সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( অরণ্যকাণ্ড পর্ব- ৮ )


একদিন লঙ্কা নগরীতে একাকী শূর্পনাখা মনমরা হয়েছিলেন। নিশাচরী কেকসীকণ্যা শূর্পনাখা ভাবল একবার গোদাবরী তট থেকে ঘুরে আসতে । নিশাচরী মায়া দ্বারা আকাশ মার্গে বিচরণ করতে গেলে সে সময় মন্দাদোরী বলল- “ননদিনী । এই সময় শুভ নয়। এই সময় তুমি যাত্রা করলে তোমার পিছু পিছু ভীষণ অমঙ্গল আসতে পারে।”শূর্পনাখা অট্টহাস্য করে বলল- “জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দশাননের নাম শ্রবনে অমঙ্গল নিজেও অমঙ্গলের ভয়ে পলায়ন করে। তুমি সেই বীর পুরুষের স্ত্রী হয়ে এত শঙ্কা করো?” এই বলে শূর্পনাখা পাখসাট মেরে চোখের পলকে সুদুর শ্রীলঙ্কা থেকে ভারতে গোদাবোরী তীরে পঞ্চবটিটে উপস্থিত হল । রাক্ষসীর বিকট চেহারা দেখে বনের পশু পক্ষী এমনকি বাঘ, সিংহ যে যেদিকে পারলো পলায়ন করলো। নবজাত পুস্পের কলি ঝড়ে পড়ে গোটা অরণ্য থমকে গেলো । সেই রাক্ষসী ঘুরতে ঘুরতে এদিক সেদিক বিচরণ করতে লাগলো । বিশাল চরণের চিহ্ন যেখানে পতিত হল- গর্ত হয়ে গেলো। গাছপালা যথেচ্ছ ভাবে ভেঙ্গেচুড়ে, বৃক্ষ গুলি উৎপাটন করে মনের সুখে আনন্দে নৃত্য গীত করতে লাগলো । তার চরণ প্রহারে ছোট ছোট অসংখ্য জীব নিহত হল । সে গোদাবরী তিরে রামচন্দ্র, লক্ষণ কে দেখতে পেলো। সুন্দর রম্য অরণ্যে দুই সুপুরুষ সেই কুটিরে অবস্থান করছিলো। তাঁরই নিকটে এক অপূর্ব সুন্দরী নারী অবস্থিত দেখলো । দুই পুরুষের সুঠাম, সুগঠিত, মেদহীন চেহারা। বনবাসী হয়েও গাত্রে রাজকূলের নানান চিহ্ন ও লক্ষণ প্রকাশিত । মস্তকে জটা, গলে রুদ্রাক্ষ, বাহুতে রুদ্রাক্ষ তবুও তাঁরা ক্ষত্রিয় দিগের ন্যায় অস্ত্রাদি সঙ্গে রেখেছেন । দুজনের রূপে সমগ্র অরণ্য আলোকিত হয়ে আছে। কি দীপ্ত শত সূর্যের ন্যায় তাহারা উজ্জ্বল ও তেজস্বী । বিধবা শূর্পনাখার মনে কাম বাসনা প্রবল ভাবে জাগ্রত হল। কামে মত্ত হয়ে মত্ত হস্তীর ন্যায় এক সুন্দরী কামিনী মূর্তি ধরে গজগামিনী নারীর ন্যায় ধীরে ধীরে সেই দিকেই যেতে লাগলো, কারণ রাক্ষসী স্বরূপ দেখলে হয়তো এই দুই পুরুষ ভয়ে আর বাঁচবেই না ।

শূর্পনাখা যখন অপূর্ব সুন্দরী নারীর রূপে সেই কুটিরের দিকে গেলো, তখন রাম লক্ষণ তার দিকে ফিরেও চাইলো না। অপরদিকে শূর্পনাখা তাদের দর্শন করে মনে মনে নানা স্বপ্নজাল রচনা করে আনন্দিতা হচ্ছিল্ল। দুই পুরুষের সাথে রতিশৃঙ্গারের কথা ভেবে অতি উৎফুল্ল হচ্ছিল্ল। এই জগত রূপের দাস। এত রূপসী বেশকে কোন পুরুষই অবহেলা করবে না । অনেকক্ষণ এভাবে থাকলে লক্ষণ জিজ্ঞেস করলো- “হে দেবী! আপনি কে? আপনি কি কারনে হেথায় দণ্ডায়মানা হয়ে আছেন?” শূর্পনাখা লক্ষণের রূপে আকৃষ্ট হয়েছিলেন । বললেন- “ হে সুপুরুষ! হে বীর ! আমি হেথায় অবস্থান করে আপনাকেই প্রত্যক্ষ করছিলাম । আপনি উত্তম। আপনি সুন্দর যুবক। আপনাকে দেখে শক্তিমান বোধ হয়। সুন্দরী নারী সর্বদা শক্তিমান পুরুষকেই পতি রূপে বরন করে, যাতে তাকে পরপুরুষে সদা সমীহ করে। হে কুমার! আপনি আমাকে বিবাহ করুন। আমি আপনার স্ত্রী হয়ে সদা সর্বদা থাকতে চাই।” লক্ষণ শুনে অবাক। তিনি বললেন- “হে দেবী! আমরা অযোধ্যার স্বর্গীয় সম্রাট দশরথের পুত্র শ্রীরামচন্দ্র ও লক্ষণ। আমি লক্ষণ। পিতার বচন পালনের জন্য আমার অগ্রজ রামচন্দ বনবাসে এসেছেন। আমি কেবল আমার অগ্রজ ও বৌঠানের সেবার জন্যই এই বনে এসেছি। আমি এখানে বিবাহ করতে পারি না। আপনি বরং আমার অগ্রজ শ্রীরামচন্দ্রের কাছে যান, তিনি চাইলে তাঁর চরণে আপনি ঠাঁই লাভ করতে পারেন।” শূর্পনাখা তখন রামচন্দ্রের কাছে গেলেন। দেখলেন এই পুরুষ পূর্বের পুরুষের থেকেও অতি অতি সুন্দর। এই সৌন্দর্য ইন্দ্রাদি দেবতা এমনকি চন্দ্রদেব, মদন দেবেরও নেই। মদন দেব এঁনার কাছে লজ্জিত হয়ে পলায়ন করবেন । বললেন- “হে বীর! হে আর্য ! আপনার ন্যায় বীর পুরুষকে সকল নারী গ্রহণ করতে চাইবে। কারণ পতির বীরত্বে পত্নীর গর্ব হয়। হে মানবশ্রেষ্ঠ আপনি আমাকে দয়া করে বিবাহ করুন।” শুনে রামচন্দ্র বিস্মিত হলেন। বললেন- “হে দেবী! আপনি কে? আপনার সাথে পরিচয় নেই। কিভাবে আমি এই প্রস্তাব গ্রহণ করি? উপরন্তু আমি বিবাহিত। এক পত্নীতেই আমি সন্তুষ্ট। আমার আর বিবাহের ইচ্ছা নেই। অতএব আপনাকে বিবাহ করার কোন যুক্তি দেখি না। আপনি বরং আমার ভ্রাতা লক্ষণের নিকট যান। সে হয়তো আপনাকে বিবাহ করতে পারে। ”

আশাহত হয়ে শূর্পনাখা লক্ষণের কাছে গেলো। লক্ষণ সেখানে কাঠ কাটছিলেন । লক্ষণের সেই দিব্য তনু দেখে পুনঃ রাক্ষসী কামাতুরা হয়ে লক্ষণ কে বলল- “কুমার! আমি আপনার ভ্রাতার সাথে বারতালাপ করেছি। কিন্তু তিনি বিবাহিত। তিনি অপর স্ত্রী গ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছেন। তাই আমি আপনার ভার্যা হইতে ইচ্ছা ব্যক্ত করছি। দয়া করে আমাকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ করুন।” লক্ষণ বলল- “হে সুনয়নী! আমার দাদা বিবাহিত। আমিও বিবাহিত। অযোধ্যায় আমার স্ত্রী আছেন। প্রথমা স্ত্রীর অনুমতি ব্যতীত দ্বিতীয় বিবাহ শাস্ত্রে অনুমোদিত নয়। এই অবস্থায় অযোধ্যায় গিয়ে আমার স্ত্রীর অনুমতি গ্রহণ আমার পক্ষে সম্ভব নয় । কিন্তু আমার জ্যেষ্ঠ অগ্রজের স্ত্রী এইখানেই আছেন, তিনি হয়তো অনুমতি দিতে পারেন। তিনি অনুমতি দিলে হয়তো অগ্রজ এখুনি আপনাকে বিবাহ করতে পারেন। অতএব আপনি অগ্রজের নিকট গমন করুন।” ভগবান রামচন্দ্রের কাছে সেই রাক্ষসী গিয়ে বলল- “হে কুমার! আপনার ভ্রাতা আমার সাথে বিবাহে ইচ্ছুক নয়। আপনি এখানে সস্ত্রীক আছেন। আমি সতীন নিয়ে সংসার করতে রাজী। আপনি আপনার প্রথমা স্ত্রীর সম্মতি নিয়ে আমাকে বিবাহ করুন। আপনার ন্যায় সুপুরুষকে আমি হারাতে চাই না।” ভগবান রাম বললেন- “হে দেবী! আমি পিতার বচনে ও মাতার আদেশে চতুর্দশ বৎসর অরণ্যে সন্ন্যাস পালন করছি। এই অবস্থায় আমার পক্ষে বিবাহ সম্ভব নয়। আপনি আমার ভ্রাতার কাছে যান, তাহাকে ভালো মতো বুঝিয়ে রাজী করুন। হয়তো সে আজই আপনাকে বিবাহ করতে পারে। পিতৃসত্য কেবল আমার জন্যই, আমার ভ্রাতা লক্ষণ এইথেকে মুক্ত।” শূর্পনাখা এরপর লক্ষণের কাছে গিয়ে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলো। লক্ষণ বলল- “দেবী এখানে আমি দাস। এখানে আমি ভৃত্য। এই অবস্থায় আমি কিভাবে বিবাহ করবো ? আমার অগ্রজই সর্বশক্তিমান । আমি কেবল তাঁর আদেশবাহক । সেবকের কাছে সুখ, ভিখারির পক্ষে সম্মান, দুরাচারীর পক্ষে অর্থ সম্পদ, ব্যভিচারীর পক্ষে শুভগতি, লোভীর পক্ষে যশ আর দাম্ভিকের পক্ষে চতুর্বিধ ফল আশা করা আর আকাশ মন্থন করে দুগ্ধ লাভ করার অলীক কল্পনা একই ব্যাপার। আমার পক্ষে সেইরূপ তোমাকে বিবাহ সম্ভব নয়। তুমি অগ্রজের কাছে যাও।” এভাবে শূর্পনাখা রাক্ষসী বারবার রাম, লক্ষণের কাছে গিয়ে বিফল হলে অতীব ক্রোধী হল ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger