছিলেন; তথাপি বায়ুমাত্র ভক্ষণপূর্ব্বক কঠোর ব্রতের অনুষ্ঠান করিতেন।
একদা জরৎকারু মুনি ভ্রমণ করিতে করিতে কোন স্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, কতিপয় ব্যক্তি ঊর্দ্ধপাদ ও অধোমস্তক হইয়া মহাগর্ত্তে লম্বমান রহিয়াছেন; তদ্দর্শনে তিনি কৃপাপরবশ হইয়া তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসিলেন; “আপনারা কে? কি নিমিত্তই বা মূষিকচ্ছিন্নমূল উশীরস্তম্ব [বেণার মূলের গুচ্ছ] মাত্র অবলম্বন করিয়া অধোমুখে এই মহাগর্ভে লম্বমান রহিয়াছেন?” পিতৃগণ কহিলেন, “আমরা যাযাবর [অতিশয় পর্য্যটনশীল- যাহারা একস্থানে স্থির থাকে না।] নামে ঋষি; সন্তানক্ষয় হওয়াতে অধঃপতিত হইতেছি। আমার নিতান্ত হতভাগ্য! আমাদিগের জরৎকারু নামে এক পুৎত্র আছে, সেই দুর্ম্মতি পুৎত্রার্থ দার পরিগ্রহ না করিয়া সংসারসুখে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক অহর্নিশ কেবল তপস্যায় কালাতিপাত করিতেছে। সুতরাং কুলক্ষয় উপস্থিত দেখিয়া এই মহাগর্ত্তে লম্বমান রহিয়াছি; আমাদিগের বংশবর্দ্ধন জরৎকারু থাকিতেও আমরা অনাথ ও দুষ্কৃতীর ন্যায় হইয়াছি; তুমি কে, কি নিমিত্তই বা আমাদিগের দুঃখ দেখিয়া বান্ধবের ন্যায় অনুশোচনা করিতেছ, জানিতে বাসনা করি।”
জরৎকারু তাঁহাদিগের কাতরোক্তি শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “আপনারা আমার পূর্ব্বপুরুষ, আমারই নাম জরৎকারু; এক্ষণে আজ্ঞা করুন, কি করিব?” পিতৃগণ কহিলেন, “বৎস! তোমার এবং আমাদিগের পারত্রিক মঙ্গল-সম্পাদন করিবার নিমিত্ত কুলরক্ষা-বিষয়ে যত্নবান হও। লোকে পুৎত্রৎপাদন দ্বারা যেরূপ সদ্গতিসম্পন্ন হয়, ধর্ম্মফল দ্বারা সেরূপ সদ্গতি লাভ করিতে পারে না। অতএব হে পুৎত্র! আমাদিগের নির্দ্দেশানুসারে দারপরিগ্রহ করিয়া সন্তানোৎপাদনে যত্নবান্ হও। ইহা করিলেই আমদিগের পরম হিতসাধন করা হইবে।”
জরৎকারু কহিলেন, “আমি সম্ভোগার্থে দারপরিগ্রহ বা জীবিকার্থে ধনোপার্জ্জন করিব না, কেবল আপনাদিগের হিতসাধনার্থে বিবাহ করিতে সম্মত হইলাম; কিন্তু তদ্বিষয়ে এই এক প্রতিজ্ঞা রহিল যে, যদি কন্যা আমার সনাম্নী হয় এবং তাহার বন্ধুবান্ধবগণ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক আমাকে সেই কন্যা ভিক্ষাস্বরূপ সম্প্রদান করে, তাহা হইলেই আমি তাহাকে যথাবিধি বিবাহ করিব; কিন্তু আমি অত্যন্ত দরিদ্র, বোধ করি, দরিদ্রকে কন্যা সম্প্রদান করিতে কেহই সম্মত হইবে না। হে পিতামহগণ! আমি এই নিয়মে দারপরিগ্রহ করিতে যত্নবান্ হইব, অন্যথা এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতে পারিব না। এইরূপে পরিণীতা ভার্য্যার গর্ভে সন্তান জন্মিলে আপনারা উদ্ধার হইবেন এবং অক্ষয় স্বর্গলাভ করিয়া পরম-সুখে কালযাপন করিতে পারিবেন।”
চতুর্দ্দশ অধ্যায়
জরৎকারুর বিবাহ
জরৎকারুর বিবাহ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তদনন্তর জরৎকারু মুনি গার্হস্থ্য আশ্রম করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়া পত্নীলাভার্থ সমস্ত মহীমণ্ডল ভ্রমণ করিতে লাগিলেন, কিন্তু কেহই তাঁহাকে কন্যা প্রদান করিল না। একদা তিনি পিতৃলোকের বাক্য স্মরণ করিয়া বনপ্রবেশপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে তিনবার কন্যা ভিক্ষা করিলেন। তাঁহার সেই ভিক্ষা-বাক্য শ্রবণে নাগরাজ বাসুকি স্বীয় ভগিনীকে আনয়ন করিয়া সম্প্রদান করিতে উদ্যত হইলেন। কিন্তু জরৎকারু সেই কন্যা সনাম্নী নহে, এই ভাবিয়া তাহার পাণিগ্রহণ পরাঙ্মুখ হইলেন; কারণ, মহাত্মা জরৎকারু প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, যদি সনাম্নী কন্যা পান ও তাহার বন্ধু বান্ধবগণ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক ভিক্ষাস্বরূপ তাঁহাকে সেই কন্যা সম্প্রদান করে, তাহা হইলেই তাহাকে সহধর্ম্মিণী করিবেন।
অনন্তর মহাপ্রাজ্ঞ মহাতপা জরৎকারু বাসুকিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে ভুজঙ্গম! তুমি যথার্থ করিয়া বল, তোমার এই ভগিনীর নাম কি? বাসুকি কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! আমার এই অনুজার নাম জরৎকারু। আমি আপনাকে এই ভগিনীটি সম্প্রদান করিতেছি, আপনি ইহাকে গ্রহণ করুন।” এই বলিয়া বাসুকি জরৎকারুকে স্বীয় ভগিনী প্রদান করিলেন। তিনিও বিধিপূর্ব্বক তাহার পাণিগ্রহণ করিলেন।
অনন্তর মহাপ্রাজ্ঞ মহাতপা জরৎকারু বাসুকিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে ভুজঙ্গম! তুমি যথার্থ করিয়া বল, তোমার এই ভগিনীর নাম কি? বাসুকি কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! আমার এই অনুজার নাম জরৎকারু। আমি আপনাকে এই ভগিনীটি সম্প্রদান করিতেছি, আপনি ইহাকে গ্রহণ করুন।” এই বলিয়া বাসুকি জরৎকারুকে স্বীয় ভগিনী প্রদান করিলেন। তিনিও বিধিপূর্ব্বক তাহার পাণিগ্রহণ করিলেন।
পৌলোম-পর্ব্ব
চতুর্থ অধ্যায়
পৌলোম-পর্ব্ব
পৌলোম-পর্ব্ব
সৌতি কহিলেন, নৈমিষারণ্যে কুলপতি শৌনকের দ্বাদশবর্ষব্যাপী যজ্ঞে যে-সকল মহর্ষিগণ সমাগত হইয়াছিলেন, সূত বংশ-সম্ভূত লোমহর্ষণাত্মজ উগ্রশ্রবাঃ পুরাণপাঠ দ্বারা তাঁহাদিগের শুশ্রূষা করিতেছিলে। উগ্রশ্রবাঃ কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাদিগকে নিবেদন করিলেন, “হে মহর্ষিগণ! উতঙ্কচরিত আদ্যোপান্ত কহিলাম, এক্ষণে আপনারা আর কি শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করেন, আজ্ঞা করুন।”
মুনিগণ কহিলেন, হে লোমহর্ষণনন্দন! আমরা প্রসঙ্গক্রমে তোমাকে যখন যে কথা জিজ্ঞাসা করিব, তুমি সেই সমুদয় বর্ণনা করিও। কিন্তু কুলপতি শৌনক এক্ষণে অগ্নিশরণে [অগ্নিগৃহ– যে গৃহে সর্ব্বদা যজ্ঞাগ্নি থাকে।] অবস্থিতি করিতেছেন, তিনি সুরাসুর-মনুষ্য-সর্প-গন্ধবর্বাদিঘটিত বিচিত্র অলৌকিক বৃত্তান্ত জানেন; বিদ্বান্, কর্ম্মদক্ষ, ব্রতপরায়ণ, বেদবেদান্তশাস্ত্রে পারদর্শী, সত্যবাদী, শান্তিগুণাবলম্বী তপোনিরত সেই মহর্ষি আমাদিগের সকলেরই মান্য, তাঁহার অপেক্ষা কর। তিনি পরমার্চ্চিত আসনে অধ্যাসীন হইয়া যে যে কথা জিজ্ঞাসা করিবেন, তাহাই কহিবে।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, “ভাল, সেই মহর্ষি আসনে উপবিষ্ট হইয়া জিজ্ঞাসিলেই বিবিধ পবিত্র কথা বলিব।” ক্ষণকাল পরে বিপ্রশ্রেষ্ঠ শৌনকঋষি দেবযজ্ঞ ও পিতৃতর্পণ প্রভৃতি ক্রিয়াকলাপ বিধিপূর্ব্বক সমাপ্ত করিয়া, যেস্থানে উগ্রশ্রবাঃ ও ব্রতপরায়ণ সিদ্ধ ব্রহ্মর্ষিগণ সুখাসীন আছেন, সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পরে ঋত্বিক্ ও সদস্যগণ উপবিষ্ট হইলে স্বয়ং আসন পরিগ্রহ করিয়া এই কথা প্রস্তাব করিলেন।
মুনিগণ কহিলেন, হে লোমহর্ষণনন্দন! আমরা প্রসঙ্গক্রমে তোমাকে যখন যে কথা জিজ্ঞাসা করিব, তুমি সেই সমুদয় বর্ণনা করিও। কিন্তু কুলপতি শৌনক এক্ষণে অগ্নিশরণে [অগ্নিগৃহ– যে গৃহে সর্ব্বদা যজ্ঞাগ্নি থাকে।] অবস্থিতি করিতেছেন, তিনি সুরাসুর-মনুষ্য-সর্প-গন্ধবর্বাদিঘটিত বিচিত্র অলৌকিক বৃত্তান্ত জানেন; বিদ্বান্, কর্ম্মদক্ষ, ব্রতপরায়ণ, বেদবেদান্তশাস্ত্রে পারদর্শী, সত্যবাদী, শান্তিগুণাবলম্বী তপোনিরত সেই মহর্ষি আমাদিগের সকলেরই মান্য, তাঁহার অপেক্ষা কর। তিনি পরমার্চ্চিত আসনে অধ্যাসীন হইয়া যে যে কথা জিজ্ঞাসা করিবেন, তাহাই কহিবে।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, “ভাল, সেই মহর্ষি আসনে উপবিষ্ট হইয়া জিজ্ঞাসিলেই বিবিধ পবিত্র কথা বলিব।” ক্ষণকাল পরে বিপ্রশ্রেষ্ঠ শৌনকঋষি দেবযজ্ঞ ও পিতৃতর্পণ প্রভৃতি ক্রিয়াকলাপ বিধিপূর্ব্বক সমাপ্ত করিয়া, যেস্থানে উগ্রশ্রবাঃ ও ব্রতপরায়ণ সিদ্ধ ব্রহ্মর্ষিগণ সুখাসীন আছেন, সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পরে ঋত্বিক্ ও সদস্যগণ উপবিষ্ট হইলে স্বয়ং আসন পরিগ্রহ করিয়া এই কথা প্রস্তাব করিলেন।
২৯ জুন ২০১৪
আমাদের ধর্মে নারীকে অনেক উপরে স্থান দেয়া হয়েছে
আমাদের ধর্মে নারীকে অনেক উপরে স্থান দেয়া
হয়েছে, ইভেন আমাদের দেবতার সাথে সাথে রয়েছে অনেক দেবীও। সকল দেবীদের রয়েছে
অনেক উচ্চ স্থান, যেমন মা দুর্গা শক্তির দেবী, মা সরস্বতী বিদ্যার দেবী, মা
লক্ষ্মী ধন সম্পদের দেবী, মা কালী সংহার কারিণী আরও অনেক। তবে আমাদের (হিন্দুদের) দের কিছু নিয়ম নীতির বা আচার ব্যবহার এর জন্যই আজও নারীরা অনেক দিক দিয়ে অবহেলিত। যেমন -
* পুত্র সন্তান না থাকলে পিতৃপুরুষের তর্পণ হয় না। তাই বাবা মা পরিবার পরিজন ছেলে সন্তান কামনা করে। নিজেদের উদ্ধারের আশায়।
* মেয়েদের বেদ পরা নিষিদ্ধ।
* পিতা মাতার ধারনা ছেলেরাই তাদের বৃদ্ধ বয়সে দেখাশুনা করবে। আর মেয়েরা তো অন্য পরিবারে চলে যাবে।
* ছেলে বাবা মায়ের নাম উজ্জ্বল করবে । এক্ষেত্রে মেয়ের কোন ভুমিকাই নেই।
* ছেলের নাম করন ধুম ধাম করে হবে, আর মেয়ের নাম করনে কোন রকম নিয়ম পালন।
* সবাই ছেলে হলে যতটা খুশি মেয়ে হলে তার ২০% খুশি হয়, বরং তার থেকেও কম।
* বিয়ের সময় ছেলেরা যৌতুক নিয়ে বিয়ে করবে, আর মেয়ে পক্ষ যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিবে।
* শিক্ষার অধিকার ছেলেদের বেশি থাকবে, তাদের অনেকদুর পড়াবে, আর মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষাই যথেষ্ট, কারন তারা অন্যের বারি চলে যাবে।
*শ্রাদ্ধ / পুজার অগ্রাধিকার ছেলেদের এ থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি।
এছারা বাবা মা বা পরিবারও অনেক সময় ভুক্তভুগী হবার ভয়ে আগের চেক করে নেয় সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে।ছেলে হলে খুশি মনে রাখবে আর মেয়ে হলে রাখবে কিন্তু এই মনে যে কি আর করা, ঈশ্বরের দান, মেরে তো আর ফেলা যায় না। আবার অনেক সময় মেয়ে সন্তান হলে নষ্ট করেও ফেলে।
আর এ সকল কিছুর জন্য নারীরা আজও অবহেলিত, যতই আমরা বলি নারী পুরুষ সমান অধিকার, তার সত্যতা যে কতটুকু তা চোখ খুললেই চোখে পরে।
যদি কিছু ভুল বলে থাকি ক্ষমা করবেন। আমি শুধু এটুকুই জানি ছেলে হই আর মেয়ে হই, আমি একজন সনাতনী হিন্দু । আর এই হিন্দুত্ব আমার গর্ব, জীবনের চরম পরাজয়ের কারন নয়।
(মৌনতা)
* পুত্র সন্তান না থাকলে পিতৃপুরুষের তর্পণ হয় না। তাই বাবা মা পরিবার পরিজন ছেলে সন্তান কামনা করে। নিজেদের উদ্ধারের আশায়।
* মেয়েদের বেদ পরা নিষিদ্ধ।
* পিতা মাতার ধারনা ছেলেরাই তাদের বৃদ্ধ বয়সে দেখাশুনা করবে। আর মেয়েরা তো অন্য পরিবারে চলে যাবে।
* ছেলে বাবা মায়ের নাম উজ্জ্বল করবে । এক্ষেত্রে মেয়ের কোন ভুমিকাই নেই।
* ছেলের নাম করন ধুম ধাম করে হবে, আর মেয়ের নাম করনে কোন রকম নিয়ম পালন।
* সবাই ছেলে হলে যতটা খুশি মেয়ে হলে তার ২০% খুশি হয়, বরং তার থেকেও কম।
* বিয়ের সময় ছেলেরা যৌতুক নিয়ে বিয়ে করবে, আর মেয়ে পক্ষ যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিবে।
* শিক্ষার অধিকার ছেলেদের বেশি থাকবে, তাদের অনেকদুর পড়াবে, আর মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষাই যথেষ্ট, কারন তারা অন্যের বারি চলে যাবে।
*শ্রাদ্ধ / পুজার অগ্রাধিকার ছেলেদের এ থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি।
এছারা বাবা মা বা পরিবারও অনেক সময় ভুক্তভুগী হবার ভয়ে আগের চেক করে নেয় সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে।ছেলে হলে খুশি মনে রাখবে আর মেয়ে হলে রাখবে কিন্তু এই মনে যে কি আর করা, ঈশ্বরের দান, মেরে তো আর ফেলা যায় না। আবার অনেক সময় মেয়ে সন্তান হলে নষ্ট করেও ফেলে।
আর এ সকল কিছুর জন্য নারীরা আজও অবহেলিত, যতই আমরা বলি নারী পুরুষ সমান অধিকার, তার সত্যতা যে কতটুকু তা চোখ খুললেই চোখে পরে।
যদি কিছু ভুল বলে থাকি ক্ষমা করবেন। আমি শুধু এটুকুই জানি ছেলে হই আর মেয়ে হই, আমি একজন সনাতনী হিন্দু । আর এই হিন্দুত্ব আমার গর্ব, জীবনের চরম পরাজয়ের কারন নয়।
(মৌনতা)













