সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

বলিপ্রথা কি সত্যই হিন্দু তথা সনাতন ধর্মে নিষিদ্ধ?

মনসাপূজা, দুর্গাপূজা এবং কালীপূজা আসলেই দেখি কিছু মানুষ একটিভ হয়ে লেখালেখি এবং প্রচারণা শুরু করে দেয় শাস্ত্রীয় বলিপ্রথার বিরুদ্ধে। তাদের কিছু বালখিল্য যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চায় সনাতন ধর্মে পশুবলি অধর্মাচরণ এবং অশাস্ত্রীয় । তবে একথা সত্য যে বলি প্রথা অমানবিক এবং অনেকটা দৃষ্টিকটুও বটে।কিন্তু বলিপ্রথা কি সত্যই ধর্মে নিষিদ্ধ?

আমাদের পূজা পদ্ধতি প্রধানত দুইটি ধারায় বিকশিত বৈদিক এবং তান্ত্রিক শাস্ত্রাচার পদ্ধতি । এই দুটি পদ্ধতিতেই পশুবলির বিধান দেয়া আছে।
সারা পৃথিবীর হিন্দু সম্প্রদায় প্রধানত তিনটি প্রধান মতে বিভক্ত শাক্ত, শৈব এবং বৈষ্ণব। এ তিনটি মতের মধ্যে বৈষ্ণব মতটিকে বাদ দিলে অন্যদুটি মতে পূজা উপাসনার অত্যাবশ্যকীয়ভাবেই পশুবলির বিধান দেয়া আছে। শাক্ত মতের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দ্বাদশ অধ্যায় (১০,১১, ২০) সহ একাধিক স্থানেই দেবীপুজায় পশুবলির কথা বলা আছে। একইভাবে শৈবদের গ্রন্থাবলীতেও পশুবলির বিধান আবশ্যকীয়ভাবে দেয়া আছে।

শুধুমাত্র বৈষ্ণব পুরাণ এবং শাস্ত্রাবলিতে পশুবলির আবশ্যকতা খুব একটা পাওয়া যায় না। এর অন্যতম কারণ বৈষ্ণব শাস্ত্রাদিতে ও উপাসনায় অহিংসা তত্ত্বের প্রভাব এবং শ্রীরামানুজাচার্য, শ্রীমধ্বাচার্য, শ্রীনিম্বার্ক এই প্রধান চার বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রধান আচার্যবৃন্দ সকলেই দক্ষিণ ভারতের। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, দক্ষিণ ভারতে ঐতিহাসিকভাবেই নিরামিষাশী প্রভাব প্রবল। সেখানে বহু মুসলিম এবং খ্রিস্টানরাও নিরামিষাশী।এই নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসেরই সরাসরি প্রভাব পরেছে বৈষ্ণব সম্প্রদায়গুলোর উপরে।

বেদের পরে বৈষ্ণবদের প্রধান গ্রন্থ হলো শ্রীমদ্ভাগবত এবং বিষ্ণু পুরাণ। তবে বৈষ্ণবদের জীবনে শ্রীমদ্ভাগবতের প্রভাব তীব্র এবং অসীম। ফেসবুকে যেহেতু বেশী কথা লেখার সুযোগ নেই তাই পশুবলি এবং মাংসাহার সম্পর্কিত ভাগবতের দুটি স্কন্ধের কয়েকটি শ্লোকের বাংলা অনুবাদ তুলে দিচ্ছি। আপনারা নিজেরা পড়ে নিজেরাই বুঝে যাবেন যে পশুবলি এবং মাংসাহার সম্পর্কে ভাগবতের মতাদর্শ কি।
( এখানে অনুবাদে রণব্রত সেন সম্পাদিত এবং ত্রিপুরাশংকর সেনশাস্ত্রী ভূমিকা সম্বলিত হরফ প্রকাশিত শ্রীমদ্ভাগবত ব্যবহৃত হয়েছে)
"অজগর যাকে গ্রাস করেছে সে যেমন অন্যকে রক্ষা করতে পারে না, তেমনি কাল, কর্ম ও ত্রিগুণের অধীন পাঞ্চভৌতিক এই দেহের পক্ষে অন্য কাউকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। ভগবানই সকলের উপযুক্ত জীবিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খায়, পা যুক্ত পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ ঘাস-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের হত্যা করে। জীবই জীবের জীবিকা - এই নিয়ম। এ জগৎ ভগবানই। তিনিই সর্বজীবের আত্মা, অথচ অদ্বিতীয়, ঐভাবে স্বপ্রকাশ। তিনিই অন্তরস্থ, তিনিই বহিঃস্থ। এক ঈশ্বরকে মায়া প্রভাবে দেব,মানুষ প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে উপস্থিত দেখ।"
( শ্রীমদ্ভাগবত: প্রথম স্কন্ধ, ১৩ অধ্যায়, ৪৫-৪৭)
"শাস্ত্রে দেবোদ্দেশে পশুবধের বিধান থাকলেও বৃথা হিংসার বিধান নেই।....... কিন্তু ভোগাসক্ত মানুষ এই বিশুদ্ধ ধর্ম জানে না। শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ, গর্বিত ও পণ্ডিতম্মন্য সেই পাপাচারী নিঃশঙ্কচিত্তে পশুবধ করে, কিন্তু পরলোকে সেই নিহত পশুরাই তাদের মাংস খেয়ে থাকে। এইভাবে যারা পশুহিংসা দ্বারা পরদেহের প্রতি হিংসা করে, তারা সেই সর্বান্তর্যামী শ্রীহরিকেই দ্বেষ করে।"
(শ্রীমদ্ভাগবত : একাদশ স্কন্ধ, ৫ম অধ্যায়, ১৩-১৪)
শ্রীমদ্ভাগবতের দুটি কোটেশনে আপনাদের দুটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করবো-
১.হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খায়, পা যুক্ত পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ ঘাস-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের হত্যা করে। জীবই জীবের জীবিকা - এই নিয়ম। এ জগৎ ভগবানই।
২. শাস্ত্রে দেবোদ্দেশে পশুবধের বিধান থাকলেও বৃথা হিংসার বিধান নেই।....... কিন্তু ভোগাসক্ত মানুষ এই বিশুদ্ধ ধর্ম জানে না।
আশাকরি এখানেই আপনারা আপনাদের উত্তর পেয়ে গেছেন যে শ্রীমদ্ভাগবতে পশুবলি এবং মাংসাহার নিষিদ্ধ কি নিষিদ্ধ না?
একারণেই মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে -
দেবোদ্দেশং বিনা ভদ্রে হিংসা সর্বত্র বর্জয়েৎ।(১১.১৪৩)
দেবোদ্দেশে বলিদান উৎসর্গ ব্যতীত সর্বত্রই হিংসা বর্জন করতে হবে।
এবং এ বিষয়ে আরো বলা হয়েছে-
কৃতায়াং বৈধহিংসায়াং নরঃ পাপৈর্ন লিপ্যতে। (১১.১৪৩)
দেবোদ্দেশে বলিদানে যে হিংসা শাস্রে তাকে বৈধহিংসা বলা হয়েছে। হিংসা পাপ, কিন্তু বৈধহিংসায় পাপ স্পর্শ করে না।
আমি বিশ্বাস করি আর না করি, শাস্ত্রে আছে বলিকৃত পশু সকল বন্ধন মুক্ত হয়ে মুক্তিলাভ করে। আমাদের ষড়রিপুর নাশের প্রতীক হিসেবেই পশুবলি দেয়া হয়। যেমন পাঠা হলো অনিষ্টকর কামের প্রতীক, মহিষ হলো ক্রোধের প্রতীক। তবে পশুবলি হয়তো প্রতিকী, কিন্তু সত্যিকারের পশুবলি দেবতার উদ্দেশ্যে আমরা তখনই দিতে পারবো যখন সত্যিসত্যি আমরা আমাদের দেহ থেকে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ,মদ ও মাৎসর্য রূপ শরীরস্থ এই ষড়রিপুকেই বিনাশ করে পশুত্ব থেকে
প্রথমে মনুষ্যত্ব এবং অন্তে দেবত্বে পৌছতে পারবো।

শ্রীভগবানের কাছে এই হোক আমাদের প্রার্থনা -
#ধিয়ো_যো_নঃ_প্রচোদয়াৎ।।

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী

( আমি জানি আমার লেখাটায় কিছু মানুষ দুঃখ পেয়েছেন, অথবা আমার উপরে বিরক্ত হয়েছেন; কিন্তু ঠিক কিছুই করার নেই আমার। গত কয়েকদিনের পশুবলির বিরুদ্ধে প্রচারণায়, অসংখ্য মানুষ আমার কাছে এ বিষয়ে আমার মতামত চায় ম্যসেঞ্জারে অথবা মোবাইলে ফোন করে। তখন আমি তাদের বলি, আমি বিষয়ে ধারাবাহিক দুইতিনটা পোস্ট দিয়ে দেবো। তাই বাধ্য হয়ে ঢেঁকিগেলার মতো এই পোস্টটি দেয়া। কেউ দুঃখ বা কষ্ট পেয়ে থাকলে, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত!)
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger