সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

ঋগ্বেদ সংহিতা - প্রথম মণ্ডলঃবিভিন্ন ঋষিঃ সুক্তঃ ১৪৬-১৬০

১৪৬ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। পিতা মাতার (দ্যাবাপৃথিবী) ক্রোড়স্থিত, মস্তকত্তয়যুক্ত সপ্তরশ্মিবিশিষ্ট (১) ও বিকলতারহিত অগ্নিকে স্তব কর। সর্বত্রগামী, অবিচলিত, দ্যোতমান এবং অভীষ্টবর্ষী অগ্নির তেজ চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হচ্ছে।
২। ফলপ্রদাতা অগ্নি নিজ মহিমায় দ্যাব্যাপুথিবীকে ব্যাপ্ত করে রয়েছেন, জরারহিত, পূজনীয় অগ্নি আমাদের রক্ষা করে অবস্থিতি করছেন, বিস্তৃত পৃথিবীর সানুপ্রদেশে বেদিতে পদক্ষেপ করছেন। তার উজ্জল জ্যাতিঃ উধঃ অন্তরীক্ষ লেহন করছে।
৩। যজমান ও তৎ পত্নী সেবাকার্যকুশল দুটি ধেনুর ন্যায় একটি বৎসরূপ অগ্নির অভিমুখে সঞ্চরণ করছেন। তারা গর্হিত বিষয়শূন্য পথ নির্মাণ করছেন এবং সর্ব প্রকার প্রজ্ঞা অধিক পরিমাণে ধারণ করছেন।
৪। অভিজ্ঞ মেধাবীগণ অজেয় অগ্নিকে স্বীয়স্থানে স্থাপন করছেন বুদ্ধিবলে নানা উপায়ে তার রক্ষা করছেন, যজ্ঞফলভোগেচ্ছায় ফল দায়ী অগ্নির শুশ্রুষা করছেন। অগ্নি সূর্যরূপে তাদের নিকট আবির্ভূত হচ্ছেন।
৫। অগ্নি ইচ্ছা করেন, যে দশদিকে তাদের দেখতে পায়। তিনি সর্বদা জয়শীল এবং স্তুতিযোগ্য, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সকলেরই জীবনস্বরূপ। ধনবান এবং সকলের দর্শনীয়, অগ্নি অনেক স্থানে শিশুতুল্য যজমানগণের পিতারূপ।
টীকাঃ
১। তিনটি সবন অগ্নির মুর্ধা, সাতটি ছন্দ তার রশ্মি। সায়ণ।
১৪৭ সুক্ত।।
অনুবাদঃ হে অগ্নি! তোমার উজ্জল ও শোষক রম্মিগণ কি প্রকারে অন্নের সাথে বায়ু প্রদান করে, যে পুত্র ও পৌত্রাদির জন্য অন্ন ও আয়ু প্রাপ্ত হয়ে যজমান যজ্ঞসম্বন্ধীয় সামগান করতে পারে?
২। হে তরুণ অন্নবান অগ্নি! আমার অতিশয় পূজনীয় ও উত্তমরূপে সম্পাদিত স্তুতি গ্রহণ কর। একজন তোমাকে হিংসা করে আর একজন তোমার পূজা করে। আমি তোমার উপাসক, আমি তোমার মুর্তিকে পূজা করি।
৩। হে অগ্নি! তোমার যে প্রসিদ্ধ পালনশীল রশ্মিগণ মমতার পুত্র দীর্ঘতমাকে অন্ধ দেখে তাকে অন্ধত্ব হতে রক্ষা করেছিল তুমি সর্ব প্রজ্ঞাযুক্ত, তুমি সে সুখকর রশ্মিগণকে রক্ষা কর। বিনাশেচ্ছু শত্রুগণ যেন হিংসা না করে।
৪। হে অগ্নি! যে আমাদের পাপ ইচ্ছা করে, নিজে দান করে না মানসিক ও বাচনিক দু প্রকার মন্ত্র দ্বারা আমাদের নিন্দা করে, তাদের একমন্ত্র (মানস)। তাদেরই পক্ষে পুরুভাব হোক, তারা দুবৃাকাদ্বারা আপনাদেরই শরীর নষ্ট করুক।
৫। হে বলের পুত্র অগ্নি। যে মানুষ জেনে শুনে দ্বিপ্রকার মন্ত্র দ্বারা মানুষের নিন্দা করে,হে স্তুয়মান অগ্নি। আমি স্তব করছি, তার হস্ত হতে আমাকে রক্ষা কর এবং আমাদের পাপে নিক্ষেপ করো না।
১৪৮ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। মাতরিশ্বা প্রবেশ করে নানা রূপ বিশিষ্ট সর্বদেবকার্য কুশল দেবগণের আহ্বানকর্তা অগ্নিকে প্রবৃদ্ধ করেছেন। পূর্বে দেবগণ একে বিচিত্র দ্যুতিমান সুর্যের ন্যায় মানুষ ও ঋত্বিকগণের যজ্ঞ সমাধার জন্য স্থাপন করেছিলেন।
২। অগ্নিকে সন্তোষকর হব্য প্রদান করলেই শত্রুগণ আমাকে নাশ করতে পারবেন না, যেহেতু অগ্নি আমার দেওয়া বরণীয় (স্তোত্রাদির) অভিলাষী। স্তোতা যখন অগ্নির সম্বন্ধে স্তুতি করেন, তখন সমস্ত দেবগণ তৎপ্রদত্ত সমস্ত হব্য প্রাপত্ হন।
৩। যজ্ঞকারীগণ যে অগ্নিকে নিত্য অগ্নিগৃহে নিয়ে যান এবং স্তুতিসহকারে স্থাপন করেন, ঋত্বিগণ দ্রুতগামী রথনিবদ্ধ অশ্বের ন্যায় সে অগ্নিকে যজ্ঞার্থ প্রণয়ন করেন।
৪। বিনাশক অগ্নি, সর্ব প্রকার বৃক্ষাদি দন্তদ্বারা নষ্ট করেন, অনন্তর বনে নানাবর্ণে শোভাপ্রাপ্ত হন। তদন্তর যেমন ধানুকীর নিকট হতে তার বেগে গমন করে সেরূপ বায়ু প্রতিদিন শিখার অনুকুলে বয়ে থাকে।
৫। অরণি গর্ভে অবস্থিত যে অগ্নিকে শত্রুগণ অথবা অন্য হিংসকগণ দুঃখ দিতে পারে না, অন্ধ, দৃষ্টি শক্তিরহিত লোকে যে অগ্নির মাহাত্ম্য নষ্ট করতে পারে না, অবিচলিত ভক্তি বিশিষ্ট যজমানগণ বিশেষরূপে তৃপ্তিসাধন করে তাকে রক্ষা করে।

১৪৯ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। মহাধনের স্বামী অগ্নি অভীষ্ট প্রদান করে আমাদের অভিমুখে আসছেন। প্রভুর অগ্নি ধনাস্পদ বেদি আশ্রয় করছেন। প্রস্তর হস্ত যজমানগণ আগত অগ্নির সেবা করছেন।
২। যে অগ্নি মনুষ্যদের ন্যায় দ্যাবাপৃথিবীরও উৎপাদক, তিনি যশোযুক্ত হয়ে বর্তমান আছেন এবং তার থেকেই জীবগণ সৃষ্টির আস্বাদন প্রাপ্ত হয়। তিনি গর্ভাশয়ে প্রবিষ্ট হয়ে (সমস্ত জীবের) সৃষ্টি করেন।
৩। অগ্নি মেদাবী, তিনি অন্তরীক্ষচারী বায়ুর ন্যায় ননাস্থানে যান। তিনি এ সুন্দর স্থান দীপ্ত করেছেন, নানারূপ অগ্নি সূর্যের ন্যায় শোভা পাচ্ছেন।
৪। দ্বিজন্মা অগ্নি দীপ্যমান লোকত্রয়কে প্রকাশ করেন এবং সমস্ত রজনাত্মক লোকও প্রকাশ করেন। তিনি দেবতগণের আহাবন কতৃা এবং যে স্থলে জল সংগৃহীত হয় সেখানে বর্তমান আছেন।
৫। যে অগ্নি দ্বিজন্মা, তিনিই হোতা, তিনি হব্যলাভের ইচ্ছায় সমস্ত বরণীয় ধন ধারণ করেন। যে মর্ত্য অগ্নিকে হব্য দান করেন, তার উত্তম পুত্র হয়।

১৫০ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে অগ্নি! যেহেতু আমি হব্য দান করি অতএব তোমার নিকট অনেক প্রার্থনা করি। হে অগ্নি! আমি তোমারই সেবক। হে অগ্নি! মহৎ প্রভুর গৃহে যেরূপ সেবক থাকে আমি তোমার নিকট সেরূপ।
২। হে অগ্নি! যে ধনবান ব্যক্তি তোমাকে স্বামী বলে না বা উত্তমরূপ হোমের জন্য দক্ষিণা দেয় না এবং যে ব্যক্তি দেবতাগণকে স্তব করে না সে দেবশূন্য লোকদ্বয়কে ধন দান করো না।
৩। হে মেধাবী অগ্নি! যে ব্যক্তি তোমার যজ্ঞ করে, সে স্বর্গস্থচন্দ্রের ন্যায় সকলের আনন্দকর হয়, প্রধানদের মধ্যেও প্রধান হয়। (অতএব) আমরা বিশেষরূপে তোমারই সেবক হব।

১৫১ সুক্তঃ
অনুবাদঃ
১। গোধনাভিলাষী, স্বাধ্যায়সম্পন্ন যজমানগণ, দোধনালাভের ও মনুষ্যগণের রক্ষার নিমিত্ত, মিত্রের ন্যায় প্রিয় ও যজনীয় যে অগ্নিকে অন্তরীক্ষভব জলমধ্যে ক্রিয়াদ্বারা উৎপন্ন করেছেন তাঁর বল ও শব্দে দ্যাব্যাপৃথিবী কম্পিত হচ্ছে।
২। যেহেতু মিত্রভূত ঋথ্বিকগণ তোমাদের জন্য অভীষ্টপ্রদায়ী স্বকর্মক্ষম সোমরস ধারণ করে আছে অতএব অর্চকের গৃহে এস। তোমরা অভীঙ্টবযী, তোমরা গৃহপতির আহ্বান শোন।
৩। হে অভীষ্টবর্ষী মিত্রাবরুণ! মহাবল লাভের জন্য মনুষ্যগণ দ্যাব্যাপৃথিবী হতে তোমার প্রশংসনীয় জন্মের কীর্তন করছে যেহেতু তুমি যজমানের যজ্ঞা ফলস্বরূপ অভীষ্ট প্রদান কর এবং স্তুতি ও হব্যযুক্ত যজ্ঞ গ্রহণ কর।
৪। হে প্রভূত বলবান মিত্রারূন! যজ্ঞভূমি তোমাদের প্রিয়তর তা উত্তমরূপে সম্পাদিত হয়েছে। হে সত্যবাদী মিত্রারবরূণ! তোমরা আমাদের বৃহৎ যজ্ঞের প্রশংসা কর; দুগ্ধাদির দ্বারা শরীরেরবল প্রদানে সমর্থ ধেনুর ন্যায়, তোমরা উভয়ে বৃহৎ দ্যুলোকের অগ্রভাগে দেবতাগণের আনন্দোৎপাদনে সমর্থ এবং নানাস্থানে আরদ্ধা কর্ম উপভোগ কর।
৫। হে মিত্রাবরূণ! তোমরা নিজ মহিমায় যে ধেনুগণকে বরণীয় প্রদেশে নিয়ে যাও, তাদের কেউ নষ্ট করতে পারে না। তারা ক্ষীর প্রদান করে এবং গোষ্ঠে ফিরে আসে। চৌরধারী ব্যক্তিগণের ন্যায় উক্ত গাভীগণ প্রাতঃকালে ও সায়ংকালে পরিস্থিত সূর্ডের দিকে চীৎকার করে।
৬। হে মিত্র! হে বরূণ! তোমরা যে যজ্ঞে যজ্ঞভূমিকে সম্মানিত কর তথায় কেশের ন্যায় অগ্নির শিখা যজ্ঞার্থ তোমাদের পূজা করে। তোমরা নিম্নমুখে বৃষ্টি প্রদান কর এবং আমাদের কর্ম সম্পন্ন কর। তোমরাই মেধাবী যজমানের মনে াহর স্তুতির ঈশ্বর।
৭। যে মেধাবী হোমনিষ্পাদক, মনোহর যজ্ঞোপকরণবিশিষট যজমান যজ্ঝের নিমিত্ত তোমাদের উদ্দেশ্যে স্তব করে হব্য প্রদান করে সে প্রজ্ঞাবান যজমানের উদ্দেশ্যে যায় এবং যজ্ঞের কামনা কর। আমাদের অনুগ্রহ করবার অভিলাষে আমাদের স্তুতি স্বীকার কর!
৮। যেমন ইন্দ্রিয়ের প্রয়োগ করতে হলে প্রথমে মনের প্রয়োগ করতে হয়। হে সত্য বাদী মিত্র ও বরূণ! সেরূপ তোমাদের জযমানেরা প্রথমে গব্য দ্বারা অর্চনা করে। যজমানেরা তোমাদের আসক্ত চিত্তে স্তুতি করেছে, তোমরা মনে দর্প না করে আমাদের সমৃদ্ধ কার্যে উপস্থিত হও।
৯। হে মিত্র ও বরূণ! তোমরা ধনবিশিষ্ট অন্ন ধারণ কর, আমাদের ধনবিশিষ্ট অগ্নি প্রদান কর। এ প্রচূর ও তোমার ধনবিশিষ্ট অন্ন ধারণ কর, আমাদের ধনবিশিষ্ট অগ্নি প্রদান কর। এ প্রচূর ও তোমার বৃদ্ধি বলে রক্ষিত। দিবস বা রাত্রি তোমার দেবত্ব প্রাপ্ত হয় নি! নদীগণও তোমার দেবত্ব প্রাপ্ত হয় নি, পণিরাও প্রাপ্ত হয় নি; তারা তোমার দানও প্রাপ্ত হয় নি।

১৫২ সুক্ত।
অনুবাদঃ
১। হে স্থুল মিত্র ও বরূণ! তোমরা (তেজরূপ) বস্ত্র ধারণ কর, তোমাদের সৃষ্টি সুন্দর ও দোষ রহিত। তোমরা সমস্ত অনৃত বিনাশকর এবং ঋতের সাথে যুক্ত হও।
২। এ উভয়ের (মিত্র ও বরূণ্যের) প্রত্যেকেই কর্ম অনুষ্ঠান কহরেন। তিনি সত্যবাদী, মন্ত্রণাকুশল, কবিগণের স্তুত্য ও শত্রু হিংসক। তিনি উগ্ররূপে চতুর্গূণ অস্ত্রবিশিষ্ট হয়ে; ত্রিগুন অত্রবিশিষ্টগণকে নাশ করেন। দেবনিন্দূকেরা তাঁর পভাবে পথমতই জীর্ণ হয়ে যায়।
৩। পদবিশিষ্ট মনূষ্যদের অগ্রে পদরহিতা ঊষা আসেন; হি মিত্রাবরূণ! এ যে তোমাদেরই কাজ তা কে জানে? তোমাদের সন্তান আদিত্য ঋতের পূরণ ও অনূতের বিনাশ করে সমস্ত জগতের ভার বহন করেন(৯)
৪। আমরা দেখেছি যে কণ্যার ঊষার প্রণয়ী আদিত্য মিত্রাবরূণের প্রিয়পাত্র।
৫। আদিত্যের অশ্ব নেই, তথাপি তিনি শ্রীঘ্র গমনশীল ও অত্যন্ত শব্দাকারী; তিনি ক্রমেই ঊর্দ্ধে আহোরণ করেছেন। লোকে এ সকল অচিন্তনীয় বৃহৎ কর্ম মিত্র ও বরূণ্যের প্রতি আরোপ করে তাদের স্তব করছে ও সেবা কর ছে।
৬। প্রীতিজনক ধেনুগণ বৃহৎ কর্মপ্রিয় মমতার পুত্রকেহ (অর্থাৎ আমাকে) আপনার স্তনজাত দুগ্ধ দ্বারা প্রীত করুক। তিনি যজ্ঞানুষ্ঠান অবগত হয়ে যজ্ঞাবিশিষ্ট অন্ন, মুখদ্বারা আহারার্থ ভিক্ষা করুন এবং মিত্রাবরূণের পরিচর্যা করে যজ্ঞা অখন্ডিতরূপ সম্পূর্ণ করুন।
৭। হে দেব মিত্রাবরূণ! আমি রক্ষার নিমিত্ত নমস্কার ও স্তোত্র করে তোমাদের হব্য সেবার উদ্যোগ করব। আমাদের বৃহৎ কর্ম যেন যুদ্ধের সময় শত্রুদের অভিনব করতে পারে! স্বর্গীয় বৃষ্টি যেন আমাদের উদ্ধার করে।
টীকাঃ
১। মিত্র ও বরূণ দিবা ও রাত্রি। সূর্য ঐ দু কালের মধ্যকালে উদয় হন। এ জন্য মিত্রাবরূণের গর্ভ অর্থাৎ শিশু বলে বর্ণিত হয়েছে। সায়ণ।
১৫৩ সুক্ত।
অনুবাদঃ
১। হে ঘৃতস্রাবী, মহান মিত্রাবরূণ! যেহেতু আমাদের অধ্বর্যূগণ স্বীয় কার্যদ্বারা তোমাদের পোষণ করে অতএব আমরা সমান প্রীতিযুক্ত হয়ে হব্য ঘৃত ও নমস্বারদ্বারা তোমাদের পূজা করি। হে মিত্রাবরূণ! তোমাদের উদ্দেশেকেবল যাগের প্রস্তাবই প্রকৃত যাগ নহে কিন্তু তা দিয়েই আমি তোমাদের তেজঃ প্রাপ্ত হই। কারণ সূখী হোতা তখন তোমাদের উদ্দেশে যজ্ঞ করবার নিমিত্ত আসেন, হে অভিষ্টবর্শদ্বয়! তখন তিনি সুখ লাভ করেন।
৩। হে মিত্রাবরূণ! রাতহব্য নামক রাজা মনুষ্য যজমানের হোতার ন্যায় যজ্ঞে সপর্যাদ্বারা তোমাকে প্রীত করলে তদীয় ধেনু যেরূপ দুগ্ধবতী হয়েছিল, তোমার যজ্ঞে যে যজমান হব্য প্রদান করে, তার ধেনু সকল সেরুপ বহু দুগ্ধবতী হয়ে আনন্দ বর্ধন করূক।
৪। হে মিত্রাবরূণ! দিবা ধেনুগণ এবং অন্ন ও উদক তোমাদের ভক্ত যজমানগণের নিমিত্ত তোমাদের প্রীত করূক। আমাদের যজমানের পূর্ব পালক অগ্নি দানশীল হোন এবং তোমরা ক্ষীরস্রাবিনী ধেনুর দুগ্ধ পান কর।

১৫৪ সুক্ত।
অনুবাদঃ
১। আমি বিষ্ণুর বীর কর্ম শ্রীঘ্রই কীর্তন করি। তিনি পার্থিব লোক পরিমাপ করেছেন। তিনি উপরিস্থ জগৎ স্তম্ভিত করেছেন! তিনি তিনবর পদক্ষেপ করছেন। লোকে তার প্রভূত স্তুতি করে (১)।
২। যেহেতু বিষ্ণুর তিনি পদক্ষেপে সমস্ত ভূবন অবস্থিতি করে অতএব ভয়ঙ্কর, হিংস্র, গিরিশায়ী আরণ্য জন্তুর ন্যায় বিষ্ণুর বিক্রম লোকে প্রশংসা করে।
৩। উন্নত প্রদেশনিবাসী, অভীষ্টবর্ষী ও সর্ব লোক প্রশংসিত বিষ্ণুকে মহাবল ও স্ত্রোত্র সমূহ আশ্রয় করুক! তিনি এককই এই একত্রাবস্থিত তঅতি বিস্তীর্ণ নিয়ত ভূবন তিনবার পদক্ষেপদ্বারা পরিমাপ করেছেন।
৪। যারা অক্ষীণ, অমৃত পূর্ণ, ত্রিসংখ্যক পদক্ষপ অন্নদ্বারা হর্ষ উৎপাদন করে; যিনি এককই ধাতুত্রয় ও পৃথিবী, দ্যুলোক ও সমস্ত ভূবন ধারন করে আছেন (২)।
৫। দেবাকাঙ্ক্ষী মানুষ্যগণ যে প্রিয় পথ প্রাপ্ত হয়ে হৃস্ট হন, আমি সে পথ যেন প্রাপ্ত হই। উরবিক্রমী বিষ্ণুর পরমপদে মধুর উৎস্য আছে, তিনি প্রকৃতই বন্ধু!
৬। যে সকল সুখের স্থানে ভূরিশৃঙ্গবিশিষ্ট ও ক্ষিপ্রগামী গোপসমূহ বিচরণ করে, সে সকল স্থানে গমনার্থ তোমাদের উভয়ের প্রার্থনা করি। এ সকল স্থানে বুহ লোকের স্তুতিযোগ্য, অভীষ্টবর্ষী বিষ্ণুর পরম পদ স্ফুর্তি প্রাপ্ত হচ্ছে।
টীকাঃ
১। বিষ্ণুর তিন পদবিক্ষেপ সম্বন্ধে ২২ সুক্তের ১৬ ঋকের টীকা দেখুন।
২। সায়ণ ধাতুত্রয়ের তিন প্রকার অর্থ অনুমান করেছেন। (১) পৃথিবী, জল ও তেজঃ। (২) কালত্রয়। (৩) পুণত্রয়। Three Elements. –Welson. Triple Universe –Muir. ‘Trois choses’ –Langlois,

১৫৫ সুক্তঃ
অনুবাদঃ
১। হে অধ্বর্যুগণ! তোমরা স্তুতিপ্রিয় মহাবীর ইন্দ্রের নিমিত্ত এবং বিষ্ণুর জন্য পানীয় সোমরস যত্নপূর্বক প্রস্তুত কর। তারা উভয়ে দুর্ধর্ষ ও মহীয়ান। তাঁরা মেঘের উপর ভ্রমণ করেন, যেন সুশিক্ষিত অশ্বের উপর আরোহন করে ভ্রমণ করেছেন।
২। হে ইন্দ্র ও বিষ্ণু! তোমরা ইষ্টপ্রদ; অতএব হূতাবিশিষ্ট সোমপায়ী যজমান তোমাদের দীপ্তিপূর্ণ আগম প্রশংসা করছে। তোমরা মর্ত্যদের জন্য শত্রুবিমর্দক অগ্নির নিকট হতে প্রদেয় অন্ন নিরন্তর প্রেরণ কর।
৩। প্রসিদ্ধ অহুতি সকল ইন্দ্রের মহৎ পৌরুষ বৃদ্ধি করছে। ইন্দ্র, সকলের মাতৃস্থানীয় দ্যাবাপৃথিবীকে রেতঃ এবং উপভোগের জন্য সে সামর্থ প্রদান করেন। পুত্র নিকৃষ্ট নাম ধারণ করেন, উৎকৃষ্ট নাম পিতার, তৃতীয় মান ম্যুলোকের দীপ্তমান প্রদেশ আছে (১)।
৪। আমরা সকলের সআমী, পালনকর্তা, শত্রু রহিত ও সেচন সমর্থ বিষ্ণুর পৌরুষের স্তুতি করি। তিনি প্রশংসনীয় লোক রক্ষার নিমিত্ত ত্রিসংখ্যক পদবিক্ষেপদ্বারা পার্থিব লোক সকল বিস্তীর্ণরূপে পরিক্রম করেছিলেন।
৫। মনুষ্যগণ স্বর্গদর্শী বিষ্ণুর দুই পাদক্ষেপ কীর্তন করে প্রাপ্ত হয়। তার তৃতীয় পাদক্ষেপ, মনুষ্য ধারণা করতে পারে না, উড্ডীয়মান পক্ষবিশিষ্ট পক্ষীগণো প্রাপ্ত হয় না।
৬। বিষ্ণু গতিবিশেষ দ্বারা বৎসরের চতুর্নবতি দিবস চক্রের ন্যায় বৃত্তাকারে চালিত করেছেন (২)। বিষ্ণু বৃহৎ শরীর বিশিষ্ট ও সুতিদ্বারা পরিমেয়, তিনি নিত্য তরূণ ও অকুমার, তিনি আহাবে গমন করেন।
টীকাঃ
১। এ ঋকের সায়ণ এরূপ তাৎপর্য লিখেছেন অগ্নিতে প্রদত্ত আহুতি সকল সূর্যলোকে গমন করে দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে ইন্দ্র ও বিষ্ণুর পুষ্টি বর্ধন এবং মানুষ্যদের জীবনযাত্রা নির্বাহ হয়। এই প্রকারে পিতা, পুত্র ও পৌত্রের উৎপত্তি হয়।
২। সায়ণ ৯৪ কালাবয়ব নির্দেশ করেছেন, যথা সম্বৎসর (১), অশ্বীদ্বয়, (২)পঞ্চঋতু (৫) দ্বাদশ মাস (১২), চতুর্বিংশতিপক্ষ (২৪) ত্রিংসৎ অহোরাত্র (৩০), অষ্টপ্রহর (৮), দ্বাদশ রাত্রি (১২)। পণ্ডিতবরা মিউয়র চতুর্ভি নবতিং অর্থে চারগুণ নব্বই অর্থাৎ বৎসরের ৩৬০ দিন করেছেন। আমরা এই দ্বিতীয় অর্থ গ্রহণ করেছি।

১৫৬ সুক্ত।
অনুবাদঃ
১। হি বিষ্ণু! তুমি মিত্রের ন্যায় আমাদের সুখপ্রদ, ঘৃতাহুতিভাজন, প্রভূত অন্নবান,রক্ষণশীল ও পৃথুব্যাপী হও। তোমার স্তোম বিদ্বান যজমান কর্তৃক পুনঃপুনঃ উচ্চার্য এবং তোমার যজ্ঞ হবিষ্মান যজমানের আরাধনীয়।
২। যে মনুষ্য প্রাচীন, মেধাবী, নিত্য নুতন ও সুমজ্জানি বিষ্ণুকে হব্য প্রদান করেন; যিনি মহানুভব বিষ্ণুর পূজনীয় জন্ম (কথা) কীর্তন করেন, তিনিই যুজ্য (স্থান) প্রাপ্ত হন।
৩। হে স্তোতৃগণ! প্রাচীন যজ্ঞের গর্ভতূত বিষ্ণুকে যেরূপ জান সে রূপেই স্তোত্রাদিদ্বারা তরি প্রীতি সাধন কর। বিষ্ণুর নাম জেনে কীর্তন কর। হে বিষ্ণু! তুমি মহানুভব, তোমার মুমতি আমরা ভজন করি।
৪। রাজা বরুণ ও অশ্বিদ্বয় মরুৎবান বিধাতার কসে যজ্ঞে মিলিত হোন। অশ্বিদ্বয় এবং বিষ্ণু সখাবিশিষ্ট হয়ে উত্তম অহর্বিদ বলধারণ করেন এবং মেঘের আবরণ উন্মোচন করে।
৫। যে স্বগীয়, অতিশয় শোভনকর্মা বিষ্ণু শোভনকর্মা ইন্দ্রের সাথে মিলিত হয়ে আসেন, সে মেধাবী ত্রিজৎবিক্রমী আর্যকে প্রীত করেছেন এবং যজমানকে যজ্ঞের ভাগ প্রদান করেছেন।

১৫৭ সুক্ত।
অনুবাদঃ
১। ভূমির উপর অগ্নি গাজরিত হলেন, সূর্য উদিত হলেন, মহতী ঊষা তেজঃদ্বারা সকলকে আহ্লাদিত করে (তমঃ) দূরীকৃত করেছেন। হে অগ্নিদ্বয়। আগমেনর জন্য তোমাদের রথ যোজিত কর, সবিতা সমস্ত জগৎকে (স্বস্ব কর্ম করণে) নিয়োজিত করুন।
২। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা যখন বৃষ্টিপ্রদ রথ যোজনা করছ, তখন মধুর জলদ্বারা আমাদের বল বর্ধিত কর এবং আমাদের লোকজনকে অন্নদ্বারা প্রীত কর। আমরা যেন বীর যুদ্ধে ধনপ্রাপ্ত হই।
৩। অশ্বিদ্বয়ের চক্রত্রয়বিশিষ্ট মধুপূর্ণ, শীঘ্রগামী অশ্ববিশিষ্ট প্রশংসতি ত্রিবন্ধুর, ধনপূর্ণ সর্ব সৌভাগ্যসম্পন্ন রথ আমাদের অভিমুখে আসুক এবং আমাদের দ্বিপদ (পুত্রাদির) ও চতুস্পদ (গবাদির) সুখ সম্পাদন করুক।
৪। হে অশ্বিবদ্বয়! তোমরা উভয়ে আমাদের বল প্রদান কর, তোমাদের মধুমতী কথাদ্বারা আমাদের প্রীতি উৎপাদন কর, আমাদের আয়ু বৃদ্ধি কর, পাপ শোধন কর, দ্বেষকারীদের বিনাশ কর, সকল কর্মে আমাদের সহচর হও।
৫। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা উভয়ে গমনশীল গোপসমূহ মধ্যে এবং সমস্ত জগতের (প্রাণী সমূহের) অন্তঃস্থিত গর্ভ রক্ষা কর। হে অভীষ্টবর্ষিদ্বয়! তোমরা উভয়ে অগ্নি, জল ও বনস্পতিদের প্রবর্তিত কর।
৬। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা উভয়ে ঔষধ (জ্ঞানদ্বারা) ভিষক হয়েছে, রথবাহক অশ্বদ্বারা রথবান হেয়ছে। তোমদের বল অত্যন্ত অধিক, অতএব হে উগ্র অশ্বিদ্বয়! তোমাদের (আসক্তচিত্তে) হব্য প্রদান করে তাকে রক্ষা কর।

১৫৮ সুক্ত।
অনুবাদঃ
১। হে অভীষ্টবর্ষী, নিবাসপ্রদ, পাপনাশক, বহুজ্ঞানী, স্তুতিদ্বারা বর্ধমান, পূজিত, অশ্বিদ্বয়! আমাদের অভিমত ফলপ্রদান কর। যেহেতু উচথ্যপুত্র দীর্ঘতমা তোমাদের নিকট ধন প্রার্থনা করছে এবং তোমরা অকুৎসিতভাবে আশ্রয় প্রদান করে থাক।
২। হে নিবাসপ্রদ অশ্বিদ্বয়! তোমাদের এ অনুগ্রহের জন্য, কে তোমাদের হব্য প্রদান করতে পারে? যেহেতু বেপদে তোমরা অন্নের সাথে বহুতর ধন দান করতে ইচ্ছা কর। শরীরপুষ্টিকারী, শব্দায়মানা, বহুদুগ্ধবতী ধেনুসমূহ প্রদান কর। তোমরা যজমানের অভিলাষ পূরণে যেন কৃতসংকল্প হয়ে বিচরণ করছো।
৩। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের উদ্ধারকুশল, অশ্বযুক্ত রথ তৌগ্র্যরাজার নিমিত্ত বল প্রয়োগদ্বারা উত্তীর্ণ হয়ে সমুদ্র মধ্যে স্থাপিত হয়েছিল (১)। অতএব যেমন যুদ্ধজেতা বীর, দ্রুতগামী অশ্বে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করে, সেরূপ আমি তোমাদের আশ্রয়ার্থে শরণাগত হয়েছি।
৪। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের স্তুতি, উচ্যথ্য তনয়কে রক্ষা করুক! নিত্য প্রত্যবর্তনশীল অহোরাত্র যেন আমাকে শীর্ণ করতে না পারে, দশবার প্রজ্বলিত অগ্নি যেন আমাকে দগ্ধ করতে না পারে, কারণ তোমার আশ্রিত এ ব্যক্তি, পাশ বন্ধ হয়ে ভূমিতে লুষ্ঠিত হচ্ছে।
৫। মাতৃস্থানীয় নদী জল আমাকে যেন গ্রাস না করে, দাসেরা এ সঙ্কুচিতাঙ্গ বৃদ্ধকে নিন্মমুখে প্রক্ষেপ করেছে, ত্রৈতন এর মন্তক ছেদন করেছে, দাস স্বয়ং বক্ষঃস্থল ও অংশ দ্বয় আঘাত করেছে (২)।
৬। মমতার পুত্র দীর্ঘতমা, দশমযুগ অতীত হলে জীর্ণ হয়েছিল। যে সকল লোক কর্মফল পেতে বাসনা করে, তিনি তাদের নেতা এবং সারথি।
টীকাঃ
১। ১১৬ সুক্তের ৩ ঋক ও টীকা দেখুন।
২। সায়ণ দাসাঃ শব্দের অর্থ গর্ভদাস করেছেন, কিন্তু বেদের অন্যস্থলে যেরূপ এস্থলেও সেরূপ দাস অর্ধে অনার্য দস্যু হতে পারে। ত্রৈতন সম্বন্ধে ৫২ সুক্তের ৫ ঋকের টীকা দেখুন। ঋগ্বেদে ত্রিত নাম বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু ত্রৈতন নামের এ একবার মাত্র উল্লেখ আছে।

১৫৯ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। যজ্ঞের বর্ধক, মহান, যজ্ঞকার্যের চৈতন্যকারী, দ্যাবাপৃথিবীকে আমি বিশেষরূপে স্তব করি। যজমানেরা তাদের পুত্রস্বরূপ, তাদের কর্ম সুন্দর তারা অনুগ্রহ করে যজমানগণকে বরণীয় ধন প্রদান করেন। । আমি দ্রোহ রহিত পিতৃস্থানীয় দ্যুলোকের উদার এবং সদয় মন আহ্বান মন্ত্রদ্বারা জেনেছি। মাতৃস্থানীয় পৃথিবীর মনও জেনেছি। পিতামাতা দ্যাবাপৃথিবী নিজ সামর্থ্য দ্বারা পুত্রগণকে বিশেষরূপে রক্ষা করে প্রভূত, বিস্তীর্ণ অমৃত প্রদান করুন।
৩। তোমাদের পুত্র, সুকর্মা, সুদর্শন প্রজাগণ, তোমাদের পূর্ব অনুগ্রহ স্মরণ করে, তোমাদের মহৎ ও মাতা বলে জানেন; পুত্রভূত স্থাবর ও জঙ্গমগণ দ্যাবাপৃথিবী, ভিন্ন আর কাকেও জানে না, তোমরা তাদের রক্ষার নিমিত্ত অবাধ স্থান প্রদান কর।
৪। দ্যাবাপৃথিবী, সহোদরা ভগিনী এবং একস্থান স্থিতা মিথুন। প্রজ্ঞাবিশিষ্ট চৈতন্যকারী। রশ্মিগণ তাদের পরিচ্ছেদ করছে স্থব্যাপারনিরত, সুদীপ্ত রশ্মিগণ দ্যোতমান অন্তরীক্ষের মধ্যে নূতন নুতন তন্তু বিস্তার করছে।
৫। আমরা অদ্য সবিতার অনুমতি অনুসারে সে বরণীয় ধন প্রার্থনা করি। দ্যাবাপৃথিবী আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করে গৃহাদি বিশিষ্ট এবং শত শত গোবিশিষ্ট ধন প্রদান করুন।

১৬০ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। দ্যাবা পৃথিবী জগতের সুখদায়িনী, যজ্ঞবতী, উদকোৎপাদনার্থ প্রযত্নবতী ও সুজাতা, নিজকার্যে প্রগল্ভা। দ্যোতমানা শুচি, দীপ্যমান সবিতা দ্যাবাপৃথিবীর অন্তরালে স্বকার্যে সর্বদা গমন করেন।
২। বিস্তীর্ণা, মহতী ও পরস্পর বিষুক্তা পিতা মাতা (দ্যাবাপৃথিবী) ভূতসমূহকে রক্ষা করছেন। দ্যাবাপৃথিবী শরীরীদের মঙ্গলের জন্যই যেন সযত্না, কারণ পিতা সমুদয় পদার্থকে রূপ প্রদান করছেন।
৩। আদিত্য পিতা মাতা স্বরূপ দ্যাবাপৃথিবীর পুত্র। তিনি ধীর এবং ফলপ্রদায়ী তিনি স্বীয় প্রজ্ঞাদ্বারা সমস্ত ভূতগণকে প্রকাশ করছেন। তিনি পৃশ্নি (১) ধেনু ও সেচন সমর্থ বৃক্ষকে প্রকাশ করছেন ও দ্যুলোক হতে নির্মল জল দোহন করছেন।
৪। তিনি দেবতাগণের মধ্যে দেবতম কর্মবানগণের মধ্যে কর্মবত্তম। তিনি সর্বসুখপ্রদ দ্যাবাপৃথিবীকে উৎপন্ন করেছেন এবং প্রাণীগণের সুখের জন্য দ্যাবাপৃথিবীকে পরিচ্ছেদ করেছেন। তিনি দৃঢ়তর শঙ্কু দ্বারা এদের স্থির করে রেখেছেন।
৫। হে দ্যাবাপৃথিবী। আমরা তোমাদের স্তব করি। তোমরা মহৎ আমাদের প্রভূত অন্ন ও বল প্রদান কর, যা দিয়ে আমরা সর্বকালেই (পুত্রাদি) প্রজা বিস্তার করব। আমাদের শরীরে প্রশংসনীয় বল বৃদ্ধি করে দাও।
টীকাঃ
১। সায়ণ পৃশ্নি শব্দের অর্থ শুক্রবর্ণ করেছেন । কিন্তু পৃশ্নি ধেনুর প্রকৃত অর্থ নানা বর্ণযুক্ত বৃষ্টিদাতা মেঘ বা আকাশ; মরুৎগণের মাতা। এ সম্পর্কে ২৩ সুক্তের ১০ ঋকের টীকা দেখুন।

(C) https://www.ebanglalibrary.com



0 comments

ঋগ্বেদ সংহিতা - প্রথম মণ্ডলঃবিভিন্ন ঋষিঃ সুক্তঃ ১৩১-১৪৫

১৩১ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। অসুর দ্যৌ স্বয়ং ইন্দ্রের নিকট নত হয়েছে। সুবিস্তৃতা পৃথিবী বরণীয় স্তুতি দ্বারা ইন্দ্রের নিকট নত হয়েছে। অনেনর নিমিত্ত (যজমানগণ) বরণীয় হব্য দ্বারা নত হয়েছে। সমস্ত দেবগণ একমতে ইন্দ্রকে অগ্রণী করেছেন। মানুষদের সমস্ত যজ্ঞ এবং মানুষদের সমস্ত দানাদি ইন্দ্রের সুখের জন্য হোক।
২। হে ইন্দ্র! তোমার নিকট অভিমত ফললাভ করবার আশায় যজমানগণ প্রত্যেক সবনে তোমাকে হব্য প্রদান করে। তুমি সকলের প্রতি একরূপ। স্বর্গলাভার্থ তোমাকেই পৃথক করে হব্য প্রদান করে। পার হবার সময় যেরূপ নৌকা স্থাপন করে, আমরা সেনাগণের অগ্রদেশে সেরুপতোমাকে স্থাপন করব। মানুষগণ যজ্ঞদ্বারা ইন্দ্রকেই চিন্তা করে। মানুষগণ স্তুতিদ্বারা ইন্দ্রকে চিন্তা করে।
৩। হে ইন্দ্র! তোমার সেবক এবং পাপদ্বেষী যজমান দম্পতী (১) তোমার তৃপ্তির অভিলাষে অধিক পরিমাণে হব্যদান করতঃ তোমার উদ্দেশে বহুসংখ্যক গোধন লাভের জন্য যজ্ঞ বিস্তার করছে। তারা গোধন ইচ্ছা করে এবং স্বগৃ গমনে উৎসুক, তুমিই তাদের অভীষ্ট প্রদান কর। হে ইন্দ্র! তুমি অভীস্টবর্ষী, তুমি তোমার সহজন্মা এবং চিরসহচর বজ্রকে আবিস্কার করে রয়েছ।
৪। হে ইন্দ্র, মানুষেরা তোমার বীর্য জানত। তুমি যে শত্রুদের শারদীপুরি (২) সমূহ নষ্ট করেছিলে, তাদের পরাজিত করে নষ্ট করেছিলে সে কথা মানুষেরা জানত। হে বরপতি ইন্দ্র! তুমি যজ্ঞ বিঘাতী মানুষকে শাসন করেছিলে, তুমি সুবিস্তৃত পৃথিবী ও এবং জলরাশিকে জয় করেছিলে, তুমি আনন্দ সহকারে জল কেড়ে নিয়েছিলে।
৫। হে ইন্দ্র! সোম পানে হৃষ্ঠ হলে তুমি অভীষ্টবর্ষী হও, যেহেতু তুমি যজমানদের রক্ষা করে থাক, তোমর বন্ধুতাভিলাষী যজমানদের রক্ষা করে থাক। অতএব তারা তোমার বীর্য বৃদ্ধির জন্য বার বার হব্য প্রদান করছে। তুমি যুদ্ধ সুখভোগের জন্য সিংহনাদ করেছিলে। তারা তোমার নিকট নানাবিধ ভোগ্য বস্তু প্রাপ্ত হয়। অন্নবথী হয়ে তোমার নিকট প্রাপ্ত হয়।
৬। ইন্দ্র আমাদের প্রাত:কালের যজ্ঞ সেবা করবেন কি? হে ইন্দ্র! আহ্বান মন্ত্র দ্বারা প্রদত্ত পূজার্থ হব্য অবগত হও। আহ্বান মন্ত্রদ্বারা আহূত হয়ে সুখ ভোগের স্থানে উপস্থিত হও। হে বজ্রযুক্ত ইন্দ্র! ন্দিুকদের নাগের জন্য অভীষ্টবর্ষী হয়ে প্রবুদ্ধ হও। হে ইন্দ্র! আমি মেধাবী ও নুতন লোক, তুমি স্তুতিমান, আমার মনোহর স্তোত্র শোন।
৭। হে বহুগুণাম্বিত ইন্দ্র হে শুর! তুমি আমাদরে স্তুতিদ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছ এবং আমাদরে প্রতি সন্তুষ্ট আছ। যে ব্যক্তি আমাদরে প্রতি শত্রুতাচরণ করে এবং যে আমাদের দুঃখ ইচ্ছা করে, বজ্রদ্বারা তাকে বিনাশ কর। হে শ্রবণোৎসুক! শ্রবণ কর। হে ইন্দ্র! পথে পরিশ্রান্ত ব্যক্তিকে যে দুর্মতিগণ পীড়া দেয় সেরূপ সমস্ত দুর্মতি (৩) আমাদের নিকট হতে দূর হোক, দূর হোক।
টীকাঃ
১। এ থেকে প্রতীয়মান হয়ে যে স্ত্রী পুরুষে একত্রে যজ্ঞ সম্পন্ন করতেন।
২। শারদীসম্বৎসরসম্বন্ধিনী সম্বৎসরপর্যান্তং প্রাকারপরিখাদিভি দৃঢ়ীক্বতা সায়ণঃ Perennial, Wilson. Les villes (celestes) de lautomne.- Langlois.
৩। সে সময় আর্য গ্রামপ্রান্তে ও ভ্রমণ পথে অনেক অনার্য দস্যু বাস করত এবং সুবিধে অনুসারে আর্য দের প্রতি অহিতাচরণ করত, তা ঋগ্বেদের অনেক স্থলেই দেখা যায়।
১৩২ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে মঘবন ইন্দ্র! আমরা তোমার দ্বারা রক্ষিত হয়ে প্রবল সেনাযুক্ত শত্রুদের পরাভব করব। প্রহারোদাত শত্রুকে প্রহার করব। হে ইন্দ্র! পূর্ব ধনবিশিষ্ট এ যজ্ঞ নিকটবর্তী, অতএব অদ্য সবনকারী যজমানের উৎসাহ বর্ধনার্থে কথা কও। হে ইন্দ্র! তুমি যুদ্ধজয়ী, আমরা তোমার উদ্দেশে হব্য আহরণ করি। তুমি যুদ্ধজয়ী।
২। শত্রু বধের জন্য ইন্তস্ততঃ ধাবমান বীরপুরুষের স্বর্গসাধন এবং কপটাদি রহিত পথস্বরূপ সংগ্রামের অগ্রভাগে ইন্দ্র প্রাত:কালে প্রবৃদ্ধ যাজ্ঞিক দের শত্রুগণকে নাশ করেন। ইন্দ্রকে সর্বজ্ঞের ন্যায় অবনত মন্তরক স্তব করা সকলের কর্তব্য। হে ইন্দ্র। তোমার প্রদত্ত ধন একযোগে আমাদেরই হোক। তুমি ভদ্র তোমার প্রদত্ত ধন অবিচালিত হোক।
৩। হে ইন্দ্র! পূর্বের ন্যায় এখনও অতি বীপ্ত প্রসিদ্ধ হব্যরূপ অন্ন তোমারই হতে হবে। তুমি যজ্ঞের নিবাসস্থানস্বরূপ। ঋত্বিকগণ যে অশ্নদ্বারা স্থান সুশোভিত করে, সে অন্ন তোমারই হবে। তুমি (যজ্ঞের) কথা বল, তা হলে লোকে আকাশ ও পৃথিবীর মাধ্য সূর্য কিরণদ্বারা দেখতে পায়। ইন্দ্র জরাগ্বেষণে তৎপর। তিনি স্বীয় বন্ধু যজমানদের জন্য গো অন্বেষণ করেন। তিনি উক্ত ক্রমে সকল কথা জানেন।
৪। হে ইন্দ্র! তোমার কর্ম পূর্বকালের ন্যায় এখনও সকলের স্তুতির যোগ্য। তুমি অঙ্গিরাগনের জন্য মেঘ উদ্ঘাটন করেছিলে, তুমি অপহৃত গোধন উদ্ধার করে তাদের অর্পণ করেছিলে। হে ইন্দ্র! তুমি উক্ত ঋষিদের ন্যায় আমাদের জন্য যুদ্ধ কর এবং জয়লাভ কর। যারা অভিষবন করে তাদরে জন্য যজ্ঞ বিঘ্নকারীদের অবনত কর। যে যজ্ঞবিঘ্নকারীগণ রোষ প্রকাশ করে, তাদরে (অবনত কর)।
৫। যেহেতু শুর ইন্দ্র কর্মদ্বারা মানুষদের বিষয়ে যথার্থ বিচার করেন সেজন্য অন্নাভিলাষী যজমানগণ, অভিমত ধনলাভ করে শত্রুদের বিনাশ করে। অন্মাভিলাষী হয়ে তারা বিশেষরূপে যজ্ঞ করে। ইন্দ্রের উদ্দেশে প্রদত্ত অগ্ন পুত্তাদি লাভের কারণ। নিজ বলে শত্রু নিবারণার্থ লোকে ইন্দ্রের পূজা করে। যজ্ঞকারীগণ ইন্দ্রের সমীপে বাসস্থান প্রাপ্ত হয়, যজ্ঞকারীগণ যেন দেবতাদের সম্মুখেই থাকে।
৬। হে ইন্দ্র ও গর্জন্য! তোমরা দুজনে অগ্রগামী হয়ে যে শত্রু আমাদরে বিরুদ্ধে সেনা সংগ্রহ করে তাদের সকলকেই বনাশ কর। বজ্র প্রহারদ্বারা তাদের সকলকেই বিনাশ কর। এ বজ্র অতিদূরগামী শত্রুকেও বিনাশ করতে ইচ্ছা করে এবং অতি গহন স্থানেও ব্যাপ্ত হয়। হে শুর ইন্দ্র! তুমি আমাদরে সমস্ত শত্রুদের বিবিধ উপায় বিদীর্ণ কর। শত্রু বিদারক বজ্র বিবিধ উপায়ে বিদীর্ণ করে।
১৩৩। সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। আমি যজ্ঞদ্বারা আকাশ ও পৃথিবী উভয়কে পবিত্র করি। ইন্দ্রশুন্যা বিদ্রোহিণী পৃথিবীকে (পৃথিবীর যে অংশে ইন্দ্রের পুজা না হয়) সন্দগ্ধ করি। শত্রুরা যেখানেই একত্রিত হয়েছিল সেখানেই হত হয়েছে। সম্পূর্ণ রূপে বিনষ্ট হয়ে তারা শ্মশানের চারদিকে পড়ে আছে।
২। হে শত্রু ভক্ষক ইন্দ্র! তুমি হিংসাবতী সেনার মন্তব একত্র করে তোমার বিস্তৃত পথদ্বারা ছেদন কর। তোমার পদ মহা বিস্তীর্ণ।
৩। হে মঘবন! এ হিংসাবতী সেনার বল চুর্ণু কর এবং কুৎসিত শ্মশানে অথবা মহা শ্মশানে নিক্ষেপ কর।
৪। হে ইন্দ্র! তুমি এরূপ ত্রিগুণিত পশ্চাশৎ সংখ্যক সেনা নাশ করেছ। লোকে তোমার এ কার্যকে অত্যন্ত ভাল মনে করে। কিন্তু তোমার এ কার্য সামান্য।
৫। হে ইন্দ্র! তুমি ঈষৎ রক্তবর্ণ অতি ভয়ঙ্কর শব্দকারী পিশাচকে বিনাশ কর এবং সমস্ত রাক্ষসগণকে নিঃশেষ কর।
৬। হে ইন্দ্র! তুমি প্রকান্ড মেঘকে নিষ্মমুখ করে বিদীর্ণ কর। আমাদের কথা শোন। হে মেঘবিশিষ্ট ইন্দ্র! পৃথিবী যেরূপ ভয়ে শোক করছে স্বর্গ ও সেরূপ শোক করছে। হে মেঘবিশিষ্ট ইন্দ্র! তাদের ভয় ঘণের ভয়ের ন্যায় (১)। হে ইন্দ্র! তুমি নিজবলে মহা বলবান এজন্য তুমি অতীব ক্রুর বধোপায় অবলম্বন করছ; তুমি যজমানদের বিনাশ কর না, তুমি শুর প্রাণিগণ তোমাকে আক্রমণ করতে পারে না। তুমি একবিংশীত অনুচরযুক্ত।
৭। হে ইন্দ্র! অভিষবকারী যজমান গৃহলাভ করে, সোমযাগকারী চারদিগের শত্রুদের বিনাশ করে, দেবতাদের শত্রুগণকেও বিনাশ করে। অন্নবান ও শত্রুর আক্রমণশূন্য অভিষবকারী অপরিমিত (ধন) লাভ করে। ইন্দ্র সোমযাগকারী যজমানকে চারদিকে উৎপন্ন ও অতি সমৃদ্ধ ধন প্রদান করেন (২)।
টীকাঃ
১। সায়ণ বলেন ঘৃণ দীপ্ত অগ্নির তির্তি বিশেষ ত্বষ্টা, পূর্বকালে জগৎ মহান্ধকারে আবৃত হলে ত্বষ্টৃরূপে পৃথিবী ও আকাশের অন্ধকার বিনাশ করেছিলেন।
২। ১২৯ হইতে ১৩৩ পাচটি সুক্তে আর্যদের সাথে ভারতবর্ষের আদিমবাসী অনার্য বর্বরদের যুদ্ধ ও বৈরতার অনেক উল্লেখ দেখা যায়। অনার্যদের কথার সাথে পিশাচ ও রাক্ষসদের কথা মিশ্রিত আছে।
১৩৪ সুক্ত।
অনুবাদঃ
১। হে বায়ু! শীঘ্রগামী বলবান অশ্বগণ তোমাকে অন্নের উদ্দেশে ও দেবতাদরে মধ্যে প্রথমেই সোমপানার্থ এ যজ্ঞে আনুক। আমাদের প্রিয় সত্য ও উন্নতি স্তুতি তোমার গুণ বিশেষরূপে ব্যাখ্যা করে, তা তোমার অভিমত হোক। হে বায়ু! যজ্ঞের হব্য স্বীকারার্থ এবং আমাদের অভীষ্টদানার্থ তুমি নিযুৎযোজিত (১) রথে এস।
২। হে বায়ু! মত্ততাজনক, হর্যোৎপাদক, সম্যক প্রস্তুত, উজ্জ্বল এবং মন্ত্রদ্বারা হুয়মান সোমবিন্দু সকল তোমার অভিমুখে গমন করে হর্ষ উৎপাদন করুক। যেহেতু স্বকর্মকুশল প্রীতিযুক্ত, তোমার নিরন্তর সহগামী নিযুৎগণ তোমায় উৎসাহ দেখে হবাস্বীকারের জন্য তোমাকে যজ্ঞভূমিতে আনয়নার্থে মিলিত হচ্ছে। বৃদ্ধিমান যজমানগণ তোমার নিকটে এসে মনোগতভাব ব্যক্ত করছে।
৩। বায়ু লোহিতবর্ণ অশ্ব ভারবহনার্থে যোজনা করেন। বায়ু অরৃণ অশ্ব যোজনা করেন। বায়ু অজিরবর্ণ অশ্ব (২) যোজনা করেন। কারণ তারা ভারবহনে অত্যন্ত সমর্থ। জার ঈষৎ নিদ্রাযুক্ত রমণীকে যেরূপ প্রবোধিত করে সেরূপ তুমি বহুপ্রজ্ঞ যজমানকে প্রবোধিত কর। আকাশ ও পৃথিবীকে প্রকাশ কর। উষাকে স্থাপন কর। হব্যস্বীকারার্থ ঊষাকে স্থাপন কর।
৪। দীপ্তিযুক্ত ঊষাগণ দুরদেশে তোমারই জন্যে গৃহাচ্ছাদক রশ্মিসমূহে কল্যাণকর বস্ত্র বিস্তার করছেন, নুতন রশ্মিতে বিচিত্র বস্ত্র বিস্তার করছেন। অমৃত নিসান্দিনী গাভী সবল তোমারই জন্য সমস্ত ধন দান করে। তুমি বৃষ্টি ও নদীদের উৎপাদনার্থ অন্তরীক্ষ হতে মরুৎগণকে উৎপাদন করেছ।
৫। দীপ্ত, শুদ্ধ, উগ্র, প্রবাহবিশিষ্ট সোম তোমার আনন্দের নিমিত্ত আহ্বানীয় অগ্নির নিকট যাচ্ছে এবং জলভারবাহী মেঘকে আকাঙ্ক্ষা করছে। হে বায়ু! যজমান অত্যন্ত ভীত ও ক্ষীণকায় হয়ে তস্করেরা যাতে অন্যত্র যায় সেজন্য তোমার পূজা করছে। আমাদের ধর্মহেতু আমাদরে সমস্ত ভূবন হতে রক্ষা কর আমাদের ধর্ম হেতু অসুর্য (৩) হতে রক্ষা কর।
৬। হে বায়ু! তোমার পূবে কেউ পান করে না, তুমিই প্রথমেই আমাদের এ সোম পান করবার যোগ্য; অভিযুত সোমপান করবার যোগ্য। তুমিই হোমবান পাপত্যাগী লোকের (হব্য স্বীকার কর)! সমস্ত ধেনুগণ তোমার জন্য দুগ্ধ প্রধান করে এবং তোমার জন্য ঘৃত প্রদান করে।
টীকাঃ
১। বায়ুর অশ্বের নাম নিযুৎ।
২। অজিরা অজিরৌ গমনশীলৌ যুক্তৌ যম্বা এতদুভয়ত্র সম্বধ্যত। সায়ণ;
৩। অসুর্যাৎ অর্থ অসুরসম্বন্ধিনো ভয়াৎ। সায়ণ। কিন্তু অসুর্য সম্বন্ধে ১৬৭ সুক্তের ৫ ঋকের টীকা ও ১৬৮ সুক্তের ৭ ঋক দেখুন।
১৩৫ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে নযুৎবান বায়! তুমি সহস্র নিযুতে আরোহণ করে তোমার জন্য প্রস্তুত হব্যভক্ষনার্থ আমাদের আস্তীর্ণ কুশোপরি অগমন কর। অসংখ্য নিুতে আরোহণ করে আগমন কর। তুমি নিযুৎবান তুমিই পূর্বে পান কর যে বলে অন্য দেবগণ সংযত হয়ে আছে। অভিষুত মধুর সোম তোমার আনন্দের জন্য অবস্থিতি করছে। যজ্ঞসিদ্ধির জন্য অবস্থিতি করছে।
২। হে বায়ু! তোমার জন্য প্রস্তরে পরিশোধিত ও স্পৃহনীয় তেজোবিশিষ্ট সোম, স্বীয় পাত্রে গমন করছে এবং শুক্রতেজোবিশিষ্ট হয়ে তোমার নিকট গমন করছে। এ সুন্দর সোম মনুষ্যগণ দেবতাদের মধ্যে তোমার জন্য প্রদান করে। হে বায়ু! তুমি আমাদের জন্য নিযুৎকে যোজনা কর এবং প্রস্থান কর, আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করে প্রীত হয়ে প্রস্থান কর।
৩। হে বায়ু! তুমি শত ও সহস্র সংখ্যক নিযুতে আরোহণ করে অভিমত সিদ্ধির জন্য এবং হবি ভক্ষণের জন্য আমার যজ্ঞে উপস্থিত হও। এ তোমার প্রাপ্যভাগ, এ সূর্যের তেজে তেজোবান। ঋত্বিক হস্তস্থিত সোম প্রস্তুত হয়েছে। হে বায়ু! পবিত্র সোম প্রস্তুত হয়েছে।
৪। আমাদের রক্ষার্থ আমাদের সুগৃহীত অন্নভক্ষণের নিমিত্ত এবং আমাদের হব্য সেবার্থ, হে বায়ু নিযুৎ যোজিত রথ তোমাদের দুজনকে অর্থাৎ ইন্দ্র ও বায়ুকে আনুক। তোমরা দুজনে মধুর সোম পান কর। অগ্রে পান করাই তোমাদের উপযুক্ত। হে বায়ু! তুমি মনোহর ধনের সাথে এস। ইন্দ্রও ধনের সাথে আসুন।
৫। হে ইন্দ্র! হে বায়ু! আমাদের স্তোত্রাদি তোমাকে যজ্ঞস্থলে আসিবার জন্য প্রবর্তিত করছে। আশুগামী অশ্বকে যেরূপে মার্জনা করে সেরূপ কলস হতে আনীত সোমকে ঋত্কিগণ মার্জনা করছে। অধর্যুদের সোমপান কর, আমাদের রক্ষার্থ যজ্ঞে এস। আমাদের প্রতি প্রসন্ন হয়ে আনন্দের জন্য প্রস্তর খন্ডে অভিষুত সোমপান কর, কারণ তোমরা উভয়েই অন্নদাতা।
৬। আমাদের এ যজ্ঞ কার্যে অভিযুত অধ্যর্যুগণের গৃহীত সোম নিশ্চয়ই তোমাদের দুজনের। এদীপ্ত সোম নিশ্চয়ই তোমাদের এ প্রভূত সোম নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য উর্ণাময় পবিত্রে পরিস্কৃত হয়েছে। তোমাদের সোম অছিন্ন লোম অতিক্রম করে প্রচুর পরিমাণে গমন করছে
৭। হে বায়ু। তুমি নিদ্রালু যজমানদের অতিক্রম করে যে গৃহ প্রস্তর শব্দ হচ্ছে সেখানে যাও। ইন্দ্রও সে গৃহে আসুন। যে গৃহে প্রিয় সত্য স্তুতি উচ্চারিত হচ্ছে, যে গৃহে ঘৃত গমন করছে পুষ্টাঙ্গ নিযুৎগণের সাথে সে অধুরস্থানে এস, ইন্দ্র। সেই স্থানে এস।
৮। হে বায়ু! তোমরা এ যজ্ঞে মধু সদৃশ আহুতি ধারণ কর, যে আহুতির জন্য জেত যজমানেরা পর্বতাদি প্রদেশ গমন করেন। আমাদরে জেতৃগণ যজ্ঞ নির্বাহে সমর্থ হোক। হে ইন্দ্র! হে বায়ু! ধেনুগণ যুগপৎ দুগ্ধ দান করছে এবং যব নিমিত হব্য প্রস্তুত হচ্ছে। এ ধেনুগণ ক্ষীণ হবে না এবং নষ্ট হবে না।
৯। হে বায়ু। এই যে তোমার বলশালী, অল্পবয়স্ক, বৃষসদৃশ অতিশয় হৃষ্টপুষ্ট অশ্বগণ আছে, এরা স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যে তোমাকে বহন করছে, এরা অন্তরীক্ষে বিলম্ব করে না এরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতি, ভৎসনায় এদের গতি রোধ হয় না। সূর্যকিরণের ন্যায় এদের গতি রোধ করা দুৎসাধ্য, হস্তদ্বারা এদের গতি রোধ করা দুঃসাধ্য।

১৩৬ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে ঋত্বিকগণ! চিরন্তন মিত্রাবরুণের উদ্দেশে প্রশংসনীয় ও প্রবৃদ্ধ পরিচর্যা কর এবং হব্য প্রদানে কৃতনিশ্চয় হও। মিত্রাবরুণ যজমানদের সুখদানের কারণ এবং সুস্বাদু হব্য ভক্ষণ করেন। এরা সম্রাট, এদের জন্য ঘৃত গৃহীত হয়। প্রতি যজ্ঞেই এদের স্তব হয়। এদের শক্তি কেউ অতিক্রম করতে পারে না এবং এদের দেবত্বে কেউ সন্দেহ করে না।
২। বরীয়সী ঊষা বিস্থীর্ণ যাত্রাভিমুখে গমন করেছেন, দৃষ্ট হল। দ্রুতগতি আদিত্যের পথ আলোক ব্যাপ্ত হল। ভগের কিরণে মনুষ্যের চক্ষুঃ উন্নীলিত হল। মিত্র অর্যমা এবং বরুণের উজ্জ্বল গৃহ আলোকে পরিপূর্ণ হল, অতএব তোমরা দুজনে স্তুতিযোগ্য প্রভূত অন্ন ধারণ কর, প্রশংসনীয় এবং প্রভূত অন্নধারণ কর।
৩। যজমান জ্যোতিস্মতী সম্পূর্ণলক্ষণা স্বর্গপ্রদায়িনী বেদি প্রস্তুত করেছেন। তোমরা সর্বদা জাগরুক থেকে প্রতিদিন সেখানে উপস্থিত হয়ে তেজঃ ও বললাভ কর। তোমরা অদিতির পুত্র এবং সর্ব প্রকার দানের কর্তা। মিত্র বরুণ লোকদের স্ব স্ব ব্যাপারে নিয়োজিত করেন, অর্যমাও স্ব স্ব ব্যাপারে লোকদের নিয়োজিত করেন।
৪। এ সোম মিত্র ও বরুণের প্রীতিপ্রদ হোক। মিত্রাবরুণ নিন্মমুখ হয়ে এ পান করুন। দীপ্য মান সোম, দেবগণের সেবার উপযুক্ত। সমস্ত দেবগণ অত্যন্ত প্রীতিযুক্ত হয়ে এ পান করুন। হে দীপ্তিযুক্ত মিত্রাবরুণ। আমরা যেরূপ প্রার্থনা করি, তোমরা সেরূপ কর। তোমরা সত্যবাদী যা প্রার্থনা করি তা কর।
৫। যে ব্যক্তি মিত্র ও বরুনের পরিচর্যা করে তাকে তোমরা পাপ হতে রক্ষা কর। দ্বেষ রহিত হব্যদাতা মর্তাকে সমস্ত পাপ হতে রক্ষা কর। ঋজুস্বভাব সে ব্যক্তিকে তার ব্রতের উদ্দেশে অর্যমা রক্ষা করেন। সে যজমান উকথদ্বারা মিত্র ও বরুণের ব্রত গ্রহণ করেন এবং স্তোমের দ্বারা তা রক্ষা করেন।
৬। আমি দ্যুতিমান মহান সূর্যকে নমস্কার করি পৃথিবী ও আকাশকে নমস্কার করি, মিত্র ও বরুণকে এবং রুদ্রকে নমস্কার করি। এরা সকলেই অভিমত ফলদায়ী এবং সুখদায়ী। ইন্দ্র, অগ্নি, দীপ্তিমান অর্ধমা ও ভগকে স্তব কর। বহুকাল জীবন ধারণ করে আমরা প্রজা কর্তৃক পরিবেষ্টিত হব এবং সোম কর্তৃক রক্ষিত হব।
৭। আমরা ইন্দ্রকে প্রাপ্ত হয়েছি, মরুৎগণ আমাদের অনুগ্রহ করেন), দেবতারা যেন আমাদরে রক্ষা করেন। ইন্দ্র, অগ্নি, মিত্র, ও বরুণ আমাদের সুখপ্রদ হোন, আমরা অন্নবান হয়ে সে সুখভোগ করি।

১৩৭ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। বহুজন পূজিত পুযার শক্তির মহিমা সর্বত্র প্রশংসিত হয়। কেউ তার হিংসা করে না। পূষার স্তোত্রের বিরাম নেই। আমি সুখলাভের ইচ্ছায় পূষার পূজা করি, তিনি শীঘ্রই আশ্রয় দান করেন ও সুখ উৎপাদন করেন। পূযা যজ্ঞবানু তিনি সমস্ত লোকের মনের সাথে মিশ্রিত হন।
২। শীঘ্রগমনে অশ্বের যেরূপ প্রশংসা হয়, সেরূপ হে পুষা। স্তোম মন্ত্রদ্বারা তোমার প্রশংসা করি। তুমি যুদ্ধে যাও এ উদ্দেশে তোমার প্রশংসা করি। তুমি উষ্ট্রের ন্যায় আমাদরে যুদ্ধে পার কর। তুমি সুখোৎপাদক দেবতা, আমি মর্ত্য, সখালাভের জন্য তোমাকে আহ্বান করি। আমার আহ্বানসমূহকে দ্যুতিমান কর এবং সংগ্রামে জয়শীল কর।
৩। হে পূষা! তোমার সখ্যলাভ করে বিশেষ ক্রতুদ্বারা তোমায় প্রীতি উৎপাদন করে স্তোত্রশীল যজমানগণ তোমাকর্তৃক রক্ষিত হয়ে নানা ভোগ উপভোগ করে। নুতন আশ্রয় লাভ করে তোমার নিকট অসংখ্য ধন প্রার্থনা করি। হে বহুজন স্তুত্য পুষা অনাদর না করে আমাদের অভিগম্য হও, যুদ্ধকালে আমাদের অগ্রগামী হও।
৪। হে অজাশ্ব (১) পুষা! আমাদের লাভ বিষয়ে অনাদর না কের, দানশীল হয়ে সমীপন্থ হও। হে অজাশ্ব! আমরা অশ্মাভিলাষী, আমাদের সমীপস্থ হও। হে শত্রুনাশক পুষা। তোমারই চার দিকে আমরা স্তোম পাঠ করে অবস্থিতি করি। হে বৃষ্টিপ্রদ পূষা। তোমার কখনও অপমান করি না এবং তোমার সখ্যের কখনও অপলাপ করি না।
টীকাঃ
১। অর্থাৎ অজই যার বাহন। অজাশ্বেতি পুষণমাহ। যাস্ক। পূষা সম্বন্ধে ৪২ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন। সূর্যকে পশুপালকগণ যেরূপ ভাবে দর্শন করত ও পুজা করত সে সূর্যই পূষা।

১৩৯ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। আমি ভক্তিপূর্বক অগ্নিকে সম্মুখে স্থাপন করেছি, তার স্বগীর্য় শক্তি বরণ করি। ইন্দ্র ও বায়ুকে বরণ করি। যেহেতু পৃথিবীর দীপ্তিমান নাভির, (যজ্ঞস্থানের), উদ্দেশে অর্থবতী নুতন স্তুতি রচিত হয়েছে অতএব অগ্নি তা শুনুন। অনন্তর আমাদের ক্রিয়াকম, যেরূপ অন্যান্য দেবতাগণের নিকট যায় সেরূপ তোমাদের অর্থাৎ ইন্দ্র ও বায়ুর নিকট যাক।
২। হে কর্মদক্ষ মিত্র। হে বরুণ। তোমরা নিজ শক্তি দ্বারা সূর্যের নিকট হতে যে নশ্বর জল লাভ কর, তা আমাদের প্রচুর পরিমাণে দাও; অতএব আমরা ক্রিয়া, কর্ম জ্ঞান, সোমরসে (আসক্ত) ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে যজ্ঞশালায় তোমাদের কিরণময় রূপ দর্শন করি।
৩। হে অশ্বিদ্বয়। স্তুতি দ্বারা তোমাদের আপনার অভিমুখে আসছে। হে সবর্চধনসম্পন্ন অশ্বিদ্বয় তারা সর্বপ্রকার ধনবান্যাদি ও অন্ন তোমাদের প্রসাদে প্রাপ্ত হচ্ছে। হে দস্র। তোমার হিরময় রথের নেমি সকল মধূক্ষরণ করে। সে রথে হবে গ্রহণ কর।
৪। হে দস্রদ্বয়! তোমাদের (মনোগত ভাব) সকলে জানে তোমরা স্বর্গে যেতে চাও। তোমাদের সারথিরা স্বর্গপথে রথযোজনা করে। অশ্বগণ রথ নষ্ট করে না। হে দস্রদ্বয়! আমরা তোমাদের সারথিরা স্বর্গ পথে রথযোজনা করে। অশ্বগণ রথ নষ্ট করে না। হে দস্রদ্বয়! আমরা তোমাদের বন্ধুর যুক্ত হিরময় রথে স্থাপন করেছি। তোমরা সুখগম্য পথে স্বর্গে যাচ্ছ। তোমরা শত্রুদের পবাভুত কর এবং নবিশেষরূপে বুষ্টির ব্যবস্থা কর।
৫। আমাদের ক্রিয়াকর্মই তোমাদের ধন। আমাদের কির্মে রক্রয়ী জন্য দিনরাত অভীষ্ট প্রদান কর। তোমাদের ধন যেন বন্ধ হয় না, আমাদের দানো যেন বন্ধ না হয়।
৬। হে অভীষ্টবর্ষী ইন্দ্র! এ সোম অভীষ্টবর্ষীর পানার্থ অভিষুত হয়েছে, প্রস্তরখন্ডদ্বারা অভিষুত হয়েছে। সোম সকল পর্বতে উৎপন্ন হয়েছে, এ তোমার জন্য অভিষুত হয়েছে। বহুবিধ বিচিত্র লাভের জন্য যজ্ঞস্থানে প্রদ্ত্ত সোম তোমার তৃপ্তি সাধন করুক। হে স্তুতিযোগ্য! আমরা তোমার স্তুতি করি, তুমি এস, আমাদের প্রতি তুষ্ট হয়ে এস।
৭। হে অগ্নি! তোমাকে স্তুতি করি, তুমি আমাদের স্তুতি শ্রবণ কর। দীপ্যমান যজ্ঞার্হ দেবগণের নিকট যজা মানের কথা বল, যেহেতু দেবগণ অঙ্গিরাদের প্রসিব্ধ ধেনু দিয়েছিলেন। অর্যম দেবতাগণের সাথে সে ধেনু সর্বোৎপাদক অগ্নির জন্য দোহন করেন। অর্যমা জানেন সে ধেনু আমাদের সাথে সমবেত।
৮। হে মরুৎগণ! তোমাদের নিত্য প্রসিদ্ধ বল যেন আমাদের রপরাভূত না করে। আমাদের ধন যেন ক্ষীণ না হয়, আমাদের নগর ক্ষীণ না হয়। তোমাদের নতুন, বিচিত্র মনুষ্য দুলর্ভ, শব্দায়মান, যা কিছু আছে তা যুগে যুগে আমাদের হোক। তোমরা যে দুর্লভ ধন ধারণ কর, তা আমাদের হোক। শত্রুরা যে ধন নষ্ট করতে পারে না তা আমাদের হোক।
৮। প্রাচীন দধীচি, অঙ্গিরা,প্রিয়মেধ কন্ব, অত্রি এবং মনু আমারজন্ম কথা জানেন। এ পূর্বকালীন ঋষিগণ ও মনু আমার পূর্ব পুরুষগণকে জানেন। কারণ মহর্ষি গণের (১ মধ্যে তারা দীর্ঘায়ুঃ এবং আমার জীবনের সাথে তাঁদের সম্বন্ধ আছে। আমি তাঁদের মহৎপদ হেতু তাঁদের স্তৃতি করি ও নমস্কার করি। আমি ইন্দ্র ও অপিনকে স্তুতি করি ও নমস্কার করি।
১০। হোতা যজ্ঞ করুন, হব্য লাভেচ্ছু দেবগণ বরণীয়সোম গ্রহণ করুন। বহুপতি নিজে ইচ্ছা করে প্রভুত, বরণীয়সোমদ্বারা যাগ করছেন। আমরা দুরদেশে প্রস্তর খন্ডের ধ্বনি শ্রবণ করলাম। সুক্রুতু যজমান নিজে জল ধারণ করেন এবং বহু বাসযোগ্য গৃহ ধারণ করেন।
১১। যে দেবগণ, স্বর্গে একাদশ পৃথিবীর উপরেও একাদশ, যখন অন্তরীক্ষে বাস করেন তখও একাদশ (৩), তাঁরা নিজ মহিমায় যজ্ঞ সেবা করেন।
টীকাঃ
১। এ ঋষিগণ বেদ রচনার সময় ও ‘পূর্ব কালীন ঋষি’ ও ‘দেব’ বলে বর্ণিত হয়েছেন। ভারতবর্ষে পূজা পদ্ধতি তাঁরাই অনেকটা প্রচার করেছিলেন তা অন্য স্থানে বলা হয়েছে। এই ৩৩ দেব সম্বন্ধে ৩৪ সুক্তের ১১ ঋকের টীকা দেখুন।

১৪০সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে অধ্বর্য্য! বেদীতে আসীন, নিজ প্রিয়ধামে প্রীতিহুক্তে এবং দ্যোতমান অপ্নির উদ্দেশে তুমি অন্নবৎ স্থান প্রস্তুত কর। সে পবিত্র জ্যোতিবিশিষ্ঠ দীপ্তবর্ণ, তমোবিনাশক স্থানের উপর বস্ত্রের ন্যায় মনোহর কুশ বিস্তার কর।
২। দ্বিজন্মা (১) অপ্নি তিন প্রকার অশ্ন সন্মুখে এনে ভক্ষণ করছেন। অপ্নির ভক্ষিত বস্তু অর্থাৎ ধনবান্যাদি, সম্বৎসরের মধ্যে আবার বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। অভীষ্টবর্ষী অপ্নি একই রপে ধারণ করে মুখো জিহবান সাহায্যে প্রবৃদ্ধ হন এবং অন্যরুপ ধারণ করে সকলকে নিবারণ করে বনবৃক্ষ সকলকে দপ্ধ করেন।
৩। অপ্নির মাতৃদ্বয় (কাষ্ঠদ্বয়) চলছে। এরা কৃষ্ণবর্গ হয়ে, দুজনেই এক কার্যক রছে এবং শিণু অপ্নিকে প্রাপ্ত হচ্ছ এ শিশুর শিখারুপ জিহ্বান পূর্বাভিমুখী। ইনি তমো নিবারণ করেন শীঘ্র উৎপন্ন হন, অল্পে অল্পে মিলিত হন। অতি যত্নে একে রক্ষঅ করতে হয়্ ইনি পালকে র সমৃদ্ধি সাধন করেন।
৪। অপ্নির শিখাগণ লঘুপতি কৃষ্ণপন্থা, শীঘ্রকারী অস্থির চিত্ত, গমনশীল স্পন্দমান, বায়ুচালিত ব্যাপ্তিবিশিষ্ট ও মোক্ষপ্রদ এবং মনস্বী যজমানের উপযোগী।
৫। যে সময়ে অপ্নি গর্জন করে, শ্বাস প্রক্ষেপ করে, বারবার বিস্তীর্ণ পৃথিবীকে স্পর্শ করে শব্দ করে, সেই সময়ে অগ্নির স্ফুলিঙ্গ সকল যুগপৎ চারদিকে গমন করে; অন্ধকার ধ্বংস করে চারদিকে গমন করে ও কৃষ্ণবর্ণ পথে উজ্জ্বল রূপ প্রকাশ করে।
৬। অগ্নি, পিঙ্গলবর্ণ ওষধিদের ভূষিত করে তন্মধ্যে অবতরণ করছেন। বৃষভ যেরূপ পত্নীদের দিকে ধাবন করে, সেরূপ শব্দ করতঃ অগ্নি ধাবিত হচ্ছেন; ক্রমে অধিকতর তেজস্বী হয়ে স্বশরীর দীপ্ত করছেন; দুধর্ষ রূপ ধারণ করে ভয়ঙ্কর পশুর ন্যায় শৃঙ্গ চালন করছেন।
৭। অগ্নি কখন প্রচ্ছন কখন দিন্তীর্ণ হয়ে ওষধিসমূহে ব্যাপ্ত হন; যজমানের অভিপ্রায় জেনেই যেন অভিপ্রায়জ্ঞ শিখাকে আশ্রয় করেন। শিখাগণ পুনরায় বর্ধিত হয়ে যাগযোগ্য অগ্নিকে প্রাপ্ত হন এবং সকলে মিলিত হয়ে পিতৃস্থানীয়া স্বর্গ ও পৃথিবীর অপূর্ব রূপ বিস্তার করেন।
৮। কেশস্থানীয় অগ্রেস্থিত শিখাগণ অগ্নিকে আলিঙ্গন করছে; অগ্নি আসছেন দেখে মৃতপ্রায় হলেও উর্ধ্বমুখ হয়ে প্রত্যুদুগমন করছে। অগ্নি তাদের জরা মোচন করে উৎকৃষ্ট সামর্থ ও অখন্ড জীবন প্রদান করে গর্জন করতে করতে আসছেন।
৯। অগ্নি মাতা পৃথিবীর উপরিভাগের আচ্ছাদন তৃণগুষ্মালি লেহন করতে করতে প্রভূত শব্দকারী প্রাণীগণের সাথে বেগে গমন করছেন: পাদবিশিষ্ট পশুদের আহার প্রদান করছেন; সর্বদা লেহন করছেন এবং ক্রমশঃ যে পথে যাচ্ছেন তা কৃষ্ণবর্ণ করে যাচ্ছেন।
১০। হে অগ্নি! তুমি অভীষ্টবর্ষী ও দানশীল হয়ে শ্বাস প্রক্ষেপ করে আমাদের ধনাঢ্য গৃহে দীপ্ত হও; শিশুমতি ত্যাগ করে যুদ্ধকালে বর্মের ন্যায় বারবার (শত্রুদের) দূর করে দিয়ে জ্বলে ওঠ।
১১। হে অগ্নি! এ যে কঠিন কাষ্ঠোপরি যত্নপূর্বক হব্য স্থাপিত হয়েছে এ তোমার মনোমত প্রিয়বস্তু হতেও প্রিয়তর হোক। তোমার শরীরের শিখা হতে যে নির্মল ও দীপ্ত তেজ নির্গত হচ্ছে তার সাথে তুমি আমাদরে রত্ন প্রদান কর।
১২। হে অগ্নি! আমাদের রথ ও গৃহের জন্য দৃঢ় দাড় ও পাদ বিশিষ্ট নৌকা প্রদান কর। এ আমাদের বীরগণকে, ধনবাহীদের ও অন্য লোকদের পার করবে এবং আমাদের সুখে রাখবে।
১৩। হে অগ্নি! আমাদের উকথ মন্ত্রের উৎসাহ বর্ধন কর। দ্যাবাপৃথিবী ও স্বয়ং গামিনী নদী সকল আমাদের গব্য ও শস্য প্রদান করে উৎসাহ বর্ধন করুক; অরুণবর্ণ ঊষাগণ, সর্বকাল লভ্য বরণীয় অন্নাদি প্রদান করুন।
টীকাঃ
১। দুখানি কাষ্ঠ ঘর্ষণ, করে যে অগ্নি উৎপাদন করা যায়, সেই অগ্নিকে দ্বিজন্মা বলে।
১৪১ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। দ্যুতিমান অগ্নির দর্শনীয় তেজঃ সত্যই এরূপে শরীরের জন্য লোকে ধারণ করে, এ শরীর বলে উৎপন্ন হয়েছে (১)। আমার জ্ঞান অগ্নির তেজকে আশ্রয় করে তা দিয়ে স্বীয় অভীষ্ট সিদ্ধি করতে পারে অতএব সে অগ্নির উদ্দেশে স্তুতি ও হব্য অর্পণ করা যায়।
২। প্রথমতঃ অন্নসাধক, বপৃষ্মান ও নিত্য অগ্নি রয়েছেন, দ্বিতীয়তঃ শুভকরী সপ্তমাতৃকাতে রয়েছেন, তৃতীয়তঃ এ অভীষ্টবর্ষীর দোহনার্থ রয়েছেন। পরস্পর সংসক্ত দশদিক দশদিকেই পূজ্য অগ্নিকে উৎপন্ন করছেন (২)।
৩। যেহেতু মহাযজ্ঞের মুল হতে যজ্ঞের রূপসিদ্ধি করণে সমর্থ ঋত্বিকগণ বলপ্রয়োগ দ্বারা অগ্নিকে উৎপন্ন করছেন এবং অনাদিকাল হতে সুন্দররূপে প্রক্ষেপ করবার নিমিত্ত গৃহাস্থিত অগিনকে মাতরিশ্বা চালন করছেন।
৪। যেহেতু অন্নের উৎকৃষ্টতা লাভের জন্য অগ্নি প্রণীত হয়, যেহেতু আহারের জন্য অভিলষিত লতাসকল এর দন্তে আরোহণ করে, যেহেতু অধুর্য, এবং যজমান উভয়েই অগ্নির যাতে উৎপত্তি হয় তার চেষ্টা করে, অতএব পবিত্র অগ্নি যজমানের প্রতি অনুগ্রহ পুরঃসর ষবিষ্ট হলেন।
৫। যে মাতৃস্থানীয় দিক সমূহ মধ্যে অগ্নি অহিংসিত হয়ে বর্ধিত হচ্ছেন, এক্ষণে প্রদীপ্ত হয়ে তারাই মধ্যে প্রবেশ করছেন। স্থাপনকালে প্রথমতঃ যে সকল ওষধি প্রক্ষিপ্ত হয়েছিল অগ্নি তার উপরে আরোহণ করেছেন, এক্ষণে নুতন ও নিকৃষ্ট ওষধির প্রতি ধাবিত হচ্ছেন।
৬। হবিঃসম্পর্ককারী যজমান দ্যুলোকবাসীদের প্রীতির নিমিত্ত হোম নিম্পাদক অগ্নিকে বরণ করছেন এবং রাজার ন্যায় তার প্রসাধন করেছেন। যেহেতু অগ্নি বহুকালের স্তুত্য ও বিশ্বাত্মক, তিনি ক্রতু সম্পন্ন ও বলযুক্ত দেবগণ এবং স্তুতিযোগ্য মত্য যজমান উভয়কেই অন্নের জন্য কামনা করেন।
৭। বাচাল বিদুষকাদি যেরূপ অবাধে তোষামোদ করতে থাকে সেরূপ বায়ু কর্তৃক তাড়িত হয়ে যজনীয় অগ্নি চারদিকে ব্যপ্ত হন। অগ্নি দাহকারী, তার জন্ম পবিত্র, তার পথ কৃষ্ণবর্ণ এবং তার পথের কিছুই স্থিরতা নাই। অতএব তার মার্গ অন্তরীক্ষ অবস্থিত আছে।
৮। অগ্নি রুজুবন্ধ রথের ন্যায় স্বীয় চঞ্চল অঙ্গের সাহায্যে স্বর্গে গমন করেন। তার পথ কৃষ্ণবর্ণ হয়, তিনি কাষ্ঠ দহন করেন। বীরের ন্যায় অগ্নির প্রদীপ্ত তেজের সম্মুখ হতে পক্ষীগণ পলায়ন করে।
৯। হে অগ্নি! তোমার সাহায্যে বরুণ স্বীয় ব্রত ধারণ করেছেন, মিত্র অন্ধকার নাশ করেন এবং অর্যমা দানশীল হন। রথের নেমি যেরূপ অরসমূহকে ব্যপ্ত করে থাকে, তুমি যজ্ঞকার্যদ্বারা সেরূপ বিশ্বাত্মক, সর্বব্যাপি ও সকলের পরাভবকারী হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছ।
১০। হে তরুণ অগ্নি! যিনি তোমর স্তব করেন এবং তোমর জন্য অভিষব করেন তুমি তার রমণীয় হব্য নিয়ে দেবতাগণের নিকট বিস্তার কর। হে তরুণ, মহাধন, বলপুত্র। তুমি স্তুত্য ও হবিভূক, আমরা স্তোত্র সময়ে রাজার ন্যায় তোমাকে স্থাপন করি।
১১। হে অগ্নি। তুমি যেমন আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং উপাস্য ধন প্রদান কর সেরূপ উৎসাহশীল জনপ্রিয়, বিদ্যাভ্যাসে কুশল পুত্র প্রদান কর। অগ্নি যেমন আপনার কিরণসমূহকে বিস্তার করেন সেরূপ আপনার জন্মধার (আকাশ পৃথিবীকে) বিস্তার করে থাকেন। সুক্রতু অগ্নি আমাদের যজ্ঞে দেবতাগণের স্তুতি বিস্তার করে থাকেন
১২। অগ্নি অত্যন্ত দ্যুতিশীল দ্রুতগামী অশ্বিবশিষ্ট, হোতা, আনন্দময়, সুবর্ণ রথবিশিষ্ট, অক্ষুন্ন বল ও প্রসন্ন স্বভাব। তিনি কি আমাদের আহ্বান শ্রবণ করবেন? তিনি কি আমাদের সিদ্ধিপ্রদ কর্মদ্বারা অনায়াস লভ্য ও অভিলষিত স্বর্গ অভিমুকে নিয়ে যাবেন?
১৩। আমরা অগ্নিকে হব্য প্রদানাদি কর্ম ও অর্চনা সাধন মন্ত্র দ্বারা স্তব করছি। অগ্নি প্রকৃষ্টরূপে দীপ্তি যুক্ত হয়েছেন। উপস্থিত সকলে এবং আমরা, সূর্য যেমন মেঘের শব্দ উৎপন্ন করেন, সেরূপ (অগ্নির উদ্দেশে) শব্দ করি।
টীকাঃ
১। অর্থাৎ অরণি ঘর্ষণে।
২। এ ঋকের অর্থ অতিশয় অস্পষ্ট; সায়ণ এরূপ অর্থ করেছেন, যথা প্রথমাগ্নির স্থান পৃথিবী। দ্বিতীয়াগ্নির স্থান অন্তরীক্ষ যেখানে মাতৃস্থানীয় বৃষ্টি আছে, এ অগ্নির নাম দৈ্যুতাগ্নি; ইনি অভিষ্টবর্ষী। একে দোহনের জন্য আদিত্য রশ্মিরূপ তৃতীয় স্থানে অগ্নির আবশ্যক করে তিনিই তুতীয়াগ্নি।
১৪২ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে সমিদ্ধ নামক অগ্নি! যে যজমান স্রুক উন্নত করে তার জন্য তুমি অদ্য দেবগণকে আহ্বান কর। যে হব্যপ্রদায়ী যজমান হোমাভিষব করেছেন তার উপকারার্থে পূর্বকালীন যজ্ঞ বিস্তার কর।
২। হে অনুনপাৎ নামক অগ্নি। আমার মত হব্যপ্রদায়ী ও মেধাবী যে যজমান তোমাকে স্তব করে তার ঘৃতমধুরসবিশিষ্ট যজ্ঞে উপস্থিত হয়ে যজ্ঞ সমাপ্তি পর্যন্ত অবস্থিতি কর।
৩। দেবগণের মধ্যে শুচি, পাবক, অন্ভূত, দ্রুতিমান, যজ্ঞসম্পাদক নরাশংস নামক অগ্নি দ্যুলোক হতে এসে তিনবার আমাদের যজ্ঞ মধুর সাথে মিশ্রিত করুন।
৪। হে ইলিত অগ্নি! তুমি বিচিত্র ও প্রিয় ইন্দ্রকে এখানে নিয়ে এস। হে সুজিহ্ব। তোমার উদ্দেশে আমি স্তোত্র পাঠ করছি।
৫। স্রুকধারী ঋত্বিকগণ এ যজ্হে অগ্নিরূপ বর্হি বিস্তার করে ইন্দ্রের জন্য বিস্তীর্ণ সুখসাধন গৃহ সম্পাদন করছেন, এ গৃহে দেবগণ সর্বদা যাতায়াত করবেন।
৬। অগ্নিরূপে দেবী দ্বার খুলে দাও, দেবতাগণের আগমনের জন্য যজ্ঞের দ্বার খুলে দাও। দ্বারগুলি যজ্ঞের বর্ধক, যজ্ঞের শোধক, বহুলোকের স্পৃহণীয় এবং পরস্পর সংলগ্ন নহে।
৭। সকল লোকের স্তুতির যোগ্য, পরস্পর সন্নিহিত, সুন্দর রূপবিশিষ্ট, মহান, যজ্ঞের নির্মাতা অগ্নিরূপ নক্ত এবং উষা স্বয়ং এসে বিস্তৃত কুশে উপবেশন করুন।
৮। দেবতাগণের উন্মাদক শিক্ষাবিশিষ্ট, সর্বদা স্তুতিশীল যজমানগণের মিত্র, মেধাবী, অগ্নিরূপ দৈব্য হোতম্বের আমাদরে এ সিদ্ধিপ্রদ স্বর্গস্পর্শী যাগের অনুষ্ঠান করুন।
৯। শুচি এবং দেবগণের মধ্যস্থা, হোমনিষ্পাদিকা ভারতী, ইলা এবং সরস্বতী (২) (অগ্নির মুর্তিত্রয়) যজ্ঞের উপযুক্তা হয়ে কুশের উপর উপবেশন করুন।
১০। ত্বষ্টা (অগ্নিমূর্তি বিশেষ) আমাদরে মিত্র। তিনি স্বয়ং বহু প্রকারে আমাদরে পুষ্টি ও সমৃদ্ধির জন্য (মেঘের) নাভিস্থিত ব্যাপ্ত, অদ্ভূত এবং বহুসংখ্যক প্রাণির হিতকারী (জল) প্রেরণ করুন।
১১। হে অগ্নিরূপ বনস্পতি। ঋত্বিকগণকে ইচ্ছানুসারে প্রেরণ করে নিজেই দেবগণের যাগ কর। দ্যুতিমান, মেধাবান অগ্নি দেবগণের মধ্যে হব্য প্রেরণ করেন।
১২। উষা ও মরুৎবিশিষ্ট বিশ্বদেবগণ, বায়ু ও গায়ত্র্যশরীর ইন্দ্রের উদ্দেশে হব্য প্রদানার্থ অগ্নিরূপ স্বাহা শব্দ উচ্চারণ কর।
১৩। হে ইন্দ্র! আমাদের স্বাহাকার বিবিষ্ট হব্য ভক্ষণের জন্য এস। যজ্ঞে ঋত্বিকগণ তোমাকে আহ্বান করেছে।
টীকাঃ
১। ১৩ সুক্তের ন্যায় এ ১৪২ সুক্তও আপ্রীসুক্ত। কাতথক্য বলেন যে মীমৎ, অনুনপাৎ প্রভৃতি শব্দ যজ্ঞের অবয়ব বাচী, অতএব এ সুক্তের দেবতা যজ্ঞই হওয়া উচিত। শাকপুণি বলেন এরা অগ্নির রূপান্তর, অতএব অগ্নিই এ সুক্তের দেবতা।
১৩। সুক্তের ঋকগুলিতে অগ্নির যে বারটি রূপের স্তুতি করা হয়েছে, এ সুক্তের প্রথম বারটি ঋকেও সে সমস্ত রূপের স্তুতি করা হয়েছে।
২। ভারতী স্বর্গস্থ বাক, ইলা পৃথিবীস্থ বাক, সরস্বতী অন্তরীক্ষস্থ বাক। সায়ণ।

১৪৪ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। বহুদর্শী হোতা উন্নত এবং অনবদ্য প্রজ্ঞাবলে অগ্নির উপর্যার জন্য গমন করছেন ও প্রদীক্ষণ করে স্রুক ধারণ করছেন। এ সকল স্রুক অগ্নিতে প্রথমাহুতি প্রদান করে।
২। সুর্যকিরণে সর্বতো ব্যাপ্ত জলের ধারা তাদের উৎপত্তিস্থান আদিত্যলোকে আবার নতুন হয়ে জন্মাচ্ছে। অগ্নি যখন জলের ক্রোড়ে আদরের সাথে বাস করে সে সময়ে লোকে তামৃতময় জলপান করে এবং অগ্নি তার সাথে মিলিত হয়।
৩। সমান বয়স্ক দু জনে (১) এক প্রয়োজন সাধনের উদ্দেশে পরস্পরকে সাহায্য করে অগ্নির শরীরে নিজ নিজ কার্য সম্পাদন করছে, অনপ্তর ভগ যেরূপ আমাদের রশ্মি অর্থাৎ প্রদ্ত্তঘৃত ধারা গ্রহণ করেন আহবনীর অগ্নি করে, আহবনীয় অগ্নি সেরুপ আমাদের রশ্মি বিস্তার করেন, অথবা সারথি যেরুপে রশ্মি গ্রহণ করে, আহবনীয় অগ্নি সেরুপ আমাদের রশ্মি অর্থাৎ প্রদত্তঘৃত ধারা গহ্রণ করেন (২)
৪। সমান বয়স্ক, এক যজ্হে বর্তমান এবং এক কার্যে নিযুক্ত দুজন যে অগ্নিকে দিনরাত পূজা করে, সে অগ্নি পলিতই হোন বা যুবাই হোন মনুষ্য যুগ্মের হব্য ভক্ষণ করে অজর হয়েছেন।
৫। দশ আঙ্গুলি পরস্পর বিশ্লিষ্ট হয়ে সেই দ্যোতমান অগ্নিকে প্রীত করে। আমরা মানুষ, রক্ষালাভার্থ অগ্নিকে আহ্বান করি। ধনুক হতে যেরূপ বাণ বহির্গত হয়, অগ্নি সেরূপ রম্মি প্রেরণ করেন। অগ্নি চতুর্দিকবর্তী যজমানগণের স্তুতি ধারণ করেন।
৬। হে অগ্নি! তুমি পশুপালকের ন্যায় নিজ সামার্থে স্বর্গীয়দের ঈশ্বর এবং পার্থিবদের ঈশ্বর, এজন্য মহতী ঐশ্বর্যবতী, হিরম্ময়ী, মঙ্গল শব্দকারিণী, শুভ্রবর্ণা ও প্রসন্না দ্যাবা পৃথিবী তোমার যজ্ঞে উপস্থিত হন।
৭। হে অগ্নি! তুমি হব্য সেবা কর, তোমার স্তোত্র শ্রবণ করতে ইচ্ছা কর। হে স্তুত্য, অন্নবানযজ্ঞার্থ উৎপন্ন, সুক্রতুঅগ্নি! তুমি সমস্ত জগতের অনুকুলে সকলের দর্শনীয়, তুমি আনন্দোৎপাদক এবং প্রভূত অন্নবান ব্যক্তির ন্যায় সকলের আশ্রয় স্থান।
টীকাঃ
১। হোতা ও অধর্যু। অথবা এ স্থলে সমান বয়স্ক এবং এক উদ্দেশে পরিশ্রমকারী পরস্পর সংলগ্ন জায়া ও পতিও বুঝাতে পারে।
২। রশ্মি শব্দের তিন অর্থ, যথা কিরণ, লাগাম এবং ঘৃত ধারা।

১৪৫ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। অগ্নিকে জিজ্ঞাসা কর তিনিই জানেন, তিনিই গিয়েছিলেন, তারই চৈতন্য আছে তিনিই যান, তার গভি দ্রুত, শাসন ক্ষমতা তারই সাছে, ইস্ট বস্তুও তাতেই আছে। তিনিই অন্ন, বল এবং বলবানের পালক।
২। তাকেই সকল লোকে জিজ্ঞাসা করে, অন্যায় জিজ্ঞাসা করে না। ধীরব্যক্তি নিজের মনে যা স্থির করে তার পূর্বে ও কথা সহ্য করতে পারে না, পরেও কথা সহ্য করত পা রনা; এ জন্যই দাস্তিকতাশুন্য লোক অগ্নির আশ্রয় প্রাপ্ত হয়।
৩। জ্বহুসমূহ তার উদ্দেশে যায়, স্তুতিও তারই জন্য, এক অগ্নি আমার সমস্ত স্তুতি শোনেন। তিনি অনেকের প্রবর্তক, তারয়িতা ও যজ্ঞের সাধনভূত, তার লক্ষা ছিদ্রশূন্য; তিনি অনেকের প্রবর্তক, তারয়িতা ও যজ্ঞের সাধনভূত, তার রক্ষা ছিদ্রশুন্য; তিনি শিশুর ন্যায় (শান্ত) এবং যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান কর্তা।
৪। যখনই যজমান অগ্নি উৎপন্ন করবার চেষ্টা করে তখনই অগ্নি আবির্ভূত হন, উৎপন্ন হয়েই সদ্য যুজ্য বস্তুর সাথে মিলিত হন। তার আনন্দজনক কর্ম শ্রান্ত যজমানের সন্তাষের জন্য অভিমত ফল প্রদান করেন।
৫। অন্বেষণশীল, অধিগম্য, বনগামী অগ্নি, ত্বকের ন্যায় ইন্ধনের মধ্যে স্থাপিত হয়েছেন। বিদ্বান যাগাভিজ্ঞ, যথার্থবাদী অগ্নি মর্তদের বিশেষ করে জ্ঞান প্রদান করেছেন।

(C) https://www.ebanglalibrary.com




0 comments

ঋগ্বেদ সংহিতা - প্রথম মণ্ডলঃবিভিন্ন ঋষিঃ সুক্তঃ ১১৬-১৩০

১১৬ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
যেরূপ যজমান যজ্ঞার্থে কুশ বিস্তার করে, যেরূপ বায়ু মেঘকে (নানা দিকে প্রেরণ করে) সেরূপ আমি নাসত্যশ্বয়কে প্রচুর স্তোত্র প্রেরণ করছি; তারা শত্রু সেনা পিছনে ফেলে রথম্বারা যুবক বিমদ রাজর্ষির স্ত্রীকে তার নিকট পৌছে দিয়েছিলেন (১)।
২। হে নাসত্যম্বয়! তোমরা বলবান ও শীঘ্রগতি অশ্বম্বারা নীত ও দেবগণের উৎসাহে উৎসাহিত হয়েছিলে, তোমাদের রথবাহক গর্দভ যমের প্রিয় সহস্রযুদ্ধে জয় করেছিল।
৩। কোন ম্রিয়মাণ মানুষ যেরূপ ধন ত্যাগ করে, সেরূপ তুগ্র অতিকষ্টে তার পুত্র ভূজ্যুকে সমুদ্রে পাঠালেন (২)। হে অশ্বিম্বয়! তোমরা আপনাদের নৌকাসমূহ দ্বারা তাকে ফিরিয়ে এনেছিলে। সে নৌকা জলে ভেসে যায় তাতে জল প্রবেশ করে না।
৪। হে নাসত্যম্বয়। তোমরা তিনখালি শীঘ্রগামী শতচক্রবিশিষ্ট ষট অশ্বিযুক্ত রথে ভুজ্যুকে বহন করেছিলে, সে রথ তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত আর্দ্র সমুদ্রের জলশূন্য পারে চলেছিল।
৫। অশ্বিদ্বয়! তোমরা অবলম্বন রহিত, ভূপ্রদেশ রহিত, গ্রহনীয় বস্তু রহিত, সমুদ্রে এ কাজ করেছিলে; শতদাড়যুক্ত নৌকায় ভুজ্যুকে রেখে তার গৃহে এনেছিলে।
৬। হে অশ্বিম্বয়! অহন্তব্য অশ্বের পতি পেদু নামক রাজর্ষিকে তোমরা যে শ্বেতবর্ণ অশ্ব দিয়েছিলে, সে অশ্ব তার নিত্য জয়রূপ মঙ্গল, সাধন করেছিল (৩); তোমাদের সে দান মহৎ ও কীর্তনীয় হয়েছিল; পেদুর সে উৎকৃষ্ট অশ্ব আমাদের সর্বদাই পূজনীয়।
৭। হে নেতৃম্বয়! প্রজ্রকুলে (৪) জাত কক্ষীবান তোমাদের স্তুতি করাতে তোমরা তাকে প্রভূত বৃদ্ধি দান করেছিলে। সুরার আধার হতে যেরূপ সূরা নির্গত করে, সেরূপ তোমাদের সেচনসমর্থ অশ্বের খুর হতে তোমরা শত কুম্ভ সুরা সিঞ্চন করেছিলে।
৮। তোমরা হিম বারা অত্রির চতুর্দিকস্থ দীপ্যমান অগ্নি নিবারণ করেছিলে (৫) এবং তাকে অন্নযুক্ত বলপ্রদ খাদ্য দিয়েছিলে; হে অশ্বিদ্বয়! অত্রি অবনতমুখে যে আলোক শূণ্য পীড়াযন্ত্র গৃহে প্রক্ষিপ্ত হয়েছিল, তোমরা তাকে তার সমভিব্যাহারিগণের সাথে সুখে তথা হতে উঠিয়েছিলে।
৯। হে নাসত্যম্বয়! তোমরা গোতম ঋষির নিকট কূপ এনেছিলে এবং তার তলভাগ উচ্চ ও মুখ নীচে করেছিলে (৬) এবং সে কূপ হতে তুষিত গোতমের পানার্থ এবং সহস্র ধন লাভার্থ জল নির্গত হয়েছিল।
১০। হে নাসত্যম্বয়। শরীরের আবরণ (যেরূপ খুলে ফেলে), তোমরা জীর্ণ চ্যবন ঋষির শরীর ব্যপ্ত করা সেরূপ খুলে ফেলেছিল (৭) হে দস্রম্বয়! তোমরা সে পুত্রাদিত্যক্ত ঋষির জীবন বৃদ্ধি করে দিয়েছিলে, তারপর তাকে কন্যা সমূহের পতি করে দিয়েছিলে।
১১। হে নেতু নাসত্যম্বয়! তোমাদের সে ইষ্ট বরণীয় কার্যটি আমাদের প্রশংসনীয় ও আরাধ্য, যে তোমরা জানতে পেরে সে গুপ্তধনের ন্যায় লুকায়িত বন্দন ঋষিকে পিপাসিত পথিকদের দ্রষ্টব্য কূপ হতে উঠিয়েছিলে (৮)।
১২। হে নেতৃম্বয়। যেমন মেঘগর্জন আসন্ন বৃষ্টি প্রকটিত করে, আমি ধন লাভার্থে তোমাদের সে উগ্র কর্ম সেরূপ প্রকটিত করছি যে অথর্বার পুত্র দধীচি অশ্বমন্তক ধারণ করে তোমাদের এ মধুবিদ্যা শিখিয়েছিল (৯)।
১৩। হে বহু লোকের পালক নাসত্যম্বয়! তোমরা অভিমত ফল প্রদানের কর্তা, বুদ্ধিসম্পন্না বধ্রিমতী পূজনীয় স্তোত্রম্বারা তোমাদের বার বার ডেকেছিল, শিষ্য যেরূপ শিক্ষকের কথা শোনে, তোমরা সেরূপ বধ্রিমতীর সে আহ্বান শুনেছিলে। হে অশ্বিদ্বয়! তাকে হিরণ্যহস্ত নামক পুত্র দিয়েছিলে (১০)।
১৪। হে ন্যসত্যদ্বয়! তোমরা বৃকের মুখ হতে বর্তি কাকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলে (১১)। হে বহু লোকের পালক! তেমেরা স্তোত্র পরায়ণ মেধাবীকে (প্রকৃত জ্ঞান) দর্শন করতে দিয়েছ।
১৫। খেলের স্ত্রী বিশপলার একটি পা, পক্ষীর একটি পাখার ন্যায় যুদ্ধে ছিন্ন হয়েছিল (১২), হে অশ্দ্বিয়! তোমরা রাত্রি যোগে সদ্যই বিশপলাকে গমনের জন্য এবং শত্রু ন্যস্ত ধন লাভার্থে নৌহময় জম্বা পরিয়ে দিয়েছিলে।
১৬। যে ঋজ্র্যশ্ব বৃকীকে শত মেঘ খন্ড করে দিয়েছিলেন, তাকে তার পিতা দৃষ্টিহীন করেছিল (১৩); হে ভিষজ দস্র নাসত্যদ্বয়! তার চক্ষুদ্বয় দর্শনে অসমর্থ হয়েছিল, তোমরা তার সে চক্ষুদ্বয় দর্শনসমর্থ করেছিলে।
১৭। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের শীঘ্রগামী অশ্ব থাকায় সূর্যর দুহিতা বিজিত হয়ে তোমাদের রথে আরোহণ করলেন (১৪), সে রথ কার্ষ্মের ন্যায় (১৫), সকল দেবগণ হৃদয়ের সাথে এ অনুমোদন করলেন; হে নাসত্যদ্বয়! তোমরা সম্পদ প্রাপ্ত হলে।
১৮। হে অশ্বিদ্বয়! দিবোদাস নামক রার্ষি (১৬), হব্যের অন্ন প্রদান করে তোমাদের আহ্বান করলে যখন তোমরা তার গৃহে গিয়েছিলে, তখন তোমাদের সেব্য রথ ধনযুক্ত অন্ন নিয়ে গিয়েছিল, বৃষভ এবং গ্রাহ (১৭) সে রথে যোগ করেছিলে।
১৯। হে নাসত্যম্বয়! তোমরা শোভনীয় বলযুক্ত ধন এবং শোভনীয় অপত্য ও বীর্যযুক্ত অন্ন নিয়ে সমান প্রীতিযুক্ত হয়ে জহু (১৮) নামক মহর্ষির সন্তানদের নিকট এসেছিলে। তারা হব্যের অন্ন প্রদান করেছিল এবং দৈনিক সোমাজিযবের প্রাভঃ সবনাদি তিনটি ভাগ ধারণ করেছিল।
২০। হে নাসত্যম্বয়! তোমরা স্বকীয় সর্বভেদকারী রথে রাত্রিযোগে তাকে সুগম্য পথ দিয়ে বার করে নিয়ে গিয়েছিলে এবং শত্রু দুরারোহ পর্বত সমূহে গমন করেছিলে।
২১। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা যশ নামক ঋষিকে একদিনে সহস্র রমণীয় ধন প্রাপ্তির জন্য রক্ষা করেছ। হে অভীষ্টবর্ষীদ্বয়! তোমরা ইন্দ্রের সাথে যুক্ত হয়ে পৃথুশ্রবার (২৩) ক্রেণদায়ী শত্রুদের হত করেছিলে।
২২। ঋচৎকের পুত্র শর নামক স্তোতার পানের জন্য তোমরা কূপের নিম্নদেশ হতে জল উচ্চে উঠিয়েছিলে। হে নাসত্যদ্বয়! তোমরা স্বকীয় কার্য দ্বারা শ্রান্ত শয্যু নামক ঋষির জন্য প্রসবশূন্য গাভীকে দুগ্ধবতী করেছিলে।
২৩। হে নাসত্যদ্বয়! কৃষ্ণের পুত্র ঋজুতাপরায়ণ বিশ্বকায় নামক ঋষি রক্ষণ ইচ্ছায় তোমাদের স্তুতি করলে তোমরা স্বকীয় কার্য দ্বারা নষ্ট পশুর ন্যায় তার বিষ্ণাপু নামক (২১) বিনষ্ট পুত্রকে পুনরায় দেখতে দিয়েছিলে।
২৪। রেভ রুজুদ্বারা বন্ধ হয়ে এবং শত্রুদ্বারা হিংসিত হয়ে দশ রাত ন দিন জলের মধ্যে থেকে জলে বিলুপ্ত ও ব্যথাদ্বারা সন্তপ্ত হলে তোমরা তাকে, হাতা দ্বারা যেরূপ সোমরস উঠায়, সেরূপে উঠিয়েছিল (২২)।
২৫। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের (পূর্ব কৃত) কর্ম সকল বর্ণনা করলাম; আমি যেন শোভনীয় গো ও শোভনীয় বীরযুক্ত হয়ে এ রাষ্ট্রের অধিপতি হই; এবং গৃহস্বামী যেরূপ (নিষ্কপ্টকে) গৃহে প্রবেশ করে, আমিও যেন চক্ষুতে স্পষ্ট দেখে দীর্ঘ আয়ু ভোগ করে বার্ধক্য প্রাপ্ত হই।
টীকাঃ
১। বিমদনামক রাজর্ষি স্বয়ম্বরে কন্যালাভ করলে অন্যান্য রাজগণ পথে তাকে আক্রমণ করেন। অশ্বিদ্বয় সে সময় বিমদকে সহায়তা করেন এবং আপনাদের রথে করে বিমদের স্ত্রীকে বিমদের সদনে পৌছে দেন। সায়ণ।
২। তুগ্র নামে অশ্বিদের প্রিয় একজন রাজর্ষি ছিলেন। তিনি দীপান্তরবর্তী, শত্রুদের উপদ্রবে ক্লিষ্ট হয়ে তাদের জয় করবার জন্য আপন পুত্র ভুজ্যুকে সেনার সঙ্গে নৌকায় প্রেরণ করেন। সমুদ্রে অনেক দুর গিয়ে সে নৌকা ভেঙে যায়। ভুজ্যু অস্বিদ্বয়কে স্তুতি করলেন, তারা ভূজ্যুকে সসৈন্যে আপনাদের পোতে আরোহণ করিয়ে তিন দিন তিন রাতে তাদের তুগ্রের নিকট পৌছে দিলেন। সায়ণ।
৩। পেদু নামক একজন অশ্বিদ্বয়কে স্তুতি করেছিল। অশ্বিদ্বয় প্রীত হয়ে তাকে একটি শ্বেতবর্ণ অশ্ব দিয়েছিলেন। সেই অশ্ব তার অনেক জয় লাভের কারণ হয়েছিল। সায়ণ।
৪। অর্থাৎ অঙ্গিরা কুল। সায়ণ।
৫। অসুরেরা অত্রি ঋষিকে শতদ্বায় পীড়া যন্ত্রগৃহে প্রবেশ করিয়ে তুষের আগুন জালিয়েছিল। তখন সেই ঋষি অশ্বিদ্বয়কে স্তুতি করলেন এবং অশ্বিদ্বয় জলদ্বারা সেই অগ্নি নিবিয়ে সে পীড়াগৃহ হতে অবিকলেশ্দ্রিয় অত্রিকে বার করলেন। সায়ণ।
৬। একদা গোতম ঋষি যখন মরুভূমিতে ছিলেন, অশ্বিদ্বয় অন্য দেশের একটি কূপ উঠিয়ে তার নিকট এনে দিয়েছিলেন এবং গোতমের স্নান পানাদির সুবিধার জন্য সে কূপের মুখ নীচে করে ও তলদেশ উচ্চ করে ধরেছিলেন। সায়ণ। ৮৫ সুক্তের ১১ ঋকের টীকা দেখুন।
৭। বলিপলিযুক্ত জীর্ণাঙ্গ ও পুত্রদের দ্বারা পরিত্যক্ত চ্যবন নামক ঋষি অশ্বিদ্বয়কে স্তুতি করেছিলেন। অশ্বিদ্বয় সেই ঋষির জরা দূর করে তাকে পুনরায় যৌবন দান করেছিলেন। সায়ণ।
৮। বন্দন নামে একজন ঋষি ছিলেন তিনি অসুরগণ কর্তৃক একটি কূপে নিক্ষিপ্ত হয়ে তথা হতে উঠতে না পেরে অশ্বিদ্বয়কে স্তুতি করলেন। অশ্বিদ্বয় তাকে উঠিয়েছিলেন। সায়ণ।
৯। ইন্দ্র দধীচিকে প্রবগ্য-বিদ্যা ও মধুবিদ্যা উপদেশ দিয়ে বলে দিয়েছিলেন যদি এ বিদ্যা অন্য কাকেও বল তবে তোমার শিরচ্ছদন করব। অশ্বিদ্বয় দধীচির মস্তক ছেদন করে তা অন্য স্থানে রেখে তাকে অশ্বের মাথা পরিয়ে দিলেন। এরূপে অশ্বিদ্বয় প্রবগ্য বিষয় অর্থাৎ ঋক সাম যজুৎ এবং মধু বিদ্যা অর্থাৎ প্রতিপাদক ব্রাহ্মণ অধ্যয়ন করেছিলেন। ইন্দ্র এ বিষয় জানতে পেরে তার সে অশ্বের মাথা বজ্রদ্বারা কেটে ফেললেন। অশ্বিদ্বয় তাকে পুনরায় তার নিজের মানুষের মাথা পরিয়ে দিলেন। সায়ণ। ৮৪ সুক্তের ১৩ ঋকের টীকা দেখুন।
১০। কোন এক রাজর্ষির বধ্রিমতী নাম্নী পুত্রী ছিল, তার স্বামী নপুংসক। বধ্রিমতী পুত্র লাভের অন্য অশ্বিদ্বয়কে আহ্বান করেছিলেন, এবং অশ্বিদ্বয় সে আহ্বান শুনে এসে তাকে হিরণ্যহস্ত নামক পুত্র প্রদান করেন। সায়ণ।
১১। সায়ণ এ ঋকের শেষার্ধের অর্থ করেন নি। বর্তিকা চড়াই পাখী সদৃশ পক্ষীর স্ত্রী। পুরাকালেঅরণ্যের একটি বৃক বর্তিকাকে ধরেছিল অশ্বিদ্বয় তাকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সায়ণ। কিন্তু যাস্ক এর অন্য অর্থ করেন। যে বার বার প্রত্যাবর্তন করে সে বীর্তকা অর্থাৎ উষা। যে আলোক দ্বার জগৎকে আবরণ করে সে বৃক অর্থাৎ সূর্য। সেই সূর্য ঊষার পশ্চাতে এসে ঊষাকে ধরেন। অশ্বিদ্বয় তাকে ছাড়িয়ে দেন। আচার্য মক্ষমুলর যাস্কের অর্থ গ্রহণ করেছেন এবং গ্রীক ধর্মাখ্যানে এই গল্প ও এই বর্তিকার নাম দেখিয়ে দিয়েছেন। Ortygia, though localised afterwards in different places, is the dawn or the dawn land, Ortygia is derived from ortyx, a quail. The quail in Sanskrit is called Vartika, i.e. the returning bird, one of the first birds which return with the return of the spring. The same name is given in the Veda to one of the many beings delivered or revived by the Asyins, i.e. by day and night, and I beliveve vartika, the returning, is again one of the many names of the dawn- Science of Language (1882), vol.II,p-553.১২। খেল নামক এক রাজা ছিলেন তার পুরোহিত অগন্ত্য। খেলের স্ত্রী বিশুপলা; কোন যুদ্ধে শত্রুদের দ্বারা সেই বিশুপলার একটি পা ছিন্ন হয়েছিল। অগস্ত্য অশ্বিদ্বয়ের স্তুতি করাতে অশ্বিদ্বয় রাত্রে এসে বিশুপলাকে লৌহের পা করে দিলেন। সায়ণ।
১৩। বৃষাগিরের পুত্র ঋজ্রাশ্ব নামক একজন রাজর্ষি ছিলেন। অশ্বিদ্বয়ের বাহন গর্দভ তার নিকট বৃকী হয়েছিল। বজ্রাশ্ব তাকে আহারার্থে ১০১ পৌরজনের মেষ খন্ড খন্ড করে দিয়েছিলেন। পৌরজনের এরূপ অপকার করাতে ঋজ্রাশ্বের পিতা তাকে নেত্রহীন করলেন। তিনি অশ্বিদ্বয়কে স্তুতি করলেন এবং তারা নিজের বাহনের জন্য ঋজ্রাশ্বের অদ্ধত্ব হয়েছে জেনে তাকে পুনরায় চক্ষু দান করলেন। সায়ণ।
১৪। সবিতা সূর্যা নান্দী আপন দুহিতাকে সোম রাজাকে প্রদান করতে ইচ্ছা করেছিলেন। সকল দেবই সে সূর্যাকে অভিলাষ করেছিলেন এবং তারা পরস্পর বললন আমরা আদিত্য পর্যন্ত দৌড়াব। আমাদের মধ্যে যে জয়লাভ করবেন, সূর্যা তারই হবেন। অশ্বিদ্বয় জয়লাভ করলেন এবং তারাই সূর্যাকে জয় করে রথে ওঠালেন। সায়ণ। ২৫। মুলে কার্মের আছে। কার্ষ্ম শব্দঃ কাষ্ঠবাচী। যথা কাষ্ঠং আজিধাবনস্য অবধিতয়া নির্দিষ্টং লক্ষং আশুগামী কশ্চিৎ সর্বেভ্যঃ ধাবম্ভ্যঃ পূর্বং প্রাপ্নোভি। সায়ণ। ঘোড়দৌড়ের সময় যে নিদিষ্ট কাষ্ঠ খন্ডের নিকট প্রথমে পৌছতে পারলে জয় হয়, সে নির্দিষ্ট কাষ্ঠ খন্ডের নাম কার্ষ্ম!
১৬। দিবোদাস সম্বন্ধে ৫১ সুক্তের ৬ ঋক ও ৫৩ সুক্তের ৮ ঋক দেখুন।
১৭। মুলে শিংশুমারঃ আছে। অর্থ গ্রহঃ। বৃষভ ও গ্রাহ পরস্পর বিরোধী হলেও অশ্বিদ্বয় নিজের সামর্থ প্রদর্শনাথ তাদের একত্রে যোগ করেছিলেন। সায়ণ।
১৮। পুরাণে জহু একজন চন্দ্রবংশীয় রাজা তা সকলেই জানেন।
১৯। জাহুষ নামে একজন রাজা ছিলেন। সায়ণ।
২০। সায়ণ বলেন পৃথুশ্রবা নামে একজন কানীন রাজা ছিলেন।
২১। এ কৃষ্ণ ও তৎপুত্র বিশ্বকায় ও তার পুত্র বিষ্ণাপুকে, তার টীকায় কোন বিবরণ নেই। কেবল তারা ঋষি ছিলেন এটুকু জানা যায়।
২২। পূর্ব কালে অসুরেরা রেভ ঋষিকে দড়ি দিয়ে বেধে একদিন সায়ংকালে কুপে নিক্ষেপ করেছিল। তিনি দশ রাত নয় দিন অশ্বিদ্বয়কে স্তক করে কুপের মধ্যে সেরূপেই ছিলেন। দশম দিনের প্রাতে অশ্বিদ্বয় তাকে কূপ হতে উঠিয়েছিলেন। সায়ণ।
১১৭ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের চিরন্তন হোতা তোমাদের হর্যার্থে মধুর সোমের সাথে তোমাদের অর্চনা করছে; কুশের উপর হব্য স্থাপন করা হয়েছে, ঋত্বিকদের দ্বারা স্তুতিও প্রস্তুত হয়েছে, হে নাসত্যদ্বয়! অন্ন ও বল নিয়ে নিকটে এস।
২। হে অশ্বিম্বর। তোমাদের মনের অপেক্ষাও বেগবান ও শোভনীয় যে অশ্বযুক্ত রথ সমস্ত প্রজাবর্গের সম্মুখে গমন করে এবং যে রথে তোমরা শুভ কর্মা লোকের গৃহে গমন কর, হে নেতৃদ্বয়! সে রথে আমাদের গৃহে এস।
৩। হে নেতৃদ্বয়! হে অভীষ্টবর্ষীদ্বয়! তোমরা শত্রুদের হিংসা করে এবং সে ক্লেশদায়ি দস্যুর মায়া আনুপুর্বিক নিবারণ ককের পঞ্চজন পূজিত অত্রি ঋষিকে পাপ তুষানল হতে সন্তানাদির সাথে মুক্ত করেছিলে (১)।
৪। হে নেতৃদ্বয়! হে অভীষ্টবর্ষী অশ্বিদ্বয়! দুর্দমনীয় শত্রুদের দ্বারা জলে নিগুড় রেভ ঋষিকে তোমরা উঠিয়ে পীড়িত অশ্বের ন্যায় তার বিনষ্ট অবয়ব তোমাদের ভৈষজ কর্মদ্বারা শোধন করে ছিলে (২) তোমাদের পূর্বের কর্ম সমূহ জীর্ণ হয়নি।
৫। হে দস্র অশ্বিদ্বয় পাপে পতিত মানুষের ন্যায় অন্ধকারে ক্ষয় প্রাপ্ত, সূর্যের ন্যায় শোভনীয়, দীপ্তিমান আভরণের ন্যায় দর্শনীয়, সে কূপে প্রক্ষিপ্ত, বন্দন ঋষিকে তোমরা উঠিয়েছিলে (৩)।
৬। হে নেতৃ নাসত্যদ্বয়! আ প্রজ্র কুলোম্ভব কক্ষীবান অভিষ্ট দ্রব্যের প্রাপ্তির জন্য তোমাদের সে কর্ম ঘোষণা করব, যে হেতু তোমর শীঘ্রগামী অশ্বের খুর হতে নির্গত মধু দ্বারা লোকের শত কুম্ভ পূরণ করে দিয়েছিলে (৪)।
৭। হে নেতৃদ্বয়। কৃষ্ণের পুত্র বিশ্বকায় তোমাদের স্তব করলে তোমরা তাকে তার বিনষ্ট পুত্র বিষ্ণাপুকে এনে দিয়েছিলে (৫); হে অশ্বিদ্বয়! গৃহে পিতৃসমীপে নিষণা জ্বয়াগ্রস্তা ঘোষাকে তোমরা পতি প্রদান করেছিলে (৬)।
৮। হে অশ্বিদ্বয়। তোমরা শ্যাবকে (৭) দীপ্তিমতী স্ত্রী দিয়েছিলে, কম্ব দৃষ্টি না থাকাতে চলতে পারতেন না, তোমরা তাকে চক্ষু দিয়েছিলে, (৮) হে অভীষ্ট বর্ষীদ্বয়! তোমাদের সে কার্য প্রশংসনীয় যে তোমরা নৃষদপুত্রকে শ্রবণেন্দ্রিয় দান করেছিলে (৯)।
৯। হে বহুরূপধারী অশ্বিদ্বয়! তোমরা পেদুকে শীঘ্র গামী অশ্ব দিয়েছিলে; সে অশ্ব সহস্রধন দান করত, বলবান শত্রুদ্বারা অপ্রতিহত, শত্রুদের হন্তা, স্তুতি ভাজন এবং বিপদে ত্রাণকারী (১০)।
১০। হে দানশীল কশ্বিদ্বয়! তোমাদের এ বীর কীর্তিগুলি সকলের জানা উচিত। তোমরা দ্যাবা পৃথিবী রূপে বর্তমান, তোমাদের আহ্বাদকর ঘোষণীয় মন্ত্র (নিষ্পন্ন হয়েছে)। হে অশ্বিদ্বয়! যখন পজ্রকুলের বজমানেরা তোমাকে আহ্বান করে তখন অন্ন নিয়ে এস এবং বিদ্বানকে (অর্থাৎ আমাকে) বল দাও।
১১। হে পোষণকার নাসত্যম্বয়! তোমরা কুম্ভপুত্র অগন্তা (১১) দ্বারা স্তুত হয়ে মেধাবী ভরদ্বাজ ঋষিকে (১২) অন্নদান করে অগন্ত্যের দ্বারা মন্ত্রে বর্ধিত হয়ে বিশুপলাকে আরোগ্য দান করেছিলে (১৩)।
১২। হে আকাশের পুত্রদ্বয়! অভীষ্টবর্ষী দ্বয়! কাব্যের স্তুতি শুনবার জন্য তার গৃহাতিমুখে কোথায় যাচ্ছ? হিরণ্যপূর্ণ কলসের ন্যায় কুপে নিখাত রেভকে তোমরা দশম দিনে উঠিয়েছিল (১৪)।
১৩। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা কার্যদ্বারা বৃদ্ধ চ্যবনকে পুনরায় যুবা করেছিলে। হে নাসত্যদ্বয়! সূর্যের দুহিতা কান্তির সাথে তোমাদের রথে আরোহণ করেছিল (১৫)।
১৪। হে দুঃখহারীদ্বয়। তুগ্র তোমাদের পূর্বের স্তোত্র দ্বারা যেরূপ স্তুতি করত, পরে পুনরায় তোমাদের সেরূপে অর্চনা করত, কারণ তোমরা তার পুত্র ভুজ্যকে বিক্ষিপ্ত সমুদ্র হতে গমনশীল নৌকা ও শীঘ্রগতি অশ্বদ্বারা এনে দিয়েছিলে (১৬)। ১৫৮। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা তুগ্রের পুত্রকে আনলে সে বিনাব্যথায় ও বিনা আয়াসে সমুদ্র পার হয়ে তোমাদের আহ্বান করেছিল। হে মনোবেগসম্পন্ন অভীষ্ট বর্ষীদ্বয়। তোমরা উৎকৃষ্ট অশ্ব যুক্ত রথে তাকে নিরাপদে এনেছিলে।
১৬। হে অশ্ব্দিবয়! যখন তোমরা বর্তিকাকে বুকের মুখ হতে ছাড়িয়ে দিয়েছিল তখন সে তোমাদের্আহ্বান করেছিল (১৭)। তোমরা জয়শীল রথদ্বারা জাহুষ রাজাকে (১৮) পর্বতের সানুতে নিয়ে গিয়েছিলে। তোমরা মেঘের জল জীবজন্তুকে প্রদান করেছিলে।
১৭। ঋজ্রাম্ব বৃকীকে শত মেঘ দেওয়ায় তার ক্রুদ্ধ পিতা তাকে অন্ধ করলে অশ্বিদ্বয় তাকে চক্ষু দিয়েছিলেন, তোমরা দেখবা জন্য অন্ধকে চক্ষু দিয়েছিলে (১১)।
১৮। সে অন্ধকে চক্ষু দ্বারা নিষ্পাদ্য সুখ দেবার মানসে বৃকী আহ্বান করল, হৈ অশ্বিদ্বয়! হে অভীষ্টবর্ষীদ্বয়! নেতৃদ্বয়! ঋজ্রাশ্ব তরুণ প্রণয়ীর ন্যায় অমিতবায়ী হয়ে, এক শত এক মেষ খন্ড খন্ড করে দিয়েছে।
১৯। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের রক্ষণকার্য সুখের কারণ, হে স্তুতিভাজন। তোমরা বাধিগ্রন্থকে সঙ্গতাবরব করেছ; অতএব বহু বুদ্ধিমতী ঘোষা (২০) তোমাদের রোগাপনয়নার্থ ডেকেছিল। হে অভীষ্টবর্ষীদ্বয়! তোমাদের রক্ষণকার্য সমূহের সাথে এস।
২০। হে দস্রদ্বয়! তোমরা কৃণ, প্রসব-শূন্য, দুগ্ধশূন্য গাভীকে শষু ঋষির জন্য দুগ্ধপূর্ণ করেছিলে। তোমরা নিজকর্ম দ্বারা পুরুমিত্র রাজার কুমারীকে বিমদ ঋষিকে স্ত্রীরূপে প্রদান করেছিলে (২১)।
২১। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা আর্যদের জন্য লাঙ্গল দ্বারা চাষ ও যব বপন করিয়ে অন্নের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করে এবং বজ্রদ্বারা দস্যুকে বধ করে, তার (২২) প্রতি বিস্তীর্ণ জ্যোতি প্রকাশ করেছ।
২২। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা অর্থাৎ ঋষির পুত্র দধীচি ঋষির স্কন্ধে অশ্বের মস্তক যোজনা করে দিয়েছিলে তিনিও সত্য পালন করে ত্বষ্টার নিকট হতে লব্ধ মধুবিদ্যা তোমাদের শিখিয়েছিলেন (২৩)। হে দস্রদ্বয়! সে বিদ্যা তোমাদের অপিকক্ষ্য (২৪) রূপ হয়েছিল।
২৩। হে মেধাবীদ্বয়! আমি সর্বদা তোমাদরে অনুগ্রহ প্রার্থনা করি, তোমরা আমার সমস্ত কর্ম রক্ষা কর। হে নাসত্যদ্বয়! আমাদের বৃহৎ ও অপত্য সমবেত ও প্রশংসনীয় ধন দাও।
২৪। হে দানশীল ও নেতা অশ্বিদ্বয়! তোমরা বধ্রিমতিকে হিরণ্যহস্তা নামক পুত্র দিয়েছিলে (২৫)। হে দানশীল অশ্বিদ্বয়! তোমরা তিন ভাগে বিচ্ছিন্ন শ্যাব ঋষিকে জীবিত করেছিলে।
২৫। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের এ পুরাতন কার্যসমূহ মনুষ্যেরা বলে গিয়েছে। হে অভীষ্টদাতৃদ্বয়। আমরাওতেোমাদেরসে্তোত্র সম্পাদন করে বীর পুত্রাদির দ্বারা যুক্ত হয়ে যজ্ঞ সম্পন্ন করছি।
টীকাঃ
১। অত্তি সম্বন্ধে ১১৬ সুক্তের ৮ ঋকের টীকা দেখুন। গণেন শব্দের অর্থ ইন্দ্রিয়বর্গেণ পুত্রপৌত্রাদিগণেন বা। সায়ণ।
২। রেভ ঋষি সম্বন্ধে ১১৬ সুক্তের ২৪ ঋকের টীকা দেখুন।
৩। বন্দন ঋষি সম্বন্ধে ১১৬ সুক্তের টীকা দেখুন।
৪। ১১৬ সুক্তের ৭ ঋক দেখুন।
৫।কৃষ্ণ সম্বন্ধে ১১৬ সুক্তের ২৩ ঋকের টীকা দেখুন।
৬। ঘোষা নান্মী কক্ষীবানের দুহিতা ছিলেন। তিনি কুষ্ঠরোগগ্রস্তা হওয়াতে তাকে কারো সাথে বিবাহ না দিয়ে পিতৃগৃহেই বার্ধক্য পর্যন্ত রাখা হয়েছিল। পরে অশ্বিদ্বয়ের অনুগ্রহে তিনি কুষ্ঠরোগ হতে আরোগ্য লাভ করে পতি লাভ করেছিলেন। সায়ণ।
৭। শ্যাবায় কুষ্ঠরোগেণ শ্যামবর্ণায় ঋষয়ে। সায়ণ। অশ্বিদ্বয় তার কুষ্ঠরোগ আরোগ্য করে দেন সুতরাং তার বিয়ে হল।
৮। কব ঋষির অন্ধতা সম্বন্ধে ১১৮ সুক্তের ৭ ঋকের টীকা দেখুন।
৯। নৃষদপুত্র একজন বধির ঋষি ছিলেন। তার আর কোনও বিবরণ টীকায় নেই।
১০। পেদু সম্বন্ধে ১১৬ সুক্তের ৬ ঋকের টীকা দেখুন।
১১। সুনোর্মানেন গৃণানা সম্পর্কে সায়ণ লিখেছেন কুম্ভাৎ প্রসুতস্য অগন্ত্যসা * * * মানেন স্তুতস্য পরিচ্ছেদকেন স্তোত্রেণ গৃণানা স্তুরমানৌ।
১২। মুলে কেবল বিপ্রায় আছে। বিপ্রায় মেধাবিনে ভরদ্বাজায় ঋষয়ে। সায়ণ।
১৩। বিশপলা সম্বন্ধে ১১৬ সুক্তের ১৫ ঋকের টীকা দেখুন।
১৪। পূর্বকালে উশনার স্তুতি শুনতে যাবার সময় অশ্বিদ্বয় পথে কুপে পতিত রেভকে দেখে তাকে কূপ হতে উদ্ধার করেছিলেন। সায়ণ। রেভ সম্বন্ধে ১১৬ সুক্তের ১০ ঋকের টীকা দেখুন। সূর্য দুহিতা সম্বন্ধে ১১৬ সুক্তের ১৭ ঋকের টীকা দেখুন।
১৬। ভূজ্য সম্বন্ধে ১১৬ সুক্তের ৩ ঋকের টীকা দেখুন।
১৭। ১১৬ সুক্তের ১৪ ঋকের টীকা দেখুন।
১৮। ১৬ সুক্তের ২০ ঋকের টীকা দেখুন।
১৯। ১১৬ সুক্তের ১৬ ঋকের টীকা দেখুন।
২০। এ সুক্তের ৭ ঋকের টীকা দেখুন।
২১। ১১৬ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।
২২। যব বপনদ্বারা ও দস্যু অর্থাৎ অসভ্য জাতিদের বিনাশ দ্বারা ভারতবর্ষের প্রথম আর্যগণ বিশেষ লাভ কেরছিলেন।
২৩। ১১৬ সুক্তের ১২ ঋকের টীকা দেখুন। সে ঋকে ইন্দ্র বিদ্যা দিয়েছিলেন, এখানে ত্বষ্ট তা দিয়েছিলেন, অতএব সায়ণ এ ঋকে ত্বষ্টা অর্থে ইন্দ্র করেছেন।
২৪। অপিকক্ষ্যং শব্দের সায়ণ অর্থ করেছেন ছিন্নস্য যজ্ঞশিরসঃ কক্ষপ্রদেশেন পুনঃ সন্ধানভূতং প্রবর্গ্যবিদ্যাখ্যাং রহস্যং। কিন্তু প্রবর্গবিদ্যার কথা মূলে এ ঋকেও নেই, ১১৬ সুক্তের ১২ ঋকেও নেই। পি্ডিতবর উইলসন অপিকক্ষ্যং অর্থ Ligature of the waist. করেছেন।
২৫। ১১৬ সুক্তের ৩১ ঋকের টীকা দেখুন।
১১৮ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের শোন পক্ষীর ন্যায় শীঘ্রগামী, সুখকর, ও ধনযুক্ত রথ আমাদের অভিমুখে আগমন করুক। হে অভীষ্টবর্ষীদ্বয়! তোমাদের সে রথ মনুষ্যের মনের ন্যায় বেগবান, ত্রিবন্ধুর এবং বায়ুবেগী।
২। তোমাদের ত্রিবন্ধুর, ত্রিবৃত, ত্রিচক্র ও শোভনীয়গতি রথে আমাদের দিকে এস। হে অশ্বিদ্বয়। আমাদের গাভীদের দুগ্ধপূর্ণ কর, আমাদের অশ্বদের প্রীত কর আমাদের বীর পুত্রদের বর্ধন কর।
৩। হে দস্রদ্বয়! তোমাদের শীঘ্রগামী শোভনীয় গতিযুক্ত রথদ্বারা এসে পরিচর্যারত স্তোতার এ লোক শ্রবণ কর। হে অশ্বিদ্বয়! পূর্বের মেধাবীগণ কি বলেন না যে তোমরা স্তোতৃদের দারিদ্র্য পরিহারার্থে সর্বদাই গমন কর?
৪। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের রথে যুক্ত, শীঘ্রগামী, লম্ফপ্রদানসমর্থ এবং শোনপক্ষীসদুশ অশ্বগণ তোমাদের নিয়ে আসুক। হে নাসত্যদ্বয়। জলের ন্যায় শীঘ্রগতি অথবা আকাশবিচারী গৃধ্রের ন্যায় সে অশ্বগণ তোমাদের হব্যের অন্নের অভিমুখে আনছে।
৫। হে নেতৃদ্বয়! সূর্যের যুবতী দুহিতা প্রীত হয়ে তোমাদের এ রথে উঠেছিলেন। তোমাদের পুস্টাঙ্গ লম্ফপ্রদানসমর্থ, শীঘ্রগামী এবং দীপ্তমান অশ্বসমূহ তোমাদের আমাদের গ্রহের দিকে নিয়ে আসুক।
৬। তোমরা স্বকীয় কার্যদ্বারা বন্ধন ঋষিকে উঠিয়েছিলে। হে কামবর্ষিদ্বয়! তোমরা স্বকীয় কার্যদ্বারা রেভ ঋষিকে উঠিয়েছিলে। তোমরা তুগ্রের পুত্রকে সমুদ্র পার করিয়েছিলে এবং চ্যবন ঋষিকে পুনরায় যুবা করে দিয়েছিলে।
৭। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা অবরুদ্ধ অত্রির তপ্ত অগ্নি নিবারণ করেছিলে এবং তাকে রসবৎ অন্ন দান করেছিলে। তোমরা স্তুতি গ্রহণ করে অন্ধকারে প্রবিষ্ট কব ঋষিকে (১) চক্ষু দান করেছিলে।
৮। হে অশ্বিদ্বয়! পুরাতন শষু ঋষি তোমাদের যাঞ্চা করলে তোমরা তার দুগ্ধশূন্য গাভী দুগ্ধে পূর্ণ করে দিয়েছিলে। তোমরা বর্তিকাকে বৃকরূপ পাপ হতে মুক্ত করে দিয়েছিলে এবং তোমরা বিশুপলাকে একটি জঙ্ঘা নির্মাণ করে দিয়েছিলে।
৯। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা পেদু রাজাকে ব্রতবর্ণ অশ্ব দিয়েছিলে, সে অশ্ব ইন্দ্রদত্ত, শত্রুহন্তা ও সংগ্রামে শব্দ করে এবং শত্রু বাজয়ী উগ্র ও সহস্র ধনদাতা, সে অশ্ব সেচনসমর্থ ও দৃঢ়াঙ্গ।
১০। হে নেতা, শোভনজন্মা অশ্বিদ্বয়। আমরা ধন যাচ্ঞা করে রক্ষণাত তোমাদরে আহ্বান করছি। আমাদের স্তুতি গ্রহণ করে তোমরা ধনযুক্ত রথে আমাদের সুখদানার্থ আমাদের নিকট এস।
১১। হে নাসত্যদ্বয়! সমান প্রীতিযুক্ত হয়ে শোন পক্ষীয় নূতন বেগের সাথে আমাদের নিকট এস। হে অশ্বিদ্বয়! হব্য নিয়ে আমি নিত্য উষার উদয়কালে তোমাদের আহ্বান করি।
টীকাঃ
১। অসুরগণ কবকে একটা অন্ধকার গৃহে প্রবেশ করিয়ে বলেছিল, এ স্থানে বসে ঊষা উদিতা হয়েছেন তা উপলব্ধি কর। ঊষার উদয় হয়েছে, অশ্বিগণ তা কবকে জানাবার জন্য বীণাশব্দ করেছিলেন। অথবা পটল দ্বারা পিহিত দৃষ্টি কবকে চক্ষু দান করেছিলেন।

১১৯ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে অশ্বীদ্বয়। জীবন ধারণার্থে অন্নের জন্য আমি তোমাদের রথকে আহ্বান করি, সে রথ বহুবিধ গতিযুক্ত, মনের ন্যায় শীঘ্রগামী, বেগবান অশ্বযুক্ত, যজ্ঞভাজন, সহস্র কেতু বিশিষ্ট, বৃষ্টিদাতা, শতধনযুক্ত, সুখকর এবং ধন দাতা।
২। সে রথ গমন করাতে অশ্বিদ্বয়ের প্রশংসায় আমাদের মন ঊর্ধ্বে আরোহণ কেরছে, আমাদের স্তুতিসমূহ অশ্বিদ্বয়কে প্রাপ্ত হয়েছে, আমি হব্য মধুর করছি, আমার সহায়ভূত (ঋত্বিগণ) আসছে। হে অশ্বিদ্বয়। সূর্যদুহিতা ঊর্জানী তোমাদের রথে আরোহণ করছেন।
৩। যখন যজ্ঞপরায়ণ অসংখ্য জয়শীল মানুষ সংগ্রামে ধনের জন্য পরস্পর স্পর্ধা করে একত্র হয়, তখন হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের রথ ভূগভীর অভিমুখে আসে তা জানা যায়, রথে তোমরা স্তোতার জন্য শ্রেষ্ঠধন আন।
৪। হে অভীষ্টবর্ষীদ্বয়। যে বূজ্যু নিজ অশ্বসমূহ দ্বারা নীত হয়ে সমুদ্রে নিমন্ন হয়েছিল তাকে তোমরা স্বয়ং সংযোজিত অশ্ব দ্বারা বহন করে তার পিত্রাদির নিকট তার দুরস্থ গৃহে এনেছিলে। দিবোদাসকে তোমরা যে মহৎ রক্ষণ প্রদান করেছিলে তা আমরা জানি।
৫। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের প্রশংসনীয় অশ্বদ্বয় তোমাদের সংযোজিত রথকে তার সীমাভূত আদিত্য পর্যন্ত সকল দেবগণের পূর্বে নিয়ে গিয়েছিল; কুমারী সূর্যা এরূপে বিজিত হয়ে সখ্যতা হেতু এসে তোমরা আমার পতি এ বলে তোমাদের পতিত্ব স্বীকার করলেন।
৬। তোমরা রেভকে চতুর্দিকের উপদ্রব হতে রক্ষা করেছিলে; তোমরা অত্রির জন্য হিমদ্বারা অগ্নি নিবারণ করেছিলে, তোমরা শযুর গাভীকে দুগ্ধ দিয়েছিলে, তোমরা বন্দনকে দীর্ঘ আয়ুদ্বারা বর্ধিত করেছিলে।
৭। জীর্ণরথকে শিল্পী যেরূপ নূতন করে, হে নিপুণ দস্রদ্বয়! তোমরা সেরূপ বার্ধক্য পীড়িত বন্দনকে পুনরায় যুবা করেছিলে। গর্ভস্থ বামদেব (১) তোমাদের স্তুতি করলে সে মেধাবীকে গর্ভ হতে জন্মদান করেছিলে। তোমাদরে রক্ষণকার্য এ পরিচযারত যজমানের সম্বন্ধে পরিণত হোক।
৮। ভূজ্যুর নিজ পিতা তাকে পরিত্যাগ করলে সে দূর দেশে পীড়িত হয়ে তোমাদের কৃপা প্রার্থনা করায় তোমরা তার নিকট গিয়েছিলে, সুতরাং তোমাদের শোভনীয় গতি ও বিচিত্র রক্ষণ কার্য সকলেই নিকটে পেতে ইচ্ছা করে।
৯। তোমরা মধুযুক্ত; সে মক্ষিকা তোমাদের স্তুতি করেছে, উশিজপুত্র (অর্থাৎ আমি কক্ষীবান) তোমাদের সোমপনে হর্যলাভার্থে আহ্বান করছি। তোমরা দধীচি ঋষির মন তুষ্ট করেছিলে, তার অশ্বের মস্তক তোমাদরে (মধুবিদ্যা) প্রদান করেছিল।
১০। হে অশ্বিদ্বয়! তোমরা পেদুকে বহুলোকের বাঞ্চিত এবং স্পর্ধীদের পরাজয়ী শুভ্রবর্ণ অশ্ব দিয়েছিলে। সে অশষ্ব যুদ্ধপরায়ণ দীপ্তিমান যুদ্ধে অপরাজিত সকল কার্যে সংযোজ্য এবং ইন্দ্রের ন্যায় মনুষ্য বিজয়ী।
টীকাঃ
১। গর্ভস্থ বামদেব অশ্বিদ্বয়কে স্তুতি করেছিল, তাতে অশ্বিদ্বয় তাকে জন্ম দিয়েছিলেন, এ ভিন্ন আর কোনও বিবরণ সায়ণের ব্যাখ্যায় নেই। বামদেব বংশীয়গণ ঋগ্বেদের চতুর্থ মন্ডলের ঋষি।
১২০ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে অশ্বিদ্বয়! কোন স্তুতি তোমাদরে পরিতুষ্ট করতে সমর্থ? কে তোমাদের উভয়কে প্রীত করতে সমর্থ? অনভিজ্ঞ একজন কিরূপে তোমাদের পরিচর্যা করবে?
২। এরূপে অজ্ঞ লোক সে সর্বজ্ঞদ্বয়কে পথ জিজ্ঞাসা কের, অশ্বিদ্বয় ভিন্ন সকলেই অজ্ঞ। শত্রু দ্বারা অনাক্রান্ত সে অশ্বিদ্বয় শীঘ্রই মানুষকে অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন।
৩। হে সর্বজ্ঞদ্বয়! আমি তোমাদের আহ্বান করি। তোমরা অভিজ্ঞ, আমাদের অদ্য মননীয় স্তোত্র উপদেশ কর। আমরা তাই সংযোগসহ হব্য প্রদান করে স্তুতি করি।
৪। আমি তোমাদেরই জিজ্ঞাসা করি, অপরিপক্বমতিদের জিজ্ঞাসা করি না। হে দস্রদ্বয়। বষটকারের (১) সাথে অগ্নিতে প্রদত্ত এবং অদ্ভূত ও পুষ্টিকর সোমরস পান কর, আমাদের পৌঢ় বল প্রদান কর।
৫। আমাদের যে স্তুতি ঘোষার পুত্র সুহস্তি ঋষি ও ভৃগু দ্বারা উচ্চারিত হয়ে শোভা পেয়েছিল, সে স্তুতি দ্বারা পজ্রবংশীয় ঋষি, আমি কক্ষীবান তোমাদরে অর্চনা করছি। অতএব এ স্তুতিজ্ঞ আমি কক্ষীবান অশ্ন কামনায় যেন সফলযত্ন হই।
৬। স্থলগতি ঋষির (অর্থাৎ অন্ধ ঋজ্রাশ্বের) স্তোত্র শ্রবণ কর। হে শোভনীয় কর্মের প্রতিপালকদ্বয়! সে আমার ন্যায় স্তুতি করে চক্ষু পেয়েছিল, অতএব আমাকেও অভিমত ফল দাও।
৭। তোমরা মহৎ ধন দান করেছ এব{ং তা পুনরায় লোপ করেছ। হে গৃহদাতৃদ্বয়! তোমরা আমাদের রক্ষক হও, পাপ বৃক তস্কর হন্তে আমাদের রক্ষা কর।
৮। কোনও শত্রুর অভিমুখে আমাদের অর্পণ করো না, আমাদের গৃহ হতে দুগ্ধবতী গাভীসমূহ যেন বৎস হতে পৃথক হয়ে কোন অগম্য স্থানে যায় না।
৯। যারা তোমাদের উদ্দেশে স্তুতি সংযোগ করে তারা মিত্রদের ধারণার্থে ধন প্রাপ্ত হয়। আমাদেরও অন্নযুক্ত ধন প্রদান কর এবং ধেনুযুক্ত অন্ন প্রদান কর।
১০। আমি অন্নদাতা অশ্বিদ্বয়ের অশ্ব রহিত রথ পেয়েছি; তা দিয়ে আমি অনেক লাভ কামনা করি।
১১। হে ধনপূর্ণ রথ! আমি এ সম্মুখে আছি, আমাকে সমৃদ্ধ কর। অশ্বিদ্বয় সে সুখকর রথ স্তোতৃদের সোমপান স্থান হয়ে যান।
১২। আমি স্বপ্ন ঘৃণা করি, যে ধনবান লোক পরকে প্রতিপালন করে না তাকেও ঘৃণা করি, উভয়ই শীঘ্র নাশ প্রাপ্ত হয়।
টীকাঃ
১। যজ্ঞের শেষে বষট শব্দ উচ্চারণ করতে হয়।

১২১ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। মনুষ্যদের পালন কর্তা ও গাভীরূপ ধনদাতা ইন্দ্র, কবে দেবাকাঙ্ক্ষী অঙ্গিরাদের এ স্তুতিসমূহ শ্রবণ করবেন? যখন তিনি গৃহপতির লোকদের সামনে দেখেন, তখন যজ্ঞে যজনীয় হয়ে তিনি প্রভূত উৎসাহ পূর্ণ হন।
২। তিনি আকাশকে স্থিরভাবে ধারণ করেছেন, তিনি গো সমূহের নেতা, তিনি বিস্তীর্ণ প্রভাযুক্ত হয়ে (১ সেবনীয় এবং জীবনধারক বৃষ্টিজল খাদ্যের জন্য প্রেরণ করেন। মহৎ সূর্যরূপ ইন্দ্র আপন দুহিত্য ঊষার পর প্রকাশ হন। তিনি অশ্বের স্ত্রীকে গোর মাতা করেছিলেন (২)
৩। তিনি অরুণ বর্ণ ঊষাকে রঞ্জিত ককের পুরাতন আহ্বান মন্ত্র শ্রবণ করুন, তিনি প্রতিদিন অঙ্গিরাগোত্রোৎপন্ন মনুষ্যদের ধন প্রেরণ করেন। তিনি হননশীল বজ্র নির্মাণ করেছেন এবং মনুষ্যদের ও চতুষ্পদ ও দ্বিপদদের হিতের জন্য আকাশ স্থির ভাবে ধারণ করেন।
৪। এ সোমপানে হৃষ্ট হয়ে তুমি স্তুতিভাজন ও লুকান গাভীদল যজ্ঞার্থে দান করেছিলে, যখন ত্রিলোকের শ্রেষ্ঠ ইন্দ্র যুদ্ধে রত হন, তখন তিনি মনুষ্যদের জন্য ক্নেণদাতা পণির দ্বার খুলে দেন।
৫। তুমি ক্ষিপ্রকারী যখন জগতের পোষণ কর্তা, তোমার পিতা মাতা দ্যৌ ও পৃথিবী তোমাকে সমৃদ্ধিকর ও উৎপাদনশক্তিযুক্ত দুগ্ধ এনে দিয়েছিলেন, যখন তারা দুগ্ধবতী গাভীসমূহের বিশুদ্ধ ধনবৎ দুগ্ধ তোমার সম্মুখে দিয়েছিলেন, তখন তুমি পণির স্বার খুলে দিয়েছিলে।
৬। এখন তিনি প্রাদুর্ভূত হয়েছেন এবং তিনি উষার সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান হয়েছেন। সে শত্রু বিজয়ী ইন্দ্র আমাদের হৃষ্ট করুন আমরাও হব্য অর্পণ করে স্তুতিভাজন সোমরসকে পাত্রদ্বারা যজ্ঞস্থানে সেচন করে সে সোম পান করি।
৭। যখন সূর্য কিরণদ্বারা দীপ্ত মেঘমালা জল বর্ষণ করতে প্রস্তুত হয়, তখন প্রেরণকারী ইন্দ্র যজ্ঞের নিমিত্ত বৃষ্টির অবরোধ নিবারণ করেন। হে ইন্দ্র! তুমি সূর্যরূপে যখন কর্মের দিনে কিরণ দান কর তখন শকটবান ও পশুপালক ও ক্ষিপ্রগামী নিজ নিজ কার্যে সিদ্ধি লাভ করে।
৮। যখন ঋত্বিকগণ তোমার বর্ধনার্থ মনোহর হর্যকর বলদায়ী এবং তোমার উপভোগ্য সোম হতে প্রস্তর দ্বারা রস বার ককের তখন হর্ষকর সোমরসের উপভোক্তা তোমার হরিনামক অশ্বদ্বয়কে এ যজ্ঞে সোমপান করাও। তুমি যুদ্ধনিপূণ, আমাদের ধনাপহারী শত্রুকে দমন কর।
৯। ঋভু দ্বারা আকাশ হতে আনীত, শীঘ্রগামী, লৌহময় বজ্র, তুমি ত্বরিতগতি শুষ্ণের প্রতি নিক্ষেপ করেছিলে। হে বহুলোকের অর্চ নাভাজন। তখন কুৎস ঋষির জন্য তুমি শুষ্ণকে অসংখ্য হননশীল অস্ত্র দ্বারা আঘাত করে বেষ্টন করেছিলে।
১০। যখন সূর্য অন্ধকারের সাথে সংগ্রাম হতে মুক্ত হলেন, তখন হে বজ্রধারী। তুমি তার মেঘরূপ শত্রুকে বিনাশ করেছিলে এবং সে শুষ্ণের যে বল সূর্যকে আচ্ছাদন করেছিল এবং সূর্যের উপর গ্রথিত হয়েছিল, তুমি সে বল ভগ্ন করেছিলে (৩)।
১১। হে ইন্দ্র! মহৎ বলবান ও সর্বত্র ব্যাপ্ত দ্যাবাপৃথিবী তোমাকে উৎসাহিত করেছিলেন; তুমি সে সর্বত্র বর্তমান ও সর্বভুক বৃত্রকে মহৎ বজ্রদ্বারা বহনশীল জলে নিক্ষেপ করেছিলে।
১২। হে ইন্দ্র! তুমি মানুষের বন্ধু, তুমি যে অশ্বগণকে রক্ষা কর, সে বায়ু তুল্য সুসংযুক্ত ও বহনকারী অশ্বে আরোহণ কর। কবির পুত্র উশনা (৪) যে হর্ষকর বজ্র তোমাকে দিয়েছেন, তুমি সে বৃত্রধ্বংসকারী শত্রুবিনাশী বজ্র তীক্ষ্ম করেছে।
১৩। হে সূর্যরূপ ইন্দ্র! হরিৎ নামক অশ্বগণকে থামাও। ইন্দ্রের্এতশ নামক অশ্ব রথের চক্র টানছে। তুমি নবতি নদীর পারে পৌছে সেখানে যজ্ঞবিহীনদের কর্তব্য কর্ম করাও।
১৪। হে বজ্রধারী ইন্দ্র! তুমি আমাদের এ দুর্দমনীয় দারিদ্র্য হতে উদ্ধার কর, সমীপবর্তী সংগ্রামে পাপ হতে রক্ষা কর এবং উন্নত কীতি ও সত্যের জন্য আমাদের রথযুক্ত ও অশ্ব প্রমুখ ধন দান কর।
১৫। ধনের জন্য পূজনীয়, হে ইন্দ্র! তোমার অনুগ্রহ আমাদের নিকট হতে উঠিয়ে নিও না, অশ্ন আমাদের পৃষ্ট করুক। হে মঘবন! তুমি ধনপতি, আমাদের গো দাও। আমরা তোমার অর্চনায় রত, যেন আমরা পুত্র পৌত্রাদির সাথে সুখ প্রাপ্ত হই।
টীকাঃ
১। এ স্থানে ইন্দ্রকে সূর্যরূপে স্তুতি করা হয়েছে। সূর্য বা সূর্য কিরণকেই ঋভু বলে উপাসনা করা হত তা আমরা ২০ সুক্তের ১ ঋকের টীকায় দেখেছি।
২। একদা ইন্দ্র লীলা খেলার জন্য অশ্বী হতে গাভী উৎপন্ন করে ছিলেন। সায়ণ। এ গল্পের প্রকৃত মূল কি? কিরণকে অশ্ব ও গো উভয়ের সঙ্গেই বেদে সর্বদা তুলনা করা হয়েছে, তা হতেই বোধ হয় এ গল্পের উৎপত্তি। বেদের অনেক প্রকৃতি সম্বন্ধে সরল উপমা হতে পুরাণের অনেক গল্পের সৃষ্টি হয়েছে।
৩। অতএব শুষ্ণ অর্থে মেঘ, যে জল দেয় না, জগৎকে শোষণ করে সেই মেঘ। ইন্দ্র সে আবরণকারী মেঘকে ভগ্ন করে বৃষ্টি দান করেন এবং সূর্যকে পুনরায় প্রকাশ করে দেন। ৩২ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।
৪। উশনা সম্বন্ধে ৫১ সুক্তের ১০ ঋকের টীকা দেখুন।

১২২ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে ক্রোধরহিত ঋত্বিকগণ! তোমরা কর্মফলদাতা রদ্রকে পালনশীল ও যজ্ঞসম্পাদক অন্ন অর্পণ কর। আমিও সে দ্যুলোকের অসুরকে এবং তার অনুচরস্বরূপ স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যস্থলবাসী মরুদগণকে স্তব করি। লোকে যেরূপ তুণীরদ্বারা শত্রুগণকে নিরস্ত করে তিনিও সেরূপ বীর মরুদগণ দ্বারা শত্রু নিরস্ত করেন।
২। পত্নী যেমন স্বামীর প্রথম আহ্বানে ত্বরান্বিত হয়ে আসেন সেরূপ অহোরাত্র নানা প্রকার স্তোত্রদ্বারা প্রকাশিত হয়ে আমাদের প্রথম আহ্বানে ত্বরান্বিত হয়েছেন। শত্রুনাশক আদিত্যের ন্যায় ূষাদেবী হিরণাবর্ণ কিরণযুক্ত ও বিস্তৃত রূপ ধারণ করে সূর্যের শোভায় শোভিত হয়েছেন।
৩। বসনাহ সর্ব তোগামী আদিত্য আমাদের আমোদ বর্ধন করুন, জলবর্ধক বায়ু আমাদের আনন্দ বর্ধন করুন। হে ইন্দ্র ও পর্জনাদেব! আমাদের বৃদ্ধি তীক্ষ্ম। কর। হে বিশ্বদেবগণ! আমাদের প্রভূত অগ্ন প্রদান করতে ইচ্ছা কর।
৪। আমি উশিজের পুত্র। হে ঋত্বিকগণ! আমার উদ্দেশে অগ্নভক্ষক ও স্তুতিভাজন অশ্বিদ্বয়কে জগৎ শুভ্রকারিণী ঊষার কালে, আহ্বান কর। উদকের নপ্তৃ অগ্নিদেবকে স্তব কর এবং আমার মত স্তবকারী মনুষ্যের মাতৃস্থানীয় (অহোরাত্র দেবতাকেও) স্তব কর।
৫। হে দেবগণ! আমি উশিজের পুত্র; আমি তোমাদের সম্বন্ধে শব্দোচ্চার্য স্তোত্র আহ্বানের জন্য পাঠ করি। হে অশ্বিদ্বয়! তোমাদের ঘোষা যেরূপ ধবল নামক চর্মরোগের বিনাশার্থে স্তব করেছিল, (আমিও সেরূপ করছি)। হে দেবগণ! ফলদাতা পুষাকেও আহ্বান করছি এবং অগ্ন সম্বন্ধীয় ধনকেও স্তব করছি।
৬। হে মিত্রাবরুণ! আমাদের আহ্বান শোন। যাগগৃহে সমস্ত আহ্বান শোন। প্রসিদ্ধ ধনবান জলদেব ক্ষেত্রসমূহ জলবর্ষণ করে আমাদের আহ্বান শোন।
৭। হে মিত্র হে বরুণ। আমি তোমাদের স্তব করি। যে স্তো্ত্রে নিয়মিত হয় সে স্তোত্র পাঠ করা হয়েছে। অতএব কক্ষীবানকে তোমার প্রসিদ্ধ গো দান কর। প্রসিদ্ধ ও সুন্দর রথবিশিষ্ট কক্ষীবানের প্রতি প্রীতি বিশিষ্ট হয়ে তোমরা এস এবং এসে আমার পৃষ্টি সাধন কর।
৮। মহাধনোপেত দেবদের ধনকে স্তব করি। আমরা মানুষ, বহুবীর পুত্রপৌত্ত বিশিষ্ট হয়ে আমরা এ ধন সম্ভোগ করব। যে দেব অঙ্গিরা গোত্রোৎপন্ন কক্ষীবানের নিমিত্ত অগ্ন প্রদান করেন, অশ্ব ও রথ প্রেরণ করেন, তাদের স্তব করি।
৯। হে মিত্রাবরুণ। যে ব্যক্তি তোমাদের দ্রোহকারী যে কোন প্রকারেও তোমাদরে দ্রোহ করে, যে তোমাদের জন্য সোমরসের অভিষব করে না, সে আপন হৃদয়ে যক্ষ্মা রোগ নিধান করে; যে ব্যক্তি যজ্ঞ করে, সে স্তুতি বাক্যে সোমরস প্রাপ্ত হয়।
১০। সে ব্যক্তি শান্ত অশ্ব প্রাপ্ত হয়, মনুষ্যদের পরাভব করে, সমকক্ষ লোকের মধ্যে অগ্নের জন্য প্রসিদ্ধ হয়, অতিথিগণকে ধন দান করে এবং সমস্ত যুদ্ধে হিংসক মনুষ্যের দিকে অশঙ্কিত ভাবে সর্বদা গমন করে।
১১। হে সর্বাধিপতি! হে আনন্দবর্ধক! তোমরা মরণ রহিত স্তোত্রকারী মানুষের অর্থাৎ আমার আহ্বান শোন ও এস! তোমরা আকাশব্যাপী, তোমরা অন্যরক্ষকরহিত রথবিশিষ্ট যজমানের সমৃদ্ধিসাধন হব্যের প্রশংসা করতে ভালবাস।
১২। যে যজমানের দশটি পাত্রস্থিত অগ্ন প্রাপ্তির জন্য আমরা আহুত হয়েছি, তাকে এ মনুষ্যাভিভাবী বল (দিলাম), দেবতারা এ কথা বললেন। এ দেবগণের দ্যোতমান অগ্ন ও ধন অতিশয় শোভা পায়। প্রকৃষ্ট যজ্ঞে দেবগণ অগ্ন দান করুন।
১৩। যেহেতু অগ্ন দশবিধ, অতএব ঋত্বিকগণ দশটি পাত্রে অগ্ন ধারণ করে গমন করছেন। আমরা বিশ্বদেবগণকে স্তব করি। ইষ্টাশ্ব ইষ্টরশ্মি (১) শত্রুতারক নেতাদের কি করতে পারে?
১৪। বিশ্বদেবগণ আমাদের হিরণ্যকর্ণ, মণিগ্রীব, রূপবান (পুত্র) দিন। আর্য বিশ্বদেবগণ সদ্য নির্গত স্তুতি ও হব্য আকাঙ্ক্ষা করুন।
১৫। মশর্শার নামক রাজার চারটি শিশুপুত্র, জয়শীল অযবস ামক রাজার তিন পুত্র আমাকে বাধা দিচ্ছে (২), হে মিত্রাবরুণ! তোমাদের অতি বিস্তৃত ও শোভন দৃপ্তিশালী রথ সূর্যের ন্যায় দ্যুতিলাভ করেছে।
টীকাঃ
১। সায়ণ বলেন ইষ্টাশ্ব ও ইষ্টরশ্মি দুজন রাজার নাম। পন্ডিতবর কৃষ্ণমোহন বন্দো্যাপাধ্যায় বলেন এ ইষ্টাশ্বই জেন্দ ধর্ম প্রচারক বিষ্টাস্প এবং পারসীকগণ তাকে পৃষ্টাষ্প বা কুষ্টাম্প বলত। See preface to Rig Veda Sanhita pp 14-17. সায়ণ এ দু রাজার সম্বন্ধে কোনও বিবরণ দেন নি।

১২৩ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। দক্ষিণা ঊষার রথ সংযোজিত হয়েছে। মরণরহিত দেবগণ এ রথে আরোহণ করলেন। কৃষ্ণবর্ণ অন্ধকার হতে পূজনীয়া, বিচিত্র গতিমতি ও মনুষ্য আবাসের রোগনাশিনী ঊষা উদয় হলেন।
২। সমস্ত ভূতগণের পূর্বেই ঊষা জাগরিত হলেন। তিনি ন্নদায়িনী মহতী ও জগতের সুখদায়িনী, তিনি যুবতী এবং বার বার আবির্ভূত হন; ঊর্ধ্বস্থিতা ঊষাদেবী আমাদের আহ্বানে প্রথমেই আসেন।
৩। হে সুজাতা ঊষা। তুমি মনুষ্যগণের পালয়িত্রী, তুমি অদ্য মনুষ্যদ্বের যে আলোকভাব প্রদান কর; দানশীল সবিতা, সূর্যের আগমনার্থ সে আলোক দান করে আমাদের পাপ রহিত বলে স্বীকার করুন।
৪। অহনা (১) নম্রভাবে প্রত্যহ প্রতিগৃহ অভিমুখে যান, ভোগেচ্ছাশালিনী দ্যুতিমতী প্রত্যহ আসেন এবং (হবারূপ) ধরনের শ্রেষ্ঠ ভাগ গ্রহণ করেন।
৫। হে স্বনৃতা ঊষা! তুমি ভগের ভগিনী এবং বরুণের ভগিনী, তুমি প্রথমা, তোমাকে সকলে স্তব করুক। পশ্চাৎ যে দুঃখের উৎপাদক সে আসুক। তোমার সহায়তা পেয়ে তাকে রথদ্বারা জয় করব।
৬। সুনৃত বাক্য উচ্চারিত হোক। প্রজ্ঞা উন্মিষিত হোক। অত্যন্ত দীপ্যামান অগ্নিসমূহ প্রজ্জ্বলিত হোক। যেহেতু বিচিত্র প্রভাবতী উষা অন্ধকারাবৃত স্পৃহনীয় বসু আবিস্কার করছেন।
৭। বিচিত্র রুপবতী আহোরাত্র দেবতাদ্বয় ব্যবধানরহিতভাবে চলছেন। একজন যান আর একজন আসেন। পর্যায়গামিনী দেবতাদ্বয়ের মধ্যে একজন পদার্থ সমূহ গোপন করেন অন্য জন অর্থাৎ ঊষা অত্যন্ত দীপ্তিমান রথদ্বারা তা প্রকাশিত করেন।
৮। অদ্যও যেরূপ কলাও সেরূপ ঊষা দেবীগণ অনবদ্য। প্রতিদিন তারা বরুণের অবস্থিতিস্থান হতে ত্রিংশৎযোজন অগ্রে অবস্থিত হন (২)। এক এক ঊষা উদয়কালেই গমনাগমনরূপ কর্ম নির্বাহ করেন।
৯। ঊষা দিনের প্রথম অংশের আগমনের সময় জানেন। তিনি স্বতোদীপ্তা ও স্বেতবর্ণা, কৃষ্ণবর্ণ হতে তার উদ্ভব। তিনি আদিত্যের ধামে মিশ্রিত হন কিন্তু তা হ্রাস করেন না বরং তার শোভা সম্পাদন করেন।
১০। দেবি। কন্যার ন্যায় শরীরাবরব বিকাশ করে তুমি দনাশীল ও দীপ্তিমান সূর্যের নিকট যাও। যুবতীর ন্যায় অত্যন্ত দীপ্তিবিশিষ্টা হয়ে ঈষৎ হাস্য করে তার সম্মুখে বক্ষোদেশ অনাবৃত কর।
১১। মাতা দেহমার্জন করে দিলে কন্যার শরীর যেরূপ উজ্জ্বল হয় তুমিও সেরুপ হয়ে দর্শনার্থে আপন শরীর প্রকাশ কর। তুমি ভদ্রা, তুমি অন্ধকারকে দুর করে দাও, অন্য ঊষা তোমার কার্য ব্যপ্ত করবে না।
১২। অশ্ববিশিষ্ট্য গোবিশিষ্টা, সর্বকালীনা ও সূর্য রশ্মির সাথে একত্রে প্রযতবতী ঊষাদেবীগণ কল্যাণকর নাম ধারণ করে নিবৃত্ত হন আবার আসেন।
১৩। সূর্যের রশ্মির অনুগমন করে (আমাদের) কল্যাণকর প্রজ্ঞা দাও, আমরা তোমাকে আহ্বান করছি। অন্ধকার নিবারণ কর, আমরা (হবির্লক্ষণ) ধনযুক্ত, আমাদের ধন হোক।
টীকাঃ
১। অহনা ঊষার নাম (যাস্ক)। গ্রীকদের Athena এ অহনা শব্দের প্রতিরূপ। ৩০ সুক্তের ২২ ঋকের টীকা দেখুন।
২। বরুণ অর্থে এখানে সূর্য সায়ণ। সায়ণ বলেন সূর্য প্রত্যহ ৫০৫৯ যোজন ভ্রমণ করেন। তা হলে সূর্য প্রত্যেক খন্ড ৭৯ যোজন ভ্রমণ করেন। অতএব ঊষা যদি সূর্যের ৩০ যোজন পূর্বগামী হন তা হলে সূর্যোদয়ের প্রায় অর্ধদন্ড (৩/৮ দন্ড) পূর্বে ঊষার উদয়। সূর্যের দৈনিক গতি সম্বন্ধে পন্ডিতবর বেষ্টলী এরূপ লিখেছেনঃ The reckoning of the sun’s daily journey, cited by Sayana, perhaps from some text of the Vedas is much nearer the truth than that of the Puranas, being something more than 20 000 miles and being in fact the equatorial circumference of the earth. Bentley-Hindu Astronomy.

১২৪ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। অগ্নি সমিধামান হলে ঊষা অন্ধকার নিরারণ করে সূর্যোদয়ের ন্যায় বহুল জ্যোতি প্রকাশ করেন। সবিতা আমাদরে ব্যবহারের জন্য দ্বিপদ ও চতুষ্পদবিশিষ্ট ধন দিন।
২। ঊষা দৈবব্রতের অবিঘ্নকারিণী, মনুষ্যের আয়ুঃকাল ক্ষয়কারিণী, অতীত ও নিত্য ঊষাগণের সদৃশী এবং আগামিনী ঊষাগণের প্রথমা। ঊষা দ্যুতি লাভ করেছেন।
৩। ঊষা স্বর্গের দুহিতা। তিনি জ্যোতিষ্ক আচ্ছাদিত হয়ে পূর্বদিকে ক্রমে দেখা দেন। সূযের অভিপ্রায় জেনেই যেন পথে সম্যকরূপে পরিভ্রমণ করেন এবং কখনও দিক সমূহের হিংসা করেন না।
৪। সূর্য যেমন নিজ বক্ষ আবিষ্কার করেন এবং নোধাঋষি যেমন আপনার প্রিয়বন্তু আবিষ্কার করেছিলেন সেরূপ ঊষা আপনাকে আবিষ্কার করেছেন। গৃহিণী জেগে যেমন সকলকে জাগান, ঊষাও জগতীজনকে সেরূপ জাগরিত করেন, ঊষা অভিসারিকাগণের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিকবার আসেন।
৫। ঊষা বিস্তৃত অন্তরীক্ষের পূর্বভাগে উৎপন্ন হয়ে দিকসমূহের চৈতন্য সম্পাদন করেন। ইনি পিতৃস্থানীয় স্বর্গ ও পৃথিবীর উৎসঙ্গে থেকে আত্মতেজদ্বারা উভয়কে পরিপূর্ণ করে বিস্তীর্ণ ও বিশিষ্টরূপে প্রথিত হয়েছেন।
৬। এ প্রকারেই ঊষা অত্যন্ত বিস্তৃত হয়ে সুখে দর্শন করবার জন্য বিজাতীয় এবং স্বজাতীয় কাকেও পরিত্যাগ করেন না। প্রকাশবতী ঊষা নির্মল শরীরে ক্রমে স্পষ্টতর হয়ে ক্ষুদ্র বা বৃহৎ কিছু হতেই পরাবৃত্ত হন না।
৭। ভাতৃরহিতা নারী যেমন অভিমুখী হরে পুরুষের নিকট আসে, গতভর্তৃকা যেমন ধনলাভার্থ গৃহে আরোহণ করে (১), ঊষাও সেরূপ করেন। জায়া যেরূপ পতি অভিলাষিণী হয়ে সুবস্ত্র পরিধান করে হাস্যদ্বারা দন্ত প্রকাশ করে, ঊষাও সেরূপ করেন।
৮। স্বসা রাত জ্যেষ্ঠ স্বসা ঊষাকে উৎপত্তি স্থান (অপর বাত্ররূপ) প্রদান করেছেন এবং ঊষাকে জানিয়ে স্বয়ং চলে যাচ্ছেন। ঊষা সূর্যকিরণ দ্বারা অন্ধকার দূর করে বিদ্যুৎরাশির ন্যায় জগৎ প্রকাশ করেছেন।
৯। এ সকল স্বসৃভাবাপন্ন পুরাতনী ঊষাগণের মধ্যে প্রথমা অপরার পশ্চাৎপ্রত্যহ যান। নবীয়সী ঊষা পুরাতনী ঊষাসমূহের ন্যায় সুদিন এনে আমাদের বহু ধনবিশিষ্ট করে প্রকাশ করুন।
১০। হে ধনবতী ঊষা! হবিপ্রদগণকে জাগাও। পণিগণ অপ্রবুদ্ধ হয়ে নিদ্রা যাক। হে ধনবতী! ধনবান যজমানগণের সমৃদ্ধি প্রদান কর। হে সুনুতে! তুমি সর্ব প্রাণিগণকে ক্ষীণ কর, তুমি যজমানকে সমৃদ্ধি প্রধান কর।
১১। যুবতী ঊষা পূর্বদিক হতে আসছেন, অরুণবর্ণ অশ্বগণকে রথে যোজন করেছেন। দিবসের সূচনা করে রূপরহিত অন্তরীক্ষে অন্ধকার নিবারণ করছেন। অগিন গৃহে গৃহে প্রদীপ্ত হচ্ছে।
১২। হে ঊষা! তোমার উদয় হলে পক্ষীগণ বসতিস্থান হতে উর্ধ্বে উৎপতিত হচ্ছে। অন্ন চেষ্টায় ব্যাপৃত মনুষ্যগণ উম্মুখ হয়ে গমন করছে। হে দেবি! দেবযজন গৃহে অবস্থিত হব্যদাতা মনুষ্যের জন্য বহুধন আন।
১৩। হে তোমাই ঊষাগণ! তোমরা আমার মন্ত্রদ্বারা স্তুত হও। আমার সমৃদ্ধি কামনা করে আমাদের বর্ধিত কর। হে দেবীগণ! তোমার রক্ষালাভ করে আমরা সহস্রসংখ্যক ধনলাভ করব।
টীকাঃ
১। গর্তারুগির সময়ে ধনানাং অর্থাৎ ধনলাভার্থ গৃহে আরোহণকারীর ন্যায়। গর্তা অর্থে গৃহ। কিন্তু নিরুক্ত অনুসারে গর্তা অর্থে দ্যুতক্রীড়ার স্থান; পতিহীন নারী কখন কখন দ্যুতক্রীড়ার দ্বারা অর্থলাভ করত।

১২৫ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। স্বনয় রাজা প্রাতঃকালে এসে প্রাতঃকালেই রত্ন এনে রাখলেন। কক্ষীবান চেতনা পেয়ে রত্ন গ্রহণ করে স্থাপন করলেন সূবীর দীর্ঘতমা সে রত্নদ্বারা প্রজা ও আয়ুবধ ন করে ধনবৃদ্ধি প্রাপ্ত হলেন (১)।
২। তার অনেক গোধন হোক। তিনি বহু সুবর্ণবান ও বহু অশ্ববান হোন। ইন্দ্র তাকে প্রভূত অন্ন প্রদান করুন। লোকে যেমন রশি দিয়ে পশু পক্ষাদি বাধে তিনিও সেরূপ প্রাতঃকালে এসে পদব্রজে আগমনকারীকে ধনদ্বারা আবদ্ধ করেছেন।
৩। আমি যজ্ঞের ত্রাতা শোভন কর্মকারীকে দেখবার ইচ্ছা করে সমৃদ্ধরথে আরোহণ করে অদ্য উপস্থিত হয়েছি। দিপ্তিশালী মাদক সোমের অভিযুত রস পান কর। বহু বীরপুত্রাদিবিশিষ্টকে প্রিয় ও সত্যবাক্যদ্বারা সমৃদ্ধ কর।
৪। প্রস্রূত পয়োধারা, সুখপ্রদা ধেনুগণ যজমান এবং যজ্ঞ সংকল্পকারীর নিকটে গিয়ে দুগ্ধ প্রদান করছে। সমৃদ্ধির হেতুভূত ঘৃতধারা, তর্পণকারী ও হিতকারী পুরুষের নিকট চারদিক হতে উপস্থিত হচ্ছে।
৫। যে ব্যক্তি দেবতাদের প্রীত করে সে স্বর্গের পৃষ্ঠদেশে অবস্থান করে এবং দেবতাদের মধ্যে যায়। স্যন্দনশীল জল তার নিকট তেজোবিশিষ্ট সার প্রদান করে। ভূমিও শস্যাদি ফল সম্পাদনক্ষম হয়ে তার সন্তোষ সাধন করে।
৬। যে ব্যাক্তি দক্ষিণা দেয়, এ বিচিত্র বস্তু সকল তারই হয়। দক্ষিণাপ্রদাতার জন্য দ্যুলোকে সূর্য বিদ্যমান আছে। দক্ষিণা প্রদাতৃগণই জরা মরণ রহিত স্থান প্রাপ্ত হয়। দক্ষিণা প্রদাতৃগণ দীর্ঘ আয়ু লাভ করে।
৭। যারা দেবতাদের প্রীত করে, তারা দুঃখ এবং পাপপ্রাপ্ত হয় না। শোভন ব্রতশালী স্তোতৃগণও জরাগ্রস্ত হয় না। দেবতাদরে প্রীতিপদ ও স্তুতিকারী ভিন্ন অন্য লোককে পাপ আশ্রয় করুক। যারা দেবতাদের প্রীত না করে শোক তাদের প্রাপ্ত হোক।
টীকাঃ
১। কক্ষীবান অধ্যয়ন সমাপ্ত করে গৃহে গমনকালে পথপার্শ্বে নিদ্রিত হয়ে পড়লেন। স্বনয় রাজা অনুচরবর্গের সাথে সেখানে এসে কক্ষীবানের রূপ দেখে তুষ্ট হয়ে তাকে নিজ গৃহে নিয়ে গেলেন এবং আপন দশ কন্যার সাথে তার বিবাহ দিয়ে তাকে ১০০ নিস্ক সুবর্ণ, ১০০ অশ্ব, ১০০ বৃষ, ১০৬০ গাভী ও ১১ রথ প্রদান করলেন। কক্ষীবান গৃহে এসে এ অর্থ সমুদয় পিতাকে অর্পণ করলেন। সায়ণ। অতএব স্বনয় রাজার দানই এ সুক্তের দেবতা অর্থাৎ সে দান সম্বন্ধে এ সুক্ত রচিত হয়েছে।

১২৬ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। সিন্ধুনিবাসী ভাবয়ব্যের জন্য (১) নিজ বুদ্ধিবলে বহুসংখ্যক স্তোম সম্পাদন করি। হিংসারহিত রাজা, কীতিলাভ কামনায়, আমার জন্য সহস্র সোম যাগের অনুষ্ঠান করেছেন।
২। অসুর রাজা গ্রহনের জন্য আমাকে যাচ্ঞা করার সঙ্গে সঙ্গেই আমি কক্ষীবান তার নিকট শত নিস্ক (২) শত লক্ষণযুক্ত অশ্ব ও শত বলীবর্ধ গ্রহণ করলাম। রাজা স্বর্গলোকে শাশ্বতী কীর্তি বিস্তার করবেন।
৩। স্বনয় কর্তৃক প্রদত্ত ও শ্যামবর্ণ অশ্বযুক্ত বধুসমশ্বিত দশখানি রথ আমার নিকট উপস্থিত হল। এক সহস্র ষষ্টিসংখ্যক গাভী উপস্থিত হল। কক্ষীবান গ্রহণ করে পর দিনেই তা আপনার পিতাকে দান করলেন।
৪। গো সহস্রের সম্মুখে দশখানি রথের চত্বারিংশৎ শোণঘোটক শ্রেণীবদ্ধ হয়ে চলতে লাগল। কক্ষীবানের অনুঢরেরা ঘাসাদি খাদ্য সংগ্রহ করে মদস্রাবী সূবর্ণময় আভরণ বিশিষ্ট সতত গতিশীল অশ্বদের মার্জন করতে লাগল।
৫। হে বন্ধুগণ! পূর্বের দান স্মরণ করে তোমাদের জন্য একাদশ সংুক্ত রথ এবং বহুমুলা গো গ্রহণ করেছি। প্রজাসমূহের ন্যায় পরস্পর অনুরাগবিশিষ্ট হয়ে আঙ্গিরাগণ শকটবিশিষ্ট হয়ে কীর্তিলাভের চেষ্টা করুক।
৬। এ সম্ভোগযোগ্য রমণী বিশেষরূপে আলিঙ্গিতা হয়ে সুতবৎসা নকুলীর ন্যায় চিরকাল রমণ করে। বহু তেজোযুক্তা হয়ে রমণী আমাকে শতবার ভোগ প্রদান করছে।
৭। নিকটে এসে বিশেষরূপে স্পর্শ কর। আমার অঙ্গে লোম অল্প মনে করো না, আমি গন্ধার দেশীয় মেধীর ন্যায় লোমপূর্ণা ও পুর্ণাবয়রা (৩)।
টীকাঃ
১। তৎপুত্রস্য স্বনয়সা ইত্যর্থঃ। সায়ণ। Either the river Indus or the seashore- Wilson
২। নিস্ক শব্দের দুটি অর্থঃ (১) আভরণ, (২) সুবর্ণ। প্রাচীন কালে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুবর্ণ খন্ড অর্থাৎ নিস্ক, মুদ্রা রূপে প্রচলিত ছিল এবং তা কষ্ঠের আভরণ রূপেও ব্যবহৃত হত।
৩। বর্তমানের পেশাওয়র প্রদেশকে পূর্বকালে গান্ধার দেশ বলা হত। পেশাওয়র, লাহোর, কাশ্মীর, অমৃতসব প্রভৃতি প্রদেশ সমূহ অদ্যাপি লোমপূর্ণ মেঘ ও ছাগ এবং উত্তম শাল ও পশমী বস্ত্রাদির জন্য প্রসিদ্ধ।

১২৭ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। কৃতবিদ্য বিপ্রের ন্যায় প্রজ্ঞাবিশিষ্ট, বলের পুত্রস্বরূপ, সকলের নিবাস ভূমিস্বরূপ এবং অত্যন্ত দানশীল অগ্নিকে আমি হোতা বলে সম্না করি। যজ্ঞনির্বাহকারী অগ্নি উৎকৃষ্ট দেব পূজা সমর্থ হয়ে; চতুর্দিকে প্রসূত ঘৃতের দীপ্তি অনুসরণ করে, নিজ শিখাদ্বারা তা প্রার্থনা করছেন।
২। হে মেধাবী শুভ্রদীপ্তি অগ্নি! আমরা যজমান, আমরা মনুষ্যদের উপকারার্থে মনন সাধন, অত্যন্ত প্রীতিপ্রদ মন্ত্রদ্বারা অঙ্গিরাগণের জ্যেষ্ঠস্বরূপ তোমাকে আহ্বান করি। সর্ব তোগামী সূর্যের ন্যায় তুমি যজমানদের জন্য দেবতাদের আহ্বান করে থাক। তুমি কেশবৎ আয়ত জ্বালাবিশিষ্ট ও অভীষ্টবর্ষী। যজমানগণ অভিমত ফলপ্রাপ্তির জন্য তোমাকে প্রীত করুক।
৩। অগ্নি বিশেষ দীপ্তিবিশিষ্ট জ্বারাদ্বারা বিশেষরূপে দীপ্যমান; তিনি বিদ্রোহিদের ছেদনার্থে পরশুর ন্যায় বিনাশে অমোঘ, তার সাথে মিলিত হলে দৃঢ় ও স্থির বন্তুও জলের ন্যায় শীর্ণ হয়। শত্রু পরাভবকারী ধনুর্ধর যেরূপ পালায় না, অগ্নিও সেরূপ শত্রুদের অভিভব কার্য হতে বিরত হন না।
৪। যেমন বিদ্বান ব্যক্তিকে অর্থদান করা যায় সেরূপ অগ্নিকে সারবান (হব্য) মন্ত্রানুক্রমে প্রদান করছে। অগ্নি তেজোযুক্ত যজ্ঞাদিদ্বারা আমাদের রক্ষার্থ ধন প্রদান করেন। যজমানও রক্ষার্থে অগ্নিকে হব্য প্রদান করেন। অগ্নি (যজমানদত্ত হব্যে) প্রবেশ করে শিখাদ্বারা তা বনের ন্যায় দহন করেন। অগ্নি কঠিন অশ্নাদি নিজশিখাদ্বারা পাক করেন এবং তেজোদ্বারা স্থির দ্রব্য বিনষ্ট করেন।
৫। অগ্নি রাতে দিন হতেও অধিক দর্শনীয়, অগ্নি দিনে সম্যক আয়ু শুন্য, আমরা অগ্নির উদ্দেশে বেদিসমীপে হব্য দান করি। পিতার নিকট পুত্র যেমন দৃঢ় ও সুখসাধন গৃহলাভ করে সেরূপ অগ্নিও অগ্ন গ্রহণ করেন। অগ্নি ভক্ত ও অভক্ত বুঝেও উভয়কেই রক্ষা করেন। অগ্নি হব্য ভক্ষণ করে অজর হন।
৬। স্তুত্য অগ্নি মরুৎ বলের ন্যায় প্রভূত ধ্বনিযুক্ত। কর্মবিশিষ্ট উর্বরা ভূমিতে অগ্নির যাগ করা উচিত, সৈন্য বিজয়ের জন্য অগ্নির যাগ করা উচিত। অগ্নি হব্য ভক্ষণ করেন। অগ্নি সর্বত্র দানশীল ও যজ্ঞের কেত পূজনীয়। যজমানদের হর্যদায়ী ও হর্যযুক্ত অগ্নির পথ নির্ভয় রাজপথের ন্যায় সুখপ্রাপ্তির জন্য সকল মনুষ্য সেবা করে।
৭। উভয় প্রকার অগ্নির গুণকীর্তনকারী, দীপ্তিশালী, নমস্কার কুশল ও হব্যদাতা ভৃগু গোত্রোৎপন্ন মহর্ষিগণ হবির্দানার্থ অরণি দ্বারা অগ্নিমন্থন এবং স্তব করছেন। প্রদীপ্ত অগ্নি সমস্ত ধনের অধীশ্বর। অগ্নি যজ্ঞবান এবং পর্যাপ্তরূপে প্রিয়হব্য ভোগ করেন, তিনি মেধাবী এবং অন্য দেবতাকেও ভাগ দেন।
৮। সমস্ত যজমানের রক্ষক, একরূপেই সমস্ত লোকের গৃহ পালক অবিসংবাদি ফলবিশিষ্ট, স্তুতির বাহক এবং অথিথিবৎ মনুষ্যদের পূজনীয় অগ্নিকে ভোগের জন্য আমরা আহ্বান করি। পুত্রগণ যেমন পিতার নিকট গমন করে, সেরুপ এ সমস্ত দেবগণ হব্যের উদ্দেশে অগ্নির নিকট যান, ঋত্বিকগণও দেবগণের যাগকালে অগ্নিকে হব্য প্রদান করেন।
৯। ধন যেমন দেবযজ্ঞার্থে উৎপন্ন হয় সেরূপ হে অগ্নি! তুমিও দেবযজ্ঞার্থে উৎপন্ন হও। তুমি নিজবলে শত্রুদের অভিভবিতা এবং অত্যন্ত তেজস্বী। তোমার আনন্দ অত্যন্ত বলপ্রদ, তোমার ক্রতু অত্যন্ত যশঃপ্রদ। হে অজর, হে ভক্তগণের জরানিবারক অগ্নি! এ জন্যই যজমানেরা দুতের ন্যায় তোমার পরিচর্যা করে।
১০। হে স্তোতৃগণ! যেহেতু হবিস্মান যজমান এ অগ্নির উদ্দেশে সমস্ত বেদি ভূমিতে বার বার গমন করছেন, অতএব তোমাদের স্তোত্র সে পূজা, শত্রুপরাভবকারী, প্রাতঃকালে জাগরণশীল এবং পশুপ্রদ অগ্নির প্রীতি উৎপাদনে সমর্থ হোক। ধনবানের নিকট বন্দী যেমন স্তব করে, সেরূপ হোতা অগ্রে দেবগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অগ্নিকে স্তব করেন।
১১। হে অগ্নি! যদিও তোমাকে নিকটে দীপ্তরূপে দেখতে পাই, তথাপি তুমি দেবতাদের সাথে আহার কর। তুমি শোভন অন্তঃকরণে তোমার অধীনের প্রতি অনুগ্রহ করে পূজনীয় ধন আহরণ কর। হে বলবান অগ্নি! আমাদরে জন্য প্রভূত অন্ন প্রদান কর, যেন পৃথিবী দর্শন ও ভোগ করতে পারি। হে মঘবন অগ্নি! স্ত্রোতৃদের জন্য সুবীর্যবৎ ধন দাও। প্রভূত বলবিশিষ্ট হয়ে ক্রুরে ব্যক্তি যেরূপ শত্রু নাশ করে, সেরূপ আমাদের শত্রু বিনাশ কর।

১২৮ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। দেবতাদের আহ্বাতা এবং অত্যন্ত যাগশীল এ অগ্নি ফলপ্রার্থীদের ব্রত ও আপনার ব্রত (হবিভোজন) উদ্দেশে মনুষ্য হতেই উৎপন্ন হন, সমস্ত বিষয় কর্মবান অগ্নি বন্ধুকামী ও অন্নাভিলাষী (যজমানের) ধনস্থানীয়। ভূমিপদে সরভূত বেদিতে ইলার বিহিত স্তুতি (১) অহিংসিত হোমনিস্পাদক, ঋত্বিগ্বেষ্টিত, অগ্নি উপবিষ্ট রয়েছেন।
২। আমরা যজ্ঞানুষ্ঠান ও আজ্যাদিবিশিষ্ট নমস্কারোপলক্ষিত স্তোত্রদ্বারা বহু হব্য বিশিষ্ট এবং দেবযজ্ঞে যজ্ঞসাধক অগ্নিকে পরিতোষপূর্বক সেবা করি। সে অগ্নি আমাদের হব্যরূপ অন্ন গ্রহনের জন্য ক্ষমবান হয়ে নাশপ্রাপ্ত হবেন না। মাতরিশ্বা মনুর জন্য দূর হতে অগ্নিকে এনে দিীপ্ত করে ছিলেন (২), সেরুপ দূর হতে আমাদের যজ্ঞশালায় তিনি আসুন।
৩। সর্বদা গীয়মান, হবিম্মান, অভীষ্টবর্ষী ও সামর্থবান অগ্নি শব্দ করে গমন করত সদ্য পার্থিব বেদীর চারদিকে শব্দ করে আসছেন। অগ্নিদেব স্তোত্র গ্রহণ করে অক্ষস্থানীয় শিখাদ্বারা চারদিকে প্রকাশমান হচ্ছেন। সমুচ্ছ্রিত স্থানীয় অগ্নি উৎকৃষ্ট যজ্ঞে সদ্য আসেন।
৪। শোভনকর্মা ও পুরোহিত অগ্নি প্রতি যজমান গৃহে নাশরহিত যজ্ঞ জানতে পারেন, তিনি ক্রতুদ্বারা যজ্ঞ জানতে পারেন। তিনি কর্মদ্বারা বিবিধ ফলদাতা হয়ে যজমানার্থ অন্ন ইচ্ছা করেন। তিনি হব্য প্রভৃতি স্পর্শ করেন কেন না তিনি ঘৃতভক্ষক অতিথি রূপে উৎপন্ন হয়েছেন। অগ্নি প্রবৃদ্ধ হয়ে হব্যদাতা বিবিধ ফলপ্রাপ্ত হন।
৫। মরুৎগণ যেরূপ ভক্ষ্যদ্রব্য মিশ্রিত করেন, এ অগ্নিকে যেরূপ ভক্ষ্যদ্রব্য দেওয়া যায়, সেরুপ যজমানগণ কর্মদ্বারা অগ্নির প্রবল শিখাতে তৃপ্তির জন্য ভক্ষদ্রব্য মিশ্রিত করে। যজমান নিজ ধন অনুসারে হব্যদান করে। পাপ আমাদের হরণ করছে, অগ্নি আমাদের হরণকারী দুঃখ ও হিংসক পাপ হতে রক্ষা করুন।
৬। বিশ্বাত্মক মহান ও বিরামরহিত অগ্নি সূর্যের ন্যায় দক্ষিণ হস্তে ধন ধারণ করেন (২), তার সে হন্ত যজ্ঞকারীর জন্য শ্রথ হয়। কেবল হবিপ্রাপ্তির আশায় অগ্নি তা ত্যাগ করেন না। হে অগ্নি! সমস্ত হবিস্কামী দেবতাদের জন্য তুমি হব্য বহন কর। অগ্নি সমস্ত সংকার্যকারীর জন্য বরণীর ধন প্রদান করেন ও স্বর্গের দ্বার উন্মুক্ত করেন।
৭। মানুষের পাপ নিমিত্তক যজ্ঞে অগ্নি বিশেষ হিতকারী। অগ্নি যজ্ঞস্থলে জন্মশীল রাজার ন্যায় মানুষের পালক ও প্রিয়। অগ্নি যজমানদের বেদিতে সম্পাদিত হব্যের উদ্দেশে আসেন। অগ্নি আমাদের হিংসক বরুণের ভয় হতে সে মহৎ দেবের হিংসা হতে উদ্ধার করেন (৩)।
৮। ধনধারক, সকলের প্রিয়, সুবুদ্ধিদাতা ও বিরামরহিত অগ্নিকে ঋত্বিকগণ স্তব করছে ও তাকে সম্পূর্ণরূপে প্রাপ্ত হয়েছে। হব্যবাহী, প্রাণীদের, জীবনস্বরূপ, সর্ব প্রজ্ঞাবিশিষ্ট, দেবতাদের আহ্বানকর্তা, যজনীয় ও মেধাবী অগ্নিকে তারা সম্পূর্ণ রূপে প্রাপ্ত হয়েছে। ঋত্বিকগণ অর্থকামী হয়ে অগ্নিকে হব্যরূপ অন্ন দেবার কামনা করে আশ্রয়লাভার্থে রমনীয় ও শব্দকারী অগ্নিকে প্রাপ্ত হয়েছে।
টীকাঃ
১। ৩১ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।
২। মাতরিশ্বা ভৃগুদের জন্য অগ্নিকে এনছিলেন, এ সম্বন্ধে ৬০ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন। আবার এস্থলে আমরা দেখছি যে মাতরিশ্বা মনুর জন্য অগ্নি এনেছিলেন। ভৃগু, মনু, অঙ্গিরা প্রভৃতি ঋষিগণ ভারতবর্ষে অগ্নি পূজা বিশেষরূপে প্রচার করেছিলেন তা এ সকল ঋক হতে প্রতীয়মান হচ্ছে। ৭১ সুক্তের ৩ ঋকের টীকা দেখুন।
২। সূর্য হস্তে ধন ধারণ করেন সে বিষয়ে ২২ সুক্তের ৫ ঋকের টীকা দেখুন।
৩। সায়ণ বরুণস্য অর্থ করেছেন রাকস্য অর্থাৎ যে যজ্ঞকার্যে বাধা দেয়। যাম্বা বরুণস্য পাপদেবস্য। সায়ণ। বরুণ পাপের দন্ডদাতা তা ঋগ্বেদের অনেক সুক্তে দেখা যায়। ৭ মন্ডলের ৮৬ সুক্ত ও ৮৯ সুক্ত দেখুন।

১২৯ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে হর্ষযুক্ত যজ্ঞগামী ইন্দ্র। তুমি যজ্ঞলাভের জন্য রথে আরোহণ করে যে প্রভূত জ্ঞানসম্পন্ন যজমানের নিকট আস এবং যাকে ধন ও বিদ্যায় উন্নত কর, তাকে তৎক্ষনাৎ সফল মনোরথ এবং হবাবিশিষ্ট করে দাও। হে হর্যযুক্ত ইন্দ্র! আমরা বেধাগণের মধ্যেও বেধা; আমরা স্তুতি করলে তুমি শীঘ্র আমাদের স্তুতি ও হব্য গ্রহণ কর।
২। হে ইন্দ্র! তুমি যুদ্ধের নেতা, তুমি মরুৎগণের সাথে প্রধান প্রধান যুদ্ধে স্পর্ধাপূর্বক শত্রুসংহারে সমর্থ, তুমি শুরগণের সাথে স্বয়ং সংগ্রাম সুখ অনুভব কর। ঋত্বিকগণ স্তব করলে তুমি তাদের অন্ন প্রদান কর, আমাদের স্তুতি শ্রবণ কর। অভ্যর্থনা সমর্থ ঋত্বিকগণ গমনশীল অন্নবান ইন্দ্রকে অশ্বের ন্যায় সেবা করে।
৩। হে ইন্দ্র! তুমি শত্রুক্ষয়কারক, বৃষ্টি পূর্ণ ত্বকরূপ মেঘকে ভেদ করে জল সেচন কর এবং মর্ত্যের ন্যায় গমনশীল মেঘকে ধরে বৃষ্টি শূন্য করে ছেড়ে দাও। হে ইন্দ্র। তোমার এ কায আমরা তোমার নিকট, দ্যুব নিকট, যশোযুক্ত রুদ্রের নিকট ও প্রজাদের সুখদায়ী মিত্র ও বরুণের নিকট বলব।
৪। হে ঋত্বিকগণ! আমাদের যজ্ঞে ইন্দ্রকে কামনা করি। ইন্দ্র আমাদর সখা, সর্বযজ্ঞগামী, শত্রুদের অভিভবকারী এবং আমাদের সহায়ভূত; তিনি যজ্ঞ বিঘ্নকারীদের পরাভব করেন এবং মরুৎগণের সাথে মিলিত হন। হে ইন্দ্র! তুমি আমাদের পালনার্থে আমাদের (কর্ম) রক্ষা কর। সংগ্রামে শতু তোমার বিরুদ্ধে দাড়াতে পারে না। তুমিই সমস্ত শত্রুকে নিবারণ কর।
৫। হে উগ্র ইন্দ্র! তোমার ভক্ত যজমানের বিরুদ্ধকারীকে উগ্র রক্ষণকার্যরূপ তেজোময় উপায সমূহদ্বারা অবনত করে দাও। তুমি পূর্বকালে যেরূপ আমাদের পূর্বপুরুষদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলে আমাদেরও সেরূপ নিয়ে যাও। তোমাকে লোকে নিষ্পাপ বলে জানে। হে ইন্দ্র! তুমি জগৎপালক হয়ে মানুষের সমস্ত পাপ দূর কর। আমাদের অভিমুখে যজ্ঞফল বহন করে অনিষ্ট বিনাশ কর।
৬। ভবনশীল ইন্দুর জন্য (১) আমরা এ স্তোত্র পাঠ করি, ইন্দু আগ্রহ সহকারে আমাদের কর্মের উদ্দেশ্যে, বক্ষোবিঘাতী আহ্বানযোগ্য (ইন্দ্রের) নঅয় আসছেন। তিনি নিজেই আমাদের নৈন্দকারী দুর্মতির বধের উপায় উদ্ভাবন করে তাকে দূর করে দেবেন। চোর যেন অত্যন্ত নিকৃষ্টভাবে ক্ষুদ্র জলের ন্যায় অধ:পতিত হয়।
৭। হে ইন্দ্র স্ত্রোত্রদ্বারা তোমার গুণকীর্তন করে তোমাকে ভজনা করি। হে ধনবান ইন্দ্র! আমরা সামর্থদায়ী, রমণীয়, নিত্য পুত্রভূত্যাদিবিশিষ্ট ধন উপভোগ করব। হে ইন্দ্র! তোমার মহিমা দুজ্ঞেয়, আমরা যেন উত্তম স্তোত্র ও অন্ন প্রাপ্ত হই। আমরা যেন বাগনিষ্পাদক ইন্দ্রকে অবিসংবাদী ও দ্যুনহুতি (২) অন্নবিশিষ্ট আহ্বানদ্বারা পেতে পারি।
৮। হে ঋত্বিকগণ! তোমাদেরও আমাদের জন্য ইন্দ্র যশস্কর আশ্রয়দান দ্বারা দুর্মতিদের বিনাশকর সংগ্রামে প্রবৃদ্ধ হন এবং দুর্মতিদের বিদীর্ণ করেন। আমাদের ভক্ষক শত্রুরা আমাদের বিরুদ্ধে আমাদের নাশের জন্য যে বেগবতী সেনা পাঠিয়েছিল সে সেনা স্বয়ং হত হয়েছে আমাদের নিকটও আসে না, শত্রুদের নিকটও্আসে না।
৯। হে ইন্দ্র! তুমি রাক্ষশুন্র পাপরহিত পথে, প্রচুর ধন নিয়ে আমাদরে নিকট এস। হে ইন্দ্র! তুমি দুরদেশে ও নিকট হতে এসে আমাদের সাথে মিলিত হও। তুমি দূরদেশ ও নিকট হতে যাগ নির্বাহের অভিপ্রায়ে আমাদের রক্ষা কর। যজ্ঞ নির্বাহ করে সর্বজ্ঞা আমাদের পালন কর।
১০। হে ইন্দ্র ! তুমি যে ধনে আমাদের আপদ উদ্ধার হয় সে ধনদ্বারা আমাদের উদ্ধায় কর। তুমি উগ্ররূপী। মিত্রের যেরূপ মহিমা, আমাদের রক্ষার জন্য তোমারও সেরূপ মহিমা হোক। হে বলবত্তম পালক, ত্রাতা, মরণরহিত ইন্দ্র! তুমি যে কোন রথে চড়ে এস। হে শত্রুভক্ষক। আমরা ভিন্ন অন্য সকলকেই বাধা দাও। হে শত্রুভক্ষক! অত্যন্ত কুৎসিত শত্রুকে বাধা দাও।
১১। হে শোভনস্তুতিবিশিষ্ট ইন্দ্র! তুমি দুঃখ হতে আমাদের রক্ষা কর। যেহেতু সর্বদা দুর্মতিদের অবনত কর। তুমি আমাদের স্তুতিতে হৃষ্ট হয়ে যজ্ঞ বিঘূকারীদের দমন কর। তুমি পাপরাক্ষসের হন্তা এবং আমার মত মেধাবীগণের রক্ষক। হেজ জগন্নিবাস ইন্দ্র! জনিতা এ হেতু তোমাকে উৎপন্ন করেছেন (৩)। হে বাসপ্রদ! রাক্ষস নাশের জন্য তোমার উৎপত্তি হয়েছে।
টীকাঃ
১। সায়ণ ইন্দু শব্দের চন্দ্র অর্থ করেছেন। উইলসন ও লাংলোয়া সোমরস অর্থ করেছেন।
২। দ্যুশ্নহৃতি শব্দে আহ্বান বিশেষ বুঝায়।
৩। ত্বাজনিতাজীজনৎ বসো অর্থ, হে বসু, জনিতা তোমাকে জন্ম দিয়েছেন। সে জনিতা কে? ৪র্থ মন্ডলের ১৭ সুক্তের ৪ ঋকে আছে দ্যুঃ ইন্দ্রস্য কর্তা, ঋগ্বেদের অন্যান্য স্থানেও এরূপ আছে। সায়ণ জনিতা অর্থ করেছেন সর্বস্য আদিকর্তা পরমেশ্বরঃ।
১৩০ সুক্ত।।
অনুবাদঃ
১। হে ইন্দ্র! ঋত্বিকগণের পতি যজমান যেরূপ যজ্ঞশালায় আসেন এবং নক্ষত্রদের পতি চন্দ্র যেরূপ অস্তাচলে গমন করেন (১) তুমি সেরূপ পুরোবর্তী সোমের ন্যায় স্বর্গ হতে আমাদের নিকট এস। আমরা অ্তবিশিষ্ট হয়ে, পুত্রগণ যেমন অশ্বভক্ষণের জন্য পিতাকে আহ্বান করে, সেরুপ তোমাকে সোমাভিষবে আহ্বান করছি। আমরা ঋত্বিকগণের সাথে হব্য গ্রহণের জন্য মহত্তম ইন্দ্রকে আহ্বান কাছ।
২। রমণীয় গতি বৃষভ তৃষ্ণার্ত হয়ে যেমন কৃপোদক পান করে, হে রমণীয়গতি ইন্দ্র! তৃপ্তি, বিক্রম, মহত্ত্ব ও আনন্দোৎপত্তির জন্য তুমি প্রস্তরদ্বারা অভিষুত ও দশাপবিত্রদ্বারা শোধিত সোমরস সেরূপ পান কর। হরিৎগণ যেরূপ সূর্যকে আনে, তোমরা অশ্বগণ সেরূপ প্রতিদিন তোমাকে আনুক।
৩। পক্ষীগণ যেরূপ (দুর্গম স্থানে শাবক রক্ষা করে) তা প্রাপ্ত হয়, সেরূপ ইন্দ্র অতি গোপনীয় স্থানে স্থাপিত এবং অনশ্ত ও অতিমহান প্রস্তর রাশিতে পরিবেষ্টিত সোমরস স্বর্গ হতে লাভ করলেন। অঙ্গিরাগণের অগ্রগণ্য বজ্রধারী ইন্দ্র সোমপানের অভিলাষে পূবে যেরূপ গোব্রজকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন, সেরূপ সোমরস প্রাপ্ত হলেন। ইন্দ্র চতুদিকে মেঘাবৃত ও অন্নের হেতুভূত (উদকের) দ্বার সকল উদঘাটন করে চারিদিকে অষ্ন বিস্তার করলেন।
৪। ইন্দ্র বাহুদ্বয়ে দৃঢ়রূপে বজ্র ধারণ করে শত্রুরপ্রতি নিক্ষেপ করবার জন্য তা তীক্ষ্ম হলেও মন্ত্র সংস্কারদ্বারা জল যেন তীক্ষ হয়, সে রূপ আরও তীক্ষ্ম করছেন, বৃত্তকে নাশ করবার জন্য আরও তীক্ষ্ম করছেন। হে ইন্দ্র। বৃক্ষচ্ছেদকে যেরূপ বনবৃক্ষকে ছেদন করে সেরূপ তুমি আপন শক্তি, তেজ ও শরীর বলে বর্ধিত হয়ে আমাদের শত্রুদের ছেদন করছ, যেমন পরশুদ্বারা ছেদন করছ।
৫। হে ইন্দ্র! তুমি সমুদ্রাভিমুখে যাবার জন্য নদীদের গমনশীল রথের ন্যায় অনায়াসে সৃজন করছ। সংগ্রামকামীগণ যেরূপ রথ সৃজন করে সেরূপ তুমিও করেছ। মনুর জন্য ধেনুগণ যেন সর্বার্থ প্রদ হয় এবং সমর্থ মানুষের জন্য ধেনুগণ যেরূপ ক্ষীরপ্রদ হয় সেরূপ অস্মদ্যভিমুখী নদী সকল একই প্রয়োজনে জল সংগ্রহ করে।
৬। কর্মকুশল ও ধীব্যক্তি যেরূপ রথ নিমাণ করে সেরূপ ধনাভিলাষী মানুষ তোমর এ স্তুতি সম্পাদন করেছে। তারা আপন মঙ্গলের জন্য তোমাকে প্রীত করেছে। লোকে যেরূপ দিগ্বিজয়ীকে প্রশংসা করে, হে মেধাবী দুর্ধর্ষ ইন্দ্র! তারা সেরূপ তোমার প্রশংসা করেছে। যুদ্ধে যেমন অশ্বের প্রশংসা হয়, সেরূপ বল, ধনরক্ষা ও সমস্ত মঙ্গল লাভের জন্য তোমার প্রশংসা হয়।
৭। হে যুদ্ধকালে নৃত্যুকারী ইন্দ্র! তুমি হবিপ্রদায়ী, পুরু অতিথিগ্ব রাজার জন্য নবতী সংখ্যক নগরী নষ্ট করেছিলেন (২)। হে নৃত্যশীল ইন্দ্র! বজ্র দ্বারা নষ্ট করেছিলে। হে উগ্র ইন্দ্র! তুমি অতিথি সেবক দিবোদাস রাজার জন্য পর্বত হতে শম্বরকে নিয়ে নিম্নে নিক্ষেপ করেছিলে এবং রাজা দিবোদাসকে স্বীয় শক্তিদ্বারা অগাধ ধনদান করেছিলে, এমন কি সমস্ত ধন দান করেছিলেন।
৮। ইন্দ্র যুদ্ধে আর্য যজমানকে রক্ষা করেন। অসংখ্যবার রক্ষাকারী ইন্দ্র সমস্ত যুদ্ধে তাকে রক্ষা করেন। সুখপ্রদ সংগ্রামে তাকে রক্ষা করেন। ইন্দ্র মানুষের জন্য ব্রতরহিত ব্যক্তিদের শাসন করেন। তিনি কৃষ্ণের কৃষ্ণত্বকে উন্মোচন করে তাকে বধ করেন (৩) তিনি তাকে ভস্মীভূত করেন। তিনি সমস্ত হিংসকদের এবং সমস্ত নিষ্ঠুর ব্যক্তিদের দগ্ধ করেন।
৯। ইন্দ্রসূর্যের রথচক্র গ্রহণ করলে তার শরীরে বলবৃদ্ধি হল তিনি সে চক্র নিক্ষেপ করলেন এবং অরুণবর্ণ রূপ ধারণ করে শত্রুদের নিকট গমন করে তাদের বাক্য হরণ করলেন, ঈশান ইন্দ্র তাদের বাক্য হরণ করলেন। হে কবি ইন্দ্র! তুমি উশনার রক্ষার্থে যেরূপ দূরবর্তী স্বর্গস্থান হতে এসেছিলে সে রূপ আমাদের সমস্ত সুখসাধন ধনের সাথে আমাদের নিকট দ্রুতপদে এস। তুমি অন্য অন্য লোকের নিকটও এরূপে এসে থাক। তুমি আমাদরে নিকট প্রত্যহই এস।
১০। হে জলবর্ষণকারী, নগরবিদারক ইন্দ্র! তুমি আমাদের নুতন উকথে তুষ্ট হয়ে বিবিধ প্রকারে রক্ষা ও সুখদান করে আমাদের প্রতিপালন কর। আমরা দিবোদাস গোত্রোৎপন্ন, আমরা তোমায় স্তব করি, তুমি দিবসে সূর্যের ন্যায় প্রবৃদ্ধ হও।
টীকাঃ
১। সৎপতিঃ শব্দ দুবার ব্যবহৃত হয়েছে। সায়ণ এর এক অর্থ যজমান অন্য অর্থ চন্দ্র করেছেন।
২। সায়ণাচার্য পুরু শব্দের অর্থ অভিশুত সাধক এবং অতিথিম্বা শব্দের অর্থ অতিথির প্রতি গমনকারী করেছেন। কিন্তু ৫১ সুক্তের ৬ ঋকের টীকায় এবং ১১২ সক্তের ১৪ ঋকের টীকায় অতিথিগ্বা শব্দটি দিবোদাসের একটি নামান্তর হয়ে দাড়িয়েছিল। দিবোদাসের অপত্য পরুচ্ছেপ ও সুক্তের রচয়িতা, অতএব দিবোদাসের বিষয় তিনি উল্লেখ করেছেন।
৩। প্রবাদ আছে যে, অংশুমতী নদীর তীরে কৃষ্ণনামে এক কৃষ্ণবর্ণ অসুর ছিল। তার দশসহস্র অনুচর লোকের প্রতি অত্যন্ত উৎপীড়ন করত। বৃহস্পতি মরুৎগণের সাথে ইন্দ্রকে তার বধের জন্য প্রেরণ করেন, ইন্দ্রও সানুচর কৃষ্ণাসুরকে বধ করে তাদের নিরুপদ্রব করেন। সায়ণ। ১০১ সুক্তের ১ ঋকের টীকা দেখুন।

(C) https://www.ebanglalibrary.com




0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger