• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

০৯ জুলাই ২০১৭

বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, বিখ্যাত কিংবদন্তী চিকিৎসক, মানবদরদী, সকলের প্রিয় ও সদালাপী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়

স্বাধীন ভারতে বিখ্যাত নাগরিকদের ঘিরে পাঠযোগ্য জীবনকথা লেখার রেওয়াজ উঠে গিয়েছে। যা এখন পাওয়া যায় তা অষ্টোত্তর শতনাম অথবা চুপিচুপি প্রচারিত কেচ্ছাকথা। অথচ এঁদের সম্বন্ধে বিপুল তথ্য এবং শতসহস্র আলোকচিত্র বিভিন্ন জায়গায় এখনও ছড়িয়ে রয়েছে।
ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এ বিষয়ে কিছুটা ভাগ্যবান, চিকিৎসক হিসেবে তাঁর নানা গল্পগাথা আজও রূপকথার মতো বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে আছে এবং তাঁর গুণমুগ্ধ কর্মচারীরা পরবর্তী সময়ে কিছু মূল্যবান লেখা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন। সে সব ধৈর্যসহকারে উল্টে দেখলে বোঝা যায় এক কিংবদন্তি চিকিৎসক বঙ্গীয় ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে তাঁর মাসিক লাখ টাকার প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে বিপন্ন বাঙালিদের রক্ষার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এই জীবনকথা কিছুটা জানা থাকলে নিরন্তর জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত ও হতাশ বঙ্গবাসীরা কিছু নতুন পথ খুঁজে পেতে পারেন।
আমার এক পরলোকগত বন্ধু রসিকতা করে বলতেন, পরের ধন অপহরণ করে নিজের বলে চালানোয় আমরা কারও থেকে কম যাই না। তা না হলে কটকের সন্তান সুভাষচন্দ্র বসু এবং পটনার সন্তান বিধানচন্দ্রকে আমরা সেন্ট পার্সেন্ট বেঙ্গলি স্ট্যাম্প দিয়ে দিলাম, চেপে গেলাম যে এঁদের কেউই এন্ট্রান্স পাশ করার আগে কলকাতায় বসবাস করেননি।
পরবর্তী কালে বিধানচন্দ্র বাংলা-বিহার সংযুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন কিন্তু পারেননি। তিনি সফল হলে কী হত তা আন্দাজ করতে আজ আর কারও আগ্রহ নেই।
সীমাহীন প্রতিভা, মানুষের জন্য অনন্ত ভালবাসা, বিস্ময়কর পরিশ্রমের ক্ষমতা নিয়ে বিধানচন্দ্র সংখ্যাহীন মানুষের ভালবাসা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু জীবনকালে তিনি যে সব নিন্দা অকারণে নতমস্তকে গ্রহণ করে গিয়েছেন তারও তুলনা নেই। তাঁর চরিত্র নিয়ে দেওয়াল লিখন ছড়িয়েছে। নিন্দুকরা তাঁকে ঘিরে ধরে কুৎসিত গালাগালি করেছে, এমনকী জামা গেঞ্জি ছিঁড়ে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এবং যিনি দেশের কাজে একের পর এক সম্পত্তি বন্ধক দিয়েছেন অথবা বিক্রি করে দিয়েছেন, তাঁকে চোর বলা হয়েছে এবং সরকারকে ঠকিয়েছেন বলা হয়েছে।
আঘাত পেলেও ডাক্তার রায়কে বিচলিত দেখাত না। তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, “তোমার সাধ্যমতো চেষ্টা করো, এবং বাকিটা ভগবানের উপর ছেড়ে দাও।” আবার কখনও কখনও মেডিক্যাল কলেজের প্রিয় মাস্টারমশাই কর্নেল লুকিসকে স্মরণ করে বলতেন, “হাত গুটিয়ে বসে থাকার চেয়ে চেষ্টা করে হেরে যাওয়া ভাল।”
আবার কখনও কখনও মা-বাবাকে স্মরণ করতেন। “মা-বাবার কাছ থেকে তিনটে জিনিস শিখেছিলাম স্বার্থহীন সেবা, সাম্যের ভাব এবং কখনও পরাজয় না মেনে নেওয়া।”
আর যাঁরা তাঁর নিন্দায় মুখর ছিলেন তাঁদের সম্বন্ধে জীবনসায়াহ্নে বলেছিলেন, “আমি যখন মরব তখন ওই লোকগুলোই বলবে, ‘লোকটা ভাল ছিল গো, আরও কিছু দিন বাঁচলে পারত’।”
.....
ঠাকুমা নাম রেখেছিলেন ভজন। আর তাঁর ভাল নাম রাখার দিনে হাজির ছিলেন কেশবচন্দ্র সেন। পটনার মেধাবী ছেলে কলকাতায় উচ্চশিক্ষার জন্য এসে যে সব কাণ্ড করলেন তা বুলেট পয়েন্টে বলে নেওয়া যেতে পারে।
ডাক্তারি পড়বার বিশেষ বাসনা বিধানচন্দ্রের ছিল না, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ফর্মের জন্য আবেদন করেছিলেন। ডাক্তারির ফর্মটা আগে আসায় ওইটাই আবেদন করলেন। পূরণ করে পাঠিয়ে দিলেন।
থাকতেন কলেজ স্ট্রিট ওয়াই এম সি এ-তে। অর্থাভাব প্রবল, মাস্টারমশায়রা ছাত্রকে অবসর সময়ে ধনী রোগীদের বাড়িতে মেল নার্স হবার সুযোগ করে দিতেন। রোগীর বাড়িতে বারো ঘণ্টার ডিউটিতে পারিশ্রমিক আট টাকা।
মহাপুরুষরা সমকালের অক্লান্ত যন্ত্রণা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে পারেন না। জেনে রাখা ভাল, যাঁর চিকিৎসাখ্যাতি এক দিন কিংবদন্তি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এমবি পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। আবার তিনিই মাত্র ১২০০ টাকা সম্বল করে বিলেত গিয়ে দু’বছরে মেডিসিন ও সার্জারির চূড়ান্ত সম্মান এম আর সি পি এবং এফ আর সি এস প্রায় একই সঙ্গে অর্জন করেছিলেন।
বিভিন্ন অপমান কাণ্ডের সঙ্গে সায়েবরা জড়িত ছিলেন। কিন্তু দেশবাসীরা তাঁর জীবনকালে যে সব যন্ত্রণা ও অপমান তাঁকে করেছিলেন তা ভাবা যায় না।
যখন লাখ টাকার প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন তখন হাওড়া-কলকাতার দেওয়ালে দেওয়ালে কুৎসিত ভাষায় লেখা হল: ‘বাংলার কুলনারী হও সাবধান, বাংলার মসনদে নলিনী বিধান।’
১৯১১ সালে ডাক্তার রায় বিলেত থেকে যখন কলকাতায় ফিরলেন তাঁর কাছে মাত্র পাঁচ টাকা। বিলেত যাবার আগে কলকাতায় বিধানবাবুর ফি ছিল দু’টাকা।
আদিতে তাঁর ঠিকানা ৬৭/১ হ্যারিসন রোড, পরে দিলখুশ কেবিনের কাছে, ৮৪ হ্যারিসন রোড। সেখানে ছিলেন ১৯১৬ পর্যন্ত, এর পর আসেন ওয়েলিংটন স্ট্রিটের বাড়িতে। শোনা যায়, উপার্জন বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় তিনি বাড়িতে রক্ত ইত্যাদি পরীক্ষার জন্য প্যাথলজিকাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করেন।
পেশায় বিপুল সাফল্য বিধানচন্দ্রকে বিশেষ সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মাত্র সাড়ে আট বছরের প্র্যাকটিসে কলকাতায় প্রাসাদোপম বাড়ি এবং গাড়ির মালিক হওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না।
তাঁর রোগীর তালিকায় তখন কোন বিখ্যাত মানুষ নেই? এর মধ্যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও আছেন। শোনা যায়, গোড়ার দিকে জোড়াসাঁকোর জন্যও ভিজিট নিতেন, যদিও পরবর্তী সময়ে দু’জনে খুব কাছাকাছি আসেন।
চিত্তরঞ্জন দাশের মহাপ্রয়াণের পর দেশবন্ধুর একটা ছবি বিক্রি করে বিধানচন্দ্র কিছু টাকা তোলবার পরিকল্পনা করেন। এ বিষয়ে পরবর্তী কালে রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য একটি চিঠিতে লেখেন, “চিত্তরঞ্জনের একটা ছবি নিয়ে বিধানচন্দ্র রায় কবির কাছে গিয়ে বললেন এর উপর একটা কবিতা লিখে দিন।
“ডাক্তার, এ তো প্রেসক্রিপশন করা নয়। কাগজ ধরলে আর চটপট করে লেখা হয়ে গেল।”
উত্তর: “বেশ অপেক্ষা করছি।”
কিন্তু বেশি ক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ছবির উপর সেই অপূর্ব কবিতাটি লেখা হল এসেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ/ মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”
ডাক্তার রায়ের বিশাল প্র্যাকটিসের কোনও মাপজোক আজও হয়নি। কলকাতার বাইরেও বার্মা থেকে বালুচিস্তান পর্যন্ত তাঁর ডাক্তারি দাপট, যার একমাত্র তুলনা স্যর নীলরতন সরকার। শোনা যায়, তাঁর এক আপনজনের প্রতি তরুণ চিকিৎসক এক সময় আসক্ত হন, কিন্তু আর্থিক বৈষম্য সেই শুভকর্মকে সম্ভব করেনি।
প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের পর বিধানচন্দ্র এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন নেতাজির জন্মদিন ২৩ জানুয়ারি ১৯৪৮ এবং তার সাত দিন পর শুক্রবার দিল্লিতে গাঁধীজি নিহত হলেন।
যখন ডা. রায় মুখ্যমন্ত্রী হলেন তার আগের মাসে ডাক্তারি থেকে আয় ৪২০০০ টাকা, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নিজেই মাইনে ঠিক করলেন ১৪০০ টাকা, বয়স ৬৫। নিকটজনদের বললেন, “দশটা বছর কম হলে ভাল হত।” তার উপর চোখের সমস্যা, ম্যাগনিফাইং গ্লাস ব্যবহার করতেন এবং খুব লম্বা কিছু পাঠ এড়িয়ে চলতেন। এই জন্যই বোধ হয় নিন্দুকেরা প্রচার করেছিল, ডা. রায় বাংলার দিগ্বিজয়ী লেখকদের কোনও লেখাই পড়েন না, যদিও ক্ষণজন্মা লেখকরা সানন্দে তাঁকে স্বাক্ষরিত বই দিতেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি খুবই খাতির করতেন। এবং স্বাভাবিক সৌজন্যে বলতেন, লেখার অভ্যাসটা যেন ছেড়ে দেবেন না।
তবু বাংলা সাহিত্য ও সিনেমার মস্ত উপকার তিনি করেছিলেন। বান্ধবী বেলা সেনের কথায়, সত্যজিৎ রায়ের অসমাপ্ত ছবি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ‘পথের পাঁচালী’ তিনি দেখেন এবং সরকারি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে এই ছবিটির সরকারি প্রযোজনার ব্যবস্থা করেন।
১৯৪৮ থেকে বাংলার ইতিহাসের কঠিনতম সময়ে বিধানচন্দ্র রাইটার্সের লালবাড়িতে সাড়ে চোদ্দো বছর বসেছিলেন। তাঁর সেক্রেটারি সরোজ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, প্রথম দু’বছর তিনি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছেন। জমি বিক্রি করলেন, শেয়ার বিক্রি করলেন, এমনকী শৈলশহর শিলং-এর প্রিয় বাড়িটাও বিক্রি করলেন।
মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বাড়িতে বিনা পয়সায় নিয়মিত রোগী দেখতেন সকাল সাতটায়। এবং তার জন্য দু’জন ডাক্তারকে নিজের পয়সায় নিয়োগ করেছিলেন। ব্যক্তিগত স্টাফের মাইনে দিতেন নিজের গ্যাঁট থেকে।
ডাক্তার রায়ের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে নানা রকম গুজব রটত। কিন্তু তাঁর প্রথম জীবনীকার কে পি টমাস স্পষ্ট বলেছেন, তিনি ধূমপান বা মদ্যপান কোনওটাই করতেন না।
কে পি টমাস লিখেছেন, তাঁর চিরকুমারত্বের পিছনে কোনও কাহিনি আছে কিনা তা তিনি কখনও জানতে চাননি। একদিন (১৯৫৫) দিল্লি-বোম্বাই পরিভ্রমণ করে বিমানে ফিরলেন দুপুর একটায়। সঙ্গে সঙ্গে রাইটার্সে চলে গেলেন, ফিরলেন সাড়ে ৭টায়।
৬৫ বছর বয়সে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে বিধানচন্দ্র যে অমানুষিক পরিশ্রমের বোঝা বহন করেছেন তার কিছু বিবরণ জীবনীকাররা আমাদের দিয়েছেন।
ভোর পাঁচটায় উঠে গীতা ও ব্রহ্মস্তোত্র পড়ে, স্নান সেরে, সাড়ে ৬টায় ব্রেকফাস্ট খেয়ে, দু ঘণ্টা ধরে বিনামূল্যে ১৬ জন রোগী দেখে রাইটার্স বিল্ডিংস-এ আসতেন সবার আগে।
ব্রেকফাস্টে থাকত একটি টোস্ট, একটি ডিম, বেলপানা অথবা পেঁপে ও এক কাপ কফি। ভাল কফির সমঝদার ছিলেন। ভাল কফি পেলেই বন্ধুদের খাওয়াতেন।
তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কৃষ্ণ মেনন তাঁকে ডিফেন্স কারখানায় বিশেষ ভাবে তৈরি কফি গ্রাইন্ডার উপহার দিয়েছিলেন। খুবই মিতাহারী ছিলেন। সাধারণত বাইরে নিমন্ত্রণ খেতে যেতেন না। রসিকতা করতেন হসপিটালিটি অনেক সময় হসটিলিটি হয়ে যায়। রাইটার্সে সকাল ন’টা থেকে দশটা জরুরি ফাইল দেখতেন। তারপর সচিবদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা।
দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথাবার্তা চলত বারোটা থেকে সাড়ে বারোটা, তারপর অ্যান্টি চেম্বারে গিয়ে মধ্যাহ্নভোজন ও বিশ্রাম। পরবর্তী সময়ে অসুস্থতার পরিপ্রেক্ষিতে বাড়ি চলে এসে খাওয়াদাওয়া করে সামান্য বিশ্রামের পরে আবার রাইটার্স। এবং সেখানে রাত ৮টা পর্যন্ত। তাঁর ছিল দুটি দুর্বলতা। কয়েকবার স্নান করে নিতেন এবং সবাইকে বলতেন রাত ন’টায় শুয়ে পড়া ভাল।
এ বার ধন্বন্তরির নিজের স্বাস্থ্য! সর্দিকাশি ইত্যাদি ছোট ছোট রোগে সেই ছোটবেলা থেকেই ভুগতেন। তাঁর প্রথম হার্ট অ্যাটাক করেছিল ১৯৩০ সালে, তখন তিনি কংগ্রেসের কাজে আমদাবাদ থেকে দিল্লির পথে।
এই অ্যাটাক নিয়ে তেমন হইচই হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক মুখ্যমন্ত্রিত্ব কালে। এবারেও তাঁকে অমানুষিক পরিশ্রম থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে যেতে হয়নি। শুধু দৈনিক রুটিনের পরিবর্তন করে দুপুরে ওয়েলিংটন স্ট্রিটের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করতে আসতেন এবং বাড়িতেই ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম করে আবার রাইটার্সে যেতেন।
অন্তিমপর্বের শুরু ২৪ জুন ১৯৬২। রাইটার্সে ওইটাই তাঁর শেষ দিন। নিমপীঠের এক সন্ন্যাসীকে বললেন, “শরীর যেমন ঠেকছে কাল নাও আসতে পারি।’ মাথায় তখন যন্ত্রণা।
পরের দিন বাড়িতে ডাক্তার শৈলেন সেন ও যোগেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকা হল। তাঁদের সিদ্ধান্ত হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। ৩০ জুন ডাক্তার রায় তাঁর প্রিয় বন্ধু ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে বললেন, ‘‘আমি তিরিশ বছর হৃদরোগের চিকিৎসা করে আসছি, আমার কতটা কী হয়েছে আমি তা ভাল করেই বুঝতে পারছি। কোনও ওষুধই আমাকে ভাল করতে পারবে না।”
১ জুলাই তাঁর জন্মদিন। সেদিনই তাঁর তিরোধান দিবস। ওই দিন তাঁর আত্মীয়স্বজনরা এলেন। পরিচারক কৃত্তিবাসের হাত থেকে এক গ্লাস মুসুম্বির রস খেলেন। বন্ধু সার্জেন ললিতমোহনকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, ললিত আমার গুরুও বটে, ওর কাছ থেকে কত কিছু শিখেছি।
তার পর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে বললেন, “আমি দীর্ঘ জীবন বেঁচেছি। জীবনের সব কাজ আমি সমাধা করেছি। আমার আর কিছু করার নেই।” এর পর বললেন, আমার পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। এর পরেই নাকে নল পরানো, ইঞ্জেকশন এবং ১১টা ৫৫ মিনিটে অমৃতপথ যাত্রা।
দুঃসংবাদ পেয়ে দেশবন্ধুর স্ত্রী বাসন্তীদেবী বলেছিলেন, বিধান পুণ্যাত্মা, তাই জন্মদিনেই চলে গেল। ভগবান বুদ্ধও তাঁর জন্মদিনে সমাধি লাভ করেছিলেন।
দেহাবসানের কয়েক বছর আগে কেওড়াতলা শ্মশানের বৈদ্যুতিক চুল্লির সূচনা করতে এসে বিধানচন্দ্র বলেছিলেন, “ওহে আমাকে এই ইলেকট্রিক চুল্লিতে পোড়াবে।” ২ জুলাই ১৯৬২ তাঁর সেই ইচ্ছা পূর্ণ করা হয়েছিল।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

‘পঞ্চ ইন্দ্রিয়’র সংযমে ‘ষড়রিপু’র দমন


পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা আমরা মানুষেরা রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ এ পঞ্চগুণের উজ্জীবিত ও সজীব জীবনের উপস্থিতি লাভ করি আমাদের মানব জীবনে। এই রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ দ্বারা জীবনের সকল সুখ খুঁজে বেড়াই, পূরণ করার চেষ্টা করি ষড়রিপু’র দাবীসমুহকে। আর শাস্ত্রসমূহ মানবজাতিকে শিক্ষা দান করেছেন ‘সংযম’ শিক্ষার মাধ্যমে নিজ পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা লাভ করে সারা বছর ব্যাপী ষড়রিপু’কে দমন করে একটি সুন্দর এবং সুস্থ মানব জীবন পরিচালনার সামর্থ্য অর্জন করার জন্য।
সাধকের প্রাথমিক সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান শিক্ষা হল ভোগস্পৃহা নিয়ন্ত্রণ করে দেহমনকে ত্যাগের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে তোলা। আর তাই সাধনা মূল বিষয় ‘সংযম’ এবং ‘ত্যাগ’। একজন স্বাভাবিক মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় রয়েছে এ কথা আমরা সবাই জানি। ইন্দ্রিয়গুলো হলো--- কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, চক্ষু ও ত্বক। আর রয়েছে ‘ষড়রিপু’ অর্থাৎ মানুষের চরম ও প্রধান ছ'টি শত্রু হ'ল ---- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। সমস্ত আধ্যাত্মিক শিক্ষার মূল শিক্ষা হল এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে এই ষড়রিপু’কে ধ্বংস করা।
অথচ বাস্তবে কি হচ্ছে? আজ আমরা জীবিকার প্রতিটি টাকা 'ভোগ'-এর পিছনে হিসাব করে খরচ করছি পরিকল্পনা করে। দান করছি কই! দান-খয়রাত করতে গেলে আগে দেখি মানিব্যাগে খুচরা টাকা-পয়সা আছে কি না, আর তার মধ্যে ময়লা-ছেঁড়া থাকলে আরও সুবিধা হয়। কিন্তু ভোগের বেলায়, শরীর-মনের উত্তেজনাকারী খাদ্য-পানীয় নিত্য উদরসাৎ করছি মহোৎসাহে। যে পরিমাণ ভোগ-বিলাস আর অপচয়-অপব্যায়ে আমরা মত্ত হই তা আমাদের সংযম শেখায় না, শেখায় না ষড়রিপুকে দমন করার কৌশল। বরং বিপরীতটাই আমাদের অবচেতনে শিকড় গেঁড়ে বসে যাচ্ছে, আর পরবর্তী প্রজন্মকে শিখাচ্ছে ------ 'খাও, পিয়ো অউর মৌজ কারো’। তথাকথিত প্রগতিশীলতা এবং আধুনিকতার দোহাই দিয়ে ষড়রিপু চরিতার্থ করতে সমাজে আজ যা হচ্ছে তা থেকে ধর্মগ্রন্থ আমাদের কতটুকু বিরত রাখতে সক্ষম হচ্ছে আর আমরাই বা কতটুকু শিক্ষা নিচ্ছি?
আধুনিক ফার্স্টফুড আর ব্র্যান্ড ফুডকোর্ট, নাইটক্লাব ও বার, ডিস্কোথেকগুলো ব্যবসার পসরা বসিয়েছে 'প্রগতিশীলতা এবং আধুনিকতা' নামেরর দুই অনুষঙ্গকে ঘিরে। যেখানে মানবিক ও লৌকিক অনেক মৌলিক নীতি ও বিধি লঙ্ঘনের সাথে সাথে চলছে 'অপচয় আর অপব্যায়’ যা ‘সংযম’ আর ‘ত্যাগ’ এর সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যবহার।
সবশেষে কি আর বলব? অত্যন্তঃ দুঃখের সাথে কাতর আবেদন জানাচ্ছি আসুন, সুস্থ্য জীবন ও সুন্দর সমাজ গড়তে --- মন্ত্র-দীক্ষা গ্রহণ করুন, সাধুসঙ্গ করুন, গীতা পাঠ করুন, প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করুন, আত্মজ্ঞান লাভ করে অন্যকে পথ দেখান। নিজের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ষড়রিপু’কে দমন করার কৌশল আয়ত্ত করে সারা বছর জুড়ে একটি সুখী এবং সুন্দর জীবন গড়ার শিক্ষা নিই শ্রী গুরুর কৃপায়। শ্রী গুরুর কৃপা সবার জন্য কল্যাণকর হোক্ --- এই কামনায় শেষ করছি আমার বিনম্র আবেদন।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

নারদ ও এক শিকারী

ভগবানের নাম জপ করতে করতে নারদ মুনি একদিন গঙ্গায় স্নান করার জন্য বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন এই সময় তিনি এক বীভৎস দৃশ্য দেখতে পেলেন।
নারদ মুনি - কে ভগবানের সৃষ্টির এই অবস্থা করলো? নিশ্চয়ই কোন দুর্বুদ্ধি বোকা এই ভয়ানক পাপ কর্ম করেছে! কিছু আত্মা প্রাণীদের উপর এমন অত্যাচারের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যতকে অন্ধকারময় তৈরী করছে! ---- নারদ মুনি কৃষ্ণ কর্তৃক প্রদত্ত তাঁর দিব্য বীণাতে টঙ্কার দিলেন আর তাতে সমস্ত পশুরা সেই স্থান পরিত্যাগ করলো।
শিকারী - এটি কিসের শব্দ? এটি কি ঘটছে? আমার সমস্ত পশুরাই এই স্থান থেকে চলে গেল।
নারদ মুনি - শিকারী, আমি তোমার কাছেই এসেছিলাম।
শিকারী - তুমি কে? আমি তো তোমার মত কাউকে চিনি না, তুমি আমার কাছে কি চাও?
নারদ মুনি - আমি নারদ, আমি তোমার কাছে এসেছিলাম যদি তুমি আমাকে আমার পথ চিনতে সাহায্য কর।
শিকারী - আমি একজন শিকারী আর তুমি কিনা আমার সমস্ত বন্দী পশুকে তাড়িয়ে দিলে, তুমি কেন এমন করলে?
নারদ মুনি - আমি যখন এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন দেখলাম যে এই সমস্ত পশু যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। এই হীন, পাপ কার্য কে করেছে?
শিকারী - পাপ কাজ! তুমি এসব কি বলছ?. আমিই তো এসব করেছি, এ সব কিছুই সঠিক আছে।
নারদ মুনি - তুমি এই দুর্বল খরগোশটিকে অর্ধমৃত কর রেখেছ আর বলছ এসবই সঠিক?
শিকারী - প্রভু, এতে পার্থক্য কোথায়, আমার পিতাই এই শিক্ষা প্রদান করেছেন, আর যখন আমি কোন খরগোশকে মৃত্যু যন্ত্রণায় কষ্ট পেতে দেখি, তা আমাকে আরো বেশি আনন্দ দান করে।
নারদ মুনি - শিকারী আমি তোমার কাছে শুধু একটি জিনিসই চাই, বল তুমি আমাকে তা দান করবে।
শিকারী - আপনি কি কোন কিছু পুষতে চান? আপনি আমার বাড়িতে চলুন আমি আপনাকে হরিণ, বাঘ, যা চান না কেন তাই দিয়ে দিব।
নারদ মুনি - আমার এইসব কিছুই চাই না। আমি শুধু চাই যে, তুমি পশুদেরকে এভাবে অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রেখ না। তোমায় কষ্ট ভোগ করতে
শিকারী - কিন্তু, আমি এই কষ্ট ভোগ করতে পারবনা।
নারদ মুনি - কিন্তু এটাই ঘটবে। তোমাকে প্রত্যেক পাপ কর্মের জন্য তার ফল ভোগ করতেই হবে।
শিকারী - হে প্রভু, আমি তাহলে কিভাবে এই পাপময় কর্ম থেকে মুক্তি পেতে পারি? আমি আপনার কাছে এই মিনতি নিবেদন করছি, দয়া করে আমাকে এই অবস্থায় বিপদ থেকে রক্ষা করুন। আমাকে পথ প্রদর্শণ করান।
নারদ মুনি - আমি তোমাকে প্রকৃত পথ দেখাতে পারি, কিন্তু তোমাকে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
শিকারী - অবশ্যই প্রভু, আমি তা থেকে বিরত হবো না।
নারদ মুনি- তাহলে প্রথমেই তুমি তোমার ধনুক ভেঙ্গে ফেল।
----- শিকারী তার ধনুক ভেঙ্গে ফেলে সেই শিকারীটি এবার নারদ মুনির নির্দেশনা শুনতে লাগল। সে তার সমস্ত বল, সম্পদ-সমৃদ্ধি ফেলে মাত্র একটি বসন পরে নারদের কাছে আসল।
শিকারী - আমার অতীত ছিল রাতের ভয়ংকর স্বপ্নের মত এবং এখন আমি জাগ্রত হতে চাই। কিন্তু কিভাবে এই বদ স্বভাবগুলো থেকে মক্তি পেতে পারি।
নারদ মুনি - হে শিকারী তুমি কি জান না কৃষ্ণ কত দয়াময়। তিনিই তোমাকে সকল রকম ব্যবস্থা করে দিবেন। তুমি শুধু তাঁর চরণে আত্মসমর্পণ কর। শিকারী ও তার স্ত্রী নদীর তীরে একটি ছোট্ট কুটির তৈরী করল।
শিকারীর স্ত্রী - তুমি আমাকে অনেক আনন্দ দান করেছ। এখন কৃপা করে নারদ মুনি যা তোমাকে বলেছে তা আমাকে বল। তুমি এখন যা করছ তাই প্রকৃত মুক্তির পথ এবং আমরা এখনই কেবল মাত্র বনের অন্য পশুর থেকে আলাদা হতে পারি।
শিকারী- তুমি আমাকে আমার আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশনা পালনে সাহায্য কর। তুমি আমার সাথে যোগদান কর আর আমার গুরুদেব যে পারমার্থিক সেবা প্রদান করেছেন তাতে অংশগ্রহণ কর।
শিকারী এবার ‘হরেকৃষ্ণ’ মহামন্ত্র নাম জপ করতে শুরু করল এবং তারা অন্যের দয়া নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করত। তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছুই গ্রহণ করত না।
তিনি তার বাড়িতে পরম পবিত্র তুলসী মহারাণীকে প্রতিদিন জলদান করতেন। এসব দেখে পাশের বাড়ির লোকেরা বলাবলি করতে লাগল -- আমাদের বাড়ির জানালা থেকে আমরা প্রায়ই দেখি যে তোমার স্বামী ভগবৎ ভজনা করছে, আর দেখ এমন তাঁর মুখমন্ডল কেমন জ্যোতির্ময় এবং উৎফুল্ল দেখাচ্ছে।
শিকারীর স্ত্রী - এটি সার্বিকভাবে নারদ মুনির কৃপা, ঐ তুলসী গাছটি দেখ। আমার স্বামী নারদ মুনির কাছ থেকে শুনেছে যে, শুধুমাত্র তুলসী গাছে জল সেচনের দ্বারা নিজেদের পবিত্র করে তুলতে পারা যায়। কারণ তুলসী মহারাণী ভগবানের পরমা প্রিয়া, দেখ দেখ, শিকারী এখন ভক্তে পরিণত হয়ে গেছে। গ্রামবাসী প্রত্যহ তার জন্য কিছু না কিছু খাবার নিয়ে আসত।
ভক্তবৃন্দ - সে সকল কিছুই বুঝতে পারছে, আমি বলছিলাম না আমরা খুবই ভাগ্যবান কারন আমরা এখন এমন একজনের সাক্ষাৎ পেয়েছি যিনি নারদ মুনির শিষ্য।
----- আর এরপর থেকে দশ থেকে বিশ জন প্রত্যেক দিন সেই শিকারীর সাথে প্রসাদ গ্রহণ করত।
ভক্তবৃন্দ - সবই তোমার কৃপা, আমরা তোমাকে আর কখনো পশুদের শত্রু বলব না। আমরা তোমাকে একজন সাধু বলে ডাকতে পারি। আর তোমার জন্য কিছু ফল নিয়ে এসেছিলাম।
শিকারী - দয়া করে আমাকে নারদ মুনির শিষ্য বলে ডাকলেই চলবে। আমি এর বেশি কিছুই নই।
---- একদিন নারদ মুনি এবং তার বন্ধু পর্বত মুনি সেই বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
নারদ মুনি - পর্বত মুনি আমার এক শিষ্য এরই পাশে কোথাও বাস করে তো দেখি এখন সে কি করছে?
পর্বত মুনি- আমি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্তদের খবুই ভালবাসি এবং তাদের দর্শনে আনন্দ উপভোগ করি, নারদ দয়া করে আমাকে সেখানে নিয়ে যাও। তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও। ঐ যে সেই শিকারী, দেখ দেখ।
শিকারী নারদ মুনিকে দেখে বললেন, “ঐ যে দেখ, আমার শ্রদ্ধেয় পরমারাধ্য শ্রী গুরুদেব আসছেন।” যখন শিকারী মাঠ পার হতে যাচ্ছিল সে দেখলো তার পায়ের ঠিক নিচে কিছু পিঁপড়া। সে বলল হে আমার প্রিয় বন্ধুরা তোমরা ভয় পেয় না, আমি তোমাদের কোন ক্ষতি করব না। এই দৃশ্য দেখে নারদ মুনি বললেন তুমি সত্যই বলিহারি শিকারী, তুমিই প্রকৃত ভক্ত। এটিই কাম্য যে, কোন কৃষ্ণ ভক্ত কোন ভাবেই জীবকে কষ্ট দিতে চায় না, এমনকি একটি পিঁপড়াকেও না। শিকারী নারদ মুনির চরণে দন্ডবৎ হয়ে বললেন, “গুরুদেব আমার পিঁপড়া ব্যাথা পেত তাই কৃপা পূর্বক সেই পিঁপড়াগুলোকে সরে যেতে দিন।”
নারদ মুনি - সকল কিছু কি ঠিক মত চলছে?
শিষ্য - হ্যাঁ গুরুদেব। দেখুন তুলসী মহারাণী কিভবে বর্ধিত হচ্ছে।
মহামুনি নারদ আপনি দয়া করে আমাদের সাথে প্রসাদ গ্রহণ করুন।
পর্বত মুনি - আমি দেখছি যে তুমি এখানে ভাল আছো এবং তোমার ভক্তি জীবন খুব ভালোভাবে চলছে এবং তোমার এমন হৃদ্যতায় আমি খুব খুশি হয়েছি।
শিষ্য - মহতী আপনি জানেন যে আমরা মহানাম থেকে সকল সময়ই কৃপা পেয়ে থাকি আর এই মহামন্ত্র নারদ মুনিই আমাকে দান করেছেন। আপনি জানেন যে এই মহামন্ত্র খুবই সুমধুর আর তাই আমরা সকল সময়ই এই মহামন্ত্র জপ করতে থাকি।
---- পূর্বের শিকারী এবং তার স্ত্রী হরিনামের উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে পড়ল। তারা তাদের এই অনুভূতিকে কৃষ্ণনামের মাধ্যমে উপভোগ করতে লাগল।
নারদ মুনি - সকল প্রশংসাই সমস্ত গৌরভক্তবৃন্দের। সকল প্রশংসাই ভগবান রাধাকৃষ্ণের।
পর্বত মুনি - নারদ মুনি সত্যিই তুমি একটি পরশ পাথর। তোমার স্পর্শেই আজ এই ঘৃণ্য শিকারী মানব জীবনের পরম প্রাপ্তি কৃষ্ণ প্রেম লাভ করেছে।
নারদ মুনি - তুমি কি ঠিক মত প্রসাদ পাচ্ছ প্রিয় শিষ্য?
শিষ্য - হ্যাঁ, গুরুদেব, আমি প্রত্যহ বিশজন ভক্তকে নিয়ে একত্রে প্রসাদ পাচ্ছি।
পর্বত মুনি - ঠিক আছে, এখন তুমি এবং তোমার স্ত্রী ভালভাবে কৃষ্ণ ভক্তি যাজন করো, কৃষ্ণ তোমাদের মঙ্গল এবং সুখী করুন।
শিকারী - মহৎ সাধুরা সকল সময় কৃষ্ণের কথাই বলেন। যিনি পরম ঈশ্বর ভগবান এবং দেবদেবীরাও তাঁকে জানেন, যিনি সমস্ত কিছুর পরম নিয়ন্তা। কিন্তু আমি এতই অধম যে, আমি কৃষ্ণকে জানতেও পারলাম না, ,আমি শুধুমাত্র আমার আধ্যাত্মিক গুরুর সেবা পূজা করতে পারি, যিনি আমাকে তাঁর পরম কৃপায় এই অজ্ঞতার অন্ধকারকে দূর করে, আমাকে দিব্য চক্ষুদান করেছেন।
কীর্তন - ভগবানের পবিত্র নামের গুণে শিকারীর বাড়ির আঙ্গিনা মধুর পরিবেশের সৃষ্টি, ঠিক যেন শুষ্ক মরুভূমিতে বসন্তের এক পশলা বৃষ্টি। সবাই 'হরিবোল হরিবোল' বলে চিৎকার করে উঠল।
.
.
একমাত্র নারদি পারেন এক দুর্বৃত্তকে সাধু বানাতে .......


Written by: Prithwish Ghosh
Share:

জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার যোগই ভারতীয় সনাতন সাধনার মূল প্রতিপাদ্য

জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার যোগই ভারতীয় সনাতন সাধনার মূল প্রতিপাদ্য। ভারতীয় ঋষিরা যোগচর্চার বেশ কয়েকটি পথের কথা উল্লেখ করেছেন। এই পথগুলিকে যোগমার্গ বা সাধনমার্গ বলা হয়। এর সংখ্যা নিয়ে মতান্তর আছে। সাধারণত যে যোগমার্গগুলির নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হলো ----

* কর্মযোগ
-- কর্মেই মুক্তি- এই বিশ্বাস থেকে কর্মযোগের সৃষ্টি। কর্মযোগের সূত্র ক্রিয়াযোগ ও জ্ঞানযোগের বিকাশ ঘটে। কর্মযোগের দ্বারা পাপক্ষয় হলে- জ্ঞানের উদ্ভব হয়। কর্মযোগের মূল লক্ষ্য ব্রহ্মজ্ঞান লাভ। কর্মের প্রকৃতি অনুসারে কর্মযোগকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগ দুটি হলো―
১। নিষ্কাম কর্মযোগ -- এর দ্বারা মোক্ষ লাভ হয়।
২। সকাম কর্মযোগ -- স্বর্গ লাভ হয়।
* ক্রিয়াযোগ -- কর্মযোগ সম্পন্ন করার জন্য ক্রিয়াত্বক উদ্যোগ থাকে তাই হলো- ক্রিয়াযোগ। এই যোগানুশীলনের সকল কর্মযোগই ক্রিয়াযোগ দ্বারা সম্পন্ন হয়।

* জ্ঞানযোগ -- পরম ব্রহ্মকে পাওয়া বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করার জন্য যে যোগানুশীলন করা হয়, তাই হলো- জ্ঞানযোগ। এক্ষেত্রে অন্তজ্ঞানকে বাস্তব জ্ঞানে পরিণত করা হয়। প্রকৃতি ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভিতর এর মানব ধর্মের অন্বেষণ করার প্রক্রিয়ার ভিতরই জ্ঞানযোগের মূল সূত্র নিহিত। যোগীর মনে উদ্ভুত বিভিন্ন প্রশ্নের সদুত্তর অন্বেষণ এবং এরই ভিতর পরম সত্যে পৌছার জন্য ধ্যানই হলো জ্ঞানযোগ। এর জন্য কোন প্রচলিত পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট নেই। বিভিন্ন পরিস্থিতি সাপেক্ষে এর বিচার ও সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়। জ্ঞানযোগে বিশ্বাসের চেয়ে উপলব্ধিকে বড় করে দেখা হয়। সেই কারণে এই যোগে আত্ম-জিজ্ঞাসা এবং তাঁর সদুত্তর খুঁজতে হয়। এই দুটি প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যে অভিজ্ঞতা লাভ হয়, তাই হলো জ্ঞানযোগের সঞ্চয়। জ্ঞানযোগ দ্বারা সঞ্চিত জ্ঞানের সাহায্যে বাস্তব সমস্যার সমাধান করা হয়। এই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে জ্ঞানযোগী নিজেকে সমৃদ্ধ করে থাকেন।

* ব্যক্তিযোগ -- বিশ্বাস স্থাপন করে নিজেকে নিবেদন করা বা নিজ ব্যক্তিত্ব বিলীন করার প্রক্রিয়াই হলো ব্যক্তিযোগ। সাধারণত বিভিন্ন ধর্মালবলম্বী আল্লাহ, পরমেশ্বর বা কোন দেবতার প্রতি বিশ্বাস রেখে নিজ ব্যক্তিত্বকে সমর্পণ করেন। এক্ষেত্রে কখনো কখনো এই বিশ্বাস সরাসরি ঈশ্বর হতে পারেন বা তার কোন প্রতীকীরূপ হতে পারে। যেমন পরমব্রহ্ম হবেন সরাসরি ঈশ্বর, কিন্তু রাম বা কৃষ্ণ হবে বিষ্ণুর অবতার হিসাবে। খ্রীষ্টধর্মালম্বীরা যেমন ত্রিত্ববাদের সূত্রে যিশুর আরাধনা করেন। কোন ব্যক্তি বিশেষের প্রবর্তিত পথ অনুসারে, উক্ত ব্যক্তিকে সম্মান করা বা তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণও ব্যক্তিযোগের পর্যায়ে পড়ে। ব্যক্তিযোগের পর্যায়ে কোন মহান শিক্ষক বা গুরু হতে পারেন। এক্ষেত্রে এই আরাধনা গুরু-ভজনা হিসাবে অভিহিত করা হয়।

* মন্ত্রযোগ -- মন্ত্রের সাধারণ সমার্থ হলো- পরামর্শ, বিচার ইত্যাদি অন্যদিকে বেদের উপাসনার উপযোগী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো (বাক্য বা পদ) মন্ত্র নামে অভিহিত করা হয় শাস্ত্র মোতাবেক মন্ত্র ও ঈশ্বর নাম জপ করতে করতে, নিজেকে ঈশ্বরে বিলীন করার পদ্ধতিই হলো মন্ত্রযোগ এই পথ ধরেই পরমব্রহ্মের সাথে সাধকের মিলন ঘটে এবং অনন্ত মুক্তিলাভ ঘটে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে- মহাদেব এই যোগের সাধনা করেছিলেন।

* রাজযোগ -- যোগ-চর্চার জন্য যতগুলি পথ বা মার্গ রয়েছে, তার ভিতরে রাজযোগ একটি। মন ও শরীরকে স্থির বা সমাধিস্থ করে যে যোগ-প্রক্রিয়া সাধিত হয়, তাকে রাজযোগ বলে। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে পতঞ্জলি, দত্তাদেয় প্রমুখ ঋষিরা এই যোগ সাধনার দ্বারা সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। যম ও নিয়মের অনুশীলনের দ্বারা মানুষের আচরণ এবং ব্যক্তিত্বের সংশোধন বিকাশ করার প্রক্রিয়ার ভিতর রাজযোগ প্রতিষ্ঠা পায়। সেই কারণে, সুস্থ মন ও শরীরের চর্চা এই যোগের বিষয় হিসাবে মূখ্য স্থান অধিকার করে আছে।

* লয়যোগ -- শরীরের নাড়িগ্রন্থিস্থানে মন বা চিত্তকে বিলীন করে যোগ সাধন করা এবং এর সাহায্যে মোক্ষ লাভ করার পথ হলো লয়যোগ। কথিত অাছে প্রখ্যাত মহর্ষি বেদব্যাস এই পথ অনুসরণে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন।

* হঠযোগ -- পিঙ্গল ও ইড়াকে অবলম্বন করে যে যোগ চর্চা বা সাধনা করা হয়, তাকেই হঠযোগ বলা হয়। দেহ থেকে শরীর পৃথক করে, মনকে ঈশ্বর বা পরমাত্মার সাথে মিলনের প্রক্রিয়াই হলো হঠযোগ। বর্তমানে হঠ্ যোগকে দেহচর্চার পদ্ধতি হিসাবেই বিবেচনা করা হয়। এই যোগ সাধনাকে কার্যকরী করার প্রক্রিয়াকে অঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই অঙ্গের প্রকারভেদ নিয়ে কিছুটা মত পার্থক্য আছে। গোরক্ষ মুনির মতে যোগাঙ্গ ছয়টি। এগুলো হলো― আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণ, ধ্যান ও সমাধি। পক্ষান্তরে মার্কেণ্ডয় মুনির মতে― যোগাঙ্গের সংখ্যা আটটি। এগুলো হলো― যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণ, ধ্যান ও সমাধি।

মনের ইচ্ছা ও একাগ্রতা দিয়ে কোন বিশেষ শক্তি বা ক্ষমতাকে আয়ত্ব করার প্রক্রিয়াই হলো সাধনা। পতঞ্জলির যোগসূত্র গ্রন্থের সাধনপাদ অংশে, সাধনা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণ, ধ্যান, শোধন ও সমাধি দ্বারা সাধনা করতে হয় সম্পন্ন হয়। আবার সাধনাকে চরিতার্থ করার জন্য রয়েছে সাধনবিধি। এই বিধিগুলো হলো শোধন, দৃঢ়তা, স্থৈর্য, ধৈর্য, লাঘব, প্রত্যক্ষ ও নির্লিপ্ত।


Written by: Prithwish Ghosh
Share:

ভবিষ্যত কি?


চৈতন্যদেব থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ থেকে রবীন্দ্রনাথ --- মিল এক জায়গায়। প্রত্যেকেই তথাকথিত ধর্মসম্পর্কিত ভাবনা এবং ধারণাকে ভেঙেচুরে নতুন আলো দেখাতে চেয়েছেন। স্বাধীনতার এত বছর পরেও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের নাগরিক হিসেবে আমাদের বহুবিধ জটিল ও জরুরী প্রশ্নের একটি আমাদের ধর্মভাব নিয়ে। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ এই যে, ধর্ম মানুষকে যতখানি সম্পন্ন করে ততখানিই বিপন্নও করে।

অথচ ভারত এক স্বাধীন সার্বভৌম গণতন্ত্র। ভারত এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান-পার্সী-বৌদ্ধ-জৈন সবাই সমান। হিন্দুরা চাইছেন বেশি করে হিন্দু হতে, মুসলমান চাইছেন বেশি করে মুসলমান হতে, খ্রিস্টান চাইছেন আরো অনেক মানুষকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে। এই চাওয়ার মধ্যে একটা শব্দ বারবার বাদ পড়ে যাচ্ছে। সেই শব্দটি হল 'মানুষ'। একজন হিন্দু 'মানুষ', মুসলমান 'মানুষ' বা খ্রিস্টান 'মানুষ' হতে চাইলে অনেক সমস্যারই আশু সমাধান হয়।

পৃথিবীর প্রতি ধর্মের উদ্দেশ্য হয়তো সর্বজনীন কল্যাণ: ভ্রাতৃত্ব, বিশ্বমৈত্রী, শান্তি ইত্যাদি। ভালো করে নিজের ধর্মশিক্ষাটুকু অনুসরণ করলে এ সংঘাতের সমস্যা মিটে যায়।
পুজো, অর্চনা, প্রার্থনা। নিয়ম করে দিনে পাঁচবার পাঠ, উপাসনা। পোষাক থেকে শুরু করে বহুবিধ আয়োজন। নানা আচার অনুষ্ঠান। সেখানে সমর্পণের ভাবনাকে ছাপিয়ে ওঠে বাহ্যিক আড়ম্বর। মানুষের জীবনদেবতাকে নিয়ে যে ধর্ম, যে ধর্ম সেই সত্যকে নিয়ে, যা সমাজ এবং ব্যক্তিমানুষকে ‘ধারণ’ করে, সে ধর্ম কোথায়?

ঠিক এইখান থেকে আমার ধর্মজিজ্ঞাসার শুরু। বুদ্ধদেব, চৈতন্যদেব, যীশু -- সবার ভাষ্যে মিল এক জায়গায় -- 'মানুষ'-এর এক নতুন চৈতন্যলোক চাই। আবহমান কাল ধরে পৃথিবীর দাবি একটাই -- মানবতাবোধে বিশ্বাসী নতুন ‘বিশুদ্ধ’ মানুষ।

কিন্তু এই যে দিকে দিকে মানবতা বিরোধী ইসলামিক জঙ্গী আক্রমণ চলছে ISIS ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর নামে, এটা কি ধর্ম? মানবতাবোধে বিশ্বাসী নতুন ‘বিশুদ্ধ’ মানুষের কাজ? তথাকথিত শুভবুদ্ধি সম্পন্ন, শিক্ষিত মানুষের প্রতিবাদ কই! ভারতবর্ষকে জঙ্গী আতুরঘর বানিয়ে ফেলেছে এরা! খাগড়াগড় এর প্রকৃষ্ট প্রমান। প্রশাসনের হাত পা বেঁধে ফেলেছে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা। থানায় পুলিশের উপর আক্রমণ এর উদাহরণ।

সত্যিই কি স্বাধীন দেশে মুক্ত ভাবে বাস করছি আমরা? আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিস্তির্ণ Border অঞ্চল দিয়ে অস্ত্র-ড্রাগ-নকল টাকা-গরু পাচার চলছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদতে ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সক্রিয় সহযোগিতায়। পুলিশ দুস্কৃতিদের পাকড়াও করলে ঐ সম্প্রদায়ের মানুষ সংগঠিত ভাবে তাদের ছিনিয়ে নিয়ে যায় পুলিশের হাত থেকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের মদতে। মানবতা ধর্ষিত, রাজনীতি ভুলুণ্ঠিত, দলতন্ত্র নগ্ন শুধুমাত্র ভোটের স্বার্থে। হিন্দু আজ নিজভুমে পরবাসীর জীবন ধারণ করে। ভবিষ্যত কি?

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

কালসর্প যোগ


ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্রে গ্রহগণের অবস্থান অনুযায়ী শুভ ও অশুভ যোগ সৃষ্টি হয়। এমনি এক অশুভ যোগ হল কালসর্প যোগ। রাহু এবং কেতু সব সময় নিজেদের সম সপ্তমে অর্থাৎ ১৮০ ডিগ্রি দুরত্বে অবস্থান করে। রাহু ও কেতুর মাঝখানে যখন সমস্ত গ্রহ চলে আসে তখন এই যোগ হয়। রাহু কে সাপের মুখ ও কেতুকে সাপের লেজ মান্য করা হয়। এর মধ্যে অর্থাৎ (সাপের পেটে) সমস্ত গ্রহ চলে আসে তখন এই যোগ সৃষ্টি হয়। এই যোগ খুব পীড়াদায়ক হয়। বিশেষ করে রাহু, কেতুর দশা মহাদশায় এবং গোচরে রাহু, কেতু যখন নিজ ভাব দিয়ে পাস করবে। রাহু ও কেতুর অবস্থান অনুযায়ী ১২ টি ভাবের জন্য ১২ রকম কালসর্প যোগ হয় এবং প্রত্যেক কালসর্প যোগ আলাদা আলাদা ফল দেয়।
১> অনন্ত নাগ কালসর্প যোগ
-------------------------------------------
রাহু লগ্নে ও কেতু সপ্তমে থাকলে অনন্ত কালসর্প যোগ হয়। এই যোগে পীড়িত ব্যাক্তিরা শারিরিক ও মানসিক ভাবে খুব বিব্রত থাকেন এবং মামলা মকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েন এই যোগের ব্যাক্তিরা খুব সাহসী হয়ে থাকেন ।
২> কুলিক কালসর্প যোগ
--------------------------------------
রাহু দ্বিতীয়ে ও কেতু অষ্টমে থাকলে কুলিক কালসর্প যোগ হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিরা আর্থিক কষ্টে ভোগেন। পারিবারিক অশান্তি লেগেই থাকে এবং সামজিক ভাবে ও কর্মে প্রতিষ্ঠা পায়না।
৩> বাসুকি নাগ কালসর্প যোগ
-------------------------------------------
রাহু তৃতীয়ে ও কেতু নবমে থাকলে এই কালসর্প যোগ হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিদের জীবন খুব সংঘর্ষ ময় হয়। চাকরি এবং ব্যাবসায় সমস্যা লেগেই থাকে। ভাতৃ সুখের অভাব হয়। ভাগ্য এদের কখনও সাথ দেয় না।
৪> শঙ্খপাল কালসর্প যোগ
---------------------------------------
রাহু চতুর্থে এবং কেতু দশমে অবস্থান করলে এই যোগ হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিদের কিছুটা অর্থ কষ্ট ভোগ করতে হয়। মানসিক ভাবে এবং পরিবার পরিজনের কাছ থেকে এরা কষ্ট পেয়ে থাকে। এদের মাতৃ সুখ হয় না। জমি, বাড়ি নিয়ে এরা সমস্যায় থাকেন।
৫> পদ্মনাগ কালসর্প যোগ
-------------------------------------
পঞ্চমে রাহু ও একাদশে কেতু থাকলে পদ্মনাগ কালসর্প যোগ হয় । এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিদের মিথ্যা বদনাম হয় । সন্তান সুখে বাধা । উচ্চ শিক্ষা ও ধন প্রাপ্তিতে বাধা হয় ।
৬> মহাপদ্ম নাগ কালসর্প যোগ
------------------------------------------
ষষ্ঠে রাহু ও দ্বাদশে কেতু থাকলে এই যোগ হয়। এদের মাতুল সুখ হয় না বা মাতুল থেকে কষ্ট পেয়ে থাকেন। প্রেমে সাফল্য আসে না। এবং অনেক লম্বা সময় পর্যন্ত এরা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগে থাকে।
৭> তক্ষক কালসর্প যোগ
-----------------------------------
এই যোগ অনন্ত কাল যোগের ঠিক উল্টো অর্থাৎ কেতু লগ্নে ও রাহু সপ্তমে অবস্থান করে। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিদের বিবাহিত জীবন খুব অশান্তি পূর্ণ হয়ে থাকে এবং চাকরি ও ব্যাবসায় বার বার ক্ষতি হয়। এবং মানসিক অশান্তি হয়।
৮> কর্কটক কালসর্প যোগ
------------------------------------
দ্বিতিয়ে কেতু ও অষ্টমে রাহু থাকলে এই যোগ হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিরা খুব ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করেন। এরা কখনও শান্ত ভাবে থাকতে পারেনা। পর্যাপ্ত টাকা পয়সা কখনও এদের হাতে থাকে না।
৯> শঙ্খচূড় কালসর্প যোগ
-------------------------------------
তৃতীয়ে কেতু ও নবমে রাহু অবস্থান করলে এই যোগ সৃষ্টি হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিদের পিতৃ সুখ হয় না। ভাগ্য সবসময় নিজের অনুকুলে থকে না। নিজের ব্যবসায় লোকসান হয়ে থাকে।
১০> ঘাতক কালসর্প যোগ
-------------------------------------
কোষ্ঠীতে চতুর্থে কেতু ও দশমে রাহু থাকলে এই যোগ হয়ে থাকে। এই যোগে গৃহে কলহ অশান্তি লেগে থাকে। কর্ম ক্ষেত্রে খুব সংঘর্ষ করতে হয়।
১১> বিষধর কালসর্প যোগ
-------------------------------------
কেতু পঞ্চমে ও রাহু একাদশে অবস্থান করলে এই যোগ হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিরা নিজের সন্তানের কাছ থেকে কষ্ট পেয়ে থাকেন। এদের নেত্র ও হৃদ রোগ হতে পারে। এদের স্মরণ শক্তি খুব দুর্বল হয়। উচ্চ শিক্ষায় বাধা এবং সামজিক ভাবে এরা প্রতিষ্ঠা পায় না।
১২> শেষনাগ কালসর্প যোগ
--------------------------------------
ষষ্ঠে কেতু ও দ্বাদশে রাহু থাকলে এই যোগ হয়। এই যোগের ব্যাক্তিদের প্রচুর গুপ্ত শত্রু থাকে যারা এদের প্রতি সবসময় ষড়যন্ত্র করতে থাকে এমনকি শত্রুরা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেয়। এই যোগে মানসিক অশান্তি ও মিথ্যা বদনাম হয়। এই যোগের ব্যাক্তিদের মৃত্যুর পরে মানুষ খুব গুণগান করে।
আপনার কোষ্ঠীতে কালসর্প যোগ থাকলেই যে সব সময় অশুভ ঘটনা ঘটবে তা কিন্তু নয়। কিছু শুভ গ্রহের বা শুভ ভাবের দৃষ্টি অথবা প্রেক্ষা পেলে অশুভ ভাব কিছুটা কাটবে।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

আর্থিক অনটনের শাস্ত্রসম্মত সমাধান


আমরা অনেকেই অনেক সময় আর্থিক অনটনে কাটাই, আয় ঠিক নয়, কোনওভাবেই সংসার চালাতে পারছি না, আবার আয় হলেও ব্যয় বেশী হয়ে যাচ্ছে এমনকি সঞ্চয়েও হাত পড়ে যাচ্ছে, এমন কি আমরা ভেবেও কুল পাচ্ছি না, হিন্দু শাস্ত্রমতে আমাদের কিছু কু-অভ্যাস এবং শাস্ত্র সম্পর্কে অজ্ঞতাই আমাদের এই অবস্থার জন্য দায়ী। আসুন, জেনে নিই এবং শাস্ত্রসম্মত ভাবে সংশোধন করি নিজেদের ------
ক => বাথরুম নোংরা করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং বাথরুম ব্যবহার করার পরে জলে ভিজে থাকা মেঝেও মুছে ফেলা দরকার।
খ => দুপুর ও রাত্রে খাবার সময় খাবার নষ্ট করাটা উচিত নয়, তেমনই খাওয়া-খাওয়ার পরে অতি দ্রুত প্লেট ধুয়ে নির্দিষ্ট স্থানে রাখা উচিত বলেও শাস্ত্রে বর্ণিত আছে।
গ => সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানা গুছিয়ে রাখতে হবে।
ঘ => বহু মানুষই অনেক রাত করে ঘুমোতে যান। এতে দুর্ভাগ্যকে আহ্বান করা হয়।
ঙ => যত্রতত্র থুতু ফেলে আশপাশের জায়গা নোংরা করলে লক্ষ্ণী রুষ্ট হন।
চ => শাস্ত্রমতে সূর্যাস্তের পরে ঘর মোছা বা ঘর ঝাড়ার অর্থ নিজের সৌভাগ্যকে মুছে ফেলা বলে দাবি করা হয়েছে শাস্ত্রে।
ছ => বাড়ীর পয়ঃপ্রণালী বা ড্রেণ ঢেকে রাখতে হয়।
জ => শাস্ত্রমতে উত্তরদিকে দেবতাদের বাস এবং সেখানে ধনসম্পত্তি থাকে। এই দিকটি খোলা ও পরিস্কার রাখা উচিৎ।
ঝ => বহু মানুষই ঘরের জানলা দিনের পর দিন খোলেন না। শাস্ত্রমতে এটা দুর্ভাগ্যের লক্ষণ।
ঞ => ঘরের সমস্ত ঘড়ি যেন ঠিকমতো কাজ করে তা নজরে রাখা উচিত। নচেৎ, সৌভাগ্য তো আসবেই না, বরং নেমে আসবে দুর্ভাগ্য।
ট => বাড়িতে যেন কিছুতেই কোনও পায়রার বাসা না থাকে। পায়রার বাসা আর্থিক অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের মূল হিসেবে কাজ করে।
ঠ => বাড়িতে মৌচাক থাকার অর্থ, দারিদ্র্য ও দুর্ভাগ্যকে টেনে আনা। কাজেই বাড়িতে মৌচাক থাকলে তা ভেঙে ফেলুন।
ড => মাড়সার জাল শুধু যে ঘর নোংরা করে তা-ই নয়, এটি সাংসারিক জীবনে টেনে আনে দুর্ভাগ্যও।
ঢ => বাড়ির দেওয়াল যদি চটা ওঠা, ভাঙা চোরা কিংবা ফাটল ধরা তবে, বাস্তু মতে, তা ভাগ্যে কুপ্রভাব ফেলে।
ণ => বাড়ির কোনও কল থেকে জল ক্রমাগত টুপ টুপ করে জল চুঁইয়ে পড়লে শুধু যে তা বাড়িতে নেতিবাচক শক্তি টেনে আনছে তা-ই নয়, আপনার বাড়ির ভিতরকার ইতিবাচক শক্তিকেও হ্রাস করছে।
ত = > বাড়ির কোনও বৈদ্যুতিক তার আলগা হয়ে দেওয়াল থেকে ঝোলা, কিংবা কোনও বৈদ্যুতিক যন্ত্রে লুজ কানেকশনের সমস্যা দুর্ভাগ্যের কারণ হতে পারে।
থ => বাড়ীতে কোনও ক্যাকটাস বা কাঁটাগাছ রাখা বা তা দিয়ে ঘর সাজানো ঐ বাড়ীর কিছু মানুষের মনে অবসাদ আনতে পারে।


Written by: Prithwish Ghosh
Share:

মহেশ্বর

দেবাদিদেব মহাদেব শিব যুগ-যুগান্তর ধরে সনাতন ধর্মের সাধনপীঠে বিরাজিত রয়েছেন। তিনিই সহস্রাধিক দিব্য নামে নিত্য বন্দিত হন আসমুদ্র হিমাচলের শত সহস্র দেবালয়ে ও ভক্তদের হৃদয়মন্দিরে। সনাতন হিন্দু ধর্ম একেশ্বরবাদী হলেও সত্যদ্রষ্টা মুনিঋষিগণ তাঁদের হৃদয়বেদিতে অভিষিক্ত করেছেন বিভিন্ন সাকার বিগ্রহে কিংবা লিঙ্গমূর্তিতে। উপনিষদে তাঁকে বলা হয়েছে ‘শান্তং শিবং অদ্বৈতম্‌’ অর্থাৎ নির্বিকার অদ্বিতীয় শিব চৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মা) রূপে, আবার সশক্তিকে প্রকাশে বর্ণিত করা হয়েছে, ‘তমীশ্বরানাং পরমং মহেশ্বরং, তং দেবতানাং পরমং চ দৈবতম্‌’’ পরমদেবতারূপে। প্রকৃতপক্ষে ‘শিব’ শব্দটি হল পরমমঙ্গলের পরিচায়ক। তিনিই আবার সর্বসংহারকারী ধ্বংসের দেবতা রুদ্ররূপেও বন্দিত হয়েছেন বেদ-উপনিষদে।

শিবের এক হাজার আট নামের মধ্যে রুদ্র নামটি বিশেষ নিরিখে মানুষই অভিহিত করেছে। মানুষ যখন বাঁচার তাগিদে অরণ্যে বা পার্বত্য অঞ্চলে দাবানল, নদীতটে বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, কিংবা সমতলে অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে মোকাবিলা করত, সেই ভয় ও ত্রাসের মধ্যে তাদের মনে প্রকটিত হয়েছে এক সংহারকারী সর্বশক্তিমান মহামানবের অস্তিত্বের বোধ। সেই অভিজ্ঞতার নিরিখেই মানুষ তাঁকে অভিহিত করেছে ‘রুদ্র’ নামে।

যজুর্বেদের মহীধর ভাষ্যে আছে, ‘‘যিনি সত্যনিষ্ঠকে জ্ঞানদান করেন, কিন্তু পাপীগণকে দুঃখভোগের মাধ্যমে ক্রন্দন করান, তিনিই রুদ্র।’’ রবণং রুৎ জ্ঞানং... রোদয়তি রুদ্রঃ’’। মানুষ তখনই বিশেষ অনুভূতি দ্বারা প্রত্যক্ষ করেছে, অলক্ষ্যে বিরাজমান এক নিষ্ঠুর ভয়ংকর দেবতাকে। যাকে তুষ্ট করলে আধিদৈবিক দুর্যোগগুলি থেকে রক্ষা পাওয়া হয়তো সম্ভব হত। কিন্তু চেতনার ক্রমবিকাশে, পরিণত মননে ক্রমে তাঁরা অনুভব করেছে এই অদৃশ্য সত্তার আর একটি পরিচয়ও আছে। ধ্বংসেরই অদৃষ্ট নিয়ন্তার কর্মধারার বাহ্যিক প্রকাশের অন্তরালেই রয়েছে নতুন সৃষ্টির উদ্বোধন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ ধ্বংসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সৃষ্টির বীজ।

প্রলয়ান্তে যে নবীন সৃষ্টির ধারা, সেটি তো ধ্বংসের মধ্য দিয়েই উন্মিষিত হয়। সুতরাং, ধ্বংস ও সৃষ্টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রলয়ের উৎস যিনি, সৃষ্টির উৎসও অলক্ষ্যে অবশ্যই তিনি। তাই পালনও তাঁর দ্বারাই হয়ে থাকে। কারণ সৃষ্ট বস্তু মাত্রই যেমন আপাতভাবে তাঁর দ্বারাই পালিত হচ্ছে, তেমনই প্রকৃতপক্ষে সময়ের মাত্রা ধরে সেটিও ধ্বংসের দিকেই ক্রমশ এগিয়ে যায়। কোনও বস্তু সৃষ্ট হলেও তার ক্ষয় হওয়াটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। তাই সৃষ্টিকর্তা, পালন কর্তা ও লয়কর্তাকে আলাদা করা যায় না। তাই তাঁর রূপের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ব্রহ্মা বিষ্ণু ও মহেশ্বর।

মহাভারতে যেমন তাঁর সৌম্য শান্তরূপের বর্ণনা আছে, তেমনই আছে উগ্ররূপেরও। সৌম্যরূপের বর্ণনায় আছে, তিনি চন্দ্রশোভিত জটাযুক্ত প্রসন্নবদন, মৃগচর্মে বস্ত্রাবৃত অভয়প্রদানকারী। কথিত আছে রুদ্রের এই উগ্ররূপটি দেখেছিলেন একমাত্র অশ্বত্থামা। গভীর রাতে ঘুমন্ত পঞ্চপাণ্ডবকে হত্যা করার জন্য তিনি যখন পাণ্ডবদের শিবিরদ্বারে কাপুরুষের মতো উপস্থিত হয়েছিলেন তখন তিনি এক অতিকায় ভয়ানক দেবমূর্তিকে দণ্ডায়মান দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলেন। সেই অতিকায় তীব্র দীপ্তি-সমন্বিত পুরুষের পরিধানে ছিল রক্তাক্ত ব্যাঘ্রচর্ম, কৃষ্ণাজিন ও কণ্ঠে নাগোপবীত। তাঁর দেহাঙ্গ অগ্নিমুখ সর্প দ্বারা বেষ্টিত ছিল। মহাভারতে বলা হয়েছে, বিগ্রহ নির্মাণ করেই অশ্বত্থামা শিব পূজা করতেন। সুতরাং মহাভারতীয় যুগ থেকেই মূর্তি গড়ে শিবপুজোর প্রচলন ছিল। অশ্বত্থামার পূজিত শিববিগ্রহ হলেন ‘পঞ্চানন’।
সাকাররূপে শিবের পঞ্চানন বিগ্রহের ধ্যানমন্ত্রে আছে, ‘‘পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রং’’। শিবের এই পাঁচটি মুখের নাম উল্লিখিত রয়েছে তৈত্তিরীয় আরণ্যকে। এই নামগুলি হল—সদ্যোজাত, বামদেব, অঘোর, তৎপুরুষ ও ঈশান। নির্বাণতন্ত্রের মতে, ‘সদ্যোজাত’ মুখটি শুদ্ধ স্ফটিকের মতো শুক্লবর্ণ—সেটি পশ্চিমে, ‘বামদেব’ পীতবর্ণ সৌম্য মনোহর—সেটি উত্তরে, ‘অঘোর’ কৃষ্ণবর্ণ ভয়ংকর—সেটি দক্ষিণে; ‘তৎপুরুষ’ রক্তবর্ণ দিব্য মনোরম—সেটি পূর্বে; এবং ‘ঈশান’ শ্যামল সর্বদেব-স্বরূপ শিব সেটি ঊর্ধ্বে। কথিত আছে, শিবের এই পঞ্চমুখ থেকেই ২৮টি আগম (তন্ত্র) রচিত হয়েছে।

কুলার্ণবতন্ত্রে বলা হয়েছে, স্বয়ং শিবের পঞ্চমুখ থেকে ‘পঞ্চ আম্নায়’ [চতুর্বেদ ও আয়ুর্বেদ (ভেষজ বিদ্যা)] প্রকাশিত হয়েছে। কালক্রমে অগ্নি ও ডমরুধারী প্রলয়নৃত্যরত নটরাজরূপী শিবের অভিব্যক্তিকে আশ্রয় করে বিকশিত হয়েছে নান্দনিক শিল্পের বহুমুখী প্রসার। বস্তুত ভারতীয় সংস্কৃতিতে নৃত্য, গীত ও বাদ্যচর্চার সুমহান ঐতিহ্যের মূলে রয়েছে শৈব-সংস্কৃতির ভূমিকা।
শুধু পঞ্চানন, রুদ্র বা শিবরূপেই নয়, বিভিন্ন মূর্তিতে এবং বিভিন্ন নামে যুগ যুগ ধরে তিনি আরাধিত। কিন্তু তাঁর যে প্রতীকী রূপটি পুরাকাল থেকে মহাপূজ্যরূপে সমাদূত, সেটি হল তাঁর লিঙ্গরূপ। শাস্ত্রবচনে লিঙ্গের সংজ্ঞায় আছে—‘‘লীয়তে গম্যতে যত্র যেন সর্বং চরাচরম্‌। তদেব লিঙ্গং ইত্যুক্তং লিঙ্গ তত্ত্ব পরায়ণৈঃ।।’’ অর্থাৎ, নিখিল বিশ্ব চরাচর যাঁকে আশ্রয় করে উদ্ভূত হয়ে ক্রিয়াশীল হয় এবং শেষে যাঁর মধ্যে লীন হয়ে যায় সেই অস্তিত্বই ‘লিঙ্গ’। আবার ‘‘যস্মিন সর্বাণি ভূতানি লীয়ন্তে বুদ্বুদাইব।’’ সমুদ্রে যেমন উত্তাল ঢেউয়ে বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়ে পরক্ষণেই আবার সেখানেই লয় প্রাপ্ত হয়, তেমনই সবই ব্যাপ্তিস্বরূপ শিব-অস্তিত্বের মধ্যেই উৎপন্ন হয়ে আবার সেইখানেই লয়প্রাপ্ত হয়। তাই সর্বভূতের সৃষ্টি ও লয়স্থানরূপে লিঙ্গপ্রতীকে শিব আরাধিত হন।

প্রধানত দুই রূপে শিবলিঙ্গের প্রকাশ ঘটে থাকে। প্রথমটি প্রকৃতিজাত ‘স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ’ যা পৃথিবীর ভূমি ভেদ করে উত্থিত। অপরটি মনুষ্য দ্বারা নির্মিত ধাতব, প্রস্তর কিংবা মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্ট লিঙ্গ। এই দুটি ছাড়াও বাণলিঙ্গ এবং পঞ্চভূতাত্মক লিঙ্গ আছে; তেমন ক্ষিতিলিঙ্গ (শর্ব), জললিঙ্গ (ভব), অগ্নিলিঙ্গ (রুদ্র), বায়ুলিঙ্গ (উগ্র) ও আকাশলিঙ্গ (ভীম)। প্রতিটি শিবলিঙ্গেরই একটি পীঠিকা বা ‘আসন’ থাকে। স্কন্দপুরাণে আছে, -- ‘‘আকাশং লিঙ্গ নিত্যাহুঃ। পৃথিবী তস্য পীঠিকা।’’ অর্থাৎ আকাশও একটি লিঙ্গ যার পীঠিকা পৃথিবীই। বস্তুত স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ মাত্রেরই আসন বা পীঠিকা এই পৃথিবী। মানুষের দ্বারা নির্মিত লিঙ্গগুলির পীঠ উত্তরমুখী করে স্থাপিত হয়। এই পীঠিকাকে গৌরীপীঠ বা গৌরীপট্টও বলা হয়। এই পঞ্চতত্ত্ব লিঙ্গ অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ্‌, তেজ, মরুৎ, ব্যোম এই পঞ্চভূতের নামে পাঁচটি শিবলিঙ্গ দক্ষিণ ভারতের পাঁচটি তীর্থে আছে।

ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠেও পঞ্চতত্ত্বের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ঠাকুরের কথায়, অখণ্ড তত্ত্ব যদি হন অগ্নি, তাহলে আলো হল তাঁর চৈতন্য আর দহনক্ষমতা হল তাঁর শক্তি। তিনি যদি হন সাগর, তবে জল হল তাঁর চৈতন্যস্বরূপ আর ঢেউরূপে প্রবহমানতা হল তাঁর শক্তি-পরিচয়। এই অখণ্ডসত্তা চৈতন্যরূপে যেমন সর্বশক্তিমান, তেমনই শক্তিরূপে চৈতন্যস্বরূপিণী। অর্থাৎ চৈতন্য ও শক্তি অভেদ। একক অদ্বিতীয় অখণ্ড সত্তার নিত্য স্থিতিশীল দিকটি যেমন ‘ব্রহ্মচৈতন্য’ বা শিবস্বরূপ, তেমনই নিত্যগতিশীল দিকটি ব্রহ্মশক্তি। এই হল অখণ্ড শক্তিব্রহ্মবাদ বা শিব-শক্তি তত্ত্বের মূলকথা।
আর ‘বাণলিঙ্গ’ হল ক্ষুদ্রাকার মসৃণগাত্রের শিলাপিণ্ড যা নর্মদা নদীতে পাওয়া যায়। শিবভক্ত বাণাসুরের নামে পরিচায়িত এই লিঙ্গ একাদশ প্রকারের হয়ে থাকে। এই বাণলিঙ্গগুলি প্রতিষ্ঠিত হয় তদুপযোগী আয়তনের ধাতব পীঠিকা নির্মাণ করে, যেটি শুধু পূজাকালেই ব্যবহার্য। এই প্রকৃতির বিস্ময় এই বাণলিঙ্গ সৃষ্টি হত ওঁকারেশ্বরের জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের অনতিদূরে নর্মদার কোলে ধাবরি কুণ্ডে। মামলেশ্বর বাঁধ নির্মাণের সময় এই প্রকৃতির বিস্ময় ধাবরি কুণ্ডটি বিনষ্ট হয়ে যায়। সেই থেকে বাণলিঙ্গের সৃষ্টি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আর মৃত্তিকানির্মিত শিবলিঙ্গ প্রতিবার পূজাকালে নির্মাণ করে পূজান্তে বিসর্জন দিয়ে দিতে হয়।

যে কোনও শিবলিঙ্গেরই তিনটি ভাগ থাকে। নিম্নাংশকে ‘ব্রহ্মা-পীঠ’, মধ্যেরটিকে ‘বিষ্ণু-পিঠ’ এবং উপরিভাগটিকে ‘শিব-পীঠ’ নামে পরিচিত। লিঙ্গরূপী মহাদেবকে কেন্দ্র করে চতুর্দিকের একশত হস্ত পরিমিত স্থানকে ‘শিবক্ষেত্র’ রূপে গণ্য করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভারতভূমির বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত স্বয়ম্ভূ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গকে বিশেষ ‘শিবক্ষেত্র’ রূপে মহাতীর্থ মর্যাদায় মান্য করা হয়। তার মধ্যে সমুদ্রতীরে দুটি (সোমনাথ, রামেশ্বর), নদীতীরে তিনটি (বিশ্বেশ্বর, ত্র্যম্ব঩কেশ্বর, মহাকাল), পর্বতে চারটি (কেদারনাথ, মল্লিকার্জুন, ওংকারেশ্বর বা অমলেশ্বর, ভীমাশঙ্কর) এবং সমতলে তিনটি (বৈদ্যনাথ, ঘৃষ্ণেশ্বর ও নাগেশ্বর) জ্যোতির্লিঙ্গ বিরাজমান। এছাড়াও হিমালয়ের গহনে রয়েছে পঞ্চকেদার শিব।

এই জগৎরূপটি দশাগতভাবে নিত্য পরিবর্তনশীল প্রকাশের হলেও এটির আধাররূপ চৈতন্যস্বরূপের কোনও পরিবর্তন নেই। জাগতিক প্রকাশগত ভাবে যে ভেদমূলক অনন্ত নামরূপ সবই সেই অরূপ সত্তারই অন্তর্গত আপেক্ষিক বিকাশপ্রবাহ। তিনিই এক এবং অদ্বিতীয়ম্‌। তিনিই আমাদের সৃষ্টি, রক্ষা, গড়ে তোলেন আবার প্রয়োজনে লয় করেন। তাঁর পুজোয় কোনও আড়ম্বর নেই। বেলপাতা, ধুতরো ফুল আর গঙ্গাজল। এতেই তিনি তুষ্ট।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

আসুন, জেনে নিই - দেবীর আশা-যাওয়ার নেপথ্যে

বাংলা সন ১৪২৪ বা ইং সন ২০১৭........ এই বৎসর মহামায়ার আগমন নৌকায় - ফলম্ শস্যবৃদ্ধিস্তথাজলম্।।
মহামায়ার গমন - ঘোটক - ফলম্ - ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে।।
.

আসুন, জেনে নিই - দেবীর আশা-যাওয়ার নেপথ্যে
===================================
প্রতি বছর গজ, ঘোটক, নৌকা, দোলা এইসব যানবাহন করে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আসা ও যাওয়ার সময় শুভ, অশুভ, ক্ষয়ক্ষতি ও নানাভাবে মানুষের মৃত্যুসংবাদও শোনা যায়। পুরাকালের মুনি, ঋষি ও পণ্ডিতেরাও একসময় ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছিলেন, মায়ের আগমন ও গমন এবং পুজোর সময়ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মৃত্যু, ধ্বংস-এই সমস্ত অশুভ ঘটনার কারণ কী? তাঁরা আরও ভেবেছিলেন যে, শুভ ঘটনার চেয়ে অশুভ ঘটনার প্রাধান্যই বা কেন থাকে, তাছাড়াও দেব-দেবীরা এই ব্যাপারে নীরব কেন --- ভাবনা চিন্তার পর তাঁরা ঠিক করলেন, পুজোর আগে, পুজোর সময় ও দুর্গার গমনের সময় সজাগ দৃষ্টি রাখবেন। 

যথাসময়ে তাঁদের দিব্যদৃষ্টিতে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে সবকিছু। ঘটনার গতি-প্রকৃতির অর্থাৎ দেবীর আগমন, গমন ও পুজোর সময় যে সব ঘটনা ঘটছে তা উপলব্ধি করে পারস্পরিক আলোচনায় দিন, তিথি ও নক্ষত্রের দিকে সন্দেহের আঙুল তুলে তাদের দোষী সাব্যস্ত করলেন। কিন্তু তাঁদের একথাও মনে হলো যে, এই তিথি, নক্ষত্র ও দিন এত শক্তি কোথা থেকে পেলো। আবার চলল অনুসন্ধান। এবার তাঁরা জানতে পারলেন যে, দেব-দেবীরাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখার জন্যেই এই সব তিথি-নক্ষত্রকে বিশেষভাবে শক্তিশালী করে তাঁদের পাহারাদারে নিযুক্ত করেছিলেন।
দেব-দেবীর দাপট বা শক্তি যতই থাকুক না কেন, দিন, তিথি ও নক্ষত্রের কর্তৃত্বকে এঁরা কেউই অস্বীকার করতে পারেননি কারণ এই তিন শক্তিকে তো দেবতারাই সৃষ্টি করেছেন।

আসলে শিল্প ও বাণিজ্য সংস্থার মতো দেব-দেবীরাও হিসেবের খাতায় সমতা রাখার জন্যে সৃষ্টি ও লয় এই দুটো অঙ্ককে মাথায় রেখেছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন, সৃষ্টিপ্রাপ্তদের সংখ্যাকে ক্রমশই বাড়তে দিলে, মহাপ্রলয়ের সূচনা হবে, তাই ধ্বংসের প্রয়োজন আছে। লয়কে সৃষ্টি করার জন্যে বন্যা, ভূমিকম্প, মহামারি ইত্যাদির দ্বারা তাকে শক্তিশালীও করা হয়েছিল। অবশ্য দেবর্ষি নারদের কাছ থেকে এই সংবাদ পেয়ে, মুনি-ঋষি ও পণ্ডিতেরা বুঝেছিলেন দুর্গতিনাশিনী দেবী প্রয়োজনবোধে কেন ধ্বংসকারিণী রূপে আবির্ভূতা হন। এই সমস্ত প্রকৃত তথ্য উন্মোচন হবার পর, মুনি-ঋষি ও পণ্ডিতেরা বিষয়টাকে বিধিবাক্য ও শাস্ত্রমতে চিহ্নিত করেছিলেন। অর্থাৎ দুর্গার আগমন ও গমনে যে বিপর্যয় ঘটে, সেই নিয়ে তাঁদের মনে আর সংশয় রইল না বলে আদি অনন্তকাল ধরে সেই নিয়মই চলে আসছে। জ্যেতিষীরা এই ব্যাপারটিকে ‘সিম্বলিক, বা প্রতীকি রূপে ব্যাখ্যা করেছেন। ভাগ্যগণনার সময় মানুষের ভাগ্যচক্রে তিথি, নক্ষত্র, দিন ও জন্মসময় ইত্যাদির বিষয়ে লক্ষ্য রেখে তাঁরা মানুষের জীবনে শুভ, অশুভ, শোক, দুঃখ ও আনন্দের ব্যাপারটাকে মেনে নিয়েছেন। তাই জন্মসময়, দিন ও গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির ওপর তাকিয়েই জ্যোতিষীরা কোষ্ঠী বিচার ও হাতে প্রতীকি ও অন্যান্য চিহ্ন দেখেই সার্বিক ভাগ্যচক্রের উত্থান, পতন, আয়ু, স্বাস্থ্য ইত্যাদির কথা বিচার করে থাকেন।

পৌরাণিক যুগে গজ, ঘোটক, নৌকো এবং দোলার ব্যবহার আমরা জেনেছি এবং পুরাকালেও মানুষ এই যানবাহনই প্রয়োজনবোধে কাজে লাগাতেন। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, চার যানবাহনের মধ্যে গজকেই বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়ে শুভ যাত্রার প্রতীক বলে চিহ্নিত করা হলো কেন।

আসলে পৌরাণিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত দেখা গেছে যে, গজ গোড়া থেকেই বিশেষ সম্মানীয় জায়গায় নিজের স্থান করে নিয়েছে। দেব-দেবী ছাড়াও রাজা, মহারাজা, জমিদারদের কাছেও “গজ” রাজকীয় মর্যাদা পেয়েছে। হয়তো তাই দেবী দুর্গার গজে আগমন ও গমনকে কেন্দ্র করে বলা হয়েছে-“গজে চ জলদা দেবী শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা।” অর্থাৎ এই আগমন ও গমনে বসুন্ধরা শস্যপূর্ণ হয়ে মানুষকে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্যে ভরিয়ে তুলবে। 

অন্যদিকে ঘোটক দেব-দেবী ও মানুষের কাজে ব্যবহৃত হলেও গজের মতো মর্যাদা না দিয়ে ঘোটকে মায়ের আগমন ও গমন নিয়ে বলা হয়েছে-“ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে”। অর্থাৎ ঘোটকে আগমন ও গমনে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংসারিক ক্ষেত্রেও অস্থিরতা প্রকাশ পাবে। যেমন, রাজনৈতিক উত্থান, পতন, সামাজিক স্তরে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ, দুর্ঘটনা, অপমৃত্যু ইত্যাদির প্রভাব বাড়বে। আবার নৌকায় আগমন ও গমনে বলা হয়েছে শস্যবৃদ্ধিস্তুথাজলম। এ ক্ষেত্রে প্রবল বন্যা, ঝড়, অতিবৃষ্টি ইত্যাদির জন্যে একদিকে প্লাবন ও ক্ষয়ক্ষতি এবং অন্যদিকে দ্বিগুণ শস্যবৃদ্ধি। এর মধ্যে ‘দোলায়’ আগমন ও গমন সবচেয়ে অশুভ। তাই দোলা সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, দোলায়াং মরকং ভবেৎ। মহামারি, ভূমিকম্প, যুদ্ধ, মন্বন্তর, খরা ইত্যাদির প্রভাবে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু তো ঘটাবেই, আবার সেই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতিও হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, একমাত্র গজ ছাড়া দেবী দুর্গার অন্য তিন যানবাহনের মাধ্যমে ধ্বংস বা লয়কে ব্যবহার করা হয়েছে। শুধুমাত্র গজই প্রয়োজনমতো বৃষ্টিধারায় বসুন্ধরাকে ধন-ধান্যে সমৃদ্ধ করে তুলবে।

এই প্রসঙ্গে কোন দিনে আগমন ও গমনে কি যানবাবন ব্যবহার করা হবে সেই ব্যাপারে বলা হয়েছে-“রবৌ চন্দ্রে গজারূঢ়া, ঘোটকে শনি ভৌময়োঃ, গুরৌ শুক্রে চ দোলায়াং নৌকায়াং বুধবাসরে।” সপ্তমীর দিনে যদি রবিবার এবং সোমবার হয়, তাহলে দুর্গার আগমন ও গমন হবে গজে। ফল-“গজে চ জলদা দেবী শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা”। 
ঠিক এই রকমই শনিবার ও মঙ্গলবারে দুর্গার আগমন ও গমন হলে, ঘোটকের প্রভাব থাকবে। অর্থাৎ ফল-“ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে”। যদি বুধবারে দেবী দুর্গার আগমন ও গমন হয়, তাহলে তিনি আসবেন এবং যাবেন নৌকায়। ফল-“শস্যবৃদ্ধিস্তুথাজলম”। 

আবার দুর্গার আগমন ও গমন যদি বৃহস্পতি ও শুক্রবারে হয় তাহলে তিনি দোলায় আসবেন এবং যাবেন। ফল-“দোলায়াং মরকং ভবেৎ”।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী

বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষ মুখার্জীর সুযোগ্য সন্তান ছিলেন ভারতকেশরী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। তিনি একধারে যেমন ছিলেন রাজনেতিক আর এক দিকে ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, তিনি ভারতের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ সংস্থার সভাপতি, সদস্য, চেয়ারম্যান হিসাবেও ছিলেন। তিনি যেমন রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ ছিলেন তদ্রূপ ছিলেন একনিষ্ঠ সমাজ, ধর্ম, সাহিত্য সেবক ছিলেন।

ডঃ মুখার্জীর জীবনের সবথেকে বড় অবদান হল, যা অকৃতজ্ঞ বাঙালীরা অবহেলার চোখে ফেলে রেখেছে, সেটা হল পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্থানের কবল থেকে বাঁচিয়ে আনা। যখন ইংরাজ চক্রান্ত , মুসলিম লীগের চক্রান্ত এবং জাতীয় নেতাদের গদীর লোভের বসে ভারত বিভাজন হচ্ছে। জিন্নার পাকিস্থান দাবিতে সকলেই যখন নতি স্বীকার করে নিয়েছিল, যেই সময় ১৯৪১ গান্ধীজী নির্দেশ দিয়েছিলেন যে বাংলার জনগণ যাতে জনগনণায় অংশ গ্রহণ না করেন, অথচ মুসলিম লীগের নির্দেশ ছিল যে বাংলার প্রতিটি মুসলিম নাগরিক যাতে জনগননায় অংশ নেয়, তখন ডাঃ মুখার্জী বিপদের আঁচ পেয়ে বাংলার নেতাদের বুঝানোর চেষ্টাও করেছিলেন কিন্তু ঐ সকল কথা বুঝেও গদীর লোভের বসে সকলে মুখ বন্ধ রাখলেন, ফলস্বরূপ বিপদের আঁচ সত্যতাই প্রকাশ পেলো।

মুসলিম জনসংখ্যা ৫৮% হল , আর ফলে বাংলার বিভাজন নিয়ে আগুন আরও তীব্র হয়ে উঠলো। শুরু হল বৃহত্তর পাকিস্থানের পরিকল্পনা। কিন্তু ডঃ মুখার্জী থামবার পাত্র ছিলেন না তিনি বাংলার সকল জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যা তথ্য দেখিয়ে দাবী করলেন -- “যদি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্থানে যাবে তা হলে বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্থানে কেন যাবে”? তিনি তীব্র বিরোধ শুরু করলেন, তাঁর যুক্তিকে তৎকালীন ইংরাজ সরকারও অস্বীকার করতে পারেনি। আর এরই ফলস্বরূপ আজ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্গত। অথচ পশ্চিমবঙ্গের এই স্রষ্টা কে অনেকই চেনেন না, আর যারা জানে তারা তারা এই সত্যকে অস্বীকার করে।

ডঃ মুখার্জীর ১৯৫২ সনে দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্রর থেকে সংসদে নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ভারতের জাতীয়তাবাদী খন্ডতার প্রতীক, তাই তিনি কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা সম্পর্কে বলেছিলেন “"Ek desh mein do Vidhan, do Pradhan aur Do Nishan nahi challenge"।

তিনি ১৯৫৩ সনে কাশ্মীরের উদ্দেশে রওনা দেন, কিন্তু ভারত থেকে কাশ্মীরে প্রবেশ করার আদেশ না থাকার অপরাধের জন্য তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেখ্ আব্দুলার নির্দেশে ডঃ মুখার্জীকে ১১ মে ১৯৫৩ সনে গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে তাঁর শারীরিক আসুস্থতার জন্য তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। শোনা যায়, সেখানে তাঁর বারন করা সত্বেও তাঁর উপর ভুল ইঞ্জেক্সন দেওয়া হয়েছিলো। তার ফলে ভুল চিকিৎসা বা বিনা চিকিৎসার কারনে ও অন্য কিছু অজানা কারনে রহস্যময় পরিস্থিতিতে ডঃ মুখার্জীর মৃত্যু ঘটে।

পুলিশি হেফাজতে তাঁর মৃত্যু সারা দেশে ব্যাপক সন্দেহ উত্থাপিত হয় ও স্বাধীন তদন্তের জন্য দাবী করে ডঃ মুখার্জীর মা যোগমায়া দেবী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু কে আন্তরিকভাবে অনুরোধও করেন। কিন্তু যোগমায়া দেবীর দাবি বা অনুরোধ নেহরু গ্রহণ করেনি এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করার প্রয়োজন মনে করেনি। তাই এ কথা বলা যেতে পারে নেহেরুর উপেক্ষা এবং কোন তদন্ত কমিশন গঠন না করার ফলে মুখার্জীর 'রহস্যময় মৃত্যু' বিতর্কের একটি বিষয় রয়ে যায়।
-
ভারতকেশরী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর 'রহস্যময় মৃত্যু' বিষয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মাননীয় অটলবিহারী বাজপেয়ী বলেন -- [2004] - "Death of Dr.SP Mookherji was a "Nehru Conspiracy".
-
শ্রদ্ধেয় লালকৃষ্ণ আদবানী বলেন -- [2011] - "Death of SP.Mookherji is still a Mystery.No Enquiry was conducted".

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

শ্বেতকালী

হূগলীর আটপুরের ৬ কিমি দূরে রাজবলহাট গ্রামে নানান কিংবদন্তিতে ঘেরা চতুর্ভুজা মৃন্ময়ী দেবী রাজবল্লভীর মন্দির, মায়ের মাহাত্ম্য অবর্ণনীয়। অপরূপা এই দেবীর বামহস্তে রুধির পাত্র, দক্ষিণহস্তে ছুরি। দণ্ডায়মান দেবীর এক পা ভৈরবের বুকে অপর পা বিরূপাক্ষ টেরাকোটায় সমৃদ্ধ মন্দির। এছাড়া মাঠের মাঝে ১৭৪৪ এ তৈরি আটচালা রাধাকান্ত ছাড়াও মন্দির রয়েছে আরও নানান রাজবলহাটে। আর আছে অমূল্য প্রত্নশালা। কবি হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের জন্মভূমি রাজবলহাটে।

মা অধিষ্ঠিতা শ্বেতকালী রূপে, পূজিতা দূর্গারূপে। এই মূর্তীর গড়ন, গঠন ভূবন ছাড়া। অার মূর্তীর বৈচিত্র্য একাধিক। প্রমাণ অাকারের নারী দাঁডিয়ে অাছেন, দ্বিভজা, স্বর্ণ বরণা, ডান হাতে ছোট খডগ। বাম হাতে নর কপাল। ডান পা মহাকালের বুকে বা পা বিরুপাক্ষ ভৈরবের মাথায়। কোমরে ছোট ছোট কাটা হাতের মালা। গলায় ঘণ্টা মালা। শাড়ি পরিহিতা দেবী রাজবল্লভী, যার নামে একটা গোটা গ্রাম রাজবলহাট।

গোটা অঞ্চলের মানুষ দিন শুরু করেন মায়ের নামে। সম্ভবত এ পূজোর সময়কাল দিল্লীশ্বর হুমায়ুনের অামল। অখণ্ড বাংলার গৌড়ে তখন পাঠানদের বাহুবল। চার চক চোদ্দ পাড়া তিন ঘাট এ নিয়ে রাজবলহাট। হুগলি জেলার এই গ্রামে পূজো হয় তেরোটা। একটা পাড়ায় শুধু মূসলমানদের বাস।

শুধু দুর্গাপূজো নয়, নিত্যদিন দেবী রাজবল্লভীর দর্শন এবং পূজোর জন্য নানা জেলা. শহর কলকাতা থেকেও যাত্রীরা অাসেন। ইংরেজ অামলে রেভিনিউ সংগ্রহের জন্য বাংলাকে নানা পরগনায় ভাগ করা হয়েছিল। রেনেল সাহেবের ম্যাপে এই ডিহি.ভরসূট পরগনার উল্লেখ পাবেন। খুব সমদ্ধ ছিল এ গ্রাম। তবে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও এখনও হারাননি রাজবল্লভী মা। ভরসূট পরগনার প্রতিষ্ঠাতা সদানন্দ রায়। ফলে ইতিহাসের বিচারে এ পূজোর বয়স অন্তত চারশো বছর। এক সময় এ জনপদে জলপথই ছিল প্রধান পথ। সে পথেই কৃষি ফসল প্রধানত ধান, সবজী, পাট, তুলো এবং বিখ্যাত ভরসূটের তামাক নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ত। এখন ও সব নেই। তবে রয়ে গিয়েছে রাজবলহাট গ্রামের বিখ্যাত শাড়ী। রাজবল্লভী দেবী এখানের তন্ত্তুবায়ীদের বোনা শাড়ী পরেন এখনও। রাত্রে শয়নে যাওয়ার অাগে দেবীর জন্য তামাক সেজে গড়গড়ার নলটি মুখের কাছে দেওয়া হয়।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

ঈশ্বর ও আত্মা

হিন্দু ধর্মে 'আত্মা' বুঝতে হলে প্রথমেই এর ঈশ্বরবাদ বুঝতে হবে, ঈশ্বর কয়জন, প্রথমেই এই প্রশ্নের উত্তর জেনে হিন্দু ধর্মে প্রবেশ করতে হবে। কারণ কেউ যদি না জানে যে ঈশ্বর কয়জন ও কি তবে ভক্তি অর্চনা করবে কাকে?
পরমাত্মা বা পরমব্রহ্ম হচ্ছেন সেই ঈশ্বর যিনি সৃষ্টির আদি হতে অন্ত পর্যন্ত আছেন এবং থাকবেন এবং তিনিই প্রকৃত আরাধ্য। ঈশ্বর, পরমাত্মা বা পরমব্রহ্ম হচ্ছেন নিরাকার, কিন্তু তিনি চাইলেই যে কোন সাকার রুপ ধারণ করতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণকে সেই পরমব্রহ্মের এক সাকার রূপ ধরা হয় এবং পরমেশ্বর মানা হয়। এখন কেউ যদি বলেন শ্রীকৃষ্ণ না শিবই আমার কাছে পরমেশ্বর তাতেও ভুল নেই কারণ তিনি যাঁকেই ডাকুন না কেন, সেই পরেমশ্বর কেই ভজনা করছেন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে কৃষ্ণ বড় নাকি শিব বড়। ব্রক্ষ্মবৈবর্ত পুরাণের সৃষ্টিখন্ডে ঈশ্বর শিবকে বলছেন -- "যে তোমার ও আমার মাঝে বিভেদ করবে তার মত পাপী আর পৃথিবীতে নেই"।
মূল কথা হচ্ছে ঈশ্বর একজন তিনি নিরাকার বা সাকার, আমরা যাকেই ভক্তি বা পূজা করিনা কেন তা সেই ঈশ্বরকেই করা হয়। আমারা বিভিন্ন রুপের মূর্ত্তিকে পুজা করি তা কিন্তু ঈশ্বর থেকে আলাদা মনে করে না, মূর্ত্তির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকেই পূজা করা হয়। ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপ কল্পনা করে আমরা পূজা করেলেও ঈশ্বর কিন্তু সেই একজনই। অনেকে প্রশ্ন করেন ভাত সোজা করে না খেয়ে এত ঘুরিয়ে খাও কেন?

গীতায় ঈশ্বর বলেছেন -- "যে আমাকে যেভাবে ডাকবে আমি তাকে সেভাবেই ফলদান করব"। হিন্দু ধর্ম যে কতটা উদার তার প্রমাণ এখানেই পাওয়া যায়। আমি যেভাবে, যেরুপে তাকে ডাকব তিনি সেভাবেই আসবেন তা সে ৩৩ কোটির যে কোন একটা হোক না কেন।

আমাদের দেহে যে আত্মা আছে, তা সকল ধর্মেই বিশ্বাস করে। ঈশ্বর হচ্ছেন সকল আত্মার উৎস অর্থাৎ পরমাত্মা। আর প্রতিটি জীবের শরীরে যে আত্মা আছে তা হচ্ছে জীবাত্মা। সকল ধর্ম কর্মের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবাত্মা পরমাত্মার সাথে লীন হওয়া অর্থাৎ পৃথিবী থেকে মুক্ত হওয়া। পুরষ্কার অথবা শাস্তির শেষ আছে, মানে ভাল কাজের জন্য স্বর্গভোগ আর খারাপ কাজের জন্য নরকভোগ আছে। কর্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করতে হয়, দুই টাকায় ভালো করে ১০ টাকার মিষ্টি খাবেন তা হবে না। পাকা হিসাবে যতটুকু ভাল ততটুকুই মিষ্টি। কিন্তু প্রধান উদ্দেশ্য কিন্তু স্বর্গ নয় সেই পরমাত্মার সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া, এর আর কোন শেষ নেই।

আত্মার কোন ধ্বংস বা শেষ নেই। এটা এক দেহ হতে অন্য দেহে গমন করে মাত্র। দেহের পরিবর্তন হয়, শিশু হতে কিশোর আবার কিশোর হতে যুবক, কিন্তু আত্মার পরিবর্তন নেই। গীতা অনুযায়ী মানুষ যেমন পুরাতন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে তেমনি আত্মা ও পুরাতন জীর্ন শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীরে গমন করে। একটু আধুনিক ভাবে বলা যায়, দেহ হচ্ছে প্রোগ্রাম করা কোন যন্ত্র আর আত্মা হচ্ছে এর ব্যাটারী যখন এই দুই একত্রিত হবে তখনই যন্ত্র সচল হবে এখানে ব্যাটারী দিয়ে কথা তা যে যন্ত্র বা শরীরে সেট করা হোক না কেন, এর চালনা শক্তি থাকলেই চলে।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

গুরু তত্ত্ব ও গুরু মহিমা


বিভিন্ন শাস্ত্র গ্রন্থে গুরু তত্ত্ব ও গুরু মহিমা সম্বন্ধে যা যা বর্ণনা করা হয়েছে, তা সম্বন্ধে সংক্ষিপ্তভাবে বিবৃত হলো।
> রুদ্রযামলে –
অনন্তর গুরু ও শিষ্যের কর্ত্তাব্যাকর্ত্তব্য কথিত হইতেছে। – রুদ্রযামলে কথিত আছে, যে, – কদাচ গুরুর আজ্ঞা লঙ্ঘন করিবে না এবং সহসা কোন বাক্যের প্রত্যুত্তর প্রদান করাও উচিত নহে। দিবানিশি দাসের ন্যায় গুরুর আজ্ঞা প্রতিপালন করিবে।।

> সারসংগ্রহে –
লিখিত আছে, যে, – সদ্ গুরু আশ্রিত শিষ্যকে একবৎসর পর্য্যন্ত পরীক্ষা করিয়া তৎপরে মন্ত্র প্রদান করিবে। কিন্তু স্বপ্নলব্ধ মন্ত্রে কালাকাল বিবেচনার আবশ্যক নাই। যেরূপ অমাত্যকৃত পাপ রাজায় এবং পত্নীকৃত পাপ পতিতে সংক্রান্ত হয়, তদ্রূপ গুরুও শিষ্যকৃত পাপে অভিভূত হইয়া থাকেন। এক বৎসরে ব্রাহ্মণ, দুই বৎসরে ক্ষত্রিয়, তিন বৎসরে বৈশ্য এবং চারি বৎসরে শূদ্রশিষ্য-যোগ্যতা প্রাপ্ত হয়।।

> তারাপ্রদীপে –
লিখিত আছে, যে, – মন্ত্রের অক্ষর সকলকে দেবতাস্বরূপ এবং সেই দেবতাকে গুরুস্বরূপ বিবেচনা করিবে, কদাচ তাহাদিগের ভেদজ্ঞান করিবে না ।।

> রুদ্রযামলে –
লিখিত আছে, যে, – যদি গুরুর দ্রব্য গ্রহণে অভিলাষ করে অথবা গুরুপত্নী গমন করে, তাহা হইলে সেই ব্যক্তি মহাপাতকে লিপ্ত হয়, কোনরূপ প্রায়শ্চিত্তে তাহার পাপের শান্তি হয় না। যে ব্যক্তি গুরুর নিন্দা শ্রবণ করে, তাহার সেই দিনকৃত পূজা দেবী গ্রহন করেন না।

> কুলার্ণবে –
কথিত আছে, যে, – যদি কোন স্থানে গুরুর নিন্দা শ্রুতিগোচর হয়, তাহা হইলে কর্ণদ্বয় আবৃত করিয়া তৎক্ষণাৎ তথা হইতে দূরে গমন করিবে, যেন আর সেই সকল দুর্বাক্য কর্ণগোচর হইতে না পারে।

> নিত্যানন্দে –
লিখিত আছে, যে, – মনুষ্যবৎ জ্ঞান করিবে না, যদি গুরুকে মনুষ্য বলিয়া জ্ঞান করা যায়, তাহা হইলে কি মন্ত্রজপ, কি পূজা কিছুতেই সিদ্ধিলাভের সম্ভাবনা নাই। যদি গুরু একগ্রামে অবস্থিতি করেন, তাহা হইলে শিষ্য প্রতিদিন ত্রিসন্ধ্যা তাঁহাকে প্রণাম করিবে, গুরু এক ক্রোশ দূরে অবস্থিত হইলে প্রতিদিন একবার তাঁহার নিকট গিয়া প্রণাম করিবে। গুরু অর্দ্ধযোজন দূরে থাকিলে শিষ্য পঞ্চ পর্ব্বে গিয়ে বন্দনা করিবে, যদি এক যোজন হইতে দ্বাদশ যোজন মধ্যে অবস্থিতি করেন, তাহা হইলে যোজনসংখ্যক মাসে গিয়া প্রণাম করিবে। যদি গুরুদেব অতি দূরদেশে থাকেন, তাহা হইলে প্রতি বর্ষে বর্ষে এক এক বার গিয়া শিষ্য তাঁহার চরণ বন্দনা করিবে।।

> যামলে –
জামলে লিখিত আছে, যে, – যে ব্যক্তি গুরুর নিন্দা করে, সে গতশ্রী ও গতায়ু হইয়া শতকোটি কল্প নরকে নিমগ্ন থাকে।।

> পুরশ্চরণরসোল্লাসে –
লিখিত আছে, যে, – গুরুকে সর্বদা শিবময় ভাবনা করিবে। গুরু পুত্রকে গণেশসদৃশ, বধূকে লক্ষ্মী ও সরস্বতী ন্যায় এবং গুরুর কুল ভৈরবগণ সদৃশ বিবেচনা করিতে হয়।

> বৃহন্নীলতন্ত্রে –
লিখিত আছে, যে, – গুরুর অভাবে গুরুপত্নীর অর্চ্চনা করিবে। তাঁহার অভাবে গুরুপুত্র, গুরুপুত্রের অভাবে গুরুকন্যা, গুরুকন্যার অভাবে গুরুস্নুষা এবং এই সকলের অভাবে গুরুবংশীয় অপরের পূজা করিবে। যদি তদ্ধংশীয়গণেরও অভাব হয়, তাহা হইলে গুরুর মাতামহ, মাতূল ও মাতুলানীর পূজা করিতে হয়।।

> গুরুগীতা –
লিখিত আছে, যে, – যে ব্যক্তি প্রতিদিন ভক্তিসহকারে গুরুর পাদোদক পান করেন, তিনি সার্দ্ধত্রিকোটি তীর্থের ফল প্রাপ্ত হন ।।
> গুপ্তসাধনতন্ত্রে –
কথিত আছে, যে, – যে ব্যক্তি ত্রিসন্ধ্যা গুরুর পাদোদক পান করেন, সংসাররূপ মোহপথে তাঁহাকে আর পুনরাগমন করিতে হয় না এবং যে ব্যক্তি ভক্তিসহকারে গুরুপাদোদক শিরোপরি ধারণ করেন, তিনি সর্ব্বতীর্থের ফল প্রাপ্ত হন ।।
> যোগিনীতন্ত্রে –
কথিত আছে, যে, – গুরুর উচ্ছিষ্ট ও গুরুপুত্রের উচ্ছিষ্ট ভক্তিসহকারে ভোজন করিবে, যদি তাহাতে ঘৃণা বোধ করে, তাহা হইলে অধোগতি প্রাপ্ত হয় ।।
> কুলার্ণবে –
লিখিত আছে, যে, – গুরুর পাদুকা, ছত্র, শয্যা ও ভূষণাদি দর্শন মাত্র নমস্কার করিবে, সেই সমস্ত দ্রব্য কদাচ নিজে ভোগ করিবে না ।।
> গুরুগীতা –
কথিত আছে, যে, – গুরু যেরূপ উপদেশ প্রদান করিবেন, তাহাতেই মনঃশুদ্ধি করিবে। গুরু সৎই বলুন আর অসৎই বলুন তাঁহার আজ্ঞা লঙ্ঘন করা উচিত নহে। গুরুর নিকট কদাচ মিথ্যা বাক্য প্রয়োগ করিবে না ।।
> পিচ্ছিলাতন্ত্রে –
লিখিত আছে, যে, – যে ব্যক্তি ধর্ম্মবিমোহিত হইয়া পৈতৃক কুরুকুল পরিত্যাগ করে, সেই ব্যক্তি যে পর্য্যন্ত চন্দ্রসূর্য ধরাতলে অবস্থিত থাকে, তাবৎ কাল ঘোর নরকে পতিত হয় ।
> জামলে –
লিখিত আছে, যে, – গুরু, গুরুপুত্র, গুরুপত্নী ও গুরুর বন্ধুগণের দোষ কদাচ প্রকাশ করিবে না; ইঁহাদিগের কোন দ্রব্য ভক্ষণ করা উচিত নহে। কিন্তু তাঁহারে আপন ইচ্ছানুসারে প্রদান করিলে তাহা ভক্ষণ করিতে পারে।।
> কুলাগমে –
লিখিত আছে, যে, – যদি পূজাকালে গুরু, গুরুপত্নী বাঁ গুরুপুত্র সমাগত হন, তাহা হইলে পূজা পরিত্যাগ পূর্ব্বক তাঁহাদিগেরই অর্চ্চনা করিবে; ইহাই শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত। সেই দিন শিষ্যের পক্ষে কোটি সূর্য্যগ্রহণের তুল্য। হে দেবি ! চন্দ্রগ্রহণ দিবসের ন্যায় সেই দিন শিষ্যের পক্ষে পরম শুভপ্রদ জানিবে।।
গুরুর দর্শনমাত্র সর্ব্বপাপ দূরীভূত হয়। হে দেবি ! গুরুকে দর্শন করিবা মাত্র তৎক্ষণাৎ দান করিবে। গুরুর প্রীতি সাধন হইলে দেবতার প্রীতি সাধন হয় এবং দেবতা সন্তুষ্ট হইলে মন্ত্র সিদ্ধি হইয়া থাকে।।
> মুন্ডমালাতন্ত্রে –
লিখিত আছে, যে, – গুরুর পূজা না করিয়া যে ব্যক্তি ইষ্টদেবতার অর্চ্চনা করে, ভৈরব স্বয়ং তাহার মন্ত্রের তেজ হরণ করেন।।
> রুদ্রযামলে –
লিখিত আছে, যে, -শিষ্য গুরুর সহিত কোন দ্রব্যের ক্রয় বিক্রয় বাঁ গুরুকে ঋণদান অথবা গুরুর নিকট হইতে ঋণ গ্রহণ করিবে না।।

Written by:Prithwish Ghosh
Share:

ভক্তিযোগের অনুশীলন কখনও ব্যর্থ হয় না এবং তার কোনও ক্ষয় নেই

শ্রীমৎ ভগবদ্গীতায় চারটি যোগের কথা বলা হয়েছে। ১.কর্মযোগ ২. জ্ঞানযোগ ৩. ধ্যানযোগ ৪. ভক্তিযোগ। কর্মযোগ,জ্ঞানযোগ এবং ধ্যানযোগের মাধ্যমে ভগবানকে আংশিক ভাবে জানা যায়। কিন্ত ভগবদ্গীতায় ভগবান বলেছেন- “ভক্ত্যা মামভিজানাতি” অথাৎ ভক্তির দ্বারাই ভগবানকে পূর্ণরূপে জানা যায়। তাই ভক্তিযোগই হচ্ছে ভগবানকে লাভ করার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা।
নীচে ভক্তির নয়টি পন্থা অনুশীলন করে ভগবানকে লাভ করেছেন তাঁদের দৃষ্টান্ত দেওয়া হল --

১. শ্রবণঃ- মহারাজ পরীক্ষিত কেবল শ্রবণের মাধ্যমে ভগবদ্ধাম লাভ করেন। তিনি শ্রীল শুকদেবের নিকট থেকে কেবলমাত্র ৭ (সাত) দিন শ্রীকৃষ্ণ মহিমা শ্রবণ করেছিলেন।

২. কীর্তন - শ্রীল শুকদেব গোস্বামী কীর্তনের মাধ্যমে ভগবানকে লাভ করেন। তাঁর পিতা মহান ঋষি ব্যাসদেবের নিকট থেকে লব্দ অপ্রাকৃত সংবাদ- ভগবৎ গুন অবিকৃতভাবে কীর্তনের মাধ্যমে।

৩. স্মরণঃ- মহারাজ প্রহ্লাদ ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত দেবর্ষি নারদ মুনির উপদেশ অনুসারে সর্বদা ভগবানকে স্মরণের মাধ্যমে পরম গতি প্রাপ্ত হন।

৪. বন্দনা - কেবল স্তবের দ্বারা ভগবানের বন্দনা করার মাধ্যমে অক্রুর পরমপদ প্রাপ্ত হন।

৫. অর্চন (পূজা)- মহারাজ পৃথু কেবল ভগবানের পূজা করার মাধ্যমে সর্বোচ্চ সিদ্ধি প্রাপ্ত হন।

৬. পাদসেবন (সেবা)- সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, লক্ষীদেবী কেবল একস্থানে উপবেশন করে শ্রী নারায়ণের পাদসেবা করে সাফল্য লাভ করেন।

৭. দাস্য (আজ্ঞা পালন)- শ্রীরামচন্দ্রের সেবক মহাভক্ত হনুমান কেবল ভগবানের আজ্ঞা পালনের মাধ্যমে পরম গতি লাভ করেন।

৮. সখ্য ( ভগবানের সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন)- মহাবীর অর্জুন ভগবানের সঙ্গে সখ্যতা করার মাধ্যমে পূর্ণ সিদ্ধি অর্জন করেন। অত্যন্ত প্রীত হয়ে ভগবান অর্জুন ও অর্জুনের ভবিষ্যৎ অনুগামী মানুষদের জন্য ভগবদ্গীতার অমৃতময় জ্ঞান উপদেশ করেন।

৯. আত্মনিবেদন- মহারাজ বলি তাঁর যথা সর্বস্ব এমনকি নিজ দেহটিকে ও ভগবানকে নিবেদনের মাধ্যমে পূর্ণ সাফল্য প্রাপ্ত হন।

অম্বরীষ মহারাজ উপরোক্ত নয়টি ভক্তির পন্থাই অনুশীলন করতেন এবং এভাবেই তিনিও পরমপদ প্রাপ্ত হন।

মূলতঃ সকলের হৃদয়ে ভগবানের প্রতি ভক্তি গুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু জড় জাগতিক সঙ্গের প্রভাবে তা জড় কলুষের দ্বারা আবৃত হয়ে রয়েছে। এই জড় কলুষ থেকে আমাদের হৃদয়কে নির্মল করতে হবে। তাহলে সুপ্ত কৃষ্ণ ভক্তি জাগ্রত হবে। সেটিই হচ্ছে ভক্তিযোগের পূর্ণ পন্থা। ভক্তিযোগ অনুশীলন করতে হলে সদ্গুরুর তত্তাবধানে কতগুলো বিধিনিষেধ পালন করতে হবে। যেমন - সূর্য উদয়ের পূর্বে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠা,স্নান করে আরতি করা, হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন করা। ফুল তুলে ভগবানের শ্রীচরণে নিবেদন করা, ভোগ রান্না করে তা ভগবানকে নিবেদন করা, ভক্ত সঙ্গ করা,নিরন্তর শুদ্ধ ভক্তের কাছ থেকে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবন করা, এই ভক্তিযোগ অনুশীলন করলে আমাদের হৃদয়ের কলুষতা দূরীভূত হয়। আমরা কৃষ্ণ ভক্তির স্তরে উন্নীত হতে পারি। তাই সদ্গুরুর তত্ত্বাবধানে বিধিবদ্ধ ভাবে ভক্তিযোগ অবলম্বন করলে অবশ্যই কৃষ্ণ ভক্তি লাভ করা যায়।

তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ.......
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (২/৪০) বলেছেন ---

“নেহাভিক্রমনাশোহস্তি প্রত্যবায়ো ন বিদ্যতে।
স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ"

--- অর্থাৎ, ভক্তিযোগের অনুশীলন কখনও ব্যর্থ হয় না এবং তার কোনও ক্ষয় নেই। তার স্বল্প অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠাতাকে সংসাররূপ মহাভয় থেকে পরিত্রাণ করে।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

দেবী দুর্গার কপালের মধ্যিখানে জ্বলজ্বল তৃতীয় নয়ন কীভাবে আপনিও পেতেতে পারেন ?

দেবী দুর্গার কপালের মধ্যিখানে জ্বলজ্বল করেন তৃতীয় নয়ন। তাই তিনি ত্রিনয়নী। এই তৃতীয় নয়নেই নাকি লুকিয়ে থাকে দেবীর দিব্যদৃষ্টি! এ তো গেল দেবীর কথা। কিন্তু, আমরা? আমার-আপনার মতো আম আদমিরও কি তৃতীয় নয়ন থাকে?
আসলে তৃতীয় চক্ষু বিষয়টা কী? সেটা আমাদের আগে একটু বুঝে নিলে ভালো হয়।
মিথোলজি অনুযায়ী যা দেবীর ত্রিনয়ন, তা বাস্তবে আসলে মনঃসংযোগের এক উচ্চতর পর্যায়। যার মাধ্যমে সে গোটা বিশ্বকে অনুধাবন করতে পারে। সোজা ভাষায় বলতে গেলে, তৃতীয় চক্ষু বা 'থার্ড আই' সাধারণ মানুষের চেতনার এক বিশেষ ক্ষমতা, যা নিয়ন্ত্রণ করবে আমার-আপনার মন ও আবেগকে। নিয়মিত কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে আমি-আপনিও সেই ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন।
-
কীভাবে আপনিও পেতে পারেন তৃতীয় নয়ন?
-
১) ধ্যানের অভ্যাস করুন। কপালের ঠিক মধ্যিখানে একটি নির্দিষ্ট কাল্পনিক বিন্দুতে মনঃসংযোগ করার চেষ্টা করুন। আমাদের দেহে (কল্পিত) সাতরকম চক্র রয়েছে, এক-একটি চক্রের সঙ্গে শরীর, মন ও আধ্যাত্মিকতার এক একরকম যোগ। এরকমই কোনও একটি চক্রকে ভেবে মনঃসংযোগের চেষ্টা করুন।
২) ধ্যানের জায়গা নির্দিষ্ট করুন। সাধারণত প্রকৃতির মাঝে খোলামেলা জায়গায় বসে ধ্যান করলে ভালো হয়।
৩) ধ্যানে বসারও নির্দিষ্ট ভঙ্গি আছে। মেঝেতে বজ্রাসনে/সুখাসনে বসুন। শিরদাঁড়া সোজা রাখুন। হাত জড়ো করে কোলের উপর রাখুন। মাটিতে বসতে যদি খুব অসুবিধা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে হাঁটুন। সমস্ত চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করুন।
৪) মনঃসংযোগের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সামনে একটি জ্বলন্ত মোমবাতি রাখতে পারেন।
৫) নিজেই একটা মন্ত্র বানান। চোখ বন্ধ করে বার বার আউড়ে চলুন সেটা। মনের বলুন শান্ত হতে। মনের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ান।
৬) অন্ধকার ঘরে শুয়ে শবাসন করে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে নাভির উচু-নিচু হওয়ার প্রতি মনোযোগ দিন।
৭) ত্রাটক ও অশ্বিনী মুদ্রা সহযোগে জপ করুন।
--- মূল কথা 'আজ্ঞাচক্র' বা গুরুশরণ নিতে হবে।
----------------------------------
[**** এগুলো শুরু করার আগে
বিশেষজ্ঞের সাহায্য অবশ্যই নেবেন,
নয়তো ক্ষতি হবে।***]
----------------------------------
উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় আজ্ঞাচক্র জাগরিত হয় আমাদের দেহস্থিত 'পিনিয়াল গ্রন্থি'-র সক্রিয়তায়। আসুন জেনে নিই পিনিয়াল গ্রন্থির বিষয়ে -----

২৪ ঘণ্টায় দেহের হরমোন ক্ষরণের চক্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে এই দেহঘড়ি। মানুষের মাঝে কয়েক ধরনের চক্র গড়ে উঠতে পারে। তবে আসল বিষয় লুকিয়ে রয়েছে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস নামক অংশে। হাইপোথ্যালামাসকে বলা হয় 'Master of Glands' অর্থাৎ গ্রন্থিদের গুরু।
মানুষের চোখে বিশেষ ধরনের ফটোসেনসিটিভ কোষ রয়েছে। সাধারণ দৃষ্টিশক্তি দিতে ব্যবহৃত হয় 'রডস' এবং 'কোনস' নামের কোষ। যখন চোখে আলো আসে তখন এই কোষগুলো মস্তিস্কের হাইপোথ্যালামাস অংশকে সতর্ক করে। এরাই এ তথ্য দেয় যে এখন দিন নাকি রাত? যখন হাইপোথ্যালামাস সিদ্ধান্ত দেয় যে এটা রাত, তখন পিনিয়াল গ্রন্থি মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণ করে। এটি মানুষকে ঘুম এনে দেয়।

ঘুমে আছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া এবং ঘুম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেগে ওঠার কাজটা দেহের যে গ্রন্থি করে থাকে তার নাম পিনিয়াল গ্রন্থি যাকে বিজ্ঞানীগণ নাম দিয়েছে 'তৃতীয় নয়ন' হিসাবে। কারন এই গ্রন্থি আলোতে সংবেদনশীল। এই গ্রন্থি এক ধরনের হরমোন নিঃসরন করে যাকে বলা হয় মেলাটোনিন। এই মেলাটোনিন নিঃসরন হওয়ার সাথে সাথে দেহের মধ্যে এক ধরনের রাসায়নিক ক্রিয়া শুরু হয় তখন মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এই গ্রন্থিটি অন্ধকারে ক্রিয়াশীল। সাধারত সন্ধ্যা হওয়ার পর থেকে এর নিঃসরন শুরু হয় যা ভোরের আলো না দেখা পর্যন্ত চলতে থাকে। ভোরের আলো দেখামাত্র এর নিঃসরন বন্ধ হয়ে যায় তখন ঘুমন্ত মানুষ সয়ংক্রিয়ভাবে জেগে ওঠে।

 শহুরে মানুষ এবং গ্রামের মানুষের ঘুমের মধ্যে অনেক তফাৎ দেখা যায়। যেমন-শহুরে মানুষ অনেক রাত পর্যন্ত জেগে টিভি দেখে বা বই পড়ে যার কারনে তাদের পিনিয়াল গ্রন্থি আলোর কারনে ক্রিয়াশীল হতে পারে না। পক্ষান্তরে গ্রামের মানুষেরা সন্ধ্যায় অন্ধকার হয়ে আসলে তাদের পিনিয়াল গ্রন্থি থেকে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরন হতে শুরু করে এবং তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। শেষ রাতে ভোরের আলো দেখা গেলেই পিনিয়ালের নিঃসরন বন্ধ হয়ে যায় এবং ঘুমন্ত মানুষ এমনিতেই জেগে যায়। এটাকেই বলে 'নিদ্রার দেহ ঘড়ি'। একবার যদি আপনার দেহ ঘড়ির কার্য্যকারীতা কমে যায় তখন ঘুম আসার জন্য আপনার ভিতর অস্থিরতা দেখা দেবে এবং মানসিক চাপের সৃষ্টি হবে। এর থেকে পরিত্রান পেতে অনিদ্রা আক্রান্ত ব্যাক্তি ঘুমের পিলের দাযরস্থ হয়।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

আমরা কি সত্যই বিজ্ঞানমনস্ক?


=> হিন্দু ধর্ম যখন বলে সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মার আবির্ভাব হয়েছিল জলে -- তখন তা আমরা বিশ্বাস করি না অথচ জড় বিজ্ঞান যখন বলে, কিন্তু পৃথিবীর বুকে প্রথম প্রাণসৃষ্টি হয়েছিল জলে -- তখন তা আমরা বিশ্বাস করি।
=> হিন্দু ধর্ম যখন মৎস > কূর্ম > বরাহ > নৃসিংহদেবেরকথা বলে -- তখন তা আমরা বিশ্বাস করি না অথচ জড় বিজ্ঞান যখন বলে, পৃথিবীতে প্রাণী জগতের বিবর্তন হয়েছে জলজ প্রাণী > উভচর > স্থলজ >চতুষ্পদ তৃণভোজী > মাংশাসী > দ্বিপদী প্রাণীতে -- তখন তা আমরা বিশ্বাস করি।
=> হিন্দু ধর্ম যখন দেখায়, শিবের কপালে তৃতীয় নয়ন আছে -- তখন তা আমরা বিশ্বাস করি না অথচ জড় বিজ্ঞান যখন দেখায়, মানুষের মস্তিষ্কে দুটি চোখের মাঝখানে পিনিয়াল নামক এক গ্রন্থি আছে -- তখন তা আমরা বিশ্বাস করি।
=> হিন্দু ধর্ম যখন গণেশের কাটা মাথা জোড়া দেওয়ার কাহিনী বলে -- তখন তা আমরা বিশ্বাস করি না অথচ জড় বিজ্ঞান যখন অর্গ্যান ট্রান্সপ্ল্যান্ট, সার্জারির কথা বলে -- তখন তা আপনি বিশ্বাস করেন।
=> হিন্দু ধর্ম যখন আপনাকে ব্রহ্মাস্ত্র, পাশুপাতাস্ত্রের মত ধ্বংসাত্বক অস্ত্রের কথা বলে -- তখন তা আমরা বিশ্বাস করি না কিন্তু বিজ্ঞান যখন অ্যাটমিক ওয়েপন, নিউক্লিয়ার ওয়েপন নামক ভয়ঙ্কর অস্ত্রের কথা বলে -- তখন তা আমরা বিশ্বাস করি।
.............. হায়রে আমাদের জড় বিজ্ঞানী সমাজ! মানুষ সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন আদিম যুগেই পড়ে রয়েছে, এদের জীবনে এখনও 'সনাতন' নামক বিজ্ঞানের ছোঁয়া লাগেনি .... হয় এরা প্রত্যেকই ভাবের ঘরে চুরি করে 'প্রগতিশীল' সাজে অথবা সত্যিই অজ্ঞান।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

০৮ জুলাই ২০১৭

মনিরামপুরে মিথ্যা অভিযোগে হিন্দু শিক্ষককে শারিরীকভাবে লাঞ্চিত

যশোরের মনিরামপুরে মিথ্যা অভিযোগ এনে হিন্দু শিক্ষক পরিতোষ সরকারকে শারিরীকভাবে লাঞ্চিত করে বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

শনিবার মণিরামপুর উপজেলার জয়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। পরে স্থানীয়রা ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, জয়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পরিতোষ সরকারের সঙ্গে একই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বলে মিথ্যা অভিযোগ তুলে। এই অভিযোগের জের ধরে শনিবার স্থানীয়রা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পরে প্রধান শিক্ষক ওই তালা ভেঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করলে বিক্ষুব্ধরা তাকে অবরুদ্ধ করে মারমুখি অবস্থান নেয় এবং প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে।

প্রধান শিক্ষক পরিতোষ সরকার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, গত ২৯ মে ওই শিক্ষিকার ছেলে বিদেশ থেকে বাড়িতে আসায় স্থানীয় কতিপয় যুবক চাঁদা দাবি করে। বিষয়টি দেখার জন্য বাড়িতে ডাকেন ওই শিক্ষিকা। এ সময় ওই শিক্ষিকার বাড়িতে কতিপয় যুবকের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি হয়। পরে এ ঘটনাকে পুঁজি করে এলাকার কিছু স্বার্থান্বেষী মহল কুৎসা রটাচ্ছে।এ প্রসঙ্গে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান দুর্গাপদ সিংহ বলেন, প্রধান শিক্ষক পরিতোষ সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটি সঠিক নয়। আর বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মুন্তাজ মহলদার বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মণিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আকরাম হোসেন খান বলেন, বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। রোববার সরেজমনি গিয়ে তদন্ত করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
Share:

হরি ধানের উদ্ভাবক হরিপদ কাপালী মৃত্যুবরণ করেছেন

ঝিনাইদহের হরি ধানের উদ্ভাবক ও চ্যানেল আইয়ের কৃষি পদক প্রাপ্ত হরিপদ কাপালী মৃত্যুবরণ করেছেন। বৃহস্পতিবার ভোরে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। হরিপদ স্ত্রী, ছেলেসহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।
তার শেষকৃত্য দুপুরে নিজ গ্রাম ঝিনাইদহ সদরের সাধুহাটি ইউনিয়নের আসাননগর গ্রামে অনুষ্ঠিত হবে।
নব্বই এর দশকে হরিপদ কাপালী উন্নত জাতের ধান উদ্ভাবন করেন। এলাকাবাসী এই ধানের নাম দেয় ’হরি ধান’। ধানটির জনপ্রিয়তা ঝিনাইদহের আসাননগর থেকে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের জেলায়।
তাকে নিয়ে চ্যানেল আইয়ে ও হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। এরপর চ্যানেল আইয়ের পক্ষ থেকে তাকে সম্মাননাসহ কৃষিপদক দেওয়া হয়।
Share:

ধামরাইয়ের রথ যাত্রা: জঙ্গি হামলার বিতর্ক পেছনে সরিয়ে আলোচনায় রাজনৈতিক বিভেদ

উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধামরাইয়ের রথ যাত্রায় এবার কালি ছড়িয়েছে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা। তবে, এসব কিছুর পাত্তা দিচ্ছে না স্থানীয় জনগণ। তারা বলছে, রাজনৈতিক ফয়দা তুলতেই একটি মহল জঙ্গি হামলার শঙ্কা ছড়িয়েছে। প্রশাসনের দিকেও আঙ্গুল তাদের।
প্রশাসনের অতি সাবধানী অবস্থান সকলের মধ্যে আতংক ছড়িয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এমনকি রথ উদযাপন কমিটি বলছে: প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে রথ টান বানচাল করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো একটি মহল।

রথের উল্টো টান স্থান ধামরাই বাজার ঘুরেও দেখা গেলো একই চিত্র। সকলের মনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবে, সেটা জঙ্গি হামলার নয়! ঢাকা ২০ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মালেক এবং পৌর মেয়র গোলাম কবির মোল্লার রাজনৈতিক সমীকরণ ঘিরে।

রথ যাত্রা আয়োজক কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নন্দ গোপাল বলেন: আমাদের বহু দিনের ঐতিহ্য আজ হুমকির মুখে। রথ যাত্রার আগের দিন রীতি মেনে এখানে মেলা শুরু হয়। এবারও তাই হয়ে ছিলো। তবে, পুলিশ পরদিন রবিবার হঠাৎ বাজারে চড়াও হয়ে দোকান ভাঙচুর করে। মেলা বন্ধ করে দেয়! বলা হয় এখানে জঙ্গি হামলা হতে পারে। কিন্তু এখানে অন্য ঘটনা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেলো রথ যাত্রার অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্যকে দাওয়াত দেওয়া হলেও, দাওয়াত পাননি মেয়র। এতেই বিরাগ ভাজন হন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মেয়রের (গোলাম কবির) লোকেরাই জঙ্গি হামলার আতঙ্ক সকলের মধ্যে ছড়িয়েছে।

এব্যাপারে মেয়র গোলাম কবির মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন: প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো এবারের রথ মেলার জঙ্গি হামলা হতে পারে। আমরা প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করেছি। পৌরসভার পক্ষ থেকে দোকান-পাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি এর বেশি জানি না।

এব্যাপারে স্থানীয় সাংসদ বলেন: আওয়ামী লীগ কখনও বিভেদের রাজনীতি করে না। আমরা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। মেয়রকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন: যে কু……(অশ্রাব্য ভাষা) এই কাজের সঙ্গে যুক্ত তার বিচার হবে।

সাংদের বক্তব্যের জবাবে মেয়র বলেন: তিনি (সাংসদ) আমার রাজনৈতিক অভিভাবক। তিনি যদি কিছু বলে থাকেন আমার কিছু বলার নেই।

রথ উদযাপন কমিটির আরেক নেতা সুকান্ত বনিক বলেন: আমরা কোনো বিভেদ চাই না। সহাবস্থান চাই। কিন্তু আজ যা হলো তা ভাষা প্রকাশ করা যাবে না। রাজনীতি তো মানুষের ভালোর জন্যই, সমস্যা সৃষ্টির জন্য না।

এর আগে সকালে ধামরাই থানার ওসি রিয়াজুল হক ধামরাই বাজারে এলে তার ওপর চড়াও হয় সাধারণ জনগণ। এসময় তারা কালো পতাকা ধারণ করেন। কেননা জঙ্গি হামলার কথা বলে তিনিই সকল আয়োজন পণ্ড করেছেন। যদিও জঙ্গি হামলা হতে পারে এমন কোনো তথ্য থাকার কথা উড়িয়ে দিয়েছেন ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল আজিম।

সাধারণ মানুষও অখুশি ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক এমন আচরণে। মুক্তিযোদ্ধা দিপেন বিশ্বাস বলছেন: আমার বুদ্ধি হওয়ার পর কখনও এতো কম মানুষ দেখিনি রথ টানে। এটা নিয়ে রাজনীতি না করলেও চলতো। চারশো বছরের ঐতিহ্য আজ কালি লাগলো।

http://thebdpost.com/ধামরাইয়ের-রথ-যাত্রা-জঙ্গ
Share:

পাকিস্তানের পঞ্জাবে শত শত হিন্দু পরিবারকে উচ্ছেদর নোটিশ জারি পাক সরকারের

পাকিস্তানের পঞ্জাবের ভাওয়ালনগর জেলার হারুনাবাদের কয়েকশো হিন্দু পরিবারকে এলাকা ছাড়তে নির্দেশ দিল পাক সরকার। এনিয়ে তাদের নোটিশও ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওইসব পরিবার কোথায় ‌যাবেন তার কোনও কথা জানায়নি সরকার।

পাকিস্তানের দৈনির দ্যা নেশনের খবর অনু‌যা‌য়ী ১৩ জন দেওয়া পাক সরকারের ওই নোটিশে বলা হয়েছে, পঞ্জাবের জার্নায়েল সড়ক(গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড)-এর ধারে ‌যারা বসবাস করছেন তাদের সরে ‌যেতে হবে। ওইসব বাড়ি ভেঙে ফেলা হবে। ওইসব লোকজন স্বেচ্ছায় না সরলে তাদের পুলিশ নামিয়ে সরিয়ে দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, পাকিস্তানে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে কমবেশি এক শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের। দেশভাগের পর তারা নিজেদের জায়গা ছেড়ে আসেননি। কিন্তু তাদের তার পর থেকেই বিভিন্ন ধরনের অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এক সময় তাদের বিয়ে নথিভূক্ত করারও অধিকার ছিল না। তবে সম্প্রতি সেখানে হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট পাস হয়েছে। ফলে কিছুটা হলেও তারা অধিকার পেয়েছেন।
এদিকে পাক সংবাদ মাধ্যমে অভি‌যোগ, একটি হাউজিং প্রকল্প হওয়ার কারণে ওইসব হিন্দুদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ওইসব লোকজন সেখান গত তিরিশ বছর ধরে বসবাস করছিলেন। এনিয়ে বিক্ষোভ শুরু হলেও তা কানে তুলছে না পঞ্জাব সরকার‍।

এলাকার হিন্দু সংগঠন হিন্দু বাল্মীকি মান্দারের প্রধান হরবংশ লাল মান্দারি জানিয়েছেন, সরকারের দেওয়া জমিতেই ওইসব হিন্দু পারিবার এতদিন বসবাস করে আসছেন। হঠাৎ করেই তাদের সরে ‌যেতে বলা হচ্ছে। এর জন্য ‌যেভাবে আন্দোলন করতে হয় তা করা হবে।

http://thebdpost.com
Share:

নড়াইলে ঐতিহ্যবাহী মন্দিরের সম্পত্তি দখল করল স্থানীয় কলেজে ও প্রশাসন

নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলায় ঐতিহ্যবাহী রথখোলা মন্দিরের কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি সহ  ০৫টি মন্দির দখলের অভিযোগ।

বিডিপোস্টডটকমের সরোজমিন তদন্তে গিয়ে স্থানীয় লোকজন ও প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করলে  বেরিয়ে আসে যে, নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলায় ঐতিহ্যবাহী রথখোলা মন্দিরের কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি সহ  ০৫টি মন্দির  শহীদ আবদুস সালাম ডিগ্রি কলেজ এর কলেজ অধ্যক্ষ – শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের  সচিব (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ)  বরাবর দলিল করে দিয়েছেন । দলিল  নং-১৬২৮/২০১৭ এই দলিলের মাধ্যমেই কলেজ অধ্যক্ষ দেবোত্তর সম্পত্তি লিখে দেয়  ।



এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিটির পুরাহিত ভবন দখল করে কালিয়া উপজেলা ক্রীড়া  সংস্থার অফিস  ও  কালিয়া  উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির অফিস করা হয়েছে।  যার উদ্ধোধন করেছেন নড়াইল- ১ আসনের এমপি মো: কবিরুল হক মুক্তি ও উপজেলার  নির্বাহী অফিসার মো: কামরূল ইসলাম ।


আর  দেবোত্তর  সম্পত্তি দানকরী শ্রী ভাবিনী রঞ্জণের ‍দ্বিতীয় তলা বিশিস্ট বাস ভবন দখল করে শহীদ আবদুস সালাম ডিগ্রি কলেজের শিক্ষকদের বাস ভবন হিসেবে অবৈধভাবে ব্যবহার করছে কলেজ কতৃপক্ষ। এছাড়া বাসভবনের পিছনের ভূমি দখল করে শহীদ এখলাশ উদ্দিন স্মৃতি পাঠাগার নির্মান করেছে কলেজে কতৃপক্ষ।





স্থানীয়দের তথ্য মতে –  শ্রী ভাবিনী রঞ্জণ ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নড়াইলের কালিয়া উপজেলার  ছোট কালিয়ার মৌজার বিশ্বখ্যাত রথখোলা দেবোত্তর মন্দির সহ ০৫টি মন্দির – শ্রী শ্রী শিব মন্দির, শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দির, শ্রী শ্রী নারায়ণ মন্দির, শ্রী শ্রী জগদ্বাত্রী মন্দির, শ্রী শ্রী জগন্নাথ মন্দির রথ মন্দির, শ্রী শ্রী দোলপিড়ি  মন্দির। যা  আজ  শহীদ আবদুস সালাম ডিগ্রি কলেজ, স্থানীয়  প্রশাসন এবং ভূমি অফিস মিলেমিশে হরিলুটের মত দখল করে নিচ্ছে।

শ্রী ভাবিনী রঞ্জণ ২০-১০-১৯২৪ সালে ৩৩২৫ নম্বর রেজিস্টার  দান দলিলে মুলে দেবতার উদ্দেশ্যে সকল সম্পত্তি অর্পণ করেন । যা দেবোত্তর সম্পত্তিতে রুপ লাভ করে। কিন্তু স্থানীয় কিছু  ভূমি দস্যুদের লেলুপ দৃষ্টিতে আজ বিলীন হতে চলছে। যার নেতৃত্ব প্রধান করে আসছে ভূমি অফিস এবং শহীদ আবদুস সালাম ডিগ্রি কলেজ এর প্রাক্তণ অধ্যক্ষ যার নেতৃত্বে আজ প্রায় দখল হয়ে যাচ্ছে এই দেবোত্তর সম্পত্তি। আর স্থানীয় প্রশাসনও এসে ভাগ বসিয়েছে তা দখলের জন্য।

এই স্বার্থান্বেশী মহল স্থানীয়  সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের অসৎ কর্মচারীগণের সহযোগীতায়  তপশীল  বর্ণিত দেবোত্তর সম্পত্তি   হওয়া সত্ত্বেও   বেআইনীভাবে  ভি. পি তালিকাভুক্ত করে দখল করে যাচ্ছে। অর্পিত  সম্পত্তি প্রত্যাপন  আইন ২০০১ (সংশোধিত ২০১১) এর  ক”  তপশীল  গেজেটে অন্তুভুক্ত করে । মন্দির কমিটি আইনানুগ পন্থায়  ক তপশীল গেজেটের  তালিকা থেকে অবমুক্তির নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট  অর্পিত সম্পত্তি প্রর্তাপণ মামলা দায়ের করে মামলাটি আজও চলমান।



সম্পত্তির বিবরন ::  জেলা: নড়াইল, থানা: কালিয়া অন্তর্গত ছোট কালিয়া মৌজার মধ্যে অবস্থিত, এস ৮৯ নং খতিয়ানে সি, এস ১৪৪২ দাগ যাহার এস, এ ১৯৮৪ নং  খতিয়ানে এস, এ ১৯৪ দাগে ০.৬৭ একর  দেবোত্তর সম্পত্তি।

বিডিপোস্টডটকমকে শহীদ আবদুস সালাম ডিগ্রি কলেজর অধ্যক্ষ বলেন,  স্থানীয় ভূমি অফিসের প্রত্যায়ণ পত্র  অনুযায়ী আমি মন্দিরের  দেবোত্তর সম্পত্তি শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সচিব বরাবরে দলিল করে দিয়েছে।

বিডিপোস্টডটকম তাকে প্রশ্ন করে আপনি কিভাবে দেবোত্তর সম্পত্তি লিখে দেন। তখন অধ্যক্ষ  এর কোন উত্তর দিতে পারেনি।

কালিয়া  উপজেলার  নির্বাহী অফিসার মো: কামরূল ইসলামকে বিডিপোস্টডটকমকে জানান: এখানে শিল্পকলা স্থাপনের জন্য এমপি সাহেব অর্থায়ন করেছেন এবং জেলা পরিষদের নির্দেশে আমি তা বাস্তবায়ন করছি।

তিনি আরো বলেন, সংস্কৃতি মন্ত্রনালয় একটি পরিপত্র জারি করে  শিল্পকলা একাডেমি স্থাপনের জন্য তখন এমপি সাহেবের সাথে আমরা কথা বলে জায়গাটা ঠিক করি । তিনি বলেন আমরা আইনের কোন ভায়োলেট করিনি। তবে তিনি দেবোত্তর সম্পত্তির বিষয়ে কোন কথা বলতে বা উত্তর দিতে চাননি।

সাধাররণ হিন্দুদের মাঝে চরমে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে কারণ তারা শতশত বছর যাবৎ পূজা অর্চনা করে আসছেন  ৫টি মন্দিরে যা আজ ভূমি দুস্যরা দখল নিচ্ছে ।

Courtesy: http://thebdpost.com/নড়াইলে-ঐতিহ্যবাহী-মন্দির
Share:

জমিদার বৌদ্ধ নারায়ণ সাহার বাড়ি এখন আহম্মদ আলী নামে!

পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় অবস্থিত শত বছরের পুরনো জমিদার বাড়িটি আজো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিপুণ কারুকাজ মণ্ডিত বাড়িটি নির্মাণ করেন মোগল আমলের লক্ষণ সাহা নামে এক জমিদার। পূর্ণাঙ্গ শৈল্পিক ২৪ কক্ষ বিশিষ্ট এই জমিদার বাড়িটির পাশেই রয়েছে ছোট্ট আরেকটি কারুকার্য খচিত মন্দির, রয়েছে একটি অর্ধনির্মিত প্রাচীন বাড়ি। বাড়ির পেছনে রয়েছে গাছ-গাছালি যুক্ত বাগান। বাড়িসহ বাগানের চারিদিকটা উঁচু প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। রয়েছে সেই সময়ই তৈরি করা জমিদার বাড়ির সুন্দর একটি পুকুর আর সান বাঁধানো ঘাট। পুকুরের পাশে পূজা করার জন্যে রয়েছে একটি বড় আকারের মণ্ডপ।

বিশাল আকৃতির এই জমিদার বাড়িটির বর্তমান মালিকানায় রয়েছে আহম্মদ আলী নামে এক উকিল। যার কারণে এই বাড়িটি এখন উকিলের বাড়ি নামে পরিচিত।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর জমিদার লক্ষণ সাহার নাতি বৌদ্ধ নারায়ণ সাহা জমিদারের রেখে যাওয়া সমস্ত সম্পত্তি আহম্মদ আলীর কাছে বিক্রি করে নারায়ণগঞ্জ জেলায় চলে যান। আহম্মদ আলীর স্ত্রীর নাম অনুসারে বাড়িটির নামকরণ করেন জামিনা মহল। মূলত আহম্মদ আলী ওকালতি পেশার সাথে সংযুক্ত ছিলেন বিধায় বর্তমানে এই জমিদার বাড়িটি উকিলের বাড়ি হিসেবেই বেশি পরিচিতি পেয়েছে। বর্তমানে আহাম্মদ আলীও নারায়ণগঞ্জ জেলায় বসবাস করছেন।

এদিকে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়দের অভিযোগ, জমিদারের রেখে যাওয়া এই বিশাল সম্পত্তিটি ছিল দেবোত্তর। সিদ্দিকুর রহমান নামে স্থানীয় এক প্রবীণ জানান, তত্কালীন ভারতবর্ষে এই এলাকাটি ছিল দেবোত্তর হিসেবে। ঐ সময়ে দেবোত্তর জমি হলে জমিদারকে খাজনা দেওয়া লাগতো না। জমিদার লক্ষণ সাহার ছিল তিন ছেলে নিকুঞ্জ সাহা, পেরিমোহন সাহা ও বঙ্কু সাহা। জমিদার মারা যাওয়ার পর তারা তিন ভাই এই সম্পত্তি দেখভাল করতেন। বঙ্কু সাহা ভারত ভাগের সময় এখান থেকে ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হওয়ার কিছু পূর্বে নিকুঞ্জ সাহাও ভারতে চলে যান। এক পর্যায়ে জমিদারের ছোট ছেলে পেরিমোহন সাহা এই সম্পত্তির দেখভাল করেন। পেরিমোহন সাহার বৌদ্ধ নারায়ণ সাহা নামে এক ছেলে ছিল। পেরিমোহন সাহা মারা যাওয়ার পর বৌদ্ধ নারায়ণ এই দেবোত্তার সম্পত্তিটি বিক্রি করে ফেলেন। তিনি আরো জানান, এলাকার হিন্দু সম্প্রদায় ট্রাস্ট নামে একটি সংগঠন দেবোত্তরকৃত এই সম্পত্তিটি বিক্রি করার পর আদালতে মামলা দায়ের করে। যা এখনো চলমান।

ডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাবের উল হাই এ প্রসঙ্গে জানান, প্রাচীন এই জমিদার বাড়িটি ডাঙ্গা ইউনিয়নের ঐতিহ্য। এটি সংরক্ষণ ও দর্শনীয় স্থান করার জন্য জেলা প্রশাসক থেকে উদ্যোগ নেওয়া
Share:

দিনাজপুরে হাজার বছরের সপ্তরথ মন্দির আবিষ্কার দুই মাস ধরে খনন চলছে

দিনাজপুরের বিরল উপজেলায় একটি সপ্তরথ হিন্দু মন্দির খুঁজে পেয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি দল। গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই খননে আবিষ্কৃত এই মন্দিরটির আনুমানিক বয়স প্রায় ১ হাজার বছর। খননকাজে নিয়োজিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ধারণা করছেন, বাংলাদেশে এটিই প্রথম আবিষ্কৃত সপ্তরথ মন্দির।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামে স্থানীয়ভাবে বুড়ির থান/বুড়ি মাতারানীর মন্দির থান নামে পরিচিত এই ঢিবিটি পূর্ব-পশ্চিমে ৮০ মিটার আর উত্তর-দক্ষিণে ৬০ মিটার মাপের। খননদলের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন ঢিবিটি পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশের লিচু বাগানের মধ্যেও বিস্তৃত।

আবিষ্কৃত মন্দিরটি ঢিবির আকারের তুলনায় বেশ ছোট। এটি দুটি অংশে বিভক্ত। পশ্চিম দিকের অংশটি অভিক্ষেপ বিশিষ্ট শক্ত কাঠামোর (৬.২৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও  ৬.২৫ মিটার প্রস্থ), মাঝখানে গর্ভগৃহ (২ মিটার দৈর্ঘ্য ও  ২ মিটার প্রস্থ)। পূর্বদিকে সংযুক্ত রয়েছে ৮ মিটার বর্গাকার একটি কক্ষ। এই কক্ষটিতে ছিল মন্দিরের মণ্ডপ।

পুরো মন্দিরটির আকার ও বৈশিষ্ট্য বুঝতে আরো সময় লাগবে বলে জানান খনন দলের পরিচালক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বাধীন সেন। তিনি আরও জানান যে, রথ শব্দটি প্রাচীন মন্দির স্থাপত্য গঠন ও শৈলী প্রকাশকারী পরিভাষা। দেয়ালের বহির্গাত্রের উলম্ব অভিক্ষেপগুলোকে রথ বলা হয়। তিনি জানান, প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, মন্দিরটি ভারতের বর্তমান উড়িশ্যায় উদ্ভুত কলিঙ্গ মন্দির স্থাপনা রীতির অনুসারী। মন্দিরটির রথবিশিষ্ট গর্ভগৃহের উপরিকাঠামো হিসেবে রেখা দেউল ধরনের শিখর ছিল বলে অনুমান করছেন ড. স্বাধীন সেন।

তিনি আরো জানান, গর্ভগৃহের কেন্দ্রে একটি সপ্তরথ অভিক্ষেপবিশিষ্ট পাথরের বেদি রয়েছে। এই বেদির পশ্চিমপাশের অর্ধবৃত্তাকার খাঁজের মধ্যে প্রতীমার নিম্নাংশ প্রবিষ্ট করে রাখা হতো। তবে খননের সময় এই জায়গাটিতে একটি ছোট মাটির তৈরি ঘট পাওয়া গেছে। এখনও বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রতীমার প্রতীকী প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ঘট পূজা করে থাকেন। উড়িষ্যার মন্দির স্থাপত্যরীতির অনুরূপ ইট নির্মিত মন্দিরের উপস্থিতি বাংলা অঞ্চলে বিরল নয়। গত বছর কাহারোল উপজেলার মাধবগাঁওয়ে একই দল একটি নবরথ মন্দির খনন করেছিলেন।
অধ্যাপক স্বাধীন জানান যে, উপরের এই মন্দিরটি পূর্বেকার আরেকটি স্থাপনার ধ্বংসাবশেষের উপরে নির্মিত হয়েছে। ওই স্থাপনার অংশবিশেষ উন্মোচিত হওয়ায় তার প্রকৃতি ও পরিবর্তন এখনো স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হয় নাই। ওই স্থাপনাগুলোর স্বরূপ উন্মোচন করতে আরো সময় প্রয়োজন।

খননদলের সহযোগী পরিচালক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুল আহছান জানান, বিরল উপজেলার এই প্রত্নস্থানগুলো প্রথম শনাক্ত করেন ২০০৪-২০০৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের গবেষণা শিক্ষার্থী খন্দকার মেহবুবুল ইসলাম। তার গবেষণা ও পরবর্তী গবেষণায় এই উপজেলায় মোট ১২২ টি বিভিন্ন কালপর্বের প্রত্নস্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। খননকৃত প্রত্নস্থানটি পারুলগঙ্গা নামের একটি নদীর মৃত খাতের দুই পাশ ধরে রৈখিক বিন্যাসে ছড়িয়ে থাকা একটি মানববসতির অংশ ছিল। তিনি আরও জানান, এই অঞ্চলের নদীব্যবস্থার বদলের সঙ্গে এই বসতিগুলোর বিকাশ ও বিলুপ্তির ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।

খননের সহকারী পরিচালক ও পিএইচডি গবেষণা শিক্ষার্থী আবির বিন কায়সার শুভ বলেন, পুরো প্রত্নস্থানটি যথাযথভাবে খনন ও নথিভুক্তকরণ করতে আরও চার মাস সময় প্রয়োজন হবে। খননের স্তরবিন্যাস বুঝে এখানে মানুষের বসতির পরিবর্তন ব্যাখ্যা করার জন্য তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন বলে তিনি বলেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহযোগিতায় বিরল উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামে পরিচালিত এই খননে অর্থায়ন করছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।

এখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ জন শিক্ষার্থী, মহাস্থানগড় থেকে আসা ১৫ জন বিশেষজ্ঞ শ্রমিক ও কাহারোল থেকে আসা ২৫ জন শ্রমিক প্রত্নস্থানটি খননে অংশ নিচ্ছেন।
মঙ্গলবার দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম খননস্থলটি পরিদর্শন করে জানান, এটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইত্তেফাক/এমআই
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।