• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২৩ নভেম্বর ২০১৭

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: চতুর্থ অধ্যায় – জ্ঞানযোগ

শ্রীভগবান্ উবাচ—
ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্ ।
বিবস্বান্ মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেঽব্রবীৎ ॥১॥

শ্রীভগবান্ উবাচ (শ্রীভগবান্ কহিলেন) অহম্ (আমি) অব্যয়ম্ (অব্যয়) ইমম্ (এই) যোগম্ (এই) যোগম্ (নিষ্কাম কর্ম্মসাধ্য জ্ঞানযোগের কথা) বিবস্বতে (সূর্য্যকে) প্রোক্তবান্ (পুরাকালে বলিয়াছিলাম), বিবস্বান্ (সূর্য্য) মনবে (স্বীয় পুত্ত্র বৈবস্বত মনুকে) প্রাহ (বলেন) মনুঃ (মনু) ইক্ষ্বাকবে (স্বপুত্ত্র ইক্ষ্বাকুকে) অব্রবীৎ (বলিয়াছিলেন) ॥১॥

শ্রীভগবান্ কহিলেন—আমি পূর্ব্বে সূর্য্যকে এই অব্যয় নিষ্কাম-কর্ম্মসাধ্য জ্ঞানযোগের কথা বলিয়াছিলাম । সূর্য্য তাহাই নিজ পুত্ত্র বৈবস্বত মনুকে বলেন, এবং মনুও তাহাই স্বীয় পুত্ত্র ইক্ষ্বাকুকে বলিয়াছিলেন ॥১॥

এবং পরম্পরা-প্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ ।
স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ ॥২॥

এবং (এইরূপে) পরম্পরা-প্রাপ্তম্ (পরম্পরাক্রমে প্রাপ্ত) ইমং (এই যোগ) রাজর্ষয়ঃ (রাজর্ষিগণ) বিদুঃ (অবগত হন), [হে] পরন্তপ ! (হে শত্রু দমন অর্জ্জুন !) সঃ যোগঃ (সেই জ্ঞান যোগ) মহতা কালেন (বহুকাল গত হওয়ায়) ইহ (বর্ত্তমানে) নষ্টঃ (নষ্টপ্রায় হইয়াছে) ॥২॥

হে পরন্তপ ! এইরূপে পরম্পরাপ্রাপ্ত এই জ্ঞানযোগ নিমি, জনক প্রভৃতি রাজর্ষিগণ অবগত হইয়াছিলেন । সেই যোগ অনেক কাল গত হওয়ায় আপাততঃ নষ্টপ্রায় হইয়াছে ॥২॥

স এবায়ং ময়া তেঽদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাতনঃ ।
ভক্তোঽসি মে সখা চেতি রহস্যং হ্যেতদুত্তমম্ ॥৩॥

[ত্বম্] (তুমি) মে (আমার) ভক্তঃ সখা চ (ভক্ত ও সখা) ইতি [হেতোঃ] (এইজন্য) অয়ং সঃ এব (এই সেই) পুরাতনঃ (পুরাতন) যোগঃ (যোগ) অদ্য (আজ) ময়া (আমা কর্ত্তৃক) তে (তোমার নিকট) প্রোক্তঃ (কথিত হইল), হি (যেহেতু) এতৎ (ইহা) উত্তমম্ রহস্যম্ (অতি গোপনীয়) ॥৩॥

সেই সনাতন যোগ অদ্য আমি তোমাকে বলিলাম, যেহেতু তুমি আমার ভক্ত ও সখা, অতএব এই উত্তম যোগ অত্যন্ত গোপনীয় হইলেও তোমাকে আমি উপদেশ করিলাম ॥৩॥

অর্জ্জুন উবাচ—
অপরং ভবতো জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ ।
কথমেতদ্বিজানীয়াং ত্বমাদৌ প্রোক্তবানিতি ॥৪॥

অর্জ্জুনঃ উবাচ (অর্জ্জুন বলিলেন) ভবতঃ (আপনার) জন্ম (জন্ম) অপরং (ইদানীন্তন) বিবস্বতঃ (সূর্য্যের) জন্ম (জন্ম) পরম্ (পূর্ব্বে হইয়াছে) [তস্মাৎ] (অতএব) ত্বম্ (তুমি) আদৌ (পুরাকালে) [ইমং যোগং] (এই যোগ) প্রোক্তবান্ (বলিয়াছিলে) ইতি (এই যে কথা) এতৎ (ইহা) [অহং] (আমি) কথম্ (কিরূপে) বিজানীয়াং (বুঝিতে পারি ?) ॥৪॥

অর্জ্জুন বলিলেন—বিবস্বান্ (সূর্য্য) পূর্ব্বকালে জন্মিয়াছিলেন এবং তুমি ইদানীন্তন জন্মগ্রহণ করিয়াছ । সুতরাং তুমিই যে পূর্ব্বে সূর্য্যকে এই যোগ উপদেশ করিয়াছিলে এ কথা কি প্রকারে বিশ্বাস করা যায়? ॥৪॥

শ্রীভগবান্ উবাচ—
বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জ্জুন ।
তান্যহং বেদ সর্ব্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ ॥৫॥

শ্রীভগবান্ উবাচ (শ্রীভগবান্ কহিলেন) [হে] পরন্তপ অর্জ্জুন ! (হে শত্রুতাপন অর্জ্জুন !) মে তব চ (আমার ও তোমার) বহূনি (বহু) জন্মানি (জন্ম) অতীতানি (অতীত হইয়াছে) ; অহং (আমি) তানি (সেই) সর্ব্বাণি (সমস্তই) বেদ (অবগত আছি), ত্বং ((তুমি কিন্তু) [তানি] (সে সকল) ন বেত্থ (জান না) ॥৫॥

শ্রীভগবান্ কহিলেন—হে শত্রুতাপন অর্জ্জুন ! আমার এবং তোমার অনেক জন্ম বিগত হইয়াছে । পরমেশ্বরত্ব হেতু আমি সে সমস্ত স্মরণ করিতে পারি । তুমি অণুচৈতন্য জীব, সে সব স্মরণ করিতে পার না ॥৫॥

অজোঽপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোঽপি সন্ ।
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া ॥৬॥

[অহম্] (আমি) অজঃ (জন্মরহিত) সন্ অপি (হইয়াও) অব্যয়াত্মা (অনশ্বর শরীর) [সন্ অপি] (হইয়াও) ভূতানাম্ (প্রাণিগণের) ঈশ্বরঃ (ঈশ্বর) সন্ অপি (হইয়াও) স্বাম্ প্রকৃতিম্ (স্বকীয় সচ্চিদানন্দ স্বরূপকে) অধিষ্ঠায় (অধিষ্ঠান করিয়া) আত্মমায়য়া (যোগমায়া বিস্তারে) সম্ভবামি (দেব-মনুষ্য-তির্য্যক্ প্রভৃতি লোকে আবির্ভূত হই) ॥৬॥

আমি জন্ম-মৃত্যু-রহিত নিত্য-বিগ্রহ এবং সমস্ত জীবের নিয়ামক হইয়াও নিজ স্বরূপে অধিষ্ঠিত থাকিয়া স্বেচ্ছায় যোগমায়া বিস্তার-পূর্ব্বক জগতে আবির্ভূত হই ॥৬॥

যদা যদা হি ধর্ম্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ।
অভ্যুত্থানমধর্ম্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ॥৭॥

[হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) যদা যদা হি (যে যে সময়েই) ধর্ম্মস্য (ধর্ম্মের) গ্লানিঃ (গ্লানি) অধর্ম্মস্য [চ] (এবং অধর্ম্মের) অভ্যুত্থানম্ (প্রাদুর্ভাব) ভবতি (হয়), তদা (তখনই) আত্মানং (নিজের স্বরূপকে) অহম্ (আমি) সৃজামি (সৃষ্ট দেহের মত প্রদর্শন করাই ) ॥৭॥

হে ভারত ! যখন যখন ধর্ম্মের গ্লানি ও অধর্ম্মের অভ্যুত্থান হয়, তখনই আমি সৃষ্ট দেহবৎ আত্মপ্রকাশ করি, অর্থাৎ আবির্ভূত হই ॥৭॥

পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥৮॥

সাধূনাং (সাধুগণের) পরিত্রাণায় (পরিত্রাণের জন্য) [তথা] (এবং) দুষ্কৃতাম্ (দুষ্কৃতগণের) বিনাশায় (বিনাশের হেতু) ধর্ম্মসংস্থাপনার্থায় চ (এবং মদীয় ধ্যান-যজন-পরিচর্য্যা-সঙ্কীর্ত্তনরূপ ধর্ম্ম সম্যক্­রূপে স্থাপন করিবার নিমিত্ত) [অহং] (আমি) যুগে যুগে (প্রতি যুগে ) সম্ভবামি (আবির্ভূত হই) ॥৮॥

সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্কৃতকারিগণের বিনাশ ও ধর্ম্মকে সম্যক্ প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য আমি যুগে যুগে আবির্ভূত হই ॥৮॥

জন্ম কর্ম্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জম্ম নৈতি মামেতি সোঽর্জ্জুন ॥৯॥

[হে] অর্জ্জুন ! (হে অর্জ্জুন !) যঃ (যিনি) মে (আমার) এবং (এইরূপ) দিব্যম্ (স্বেচ্ছাকৃত ও অপ্রাকৃত) জন্ম কর্ম্ম চ (জন্ম ও কর্ম্ম) তত্ত্বতঃ (পূর্ব্বোক্তমত তত্ত্ব বিচারক্রমে) বেত্তি (অবগত হন), সঃ (তিনি) দেহং (বর্ত্তমান দেহ) ত্যক্ত্বা (ত্যাগ করিয়া) পুনঃ (পুনর্ব্বার) জন্ম (জন্ম) ন এতি (গ্রহণ করেন না), [কিন্তু] মাম্ এতি (আমাকে প্রাপ্ত হন) ॥৯॥

হে অর্জ্জুন ! যিনি আমার এইরূপ স্বেচ্ছাকৃত অপ্রাকৃত জন্ম ও কর্ম্ম যথার্থভাবে অবগত হন, তিনি নিজের এই বর্ত্তমান দেহটী পরিত্যাগ করিয়া পুনরায় আর জন্মগ্রহণ করেন না কিন্তু আমাকেই প্রাপ্ত হন, অর্থাৎ আমার চিচ্ছক্তি প্রকাশরূপ হ্লাদিনী-শক্তির বশীভূত হইয়া আমার নিত্যসেবা প্রাপ্ত হন ॥৯॥

বীতরাগভয়ক্রোধা মম্ময়া মামুপাশ্রিতাঃ ।
বহবো জ্ঞানতপসা পূতা মদ্ভাবমাগতাঃ ॥১০॥

বীতরাগভয়ক্রোধাঃ (জড় বিষয়ে প্রীতি, ভয় ও ক্রোধশূন্য হইয়া) মম্ময়াঃ (আমার বিষয় শ্রবণ, কীর্ত্তন ও স্মরণে নিবিষ্ট চিত্ত) মাম্ উপাশ্রিতাঃ (আমার আশ্রিত) বহবঃ (বহু ব্যক্তি) জ্ঞানতপসা (মদীয় জ্ঞানের ও মৎসম্বন্ধীয় তপস্যা দ্বারা) পূতাঃ [সন্তঃ] (নির্ম্মল হইয়া) মদ্­ভাবম্ (আমাতে ভাব-ভক্তি) আগতাঃ (লাভ করিয়াছেন) ॥১০॥

জড়বিষয়ে প্রীতি, ভয় ও ক্রোধশূন্য, আমার বিষয়ে শ্রবণ, কীর্ত্তন ও স্মরণে নিবিষ্টচিত্ত ও আমারই আশ্রিত বহু ব্যক্তি মৎসম্বন্ধীয় জ্ঞান ও তপস্যায় বিশুদ্ধ হইয়া আমার পবিত্র প্রেমলাভ করিয়াছেন ॥১০॥

যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্ ।
মম বর্ত্মানুবর্ত্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্ব্বশঃ ॥১১॥

যে (যাহারা) যথা (যে প্রকারে) মাং (আমাকে) প্রপদ্যন্তে (ভজনা করে), অহম্ (আমি) তান্ (তাহাদিগকে) তথা এব (সেই প্রকারেই) ভজামি (ভজন ফল দান করি) । [হে] পার্থ ! (হে অর্জ্জুন !) সর্ব্বশঃ মনুষ্যাঃ (জ্ঞানি-কর্ম্মি-যোগি-দেবতান্তর-ভজনকারী সকল মনুষ্যই) মম বর্ত্ম (আমার পথের) অনুবর্ত্তন্তে (অনুসরণ করে) ॥১১॥

যে ব্যক্তি আমার প্রতি যেভাবে প্রপত্তি স্বীকার করেন, আমি তাহাকে সেইভাবেই ভজন করি । সকল মতেরই চরম উদ্দেশ্য স্বরূপ আমি সকলেরই প্রাপ্য । সমস্ত মনুষ্যই আমার বিবিধ বর্ত্মের অনুসরণ করে ॥১১॥

কাঙ্ক্ষন্তঃ কর্ম্মণাং সিদ্ধিং যজন্ত ইহ দেবতাঃ ।
ক্ষিপ্রং হি মানুষে লোকে সিদ্ধির্ভবতি কর্ম্মজা ॥১২॥

ইহ (এই মনুষ্য লোকে) কর্ম্মণাং (কর্ম্ম সমূহের) সিদ্ধিং (সাফল্য) কাঙ্ক্ষন্তঃ (কামনাকারী ব্যক্তিগণ) দেবতাঃ (ইন্দ্রাদি দেবতাগণের) যজন্তে (ভজনা করিয়া থাকে), হি (যেহেতু) মানুষে লোকে (মনুষ্য লোকে) কর্ম্মজা (কর্ম্ম জন্য) সিদ্ধিঃ (স্বর্গাদি ফল) ক্ষিপ্রং (শ্রীঘ্রই) ভবতি (হইয়া থাকে) ॥১২॥

এই মনুষ্যলোকে কর্ম্মসমূহের সহজে সাফল্য কামনাশীল ব্যক্তিগণ ইন্দ্রাদি দেবতাগণকে ভজনা করেন । তদ্দ্বারা মনুষ্যলোকে কর্ম্মজ ফল স্বর্গাদি লাভ অতি শীঘ্রই সংঘটিত হইয়া থাকে ॥১২॥

চাতুর্ব্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্ম্মবিভাগশঃ ।
তস্য কর্ত্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্ত্তারমব্যয়ম্ ॥১৩॥

ময়া (আমা কর্ত্তৃক) গুণকর্ম্মবিভাগশঃ (সত্ত্বাদি গুণ ও শম দমাদি কর্ম্মের বিভাগ অনুসারে) চাতুর্ব্বর্ণ্যং (ব্রাহ্মণাদি চারিটী বর্ণ) সৃষ্টং (সৃষ্ট হইয়াছে) । তস্য (সেই বর্ণ ধর্ম্মের ও বর্ণ সকলের) কর্ত্তারম্ অপি (স্রষ্টা হইলেও) মাং (আমাকে) অকর্ত্তারম্ (বস্তুতঃ গুণাতীত স্বরূপ বলিয়া অস্রষ্টা) অব্যয়ম্ (ও নির্ব্বিকার বলিয়া) বিদ্ধি (জানিবে) ॥১৩॥

সত্ত্বাদিগুণ ও শমদমাদি কর্ম্মের বিভাগ অনুসারে ব্রাহ্মণাদি বর্ণচতুষ্টয় আমিই সৃজন করিয়াছি । জগতে আমি বই আর কেহ কর্ত্তা নাই । কিন্তু সেই বর্ণধর্ম্মের কর্ত্তা হইলেও আমাকে বস্তুতঃ গুণাতীত স্বরূপ বলিয়া অকর্ত্তা ও অব্যয় বলিয়া জানিতে হইবে ॥১৩॥

ন মাং কর্ম্মাণি লিম্পন্তি ন মে কর্ম্মফলে স্পৃহা ।
ইতি মাং যোঽভিজানাতি কর্ম্মভির্ন স বধ্যতে ॥১৪॥

কর্ম্মাণি (কর্ম্ম সকল) [জীবমিব] (জীবের ন্যায়) মাং (আমাকে) ন লিম্পন্তি (লিপ্ত করিতে পারে না), মে (আমার) কর্ম্মফলে (কর্ম্মফল স্বর্গাদিতেও) স্পৃহা (স্পৃহা) ন [অস্তি] (নাই), ইতি (এইরূপ) যঃ (যিনি) মাং (আমাকে) অভিজানাতি (সাম্যক্ জানিতে পারেন) সঃ (তিনি) কর্ম্মভিঃ (কর্ম্মের দ্বারা) ন বধ্যতে (বদ্ধ হন না) ॥১৪॥

জীবের অদৃষ্ট বশতঃ যে কর্ম্মতত্ত্ব আমি সৃষ্টি করিয়াছি, তাহা আমাকে লিপ্ত করিতে পারে না । কর্ম্মফলেও আমার স্পৃহা নাই, (যেহেতু অতি তুচ্ছ কর্ম্মফল আমি যে ষড়ৈশ্বর্য্যপূর্ণ ভগবান্ আমার পক্ষে নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর ।) জীবের কর্ম্মমার্গ ও আমার স্বতন্ত্রতা বিচার পূর্ব্বক যিনি আমার অব্যয়তত্ত্ব অবগত হইতে পারেন, তিনি কখনই কর্ম্ম দ্বারা বদ্ধ হন না । শুদ্ধভক্তি আচরণ করতঃ আমাকেই লাভ করেন ॥১৪॥

এবং জ্ঞাত্বা কৃতং কর্ম্ম পূর্ব্বৈরপি মুমুক্ষুভিঃ ।
কুরু কর্ম্মৈব তস্মাৎ ত্বং পূর্ব্বৈঃ পূর্ব্বতরং কৃতম্ ॥১৫॥

এবং (এইরূপ) জ্ঞাত্বা (জানিয়া) পূর্ব্বৈঃ (পূর্ব্ব পূর্ব্ব) মুমুক্ষুভিঃ অপি (মুক্তিকামিগণও) কর্ম্ম (মদর্পিত কর্ম্ম) কৃতং (করিয়াছেন) । তস্মাৎ (অতএব) ত্বং (তুমি) পূর্ব্বৈঃ (প্রাচীন জনকাদি মহাজন কর্ত্তৃক) পূর্ব্বতরং কৃতম্ (পূর্ব্বে অনুষ্ঠিত) কর্ম্ম এব (নিষ্কাম কর্ম্মযোগই) কুরু (অবলম্বন কর) ॥১৫॥

পূর্ব্ব পূর্ব্ব মুমুক্ষুগণ এই তত্ত্ব অবগত হইয়া সকাম কর্ম্ম পরিত্যাগ পূর্ব্বক নিষ্কাম মদর্পিত কর্ম্মানুষ্ঠান করিয়াছেন । অতএব তুমিও পূর্ব্ব পূর্ব্ব মহাজন অনুষ্ঠিত নিষ্কাম কর্ম্মযোগ অবলম্বন কর ॥১৫॥

কিং কর্ম্ম কিমকর্ম্মেতি কবয়োঽপ্যত্র মোহিতাঃ ।
তত্তে কর্ম্ম প্রবক্ষ্যামি যজ্­জ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেঽশুভাৎ ॥১৬॥

কিং কর্ম্ম (কর্ম্ম কি ?) কিম্ অকর্ম্ম (অকর্ম্মই বা কি ?) ইতি অত্র (এই তত্ত্ব নিরূপণে) কবয়ঃ অপি (জ্ঞানিগণও) মোহিতাঃ [ভবন্তি] (মোহ প্রাপ্ত হন), [অতঃ] (অতএব) যৎ জ্ঞাত্বা (যাহা জানিয়া) অশুভাৎ (অমঙ্গলপূর্ণ সংসার হইতে) মোক্ষ্যসে (মুক্তি লাভ করিতে পারিবে) তৎ কর্ম্ম (সেই কর্ম্ম ও অকর্ম্ম) তে (তোমাকে) প্রবক্ষ্যামি (বলিব) ॥১৬॥

কাহাকে কর্ম্ম ও কাহাকে অকর্ম্ম বলে তাহা স্থিরীকরণ সম্বন্ধে জ্ঞানিগণও মোহপ্রাপ্ত হইয়া থাকেন । অতএব যাহা অবগত হইয়া তুমি অমঙ্গলপূর্ণ সংসার হইতে মুক্তিলাভ করিবে সেই কর্ম্ম ও অকর্ম্ম সম্বন্ধে তোমাকে উপদেশ করিতেছি ॥১৬॥

কর্ম্মণো হ্যপি বোদ্ধব্যং বোদ্ধব্যঞ্চ বিকর্ম্মণঃ ।
অকর্ম্মণশ্চ বোদ্ধব্যং গহনা কর্ম্মণো গতিঃ ॥১৭॥

কর্ম্মণঃ অপি (বেদবিহিত কর্ম্মেরও) বোদ্ধব্যং (জানিবার বিষয়) বিকর্ম্মণঃ চ (শাস্ত্র নিষিদ্ধ কর্ম্মের সম্বন্ধেও) বোদ্ধব্যং (জানিবার বিষয়) অকর্ম্মণঃ চ (এবং কর্ম্মের অকরণ অর্থাৎ সন্ন্যাস সম্বন্ধেও) বোদ্ধব্যং (জানিবার বিষয়) [অস্তি] (আছে) । হি (যেহেতু) কর্ম্মণঃ (কর্ম্ম, বিকর্ম্ম ও অকর্ম্মের) গতিঃ (যথার্থ তত্ত্ব) গহনা (অতিশয় দুর্গম) ॥১৭॥

বেদবিহিত কর্ম্মেরও জানিবার বিষয় আছে, শাস্ত্র নিষিদ্ধ কর্ম্মের সম্বন্ধেও জানিবার বিষয় আছে, এবং কর্ম্মের সন্ন্যাস সম্বন্ধেও জানিবার বিষয় আছে । কর্ত্তব্যাচরণই ‘কর্ম্ম’, নিষিদ্ধাচরণই ‘বিকর্ম্ম’, এবং কর্ম্মের অকরণ বা সন্ন্যাসই ‘অকর্ম্ম’, ইহাদের নিগূঢ় তত্ত্ব নিরূপণ সুকঠিন ॥১৭॥

কর্ম্মণ্যকর্ম্ম যঃ পশ্যেদকর্ম্মণি চ কর্ম্ম যঃ ।
স বুদ্ধিমান্ মনুষ্যেষু স যুক্তঃ কৃৎস্নকর্ম্মকৃৎ ॥১৮॥

যঃ (যিনি) কর্ম্মণি (শুদ্ধান্তঃকরণ জ্ঞানিকর্ত্তৃক অনুষ্ঠীয়মান নিষ্কাম কর্ম্ম যোগে) অকর্ম্ম (বন্ধকত্ব নাই বলিয়া উহা কর্ম্ম নয় এইরূপ) অকর্ম্মণি চ (এবং অশুদ্ধান্তঃ করণ সন্ন্যাসী কর্ত্তৃক কর্ম্মের অকরণে) কর্ম্ম (দুর্গতি প্রাপক কর্ম্মবন্ধন) পশ্যেৎ (দর্শন করেন) সঃ (তিনিই) মনুষ্যেষু (মনুষ্যদিগের মধ্যে) বুদ্ধিমান্ (বিবেকী), সঃ (তিনিই) যুক্তঃ (যোগী) কৃৎস্নকর্ম্মকৃৎ (এবং সম্পূর্ণ কর্ম্মের অনুষ্ঠাতা) ॥১৮॥

যিনি শুদ্ধান্তঃকরণ জ্ঞানীর নিষ্কাম কর্ম্মানুষ্ঠানে বন্ধকত্ব নাই সুতরাং উহা কর্ম্ম নয় এইরূপ জানেন ; এবং অশুদ্ধান্তঃকরণ সন্ন্যাসীর কর্ম্মত্যাগে দুর্গতি প্রাপক কর্ম্মবন্ধন উপলব্ধি করেন, তিনিই মনুষ্যদিগের মধ্যে বুদ্ধিমান্ যোগী এবং সম্পূর্ণ কর্ম্মানুষ্ঠাতা ॥১৮॥

যস্য সর্ব্বে সমারম্ভাঃ কামসঙ্কল্পবর্জ্জিতাঃ ।
জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্ম্মাণং তমাহুঃ পণ্ডিতং বুধাঃ ॥১৯॥

যস্য (যাঁহার) সর্ব্বে (সমস্ত) সমারম্ভাঃ (কর্ম্ম) কামসঙ্কল্পবর্জ্জিতাঃ (ফল কামনা রহিত) জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্ম্মাণং (তিনি জ্ঞানরূপ অগ্নিতে বিহিত ও নিষিদ্ধ কর্ম্মসমূহ দগ্ধ করিয়াছেন) তম্ (তাঁহাকে) বুধাঃ (সুধীগণ) পণ্ডিতঃ (পণ্ডিত) আহুঃ (বলেন) ॥১৯॥

যাঁহার সমুদয় কর্ম্মাচরণ ফলকামনা শূন্য, জ্ঞানাগ্নিতে বিহিত ও নিষিদ্ধ কর্ম্মসমূহ দগ্ধকারী তাঁহাকে বিবেকিগণ ‘পণ্ডিত’ বলেন ॥১৯॥

ত্যক্ত্বা কর্ম্মফলাসঙ্গং নিত্যতৃপ্তো নিরাশ্রয়ঃ ।
কর্ম্মণ্যভিপ্রবৃত্তোঽপি নৈব কিঞ্চিৎ করোতি সঃ ॥২০॥

[যঃ] (যিনি) কর্ম্মফলাসঙ্গং (কর্ম্ম ফলের আসক্তি) ত্যক্তা (ত্যাগ করিয়া) নিত্যতৃপ্তঃ (নিত্য নিজানন্দে তৃপ্ত) নিরাশ্রয়ঃ (এবং যোগক্ষেম নিমিত্ত আশ্রয় নিরপেক্ষ) সঃ (তিনি) কর্ম্মণি (সমস্ত কর্ম্মে) অভিপ্রবৃত্তঃ অপি ( সম্যক্ প্রবৃত্ত হইলেও) কিঞ্চিৎ এব (কিছুই) ন করোতি (করেন না) ॥২০॥

যিনি কর্ম্মফলের আসক্তি পরিত্যাগ পূর্ব্বক নিত্য নিজানন্দে পরিতৃপ্ত এবং যোগ ও ক্ষেমের নিমিত্ত আশ্রয় নিরপেক্ষ, তিনি সমস্ত কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়াও কিছুই করেন না অর্থাৎ সেই সমস্ত কর্ম্মফলে আবদ্ধ হন না ॥২০॥

নিরাশীর্যতচিত্তাত্মা ত্যক্তসর্ব্বপরিগ্রহঃ ।
শারীরং কেবলং কর্ম্ম কুর্ব্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্ ॥২১॥

[সঃ] (তিনি) নিরাশীঃ (নিষ্কাম) যতচিত্তাত্মা (সংযত চিত্ত ও শরীর) ত্যক্তসর্ব্বপরিগ্রহঃ (এবং সর্ব্ব প্রকার পরিগ্রহ ত্যাগী) [সন্] (হইয়া) কেবলং (কেবল) শারীরং (শরীর রক্ষার্থ অসৎপ্রতিগ্রহাদি) কর্ম্ম (কর্ম্ম) কুর্ব্বন্ [অপি] (করিয়াও) কিল্বষম্ (পাপ) ন আপ্নোতি (গ্রস্ত হন না) ॥২১॥

তিনি ফলাশা ও সমস্ত পরিগ্রহ অর্থাৎ সংগ্রহচেষ্টাতিশয্য ত্যাগ করতঃ স্বীয় শরীর ও চিত্তকে বুদ্ধির অধীন রাখিয়া যদি কেবলমাত্র শরীর যাত্রা-নির্ব্বাহের জন্য অসৎ প্রতিগ্রহাদি কর্ম্ম করিয়াও থাকেন, তাহাতে তাঁহার সেই কর্ম্ম-জনিত পাপ বা পূণ্য কিছুই হয় না ॥২১॥

যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্টো দ্বন্দ্বাতীতো বিমৎসরঃ ।
সমঃ সিদ্ধাবসিদ্ধৌ চ কৃত্বাপি ন নিবধ্যতে ॥২২॥

যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্টঃ (অনায়াসে প্রাপ্ত বস্তুতে সন্তষ্ট), দ্বন্দ্বাতীতঃ (শীতোষ্ণ সুখদুঃখাদি সহনশীল), বিমৎসরঃ (অন্যের প্রতি দ্বেষ শূন্য), সিদ্ধৌ অসিদ্ধৌ চ (এবং কার্য্যের সিদ্ধি ও অসিদ্ধি বিষয়ে) সমঃ (হর্ষ ও বিষাদরহিত) [জনঃ] (ব্যক্তি) [কর্ম্ম] কৃত্বা অপি (কর্ম্ম করিয়াও) ন নিবধ্যতে (বদ্ধ হন না) ॥২২॥

তিনি অনায়াসে যাহা প্রাপ্ত হন, তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, সুখ-দুঃখ, রাগ-দ্বেষ ইত্যাদি দ্বন্দ্বের বশীভূত হন না, মাৎসর্য্যকে দূর করেন ; কার্য্যের সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে হর্ষ বা বিষাদযুক্ত হন না অর্থাৎ তুল্য জ্ঞান করেন । অতএব যে কর্ম্মই করুন তাহাতে নিজে বদ্ধ হন না ॥২২॥

গতসঙ্গস্য মুক্তস্য জ্ঞানাবস্থিতচেতসঃ ।
যজ্ঞায়াচরতঃ কর্ম্ম সমগ্রং প্রবিলীয়তে ॥২৩॥

গতসঙ্গস্য (আসক্তি রহিত), মুক্তস্য (মুক্ত), জ্ঞানাবস্থিতচেতসঃ (জ্ঞানে অবস্থিত চিত্ত), যজ্ঞায় (এবং যজ্ঞের অর্থাৎ পরমেশ্বরের প্রীত্যর্থে) কর্ম্ম আচরতঃ (কর্ম্ম আচরণকারী পুরুষের) সমগ্রং (সমুদয়) [কর্ম্ম] (কর্ম্ম) প্রবিলীয়তে (প্রকৃষ্টরূপে লয়প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ ফলজনক হয় না) ॥২৩॥

আসক্তি রহিত, মুক্ত ও জ্ঞানে অবস্থিত চিত্ত পুরুষের যজ্ঞের জন্য যে কর্ম্ম আচরিত হয়, তাঁহার আচরিত সেই সমস্ত কর্ম্ম প্রকৃষ্টরূপে লয় পাইয়া যায় । কর্ম্মমীমাংসকগণ যাহাকে ‘অপূর্ব্ব’ বলেন, নিষ্কাম-কর্ম্মযোগীর কর্ম্মসকল সেই অপূর্ব্বতা লাভ করে না ॥২৩॥

ব্রক্ষার্পণং ব্রহ্ম হবির্ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্ ।
ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্ম্মসমাধিনা ॥২৪॥

অর্পণং (স্রুক্­স্রুবাদি) ব্রহ্ম (ব্রহ্ম স্বরূপ) [অর্প্যমাণম্] (অর্প্যমাণ) হবিঃ (ঘৃতাদিও) ব্রহ্ম (ব্রহ্মস্বরূপ) ব্রহ্মণা (হবন কর্ত্ত্রা] (ব্রহ্মস্বরূপ হোতৃপুরুষ কর্ত্তৃক) ব্রহ্মাগ্নৌ (ব্রহ্মস্বরূপ অগ্নিতে) হুতম্ (হোমও) [ব্রহ্ম] (ব্রহ্মস্বরূপ) [ভবতি] (হয়) ; [এবং বিবেকবতা] (এইরূপ বিচারযুক্ত) তেন (সেই পুরুষের) ব্রহ্মকর্ম্মসমাধিনা (ব্রহ্মাত্মক কর্ম্মে চিত্তের একাগ্রতা নিবন্ধন) ব্রহ্ম এব (ব্রহ্মই) গন্তব্যম্ (লভ্য হয়) ॥২৪॥

যজ্ঞের মূল তত্ত্ব বলিতেছেন—স্রুক্­স্রুবাদি, অর্প্যমাণ ঘৃতাদি হোমীয় অগ্নি, আহুতি প্রদানকারী ব্রাহ্মণ এবং হোমক্রিয়া বা তৎফল এই সমস্তই ব্রহ্মস্বরূপ হইয়া থাকে । এইরূপ বিচারযুক্ত পুরুষের ব্রহ্মাত্মক কর্ম্মে চিত্তের একাগ্রতা নিবন্ধন তিনি ব্রহ্মকেই লাভ করিয়া থাকেন ॥২৪॥

দৈবমেবাপরে যজ্ঞং যোগিনঃ পর্য্যুপাসতে ।
ব্রহ্মাগ্নাবপরে যজ্ঞং যজ্ঞেনৈবোপজুহ্বতি ॥২৫॥

অপরে (অপর) যোগিনঃ (কর্ম্মযোগিগণ) দৈবম্ যজ্ঞং এব (ইন্দ্রাদিদেবোদ্দেশ্যক যজ্ঞেরই) পর্য্যুপাসতে (উপাসনা করেন), অপরে (জ্ঞানযোগিগণ) ব্রহ্মাগ্নৌ (তৎপদার্থ পরমাত্মরূপ অগ্নিতে) যজ্ঞং (হবিঃ স্থানীয় ত্বংপদার্থ জীবাত্মাকে) যজ্ঞেন এব (প্রণবরূপ মন্ত্র দ্বারাই) উপজুহ্বতি (আহুতি প্রদান করেন) ॥২৫॥

অপর কর্ম্মযোগিগণ ইন্দ্র বরুণাদি দেবগণের পূজারূপ দৈবযজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন । অন্য জ্ঞানযোগিগণ তৎপদার্থ পরমাত্মরূপ অগ্নিতে হবিঃ স্থানীয় ত্বংপদার্থ জীবাত্মাকে প্রণবরূপ মন্ত্র দ্বারাই হোম করেন ॥২৫॥

শ্রোত্রাদীনীন্দ্রিয়াণ্যন্যে সংযমাগ্নিষু জুহ্বতি ।
শব্দাদীন্ বিষয়ানন্য ইন্দ্রিয়াগ্নিষু জুহ্বতি ॥২৬॥

অন্যে (নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারিগণ) সংযমাগ্নিষু (ইন্দ্রিয়সংযমরূপ অগ্নিতে অর্থাৎ সংযত মনে) শ্রোত্রাদীনি (শ্রোত্র চক্ষুরাদি) ইন্দ্রিয়াণি (ইন্দ্রিয় সকলকে) জুহ্বতি (হোম করেন), অন্যে (অপর ব্রহ্মচারিগণ) ইন্দ্রিয়াগ্নিষু (ইন্দ্রিয়রূপ অগ্নিতে) শব্দাদীন্ (শব্দাদি) বিষয়ান্ (বিষয় সমূহকে) জুহ্বতি (হোম করেন) ॥২৬॥

অপর নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারিগণ মনঃ সংযমরূপ অগ্নিতে শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয় সকলকে হোম করেন । স্বধর্ম্মপরায়ণ গৃহিসকল শব্দাদি বিষয়সমূহকে ইন্দ্রিয়রূপ অগ্নিতে হোম করেন ॥২৬॥

সর্ব্বাণীন্দ্রিয়কর্ম্মাণি প্রাণকর্ম্মাণি চাপরে ।
আত্মসংযমযোগাগ্নৌ জুহ্বতি জ্ঞানদীপিতে ॥২৭॥

অপরে (শুদ্ধত্বংপদার্থবিজ্ঞগণ) জ্ঞানদীপিতে (জ্ঞানদ্বারা প্রদীপ্ত) আত্মসংযমযোগাগ্নৌ (ত্বং পদার্থের শুদ্বিরূপ অগ্নিতে) সর্ব্বাণি (সমস্ত) ইন্দ্রিয়কর্ম্মাণি (ইন্দ্রিয় ও তাহাদের কর্ম্ম শ্রবণ দর্শনাদি) প্রাণকর্ম্মাণি চ (এবং দশপ্রাণ ও তাহাদের কার্য্য) জুহ্বতি (হোম করিয়া থাকেন) ॥২৭॥

প্রত্যগাত্মার অনুসন্ধানকারী কৈবল্যবাদী পাতঞ্জলাদি যোগিসকল জ্ঞান দ্বারা ত্বংপদার্থের শুদ্ধিরূপ অগ্নিতে সমস্ত ইন্দ্রিয়গণ ও তাহাদের কর্ম্ম শ্রবণ দর্শনাদি এবং দশপ্রাণও তাহাদের কার্য্য সমুদয়ই হোম করিয়া থাকেন ॥২৭॥

দ্রব্যযজ্ঞাস্তপোযজ্ঞা যোগযজ্ঞাস্তথাপরে ।
স্বাধ্যায়জ্ঞানযজ্ঞাশ্চ যতয়ঃ সংশিতব্রতাঃ ॥২৮॥

[কেচিৎ] (কেহ কেহ) দ্রব্যযজ্ঞাঃ (দ্রব্যদানরূপ যজ্ঞ করেন) [কেচিৎ] (কেহ কেহ) তপোযজ্ঞাঃ (কৃচ্ছ্র চান্দ্রয়ণাদিরূপ যজ্ঞ করেন) তথা অপরে (এবং অপর কেহ কেহ) যোগযজ্ঞাঃ (অষ্টাঙ্গ যোগরূপ যজ্ঞ করেন) [কেচন] (আবার কেহ কেহ) স্বাধ্যায়-জ্ঞান-যজ্ঞাশ্চ (বা বেদপাঠ ও বেদার্থজ্ঞানরূপ যজ্ঞকারী) [এতে সর্ব্বে] (ইহারা সকলেই) যতয়ঃ (যত্নশীল) সংশিতব্রতাঃ (ও তীক্ষ্ণব্রতকারী) ॥২৮॥

কেহ কেহ দ্রব্যদানরূপ যজ্ঞশীল, কেহ কেহ কৃচ্ছ্র চান্দ্রায়ণাদিরূপ যজ্ঞশীল, কেহ কেহ অষ্টাঙ্গযোগরূপ যজ্ঞশীল এবং অপর কেহ বা বেদপাঠ ও বেদার্থ জ্ঞানরূপ যজ্ঞকারী । ইহারা সকলেই যত্নশীল ও তীক্ষ্ণব্রতকারী ॥২৮॥

অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণেঽপানং তথাপরে ।
প্রাণাপানগতী রুদ্ধা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ ।
অপরে নিয়তাহারাঃ প্রাণান্ প্রাণেষু জুহ্বতি ॥২৯॥

অপরে (অপর কেহ) অপানে (অধোবৃত্তি বায়ুতে) প্রাণং (উর্দ্ধবৃত্তি বায়ুকে) জুহ্বতি (পূরককালে একীভূত করেন) তথা (সেইরূপ) প্রাণে অপানং (রেচককালে অপান বায়ুকে প্রাণ বায়ুতে) জুহ্বতি (হোম করেন) ; প্রাণাপানগতী (কুম্ভককালে প্রাণ ও অপানের গতিকে) রুদ্ধা (নিরোধ পূর্ব্বক) প্রাণায়ামপরায়ণাঃ (প্রাণায়াম পরায়ণ) [ভবন্তি] (হইয়া থাকেন) । অপরে (অপর ইন্দ্রিয়-জয়কামিগণ) নিয়তাহারাঃ (আহার সংকোচ পূর্ব্বক) প্রাণেষু (প্রাণ বায়ুতে) প্রাণান্ (ইন্দ্রিয় সকলকে) জুহ্বতি (হোম করেন) ॥২৯॥

অপর কেহ কেহ অধোবৃত্তি বায়ুতে উর্দ্ধবৃত্তি-বায়ুকে পূরককালে একীভূত করেন, সেইরূপ রেচককালে অপান বায়ুকে প্রাণবায়ুতে হোম করেন ; এবং কুম্ভককালে প্রাণ ও অপানের গতি নিরোধপূর্ব্বক প্রাণায়াম পরায়ণ হইয়া থাকেন । অপর ইন্দ্রিয় জয়কামিগণ আহার সঙ্কোচ অভ্যাস করিয়া প্রাণবায়ুতে ইন্দ্রিয় সকলকে হোম করেন ॥২৯॥

সর্ব্বেঽপ্যেতে যজ্ঞবিদো যজ্ঞক্ষয়িতকল্মষাঃ ।
যজ্ঞশিষ্টামৃতভুজো যান্তি ব্রহ্ম সনাতনম্ ॥৩০॥

এতে সর্ব্বে অপি (ইহারা সকলেই) যজ্ঞবিদঃ (যজ্ঞতত্ত্ববিৎ) যজ্ঞক্ষয়িতকল্মষাঃ (যজ্ঞের দ্বারা ক্ষীণপাপ) যজ্ঞশিষ্টামৃতভুজঃ (যজ্ঞাবশিষ্ট অমৃত অর্থাৎ ভোগ, ঐশ্বর্য্য ও সিদ্ধি প্রভৃতি ভোগ করেন) ; সনাতনম্ (এবং জ্ঞান দ্বারা সনাতন) ব্রহ্ম (ব্রহ্মকেই) যান্তি (লাভ করেন) ॥৩০॥

ইহারা সকলেই যজ্ঞতত্ত্ববেত্তা, যজ্ঞের দ্বারা ক্ষীণ পাপ হইয়া যজ্ঞাবশিষ্ট অমৃত অর্থাৎ ভোগ, ঐশ্বর্য্য ও সিদ্ধি প্রভৃতি ভোগ করতঃ অবশেষে পূর্ব্বোক্ত সনাতন ব্রহ্মকেই লাভ করেন ॥৩০॥

নায়ং লোকোঽস্ত্যযজ্ঞস্য কুতোঽন্যঃ কুরুসত্তম ॥৩১॥

[হে] কুরুসত্তম ! (হে কুরুশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন !) অযজ্ঞস্য (যজ্ঞরহিত ব্যক্তির) অয়ং লোকঃ [অপি] (এই অল্পসুখবিশিষ্ট মনুষ্যলোকও) ন [অস্তি] (নাই) অন্যঃ [লোকঃ] (অপর স্বর্গলোক) কুতঃ [প্রাপ্তব্যঃ] (কিরূপে প্রাপ্তি সম্ভব হইবে ? ) ॥৩১॥

হে কুরুশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন ! যজ্ঞানুষ্ঠানবিহীন ব্যক্তির পক্ষে ইহলোক প্রাপ্তিই সম্ভব হয় না, তখন ইহাদের পরলোক প্রাপ্তি কিরূপে সম্ভব হইবে ? ॥৩১॥

এবং বহুবিধা যজ্ঞা বিততা ব্রহ্মণো মুখে ।
কর্ম্মজান্ বিদ্ধি তান্ সর্ব্বানেবং জ্ঞাত্বা বিমোক্ষ্যসে ॥৩২॥

ব্রহ্মণঃ মুখে (বেদরূপ মুখে) এবং (এই প্রকার) বহুবিধাঃ (বহুবিধ) যজ্ঞাঃ (যজ্ঞ) বিততাঃ (স্পষ্ট উক্ত হইয়াছে), [ত্বং] (তুমি) তান্ সর্ব্বান্ (সেই সকল যজ্ঞকেই) কর্ম্মজান্ (বাক্য-মন-কায় কর্ম্মজনিত বলিয়া) বিদ্ধি (জানিবে), এবং (এইরূপ) জ্ঞাত্বা (জানিয়া) বিমোক্ষ্যসে (কর্ম্ম-বন্ধন হইতে মুক্তি লাভ করিবে) ॥৩২॥

এই সমস্ত প্রকার যজ্ঞই বেদোক্ত বা বেদানুগত শাস্ত্রোক্ত ; ইহারা সকলেই বাক্য-মন-কায়-কর্ম্ম-জনিত, অতএব কর্ম্মজ । এইরূপে কর্ম্মতত্ত্ব বিচার করিতে পারিলে কর্ম্মবন্ধন হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারিবে ॥৩২॥

শ্রেয়ান্ দ্রব্যময়াদ্­যজ্ঞাজ্­ জ্ঞানযজ্ঞঃ পরন্তপ ।
সর্ব্বং কর্ম্মাখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে ॥৩৩॥

[হে] পরন্তপ পার্থ ! (হে শত্রুতাপন অর্জ্জুন !) [তেষু অপি] (সেই যজ্ঞগুলির মধ্যেও) দ্রব্যময়াৎ (ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবিঃ ইত্যাদিরূপ দ্রব্যময়) যজ্ঞাৎ (যজ্ঞ হইতে) জ্ঞানযজ্ঞঃ (ব্রহ্মাগ্নাবপরে ইত্যাদি শ্লোকোক্ত জ্ঞানযজ্ঞ) শ্রেয়ান্ (শ্রেষ্ঠ) । [যতঃ] (যেহেতু) জ্ঞানে [সতি] (জ্ঞানের উদয় হইলে) সর্ব্বং কর্ম্ম (সমুদয় কর্ম্ম) অখিলং [সৎ] (অব্যর্থ হইয়া) পরিসমাপ্যতে (সমাপ্ত হয় অর্থাৎ জ্ঞানের অনন্তর কর্ম্ম থাকে না) ॥৩৩॥

হে শত্রুতাপন অর্জ্জুন ! সেই সমস্ত যজ্ঞগুলির মধ্যেও ‘ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবিঃ’ ইত্যাদিরূপ দ্রব্যময় যজ্ঞ হইতে ‘ব্রহ্মাগ্নাবপরে’ ইত্যাদি শ্লোকোক্ত জ্ঞানযজ্ঞ অত্যন্ত শ্রেষ্ঠ । যেহেতু সমস্ত কর্ম্মই জ্ঞানে পরিসমাপ্তি লাভ করে ॥৩৩॥

তদ্­বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া ।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ ॥৩৪॥

প্রণিপাতেন (তত্ত্বদর্শী গুরুকে দণ্ডবৎ নমস্কার), পরিপ্রশ্নেন (সঙ্গত প্রশ্ন), সেবয়া (ও অকপট পরিচর্য্যা দ্বারা) তৎ (পূর্ব্বোক্ত সেই জ্ঞানের কথা) বিদ্ধি (জানিতে হইবে) ; জ্ঞানিনঃ (শাস্ত্রজ্ঞানী) তত্ত্বদর্শিনঃ (পরব্রহ্ম বিষয়ে অপরোক্ষানুভূতি সম্পন্ন মহাত্মগণ) তে (তোমাকে) জ্ঞানং (জ্ঞান) উপদেক্ষ্যন্তি (উপদেশ করিবেন) ॥৩৪॥

তুমি তত্ত্বদর্শী গুরুকে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত, সঙ্গত প্রশ্ন ও অকৃত্রিম সেবা করতঃ সন্তুষ্ট করিয়া পূর্ব্বোক্ত সেই জ্ঞানের কথা জানিতে পারিবে । শাস্ত্রজ্ঞানে সুনিপুণ ও পরব্রহ্ম বিষয়ে সাক্ষাৎ অনুভূতি সম্পন্ন মহাপুরুষগণ তোমাকে তত্ত্বজ্ঞান উপদেশ করিবেন ॥৩৪॥

যজ্­জ্ঞাত্বা ন পুনর্মোহমেবং যাস্যসি পাণ্ডব ।
যেন ভূতান্যশেষাণি দ্রক্ষ্যস্যাত্মন্যথো ময়ি ॥৩৫॥

[হে] পাণ্ডব ! (হে পাণ্ডব !) যৎ [জ্ঞানং] (আত্মা দেহাদি হইতে ভিন্ন এইরূপ যে জ্ঞান) জ্ঞাত্বা (লাভ করিয়া) পুনঃ (পুনরায়) এবং (এইরূপ) মোহম্ (মোহ) ন যাস্যসি (প্রাপ্ত হইবে না), যেন [মোহবিগমেন] (নিত্যসিদ্ধ আত্মজ্ঞান লাভে মোহ নষ্ট হইলে) অশেষাণি ভূতানি (মনুষ্য তির্য্যক্ প্রভৃতি ভূত সমুদয়) আত্মনি (জীবাত্মায়) [উপাধিত্বেন] (উপাধিরূপে অবস্থিত) [পৃথক্] দ্রক্ষ্যসি (পৃথক্ দর্শন করিবে), অথো (অনন্তর) ময়ি (আমাতে) [কার্য্যত্বেন স্থিতানি] (কার্য্যরূপে অবস্থিত) [দ্রক্ষ্যসি] (দর্শন করিবে) ॥৩৫॥

হে পাণ্ডব ! গুরূপদিষ্ট সেই তত্ত্বজ্ঞান লাভ করিলে আর তোমাকে এরূপ মোহ আশ্রয় করিবে না । সেই তত্ত্বজ্ঞান দ্বারা তুমি জানিতে পারিবে যে, মনুষ্য তির্য্যগাদি ভূতসকল এক জীবাত্মারূপ তত্ত্বে অবস্থিত ; উপাধি দ্বারা তাহাদের জড়ীয় তারতম্য ঘটিয়াছে এবং এ সমুদয়ই পরম কারণরূপ আমাতে কার্য্যরূপে অবস্থিতি করে ॥৩৫॥

অপি চেদসি পাপেভ্যঃ সর্ব্বেভ্যঃ পাপকৃত্তমঃ ।
সর্ব্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি ॥৩৬॥

চেৎ (যদি) সর্ব্বেভ্যঃ অপি পাপেভ্যঃ (সমস্ত পাপী হইতেও পাপকৃত্তমঃ (অধিক পাপিষ্ঠ) অসি (হও), [তথাপি] সর্ব্বং (সমস্ত) বৃজিনং (পাপ ও দুঃখ) জ্ঞানপ্লবেন এব (জ্ঞানরূপ ভেলা দ্বারা) সন্তরিষ্যসি (সমুত্তীর্ণ হইবে) ॥৩৬॥

যদিও তুমি অত্যন্ত পাপ আচরণ করিয়া থাক, তাহা হইলেও জ্ঞানপোতে আরোহণ পূর্ব্বক সমস্ত দুঃখ সমুদ্র পার হইয়া যাইবে ॥৩৬॥

যথৈধাংসি সমিদ্ধোঽগ্নির্ভস্মসাৎ কুরুতেঽর্জ্জুন ।
জ্ঞানাগ্নিঃ সর্ব্বকর্ম্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা ॥৩৭॥

[হে] অর্জ্জুন ! (হে অর্জ্জুন !) যথা (যেরূপ) সমিদ্ধঃ (সম্যক্­রূপে প্রজ্জ্বলিত) অগ্নিঃ (অগ্নি) এধাংসি (কাষ্ঠ সমূহকে) ভস্মসাৎ (ভস্মসাৎ) কুরুতে (করে), তথা (সেইরূপ) জ্ঞানাগ্নিঃ (জ্ঞানরূপ অগ্নি) সর্ব্বকর্ম্মাণি (বর্ত্তমান দেহারম্ভক প্রারব্ধ ভিন্ন সমুদয় কর্ম্মকে) ভস্মসাৎ (ভস্মসাৎ) কুরুতে (করে) ॥৩৭॥

প্রবলরূপে জ্বলিত অগ্নি যেমত কাষ্ঠাদিকে ভস্মসাৎ করে, হে অর্জ্জুন ! জ্ঞানাগ্নিও সেইরূপ সমস্ত কর্ম্মকে দগ্ধ করিয়া থাকে ॥৩৭॥

ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে ।
তৎ স্বয়ং যোগসংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি ॥৩৮॥

ইহ (তপস্যাদির মধ্যে) জ্ঞানেন সদৃশং (জ্ঞানের তুল্য) পবিত্রম্ (পবিত্র) [কিমপি] ন হি বিদ্যতে (আর কিছুই নাই) তৎ (সেই জ্ঞান) যোগসংসিদ্ধঃ (নিষ্কাম কর্ম্মযোগে সমাক্ সিদ্ধ ব্যক্তি) কালেন (বহুকাল পরে) আত্মনি (আত্মাতে) স্বয়ং (স্বয়ং প্রাপ্তরূপে) বিন্দতি (লাভ করেন) ॥৩৮॥

পূর্ব্বোক্ত তপস্যাদির মধ্যে জ্ঞানের সমান পবিত্র পদার্থ আর কিছুই নাই । নিষ্কাম কর্ম্মযোগের সাধনায় সুসিদ্ধ মানব দীর্ঘকাল পরে সেই জ্ঞান স্বীয় আত্মাতে স্বয়ং প্রাপ্তরূপে লাভ করিয়া থাকেন ॥৩৮॥

শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ ।
জ্ঞানং লব্ধ্বা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি ॥৩৯॥

শ্রদ্ধাবান্ (নিষ্কাম কর্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা অন্তঃকরণ শুদ্ধি হইলেই জ্ঞান হয়, এই শাস্ত্রীয় অর্থে আস্তিক্য বুদ্ধিমান্), তৎপরঃ (নিষ্কাম কর্ম্মানুষ্ঠানরত) সংযতেন্দ্রিয়ঃ (এবং জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি) জ্ঞানং (জ্ঞান) লভতে (লাভ করেন) । জ্ঞানং (জ্ঞান) লব্ধ্বা (লাভ করিয়া) অচিরেণ (অতিশ্রীঘ্র) পরাং শান্তিম্ (সংসার ক্ষয়রূপ পরাশান্তি) অধিগচ্ছতি (লাভ করেন) ॥৩৯॥

নিষ্কাম কর্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা অন্তঃকরণ শুদ্ধ হইলে পর জ্ঞান হয় । এই শাস্ত্র তাৎপর্য্যে আস্তিক্য বুদ্ধিমান্, শ্রদ্ধা-সহকারে নিষ্কাম-কর্ম্মযোগ অনুষ্ঠানরত এবং জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিই সেই জ্ঞান লাভ করেন । তিনি এই জ্ঞান লাভ করিয়া শ্রীঘ্রই সংসারক্ষয়রূপ পরাশান্তি লাভ করিয়া থাকেন ॥৩৯॥

অজ্ঞশ্চাশ্রদ্দধানশ্চ সংশয়াত্মা বিনশ্যতি ।
নায়ং লোকোঽস্তি ন পরো ন সুখং সংশয়াত্মনঃ ॥৪০॥

অজ্ঞঃ (পশ্বাদিবৎমূঢ়) অশ্রদ্দধানঃ (শ্রাস্ত্রজ্ঞান থাকিলেও নানামতবাদদৃষ্টে অবিশ্বস্ত) সংশয়াত্মা চ (এবং শ্রদ্ধা থাকিলেও আমার এই বিষয় সিদ্ধি হইবে কিনা এইরূপ সন্দেহাকুলচিত্ত ব্যক্তি) বিনশ্যতি (বিনষ্ট হয় অর্থাৎ কল্যাণ হইতে বিচ্যুত হয়) । সংশয়াত্মনঃ (সংশয়িতচিত্ত মানবের) অয়ং লোকঃ (এই মনুষ্যলোক) ন [অস্তি] (নাই) ন চ পরঃ (পরলোকও নাই) ন চ সুখং অস্তি (বৈষয়িক সুখও নাই) ॥৪০॥

শাস্ত্রজ্ঞানহীন পশ্বাদির মত মূঢ়, শাস্ত্রজ্ঞান থাকিলেও নানা মতবাদ দেখিয়া শাস্ত্রার্থে বিশ্বাসশূন্য, এবং শ্রদ্ধা থাকিলেও ‘আমার এই বিষয় সিদ্ধ হইবে কিনা’ এইরূপ সন্দেহাক্রান্ত মতি মানব কখনও মঙ্গললাভ করিতে পারে না । সংশয়াত্মার ইহলোকে বা পরলোকে কোথাও সুখ লাভ হয় না, কারণ সংশয়রূপ দুঃখই তাহার শান্তি নাশ করে ॥৪০॥

যোগসংন্যস্তকর্ম্মাণং জ্ঞানসংছিন্নসংশয়ম্ ।
আত্মবন্তং ন কর্ম্মাণি নিবধ্নন্তি ধনঞ্জয় ॥৪১॥

[হে] ধনঞ্জয় ! (হে ধনঞ্জয় !) যোগসংন্যস্তকর্ম্মাণং (নিষ্কাম কর্ম্মযোগের অনন্তরই যিনি সন্ন্যাস বিধিতে কর্ম্মত্যাগ করিয়াছেন), জ্ঞানসংছিন্ন-সংশয়ম্ (তদনন্তর জ্ঞানাভ্যাস দ্বারা সংশয় নাশ করিয়াছেন) আত্মবন্তং (এবং আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করিয়াছেন) কর্ম্মাণি (কর্ম্মসমূহ) [তম্] (তাঁহাকে) ন নিবধ্নন্তি (বদ্ধ করিতে পারে না) ॥৪১॥

হে ধনঞ্জয় ! যিনি নিষ্কাম কর্ম্মযোগের দ্বারা কর্ম্ম সন্ন্যাস করেন, তারপর জ্ঞানাভ্যাস দ্বারা সংশয় সমূহ নাশ করেন এবং আত্মার চিন্ময়স্বরূপ অবগত হন, তাঁহাকে কোন কর্ম্মই আবদ্ধ করিতে পারে না ॥৪১॥

তস্মাদজ্ঞানসম্ভূতং হৃৎস্থং জ্ঞানাসিনাত্মনঃ ।
ছিত্ত্বৈনং সংশয়ং যোগমাতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত ॥৪২॥

[হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) তস্মাৎ (অতএব) আত্মনঃ (তোমার) অজ্ঞানসম্ভূতং (অজ্ঞান হইতে উদ্ভূত) হৃৎস্থং (হৃদয়স্থিত) এনং (এই) সংশয়ং (সংশয়কে) জ্ঞানাসিনা (জ্ঞানরূপ খড়্গ দ্বারা) ছিত্ত্বা (ছেদন করিয়া) যোগম্ (নিষ্কাম কর্ম্মযোগ) আতিষ্ঠ (আশ্রয় কর) উত্তিষ্ঠ [চ] (এবং [যুদ্ধার্থ] উত্থিত হও) ॥৪২॥

হে ভারত ! অতএব তোমার অজ্ঞান সম্ভূত হৃদয়স্থিত এই সংশয়কে জ্ঞানখড়্গ দ্বারা ছেদন কর, এবং নিষ্কাম কর্ম্মযোগ আশ্রয় পূর্ব্বক (যুদ্ধার্থ) উত্থিত হও ॥৪২॥

ইতি শ্রীমহাভারতে শতসাহস্র্যাং সংহিতায়াং বৈয়াসিক্যাং
ভীষ্মপর্ব্বণি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জ্জুনসংবাদে জ্ঞানযোগো নাম
চতুর্থোঽধ্যায়ঃ ॥৪॥

ইতি চতুর্থ অধ্যায়ের অন্বয় সমাপ্ত ॥


                                                                                                   গ্রন্থ-সম্পাদক—
                                                                                       ত্রিদণ্ডিভিক্ষু—শ্রীভক্তিরক্ষক শ্রীধর
                                                                                         শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ, নবদ্বীপ
                                                                                        শ্রীজন্মাষ্টমী বঙ্গাব্দ ১৩৬৮ সাল

১) বিবস্বান (সূর্য) হইতেই সূর্যবংশের উৎপত্তি । বিবস্বানের পুত্র মনু, মনুর পুত্র ইক্ষ্বাকু । এই বৈবস্বত মনু হইতে ৫৮তম অধস্তন পুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ।

এই শ্লোকে যে যোগধর্মের কথা উল্লেখ করা হইল, ইহাই মহাভারতের শান্তিপর্বে কথিত নারায়ণীয় ধর্ম বা সাত্বত ধর্ম । কল্পে কল্পে এই ধর্ম কিরূপে আবির্ভূত হইয়া প্রচারিত হইয়াছে তথাত তাহার বিস্তারিত পরম্পরা দেওয়া হইয়াছে । এ-স্থলে মাত্র ব্রহ্মার সপ্তম জন্মে অর্থাৎ বর্তমান কল্পে ত্রেতাযুগের প্রথমে এই ধর্ম কিরূপে প্রচারিত হইয়াছিল, সেই পরম্পরা দেওয়া হইয়াছে ।

২) রাজর্ষি = রাজা হইয়াও যিনি ঋষি, যেমন জনকাদি । সুতরাং যাঁহারা জ্ঞানী ও কর্মী, ইহা তাঁহাদেরই অধিগম্য ।

৬) মায়া = পরমেশ্বরের অপূর্ব সৃষ্টি-কৌশল, যোগমায়া, যোগ । শঙ্কর মতে অবস্তু বা ভ্রমাত্মক কোনো কিছু (illusion) ।
পরমেশ্বরের নিজের অব্যক্ত স্বরূপ হইতে সমস্ত জগৎ নির্মাণ করিবার অচিন্ত্য শক্তিকেই গীতাতে ‘মায়া’ বলা হইয়াছে [তিলক] ।

অবতারতত্ত্ব :
সর্বভূতেশ্বর জন্মমৃত্যু-রহিত, প্রাণিগণের যেরূপ জন্মমৃত্যু হয়, তাঁহার সেরূপে আবির্ভাব হয় না । তিনি তাঁহার ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতিকে বশীভূত করিয়া মায়াবলে আবির্ভূত হন অর্থাৎ মায়া-শরীর ধারণ করেন [শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য] । কিন্তু ভক্তিপন্থী শ্রীধরস্বামী প্রভৃতি বলেন – উহাই তাঁহার নিত্যসিদ্ধ-চিদ্রূপ, উহা জড়রূপ নহে ।

মহাভারতে নারায়ণীয়-পর্বাধ্যায়ে যে দশ অবতারের উল্লেখ আছে তাহাতে বুদ্ধ অবতার নাই, প্রথমে হংস (swan) অবতার । পরবর্তী পুরাণসমূহে বুদ্ধ-অবতার লইয়াই দশ অবতারের গণনা হইয়াছে । ভাগবতে দ্বাবিংশ অবতারের উল্লেখ আছে, এবং এই প্রসিদ্ধ শ্লোকাংশ আছে – ‘শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান পরব্রহ্ম; সমস্ত অবতার তাঁহারই অংশ ও কলা’ । বিশদ

বেদান্তমতে ঈশ্বর কেবল এক নন, তিনি অদ্বিতীয়, একমেবদ্বিতীয়ম্‌, তিনিই সমস্ত, তিনি ছাড়া আর-কিছু নাই, সকলই তাঁহার সত্তায় সত্তাবান, সকলই তাঁহার মধ্যেই আছে, তিনি সকলের মধ্যেই আছেন । সুতরাং অজ আত্মার দেহ-সম্পর্ক গ্রহণ করা অসম্ভব তো নহেই, বরং সেই সম্পর্কেই জগতের অস্তিত্ব । কাজেই হিন্দুর পক্ষে অবতার-বাদ কেবল ভক্তি-বিশ্বাসের বিষয়মাত্র নহে, উহা বেদান্তের দৃঢ় ভিত্তির উপরেই প্রতিষ্ঠিত ।

৮) যুগে যুগে – তত্ত্বদবসরে, তত্তৎ সময়ে (শ্রীধর, বলদেব) যখনই ধর্মের গ্লানি হয়, তখনই অবতার; এক যুগে একাধিক অবতারও হয় ।

১১) গীতার এই শ্লোকটির তাৎপর্য বুঝিলে প্রকৃতপক্ষে ধর্মগত-পার্থক্য থাকে না, হিন্দুর হৃদয়ে ধর্মবিদ্বেষ থাকিতে পারে না । হিন্দুর নিকট কৃষ্ণ, খ্রীষ্ট, বুদ্ধ সকলেই এক ।

‘ইহাই প্রকৃত হিন্দুধর্ম । হিন্দুধর্মের তুল্য উদার ধর্ম আর নাই – আর এই শ্লোকের তুল্য উদার মহাবাক্য আর নাই ।’ [বঙ্কিমচন্দ্র]

১৩) অব্যয় – অবিকারী (নীলকন্ঠ) । তিনি নির্গুণ হইয়াও সগুণ, ‘নির্গুণো-গুণী’ । নির্গুণ বিভাবে তিনি নির্বিশেষ নিষ্ক্রিয়; সগুণবিভাবে তিনি সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়কর্তা । তাই তিনি কর্তা হইয়াও অকর্তা, ক্রিয়াশীল হইয়াও অবিকারী । কেহ সকামভাবে রাজসিক বা তামসিক পূজার্চনা করে, কেহ নিষ্কাম ভাবে উপাসনা করে । এরূপ কর্ম-বৈচিত্র্য কেন? তুমিই ত এসব ঘটাও ? – না, প্রকৃতিভেদবশতঃ এইরূপ হয় । প্রকৃতিভেদ অনুসারে বর্ণভেদ বা কর্মভেদ আমি করিয়াছি – কিন্তু আমি উহার কর্তা হইলেও উহাতে লিপ্ত হই না বলিয়া আমি অকর্তা । জীবেরও এই তত্ত্ব জানিয়া নিষ্কামভাবে স্বধর্ম পালন করা উচিত । মুমুক্ষু ব্যক্তিগণ পূর্বে এই ভাবেই কর্ম করিযাছেন ।

চাতুর্বর্ণের উৎপত্তি

১৪) শ্রীভগবান্‌ আদর্শ কর্মযোগী, তাঁহার নির্লিপ্ততা ও নিস্পৃহতা বুঝিতে পারিলে মনুষ্য নিষ্কাম কর্মের মর্ম বুঝিতে পারে, তাহার কর্ম নিষ্কাম হয় । সুতরাং কর্ম করিয়াও সে কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হয় ।

১৬) কর্ম – বিহিত কর্ম; বিকর্ম – অবিহিত কর্ম; অকর্ম – কর্মশূন্যতা; কর্মত্যাগ, কিছু না করিয়া তুষ্ণীম্ভাব অবলম্বন ।

১৮) কর্মতত্ত্বঃ, বিকর্মতত্ত্ব, অকর্মতত্ত্ব :
কর্মতত্ত্বঃ : যিনি কর্মে অকর্ম দর্শন করেন অর্থাৎ যিনি কর্ম করিয়াও মনে করেন যে দেহেন্দ্রিয়াদি কর্ম করিতেছে, আমি কিছুই করি না, তিনিই বুদ্ধিমান্‌, কেন না কর্ম করিয়াও তিনি কর্মের ফলভোগী হন না । অর্থাৎ যিনি কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করিয়া কর্ম করেন, তাঁহার কর্মও অকর্মস্বরূপ ।

বিকর্মতত্ত্বঃ : কর্ম করিয়াও তাহার ফলভোগী হন না সুতরাং নির্লিপ্ত অনহঙ্কারী কর্মযোগীর পক্ষে বিকর্মও অকর্মস্বরূপ ।

অকর্মতত্ত্বঃ : আর যিনি অকর্মে কর্ম দর্শন করেন, তিনিই বুদ্ধিমান্‌ । অনেকে আলস্যহেতু, দুঃখবুদ্ধিতে কর্তব্যকর্ম ত্যাগ করেন, কিন্তু তাহারা জানেন না এ অবস্থায় প্রকৃতির ক্রিয়া চলিতে থাকে, কর্মবন্ধ হয় না । এই যে কর্মত্যাগ বা অকর্ম ইহা প্রকৃতপক্ষে কর্ম, কেননা ইহা বন্ধনের কারণ । আবার ইহারা কর্ম ত্যাগ করিয়া মনে করেন, আমি কর্ম করি না, আমি বন্ধনমুক্ত । কিন্তু “আমি কর্ম করি” ইহা যেমন অভিমান, “আমি কর্ম করি না” ইহাও সেইরূপ অভিমান, সুতরাং বন্ধনের কারণ । ইহারা বুঝেন না যে কর্ম করে প্রকৃত, ‘আমি’ নহে । বস্তুতঃ ‘আমি’ ত্যাগ না হইলে কেবল কর্মত্যাগে বন্ধন-মুক্ত হওয়া যায় না । সুতরাং এইরূপ অকর্ম বা কর্মত্যাগও বন্ধনহেতু বলিয়া প্রকৃতপক্ষে কর্মই ।

১৯) নিষ্কাম কর্ম দিব্য কর্ম, ভাগবৎ কর্ম ! ‘আমি করিতেছি’ এইরূপ কর্তৃত্বাভিমান যাঁহার নাই, তিনি কর্ম করিয়াও তাহার ফলভাগী হন না । অহং-বুদ্ধিত্যাগই প্রকৃত জ্ঞান । এই জ্ঞানরূপ অগ্নিদ্বারা তাঁহার কর্মের ফল দগ্ধ হইয়াছে, তাঁহার কর্মের ফলভাগিত্ব বিনষ্ট হইয়াছে । এইরূপ ব্যক্তিই কর্মে অকর্ম অর্থাৎ কর্মশূন্যতা দেখেন ।

২৩) যজ্ঞতত্ত্ব :
বৈদিক যজ্ঞাদি লইয়াই হিন্দুধর্মের আরম্ভ । যজ্ঞমাত্রেরই মূল তাৎপর্য হইতেছে ত্যাগ এবং ত্যাগের ফলস্বরূপ ভোগ – দিব্যভোগ (‘অমৃতমশ্নুতে’) । নৃযজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ প্রভৃতি স্মার্ত-যজ্ঞগুলি সকলই ত্যাগমূলক । প্রাচীনকালে যজ্ঞই ঈশ্বর-আরাধনার প্রধান অঙ্গ ছিল । কালক্রমে এই সকল যজ্ঞবিধি অতি জটিল ও বিস্তৃত হইয়া পড়ে ।

বেদের ব্রাহ্মণভাগে বিবিধ যাগযজ্ঞাদির বিস্তৃত বিবরণ আছে । বৈদিক ক্রিয়াকর্ম ও বৈদিক মন্ত্রের দুইটি অঙ্গ ছিল – (i)বাহ্য, আনুষ্ঠানিক; (ii)আভ্যন্তরীণ, আধ্যাত্মিক । বাহ্য অনুষ্ঠানটি প্রকৃতপক্ষে কোনো আধ্যাত্মিক গূঢ়-তত্ত্বেরই রূপক বা প্রতীকরূপে ব্যবহৃত হইত । যেমন সোমরস = অমৃত/অমরত্ব/ভূমানন্দের প্রতীক; ধান = ধনের প্রতীক; দূর্বা = দীর্ঘায়ুর প্রতীক । দূর্বার মৃত্যু নাই, রৌদ্রে পুড়িয়া, বর্ষায় পচিয়া গেলেও আবার গজাইয়া উঠে । উহার আর এক নাম ‘অমর’ । সুতরাং ধান-দূর্বা মস্তকে দেওয়ার অর্থ – ধনেশ্বর হও, চিরায়ু লাভ কর । বস্তুত, হিন্দুদিগের পূজার্চনা, আচার-অনুষ্ঠান সমস্তই রূপক বা প্রতীক-তান্ত্রিক (symbolic) ।

ক্রমে ব্রহ্মবিদ্যা বা জ্ঞানমার্গের প্রভাবে বৈদিক যাগযজ্ঞাদি গৌণ বলিয়া বিবেচিত হইতে লাগিল এবং জ্ঞানযজ্ঞ/ব্রহ্মযজ্ঞই শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ বলে নির্ধারিত হইল । তাহার পর ভাগবত-ধর্ম ও ভক্রিমার্গের প্রচার হইলে পুরাণাদি-শাস্ত্রে জপযজ্ঞ/নামযজ্ঞেরই প্রাধান্য দেওয়া হইয়াছে । শ্রীগীতায়ও ভগবান দ্রব্যযজ্ঞ হইতে জ্ঞানযজ্ঞেরই শ্রেষ্ঠতা দিয়াছেন । বস্তুত ভারতীয় ধর্মচিন্তার ক্রমবিকাশ ও সম্প্রসারণের সঙ্গে-সঙ্গে যজ্ঞশব্দের অর্থ ও তাৎপর্য সম্প্রসারিত হইয়াছে । গীতায় এই সম্প্রসারণের সকল স্তরই স্বীকার করা হইয়াছে এবং যজ্ঞের যে মূলতত্ত্ব ত্যাগ, ঈশ্বরার্পণ, নিষ্কামতা তাহা যুক্ত করিয়া সবগুলিই মোক্ষপ্রদ করিয়া দেওয়া হইয়াছে ।

২৪) যিনি কর্মে ও কর্মের অঙ্গসকলে ব্রহ্মই দেখেন, তিনি ব্রহ্মত্বই প্রাপ্ত হন – ‘ব্রহ্মবিদ ব্রহ্মৈব ভবতি’ ।

জ্ঞানীর কর্ম ব্রহ্মকর্ম :
যিনি যজ্ঞ করিতে বসিয়া স্রুবাদি (হবিঃ-অর্পণ করিবার জন্য হাতা) কিছু দেখিতে পান না, সর্বত্রই ব্রহ্ম দর্শন করেন, ব্রহ্ম ব্যতীত আর-কিছু ভাবনা করিতে পারেন না, ব্রহ্মে একাগ্রচিত্ত সেই যোগী পুরুষ ব্রহ্মই প্রাপ্ত হন । এই স্থলে ‘যজ্ঞ’-শব্দ রূপার্থক; বস্তুত জ্ঞানীর কর্মকেই এখানে যজ্ঞরূপে কল্পনা করা হইয়াছে । ইহাই কর্মযোগের শেষ কথা, এই অবস্থায় কর্ম জ্ঞানে পরিসমাপ্ত হয় । এই জন্যই বলা হইয়াছে, ‘সাংখ্যগণ যে স্থান লাভ করেন, কর্মযোগীও তাহাই প্রাপ্ত হন’ [৫|৫] । যাঁহারা ‘সাংখ্যযোগ ও কর্মযোগকে পৃথক বলেন তাঁহারা অজ্ঞ’ [৫|৪] । ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’ (এ-সমস্তই ব্রহ্ম), ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ (আমি ব্রহ্ম), ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য এই জ্ঞানই প্রচার করিয়াছেন । জীবের অহংবুদ্ধি যখন সম্পূর্ণ বিদূরিত হয়, তখনই এই পূর্ণ একত্বের জ্ঞান আবির্ভূত হয় । তখন জ্ঞাতা-জ্ঞেয়, উপাস্য-উপাসক, কর্তা-কর্ম-করণ এইসকল ভেদবুদ্ধি থাকে না; সর্বত্রই এক তত্ত্ব, এক শক্তিই আবির্ভূত হয় । এইরূপ জ্ঞানে যিনি কর্ম করিতে পারেন, জীবনযাপন করিতে পারেন, তাঁহার কর্ম-বন্ধন কি ? তিনি তো মুক্ত পুরুষ ।

কর্ম, ভক্তি, জ্ঞান – এই তিন মার্গেরই শেষ ফল অদ্বয় তত্ত্বোপলব্ধি, পার্থক্য প্রারম্ভে ও সাধনাবস্থায় ।
কর্মীর আরম্ভ লোকরক্ষার্থ বা ঈশ্বরপ্রীত্যর্থ নিষ্কাম কর্মে;
ভক্তের আরম্ভ নিষ্কাম উপাসনায়;
জ্ঞানমার্গী সাধকগণ প্রারম্ভ হইতেই অদ্বৈতভাবে চিন্তা করেন ।
বিশিষ্ট চিন্তা :
প্রকৃত পক্ষে জ্ঞানমার্গী সাধকগণদের কোনো উপাসনা নাই, কেননা সকলই যখন ব্রহ্ম, তখন কে কাহার উপাসনা করিবে ? কেবল ব্রহ্মচিন্তাই তাঁহাদের উপাসনা, তাই এই উপাসনার নাম ‘বিশিষ্ট চিন্তা’ । ইহা ত্রিবিধ –
অঙ্গাববিদ্ধ উপাসনা = যজ্ঞের অঙ্গবিশেষকে ব্রহ্ম ভাবনা করা ।
প্রতীক উপাসনা = যাহা ব্রহ্ম নয়, তাহাকে ব্রহ্ম-ভাবনা, যেমন মনকে ব্রহ্ম ভাবিয়া উপাসনা করা ।
অহংগ্রহ = আত্মা ব্রহ্ম হইতে অভিন্ন, আমিই ব্রহ্ম (‘অহং ব্রহ্মাস্মি’) – এইরূপ ভাব-সাধনা ।
২৫-২৭) ‘যজ্ঞ’ শব্দ রূপকার্থে ব্যবহৃত হইয়াছে । যজ্ঞের লাক্ষণিক অর্থ গ্রহণ করিয়া বিভিন্ন সাধন-প্রণালী বর্ণিত হইয়াছে :-
দৈবযজ্ঞ : ইন্দ্র-বরুণাদি দেবতার উদ্দেশে
ব্রহ্মার্পণ যজ্ঞ বা জ্ঞানযজ্ঞ : ব্রহ্মাগ্নিতে জীবাত্মার আহুতি
সংযমযজ্ঞ : ব্রহ্মচর্য অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গুলিকে রূপরসাদি-বিষয় হইতে প্রত্যাহার
ইন্দ্রিয়যজ্ঞ : ইন্দ্রিয়রূপ অগ্নিতে শব্দাদি-বিষয়সমূহের আহূতি (নির্লিপ্ত সংসারী)
আত্মসংযম বা সমাধি-যজ্ঞ : আত্মাতে চিত্তকে একাগ্র করা (ধ্যানযোগিগণ)
প্রাণকর্মাণি – প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান, সমান – মনুষ্য শরীরে এই পঞ্চপ্রাণ আছে :-
প্রাণবায়ুর কর্ম : বহির্নয়ন
অপান বায়ু্র কর্ম : অধোনয়ন
ব্যান বায়ু্র কর্ম : আকুঞ্চন ও প্রসারণ
উদান বায়ু্র কর্ম : ঊর্দ্ধনয়ন
সমান বায়ুর কর্ম : ভুক্তপদার্থের পরিপাক-করণ
২৮) এই শ্লোকে পাঁচ প্রকার যজ্ঞের কথা বলা হইল :-
দ্রব্যযজ্ঞ : দ্রব্যত্যাগরূপ যজ্ঞ । পূর্বের দৈবযজ্ঞ ও ব্রহ্মার্পণ যজ্ঞও দ্রব্যযজ্ঞ । উহা শ্রৌত কর্ম, আর বাপী-কূপাদি খনন, দেবমন্দির প্রতিষ্ঠা, অন্নসত্র দান ইত্যাদি স্মার্ত-কর্ম । এ-সকল এবং পুষ্পপত্র-নৈবেদ্যাদি দ্বারা পূজার্চনা সমস্তই দ্রব্যযজ্ঞ ।
তপোযজ্ঞ : কৃচ্ছ্র-চান্দ্রায়ণাদি উপবাস ব্রত
যোগযজ্ঞ : অষ্টাঙ্গ যোগ বা রাজযোগ – যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি ।
স্বাধ্যায়-যজ্ঞ : ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিয়া শ্রদ্ধাপূর্বক যথাবিধি বেদাভ্যাস
বেদজ্ঞান-যজ্ঞ : যুক্তিদ্বারা বেদার্থ নিশ্চয় করা
২৯) প্রাণবায়ু = হৃদয় হইতে যে বায়ু বাহিরে আসে; অপান বায়ু = বাহির হইতে যে বায়ু হৃদয়ে প্রবেশ করে ।
প্রাণায়াম : প্রাণ = প্রাণবায়ু, আয়াম = নিরোধ; অর্থাৎ প্রাণবায়ুর নিরোধ । ইহা তিন প্রকার – (i)পূরক, (ii)রেচক, (iii)কুম্ভক ।

পূরক প্রাণায়াম : প্রশ্বাস দ্বারা অপান বায়ুকে শরীর-ভিতরে প্রবেশ করাইলে প্রাণবায়ুর গতি রোধ হয়, ইহাই অপানে প্রাণের আহুতি; ইহাতে অন্তর বায়ুতে পূর্ণ হয় ।

রেচক প্রাণায়াম : নিঃশ্বাস দ্বারা প্রাণবায়ুকে শরীর থেকে নিঃসারণ করিলে অপান বায়ুর অন্তঃপ্রবেশরূপ গতিরোধ হয়, অর্থাৎ বাহিরের বায়ু ভিতরে প্রবেশ করিতে পারে না, ইহাই প্রাণে অপানের আহুতি; ইহাতে অন্তর বায়ুশূন্য হয় ।

কুম্ভক প্রাণায়াম : প্রাণ ও অপানের গতি রোধ করিয়া অর্থাৎ রেচন-পূরণ পরিত্যাগ-পূর্বক বায়ুকে শরীরের মধ্যে নিরুদ্ধ করিয়া অবস্থিতি করেন । এইরূপ কুম্ভকে শরীর স্থির হইলে ইন্দ্রিয়সমূহ প্রাণবায়ুতে লয় হইয়া যায়, ইহাই প্রাণে ইন্দ্রিয়সমূহের আহুতি ।

৩০) একথার তাৎপর্য এই যে, যজ্ঞই সংসারের নিয়ম । প্রত্যেকের কর্তব্য সম্পাদন দ্বারা, পরস্পরের ত্যাগ স্বীকার দ্বারা, আদান-প্রদান দ্বারাই জগৎ চলিতেছে এবং উহাতেই প্রত্যেকের সুখ-স্বাতন্ত্র্য অব্যাহত আছে । যে এই বিশ্ব-যজ্ঞ ব্যাপারে যোগদান করে না, যজ্ঞস্বরূপে স্বীয় কর্তব্য সম্পাদন করে না, তাহার ইহকাল ও পরকাল উভয়ই বিনষ্ট হয়, তাহার জীবন ব্যর্থ হয় ।

৩১) যজ্ঞাবশিষ্ট দ্রব্যকে অমৃত বলে । এ-স্থলে ইহা রূপকার্থক । যজ্ঞস্বরূপ কৃত নিষ্কাম কর্মদ্বারাই মোক্ষ লাভ হয় ।

৩৪) পরিপ্রশ্নেন – আমি কে ? আমার সংসার-বন্ধন কেন ? কিরূপে বন্ধনমুক্ত হইব ? ইত্যাদি প্রশ্ন দ্বারা ।

৩৭) ‘ইহা দ্বারা মোটেই বুঝায় না যে, যখন জ্ঞান সম্পূর্ণ হয় তখন কর্ম বন্ধ হইয়া যায়’ – [শ্রী অরবিন্দ]

পারমার্থিক জ্ঞান কি ? যাহা দ্বারা সর্বভূত এবং স্বীয় আত্মা অভিন্ন বোধ হয় এবং তারপর বোধ হয় সেই আত্মা শ্রীভগবানেরই সত্ত্বা, – আমি, সর্বভূত, যাহা কিছু তাঁহার সত্তায়ই সত্তাবান, তাঁহারই আত্ম-অভিব্যক্তি, তিনিই সকলের মূল [গী|৪|৩৫] ।

প্রাকৃত/লৌকিক জ্ঞান কি ? চক্ষু-কর্ণাদি ইন্দ্রিয় দ্বারা, বুদ্ধিবিচার দ্বারা নানা বিষয়ে আমরা যে জ্ঞানলাভ করি । ইহাতে শ্রদ্ধার প্রয়োজন হয় না । এই সকল নিম্নস্তরের সত্যের সহিত মিথ্যা মিশ্রিত থাকে, সংশয়বুদ্ধিতে পরীক্ষা করিয়া (scientific method) মিথ্যা হইতে সত্যকে পৃথক করিয়া লইতে হয় ।

৪০) যে অজ্ঞ, অর্থাৎ যাহার শাস্ত্রাদির জ্ঞান নাই, এবং যে সদুপদেশ লাভ করে নাই এবং যে শ্রদ্ধাহীন অর্থাৎ সদুপদেশ পাইয়াও যে তাহা বিশ্বাস করে না এবং তদনুসারে কার্য্য করে না, সুতরাং যে সংশয়াত্মা – অর্থাৎ যাহার সকল বিষয়েই সংশয় – এইটি কি ঠিক, না ঐটি ঠিক, – এইরূপ চিন্তায় যে সন্দেহাকুল তাহার অত্মোন্নতির কোন উপায় নাই ।

৪১) অর্থাৎ – জ্ঞানী কর্ম করিয়াও কর্মে আবদ্ধ হন না, সুতরাং জ্ঞানীরও কর্ম আছে, একথা স্পষ্টই বলা হইল, তবে সে কর্ম অকর্মস্বরূপ ।

রহস্য : কর্ম ও জ্ঞানে সংযোগ কিরূপে সম্ভব ?
গতি ও স্থিতি, আলোক ও অন্ধকার যেমন একত্র থাকিতে পারে না, তদ্রূপ কর্ম ও জ্ঞানের সমুচ্চয় অসম্ভব বলিয়াই বোধ হয় । সন্ন্যাসবাদিগণ এইরূপ যুক্তিবলেই জ্ঞান-কর্মের অস্বীকার করেন । ‘আমিত্ব’ বর্জন করিয়াও ‘আমি’ রাখা, জ্ঞানলাভ করিয়াও কর্ম করা – এটা অসম্ভব নহে । বস্তুত যোগিগণ সর্বদাই আবশ্যক কর্ম করেন যেমন রাজর্ষি জনকাদি, দেবর্ষি নারদাদি, ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠাদি, মহর্ষি বিশ্বমিত্রাদি, পরমহংস রামকৃষ্ণাদি । সর্বোপরি শ্রীভগবান স্বয়ং নিজ কর্মের আদর্শ দেখাইয়া, জ্ঞানিগণকে বিশ্বকর্মে আহ্বান করিয়া বলিতেছেন – ‘লোকরক্ষার্থ জ্ঞানিগণও অনাসক্তচিত্তে কর্ম করিবে’ । ইহার উপর আর টীকা-টীপ্পনী চলে না, দার্শনিক মতবাদ যাহাই হউক ।

৪২) তুমি যুদ্ধে অনিচ্ছুক, কারণ তোমার হৃদয়ে নানারূপ সংশয় উপস্থিত হইয়াছে । গুরুজনাদি বধ করিয়া কি পাপভাগী হইব ? আত্মীয়-স্বজনাদির বিনাশে শোক-সন্তপ্ত হইয়া রাজ্যলাভেই বা কি সুখ হইবে ? এইরূপ শোক, মোহ ও সংশয়ে অভিভূত হইয়া তুমি স্বীয় কর্তব্য বিস্মৃত হইয়াছ । তোমার এই সংশয় অজ্ঞান-সম্ভূত । যাঁহার দেহাত্মবোধ বিদূরিত হইয়াছে, সর্বভূতে একাত্মবোধ জন্মিয়াছে – তাঁহার চিত্তে এ সকল সংশয় উদিত হয় না; তিনি শোক-দুঃখে অভিভূত হন না [ঈশোপনিষৎ|৭]; ইহাই প্রকৃত জ্ঞান, তাহা পূর্বে বলিয়াছি । শ্রদ্ধা, আত্মসংযম একনিষ্ঠা – সেই জ্ঞান লাভের যে উপায় তাহাও বলিয়াছি । আমার বাক্যে তোমার শ্রদ্ধা আছে, তোমার আত্মসংযম ও একনিষ্ঠা আছে, সুতরাং তোমাকে আমি জ্ঞানোপদেশ দিতেছি । তুমি আত্মজ্ঞান লাভপূর্বক নিঃসন্দেহ হইয়া নিষ্কাম কর্মযোগ অবলম্বন কর, স্বীয় কর্তব্য পালন কর, যুদ্ধ কর ।

সংগ্রহঃ ০১। sanatandharmatattva.wordpress.com
             ০২। http://www.scsmathinternational.com
Share:

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা: তৃতীয় অধ্যায় – কর্মযোগ

অর্জ্জুন উবাচ—
জ্যায়সী চেৎ কর্ম্মণস্তে মতা বুদ্ধির্জনার্দ্দন ।
তৎ কিং কর্ম্মণি ঘোরে মাং নিযোজয়সি কেশব ॥১॥

অর্জ্জুনঃ উবাচ (অর্জ্জুন বলিলেন) [হে] জনার্দ্দন ! (হে জনার্দ্দন !) [হে] কেশব ! (হে কেশব !) কর্ম্মণঃ (রাজসিক ও সাত্ত্বিক কর্ম্ম অপেক্ষা) বুদ্ধিঃ (সাত্ত্বিক জ্ঞান) জ্যায়সী চেৎ (যদি শ্রেষ্ঠ বলিয়া) তে (তোমার) মতা (অভিমত হয়) তৎ কিং (তবে কেন) ঘোরে কর্ম্মণি (যুদ্ধরূপ ভয়ানক কর্ম্মে) মাং (আমাকে) নিযোজয়সি (নিযুক্ত করিতেছ ?) ॥১॥

অর্জ্জুন কহিলেন—হে জনার্দ্দন ! হে কেশব ! সাত্ত্বিক ও রাজসিক কর্ম্ম অপেক্ষা ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিই যদি শ্রেষ্ঠ বলিয়া তোমার মনে হয়, তবে কিজন্য আমাকে যুদ্ধরূপ হিংসাত্মক কর্ম্মে নিযুক্ত করিতেছ ? ॥১॥

ব্যামিশ্রেণেব বাক্যেন বুদ্ধিং মোহয়সীব মে ।
তদেকং বদ নিশ্চিত্য যেন শ্রেয়োঽহমাপ্নুয়াম্ ॥২॥

ব্যামিশ্রেণ ইব (কোন স্থলে কর্ম্মের, কোন স্থলে জ্ঞানের প্রশংসারূপ নানাবিধ অর্থমিশ্রিত) বাক্যেন (বাক্যের দ্বারা) মে (আমার) বুদ্ধিং (বুদ্ধিকে) মোহয়সি ইব (বিমোহিতপ্রায় করিতেছ) তৎ (সুতরাং) একং (উভয়ের মধ্যে একটীকে) নিশ্চিত্য (নিশ্চিয় করিয়া) বদ (বল) যেন (যাহার দ্বারা) অহম্ (আমি) শ্রেয়ঃ (মঙ্গল) আপ্নুয়াম্ (লাভ করিতে পারি) ॥২॥

কোন স্থলে কর্ম্মের, কোন স্থলে জ্ঞানের প্রশংসারূপ নানাবিধ অর্থমিশ্রিত বাক্যের দ্বারা আমার বুদ্ধিকে সন্দেহযুক্ত করিতেছ । অতএব এই উভয়ের মধ্যে একটীকে নিশ্চয় করিয়া উপদেশ কর, যাহার আশ্রয়ে আমি মঙ্গল লাভ করিতে পারি ॥২॥

শ্রীভগবানুবাচ—
লোকেঽস্মিন্ দ্বিবিধা নিষ্ঠা পুরা প্রোক্তা ময়ানঘ ।
জ্ঞানযোগেন সাংখ্যানাং কর্ম্মযোগেন যোগিনাম্ ॥৩॥

শ্রীভগবান্ উবাচ (শ্রীভগবান্ বলিলেন) [হে] অনঘ ! (হে নিষ্পাপ অর্জ্জুন !) অস্মিন্লোকে (এই জগতে) দ্বিবিধা (দুই প্রকার) নিষ্ঠা (নিষ্ঠার কথা) ময়া (মৎ কর্ত্তৃক) পুরা (পূর্ব্ব অধ্যায়ে) প্রোক্তা (উক্ত হইয়াছে) । সাংখ্যানাং (চিদনুভবযুক্ত জ্ঞানিগণের) জ্ঞানযোগেন (জ্ঞানযোগের দ্বারা) যোগিনাম্ (জড়ানুভবপ্রধান সাধকদিগের) কর্ম্মযোগেন (ঈশ্বরে অর্পিত নিষ্কাম কর্ম্মযোগ দ্বারা) [নিষ্ঠা স্থাপিতা] (মর্য্যাদা স্থাপিত হইয়াছে) ॥৩॥

শ্রীভগবান্ কহিলেন—হে অনঘ ! ইহলোকে যে দুইপ্রকার নিষ্ঠার বিষয় পূর্ব্ব অধ্যায়ে আমি বর্ণন করিয়াছি । উহাতে চিদনুভবযুক্ত জ্ঞানিদিগের জ্ঞানযোগের দ্বারা এবং জড়ানুভব প্রধান সাধকগণের ভগবদর্পিত নিষ্কাম কর্ম্মযোগদ্বারা মাত্র ভক্তিযোগ সাধনের (নিম্ন) সীমা নির্দ্ধারণ করিয়াছি । বস্তুতঃ ভক্তিভূমি লাভ করিবার সোপান একই । আরোহিদিগের অবস্থাক্রমে নিষ্ঠাই কেবল দুই প্রকার হয় ॥৩॥

ন কর্ম্মণামনারম্ভান্নৈষ্কর্ম্ম্যং পুরুষোঽশ্নুতে ।
ন চ সন্ন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি ॥৪॥

পুরুষঃ (পুরুষ) কর্ম্মণাম্ (শাস্ত্রীয় কর্ম্মের) অনারম্ভাৎ (অনুষ্ঠান না করিয়া) নৈষ্কর্ম্ম্যং (কর্ম্মাতীত চৈতন্যাবস্থা) ন অশ্নুতে (লাভ করিতে পারে না) । সন্ন্যসনাৎ এব চ (কেবল শাস্ত্রীয় কর্ম্ম পরিত্যাগ করিলেই) সিদ্ধিং (সিদ্ধি) ন সমধিগচ্ছতি (লাভ করিতে পারে না) ॥৪॥

পুরুষ শাস্ত্রীয় কর্ম্মের অনুষ্ঠান না করিলে নৈষ্কর্ম্ম্যরূপ জ্ঞান লাভ করিতে পারে না । অশুদ্ধচিত্ত ব্যক্তি শাস্ত্রীয় কর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া কিরূপে সিদ্ধিলাভ করিবে ? ॥৪॥

ন হি কশ্চিৎ ক্ষণমপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্ম্মকৃৎ ।
কার্য্যতে হ্যবশঃ কর্ম্ম সর্ব্বঃ প্রকৃতিজৈগু ণৈঃ ॥৫॥

জাতু (কদাচিৎ) ক্ষণমপি (ক্ষণকালও) কশ্চিৎ (কেহ) অকর্ম্মকৃৎ (কর্ম্ম না করিয়া) ন হি তিষ্ঠতি (থাকিতেই পারে না) । সর্ব্বঃ হি (সমস্ত জীবই) প্রকৃতিজৈঃ গুণৈঃ (প্রকৃতিজাত গুণ সমূহ দ্বারা) অবশঃ [সন্] (অস্বতন্ত্র হইয়া) কর্ম্ম কার্য্যতে (কর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়) ॥৫॥

কেহ কখনও কোন কর্ম্ম না করিয়া ক্ষণকালও অবস্থান করিতে পারে না, প্রকৃতিসিদ্ধ গুণের দ্বারা উত্তেজিত হইয়া অস্বতন্ত্ররূপে বাধ্য হইয়া সকলেই কর্ম্ম করিয়া থাকে । সুতরাং অশুদ্ধচিত্ত পুরুষের পক্ষে শাস্ত্রনির্দ্দিষ্ট চিত্তশোধক কর্ম্ম পরিত্যাগ করা কর্ত্তব্য নহে ॥৫॥

কর্ম্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরন্ ।
ইন্দ্রিয়ার্থান্ বিমূঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে ॥৬॥

যঃ (যে ব্যক্তি) কর্ম্মেন্দ্রিয়াণি (হস্তপদাদি কর্ম্মেন্দ্রিয়গুলিকে) সংযম্য (সংযত করিয়া) মনসা (মনে মনে) ইন্দ্রিয়ার্থান্ (ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বিষয়গুলিকে) স্মরন্ আস্তে (স্মরণ পূর্ব্বক অবস্থান করে) সঃ (সেই ব্যক্তি) বিমূঢ়াত্মা (মূঢ়চিত্ত) মিথ্যাচারঃ (কপটাচার বা দাম্ভিক বলিয়া) উচ্যতে (কথিত হয়) ॥৬॥

যে ব্যক্তি হস্তপদাদি কর্ম্মেন্দ্রিয় সকলকে বাহির সংযত করিয়া ও মনে মনে সেই সকল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় সম্বন্ধে আলোচনা করে—সেই বিমূঢ়চিত্ত ব্যক্তিকে মিথ্যাচারী বলিয়া জানিবে ॥৬॥

যাস্ত্বিন্দ্রিয়াণি মনসা নিয়ম্যারভতেঽর্জ্জুন ।
কর্ম্মেন্দ্রিয়ৈঃ কর্ম্মযোগমসক্তঃ স বিশিষ্যতে ॥৭॥

[হে] অর্জ্জুন ! (হে ধনঞ্জয় !) যঃ তু (কিন্তু যে ব্যক্তি) মনসা (মনের দ্বারা ) ইন্দ্রিয়াণি (ইন্দ্রিয় সমূহকে) নিয়ম্য (সংযত করিয়া) কর্ম্মেন্দ্রিয়ৈঃ (কর্ম্মেন্দ্রিয়গণ দ্বারা) কর্ম্মযোগম্ (শাস্ত্রীয় কর্ম্মযোগ) আরভতে (আরম্ভ করেন), অসক্তঃ (অফলাকাঙ্ক্ষী) সঃ (সেই ব্যক্তি) বিশিষ্যতে (মিথ্যাচারী অপেক্ষা উৎকৃষ্ট) ॥৭॥

হে অর্জ্জুন ! যিনি মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়সকলকে নিয়মিত করিয়া কর্ম্মেন্দ্রিয়গণের দ্বারা গৃহস্থধর্ম্মে অনাসক্তরূপে কর্ম্মযোগ আরম্ভ করিয়াছেন, তিনি পূর্ব্বোক্ত “মিথ্যাচারী” অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ॥৭॥

নিয়তং কুরু কর্ম্ম ত্বং কর্ম্ম জ্যায়ো হ্যকর্ম্মণঃ ।
শরীরযাত্রাপি চ তে ন প্রসিধ্যেদকর্ম্মণঃ ॥৮॥

ত্বং (তুমি) নিয়তং কর্ম্ম (সন্ধ্যোপাসনাদি নিত্য-কর্ম্ম) কুরু (কর) হি (যেহেতু) অকর্ম্মণঃ (কর্ম্মত্যাগ অপেক্ষা) কর্ম্ম (কর্ম্মানুষ্ঠান) জ্যায়ঃ (শ্রেষ্ঠ) । অকর্ম্মণঃ চ (কর্ম্ম ত্যাগ করিলে) তে (তোমার) শরীরযাত্রাপি (দেহ যাত্রাও) ন প্রাসিধ্যেৎ (নির্ব্বাহ হইবে না) ॥৮॥

তুমি সন্ধ্যোপাসনাদি নিত্যকর্ম্ম করিতে থাক, যেহেতু কর্ম্মত্যাগ দ্বারা যখন শরীর যাত্রাও নির্ব্বাহ হয় না, তখন অনধিকারী ব্যক্তির কর্ম্মত্যাগ অপেক্ষা কর্ম্ম করাই শ্রেষ্ঠ । কাম্যকর্ম্ম পরিত্যাগ পূর্ব্বক সন্ধ্যা উপাসনাদি নিত্যকর্ম্ম করিতে করিতে চিত্তশুদ্ধ হইলে জ্ঞানভূমি অতিক্রম করতঃ নির্গুণ ভক্তি লাভ করিবে ॥৮॥

যজ্ঞার্থাৎ কর্ম্মণোঽন্যত্র লোকোঽয়ং কর্ম্মবন্ধনঃ ।
তদর্থং কর্ম্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর ॥৯॥

[হে] কৌন্তেয় ! (হে অর্জ্জুন !) যজ্ঞার্থাৎ (বিষ্ণুতে অর্পিত নিষ্কাম ধর্ম্মের জন্য) কর্ম্মণঃ অন্যত্র (কর্ম্ম ব্যতীত) অয়ং লোকঃ (এই জীবলোক) কর্ম্মবন্ধনঃ [ভবতি] (অন্য সমস্ত কর্ম্ম দ্বারা বন্ধন প্রাপ্ত হয়) । [অতঃ] (অতএব) তদর্থং (সেই যজ্ঞের উদ্দেশ্যে) মুক্তসঙ্গঃ [সন্] (আসক্তিরহিত হইয়া) কর্ম্ম সমাচর (কর্ম্মের সম্যক্ অনুষ্ঠান কর) ॥৯॥

ভগবদর্পিত নিষ্কাম-ধর্ম্মকে যজ্ঞ বলে । হে অর্জ্জুন ! সেই যজ্ঞের উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য যে সকল কর্ম্ম করা য়ায়, সে সমুদায়কেই ‘কর্ম্মবন্ধন’ অর্থাৎ সংসার বন্ধনের কারণ বলিয়া জানিবে । অতএব তুমি কর্ম্মফলাকাঙ্ক্ষা রহিত হইয়া সেই যজ্ঞের উদ্দেশ্যে সমুদয় কর্ম্ম আচরণ কর । এবম্বিধ কর্ম্মই ভক্তিযোগের সাধকস্বরূপ হইয়া ভগবত্তত্ত্বজ্ঞান উৎপন্ন করতঃ নির্গুণ ভক্তি লাভ করাইবে ॥৯॥

সহযজ্ঞাঃ প্রজাঃ সৃষ্ট্বা পুরোবাচ প্রজাপতিঃ ।
অনেন প্রসবিষ্যধ্বমেষ বোঽস্ত্বিষ্টকামধুক্ ॥১০॥

পুরা (সৃষ্টির প্রারম্ভে) প্রজাপতিঃ (ব্রহ্মা) সহযজ্ঞাঃ প্রজাঃ (বিষ্ণুতে অর্পিত নিষ্কাম-ধর্ম্মানুষ্ঠানকারিণী প্রজা সকল) সৃষ্ট্বা (সৃষ্টি করিয়া) উবাচ (বলিয়াছিলেন) অনেন (এই ধর্ম্মের দ্বারা) প্রসবিষ্যধ্বম্ (বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হও), এষঃ (এই যজ্ঞ) বঃ (তোমাদিগের) ইষ্টকামধুক্ (অভীষ্ট ভোগপ্রদ) অস্তু (হউক) ॥১০॥

ব্রহ্মা সৃষ্টির প্রারম্ভে যজ্ঞের সহিত প্রজাগণকে সৃষ্টি করিয়া এইরূপ আদেশ করিয়াছিলেন যে, তোমরা এই যজ্ঞরূপ ধর্ম্মকে আশ্রয় করিয়া উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হও, এই যজ্ঞই তোমাদের সমস্ত কাম প্রদান করুন ॥১০॥

দেবান্ ভাবয়তানেন তে দেবা ভাবয়ন্তু বঃ ।
পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ শ্রেয়ঃ পরমবাপ্স্যথ ॥১১॥

অনেন (এই যজ্ঞদ্বারা) দেবান্ (দেবতাগণকে) [যূয়ং] (তোমরা) ভাবয়ত (প্রীতিযুক্ত কর) তে দেবাঃ অপি (সেই দেবতাগণও প্রীতিযুক্ত হইয়া) বঃ (তোমাদিগকে) ভাবয়ন্তু (অভীষ্ট ফলপ্রদান পূর্ব্বক প্রীতিযুক্ত করুন) [এবং] (এইরূপে) পরস্পরং (পরস্পর পরস্পরকে) ভাবয়ন্তঃ (প্রীত করিলে) পরম্ শ্রেয়ঃ (পরম কল্যাণ) অবাপ্স্যথ (লাভ করিবে) ॥১১॥

এই যজ্ঞদ্বারা তোমরা দেবতাগণকে প্রীত কর, সেই সকল দেবতাগণও প্রীতিযুক্ত হইয়া তোমাদিগকে অভীষ্ট ফলপ্রদানে প্রীত করুন । পরস্পর এইরূপ প্রীত সম্পাদন করিলে পরমমঙ্গল লাভ করিবে ॥১১॥

ইষ্টান্ ভোগান্ হি বো দেবা দাস্যন্তে যজ্ঞভাবিতাঃ ।
তৈর্দত্তানপ্রদায়ৈভ্যো যো ভুঙ্­ক্তে স্তেন এব সঃ ॥১২॥

দেবাঃ (বিরাট্ পুরুষ মদঙ্গভূত—দেবগণ) যজ্ঞভাবিতাঃ [সন্তঃ] (যজ্ঞের দ্বারা প্রীত হইয়া) বঃ (তোমাদিগকে) ইষ্টান্ ভোগান্ (অভীষ্ট ভোগ্যবস্তু) দাস্যন্তে (প্রদান করিবেন) । হি (অতএব) [বৃষ্ট্যাদিদ্বারেণ] (বৃষ্টি প্রভৃতি দ্বারা) তৈঃ দত্তান্ (তাঁহাদের প্রদত্ত অন্নাদি বস্তুসকল) এভ্যঃ (সেই সকল মদাশ্রিত—দেবগণকে) [পঞ্চ যজ্ঞাদিভিঃ] (পঞ্চ যজ্ঞাদি দ্বারা) অপ্রদায় (প্রদান না করিয়া) যঃ (যিনি) ভুঙ্­ক্তে (ভোজন করেন) সঃ (সেই ব্যক্তি) স্তেনঃ এব (চোরই) ॥১২॥

আমার বহিরঙ্গভূত দেবতাগণ যজ্ঞের দ্বারা প্রীত হইয়াই তোমাদের অভীষ্ট ভোগ্যবস্তু সকল প্রদান করিয়া থাকেন । বৃষ্ট্যাদি দ্বারা তাঁহাদের প্রদত্ত সেই অন্নাদি বস্তু সকল পঞ্চ মহাযজ্ঞাদি দ্বারা মদাশ্রিত—দেবতাগণকে প্রদান না করিয়া যে ব্যক্তি স্বয়ং ভোজন করে সে চোরই অর্থাৎ চোরস্বরূপ দোষভাক্ হইয়া থাকে ॥১২॥

যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ সন্তো মুচ্যন্তে সর্ব্বকিল্বিষৈঃ ।
ভুঞ্জতে তে ত্বঘং পাপা যে পচন্ত্যাত্মকারণাৎ ॥১৩॥

যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ (বৈশ্বদেবাদি যজ্ঞাবশিষ্ট অন্ন ভোজনকারী) সন্তঃ (সাধুগণ) সর্ব্বকিল্বিষৈঃ (পঞ্চসূনাজনিত সমস্ত পাপ হইতে) মুচ্যন্তে (মুক্ত হন) । যে তু (কিন্তু যাহারা) আত্মকারণাৎ (কেবল নিজের ভোজনের নিমিত্ত) পচন্তি (পাক করে) তে (সেই) পাপাঃ (পাপিষ্ঠবগণ) অঘং [এব] (পাপই) ভুঞ্জতে (ভোজন করে) ॥১৩॥

বৈশ্বদেবাদি পঞ্চ মহাযজ্ঞের অবশিষ্ট অন্নাদি ভোজনকারী সাধুগণ পঞ্চসূনা (পঞ্চবিধ জীবহিংসা) জাত সমস্ত পাপ হইতে মুক্ত হইয়া থাকেন । কিন্তু যাহারা শুধু নিজের ভোজন নিমিত্ত পাক করে, সেই দুরাচারগণ পাপই ভোজন করে ॥১৩॥

অন্নাদ্ভবন্তি ভূতানি পর্জ্জন্যাদন্নসম্ভবঃ ।
যজ্ঞাদ্ভবতি পর্জ্জন্যো যজ্ঞঃ কর্ম্মসমুদ্ভবঃ ॥১৪॥

অন্নাৎ (শুক্র শোণিতরূপে পরিণত অন্ন হইতে) ভূতানি (প্রাণী [দেহ] সকল) ভবন্তি (উৎপন্ন হয়), পর্জ্জন্যাৎ (বৃষ্টি হইতে) অন্ন-সম্ভবঃ (অন্নের উৎপত্তি হয়) যজ্ঞাৎ (যজ্ঞ হইতে) পর্জ্জন্যঃ (বৃষ্টি) ভবতি (হয়) যজ্ঞঃ (এবং যজ্ঞ) কর্ম্মসমুদ্ভবঃ (কর্ম্ম হইতে উৎপন্ন হয়) ॥১৪॥

অন্ন হইতে প্রাণিগণের উৎপত্তি হয়, বৃষ্টি হইতে অন্ন উৎপন্ন হয়, যজ্ঞ হইতে বৃষ্টি হইয়া থাকে এবং যজ্ঞ কর্ম্ম হইতে সমুদ্ভূত হয় ॥১৪॥

কর্ম্ম ব্রহ্মোদ্ভবং বিদ্ধি ব্রহ্মোক্ষরসমুদ্ভবম্ ।
তস্মাৎ সর্ব্বগতং ব্রহ্ম নিত্যং যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিতম্ ॥১৫॥

কর্ম্ম (কর্ম্ম) ব্রহ্মোদ্ভবং (বেদ হইতে উৎপন্ন) বিদ্ধি (জানিবে), ব্রহ্ম (বেদ) অক্ষর সমুদ্ভবম্ (অক্ষর অর্থাৎ পরব্রহ্ম হইতে সমুদ্ভূত), তস্মাৎ (অতএব) সর্ব্বগতং (সর্ব্বব্যাপক) ব্রহ্ম (পরব্রহ্ম) যজ্ঞে (যজ্ঞে) নিত্যং (সর্ব্বদা) প্রতিষ্ঠিতম্ (প্রতিষ্ঠিত আছেন) ॥১৫॥

ব্রহ্ম (বেদ) হইতে কর্ম্ম উদ্ভূত এবং ঐ বেদ অক্ষর অর্থাৎ অচ্যুত হইতে উৎপন্ন, সুতরাং সর্ব্বব্যাপক ভগবান্ অচ্যুত যজ্ঞে নিত্যকালই প্রতিষ্ঠিত ॥১৫॥

এবং প্রবর্ত্তিতং চক্রং নানুবর্ত্তয়তীহ যঃ ।
অঘায়ুরিন্দ্রিয়ারামো মোঘং পার্থ স জীবতি ॥১৬॥

[হে] পার্থ ! (হে অর্জ্জুন !) যঃ ( যে কর্ম্মাধিকারী বা জ্ঞানাধিকারী মানব) এবং (এইরূপে) [পরমপুরুষেণ] (পরম পুরুষ ভগবান্ কর্ত্তৃক) প্রবর্ত্তিতং (কার্য্যকারণভাবে প্রবর্ত্তিত) চক্রং (চক্রকে) ইহ (এই জীবনে) ন অনুবর্ত্তয়তি (অনুর্বত্তন করে না) সঃ (সেই) অঘায়ুঃ (পাপপূর্ণ জীবন) ইন্দ্রিয়ারামঃ (ইন্দ্রিয়াসক্ত পুরুষ) মোঘং (বৃথা) জীবতি (জীবন ধারণ করে) ॥১৬॥

হে অর্জ্জুন ! যে কর্ম্মাধিকারী বা জ্ঞানাধিকারী মনুষ্য এইরূপে পরমপুরুষ স্বয়ং ভগবান্ কর্ত্তৃক কার্য্যকারণ ভাবে প্রবর্ত্তিত এই চক্রের (নিয়মের) প্রবর্ত্তন করে না, সেই পাপপূর্ণ-জীবন, ইন্দ্রিয়াসক্ত মানব বৃথাই জীবন ধারণ করে ॥১৬॥

যস্ত্বাত্মরতিরেব স্যাদাত্মতৃপ্তশ্চ মানবঃ ।
আত্মন্যেব চ সন্তুষ্টস্তস্য কার্য্যং ন বিদ্যতে ॥১৭॥

তু (কিন্তু) যঃ মানবঃ (যে মানব) আত্মরতিঃ (আত্মাতেই প্রীতি বিশিষ্ট) আত্মতৃপ্তঃ এব চ (ও অত্মাতেই তৃপ্ত) আত্মনি এব চ (এবং আত্মাতেই) সন্তুষ্টঃ (সম্যক্ তুষ্ট) স্যাৎ (থাকেন), তস্য (তাঁহার) কার্য্যং (করণীয়) ন বিদ্যতে (কিছুই নাই) ॥১৭॥

কিন্তু যে মানব আত্মাতেই প্রীতিবিশিষ্ট ও আত্মাতেই তৃপ্ত এবং আত্মাতেই সম্যক্ তুষ্ট থাকেন ; তাঁহার করণীয়রূপে কোন কার্য্য নাই, কেবল মাত্র শরীর যাত্রা নির্ব্বাহের জন্য তিনি কর্ম্ম করিয়া থাকেন ॥১৭॥

নৈব তস্য কৃতেনার্থো নাকৃতেনেহ কশ্চন ।
ন চাস্য সর্ব্বভূতেষু কশ্চিদর্থ-ব্যপাশ্রয়ঃ ॥১৮॥

ইহ (এ জগতে) তস্য (সেই আত্মারাম পুরুষের) কৃতেন (কৃতকর্ম্ম দ্বারা) অর্থঃ ন এব (পূর্ণ্য হয় না) অকৃতেন (কর্ম্মের অকরণ হেতু) কশ্চন [অনর্থঃ] ন (কোনও পাপ হয় না), অস্য সর্ব্বভূতেষু চ (এবং এই ব্যক্তির নিখিল প্রাণীগণের মধ্যে) কশ্চিৎ (কেহই) অর্থ ব্যপাশ্রয়ঃ (স্ব-প্রয়োজনে আশ্রয়নীয়) ন [ভবতি] (হয় না) ॥১৮॥

ইহলোকে সেই আত্মারাম পুরুষের অনুষ্ঠিত কর্ম্মের জন্য কোনও পুণ্য সঞ্চয় হয় না, এবং কর্ত্তব্য কর্ম্মের অননুষ্ঠান জন্য কোন পাপও উৎপন্ন হয় না । আব্রহ্ম-স্থাবর পর্য্যন্ত ভূত সকলের মধ্যে এই ব্যক্তির স্বপ্রয়োজনে কেহই আশ্রয়নীয় হন না ॥১৮॥

তস্মাদসক্তঃ সততং কার্য্যং কর্ম্ম সমাচর ।
অসক্তো হ্যাচরন্ কর্ম্ম পরমাপ্নোতি পূরুষঃ ॥১৯॥

তস্মাৎ (অতএব) অসক্তঃ [সন্] (ফলাসক্তি রহিত হইয়া) সততং (সর্ব্বদা) কার্য্যং কর্ম্ম (বিহিত কর্ম্ম) সমাচর (সম্যক্ আচরণ কর), হি (যেহেতু) অসক্তঃ [সন্] (অনাসক্ত হইয়া) কর্ম্ম আচরন্ (কর্ম্ম করিলে) পুরুষঃ (পুরুষ) পরম্ (অর্থাৎ পরমভক্তি) আপ্নোতি (লাভ করেন) ॥১৯॥

অতএব ফলাসক্তি পরিত্যাগ পূর্ব্বক সর্ব্বদা অবশ্য কর্ত্তব্যরূপে বিহিত কর্ম্মের অনুষ্ঠান কর । যেহেতু অনাসক্তভাবে কর্ম্ম করিতে করিতে জীবের মোক্ষ লাভ হয় । নিষ্কাম কর্ম্ম সকলের চরম পরিপাক্কাবস্থায় যে পরমাভক্তি জন্মে তাহাই মোক্ষ ॥১৯॥

কর্ম্মণৈব হি সংসিদ্ধিমাস্থিতা জনকাদয়ঃ ।
লোকসংগ্রহমেবাপি সম্পশ্যন্ কর্ত্তুমর্হসি ॥২০॥

জনকাদয়ঃ (জনকাদি জ্ঞানিগণ) কর্ম্মণা এব (কর্ম্মের দ্বারাই) হি (নিশ্চিত) সংসিদ্ধিম্ (ভক্তিরূপ সম্যক্ সিদ্ধি) আস্থিতাঃ (লাভ করিয়াছিলেন) । লোকসংগ্রহম্ অপি সংপশ্যন্ এব (লোকে শিক্ষা গ্রহণ করিবে এইরূপ বিবেচনায়ও) [কর্ম্ম] (কর্ম্ম) কর্ত্তুম্ (করিতে) অর্হসি (যোগ্য হও) ॥২০॥

জনক প্রভৃতি জ্ঞানাধিকারী ব্যক্তিগণও কর্ম্মের দ্বারাই ভক্তিরূপ সংসিদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন । অতএব লোকশিক্ষার্থ তোমার কর্ম্ম করা উচিত ॥২০॥

যদ্যদাচরতি শ্রেষ্ঠস্তত্তদেবেতরো জনঃ ।
স যৎ প্রমাণং কুরুতে লোকস্তদনুবর্ত্ততে ॥২১॥

শ্রেষ্ঠঃ (শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি) যৎ যৎ (যাহা যাহা) আচরতি (আচরণ করেন) ইতরঃ জনঃ (সাধারণ ব্যক্তি) তৎ তৎ এব (সেই সেই কর্ম্মই) [আচরতি] (আচরণ করে), সঃ (সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি) যৎ (যাহাকে) প্রমাণং (প্রমাণ বলিয়া) কুরুতে (স্বীকার করেন) লোকঃ (সাধারণ লোকও) তৎ (তাহাই) অনুবর্ত্ততে (অনুসরণ করে) ॥২১॥

শ্রেষ্ঠ লোক যেরূপ আচরণ করিয়া থাকেন, সাধারণ লোকসকল তাহারই অনুকরণ করেন । তিনি যাহাকে প্রমাণ বলিয়া স্বীকার করেন, সাধারণ লোকও তাহাতেই অনুবর্ত্তী হয় ॥২১॥

ন মে পার্থাস্তি কর্ত্তব্যং ত্রিষু লোকেষু কিঞ্চন ।
নানবাপ্তমবাপ্তব্যং বর্ত্ত এব চ কর্ম্মণি ॥২২॥

হে পার্থ ! (হে অর্জ্জুন !) ত্রিষু লোকেষু (ত্রিজগতে) মে (আমার) কিঞ্চন (কোন) কর্ত্তব্যং নাস্তি (করণীয় নাই) [যতঃ] (যেহেতু) [মম] (আমার) অনবাপ্তম্ (অপ্রাপ্ত) অবাপ্তব্যং (বা প্রাপ্য) [কিঞ্চন নাস্তি] (কিছুই নাই) [তথাপি] কর্ম্মণি (কর্ম্মে) বর্ত্তে এব চ (প্রবর্ত্তমান রহিয়াছি) ॥২২॥

হে অর্জ্জুন ! আমি পরমেশ্বর এই ত্রিলোক মধ্যে আমার কিছুই কর্ত্তব্য নাই ; যেহেতু আমার অপ্রাপ্ত বা পাইবার যোগ্য কিছুমাত্র বস্তু নাই, তথাপি আমি নিজে কর্ম্মাচরণ করিতেছি ॥২২॥

যদি হ্যহং ন বর্ত্তেয়ং জাতু কর্ম্মণ্যতন্দ্রিতঃ ।
মমবর্ত্মানুবর্ত্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্ব্বশঃ ॥২৩॥

[হে] পার্থ ! (হে অর্জ্জুন !) যদি জাতু (যদি কখনও) অতন্দ্রিতঃ [সন্] (অনবহিত হইয়া) অহম্ (আমি) কর্ম্মণি (কর্ম্মে) ন বর্ত্তেয়ং (প্রবৃত্ত না হই), [তর্হি] (তবে) হি (নিশ্চয়ই) মনুষ্যাঃ (মানবগণ) সর্ব্বশঃ (সর্ব্বথা) মম (আমার) বর্ত্ম (পথ) অনুবর্ত্তন্তে (অনুসরণ করিবে) ॥২৩॥

হে অর্জ্জুন ! কখনও যদি আমি অনবহিত হইয়া কর্ম্মানুষ্ঠান না করি, তবে আমার অনুবর্ত্তী হইয়া সকল মনুষ্যই কর্ম্ম পরিত্যাগ করিবে ॥২৩॥

উৎসীদেয়ুরিমে লোকা ন কুর্য্যাং কর্ম্ম চেদহম্ ।
সঙ্করস্য চ কর্ত্তা স্যামুপহন্যামিমাঃ প্রজাঃ ॥২৪॥

চেৎ (যদি) অহম্ (আমি) কর্ম্ম (কর্ম্ম) ন কর্য্যাম্ (না করি) [তর্হি] (তবে) ইমে লোকাঃ (এই সমস্ত লোকই) [কর্ম্ম ত্যক্ত্বা] (কর্ম্মত্যাগ পূর্ব্বক) উৎসীদেয়ুঃ (বিনষ্ট হইবে), চ (এবং) [অহং] (আমি) সঙ্করস্য (বর্ণসঙ্করের) কর্ত্তা (কর্ত্তা) স্যাম্ (হইব), [এবং অহমেব] (এইরূপে আমিই) ইমাঃ প্রজাঃ (এই সমস্ত প্রজাকে) উপহন্যাম্ (বিনাশ করিব) ॥২৪॥

যদি আমি কর্ম্ম না করি তবে আমার দৃষ্টান্তে এই সমস্ত লোকই কর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া উৎসন্ন হইবে এবং আমি বর্ণ-সঙ্করের প্রবর্ত্তক হইব, এইরূপে আমিই এই সমস্ত প্রজাকে বিনষ্ট করিব ॥২৪॥

সক্তাঃ কর্ম্মণ্যবিদ্বাংসো যথা কুর্ব্বন্তি ভারত ।
কুর্য্যাদ্বিদ্বাংস্তথাসক্তশ্চিকীর্ষুলোকসংগ্রহম্ ॥২৫॥

[হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) কর্ম্মণি সক্তাঃ (কর্ম্মে আসক্ত) অবিদ্বাংসঃ (অজ্ঞগণ) যথা (যেরূপ) [কর্ম্মাণি] কুর্ব্বন্তি (কর্ম্ম করিয়া থাকে) বিদ্বান্ (জ্ঞানী ব্যক্তি) অসক্তঃ (আসক্তি রহিত) [সন্] (হইয়া) লোকসংগ্রহম্ (লোক সংগ্রহ) চিকীর্ষুঃ (করিতে ইচ্ছুক হইয়া) তথা (সেইরূপ কর্ম্ম) কুর্য্যাৎ (করিবেন) ॥২৫॥

হে অর্জ্জুন ! কর্ম্মে আসক্ত অজ্ঞগণ যেরূপ কর্ম্ম করিয়া থাকে, সেইরূপ জ্ঞানিগণও কর্ম্মে অনাসক্ত হইয়া কর্ম্মাধিকারিদিগের স্বধর্ম্ম রক্ষার নিমিত্ত কর্ম্মাচরণ করিবেন, অর্থাৎ উভয়ের কর্ম্মের প্রকার পৃথক নয়, আসক্তি ও অনাসক্তিরূপ নিষ্ঠাই পৃথক জানিবে ॥২৫॥

ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কর্ম্মসঙ্গিনাম্ ।
যোজয়েৎ সর্ব্বকর্ম্মাণি বিদ্বান্ যুক্তঃ সমাচরন্ ॥২৬॥

বিদ্বান্ (জ্ঞানযোগের উপদেশক) কর্ম্মসঙ্গিনাম্ (কর্ম্মে আসক্ত চিত্ত) অজ্ঞানাম্ (অজ্ঞ ব্যক্তিগণের) বুদ্ধিভেদং (‘কর্ম্ম ত্যাগ পূর্ব্বক জ্ঞানাভ্যাস কর’ এইরূপ বুদ্ধিভেদ) ন জনয়েৎ (জন্মাইবে না) । [অপি তু] (অথচ) যুক্তঃ [সন্] (অনাসক্ত হইয়া) সর্ব্বকর্ম্মাণি (সমস্ত কর্ম্ম) সমাচরন্ (সম্যক্ আচরণ পূর্ব্বক) [অজ্ঞান্] (অজ্ঞগণকে) যোজয়েৎ (কর্ম্মে নিযুক্ত রাখিবেন) ॥২৬॥

জ্ঞানযোগের উপদেষ্টা কর্ম্মাসক্ত অজ্ঞগণের ‘কর্ম্মত্যাগ পূর্ব্বক জ্ঞানাভ্যাস কর’ এইরূপ বুদ্ধিভেদ জন্মাইবেন না । উপরন্তু নিজে সমাহিত চিত্তে নিষ্কাম কর্ম্ম সমূহের অনুষ্ঠান পূর্ব্বক অজ্ঞ লোকদিগকেও (সেই ভাবে) কর্ম্মেই নিযুক্ত রাখিবেন ॥২৬॥

প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্ম্মাণি সর্ব্বশঃ ।
অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্ত্তাহমিতি মন্যতে ॥২৭॥

প্রকৃতেঃ (প্রকৃতির) গুণৈঃ (কার্য্য ইন্দ্রিয়ের দ্বারা) সর্ব্বশঃ (সর্ব্বপ্রকারে) কর্ম্মাণি (কর্ম্ম সকল) ক্রিয়মাণানি (সম্পাদিত হয়), [কিন্তু] অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা (দেহাদিতে অহং বুদ্ধি দ্বারা বিমূঢ় চিত্ত ব্যক্তি) অহং কর্ত্তা (আমিই কর্ত্তা) ইতি (এইরূপ) মন্যতে (মনে করে) ॥২৭॥

কার্য্য সমূহ সর্ব্বতোভাবে প্রকৃতির গুণের (কার্য্যের অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের) দ্বারা সম্পাদিত হয় । কিন্তু দেহাদিতে অহং বুদ্ধি দ্বারা বিমুগ্ধচিত্ত মানব ‘আমিই উহা সম্পন্ন করিতেছি’ মনে করে ॥২৭॥

তত্ত্ববিৎ তু মহাবাহো গুণকর্ম্মবিভাগয়োঃ ।
গুণা গুণেষু বর্ত্তন্ত ইতি মত্বা ন সজ্জতে ॥২৮॥

[হে] মহাবাহো ! (হে বীরশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন !) গুণকর্ম্ম বিভাগয়োঃ (গুণ বিভাগ ও তদীয় কার্য্যের যে বিভাগ অর্থাৎ সত্ত্ব রজঃ তমঃ এইসকল গুণ ভেদ এবং তাহাদের কার্য্য দেবতা, ইন্দ্রিয় ও বিষয়রূপ কার্য্যভেদের) তত্ত্ববিৎ (স্বরূপ যিনি জানেন), [সঃ] (তিনি) তু (কিন্তু) গুণাঃ (দেবতা কর্ত্তৃক প্রেরিত চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়) গুণেষু (রূপাদি স্ব স্ব বিষয়ে) বর্ত্তন্তে (প্রবৃত্ত হয়) ইতি (ইহা) মত্বা (মনে করিয়া) ন সজ্জতে (তাহাতে আসক্ত হন না) ॥২৮॥

হে মহাবীর অর্জ্জুন ! গুণের বিভাগ ও তদীয় কার্য্যের বিভাগ অর্থাৎ সত্ত্ব রজঃ ও তমঃ এই গুণত্রয়, এবং দেবতা, ইন্দ্রিয় ও বিষয়রূপ কার্য্য সমূহের তত্ত্ব যিনি অবগত আছেন, তিনি কিন্তু ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাতৃ-দেবতাকর্ত্তৃক প্রেরিত চক্ষুকর্ণাদি ইন্দ্রিয়গণই রূপাদি স্ব স্ব গ্রাহ্যবিষয়সমূহে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে—এইরূপ মনে করিয়া নিজের কর্ত্তৃত্বাভিমান করেন না ॥২৮॥

প্রকৃতের্গুণসংমূঢ়াঃ সজ্জন্তে গুণকর্ম্মসু ।
তানকৃৎস্নবিদো মন্দান্ কৃৎস্নবিন্ন বিচালয়েৎ ॥২৯॥

প্রকৃতেঃ (প্রকৃতির) গুণসংমূঢ়াঃ (গুণ সমূহ দ্বারা ভূতাবিষ্টের ন্যায় আবিষ্ট জীবগণ) গুণকর্ম্মসু (গুণ কার্য্য বিষয় সমূহে) সজ্জন্তে (আসক্ত হয়); তান্ (সেই সকল) অকৃৎস্নবিদঃ (অসর্ব্বজ্ঞ) মন্দান্ (মন্দবুদ্ধিগণকে) কৃৎস্নবিৎ (সর্ব্বজ্ঞ বিদ্বান্ ব্যক্তি) ন বিচালয়েৎ (আত্ম অনাত্ম বিচার গ্রহণ করাইতে চেষ্টা করিবেন না) [কিন্তু গুণাবেশ-নিবর্ত্তকং নিষ্কাম কর্ম্মৈব কারয়েৎ] (কিন্তু গুণাবেশ নিবর্ত্তক নিষ্কাম কর্ম্মই করাইবেন) ॥২৯॥

প্রকৃতির গুণসমূহ দ্বারা ভূতাবিষ্ট মানুষের মত সম্যক্­রূপে মুগ্ধ ব্যক্তিগণ ইন্দ্রিয় ও তদ্­বিষয়ক কর্ম্মসমূহে আসক্ত হয় । সর্ব্বজ্ঞ বিদ্বান্ ব্যক্তি সেইসকল অজ্ঞ মন্দমতিগণকে (অনধিকারিগণকে) তত্ত্ববিচার প্রদর্শন পূর্ব্বক বিচলিত করিবেন না । গুণাবেশ নিবর্ত্তক নিষ্কাম কর্ম্মেরই উপদেশ দান করিবেন ॥২৯॥

ময়ি সর্ব্বাণি কর্ম্মাণি সংন্যস্যাধ্যাত্মচেতসা ।
নিরাশীর্নির্ম্মমো ভূত্বা যুধ্যস্ব বিগতজ্বরঃ ॥৩০॥

অধ্যাত্মচেতসা (আত্মস্বরূপনিষ্ঠ চিত্তে) ময়ি (আমাতে) সর্ব্বাণি কর্ম্মাণি (সমস্ত কর্ম্ম) সংন্যস্য (সমর্পণ করিয়া) নিরাশীঃ (নিষ্কাম), নির্ম্মামঃ (সর্ব্বত্র মমতাশূন্য) বিগতজ্বরঃ [চ] (ও খেদ রহিত) ভূত্বা (হইয়া) যুধ্যস্ব (যুদ্ধ কর) ॥৩০॥

সমস্ত কর্ম্ম আমাতে সমর্পণ পূর্ব্বক ‘অন্তর্যামীর অধীনে আমি কর্ম্ম করিতেছি’ এইরূপ বুদ্ধিতে নিষ্কাম, মমতাশূন্য ও শোকরহিত হইয়া (স্বধর্ম্মরূপ) যুদ্ধ অবলম্বন কর ॥৩০॥

যে মে মতমিদং নিত্যমনুতিষ্ঠন্তি মানবাঃ ।
শ্রদ্ধাবন্তোঽনসূয়ন্তো মুচ্যন্তে তেঽপি কর্ম্মভিঃ ॥৩১॥

যে (যে সকল) মানবাঃ (মনুষ্য) শ্রদ্ধাবন্তঃ (শ্রদ্ধাবান্) অনসূয়ন্তঃ (ও অসূয়া রহিত হইয়া) মে (আমার) ইদং (এই) মতম্ (অভিমত নিষ্কাম কর্ম্মযোগের) নিত্যম্ (সর্ব্বদা) অনুতিষ্ঠন্তি (অনুষ্ঠান করেন) তে অপি (তাঁহারাও) কর্ম্মভিঃ (কর্ম্ম বন্ধন হইতে) মুচ্যন্তে (মুক্ত হন) ॥৩১॥

যে সকল মানব শ্রদ্ধালু ও দোষদৃষ্টি-রহিত হইয়া আমার অভিমত এই নিষ্কাম কর্ম্মযোগের সতত অনুবর্ত্তন করেন—কর্ম্ম করিয়াও তাঁহারা সেই কর্ম্মবন্ধন হইতে মুক্তিলাভ করিয়া থাকেন ॥৩১॥

যে ত্বেতদভ্যসূয়ন্তো নানুতিষ্ঠন্তি মে মতম্ ।
সর্ব্বজ্ঞানবিমূঢ়াংস্তান্ বিদ্ধি নষ্টানচেতসঃ ॥৩২॥

যে তু (পরন্তু যাহারা) মে এতৎ মতম্ (আমার এই উপদেশ) অভ্যসূয়ন্তঃ (অসূয়াবশতঃ) ন অনুতিষ্ঠন্তি (পালন করে না) তান্ (তাহাদিগকে) সর্ব্বজ্ঞানবিমূঢ়ান্ (সমস্ত জ্ঞানে বঞ্চিত ), নষ্টান্ (পুরুষার্থ বিভ্রষ্ট) অচেতসঃ (ও নির্ব্বোধ বলিয়া) বিদ্ধি (জানিবে) ॥৩২॥

আর যাহারা অসূয়া পরবশ হইয়া আমার এই মতের অনুবর্ত্তন করে না, সেই বিবেক শূন্য জনগণকে সর্ব্ববিধজ্ঞানে বিমূঢ় ও বিনাশপ্রাপ্ত বলিয়া জানিবে ॥৩২॥

সদৃশং চেষ্টতে স্বস্যাঃ প্রকৃতের্জ্ঞানবানপি ।
প্রকৃতিং যান্তি ভূতানি নিগ্রহঃ কিং করিষ্যতি ॥৩৩॥

জ্ঞানবান্ অপি (জ্ঞানী ব্যক্তিও) স্বস্যাঃ প্রকৃতেঃ (স্বীয় প্রকৃতির) সদৃশং (অনুরূপ) চেষ্টতে (কার্য্য করে), ভূতানি (প্রাণিগণ) প্রকৃতিং যান্তি (তাদৃশ চেষ্টার ফলে তাদৃশ স্বভাবের অধীন হয়) নিগ্রহঃ (শাস্ত্রকৃত বা রাজকৃত দণ্ড)[তেষাং] (তাহাদের) কিং করিষ্যতি (কি করিবে) ॥৩৩॥

জ্ঞানবান্ ব্যক্তিও স্বীয় প্রকৃতির অর্থাৎ দুঃস্বভাবের অনুরূপ চেষ্টা করে । সুতরাং জীবগণ তাদৃশ চেষ্টার ফলে নিজে তাদৃশ স্বভাবের অধীন হইয়া পড়ে । শাস্ত্রকৃত বা রাজকৃত দণ্ডের ভয় তখন তাহাদিগকে রোধ করিতে পারে না ॥৩৩॥

ইন্দ্রিয়স্যেন্দ্রিয়স্যার্থে রাগদ্বেষৌ ব্যবস্থিতৌ ।
তয়োর্ন বশমাগচ্ছেত্তৌ হ্যস্য পরিপন্থিনৌ ॥৩৪॥

ইন্দ্রিয়ষ্য ইন্দ্রিয়স্য (সমস্ত ইন্দ্রিয়ের) অর্থে (স্ব স্ব বিষয়ে) রাগদ্বেষৌ (আসক্তি ও দ্বেষ) ব্যবস্থিতৌ (বিশেষভাবে অবস্থিত) । [তথাপি] তয়োঃ (সেই রাগদ্বেষের) বশং ন আগচ্ছেৎ (বশীভূত হইবে না) । হি (যেহেতু) তৌ (সেই রাগ ও দ্বেষ) অস্য (সাধকের) পরিপন্থিনৌ (বিরোধী) ॥৩৪॥

সমস্ত ইন্দ্রিয়গণেরই নিজ নিজ গ্রহণীয় বস্তুতে অনুরাগ ও বিরাগ বিশেষভাবে বর্ত্তমান রহিয়াছে । তাহা হইলেও এই রাগ বা দ্বেষের কখনও বশবর্ত্তী হইবে না । যেহেতু এই বিষয়ানুরাগ বা বিষয় বিরাগ সাধক ব্যক্তির পরম শত্রু বলিয়া জানিবে । (ইহাতে ভক্তি বিষয়ক রাগ বা বিরাগ লক্ষীভূত নহে) ॥৩৪॥

শ্রেয়ান্ স্বধর্ম্মো বিগুণঃ পরধর্ম্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ ।
স্বধর্ম্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্ম্মো ভয়াবহঃ ॥৩৫॥

স্বনুষ্ঠিতাৎ (নির্দ্দোষভাবে অনুষ্ঠিত) পরধর্ম্মাৎ (পরধর্ম্ম অপেক্ষা) বিগুণঃ (কিঞ্চিৎ দোষযুক্ত) স্বধর্ম্মঃ (স্বকীয় ধর্ম্ম) শ্রেয়ান্ (শ্রেষ্ঠ) । স্বধর্ম্মে (স্ব স্ব বর্ণ ও আশ্রমোচিত ধর্ম্ম) নিধনং (মরণও) শ্রেয়ঃ (ভাল) পরধর্ম্মঃ (পরধর্ম্ম) ভয়াবহঃ (তদপেক্ষা ভয়ানক) ॥৩৫॥

নির্দ্দোষভাবে আচরিত অন্যের ধর্ম্ম অপেক্ষা কিঞ্চিৎ অঙ্গহীন স্বীয় ধর্ম্মাচরণ ভাল । স্ব স্ব বর্ণ ও আশ্রমোচিত ধর্ম্মে বর্ত্তমান থাকিয়া নিধনপ্রাপ্ত হওয়া মঙ্গলপ্রদ হইয়া থাকে ; যেহেতু পরধর্ম্ম আচরণ ভয়াবহ জানিবে । (অধোক্ষজে ভক্তি সর্ব্বজীবের নিত্য স্বাভাবিক পরমধর্ম্ম হওয়ায়, ইহা বাহ্যিক সুদুরাচারযুক্ত হইলেও মায়িক সত্ত্বাদি গুণাশ্রিত সদাচার সংস্কারযুক্ত অনাত্ম ধর্ম্ম হইতে সর্ব্বদা শ্রেষ্ঠ । সাধুসঙ্গে এই শুদ্ধভক্তি যাজন করিতে করিতে দেহপাত হইলেও শ্রেয়ঃস্কর ; যেহেতু অবিদ্যাশ্রিত সংষ্কারের অনিশ্চয়তাপূর্ণ ঔপাধিক সদাচার দ্বিতীয়াভিনিবেশ থাকায় ভয়াবহ ।) ॥৩৫॥

অর্জ্জুন উবাচ—
অথ কেন প্রযুক্তোঽয়ং পাপঞ্চরতি পূরুষঃ ।
অনিচ্ছন্নপি বাষ্ণের্য় বলাদিব নিয়োজিতঃ ॥৩৬॥

অর্জ্জুনঃ উবাচ (অর্জ্জুন বলিলেন) [হে] বার্ষ্ণেয় ! (হে বৃষ্ণিবংশাবতংস !) অনিচ্ছন্ অপি (ইচ্ছা না করিলেও) অথ কেন প্রযুক্তঃ [সন্] (কাহা কর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়া) অয়ং পুরুষঃ (এই জীব) বলাং (বলপূর্ব্বক) নিযোজিতঃ ইব (যেন নিযোজিত হইয়াই) পাপং (পাপ) চরতি (আচরণ করে) ॥৩৬॥

অর্জ্জুন বলিলেন—হে বার্ষ্ণেয় ! ইচ্ছা না করিলেও কাহার প্রেরণায় এই জীব বলপূর্ব্বক নিয়োজিতের মত বাধ্য হইয়া পাপকার্য্য আচরণ করিয়া থাকে ? ॥৩৬॥

শ্রীভগবান্ উবাচ—
কাম এষ ক্রোধ এষ রজোগুণসমুদ্ভবঃ ।
মহাশনো মহাপাপ্মা বিদ্ধ্যেনমিহ বৈরিণম্ ॥৩৭॥

শ্রীভগবান্ উবাচ (শ্রীভগবান্ কহিলেন) এষঃ কামঃ (এই বিষয়াভিলাষরূপ কামই) এষঃ ক্রোধঃ (ক্রোধরূপে পরিণত হয়) রজোগুণসমুদ্ভবঃ (কাম রজোগুণ হইতে উৎপন্ন, এবং এই কাম হইতেই তামস ক্রোধ জন্মে), মহাশনঃ (দুষ্পূরণীয়) মহাপাপ্মা (ও অতি উগ্র) ইহ (এই জগতে) এনং (এই কামকেই) বৈরিণম্ (জীবের প্রধান শত্রু বলিয়া) বিদ্ধি (জানিবে) ॥৩৭॥

শ্রীভগবান্ কহিলেন—রজোগুণসমুদ্ভূত কামই পুরুষকে পাপে প্রবৃত্তি দেয় । ‘কাম’ বিষয়াভিলাষ স্বরূপ, ঐ কামই অবস্থাভেদে রূপান্তর প্রাপ্ত হইয়া ক্রোধ হয় । এই কামের কিছুতেই পূর্ত্তি হয় না এবং সে অতিশয় উগ্র । এই জগতে উক্ত কামকেই জীবের প্রধান শত্রু বলিয়া জানিবে ॥৩৭॥

ধূমেনাব্রিয়তে বহ্নির্যথাদর্শো মলেন চ ।
যথোল্বেনাবৃতো গর্ভস্তথা তেনেদমাবৃতম্ ॥৩৮॥

যথা (যেমন) বহ্নিঃ (অগ্নি) ধূমেন (ধূম দ্বারা) আব্রিয়তে (আবৃত থাকে), যথা (যেমন) আদর্শঃ (দর্পণ) মলেন (ময়লার দ্বারা) [আব্রিয়তে] (আবৃত থাকে), যথা চ (এবং যেমন) উল্বেন (জরায়ু দ্বারা) গর্ভঃ (গর্ভ) আবৃতঃ (আবৃত থাকে), তথা (সেইরূপ) তেন (সেই কাম দ্বারা) ইদম্ (এই জ্ঞান) আবৃতম্ (আবৃত থাকে) ॥৩৮॥

যেমন ধূমের দ্বারা অগ্নি কিঞ্চিৎ আবৃত থাকে, যেমন দর্পণ ময়লা দ্বারা গাঢ় আবৃত থাকে, এবং যেমন জরায়ু দ্বারা গর্ভস্থ জীব অতি গাঢ়ভাবে আবৃত থাকে ; সেইরূপ এই কামের দ্বারা উক্ত ত্রিবিধ রূপে (সত্ত্ব, রজ ও তমোগুণাশ্রয়ে) জীবচৈতন্য আচ্ছন্ন রহিয়াছে ॥৩৮॥

আবৃতং জ্ঞানমেতেন জ্ঞানিনো নিত্যবৈরিণা ।
কামরূপেণ কৌন্তেয় দুষ্পূরেণানলেন চ ॥৩৯॥

[হে] কৌন্তেয় ! (হে কুন্তীপুত্ত্র অর্জ্জুন !) জ্ঞানিনঃ (জ্ঞানিগণেরও) নিত্যবৈরিণা (চিরশত্রু) এতেন (এই) দুষ্পূরেণ (দুষ্পূরণীয়) অনলেন চ (অনল সদৃশ) কামরূপেণ (কামও তন্মূল অজ্ঞান কর্ত্তৃক) জ্ঞানম্ (বিবেক জ্ঞান) আবৃতম্ (আবৃত হয়) ॥৩৯॥

হে অর্জ্জুন ! জ্ঞানীর চিরশত্রু—(ঘৃতাহুতি দ্বারা) দুষ্পূরণীয় অনল সদৃশ এই ‘কাম’ ও তন্মূল অজ্ঞান কর্ত্তৃক—বিবেক-জ্ঞান আবৃত হয় ॥৩৯॥

ইন্দ্রিয়াণি মনো বুদ্ধিরস্যাধিষ্ঠানমুচ্যতে ।
এতৈর্বিমোহয়ত্যেষ জ্ঞানমাবৃত্য দেহিনম্ ॥৪০॥

অস্য (এই কামরূপ শত্রুর) ইন্দ্রিয়াণি (ইন্দ্রিয়গণ) মনঃ বুদ্ধিঃ (মন ও বুদ্ধি) অধিষ্ঠানম্ (আশ্রয়স্থল বলিয়া) উচ্যতে (কথিত হয়), এষঃ (এই কাম) এতৈঃ (এই সকল ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা) জ্ঞানম্ (বিবেক জ্ঞানকে) আবৃত্য (আবৃত করিয়া) দেহিনম্ (জীবকে) বিমোহয়তি (বিমোহিত করে) ॥৪০॥

ইন্দ্রিয়গণ, মন ও বুদ্ধিকে এই কামরূপ শত্রুর আশ্রয়-স্থল বলা হইয়াছে । ঐ কাম এই সকল ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা বিবেক-জ্ঞানকে আচ্ছাদন করিয়া জীবকে বিমোহিত করে অর্থাৎ জড়বিষয়ে নিক্ষেপ করে ॥৪০॥

তস্মাৎ ত্বমিন্দ্রিয়াণ্যাদৌ নিয়ম্য ভরতর্ষভ ।
পাপ্মানং প্রজহি হ্যেনং জ্ঞানবিজ্ঞাননাশনম্ ॥৪১॥

[হে] ভরতর্ষভ ! (হে ভরত শ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন !) তস্মাৎ (অতএব) ত্বম্ (তুমি) আদৌ (প্রথমতঃ) ইন্দ্রিয়াণি (ইন্দ্রিয় সকলকে) নিয়ম্য (বশীভূত করিয়া) জ্ঞানবিজ্ঞাননাশনম্ (জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিনাশক) পাপ্মানং (পাপরূপ) এনং (এই কামকে) হি (স্পষ্টতঃ) প্রজহি (বিনাশ কর) ॥৪১॥

হে ভরতবংশাবতংস ! অতএব তুমি প্রথমে ইন্দিয়গণকে স্বীয় বশীভূত করিয়া শাস্ত্রীয় আত্মানাত্ম-বিবেকরূপ ‘জ্ঞান’ ও তৎসম্বন্ধীয় চিন্ময় অনুভব হইতে লব্ধ ‘বিজ্ঞান’ এই উভয়ের ধ্বংসকারী পাপস্বরূপ এই কামকে প্রকাশ্যভাবে বিনাশ কর ॥৪১॥

ইন্দ্রিয়াণি পরাণ্যাহুরিন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ ।
মনসস্তু পরা বুদ্ধির্বুদ্ধের্যঃ পরতস্তু সঃ ॥৪২॥

[বিষয়েভ্যঃ] (জড় বিষয় হইতে) ইন্দ্রিয়াণি (ইন্দ্রয়গণকে) পরাণি (শ্রেষ্ঠ) [পণ্ডিতাঃ] (পণ্ডিতগণ) আহুঃ (বলিয়া থাকেন), ইন্দ্রিয়েভ্যঃ (ইন্দ্রিয় সকল হইতে) মনঃ (মনকে) পরং (শ্রষ্ঠ), মনসঃ তু (মন অপেক্ষাও) বুদ্ধিঃ (নিশ্চয়াত্মিকা বৃত্তি) পরা (শ্রেষ্ঠ) । যঃ তু (আর যিনি) বুদ্ধেঃ (বুদ্ধি অপেক্ষাও) পরতঃ (পরতর) সঃ (তিনিই জীবাত্মা) ॥৪২॥

পণ্ডিতগণ বলেন জড় বিষয় হইতে ইন্দ্রিয়গণ শ্রেষ্ঠ, ইন্দ্রিয়সকল হইতে মন শ্রেষ্ঠ, মন অপেক্ষাও নিশ্চয়াত্মিকা বৃত্তিরূপ বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ । আবার যিনি বুদ্ধি অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, তিনিই সেই (জীবাত্মা) ॥৪২॥

এবং বুদ্ধেঃ পরং বুদ্ধা সংস্তভ্যাত্মানমাত্মনা ।
জহি শত্রুং মহাবাহো কামরূপং দুরাসদম্ ॥৪৩॥

[হে] মহাবাহো ! (হে মহাবীর অর্জ্জুন !) এবং (এইরূপে) বুদ্ধেঃ পরং (বুদ্ধি হইতে পৃথক্ জীবাত্মাকে) বুদ্ধা (জানিয়া) আত্মানম্ (মনকে) আত্মনা (ঈদৃশ নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি দ্বারা) সংস্তভ্য (স্থির করিয়া) দুরাসদম্ (দুর্জ্জয়) কামরূপং (কামরূপ) শত্রুং (শত্রুকে) জহি (বিনাশ কর) ॥৪৩॥

হে মহাবীর অর্জ্জুন ! এইরূপে বুদ্ধি হইতে সম্পূর্ণভাবে পৃথক জীবাত্মাকে অবগত হইয়া ঈদৃশ নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধিদ্বারা মনকে নিশ্চল করিয়া কামরূপ দুর্জ্জয় শত্রুকে বিনষ্ট কর ॥৪৩॥

ইতি শ্রীমহাভারতে শতসাহস্র্যাং সংহিতায়াং বৈয়াসিক্যাং ভীষ্মপর্ব্বণি
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জ্জুনসংবাদে কর্ম্মযোগো নাম তৃতীয়োঽধ্যায়ঃ ॥৩॥

ইতি তৃতীয় অধ্যায়ের অন্বয় সমাপ্ত ॥

                                                                                                   গ্রন্থ-সম্পাদক—
                                                                                       ত্রিদণ্ডিভিক্ষু—শ্রীভক্তিরক্ষক শ্রীধর
                                                                                         শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ, নবদ্বীপ
                                                                                        শ্রীজন্মাষ্টমী বঙ্গাব্দ ১৩৬৮ সাল

৪) নৈষ্কর্ম্য লাভ : কর্মবন্ধন হইতে মুক্তি বা নিষ্কৃতির অবস্থাকে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি বা মোক্ষ বলে । শ্রীগীতা বলেন সন্ন্যাসমার্গে মোক্ষ লাভ হয় জ্ঞানের ফলে, কর্মত্যাগের ফলে নয় । কর্ম বন্ধনের কারণ নয়, অহঙ্কার ও কামনাই বন্ধনের কারণ । কামনা ত্যাগেও জ্ঞানের প্রয়োজন এবং সেই হেতুই নিষ্কাম-কর্মও মোক্ষপ্রদ । মোক্ষের জন্য চাই, অহঙ্কার ও ফলাসক্তি ত্যাগ, কর্মত্যাগ প্রয়োজন হয় না । বস্তুত দেহধারী জীব একেবারে কর্মত্যাগ করিতেই পারে না ।
৬-৭) মিথাচারী ও কর্মযোগী : হস্তপদাদি সংযত করিয়া ধ্যানে বসিয়াছি । মন বিষয়ে ভ্রমণ করিতেছে । আমি মিথাচারী । এই অবস্থা উল্টাইয়া লইতে পারিলে আমি কর্মযোগী হইব । অর্থাৎ যখন ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বিষয়-কর্ম করিতেছি, কিন্তু মন ঈশ্বরে নিবিষ্ট আছে, বিষয়-কর্মও তাঁহারই কর্ম মনে করিয়া কর্তব্যবোধে করিতেছি, উহাতে আসক্তি নাই, ফলাকাঙ্ক্ষা নাই । সিদ্ধি-অসিদ্ধিতে হর্ষ-বিষাদ নাই ।
৮) নিয়ত কর্ম : সাধারণত শাস্ত্রবিহিত কর্তব্য-কর্ম (duty), স্বধর্ম – লোকমান্য তিলক । এখানে ইন্দ্রিয়সকল সংযত করিয়া (নিয়ম্য) যে কর্ম তাহাই বুঝায় (controlled action) ।
ধর্মশাস্ত্র : স্বেচ্ছাচারিতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা নিবারণপূর্বক ধর্ম ও লোকরক্ষার উদ্দেশ্যে যে সকল বিধি-নিষেধ প্রবর্তিত হইয়াছে । শাস্ত্র সকল সম্প্রদায়ের, সকল সমাজের, সকল জাতিরই আছে । সকলের পক্ষেই শাস্ত্রবিহিত কর্মই কর্তব্য-কর্ম । হিন্দুর কর্মজীবনে ও ধর্মজীবনে পার্থক্য নাই, তাই হিন্দুর সাংসারিক-কর্ম-নিয়ামক শাস্ত্রু ধর্মশাস্ত্র । তিন সহস্র-বৎসর পূর্বে প্রবর্তিত কোনো শাস্ত্রবিধি যদি অবস্থার পরিবর্তনে সমাজরক্ষার প্রতিকূল বোধ হয়, তবে তাহা অবশ্যই ত্যাজ্য । কেননা, যুক্তিহীন, গতানুগতিক ভাবে শাস্ত্র অনুসরণ করিলে ধর্মহানি হয় –
কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্তব্যো বিনির্ণয়ঃ ।যুক্তিহীনবিচারেণ ধর্মহানিঃ প্রজায়তে ।। – বৃহস্পতি
স্বয়ং ব্রহ্মাও যদি অযৌক্তিক কথা বলেন, তবে তাহা তৃণবৎ পরিত্যাগ করিবে ।
অন্যং তৃণমিব ত্যাজ্যমপ্যুক্তং পদ্মজন্মনা – বশিষ্ঠ
৯) ‘যজ্ঞার্থ’ কর্ম কি ? বৈদিক যাগযজ্ঞাদি-ক্রিয়াকাণ্ড সমস্তই রূপাত্মক, উহাদের অন্তর্নিহিত গূঢ় অর্থ আছে । ‘যজ্ঞের মর্মভাব ত্যাগ, অতএব যজ্ঞার্থে কর্ম করার এরূপ অর্থও অসঙ্গত নহে যে, ত্যাগের ভাবে কর্মানুষ্ঠান করা । এইরূপ কর্মানুষ্ঠান যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন মানব-জীবন একটি মহাযজ্ঞের আকার ধারণ করে । সেই যজ্ঞের বেদী জগতের হিত, ত্যাগ, আত্মবলিদান এবং যজ্ঞেশ্বর স্বয়ং ভগবান ।’ [গীতায় যজ্ঞতত্ত্ব, বেদান্তরত্ন হীরেন্দ্রনাথ দত্ত]
১৩) পঞ্চমহাযজ্ঞ : মানুষ জীবনরক্ষার্থ অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রাণিহিংসা করিতে বাধ হয় । শাস্ত্রকারগণ গৃহস্তের পাঁচ প্রকার ‘সূনা’ অর্থাৎ জীবহিংসা-স্থানের উল্লেখ করেন । যথা – (i)উদূখল, (ii)জাঁতা, (iii)চুল্লী, (iv)জলকুম্ভ ও (v)ঝাঁটা । এগুলি গৃহস্তের নিত্য-ব্যবহার্য, অথচ এগুলি দ্বারা কীটপতঙ্গাদি প্রাণিবধও অনিবার্য, সুতরাং তাহাতে পাপও অবশ্যম্ভাবী । এই পাপমোচনার্থ পঞ্চমহাযজ্ঞের ব্যবস্থা । যথা – (i)অধ্যাপনা (এবং সন্ধ্যোপাসনাদি) ব্রহ্মযজ্ঞ/ঋষিযজ্ঞ, (ii)তর্পণাদি পিতৃযজ্ঞ, (iii)হোমাদি দৈবযজ্ঞ, (iv)কাকাদি-জীবজন্তুকে খাদ্যপ্রদান ভৃতযজ্ঞ ও (v)অতিথি-সৎকার নৃযজ্ঞ । সকলের প্রতিই মানুষের কর্তব্য আছে, এই কর্তব্যকেই শাস্ত্রে ‘ঋণ’ বলে । ত্যাগমূলক পঞ্চযজ্ঞদ্বারা পিতৃঋণ, দেবঋণ ইত্যাদি পরিশোধ করিতে হয় ।
১৪-১৫) গীতায় যজ্ঞবিধি : গীতা সকাম-যজ্ঞেরই বিরোধী, নিষ্কাম-যজ্ঞের নহে । যজ্ঞ, দান ও তপস্যা – এই সকল কর্ম চিত্তশুদ্ধিকর, উহা অবশ্যকর্তব্য; কিন্তু আসক্তি ও ফলকামনা ত্যাগ করিয়া এই সকল কর্ম করিতে হইবে [১৮|৫-৬] । ‘গীতার শ্লোকগুলিতে যে-যজ্ঞের বিধান আছে তাহাতে যদি আমরা কেবল আনুষ্ঠানিক যজ্ঞই বুঝি তাহা হইলে আমরা গীতোক্ত কর্ম-তত্ত্ব যথার্থ বুঝিতে পারিব না; বস্তুত, এই শ্লোকগুলির মধ্যে গভীর গূঢ়ার্থ আছে ।’ – [শ্রীঅরবিন্দ] । ‘যজ্ঞের মর্মভাব ত্যাগ (sacrifice) – [বেদান্তরত্ন হীরেন্দ্রনাথ দত্ত]
রহস্য – যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞাদি
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরও শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শক্রমেই ‘কাম্য কর্ম’ রাজসূয়-যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, কিন্তু নিষ্কামভাবে, কর্তব্যানুরোধে । এই রাজসূয়-যজ্ঞের উদেশ্য প্রধানত জরাসন্ধ, শিশুপাল প্রভৃতি ধর্মদ্বেষী অত্যাচারী ‘অসুরগণ’কে নত বা নিহত করিয়া একচ্ছত্র ধর্মরাজ্য সংস্থাপন । কিন্তু ঈদৃশ অশ্বমেধ-যজ্ঞ অপেক্ষাও যে বিশুদ্ধ ত্যাগ-লক্ষণ নৃযজ্ঞাদির শ্রেষ্ঠতা কম নহে, মহাভারতকার সুবর্ণনকুল-উপাখ্যানে তাহাও প্রদর্শন করিয়াছেন ।
সুবর্ণনকুল-উপাখ্যান : এক নকুল যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ-যজ্ঞস্থলে আসিয়া অবিরত লুণ্ঠিত হইতেছিল । দেখা গেল, নকুলটির মুখ ও শরীরের অর্ধাংশ স্বর্ণময় । অদ্ভুত জীবটির অদ্ভুত কর্মের কারণ জিজ্ঞাসা করা হইলে নকুল বলিল – দেখিলাম, কুরুক্ষেত্রে এক উঞ্ছবৃত্তি ব্রাহ্মণ সপরিবারে উপবাসী থাকিয়া অতিথিকে সঞ্চিত সমস্ত যবচূর্ণ প্রদান করিলেন । সেই অতিথির ভোজনপাত্রে যৎকিঞ্চিৎ উচ্ছিষ্ট অবশিষ্ট ছিল, সেই পবিত্র যবকণার সংস্পর্শে আমার মুখ ও দেহার্ধ স্বর্ণময় হইয়াছে । অপরার্ধ স্বর্ণময় করিবার জন্য আমি নানা যজ্ঞস্থলে যাইয়া লুণ্ঠিত হইলাম, কিন্তু দেখিলাম এ-যজ্ঞ অপেক্ষা সেই ব্রাহ্মণের শক্তুযজ্ঞই শ্রেষ্ঠ; কেননা আমার দেহ স্বর্ণময় হইল না ।
১৭-১৯) জ্ঞানীর কর্ম : ‘উচ্চতর সত্যের অভিমুখ হইলেই কর্ম ত্যাগ করিতে হইবে না – সেই সত্য লাভ করিবার পূর্বে ও পরে নিষ্কাম কর্মসাধনই গূঢ় রহস্য । মুক্ত পুরুষের কর্মের দ্বারা লাভ করিবার কিছুই নাই, তবে কর্ম হইতে বিরত থাকিয়াও তাঁহার কোনো লাভ নাই এবং কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য তাঁহাকে কর্ম করিতে বা কর্ম ত্যাগ করিতে হয় না, অতএব যে কর্ম করিতে হইবে (জগতের জন্য, লোক-সংগ্রহার্থে [৩|২০]) সর্বদা অনাসক্ত হইয়া তাহা কর ।’ – শ্রীঅরবিন্দের গীতা
২০) লোকসংগ্রহম্‌ : লোকরক্ষা, সৃষ্টিরক্ষা । এ-স্থলে ‘লোক’ শব্দের অর্থ ব্যাপক । শুধু মনুষ্য-লোকের নহে, দেবাদি সমস্ত লোকের ধারণ-পোষণ হইয়া পরস্পরের শ্রেয় সম্পাদন করিবে । জ্ঞানী পুরুষ সমস্ত জগতের চক্ষু, ইঁহারা যদি নিজের কর্ম ত্যাগ করেন, তাহা হইলে অন্ধতমসাচ্ছন্ন হইয়া সমস্ত জগৎ ধ্বংস না হইয়া যায় না । লোকদিগকে জ্ঞানী করিয়া উন্নতির পথে আনয়ন করা জ্ঞানী পুরুষদিগেরই কর্তব্য ।
২৪) সঙ্করস্য : ‘সঙ্কর’ অর্থ পরস্পর-বিরুদ্ধ পদার্থের মিলন বা মিশ্রণ, উহার ফল সামাজিক বিশৃঙ্খলা । বর্ণসঙ্কর উহার প্রকার বিশেষ । বর্ণসঙ্কর, কর্মসঙ্কর, নানাভাবেই সাঙ্কর্য উপস্থিত হইতে পারে । লোকে স্বধর্মানুসারে কর্তব্য-পালন না করিলেই এইরূপ সাঙ্কর্য উপস্থিত হয় । এ-স্থলে সঙ্কর-শব্দের সাধারণ ব্যাপক অর্থ গ্রহণই কর্তব্য । মূল শ্লোকে “বর্ণের” উল্লেখ নেই [uploader’s comment] ।
শ্লোকের তাৎপর্য – আমি কর্ম না করিলে আমার দৃষ্টান্তের অনুসরণে সকলে স্বীয় কর্তব্য-কর্ম ত্যাগ করিয়া স্বেচ্ছাচারী হইয়া উঠিবে । স্বেচ্ছাচারে সাঙ্কর্য ও বিশৃঙ্খলা অবশ্যম্ভাবী । সামাজিক বিশৃঙ্খলায় ধর্মলোপ, সমাজের বিনাশ । সুতরাং লোক-শিক্ষার্থ, লোক-সংগ্রহার্থ আমি কর্ম করি, তুমিও তাহাই কর ।
কৃষ্ণই হিন্দুর জাতীয় আদর্শ : ‘আপনি আচরি ধর্ম লোকেরে শিখায়’ – শ্রীচৈতন্য-লীলাপ্রসঙ্গ । অবতারগণ মানব-ধর্ম স্বীকার করিয়া মানবী-শক্তির সাহায্যেই কর্ম করিয়া থাকেন, নচেৎ লোকে তাঁহাদের আদর্শ ধরিতে পারে না । এইভাবে দেখিলে, তাঁহারা আদর্শ মনুষ্য । শ্রীচৈতন্য, ভক্তরূপে স্বয়ং আচরণ করিয়া প্রেমভক্তি শিক্ষা দিয়াছেন । বুদ্ধদেব ত্যাগ ও বৈরাগ্যের প্রতিমূর্তি । শ্রীরামচন্দ্রে কর্তব্যনিষ্ঠার চরমোৎকর্ষ । আর শ্রীকৃষ্ণ সর্বতঃপূর্ণ, সর্বকর্মকৃৎ ।
২৫) নিষ্কাম কর্মের উদ্দেশ্য : দুইটি উদ্দেশ্য – (i)ভগবানের অর্চনা, (ii)সৃষ্টি রক্ষা । জ্ঞানী যদি কর্মত্যাগী হন, তবে জ্ঞান প্রচার করিবে কে ? কর্মে নিষ্কামতা শিক্ষা দিবে কে ? সংসার-কীট কর্মীকে ভগবানের দিকে আকর্ষণ করিবে কে ? কর্মী যদি স্বার্থান্বেষী হন, তবে জগতের দুঃখ মোচন করিবে কে ? তাই প্রহ্লাদ দুঃখ করিয়া বলিয়াছিলেন –
‘প্রায়ই দেখা যায়, মুনিরা নির্জনে মৌনাবলম্বন করিয়া তপস্যা করেন, তাঁহারা তো লোকের দিকে দৃষ্টি করেন না । তাঁহারা তো পরার্থনিষ্ঠ নন, তাঁহারা নিজের মুক্তির জন্যই ব্যস্ত, সুতরাং স্বার্থপর ।’
অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে যেমন রামকৃষ্ণ মিশন অথবা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সন্ন্যাসীবৃন্দ । কিন্তু স্মরণ রাখিতে হইবে যে সেবাধর্মী সন্ন্যাসীবৃন্দের কর্মজীবনের আদর্শ কেবল সমাজ-সেবা বা ভূতহিত নয়, উহা তাঁহাদের শিক্ষার আনুষঙ্গিক ফল এবং উচ্চস্তরে উঠিবার সোপানমাত্র । স্বামী বিবাকানন্দের শিক্ষার মূল কথা ভাগবত-জীবন লাভ, সর্বজীবকে সত্ত্বশুদ্ধ করিয়া ভগবানের দিকে আকৃষ্ট করা । বর্তমান ভারতবাসী তমোগুণাক্রান্ত, রজোগুণের উদ্রেক না হইলে সত্ত্বে যাওয়া যায় না, এই জন্য তিনি কর্মের উপর এত জোর দিয়াছেন ।
‘দেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, সমাজসেবা, সমষ্টির সাধনা, এই সমস্ত যে আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থপরতার হস্ত হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়া অপরের জীবনের সহিত নিজের একত্ব উপলব্ধি করিবার প্রকৃষ্ট উপায় তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই । আদিম স্বার্থপরতার পর ইহা দ্বিতীয় অবস্থা । কিন্তু গীতা আরো উচ্চ তৃতীয় অবস্থার কথা বলিয়াছেন । দ্বিতীয় অবস্থাটি সেই তৃতীয় অবস্থায় উঠিবার আংশিক উপায় মাত্র । সেই এক সর্বাতীত সার্বজনীন ভাগবত সত্তা ও চৈতন্যের মধ্যে মানবের সমগ্র ব্যক্তিত্বকে হারাইয়া ক্ষুদ্র আমিকে হারাইয়া, বৃহত্তর আমাকে পাইয়া যে ভাগবত অবস্থা লাভ করা যায়, গীতায় তাহারই নিয়ম বর্ণিত হইয়াছে ।’ – শ্রীঅরবিন্দের গীতা (সংক্ষিপ্ত) ।
২৬) সন্ন্যাসবাদে ভারতের দুর্দশা :
প্রাচীন ভারত কর্মদ্বারাই গৌরবলাভ করিয়াছিল, শিক্ষা-সভ্যতায়, শিল্প-সাহিত্যে, শৌর্য-বীর্যে জগতে শীর্ষস্থান অধিকার করিয়াছিল । সেই ভারতবাসী আজ অলস, অকর্মা, বাক্যবাগীশ বলিয়া জগতে উপহাসাস্পদ । এ-দুর্দশা কেন ? ভারতকে কর্ম হইতে বিচ্যুত করিল কে ? ভারতে এ-বুদ্ধিভেদ জন্মিল কিরূপে ?
বুদ্ধদেবের অষ্টাঙ্গ পথ, শঙ্করের মায়াবাদ, পরবর্তী ধর্মাচার্যগণের দ্বৈতবাদ, এ-সকলে জ্ঞান, বৈরাগ্য, প্রেম, ভক্তি সবই আছে, কিন্তু কর্মের প্রেরণা নাই, কর্মপ্রশংসা নাই, কর্মোপদেশ নাই । কুরুক্ষেত্রের সমরাঙ্গনে যে শঙ্খধ্বনি উত্থিত হইয়াছিল, ‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন’, সে ধ্বনির আর কেহ প্রতিধ্বনি করেন নাই, তেমন কথা ভারতবাসী তিন-সহস্র বৎসরের মধ্যে আর শুনে নাই । মধ্যযুগে সে কেবল শুনিয়াছে – ‘কর্মে জীবের বন্ধন, জ্ঞানেই মুক্তি’, ‘সন্ন্যাস গ্রহণ করিলেই মানুষ নারায়ণ হয়’ এই সব । ফলে, সংসারে জাতবিতৃষ্ণ, কর্মবিমুখ অদৃষ্টবাদীর সৃষ্টি, দলে-দলে অনধিকারীর সন্ন্যাস গ্রহণ, ধর্মধ্বজী ভিক্ষোপজীবীর সংখ্যাবৃদ্ধি । এইরূপে কালে সমাজ হইতে রজোগুণের সম্পূর্ণ অন্তর্ধান হইল, সত্ত্বগুণাশ্রিত অতি অল্পসংখ্যক ব্যক্তি সমাজ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া জ্ঞানভক্তির চর্চায় নিযুক্ত রহিলেন – তমোগুণাক্রান্ত নিদ্রাভিভূত জনসাধারণ শত্রুর আক্রমণে চমকিত হইয়া ‘কপালের লিখন’ বলিয়া চিত্তকে প্রবোধ দিল ।
পূর্বে যে-সকল মহাপুরুষের কথা উল্লিখিত হইল ইঁহারা সকলেই যুগাবতার । সনাতন ধর্মের গ্লানি উপস্থিত হইলে, সেই গ্লানি নিবারণ করিয়া উহার বিশুদ্ধি ও সময়োপযোগী পরিবর্তন সাধনের জন্যই যুগধর্মের প্রবর্তন হয় । তত্তৎকালে ঐ সকল ধর্মপ্রবর্তনের প্রয়োজন ছিল বলিয়াই এই যুগাবতারগণের আবির্ভাব । ইঁহারা কখনো অনধিকারীকে সোহহং জ্ঞান বা সন্ন্যসাদি উপদেশ দেন নাই । কিন্তু কালের গতিতে যুগধর্মেরও ব্যভিচার হয়, লোকে উহার প্রকৃত মর্ম গ্রহণ করিতে না পারিয়া নানারূপ উপধর্মের সৃষ্টি করে, উহাতেই কুফল ঘটে ।
২৭-৩০) কর্মী ও কর্মযোগী :
প্রশ্নঃ জ্ঞানীও কর্ম করেন, অজ্ঞানও কর্ম করেন, তবে জ্ঞানী ও অজ্ঞানে পার্থক্য কি ?
উত্তরঃ অজ্ঞান ব্যক্তি মনে করেন, কর্ম করি আমি, জ্ঞানী মনে করেন, কর্ম করেন প্রকৃতি । অজ্ঞান ‘আমি’টাকে কর্মের সহিত যোগ করিয়া দেন বলিয়াই ফলাসক্ত হন । সুতরাং অজ্ঞানের কর্ম ভোগ, জ্ঞানীর কর্ম যোগ । কর্মী হইলেই কর্মযোগী হয় না । কর্তৃত্বাভিমান ও ফলাকাঙ্খা বর্জন ব্যতীত কর্ম যোগে পরিণত হয় না ।
‘কাঁচা আমি’ ও ‘পাকা আমি’ : “মানুষের ভিতর ‘কাঁচা আমি’ ও ‘পাকা আমি’, এই দুই রকম ‘আমি’ আছে । অহঙ্কারী আমি কাঁচা আমি । এ-আমি মহাশত্রু । ইহাকে সংহার করা চাই । মুক্তি হবে কবে, অহং যাবে যবে । সমাধি হলে তাঁর সঙ্গে এক হওয়া যায়, আর অহং থাকে না । জ্ঞান হবার পর যদি অহং থাকে তবে জেনো সে বিদ্যার আমি, ভক্তির আমি, দাস আমি, সে অবিদ্যার আমি নয় । সে পাকা আমি । প্রহ্লাদ, নারদ, হনুমান, এঁরা সমাধির পর ভক্তি রেখেছিলেন; শঙ্করাচার্য, রামানুজ, এঁরা বিদ্যার আমি রেখেছিলেন ।” – শ্রীরামকৃষ্ণ ।
সমাধি : সমাধি হইলেই যে বাহ্য বিষয়ের জ্ঞান লোপ পাইবে, তাঁহার শরীর ও মনের জ্ঞানও লোপ পাইবে, এমন-কি তাঁহার শরীর দগ্ধ করিলেও জ্ঞান হইবে না, তাহা নহে । সমাধিস্থ ব্যক্তির প্রধান লক্ষণ এই যে, তাঁহার ভিতর হইতে সমস্ত কামনা দূর হয়, সংসারের শুভাশুভ, সুখ-দুঃখ, কর্ম-কোলাহলে মন সম্পূর্ণ অবিচলিত থাকে, তিনি আত্মার আনন্দেই তৃপ্ত থাকেন – যখন সাধারণের চক্ষুতে তাঁহাকে দেখায় যে, তিনি সাংসারিক বাহ্য-ব্যাপারে ব্যস্ত, তখনো সম্পূর্ণভাবে ভগবানের দিকেই তাঁহার লক্ষ্য থাকে ।
৩৩) স্বভাব কাহাকে বলে ?
জীবমাত্রেই একটি বিশেষ প্রকৃতি লইয়া জন্মগ্রহণ করে এবং প্রকৃতির অনুগামী হইয়া সে কর্ম করে । এই প্রকৃতি কি ? শাস্ত্রকারগণ বলেন, পূর্বজন্মার্জিত ধর্মাধর্ম-জ্ঞানেচ্ছাদিজনিত যে-সংস্কার তাহা বর্তমান জন্মে অভিব্যক্ত হয়; এই সংস্কারের নামই প্রকৃতি । পূর্বে বলা হইয়াছে যে, ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতির প্রেরণায়ই জীব কর্ম করে [৩|২৭-২৯] । বস্তুত, এই প্রাক্তন সংস্কারের মূলেও সেই ত্রিগুণ । পূর্বজন্মের ধর্মাধর্ম কর্মফলে গুণবিশেষের প্রাবল্য বা হ্রাস হইয়া স্বভাবের যে অবস্থা দাঁড়ায়, তাহাই প্রাচীন সংস্কার বা অভ্যাস । কাহারো মধ্যে সত্ত্বগুণের, কাহাতে রজোগুণের, কাহাতে তমোগুণের প্রাবল্য । আবার গুণত্রয়ের সংযোগে নানাবিধ মিশ্রগুণেরও উৎপত্তি হয়; যথা – সত্ত্ব-রজঃ, রজ-স্তমঃ ইত্যাদি । যখন যাহার মধ্যে যে গুণ প্রবল হয়, তখন তাহার মধ্যে সেই গুণের কার্য হইয়া থাকে । ইহাকেই স্বভাবজ কর্ম বলে । এ-স্থলে বলা হইতেছে, জীবের প্রবৃত্তি স্বভাবেরই অনুবর্তন করে, স্বভাবই বলবান, ইন্দ্রিয়ের নিগ্রহে বা শাস্ত্রাদির শাসনে কোন ফল হয় না ।
৩৪) তবে কি জীবের স্বাতন্ত্র্য নাই, তাহার আত্মোন্নতির উপায় নাই ?
আছে । ইন্দ্রিয়সমূহকে নিগ্রহ বা পীড়ন না করিয়া তাহাদিগকে বশীভূত করিতে হইবে । স্ব-স্ব বিষয়ে রাগদ্বেষ ইন্দ্রিয়ের স্বাভাবিক, কিন্তু জীবের রাগদ্বেষের বশে যাওয়া উচিত নয় । যিনি রাগদ্বেষ হইতে বিমুক্ত, তিনি ইন্দ্রিয়ের অধীন নন, ইন্দ্রিয়সমূহই তাঁহার অধীন হয় । এইরূপ আত্মবশীভূত ইন্দ্রিয়দ্বারা স্বকর্ম করিতে হইবে, স্বধর্ম পালন করিতে হইবে [২|৬৪] ।
৩৫) যুগধর্ম : সময়োপযোগী পরিবর্তন সাধনের জন্যই যুগধর্মের প্রবর্তন হয় এবং সনাতন ধর্মের বিশুদ্ধি রক্ষিত হয় । বিশদ : স্বধর্ম বলিতে কি বুঝায় ?
৩৭) ষড়রিপু : (i)কাম, (ii)ক্রোধ, (iii)লোভ, (iv)মোহ, (v)মদ, (vi)মাৎসর্য ।
কাম = যে-কোন রূপ ভোগবাসনা ।
ক্রোধ = বাসনা প্রতিহত হইলেই ক্রোধের উদ্রেক হয় ।
লোভ = মিষ্টরসাদি বা ধনাদির দিকে অতিমাত্রায় আকৃষ্ট হওয়া ।
মোহ = বিষয়-বাসনারূপ অজ্ঞান বা মায়া যা আত্মজ্ঞান আচ্ছন্ন করিয়া রাখে, উহার অতীত নিত্যবস্তুকে দেখিতে দেয় না ।
মদ = এই অজ্ঞানতার ফলে ‘আমি ধনী’, ‘আমি জ্ঞানী’ এইরূপ অহমিকা ।
মাৎসর্য = পরশ্রীকাতরতা; পরের উন্নতি-দর্শনে নিজের অহমিকার খণ্ডনের ফলে উপস্থিত চিত্তক্ষোভ ।
সুতরাং, ষড়রিপুগুলির ্মূল হইতেছে কাম, কামনা বা বাসনা । এইগুলি এক বস্তুরই বিভিন্ন বিকাশ, এক ভাবেরই বিভিন্ন বিভাব ।
৩৮) বিষয়-বাসনা থাকিতে আত্মজ্ঞানের উদয় হয় না । যেমন ধূম অপসারিত হইলে অগ্নি প্রকাশিত হয়, ধূলিমল অপসারিত হইলে দর্পণের স্বচ্ছতা প্রতিভাত হয়, প্রসবের দ্বারা জরায়ূ প্রসারিত হইলে ভ্রুণের প্রকাশ হয়, সেইরূপ বিষয়-বাসনা বিদূরিত হলে তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয় (সংসারের ক্ষয় হয়) ।
৪৩) আত্মস্বাতন্ত্র্য ও প্রকৃতির বশ্যতা :
জীব যখন ‘পাকা আমি’কে জানিতে পারে, তাঁহার প্রেরণা বুঝিতে পারে, তখন তাহার প্রকৃতির বশ্যতা থাকে না । ‘পাকা আমি’র জ্ঞানের দ্বারা ‘কাঁচা আমি’ দূরীভূত হন – ইহাকেই বলা হইতেছে – আত্মার দ্বারা আত্মাকে স্থির করা বা নিজেই নিজেকে স্থির করা । ইহারই নাম আত্ম-স্বাতন্ত্র্য ।
সংগ্রহঃ ০১। sanatandharmatattva.wordpress.com
০২। http://www.scsmathinternational.com
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।