• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

২৬ ডিসেম্বর ২০১৪

প্রথম অধ্যায়ঃ অর্জুন-বিষাদযোগ

................................ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়....................................

                             ✴ ✴ ✴ ✴ ✴ প্রথম অধ্যায়ঃ অর্জুনবিষাদ-যোগ ✴ ✴ ✴ ✴ ✴



ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ।
মামকাঃপান্ডুবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।১

অর্থ- ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়, পুণ্যক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধাভিলাশী আমার পুত্রগণ এবং পান্ডুপুত্রগণ সববেত হইয়া কি করিলেন?

আলোচনা: যুদ্ধারম্ভের পূর্বে ব্যাসদেব অন্ধরাজকে যুূ্দ্ধদর্শনার্থ দিব্যচুক্ষু প্রদান করিতে চাইলেন।ধৃতরাষ্ট্র্য তাহাতে অসম্মত হলে ব্যাসদেব রাজ-আমত্য সঞ্জয়কে বর প্রদান করেন।সেই বরপ্রভাবে তিনি দিব্যদৃষ্টি লাভ করিয়া যুদ্ধাদি-সন্দুর্শন ও উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের বাক্যাদি শ্রবণ ও মনোভাব সমস্ত পরিজ্ঞাতত হইয়া ধৃতরাষ্ট্রের নিকট বর্ণনা করিয়াছিলেন।

এখানে যুদ্ধের কথা হইতেছে, তাই আমাদের কাছে মনে হতে পারে প্রথম শ্লোকে "কুরুক্ষেত্রেও যুদ্ধক্ষেত্র" হওয়ার কথা কিন্তু শ্লোকে "কুরুক্ষেত্রেও যুদ্ধক্ষেত্র" স্থলে "ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে" লেখা হয়েছে।অর্থাৎ ধর্মক্ষেত্র-এই বিশেষণটি ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু কেন?
কুরুক্ষেত্র কে ধর্মক্ষেত্র নামে আখ্যায়িত করার পিছনে কতগুলো যুক্তিসংঙ্গত কারণ আছে।

👍 জাবাল উপনিষদে ও শতপথব্রাহ্মণে ইহাকে দেবযজন অর্থাৎ দেবতাদের 'যজ্ঞস্থান' বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।ইহার প্রাচীন নাম সমন্তপঞ্চক।

👍 দুর্যোধনাদির পূর্বপুরুষ বিখ্যাত কুরু রাজা এই স্থানে হল চালনা করে বর লাভ করিয়াছিলেন যে, যে ব্যক্তি এই স্থানে তপস্যা করিবে অথবা যুদ্ধে প্রাণ ত্যাগ করিবে,সে স্বর্গে গমন করিবে।

👍 বনপর্বের তীর্থযাত্রা পর্বাধ্যায়ে কুরুক্ষেত্রকে তিন লোকের মধ্যে শ্রেষ্ট তীর্থস্থান বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে।

👍 প্রাচীন গ্রন্থাদিতে সর্বত্রই কুরুক্ষেত্রকে ধর্মক্ষেত্র বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
সুতারাং আমরা এই থেকে বুঝতে পারি এই শ্লোকে কুরুক্ষেত্রের আগে কেন 'ধর্মক্ষেত্র' শব্দটি বসলো কিংবা কুরুক্ষেত্রকে কেন ধর্মক্ষেত্র বলা হয়।


সঞ্জয় উবাচ
দৃষ্ট্রা তু পান্ডবানীকং ব্যূঢ়ং দুর্যোধনস্তদা।
আচার্যমুপঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ।।২

অর্থ: সঞ্জয় কহিলেন,তখন রাজা দুর্যোধন পান্ডব-সৈন্যদিগকে ব্যূহাকারে সজ্জিত দেখিয়া দ্রোণাচার্য সমীপে যাইয়া এই কথা কহিলেন।

আলোচনা: আজকের আলোচনার অংশে, প্রান্তের কয়েকটি লাইন পড়ে বুঝতে পারবো যে, বাংলাদেশে আমরা সনাতন ধর্মালম্বীরা সংখ্যায় কম হলেও অর্থাৎ সংখ্যালগু হলেও আমরা সবাই যদি সর্বস্তরে ঐক্যবদ্ধ থাকি তাহলে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠরা আমাদের শক্তি ও আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বিরোধিতা করার সাহস পাবেনা। তাই দেখা যাক আজকের আলোচনার অংশবিশেষ।

ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন জন্মান্ধ। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি পারমার্থিক তত্ত্বদর্শন থেকেও বঞ্ছিত ছিলেন। তিনি ভাল ভাবেই জানতেন যে, ধর্মের ব্যাপারে তাঁর পাপিষ্ঠ পুত্রেরাও ছিল তাঁরই মতো অন্ধ এবং তিনি আরোও নিশ্চিত ছিলেন যে, তাঁর পাপিষ্ঠ পুত্রেরা পাণ্ডবদের সঙ্গে কোন রকম আপস-মীমাংসা করতে সক্ষম হবে বা, কারণ পাণ্ডবেরা সকলেই জন্ম থেকে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিলেন। তবুও তিনি ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের প্রভাব সম্বন্ধে সন্দিগ্ধ ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্বন্ধে ধৃতরাষ্ট্রের এই প্রশ্ন করার প্রকৃত উদ্দেশ্য সঞ্জয় বুঝতে পেরেছিলেন। তাই ধৃতরাষ্ট্র নৈরাশ্যগ্রস্থ রাজাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, এই পবিত্র ধর্মক্ষেত্রের প্রভাবের ফলে তাঁর সন্তানেরা পাণ্ডবদের সঙ্গে কোন রকম আপস-মীমাংসা করতে সক্ষম হবে না। সঞ্জয় তখনই ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন যে, তাঁর পুত্র দুর্যোধন পাণ্ডবদের মহৎ সৈন্যসজ্জা দর্শন করে, তার বিবরণ দিতে তৎক্ষনাৎ দুর্যোধন সেনাপতি দ্রোণাচার্যের কাছে উপস্থিত হলেন। দুর্যোধনকে যদিও রাজা বলা হয়েছে, তবুও সেই সঙ্কট ময় অবস্থায় তাঁকে তাঁর সেনাপতির কাছে উপস্থিত হতে দেখা যাচ্ছে।

এর থেকে আমরা বুঝতে পারি, চতুর রাজনীতিবিদ্‌ হবার সমস্ত গুনগুলি দুর্যোধনের মধ্যে বর্তমান ছিল। কিন্তু পাণ্ডবদের মহতী সৈন্যসজ্জা দেখে দুর্যোধনের মনে যে মহাভয়ের সঞ্চার হয়েছিল, যার ফলে তিনি তাঁর চতুরতার আবরণে ঢেকে রাখতে পারেননি।


পশ্যৈতাং পান্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম্।
ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা।।৩

অর্থঃ- গুরুদেব,আপনার ধীমান্ শিষ্য দ্রুপদপুত্র কর্তৃক ব্যূহবদ্ধ পান্ডবদিগের এই বিশাল সৈন্যদল দেখুন।

আলোচনাঃ- এখানে একটা বিষয় খেয়াল করবেন, " আপনার ধীমান্ শিষ্য" এ কথাটি দুর্যোধন শ্লেষাত্নক ভাবেই ব্যবহার করিয়াছেন।আবার 'ধৃষ্টদ্যুম্ন' না বলিয়া 'দ্রুপদপুত্র' বলিয়া দ্রোণাচার্যের পূর্বশত্রুতা স্মরণ করাইয়া দিতেছেন।পঞ্চপাণ্ডবের পত্নী দ্রৌপদীর পিতা দ্রুপদরাজের সঙ্গে দ্রোণাচার্যের কিছু রাজনৈতিক মনোমালিণ্য ছিল।এই মনোমালিন্যের ফলে দ্রুপদ এক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন, এবং সেই যজ্ঞের ফলে তিনি বর লাভ করেন যে,তিনি এক পুত্র লাভ করবেন,যে দ্রোণাচার্যকে হত্যা করতে সক্ষম হবে।দ্রোনাচার্য এই বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে অবগত ছিলেন,কিন্তু দ্রুপদ তাঁর সেই পুত্র ধৃষ্টদুম্নকে যখন অস্রশিক্ষার জন্য তাঁর কাছে প্রেরণ করেন,তখন উদার হৃদয় সত্যনিষ্ট ব্রাক্ষণ দ্রোণাচার্য তাঁকে সব রকমের অস্রশিক্ষা এবং সমস্ত সামরিক কলা-কৌশলের গুপ্ত তথ্য শিখিয়ে দিতে কোণও দ্বিধা করেনি।

এখন,কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ধৃষ্ট্যদ্যূম্ন পাণ্ডবদের পক্ষে যোগদান করেন এবং পাণ্ডবদের সৈন্যসজ্জা তিনিই পরিচালনা করেন, সেই শিক্ষা তিনি দ্রোণাচার্যের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। দ্রোণাচার্যের এই ত্রুটির কথা দুর্যোধন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলেন,যাতে তিনি পূর্ণ সতর্কতা ও অনমনীয় দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ করেন।দুর্যোধণ মহৎ ব্রাক্ষণ দ্রোণাচার্যকে এটিও মনে করিয়ে দিলেন যে, পাণ্ডবদের, বিশেষ করে অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তিনি যেন কোন কোমলতা প্রদর্শন না করেন,কারণ তাঁরাও সকলে তাঁর প্রিয় শিষ্য,বিশেষত অর্জুন ছিলেন সবচেয়ে প্রিয় ও মেধাবী শিষ্য।দুর্যোধন সতর্ক করে দিতে চেয়েছিলেন যে, এই ধরনের কোমলতা প্রকাশ পেলে যুদ্ধে অবধারিতভাবে পরাজয় হবে।



অত্র শূরা মহেষ্রাসা ভীমার্জুনসমা যুধি।
যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথ।।৪

ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশীরাজশ্চ বীর্যবান্।
পুরুজিৎ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ।।৫

যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান্।
সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ।।৬

অর্থঃ- সেই সমস্ত সেনাদের মধ্যে অনেকে ভীম ও অর্জুনের মতো বীর ধনুর্ধারী রয়েছেন এবং যুযুধান, বিরাট ও দ্রুপদের মতো মহাযোদ্ধা রয়েছেন। সেখানে ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, কাশিরাজ, পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ ও শৈব্যের মতো অত্যন্ত বলবান যোদ্ধারাও রয়েছেন। সেখানে রয়েছেন অত্যন্ত বলবান যুধামন্যু, প্রবল পরাক্রমশালী উত্তমৌজ, সুভদ্রার পুত্র এবং দ্রৌপদীর পুত্রগণ। এই সব যোদ্ধারা সকলেই এক-একজন মহারথী।

আলোচনাঃ- যদিও দ্রোণাচার্যের অসীম শোর্য, বীর্য ও সামরিক কলা-কৌশলের কাছে ধৃষ্টদ্যুম্ন ছিলেন এক অতি নগণ্য প্রতিবন্ধক এবং তাঁর ভয়ে ভীত হবার কোন কারণই ছিল না দ্রোণাচার্যের পক্ষে, কিন্তু ধৃষ্টদ্যুম্ন ছাড়াও পাণ্ডবপক্ষে অন্য অনেক রথী-মহারথী ছিলেন, যাঁরা সত্যিসত্যিই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দুর্যোধনের পক্ষে সেই যুদ্ধজয়ের পথে তাঁরা ছিলেন এক-একটি দুরতিক্রম্য প্রতিবন্ধকের মতো, কারণ তাঁরা ছিলেন ভীম ও অর্জুনের মতো ভয়ংকর। তাঁদের বীরত্বের কথা দুর্যোধন ভালভাবেই জানতেন, তাই তিনি অন্যান্য রথী-মহারথীদেরও ভীম ও অর্জুনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।


অস্মাকন্তু বিশিষ্টা যে তান্নিবোধ দ্বিজোত্তম।
নায়কা মম সৈন্যস্য সংজ্ঞার্থং তান্ ব্রবীমি তে।।৭

অর্থঃ- হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, আমার সনৈমধ্যেও যে সকল প্রধান সেনানায়ক আছেন, তাঁহাদিগকে অবগত হউন।আপনার সম্যক্ অবগতির জন্য তাঁহাদিগের নাম বলিতেছি।

ভবান্ ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ।
অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তির্জয়দ্রথঃ।।৮

অর্থঃ- আপনি নিজে,ভীষ্ম,কর্ণ,যুদ্ধজয়ী কৃপ,অশ্বত্থামা, বিকর্ণ, সোমদত্ত-পুত্র এবং জয়দ্রথঃ।

আলোচনাঃ- পাণ্ডব-পক্ষের রথী-মহারথীদের বর্ণনা করবার পর দুর্যোধন তার স্বপক্ষে যে সমস্ত বীরেরা যোগদান করেছেন তাঁদের বর্ণনা করেছে।

আট নং শ্লোকে 'সমিতিঞ্জয়ঃ' শব্দটি দ্বারা বুঝানো হয়েছে সমিতি বা সংগ্রাম জয় করে যে এক কথায় যুদ্ধজয়ী।

উক্ত শ্লোকে আমরা আরো দেখতে পায় যে, বিকর্ণ, অশ্বণ্থামা, সৌমদত্তি বা ভূরিশ্রবা,জয়দ্রথ এবং কর্ণের নাম উল্লেখ আছে যাদের সম্পর্কে আমরা অনেকে হয়তবা অবগত নই। যেমনঃ

👍 কৃপ-দ্রোণাচার্যের শ্যালক।যিনি কৌরবদিগের অস্রগুরু।

👍 বিকর্ণ- যিনি দুর্যোধনের অন্যতম কনিষ্ঠ ভ্রাতা।

👍 সোমদত্তি- বাহ্লীকের রাজা সোমদত্তের পুত্র বিখ্যাত সোমদত্তি বা ভূরিশ্রবা।

👍 জয়দ্রথ- সিন্ধুদেশের রাজা,দুর্যোধনের ভগিনীপতি।

👍 অশ্বণ্থামা- দ্রোণাচার্যের পুত্র।

👍 কর্ণ-যিনি ছিলেন অর্জুনের বৈপিত্রেয় ভ্রাতা,কেন না রাজা পাণ্ডুর সঙ্গে বিবাহ হবার আগে কুন্তীদেবীর কোলে তাঁর জন্ম হয়।



অন্যে চ বহবঃ শূরাঃ মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ।
নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধ-বিশারদাঃ।।৯

অর্থঃ- এছাড়া আরও বহু সেনানায়ক রয়েছেন, যাঁরা আমার জন্য তাঁদের জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত । তাঁরা সকলেই নানা প্রকার অস্রশস্রে সজ্জিত এবং তাঁরা সকলেই সামরিক বিজ্ঞানে বিশারদ ।

আলোচনাঃ- অন্য আর যে সমস্ত বীরেরা দুর্যোধনের পক্ষে ছিলেন, যেমন-জয়দ্রথ, কৃতবর্মা, শল্য আদি, এঁরা সকলেই দুর্যোধনের জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তাই দুর্যোধনের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এই সমস্ত বীরপুঙ্গবেরা স্বপক্ষে থাকায় তার জয় অনিবার্য । তবে ঊপাপিষ্ট দুর্যোধনের পক্ষ অবলম্বন করার ফলে, কুরুক্ষেত্রের রনাঙ্গনে এঁদের সকলেরই মৃত্যু অবধারিত ছিল যা আমরা পরবর্তী শ্লোকগুলো পাঠ করে বুঝতে পারবো।



অপর্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মাভিরক্ষিতম্।
পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিরক্ষিতম্।।১০

অর্থঃ- ভীষ্মকর্তৃক সম্যক্ রক্ষিত আমাদের সেনা অপরিমিত।আর ভীমকর্তৃক রক্ষিত পান্ডবদের সেনা পরিমিত(অপেক্ষাকৃত অল্প)।

আলোচনাঃ- এই শ্লোকে দুর্যোধন পাণ্ডব-পক্ষ ও কৌরব-পক্ষের সামরিক শক্তির তুলনা করেছে। পিতামহ বীরশ্রেষ্ঠ ভীষ্মদেবের রক্ষণাবেক্ষণাধীন অমিত শক্তিশালী এক সৈন্যবাহিনী ছিল দুর্যোধনের স্বপক্ষে। অপর পক্ষে, পাণ্ডবদের সৈন্যবাহিনী ছিল সীমিত এবং তার সেনাপতি ছিলেন ভীমেসেন, যারা শৌর্যবীর্য ও সৈন্য পরিচালনার ক্ষমতা পিতামহ ভীষ্মদেবের তুলনায় ছিল নিতান্তই নগণ্য।




অয়নেষু চ সর্বেষু যথাভাগমবস্থিতাঃ।
ভীষ্মমেবাভিরক্ষন্তু ভবন্তঃ সর্ব এব হি।।১১

অর্থ- আপনারা সককলেই স্ব স্ব বিভাগানুসারে সমস্ত বূহ্যদ্বারে অবস্থিত থাকিয়া ভীষ্মকেই সকল দিক হইতে রক্ষা করিতে থাকুন।

আলোচনা:একবার ভাবুন তো ভীষ্ম সমরে অপরাজেয়, তাঁহার জন্য দুর্যোধনের এত আশঙ্কা কেন এবং সকলে ভীষ্মকে রক্ষা করুন,এই কথা বলেন কেন?

👍দুর্যোধন পূর্বে স্পষ্টই বলিয়াছেন যে- 'ভীষ্ম একাই সসৈন্য পান্ডবগণকে বধ করিতে পারেন,কিন্তু তিনি শিখন্ডীকে বধ করিবেন না,সুতারাং সকলে সতর্ক হইয়া সর্ব দিক হইতে ভীষ্মকে রক্ষা করিবেন। কারণ ভীষ্মের মতো বিচক্ষণ ও দুর্ধর্ষ যোদ্ধা তার পক্ষের সেনাপতি থাকালে জয় তার হবেই, সে নিশ্চিতভাবে ধরে নিয়েছিল। আর তাই দুর্যোধনের প্রতিটি কথাতে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধজয় সম্বন্ধে তার মনে কোনই সংশয় ছিল না। ভীষ্মের শৌর্যবীর্যের প্রশংসা করার পরে, দুর্যোধন বিবেচনা করে দেখল, অন্যেরা মনে করতে পারে, তাঁদের শৌর্যবীর্যের গুরুত্ব লাগব করে হেয় করা হচ্ছে, তাই তার স্বভাবসুলব কূটনৈতিক চাতুরীর সাহায্য সেই পরস্থিতির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সে উপরোক্ত কথাগুলি বলেছিল এভাবে সে মনে করিয়ে দিল যে ভীষ্মদেব যত বড় যোদ্ধাই হন, তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন এবং সব দিক থেকে তাই ভীষ্মদেবকে তাঁদের রক্ষা করা উচিত। যুদ্ধ করতে করতে যদি তিনি কোনও একদিকে এগিয়ে যান, তা হলে শত্রুপক্ষ তার সুযোগ নিয়ে অন্য দিক থেকে আক্রমণ করতে পারে। তাই অন্য বীরপুঙ্গবেরা যাতে নিজ নিজ স্থানে অধিষ্ঠিত থেকে শক্রসৈন্যকে ব্যূহ ভেদ করতে না দেয়, তার গুরুত্ব সম্বদ্ধে দ্রোণাচার্যেকেও দুর্যোধন মনে করিয়ে দিয়েছিল।



তস্য সংজনয়ন্ হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ।
সিংহনাদং বিনদ্যােচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্।।১২

অর্থঃ- তখন প্রতাপশালী কুরুবৃদ্ধ পিতামহ(ভীষ্ম) দুর্যোধনের আনন্দ জন্মাইয়া উচ্চ সিংহনাদ করিয়া শঙ্খধ্বনি করিলেন।

আলোচনাঃ- এখানে হর্ষং দ্বারা আনন্দকে বুঝানো হয়েছে তবে কুরু-রাজবংশের পিতামহ(ভীষ্ম) দুর্যোধনের হৃদকম্প অনুভব করতে পেরে তাঁর স্বভাবসুলভ করুণার বশবর্তী হয়ে তাঁকে উৎসাহিত করবার জন্য সিংহনাদে তাঁর শঙ্খ বাজালেন। পরোক্ষভাবে, শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে তিনি তাঁর হতাশাচ্ছন্ন পৌত্র দুর্যোধনের জানিয়ে দিলেন যে, এই যুদ্ধে জয়লাভ করার কোন আশাই তাঁর নেই, কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন তাঁর বিপক্ষে। তবুও, ক্ষাত্রধর্ম অনুসারে জয়-পরাজয়ের কথা বিবেচনা না করে যুদ্ধ করাই তাঁর কর্তব্য এবং এই ব্যাপারে তিনি কোন রকম অবহেলা করবেন না। সেই কথা তিনি দুর্যোধনকে মনে করিয়ে দিলেন।

পরিশেষে উপরের আলোচনা থেকে আমরা এতটুকু হলেও বুঝা উচিত যে, আমাদের ধর্ম এবং আমাদের নৈতিকতা যা বলে তাই আমাদের করা দায়িত্ব ও কর্তব্য। নিজ জন্মদাতা পিতা মাতা বৃদ্ধ হলে আমরা তাদের কে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসি কারণ এই যুগের কিছু ডিজিটাল বৌরা এসব বৃদ্ধ মানুষ গুলির সাথে নাকি তাল মিলিয়ে বসবাস করতে পারবে না।আর এই ধরনের হীন মন মানসিকতা ও চিন্তা ভাবনাকে কিছু কুলাঙ্গার ছেলেরা সমর্থন করে তার জন্মদাতা পিতা মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে।ধর্মের মতে পিতা মাতা হলেন গুরুজন তাই ধর্ম এবং নৈতিকতার হিসবা অনুসারে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য আমাদের নিজ নিজ বাবা মাকে তাদের শেষ জীবন পর্যন্ত শ্রদ্ধা, ভক্তি ভালবাসা দিয়ে নিজের কাছে যত্নসহকারে রাখা। তাহলে আমরাই হতে পারবো আমাদের পিতা মাতার কাছে এক একটা আদর্শ সন্তান।



শ্রীগোপালকৃষ্ণায় নমঃ
।। ওঁ নমো ভগবতে বাসুুদেবায়।।

ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ।
সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোহভবৎ।।১৩

অর্থ- তখন শঙ্খ,ভেরী,পণব,আনক,গোমুখ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র সহসা বাদিত হইলে সে শব্দ তুমুল হইয়া উঠিল।১৩

ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্তিতৌ।
মাধবঃ পান্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ।।১৪

অর্থ- অনন্তর শ্বেতাশ্বযুক্ত(শ্বেতবর্ণ অশ্বযুক্ত) মহারথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন দিব্য-শঙ্খ-ধ্বনি করিলেন।

আলোচনাঃ- এখানে ভীষ্মদেবের শঙ্খের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য দেখিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের শঙ্খকে ‘দিব্য’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই দিব্য শঙ্খধ্বনি ঘোষণা করল যে, কুরুপক্ষের যুদ্ধজয়ের কোন আশাই নেই, কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবপক্ষে যোগদান করেছেন। জয়স্তু পাণ্ডপুত্রাণাং যেষাং পক্ষে জনার্দনঃ । পাণ্ডবদের জয় অবধারিত, কারণ জনার্দন শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের পক্ষে যোগ দিয়েছেন। ভগবান যে পক্ষে যোগদান করেন, সৌভাগ্য-লক্ষ্মীও সেই পক্ষেই থাকেন, কারণ সৌভাগ্য-লক্ষ্মী সর্বদাই তাঁর পতির অনুগামী। তাই বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের দিব্য শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে ঘোষিত হল যে, অর্জুনের জন্য বিজয় ও সৌভাগ্য প্রতীক্ষা করছে। তা ছাড়া, যে রথে চড়ে দুই বন্ধু শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তা অগ্নিদেব অর্জুনকে দান করেছিলেন এবং সেই দিব্য রথ ছিল সমগ্র ত্রিভুবনে সর্বত্রই অপরাজেয়।

১৩নং শ্লোকে কিছু বিশেষ শব্দও ব্যবহার হয়েছে যেগুলোর সম্পর্কে আমারা অনেকেই অবগত না।যেমন:
১)পণব=মৃদঙ্গ ;
২)আনক=ঢাক ;
৩)গোমুখ=রণশঙ্খ।
আরেকটি বিশেষ কথা হলো সেকালে বিউগল্( bugle) হিসাবে বর্তমান শঙ্খ ছিল।






পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ।
পৌন্ড্রং দধ্মৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদর্র।।১৫

অর্থ- তখন, শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চজন্য নামক তাঁর শঙ্খ বাজালেন, অর্জুন বাজালেন, তাঁর দেবদত্ত নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভোজনপ্রিয় ও ভীমকর্মা ভীমসেন বাজালেন পৌণ্ড্র নামক তাঁর ভয়ংকর শঙ্খ।

আলোচনাঃএই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ অর্জুন এবং ভীমকে একটা বিশেষ নামে অখ্যায়িত করা হয়েছে।

👍 হৃষীকেশঃ আমরা জানি যে শ্রীকৃষ্ণের শত নাম রয়েছে, যেখানে প্রায় প্রত্যেকটি নামের পিছনে ভিন্ন ভিন্ন কার্যকলাপের উপর ভিত্তি করে এক একটি ব্যাখ্যা রয়েছে।যেমন: মধু নামক দানবকে সংহার করার জন্য তাঁর নাম মধুসূদন; গাভী ও ইন্দ্রিয়গুলিকে আনন্দ দান করেন বলে তাঁর নাম গোবিন্দ ; বসুদেবের পুত্ররূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম বাসুদেব; দেবকীর সন্তানরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম দেবকীনন্দন; বৃন্দাবনে যশোদার সন্তানরূপে তিনি তাঁর বাল্যলীলা প্রদর্শন করেন বলে তাঁর নাম যশোদানন্দন এবং সখা অর্জুনের রথের সারথি হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম পার্থসারথি। একই ভাবে শ্রীকৃষ্ণকে এই শ্লোক হৃষীকেশ বলা হয়েছে, যেহেতু তিনি হচ্ছেন সমস্ত হৃষীক বা ইন্দ্রিয়ের ঈশ্বর। জীবেরা হচ্ছে তাঁর অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই জীবদের ইন্দ্রিয়গুলিও হচ্ছে তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই রকম, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে দিব্য নিজেই পরিচালনা করেছিলেন বলে তাঁর নাম হৃষীকেশ।

👍 ধনঞ্জয়ঃ এখানে অর্জুনকে ধনঞ্জয় বলে অভিহিত করা হয়েছে, কারণ বিভিন্ন যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান করার জন্য তিনি যুধিষ্ঠিরকে ধন সংগ্রহ করতে সাহায্য করতেন।

👍 বৃকোদরঃ তেমনি ভীমকে এখানে বৃকোদর বলা হয়েছে, কারণ যেমন তিনি হিড়িম্ব আদি দানবকে বধ করার মতো দুঃসাধ্য কাজ সাধন করতে পারতেন, তেমনই তিনি প্রচুর পরিমাণে আহার করতে পারতেন।

সুতরাং পাণ্ডবপক্ষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ বিভিন্ন ব্যক্তিরা যখন তাঁদের বিশেষ ধরনের শঙ্খ বাজালেন, সেই


অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠরঃ ।
নকুলঃ সহদেবশ্চ সুঘোষমণিপুষ্পকৌ ।। ১৬ ।।
কাশ্যশ্চ পরমেষ্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ ।
ধৃষ্ঠদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্যকিশ্চাপরাজিতঃ ।। ১৭ ।।
দ্রুপদো দ্রুপদেয়াশ্চ সর্বশঃ পৃথিবীপতে ।
সৌভদ্রশ্চ মহাবাহুঃ শঙ্খান্ দধ্মুঃ পৃথক্ পৃথক্ ।। ১৮ ।।

অর্থ- কুন্তীপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠর অনন্তবিজয় নামক শঙ্খ বাজালেন এবং নকুল ও সহদেব বাজালেন সুঘোষ ও মনিপুস্পক নামক শঙ্খ। হে মহারাজ! তখন মহান ধনুর্ধর কাশীরাজ, প্রবল যোদ্ধা শিখণ্ডী, ধৃষ্ঠদ্যুম্ন, বিরাট, অপরাজিত সাত্যকি, দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্রগণ, সুভদ্রার মহা বলবান পুত্র এবং সকলে তাঁদের নিজ নিজ শঙ্খ বাজালেন।

আলোচনঃ- তবে একটা কথা পূর্বে বলে রাখি যা আমরা পরবর্তী শ্লোকগুলোর আলোচনার মাধ্যমে বিশদভাবে জানতে পারবো, এখানে সঞ্জয় সুকৌশলে ধৃতরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিলেন যে, পাণ্ডুপুত্রদের প্রতারণা করে তাঁর নিজের ছেলেদের সিংহাসনে বসাবার দুরভিসন্ধি করাটা তাঁর পক্ষে মোটেই প্রশংসনীয় কাজ হয়নি। চারিদিক থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে, কুরুবংশে সমূলে বিনাশ হবে এবং পিতামহ ভীষ্ম থেকে শুরু করে অভিমন্যু আদি পৌত্ররা সকলেই যুদ্ধে নিহত হবেন। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে উপস্থিত রাজা-মহারাজা ও রথী-মহারথীরা সকলেই নিহত হবেন। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিলেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র স্বয়ং, কারণ তাঁর পুত্রদের দুষ্কর্মে তিনি কখনও কোন রকম বাধা দেননি, উপরন্তু তাঁদের সব রকম দুষ্কর্মে তিনি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।




স ঘোষো ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ ।
নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলোহভ্যনুনাদয়ন্ ।। ১৯

অর্থ- সেই তুমুল শব্দ আকাশ ও পৃথিবীতে প্রতিধ্বনিত হইয়া ধৃতরাষ্ট্র-পুত্রগণ ও তৎপক্ষীয়গণের হৃদয় বির্দীর্ণ করিল।

আলোচনাঃ- ভীষ্মদেব আদি কৌরব-পক্ষের বীরেরা যখন শঙ্খ বাজিয়েছিলেন, তখন পাণ্ডবদের বুক ভয়ে কেঁপে ওঠেনি। কিন্তু এই শ্লোকে আমারা দেখছি যে, পাণ্ডবদের শঙ্খনাদে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় ভয়ে বিদীর্ণ হল। পাণ্ডবদের মনে কোন ভয় ছিল না, কারণ তাঁরা ছিলেন সদাচারী এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত। ভগবানের কাছে যিনি আত্মসর্মপণ করেন, তাঁর মনে কোন ভয় থাকে না, চরম বিপদেও তিনি থাকেন অবিচলিত।



অথ ব্যবস্থিতান্ দৃষ্ট্বা ধার্তরাষ্ট্রান্ কপিধ্বজঃ ।
প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুরুদ্যম্য পাণ্ডবঃ ।
হৃষীকেশং তদা বাক্যমিদমাহ মহীপতে ।। ২০ ।।

অর্থ- সেই সময় পাণ্ডুপুত্র অর্জুন হনুমান চিহ্নিত পতাকা শোভিত রথে অধিষ্ঠিত হয়ে, তাঁর ধনুক তুলে নিয়ে শর নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হলেন। হে মহারাজ! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সমরসজ্জায় বিন্যস্ত দেখে, অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণকে এই কথাগুলি বললেন।

আলোচনাঃ- কুরুেক্ষেত্রে যুদ্ধের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই, পাণ্ডবদের অপ্রত্যাশিত সৈন্যসজ্জা দেখে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদকম্প শুরু হয়ে গেছে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে উপস্থিত থেকে পাণ্ডবদের পরিচালিত করেছিলেন, তাই কৌরবদের এই হৃদকম্প হওয়াটা স্বাভাবিক। অর্জুনের রথে হনুমান অঙ্কিত ধ্বজাও একটি বিজয়সূচক ইঙ্গিত, কারণ রাম-রাবণের যুদ্ধে হনুমান শ্রীরামচন্দ্রকে সহযোগিতা করেছিলেন এবং শ্রীরামচন্দ্র বিজয়ী হয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধও অর্জুনকে সাহায্য করবার জন্য তাঁর রথে শ্রীরামচন্দ্র ও হনুমান দুজনকেই উপস্থিত থাকতে দেখতে পাই। শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন শ্রীরামচন্দ্র এবং যেখানে শ্রীরামচন্দ্র, সেখানেই তাঁর নিত্য সেবক ভক্ত-হনুমান এবং নিত্য সঙ্গিনী সীতা লক্ষ্মীদেবী উপস্থিত থাকেন। তাই, অর্জুনের কোন শত্রুর ভয়েই ভীত হবার কারণ ছিল না, আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পরিচালিত করবার জন্য স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। এভাবে, যুদ্ধজয়ের সমস্ত শুভ পরামর্শ অর্জুন পাচ্ছিলেন। তাঁর নিত্যকালের ভক্তের জন্য ভগবানের দ্বারা আয়োজিত এই রকম শুভ পরিস্থিতে সুনিশ্চিত জয়েরই ইঙ্গিত বহন করে।






অর্জুন উবাচ -সেনয়োরুরভয়োরমধ্যে রথং স্থাপয় মেঅচ্যুত । যাবদেতান্নিরীক্ষেহহং যোদ্ধুকামানবস্থিতান।। ২১ ।।
কৈরময়া সহ যোদ্ধব্যমস্মিন রণসমুদ্যমে ।। ২২ ।।

অর্থ- অর্জুন বললেন- হে অচ্যুত ! তুমি উভয় পক্ষের সৈন্যদলের মাঝখানে আমার রথ স্থাপন কর, যাতে আমি দেখতে পারি যুদ্ধ করার অভিলাষী হয়ে কারা এখানে এসেছে এবং এই মহা সংগ্রামে আমাকে কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।





যোতস্যমানানবেক্ষেহহং য এতেহত্র সমাগতাঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্বুদ্ধেরযুদ্ধে প্রিয়চিকিরষবঃ ।। ২৩।।

অর্থ- ধৃতরাষ্ট্রের দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন পুত্রকে সন্তুষ্ট করার বাসনা করে এখানে যুদ্ধ করতে যারা এসেছে তাদেরকে আমি দেখতে চাই ।

আলোচনাঃ এই কথা সকলেরই জানা ছিল যে, দুর্যোধন তার পিতা ধৃতরাষ্ট্রের সহযোগিতায় অন্যায়ভাবে পাণ্ডবদের রাজ্যত্ব আত্মসাৎ করতে চেষ্টা করেছিল । তাই যারা দুর্যোধনের পক্ষে যোগ দিয়েছিল, তারা সকলেই ছিল "এক গোয়ালের গরু ।" যুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জুন দেখে নিতে চেয়েছিলেন তারা কারা । কৌরবদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করার সবরকম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার ফলেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আয়োজন করা হয়, তাই সেই যুদ্ধক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার কোন বাসনা অর্জুনের ছিল না । অর্জুন যদিও স্থির নিশ্চিতভাবে জানতেন যে, জয় তাঁর হবেই কারণ, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পাশেই বসে আছেন, কিন্তু তবুও যুদ্ধের প্রারম্ভে তিনি শত্রুপক্ষের সৈন্যবল কতটা তা দেখে নিতে চেয়েছিলেন।





সঞ্জয় উবাচ-

এবমুক্তো হৃষীকেশো গুড়াকেশেন ভারত।

সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথোত্তমম্ম।।২৪।।

অর্থ- সঞ্জয় বললেন- হে ভরত-বংশধর! অর্জুন কর্তৃক এভাবে আদিষ্ট হয়ে, শ্রীকৃষ্ণ সেই অতি উত্তম রথটি চালিয়ে নিয়ে উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রাখলেন।

আলোচনাঃ- ২৪নং শ্লোকে ভারত , হৃষীকেশ, গুড়াকেশ শব্দগুলো উল্লেখ আছে।চলুন দেখি এই শব্দগুলো সম্পর্কে গীতায় কি ব্যাখ্যা আছে।

১)ভারত- এখানে ভারতে বলতে ধৃতরাষ্ট্রকে বুঝানো হয়ছে।তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে ,ভারত দ্বারা অন্যত্র অর্জুনকেও উল্লেখ করা হয়েছে।কারণ ইঁহারা উভয়েই দুষ্মন্ত রাজার পুত্র ভরতের বংশধর।তাই ইঁহাদেরকে বিশেষ বিশেষ জায়গায় ভারত বলেও সম্বোধন করা হয়।

২)গুড়াকেশ- এই শ্লোকে অর্জুনকে গুড়াকেশ বলে অভিহিত করা হয়েছে। গুড়াকা মানে হচ্ছে নিদ্রা এবং যিনি নিদ্রা জয় করেছেন, তাকে বলা হয় গুড়াকেশ। নিদ্রা অর্থে অজ্ঞানতাকেও বোঝায়। অতএব শ্রীকৃষ্ণের বন্ধুত্ব লাভ করার ফলে অর্জুন নিদ্রা ও অজ্ঞানতা উভয়কেই জয় করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্ত অর্জুন এক মুহূর্তের জন্যও শ্রীকৃষ্ণকে বিস্মৃত হতেন না, কারণ এটিই হচ্ছে ভক্তের লক্ষণ। শয়নে অথবা জাগরণে ভক্ত ভগবানের নাম, রূপ, গুন ও লীলা স্মরণে কখনও বিরত হন না। এভাবেই কৃষ্ণভক্ত সর্বদাই কৃষ্ণচিন্তায় মগ্ন থেকে নিদ্রা ও অজ্ঞানতা জয় করতে পারেন। একেই বলা হয় কৃষ্ণভাবনা বা সমাধি।

৩)হৃষীকেশ- হৃষীক ইন্দ্রিয় , তাহার ঈশ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গণের প্রভু শ্রীকৃষ্ণ।এই জন্য শ্রীকৃষ্ণের শতনামের এক নাম হৃষীকেশ।





ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ সর্বেষাম চ মহিক্ষীতাম ।
উবাচ পার্থ পশ্যৈইতান সমবেতান কুরূনীতি ।।

অর্থ- ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখ অন্যান্য নৃপতিদের সামনে ভগবান হৃষীকেশ বললেন, হে পার্থ ! এখানে সমবেত সমস্ত কৌরবদের দেখ ।

আলোচনাঃ- সর্বজীবের পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ জানতেন অর্জুনের মনে কি হচ্ছিল । এই প্রসঙ্গে তাঁকে হৃষীকেশ বলার মধ্যদিয়ে বোঝানো হচ্ছে তিনি সবই জানতেন, তিনি সর্বজ্ঞ । এখানে অর্জুনকে পার্থ, অর্থাৎ পৃথা বা কুন্তীপুত্র বলে অভিহিত করাটাও তাৎপর্যপূর্ণ । বন্ধু হিসেবে তিনি অর্জুনকে জানাতে চেয়েছিলেন যে, যেহেতু অর্জুন হচ্ছেন তাঁর পিতা বসুদেবের ভগ্নী পৃথার পুত্র, তাই তিনি তাঁর রথের সারথী হতে সম্মত হয়েছেন । এখন যখন শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “দেখ পার্থ, সমবেত ধার্তরাষ্ট্রগণ” তখন তিনি কি অর্থ করেছিলেন? সেজন্যই কি অর্জুন সেখানে দাড়িয়ে পড়ে, যুদ্ধ করতে অসম্মত হননি? পিতামহ ভীষ্ম, পিতৃতুল্য আচার্য দ্রোণ এঁদের দেখে কি তাঁর হৃদয় আর্দ্র হয়ে উঠেনি? কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পিতৃস্বসা কুন্তীর পুত্র অর্জুনের কাছ থেকে এমন আচরন কখনই আশা করেননি । অর্জুনের মনের ভাব বুঝতে পেরে পরিহাসছলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভবিষ্যৎ-বাণী করলেন ।




তত্রাপশ্যৎ স্থিতান পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান ।

আচার্যাম্নাতুলান ভ্রাতৃন পুত্রান পৌত্রান সখীংস্তথা ।।

শ্বশুরান সুহৃদশ্চৈব সেনয়োরুরভয়োরপি ।। ২৬।।

অর্থ- তখন অর্জুন উভয় দলের সেনাদলের মধ্যে পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শ্বশুর, মিত্র ও শুভাকাঙ্খীদের উপস্থিত দেখতে পেলেন ।

আলোচনাঃ– যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন সমস্ত আত্মীয়স্বজনদের দেখতে পেলেন । তিনি ভূরিশ্রবা আদি সমস্ত পিতৃবন্ধুদের দেখলেন; ভীষ্মদেব, সোমদেব আদি পিতামহদের দেখলেন; দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য আদি শিক্ষাগুরুদের দেখলেন; শল্য, শকুনি আদি মাতুলদের দেখলেন; দুর্যোধন আদি ভাইদের দেখলেন; পুত্রতুল্য লক্ষ্মণকে দেখলেন; অশ্বত্থামার মত বন্ধুদের দেখলেন; কৃতবর্মার মত শুভাকাঙ্খীদের দেখলেন । এভাবে শত্রুপক্ষের সেনাদের মধ্যে তিনি শুধুমাত্র আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদেরই দেখলেন ।





তান সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান বন্ধুনবস্থিতান ।

কৃপয়া পরয়াবিস্টো বিষিদন্নীদমব্রবৎ ।। ২৭ ।।

অর্থ- যখন কুন্তীপুত্র অর্জুন সকল রকমের বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনদের যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থিত দেখলেন, তখন তিনি অত্যন্ত বিষণ্ণ ও কৃপাবিস্ট হয়ে বললেন ।

অর্জুন উবাচ দৃষ্টেমং স্বজনং কৃষ্ণ যুযুৎসুং সমুপস্থিতং । সীদন্তি মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুস্যতি ।। ২৮ ।।

অর্থ- অর্জুন বললেন- হে প্রিয়বর কৃষ্ণ! আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের এমনভাবে যুদ্ধাভিলাষী হয়ে আমার সামনে অবস্থান করতে দেখে আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হচ্ছে এবং মুখ শুষ্ক হয়ে উঠছে ।

আলোচনাঃ- শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে – যস্যাস্তি ভক্তিরভগবত্যকিঞ্চনা সর্বইরগুনৈস্তত্র সমাসতে সুরাঃ । হরাভক্তস্য কুতো মহদগুণা মনোরথেনাসতি ধাবতো বহিঃ।।

“ভগবানের প্রতি যার অবিচলিত ভক্তি আছে, তিনি দেবতাদের সবকয়টি মহৎ গুণের দ্বারা ভূষিত । কিন্তু যে ভগবৎভক্ত নয়, তার যে সব গুণ তা সবই জাগতিক, এবং সেগুলোর কোন মূল্য নেই । কারণ, সে মনধর্মের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং সে অবধারিতভাবেই চোখ ধাঁধান জাগতিক শক্তির দ্বারা আকর্ষিত হয়ে পড়ে। "(ভাগবত ৫/১৮/১২)।

অর্থাৎ এই থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, যিনি প্রকৃত ভগবৎ ভক্ত তাঁর মধ্যে সদগুণগুলিই বর্তমান থাকে, যা সাধারণত দেবতা এবং দৈবীভাবাপন্ন মানুষদের মধ্যে কেবল দেখা যায়। পক্ষান্তরে যারা অভক্ত, ভগবৎ-বিমুখ তারা জাগতিক শিক্ষা সংস্কৃতির মাপকাঠিতে যতই উন্নত বলে প্রতীত হোক, তাদের মধ্যে এইসব দৈবী গুণগুলোর প্রকাশ একদমই দেখা যায় না । সেই কারণেই, যে সমস্ত হীন ভাবাপন্ন আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবেরা অর্জুনকে সবরকম দুঃখের মধ্যে ফেলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি, যারা তাঁকে তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টায় এই যুদ্ধের আয়োজন করেছিল তাদেরই দেখে অর্জুনের অন্তরাত্মা কেঁদে উঠেছিল । তাঁর স্বপক্ষের সৈন্যদের প্রতি অর্জুনের সহানুভূতি ছিল অতি গভীর কিন্তু এমনকি যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে শত্রুপক্ষের সৈন্যদের দেখে এবং আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে অর্জুন শোকাতুর হয়ে পড়েছিলেন । সেই গভীর শোকে তাঁর শরীর কাঁপছিল, মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল । কুরুপক্ষের এই যুদ্ধলালসা তাঁকে আশ্চর্যান্বিত করেছিল । বাস্তবিকপক্ষে সমস্ত শ্রেণীর লোকেরা এবং অর্জুনের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনরা তাঁর সাথে যুদ্ধ করতে এসেছিল । তিনি বুঝতে পারছিলেন না কেন তাঁর আত্মীয়স্বজনরা তাঁর সাথে যুদ্ধ করতে সমবেত হয়েছিল । তাদের এই নিষ্ঠুর মনোভাব অর্জুনের মত দয়ালু ভগবৎ-ভক্তকে অভিভূত করেছিল । এখানে যদিও উল্লেখ করা হয়নি তবুও আমাদের অনুমান করতে কষ্ট হয়না যে, অর্জুনের শরীর কেবল শুষ্ক ও কম্পিতই হয়নি, সেই সঙ্গে অনুকম্পা ও সহানুভূতিতে তাঁর চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল পড়ছিল । অর্জুনের এই ধরনের আচরণ তাঁর দুর্বলতার প্রকাশ নয়, এ হচ্ছে তাঁর হৃদয়ের কোমলতার প্রকাশ । ভগবানের ভক্ত করুণার সিন্ধু, অপরের দুঃখে তাঁর অন্তর কাঁদে । তাই শুদ্ধ ভগবৎ-ভক্ত অর্জুন বীরশ্রেষ্ঠ হলেও তাঁর অন্তরের কোমলতার পরিচয় আমরা এখানে পাই ।




বেপথুশ্চ শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে।
গাণ্ডীবং সংস্রতে হস্তাৎ ত্বক চৈব পরিদহ্যতে ।। ২৯ ।।

অর্থ- আমার সর্বশরীর কম্পিত ও রোমাঞ্চিত হচ্ছে, আমার হাত থেকে গাণ্ডীব খসে পড়ছে এবং ত্বক যেন জ্বলে যাচ্ছে।

আলোচনাঃ- শরীরে কম্পন হওয়ার দুটি কারণ আছে এবং রোমাঞ্চিত হওয়ারও দুটি কারণ আছে । তার একটি হচ্ছে চিন্ময় আনন্দের অনুভূতি এবং অন্যটি হচ্ছে প্রচণ্ড জড়-জাগতিক ভয় । অপ্রাকৃত অনুভূতি হলে কোন ভয় থাকেনা । অর্জুনের এই কম্পন ও রোমাঞ্চ অপ্রাকৃত আনন্দের জন্য নয়, পক্ষান্তরে জড় জগতের ভয়ের জন্য । এই ভয়ের উদ্রেক হয়েছিল তাঁর আত্মীয় স্বজনদের প্রাণহানির আশঙ্কার ফলে । তাঁর অন্যান্য লক্ষণ দেখেও আমরা তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি । অর্জুন এতই অস্থির হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর হাত থেকে গাণ্ডীব ধনু খসে পড়েছিল এবং প্রচণ্ড দুঃখে তাঁর হৃদয় দগ্ধ হবার ফলে তাঁর ত্বক জ্বলে যাচ্ছিল । এই সমস্ত কিছুরই মূল কারণ হচ্ছে ভয় । অর্জুন এই মনে করে ভীষণ ভীত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর সমস্ত আত্মীয়-স্বজন সেই যুদ্ধে হত হবে, এবং এই যে হারাবার ভয়, তারই বাহ্যিক প্রকাশ হচ্ছিল তাঁর দেহের কম্পন, রোমাঞ্চ, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, গা জ্বালা করা আদির মাধ্যমে । গভীরভাবে বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাই, অর্জুনের এই ভয়ের কারণ হচ্ছে, তিনি তাঁর এই দেহটাকেই তাঁর স্বরূপ বলে মনে করেছিলেন এবং তাঁর দেহের সম্বন্ধে যারা আত্মীয়, তাদের হারাবার শোকে তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন ।








চ শকনোম্যবস্থাতুং ভ্রমতীব চ মে মনঃ ।

নিমিত্তানি চ পশ্যামি বিপরিতানি কেশব ।। ৩০ ।।

অর্থ- হে কেশব! আমি আর স্থির থাকতে পারছি না । আমি আত্মবিস্মৃত হচ্ছি এবং আমার চিত্ত উদভ্রান্ত হচ্ছে । হে কেশী দানবহন্তা শ্রীকৃষ্ণ! আমি কেবল অমঙ্গলসূচক চিহ্নসমূহ দর্শন করছি ।

আলোচনাঃ-আমরা এখানে দেখতে পাই যে, অর্জুন অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, তাই তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে থাকতে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর মন এতই বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল যে, তিনি আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়েছিলেন । জড় জগতের প্রতি অত্যধিক আসক্তি মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে । ভয়ং দ্বিতীয়াভিনিবেশতঃ স্যাৎ(ভাগবত ১১/২/৩৭) – এই ধরনের ভীতি ও আত্মবিস্মৃতি তখনই দেখা দেয়, যখন মানুষ জড়া প্রকৃতির দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ে । অর্জুন অনুভব করেছিলেন যে, ঐ যুদ্ধের পরিণতি হচ্ছে কেবল স্বজন হত্যা এবং এইভাবে শত্রুনাশ করে যুদ্ধে জয়লাভ করে তিনি কোন সুখই পাবেন না । এখানে, “নিমিত্তানি বিপরিতানি” কথাগুলো তাৎপর্যপূর্ণ । মানুষ যখন নৈরাশ্য ও হতাশা সম্মুখীন হয় তখন মনে করে, “আমার বেঁচে থেকে লাভ কি?” সকলেই কেবল তার নিজের সুখ সুবিধা নিয়ে চিন্তা করে । ভগবানের বিষয়ে কেউ মাথা ঘামায় না । শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাতেই অর্জুন তাঁর প্রকৃত স্বার্থ বিষয়ে অজ্ঞতা প্রদর্শন করেছেন । মানুষের প্রকৃত স্বার্থ নিহিত রয়েছে বিষ্ণু অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণেরই মাঝে । মায়াবদ্ধ জীবেরা একথা ভুলে গেছে, তাই তারা নানাভাবে কষ্ট পায় । এই দেহাত্মবুদ্ধির প্রভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার ফলে অর্জুন মনে করেছিলেন, তাঁর পক্ষে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয় করাটা হবে গভীর মর্মবেদনার কারণ ।





ন চ শ্রেয়োহনুপশ্যামি হত্বা স্বজনমাহবে ।

ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ ।। ৩১।।

অর্থ- হে কৃষ্ণ ! যুদ্ধে আত্মীয়-স্বজনদের নিধন করা শ্রেয়স্কর দেখছি না । আমি যুদ্ধে জয়লাভ চাই না, রাজ্য এবং সুখভোগও কামনা করিনা ।

আলোচনাঃ- মায়াবদ্ধ মানুষ বুঝতে পারেনা, তার প্রকৃত স্বার্থ নিহিত রয়েছে বিষ্ণু বা কৃষ্ণের সেবার মধ্যে । এই কথা বুঝতে না পেরে তারা তাদের দেহজাত আত্মীয়-স্বজনদের দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে তাদের সাহচর্যে সুখী হতে চায় । জীবনের এই প্রকার অন্ধ ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা এমনকি জাগতিক সুখের কারণগুলিও ভুলে যায় । এখানে অর্জুনের আচরনে আমরা দেখতে পাই তিনি তার ক্ষাত্রধর্মও ভুলে গেছেন । শাস্ত্রে বলা হয়েছে, দুই ধরনের মানুষ দিব্য আলোকে উদ্ভাসিত সূর্যলোকে উত্তীর্ণ হন । তাঁরা হচ্ছেন – (১) শ্রীকৃষ্ণের আজ্ঞা অনুসারে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে যিনি রণভূমিতে প্রাণত্যাগ করেন এবং (২) যে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী অধ্যাত্ম-চিন্তায় গভীরভাবে অনুরক্ত, তিনি । অর্জুনের অন্তঃকরণ এমন যে তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করা দূরের কথা, তিনি তাঁর শত্রুদের পর্যন্ত হত্যা করতে নারাজ ছিলেন । তিনি মনে করেছিলেন যে, তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করে তিনি সুখী হতে পারবেন না । যার ক্ষুধা নেই সে যেমন রান্না করতে চায় না, তেমনি অর্জুনও যুদ্ধ করতে নারাজ ছিলেন । পক্ষান্তরে তিনি স্থির করেছিলেন, অরণ্যের নির্জনতায় নৈরাশ্য-পীড়িত জীবন অতিবাহিত করবেন । অর্জুন ছিলেন ক্ষত্রিয়, এই ধর্ম পালন করার জন্য তাঁর রাজত্বের প্রয়োজন ছিল । কিন্তু ন্যায়সঙ্গতভাবে পাওয়া সেই রাজত্ব থেকে দুর্যোধন আদি কৌরবেরা তাঁকে বঞ্চিত করার ফলে সেই রাজ্যে তাঁর অধিকার পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার জন্য কৌরবদের সাথে তাঁর যুদ্ধ করা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল । কিন্তু যুদ্ধে এসে যখন তিনি দেখলেন যে, তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করে সেই রাজ্যে তাঁর অধিকার পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তখন তিনি গভীর দুঃখ ও নৈরাশ্যে ঠিক করলেন যে, তিনি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে বনবাসী হবেন ।




কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা

যেষামর্থে কাঙ্ক্ষিতং নো রাজ্যং ভোগাঃ সুখানি চ। ৩২।
ত ইমেঽবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্ত্বা ধনানি চ

আচার্যাঃ পিতরঃ পুত্রাস্তথৈব চ পিতামহাঃ |।৩৩।।
মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্রাঃ শ্যালাঃ সম্বন্ধিনস্তথা

এতান্ন হন্তুমিচ্ছামি ঘ্নতোঽপি মধুসূদন ||৩৪||
অপি ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য হেতোঃ কিং নু মহীকৃতে

নিহত্য ধার্তরাষ্ট্রান্নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্জনার্দন||৩৫||

অর্থ- হে গোবিন্দ! আমাদের রাজ্যে কি প্রয়োজন, আর সুখভোগ বা জীবন ধারণেই বা কি প্রয়োজন, যখন দেখছি- যাদের জন্য রাজ্য বা সুখভোগের কামনা তারা সকলেই আজ এই যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত? হে মধুসূদন! যখন আচার্য, পিতৃব্য, পুত্র, পিতামহ, মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক ও আত্মীয়-স্বজন সকলেই প্রাণ ও ধনাদির কথা ত্যাগ করে আমার সামনে যুদ্ধ করতে উপস্থিত হয়েছেন, তখন তারা আমাকে বধ করতে চাইলেও আমি তাদেরকে হত্যা করব কেন? হে সমস্ত জীবের প্রতিপালক জনার্দন! পৃথিবীর তো কথাই নেই, এমনকি সমগ্র ত্রিভুবনের বিনিময়েও আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নই । ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করে কি সন্তোষ আমরা লাভ করতে পারব?

আলোচনাঃ- অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে “গোবিন্দ” নামে সম্বোধন করেছেন যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ গো অর্থাৎ গরু ও ইন্দ্রিয়গুলোকে আনন্দ দান করেন । এই তাৎপর্যপূর্ণ নামের দ্বারা তাঁকে সম্বোধন করার মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন কিসে তাঁর ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি হবে । বাস্তবিকপক্ষে গোবিন্দ আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে তৃপ্ত করেন না, কিন্তু আমরা যদি গোবিন্দের ইন্দ্রিয়গুলোকে তৃপ্ত করি তাহলে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো এমনিতেই তৃপ্ত হয়ে যায় । দেহাত্ববুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা নিজেদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি নিয়ে ব্যস্ত এবং তারা চায় যে, ভগবান তাদের সকল ইন্দ্রিয়তৃপ্তির যোগান দিয়ে যাবেন । যার যতটা ইন্দ্রিয়তৃপ্তি প্রাপ্য, ভগবান তাকে তা দিয়ে থাকেন । কিন্তু আমরা যা চাইব, ভগবান তা দিয়ে যাবেন সেটা মনে করা ভুল । কিন্তু তার বিপরীত পন্থা গ্রহণ করে অর্থাৎ, যখন আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির কথা না ভেবে গোবিন্দের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির সেবায় ব্রতী হই, তখন গোবিন্দের আশীর্বাদে আমাদের সমস্ত বাসনা আপনা থেকেই তৃপ্ত হয়ে যায় । আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি অর্জুনের গভীর মমতা তাঁর স্বভাবজাত করুণার প্রকাশ এবং এই মমতার বশবর্তী হয়ে তিনি যুদ্ধ করতে নারাজ হন । প্রত্যেকেই নিজের সৌভাগ্য ও ঐশ্বর্য তাঁর বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে দেখাতে চায় । কিন্তু অর্জুন যখন বুঝতে পারলেন যুদ্ধে তাঁর সমস্ত আত্মীয়-স্বজন নিহত হবেন এবং যুদ্ধশেষে সেই যুদ্ধলব্ধ ঐশ্বর্য ভোগ করার জন্য তাঁর সঙ্গে আর কেউ থাকবেনা, তখন তিনি ভয় ও শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন । সাংসারিক মানুষের স্বভাবই হচ্ছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এই ধরণের হিসাব-নিকাশ ও জল্পনা-কল্পনা করা । কিন্তু অপ্রাকৃত অনুভুতিসম্পন্ন জীবন অবশ্য ভিন্ন ধরণের । তাই ভগবৎ ভক্তের মনোভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের । ভগবানকে তৃপ্ত করাটাই হচ্ছে তাঁর ব্রত, তাই ভগবান যখন চান, তখন পৃথিবীর সমস্ত ঐশ্বর্য গ্রহণ করতেও তিনি কুণ্ঠিত হন না । আবার ভগবান যখন চান না, তখন তিনি একটি কপর্দকও গ্রহণ করেন না । অর্জুন সেই যুদ্ধে তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করতে চাইছিলেন না এবং তাদের হত্যা করা যদি এতই জরুরি হয়ে থাকে, তাহলে তিনি চেয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং যেন তাদেরকে বিনাশ করুন । তখনও তিনি জানতেন না যে, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আসার আগেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায় তারা হত হয়ে আছে এবং সেই ইচ্ছাকে রূপ দেয়ার জন্য তিনি হচ্ছেন একটি উপলক্ষ মাত্র । পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এই কথা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে । ভগবানের শুদ্ধভক্ত অর্জুনের ইচ্ছাই ছিল না তাঁর দুর্বৃত্ত ভাইদের উপর প্রতিশোধ নেয়ার, কিন্তু ভগবান চেয়েছিলেন তাদের সকলকে বিনাশ করতে । ভগবানের শুদ্ধভক্ত কখনোই কারও প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ হন না, অন্যায়ভাবে যে তাঁকে প্রতারণা করে, তাঁর উপরও তিনি করুণা বর্ষণ করেন । কিন্তু ভগবানের ভক্তকে যে আঘাত দেয়, ভগবান কখনোই সেটা সহ্য করেন না । ভগবানের শ্রীচরণে অন্যায় করলে ভগবান ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু তাঁর ভক্তের প্রতি অন্যায় ভগবান তাই অর্জুন যদিও সেই দুর্বৃত্তদের ক্ষমা করে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভগবান তাদের বিনাশ করা থেকে নিরস্ত হন নি




পাপম্‌ এব আশ্রয়েত্ অস্মান্‌ হত্বা এতান আততায়িনঃ ।
তস্মাত্ ন অর্হা বয়ম্‌ হন্তুম্‌ ধার্তরাষ্ট্রান সবান্ধবান ।
স্বজনম্‌ হি কথম্‌ হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধবম্‌ ।৩৬।

অর্থ- এই ধরনের আততায়িদের বধ করলে মহাপাপ আমাদের আচ্ছন্ন করবে। সুতরাং বন্ধুবান্ধব সহ ধৃতরাষ্টের পুত্রদের সংহার করা আমাদের উচিত্ হবে না। হে শ্রীকৃষ্ণ লক্ষ্মীপতি মাধব! আত্মীয় স্বজনদের হত্যা করে আমাদের কি লাভ হবে? আর তা থেকে কেমন করে আমরা সুখী হব?
আলোচনাঃ- আমাদের জানার প্রয়োজন আছে যে, বেদের অনুশাসন অনুয়ায়ী শত্রু ছয় প্রকার-
১) যে বিষ প্রয়োগ করে,
২) যে ঘরে আগুন লাগায়,
৩) যে মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে,
৪) যে ধনসম্পদ লুন্ঠন করে,
৫) যে অন্যের জমি দখল করে এবং
৬) যে বিবাহিত স্ত্রীকে হরণ করে।

এই ধরণের আততায়ীদের অবিলম্বে হত্যা করার নির্দেশ শাস্ত্রে দেওয়া হয়েছে এবং এদের হত্যা করলে কোন রকম পাপ হয় না। এই ধরনের শত্রুকে সমূলে বিনাশ করাটাই সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক, কিন্তু অর্জুন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তাঁর চরিত্র ছিল সাধুসুলভ, তাই তিনি তাদের সাথে সাধুসুলভ ব্যবহারই করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু এই ধরনের সাধুসুলভ ব্যবহার ক্ষত্রিয়দের জন্য নয় । যদিও উচ্চপদস্থ রাজপুরুষকে সাধুর মতই ধীর, শান্ত ও সংযত হতে হয়, তাই বলে তাঁকে কাপুরুষ হলে চলবে না । যেমন, শ্রীরামচন্দ্র এতই সাধুপ্রকৃতির ছিলেন যে, পৃথিবীর ইতিহাসে “রামরাজত্ব” শান্তি ও শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে আছে, কিন্তু তাঁর চরিত্রে কোনরকমের কাপুরুষতা আমরা দেখতে পাই না । রাবণ ছিল রামের শত্রু, যেহেতু সে তাঁর স্ত্রী সীতাদেবীকে হরণ করেছিল এবং সেইজন্য শ্রীরামচন্দ্র তাকে এমন শাস্তি দিয়েছিলেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল । অর্জুনের ক্ষেত্রে অবশ্য আমরা দেখতে পাই তাঁর শত্রুরা ছিল অন্য ধরনের । পিতামহ, শিক্ষক, ভাই, বন্ধু এরা সকলেই শত্রু হবার ফলে শত্রুদের প্রতি যেমন আচরণ করা উচিত তিনি তেমন করতে পারছিলেন না । তা ছাড়া, সাধু প্রকৃতির মানুষেরা সবসময়ই ক্ষমাশীল । শাস্ত্রেও সাধুপ্রকৃতির মানুষদের ক্ষমাশীল হবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং সাধুদের প্রতি এই ধরনের উপদেশ যে-কোন রাজনৈতিক সঙ্কটকালীন অনুশাসন থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ । অর্জুন মনে করেছিলেন, রাজনৈতিক কারণবশত তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করার চেয়ে সাধুসুলভ আচরণ ও ধর্মের ভিত্তিতে তাদের ক্ষমা করাই শ্রেয় । তাই, সাময়িক দেহগত সুখের জন্য এই হত্যাকার্যে লিপ্ত হওয়া তিনি সমীচীন বলে মনে করেননি । তিনি বুঝেছিলেন, রাজ্য ও রাজ্যসুখ অনিত্য । তাই, এই ক্ষণস্থায়ী সুখের জন্য আত্মীয়-স্বজন হত্যার পাপে লিপ্ত হয়ে মুক্তির পথ চিরতরে রুদ্ধ করার ঝুঁকি তিনি কেন নেবেন? এখানে অর্জুন যে শ্রীকৃষ্ণকে ‘মাধব’ অথবা ‘লক্ষ্মীপতি’ বলে সম্বোধন করেছেন, তা তাৎপর্যপূর্ণ । এই নামের দ্বারা তাকে সম্বোধন করে অর্জুন বুঝিয়ে দিলেন, তিনি হচ্ছেন সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবীর পতি, তাই অর্জুনকে এই ধরনের কাজে প্ররোচিত করা তাঁর কর্তব্য নয়, যার পরিণতি হবে দুর্ভাগ্যজনক । শ্রীকৃষ্ণ অবশ্য কাউকেই দুর্ভাগ্য এনে দেন না, সুতরাং তাঁর ভক্তের ক্ষেত্রে তো সেই কথা ওঠেই না ।






যদ্যপ্যেতে ন পশ্যন্তি লোভোপহতচেতসঃ |

কুলক্ষয়কৃতং দোষং মিত্রদ্রোহে চ পাতকম্ ||৩৭||
কথং ন জ্ঞেয়মস্মাভিঃ পাপাদস্মান্নিবর্তিতুম্ |

কুলক্ষয়কৃতং দোষং প্রপশ্যদ্ভির্জনার্দন ||৩৮।।

অর্থ- হে জনার্দন! যদিও এরা রাজ্যলোভে অভিভূত হয়ে কুলক্ষয় জনিত দোষ ও মিত্রদ্রোহ নিমিত্ত পাপ লক্ষ্য করছে না, কিন্তু আমরা কুলক্ষয় জনিত দোষ করেও এই পাপকর্মে কেন প্রবৃত্ত হব?

আলোচনাঃ- পাশাখেলায় আহ্বান করা হলে কোনও ক্ষত্রিয় বিরোধীপক্ষের সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না । দুর্যোধন সেই যুদ্ধে অর্জুনকে আহবান করেছিলেন, তাই যুদ্ধ করতে অর্জুন বাধ্য ছিলেন । কিন্তু এই অবস্থায় অর্জুন বিবেচনা করে দেখলেন যে, তাঁর বিরুদ্ধপক্ষ সকলেই এই যুদ্ধের পরিণতি সম্বন্ধে একেবারে অন্ধ হতে পারে, কিন্তু তা বলে তিনি এই যুদ্ধের অমঙ্গলজনক পরিণতি উপলব্ধি করতে পারার পর, সেই যুদ্ধের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারবেন না । এই ধরনের আমন্ত্রণের বাধ্যবাধকতা তখনই থাকে, যখন তার পরিণতি মঙ্গলজনক হয়, নতুবা এর কোন বাধ্যবাধকতা নেই । এই সব কথা সুচিন্তিতভাবে বিবেচনা করে অর্জুন এই যুদ্ধ থেকে নিরস্ত থাকতে মনস্থির করেছিলেন।




কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনাতনাঃ |
ধর্মে নষ্টে কুলং কৃত্স্নমধর্মোঽভিভবত্যুত ।।৩৯।।

অর্থ- কুলক্ষয় হলে সনাতন কুলধর্ম বিনষ্ট হয় এবং তা হলে সমগ্র বংশ অধর্মে অভিভূত হয় ।

আলচনাঃ- বর্ণাশ্রম সমাজ-ব্যবস্থায় অনেক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেওয়া আছে, যা পরিবারের প্রতিটি লোকের যথাযথ পারমার্থিক উন্নতি সাধনে সহায়তা করে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যেরা পরিবারভুক্ত অন্য সকলের জন্ম থেকে আরম্ভ করে মৃত্যু পর্যন্ত শুদ্ধিকরণ সংস্কার দ্বারা তাদের যথাযথ মঙ্গল সাধন করার জন্য সর্বদাই তৎপর থাকেন । কিন্তু এই সমস্ত প্রবীণ লোকদের মৃত্যু হলে, মঙ্গলজনক এই সমস্ত পারিবারিক প্রথাকে রূপ দেওয়ার মত কেউ থাকে না। তখন পরিবারের অল্পবয়স্ক সদস্যেরা অমঙ্গলজনক কাজকর্মে লিপ্ত হতে পারে এবং তার ফলে তাদের আত্মার মুক্তির সম্ভাবনা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। তাই, কোন কারণেই পরিবারের সদস্যদের হতা করা উচিত নয়।





অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ |
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্করঃ ।।৪০।।

অর্থ- হে কৃষ্ণ! কুল অধর্মের দ্বারা অভিভূত হলে কুলবধূগণ ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হয় এবং হে বার্ষ্ণেয়! কুলস্ত্রীগণ অসৎ চরিত্রা হলে অবাঞ্ছিত প্রজাতি উৎপন্ন হয়।

আলোচনাঃ- সমাজের প্রতিটি মানুষ যখন সৎ জীবনযাপন করে, তখনই সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি দেখা দেয় এবং মানুষের জীবন অপ্রাকৃত ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্ণাশ্রম প্রথার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সমাজ-ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যার ফলে সমাজের মানুষেরা সৎ জীবনযাপন করে সর্বতোভাবে পারমার্থিক উন্নতি লাভ করতে পারে। এই ধরনের সৎ জনগণ তখনই উৎপন্ন হন, যখন সমাজের স্ত্রীলোকেরা সৎ চরিত্রবর্তী ও সত্যনিষ্ঠ হয়। শিশুদের মধ্যে যেমন অতি সহজেই বিপথগামী হবার প্রবণতা দেখা যায়, স্ত্রীলোকদের মধ্যেও তেমন অতি সহজেই অধঃপতিত হবার প্রবণতা থাকে। তাই, শিশু ও স্ত্রীলোক উভয়েরই পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ও তত্ত্বাবধানের একান্ত প্রয়োজন। নানা রকম ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়োজিত করার মাধ্যমে স্ত্রীলোকদের চিত্তবৃত্তিকে পবিত্র ও নির্মল রাখা হয় এবং এভাবেই তাদের ব্যভিচারী মনোবৃত্তিকে সংযত করা হয়। চাণক্য পণ্ডিত বলে গেছেন, স্ত্রীলোকেরা সাধারণত অল্পবুদ্ধিসম্পন্না, তাই তারা নির্ভরযোগ্য অথবা বিশ্বস্ত নয়। সেই জন্য তাদের পূজার্চনা আদি গৃহস্থালি নানা রকম ধর্মানুষ্ঠানে সব সময় নিয়োজিত রাখতে হয় এবং তার ফলে তাদের ধর্মে মতি হয় এবং চরিত্র নির্মল হয়। তারা তখন চরিত্রবান, ধর্মপরায়ণ সন্তানের জন্ম দেয়। যারা হয় বর্ণাশ্রম-ধর্ম পালন করার উপযুক্ত। বর্ণাশ্রম-ধর্ম পালন না করলে, স্বভাবতই স্ত্রীলোকেরা অবাধে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা করতে শুরু করে এবং তাদের ব্যভিচারের ফলে সমাজে অবস্থিত সন্তান-সন্ততির জন্ম হয়। দায়িত্বজ্ঞানশূন্য লোকদের পৃষ্ঠপোষকতায় যখন সমাজে ব্যভিচার প্রকট হয়ে ওঠে এবং অবাঞ্ছিত মানুষে সমাজ ছেয়ে যায়, তখন মহামারী ও যুদ্ধ দেখা দিয়ে মানব-সমাজকে ধ্বংসোন্মুখ করে তোলে।





সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ।
পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিণ্ডোদকক্রিয়াঃ ।।৪১।।

অর্থ- বর্ণসংকর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে কুল ও কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়। সেই কুলে পিণ্ডদান ও তর্পণপ্রক্রিয়া লোপ পাওয়ার ফলে তাদের পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃপতিত হয়।

আলোচনাঃ- কর্মকাণ্ডের বিধি অনুসারে পিতৃপুরুষের আত্মাদের প্রতি পিণ্ডদান ও জল উৎসর্গ করা প্রয়োজন। এই উৎসর্গ সম্পন্ন করা হয় বিষ্ণুকে পূজা করার মাধ্যমে, কারণ বিষ্ণুকে উৎসর্গীকৃত প্রসাদ সেবন করার ফলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তিলাভ হয়। অনেক সময় পিতৃপুরুষেরা নানা রকমের পাপের ফল ভোগ করতে থাকে এবং অনেক সময় তাদের কেউ কেউ জড় দেহ পর্যন্ত ধারণ করতে পারে না। সূক্ষ্ম দেহে প্রেতাত্মারূপে থাকতে বাধ্য করা হয়। যখন বংশের কেউ তার পিতৃপুরুষদের ভগবৎ-প্রসাদ উৎসর্গ করে পিণ্ডদান করে, তখন তাদের আত্মা ভূতের দেহ অথবা অন্যান্য দুঃখময় জীবন থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করে। পিতৃপুরুষের আত্মার শান্তির জন্য এই পিণ্ডদান করাটা বংশানুক্রমিক রীতি। তবে যে সমস্ত লোক ভক্তিযোগ সাধন করেন, তাঁদের এই অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন নেই। ভক্তিযোগ সাধন করার মাধ্যমে ভক্ত শত-সহস্র পূর্বপুরুষের আত্মার মুক্তি সাধন করতে পারেন।

শ্রীমদ্ভাগবতে(১১/৫/৪১) বলা হয়েছে- দেবর্ষিভূতাপ্তনৃণাং পিতৃণাং ন কিঙ্করো নায়মৃণী চ রাজন ।সর্বাত্মনা যঃ শরণং শরন্যং গতো মুকুন্দং পরিহৃত্য কর্তম ।। “যিনি সব রকম কর্তব্য পরিত্যাগ করে মুক্তি দানকারী মুকুন্দের চরণ-কমলে শরণ নিয়েছেন এবং ঐকান্তিকভাবে পন্থাটি গ্রহণ করেছেন, তাঁর আর দেব-দেবী, মুনি-ঋষি, পরিবার-পরিজন মানব-সমাজ ও পিতৃপুরুষের প্রতি কোন কর্তব্য থাকে না। পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করার ফলে এই ধরনের কর্তব্যগুলি আপনা থেকেই সম্পাদিত হয়ে যায়।”





দোষৈরেতৈঃ কুলঘ্নানাং বর্ণসঙ্করকারকৈঃ।
উত্সাদ্যন্তে জাতিধর্মাঃ কুলধর্মাশ্চ শাশ্বতাঃ ।।৪২।।

অর্থ- যারা বংশের ঐতিহ্য নষ্ট করে এবং তার ফলে অবাঞ্ছিত সন্তানাদি সৃষ্টি করে, তাদের কুকর্মজনিত দোষের ফলে সর্বপ্রকার জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং বংশের কল্যাণ-ধর্ম উৎসন্নে যায়।

আলোচনাঃ- সনাতন-ধর্ম বা বর্ণাশ্রম-ধর্মের মাধ্যমে সমাজ-ব্যবস্থায় যে চারটি বর্ণের উদ্ভব হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ যাতে তাদের জীবনের চরম লক্ষ্য মুক্তি লাভে সক্ষম হয়। তাই, সমাজের দায়িত্বজ্ঞানশূন্য নেতাদের পরিচালনায় যদি সনাতন-ধর্মের যথাযথ আচরণ না করা হয়, তবে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং ক্রমে ক্রমে মানুষ তাদের জীবনের চরম লক্ষ্য বিষ্ণুকে ভুলে যায়। এই ধরনের সমাজ-নেতাদের বলা হয় অন্ধ এবং যারা এদের অনুসরণ করে, তারা অবধারিতভাবে অন্ধকূপে পতিত হয়।



উত্সন্নকুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন।
নরকে নিযতং বাসো ভবতীত্যনুশুশ্রুম ।।৪৩।।

অর্থ- হে জনার্দন! আমি পরম্পরাক্রমে শুনেছি যে, যাদের কুলধর্ম বিনষ্ট হয়েছে, তাদের নিয়ত নরকে বাস করতে হয়।

আলোচনাঃ- অর্জুনের সমস্ত যুক্তি-তর্ক তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, পক্ষান্তরে তিনি সাধুসন্ত আদি মহাজনদের কাছ থেকে আহরণ করা জ্ঞানের ভিত্তিতে এই সমস্ত যুক্তির অবতারণা করেছিলেন। প্রকৃত জ্ঞান উপলব্ধি করেছেন যে-মানুষ, তাঁর তত্ত্বাবধানে এই জ্ঞান শিক্ষালাভ না করলে, এই জ্ঞান আহরণ করা যায় না। বর্ণাশ্রম-ধর্মের বিধি অনুসারে মানুষকে মৃত্যুর পূর্বে তার সমস্ত পাপ মোচনের জন্য কতকগুলি প্রায়শ্চিত্ত বিধি পালন করতে হয়। যে সব সময় পাপকার্যে লিপ্ত থেকে জীবন অতিবাহিত করেছে, তার পক্ষে এই বিধি অনুসরন করে প্রায়শ্চিত্ত করাটা অবশ্য কর্তব্য। প্রায়শ্চিত্ত না করলে তার পাপের ফলস্বরূপ মানুষ নরকে পতিত হয়ে নানারকম দুঃখকষ্ট ভোগ করে।







অহো বত মহৎ পাপং কর্তুং ব্যবসিতা বয়ম্। যদ্রাজ্যসুখলোভেন হন্তুং স্বজনমুদ্যতাঃ ।।৪৪।।

অর্থ- হায়! কী আশ্চর্যের বিষয় যে, আমরা রাজ্যসুখের লোভে স্বজনদের হত্যা করতে উদ্যত হয়ে মহাপাপ করতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছি।

আলোচনাঃ- স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষকে মাতা-পিতা, ভাই-বন্ধুকে হত্যা করতে দেখা যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এর অনেক নজির আছে। কিন্তু ভগবদ্ভক্ত অর্জুন সদাসর্বদা নৈতিক কর্তব্য অকর্তব্যের প্রতি সচেতন, তাই তিনি এই ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকাকেই শ্রেয় বলে মনে করেছেন।






যদি মামপ্রতীকারমশস্ত্রং শস্ত্রপাণয়ঃ।
ধার্তরাষ্ট্রা রণে হন্যুস্তন্মে ক্ষেমতরং ভবেত্।।৪৫।।

অর্থ- প্রতিরোধ রহিত ও নিরস্ত্র অবস্থায় আমাকে যদি শস্ত্রধারী ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা যুদ্ধে বধ করে, তা হলে আমার অধিকতর মঙ্গলই হবে।

আলোচনাঃআমরা জানি যে, ক্ষত্রিয় রণনীতি অনুসারে নিয়ম আছে, শত্রু যদি নিরস্ত্র হয় অথবা যুদ্ধে অনিচ্ছুক হয়, তবে তাকে আক্রমণ করা যাবে না। কিন্তু অর্জুন স্থির করলেন যে, এই রকম বিপজ্জনক অবস্থায় তাঁর শত্রুরা যদি তাঁকে আক্রমণও করে, তবুও তিনি যুদ্ধ করবেন না। তিনি বিবেচনা করে দেখলেন না, শত্রুপক্ষ যুদ্ধ করতে কতটা আগ্রহী ছিল। সুতারাং অর্জুনের এই ধরনের আচরণ থেকে ভগবদ্ভক্তোচিত কোমল হৃদয়বৃত্তির পরিচায়ক প্রকাশ পাই।





সঞ্জয় উবাচ এবমুক্ত্বার্জুনঃ সঙ্খ্যে রথোপস্থ উপাবিশত্।

বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানসঃ ।।৪৬।।

অর্থ- সঞ্জয় বললেন- রণক্ষেত্রে এই কথা বলে অর্জুন তাঁর ধনুর্বাণ ত্যাগ করে শোকে ভারাক্রান্ত চিত্তে রথোপরি উপবেশন করলেন।

আলোচনাঃ- শত্রুসৈন্যকে নিরীক্ষণ করতে অর্জুন রথের উপর দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু তিনি শোকে এতই মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর গাণ্ডীব ধনু ও অক্ষয় তূণ ফেলে দিয়ে, তিনি রথের উপর বসে পড়লেন। এই ধরনের কোমল হৃদয়বৃত্তির মানুষই কেবল ভগবদ্ভক্তি সাধন করার মাধ্যমে সমগ্র জগতের যথার্থ মঙ্গল সাধন করতে পরারেন।

প্রথম অধ্যায়ের বিশ্লষণ ও সার-সংক্ষেপঃ- এই অধ্যায়ে নাম 'সৈন্যদর্শন' বা 'অর্জুন-বিষাদ' যোগ। ইহাতে তত্ত্বকথা কিছু নাই কিন্তু কাব্যাংশে ইহা অতুলনীয়।করুক্ষেত্রে মহাযুদ্ধে আরব্ধপ্রায়, উভয়পক্ষী সুসজ্জিত সৈন্যগণ ব্যুহবদ্ধ হইয়া পরস্পর সম্মুখীন, যোদ্ধৃগণ মহোৎসাহে সিংহনাদ করিয়া শঙ্খধ্বনি করিলেন- রণবাদ্য বাজিয়া উঠিল- শস্ত্রসম্পাত আরম্ভ হইলো। তখন অর্জুনের মহানির্বেদ উপস্থিত। তাঁহার শরীর কাঁপিতে লাগিল,মুখ শুকাইল, দেহ অবসন্ন হইল, হস্ত হইতে গান্ডীব খসিয়া পড়িল।কৃপাবিষ্ট অর্জনের মোহভাব কাব্যতুলিকায় নিঃস্বার্থ উদার করুণরসে অনুরঞ্জিত, যেমন চিত্তমোহকর, তেমন প্রাণস্পর্শী।

ইতি শ্রীমহাভারতে ভীষ্মপর্বণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন-সংবাদে অর্জুনবিষাদ-যোগে নাম প্রথমোহধ্যায়।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।



-----------------------------------------------------------------------
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ অন্তে শ্রীকৃষ্ণের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা-
-----------------------------------------------------------------------

ওঁ যদক্ষরং পরিভ্রষ্টং মাত্রাহীনঞ্চ যদ্‌ ভবেৎ ।

পূর্ণং ভবতু ত্বৎ সর্বং ত্বৎ প্রসাদাৎ জনার্দ্দন ।।

মন্ত্র হীনং ক্রিয়া হীনং ভক্তিহীনং জনার্দ্দন ।

যৎ পূজিতং ময়া দেব পরিপূর্ণং তদস্তুমে ।।
Share:

২৫ ডিসেম্বর ২০১৪

৩৩ কোটি হচ্ছেন মানবিক সত্ত্বা বা মানুসিক শক্তি বা ঐশ্বরিক শক্তি

৩৩ কোটি হচ্ছেন মানবিক সত্ত্বা বা মানুসিক শক্তি বা ঐশ্বরিক শক্তি যা আমাদের জন্য উপকারী। কিন্তু বেদে কোথাও এটা উল্লেখ নেই যে আমাদেরকে এই সকল সত্তাকে পূজা করতে হবে। বেদে ৩৩ কোটি দেবতার উল্লেখ নেই কিন্তু ৩৩ ধরনের দেবতার উল্লেখ রয়েছে। সংস্কৃততে কোটি অর্থ হচ্ছে ধরন বা প্রকার। এই ৩৩ ধরনের দেবতাদের মধ্যে রয়েছেন -

৮ বসু
১২ টি আদিত্য
১১ রুদ্র ইন্দ্র ও প্রজাপতি

এই ৩৩ দেবতার প্রভু হচ্ছেন মহেশ্বর অথবা ঈশ্বর যাকে শতপথ ব্রাক্ষনের ১৪ কান্ড অনুযায়ী উপাসনা করতে হবে অন্য কাউকে নয়।
এই ৩৩ দেবতার ধারণাটি হচ্ছে বিশাল গবেষণার বিষয় এবং বিষয়টিকে যথাযত ভাবে বোঝার জন্য গভীর অধ্যয়নের ও মননের প্রয়োজন।

ঈশ্বরে বহু গুণাবলীর অধিকারী............ শুধু মাত্র মূর্খ মানুষেরাই মনে করে ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন গুন বা শক্তি এক একটি ঈশ্বর।

ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় ......... আপনার কাছেও ....... তা আপনি মানুন বা না মানুন .....

প্রাচীন ভারতীয় মনীষা কয়েক হাজার বছর আগে যা 'মানষচক্ষে দর্শন' করেছিলেন.................. ও "হিন্দু" যোগ বইয়ে যা লিপিবদ্ধ করা ছিল.................আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একবার দেখে নিয়ে............প্রকাশ্যে না বললেও অন্তরে ভগবান শিব কে স্মরণ করে বলুন............
"ওঁ নমঃ শিবায়"
------------------------------------------------------------------------------------------------
There are 31 spinal cord nerve segments in a human spinal cord:
• 8 cervical segments forming 8 pairs of cervical nerves (C1 spinal nerves exit spinal column between occiput and C1 vertebra; C2 nerves exit between posterior arch of C1 vertebra and lamina of C2 vertebra; C3-C8 spinal nerves through IVF above corresponding cervica vertebra, with the exception of C8 pair which exit via IVF between C7 and T1 vertebra)
• 12 thoracic segments forming 12 pairs of thoracic nerves (exit spinal column through IVF below corresponding vertebra T1-T12)
• 5 lumbar segments forming 5 pairs of lumbar nerves (exit spinal column through IVF, below corresponding vertebra L1-L5)
• 5 sacral segments forming 5 pairs of sacral nerves (exit spinal column through IVF, below corresponding vertebra S1-S5)
• 1 coccygeal segments
---------------------------------------------------------------------------------------------------------
*** [নীচের ছবিতে একজন মানুষের নার্ভাস সিস্টেমের ছবি ও শক্তিকেন্দ্রের (দেবতা) জায়গাগুলো লাল তীর চিহ্ন দিয়ে দেখিয়ে দিলাম] ***


Collected from: Prithwish Ghosh



Share:

০১ ডিসেম্বর ২০১৪

রামায়নের একটি ঘটনা শোনা যাক ।

 ঘটনাটা ঠিক সীতা মায়ের অপহরণের পর । শ্রীরামচন্দ্রের সাথে সুগ্রীবের বন্ধুত্ব হয়েছে । কিন্তু সুগ্রীব তখনো বানর দের রাজা হন নি। কিস্কিন্ধ্যার রাজা ছিলেন বালি। বালির সাথে সুগ্রীবের বিবাদ এমন পর্যায়ে ছিল- যে বালি সুগ্রীবের বিনাশ চাইতো। মাতঙ্গ মুনির অভিশাপ থাকার জন্য একটি বিশেষ স্থানে বালি আসতে পারতো না, আর সেই বিশেষ স্থানে বাস করতেন সুগ্রীব । ভগবান রামের সাথে সুগ্রীবের চুক্তি হোলো বালিকে বধ করে সুগ্রীবকে সম্রাট বানাবেন। ঠিক সেই মতো সুগ্রীব বালির সাথে লড়তে তাকে আহ্বান জানালো। আড়ালে ভগবান রাম ধনুর্বাণ নিয়ে তৈরী থাকলেন । কিন্তু সমস্যা হোলো- বালি আর সুগ্রীব যমজ। কে সুগ্রীব আর কে বালি ভগবান রাম বুঝতে না পেরে বাণ চালালেন না। বালির হাতে আধা মরা হয়ে সুগ্রীব ফিরে এসে ভগবান রামকে খুব করে বাক্যবানে বিঁধলে ভগবান রাম বললেন- "মিত্র সুগ্রীব। তুমি ও বালি যমজ ও একই রকম দেখতে। ভুল বশত আমি যদি তোমাকে বালি জ্ঞানে শর বিদ্ধ করতাম তবে অনর্থ হোতো। কাল তুমি একটি পুস্পমাল্য কন্ঠে পরিধান করে পুনঃ বালিকে মল্ল যুদ্ধে আহ্বান জানাবে। তোমার কন্ঠের মাল্য দেখে আমি নিশ্চিত হয়ে বালিকে বধ করবো।" পর দিবস পুনঃ সুগ্রীব ভ্রাতা বালিকে যুদ্ধে আহ্বান করলে বালি রেগে দাঁত কিড়মিড় করে গেলো। দেখতে দেখতে দুই বানরে যুদ্ধ লাগলো। গাছেড় ডালপালা ভেঙ্গে চুরমার করতে লাগলো। বড় বড় পাথর একে অপরের প্রতি নিক্ষেপ করতে লাগলো। আঁচড় কামড় কিছুই বাদ গেলো না। তখন ভগবান রাম শর নিক্ষেপ করলেন আড়াল থেকে। রামের বাণে বালি বিদ্ধ হয়ে ছিটকে পড়লো । তখন বালি সব চালাকী বুঝতে পেরে বলল- " ওহে রাম আড়াল থেকে শর সন্ধান করা কি তোমার উচিৎ কর্ম ? আমাদের দুভাইয়ের লড়াইয়ে তুমি আড়াল থেকে আমাকে বধ করছ - এই তোমার ধর্ম ? সাধু মুনি গণ তোমাকে ভগবান নারায়ন বলে ভক্তি করে- এই কি তুমি এমন ভগবান যে আড়াল থেকে শর সন্ধান করো ? হে রাম। তুমি মহান সূর্য বংশীয় নৃপতি রাজা দশরথের সন্তান। তুমি কিভাবে এই অধর্ম করলে ? হে রাম। আমি জাতিতে বানর। আমি তো বাঘ, ভল্লুক বা মৃগ নি, যে আমার চর্ম তুমি ব্যবহার করবে ? শুনেছি তোমার পত্নীকে লঙ্কার রাজা রাবন অপহরণ করেছে । তুমি আমাকে বলতে- আমি সেই রাবণকে লেজে বেঁধে তোমার সম্মুখে উপস্থিত করতাম। কিন্তু সেসব না করে তুমি কিভাবে এই অধর্ম করলে ? "
শুনে রাম বললেন- "ওহে বালি তোমার এখন ধর্ম কথা মনে পড়ছে ? তুমি সন্দেহের বশে তোমার ভ্রাতা সুগ্রীবকে বিতারিত করেছো - তখন তোমার ধর্ম জ্ঞান কোথায় ছিল ? পিতার সম্পত্তি থেকে নিজ ভ্রাতাকে বহিষ্কার করেছো- তখন তোমার ধর্ম চিন্তা উদয় হয়নি ? সুগ্রীবের স্ত্রী রুমাকে কারাগারে আটকে রেখে তাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছো, তখন তোমার ধর্ম ভাবনা কোথায় ছিলো? তোমার সাথে আমি রাবণের কোনো বিভেদ দেখিই না। এখন তোমার মনে ধর্ম ভাবের উদয় হয়েছে।" বালি বুঝতে পেরে ভগবান রামের চরণে ক্ষমা প্রার্থনা করে মৃত হোলো। বালি পুত্র অঙ্গদকে ভগবান রাম বর দিলেন- "অঙ্গদ, তোমার নিকট আমি অপরাধী । তুমি পরজন্মে এক ব্যাধ হয়ে জন্মাবে। পরজন্মে যখন আমি কৃষ্ণ অবতার ধারন করবো- তোমার বানে আমি দেহ ছেড়ে বৈকুণ্ঠ প্রস্থান করবো।" এই বালি বধ প্রসঙ্গে ভগবান রাম তাঁর ভ্রাতা লক্ষণ কে বলেছিলেন - "ধর্ম সংস্থাপনের জন্য, পাপের বিনাশের জন্য ছল করলে তা পাপ বলে খ্যাত হয় না।" লক্ষণ কে তাই যজ্ঞে রত অবস্থায় মেঘনাদ বধ করতে হয়েছিল । সাম, দাম, দণ্ড, ভেদ সর্বদা ধর্মের জন্য, সত্যের জন্যই প্রয়োগ করা উচিৎ। মিথ্যা কথার দ্বারা যদি ধর্ম স্থাপন হয়- তবে সেই মিথ্যায় পাপ নেই।


লিখেছেনঃ সুকান্ত বসাক, শিলিগুরি ।
Share:

২৯ অক্টোবর ২০১৪

মনোযোগ দিয়ে পড়ুন

প্রতিটি মুহূর্ত চলাফেরা অথবা কাজ করার সময় ভগবানের নাম মনে মনে স্মরন করুন বা জপ করুন এবং মনে প্রানে বিশ্বাস করুন ভগবান আমাকে রক্ষা করবেন সমস্ত বিপদ আপদ হতে । তাহলে নিজেই দেখতে পাবেন কিভাবে কত বিপদ হতে আপনারা রক্ষা পাচ্ছেন তবে অবশ্যই সৎ থাকতে হবে । ভগবান আমাদের হাজারো বিপদে ফেলে পরীক্ষা করেন এবং সতর্ক করে দেন আর এসব পরীক্ষা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় একান্ত ভাবে ভগবান কে স্মরন করেই ।

আর চেষ্টা করুন প্রতিদিন একটি করে হলেও শ্রীমদভগবত গীতার শ্লোক পরতে এবং তা মনোযোগ দিয়ে তার অন্ত নিহিত অর্থ বুঝতে । শ্রীমদভগবত গীতা কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মুখস্ত বা রিডিং পড়ে পূন্য অর্জন করার জন্য দেয়নি । এর মাধ্যমে দিয়েছে মানব কল্যানের পথ, দিয়েছে আত্মত্বত্ত লাভের পন্থা , দিয়েছে চির মুক্তির পন্হা , দিয়েছে কিভাবে চলতে হবে তার নির্দেশ, দিয়েছে ভগবানকে পাবার পন্হা , দিয়েছে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর , জীবনে চলার সঠিক রাস্তা । তাহলে কেন শুধু পুন্য অর্জনের জন্য মুখস্ত করছেন বা না বুঝে শুধু পড়ে যাচ্ছেন ?

আর আপনি নিজে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন মন্দিরে গিয়ে পাঠ শুনুন মন্দিরে গিয়ে এখানে সখানে বসে আড্ডা না মেরে । এবং যাদের ছেলে মেয়ে আছে তাদেরকেও নিয়মিত মন্দিরে নিয়ে যান । ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে উৎসাহ দিন এবং তাদের সনাতনের এই বিশাল জ্ঞানভান্ডার কে জানান এবং নিজে জানুন । তবেই বৃদ্ধ বয়সে আপনার সন্তান আপনাকে ছেড়ে যাবে না অবহেলা করবে না । আপনার সন্তানদের সংস্কার দিন ও নিজেও সংস্কার জানুন । তবেই আপনার সন্তান তা লালন করবে ও ধারন করবে । তবেই সে ধর্মান্তরিত হবে না । মনে রাখবেন সন্তান আপনার কাছে যা শিখবে তাই লালান করবে । তাই নিজে মানুষ আপনার সন্তান এমনিতেই মানুষ হবে ।

নিজের ধর্মকে জানার চেষ্টা করুন তবেই আপনাকে বিধর্মীদের প্রশ্ন শুনে বিবর্ত হতে হবে না । তখন তাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে সুন্দর করে বোঝাতে পারবেন তখন তারাও বুঝবে ও অন্যকে বিরক্ত করবে না এবং নিজেও গর্ববোধ করবেন নিজেকে সনাতনী হিন্দু ভেবে । নিজে জানুন অন্যকে জানান ।

আর একটা কথা মনে রাখবেন সনাতন ধর্মে জাত প্রথা আছে এবং থাকবে তবে কখনই তা জম্মের ভিত্তিতে নয় তা হলো কর্মের ভিত্তিতে আর সেখানে কোন উচু জাত নিচু জাতের স্থান নেই । যার ব্রহ্ম জ্ঞান আছে বিদ্বান ও সৎ চরিত্রের অধিকারী তাকেই বলা হয় ব্রাহ্মন , এটা জম্মগত কোন অধিকার নয় । যিনি দেশ শাষন ও দেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত তিনি ক্ষত্রিয়, যেমনঃ সেনাবাহিনী , সরকার যা যে কেউ হতে পারে । যিনি ব্যবসা করেন তিনি বৈশ্য অর্থাৎ, টাটা আম্বানির মত ব্যবসায়ীরা । আর শুদ্র হলো যারা সেবা কাজে নিয়োজিত, যেমনঃ ডাক্তার, নার্স, আইনজীবী । সকলকেই কর্মের মাধ্যমেই ভাগ করা হয়েছে তবে কেন উচু জাত নিচু জাত এর কুসংস্কার নিয়ে বসে আছেন ? তাই বলি আগে জানুন তরে ব্যবহার করুন ।

লজ্জায় নয় ,গর্ব করে বলুন আমি হিন্দু আমি সনাতন ।

লিখেছেনঃ অমিত সরকার শুভ
Share:

২১ অক্টোবর ২০১৪

শ্মশানে কেন মা কালীর পূজা হয় ?


“শ্মশান” শব্দের অর্থ- শম স্থান । মৃত স্থান । চলতি কথায় যেখানে শবদাহ করা হয় সেই ক্ষেত্র শ্মশান ভূমি নামে পরিচিত । করালবদনী আদ্যাশক্তি মায়ের বিচরণ ক্ষেত্র এই শ্মশান । মা কালীকে ধ্বংসের দেবী বলা হয়। এই “ধ্বংস” বলতে সর্বনাশ করা নয়। এর অর্থ- “সংহরন” অর্থাৎ দেবী নিজেই এই সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড রচনা করেছেন- আবার তিনিই গুটিয়ে নেন। ঠিক যেমন মাকড়শা নিজেই জাল বোনে আবার নিজেই গুটিয়ে নেয় । জীব কর্মফল ভোগান্তে মায়ের কোলে আশ্রয় পেয়ে পায় অসীম শান্তি ও আনন্দ । এই শ্মশান তাই মাকালীর ক্রীড়া ক্ষেত্র ।
শ্মশান কে বৈরাগ্যভূমি বলা হয়। শ্মশানকে তপঃ সাধনার ভূমি বলা হয় । ১০ মিনিট শ্মশানে বসে থাকলে জড় দেহের নশ্বরতার প্রতিচ্ছবি আমাদের চোখের সামনে আসে। জীব তাঁর খাঁচা নিয়ে বড়ই অহংকার করে , কিন্তু খাঁচা থেকে পাখী মুক্ত হলে খাঁচা শ্মশানে এক মুঠো ভস্মে পরিণত হয়। জ্ঞানী গণ এই তত্ত্ব উপলব্ধি করে দেহ সুখ বিসর্জন দিয়ে সাধন ভজনে মন দেয়। শ্মশান কেই তাই তপঃ সাধনার কেন্দ্র করে বহু যুগ থেকে অনেক সাধক সাধিকারা সাধন ভজনে নিমগ্ন হয় । মৃত্যু কাউকে ছাড়ে না। এক রূপবতী অপ্সরা তুল্যা কন্যার মৃত্যুর হলে শ্মশানে তার দেহ এক মুঠো ভস্ম হয়- অপরদিকে এক কুৎসিত চেহারা বিকৃত ব্যাক্তির মৃত্যু হলে তাঁর শ্মশানে দেহের পরিণতি এক মুঠো ছাই। মৃত্যুর কাছে কোন ভেদাভেদ নেই। ধনী গরীব নির্ধন কাঙ্গাল সকলের মৃত্যুর পর দেহ ভস্মেই পরিণত হয় । সাধু গণ এই তত্ত্ব জানেন। কালের করাল গ্রাস থেকে কারোর মুক্তি নেই। তাই কালের কাল মহাকালকে গ্রাসকারীনি আদ্যাশক্তি মহামায়া কালীর উপাসনাতেই নিমগ্ন হন ।
কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা, অহংকার, বাসনা গ্রস্ত এই শরীর । আত্মার এই সকল বোধ নেই। দেহান্তে এই রিপুগণের ক্রীড়া ক্ষেত্র শরীর টি জলন্ত চিতাতে ভস্ম হয়। রিপু গনের নাশ হলেই সাধকের মনে বৈরাগ্য জাগ্রত হয়। তাই এই রিপুর খেলার মাঠ শরীর টি জলন্ত চিতায় দগ্ধ হয় বলে মা কালী শ্মশানে বিরাজ করেন। মা তারা দেবী জলন্ত চিতায় অধিষ্ঠান করেন । ভগবতী ছিন্নমস্তা পদতলে মদন রতি দলিতা করেন । এই হোলো শ্মশানের পরিচয় । শ্মশান মন্দিরের মতোই পবিত্র। মন্দিরে শাস্ত্র পাঠ করে জড় দেহের পরিণামের কথা বলা হয়। শ্মশানে গেলে সেটার জীবন্ত উদাহরণ সচক্ষে দেখা যায়। তাই শ্মশান মা কালীর এত প্রিয় স্থান ।
ছবিটি আমার বন্ধু পিন্টু দাস বানিয়েছেন
Share:

১৫ অক্টোবর ২০১৪

শ্রীকৃষ্ণই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু


আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের তাৎপর্য সমন্বিত ভগবদ্গীতা যথাযথ যাঁরা পাঠ করেছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে জানতে পেরেছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্ব কারণের পরম কারণ এবং লীলা পুরুষোত্তম স্বয়ং ভগবান। গীতায় বিভিন্ন শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যে পরম পুরষ ভগবান তার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন -
মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয় (৭/৭)
অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে (১০/৮)
পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্ (১০/১২)
আমরা দেখতে পাই অষ্টাদশ অধ্যায় যুক্ত ভগবদ্গীতার বিভিন্ন উপদেশের মাধমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পরম ভক্ত ও সখা অর্জুনের মোহ মুক্ত করার জন্য বহুভাবে চেষ্টা করেছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে অর্জুনকে যুদ্ধ করতে বললেন, অর্থাৎ তাঁর শরণাগত হতে বললেন। কিন্তু অর্জুনের তাতে সংশয় দেখা দিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না তাঁর প্রকৃতপক্ষে কি করা উচিত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তা বুঝতে পেরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মাঝখানে অর্জুনকে আত্মতত্ত¡-বিজ্ঞান প্রদান করলেন, যাতে অর্জুন মোহ থেকে মুক্ত হয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ পালন করেন। প্রকৃতপক্ষে অর্জুন ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সখা অর্থাৎ নিত্য পার্ষদ, তাই অর্জুনের মায়ার দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ার কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। সমগ্র মায়াবদ্ধ জীবদের মায়া থেকে মুক্তির জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিত্যসখা অর্জুনকে নিমিত্ত করে এই ভগবদ্গীতার জ্ঞান প্রদান করেছিলেন। তিনি সর্বপ্রথমে অর্জুনের নিকট কর্মের ব্যাখ্যা করলেনÑকর্ম, বিকর্ম ও অকর্ম। তিনি ‘অকর্ম’ অর্থাৎ নিষ্কাম কর্মের উপর গুরুত্ব আরোপ করলেন। তারপর তিনি জ্ঞানযোগের কথা বললেন। অর্থাৎ, ভগবৎ-তত্ত¡বিজ্ঞান লাভের মাধ্যমে জড় ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করে কিভাবে ব্রহ্মের ধ্যান করা যায়। তারপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অষ্টাঙ্গ যোগের ব্যাখ্যা করলেনÑকিভাবে একজন যোগী যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম এবং অন্তিমে সমাধির স্তরে উপনীত হয়ে হৃদয়ে অবস্থিত অন্তর্যামী পরমাত্মার দর্শন লাভ করতে পারেন।
সর্ব পরিশেষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কি উপদেশ দান করলেন? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন-
সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ \
“সমস্ত রকমের ধর্ম পরিত্যাগ করে একমাত্র আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত রকম পাপকর্মের ফল থেকে মুক্ত করে উদ্ধার করব। তুমি তার জন্য চিন্তা করো না।” (গীতা ১৮/৬৬) এই শ্লোকে ভগবান কৃষ্ণ অর্জুনকে সম্পূর্ণরূপে তাঁর শরণাগত হতে বললেন। সর্বধর্মান পরিত্যজ্য বলতে কর্মফল প্রদানকারী কর্মকাণ্ডীয় কর্মই কেবল ত্যাগ নয়, এমন কি মুমুক্ষুদের জ্ঞানযোগ এবং সিদ্ধিকামীদের অষ্টাঙ্গযোগকেও ত্যাগ করতে বলেছেন। কারণ, কর্মকাণ্ডের প্রতি আসক্ত হলে স্বর্গসুখের বাসনা, জ্ঞানের প্রতি আসক্ত হলে ব্রহ্মে লীন হয়ে যাওয়ার বাসনা এবং অষ্টাঙ্গযোগের প্রতি আসক্ত হলে অনিমা, লঘিমা, ঈশিতা, বশিতা, প্রাপ্তি আদি জড়-জাগতিক সিদ্ধি লাভের প্রতি বাসনা জাগ্রত হয়, ফলে মানব জীবনের পরম প্রাপ্তি যে কৃষ্ণপ্রেম তা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। সেই সম্বন্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্ত উদ্ধবকে বলেছেন-
ন সাধয়তি মাং যোগো ন সাংখ্যং ধর্ম উদ্ধব।
ন স্বাধ্যায়স্তপস্ত্যাগো যথা ভক্তির্মমোর্জিতা \
“হে প্রিয় উদ্ধব! অষ্টাঙ্গযোগ, সাংখ্যযোগ, বেদ অধ্যয়ন, তপশ্চর্যা অথবা ত্যাগের মাধ্যমে আমাকে লাভ করা যায় না, একমাত্র আমার প্রতি শুদ্ধ ভক্তি অর্জন করে আমার ভক্ত অতি সহজেই আমাকে লাভ করতে পারে।”
সুতরাং কর্ম, জ্ঞান ও অষ্টাঙ্গ-যোগের দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে শরণাগতি হয় না, তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সব রকমের ধর্ম পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণরূপে তাঁর শরণাগত হতে বলেছেন। অর্থাৎ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ভক্তিযোগের মাধ্যমে তাঁর শরণাগত হতে বলেছেন। লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে কিভাবে শরণাগত হতে হবে, সেটিই হচ্ছে ভগবদ্গীতায় অর্জুনের প্রতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গুহ্যতম উপদেশ এবং তা হচ্ছেÑ
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যামী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে \
“সর্বদাই আমার স্মরণ কর, আমার ভক্ত হও, আমাকে পূজা কর এবং আমাকে প্রণাম কর। যদি তুমি তা কর, তবে নিঃসন্দেহে তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে। আমি তোমার কাছে প্রতিজ্ঞা করছি, কেন না তুমি আমার প্রিয় সখা।” (গীতা ১৮/৬৫) সমগ্র মানব সমাজের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই গুহ্যতম বাণী যথাযথভাবে পালন করা। অর্থাৎ ভক্তিযোগের আশ্রয় গ্রহণ করে চিন্ময় কৃষ্ণলোকে লীলা পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের কাছে ফিরে যাওয়া। একবার কেউ সনাতন চিন্ময় ভগবৎ ধামে ফিরে গেলে, তাকে আর জন্ম-মৃত্যুময় ভৌতিক জগতে ফিরে আসতে হয় না।
প্রথমে অর্জুনও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ পালন করতে অস্বীকৃত হয়েছিলেন। পরিশেষে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় অর্জুন সংশয় ও মোহ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন এবং তিনি সম্পূর্ণরূপে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হয়েছিলেন। তখন অর্জুন বলেছিলেনÑ
নষ্টো মোহ স্মৃতির্লব্ধা ত্বৎপ্রসাদান্ময়াচ্যুত।
স্থিতোহস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব \
“হে প্রিয় কৃষ্ণ! হে অচ্যুত! আমার মোহ দূরীভূত হয়েছে। তোমার কৃপায় আমার স্মৃতিশক্তি আমি পুনরায় ফিরে পেয়েছি। আমি এখন সম্পূর্ণরূপে সংশয় থেকে মুক্ত এবং তোমার উপদেশ মতো কাজ করতে আমি প্রস্তুত।” (গীতা ১৮/৭৩) শেষ পর্যন্ত অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে যুদ্ধ করেছিলেন। বহু অধার্মিক রাজাদের ধ্বংস করে ধর্মরাজ্য স্থাপনে শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাকে পূর্ণ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের কৃপার ফলে অর্জুুন পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্তরূপে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। যিনি অর্জুনের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন, তিনি এই জীবনে পরম সৌভাগ্যশালী তো হবেনই এবং পরবর্তী জীবনে চিত-জগতে কৃষ্ণলোকে ফিরে গিয়ে নিত্যকাল শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গলাভ করবেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
দ্বাপর যুগ শেষ হয়ে এখন কলিযুগ চলছে। কলির প্রভাবে মানুষ ক্রমশ অধিক থেকে অধিকতর অধঃপতনের দিকে এগিয়ে চলেছে। নেশা, মাংসাহার, জুয়া ও অবৈধ স্ত্রীসঙ্গের প্রতি মানুষের আসক্তি বৃদ্ধির ফলে ধর্মের তিনটি অঙ্গÑতপস্যা, শৌচ ও দয়া একেবারেই বিনষ্ট হয়ে যায়, অর্থাৎ একমাত্র সত্যের অস্তিত্ব রয়েছে। ভয়ংকর কলির দ্বারা এভাবেই দ্রুত করালগ্রস্ত হওয়ার দরুন মানুষ আর কেউই ধর্মের অনুশাসন গ্রহণ করতে চায় না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরম গুহ্যতম নির্দেশ-‘আমার শরণাগত হও’ মায়ামোহাচ্ছন্ন হয়ে সকলেই তা ভুলতে বসেছে। কলির ভয়ংকর তাণ্ডব নৃত্যের প্রভাবে অল্প-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ পারমার্থিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মানব-জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছে। মানুষ আহার, নিদ্রা ও স্ত্রীসঙ্গে আসক্ত হয়ে তাদের শাশ্বত, চিন্ময় স্বরূপকে ভুলে গিয়ে অনিত্য, নশ্বর জড় শরীরকেই তাদের স্বরূপ বলে মনে করতে থাকে। এই নিদারুণ শৌচনীয় অবস্থা থেকে উদ্ধারের পথ তাদের কে দেখাবে ? যার তার কথা তো মানুষ শুনবে না। সুহৃদং সর্বভূতানাম্Ñভগবান শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন সমগ্র জীবকুলের একমাত্র পরম উপকারী বন্ধু। যদি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবার এই কলিযুগে অবতীর্ণ হয়ে তাঁর পাদপদ্মে শরণাগত হবার পন্থা প্রদর্শন করেন, তবেই মায়াবদ্ধ জীবেরা ভক্তিমার্গের পন্থা গ্রহণ করবে, নচেৎ আশা নেই। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের থেকেও তাঁর একান্ত শরণাগত শুদ্ধ ভক্ত অধিকতর পরদুঃখে দুঃখী। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঠিক করলেন, ভগবৎ-ভক্তির পন্থা আচরণের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি ভক্তশ্রেষ্ঠ শ্রীমতী রাধিকার ভাব ও কান্তি অবলম্বন করে ভক্তরূপে এই কলিযুগে শচীগর্ভসিন্ধু থেকে অবতীর্ণ হবেন। তিনি হচ্ছেন কলিযুগের মহাবদান্য অবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, যিনি পাঁচশো কুড়ি বছর পূর্বে কলিযুগের যুগধর্ম হরিনাম সংকীর্তন প্রবর্তন করবার জন্য এই শ্রীধাম মায়াপুরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সেই সম্বন্ধে বলা হয়েছেÑ
মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য রাধাকৃষ্ণ নহে অন্য,
রূপানুগজনের জীবন।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে স্বয়ং রাধা-কৃষ্ণের মিলিত প্রকাশ, সেই সম্বন্ধে শ্রীল স্বরূপ গোস্বামীর কড়চায় বর্ণিত হয়েছে-
রাধা কৃষ্ণপ্রণয়বিকৃতির্হ্লাদিনীশক্তিরস্মা-
দেকাত্মানাবপি ভুবি পুরা দেহভেদং গতৌ তৌ।
চৈতন্যাখ্যাং প্রকটমধুনা তদ্দ্বয়ং চৈক্যমাপ্তং
রাধাভাবদ্যুতিসুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম্ \
“শ্রীরাধিকা শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়ের বিকার-স্বরূপা; সুতরাং শ্রীমতী রাধারানী শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি। এই জন্য তাঁরা (শ্রীমতি রাধারানী ও শ্রীকৃষ্ণ) একাত্মা; কিন্তু একাত্মা হলেও তাঁরা অনাদিকাল থেকে গোলোকে পৃথক দেহ ধারণ করে আছেন। এখন (কলিযুগে) সেই দুই দেহ পুনরায় একত্রে যুক্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে প্রকট হয়েছেন। শ্রীমতী রাধারানীর এই ভাব ও কান্তিযুক্ত শ্রীকৃষ্ণস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে আমি আমার প্রণতি নিবেদন করি।” (চৈঃ চঃ আদি ১/৫)
ভগবান শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে অবতরণের কারণ প্রসঙ্গে বিদগ্ধমাধবে (প্রথমাঙ্কে দ্বিতীয় শ্লোক) শ্রীল রূপ গোস্বামী উল্লেখ করেছেনÑ
অনর্পিতচরীং চিরাৎ করুণাবতীর্ণঃ কলৌ
সমর্পয়িতুমুন্নতোজ্জ্বলরসাং স্বভক্তিশ্রিয়ম্।
হরিঃ পুরটসুন্দরদ্যুতিকদম্বসন্দীপিতঃ
সদা হৃদয়কন্দরে স্ফুরতু বঃ শচীনন্দনঃ\
“পূর্বে যা অর্পিত হয়নি, সেই উন্নত ও উজ্জ্বল রসময়ী নিজের ভক্তিসম্পদ দান করার জন্য যিনি করুণাবশত কলিযুগে অবতীর্ণ হয়েছেন, স্বর্ণ থেকেও সুন্দর দ্যুতিসমূহ দ্বারা সমুদ্ভাসিত সেই শচীনন্দন শ্রীহরি সর্বদা তোমাদের হৃদয়-কন্দরে স্ফুরিত হোন।” লীলা পুরুষোত্তম ভগবান কলিযুগের যুগধর্ম হরিনাম সংকীর্তন প্রবর্তন ও প্রচারের জন্য এই কলিযুগে যে অবতীর্ণ হবেন, তা শ্রীমদ্ভাগবত, পুরাণ, উপনিষদ আদি বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে পরিদৃষ্ট হয়। পূর্বের কোনও প্রকার যোগ্যতা ছাড়া অকাতরে, নির্বিচারে, সকলকে দুর্লভ কৃষ্ণপ্রেম প্রদানের জন্যই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাই শ্রীল রূপ গোস্বামীপাদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে‘মহাবদান্য অবতার’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীধাম মায়াপুরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ফাল্গুনী পূর্ণিমায় চন্দ্রগ্রহণচ্ছলে হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই শ্রীধাম মায়াপুরে যে-মুহূর্তে আবির্ভূত হয়েছিলেন, ঠিক সে সময়ে চন্দ্রগ্রহণের পরিসমাপ্তি হওয়াতে লক্ষ লক্ষ বৈদিক ব্রাহ্মণ ও হিন্দুরা উচ্চস্বরে বৈদিক মন্ত্র পাঠ ও সংকীর্তন করে সকলে গঙ্গাস্নান করছিল। আর সেই হরিনামের চিন্ময় শব্দতরঙ্গে দশদিক আকাশ বাতাস মুখরিত হচ্ছিল। এভাবেই মহাপ্রভু অত্যন্ত সুকৌশলে কলিযুগের যুগধর্ম সংকীর্তনের সূচনা করেন। শিশুকালে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ক্রন্দনের ছলে হরিনাম কীর্তন করাতেন। শিশুকালে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মাঝে মধ্যে হঠাৎ কেঁদে উঠতেন। তখন পাড়া-প্রতিবেশীরা বিন্নিভাবে তাঁর ক্রন্দন থামাবার চেষ্টা করতেন, কিন্ত তিনি তাতে আরও বেশি কান্না করতেন। কিন্তু যেমাত্র হাত তালি দিয়ে সকলে মিলে উচ্চস্বরে-
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে \
এই মহামন্ত্র কীর্তন করত, তৎক্ষণাৎ শিশু নিমাই তাঁর কান্না বন্ধ করে দিয়ে হাসতে হাসতে সকলের মুখের দিকে তাকাতেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন দিব্যলীলা-বিলাস করছিলেন, তখন নবদ্বীপের সকলে তাঁকে নিমাই পণ্ডিত বলেই জানত। কিন্তু তিনি যে লীলা পুরুষোত্তম স্বয়ং ভগবান তা কেউ বুঝতে পারত না। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গোপিকাশ্রেষ্ঠ শ্রীমতী রাধারানীর ভাব অঙ্গীকার করে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। একদিন তিনি কৃষ্ণপ্রেমে উন্মত্ত হয়ে ‘গোপী’ ‘গোপী’ এই নাম জপ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর পড়–য়া ছাত্রগণ মহাপ্রভুর নিকটবর্তী হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তিনি কৃষ্ণনাম উচ্চারণ না করে গোপীনাম উচ্চারণ করছেন? মহাপ্রভু আবেশে রাগ প্রকাশ করে ঠেঙ্গা নিয়ে তাদের পিছনে তাড়া করলেন। পরিশেষে ছাত্ররা দলবদ্ধ হয়ে মহাপ্রভুকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অন্তর্যামী ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তা জানতে পারলেন। তিনি তখন ভাবতে লাগলেন, যদি এই সব ছাত্র তাঁর পাদপদ্মে অপরাধ করে, তবে কোনও দিনই তারা কৃষ্ণপ্রেম লাভ করতে পারবে না। অথচ শ্রীকৃষ্ণই মহাপ্রভুরূপে এসেছেন নির্বিচারে কৃষ্ণপ্রেম প্রদান করার জন্য। সকলেই যাতে তাঁকে শ্রদ্ধাভক্তি করে ব্রহ্মার দুর্লভ কৃষ্ণপ্রেম লাভ করতে পারে, তাই তিনি ঠিক করলেন গৃহস্থ-আশ্রম পরিত্যাগ করে সন্ন্যাস-আশ্রম গ্রহণ করবেন। কারণ সন্ন্যাসীকে সকলেই শ্রদ্ধাভক্তি করে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কাটোয়ায় কেশব ভারতীর কাছ থেকে সন্ন্যাস-ধর্ম গ্রহণ করে, শান্তিপুরে অদ্বৈত আচার্যের গৃহে শোকসন্তপ্তা ও বিরহবিধূরা শচীমাতা ও আপন প্রি
য় ভক্তদের সান্ত্বনা দানের পর শচীমায়ের অনুমোদন নিয়ে যখন জগন্নাথ পুরীতে জগন্নাথ মন্দিরে এসে প্রেমে বিহŸল হয়ে শ্রীজগন্নাথদেবকে আলিঙ্গন করবার জন্য বিগ্রহের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন, তখন গভীর ভাবের আবেগে মেঝেতে পতিত হয়ে মূর্ছাপ্রাপ্ত হলেন। নিকটেই বেদান্ত-দর্শনের ভারত বিখ্যাত দার্শনিক পণ্ডিত সার্বভৌম ভট্টাচার্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি মহাপ্রভুর সর্বাঙ্গে এই প্রকার অলৌকিক সাত্তি¡ক বিকার দর্শন করে আশ্চার্যান্বিত হলেন এবং চিন্তা করলেন, মনুষ্য-শরীরে এই প্রকার সাত্তি¡ক প্রেমের বিকার কিভাবে প্রকাশ হতে পারে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শরীরে কোন প্রকার স্পন্দন দেখতে না পাওয়ায় সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুকে তাঁর নিজের গৃহে এনে রেখেছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ পার্ষদ শ্রীল গোপীনাথ আচার্য সার্বভৌম ভট্টাচার্যকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে, মহাপ্রভু হচ্ছেন স্বয়ং ঈশ্বর। কিন্তু সার্বভৌম ভট্টাচার্য তা অস্বীকার করে গোপীনাথ আচার্যকে বললেন যে, তিনি কিসের ভিত্তিতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে ঈশ্বর বলে স্বীকার করছেন, তা ছাড়া কলিযুগে ভগবানের কোনও অবতার নেই। তখন গোপীনাথ আচার্য ঈশ্বরের অন্তর ও বহির লক্ষণ ব্যাখ্যা করে শাস্ত্রে যে কলিযুগে ভগবানের অবতার আছে, তা মহাভারত (দানধর্ম বিষ্ণুসহস্রনাম-স্তোত্র) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে শোনালেনÑ
সুবর্ণবর্ণো হেমাঙ্গো বরাঙ্গশ্চন্দনাঙ্গদী।
সন্ন্যাসকৃচ্ছমঃ শান্তো নিষ্ঠাশান্তিপরায়ণঃ \
“ভগবান তপ্ত কাঞ্চনের মতো অঙ্গকান্তি ধারণ করে (গৌরসুন্দর রূপে) অবতীর্ণ হবেন। তাঁর সুন্দর রূপ তপ্ত কাঞ্চনের মতো এবং চন্দনে চর্চিত। তিনি সন্ন্যাস-আশ্রম অবলম্বন করে কঠোরভাবে আত্মসংযমী হবেন এবং মায়াবাদী সন্ন্যাসীদের মতো নির্বিশেষবাদী না হয়ে তিনি ভগবৎ-ভক্তিতে নিষ্ঠাপরায়ণ হবেন এবং সংকীর্তন আন্দোলনের সূচনা করবেন।”
পরে সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুকে সাতদিন ধরে বেদান্ত-দর্শন শ্রবণ করিয়েছিলেন। মহাপ্রভু তার ভ্রান্ত নির্বিশেষপর মায়াবাদী ব্যাখ্যা খণ্ডন করে বেদান্তের নির্ভুল সবিশেষ-তত্ত¡ ব্যাখ্যা করলেন এবং পরিশেষে তাঁকে ষড়ভুজরূপে দর্শন দান করে এক মহান ভক্তরূপে পরিণত করলেন। সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুর কৃপা প্রাপ্ত হয়ে তাঁকে একশো শ্লোকদ্বারা বন্দনা করেছিলেন। সার্বভৌম ভট্টাচার্যের মতো অনেকেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুই যে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তা জানতে পারেননি। কারণ ভগবানের কৃপা ছাড়া ভগবানকে জানা যায় না। শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র যে শচীসূতরূপে অবতীর্ণ হবেন তা ভবিষ্যৎ পুরাণেও উল্লেখ আছে-
অজায়ধ্বমজায়ধ্বজয়ধ্বং ন সংশয়ঃ।
কলৌ সংকীর্তনারম্ভে ভবিষ্যামি শচীসুতঃ \
“কলিযুগে সংকীর্তন আরম্ভে আমি শচীসূতরূপে জন্মগ্রহণ করব, জন্মগ্রহণ করব, জন্মগ্রহণ করব, সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।” শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (আদি ৩/৪০) উল্লেখ আছেÑ
কলিযুগে যুগধর্মÑনামের প্রচার।
তথি লাগি’ পীতবর্ণ চৈতন্যাবতার \
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখনই অবতীর্ণ হন, তখনই তিনি নবদ্বীপের অন্তর্দ্বীপে অন্তর্গত এই শ্রীধাম মায়াপুরে শচীমায়ের গর্ভে অবতীর্ণ হন। তবে শ্রীকৃষ্ণের মতো তিনিও প্রতি কলিযুগে অবতীর্ণ হন না। তিনি ব্রহ্মার দিবসে অর্থাৎ এক হাজার চতুর্যুগের মধ্যে একবার মাত্র অবতীর্ণ হন। সেই সম্বন্ধে শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (আদি ৩/১০) উল্লেখ করা হয়েছে-
অষ্টাবিংশ চতুর্যুগে দ্বাপরের শেষে।
ব্রজের সহিত হয় কৃষ্ণের প্রকাশে \
“বৈবস্বত মন্বন্তরের অষ্টাবিংশ চতুর্যুগের দ্বাপরের শেষভাগে কৃষ্ণ নিজে ব্রজতত্তে¡র সমস্ত উপকরণ সহ প্রকাশ পান।” সেই প্রকার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও দ্বাপরের পরেই কলিতেই অবতীর্ণ হন। তিনি এসে কি করেন? অনর্পিত বস্তু প্রদান করেন, যা ভগবানের অন্য কোন অবতার ইতিপূর্বে প্রদান করেননি। তা হচ্ছে কৃষ্ণপ্রেম, বিশেষ করে ব্রজের পরকীয়া মাধুর্য প্রেম, যাকে উন্নতোজ্জ্বল রস বলা হয়েছে।
Share:

প্রহ্লাদ মহারাজ কর্তৃক সহপাঠীদের উপদেশ


প্রহ্লাদ মহারাজ, যিনি ছিলেন যথার্থই মহা জ্ঞানী, তিনি তাঁর সহপাঠীদের অত্যন্ত মধুর বাক্যে সম্ভাষণ করে, হেসে জড়-জাগতিক জীবনের নিরর্থকতা সম্বন্ধে শিক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন। তাদের প্রতি অত্যন্ত কৃপাপরবশ হয়ে, তিনি তাদের নিম্নলিখিত উপদেশগুলি দিয়েছিলেন।[৭/৫/৫৫]


হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, সমস্ত বালকেরা প্রহ্লাদ মহারাজের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত এবং শ্রদ্ধাশীল ছিল। তাদের অল্প বয়সের ফলে, দ্বৈতভাব এবং দেহসুখের প্রতি আসক্ত শিক্ষকদের উপদেশের দ্বারা তাদের অন্তঃকরণ দূষিত হয়নি। তারা তাদের খেলার সমস্ত উপকরণ পরিত্যাগ করে, প্রহ্লাদ মহারাজের কথা শ্রবণ করার জন্য তাঁকে ঘিরে বসেছিল। তাদের হৃদয় এবং নেত্র তাঁর উপর নিবদ্ধ ছিল এবং গভীর নিষ্ঠা সহকারে তারা তাঁর দিকে তাকিয়ে তাঁর কথা শুনছিল। অসুরকুলে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও প্রহ্লাদ মহারাজ ছিলেন একজন মহাভাগবত, এবং তিনি তাদের মঙ্গল কামনা করেছিলেন। তার ফলে তিনি তাদের জড়-জাগতিক জীবনের নিরর্থকতা সম্বন্ধে উপদেশ দিতে শুরু করেছিলেন। [৭/৫/৫৬-৫৭]


দৈত্যবালকদের প্রতি প্রহ্লাদের উপদেশ


প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন-প্রাজ্ঞ ব্যক্তি মনুষ্যজন্ম লাভ করে জীবনের শুরু থেকেই, অর্থ্যাৎ বাল্যকাল থেকেই, অন্য সমস্ত প্রয়াস ত্যাগ করে ভাগবত-ধর্ম অনুষ্ঠান করবেন। মনুষ্যজন্ম অত্যন্ত দূর্লভ, এবং অন্যান্য শরীরের মতো অনিত্য হলেও তা অত্যন্ত অর্থপূর্ণ, কারণ মনুষ্য-জীবনে ভগবানের সেবা সম্পাদন করা সম্ভব। নিষ্ঠাপূর্বক কিঞ্চিৎমাত্র ভগবদ্ভক্তির অনুষ্ঠান করলেও মানুষ পূর্ণসিদ্ধি লাভ করতে পারে। [৭/৬/১]


মনুষ্য-জীবন ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার সুযোগ প্রদান করে। তাই প্রতিটি মানুষের অবশ্য কর্তব্য ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্মের সেবায় যুক্ত হওয়া। এই ভগবদ্ভক্তি স্বাভাবিক, কারণ ভগবান শ্রীবিষ্ণু সকলেরই পরম প্রিয়, পরমাত্মা এবং পরম সুহৃদ্। [৭/৬/২]


প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন-হে দৈত্য-কুলোদ্ভূত বন্ধুগণ, দেহের সঙ্গে ইন্দ্রিয়-বিষয়ের সংযোগবশত যে ইন্দ্রিয় সুখ তা যে কোন যোনিতেই পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে লাভ হয়ে থাকে। এই প্রকার সুখ আপনা থেকেই কোন রকম প্রচেষ্টা ছাড়াই লাভ হয়, ঠিক যেমন বিনা প্রয়াসে দু:খলাভ হয়।[৭/৬/৩]




ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ অথবা অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের মাধ্যমে জড়সুখ ভোগের প্রয়াস করা উচিত নয়, কারণ তার ফলে বাস্তবিক কোন লাভ হয় না, পক্ষান্তরে কেবল সময় এবং শক্তিরই অপচয় হয়। মানুষের প্রয়াস যদি কৃষ্ণভক্তির দিকে পরিচালিত হয়, তা হলে নি:সন্দেহে আত্ম-উপলব্ধির চিন্ময় স্তর প্রাপ্ত হওয়া যায়। অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনে যুক্ত হওয়ার ফলে কোন লাভ হয় না। [৭/৬/৪]


অতএব জড় জগতে অবস্থান কালে (ভবমাশ্রিতঃ) পূর্ণরূপে সুযোগ্য ব্যক্তির কর্তব্য সৎ এবং অসতের পার্থক্য নিরূপণ করে, যে পর্যন্ত এই পরিপুষ্ট মানব-শরীরটি রয়েছে, ততক্ষণ ভীত না হয়ে জীবনের চরম উদ্দেশ্য লাভের জন্য যত্নশীল হওয়া। [৭/৬/৫]


মানুষের আয়ু বড় জোর একশ বছর। কিন্তু যে ব্যক্তি অজিতেন্দ্রিয়, তার সেই একশ বছরের অর্ধেক সময় অনর্থক অতিবাহিত হয়, কারণ অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে, রাত্রিবেলায় সে বার ঘন্টা ঘুমিয়ে থাকে। অতএব এই প্রকার ব্যক্তির আয়ুষ্কাল মাত্র পঞ্চাশ বছর। [৭/৬/৬]


বাল্যকালে মোহগ্রস্ত অবস্থায় দশ বছর অতিবাহিত হয়। তেমনই, কৈশোরে খেলাধুলায় মগ্ন থেকে আরও দশ বছর অতিবাহিত হয়। এইভাবে কুড়ি বছর বিফলে যায়। তেমনই, বৃদ্ধ বয়সে জরাগ্রস্ত হয়ে জড়-জাগতিক কার্যকলাপ অনুষ্ঠান করতে অক্ষম হওয়ার ফলে, আরও কুড়ি বছর বৃথা অতিবাহিত হয়। [৭/৬/৭]


যার মন এবং ইন্দ্রিয় অসংযত, তার অতৃপ্ত কামনা এবং প্রবল মোহের ফলে, পারিবারিক জীবনের প্রতি সে অত্যন্ত আসক্ত হয়। এই প্রকার উন্মত্ত ব্যক্তির বাকি জীবনও বিফলে যায়, কারণ সেই কয়টি বছরেও সে ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হতে পারে না। [৭/৬/৮]


গৃহস্থ-জীবনের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত কোন্ অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি মুক্ত হতে সমর্থ হয়? গৃহাসক্ত ব্যক্তি তার স্ত্রী-পুত্র এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের প্রতি স্নেহরূপ রজ্জুর দ্বারা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ। [৭/৬/৯]


ধন মানুষের এতই প্রিয় যে, সে ধনকে মধু থেকেও মধুরতর বলে মনে করে। তাই, সে ধন সংগ্রহের বাসনা কে ত্যাগ করতে পারে, বিশেষ করে গৃহস্থ-জীবনে? তস্কর, পেশাধারী ভৃত্য (সৈনিক)এবং বণিক-এরা নিজের প্রিয়তম প্রাণকে বিপন্ন করেও অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করে।[৭/৬/১০]


যে ব্যক্তি তার পরিবারের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, যার অন্তরের অন্তঃস্থল সর্বদা তাদের চিত্রে পূর্ণ, সে কিভাবে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে পারে? বিশেষত, স্নেহশীলা এবং সহানুভূতিশীলা পত্নীর নির্জন সঙ্গ স্মরণ করলে, কে তাকে পরিত্যাগ করতে পারে? শিশুদের মধুর আধো আধো বুলি স্মরণ করলে কোন্ স্নেহশীল পিতা তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করতে পারে? বৃদ্ধ পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা এরা সকলেই অত্যন্ত প্রিয়। কন্যা বিশেষ করে পিতার অত্যন্ত প্রিয় হয়, এবং যখন সে তার পতিগৃহে চলে যায়, তখন তার কথা পিতার সব সময় মনে হয়। সেই সঙ্গ কে পরিত্যাগ করতে পারে? আর তা ছাড়া গৃহে নানা রকম ভোগের উপকরণ থাকে, গৃহপালিত পশু এবং ভৃত্য থাকে। সেই সুখ কে পরিত্যাগ করতে পারে? গৃহাসক্ত ব্যক্তির অবস্থা ঠিক রেশমকীটের মতো, যে কোষ সে তৈরি করে, সেই কোষে বন্দী হয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারে না। কেবল জিহ্বা এবং উপস্থ-এই দুটি ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধনের জন্য মানুষ এই জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিভাবে সে তা থেকে মুক্তিলাভ করতে পারে? [৭/৬/১১-১৩]


যে ব্যক্তি অত্যন্ত আসক্ত সে বুঝতে পারে না যে, তার কুটুম্ব ভরণ-পোষণে সে তার জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় করছে। সে এও বুঝতে পারে না যে, পরম সত্যকে উপলব্ধি করার অত্যন্ত অনুকূল এই মনুষ্যজীবন সে অনর্থক নষ্ট করছে। কিন্তু, সে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা এবং সাবধানতার সঙ্গে দেখে যে, একটি পয়সাও যেন অনর্থক নষ্ট না হয়। এইভাবে জড় বিষয়াসক্ত ব্যক্তি নিরন্তর ত্রিতাপ দু:খ ভোগ করা সত্ত্বেও তার জড় অস্তিত্বের প্রতি বিতৃষ্ণা বোধ করে না।[৭/৬/১৪]


যদি কোন ব্যক্তি তার কুটুম্ব ভরণ-পোষণের কর্তব্যের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়, তা হলে সে তার ইন্দ্রিয়গুলি বশীভূত করতে পারে না এবং তার মন সর্বদাই ধন সংগ্রহের চিন্তায় মগ্ন থাকে। যদিও সে জানে যে পরের ধন অপহরণ করার ফলে সে আইনের দ্বারা দণ্ডিত হবে এবং মৃত্যুর পর যমরাজের আইনে দণ্ডভোগ করবে, তবুও সে ধন সংগ্রহ করার জন্য অন্যদের প্রতারণা করতে থাকে। [৭/৬/১৫]


হে বন্ধু, দানব-নন্দনগণ! এই জড় জগতে আপাতদৃষ্টিতে বিদ্বান ব্যক্তিরাও মনে করে, “এটি আমার এবং ওটি অন্যের।” তার ফলে তারা সর্বদাই অশিক্ষিত কুকুর-বিড়ালের মতো তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য জীবনের আবশ্যকতাগুলি প্রদান করার কাজে সর্বদা ব্যস্ত থাকে। তারা আধ্যাত্মিক জ্ঞান গ্রহণ করতে পারে না। পক্ষান্তরে তারা অজ্ঞানের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন হয়। [৭/৬/১৬]


হে আমার বন্ধু দৈত্যনন্দনগণ, কোন দেশে অথবা কোন কালে ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান-বিহীন ব্যক্তি নিজেকে জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে পারেনি। পক্ষান্তরে সেই সমস্ত ভগবদ্বিমুখ ব্যক্তিরা জড়া প্রকৃতির নিয়মে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। তারা প্রকৃতপক্ষে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের প্রতি আসক্ত, এবং তাদের একমাত্র লক্ষ্য স্ত্রীসম্ভোগ। বস্তুতপক্ষে তারা সুন্দরী রমণীর হস্তে ক্রীড়ামৃগতুল্য। এই প্রকার জীবনের শিকার হয়ে তারা পুত্র, পৌত্র এবং প্রপৌত্রদের দ্বারা পরিবোষ্টিত হয়, এবং এইভাবে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। যারা এই প্রকার জীবনের প্রতি আসক্ত, তাদের বলা হয় অসুর। অতএব, যদিও তোমরা দৈত্যনন্দন, সেই প্রকার ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাক এবং আদিদেব ভগবান শ্রীনারায়ণের শরণ গ্রহণ কর। কারণ নারায়ণের ভক্তদের চরম লক্ষ্য জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া। [৭/৬/১৭-১৮]


হে অসুর-নন্দনগণ, পরমেশ্বর ভগবান নারায়ণই সমস্ত জীবের মূল পরমাত্মা এবং পরম পিতা। তাই তাঁকে সন্তুষ্ট করতে অথবা তাঁর আরাধনা করতে বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে কারুরই কোন রকম প্রতিবন্ধকতা নেই। জীব এবং ভগবানের সম্পর্ক সর্বদাই বাস্তব, এবং তাই অনায়াসে ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করা যায়। [৭/৬/১৯]


পরম ঈশ্বর ভগবান যিনি অচ্যুত এবং অব্যয়, তিনি বৃক্ষলতা আদি স্থাবর জীব থেকে শুরু করে ব্রহ্মা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার জীবের মধ্যে বিরাজমান। তিনি নানা প্রকার জড় সৃষ্টিতে, জড় উপাদানে, মহত্তত্ত্বে, প্রকৃতির গুণে (সত্ত্বগুণ, রজোগুণ এবং তমোগুণ), অব্যক্ত প্রকৃতিতে এবং অহংকারেও বিরাজমান। তিনি যদিও এক, তবুও তিনি সর্বত্র বিরাজমান, এবং তিনি চিন্ময় পরমাত্মা এবং সর্বকারণের পরম কারণ, যিনি সমস্ত জীবের অন্তরে সাক্ষীরূপে বিরাজ করেন। তাঁকে ব্যাপ্য এবং সর্বব্যাপ্ত পরমাত্মা বলে ইঙ্গিত করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি বর্ণনাতীত। তিনি অবিকারী এবং অবিভাজ্য। তাঁকে কেবল পরম সচ্চিদানন্দরূপে অনুভব করা যায়। নাস্তিকদের কাছে মায়ার আবরণে আচ্ছাদিত থাকার ফলে, তারা মনে করে যে তাঁর অস্তিত্ব নেই। [৭/৬/২০-২৩]


অতএব দৈত্য কুলোদ্ভুত আমার বালক বন্ধুগণ, তোমরা সকলে এমনভাবে আচরণ কর যাতে অধোক্ষজ ভগবান তোমাদের প্রতি প্রসন্ন হন। তোমাদের আসুরিক প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে শত্রুতা এবং দ্বৈতভাব রহিত হয়ে কর্ম কর। ভগবদ্ভক্তির জ্ঞান প্রদান করে সমস্ত জীবের প্রতি তোমাদের করুণা প্রদর্শন কর, এবং এইভাবে তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী হও। [৭/৬/২৪]


সর্বকারণের পরম কারণ, সবকিছুর আদি উৎস ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করেছেন যে সমস্ত ভক্তেরা, তাঁদের পক্ষে কিছুই অপ্রাপ্য নয়। ভগবান অন্তহীন চিন্ময় গুণের উৎস। তাই, গুণাতীত ভক্তদের কাছে ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মুক্তির প্রচেষ্টা করার কি প্রয়োজন-যা প্রকৃতির গুণের প্রভাবে আপনা থেকেই লাভ হয়? আমরা ভগবদ্ভক্তেরা সর্বদাই ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের মহিমা কীর্তন করি, এবং তাই আমাদের ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ আদির বাসনা করার কোন প্রয়োজন হয় না। [৭/৬/২৫]


ধর্ম, অর্থ এবং কাম-এই তিনটিকে বেদে ত্রিবর্গ বা মোক্ষ লাভের তিনটি উপায় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই তিনটি বর্গের মধ্যেই আত্ম-উপলব্ধির বিদ্যা, বৈদিক নির্দেশ অনুসারে কর্ম অনুষ্ঠানের পন্থা, তর্কশাস্ত্র, দণ্ডনীতি এবং জীবিকা নির্বাহের বিভিন্ন বৃত্তি নিহিত রয়েছে। এগুলি বেদ অধ্যয়নের বাহ্য বিষয়, এবং তাই আমি এগুলিকে জড়-জাগতিক বলে মনে করি। কিন্তু, পরম পুরুষ শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্মে আত্ম-নিবেদনের পন্থাকে আমি দিব্য বলে মনে করি। [৭/৬/২৬]


সমস্ত জীবের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সুহৃদ ভগবান প্রথমে এই দিব্য জ্ঞান দেবর্ষি নারদকে উপদেশ দিয়েছিলেন। নারদ মুনির মতো মহাত্মার কৃপা ব্যতীত এই জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু যিনি শ্রীনারদ মুনির পরম্পরার শরণ গ্রহণ করেন, তিনি এই গুহ্য জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। [৭/৬/২৭]


প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন-এই জ্ঞান আমি দেবর্ষি নারদ মুনির কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়েছি, যিনি সর্বদা ভগবানের সেবায় যুক্ত। এই জ্ঞান, যাকে বলা হয় ভাগবত-ধর্ম, তা সর্বতোভাবে বিজ্ঞানসম্মত। তা ন্যায় এবং দর্শনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, এবং সমস্ত জড় কলুষ থেকে মুক্ত।[৭/৬/২৮]


দৈত্যনন্দনেরা বলল-হে প্রহ্লাদ, তুমি অথবা আমরা শুক্রাচার্যের পুত্র ষণ্ড এবং অমর্ক ব্যতীত অন্য কোন গুরুকে জানি না। আমরা শিশু এবং তারা আমাদের নিয়ন্তা। বিশেষ করে তোমার পক্ষে, যে সর্বদা প্রাসাদে থাকে, তার মহাত্মার সঙ্গ করা অত্যন্ত কঠিন। হে সৌম্য, দয়া করে আমাদের বল কিভাবে তুমি নারদ মুনির উপদেশ শ্রবণ করেছিলে? দয়া করে আমাদের এই সংশয় দূর কর। [৭/৬/২৯-৩০]
Share:

আমেরিকায় মন্দির ও হিন্দুরা

১১-ই সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩ সন। শিকাগো বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনের প্রাঙ্গন। গৈরিক বসনধারী দীর্ঘকায় এক পুরুষ মঞ্চে উঠে বললেন -  “I thank you in the name of the millions of Hindu people of all classes and sects."  দূর সাগরের পারে আমেরিকায় জনসমাজের সম্মূখে তিনি হিন্দুধর্মকে পরিচিত করালেন - "I am proud to belong to a religion which has taught the world both tolerance and universal acceptance. We believe not only in universal toleration, but we accept all religion as true." গম্ভীর মন্দ্র স্বরের বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে স্ত্রোত্র উচ্চারণের মাধ্যমে তিনি তাঁর ভগবৎ বিশ্বাসের কথা শোনালেন উপস্থিত শ্রোতৃমন্ডলীকে - “As the different streams having their sources in different places all mingle their water in the sea, O Lord, the different paths which men take through different  tendencies, various though they appear, crooked or straight, all lead to Thee." পৌত্তলিকতার বাইরে হিন্দুধর্মের মূলকথা যে পরধর্মসহিষ্ণুতা ও মনুষ্যত্বের ভজনা, সেই কথাই বিশ্ববাসীর সামনে বলে রাখলেন, - “I fervently hope that the bell that tolled this morning in honor of this convention may be the death-knell of all fanaticism, of all persecution with the sword or with the pen, and of all uncharitable feelings between persons wending their way to the same goal." এই ব্যক্তি আর কেউই নন - তিনি পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবশিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ।

যদিও বিবেকানন্দই সেই ব্যক্তি যিনি আমেরিকার বুকে হিন্দুধর্মকে সরাসরি পরিচিত করিয়েছিলেন, কিন্তু অনেকেই একথা মনে করেন যে হিন্দুধর্মের চর্চা অভিবাসীদের মাধ্যমে এদেশে ছিল প্রায় এর জন্মলগ্ন থেকেই। যদিও এই ধারণার বাস্তব ভিত্তি কতটা, সেটা তর্কসাপেক্ষ। তবে আমেরিকানদের সঙ্গে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির পরিচয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় আরও অনেক আগে। তৎকালীন আমেরিকার বিদ্বৎসমাজের দুই প্রতিভূ - Ralph Waldo Emerson এবং Henry David Thoreau - শ্রীমৎভাগবত গীতা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করছিলেন সেই সময়। সেই সময়কার বিভিন্ন চিঠিপত্র ও পত্রপত্রিকায় এই দুই লেখক ভবগত গীতা সম্পর্কে তাঁদের গবেষণালব্ধ চিন্তা ও সমীক্ষার অনেক নিদর্শন রেখে গেছেন। “Over Soul” নামে একটি প্রবন্ধে Ralph-এর চিন্তায় বেদিক দর্শনের প্রভাব পরিস্কার লক্ষ্যণীয়। তাঁরা দুজনেই একমত হয়ে বলেছিলেন গীতা এশীয় সংস্কৃতির এক অনবদ্য অবদান। গীতার দার্শনিক মূল্য যেমন অনস্বীকার্য্য, তেমনি আত্মোপলব্ধি, আত্মনুসন্ধান ও আত্মসংযম অভ্যাসের ক্ষেত্রেও গীতার তাৎপর্য্য অপরিসীম। শিকাগোর বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনের প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা এসব।

বিশ্ব ধর্মসম্মেলনোত্তর স্বামী বিবেকান্দের উদ্যোগই আমেরিকার বুকে হিন্দুধর্মকে পরিচিত করানোর প্রথম সংঘবদ্ধ উদ্যোগ একথা বললে অত্যুক্তি হয় না। মন্দির তখন আমেরিকাতে ছিল না। শিকাগোর মহাসম্মেলনের পর স্বামীজী আরও বছর দুই এদেশে কাটিয়েছিলেন এবং বস্টন, ডেট্রয়েট, নিউ ইয়র্ক প্রভৃতি অঞ্চলে বক্তৃতা করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে স্বামীজী নিউ ইয়র্কে ‘বেদান্ত সোসাইটি’ স্থাপন করলেন। বলা চলে এইটি আমেরিকার বুকে হিন্দু মন্দির স্থাপনের প্রথম ধাপ। সেই সময় এদেশীও অভিবাসীদের মধ্যে বেদান্ত-দর্শনের চর্চাই ছিল এই সোসাইটির উদ্দেশ্য। এর অব্যবহিত পরেই বাবা প্রেমানন্দ সরস্বতী আমেরিকায় থেকে প্রায় বছর পাঁচেক ধরে হিন্দু ধর্মের শিক্ষা নিয়ে বক্তৃতা করলেন এবং অবশেষে ‘কৃষ্ণসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করলেন। স্বামী পরমানন্দ বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নিউ ইর্য়ক বেদান্ত সোসাইটির দায়িত্বভার নিয়ে এলেন এবং শেষ পর্য্যন্ত বস্টন এবং লস এঞ্জেলেস-এ বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করলেন।

বলা হয়ে থাকে যে আমেরিকার প্রথম হিন্দু মন্দির স্থাপিত হয়েছিল ১৯০৬ সালে সান ফ্রান্সিস্কোতে। বেদান্ত সোসাইটির উদ্যোগে। তারপর আরও দুটি মন্দিরের কথা জানা যায়। ১৯৩৮ সালে হলিউড মন্দির ও ১৯৫৬ সালে সান্টা বারবারা মন্দির। যেহেতু এই সব মন্দিরগুলো স্থাপিত হয়েছিল বেদান্ত সোসাইটির তত্বাবধানে, এদের মূল লক্ষ্য ছিল বেদান্ত দর্শন এবং হিন্দু শাস্ত্র পঠন পাঠন। বেদান্তের শিক্ষার প্রধান কথা আত্মোপলব্ধি এবং মূল মন্ত্র হল মানুষই ঈশ্বর। পৌত্তলিক বিগ্রহ পূজা বেদান্তের লক্ষ্য নয়। তাই হিন্দু ধর্মবালম্বী যে সব সম্প্রদায় শিব, বিষ্ণু, নারায়ণ ইত্যাদি বহুরুপে ঈশ্বরের ভজনায় অভ্যস্ত, তাদের স্বদেশীয় মন্দিরের ধারনার সঙ্গে বেদান্তের ধারণার তফাৎ রয়েই গেল। অভাব পূরণ হল না। দেশের মত অপরূপ স্থাপত্য- ভাস্কর্য্যের মহিমামন্ডিত বিগ্রহ মন্দির গঠনের ইচ্ছা অভিবাসীদের মনে জেগে রইল তখনকার মত। সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না কেন না সেইরকম মন্দির গড়বার জন্য যে বিপুল অর্থ ও লোকবল দরকার, আমেরিকায় তখনও তা ছিল না। অভিবাসী হিন্দুর সংখ্যা তখনও আমেরিকায় নগন্যই বলা চলে।

১৯৬৫ সালে Immigration and Nationality Services (INS) Act চালু হওয়ার পর আমেরিকায় অভিবাসনের দরজা যেন খুলে গেল। ছাত্র, গবেষক, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ এবং ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে এদেশে আসতে শুরু করলেন এবং এদেশেই পাকাপাকি ভাবে বসবাস করতে শুরু করলেন। এদের সঙ্গে সঙ্গেই সম্প্রদায়ের ধর্মপ্রচারকেরাও। আবারও বলা ভাল এই প্রচার যতটা না ছিল আমেরিকার মূল স্রোতের মধ্যে হিন্দু র্ধম ও দর্শন সম্বন্ধে উৎসাহ জাগিয়ে তোলা, ততটা ছিল এদেশীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মাচরণের প্রয়োজনীয়তা মেটানো। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউ ইয়র্কে এসে পৌছালেন স্বামী প্রভুপাদ। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন -  ISKCON- International Society for Krishna Consciousness.

সনাতন ভারতীয় হিন্দু ভাবধারায় মূলতঃ দু’টি দিক দেখা যায়। প্রথমটি - ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ এবং দ্বিতীয়টি, প্রতিষ্ঠানিক এবং পূজারী নির্ভর ধর্মাচরণ এবং পূজাবিধি। প্রথমটির কোন প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই। দ্বিতীয়টির জন্য দেবস্থান বা মন্দির এবং পুরোহিত দরকার। আমেরিকাতেও হিন্দু ধর্ম-প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোটামুটি এই দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। বেদান্ত সোসাইটির মত আর যে সব প্রতিষ্ঠান এখানে যোগাভ্যাস, ধ্যান এবং হিন্দু শাস্ত্র পঠন পাঠনের ব্যবস্থা রেখেছে তারা প্রথম শ্রেণীভূক্ত।

১৯৬৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকাতে প্রধানতঃ এই ধারারই প্রচলন দেখা গেছে। ১৯৬৫ সালের পর প্রতিষ্টিত ইস্কন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচরণের প্রথম ক্ষেত্র বলা যেতে পারে। চৈতন্য-অনুসারী কৃষ্ণ-প্রেম ও ভক্তিই এদের মূল দর্শন। কৃষ্ণই প্রধান বিগ্রহ।  এদের বেশীর ভাগ ভক্তকুলই উত্তর ভারতীয়। যদিও এদের বেশ কিছু সংখ্যক অভারতীয় ভক্ত সম্প্রদায় আছেন। ভক্তরা মন্দিরে মিলিত হয়ে ‘হরেকৃষ্ণ’ মন্ত্রোচ্চারণ, ভক্তি-সঙ্গীত গায়ন এবং আরতি ও পূজাপাঠের মাধ্যমে ঈশ্বরের আশীর্বাদ অভিলাষী। আরতি-গান -কীর্তনের পর প্রসাদ বিতরণ। বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে ধর্মীয় ও তাত্বিক অনুশাসন সম্পর্কিত বক্তৃতাও চলে।

১৯৬৫ সালের পর থেকে, বিশেষ করে গত শতকের আশির দশকের পর থেকে অসংখ্য প্রযুক্তিবিদ এবং ছাত্র ভারত থেকে এদেশে এসেছেন। তার সঙ্গে আছে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। এই বিপুল সংখ্যক হিন্দু অভিবাসীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর্থিকভাবে সচ্ছল। দেশের মাটি থেকে বহুদূরে থাকার জন্যই তারা স্বদেশের বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান ও ধর্মাচরণ বিধির জন্য আকর্ষণ বোধ করেন। মূলতঃ এই শ্রেণীর উদ্যোগেই আমেরিকায় একের পর এক মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়ে চলেছে। পরিসংখ্যান বলে যে সারা উত্তর আমেরিকা জুড়ে হিন্দু মন্দিরের সংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে চারশো। বোর্ড অফ ট্রাষ্টি পরিচালিত এই সব মন্দিরের পূজা-বিধির ভার ন্যাস্ত থাকে দেশ থেকে আগত পূজারী বা পুরোহিতের উপর। অধিকাংশ মন্দিরের স্থাপত্য ভাস্কর্য্য ও বাহ্যিক শোভায় দেশের বিশিষ্ট মন্দিরের অনুকরন দেখা যায়। এই শ্রেণীর প্রথম মন্দির পিটসবার্গের শ্রী ভেস্কটেশ মন্দির। স্থাপিত জুন, ১৯৭৬ সালে। তার পরের বছরই নিউ ইয়র্কের ফ্লাশিং-এ প্রতিষ্ঠা হল শ্রী গণপতি দেবস্থানম। ১৯৮১-তে ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যালিব্যু হিন্দু মন্দির। এরই প্রায় সমসাময়িক লিভারমুরের (ক্যালিফোর্নিয়া) শিব-বিষ্ণু মন্দির। ১৫-ই জুন, ১৯৮৫।

মন্দির বলতে প্রথমেই ধর্মাচরণের স্থান মনে আসে। মন্দির মানে দেবস্থান, দেবতার বাসগৃহ। পূজা-অর্চনা ছাড়া আর কিছু মন্দিরের আওতায় আসে না। দেশের প্রেক্ষিতে এই ধারণা সর্বাংশে সত্য হলেও আমেরিকার হিন্দু মন্দিরে দু’টি অন্য মাত্রা যোগ হয়েছে। প্রথমতঃ মন্দিরের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দ্বিতীয়তঃ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন। একথা বলে রাখা ভাল আমেরিকায় হিন্দু মন্দিরের  এই বিপুল সংখ্যা কিন্তু কোনভাবেই প্রমান করে না যে হিন্দু ধর্ম বা বিশ্বাস আমেরিকার মূলস্রোতে বিরাট প্রভাব ফেলেছে। বরঞ্চ বলা যেতে পারে এইসব মন্দির ও তাদের কার্য্যকলাপ বিপুল সংখ্যাক ভারতীয় হিন্দু অভিবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে যে শূন্যতা ছিল তা পূরণে সর্মথ হয়েছে। অবশ্য সারা আমেরিকা জুড়ে মন্দিরের প্রসার ও বিস্তারের ফলে আমেরিকার মূলস্রোতে হিন্দু ধর্ম যে কিছুটা হলেও পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সেটা স্বীকার না করলে মিথ্যা ভাষণ হবে। তার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ২০০৭-এর ১২ই জুলাই আমেরিকার সিনেটে প্রথম হিন্দু শাস্ত্র থেকে প্রার্থনা ও মন্ত্রোচ্চারণ। প্রার্থনা পরিচালনা করেছিলেন  Rajan Zed, নেভাডার এক হিন্দু ধর্মযাজক। আমেরিকার ২১৮ বছরের সিনেটের ইতিহাসে এ রকম ঘটনার নজির আর নেই।

যাই হোক, আমেরিকার পটভূমিতে এই মন্দিরগুলি প্রধানত চারটি দায়িত্ব পালন করে থাকেঃ

১)  নিজেদের শেকড় ও সংস্কৃতি সম্বদ্ধে জনচেতনা গড়ে তোলার এবং সেই ভিত্তির উপর এক নতুন চিন্তা ও দর্শনের উদ্ভবের পথ সুগম করে তোলা।
২)  অপেক্ষাকৃত তরুণ সমাজের কাছে শাশ্বত হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির বিশ্বাস ও অনুশাসনগুলিকে সহজবোধ্য উপায়ে তুলে ধরা যাতে করে ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোঁড়া ধর্মীয় প্রচেষ্ঠাকে চিনে নেওয়া যায়।
৩)  হিন্দু ধর্মের আদর্শকে আমেরিকার প্রেক্ষিতে ব্যবহার করে এখানকার জনজীবনের সমস্যার গভীর অসুসন্ধান ও সমাধানের পথনির্দেশ।
৪)  হিন্দু ধর্মের মানবিক ও দার্শনিক চিন্তাভাবনার সাথে অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসের মেলবদ্ধনের প্রচেষ্টা।

একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে যে মন্দিরগুলি এখানে যতটাই ধর্মীয় উৎসব-অনুশাসনের চর্চার ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হয়, ঠিক ততটাই ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়। প্রায় বেশীরভাগ মন্দির কমিটির সঙ্গে ÔCultural Center' কথাটির ব্যবহার এই ধারণাকে সমর্থন করে। প্রায়শই দেখা যায় মন্দিরের একটি নিজস্ব কম্যুনিটি হল থাকে যা কিনা মন্দিরের নিজস্ব ব্যবহারের বাইরে অন্যান্য সংস্থার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ ক্যালফোর্নিয়ার সাভিনেল হিন্দু মন্দির ও কালচারাল সেন্টার, লিভারমুর শিব-বিষ্ণু মন্দিরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। লিভারমুর মন্দির সংস্থা-তে সংস্কৃত ভাষা ও যোগ ব্যায়াম শিক্ষার ব্যবস্থাও রেখেছে। স্যান লিয়ান্ড্রোর বদরিকাশ্রম তাদের প্রাঙ্গন উন্মুক্ত রেখেছেন নৃত্য-গীত ও অন্যান্য শিল্পকলার চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবে। পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি এখানে নিয়মিত সাঙ্গীতিক ও নৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। খরা-বন্যা-ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় এইসব মন্দিরগুলি ত্রাণের ব্যবস্থা করে সাহায্যের হাত বাড়ায়। সে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশেই হোক বা ছেড়ে আসা দেশে। অনেক মন্দির ভারতের দুঃস্থ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য স্কুল চালায় বা চালানোতে সাহায্য করে।

হিন্দু ধর্মে ধর্মীয় অনুসাশন এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক-দৈনন্দিন জীবন এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে একটিকে অন্যের থেকে আলাদা করাই ভার। আমেরিকার হিন্দু মন্দিরগুলি এই মেলবন্ধনের কাজটি প্রায় নিখুঁত ভারসাম্য রেখে করে চলেছে। তাই ফ্রিমন্ট মন্দির যখন রথযাত্রার আয়োজন করে, সেখানে জগন্নাথ পূজো ছাপিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও মেলামেশার দিকটি আগে চলে আসে। লিভারমুরের দূর্গাপূজোয় বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশিষে যোগদান এবং আনুষঙ্গিক সাংস্কৃতিক চর্চা এটিকে দেবস্থানের বাইরে এক মিলন মেলায় পরিণত করে। একথা অল্পবিস্তর আমেরিকার প্রায় অধিকাংশ মন্দির সম্বন্ধেই প্রযোজ্য।

পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আমেরিকার মন্দিরগুলি জ্ঞান ও মুক্ত চিন্তার বিকাশে আরও সক্রিয় হবে এই আশা রাখি। স্বদেশের অনেক মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে হয় অসংখ্য গলি-ঘুঁজি ও গুহা-অন্ধকার পেরিয়ে। আমেরিকার হিন্দু মন্দিরগুলির গর্ভগৃহ তুলনায় অনেক সুগম। মন্দিরের অন্দরমহল প্রশস্ত ও অনেক উন্মুক্ত। সুপবন বয়ে যাবার সুযোগ অনেক। সেই সুপবন হিন্দু মন্দির ছাপিয়ে সমস্ত মানুষের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নকে আন্দোলিত করুক-মুক্ত চিন্তার ভূমি আমেরিকার হিন্দু মন্দিরগুলির সেটাই হবে সার্থকতার নিদর্শন।

তথ্যসূত্রঃ

১. Excerpt from Swami Vivekananda's speech in Chicago, 1893.
২. Wood, Angela, "Hindu Temple"
৩. Pechilis, Karen, "The pattern of Hinduism and Hindu Temple building in the U.S"
৪. Kolapen, Mahalingum, "Hindu Temple in North America: A Celebration of Life."


লিখেছেনঃ প্রদোষ কান্তি সরকার
প্রবাসের সংগঠন ‘সংস্কৃতি’র কর্ণধার ও প্রবাসের নাট্য আন্দোলনের পুরোধা।
ফ্রিমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া
নভেম্বর ২, ২০০৯
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।