• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

০৯ নভেম্বর ২০১৩

কৃষ্ণের চরিত্র কিরূপ ছিল, তাহা জানিবার উপায় কি? (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)




আদৌ এখানে দুইটি গুরুতর আপত্তি উপস্থিত হইতে পারে। যাঁহারা দৃঢ় বিশ্বাস করেন যে, কৃষ্ণ ভূমণ্ডলে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, তাঁহাদের কথা এখন ছাড়িয়া দিই। আমার সকল পাঠক সেরূপ বিশ্বাসযুক্ত নহেন। যাঁহারা সেরূপ বিশ্বাসযুক্ত নহেন, তাহারা বলিবেন, কৃষ্ণচরিত্রের মৌলিকতা কি? কৃষ্ণ নামে কোন ব্যক্তি পৃথিবীতে কখনও বিদ্যমান ছিলেন, তাহার প্রমাণ কি? যদি ছিলেন, তবে তাঁহার চরিত্র যথার্থ কি প্রকার ছিল, তাহা জানিবার কোন উপায় আছে কি?
আমরা প্রথমে এই দুই সন্দেহের মীমাংসায় প্রবৃত্ত হইব।
কৃষ্ণের বৃত্তান্ত নিম্নলিখিত প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে পাওয়া যায়ঃ—
(১) মহাভারত।
(২) হরিবংশ।
(৩) পুরাণ।
ইহার মধ্যে পুরাণ আঠারখানি। সকলগুলিতে কৃষ্ণবৃত্তান্ত নাই। নিম্নলিখিতগুলিতে আছেঃ—
(১) ব্রহ্মপুরাণ।
(২) পদ্মপুরাণ।
(৩) বিষ্ণুপুরাণ।
(৪) বায়ুপুরাণ।
(৫) শ্রীমদ্ভাগবত।
(১০) ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ।
(‍১৩) স্কন্দপুরাণ।
(১৪) বামনপুরাণ।
(১৫) কূর্মপুরাণ।
মহাভারত, আর উপরিলিখিত অন্য গ্রন্থগুলির মধ্যে কৃষ্ণজীবনী সম্বন্ধে একটি বিশেষ প্রভেদ আছে। যাহা মহাভারতে আছে, তাহা হরিবংশে ও পুরাণগুলিতে নাই। যাহা হরিবংশ ও পুরাণে আছে, তাহা মহাভারতে নাই। ইহার একটি কারণ এই যে, মহাভারত পাণ্ডবদিগের ইতিহাস; কৃষ্ণ পাণ্ডবদিগের সখা ও সহায়; তিনি পাণ্ডবদিগের সহায় হইয়া বা তাঁহাদের সঙ্গে থাকিয়া যে সকল কার্য করিয়াছেন, তাহাই মহাভারতে আছে, ও থাকিবার কথা। প্রসঙ্গক্রমে অন্য দুই একটা কথা আছে মাত্র। তাঁহার জীবনের অবশিষ্টাংশ মহাভারতে নাই বলিয়াই হরিবংশ রচিত হইয়াছিল, ইহা হরিবংশে আছে। ভাগবতেও ঐরূপ কথা আছে। ব্যাস নারদকে মহাভারতের অসম্পূর্ণতা জানাইলেন। নারদ ব্যাসকে কৃষ্ণচরিত্র রচনার উপদেশ দিলেন। অতএব মহাভারতে যাহা আছে, এই ভাগবতে বা হরিবংশে বা অন্য পুরাণে তাহা নাই; মহাভারতে, যাহা নাই—পরিত্যক্ত হইয়াছে, তাহাই আছে।
অতএব মহাভারত সর্বপূর্ববর্তী। হরিবংশাদি ইহার অভাব পূরণার্থ মাত্র। যাহা সর্বাগ্রে রচিত হইয়াছিল, তাহাই সর্বাপেক্ষা মৌলিক, ইহাই সম্ভব। কথিত আছে যে, মহাভারত, হরিবংশ, এবং অষ্টাদশ পুরাণ একই ব্যক্তি রচিত। সকলই মহর্ষি বেদব্যাসপ্রণীত। এ কথা সত্য কি না, তাহার বিচারে এক্ষণে প্রয়োজন নাই। আগে দেখা যাউক, মহাভারতের কোন ঐতিহাসিকতা আছে কি না। যদি তাহা না থাকে, তবে হরিবংশে ও পুরাণে কোন ঐতিহাসিক তত্ত্বের অনুসন্ধান বৃথা।
এক্ষণে যে বিচারে প্রবৃত্ত হইব, তাহাতে দুই দিকে দুই ঘোর বিপদ্। এক দিকে, এ দেশীয় প্রাচীন সংস্কার যে, সংস্কৃতভাষায় যে কিছু রচনা আছে, যে কিছুতে অনুস্বার আছে, সকলই অভ্রান্ত ঋষি প্রণীত; সকলই প্রতিবাদ বা সন্দেহের অতীত যে সত্য, তাহাই আমাদিগের কাছে আনিয়া উপস্থিত করে। বেদবিভাগ, লক্ষশ্লোকাত্মক মহাভারত, হরিবংশ, এবং অষ্টাদশ পুরাণ সকল একজনে করিয়াছেন; সকলই কলিযুগের আরম্ভে হইয়াছে; সেও পাঁচহাজার বৎসর হইল; আর এই সকল বেদব্যাস যেমন করিয়াছিলেন, ঠিক তেমনই আছে। অনেক লোকে, এ সংস্কারের প্রতিবাদ শুনা দূরে যাউক, যে প্রতিবাদ করিবে, তাহাকে মহাপাতকী, নারকী এবং দেশের সর্বনাশে প্রস্তুত মনে করেন। এই এক দিকের বিপদ্। আর দিকে গুরুতর বিপদ্, বিলাতী পাণ্ডিত্য। ইউরোপ ও আমেরিকার কতকগুলি পণ্ডিত সংস্কৃত শিক্ষা করিয়াছেন। তাঁহারা প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ হইতে ঐতিহাসিক তত্ত্ব উদ্ভূত করিতে নিযুক্ত, কিন্তু তাহাদের এ কথা অসহ্য যে, পরাধীন দুর্বল হিন্দুজাতি, কোন কালে সভ্য ছিল, এবং সেই সভ্যতা অতি প্রাচীন। অতএব দুই চারি জন ভিন্ন তাহারা সচরাচর প্রাচীন ভারতবর্ষের গৌরব খর্ব করিতে নিযুক্ত। তাঁহারা যত্নপূর্বক ইহাই প্রমাণ করিতে চাহেন যে, প্রাচীন ভারতবর্ষীয় গ্রন্থ সকলে যাহা কিছু আছে—হিন্দুধর্মবিরোধী বৌদ্ধগ্রন্থ ছাড়া—সকলই আধুনিক, আর হিন্দুগ্রন্থে যাহাই আছে, তাহা হয় সম্পূর্ণ মিথ্যা, নয় অন্য দেশ হইতে চুরি করা। কোন মহাত্মা বলেন, রামায়ণ হোমরের কাব্যের অনুকরণ; কেহ বা বলেন, ভগবদ্গীতা বাইবেলের ছায়ামাত্র। হিন্দুর জ্যোতিষ চীন, যবন বা কাল্‌ডিয় হইতে প্রাপ্ত; হিন্দুর গণিতও পরের কাছে পাওয়া; লিখিত অক্ষরও কোন সীমীয় জাতীয় হইতে প্রাপ্ত। এ সকল কথা প্রতিপন্ন করিবার জন্য তাঁহাদের বিচারপ্রণালীর মূল সূত্র এই যে, ভারতবর্ষীয় গ্রন্থে ভারতপক্ষে যাহা পাওয়া যায়, তাহা মিথ্যা বা প্রক্ষিপ্ত, যাহা ভারতবর্ষের বিপক্ষে পাওয়া যায়, তাহাই সত্য। পাণ্ডবদিগের ন্যায় বীরচরিত্র ভারতবর্ষীয় পুরুষের কথা মিথ্যা, পাণ্ডব কবিকল্পনা মাত্র, কিন্তু পাণ্ডবপত্নী দ্রৌপদীর পঞ্চ পতি সত্য, কেন না, তদ্বারা সিদ্ধ হইতেছে যে, প্রাচীন ভারতবাসীয়েরা চূয়াড় জাতি ছিল, তাহাদিগের মধ্যে স্ত্রীলোকদিগের বহুবিবাহ প্রচলিত ছিল। ফর্গুসন্ সাহেব অট্টালিকার ভগ্নাবশেষে কতকগুলা বিবস্ত্রা স্ত্রীমূর্তি দেখিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে, প্রাচীন ভারতবর্ষে স্ত্রীলোকেরা কাপড় পরিত না; এদিকে মথুরা প্রভৃতি স্থানের অপূর্ব ভাস্কর্য দেখিয়া বিলাতী পণ্ডিতেরা স্থির করিয়াছেন, এ শিল্প গ্রীক্ মিস্ত্রীর। বেবর (Weber) সাহেব, কোন মতে হিন্দুদিগের জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রাচীনতা উড়াইয়া দিতে না পারিয়া স্থির করিলেন, হিন্দুরা চান্দ্র নক্ষত্রমণ্ডল বাবিলনীয়দিগের নিকট হইতে পাইয়াছে। বাবিলনীয়দিগের যে চান্দ্র নক্ষত্রমণ্ডল আদৌ কখনও ছিল না, তাহা চাপিয়া গেলেন। প্রমাণের অভাবেও Whitney সাহেব বলিলেন, তাহা হইতে পারে, কেন না, হিন্দুদের মানসিক স্বভাব তেমন তেজস্বী নয় যে, তাহার নিজবুদ্ধিতে এত করে।
এই সকল মহাপুরুষগণের মতের সমালোচনায় আমার কোন প্রয়োজন ছিল না। কেন না, আমি স্বদেশীয় পাঠকের জন্য লিখি, হিন্দুদ্বেষীদিগের জন্য লিখি না। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, আমার স্বদেশীয় শিক্ষিতসম্প্রদায়মধ্যে অনেকে তাঁহাদের মতের অনুবর্তী। অনেকেই নিজে কিছু বিচার আচার না করিয়াই, কেবল ইউরোপীয় পণ্ডিতদিগের মত বলিয়াই, সেই সকল মতের অনুবর্তী। আমার দুরাকাঙ্ক্ষা যে, শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যেও কেহ কেহ এই গ্রন্থ পাঠ করেন। তাই, আমি ইউরোপীয় মতেরও প্রতিবাদে প্রবৃত্ত। যাঁহাদের কাছে বিলাতী সবাই ভাল, যাঁহারা ইস্তক বিলাতী পণ্ডিত, লাগায়েৎ বিলাতী কুকুর, সকলেরই সেবা করেন, দেশী গ্রন্থ পড়া দূরে থাক, দেশী ভিখারীকেও ভিক্ষা দেন না, তাঁহাদের আমি কিছু করিতে পারিব না। কিন্তু শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেকেই সত্যপ্রিয় এবং দেশবৎসল। তাঁহাদের জন্য লিখিব ।
সংগ্রহেঃ অমিত সরকার শুভ
Share:

কৃষ্ণচরিত্র ত্র মহাভারতের ঐতিহাসিকতা (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)



কৃষ্ণচরিত্র যে সকল গ্রন্থে পাওয়া যায়, মহাভারত তাহার মধ্যে সর্বপূর্ববর্তী। কিন্তু মহাভারতের উপর কি নির্ভর করা যায়? মহাভারতের ঐতিহাসিকতা কিছু আছে কি? মহাভারতকে ইতিহাস বলে, কিন্তু ইতিহাস বলিলে কি History ই বুঝাইল? ইতিহাস কাহাকে বলে? এখনকার দিনে শৃগাল কুক্কুরের গল্প লিখিয়াও লোকে তাহাকে “ইতিহাস” নাম দিয়া থাকে। কিন্তু বস্তুতঃ যাহাতে পুরাবৃত্ত, অর্থাৎ পূর্বে যাহা ঘটিয়াছে, তাহার আবৃত্তি আছে, তাহা ভিন্ন আর কিছুকেই ইতিহাস বলা যাইতে পারে না—
“ধর্মার্থকামমোক্ষাণামুপদেশসমন্বিতম্।
পূর্ববৃত্তকথাযুক্তমিতিহাসং প্রচক্ষতে ||”
এখন, ভারতবর্ষের প্রাচীন গ্রন্থ সকলের মধ্যে কেবল মহাভারতই অথবা কেবল মহাভারত ও রামায়ণ ইতিহাস নাম প্রাপ্ত হইয়াছে। যেখানে মহাভারত ইতিহাস পদে বাচ্য, যখন অন্ততঃ রামায়ণ ভিন্ন আর কোন গ্রন্থই এই নাম প্রাপ্ত হয় নাই, তখন বিবেচনা করিতে হইবে যে, ইহার বিশেষ ঐতিহাসিকতা আছে বলিয়াই এরূপ হইয়াছে।
সত্য বটে যে, মহাভারতে এমন বিস্তর কথা আছে যে, তাহা স্পষ্টতঃ অলীক, অসম্ভব, অনৈতিহাসিক। সেই সকল কথাগুলি অলীক অনৈতিহাসিক বলিয়া পরিত্যাগ করিতে পারি। কিন্তু যে অংশে এমন কিছুই নাই যে, তাহা হইতে ঐ অংশ অলীক বা অনৈতিহাসিক বিবেচনা করা যায়, সে অংশগুলি অনৈতিহাসিক বলিয়া কেন পরিত্যাগ করিব? সকল জাতির মধ্যে, প্রাচীন ইতিহাসে এইরূপ ঐতিহাসিকে ও অনৈতিহাসিকে, সত্যে ও মিথ্যায়, মিশিয়া গিয়াছে। রোমক ইতিহাসবেত্তা লিবি প্রভৃতি, যবন ইতিহাসবেত্তা হেরোডোটস্ প্রভৃতি, মুসলমান ইতিহাসবেত্তা ফেরেশ্‌তা প্রভৃতি এইরূপ ঐতিহাসিক বৃত্তান্তের সঙ্গে অনৈসর্গিক এবং অনৈতিহাসিক বৃত্তান্ত মিশাইয়াছেন। তাঁহাদিগের গ্রন্থ সকল ইতিহাস বলিয়া গৃহীত হইয়া থাকে—মহাভারতই অনৈতিহাসিক বলিয়া একেবারে পরিত্যক্ত হইবে কেন?
আমি জানি যে, আধুনিক ইউরোপীয়েরা এই সকল ইতিহাসবেত্তাদিগকে (Livy, Herodotus প্রভৃতিকে) আদর করেন না। কিন্তু তাঁহারা এমন বলেন না যে, ইঁহাদের গ্রন্থ অনৈসর্গিক ব্যাপারে পরিপূর্ণ, এই জন্যই ইঁহারা পরিত্যাজ্য। তাঁহারা বলেন যে, ইঁহারা যে সকল সময়ের ইতিহাস লিখিয়াছেন, সে সকল সময়ে ইঁহারা নিজেও বর্তমান ছিলেন না, কোন সমসাময়িক লেখকেরও সাহায্য পান নাই; অতএব তাঁহাদের গ্রন্থের উপর, প্রকৃত ইতিহাস বলিয়া নির্ভর করা যায় না। এ কথা যথার্থ, কিন্তু লিবি বা হেরোডোটাস অপেক্ষা মহাভারতের সমসাময়িকতা সম্বন্ধে দাবি দাওয়া কিছু বেশী, তাহা এই গ্রন্থে সময়ান্তরে প্রমাণীকৃত হইবে। এই পর্যন্ত এখন বলিতে ইচ্ছা করি যে, আধুনিক ইউরোপীয় সমালোচকেরা যাহাই বলুন, প্রাচীন রোমক বা গ্রীক্ লিপি বা হেরোডোটসের গ্রন্থকে কখন অনৈতিহাসিক বলিতেন না। পক্ষান্তরে এমন দিনও উপস্থিত হইতে পারে যে Giffon বা Froude অসমসাময়িক বলিয়া পরিত্যক্ত হইবেন। আর আধুনিক সমালোচকের দল যাই বলুন, লিবি বা হেরোডোটস্‌কে একেবারে পরিত্যাগ করিয়া রোম বা গ্রীসের কোন ইতিহাস আজিও লিখিত হয় না।
পাঠক মনে রাখিবেন যে, অনৈসর্গিকতার বাহুল্যঘটিত যে দোষ, তাহারই বিচার হইতেছে। এ বিষয়ে ইউরোপীয়দিগের পদচিহ্নানুসরণই যদি বিদ্যাবুদ্ধির পরাকাষ্ঠার পরিচয় হয়, তবে আমরা এখানে সে গৌরবে বঞ্চিত নহি। তাঁহারা স্থির করিয়াছেন যে, ভারতবর্ষের পূর্বতন অবস্থা জানিবার জন্য দেশীয় গ্রন্থ সকল হইতে কোন সাহায্য পাওয়া যায় না, কেন না, সে সকল অতিশয় অবিশ্বাসযোগ্য, কিন্তু গ্রীক্ লেখক Megasthenes এবং Ktesias এ বিষয়ে অতিশয় বিশ্বাসযোগ্য,—সে জন্য ইঁহারাই সে বিষয় ইউরোপীয় লেখকদিগের অবলম্বন। কিন্তু এই লেখকদিগের ক্ষুদ্র গ্রন্থগুলিতে যে রাশি রাশি অদ্ভুত, অলীক, অনৈসর্গিক উপন্যাস পাওয়া যায়, তাহা মহাভারতের লক্ষ শ্লোকের ভিতরও পাওয়া যায় না। এ গ্রন্থগুলি বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস, আর মহাভারত অবিশ্বাসযোগ্য কাব্য!! কি অপরাধে?
এখন ইহাও স্বীকার করা যাউক যে, ঐ সকল ভিন্নদেশীয় ইতিহাসগ্রন্থের অপেক্ষা মহাভারতে অনৈসর্গিক ঘটনার বাহুল্য অধিক। তাহাতেও, যেটুকু নৈসর্গিক ও সম্ভব ব্যাপারের ইতিবৃত্ত সেটুকু গ্রহণ করিবার কোন আপত্তি দেখা যায় না। মহাভারতে যে অন্য দেশের প্রাচীন ইতিহাসের অপেক্ষা কিছু বেশী কাল্পনিক ব্যাপারের বাহুল্য আছে, তাহার বিশেষ কারণও আছে। ইতিহাসগ্রন্থে দুই কারণে অনৈসর্গিক বা মিথ্যা ঘটনা সকল স্থান পায়। প্রথম, লেখক জনশ্রুতির উপর নির্ভর করিয়া, সেই সকলকে সত্য বিবেচনা করিয়া তাহা গ্রন্থভুক্ত করেন। দ্বিতীয়, তাঁহার গ্রন্থ প্রচারের পর, পরবর্তী লেখকেরা আপনাদিগের রচনা পূর্ববর্তী লেখকের রচনামধ্যে প্রক্ষিপ্ত করে। প্রথম কারণে সকল দেশের প্রাচীন ইতিহাস কাল্পনিক ব্যাপারের সংস্পর্শে দূষিত হইয়াছে—মহাভারতেও সেইরূপ ঘটিয়া থাকিবে।
কিন্তু দ্বিতীয় কারণটি অন্য দেশের ইতিহাসগ্রন্থে সেরূপ প্রবলতা প্রাপ্ত হয় নাই—মহাভারতকেই বিশেষ প্রকারে অধিকার করিয়াছে। তাহার তিনটি কারণ আছে।
প্রথম কারণ এই যে, অন্যান্য দেশে যখন ঐ সকল প্রাচীন ঐতিহাসিক গ্রন্থ প্রণীত হয়, তখন প্রায়ই সে সকল দেশে গ্রন্থ সকল লিখিত করিবার প্রথা চলিয়াছে। গ্রন্থ লিখিতে হইলে, তাহাতে পরবর্তী লেখকেরা স্বীয় রচনা প্রক্ষিপ্ত করিবার বড় সুবিধা পান না—লিখিত গ্রন্থে প্রক্ষিপ্ত রচনা শীঘ্র ধরা পড়ে। কেন না, প্রাচীন একখানা কাপির দ্বারা অন্য কাপির শুদ্ধাশুদ্ধি নিশ্চিত করা যায়। প্রাচীন ভারতবর্ষে গ্রন্থ সকল প্রণীত হইয়া মুখে মুখে প্রচারিত হইত, লিপিবিদ্যা প্রচলিত হইলে পরেও গ্রন্থ সকল পূর্বপ্রথানুসারে গুরু-শিষ্য-পরম্পরা মুখে মুখেই প্রচারিত হইত। তাহাতে প্রক্ষিপ্ত রচনা প্রবেশ করিবার বিশেষ সুবিধা ঘটিয়াছিল।
দ্বিতীয় কারণ এই যে, রোম, গ্রীস বা অন্য কোন দেশে কোন ইতিহাসগ্রন্থ, মহাভারতের ন্যায় জনসমাজে আদর বা গৌরব প্রাপ্ত হয় নাই। সুতরাং ভারতবর্ষীয় লেখকদিগের পক্ষে মহাভারতে স্বীয় রচনা প্রক্ষিপ্ত করিবার যে লোভ ছিল, অন্য কোন দেশীয় লেখকদিগের সেরূপ ঘটে নাই।
তৃতীয় কারণ এই যে, অন্য দেশের লেখকেরা আপনার যশ বা তাদৃশ অন্য কোন কামনার বশীভূত হইয়া গ্রন্থ প্রণয়ন করিতেন। কাজেই আপনার নামে আপনার রচনা প্রচার করাই তাঁহাদিগের উদ্দেশ্য ছিল, পরের রচনার মধ্যে আপনার রচনা ডুবাইয়া দিয়া আপনার নাম লোপ করিবার অভিপ্রায় তাঁহাদিগের কখনও ঘটিত না। কিন্তু ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণেরা নিঃস্বার্থ ও নিষ্কাম হইয়া রচনা করিতেন। লোকহিত ভিন্ন আপনাদিগের যশ তাঁহাদিগের অভিপ্রেত ছিল না। অনেক গ্রন্থে তৎপ্রণেতার নামমাত্র নাই। অনেক শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ এমন আছে যে, কে তাহার প্রণেতা, তাহা আজি পর্যন্ত কেহ জানে না। ঈদৃশ নিষ্কাম লেখক, যাহাতে মহাভারতের ন্যায় লোকায়ত গ্রন্থের সাহায্যে তাঁহার রচনা লোকমধ্যে বিশেষ প্রকারে প্রচারিত হইয়া লোকহিত সাধন করে, সেই চেষ্টায় আপনার রচনা সকল তাদৃশ গ্রন্থে প্রক্ষিপ্ত করিতেন।
এই সকল কারণে মহাভারতে কাল্পনিক বৃত্তান্তের বিশেষ বাহুল্য ঘটিয়াছে। কিন্তু কাল্পনিক বৃত্তান্তের বাহুল্য আছে বলিয়া এই প্রসিদ্ধ ইতিহাসগ্রন্থে যে কিছুই ঐতিহাসিক কথা নাই, ইহা বলা নিতান্ত অসঙ্গত।
সংগ্রহেঃ অমিত সরকার শুভ
Share:

কুরুক্ষেত্র

কুরুক্ষেত্র একটি চক্র বা জনপদ। ঐ চক্র এখনকার স্থানেশ্বর বা থানেশ্বর নগরের দক্ষিণবর্ত্তী। আম্বালা নগর হইতে উহা ১৫ ক্রোশ দক্ষিণ। পানিপাট হইতে উহা ২০ ক্রোশ উত্তর। কুরুক্ষেত্র ও পানিপাট ভারতবর্ষের যুদ্ধক্ষেত্র, ভারতের ভাগ্য অনেক বার ঐ ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি পাইয়াছে। “ক্ষেত্র” নাম শুনিয়া ভরসা করি, কেহ একখানি মাঠ বুঝিবেন না। কুরুক্ষেত্র প্রাচীন কালেই পঞ্চ যোজন দৈর্ঘ্যে এবং পঞ্চ যোজন প্রস্থে। এই জন্য উহাকে সমন্তপঞ্চক বলা যাইত। চক্রের সীমা এখন আরও বাড়িয়া গিয়াছে।

কুরু নামে এক জন চন্দ্রবংশীয় রাজা ছিলেন। তাঁহা হইতেই এই চক্রের নাম কুরুক্ষেত্র হইয়াছে। তিনি দুর্য্যোধনাদির ও পাণ্ডবদিগের পূর্ব্বপুরুষ; এজন্য দুর্য্যোধনাদিকে কৌরব বলা হয়, এবং কখন কখন পাণ্ডবদিগকেও বলা হয়। তিনি এই স্থানে তপস্যা করিয়া বর লাভ করিয়াছিলেন, এই জন্য ইহার নাম কুরুক্ষেত্র। মহাভারতে কথিত হইয়াছে যে, তাঁহার তপস্যার কারণেই উহা পুণ্যতীর্থ। ফলে চিরকালই কুরুক্ষেত্র পুণ্যক্ষেত্র বা ধর্ম্মক্ষেত্র বলিয়া প্রসিদ্ধ। শতপথ ব্রাহ্মণে আছে, “দেবাঃ হ বৈ সত্রং নিষেদুরগ্নিরিন্দ্রঃ সোমো মখো বিষ্ণুর্বিশ্বেদেবা অন্যত্রেবাশ্বিভ্যাম্। তেষাং কুরুক্ষেত্রং দেবযজনমাস। তস্মাদাহুঃ কুরুক্ষেত্রং দেবযজনম্।” অর্থাৎ দেবতারা এইখানে যজ্ঞ করিয়াছিলেন, এজন্য ইহাকে “দেবতাদিগের যজ্ঞস্থান” বলে।

মহাভারতের বনপর্ব্বের তীর্থযাত্রা পর্ব্বাধ্যায়ে কথিত হইয়াছে যে, কুরুক্ষেত্র ত্রিলোকীর মধ্যে প্রধান তীর্থ। বনপর্ব্বে কুরুক্ষেত্রের সীমা এইরূপ লেখা আছে-“উত্তরে সরস্বতী, দক্ষিণে দৃষদ্বতী; কুরুক্ষেত্র এই উভয় নদীর মধ্যবর্ত্তী।” (৮৩ অধ্যায়) মনুসংহিতায় বিখ্যাত ব্রহ্মাবর্ত্তেরও ঠিক সেই সীমা নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে।-

সরস্বতীদৃষদ্বত্যোর্দেবনদ্যোর্যন্তরং।
তং দেবনির্ম্মিতং দেশং ব্রহ্মাবর্তং প্রচক্ষতে || ২। ১৭।

অতএব কুরুক্ষেত্র এবং ব্রহ্মাবর্ত্ত একই। কালিদাসের নিম্নলিখিত কবিতাতে তাহাই বুঝা যাইতেছে।

ব্রহ্মাবর্ত্তং জনপদমথচ্ছায়য়া গাহমানঃ
ক্ষেত্রং ক্ষত্রপ্রঘনপিশুনং কৌরবং তদ্ভজেথাঃ।
রাজন্যানাং শিতশরশতৈর্যত্র গাণ্ডীবধন্বা
ধারাপাতৈস্ত্বমিব কমলান্যভ্যবর্ষন্ মুখানি ||
-মেঘদূত ৪৯।

কিন্তু মনুতে আবার অন্য প্রকার আছে। যথা-

কুরুক্ষেত্রঞ্চ মৎস্যাশ্চ পঞ্চলাঃ শূরসেনকাঃ।
এষ ব্রহ্মর্ষিদেশো বৈ ব্রহ্মাবর্ত্তাদনন্তরঃ ||

অপেক্ষাকৃত আধুনিক সময়ে চৈনিক পরিব্রাজক হিউন্থসাঙ্‌ও ইহাকে স্বীয় গ্রন্থে “ধর্ম্মক্ষেত্র” বলিয়াছেন।1

কুরুক্ষেত্র আজিও পুণ্যতীর্থ বলিয়া ভারতবর্ষে পরিচিত; অনেক যোগী সন্ন্যাসী তথা পরিভ্রমণ করেন। কুরুক্ষেত্রে অনেক ভিন্ন ভিন্ন তীর্থ আছে। তাহার মধ্যে কতকগুলি মহাভারতের যুদ্ধের স্মরাক স্বরূপ। যে স্থানে অভিমন্যু সপ্তরথিকর্ত্তৃক অন্যায়-যুদ্ধে নিহত হইয়াছিলেন, সে স্থানকে এক্ষণে ‘অভিমন্যুক্ষেত্র’ বা ‘অমিন’ বলিয়া থাকে। যেখানে আজিও পুত্রহীনারা পুত্রকামনায় অদিতির মন্দিরে অদিতির উপাসনা করে। যেখানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত যোদ্ধাদিগের সৎকার সমাপন হইয়াছিল, ক্ষেত্রের যে ভাগ সেই বীরগণের অস্থিতে সমাকীর্ণ হইয়াছিল, এখনও তাহাকে ‘অস্থিপুর’ বলে। যেখানে সাত্যকিতে ও ভূরিশ্রবাতে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়, এবং অর্জ্জুন সাত্যকির রক্ষার্থ অন্যায় করিয়া ভূরিশ্রবার বাহুচ্ছেদ করেন, সে স্থানকে এক্ষণে ‘ভোর’ বলে। জনপ্রবাদ আছে যে, ভূরিশ্রবার সালঙ্কার ছিন্ন হস্ত পক্ষীতে লইয়া যায়। সেই ছিন্ন হস্তের অলঙ্কারে একখণ্ড বহুমূল্য হীরক ছিল। তাহাই কহীনুর, এক্ষণে ভারতেশ্বরীর অঙ্গে শোভা পাইতেছে। কথাটা যে সত্য, তাহার অবশ্য কোন প্রমাণ নাই।

কুরুক্ষেত্রের নাম বাঙ্গালীমাত্রেরই মুখে আছে। একটা কিছু গোল দেখিলে বাঙ্গালীর মেয়েরাও বলে, “কুরুক্ষেত্র হইতেছে”। অথচ কুরুক্ষেত্রের সবিশেষ তত্ত্ব কেহই জানে না। বিশেষ টম্‌সন, হুইলর প্রভৃতি ইংরেজ লেখকেরা সবিশেষ না জানিয়া অনেক গোলযোগ বাধাইয়াছেন। তাই কুরুক্ষেত্রের কথা এখানে এত সবিস্তারে লেখা গেল।
Share:

মনুসংহিতা (সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ )

সৃষ্টি জিজ্ঞাসা

মনুমেকাগ্রমাসীনমভিগম্য মহর্ষযঃ ।
প্রতিপূজ্য যথান্যাযমিদং বচনমব্রুবন্ ।।১
ভগবান মনু ঈশ্বরে একান্ত মনঃসমাধান করিয়া আসনে সমাসীন রহিয়াছেন, এমন সময়ে ধর্ম্মজিজ্ঞাসু মহর্ষিগণ সন্নিধানে সমাগত হইয়া বিধিমত পূজা-বন্দনাদি করত তাঁহাকে এই কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। ১
The great sages approached Manu, who was seated with a collected mind, and, having duly worshipped him, spoke as follows:

ভগবন্ সর্ববর্ণানাং যথাবদনুপূর্বশঃ ।
অন্তরপ্রভবানাং চ ধর্মান্নো বক্তুমর্হসি ।। ২
হে ভগবন্‌! ব্রাহ্মণাদি বর্ণ সকলের ও অম্বষ্ঠ, করণ, ক্ষত্রিয় (ক্ষত্তা) প্রভৃতি অনুলোম-প্রতিলোমজাত সঙ্করজাতির* পৃথক পৃথকরূপে ধর্ম্মসকল আমাদিগকে বলুন।২
(* উচ্চবর্ণ পুরুষের ঔরসে নীচবর্ণা স্ত্রীর গর্ভে সন্তানের নাম অনুলোমজাত আর নীচবর্ণ পুরুষের ঔরসে উচ্চবর্ণা স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানের নাম প্রতিলোমজাত।)
‘Deign, divine one, to declare to us precisely and in due order the sacred laws of each of the (four chief) castes (varna) and of the intermediate ones.

ত্বমেকো হ্যস্য সর্বস্য বিধানস্য স্বযংভুবঃ ।
অচিন্ত্যস্যাপ্রমেযস্য কার্যতত্ত্বার্থবিত্ প্রভো ।।৩
হে প্রভো! যে বেদ বহুশাখায় বিভক্ত হওয়াতে অসীমরূপে প্রতীয়মান হয়, এবং মীমাংসা, ন্যায় প্রভৃতি শাস্ত্রের সাহায্য ব্যতিরেকে যাহার প্রতিপাদ্য ভাগ বুঝা যায় না, কি প্রত্যক্ষ কি স্মৃত্যাদি শাস্ত্র দ্বারা অনুমেয়* সেই অপৌরুষয় ও নিত্য সমগ্র বেদশাস্ত্রে উল্লিখিত যজ্ঞাদি কার্য্য ও ব্রহ্মতত্ত্বের আপনিই অদ্বিতীয় বেত্তা হয়েন। ৩
(* সাক্ষাৎসম্বন্ধে শ্রুতি না থাকিলেও পণ্ডিতেরা স্মৃত্যাদি শাস্ত্রের উপপত্তি করিবার জন্য শ্রুতির কল্পনা করেন।)
‘For thou, O Lord, alone knowest the purport, (i.e.) the rites, and the knowledge of the soul, (taught) in this whole ordinance of the Self-existent (Svayambhu), which is unknowable and unfathomable.’

স তৈঃ পৃষ্টস্তথা সম্যগমিতোজা মহাত্মভিঃ ।
প্রত্যুবাচার্চ্য তান্ সর্বান্ মহর্ষীংশ্রূযতামিতি ।।৪
অসীমতেজঃসম্পন্ন ভগবান মনু মহানুভব মহর্ষিগণ কর্ত্তৃক উক্ত প্রকারের জিজ্ঞাসিত হইয়া, তাঁহাদিগকে পূজা করিয়া ‘শ্রবণ করুন’ বলিয়া প্রকৃতপ্রস্তাবে উত্তর প্রদান করিলেন। ৪
He, whose power is measureless, being thus asked by the high-minded great sages, duly honoured them, and answered, ‘Listen!’
Share:

প্রলয়কালে জাগতিক অবস্থা:



‘আসীদিদং তমোভূতমপ্রজ্ঞাতমলক্ষণম্।
অপ্রতর্ক্যমবিজ্ঞেয়ং প্রসুপ্তমিব সর্বতঃ।।’

এই পরিদৃশ্যমান বিশ্বসংসার এককালে (সৃষ্টির পূর্বে) গাঢ় তমসাচ্ছন্ন ছিল; তখনকার অবস্থা প্রত্যক্ষের গোচরীভূত নয়; কোনও লক্ষণার দ্বারা অনুমেয় নয়; তখন ইহা তর্ক ও জ্ঞানের অতীত ছিল। এই চতুর্বিধ প্রমাণের অগোচর থাকায় এই জগৎ সর্বতোভাবে যেন প্রগাঢ় নিদ্রায় নিদ্রিত ছিল। (১/৫)।

প্রলয়কালে এই জগৎ এ প্রকারে প্রকৃতিতে লীন ছিল যে, উহা প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দ, এই ত্রিবিধ প্রমাণের বিষয় ছিল না; যেন সকল জগৎ নিদ্রিতাবস্থায় ছিল। ৫

This (universe) existed in the shape of Darkness, unperceived, destitute of distinctive marks, unattainable by reasoning, unknowable, wholly immersed, as it were, in deep sleep.
মনুসংহিতা
Share:

ভক্তি



ভক্তি শব্দটা আসছে ‘ভজ’ ধাতুর উত্তর ‘ক্তিন’ প্রত্যয় করে; আর ভজনা শব্দের মানে হচ্ছে, আর অন্য কিছুকে আমার বলে মনে না করে ও আমাকে আর অন্য কিছুর মনে না করে প্রাণ, মন ও সমস্ত ভাবনাকে একাগ্র করে যখন ঈশ্বরের দিকে দেওয়া হয়, পরমপুরুষের দিকে দেওয়া হয় তাকে বলে ভক্তি। এই যাওয়াটা যদি পরমপুরুষের দিকে না হয়, অন্য কোন স্থূল বস্তুর দিকে , জড় জাগতিক বস্তুর দিকে হয়, তাকে বলা হয় আসক্তি। ভক্তি হ’ল সর্ববৃত্তিকে একাগ্র করে পরমপুরুষের দিকে নিয়ে যাওয়া। এই যে ভজনা, এই ভাবটাকে বলা হয় ভক্তি - ‘ভজ’ ধাতু + ‘ক্তিন’ = ভক্তি । ভজনার ব্যাখ্যা হ’ল - ‘ভক্তির্ভগবতো সেবা’। এখন ঈশ্বরকে ভজনা করে ঈশ্বরের সান্নিধ্য পেয়ে সে কী করবে ? কোন্‌ কাজটা সে সেই সময় করবে ? - না, ভগবানের সেবা করবে। ‘ভগবতো সেবা’ মানে ভগবানের সেবা, পরমপুরুষের সেবা ।
(সূত্রঃ তন্ত্রই সাধনা সাধনাই তন্ত্র)
Share:

অন্নকূট মহোৎসব



শ্রীমদ্ভগবত গীতার গোপন শ্রেষ্ঠ বাণী ‘সর্ব ধর্মান পরিত্যাজ মা মে কং স্মরণং ভজ।’ এ কথার আলোকে শরতের ঠিক মাঝামাঝি কার্তিক মাস, এ সময় ব্রজবাসীরা এক বিশেষ অনুষ্ঠানের অয়োজন করে। যা গোবর্দ্ধন পূজা ও অন্নকূট মহোৎসব নামে খ্যাত। আজ গোবর্দ্ধন পূজা অন্নকুট মহোৎসব। শ্রীমদ্ভগবত গীতার দশম স্কন্ধের নবম ও দশম অধ্যায়ে লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত বশ্যতা স্বীকার স্বরূপ দাস বন্ধন লীলা বর্ণিত হয়েছে। যা আসল পুরাণ শ্রীমদ্ভগবতে বিধৃত লীলাদির প্রভূত রস আস্বাদন করেছেন বৈষ্ণব আচার্যগণ। লীলাপুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভৌম লীলায় অনেক চমকপ্রদ লীলা প্রদর্শন করেন।
শ্রীল জীব গোস্বামী তার গোপাল চম্পু গ্রন্থে নন্দ মহারাজের বক্তব্য হচ্ছে, 'বৈশ্য গোপ জাতি। কৃষি এবং গো-পালন আমাদের জীবিকা। গো-পালনের জন্য আমাদের ঘাসের প্রয়োজন। চাষের জন্য বৃষ্টি চাই। আর ইন্দ্র হচ্ছে বৃষ্টির দেবতা। তাই আমরা দেবতা ইন্দ্ররাজের পূজা করি।"
শ্রীকৃষ্ণের বয়স ছিল ন্যুনধিক তিন বছর চার মাস। শ্রীল জীব গোস্বামী তার গোপাল চম্পু গ্রন্থে নন্দ মহারাজের বক্তব্য হচ্ছে, 'বৈশ্য গোপ জাতি। কৃষি এবং গো-পালন আমাদের জীবিকা। গো-পালনের জন্য আমাদের ঘাসের প্রয়োজন। চাষের জন্য বৃষ্টি চাই। আর ইন্দ্র হচ্ছে বৃষ্টির দেবতা। তাই আমরা ইন্দ্ররাজের পূজা করি।"
তখন শ্রীকৃষ্ণ বল্লেন, "বাবা, সমুদ্রের মাঝেও বৃষ্টি হয়। সেখানে কেউ ইন্দ্র পূজা করেন না। আমাদের জীবিকা যে গো-পালন, গাভী বর্ধনের জন্য আমরা গোবর্ধনের কাছে ঋণী। ইন্দ্রের কাছে নয়। চলো আমরা গোবর্ধনের পূজা করি।"
এরপর থেকে ইন্দ্ররাজ কুপিত হয়ে প্রবল বর্ষণ শুরু করলেন। ব্রজবাসীদের রক্ষায় শ্রীকৃষ্ণ গিরিধারীরূপে গোবর্দ্ধন শূন্যে ধারণ করলেন। অহংকারী ইন্দ্ররাজ লজ্জিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ পদে আত্মনিবেদন করলেন। পাশাপাশি ব্রজবাসীরা মহারাজ নন্দসহ গোবর্দ্ধন পূজার আয়োজন করেন। সেই পূজার উপাচার অন্নের পাহাড়ের রূপ ধারণ করে। অন্নের পাহাড়টি গোবর্দ্ধনকে নিবেদন করা হয়। উপস্থিত সবাই দেখলো এক দিকে সাত বছর বয়সী ছোট কৃষ্ণ দাঁড়িয়ে, অপরদিকে এক বিশাল শ্রীকৃষ্ণ অন্ন ভোজন করছেন। এই অনুষ্ঠান থেকেই গোবর্দ্ধন পূজা ও অন্নকূট মহোৎসবের সূচনা।
হরে কৃষ্ণ...!

সৌজন্যে : প্র্রদীপ সরকার

(ছবি: অনন্নকূট .... ।গৌড়িয়মঠ মন্দির, নারিন্দা, ঢাকা ।।
ছবি কার্টেসি: অমিত সরকার শুভ)

Share:

সংখ্যালঘু নির্যাতন

১৯৭১ সালে যাঁরা বাস্তুত্যাগী হিন্দুর সম্পত্তি দখল করেছিলেন, ১৯৭২-এ তা কেউ কেউ ফেরত দেননি এবং এ-বিষয়ে সরকার থেকেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক বিধ্বস্ত রমনা কালীবাড়ি পুনর্নির্মাণের দাবি কোনো সরকারই পূরণ করেনি। ১৯৭২-৭৩-এ পুজোর সময়ে এদিকে ওদিকে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল যে, তুলনায় পাকিস্তানের কালে সাম্প্রদায়িক সহনশীলতা ও নিরাপত্তা বেশি ছিল বলে ভাবার কারণ ছিল। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার উচ্ছেদ, ইসলামের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকাশ্য পক্ষপাত, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের ক্ষমতাসীন হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রধর্মের প্রবর্তন সাম্প্রদায়িক শক্তিকেই উৎসাহিত করেছে। আমরা আশির দশকে ‘স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করেছিলাম এবং রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা রুজু করেছিলাম, কিন্তু তাতে অমুসলমানদের আস্থা বা স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায়নি। তাঁরা ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদ’ গঠন করে নিজেদের স্বার্থরক্ষার পথ খুঁজেছেন। সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতা যে সংখ্যালঘুর সাম্প্রদায়িকতা উশকে দেয়, তার দৃষ্টান্ত আমরা পৃথিবীর বহু দেশে দেখেছি।

একটি দৈনিক পত্রিকার মিথ্যা প্রচারণার ফলে ১৯৯০ সালে এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৯২ সালে দেশের নানা জায়গায় সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ১৯৬৪ সালে যেমন রাজনৈতিক দল, প্রচারমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ একযোগে দাঙ্গা-প্রতিরোধে সফলভাবে অগ্রসর হয়েছিল, ১৯৯০ ও ১৯৯২-তে তেমন উদেযাগ অনেক দুর্বল ছিল। প্রশাসনের তৎপরতায় ছিদ্র ছিল, অন্যেরাও জোর প্রতিরোধ করতে পারেনি। অমুসলমান নাগরিকেরা আওয়ামী লীগের ভোট-ব্যাংক, আওয়ামী লীগই তাদের রক্ষা করুক—সরকারের মনোভাব ছিল এ-রকম। আর নাগরিকদের নিরাপত্তাদানের দায়িত্ব সরকারের, তাদেরকেই যা করার তা করতে হবে—আওয়ামী লীগের মনোভাব ছিল অনেকটা এমন।

গত এক বছরের কিছু বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের পুবে-পশ্চিমে উত্তরে-দক্ষিণে নানা জায়গায় হিন্দু ও বৌদ্ধদের পীড়ন করা হয়েছে। ঘটনাগুলোর ধরন একইরকম। বাড়িঘর ও লোকজন তেমন আক্রান্ত হয়নি, কিন্তু উপাসনালয় ও প্রতিমাবিগ্রহের ধ্বংসসাধন করে উপাসকদের মনে ভীতির সঞ্চার করা হয়েছে। ভয় পেয়ে তারা যেন ভিটেবাড়ি ও দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়, সেটাই, মনে হয়, আক্রমণকারীদের লক্ষ্য। প্রশাসনের যে-সক্রিয়তা আশা করা গিয়েছিল, তা দেখা যায়নি—ঔদাসীন্য বা অপারগতা ছিল তার মূলে। নাগরিক সমাজ এসব প্রতিরোধ করতে তাৎক্ষণিক ও তাৎস্থানিকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েনি, পরে কিছু কিছু প্রতিবাদ হয়েছে। কিছু সাংগঠনিক উদেযাগও নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। সরকার অনেক ধর্মস্থান পুনর্নির্মাণ করে দিচ্ছেন বটে, তাতে ভাঙাবাড়ি জোড়া লাগবে, ভাঙামন জোড়া লাগবে কি?

# আনিসুজ্জামান:
লেখক ও শিক্ষাবিদ;
ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Share:

ব্রিটিশ যুবরাজ চার্লস এবং তাঁর স্ত্রী ক্যামিলা পার্কার দর্শন করলেন দিল্লীর অক্ষরধাম মন্দির

ব্রিটিশ যুবরাজ চার্লস এবং তাঁর স্ত্রী ক্যামিলা পার্কার দর্শন করলেন দিল্লীর অক্ষরধাম মন্দির।শুক্রবার ।

শুধু তাই নয় গত বুধবার সনাতন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় ঘটালেন অকৃপণভাবে। গোধূলি বেলায় তারা হাজির হন ঋষিকেশের গঙ্গা নদীর পাড়ে। সেখানে পরমার্থ নিকেতন আশ্রমের পুরোহিতরা তাদের স্বাগত জানান। এরপর প্রিন্স চার্লস ও ক্যামিলা সন্ধ্যা আরতিতে অংশ নেন।

Share:

সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক “মলয় ভৌমিক” লেখা

“যখন ফেসবুক ছিল না তখনো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালানোর জন্য কৌশল ও অজুহাতের অভাব হয়নি...” 
 -------------------

হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা নরেন্দ্র মোদি যত দিন বেঁচে থাকবেন, ভারতের গুজরাট রাজ্যের সংখ্যালঘু নির্যাতনের দায় তত দিন তাঁর পিছু ধাওয়া করবে। এমনকি ‘স্বর্গলোকেও’ যে তিনি এ দায় বহন করে নিয়ে যাবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা এ কথাটা সহজেই বুঝি। আমাদের চেয়ে অনেক গুণ ‘বিচক্ষণ’ নরেন্দ্র মোদি এই সত্যটা আরও ভালো বোঝেন। কিন্তু এসবের কোনোই পরোয়া তিনি করেন না। কেননা, তাঁর হিসাব হলো ভোট ও ক্ষমতার। এবং তিনি একজন অত্যন্ত দক্ষ হিসাবি। বারবার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর হিসাবের প্রায়োগিক সাফল্য প্রমাণ করে দিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদিদের হিসাব আর আমাদের মতো মানুষের ব্যক্তিগত নিকাশকে এক প্রান্তে মেলানোর তত্ত্ব এ সমাজে কাজ করে বলেই কদিন আগে আমরা দেখলাম, সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরও মোদির প্রতি সমর্থন জানালেন। এর কয়েক বছর আগে অপর সুরস্রষ্টা ভূপেন হাজারিকার বিজেপিতে যোগদানের ক্ষেত্রেও বোধ করি এই ব্যক্তিগত হিসাবনিকাশ-তত্ত্বই কাজ করেছিল।


দেশ পৃথক হলেও উপমহাদেশের ভূমি তো অবিচ্ছিন্ন। এ দেশে মোদির মতো হিসাবি মানুষ যেমন আছেন, তেমনই লতা-ভূপেনের মতো নিকাশি লোকও আছেন। সুতরাং কক্সবাজারের রামুর পর পাবনার সাঁথিয়ার মতো ঘটনা ঘটবে না—এ নিশ্চয়তা যেমন কেউ দিতে পারেনি, ঘটনাও তেমন থেমে থাকেনি। এভাবে ২ নভেম্বর সাঁথিয়ার বনগ্রাম বাজারের ঘটনার মাত্র দুই দিনের মাথায় ৪ নভেম্বর লালমনিরহাট সদরের সাতপাটকী মাঝিপাড়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এবং এভাবে হয়তো ঘটতেই থাকবে।

সংখ্যালঘু এক যুবক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করেছে—এই গুজব ছড়িয়ে রামুতে নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। এর এক বছর পর সাঁথিয়ার বনগ্রামের বাবলু সাহার ছেলে রাজীব সাহা ফেসবুকে মহানবী (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করেছে—এই গুজব ছড়িয়ে আবার তাণ্ডব চালানো হলো। গুজব ছড়ানোর কৌশলটা ছিল একই।

ফেসবুকের ব্যাপারস্যাপার সাধারণ মানুষ কমই বোঝে। সাম্প্রতিক সময়ে এই মাধ্যমটিকে মতলববাজেরা বেশ সাফল্যের সঙ্গে নেতিবাচক কাজে ব্যবহার করছে। তাই বলে মনোযোগটাকে ফেসবুকে আটকে রাখার কোনো কারণ নেই। যখন ফেসবুক ছিল না তখনো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালানোর জন্য কৌশল ও অজুহাতের অভাব হয়নি। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে পথের ধুলো ভিজে কাদা হয়েছে সংখ্যালঘুদের চোখের জলে। কখনো কম, কখনো বেশি।

সাতচল্লিশের দেশ বিভাগে সব থেকে বেশি মূল্য দিয়েছে পাঞ্জাব আর বাংলার সংখ্যালঘুরা। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার লালেও মিশে রয়েছে সংখ্যাগুরুর পাশাপাশি অসংখ্য সংখ্যালঘুর রক্ত। তার পরও থেমে থাকেনি। ফুটবলকে যেমন একবার বাঁ পা একবার ডান পা করে এগিয়ে নেওয়া হয়, তেমনই ক্ষমতায় টিকে থাকা অথবা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সংখ্যালঘু নির্যাতনের ‘খেলাটি’ খেলে যাওয়া হচ্ছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণার সময় ঘনিয়ে আসার মুখে আরেক দফা নতুন মাত্রায় সংখ্যালঘু-নিপীড়নের সূত্রপাত ঘটে। সাম্প্রদায়িক উসকানির মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করা, অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে বিচার-প্রক্রিয়াকে প্রলম্বিত করা বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমতাসীনদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা—এমন সব বিষয়ে নতুন মাত্রার এই সংখ্যালঘু নির্যাতনের পেছনের কারণ সন্দেহ নেই। তবে এটাই সবটা নয়। এ দেশে সংখ্যালঘু-পীড়নের ক্ষেত্র তৈরি এবং যুগ যুগ ধরে সেই ক্ষেত্র অবিকৃত থাকার পেছনের কারণটিও এর সঙ্গে যুক্ত।

সংখ্যালঘু, বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা পৃথিবীর অনেক দেশে এমনিতেই নানা সামাজিক-রাজনৈতিক চাপ ও বৈষম্যের শিকার। তাদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হতে পারে, যদি এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিটা যুক্ত হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল দলিল সংবিধান একসময় ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর এতে মতলববাজদের হাত পড়ে। অনেক কাটাছেঁড়ার পরও শেষ পর্যন্ত যখন তাতে রাষ্ট্রধর্ম রয়ে যায় এবং তা সংখ্যাগুরুর দিকেই ঝুঁকে পড়ে, তখন সেই সংবিধানে আর যা কিছুই লেখা থাক না কেন, সংখ্যালঘুরা নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারে না।


রাষ্ট্রীয় এই দৃষ্টিভঙ্গি সংখ্যালঘুদের দেহমনে হীনম্মন্যতা ও হীনবলের রসায়ন তৈরি করে। অন্যদিকে সাধারণ সংখ্যাগুরুর মনোজগতে কাজ করে এর উল্টো প্রতিক্রিয়া। এবং এই প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে নানামুখী স্বার্থ যুক্ত হয়ে তা চেপে বসে সংখ্যালঘুর ঘাড়ে। কক্সবাজারের রামু, উখিয়া, টেকনাফ, সাঁথিয়ার বনগ্রাম বা দেশের অন্যান্য স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের খবরের পাশাপাশি এ খবরও আসে যে কেবল ধর্মীয় দল নয়, কমবেশি অন্য বড় দলগুলোর নেতা-কর্মীরাও এর সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড় দাগের পরিকল্পনার নায়কদের স্বার্থের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের স্বার্থও একই পথ ধরে এগিয়ে যায়।

গত শতকের পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের হার বেড়ে গেছে। এ ধরনের দেশত্যাগের ঘটনায় কারও লাভ ভোটের, আর কারও লাভ সম্পত্তির। ধর্মের লাভের ভাগ পড়ে থাকে খালিই। অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধ্বজাটিও পড়ে মুখ থুবড়ে। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকেরা সাম্প্রতিক সংখ্যালঘু নির্যাতনের পেছনের কারণ তুলে ধরতে গিয়ে একটা ব্যাখ্যা বেশ জোরের সঙ্গেই দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, ঐতিহ্যগতভাবে এ দেশের সংখ্যালঘুরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে, এমন একটি বড় দলের দিকে ঝুঁকে আছে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেছে, এ রকম একটি দল নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে ঝুঁকেছে আর একটি বড় দলের দিকে। দেশে সংখ্যালঘুদের জনসংখ্যা এবং মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী দলটির সমর্থকসংখ্যা প্রায় সমান। বিশ্লেষকদের বক্তব্য হলো, এ অবস্থায় সংখ্যালঘুরা যতই দেশত্যাগ করবে, ততই তাদের সমর্থক বড় দলটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অন্য বড় দলটি লাভবান হবে।

সংখ্যালঘু-নির্যাতনের নেপথ্য কারণ হিসেবে এই ব্যাখ্যা হয়তো ফেলনা নয়। কিন্তু এই হিসাবের মধ্যে তাহলে গোঁজামিলটা থেকে যাচ্ছে কেন? সংখ্যালঘুরা দেশত্যাগ করলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের তো তাহলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কথা নয়; বরং প্রতিরোধ করতে মাঠে নামার কথা।

...রামুর ঘটনায় একদল যুবক রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। শেষরক্ষা হয়নি। সাঁথিয়ায়ও বাবলু সাহাকে কিছু মানুষ লুকিয়ে রেখেছিলেন হামলাকারীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য। কিন্তু এতে সংখ্যালঘুদের মনে স্বস্তি আসেনি। দেশের অন্যত্র এটুকু প্রতিরোধও হয়নি। কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হয়তো কঠোর হয়েছে। কিন্তু সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া কোনো দিনই সংখ্যালঘুর মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে অনেকে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। আবার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকে ব্যাপক সহিংসতার বিপক্ষে দাঁড়ানোর জন্য তেমন লোক খুঁজে না পেয়ে মনঃকষ্টে আছেন। এসব মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কিছুটা সক্রিয় হলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা যথেষ্ট সক্রিয় নন কেন, এ প্রশ্নের কিন্তু যুক্তিগ্রাহ্য জবাব মেলে না।

অনেকেই মনে করেন, গুজরাটে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি মোদির সহানুভূতি থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু ভোটের বৈতরণি পার হওয়ার জন্য তিনি সংখ্যাগুরুর ভাবাবেগের বাইরে পা রাখাকে যথাযথ মনে করেননি। শাসক হিসেবে সংখ্যালঘুদের রক্ষার দায় তাঁর ওপর বর্তালেও পিছে সংখ্যালঘুর প্রতি ‘দরদ’ দেখাতে গিয়ে সংখ্যাগুরুর সমর্থন হারিয়ে বসেন—এই বিবেচনায় তিনি সংখ্যাগুরুর অযৌক্তিক ভাবাবেগের কাছে নতিস্বীকার করেছেন।

দেশে নির্বাচন আসন্ন। এখন সব ঘটনাকেই ভোটের হিসাবের নিরিখে দেখা হবে। সংখ্যালঘু পীড়নের ঘটনাকেও পদপ্রার্থীরা হয়তো এই হিসাবেই দেখবেন। দেখবেন কিসে লাভ, কিসে লোকসান। শঙ্কায়-সংকটে যারা থাকে, তাদের ভোট আদায় হয়তো কঠিন নয়, বরং যারা তুলনায় সংকটে নেই, যারা সংখ্যাগুরু, তাদের সঙ্গে চলাটাই বেশি বুদ্ধিমানের কাজ—এমন ভাবনাও জননেতাদের কারও কারও বিবেচনায় আসতে পারে।

আসলে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নির্বিশেষে মানুষকে যখন মানুষ হিসেবে না দেখে ভোটার হিসেবে দেখা হয়, তখনই ঘটে বিপত্তি। জনপ্রতিনিধিরা মানুষকে যদি কেবল ভোটার হিসেবেই বিবেচনা করতে থাকেন, তাহলে আজ সংখ্যালঘুরা যেভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, কাল সংখ্যাগুরুও সেভাবেই নির্যাতিত হবে। কাল কেন, আজও তো হীনবল মানুষ ধর্মীয় দিক থেকে সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনসহ নানা দিক থেকে নির্যাতনের শিকার।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য রামুর সাহসী সেই সব যুবক আর সাঁথিয়ায় বাবলু সাহাকে যাঁরা রক্ষা করেছিলেন, তাঁদের মতো মানুষের জন্যই হয়তো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
অপেক্ষার সে সময় দীর্ঘও হতে পারে।

# মলয় ভৌমিক: অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Share:

আমি গর্বিত কারণ আমি হিন্দু

আমি গর্বিত কারণ আমি হিন্দু । এর অর্থ হল , --

* আমি গর্বিত , কারণ আমি পৃথিবীর প্রাচীনতম আধ্যাত্মিক আদর্শের গোষ্ঠীভুক্ত ।
*আমি গর্বিত , কারণ সারা পৃথিবীতে আমরাই প্রথম জ্ঞানের আলো জ্বেলেছি ।
*আমি গর্বিত , কারণ অন্যান্য সকল ধর্মমত হিন্দুধর্মের কোনও না কোনও শাখার মতবাদের প্রতিধ্বনি মাত্র ।
*আমি গর্বিত , কারণ আমরাই প্রথম জগতের মানুষকে তার অমৃতের অধিকার সম্পর্কে অবহিত করেছি
*আমি গর্বিত , কারণ আমি পবিত্র আর্য ঋষির উত্তরাধিকারী
Share:

"দামোদর ভজন্"




অচ্যুতম কেশবম্‌ কৃষ্ণ দামোদর
রাম নারায়নম্‌ জানকি বল্লভম ।।

কে বলে ভগবান এই পৃথিবীতে আসে না,
তুমি ভক্ত মীরার মত ডাকতে জানো না !!

অচ্যুতম কেশবম্‌ কৃষ্ণ দামোদর
রাম নারায়নম্‌ জানকি বল্লভম ।।

কে বলে ভগবান কখনো খায় না,
বের- শবরীর মত খাওয়াইতে জান না !!

অচ্যুতম কেশবম্‌ কৃষ্ণ দামোদর
রাম নারায়নম্‌ জানকি বল্লভম ।।

কে বলে ভগবান কখনো ঘুমান না,
মা যশোদার মত ঘুম পারাতে জান না !!

অচ্যুতম কেশবম্‌ কৃষ্ণ দামোদর
রাম নারায়নম্‌ জানকি বল্লভম ।।

কে বলে ভগবান কখনো নাচেন না,
গোপীদের মত নাচাইতে জান না !!

অচ্যুতম কেশবম্‌ কৃষ্ণ দামোদর
রাম নারায়নম্‌ জানকি বল্লভম ।।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ।।

দাসানুদাস কৃষ্ণকমল (মিন্টু)
๑۩๑ Bhagavad GITA (বাংলা) & শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল ๑۩๑
Share:

ভারতবর্ষের শিক্ষা ও সংস্কৃতি কতটা শক্তিশালি ছিল তার প্রমান

আর্যভুমি তথা ভারতবর্ষের শিক্ষা ও সংস্কৃতি কতটা শক্তিশালি ছিল তার প্রমান পাওয়া যায় ১৮৩৫ সালে এক ইংরেজ লর্ড এর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে-

"আমি ভারতবর্ষের অলিতে গলিতে, আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছি, কিন্তু এই দেশের এতটাই প্রাচুর্যতা, এতটাই সচ্ছলতা যে একজন ভিক্ষুক বা একজন চোরও আমার চোখে পড়েনি! তাদের মধ্যে এত উঁচু পর্যায়ের ন্যায়পরায়ণতা, একেকজন এতটাই নিষ্ঠাবান যে আমার মনে হয়না যে আমরা এই ভূমি জয় করতে পারব, যতক্ষন পর্যন্ত না আমরা সেখানকার জাতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিতে পারব! আর সেটি হল তাদের ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি! আর এই জন্য আমি প্রস্তাব করছি তাদের পুরানো, প্রাচীন শিক্ষা, সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করে দিতে। যখন তারা ভাবতে শিখবে তাদের নিজেদের চাইতে বিদেশী, ইংরেজরাই সেরা, ইংরেজদের সভ্যতাই সেরা, তখনই বুঝে নিতে হবে যে তারা তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা, তাদের নিজস্ব পরিচয় হারিয়েছে, আর তারা সেটাতে পরিণত হয়েছে ঠিক যেমনটি আমরা চাই। "

-লর্ড ম্যাকাউলি
ব্রিটিশ পার্লামেন্ট,
২/২/১৮৩৫
Share:

০৪ নভেম্বর ২০১৩

ভাইফোঁটা

বারো মাসের তেরো পার্বণে বাঁধা বাঙালি হিন্দুসমাজে ভাই-বোনের মধ্যেকার প্রীতি ও ভালোবাসায় পালিত হচ্ছে সম্প্রীতির উৎসব "ভাইফোঁটা"
--------------------------------------------

বারো মাসের তেরো পার্বণে বাঁধা বাঙালি হিন্দুসমাজের জীবনাচার। এর কোনোটি ধর্মীয় প্রথা, কোনোটি লৌকিক। ভাইফোঁটা হচ্ছে তাদের মধ্যই একটি আচার, যা কোন প্রচলিত পূজা-পার্বণ নয়। বাঙ্গালীর ঘরে ‘ভাইফোঁটা’ হচ্ছে সবচেয়ে আনন্দময়, নির্মল, একটি পার্বণ। ভাই-বোনের মধ্যেকার অনিন্দ্যসুন্দর সম্পর্ক ঘিরেই প্রচলিত হয়েছে এই উৎসবটি।

“ভ্রাতৃদ্বিতীয়া” বা “ভাইফোঁটা” উৎসব কেন করা হয় তার পিছনে অনেক পৌরাণিক ব্যাখ্যা বা কাহিনী রয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, “কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে যমুনাদেবী তাঁর ভাই যমরাজের মঙ্গল কামনায় আরাধনা করেন; যার পুণ্যপ্রভাবে যমদেব অমরত্ব লাভ করেন। বোন যমুনা দেবীর পুজার ফলে ভাই যমের এই অমরত্ব লাভের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বর্তমান কালের বোনেরাও এই সংস্কার বা ধর্মাচার পালন করে আসছে।”

অপর একটি সূত্রে জানা যায় যে, “ একদা প্রবল পরাক্রমশালী বলির হাতে বিষ্ণু পাতালে বন্দি হন। দেবতারা পড়েছেন মহা বিপদে, কারন কোন মতেই তাঁরা নারায়ণকে বলির কবল থেকে বার করে আনতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এলেন স্বয়ং লক্ষ্মী। তিনি বলিকে ভাই হিসেবে স্বীকার করেন। সেই উপলক্ষে তাঁর কপালে তিলক এঁকে দেন। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তখন স্বীকার করে বলি লক্ষ্মীকে উপহার দিতে চাইলে লক্ষ্মী চেয়ে নেন ভগবান বিষ্ণুকে। সেই থেকেই ভাইফোঁটা উৎসবের সূচনা”

এই সকল পৌরাণিক ব্যাখ্যা বা কাহিনি যাই থাকুক না কেন, বর্তমানে ভাইফোঁটা একটি সামাজিক উৎসব। এই উৎসবে এক দিকে যেমন পারিবারিক সম্পর্কগুলো আরও পোক্ত হয়; অন্য দিকে সূচিত হয় নারীদের সামাজিক সম্মান। তাই, ভাইফোঁটার ধর্মীয় গুরুত্ব অপেক্ষা সামাজিক ও পারিবারিক গুরুত্ব অনেক বেশী, যেখানে ভাই-বোনের মধ্যেকার প্রীতি ও ভালোবাসার স্বর্গীয় সম্পর্কটিই মূখ্য।

আমরা সামাজিক জীব। আমাদের সমাজ তৈরী হয় প্রথমে ঘর থেকে। মা-বাবা, ভাই-বোন দিয়ে যে পরিবার শুরু হয়, সেই পরিবারটিই সময়ের সাথে সাথে আত্মীয়তার বন্ধন বিস্তৃত করে, ঘর থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশী, প্রতিবেশী পেরিয়ে পাড়া, গ্রাম ছাড়িয়ে একদিন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে। আজ বাংলার যে নানা লোকাচার রয়েছে, যা দিয়ে বাঙালির সংস্কৃতিকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা যায়, তারই অনিবার্য অঙ্গ ভাইফোঁটা।

পরিশেষে “ভাইফোঁটা” উপলক্ষে পেজের সকল ভাই ও বোনদের প্রতি রইলো শুভকামনা। ভাইফোঁটা হোক সম্প্রীতির উৎসব৷

# শ্রী জয় রায়
Share:

০১ নভেম্বর ২০১৩

দীপাবলি- আঁধারে জ্বালে আলোর প্রদীপ



দীপাবলি- আলোর উৎসব; প্রতি বছরই দুর্গাপূজার আনন্দ-উচ্ছাস মিইয়ে যাবার আগেই দীপাবলি আসে। বিজয়ার ভাসানে- পাঁচদিনের আনন্দ-বিদায়ে অবচেতনে হলেও যে বিয়োগ-বিধূর চেতনায় আবিষ্ট হয় মন সেই মন দীপাবলিকে সামনে রেখেই আবার আনন্দের স্বপ্ন দেখে। সনাতন বাঙ্গালি সমাজে দুর্গাপূজা থেকেই শুরু হয় উৎসবের। তারপর লেগে থাকে বছর জুড়ে। দুর্গাপূজার পরে দীপাবলিতে কালী পূজা, ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, উত্তরায়ন সংক্রান্তি, লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতী পূজা, ঢোলপূর্ণিমা(হোলি)- এভাবেই বর্ষা শেষের বছর কেটে যায়। আবহমান বাঙ্গালি সমাজে বর্ষা হলো পরিশ্রমের, কষ্টের, দূর্ভোগের, বপনের-রোপনের; বর্ষাতেই রোপন হয় সারা বছরের ভাগ্য-লিপি; তারপরে আশ্বিনের পর থেকে একের পর এক উৎসব আসতে থাকে। বাকিটা বছর এভাবেই চলতে থাকে, আর উৎসব জোরদার হয় আগনের পর থেকে।

ছোটবেলা থেকেই এই উৎসবের পালন দেখে আসছি।আমি দীপাবলিকে ‘দিবানিতা’ নামেই জেনে এসেছি।সিলেটের সনাতন সমাজে এই নামকরণের পেছনের কারণ এখনও জানিনি। তবে বাংলা অভিধানে 'দীপাবলি'র সমার্থক আরেকটি শব্দ আছে, 'দীপান্বিতা'। স্পষ্টতই এই শব্দ ভ্রংশ হয়ে এসেছে কথ্য 'দিবানিতা'। সন্ধ্যার আগে মাটির প্রদীপ সাজানো হয়। অথবা কলা গাছের সতেজ খোল দিয়ে তৈরি হয় প্রদীপ। তেলে জড়িয়ে সলতে প্রদীপে রাখা হয়। মোমবাতিও আনা হয়। উঠোনের মাঝখানে একটা কলাগাছ রাখা হয়- আলকাধার হিসেবে। তার গায়ে বাঁশের টুকরো গেঁথে দেওয়া হয়, যাতে প্রদীপদানীর মত ব্যবহার করা যায়। ফুল দিয়ে সেই গাছ সাজানো হত। কলার খোল দিয়ে বড় বড় করে কয়েকটি ডুঙ্গা তৈরি করা হয়, মৃত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানাতে। বাবা তাঁর বাবা ও মায়ের নামে দুটি ডুঙ্গার প্রদীপ জেলে পুকুরের জলে ভাসাতেন; তাতে ধূপ জ্বলত; কাঁসরের শব্দে আলতো হাতের স্রোতে ভাসতো প্রদীপ- সেই প্রজ্বলিত প্রদীপে এক অন্যরকম পরিবেশ চলে আসত। বর্তমান আর অতীত যেন এক সাথে দাঁড়াত।ভূত-অভূত সময় যেন একটুর জন্য হলেও এক হত হাতের আলতো স্রোতের তোড়ে ভাসমান প্রদীপের শিখায়। পিতৃদেব-মাতৃদেবীর উদ্দেশ্যে উদ্যত জোড় হাতের প্রণামে জীবিত আর বিগত প্রাণ স্পন্দন অনুভূত হত, অমাবস্যার এক নিশির প্রারম্ভে, কাঁসর বাজা সন্ধ্যায়- আলোময়-প্রজ্বলিত রাতের পূর্বে।

তারপর; সন্ধ্যা নেমে আসত। একে একে জ্বলে উঠত মাটির প্রদীপ, কলার প্রদীপ, মোমবাতি। দেবালয়ে, উঠোনে, দেউড়িতে, বাড়ির পথে- সর্বত্র জ্বলত প্রদীপ। এত এত জ্বলন্ত প্রদীপের সামনে দাঁড়িয়ে অনুভূতির সীমানার লাগাম টানা বেশ দুষ্কর। সেদিন বিদ্যুত লোডশেডিংয়ে কিছু সময়ের জন্যে চলে গেলে মন খুশীই হত।
-কথাগুলো সব অতীত কালে বলেছি, কারণ- সাত বছরের মত হতে চলল আমি এই উৎসবে বাড়িতে থাকতে পারি না। তাই আমার কাছে সবই অতীত।

দীপাবলি- শুধু সনাতনধর্মীদের নয়, শিখ এবং জৈন ধর্মাবলম্বীদেরও অনুষ্ঠান। আর এখন- এই অনুষ্ঠান সার্বজনীন; গ্লোভালাইজড সমাজে এখন একে আর সীমাবদ্ধ রাখা যায় না; এই অনুষ্ঠান আমার- আপনার- সবার; এদেশের- সেদেশের- ওই দেশের; এ জাতির- সে জাতির- ঐ জাতির। বাংলাদেশে আজকেই এই দিনে কালী পূজা হয়- তাই দীপাবলি আর কালী পূজা একসাথে গাঁথা। এই দিন সরকারী ছুটি না সংরক্ষিত ছুটি; আমার জানা নেই। তবে হাইস্কুলে থাকতে এই দিন অর্ধদিবসের জন্য ছুটি চেয়েছিলাম সব ক্লাসমেটদের অনুরোধে- তাই মনে হচ্ছে সরকারী ছুটি নেই এই দিনে।হয়তো সংরক্ষিত ছুটি থেকে স্কুল-কলেজে ছুটি দেওয়া হয়। মালোয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, নেপাল, গুয়ানা, ত্রিনিদাদ-টোব্যাগো, মারিশাস, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ফিজি এবং সুরিনামে এই দিন সরকারী ছুটির দিন।

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে দীপাবলিতে কালী পূজা হয়। অন্যান্য অঞ্চলে এই দিনে গণেশ পূজা এবং লক্ষ্মী পূজাও করা হয়।সনাতনদের মাঝে কেউ কেউ আজকের দিনকে বিষ্ণুদেব এবং লক্ষ্মীদেবীর বিবাহ বার্ষিকি হিসেবে পালন করেন। জৈন ধর্মের প্রবর্তক মহাবীর ৫২৭ অব্দে আজকেই এই দিনে মোক্ষ (নির্বাণ) লাভ করেন। এই দিনে শিখ ধর্মগুরু গুরু হরগোবিন্দ জী অমৃতসরে ফিরে আসেন; সম্রাট জাহাঙ্গীরকে পরাজিত করে গোয়ালিওর দুর্গ থেকে বায়ান্ন হিন্দু রাজাকে মুক্ত করে- তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে শিখগণ পালন করেন; তারা এই দিনকে ‘বন্দী ছোড় দিবস’ও বলেন।

রামায়ন অনুসারে আজকের দিনে ত্রেতা যুগে শ্রী রাম রাবণ বধ করে চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করেন। শ্রী রামের চৌদ্দ বছর পরের প্রত্যাবর্তনে সারা রাজ্য জুড়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়। প্রজারা খুশীতে শব্দবাজি করে। অনেকে মনে করেন দীপাবলীর আলোকসজ্জা এবং শব্দবাজি ত্রেতাযুগে রাম-রাজ্যে ঘটে যাওয়া সেই অধ্যায়কে সামনে রেখেই অন্যসব অঞ্চলে প্রচলিত হয়েছে, পরিচিত হয়েছে, বিস্তৃত হয়েছে।

দীপাবলী মূলত পাঁচদিন ব্যাপী উৎসব। দীপাবলীর আগের দিনের চতুর্দশীকে (এই দিনকে দীপাবলি উৎসবের প্রথম দিন বলা হয়) বলা হয় ‘নরকা চতুর্দশী’; এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর স্ত্রী সত্যভামা নরকাসুরকে বধ করেছিলেন। চতুর্দশী পরের অমাবস্যা তিথি দীপাবলি উৎসবের দ্বিতীয় দিন, কিন্তু এই দিনই মূল হিসেবে উদযাপিত হয়। এই দিন রাতে শাক্ত ধর্মের অনুসারীগণ শক্তি দেবী কালীর পূজা করেন। তাছাড়া এই দিনে লক্ষীপূজাও করা হয়, কথিত আছে এই দিনে ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী বরধাত্রী রূপে ভক্তের মনোকামনা পূর্ণ করেন। বিষ্ণুপুরান মতে, বিষ্ণুর বামন অবতার অসুর বলিকে পাতালে পাঠান; আজকের এই দিনে পৃথিবীতে এসে অন্ধকার ও অজ্ঞতা বিদূরিত করতে, ভালবাসা ও জ্ঞানের শিখা প্রজ্বলিত করতে অসুর বলিকে পৃথিবীতে এসে অযুদ অযুদ প্রদীপ জ্বালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। দীপাবলীর তৃতীয় দিন- কার্তিকা শুদ্ধ; এই দিন অসুর বলি নরক থেকে বেরিয়ে পরিশুদ্ধ হয়ে বিষ্ণুর বরে পৃথিবী শাসন করে।চতুর্থ দিন হচ্ছে ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া; একে যম দ্বিতীয়াও বলা হয়; এই দিন বোনেরা ভাইকে নিমন্তণ করে, কপালে ফোটা দেয়, হাতে রাখী বেঁধে দেয়।

প্রত্যেক সার্বজনীন আনন্দের উৎসব মন্দের বিরুদ্ধে ভাল'র জয়কে উদযাপন করে। আলোকসজ্জার এই দিবস অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো জ্বালার দিন। নিজের ভেতরের বাহিরের সকল অজ্ঞতা ও তমঃকে দীপ শিখায় বিদূরিত করার দিন। প্রেম-প্রীতি-ভালবাসার চিরন্তন শিখা প্রজ্বলিত করার দিন। দেশ থেকে দেশে, অঞ্চল থেকে অঞ্চলে- এই দিনের মাহাত্ম্য ভিন্ন ভিন্ন; তবু মূল কথা এক। আর আধ্যাত্মিকতার গভীর দর্শনে এই দিন- আত্মাকে প্রজ্বলিত করে পরিশুদ্ধ করে সেই পরমব্রহ্মে লীন হওয়ার দিন।



সবার জীবনে সুখ আসুক। সকল অন্ধকার ঘুচে যাক। সকল যন্ত্রনা মুছে যাক। শান্তির প্রদীপ জ্বলুক। ভালবাসার প্রদীপ জ্বলুক।



সবাইকে দীপাবলির শুভেচ্ছা।

লিখেছেনঃ সজল শর্মা
Share:

২২ অক্টোবর ২০১৩

সংস্কার কি?




সংস্কার মানে হচ্ছে নিজেকে পবিত্র, দোশত্রুটি মুক্ত এবং নির্মল করতে যে কাজ করা হয় তাকে বোঝায়। প্রতিটা মানুষ চায় তার সন্তান একজন ভাল চরিত্রের মানুষ হিসাবে গড়ে উঠুক। যে অনুষ্ঠান জীবনকে ধর্মীয় পরিবেশে সুন্দরভাবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে তাই সংস্কার। সনাতান ধর্মে ১৬ টি সংস্কার আছে।

সংস্কার এমন কিছু কাজ যা ভবিষ্যত জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলে এবং একজন ব্যাক্তির উপর প্রভাব বিস্তার করে। চারপাশের পরিবেশ শিশুর চরিত্র গঠনে ভুমিকা রাখে। যে কোন ভাল প্রভাব সুন্দর চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। এই ষোলটি সংস্কার মানুষের জীবন কে উন্নত করে, খারাপ সঙ্গ থেকে রক্ষা করে এবং তাকে একজন সু-নাগরীক হিসাবে গড়ে তোলে।

যখন কেও একটি আরাম দায়ক চেয়ার তৈরি করতে চায় নিশ্চয় সে আজেবাজে কাঠ দিয়ে তা তৈরি করতে চাইবে না। খারাপ কাঠ কে মসৃন করে, সুন্দর ভাবে পরিষ্কার করে, তারপর ঘরের জন্য আসবাব তৈরি করে। জন্মের পর থেকে এইসব সংস্কার মানুষকে একজন পূর্ণ মানুষে পরিনত করে।

আমরা ঘরে ধূলা ময়ল ঝাড়ু দেই। নিজেদের কাপড় পরিষ্কার করি।ঘরবাড়ী, কাপড় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না থাকলে আমাদের খারাপ লাগে। আমরা প্রতিদিন স্নান করি শরীর পরিষ্কার করার জন্য। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার চেষ্টা করি কারন এর অভাবে আমাদের বিভিন্ন রোগ হতে পারে। এই বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা জীবনের একটি অংশ কিন্তু মন, চিন্তা এবং আত্মার পরিচ্ছন্নতা বেশি প্রয়োজন ।

মন কে অবশ্যই সত্যের অনুসন্ধানে ব্যকুল থাকতে হবে; দয়ালু এবং উদার হতে হবে; বোধবুদ্ধি সততায় পূর্ণ থাকতে হবে; আত্মাকে অবশ্যই পাপ শূণ্য হতে হবে।মহৎ জীবন গঠনে এগুলো প্রয়োজন। মন, বোধবুদ্ধি এবং আত্মার সর্বচ্চ পবিত্রতা অর্জনের জন্য ঋষিরা ষোলটি সংস্কারের কথা বলেছেন।প্রাথমিক সংস্কার জীবনের শুরু নির্দেশ করে সর্বশেষ সংস্কার মৃত্যুর সময় পালন করা হয়ে থাকে।আমরা এই সংস্কার গুলো পালন করি যাতে ভগবানের আশীর্বাদ পেয়ে সত্য ও ভালোর প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত হতে পারি। সংস্কার একজন প্রকৃত মহান মানুষের মর্যাদা কে আরও বৃদ্ধি করে।

১৬ টি সংস্কার হচ্ছে:
১) গর্ভদানঃ বিবাহের পর স্বামী স্ত্রী সন্তান জন্মদানের জন্য সকলের আশীর্বাদ পান। এই সংস্কার দ্বারা তারা স্ব্যাস্থবান, মহৎ এবং উদার হৃদয়ের সন্তান প্রার্থনা করেন।

২) পুংসবনঃ গর্ভদানের ৩ মাস পর এই সংস্কার পালন করতে হয়। গর্ভাবস্থায় সন্তানের সুস্থ ভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হয়।

৩) সীমান্তনয়নঃ এটা গর্ভধারনের ষষ্ঠ বা অস্টম মাসের শেষে করা হয় বাচ্চার অঙ্গ প্রত্তঙ্গ পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য।

৪) জাতকর্ম: জন্মগ্রহনের দিন বাচ্চা কে জাতকর্মের মাধ্যমে পৃথিবিতে স্বাগতম জানান হয়।

৫) নামকরনঃ জন্মের এগার মাসে এই সংস্কার পালন করা হয় এবং বাচ্চাকে একটি নাম দেয়া হয়।

৬) নিশক্রমনঃ জন্মের চতুর্থ মাসে এই সংস্কার পালন করা হয়।শিশু সন্তান কে বাইরের পরিবেশে উন্মুক্ত করা হয়। যাতে সূর্যের আলো তাকে স্বাস্থ্যবান করে তোলে। দীর্ঘায়ুর জন্য প্রার্থনা করা হয়। এই সময় থেকে সন্তান প্রকৃতির কোলে প্রাকৃতিক ভাবে বড় হতে থাকে।

৭) আন্নপ্রাসনঃ সন্তানের যখন দাঁত উঠতে থাকে সাধারনত ছয় থেকে আট মাস বয়সে এই সংস্কার পালন করা হয়। এখন থেকেই তাকে শক্ত খাবার দেয়া হয়।

৮) চুড়াকরনঃ প্রথম থেকে তৃতীয় বছর বয়সের মধ্যে এই সংস্কার পালন করা হয়। প্রথম বারের মত মাথার সব চুল ফেলে দেয়া হয়। সুস্বাস্থ্য এবং সুস্থ্য্ মানসিক বিকাশের জন্য প্রার্থনা করা হয়।

৯) কর্ণভেদঃ তিন বছর বয়সে কান ফোরানো হয় এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করা হয়।

১০) উপনয়নঃ ৫ থেকে ৮ বছর বয়সের যে কোন সময় এই কাজ করা হয়। উপনয়ন মানে কার সন্নিকটে আসা। এই সংস্কারের মাধ্যমে একটি শিশু গুরু/ শিক্ষকের সন্নিধ্যে আসে। তাকে একটি পবিত্র সূতা দেয়া হয়, যাতে তিনটি আঁশ থাকে। এটি ছাত্রজ়ীবনের তিনটি নিয়মানুবর্তিতা নির্দেশ করেঃ জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি।শাস্ত্রে জীবন যাপনের যে পদ্ধতি উল্লেখ আছে তার প্রতি ওই শিশুটির অঙ্গিকার নির্দেশ করে। ব্রহ্মচর্য/ কৌমার্য (অবিবাহিত অবস্থা) ছাত্র জীবনের সবচেয়ে গুরুত্ত পুর্ণ বিষয়।নিজেকে নিয়ন্ত্রন করা এবং সব রকম খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার অভ্যাস ছাত্র জীবনেই করতে হয়। নিয়মিত পড়ালেখা এই সংস্কারের পরেই শুরু হয়।

১১) বেদারম্ভঃ উপনয়ন এর পরেই এই সংস্কার পালন করা হয়। এই সময় বেদ এবং বিভিন্ন শাস্ত্র অনুসারে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন শুরু হয়।জ্ঞানের সকল শাখায় তাকে বিচরণ করতে হয় এবং এর মাধ্যমে সে জাগতিক বিষয়ের সাথে আধাত্মিক বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে।

১২) সমাবর্তনঃ ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে যখন শিক্ষা গ্রহন শেষ হয় তখন এটি পালন করা হয়। গুরু ছাত্র কে যোগ্যতা অনুযায়ী ডিগ্রি প্রদান করেন। এরপর একজন ছাত্র আত্ম নির্ভর এবং স্বাধীন জীবন যাপন করে।

১৩) বিবাহঃ ছাত্রজীবনের ব্রহ্মচর্য শেষে একজন বিয়ে করে পরবর্তী জ়ীবনে পদার্পন করে, গৃহস্থ জ়ীবনে। একজন পুরুষ আর একজন মহিলা যারা এতদিন স্বাধীন জীবন যাপন করেছে এখন একসাথে জীবনভর চলার সপথ গ্রহন করে। বিয়ের পর সন্তান হয় এবং পরিবারের ধারা চলতে থাকে।

১৪) বানপ্রস্থঃ ৫০ বছর বয়সে গৃহস্থ আশ্রম শেষে বানপ্রস্থ আশ্রম শুরু হয়। নিজের সুবিধার জন্য তিনি যে সব কাজ করতেন তার সব কিছু পরিত্যাগ করেন। পরিবারের সব দায়িত্ব সন্তানের হাতে তুলে দিয়ে পূজর্চনা, ধ্যান এবং মানব সেবায় নিয়োজিত হন।

১৫) সন্ন্যাস: যদিও ৭৫ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহন করার কথা বলা আছে তারপরেও আত্মনিয়ন্ত্রন এবং আধ্যাত্মিকতা দ্বারা যিনি জাগতিক সব কিছু থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন তিনিই সন্ন্যাস গ্রহন করবেন। এ সময় তিনি ধনসম্পদ, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন এবং সকল ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করবেন । গাঢ় হলুদ রঙের ঢিলেঢালা পোশাক এই কঠোর জীবনের প্রতীক।তার কোন নির্দিষ্ট পরিবার সমাজ অথবা গৃহ নেই।

১৬) অন্তেষ্টীঃ মৃত্যুর পর শবদাহ করা হয় ।কিন্তু আত্মা অমর। যখন দেহ অগ্নিতে দাহ করা হয় তখন শরীর যে পাঁচটি উপাদান দিয়ে তৈরি, যেমন- মাটি, জল, আগুন, বাতাস এবং আকাশ প্রকৃতিতে মিশে যায়। মৃতের আত্মার শান্তিতে প্রার্থনা করা হয়। শবদাহ হচ্ছে মৃত দেহ সৎকারের সব চেয়ে ভাল উপায়।
সংস্কার কি? সংস্কার মানে হচ্ছে নিজেকে পবিত্র, দোশত্রুটি মুক্ত এবং নির্মল করতে যে কাজ করা হয় তাকে বোঝায়। প্রতিটা মানুষ চায় তার সন্তান একজন ভাল চরিত্রের মানুষ হিসাবে গড়ে উঠুক। যে অনুষ্ঠান জীবনকে ধর্মীয় পরিবেশে সুন্দরভাবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে তাই সংস্কার। সনাতান ধর্মে ১৬ টি সংস্কার আছে। সংস্কার এমন কিছু কাজ যা ভবিষ্যত জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলে এবং একজন ব্যাক্তির উপর প্রভাব বিস্তার করে। চারপাশের পরিবেশ শিশুর চরিত্র গঠনে ভুমিকা রাখে। যে কোন ভাল প্রভাব সুন্দর চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। এই ষোলটি সংস্কার মানুষের জীবন কে উন্নত করে, খারাপ সঙ্গ থেকে রক্ষা করে এবং তাকে একজন সু-নাগরীক হিসাবে গড়ে তোলে। যখন কেও একটি আরাম দায়ক চেয়ার তৈরি করতে চায় নিশ্চয় সে আজেবাজে কাঠ দিয়ে তা তৈরি করতে চাইবে না। খারাপ কাঠ কে মসৃন করে, সুন্দর ভাবে পরিষ্কার করে, তারপর ঘরের জন্য আসবাব তৈরি করে। জন্মের পর থেকে এইসব সংস্কার মানুষকে একজন পূর্ণ মানুষে পরিনত করে। আমরা ঘরে ধূলা ময়ল ঝাড়ু দেই। নিজেদের কাপড় পরিষ্কার করি।ঘরবাড়ী, কাপড় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না থাকলে আমাদের খারাপ লাগে। আমরা প্রতিদিন স্নান করি শরীর পরিষ্কার করার জন্য। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার চেষ্টা করি কারন এর অভাবে আমাদের বিভিন্ন রোগ হতে পারে। এই বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা জীবনের একটি অংশ কিন্তু মন, চিন্তা এবং আত্মার পরিচ্ছন্নতা বেশি প্রয়োজন । মন কে অবশ্যই সত্যের অনুসন্ধানে ব্যকুল থাকতে হবে; দয়ালু এবং উদার হতে হবে; বোধবুদ্ধি সততায় পূর্ণ থাকতে হবে; আত্মাকে অবশ্যই পাপ শূণ্য হতে হবে।মহৎ জীবন গঠনে এগুলো প্রয়োজন। মন, বোধবুদ্ধি এবং আত্মার সর্বচ্চ পবিত্রতা অর্জনের জন্য ঋষিরা ষোলটি সংস্কারের কথা বলেছেন।প্রাথমিক সংস্কার জীবনের শুরু নির্দেশ করে সর্বশেষ সংস্কার মৃত্যুর সময় পালন করা হয়ে থাকে।আমরা এই সংস্কার গুলো পালন করি যাতে ভগবানের আশীর্বাদ পেয়ে সত্য ও ভালোর প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত হতে পারি। সংস্কার একজন প্রকৃত মহান মানুষের মর্যাদা কে আরও বৃদ্ধি করে। ১৬ টি সংস্কার হচ্ছে: ১) গর্ভদানঃ বিবাহের পর স্বামী স্ত্রী সন্তান জন্মদানের জন্য সকলের আশীর্বাদ পান। এই সংস্কার দ্বারা তারা স্ব্যাস্থবান, মহৎ এবং উদার হৃদয়ের সন্তান প্রার্থনা করেন। ২) পুংসবনঃ গর্ভদানের ৩ মাস পর এই সংস্কার পালন করতে হয়। গর্ভাবস্থায় সন্তানের সুস্থ ভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হয়। ৩) সীমান্তনয়নঃ এটা গর্ভধারনের ষষ্ঠ বা অস্টম মাসের শেষে করা হয় বাচ্চার অঙ্গ প্রত্তঙ্গ পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য। ৪) জাতকর্ম: জন্মগ্রহনের দিন বাচ্চা কে জাতকর্মের মাধ্যমে পৃথিবিতে স্বাগতম জানান হয়। ৫) নামকরনঃ জন্মের এগার মাসে এই সংস্কার পালন করা হয় এবং বাচ্চাকে একটি নাম দেয়া হয়। ৬) নিশক্রমনঃ জন্মের চতুর্থ মাসে এই সংস্কার পালন করা হয়।শিশু সন্তান কে বাইরের পরিবেশে উন্মুক্ত করা হয়। যাতে সূর্যের আলো তাকে স্বাস্থ্যবান করে তোলে। দীর্ঘায়ুর জন্য প্রার্থনা করা হয়। এই সময় থেকে সন্তান প্রকৃতির কোলে প্রাকৃতিক ভাবে বড় হতে থাকে। ৭) আন্নপ্রাসনঃ সন্তানের যখন দাঁত উঠতে থাকে সাধারনত ছয় থেকে আট মাস বয়সে এই সংস্কার পালন করা হয়। এখন থেকেই তাকে শক্ত খাবার দেয়া হয়। ৮) চুড়াকরনঃ প্রথম থেকে তৃতীয় বছর বয়সের মধ্যে এই সংস্কার পালন করা হয়। প্রথম বারের মত মাথার সব চুল ফেলে দেয়া হয়। সুস্বাস্থ্য এবং সুস্থ্য্ মানসিক বিকাশের জন্য প্রার্থনা করা হয়। ৯) কর্ণভেদঃ তিন বছর বয়সে কান ফোরানো হয় এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করা হয়। ১০) উপনয়নঃ ৫ থেকে ৮ বছর বয়সের যে কোন সময় এই কাজ করা হয়। উপনয়ন মানে কার সন্নিকটে আসা। এই সংস্কারের মাধ্যমে একটি শিশু গুরু/ শিক্ষকের সন্নিধ্যে আসে। তাকে একটি পবিত্র সূতা দেয়া হয়, যাতে তিনটি আঁশ থাকে। এটি ছাত্রজ়ীবনের তিনটি নিয়মানুবর্তিতা নির্দেশ করেঃ জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি।শাস্ত্রে জীবন যাপনের যে পদ্ধতি উল্লেখ আছে তার প্রতি ওই শিশুটির অঙ্গিকার নির্দেশ করে। ব্রহ্মচর্য/ কৌমার্য (অবিবাহিত অবস্থা) ছাত্র জীবনের সবচেয়ে গুরুত্ত পুর্ণ বিষয়।নিজেকে নিয়ন্ত্রন করা এবং সব রকম খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার অভ্যাস ছাত্র জীবনেই করতে হয়। নিয়মিত পড়ালেখা এই সংস্কারের পরেই শুরু হয়। ১১) বেদারম্ভঃ উপনয়ন এর পরেই এই সংস্কার পালন করা হয়। এই সময় বেদ এবং বিভিন্ন শাস্ত্র অনুসারে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন শুরু হয়।জ্ঞানের সকল শাখায় তাকে বিচরণ করতে হয় এবং এর মাধ্যমে সে জাগতিক বিষয়ের সাথে আধাত্মিক বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে। ১২) সমাবর্তনঃ ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে যখন শিক্ষা গ্রহন শেষ হয় তখন এটি পালন করা হয়। গুরু ছাত্র কে যোগ্যতা অনুযায়ী ডিগ্রি প্রদান করেন। এরপর একজন ছাত্র আত্ম নির্ভর এবং স্বাধীন জীবন যাপন করে। ১৩) বিবাহঃ ছাত্রজীবনের ব্রহ্মচর্য শেষে একজন বিয়ে করে পরবর্তী জ়ীবনে পদার্পন করে, গৃহস্থ জ়ীবনে। একজন পুরুষ আর একজন মহিলা যারা এতদিন স্বাধীন জীবন যাপন করেছে এখন একসাথে জীবনভর চলার সপথ গ্রহন করে। বিয়ের পর সন্তান হয় এবং পরিবারের ধারা চলতে থাকে। ১৪) বানপ্রস্থঃ ৫০ বছর বয়সে গৃহস্থ আশ্রম শেষে বানপ্রস্থ আশ্রম শুরু হয়। নিজের সুবিধার জন্য তিনি যে সব কাজ করতেন তার সব কিছু পরিত্যাগ করেন। পরিবারের সব দায়িত্ব সন্তানের হাতে তুলে দিয়ে পূজর্চনা, ধ্যান এবং মানব সেবায় নিয়োজিত হন। ১৫) সন্ন্যাস: যদিও ৭৫ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহন করার কথা বলা আছে তারপরেও আত্মনিয়ন্ত্রন এবং আধ্যাত্মিকতা দ্বারা যিনি জাগতিক সব কিছু থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন তিনিই সন্ন্যাস গ্রহন করবেন। এ সময় তিনি ধনসম্পদ, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন এবং সকল ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করবেন । গাঢ় হলুদ রঙের ঢিলেঢালা পোশাক এই কঠোর জীবনের প্রতীক।তার কোন নির্দিষ্ট পরিবার সমাজ অথবা গৃহ নেই। ১৬) অন্তেষ্টীঃ মৃত্যুর পর শবদাহ করা হয় ।কিন্তু আত্মা অমর। যখন দেহ অগ্নিতে দাহ করা হয় তখন শরীর যে পাঁচটি উপাদান দিয়ে তৈরি, যেমন- মাটি, জল, আগুন, বাতাস এবং আকাশ প্রকৃতিতে মিশে যায়। মৃতের আত্মার শান্তিতে প্রার্থনা করা হয়। শবদাহ হচ্ছে মৃত দেহ সৎকারের সব চেয়ে ভাল উপায়।

courtesy by : Dipan Kumar Sarker
Share:

১৪ অক্টোবর ২০১৩

মহাভারত (ভূমিকা )

     
 মহাভারত অতি বৃহৎ গ্রন্থ। সংস্কৃত ভাষায় এতাদৃশবিস্তীর্ণ গ্রন্থ আর দেখিতে পাওয়া যায় না। ইহা ইতিহাস বলিয়াই প্রসিদ্ধ; কিন্তু কোন কোন স্থলে ইহা পুরাণ এবং পঞ্চম বেদ শব্দেও উক্ত হইয়াছে। বস্তুতঃ মহাভারতে পুরাণের সমস্ত লক্ষণ বিদ্যমান আছে, এবং স্থানে স্থানে বেদের আখ্যানও বর্ণিত হইয়াছে। ইহাতে দেবচরিত, ঋষিচরিত ও রাজচরিত কীর্ত্তিত হইয়াছে এবং নানাপ্রকার উপাখ্যানাদিও লিখিত আছে। অতি বিস্তৃত মহাভারত গ্রন্থে অনেক প্রকার রাজনীতি ও ধর্ম্মনীতি উক্ত হইয়াছে, এবং নানাবিধ লৌকিকাচার ও বিষয়-ব্যবহারও বর্ণিত আছে। যাহাতে ভারতবর্ষের পূর্ব্ববৃত্তান্ত সমস্ত জ্ঞাত হইয়া সম্পূর্ণরূপে চরিতার্থ হইতে পারা যায়, সংস্কৃত ভাষায় এতাদৃশ কোন প্রকৃত পুরাগ্রন্থ দৃষ্ট হয় না। কিন্তু মহাভারত পাঠ করিলে সে ক্ষোভ অনেক অংশে দূর হইতে পারে। যেরূপ পদ্ধতি অনুসারে অন্যান্য দেশের পুরাবৃত্ত লিখিত হইয়া থাকে, মহাভারত তদ্রূপ প্রথানুক্রমে রচিত নহে, কিন্তু কোন বিচক্ষণ লোকে মনোযোগপুর্ব্বক ইহার আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া দেখিলে যে ভারতবর্ষের পূর্ব্বকালীন আচার, ব্যবহার, ধর্ম্ম ও বিষয়-ব্যবহারের অনেক পরিচয় প্রাপ্ত হইতে পারেন, তাহাতে আর সন্দেহ নাই।
    কোন কোন বিষয় বিবেচনা করিলে মহাভারত যেমন পুরাবৃত্তমধ্যে পরিগণিত হইতে পারে, সেইরূপ কোন কোন অংশে ইহাকে নীতি-শাস্ত্র বলিলেও বলা যায়। ইহার অনেক স্থানে সুষ্পষ্টরূপে অনেক উপাখ্যানাদি বর্ণিত হইয়াছে। মহাভারতের রচনাকর্ত্তা এবং ভারতবর্ষীয় অপরাপর পূর্ব্বতন ঋষিগণ উল্লিখিত অসামান্য গ্রন্থের অধ্যয়ন ও শ্রবণের যে সমস্ত অসাধারণ অলৌকিক ফলশ্রুতি বর্ণন করিয়া গিয়াছেন, তাহাতে আস্থাশূন্য হইলেও ইহার শ্রবণ ও অধ্যয়ন দ্বারা নীতি, জ্ঞান ও বিষয়-ব্যবহার জ্ঞানাদি অনেক প্রকার উপকার লাভ করিয়া সুখী হওয়া যাইতে পারে, সন্দেহ নাই।
    এই গ্রন্থ হইতে উৎকৃষ্ট উৎকৃষ্ট নীতি সকল সঙ্কলন করিয়া এতদ্দেশীয় অনেক পণ্ডিত প্রশংসনীয় নীতিশাস্ত্র রচনা দ্বারা জনসমাজে প্রতিষ্ঠিা লাভ করিবাছেন, এবং ভারতবর্ষের অনেক কবিও ইহার অনেক মনোহর আখ্যান অবলম্বনপূর্বক অনুপম আশ্চর্য্য কাব্য-নাটকাদি রচনা করিয়া কাব্য-রসরসিক জনগণের চিত্তবিনোদ সাধন করিয়াছেন। শাস্ত্রব্যবসায়ী পণ্ডিতগণও উল্লিখিত গ্রন্থ হইতে সর্ব্বদা শ্লোক সকল উদ্ধৃত করিয়া লোকদিগকে নীতিশিক্ষা প্রদান করেন। ফলতঃ ভারতান্তর্গত অনেক উপদেশ শ্রবণ করিয়া যে ভারতবর্ষীয় লোকে অনেক প্রকার নীতিজ্ঞান লাভ করিয়াছে, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। অতি বিস্তীর্ণ ভারত-গ্রন্থে প্রায় মনুষ্যের সকল প্রকার অবস্থাই বর্ণিত আছে, সুতরাং ইহা হইতে সকল অবস্থার অনুরূপ উপদেশ প্রাপ্ত হইয়া লোকে সাবধানে সংসার-যাত্রা নির্ব্বাহ করিতে পারে। এই গ্রন্থ এদেশের সবিশেষ গৌরবস্বরূপ। কোন ভিন্নদেশীয় পণ্ডিত নিরপেক্ষ হইয়া ইহার আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া দেখিলে অবশ্যই গ্রন্থকর্তার আশ্চর্য্য অধ্যাবসায়, অসামান্য রচনানৈপূণ্য, প্রগাঢ় ভাবমাধুরী ও উদার উদ্দেশ্যের যশঃকির্ত্তন করেন, সন্দেহ নাই।
    অসামান্য যত্ন-সম্পন্ন ভারতগ্রন্থ যে, কোন্ সময় ও ভারতবর্ষের কি প্রকার অবস্থায় রচিত হইয়াছে, তাহা সংশয়শূন্য হইয়া অবধারিত করা নিতান্ত কঠিন। কিন্তু বেদরচনার অনেক পরে যে ইহার রচনা হইয়াছে, তাহা ইহার রচনাতাৎপর্য্য ও উপাখ্যানাদি দ্বারাই সহজে প্রতিপন্ন হইতেছে। বেদের ভাষার সহিত ইহার ভাষার তুলনা করিয়া দেখিলেই ইহাকে বেদাপেক্ষা আধুনিক বোধ হয় এবং ইহার মধ্যে বেদের আখ্যানাদিও দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার মধ্যে রাজনীতি, ধর্ম্মনীতি, লোকযাত্রাবিধান, বাণিজ্য-কৃষিকার্য্য ও শিল্পশাস্ত্রাদি সংক্রান্ত যে সকল কথা বর্ণিত আছে, কোন আদিম-কালবর্ত্তী অসভ্যাবস্থা লোকের চিন্তাপথে তৎসমুদয় উদিত হওয়া কোনক্রমেই সম্ভব হইতে পারে না। অতএব যে সময় ভারতবর্ষে বিলক্ষণ রূপে সভ্যতার প্রচার ও জ্ঞানের বিস্তার হইয়াছিল, মহাভারত যে তৎকালে রচিত গ্রন্থ, সে বিষয়ে কোন সংশয় জন্মিতে পারে না।

    অশেষ জ্ঞানাধার ও নীতিগর্ভ মহাভারত গ্রন্থ এদেশীয় সর্ব্বসধারণ লোকের বোধসুলভ করিবার উদ্দেশে, কাশীরাম দাস তাঁহার অষ্টাদশ-পর্ব্ব বাঙ্গালা ভাষায় পদ্যে অনুবাদ করিয়া গিয়েছেন এবং এপর্য্যন্ত পৌরাণিক পণ্ডিতেরাও  স্থানে স্থানে দেশীয় ভাষায় উক্ত গ্রন্থের ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন। কিন্তু কাশীরাম দাসের গ্রন্থপাঠ, অথবা বেদীস্থিত পৌরাণিকদিগের ব্যাখ্যা শ্রবণ করিয়া মহাভারত যে কি পদার্থ ইহা যথার্থ রূপে জানিবার সম্ভাবনা নাই। কাশীরাম দাস স্বরচিত গ্রন্থের সৌন্দর্য্য-সম্পাদনমানসে এবং সর্ব্বসাধারণ লোকের চিত্তরঞ্জন উদ্দেশে ব্যাসপ্রোক্ত মূল গ্রন্থের বহির্ভূত অনেক কথা রচনা করিয়া আপনার কবিত্বশক্তি প্রকাশ করিয়াছেন, এবং মূলের লিখিত অনেক স্থল পরিত্যাগ করিয়া আপনার শ্রম লাঘব করিতে চেষ্টা পাইয়াছেন। ইদানীন্তন পুরাণ-বক্তা পণ্ডিত মহাশয়েরাও শ্রোতাদিগের শ্রবণ-সুখসম্পাদনাভিলাষে এবং আপনাদিগের হাস্যকরুণাদি-রসসাধনীশক্তি প্রকাশ করিবার মানসে কাশীরাম দাসের অনুকরণ করিয়া মূল গ্রন্থ পরিত্যাগপূর্ব্বকও অনেক প্রকার নূতন কথার ব্যাখ্যা করেন এবং শ্রোতাদিগের শ্রবণের অনুপযুক্ত আশঙ্কা করিয়া মূল গ্রন্থের অনেক স্থল পরিত্যাগ করিয়া থাকেন। এই দেশীয় সর্ব্বসাধারণ লোকের মহাভারতের প্রকৃত পরিচয় প্রাপ্ত হইবার উল্লিখিত উভয় পথে যখন উক্ত প্রকার বিষম প্রতিবন্ধক বিদ্যমান রহিয়াছে, তখন গুরুতর পরিশ্রম স্বীকারপূর্বক সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ পারদর্শী হইয়া স্বয়ং মহাভারত পাঠ বা কোন যোগ্য পণ্ডিতের মুখে প্রত্যেক শ্লোকের ব্যাখ্যা শ্রবণ না করিলে আর মহাভারত যে কি  ইহা জানিবার উপায় নাই। কিন্তু এক্ষণে এদেশে দিন দিন সংস্কৃত ভাষায় যে প্রকার অননুশীলন এবং অনাদর হইয়া আসিতেছে তাহাতে বরং সংস্কৃত গ্রন্থসকল ক্রমে এদেশীয় লোকের নিকট হইতে তিরোহিত হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা বোধ হয়। অতএব যাহাতে এদেশিয় লোকে অতীব আদরণীয় ভারত-গ্রন্থের সমস্ত মর্ম্ম প্রকৃত রূপে অবগত  হইয়া সুখী হইতে পারেন এবং  যাহাতে ভারতবর্ষের গৌরবস্বরূপ মহাভারতের অবশ্যম্ভব মর্য্যাদা চিরদিন বর্ত্তমান থাকে, তাহার উপযুক্ত উপায় নির্দ্ধারণ করিবার উদ্দেশে আমি এই দুঃসাধ্য ও চিরসঙ্কল্পিত ব্রতে ব্রতী হইয়াছি।
    এক্ষণে আমাদিগকে দেশের মধ্যে নানাস্থানে নানা বিদ্যোৎসাহী ও স্বদেশহিতানুরাগী মহানুভবগণ ইংরেজী ভাষার বিবিধ জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ বাঙ্গালা ভাষায় অনুবাদ করিয়া দেশের হিতসাধনে তৎপর হইয়াছেন। কেহ বিজ্ঞানশাস্ত্রের অনুবাদ করিতেছেন, কেহ সাহিত্যের অনুবাদ করিয়া প্রচার করিতেছেন, কেহ পুরাবৃত্তাদি গ্রন্থের অনুবাদপ্রসঙ্গেও আমোদিত হ‌ইয়াছেন। ইহা দেখিয়াও আমার মনে হইল যে, যেমন অনুবাদ দ্বারা ভিন্ন দেশের গ্রন্থান্তর্গত অমূল্য জ্ঞানরত্ন সকল সঞ্চয় করিয়া স্বদেশের গৌরববৃদ্ধি করা উচিত, সেইরূপ স্বদেশীয় মহানুভব পুরুষদিগের মানসোদিত আশ্চর্য্য তত্ত্ব সকল স্থায়ী হইবার উপায় বিধান করাও একান্ত কর্ত্তব্য। স্বদেশের জ্ঞানোন্নতি সংসাধন ও জ্ঞানগৌরব রক্ষা করাই তাহার প্রকৃত হিত সাধন করা। সুদূরপ্রস্থিত প্রশস্ত পন্থাও কালেতে বিলুপ্ত হয়, সুদীর্ঘ দীর্ঘিকাও সময়ে শুষ্ক হইয়া যায়, অত্যূচ্চ প্রাসাদও কালে ভগ্ন ও চূর্ণ হইয়া গিয়া থাকে এবং পরিখাপরিবেষ্টিত দুর্গম দুর্গেরও ক্রমেই নাশ হইয়া থাকে, কিন্তু প্রগাঢ় জ্ঞানচিহ্ন দেশ হইতে শীঘ্র অপনীত হ‌ইবার নহে। এই বিবেচনায় আমি স্বীয় যৎ-সামান্য পরিমিত শক্তি দ্বারা বাঙ্গালা ভাষায় প্রবিস্তীর্ণ মহাভারতের অনুবাদ করিত স্বদেশের হিত সাধন করিতে সাহসী হইয়াছি।
    মহাভারত যেরূপ দুরূহ গ্রন্থ, যাদৃশ অল্পবুদ্ধি জনকর্ত্তৃক ইহা সম্যক্‌রূপে অনুবাদিত হওয়া নিতান্ত দুষ্কর। এই নিমিত্ত ইহার অনুবাদসময়ে অনেক কৃতবিদ্য মহোদয়গণের ভূয়িষ্ঠ সাহায্য গ্রহণ করিতে হইয়াছে, এমনকি তাঁহাদের পরামর্শ ও সাহায্যের উপর নির্ভর করিয়া আমি এই গুরুতর ব্যাপারের অনুবষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইয়াছি, তন্নিমিত্ত ঐ সকল মহানুভবদিগের নিকট চিরজীবন কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ রহিলাম।
    আমি যে দুঃসাধ্য ও চিরজীবনসেব্য কঠিন ব্রতে কৃতসংকল্প হইয়াছি তাহা যে নিবিগ্নে শেষ করিতে পারিব, আমার এপ্রকার ভরসা নাই। যদি জগদীশ্বর-প্রসাদে পৃথিবীমধ্যে কুত্রাপি বাঙ্গালা প্রচলিত থাকে, আর কোন কালে এক অনুবাদিত পুস্তক কোন ব্যক্তির হস্তে পতিত হওয়ায় সে ইহার মর্ম্মানুধাবন করত হিন্দুকুলের কীর্ত্তিস্তম্ভস্বরূপ ভারতের মহিমা অবগত হইতে সক্ষম হয়, তাহা হইলেই আমার সমস্ত পরিশ্রম সফল হইবে।
    অষ্টাদশপর্ব্ব সমগ্র মহাভারত অনুবাদ করত একত্রে মুদ্রিত করিয়া প্রকাশ করিতে হইলে, দীর্ঘ কালের মধ্যেও সম্পন্ন হওয়া কঠিন। অতএব ইহা ক্রমশ খণ্ড খণ্ড করিয়া মুদ্রিত করাই উপযুক্ত বিবেচনা করিয়া, ইহার দোষ গুণ অবগত হইবার জন্য আপাততঃ আদিপর্ব্বের প্রথমাবধি পৌষ্য, পৌলোম ও আস্তীক পর্ব্বাধ্যায়ের শকুন্তলোপাখ্যান পর্যন্ত প্রথম খণ্ড সাধারণ সমীপে অর্পণ করিতেছি, করুণাশীল সুধীগণ ইহার অবশ্যম্ভাবী অপেক্ষিত দোষরাশি মার্জ্জনা করিয়া উৎসাহ প্রদান করিলে অচিরে অপর খণ্ড প্রকাশ করিতে উৎসাহান্বিত হইব।

কলিকাতা, ১৭৮১ শকাব্দ                                                            শ্রীকালীপ্রসন্ন সিংহ

ভূমিকা
    মহাভারতীয় সভাপর্ব অনুবাদিত  ও মুদ্রিত হইল। এ খণ্ডে লোকপালদিগের সভাবর্ণন, রাজসূয় যজ্ঞ, দ্যূতক্রীড়া, সভামধ্যে দ্রৌপদীর কেশাকর্ষণ ও বস্ত্রহরণ প্রভৃতি নিগ্রহ, পাণ্ডবগণের নির্ব্বাসন ও কুন্তীর বিলাপাদি সমুদায় বিষয় অবিকল অনুবাদিত হ‌ইয়াছে। যে কারণে অতি বিশাল কৌরবকুলে ভ্রাতৃবিরোধের সূত্রপাত হয়, যে কারণে ধর্ম্মাত্মা যুধিষ্ঠির সাম্রাজ্যভ্রষ্ট হইয়া ভার্য্যা ও ভ্রাতৃগণের সহিত প্রাকৃত জনের ন্যায় ত্রয়োদশ বৎসর বনবাসে জীবনযাত্রা নির্ব্বাহিত করেন, যে কারণে অষ্টাদশ অক্ষৌহিনী সেনা সমরানলে পতঙ্গবৃত্তি অবলম্বন করে,  যে কারণে দুর্জ্জয় ধার্ত্তরাষ্ট্রগণ সমূলে নির্ম্মূলিত হয় এবং যে সকল বৃ্ত্তান্ত লইয়া বেদব্যাস কবিত্বশক্তির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন সেই সমুদয়ের মূলস্বরূপ করুণরসপূর্ণ দ্যূতক্রীড়া এই পর্ব্বের অন্তর্গত। এই পর্ব্বে মহর্ষি ব্যাসদেব রৌদ্র করুণ প্রভূতি নানাবিধ রসমাধুর্য্যের সহিত অপূর্ব্ব কবিত্বশক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন।
    সভাপর্ব্ব অন্যান্য পর্ব্ব অপেক্ষা অনেক ক্ষুদ্র বটে, কিন্তু ইহার অনুবাদে অত্যন্ত পরিশ্রম স্বীকার করিতে হইয়াছে, কারণ কূটার্থপূর্ণ শ্লোক অধিক পরিমাণে এই পর্ব্বে সন্নিবেষ্টিত আছে। যাঁহারা বিশেষ মনোযোগ সহকারে সভাপর্ব্বের আদ্যোপান্ত পাঠ করিবেন, তাঁহারা নীতিশাস্ত্র ও ধর্ম্মশাস্ত্র অধ্যায়নের ফলপ্রাপ্ত হইবেন এবং মনুষ্যের অবস্থা যে কখনই অপরিবর্ত্তনীয় নহে, যুধিষ্ঠিরের অতুল সাম্রাজ্য ও দ্যুতোপলক্ষে নির্ব্বাসনব্যাপার অবলোকন করিলে তাহা সম্পূর্ণরূপে বুঝিতে পারিবেন।

কলিকাতা, ১৭৮২ শকাব্দ                                                            শ্রীকালীপ্রসন্ন সিংহ

Share:

মহাভারত (আদিপর্ব ষষ্ঠ-সপ্তম অধ্যায়)

ষষ্ঠ অধ্যায়
রাক্ষস কর্ত্তৃক পুলোমা-হরণ
    উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দুরাত্মা রাক্ষস অগ্নির সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া বরাহরূপ ধারণপূর্ব্বক ভৃগুজায়াকে অপহরণ করিয়া বায়ুবেগে পলায়ন করিতে লাগিল। তখন পুলোমার গর্ভস্থ বালক রাক্ষসের এইরূপ গর্হিত অনুষ্ঠান অবলোকনে ক্রোধান্বিত হইয়া মাতৃগর্ভ হইতে নির্গত হইলেন। তাহাতেই তাঁহার নাম চ্যবন হইল। রাক্ষসসূর্য্যের ন্যায় তেজস্বী সদ্যোজাত সেই শিশুকে অবলোকন করিবামাত্র পুলোমাকে পরিত্যাগ পূর্ব্বক ভস্মীভূত হইয়া ভূতলে পতিত হইল। অনন্তর দুঃখাভিভূতা পুলোমা ভৃগুর ঔরসপুৎত্র চ্যবনকে ক্রোড়ে লইয়া রোদন করিতে করিতে আশ্রমাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা সেই অনিন্দিতা ভৃগুপত্নীকে বাষ্পাকুলিত-লোচনা দেখিয়া সমীপে গিয়া অশেষ প্রকার প্রবোধবাক্যে তাঁহাকে সান্ত্বনা করিলেন। ভৃগুপত্নীর নয়ন-নিপতিত জলধারায় এক মহানদী প্রবাহিত হইল। পিতামহ ব্রহ্মা সেই নদীকে পুৎত্রবধূ পুলোমার অনুসরণ করিতে দেখিয়া তাহার নাম "বধূসরা" রাখিলেন।
    পরে পুলোমা চ্যবনকে ক্রোড়ে লইয়া আসিতেছিলেন, ইত্যবসরে মহর্ষি ভৃগু স্নান-পূজাদি সমাপনান্তর প্রত্যাগমনপূর্ব্বক স্বীয় ধর্ম্মপত্নী ও পুৎত্রকে তদবস্থ দেখিয়া ক্রোধান্ধ হইলেন এবং সহধর্ম্মিণী পুলোমাকে সম্বোধনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, "হে মধুরহাসিনি! হরণেচ্ছৃ দুরাত্মা রাক্ষস তোমাকে আমার ভার্য্যা বলিয়া জানিত না, তুমি সত্য করিয়া বল, কে তাহার নিকট তোমার পরিচয় প্রদান করিল? আমি এক্ষণেই সেই পরিচয়দাতাকে শাপ প্রদান করিব। কোন্ ব্যক্তির এই দুষ্টকর্ম্মের অনুষ্ঠানে সাহস হইল? আমার শাপে ভীত না হয়, এমত লোক কে?" ভৃগু কর্ত্তৃক এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া পুলোমা কহিলেন, "ভগবন্! অগ্নি সেই রাক্ষসের সমীপে আমার পরিচয় দেন, পরে সেই পাপাত্মা রাক্ষস আমাকে রোরুদ্যমানা কুররীর [উৎক্রোশ পক্ষী
কুরল পাখী] ন্যায় অপহরণ করিল। তদনন্তর এই পুৎত্রের তেজঃপ্রভাবে সে ভস্মীভূত হইয়া ভূমিসাৎ হইয়াছে, তাহাতে আমি রক্ষা পাইলাম।" ভৃগু পুলোমার এই বাক্যশ্রবণে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়া "অদ্যাবধি তুমি সর্ব্বভক্ষ হইবে" বলিয়া অগ্নিকে শাপ প্রদান করিলেন।

                                                          সপ্তম অধ্যায়
                                                     পুলোমা রাক্ষস নিধন

    উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভৃগু এইরূপ শাপ প্রদান করিলে অগ্নি সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলেন, "হে ব্রহ্মন্! আপনি কেন অকারণে আমাকে এই নিদারুণ অভিসম্পাত করিলেন? আমি তৎকর্ত্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া ধর্ম্মপ্রতিপালনার্থ সত্যকথা কহিয়াছি, ইহাতে আমার দোষ কি? যে ব্যক্তি জিজ্ঞাসিত হইয়া জানিয়া-শুনিয়া মিথ্যা বলে, সে আপনার ঊর্দ্ধতন সপ্তপুরুষ ও অধস্তন সপ্তপুরুষকে নরকে পাতিত করে। আর যে ব্যক্তি যথার্থ জানিয়াও না কহে, সেও সেই পাপে লিপ্ত হয়, ইহাতে সন্দেহ নাই। যাহা হউক, আমিও আপনাকে শাপ প্রদান করিতে পারি, কিন্তু আমি ব্রাহ্মণদিগকে মান্য করি, এই নিমিত্ত বিরত হইলাম। আপনি সর্ব্বজ্ঞ, তথাপি আপনাকে কিছু কহিতেছি, শ্রবণ করুন। আমি যোগবলে আত্মাকে বহুধা বিভক্ত করিয়া শরীরভেদে অগ্নিহোত্র, গর্ভাধান ও জ্যোতিষ্টোমাদি ক্রিয়াকলাপে অধিষ্ঠিত আছি। বেদোক্তবিধিপূর্ব্বক আমাতে হুত যে হবিঃ, তদ্দ্বারা দেবগণ ও পিতৃগণ পরিতৃপ্ত হয়েন। হূয়মান সোমরসাদি সামগ্রী সকল দেবগণ ও পিতৃগণের শরীররূপে পরিণত হয়। দেবগণ ও পিতৃগণকে উদ্দেশ করিয়া একত্র দর্শ ও পৌর্ণমাস যজ্ঞের অনুষ্ঠান হয়, অতএব দেবগণ ও পিতৃগণ অভিন্নস্বরূপ এবং প্রতি পর্ব্বে কখন একত্র, কখন বা পৃথক্ কৃথক্ পূজিত হইয়া থাকেন। আমাতে যে আহুতি-সকল প্রদত্ত হয়, সেই সকল আহুতি দেবগণ ও পিতৃগণ ভক্ষণ করেন। তন্নিমিত্ত আমি দেবগণ ও পিতৃগণের মুখস্বরূপ। অমাবস্যাতে পিতৃগণকে ও পূর্ণিমাতে দেবগণকে উদ্দেশ করিয়া আমাতে আহুতি প্রদত্ত হয়, তাঁহারাও আমারই মুখ দ্বারা তাহা ভক্ষণ করেন, অতএব আমি কি প্রকারে সর্ব্বভক্ষ হইব?"
    পরে অগ্নি ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া বিপ্রগণের অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞক্রিয়া হইতে আপনাকে তিরোহিত করিলেন। তাঁহার অন্তর্দ্ধানান্তর প্রজাগণ ওঙ্কার, বষট্‌কার ও স্বধা-স্বাহা-বিবর্জ্জিত হইয়া দুঃখার্ণবে নিমগ্ন হইল। ঋষিগণ তদ্দর্শনে উদ্বিগ্নমনে দেবগণ সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, "হে দেবগণ! অগ্নির অন্তর্দ্ধানপ্রযুক্ত ক্রিয়ালোপ হওয়াতে ত্রিলোকী ইতিকর্ত্তব্যতাবিমূঢ় হইয়াছে, অতএব এ বিষয়ে যাহা কর্ত্তব্য হয়, শীঘ্র বিধান করুন, আর কালাতিপাত করিবেন না।"
    অনন্তর ঋষিগণ ও দেবগণ ব্রহ্মার নিকট গমন করিয়া অগ্নির শাপ ও তন্নিবন্ধন ক্রিয়ালাপের বৃত্তান্ত নিবেদন করিয়া কহিলেন, "হে ব্রহ্মন্! মহর্ষি ভৃগু কোন কারণবশতঃ অগ্নিকে 'সর্ব্বভক্ষ হও] বলিয়া শাপ দিয়াছেন, কিন্তু অগ্নি দেবগণের মুখ ও যজ্ঞের অগ্রভাগভোক্তা হইয়া কিরূপে সর্ব্বভক্ষ হইবেন?" বিধাতা তাঁহাদিগের সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া অগ্নিকে আহ্বান করিলেন এবং মধুরবাক্যে সান্ত্বনা করিয়া কহিতে লাগিলেন, "বৎস! তুমি সর্ব্বলোকের কর্ত্তা ও সংহর্ত্তা এবং অগ্নিহোত্রাদি ক্রিয়াকলাপের প্রবর্ত্তয়িতা, তুমিই এই ত্রিলোকী ধারণ করিতেছ; অতএব হে ত্রিলোকেশ হুতবহ! এক্ষণে যাহাতে ক্রিয়াকলাপের উচ্ছেদ না হয়, তাহা কর। তুমি সর্ব্বলোকের ঈশ্বর হইয়া এরূপ বিমূঢ়প্রায় হইতেছ কেন? তুমি সর্ব্বলোকে সর্ব্বদা পবিত্র এবং সর্ব্বজীবের গতিস্বরূপ। অতত্রব আমি বলিতেছি তুমি সর্ব্বশরীরে সর্ব্বভক্ষ হইবে না। অপানদেশে তোমার যে-সকল শিখা আছে, তাহারাই সকল বস্তু ভক্ষণ করিবে এবং তোমার মাংসভক্ষিকা যে তনু আছে, সেই সর্ব্বভক্ষ হইবে। যেমন রবিকিরণ-সংস্পর্শে সকল বস্তু শুচি হয়, সেইরূপ তোমার শিখা দ্বারা দগ্ধ হইয়া সকল বস্তু শুচি হইবে। হে হুতাশন! তুমি সর্ব্বশ্রেষ্ঠ তেজঃপদার্থ, তুমি আপনার প্রভাবে আপনি বিনির্গত হইয়াছ, এক্ষণেও স্বকীয় তেজঃপ্রভাবে ঋষির শাপ সত্য কর এবং তোমার মুখে হুত দেবভাগ ও আত্মভাগ গ্রহণ কর।"
    অগ্নি সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া "যে আজ্ঞা" বলিয়া তদীয় আজ্ঞা-পালনার্থে গমন করিলেন। দেবগণ ও ঋষিগণ আহ্লাদিত হইয়া স্ব স্ব স্থানে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। মহর্ষিগণ পূর্ব্বের ন্যায় যাগযজ্ঞাদি ক্রিয়াসকল সম্পন্ন করিতে লাগিলেন। স্বর্গে দেবগণ ও ধরাতলে নরগণ অত্যন্ত হৃষ্টচিত্ত হইলেন। অগ্নিও শাপ-বিনির্ম্মুক্ত হইয়া সাতিশয় প্রীতিলাভ করিলেন। পূর্ব্বকালে ভগবান অগ্নি মহর্ষি ভৃগু হইতে এইরূপে শাপগ্রস্ত হইয়াছিলেন। অগ্নির শাপ, পুলোমা রাক্ষসের নিধন ও চ্যবনের জন্মবৃত্তান্ত-ঘটিত প্রাচীন ইতিহাস এই।

Share:

মহাভারত ( আদিপর্ব : চতুর্থ-পঞ্চম)







চতুর্থ অধ্যায়
পৌলোম-পর্ব্ব


    সৌতি কহিলেন, নৈমিষারণ্যে কুলপতি শৌনকের দ্বাদশবর্ষব্যাপী যজ্ঞে যে-সকল মহর্ষিগণ সমাগত হইয়াছিলেন, সূত বংশ-সম্ভূত লোমহর্ষণাত্মজ উগ্রশ্রবাঃ পুরাণপাঠ দ্বারা তাঁহাদিগের শুশ্রূষা করিতেছিলে। উগ্রশ্রবাঃ কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাদিগকে নিবেদন করিলেন, "হে মহর্ষিগণ! উতঙ্কচরিত আদ্যোপান্ত কহিলাম, এক্ষণে আপনারা আর কি শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করেন, আজ্ঞা করুন।"
    মুনিগণ কহিলেন, হে লোমহর্ষণনন্দন! আমরা প্রসঙ্গক্রমে তোমাকে যখন যে কথা জিজ্ঞাসা করিব, তুমি সেই সমুদয় বর্ণনা করিও। কিন্তু কুলপতি শৌনক এক্ষণে অগ্নিশরণে [অগ্নিগৃহ
যে গৃহে সর্ব্বদা যজ্ঞাগ্নি থাকে।] অবস্থিতি করিতেছেন, তিনি সুরাসুর-মনুষ্য-সর্প-গন্ধবর্বাদিঘটিত বিচিত্র অলৌকিক বৃত্তান্ত জানেন; বিদ্বান্, কর্ম্মদক্ষ, ব্রতপরায়ণ, বেদবেদান্তশাস্ত্রে পারদর্শী, সত্যবাদী, শান্তিগুণাবলম্বী তপোনিরত সেই মহর্ষি আমাদিগের সকলেরই মান্য, তাঁহার অপেক্ষা কর। তিনি পরমার্চ্চিত আসনে অধ্যাসীন হইয়া যে যে কথা জিজ্ঞাসা করিবেন, তাহাই কহিবে।
    উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, “ভাল, সেই মহর্ষি আসনে উপবিষ্ট হইয়া জিজ্ঞাসিলেই বিবিধ পবিত্র কথা বলিব।" ক্ষণকাল পরে বিপ্রশ্রেষ্ঠ শৌনকঋষি দেবযজ্ঞ ও পিতৃতর্পণ প্রভৃতি ক্রিয়াকলাপ বিধিপূর্ব্বক সমাপ্ত করিয়া, যেস্থানে উগ্রশ্রবাঃ ও ব্রতপরায়ণ সিদ্ধ ব্রহ্মর্ষিগণ সুখাসীন আছেন, সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পরে ঋত্বিক্ ও সদস্যগণ উপবিষ্ট হইলে স্বয়ং আসন পরিগ্রহ করিয়া এই কথা প্রস্তাব করিলেন।

                                                             পঞ্চম অধ্যায়
                                                      ভূগুবংশ-চ্যবনোৎপত্তি

    শৌনক কহিলেন, বৎস সূতনন্দন! তোমার পিতা মহর্ষি বেদব্যাসের নিকট সমস্ত পুরাণ অধ্যয়ন করিয়াছিলেন, তুমিও সেই সমুদয় অধ্যয়ন করিয়াছ। তোমার পিতার মুখে শ্রবণ করিয়াছি, পুরাণে অলৌকিক কথা-সকল ও আদিবংশ-বৃত্তান্ত-সকল বর্ণিত আছে, তন্মধ্যে প্রথমতঃ ভূগুবংশের বৃত্তান্তশ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি, বর্ণনা কর।
      মহর্ষি শৌনকের আজ্ঞালাভানন্তর সূতনন্দন উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দ্বিজাগ্রণী মহাত্মা বৈশম্পায়ন প্রভৃতি যাহা সম্যক্‌রূপে অধ্যয়ন ও কীর্ত্তন করিয়াছেন, আমার পিতা যাহা অধ্যয়ন করিয়াছিলেন এবং তাঁহার নিকট আমি যাহা অধ্যয়ন করিয়াছি, সেই সমস্ত বর্ণনা করিতেছি, শ্রবণ করুন।
      সুবিখ্যাত ভূগুবংশ ইন্দ্রাদি দেবগণ ও অশেষ ঋষিগণের পূজনীয়। এই বংশ পুরাণে যেরূপ বর্ণিত আছে, তাহা আমি যথাবৎ বর্ণন করিতেছি। স্বয়ম্ভু ব্রহ্মা বরুণের যজ্ঞ করিতেছিলেন, আমরা শুনিয়াছি, সেই যজ্ঞাগ্নি হইতে মহর্ষি ভৃগু সমুত্থিত হয়েন। ভৃগুর পুৎত্র চ্যবন পিতার প্রিয়পাত্র ছিলেন; চ্যবনের পুৎত্র প্রমতি অতিশয় ধর্ম্মপরায়ণ ছিলেন; ঘৃতাচীর গর্ভে প্রমতির রুরু-নামক এক পুৎত্র উৎপন্ন হয়; রুরুর ঔরসে প্রমদ্বরার গর্ভে আপনার প্রপিতামহ শুনক জন্মগ্রহণ করেন। মহর্ষি শুনক বেদাধ্যয়ন-সম্পন্ন, তপোনিরত, যশস্বী, অশেষ-শাস্ত্রজ্ঞ, ব্রহ্মজ্ঞানী, সত্যবাদী ও জিতেন্দ্রিয় ছিলেন।
      শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! যেরূপে সেই মহাত্মা ভৃগুনন্দন চ্যবন নামে বিখ্যাত হইলেন, তাহা আমার নিকট সবিশেষ বর্ণন কর।
      উদ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাত্মা ভৃগুর পুলোমানম্নী প্রিয়তমা ধর্ম্মপত্নী ছিলেন, তিনি ঐ মহর্ষির সহযোগে গর্ভিণী হয়েন। একদা ধার্ম্মিকাগ্রগণ্য মহর্ষি ভৃগু স্নানার্থ গমন করিলে পুলোমা নামে এক রাক্ষস তাঁহার আশ্রমে উপস্থিত হইল। ঐ পাপাত্মা আশ্রমে প্রবেশপূর্ব্বক ভৃগু-গৃহিণীর মনোহারিণী মূর্ত্তি দর্শনে কন্দর্পশরে জর্জ্জরিত ও মূর্চ্ছিতপ্রায় হইল। সুচারুদর্শনা পুলোমা অনায়াসলভ্য বন্যফলমূলাদি দ্বারা সেই অভ্যাগত রাক্ষসের অতিথিসৎকার করিলেন। দুর্ব্বৃত্ত রাক্ষস কুসুমশরের বিষম শরে নিতান্ত উদ্‌ভ্রান্তচিত্ত হইয়া "এই বরবর্ণিনীকে হরণ করিব" এইরূপ সঙ্কল্প করিবামাত্র সাতিশয় হৃষ্টমনা হইল। পুলোমা রাক্ষস পূর্ব্বে ঐ সুচারুহাসিনী কন্যাকে’ ভার্ষ্যারূপে বরণ করিয়াছিল, কিন্তু কন্যার পিতা তাহাকে না দিয়া মহাত্মা ভৃগুকে বিধিপূর্ব্বক কন্যা সম্প্রদান করেন। সে অন্যায় কার্য্যের অনুষ্ঠান তাহার মনে সর্ব্বদা জাগরূক ছিল, এক্ষণে সে অবসর পাইয়া হরণ করিতে অভিলাষ করিল।
      রাক্ষস পুলোমাহরণে কৃতনিশ্চয় হইয়া অগ্নিশরণস্থ প্রজ্বলিত হুতাশন-সমীপে গমনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিল, "হে হুতাশন! তুমি সর্ব্বদেবগণের মুখ্য। তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, সত্য করিয়া বল, এই সুন্দরী কাহার ভার্গ্যা‍! আমি পূর্ব্বে এই কামিনীকে স্বীয় সহচারিণী করিব বলিয়া বরণ করিয়াছিলাম, কিন্তু ইহার পিতা আমাকে কন্যা দান না করিয়া ভৃগুকে সম্প্রদান করেন। অতএব যদি এই নির্জ্জন-নিবাসিনী বরবর্ণিনী ভৃগুর ভার্য্যা হয়, তবে বল, আমি আশ্রম হইতে ইহাকে অপহরণ করিব। ভৃগু যে আমার পূর্ব্বপ্রার্থিত সুরূপা রমণীর প্রাণীগ্রহণ করিয়াছে, সেই ক্রোধাগ্নিতে আমার হৃদয় অদ্যাপি দগ্ধ হইতেছে।" দুরাত্মা রাক্ষস ভৃগু-পত্নী-বিষয়ে এই রূপ সন্দিগ্ধচিত্ত হইয়া প্রজ্বলিত অগ্নিকে আমন্ত্রণ করিয়া পুনঃপুনঃ জিজ্ঞাসিতে লাগিল। পরে সম্বোধন করিয়া কহিল, "হে হুতবহ! তুমি সর্ব্বদা সর্ব্বজীবের অন্তরে পাপ-পুণ্যের সাক্ষিস্বরূপ অবস্থিতি কর, অতএব তোমাকে জিজ্ঞাসিতেছি, সত্য করিয়া বল, পাপিষ্ঠ ভৃগু আমার পূর্ব্বপ্রার্থিত ভার্য্যাকে গ্রহণ করিয়াছে, সেই কামিনী আমার হইতে পারে কি না? তোমার নিকট ইহার যথার্থ শ্রবণ করিয়া তোমার সাক্ষাতেই এই ভৃগুপত্নীকে হরণ করিব।" অগ্নি রাক্ষসের জিজ্ঞাসানন্তর একপক্ষে মিথ্যাকথন ও পক্ষান্তরে ভৃগুশাপ এই উভয় সঙ্কটে পতিত হইয়া অতিশয় ভীত হইলেন এবং মৃদুস্বরে কহিতে লাগিলেন,
হে দানব-তনয়! পূর্ব্বে তুমি ইঁহাকে বরণ করিয়াছিলে যথার্থ বটে; কিন্তু তোমার যথাবিধি বিবাহ করা হয় নাই। এই নিমিত্ত যশস্বিনী পুলোমার পিতা সৎপাত্রলাভে  ইঁহাকে ভৃগুর হস্তে সমর্পণ করেন। মহাতপা ভৃগু বেদবিধিপূর্ব্বক আমার সমক্ষে ইঁহার পাণিগ্রহণ করিয়াছেন। তথাপি তুমি ইঁহাকে পূর্ব্বে বরণ করিয়াছিলে বলিয়া ইনি বিচারমতে তোমারই পত্নী হইতে পারেন। আমি মিথ্যা কহিতে পারি না, যেহেতু মিথ্যাবাদী সর্ব্বত্র অনাদরণীয় হয়।


Share:

মহাভারত (আদিপর্ব তৃতীয় অধ্যায়)

তৃতীয় অধ্যায়
পৌষ্যপর্ব্ব-জনমেজয় শাপ
    উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কুরুক্ষেত্রে পরীক্ষিতপুৎত্র রাজা জনমেজয় ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে এক দীর্ঘ-সত্র [দীর্ঘকালব্যাপী যজ্ঞ] অনুষ্ঠান করিতেছেন। তাঁহার তিন সহোদর  শ্রুতসেন, উগ্রসেন ও ভীমসেন। তাঁহাদিগের যজ্ঞানুষ্ঠানকালে একটা কুক্কুর তথায় উপস্থিত হইল। জনমেজয়ের ভ্রাতৃগণ ক্রোধান্ধ হইয়া তাহাকে প্রহার করিলে সে রোদন করিতে করিতে মাতৃসন্নিধানে গমন করিল। সরমা তাহাকে অকস্মাৎ রোদন করিতে দেখিয়া কহিল, "তুমি কেন কাঁদিতেছ? কে তোমাকে প্রহার করিয়াছে, বল।" জননী কর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া সে কহিল, "জনমেজয়ের ভ্রাতৃগণ আমাকে প্রহার করিয়াছেন।" তাহা শুনিয়া দেবশুনী কহিল, "বোধ হয়, তুমি তাঁহাদিগের কোন অপকার করিয়া থাকিবে।" সে পুনর্ব্বার কহিল, "আমি তাঁহাদিগের কিছুমাত্র অপকার করি নাই, যজ্ঞের হবিঃও নিরীক্ষণ করি নাই, তাঁহারা অকারণে আমাকে প্রহার করিয়াছেন।" তৎশ্রবণে সরমা অতি দুঃখিতা হইয়া যথায় জনমেজয় ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে বহুবার্ষিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, তথায় সমুপস্থিত হইয়া রোষভরে কহিতে লাগিল, "আমার পুৎত্র তোমাদিগের কিছুমাত্র অপকার করে নাই, যজ্ঞের হবিঃ অবেক্ষণ [দর্শন] ও অবলেহন করে নাই, তোমরা কি নিমিত্ত ইহাকে প্রহার করিয়াছ, বল?" তাঁহারা কিছুই প্রত্যুত্তর দিলেন না। তখন সরমা কহিল, "তোমরা নিরপরাধকে প্রহার করিয়াছ, অতত্রব অনুপলক্ষিত [অজ্ঞাত] ভয় তোমাদিগকে আক্রমণ করিবে।" জনমেজয় দেবশুনী সরমার এইরূপ অভিশাপ শ্রবণ করিয়া অতিশয় বিষণ্ণ ও সন্ত্রস্ত হইলেন।


                                                         সোমশ্রবা ঋষির উপাখ্যান

 অনন্তর সেই যজ্ঞ সমাপ্ত হইলে জনমেজয় হস্তিনাপুরে আগমন ও সরমাশাপ-নিবারণের নিমিত্ত সাতিশয় প্রযত্নসহকারে এক অনুরূপ পুরোহিত অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। একদা মৃগয়ায় নির্গত হইয়া জনমেজয় স্বীয় জনপদের অন্তর্গত এক আশ্রম দর্শন করিলেন। তথায় শ্রুতশ্রবাঃ নামক এক ঋষি বাস করিতেন। তাঁহার সোমশ্রবাঃ নামে এক পুৎত্র ছিল। জনমেজয় ঋষিপুৎত্রের সন্নিহিত হইয়া তাঁহাকে পৌরোহিত্যে বরণ করিলেন এবং ঋষিকে নমস্কার করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, "ভগবন্! আপনার এই পুৎত্র আমার পুরোহিত হউন।" রাজার এইরূপ কথা শ্রবণ করিয়া শ্রুতশ্রবাঃ কহিলেন, "হে জনমেজয়! একদা এক সর্পী আমার শুক্র পান করিয়াছিল। ঐ শুক্রে তাহার গর্ভসঞ্চার হয়; আমার এই পুৎত্র ঐ গর্ভে জন্মেন। ইনি মহাতপস্বী, অধ্যয়ননিরত ও মদীয় তপোবীর্য্যে সম্ভূত। মহাদেবের অভিশাপ ব্যতিরেকে তোমার সমুদয় শাপশান্তি করিতে সমর্থ হইবেন। কিন্তু ইঁহার একটি নিগূঢ় ব্রত আছে যে, যদি কোন ব্রাহ্মণ ইঁহার সন্নিধানে কোন বিষয় প্রার্থনা করেন, ইনি তৎক্ষণাৎ তাহা প্রদান করিয়া থাকেন, যদি ইহাতে সাহস হয়, তবে ইঁহাকে লইয়া যাও।" শ্রুতশ্রবার এইরূপ কথা শুনিয়া জনমেজয় প্রত্যুত্তর করিলেন, "মহাশয়! আপনি যাহা অনুমতি করিতেছেন, আমি তাহাতে সম্মত আছি।" এই কথা কহিয়া পুরোহিত-সহ স্বনগরে প্রত্যাগমনকরতঃ ভ্রাতৃগণকে কহিলেন, "আমি এই মহাত্মাকে পৌরোহিত্যে বরণ করিয়াছি, ইনি যখন যাহা অনুজ্ঞা করিবেন, তোমরা তদ্বিষয়ে কোন বিচার না করিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিবে; কিছুতেই যেন তাহার ব্যতিক্রম না হয়। "সহোদরদিগকে এইরূপ আদেশ করিয়া তিনি তক্ষশিলায় প্রস্থান করিলেন ও অনতিবিলম্বেই সেই প্রদেশ আপন অধিকারে আনিলেন।


                                                        আয়োধধৌম্য ও আরুণিবৃত্তান্ত

    ইত্যবসরে প্রসঙ্গক্রমে একটি উপাখ্যানের উল্লেখ হইতেছে। আয়োধধৌম্য নামে এক ঋষি ছিলেন। উপমন্যু, আরুণি ও বেদ নামে তাঁহার তিনটি শিষ্য ছিল। তিনি একদিন পাঞ্চালদেশীয় আরুণি নামক শিষ্যকে আহ্বান করিয়া ক্ষেত্রের আলি বাঁধিতে অনুমতি করিলেন। আরুণি উপাধ্যায়ের উপদেশক্রমে ক্ষেত্রে গমন করিয়া অশেষ ক্লেশ স্বীকার করিয়াও পরিশেষে আলি বাঁধিতে অশক্ত হইলেন। অগত্যা তথায় শয়ন করিয়া জলনির্গম নিবারণ করিলেন। কোন সময়ে উপাধ্যায় আয়োধধৌম্য শিষ্যগণকে জিজ্ঞাসিলেন, "পাঞ্চালদেশীয় আরুণি কোথায় গিয়াছে?" তাহারা কহিল, "ভগবন্! আপনি তাহাকে ক্ষেত্রের আলি বাঁধিতে প্রেরণ করিয়াছেন।" তাহা শ্রবণ করিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, "যথায় আরুণি গমন করিয়াছে, চল, আমরাও তথায় যাই।" অনন্তর সেই স্থানে গমন করিয়া উচ্চৈঃস্বরে এইরূপে তাঁহাকে আহ্বান করিতে লাগিলেন, "ভো বৎস আরুণি! কোথায় গিয়াছ, আইস।" তৎশ্রবণে আরুণি সহসা তথা হইতে উত্থিত ও উপাধ্যায়ের সন্নিহিত হইয়া অতি বিনীতবচনে নিবেদন করিলেন, "ক্ষেত্রের যে জল নিঃসৃত হইতেছিল, তাহা অবারণীয়; সুতরাং তৎপ্রতিরোধের নিমিত্ত আমি তথায় শয়ন করিয়াছিলাম। এক্ষণে আপনার কথা শ্রবণ করিয়া সহসা কেদার [ক্ষেতের আলি] খণ্ড বিদারণপূর্ব্বক আপনার সম্মুখীন হইলাম; অভিবাদন করি, আর কি অনুষ্ঠান করিব, অনুমতি করুন।" আরুণি এইরূপ কহিলে উপাধ্যায় উত্তর করিলেন, "বৎস! যেহেতু তুমি কেদারখণ্ড বিদারণ করিয়া উত্থিত হইয়াছ, অতত্রব অদ্যাবধি তোমার নাম উদ্দালক বলিয়া প্রসিদ্ধ হইবে এবং আমার আজ্ঞাপালন করিয়াছ, এই নিমিত্ত তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে। সকল বেদ ও সকল ধর্ম্মশাস্ত্র সর্ব্বকালে সমভাবে তোমার অন্তরে প্রতিভাত হইবে।" পরে আরুণি উপাধ্যায়ের আদেশ লাভ করিয়া অভিলষিত দেশে গমন করিলেন।
                                             
                                                     উপমনযু-উপাখ্যান


    আয়োধধৌম্যের উপমন্যু নামে একটি শিষ্য ছিলেন। একদা উপাধ্যায় তাঁহাকে কহিলেন, "বৎস উপমন্যু! সতত সাবধানে আমার গোধন রক্ষা কর।" এই বলিয়া তাঁহাকে গোচারণে প্রেরণ করিলেন। উপমন্যু তাঁহার অনুমতিক্রমে দিবাভাগে গোচারণ করিয়া সায়াহ্নে গুরুগৃহে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক তাঁহাকে অভিবাদন করিয়া সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকিতেন। একদিন উপাধ্যায় তাঁহাকে স্থূলকায় দেখিয়া কহিলেন, "বৎস উপমন্যু! তোমাকে ক্রমশঃ অতিশয় হৃষ্ট-পুষ্ট দেখিতেছি, এক্ষণে কিরূপ আহার করিয়া থাক, বল।" তিনি উত্তর করিলেন, "ভগবন্! আমি এক্ষণে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছি।" তাহা শ্রবণ করিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, "দেখ, আমাকে না জানাইয়া ভিক্ষালব্ধ দ্রব্যজাত উপযোগ [ভক্ষণ] করা তোমার বিধেয় নহে। "উপমন্যু তাহাই স্বীকার করিয়া ভিক্ষান্ন আহরণপূর্ব্বক গুরুকে প্রত্যর্পণ করিলেন; উপাধ্যায় সমস্ত ভিক্ষান্ন গ্রহণ করিলেন; ভক্ষণার্থ তাঁহাকে কিছুই দিলেন না। অনন্তর উপমন্যু দিবাভাগে গো-রক্ষা করিয়া সায়াহ্নে গুরুগৃহে আগমন ও তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া নমস্কার করিলেন। উপাধ্যায় তাঁহাকে অত্যন্ত পুষ্ট দেখিয়া কহিলেন, "বৎস উপমন্যু! তোমার ভিক্ষান্ন সমুদয়ই গ্রহণ করিয়া থাকি, তথাপি তোমাকে অতিশয় স্থূলকায় দেখিতেছি, এক্ষণে কি আহার করিয়া থাক, বল।" তিনি এইরূপ অভিহিত হইয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, "ভগবন্! একবার ভিক্ষা করিয়া আপনাকে প্রদান করি, দ্বিতীয়বার কয়েক মুষ্টি তণ্ডুল আহরণ করিয়া আপনার উদর পূরণ করিয়া থাকি।" উপাধ্যায় কহিলেন, "দেখ, ইহা ভদ্রলোকের ধর্ম্ম ও সমুচিত কর্ম্ম নহে। ইহাতে অন্যের বৃত্তিরোধ হইতেছে, আরও এইরূপ অনুষ্ঠান করিলে তুমিও ক্রমশঃ লোভপরায়ণ হইবে। "উপাধ্যায় কর্ত্তৃক এইরূপ আদিষ্ট হইয়া উপমন্যু পূর্ব্ববৎ গোচারণ ও সায়ংকালে গুরুগৃহে আগমন করিলে উপাধ্যায় তাঁহাকে কহিলেন, "বৎস উপমন্যু! তুমি ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিয়া যে ভিক্ষান্ন আহরণ কর, তাহা আমি সম্পূর্ণই লইয়া থাকি এবং প্রতিষেধ করিয়াছি বলিয়া তুমিও দ্বিতীয়বার ভিক্ষা কর না; তথাপি তোমাকে পূর্ব্বাপেক্ষা সমধিক স্থূলকায় দেখিতেছি, এক্ষণে কি আহার করিয়া থাক, বল।" এইরূপ অভিহিত হইয়া উপমন্যু কহিলেন, "ভগবন্! এক্ষণে ধেনুগণের দুগ্ধ পান করিয়া প্রাণধারণ করিতেছি।" উপাধ্যায় কহিলেন, "দেখ, আমি তোমাকে অনুমতি করি নাই, সুতরাং ধেনুর দুগ্ধ পান করা তোমার অত্যন্ত অন্যায় হইতেছে।" গুরুবাক্য অঙ্গীকার করিয়া উপমন্যু পূর্ব্ববৎ গোচারণ ও গুরুগৃহে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া নমস্কার করিলেন। গুরু তাঁহাকে বিলক্ষণ স্থূল দেখিয়া কহিলেন, "বৎস উপমন্যু! তুমি ভিক্ষান্ন ভক্ষণ ও দ্বিতীয়বার ভিক্ষার্থ পর্য্যটন কর না এবং ধেনুর দুগ্ধ পান করিতেও তোমাকে নিবারণ করিয়াছি, তথাপি তোমাকে অতিশয় স্থূলকলেবর দেখিতেছি, এক্ষণে কি আহার করিয়া থাক, বল।" উপমন্যু কহিলেন, :বৎসগণ মাতৃস্তন পান করিয়া যে ফেন উদগার করে, আমি তাহা পান করি।" উপাধ্যায় কহিলেন, "অতি শান্তস্বভাব বৎসগণ তোমার প্রতি অনুকম্পা করিয়া অধিক পরিমাণে ফেন উদগার করিয়া থাকে, সুতরাং তুমি তাহাদিগের আহারের ব্যাঘাত করিতেছ। অতঃপর তোমার ফেন পান করাও বিধেয় নহে।" এইরূপ আদিষ্ট হইয়া উপমন্যু পূর্ব্ববৎ গোরক্ষা করিতে লাগিলেন।
    এইরূপে উপাধ্যায় কর্ত্তৃক প্রতিষিদ্ধ হইয়া তিনি আর ভিক্ষান্ন ভক্ষণ করিতেন না, দ্বিতীয়বার ভিক্ষার্থ পর্য্যটন করিতেন না, ধেনুর দুগ্ধপান ও দুগ্ধের ফেনোপযোগেও বিরত হইলেন। একদা তিনি অরণ্যে গোচারণে ক্ষুধার্ত্ত হইয়া অর্কপত্র ভক্ষণ করিলেন। সেই সকল ক্ষার, তিক্ত, কটু, রুক্ষ ও তীক্ষ্মবিপাক অর্কপত্র উপযোগ করাতে চক্ষুদোষ জন্মিয়া অন্ধ হইলেন; অন্ধ হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে এক কূপে নিপাতিত হইলেন।
    অনন্তর ভগবান্ দিনমণি অস্তাচল-চূড়াবলম্বী হইলে, উপাধ্যায় আয়োধধৌম্য শিষ্যদিগকে কহিলেন, "দেখ উপমন্যু এখনও আসিতেছে না।" শিষ্যেরা কহিলেন, "ভগবন্! উপমন্যুকে আপনি গোচারণের নিমিত্ত অরণ্যে প্রেরণ করিয়াছেন।" উপাধ্যায় কহিলেন, "দেখ, আমি উপমন্যুকে সর্ব্বপ্রকার আহার করিতে নিষেধ করিয়াছি, বোধ হয়, সে কুপিত হইয়াছে; এই নিমিত্ত প্রত্যাগত হইতেছে না। চল, আমরা গিয়া তাহার অনুসন্ধান করি।" এই বলিয়া শিষ্যগণ-সমভিব্যাহারে বন-গমনপূর্ব্বক "বৎস উপমন্যু! কোথায় গিয়াছ?" এই বলিয়া মুক্তকণ্ঠে তাহাকে আহ্বান করিতে লাগিলেন। উপমন্যু উপাধ্যায়ের স্বরসংযোগ শ্রবণ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, "আমি কূপে পতিত হইয়াছি।" তাহা শ্রবণ করিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, "তুমি কিরূপে কূপে নিপতিত হইয়াছ?" তিনি প্রত্যুত্তর করিলেন, "আমি অর্কপত্র-ভক্ষণে অন্ধ হইয়া কূপে পতিত হইলাম।" উপাধ্যায় কহিলেন, "তুমি দেববৈদ্য অশ্বিনীকুমারের স্তব কর। তাহা হইলে তোমার চক্ষুলাভ হইবে।" উপমন্যু উপাধ্যায়ের উপদেশানুসারে বেদবাক্য দ্বারা অশ্বিনীকুমার দেবতাদ্বয়ের স্তব আরম্ভ করিলেন। "হে অশ্বিনীকুমার! তোমরা সৃষ্টির প্রারম্ভে বিদ্যমান ছিলে; তোমরাই সর্ব্বভূতপ্রধান হিরণ্যগর্ভরূপে উৎপন্ন হইয়াছ, পরে তোমরাই সংসারে প্রপঞ্চ [সংসার জীব] স্বরূপে প্রকাশমান হইয়াছ; দেশ, কাল ও অবস্থা দ্বারা তোমাদিগের ইয়ত্তা করা যায় না; তোমরাই মায়া ও মায়ারূঢ় চৈতন্যরূপে দ্যোতমান আছ; তোমরা শরীরবৃক্ষে পক্ষিরূপে অবস্থান করিতেছ; তোমরা সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় পরমাণুসমষ্টি ও প্রকৃতির সহযোগিতার আবশ্যকতা রাখ না; তোমরা বাক্য ও মনের অগোচর; তোমরাই স্বীয় প্রকৃতির বিক্ষেপশক্তি দ্বারা নিখিল বিশ্বকে সুপ্রকাশ করিয়াছ। এক্ষণে আমি নির্ব্ব্যাধি হইবার জন্য শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন [প্রগাঢ় চিন্তা] দ্বারা তোমাদিগের আরাধনা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। তোমরা পরম রমণীয় ও নির্লিপ্ত, বিলীন জগতের অধিষ্ঠানভূত, মায়াবিকার-রহিত এবং জন্মমৃত্যু বিবর্জ্জিত; তোমরা সর্ব্বকাল সমভাবে বিরাজমান আছ; তোমরা ভাস্কর সৃষ্টি করিয়া দিনযামিনীরূপ শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ সূত্র দ্বারা সংবৎসররূপ বস্ত্র বয়ন করিতেছ; তোমরা জীবদিগকে সুবিহিত পথ সতত প্রদর্শন কর; তোমরা পরমাত্মশক্তিরূপ কালপাশ হইতে বিমুক্ত করিয়া জীবাত্ম-স্বরূপ পক্ষিণীকে মোক্ষরূপ সৌভাগ্যশালিনী করিয়াছ। জীবেরা যাবৎ অজ্ঞানান্ধকারাচ্ছন্ন থাকিয়া নিরবচ্ছিন্ন ইন্দ্রিয়-পরতন্ত্র থাকে, তাবৎ তাহারা সর্ব্বদোষ-স্পর্শশূন্য চৈতন্যস্বরূপ তোমাদিগকে শরীরী বলিয়া ভাবনা করে। ত্রিশতষষ্টি দিবস-স্বরূপ গোসকল সংবৎসররূপ যে বৎস উৎপাদন করে, তত্ত্বজিজ্ঞাসুরা ঐ বৎসকে আশ্রয় করিয়া পৃথক ফলক্রিয়াসমূহরূপ গো হইতে তত্ত্বজ্ঞানস্বরূপ দুগ্ধ দোহন করেন; উৎপাদক ও সংহারক সেই বৎসকে তোমরাই প্রসব করিয়াছ। অহোরাত্রস্বরূপ সপ্তশতবিংশতি অর [চক্রমধ্যস্থ কাষ্ঠ] সংবৎসররূপ নাভিতে [চাকার হাঁড়ী] সংস্থিত এবং দ্বাদশমাসরূপ প্রধি [রথচক্রের প্রান্ত] দ্বারা পরিবেষ্টিত যুষ্মৎ-প্রকাশিত নেমিশূন্য মায়াত্মক অক্ষয় কালচক্র নিরন্তর পরিবর্ত্তিত হইতেছে। দ্বাদশ রাশিরূপ অর, ছয় ঋতুস্বরূপ নাভি ও সংবৎসররূপ অক্ষ [চক্রের মধ্যমণ্ডল]-সংযুক্ত এবং ধর্ম্মফলের আধারভূত একখানি চক্র আছে, যাহাতে কালাভিমানিনী দেবতা সতত অবস্থিত আছেন। হে অশ্বিনীকুমার যুগল! তোমরা ঐ চক্র হইতে আমাকে মুক্ত কর, আমি জন্ম মরণ ক্লেশে অতিশয় ক্লিষ্ট আছি। তোমরা সনাতন ব্রহ্ম হইয়াও জড়স্বভাব বিশ্বস্বরূপ; তোমরাই কর্ম্ম ও কর্ম্মফল স্বরূপ। আকাশাদি সমস্ত জড়পদার্থ তোমাদের স্বরূপে লয়প্রাপ্ত হয়, তোমরাই অবিদ্যাপ্রভাবে তত্ত্বজ্ঞান উপার্জ্জন করিতে বিমুখ হইয়াও বিষম-বিষয়-রসাস্বাদ-সুখভোগ দ্বারা ইন্দ্রিয়বৃত্তি চরিতার্থ করিয়া সংসার-মায়াজালে জড়িত হও। তোমরা সৃষ্টির পূর্ব্বে দশদিক্ আকাশ ও সূর্য্যমণ্ডলের উদ্ভাবন করিয়াছ; মহর্ষিগণ সূর্য্য-বিহিত সময়ানুসারে বেদ-প্রতিপাদ্য কার্য্যকলাপ নির্ব্বাহ করেন এবং নিখিল দেবগণ ও মনুষ্যেরা বিবিধ ঐশ্বর্য্য ভোগ করেন। তোমরা আকাশাদি সূক্ষ্ম পঞ্চভূত সৃষ্টি করিয়া তাহাদের পঞ্চীকরণ করিয়াছ, সেই পঞ্চভূত হইতে অখিল ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্ট হইয়াছে, প্রাণিগণ ইন্দ্রিয়পরবশ হইয়া বিষয়ানুরক্ত হইতেছে এবং নিখিল দেবগণ ও সমগ্র মনুষ্য অধিষ্ঠানভূতা এই পৃথিবীতে অধিষ্ঠত আছে। তোমাদিগকে ও তোমাদের কণ্ঠদেশাবলম্বিত কমলমালিকাকে প্রণাম করি। নিত্যযুক্ত কর্ম্মফলদাতা অশ্বিনীকুমারযুগলের সাহায্য বিনা অন্যান্য দেবগণ স্বকীয় কার্য্যসাধনে সক্ষম নহেন। হে অশ্বিনীকুমার! তোমরা অগ্রে মুখ দ্বারা অন্নরূপ গর্ভ গ্রহণ কর, পরে অচেতন দেহ ইন্দ্রিয় দ্বারা সেই গর্ভ প্রসব করে। ঐ গর্ভ প্রসূতমাত্র মাতৃস্তন্যপানে নিযুক্ত হয়। এক্ষণে তোমরা আমার চক্ষুর্দ্বয়ের অন্ধত্ব মোচন করিয়া প্রাণরক্ষা কর।" অশ্বিনীকুমারযুগল উপমন্যুর এইরূপ স্তবে সন্তুষ্ট হইয়া তথায় আবির্ভূত হইলেন এবং কহিলেন, "আমরা তোমার প্রতি অতিশয় প্রসন্ন হইয়াছি, অতএব তোমাকে এক পিষ্টক দিতেছি, ভক্ষণ কর।" এইরূপ আদিষ্ট হইয়া তিনি কহিলেন, "আপনাদিগের কথা অবহেলন করিবার যোগ্য নয়; কিন্তু আমি গুরুকে নিবেদন না করিয়া অপূপ [পিষ্টক] ভক্ষণ করিতে পারি না।" তখন অশ্বিনীতনয়দ্বয় কহিলেন "পূর্ব্বে তোমার উপাধ্যায় আমাদিগকে স্তব করিয়াছিলেন। আমরা তাঁহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া এক পিষ্টক দিয়াছিলাম; কিন্তু তিনি গুরুর আদেশ না লইয়া তাহা উপযোগ করেন; অতএব তোমার উপাধ্যায় যেরূপ করিয়াছিলেন, তুমিও সেইরূপ কর।" এইরূপ অভিহিত হইয়া উপমন্যু কহিলেন, "আপনাদিগকে অনুনয় করিতেছি, আমি গুরুকে নিবেদন না করিয়া অপূপভক্ষণ করিতে পারিব না।" অশ্বিনীকুমার কহিলেন, "তোমার এই প্রকার অসাধারণ গুরুভক্তি দর্শনে আমরা অতিশয় প্রসন্ন হইলাম, তোমার উপাধ্যায়ের সন্ত-সকল লৌহময়, তোমারও হিরণ্‌ময় হইবে এবং তুমি চক্ষু ও শ্রেয়োলাভ করিবে।" উপমন্যু অশ্বিনীকুমারের বরদান-প্রভাবে পূর্ব্ববৎ চক্ষুরত্ন লাভ করিয়া গুরু-সন্নিধানে গমন ও অভিবাদনপূর্ব্বক আদ্যোপান্ত সমুদয় বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। তিনি শুনিয়া অত্যন্ত প্রীত হইলেন এবং কহিলেন, "অশ্বিনীতনয়েরা যেরূপ কহিয়াছেন, তুমিও সেইরূপ মঙ্গললাভ করিবে, সকল বেদ ও সকল ধর্ম্মশাস্ত্র সর্ব্বকাল তোমার স্মৃতিপথে থাকিবে।" উপমন্যুর এই পরীক্ষা হইল।
                         
                                                   বেদ ঋষি-উতঙ্ক-বৃত্তান্ত





    আয়োধধৌম্যের বেদ নামে অপর একটি শিষ্য ছিলেন। একদা উপাধ্যায় তাঁহাকে আদেশ করিলেন, "বৎস বেদ, তুমি আমার গৃহে থাকিয়া কিছুকাল শুশ্রূষা কর, তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে।" বেদ তদীয় বাক্য শিরোধারণপূর্ব্বক গুরুশুশ্রূষায় রত হইয়া বহুকাল গুরুগৃহে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। গুরু যখন যাহা নিয়োগ করিতেন, তিনি শীত, উত্তাপ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা প্রভৃতি অশেষ ক্লেশ গণনা না করিয়া ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহকারে তৎক্ষণাৎ তাহা অনুষ্ঠান করিতেন; কখন কোন বিষয়ে অবহেলা করিতেন না। এইরূপে বহুকাল অতীত হইলে উপাধ্যায় তাঁহার প্রতি অতি প্রীত ও প্রসন্ন হইলেন। তখন বেদ গুরুর প্রসাদে শ্রেয়ঃ ও সর্ব্বজ্ঞতা লাভ করিলেন। বেদের এই পরীক্ষা হইল।
    অনন্তর বেদ উপাধ্যায়ের অনুমতিক্রমে গুরুকুল হইলে প্রত্যাগত হইয়া গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশ করিলেন। ঐ আশ্রমে অবস্থানকালে তাঁহারও তিনটি শিষ্য হইল। বেদ শিষ্যদিগকে কোন কর্ম্মে নিয়োগ বা আত্মশুশ্রূষা করিতে আদেশ করিতেন না। কারণ, গুরুকুলবাসের দুঃখ তাঁহার মনোমধ্যে সতত জাগরূক ছিল। এই নিমিত্ত তিনি শিষ্যগণকে ক্লেশ দিতে পরাঙ্মুখ হইলেন।
    কিয়ৎকাল পরে রাজা জনমেজয় ও পৌষ্য-নামক অপর এক ভূপাল বেদের নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে উপাধ্যায় রূপে বরণ করিলেন। একদা তিনি যাজনকার্য্যোপলক্ষে স্থানান্তরে প্রস্থান করিবার কালে উতঙ্ক-নামক শিষ্যকে আদেশ করিলেন, "বৎস! আমার অবস্থানকালে মদীয় গৃহে যে-কোন বিষয়ের অসদ্ভাব হইবে, তাহা তুমি তৎক্ষণাৎ সম্পন্ন করিবে।" উতঙ্ককে এইরূপ আদেশ দিয়া বেদ প্রবাসে গমন করিলেন। উতঙ্ক গুরুকুলে বাস করিয়া গুরুর অনুজ্ঞা পালন করিতে লাগিলেন।
    একদিন উপাধ্যায়পত্নীরা উতঙ্ককে আহ্বান করিয়া কহিলেন, "তোমার উপাধ্যায়ানী ঋতুমতী হইয়াছেন। এ সময় তোমার গুরু গৃহে নাই। যাহাতে তাঁহার ঋতু ফলহীন না হয়, তুমি তাহা কর, কাল অতিক্রান্ত হইয়াছে।" উতঙ্ক এতাদৃশ অসঙ্গত কথা শুনিয়া কহিলেন, "আমি স্ত্রীলোকের কথায় এরূপ কুকর্ম্মে কদাচ প্রবৃত্ত হইতে পারি না এবং গুরু আমাকে অন্যায় আচরণ করিতে কহিয়া যান নাই।" কিয়ৎকাল পরে উপাধ্যায় প্রবাস হইতে গৃহে আগমন করিয়া উতঙ্কের সুচরিত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিয়া অত্যন্ত প্রসন্ন হইলেন এবং তাহাকে কহিলেন, "বৎস উতঙ্ক! তোমার কি প্রিয়কার্য্য অনুষ্ঠান করিব, বল? তুমি ধর্ম্মতঃ আমার শুশ্রূষা করিয়াছ, তাহাতে আমি অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছি অতএব এক্ষণে তোমাকে অনুজ্ঞা করিতেছি, তোমার সকল মনোরথ সফল হউক; গমন কর।" গুরু কর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া উতঙ্ক কহিলেন, "ভগবন্! আমি দক্ষিণা দিতে প্রার্থনা করি। কারণ, এইরূপ শ্রুতি আছে যে, যিনি দক্ষিণা গ্রহণ না করিয়া শিক্ষাদান করেন ও যে ব্যক্তি দক্ষিণা না দিয়া অধ্যয়ন করে, তাহাদের মধ্যে একজন মৃত্যু বা বিদ্বেষ প্রাপ্ত হয়। অনুমতি করিলে আপনার ইচ্ছানুরূপ দক্ষিণা আহরণ করি।" উপাধ্যায় কহিলেন, "বৎস উতঙ্ক! অবসর ক্রমে আদেশ করিব।" উতঙ্ক আর একদিন গুরুকে নিবেদন করিলেন, "মহাশয়, আজ্ঞা করুন, কিরূপ দক্ষিণা আপনার অভিমত, তাহা আহরণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে।" তাহা শুনিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, "বৎস উতঙ্ক! গুরুদক্ষিণা আহরণ করিবে বলিয়া আমাকে বারংবার জিজ্ঞাসা করিয়া থাক, অতত্রব তোমার উপাধ্যায়ানীকে বল, তাঁহার যাহা অভিরুচি, সেইরূপ গুরুদক্ষিণা আহরণ কর।" উতঙ্ক উপাধ্যায়ের উপদেশক্রমে গুরু-পত্নী সমীপে গমনপূর্ব্বক কহিলেন, "মাতঃ! গৃহে যাইতে উপাধ্যায় আমাকে অনুমতি করিয়াছেন, এক্ষণে আপনার অভিলষিত গুরুদক্ষিণা দিয়া ঋণমুক্ত হইতে বাসনা করি। বলুন, কি দক্ষিণা আপনার অভিপ্রেত?" উপাধ্যায়ানী কহিলেন, "বৎস! পৌষ্যরাজের ধর্ম্মপত্নী যে কুণ্ডলদ্বয় ধারণ করিয়া আছেন, তাহা আনয়ন করিয়া আমাকে প্রদান কর। আগামী চতুর্থ দিবসে এক ব্রত উপলক্ষে মহা সমারোহ হইবে, সেইদিন ঐ দুই কুণ্ডল ধারণ করিয়া নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণদিগের পরিবেশন করিব; অতএব তুমি সত্বর গমন কর, ইহা করিতে পারিলে তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে, অন্যথা মঙ্গল হওয়া সুকঠিন।"
    উতঙ্ক এইরূপ অভিহিত হইয়া প্রস্থান করিলেন। গমন করিতে করিতে পথিমধ্যে অতি বৃহৎ এক বৃষ দেখিলেন। ঐ বৃষে বৃহৎকায় এক পুরুষ আরোহণ করিয়াছিলেন। তিনি উতঙ্ককে আহ্বান করিয়া কহিলেন, "ওহে উতঙ্ক! তুমি এই বৃষের পুরীষ ভক্ষণ কর।" উতঙ্ক তাহাতে অসম্মত হইলেন। তখন ঐ পুরুষ পুনর্ব্বার তাঁহাকে কহিলেন, "উতঙ্ক! তুমি মনোমধ্যে কোনপ্রকার বিচার না করিয়া এই বৃষের পুরীষ ভক্ষণ কর, পূর্ব্বে তোমার উপধ্যায় ইহার পুরীষ ভক্ষণ করিয়াছিলেন।" তখন উতঙ্ক ঐ কথায় স্বীকার করিয়া সেই বৃষের মূত্র ও পুরীষ ভক্ষণ করিলেন। অনন্তর সত্বর আচমন করিতে করিতে সসম্ভ্রমে প্রস্থান করিলেন এবং আসনাসীন পৌষ্যের সন্নিধানে গমন করিয়া আশীর্ব্বাদ-প্রয়োগ-পুরঃসর কহিলেন, "মহারাজ! আমি অর্থিভাবে আপনার নিকট অভ্যাগত হইয়াছি।" রাজা তাঁহাকে অভিবাদন করিয়া কহিলেন, "ভগবন্! এই কিঙ্কর আপনার কি উপকার করিবে, বলুন। "উতঙ্ক কহিলেন, "মহারাজ! আপনার মহিষী যে কুণ্ডলদ্বয় ধারণ করেন, গুরুদক্ষিণা-প্রদান-বাসনায় আপনার নিকট আমি তাহা প্রার্থনা করিতে আসিয়াছি।" পৌষ্য কহিলেন, "মহাশয়! অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া আমার সহধর্ম্মিণীর নিকট উহা যাচ্ঞা করুন।" উতঙ্ক তাঁহার আদেশানুসারে অন্তঃপুরে গমন করিয়া রাজ-মহিষীকে দেখিতে পাইলেন না। তখন তিনি পুনর্ব্বার পৌষ্যের নিকট আসিয়া কহিলেন, "মহারাজ। আমার প্রতি এরূপ মিথ্যা আচরণ করা আপনার উচিত হয় নাই। অনেক অনুসন্ধান করিলাম, কিন্তু অন্তঃপুরে আপনার মহিষীকে দেখিতে পাইলাম না।" পৌষ্য ক্ষণকাল বিবেচনা করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, "মহাশয়! বোধ হয়, আপনি অশুচি আছেন, মনে করিয়া দেখুন। আমার গৃহিণী অতি পতিব্রতা, অপবিত্র থাকিলে কেহই তাঁহার সন্দর্শন পায় না।" এইরূপ অভিহিত হইলে উতঙ্ক সমুদয় স্মরণ করিয়া কহিলেন, "আমি বৃষ-পুরীষ ভক্ষণান্তর সত্বরে উত্থিত হইয়া গমনকালে আচমন করিয়াছিলাম।" পৌষ্য প্রত্যুত্তর করিলেন, "মহাশয়! আপনার ইহাই ব্যাতিক্রম হইয়াছে। উত্থানাবস্থায় ও গমনকালে আচমন করা আর না করা উভয়ই তুল্য।" তখন উতঙ্ক প্রাঙ্মুখে উপবেশন এবং করচরণ ও বদন প্রক্ষালন পূর্ব্বক নিঃশব্দ, অফেন, অনুষ্ণ ও হৃদয়দেশ পর্য্যন্ত গমন করিতে পারে, এইরূপ পরিমাণে জল তিনবার আচমনপূর্ব্বক অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন এবং রাজমহিষীকে দেখিতে পাইলেন। রাজমহিষী তাঁহার দর্শনমাত্রে সত্বরে উত্থিত হইয়া অভিবাদন করিলেন এবং স্বাগত জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, "ভগবন্! এ কিঙ্করী আপনার কি করিবে, আজ্ঞা করুন?" উতঙ্ক কহিলেন, "গুরুদক্ষিণা প্রদান করিবার নিমিত্ত তোমার নিকট কুণ্ডলদ্বয় ভিক্ষা করিতে আসিয়াছি, আমাকে তাহা দান কর।" রাজমহিষী তাঁহার তাদৃশ প্রার্থনায় প্রীতা ও প্রসন্না হইয়া সৎপাত্র বোধে তৎক্ষণাৎ কর্ণ হইতে উন্মোচনপূর্ব্বক কুণ্ডলদ্বয় তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিলেন এবং কহিলেন, "নাগরাজ তক্ষক আগ্রহাতিশয়সহকারে ইহা প্রার্থনা করেন। অতত্রব সাবধান হইয়া লইয়া যাউন।" উতঙ্ক কহিলেন, "তুমি কোনরূপ আশঙ্কা করিও না। নিশ্চয় কহিতেছি, তক্ষক আমার কিছুই করিতে পারিবে না।"
    উতঙ্ক ইহা কহিয়া সমুচিত সংবর্দ্ধনাপূর্ব্বক তাঁহার নিকট বিদায় লইয়া পৌষ্য-সকাশে গমন করিলেন এবং কহিলেন, "মহারাজ! অভিলষিত-ফললাভে আমি অতিশয় প্রীত হইয়াছি। "অনন্তর পৌষ্য কহিলেন, "ভগবন্! সকল সময় সুপাত্র-সমাগম হয় না। আপনি গুণবান্ অতিথি উপস্থিত হইয়াছেন। ইচ্ছা হয়, আতিথ্য করি, অতএব কাল-নির্দ্দেশ করুন।" উতঙ্ক প্রত্যুত্তর করিলেন, "আমি এক্ষণেই প্রস্তুত আছি, আপনি অন্ন আনয়ন করুন।" রাজা তদীয় আদেশানুসারে অন্ন উপস্থিত করিয়া তাঁহাকে উপযোগ করিতে দিলেন। তিনি তাহা শীতল ও কেশসংস্পর্শে অশুচি দেখিয়া কহিলেন, "তুমি আমাকে দূষিত অন্ন ভোজন করিতে দিয়াছ, অতএব অন্ধ হইবে।" পৌষ্য এইরূপ অভিশাপ শ্রবণ করিয়া কহিলেন, "তুমি অদূষিত অন্নে দোষারোপ করিলে, অতএব তোমারও বংশলোপ হইবে।" তখন উতঙ্ক কহিলেন, "দেখ তুমি অশুচি অন্ন ভোজন করিতে দিয়া পুনর্ব্বার প্রতিশাপ প্রদান করিতেছ, ইহা তোমার সমুচিত কর্ম্ম হইল না, বরং তুমি অন্নের দোষ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ কর।" পৌষ্য অন্নের অশুচিত্ব স্পষ্টই দেখিতে পাইলেন। পরে উতঙ্ককে বিনয়বাক্যে কহিলেন, "ভগবন্! আমি সবিশেষ না জানিতে পারিয়া এই অশুচি অন্ন আহরণ করিয়াছিলাম, এক্ষণে আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। আপনি প্রসন্ন হইয়া যাহাতে আমি অন্ধ না হই, এইরূপ অনুগ্রহ করুন।"
    তখন উতঙ্ক প্রত্যুত্তর করিলেন, "দেখ, আমার বাক্য মিথ্যা হইবার নহে, সুতরাং একবার অন্ধ ও অনতিবিলম্বে চক্ষুষ্মান্ হইবে, সন্দেহ নাই। কিন্তু তুমি যে শাপ দিয়াছ, তাহা হইতে আমাকে মুক্ত কর।" পৌষ্য কহিলেন, "এখনও আমার ক্রোধের উপশম হয় নাই; অতএব শাপ প্রতিসংহার করিতে পারি না। আর আপনি কি জানেন না যে, ব্রাহ্মণের হৃদয় নবনীতের ন্যায় সুকোমল ও বাক্য খরধার ক্ষুরের ন্যায় নিতান্ত তীক্ষ্ম; ক্ষৎত্রিয়দিগের উভয়ই বিপরীত অর্থাৎ তাহাদিগের বাক্য নবনীতবৎ কোমল ও হৃদয় ক্ষুরধার-তুল্য সুতীক্ষ্ম; সুতরাং আমি স্বভাবসুলভ তীক্ষ্মভাব-প্রযুক্ত এক্ষণে প্রদত্ত শাপের অন্যথা করিতে পারি না।" উতঙ্ক কহিলেন, "আমি অদূষিত অন্নে দোষারোপ করিয়া তোমাকে অভিসম্পাত করিয়াছি, এই ভাবিয়া তুমি আমাকে প্রতিশাপ প্রদান করিয়াছিলে। এক্ষণে অন্নের দোষ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া অনুনয়-বিনয় পূর্ব্বক আমাকে প্রসন্ন করিলে এবং শাপ বিমোচন করিয়া লইলে; কিন্তু তুমি যে শাপ দিয়াছ, তাহা মোচন করিতে চাহিতেছ না। এই প্রবঞ্চনা-প্রযুক্ত সে শাপ আমাকে লাগিবে না; আমি চলিলাম।" এই বলিয়া কুণ্ডলদ্বয় গ্রহণপূর্ব্বক সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।
    পথিমধ্যে দেখিলেন, এক নগ্ন ক্ষপণক [বৌদ্ধ ভিক্ষুক-ন্যাঙটা ভিখারী] আসিতেছে; কিন্তু সে মধ্যে মধ্যে অদৃশ্য হইতেছে। উতঙ্ক সেই সময়ে পৌষ্য-মহিষীদত্ত কুণ্ডলদ্বয় ভূতলে রাখিয়া স্নানতর্পণাদির নিমিত্ত সরোবরে গমন করিলেন। ইত্যবসরে-ক্ষপণক নিঃশব্দ পদসঞ্চারে সত্বর তথায় আগমন ও কুণ্ডলদ্বয় অপহরণ করিয়া পলায়ন করিল। উতঙ্ক স্নানাহ্নিক-সমাপনানন্তর অতি পূতমনে দেবতা ও গুরুকে প্রণাম করিয়া প্রবলবেগে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। তিনি সেই ক্ষপণকের সন্নিকৃষ্ট হইবামাত্র সে ক্ষপণকরূপ পরিহারপূর্ব্বক তক্ষকরূপ পরিগ্রহ করিল এবং অকস্মাৎ ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ হইয়া তাহার সম্মুখে এক মহাগর্ত্ত সমুৎপন্ন হইল। তক্ষক সেই মহাগর্ত্ত দিয়া নাগলোকস্থ স্বীয়ভবনে গমন করিলেন। তখন উতঙ্ক পৌষ্য-মহিষীর কথা স্মরণ করিয়া প্রাণপণে তক্ষকের অনুসরণে যত্নবান হইলেন এবং প্রবেশদ্বার বিস্তার করিবার নিমিত্ত দণ্ডকাষ্ঠ দ্বারা খনন করিতে লাগিলেন; কিন্তু তাহাতে কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁহাকে কষ্টভোগ করিতে দেখিয়া স্বীয় বজ্রাস্ত্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, "বজ্র! তুমি যাইয়া এই ব্রাহ্মণের সাহায্য কর।" বজ্র প্রভুর আদেশক্রমে তদ্দণ্ডে দণ্ডকাষ্ঠে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া গর্ত্তদ্বার বিস্তীর্ণ করিল। উতঙ্ক তদ্দ্বারা রসাতলে প্রবেশ করিলেন। তিনি এইরূপে নাগলোকে প্রবেশ করিয়া বহুবিধ প্রাসাদ, হর্ম্ম্য, বলভী ও নানাবিধ ক্রীড়াকৌতুকের রমণীয় স্থান অবলোকন করিলেন এবং বক্ষ্যমাণ প্রকারে নাগগণের স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন।
    "ঐরাবত যে-সকল সর্পের অধিরাজ এবং যাঁহারা যুদ্ধে অতিশয় শোভমান, সৌদামিনী সহকৃত পবনচালিত মেঘমালার ন্যায় বেগবান্ সেই সকল সর্পদিগকে স্তব করি। ঐরাবত সম্ভূত অন্যান্য সুরূপ ও বহুরূপ বিচিত্র কুণ্ডলধারী সর্প, যাঁহারা প্রচণ্ড দিবাকরের ন্যায় অমরলোকে নিরবচ্ছিন্ন বিরাজমান আছেন এবং ভাগীরথীর উত্তর তীরে যে-সকল নাগের বাসস্থান আছে, সেই সকল সুমহৎ পন্নগদিগকেও স্তব করি। ঐরাবত ব্যতিরেকে আর কে সূর্য্যকিরণে বিচরণ করিতে পারে? যখন ধৃতরাষ্ট্র সর্প গমন করেন, তৎকালে বিংশতিসহস্র অষ্টশত অশীতি সর্প তাঁহার অনুসরণ করেন। যাঁহারা ধৃতরাষ্ট্রের সমভিব্যাহারে গমন করেন ও যাঁহারা অতিদূরে বাস করেন, সেই সমস্ত ঐরাবতের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাদিগকে নমস্কার করি। পূর্ব্বে খাণ্ডবপ্রস্থে ও কুরুক্ষেত্রে যাঁহার বাসস্থান ছিল, কুণ্ডলের নিমিত্ত সেই নাগরাজ তক্ষককে স্তব করি। তক্ষক ও অশ্বসেন এই উভয়ে নিত্যকাল সহচর হইয়া স্রোতস্বতী ইক্ষুমতীতীরে সতত বাস করিতেন। মহাত্মা তক্ষকের কনিষ্ঠ পুৎত্র শ্রুতসেন, যিনি সর্ব্বনাগের আধিপত্য লাভ করিবার প্রত্যাশায় কুরুক্ষেত্রে বাস করিয়াছিলেন, তাঁহাকেও নমস্কার করি।"
    উতঙ্ক এইরূপে সর্পদিগকে স্তব করিয়াও যখন কুণ্ডলদ্বয় লাভ করিতে পারিলেন না, তখন অত্যন্ত চিন্তিত হইলেন এবং ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন, দুইটি স্ত্রীলোক সুচারু বাপদণ্ডযুক্ত তন্ত্রে [তাঁতে] বস্ত্র বয়ন করিতেছে। সেই তন্ত্রের সুত্রসকল শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ এবং দেখিলেন, দ্বাদশ অর-যুক্ত একখানি চক্র ছয়টি শিশু কর্ত্তৃক পরিবর্ত্তিত হইতেছে। আর একজন পুরুষ ও অতি মনোহর একটি অশ্ব নিরীক্ষণ করিলেন। এইরূপ অবলোকন করিয়া তিনি তাঁহাদিগকেও স্তব করিতে লাগিলেন।
    "সতত ভ্রাম্যমাণ চতুর্ব্বিংশতি পর্ব্বযুক্ত এই চক্রে তিনশত ষষ্টি তন্তু সমর্পিত আছে। ইহাকে ছয় জন কুমার পরিবর্ত্তিত করিতেছে। বিশ্বরূপ দুই যুবতী শুক্ল ও কৃষ্ণ সূত্র দ্বারা এই তন্ত্রে বস্ত্র বয়ন করিতেছেন। এই দুই যুবতী সমস্ত প্রাণী ও চতুর্দ্দশ ভুবন উৎপাদন করেন। নিখিল ভুবনের রক্ষাকর্ত্তা, বৃত্রাসুর ও নমুচির হন্তা, বজ্রধর ইন্দ্র, যিনি সেই কৃষ্ণবর্ণ বসনযুগল পরিধান করিয়া ত্রিলোকে সত্য-মিথ্যা উভয়ই বিচার করেন, সেই ত্রিলোকীনাথ পুরন্দরকে নমস্কার করি।"
    অনন্তর সেই পুরুষ উতঙ্ককে কহিলেন, "তোমার এইরূপ স্তবে আমি অতিশয় র্প্রীত হইলাম, এক্ষণে কি উপকার করিব, বল?" উতঙ্ক কহিলেন, "ভগবন্! এই করুন, যেন সমস্ত নাগগণ আমার বশবর্ত্তী হয়।" তখন সেই পুরুষ কহিলেন, "ভাল, তুমি এই অশ্বের অপান [গুহ্যদেশ]-দেশে ফুৎকার প্রদান কর।" তদীয় বাক্যানুসারে উতঙ্ক অশ্বের অপানদেশে ফুৎকার প্রদান করিলে তাহার শরীর প্রধূমিত হইয়া উঠিল এবং ইন্দ্রিয়রন্ধ্র হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সকল নির্গত হইতে লাগিল। তদ্দ্বারা নাগলোক সাতিশয় সন্তপ্ত হইলে পর তক্ষক অগ্ন্যুৎপাতভয়ে ভীত ও ব্যাকুলিত হইয়া কুণ্ডলদ্বয়ের সহিত স্বীয় বাসভবন হইতে সহসা নিষ্ক্রান্ত হইলেন এবং উতঙ্ক-সমীপে আসিয়া কহিলেন, "আপনার এই কুণ্ডলদ্বয় গ্রহণ করুন।" উতঙ্ক কুণ্ডল লইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, "অদ্য ব্রতোপলক্ষে মহাসমারোহ হইবে, কিন্তু আমি অতিদূরে রহিলাম, অতএব এক্ষণে কিরূপে উপাধ্যায়ানীর মনোরথ সম্পূর্ণ হইবে?" পরে সেই পুরুষ উতঙ্ককে চিন্তাকুল দেখিয়া কহিলেন, "উতঙ্ক! তুমি আমার এই অশ্বে আরোহণ কর, অনতিবিলম্বেই গুরুকুলে উপস্থিত হইতে পারিবে। উতঙ্ক তাঁহার আদেশানুসারে অশ্বে অধিরূঢ় হইয়া ক্ষণকালমধ্যে গুরুগৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। তৎকালে তাঁহার উপাধ্যায়ানী স্নানপূজাদি সমাপনানন্তর কেশবিন্যাস করিতেছিলেন, তিনি উতঙ্কের বিলম্ব দেখিয়া অভিসম্পাত করিবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময়ে উতঙ্ক গুরুগৃহে প্রবেশপূর্ব্বক উপাধ্যায়ানীকে অভিবাদন করিয়া কুণ্ডল দিলেন। তিনি তাহা গ্রহণ করিয়া কহিলেন, "বৎস উতঙ্ক! ভাল আছ ত'? বৎস! তুমি ভাল সময়ে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছ। আমি এখনই অকারণে তোমাকে শাপ দিলাম, ভাগ্যে দিই নাই। এক্ষণে আশীর্ব্বাদ করি, তুমি চিরকাল কুশলে থাক।"
    অনন্তর উতঙ্ক গুরুপত্নী সন্নিধানে বিদায় গ্রহণ করিয়া উপাধ্যায়ের নিকট উপস্থিত হইয়া প্রণাম করিলেন। উপাধ্যায় তাঁহাকে প্রত্যাগত দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "বৎস! ভাল আছ ত'? এত বিলম্ব হইল কেন?" উতঙ্ক প্রত্যুত্তর কহিলেন, "ভগবন্! নাগরাজ তক্ষক কুণ্ডলাহরণবিষয়ে অতিশয় বিঘ্ন করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত আমি নাগলোকে গমন করিয়াছিলাম। তথায় দেখিলাম, দুইটি স্ত্রীলোক কৃষ্ণ ও শুক্লবর্ণ সূত্র তন্ত্রে আরোপণ করিয়া বস্ত্র বয়ন করিতেছেন, তাহা কি? ছয়টি কুমার দ্বাদশ অরসংযুক্ত একখানি চক্র নিয়ত পরিবর্ত্তিত করিতেছে, তাহাই বা কি? এবং তথায় এক পুরুষ ও এক বৃহৎকায় অশ্ব দেখিলাম, তাহাই বা কি? আর পথিমধ্যে গমন করিতে করিতে এক বৃষ দেখিলাম, ঐ বৃষে এক পুরুষ আরোহণ করিয়া আছেন, তিনি আমাকে বৃষের পুরীষ ভক্ষণ করিতে অনুরোধ করিলেন এবং কহিলেন, 'পূর্ব্বে তোমার উপাধ্যায় এই বৃষের পুরীষ ভক্ষণ করিয়াছিলেন।' পরে তাঁহার নির্দ্দেশক্রমে আমি সেই বৃষের পুরীষ উপযোগ করিলাম, ঐ বৃষ ও বৃষাধিরূঢ় পুরুষই বা কে। আপনি অনুগ্রহ করিয়া এই সমস্ত বর্ণনা করুন, আমি শ্রবণ করিতে অভিলাষ করি।"
    উতঙ্কের প্রার্থনায় উপাধ্যায় কহিলেন, "বৎস! তুমি যে দুইটি স্ত্রীলোক দেখিয়াছ, তাঁহারা পরমাত্মা ও জীবাত্মা। দ্বাদশ অর-সংযুক্ত যে চক্র দেখিয়াছ, উহা সংবৎসর। শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ যে-সকল তন্তু দেখিয়াছিলে, উহা দিবা রাত্রি। ছয়টি কুমার ছয় ঋতু। যে পুরুষ দেখিয়াছ, তিনি পর্জ্জন্য। আর অশ্বটি অগ্নি। পথিমধ্যে যে বৃষভ দেখিয়াছিলে, তিনি নাগরাজ ঐরাবত। আর ঐ অশ্বে যে পুরুষ আরোহণ করিয়াছিলেন, তিনি দেবরাজ ইন্দ্র। যে পুরীষ ভক্ষণ করিয়াছ, তাহা অমৃত। বৎস! সেই অমৃত ভক্ষণ করিয়াছিলে বলিয়াই নাগলোকে পরিত্রাণ পাইয়াছ। ভগবন্ ইন্দ্র আমার সখা, তিনি কৃপারসপরবশ হইয়া তোমাকে রক্ষা করিয়াছেন, নতুবা নাগলোক হইতে কুণ্ডল লইয়া আগমন করা দুষ্কর হইত। বৎস! এক্ষণে আমি তোমাকে অনুমতি করিতেছি, গৃহে গমন কর এবং তোমার শ্রেয়োলাভ হউক।"

                                                   জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ প্ররোচনা
    
উতঙ্ক উপাধ্যায়ের অনুজ্ঞালাভানন্তর তক্ষকের প্রতি জাতক্রোধ হইয়া তাহার প্রতীকার-সঙ্কল্পে হস্তিনাপুরে প্রস্থান করিলেন এবং অনতিকালবিলম্বে তথায় উপস্থিত হইয়া রাজা জনমেজয়ের সহিত সমাগত হইলেন। তৎকালে মহারাজ জনমেজয় অমাত্যগণে পরিবৃত হইয়া বসিয়া ছিলেন। উতঙ্ক অবসর বুঝিয়া রাজা জনমেজয়কে যথাবিধি আশীর্ব্বাদবিধানপূর্ব্বক কহিলেন, "মহারাজ! প্রকৃত কার্য্যে অনাস্থা করিয়া বালকের ন্যায় সামান্য কার্য্যে ব্যাপৃত রহিয়াছেন।"
    জনমেজয় তাঁহাকে যথোচিত সৎকার করিয়া কহিলেন, "হে দ্বিজোত্তম! আমি সুতনির্ব্বিশেষে প্রজাপালন করিয়া ক্ষৎত্রিয়ধর্ম্ম প্রতিপালন করিতেছি, এক্ষণে আপনি কি নিমিত্ত আগমন করিয়াছেন, আজ্ঞা করুন।" উতঙ্ক কহিলেন, "মহারাজ! আমি যে কার্য্যের নিমিত্ত আগমন করিয়াছি, উহা আপনারই কর্ত্তব্য কর্ম্ম। দুরাত্মা তক্ষক আপনার পিতার প্রাণ হিংসা করিয়াছিল, এক্ষণে তাহার প্রতিবিধান করুন। ঐ অবশ্যকর্ত্তব্য কর্ম্মের অনুষ্ঠানকাল উপস্থিত হইয়াছে; অতএব হে মহারাজ! আপনার পিতৃবৈরী তক্ষককে সমুচিত প্রতিফল প্রদান করুন। সেই দুরাত্মা বিনা দোষে আপনার পিতাকে দংশন করিয়াছিল, তাহাতেই তিনি বজ্রহত বৃক্ষের ন্যায় ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়েন। বলদৃপ্ত পন্নগাধম তক্ষক বিনা অপরাধে আপনার পিতার প্রাণসংহার করিয়া কি দুষ্কর্ম্ম করিয়াছে, একবার স্থিরচিত্তে ভাবিয়া দেখুন। কাশ্যপ বিষ চিকিৎসা দ্বারা রাজর্ষিবংশরক্ষক দেবতানুভব মহারাজ পরীক্ষিতের প্রাণরক্ষা করিতে আসিতেছিলেন, পথিমধ্যে পাপাধম তক্ষক পরিচয় পাইয়া তাঁহাকে নিবৃত্ত করে। অতএব মহারাজ! অবিলম্বে সর্পসত্রের অনুষ্ঠান করিয়া ঐ পাপাত্মাকে প্রদীপ্ত হুতাশনে আহুতি প্রদান করুন, তাহা হইলে আপনার পিতার বৈরনির্যাতন এবং আমারও অভীষ্টসাধন হইবে সন্দেহ নাই। মহারাজ! আমি গুরুদক্ষিণা আহরণ করিতে গিয়াছিলাম, ঐ পাপিষ্ঠ পথিমধ্যে আমার যথেষ্ট বিঘ্ন অনুষ্ঠান করিয়াছিল।"
    রাজা জনমেজয় তাহা শ্রবণ করিয়া তক্ষকের প্রতি অত্যন্ত কোপাবিষ্ট হইলেন। যেমন ঘৃত-সংযোগে অগ্নি প্রজ্বলিত হইয়া উঠে, উতঙ্কের বাক্যে রাজার রোষানলও সেইরূপ উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিল। তখন রাজা জনমেজয় অতিশয় দুঃখিত হইয়া উতঙ্ক-সমক্ষে পিতার স্বর্গপ্রাপ্তির নিমিত্ত স্বীয় অমাত্যবর্গকে বারংবার জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন এবং উতঙ্কমুখে পিতৃবধবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অবধি শোকে ও দুঃখে নিতান্ত আক্রান্ত ও একান্ত অভিভূত হইলেন।
                                                        পৌষ্যপর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।