সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা দর্শন

বলা হয়, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণী। এটি মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে সংক্ষেপে ভগবদ্গীতা বা শ্রীগীতা বা আরো সংক্ষেপে গীতা বলা হয়। ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের সমরাঙ্গনে কৌরবসৈন্য ও পাণ্ডবসৈন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধার্থে সজ্জিত হলে, যুদ্ধে প্রতিপক্ষে অবস্থানকারী আত্মীয়বর্গকে হত্যা করতে হবে ভেবে অন্যতম পাণ্ডব সেনাধ্যক্ষ ধনুর্ধর অর্জুন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আত্মীয়হত্যা অসঙ্গত বিবেচনা করে ক্ষণিক বৈরাগ্যের মোহাক্রান্ত অর্জুন যুদ্ধে নিবৃত্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁর রথের সারথিরূপ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে বিশদ তত্ত্বসমৃদ্ধ উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে অর্জুনের মোহ দূর করে স্বকর্মে প্রবৃত্ত করেছিলেন, মুখ্যত তা-ই ভগবদ্গীতা।

গীতার গুরুত্ব বোঝাতে গীতামাহাত্ম্যে বলা হয়েছে-
‘সর্ব্বোপনিষদো গাবো দোগ্ধা গোপালনন্দনঃ।
পার্থো বৎসঃ সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ’।।
অর্থাৎ : সমস্ত উপনিষদ গাভী, শ্রীকৃষ্ণ দোহনকর্তা, অর্জুন বৎস ও সুধীগণ ভোক্তা, গীতামৃত উপাদেয় দুগ্ধ।
এদ্বারা এটাই প্রতিপন্ন করা হচ্ছে যে, ভগবদ্গীতা উপনিষদের সারগ্রন্থ মাত্র। এছাড়াও ভাগবতের বরাহপুরাণোক্ত দীর্ঘ গীতামাহাত্ম্যের একটি শ্লোকে ভগবান বিষ্ণুর উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে-
‘গীতাশ্রয়েহহং তিষ্ঠামি গীতা মে চোত্তমং গৃহম্’।
গীতাজ্ঞানমুপাশ্রিত্য ত্রীন্ লোকান্ পালয়াম্যহম্’।।
অর্থাৎ : আমি গীতার আশ্রয়ে অবস্থান করি এবং গীতা আমার উত্তম গৃহ। গীতাজ্ঞান আশ্রয় করে আমি ত্রিলোক পালন করি।
গীতার এ গুরুত্ব বিবেচনা করেই বেদান্তশাস্ত্রে গীতাকে প্রাচীন বারোটি উপনিষদের সমশ্রেণীর কাতারে ত্রয়োদশ উপনিষদ বলেও গণ্য করা হয়। বেদের মতো গীতা সব সম্প্রদায়েরই মান্য। এজন্যেই পরবর্তীকালের শঙ্করাচার্য, রামানুজ, শ্রীধরস্বামী, মাধবাচার্য, বলদেব প্রমুখ শ্রেষ্ঠ আচার্যরা সকলেই গীতার জ্ঞানকে শিরোধার্য করেছেন। তাঁরা নিজ নিজ উপসম্প্রদায়ের মতের পরিপোষণের জন্য ভগবদ্গীতার টীকাভাষ্যও রচনা করেছেন। এর মধ্যে শাঙ্করভাষ্য এবং শ্রীধরস্বামীর টীকাই সমধিক প্রসিদ্ধ। তবে শঙ্করাচার্যের শাঙ্করভাষ্যকে পরিপূর্ণ উপনিষদানুসারী বলে বিবেচনা করা হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় আঠারটি যোগ বা অধ্যায়ে মোট ৭০০ শ্লোক রয়েছে। গীতার অধ্যায়সমূহ যথাক্রমে- (১) অর্জুন বিষাদযোগ, (২) সাংখ্যযোগ, (৩) কর্মযোগ, (৪) জ্ঞানযোগ, (৫) সন্ন্যাসযোগ, (৬) ধ্যানযোগ বা অভ্যাসযোগ, (৭) জ্ঞান-বিজ্ঞানযোগ, (৮) অক্ষর-ব্রহ্মযোগ, (৯) রাজবিদ্যা-রাজগুহ্যযোগ, (১০) বিভূতিযোগ, (১১) বিশ্বরূপ-দর্শনযোগ, (১২) ভক্তিযোগ, (১৩) ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ, (১৪) গুণত্রয়-বিভাগযোগ, (১৫) পুরুষোত্তমযোগ, (১৬) দৈবাসুরসম্পদ-বিভাগযোগ, (১৭) শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগযোগ, (১৮) মোক্ষযোগ।

এই আঠারটি অধ্যায়ের মোট ৭০০ শ্লোকের মধ্যে ধৃতরাষ্ট্রের উদ্ধৃতিতে ১টি, সঞ্জয়ের উদ্ধৃতিতে ৪০টি, অর্জুনের উদ্ধৃতিতে ৮৫টি এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্ধৃতিতে ৫৭৪টি শ্লোক রয়েছে। এসব শ্লোকের মাধ্যমে মূলত অর্জুনের জিজ্ঞাসু মনের সশ্রদ্ধ প্রশ্ন ও তার প্রেক্ষিতে যথাযোগ্য উত্তর দিতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ভক্তি, প্রেম, আত্মা, জ্ঞান, সকাম-কর্ম, নিষ্কাম-কর্ম, সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্ম প্রভৃতি সম্পর্কিত যাবতীয় দর্শন ও তত্ত্বজ্ঞান উপস্থাপন ও তার বিশ্লেষণ করে অর্জুনের সকল কৌতুহল ও জ্ঞানতৃষ্ণা নিবৃত্ত করেন। এজন্যেই গীতাকে পরম ভক্তি সহকারে সকল শাস্ত্রের সার বলা হয়।

জীবের চূড়ান্ত লক্ষ্য মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে গীতা কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়ে সম্পূর্ণ সাধনতত্ত্ব প্রচার করে। কর্মের সাথে জ্ঞানের এবং জ্ঞানের সাথে ভক্তির সংযোগে সাধনা সম্পূর্ণতা লাভ করে। তবে কর্মযোগই গীতার মুখ্য আলোচ্য বিষয়। কিন্তু এই কর্ম হবে নিষ্কাম কর্ম, অর্থাৎ ফলের আশা না করে কর্ম করে যাওয়া। যেমন-
‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত¡কর্মণি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৪৭)।
অর্থাৎ : কর্মে তোমার অধিকার, ফলে নয়। অতএব কর্ম করো। সুতরাং কর্মফল-প্রাপ্তির হেতু হয়ো না। আবার কর্মত্যাগেও তোমার প্রবৃত্তি না হোক (গীতা-২/৪৭)।
কিন্তু কেন এই কর্মফল-প্রাপ্তির হেতু না হয়ে অর্থাৎ কাম্য-কর্ম বাদ দিয়ে কেবল নিষ্কাম কর্ম করে যাওয়া ? শ্রীকৃষ্ণ বলছেন-
‘দূরেণ হ্যবরং কর্ম বুদ্ধিযোগাদ্ ধনঞ্জয়।
বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৪৯)।
‘কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত্বা মনীষিণঃ।
জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫১)।
অর্থাৎ :
হে ধনঞ্জয়, কাম্য-কর্ম নিষ্কাম-কর্ম অপেক্ষা নিতান্ত নিকৃষ্ট। অতএব তুমি কামনাশূন্য হয়ে সমত্ব বুদ্ধির (সম্যক জ্ঞানের) আশ্রয় গ্রহণ করো। যারা ফলাকাঙ্ক্ষী হয়ে কর্ম করে তারা অতি হীন (গীতা-২/৪৯)। নিষ্কাম কর্মযোগী মনীষিগণ কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্মরূপ বন্ধন হতে মুক্ত হন এবং সর্বপ্রকার উপদ্রবরহিত (পাপ ও পুণ্য উভয় হতে মুক্ত হয়ে) ব্রহ্মপদ লাভ করেন (গীতা-২/৫১)।
গীতার মতে ফলাসক্তি ও কর্তৃত্বাভিমান বন্ধনের কারণ। আসক্তি ও অহংবুদ্ধি ত্যাগ করে ফলাফলে উদাসীন হয়ে কর্ম সম্পাদনে বন্ধন হয় না। অর্থাৎ সর্বকর্ম ঈশ্বরে সমর্পণ করে ফলাকাঙ্ক্ষা বর্জন ও অহংবুদ্ধি বা কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করাই নিষ্কার্ম কর্মের লক্ষণ। কিন্তু আত্মজ্ঞান ব্যতীত এই আসক্তি ও কর্তৃত্বাভিমান দূর হয় না। তাই শ্রীকৃষ্ণ বলেন-
‘যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি।
তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫২)।
‘শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্যতি নিশ্চলা।
সমাধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাপ্স্যসি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৩)।
অর্থাৎ :
যখন তোমার বুদ্ধি (জ্ঞান) মোহাত্মক অবিবেকরূপ কলুষ অতিক্রম করবে, তখন তুমি শ্রোতব্য ও শ্রুত কর্মফল বিষয়ে বৈরাগ্যলাভ করবে (নিষ্পৃহ হবে) (গীতা-২/৫২)। নানা কর্মফল শ্রবণে বিক্ষিপ্ত তোমার চিত্ত যখন পরমাত্মাতে স্থির ও অচল হবে, তখন তুমি তত্ত্বজ্ঞান লাভ করবে (গীতা-২/৫৩)।
অতএব কর্মযোগ সিদ্ধিলাভের জন্য জ্ঞানলাভের দরকার। আত্মজ্ঞান লাভ হলে ভগবানে পরমভক্তি জন্মায়। এর মাধ্যমেই সমত্ব-বুদ্ধি বা সম্যক-জ্ঞান জন্মায়। এই সমত্ব বুদ্ধিকেই বলা হয় স্থিতপ্রজ্ঞা। গীতায় এই স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি সম্পর্কে শ্রীভগবান বলেন-
‘প্রজহাতি যদা কামান্ সর্বান্ পার্থ মনোগতান্ ।
আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৫)।
দুঃখেষ¦নুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৬)।
অর্থাৎ :
হে পার্থ, বাহ্যলাভে নিরপেক্ষ ও পরমার্থদর্শনে প্রত্যগাত্মাতেই পরিতৃপ্ত হয়ে যখন যোগী সমস্ত মনোগত বাসনা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন, তখন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ বলে উক্ত হন (গীতা-২/৫৫)। দুঃখে উদ্বেগহীন, সুখে নিঃস্পৃহ এবং আসক্তিশূন্য ভয়মুক্ত ও ক্রোধরহিত মুনিই স্থিতপ্রজ্ঞ বলে উক্ত হন (গীতা-২/৫৬)।
এখানে প্রশ্ন আসে, কর্মযোগ অপেক্ষা সমত্ব-বুদ্ধি বা সম্যক-জ্ঞানই যদি শ্রেষ্ঠ হয় তাহলে সব কামনা বর্জন করে সাম্যবুদ্ধি বা সম্যকজ্ঞান লাভ করলেই তো জীবের মোক্ষ লাভ হয়, কর্মের আবশ্যকতা কী ? তাই অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন-
‘জ্যায়সী চেৎ কর্মণস্তে মতা বুদ্ধির্জনার্দন।
তৎ কিং কর্মণি ঘোরে মাং নিয়োজয়সি কেশব’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/১)।
অর্থাৎ : হে জনার্দন, যদি আপনার মতে কর্ম অপেক্ষা জ্ঞান শ্রেষ্ঠ হয়, তবে আমাকে এই হিংসাত্মক (যুদ্ধ) কর্মে নিযুক্ত করছেন কেন (গীতা-৩/১)?
বলাবাহুল্য, গীতায় কর্মকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এমনকি ইহলোকে মোক্ষলাভের যে দুটি মার্গ রয়েছে- সন্ন্যাস মার্গ ও কর্মযোগ মার্গ, সেখানেও কর্মযোগকেই শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিপাদন করা হয়েছে। কেননা, সন্ন্যাস মার্গে যে মোক্ষ লাভ হয় তা জ্ঞানের ফলে, কর্ম ত্যাগের জন্য নয়। যেমন গীতার সন্ন্যাসযোগে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-
‘সন্ন্যাসঃ কর্মযোগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ।
তয়োস্তু কর্মসন্ন্যাসাৎ কর্মযোগো বিশিষ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৫/২)।
‘সন্ন্যাসস্তু মহাবাহো দুঃখমাপ্তুমযোগতঃ।
যোগযুক্তো মুনির্ব্রহ্ম ন চিরেণাধিগচ্ছতি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৫/৬)।
অর্থাৎ :
সন্ন্যাস বা কর্মের ত্যাগ ও কর্মের অনুষ্ঠান উভয়ই মুক্তিমার্গ; কিন্তু তাদের মধ্যে জ্ঞানহীন কর্মসন্ন্যাস অপেক্ষা নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান উৎকৃষ্টতর (গীতা-৫/২)। হে মহাবাহো, নিষ্কাম কর্মযোগ ব্যতীত জ্ঞানযুক্ত পরমার্থ সন্ন্যাস লাভ করা অসম্ভব। নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা চিত্তশুদ্ধি হলেই নিষ্ঠ ব্যক্তি সন্ন্যাসী হয়ে অচিরে পরব্রহ্ম প্রাপ্ত হন (গীতা-৫/৬)।
এছাড়াও জ্ঞান ও কর্মের পরস্পর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বোঝাতে গীতায় জ্ঞানযোগে বলা হয়েছে যে-
‘ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে।
তৎ স্বয়ং যোগসংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/৩৮)।
অর্থাৎ : জ্ঞানের তুল্য পবিত্র বস্তু ইহজগতে নেই। দীর্ঘকাল প্রযত্ন দ্বারা কর্মযোগে চিত্ত শুদ্ধ হলেই মুমুক্ষু ব্যক্তি সেই আত্মজ্ঞান (ব্রহ্মজ্ঞান) লাভ করেন (গীতা-৪/৩৮)।
তাই কর্ম নাকি জ্ঞান শ্রেষ্ঠ, অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন-
‘লোকেহস্মিন্ দ্বিবিধা নিষ্ঠা পুরা প্রোক্তা ময়ানঘ।
জ্ঞানযোগেন সাংখ্যানাং কর্মযোগেন যোগিনাম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৩)।
‘ন কর্মণামনারম্ভান্নৈষ্কর্ম্যং পুরুষোহশ্লুতে।
ন চ সংন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৪)।
‘ন হি কশ্চিৎ ক্ষণমপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্মকৃৎ।
কার্যতে হ্যবশঃ কর্ম সর্বঃ প্রকৃতিজৈর্গুণৈঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৫)।
অর্থাৎ :
হে অনঘ অর্জুন, ইহলোকে জ্ঞানাধিকারিগণের জন্য জ্ঞানযোগ এবং নিষ্কাম কর্মিগণের জন্য কর্মযোগ- এই দুই প্রকার নিষ্ঠার বিষয় সৃষ্টির প্রারম্ভে আমি বেদমুখে বলেছি (গীতা-৩/৩)। কর্মানুষ্ঠান না করে কেউ নৈষ্কর্ম্য বা মোক্ষ লাভ করতে পারে না। আবার কর্মযোগে চিত্তশুদ্ধি ও আত্মবিবেক না হলে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি হয় না। কেবলমাত্র জ্ঞানশূন্য কর্মত্যাগ দ্বারা এ অবস্থালাভ অসম্ভব (গীতা-৩/৪)। কর্ম না করে কেউই ক্ষণকালও থাকতে পারে না। অ-স্বতন্ত্র প্রকৃতির (মায়াজাত সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের) প্রভাবে সকলেই কর্ম করতে বাধ্য হয় (গীতা-৩/৫)।
এ প্রেক্ষিতে শ্রীকৃষ্ণ আরো বলেন-
‘কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরন্ ।
ইন্দ্রিয়ার্থান্ বিমূঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৬)।
‘যস্ত্বিন্দ্রিয়াণি মনসা নিয়ম্যারভতেহর্জুন।
কর্মেন্দ্রিয়ৈঃ কর্মযোগমসক্তঃ স বিশিষ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৭)।
‘নিয়তং কুরু কর্ম ত্বং কর্ম জ্যায়ো হ্যকর্মণঃ।
শরীরযাত্রাপি চ তে ন প্রসিধ্যেদকর্মণঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৮)।
অর্থাৎ :
যে ব্যক্তি কর্মেন্দ্রিয়গুলিকে কর্মবিরত করে মনে মনে তাদের বিষয় চিন্তা করে তারা মিথ্যাচারী (গীতা-৩/৬)। কিন্তু যারা ইন্দ্রিয়গুলি সংযত করে অনাসক্তভাবে কর্ম করেন তারাই শ্রেষ্ঠ (গীতা-৩/৭)। তুমি শাস্ত্রবিহিত নিত্যকর্ম করো। কর্ম না করা অপেক্ষা কর্ম করাই শ্রেয়। কর্মহীন হলে তোমার দেহযাত্রাও নির্বাহ হবে না (গীতা-৩/৮)।
তাই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আসক্তিহীন হয়ে কর্তব্যরূপে সবসময় বিহিত কর্মের অনুষ্ঠান করার উপদেশ দেন। যে কর্ম যার পক্ষে বিহিত তাই তার পক্ষে যজ্ঞস্বরূপ। অনাসক্ত হয়ে কর্ম করলে মানুষ মোক্ষ লাভ করে। কারণ এই যথার্থ কর্ম ঈশ্বরের প্রীতির জন্যেই করা হয়-
‘যজ্ঞার্থাৎ কর্মণোহন্যত্র লোকোহয়ং কর্মবন্ধনঃ।
তদর্থং কর্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৯)।
অর্থাৎ : যজ্ঞার্থে বা ঈশ্বরের প্রীতির জন্য অনুষ্ঠিত কর্ম ব্যতীত অন্য কর্ম বন্ধনের কারণ হয়। অতএব, তুমি ভগবানের উদ্দেশ্যে অনাসক্ত হয়ে বর্ণাশ্রমোচিত সকল কর্ম করো (গীতা-৩/৯)।
এবং বিহিত কর্মযোগের সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে গীতার সেই প্রসিদ্ধ শ্লোকটি উচ্চারিত হয় এভাবে-
‘শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৩৫)।
অর্থাৎ : স্বধর্মের অনুষ্ঠান দোষযুক্ত হলেও উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। (বর্ণাশ্রমবিহিত) স্বধর্মসাধনে নিধনও কল্যাণকর; কিন্তু অন্যের (বর্ণাশ্রমোচিত) ধর্মের অনুষ্ঠান অধোগতির কারণ বলে বিপজ্জনক (গীতা-৩/৩৫)।
বর্ণাশ্রমে বিভক্ত সমাজে জন্মজাত চারটি বর্ণ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের জন্য ঈশ্বরবিহিত যে যে কর্ম নির্ধারণ করা আছে প্রত্যেকের জন্য তা-ই স্বধর্ম অনুষ্ঠান। কারণ এই বর্ণগুলি ঈশ্বরসৃষ্ট এবং তাদের কর্মবণ্টনও ঈশ্বরই করে রেখেছেন প্রকৃতিজাত বা স্বভাবজাত করে-
‘চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/১৩)।
‘ন তদস্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।
সত্ত্বং প্রকৃতিজৈর্মুক্তং যদেভিঃ স্যাৎত্রিভির্গুণৈঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪০)।
‘ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাঞ্চ পরন্তপ।
কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪১)।
‘শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।
জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪২)।
‘শৌর্যং তেজো ধৃতির্দাক্ষ্যং যুদ্ধে চাপ্যপলায়নম্ ।
দানমীশ্বরভাবশ্চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪৩)।
‘কৃষিগৌরক্ষ্যবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্ ।
পরিচর্যাত্মকং কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪৪)।
‘স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ’। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪৫)।
অর্থাৎ :
গুণ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) ও কর্মের বিভাগ অনুসারে আমি চারটি বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) সৃষ্টি করেছি। আমি মায়িক (মায়ারূপ) ব্যবহারে চতুর্বর্ণের সৃষ্টিকর্তা হলেও আমাকে পরমার্থদৃষ্টিতে অব্যয় অকর্তা ও অসংসারী বলে জানবে (গীতা-৪/১৩)। পৃথিবীতে বা স্বর্গে এমন কোন প্রাণী (মানুষ বা দেবতা) বা বস্তু নেই, যা এই প্রকৃতিজাত ও বন্ধনের কারণ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই) ত্রিগুণ থেকে মুক্ত (গীতা-১৮/৪০)। হে পরন্তপ, প্রকৃতিজাত ত্রিগুণানুসারেই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রেরও কর্মসমূহ পৃথক পৃথক রূপে ভাগ করা হয়েছে (গীতা-১৮/৪১)। বাহ্যেন্দ্রিয় ও অন্তরিন্দ্রিয়ের সংযম, বাচিক ও মানসিক তপস্যা; অন্তর্বহিঃ শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, শাস্ত্রজ্ঞান ও তত্ত্বানুভূতি এবং শাস্ত্রে ও ভগবানে বিশ্বাস- এই সকল ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত (রজোমিশ্রিত সত্ত্বগুণ দ্বারা বিহিত) কর্ম (গীতা-১৮/৪২)। পরাক্রম, তেজ, ধৃতি, কর্মকুশলতা, যুদ্ধে অপরাঙ্মুখতা, দানে মুক্তহস্ততা ও শাসনক্ষমতা- এইগুলি ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত (স্বভাবজ সত্ত্বমিশ্রিত রজোগুণ দ্বারা বিহিত) কর্ম (গীতা-১৮/৪৩)। কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য বৈশ্যের স্বভাবজাত (স্বভাবজ তমোমিশ্রিত রজোগুণ দ্বারা বিহিত) কর্ম। (অন্য বর্ণের) সেবা বা পরিচর্যা শূদ্রদের স্বভাবজাত (রজোমিশ্রিত তমোগুণের দ্বারা বিহিত) কর্ম (গীতা-১৮/৪৪)। মানুষ নিজ নিজ বর্ণ ও আশ্রমের কর্মে নিরত থেকে জ্ঞান, নিষ্ঠা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সিদ্ধিলাভ করে (গীতা-১৮/৪৫)।
সহজভাবে বললে, বিহিত কর্ম মানে আরোপিত কর্ম যা ঈশ্বরকর্তৃক নির্দেশিত। কর্মফলের আশা ত্যাগ করে আসক্তিহীন কর্মযোগে চিত্তশুদ্ধির মাধ্যমে জ্ঞানরূপ সন্ন্যাসমার্গে উত্তীর্ণ হওয়াই গীতার মতে জীবের মোক্ষ বা সংসার-মুক্তির অনিবার্য শর্ত। কিন্তু ভক্তি বিনে জ্ঞান হয় না। এই ব্রহ্মজ্ঞান লাভে পরমেশ্বর পরমব্রহ্মের প্রতি অবিচল ভক্তি থাকা আবশ্যক। তাই গীতায় শ্রীভগবান বলছেন-
‘মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৬৫)।
অর্থাৎ : তুমি আমাতে চিত্ত স্থির করো, ভজনশীল ও পূজনশীল হও। আমাকে নমস্কার করো। আমি প্রতিজ্ঞা করে বলছি, এভাবেই তুমি আমাকে পাবে (গীতা-১৮/৬৫)।
কিন্তু যা-ই করো না কেন, কোনভাবেই কর্মযোগ উপেক্ষা করে নয়। সকল শাস্ত্রের সারগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সার-কথাটাও সম্ভবত এই যে-
‘শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাসাজ্ জ্ঞানাদ্ধ্যানং বিশিষ্যতে।
ধ্যানাৎ কর্মফলত্যাগস্ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১২/১২)।
অর্থাৎ : অবিবেচকপূর্বক অভ্যাস অপেক্ষা শ্রুতি (বেদোক্ত শাস্ত্রাদি) ও যুক্তি দ্বারা আত্মনিশ্চয় উৎকৃষ্ট। আত্মনিশ্চয় অপেক্ষা জ্ঞানপূর্বক ধ্যান শ্রেষ্ঠ। জ্ঞানপূর্বক ধ্যান অপেক্ষা কর্মফলত্যাগ শ্রেষ্ঠ। কর্মফল ত্যাগের অব্যবহিত পরেই সহেতুক সংসার নিবৃত্তিরূপ পরম শান্তিলাভ হয় (গীতা-১২/১২)।
মূলত, কর্মযোগকে ঘিরেই গীতার মুখ্য আলোচ্য বিষয় গীতার মূলতত্ত্ব, মূলনীতি, আত্ম-তত্ত্ব, বিশ্বতত্ত্ব, ব্রহ্মতত্ত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে যত প্রকার জ্ঞান উপদিষ্ট হয়েছে, অর্জুনকে তা উপলব্ধি করতে হয়েছে। এবং তার উপলক্ষ হয়ে এটি একটি অন্যতম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবেও ভারতীয় লোকসমাজে সর্বাদৃত হয়েছে।

লেখকঃ রণদীপম বসু
0 comments

রাম নবমী কি ?

যুদ্ধে একে একে মারা পড়েছেন লঙ্কার সব বড়ো বড় বীর। রাবণ তখন একা কুম্ভের মতো রক্ষা করছেন লঙ্কাপুরী। তিনিও শ্রান্ত, বিধ্বস্ত। এমনকি একবার তো হনুমানের হাতে প্রচুর মার খেয়ে অজ্ঞানই হয়ে গেলেন। বেগতিক বুঝে রাবণ অম্বিকার স্তব করলেন:- - -

আর কেহ নাহি মোর ভরসা সংসারে। শঙ্কর ত্যজিল তেঁই ডাকি মা তোমারে।। রাবণে কাতর স্তবে হৈমবতীর হৃদয় টলল। তিনি কালী রূপে রাবণকে কোলে তুলে নিয়ে তাঁকে দিলেন অভয়। এই খবর রামের কানে যেতেই তিনি গুণলেন প্রমাদ। দেবতাদের ঘুম উড়ে যাওয়ার জোগাড় হল। ইন্দ্র ব্রহ্মার কাছে গিয়ে কাকুতি-মিনতি করে একটা কিছু করার অনুরোধ জানালেন। বুড়ো ঠাকুরদাদা ব্রহ্মা এসে রামকে পরামর্শ দিলেন, “দুর্গাপূজা করো। আর কোনো উপায় নেই ।।”

রাম বললেন, “তা কেমন করে হয়? দুর্গাপূজার
প্রশস্ত সময় বসন্তকাল। শরৎকাল তো অকাল। তাছাড়া বিধান রয়েছে, অকালবোধনে নিদ্রা ভাঙাতে হবে কৃষ্ণানবমীতে। সুরথ রাজা প্রতিপদে পূজারম্ভ করেছিলেন। কিন্তু সেকাল তো আর নেই। পূজা করি কিভাবে?” ব্রহ্মা বললেন, “আমি ব্রহ্মা, বিধান দিচ্ছি, শুক্লাষষ্ঠীতে বোধন করো।” শুনে রাম মহাখুশি হলেন।।

চণ্ডীপাঠ করি রাম করিল উৎসব। গীত নাট করে জয় দেয় কপি সব। রাম চণ্ডীপাঠ করে উৎসব করলেন। সেই সুযোগে বাঁদরের দল খানিকটা নাচগান করে নিল ।।

রামচন্দ্র কিভাবে দুর্গাপূজা করেছিলেন:

তার একটু বর্ণনা দেবো। চণ্ডী -তে আছে, সুরথ রাজা দুর্গার মাটির মূর্তি গড়ে পূজা করেছিলেন (‘তৌ তস্মিন্ পুলিনে দেব্যাঃ কৃত্বা মূর্ত্তিং মহীময়ীম্।’ চণ্ডী , ১৩।১০)।

রামচন্দ্রও পূজা করেছিলেন নিজের হাতে তৈরি মাটির প্রতিমায় (‘আপনি গড়িলা রাম প্রতিমা মৃন্ময়ী’)। ষষ্ঠীর সন্ধায় বেল গাছের তলায় হল দেবীর বোধন। অধিবাসের সময় রাম স্বহস্তে বাঁধলেন নব পত্রিকা। সায়াহ্নকালেতে রাম করিল বোধন ।।

আমন্ত্রণ অভয়ার বিল্বাধিবাসন।। …
আচারেতে আরতি করিলা অধিবাস।
বান্ধিলা পত্রিকা নব বৃক্ষের বিলাস।।
সপ্তমীর দিন সকালে স্নান করে রাম ‘বেদবিধিমতে’ পূজা করলেন।

অষ্টমীর দিনও তাই। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে রাম সন্ধিপূজা করলেন। দুই দিনই রাতে চণ্ডীপাঠ ও নৃত্যগীত হল। রামচন্দ্রের নবমী পূজার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন কৃত্তিবাস। বহুরকম বনফুল ও বনফলে পূজার আয়োজন হল। ‘তন্ত্রমন্ত্রমতে’ পূজা হল। কিন্তু দেবী দর্শন দিলেন না। তখন বিভীষণ উপদেশ দিলেন, “নীলপদ ্মে পূজা করুন। দেবী নিশ্চয় দর্শন দেবেন।”

কিন্তু নীলপদ্ম দুর্লভ। দেবতারাও তার খোঁজ রাখেন না। পৃথিবীতে একমাত্র দেবীদহ নামক হ্রদেই নীলপদ্ম মেলে। কিন্তু সেও লঙ্কা থেকে দশ বছরের পথ। শুনে হনুমান নিমেষে উপস্থিত হলেন দেবীদহে। এনে দিলেন একশো আটটি নীলপদ্ম। কিন্তু দুর্গা ছলনা করে একটি পদ্ম রাখলেন লুকিয়ে। রাবণকে তিনি কথা দিয়ে রেখেছিলেন কিনা। কিন্তু রামও ছাড়বার পাত্র নন। একটি নীলপদ্মের ক্ষতিপূরণে তিনি নিজের একটি চোখ উপড়ে নিবেদন করতে চাইলেন।

চক্ষু উৎপাটিতে রাম বসিলা সাক্ষাতে।
হেনকালে কাত্যায়নী ধরিলেন হাতে।।
কর কি কর কি প্রভু জগত গোঁসাই।
পূর্ণ তোমার সঙ্কল্প চক্ষু নাহি চাই।।

বাধ্য হয়েই দুর্গা রামচন্দ্রকে রাবণ বধের বর দিলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন:অকালবোধনে পূজা কৈলে তুমি দশভূজা বিধিমত করিলা বিন্যাস। লোকে জানাবার জন্য আমারে  করিতে ধন্য অবনীতে করিলে প্রকাশ।।

এরপর রাম দশমীপূজা সমাপ্ত করে দুর্গাপ্রতিমাবিসর্জন দিলেন । তারপরে রাবণ বধের গল্প তো সবাই জানে। রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার এই ইতিহাস বাল্মীকি রামায়ণে নেই। আছে দেবীভাগবত পুরাণ ও কালিকাপুরাণ -এ। খ্রিস্টীয় নবম -দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে লেখা এই দুই পুরাণ, গবেষক মহলের মতে, বাঙালি স্মার্তদের দুই মহাকীর্তি।

কৃত্তিবাসের আগেও যে বাংলায় দুর্গাপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল, তার প্রমাণ ভবদেব ভট্টের মাটির মূর্তিতে দুর্গাপূজার বিধান (একাদশ শতাব্দী), বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তি-তরঙ্গিনী (চতুর্দশ শতাব্দী), শূলপাণির দুর্গোৎসব-বিবেক (চতুর্দশ শতাব্দী) ও স্মার্তরঘুনন্দনের দুর্গাপূজা-তত্ত্ব (পঞ্চদশ শতাব্দী)।

অর্থাৎ, কৃত্তিবাসের যুগে (পঞ্চদশ শতাব্দীতে) দুর্গাপূজা ছিল বাঙালির এক প্রধান উৎসব। আর সেই জন্যই তিনি রামচন্দ্রকে দিয়ে দুর্গাপূজা করালেন সনাতন বাঙালি পন্থায়। যদিও কৃত্তিবাসী রামায়ণের দুর্গোৎসব বিবরণের সঙ্গে পৌরাণিক দুর্গোৎসব বর্ণনা ঠিক হুবহু মেলে না। যেসব পুরাণমতে আজ বাংলায় দুর্গাপূজা হয়, তার একটি হল কালিকাপুরাণ । এই পুরাণে রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার বর্ণনা পাই। সংস্কৃত শ্লোক ক্লান্তিকর ঠেকতে পারে, তাই সর্বজনবোধ্য বাংলা ভাষায় কালিকাপুরাণ -এর ষাট অধ্যায়ের ২৬ থেকে ৩৩ সংখ্যক শ্লোকগুলি

অনুবাদ করে দিচ্ছি:
পূর্বে রামের প্রতি অনুগ্রহ করে রাবণ বধে তাঁকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা রাত্রিকালে এই মহাদেবীর বোধন করেছিলেন। বোধিতা হয়ে দেবী গেলেন রাবণের বাসভূমি লঙ্কায়। সেখানে তিনি রাম ও রাবণকে দিয়ে সাত দিন ধরে যুদ্ধ করালেন। নবমীর দিন জগন্ময়ী মহামায়া রামের দ্বারা রাবণ বধ করেন। যে সাত দিন দেবী রামরাবণের যুদ্ধ দেখে আনন্দ  করলেন, সেই সাত দিন দেবতারা তাঁর পূজা করেন ।।

রাবণ নিহত হলে নবমীর দিন ব্রহ্মা সকল দেবতাকে সঙ্গে নিয়ে দেবীর বিশেষ পূজা করলেন। তারপর দশমীর দিন শবরোৎসব উদযাপিত হল। শেষে দেবীর বিসর্জন হল। এখানে রাত্রিকাল কথাটির একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এই ব্যাখ্যার মধ্যেই রয়েছে, শরৎকালকে রাম কেন দুর্গাপূজার পক্ষে অকাল বলেছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর ।।

সূর্যের দক্ষিণায়ণ দেবতাদের রাত। এই সময় দেবতারা ঘুমান। শরৎকাল পরে দক্ষিণায়ণের সময়। এই সময় দেবতাকে পূজা করতে হলে, তাকে জাগরিত করতে হয়। এই প্রক্রিয়াটিই হল বোধন। বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এ রামের জন্য ব্রহ্মার দুর্গাপূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই পুরাণের মতে, কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের পর রামচন্দ্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় দেবতারা হলেন শঙ্কিত। তখন ব্রহ্মা বললেন, দুর্গাপূজা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই ।।

তাই রামচন্দ্রের মঙ্গলের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মা যজমানী করতে রাজি হলেন। তখন শরৎকাল। দক্ষিণায়ণ। দেবতাদের নিদ্রার সময়। এতএব ব্রহ্মা স্তব করে দেবীকে জাগরিত করলেন। দেবী তখন কুমারীর বেশে এসে ব্রহ্মাকে বললেন, বিল্ববৃক্ষমূলে দুর্গার বোধন করতে। দেবতারা মর্ত্যে এসে দেখলেন, এক দুর্গম স্থানে একটি বেলগাছের শাখায় সবুজ পাতার রাশির মধ্যে ঘুমিয়ে রয়েছে একটি পরমাসুন্দরী বালিকা। ব্রহ্মা বুঝলেন, এই বালিকাই জগজ্জননী দুর্গা ।।

তিনি বোধন-স্তবে তাঁকে জাগরিত করলেন। ব্রহ্মার স্তবে জাগরিতা দেবী বালিকামূর্তি ত্যাগ করে চণ্ডিকামূর্তি ধরলেন। ব্রহ্মা বললেন, “রাবণবধে রামচন্দ্রকে অনুগ্রহ করার জন্য তোমাকে অকালে জাগরিত করেছি। যতদিন না রাবণ বধ হয়, ততদিন তোমার পূজা করব। যেমন করে আমরা আগামীকাল তোমার বোধন করে পূজা করব, তেমন করেই মর্ত্যবাসী যুগ যুগ ধরে তোমার পূজা করবে। যতকাল সৃষ্টি থাকবে, তুমিও পূজা পাবে এইভাবেই।”

একথা শুনে চণ্ডিকা বললেন, “সপ্তমী তিথিতে আমি প্রবেশ করব রামের ধনুর্বাণে। অষ্টমীতে রাম-রাবণে মহাযুদ্ধ হবে। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড বিচ্ছিন্ন হবে। সেই দশমুণ্ড আবার  জোড়া লাগবে। কিন্তু নবমীতে রাবণ নিহত হবেন। দশমীতে রামচন্দ্র করবেন বিজয়োৎসব।” হলও তাই। মহাবিপদ কেটে গেল অষ্টমীতে; তাই অষ্টমী হল মহাষ্টমী। রাবণ বধ করে মহাসম্পদ সীতাকে লাভ করলেন রাম; তাই নবমী হল মহানবমী ।।

কৃত্তিবাসী রামায়ণে দুর্গাপূজা করেছিলেন রাম। কিন্তু পুরাণ বলে, রামের মঙ্গলের জন্য দেবগণ করেছিলেন পূজার আয়োজন। পুরোহিত হয়েছিলেন স্বয়ং ব্রহ্মা। কৃত্তিবাসের দুর্গাপূজা বিবরণে বাংলায় প্রচলিত লৌকিক প্রথার অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই বিবরণ সম্পূর্ণ শাস্ত্রানুগ নয়। যদিও কৃত্তিবাসকে ধরে লোকে আজকাল মনে করে, শরৎকালের দুর্গাপূজার সূচনা করেছিলেন রাম। কিন্তু এই সম্মান বুড়ো ঠাকুরদাদারই পাওয়া উচিত। আমাদের মনে রাখা উচিত, বাংলার লক্ষ লক্ষ দুর্গাপূজায় আজও বোধনের মন্ত্রে উচ্চারিত হয়:

ওঁ ঐং রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ।
অকালে ব্রহ্মণা বোধো দেব্যস্তয়ি কৃতঃ পুরা।।
অহমপাশ্বিনে ষষ্ঠ্যাং সায়াহ্নে বোধয়মি বৈ।

(হে দেবী, রাবণবধে রামকে অনুগ্রহ করার জন্য ব্রহ্মা তোমার অকালবোধন করেছিলেন, আমিও সেইভাবে আশ্বিন মাসের ষষ্ঠী তিথিতে সন্ধ্যায় তোমার বোধন করছি।)


(C) সনাতন ধর্ম প্রচার -Circulate Of sanatan
0 comments

ছান্দোগ্যোপনিষৎঃ ২য় প্রপাঠকঃ(পর্ব-১১)

 ১ম খণ্ডঃ
সমস্ত সামের উপাসনাই সাধু।সাধুই সাম,অসাধুই অসাম।ভাষাতেও দেখা যায় -সাম্না এনমুপাগাৎ,অর্থ-সাধুনা এনমুপাগাৎ।আর 'অসাম্না' অর্থ ' অসাধুনা'।কোন সাধু ঘটনাকে বলা হয় 'সাম নঃ' ইহা আমাদের পক্ষে সাধু।আর অসাধু ঘটনাকে 'অসাম' বলা হয়।যে বিদ্বান সাম সাধু এইরূপ জানিয়া উপাসনা করেন সাধুগণ তাহার নিকট শীঘ্র আগমন করেন-'সাধবো ধর্ম্মা আ চ গচ্ছেষুঃ, উপ চ নমেষুঃ'- তাহার নিকট আগমন করে ও তাহার ভোগ্য হয়।
 
২য় খণ্ডঃ
লোকদৃষ্টিতে পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করিবে।পঞ্চবিধং সাম উপাসীত।পৃথিবী হিংকার,অগ্নি প্রস্তাব, অন্তরীক্ষ উদগীথ,আদিত্য প্রতিহার, দ্যৌ নিধন।ইহা উর্ধ্ব দৃষ্টিতে সামোপাসনা।তাহার পর উর্ধ্বলোক হইতে আরম্ভ করিয়া নিম্নদৃষ্টিতে সামোপাসনা।দ্যৌ হিংকার,আদিত্য প্রস্তাব, অন্তরীক্ষ উদগীথ,অগ্নি প্রতিহার,পৃথিবী নিধন।
যিনি এই তত্ত্ব জানিয়া উর্ধ্ব হইতে নিম্ন পর্যন্ত ও নিম্ন হইতে উর্ধ্ব পর্যন্ত উপাসনা করেন-সমুদয় লোক তাহার ভোগ্য হয়।
৩য় খণ্ডঃ
বৃষ্টি বর্ষণে পাঁচ প্রকার সামের উপাসনা। বৃষ্টির পূর্ববর্তী বায়ু হিংকার,মেঘ জমে ইহা প্রস্তাব, বৃষ্টি পড়ে ইহা উদগীথ,মেঘগর্জ্জন ও বিদ্যুৎচমক ইহা প্রতিহার,বৃষ্টিপাত শেষ হয়-ইহা নিধন।যিনি এই তত্ত্ব জানিয়া বৃষ্টি-দৃষ্টিতে পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করেন,মেঘ তাহার জন্য বর্ষণ করে,তিনি অন্যের জন্য বর্ষণ করান।
৪র্থ খণ্ডঃ
জলবিষয়ে পঞ্চপ্রকার সামের উপাসনা।মেঘ ঘনীভূত হয় ইহা হিংকার,বর্ষণ হয় ইহা প্রস্তাব, পূর্বদিকে প্রবাহিত নদী, ইহা উদগীথ,পশ্চিম দিকে প্রবাহিত নদী প্রতিহার,সমুদ্র নিধন। যিনি এই তত্ত্ব জানিয়া জলতত্ত্বে তাহার উপাসনা করেন তিনি জলমগ্ন হন না,জলশায়ী হন।

(C) Niha Rani Roy
0 comments

ছান্দোগ্যোপনিষৎঃ ১ম প্রপাঠক(পর্ব-১০)

 একাদশ খণ্ডঃ
উষস্তি চক্রের পুত্র এই পরিচয় পাইয়া প্রীত হইয়া যজমান রাজা তাহাকে ঋত্বিক পদে বরণ করিলেন।কারণ তাহাকেই তিনি এই পদের জন্য খুজিতেছিলেন।
ঋত্বিক উষস্তির নিকট প্রস্তোতা জানিতে চাহিলেন- কোন্ দেবতা প্রস্তাবের অনুগমন করেন?উষস্তি উত্তর দিলেন,প্রাণ দেবতা।সমুদয় ভুত প্রাণের উৎপন্ন,প্রাণেই বিলীন হয়।এই মন্ত্রদ্বারা প্রাণই পরমাত্না ইহা বুঝা যায়।এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ব্রহ্মসূত্র (২/৪/১) "তথা প্রাণাঃ" প্রতিষ্ঠিত।
উদগাতা জানিতে চাহিলেন,কোন্ দেবতা উদগীথের অনুগমন করে? উষস্তি উত্তর দিলেন- আদিত্য দেবতা।তিনি উর্ধ্বস্থ হইলে সমুদয় ভূত তাহার স্তব করে।প্রতিহর্তা জানিতে চাহিলেন- কোন্ দেবতা প্রতিহারের অনুসরণ করেন? উষস্তি বলিলেন- অন্ন দেবতা।সমুদয় ভূত অন্নাহরণ করিয়াই জীবিত থাকে।
 

দ্বাদশ খণ্ডঃ
দালভ্যের পুত্র বক।তাঁহার অপর নাম মৈত্রেয়,গ্লাব।তিনি একদা বেদ পাঠের জন্য কোনো নির্জন স্থানে গমন করিলেন।তখন তাঁহার নিকট একটি শ্বেত বর্ণের কুকুর আসিল।অন্য কতকগুলি কুকুর তাহার নিকট গিয়া বলিল- আমাদের অন্ন লাভের জন্য আপনি সাম গান করুন।আমরা অন্ন ভোজন করিতে ইচ্ছা করি।শ্বেত কুকুর বলিল,"সকলে প্রভাতে আসিও"।দালভ্য তাহাদের অপেক্ষা করিলেন।তাহারা আসিল।বহিষ্পবমান স্তোত্রদ্বারা স্তুতি করিবার সময় যেমন পরস্পর সংলগ্ন হইয়া পরিভ্রমণ করে কুকুরগুলি সেইরূপ করিল।তাহারা 'হিং' উচ্চারণ করিল।ওঁ অদাম(আহার করি)ওঁ পিবাম(জলপান করি)ওঁ দেব বরুণ প্রজাপতি সবিতা অন্ন আনয়ন করুন।হে অন্নপতে,এই স্থানে অন্ন আহরণ করুন।আহরণ কর।ওম্।

ত্রয়োদশ খণ্ডঃ
এই পৃথিবী 'হাউ' কার।বায়ু 'হাই' কার।চন্দ্রমা 'অথ' কার।আত্না 'ইহ' কার।অগ্নি 'ঈ' কার।আদিত্য 'উ' কার।আহ্বান 'এ' কার।বিশ্বদেব 'ঔহোই' কার।প্রজাপতি 'হিং' কার।প্রাণই 'স্বর' কার।অন্নই 'যা' অক্ষর। বাকই বিরাট। তেরটি স্তোভ-' হাউ','অথ','ইহ','ঈ','এ','উ',ঔহোই','হিং','স্বর',যা,বাক্ ও হুং।ইহা অনিরুক্ত-অনির্ব্বচনীয়।
বাক্যের যে দুগ্ধ, তাহা বাক্ স্বয়ং উপাসকের জন্য দোহন করেন।যিনি স্তোভ অক্ষরসমুহের উপনিষদ অর্থাৎ গুহ্যার্থ জানেন তিনি অন্নবান হন।

 (C) Niha Rani Roy
0 comments

দেবতারা কেন স্বর্গে থাকেন আর দানবরা কেন পাতালে থাকেন ??

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে গিয়ে ,,দেবর্ষি নারদ একবার ব্রহ্মলোকে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাজীর কাছে গিয়ে উপস্থিত হলেন।ব্রহ্মাজী বললেন ,, হে দেবর্ষি নারদ !!দেবতারাও আমার সন্তান আর দানবরাও আমারই সন্তান ,,তাই এই প্রশ্নের উত্তর যদিও আমার দেওয়া উচিৎ নয় ,, তবে আমি তোমাকে আগামীকাল একটি উদাহরন দেখিয়ে বুঝিয়ে দেবো !! তুমি আজ সকল দেবতা ও দানবদের কাছে গিয়ে নিমন্ত্রন করে আসো ,,আগামীকাল তারা যেন আমার এখানে দ্বিপ্রহরে ভোজন সেবা করতে আসেন।দেবর্ষি নারদও পিতার আদেশ পালন করলেন।তিনি স্বর্গে গিয়ে দেবতাদের আর পাতালে গিয়ে দানবদের নিমন্ত্রন করে আসলেন !! পরদিন দুপুর বেলা প্রথমে দানবরা এসে উপস্থিত হলেন।দানবেরা ভোজন শুরু করবেন ,,ঠিক সেইসময় ব্রহ্মাজী একজন দানবের হাত ধরে ফেললেন এবং বললেন ,, তোমরা ভোজন করার আগে আমার একটি শর্ত মানতে হবে !! শর্তটি হলো তোমাদের সবার হাতে আমি কাঠ বেঁধে দেবো তারপর তোমরা ভোজন করতে পারবে !!


সেই মোতাবেক সকল দানবদের হাতে লাকড়ী বেঁধে দেওয়া হলো ,,তারা যেন হাত কিছুতেই বাঁকা করে খেতে না পারে !! দানবরা তো হাত বাঁকা করতে না পেরে কেউ কেউ মাটিতে শুয়ে ভোজন শুরু করে দিলেন ,,আবার কেউ কেউ পা দিয়ে কোনোরকমে ভোজনের থালাটা উঠিয়ে অনেক কষ্টে ভোজন করতে লাগলেন !! অবশেষে তারা ভালো করে ভোজন করতে না পেরে বিরক্ত হয়ে ব্রহ্মাজীকে বকাবকি শুরু করে দিলেন !! এইরকম ভাবেই যদি দুই হাতে লাকড়ী বেঁধে আমাদের ভোজন করতে দেওয়া হয় তাহলে কেন আমাদের নিমন্ত্রন করে এখানে আনা হলো ?? আমাদের কি এখানে অপমান করার জন্য আনা হয়েছে ??

ঠিক সেইসময় দেবতারা সেখানে এসে উপস্থিত হলেন এবং তারাও ভোজন করতে বসলেন।পরমপিতা ব্রহ্মাজী তাদেরও হাত ঐ একইভাবে বেঁধে দিলেন।দেবতারা বুঝে গেছেন যে এইভাবে তো ভোজন করা যাবেনা।তাই এই হাত সোজা অবস্থাতেই দেবতারা খুবই আনন্দ সহকারে একে অপরকে ভোজন করাতে লাগলেন।কিছুক্ষণ পর দেবতাদের ভোজন শেষ হয়ে গেল।এবার দেবতারা একে অপরকে হাত ধোঁয়াতে লাগলেন।এই দৃশ্য দেখে দানবরা খুবই লজ্জিত হয়ে গেলেন এবং তারা আফসোস করতে লাগলেন যে ,, দেবতাদের এই চিন্তাধারাটা আগে কেন আমাদের মাথায় আসলোনা !!

দূর থেকে দেবর্ষি নারদ এই দৃশ্য দেখে উনার এতদিনের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন এবং ব্রহ্মাজীকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও প্রনাম জানালেন।

#হিতোপদেশঃ- তাই ভগবৎ ভক্তগন ,, এই পৌরাণিক কাহিনীটি থেকে আমরা একটা দারুন শিক্ষা পাচ্ছি যে ,, অপরকে ভালবাসা আর পরোপকার করার মধ্যেই ধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ লুকিয়ে থাকে।

(C) ডি শীল
0 comments

রামায়ন কথা (সম্পূর্ন)

                                                        আদিকাণ্ড

রামায়ন কথাঃ আদিকান্ড - ৩২ পর্ব

                                           অযোধ্যাকাণ্ড



                                                                   অরণ্যকাণ্ড


রামায়ন কথাঃ অরণ্যকাণ্ড - ১২ পর্ব

                                                                     কিষ্ন্ধিন্ধ্যাকাণ্ড


রামায়ন কথাঃ  কিষ্ন্ধিন্ধ্যাকাণ্ড -  ০১ পর্ব

                                                            সুন্দরাকাণ্ড


রামায়ন কথাঃ সুন্দরাকাণ্ড -০১  পর্ব
রামায়ন কথাঃ সুন্দরাকাণ্ড - ১২ পর্ব
রামায়ন কথাঃ সুন্দরাকাণ্ড -১৩  পর্ব

                                                             লঙ্কাকাণ্ড


রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০১ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০৪ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০৫ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০৮ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০৯ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -১২ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -১৩ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -১৬ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -১৭ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২০ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২১ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২৪ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২৫ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২৮ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২৯ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -৩২ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -৩৩ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -৩৬ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -৩৭ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
0 comments

ইনি রাজা রবি বর্মা, যিনি প্রথম পূরাণ ও মহাভারত অনুযায়ী দেবদেবীর ছবি একেছিলেন ।

“রবি বর্মার চিত্রকর্মগুলো দেখে পুরোটা সকালই কাটিয়ে দিলাম। স্বীকার করতেই হয় যে ওগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই চিত্রগুলো আমাদের দেখায় যে আমাদের নিজস্ব গল্প, ছবি ও এর অভিব্যক্তি আমাদের কতটা আপন। কিছু কিছু চিত্রকর্মে গঠনের অনুপাত হয়তো ঠিক নেই কিন্তু তাতে কী এসে যায়! সামগ্রিক অর্থে এই চিত্রকর্মগুলোর প্রভাব থেকেই যায়”।
রাজা রবি বর্মা(১৮৪৮-১৯০৬)
১৮৪৮ সালের ২৯শে এপ্রিল রাজা রবি বর্মার জন্ম হয় ভারতের কেরালা রাজ্যের এক প্রত্যন্ত অঞ্চল তৎকালীন ‘ত্রাভানকোর’ এর ‘কিলিমানুর’ রাজপ্রাসাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা নীলকান্থন ভট্টতিরিপদ ও মাতা উমাম্বা থামপুরত্তি। তার পরিবারের আবহাওয়া ছিল শিল্পমনা। কবি, শিল্পীতে ভরপুর এই বংশ-পরম্পরায় রবি’র শিল্পমন খুব একটা অদ্ভূত কিছু ছিলো না বটে, কিন্তু তারপরও ছোটবেলায় রবি’র ছবি আঁকাআঁকির ব্যাপারটি দুরন্তপনা বলেই গণ্য হয়েছিলো। মাত্র ৭ বছর বয়স থেকেই তার ছবি আঁকার নেশা তাকে সবার কাছে পরিচিত করে তোলে। তাদের বাড়ির দেয়াল ভরে ওঠতো তার আঁকা পশুপাখির ছবিতে, হাটবাজারে, পথেঘাটে বহমান নিত্যদিনের জীবনযাত্রার দৃশ্যে।
‘গোয়ালিনী’। সাধারণ চিত্রেও অভিব্যক্তির স্পষ্টতা।
তার সৃজনশীলতা ও শৈল্পিক অভিব্যক্তি খুব সাধারণ ছবিতেও স্পষ্ট হয়ে ওঠতো। বাড়ির সবাই যখন তার এই অন্যরকম দুরন্তপনায় কিছুটা বিরক্ত বোধ করছে, তখন তার কাকা রাজা রাজা বর্মাই ছিলেন যিনি রবির শিল্পীসত্ত্বাকে আরো বিকশিত করার পথে নিয়ে যান। রাজা বর্মা নিজেও তাঞ্জোরের শিল্পী ছিলেন। তিনি তার ভ্রাতুষ্পুত্রের চিত্রশিল্পে প্রথম শিক্ষক হন, তিনি তাকে শিল্পের খাতায় নিয়ম-কানুনের হাতেখড়ি করান এবং তার একান্ত পৃষ্ঠপোষকতায়ই রবি বর্মার চিত্রশিল্পীজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষণ শুরু হয়। ১৪ বছর বয়সে রাজা রবি বর্মা জলরঙ্গে ছবি আঁকতে শেখেন থিরুবনান্তপূরম রাজপ্রাসাদের রাজ চিত্রকর রামা স্বামী নাইড়ুর কাছ থেকে।
মহাভারতের দৃশ্য তার চিত্রে
সে সময়ে তৈলচিত্রের ব্যাপারটি ছিলো ছবি আঁকার জন্য অত্যন্ত নতুন একটি মাধ্যম। একজন ব্যক্তিই তৈলচিত্র সম্পর্কে খুব ভাল করে জানতেন, জানতেন কীভাবে তেলরঙ্গে চিত্র রূপ নেয়। ব্যক্তিটি ছিলেন মাদুরাই প্রদেশের রামা স্বামী নাইকার। রবি বর্মা তার কাছ থেকেই তৈলচিত্রে দীক্ষা নিতে মনস্থ করেন, কিন্তু বলিহারি! নাইকার তাকে কিছুতেই প্রশিক্ষণ দান করতে চাইলেন না! নাইকার ছিলেন একজন ঈর্ষান্বিত শিল্পী, যিনি রবি’র মধ্যে তার ভবিষ্যৎ প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখতে পান।
এ সময় গল্পে অবতীর্ন হন আরেক চরিত্র, নাইকারেরই এক ছাত্র অরূমুঘম পিল্লাই। নাইকারের এই ছাত্র তার শিক্ষকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে রাজা রবি বর্মাকে তেল রঙ্গে ছবি আঁকা শেখাতে শুরু করেন। এর সাথে ডাচ চিত্রশিল্পী থিওডর জনসনও যুক্ত হন রবি বর্মার শিক্ষকতালিকায়। থিওডর জনসন মূলত একজন পোর্ট্রেটশিল্পী ছিলেন এবং তিনি রাজা আইল্যাম থিরূনাম এর পোর্ট্রেট আঁকতে ভারতে এসেছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরে শিক্ষালাভের মধ্য দিয়ে, বহু ভুল করার পর, ভুল শোধরানো মোড়ের পর রবি বর্মা তেলরঙ্গে ছবি আঁকায় সিদ্ধহস্ত হলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরপর তিনিও রাজকীয় জুটি আইল্যাম থিরূনাম ও তার পত্নীর একটি পোর্ট্রেট আঁকেন। বলা হয়ে থাকে এই পোর্ট্রেট তার শিক্ষক থিওডর জনসনের আঁকা পোর্ট্রেটটির চাইতেও মোহনীয় ছিলো! একেই বোধহয় বলে একেবারে ‘গুরুমারা বিদ্যে’!
অভিজাতশ্রেণীর পোর্ট্রেট করায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি, তার করা পান্নালাল রায়ের একটি পোর্ট্রেট
চিত্রকর রাজা রবি বর্মা তার শিল্পকে শুধু শিক্ষকপ্রাপ্ত জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। সুনির্মল বসুর কবিতাটির মতই রবি বর্মাও বিশ্বাস করতেন, “বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র……”। ভারতীয় উপমহাদেশের অগণিত সঙ্গীত, কথাকলি নৃত্য ও প্রাচীন গাথা থেকে তিনি খুঁজে নিয়েছেন তার জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাবার উৎস এবং সময়ে সময়ে সে জ্ঞান ঢেলে দিয়েছেন রং-তুলিতে ছোঁয়ানো তার ক্যানভাসে।
রবি’র চিত্রে যশোদা ও কৃষ্ণ, মাতৃত্বের অপূর্ব রূপ
যখন ভারতের মানুষ ব্রিটিশ রীতি-নীতিতে ক্রমেই নিমজ্জিত হচ্ছিলো এবং নিজেদের সংস্কৃতিতে প্রশংসনীয় কিছু থাকতে পারে তাও ভুলে যাচ্ছিলো, ভারতীয় সংস্কৃতিকে সেসময় রক্ষার ভার যারা নিয়েছিলেন, তার মধ্যে রাজা রবি বর্মার নাম অবশ্যই থাকা উচিত। এক রাজা ইউরোপীয় চিত্রশিল্পের দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে রবি বর্মাকে নির্দেশ দেন সেসব চিত্রকর্মের অনুলিপি প্রস্তুত করতে। রবি বর্মা তা অস্বীকার করেন এবং তাকে বলেন যে ভারতীয় সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করতে বাইরে থেকে কোন অনুলিপি তৈরী করতে হবেনা, ভারতের মাঠেঘাটে প্রাচীনকাল থেকেই ছড়িয়ে আছে শিল্পের সহস্র উপাদান। শুধু সেগুলোকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলবার বিলম্বমাত্র! এর জের ধরে তিনি ভ্রমণ করেন সমগ্র ভারতবর্ষ এবং যখন তার মনে হয় ভারতীয় সাহিত্যের সাথে মিল রয়েছে ভারতের লোকেদের জীবনবোধের, জীবনদর্শনের এবং সর্বোপরি তাদের জীবনযাপনের। তখনই তিনি একের পর এক পৌরাণিক কাহিনীর খন্ড দৃশ্য তার চিত্রাবলীতে প্রকাশ করতে থাকেন। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণের সাহিত্য… ভারতবাসীর সঙ্গে যা জড়িয়ে থেকেছে বহুকাল ধরে, তার দৃশ্যমান রূপ দেখতে পারলো তারা, রবি বর্মার ক্যানভাসের মধ্য দিয়ে।
রামায়ণের দৃশ্য
রাজা রবি বর্মা বিবাহিত ছিলেন, তার স্ত্রী ছিলেন পুরুরুত্তাথি ভাগীরথী…মাভেলিকরার রাজপরিবারের মেয়ে। তাদের সর্বমোট পাঁচ সন্তান ছিল।
আমরা আগেই দেখেছি যে তার অধিকাংশ ছবিই ছিলো পৌরাণিক কাহিনী ও চরিত্র নিয়ে, কিন্তু তার খ্যাতি অর্জনে এই ছবিগুলোর পাশাপাশি অবদান রেখেছে বহু রাজা-মহারাজা ও অভিজাতশ্রেণীর নিখুঁত পোর্ট্রেটগুলোও। ১৮৭০ থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত রবি বর্মা মনোনিবেশ করেন পোর্ট্রেট আঁকার প্রতি এবং লাভ করেন সুদূরপ্রসারী খ্যাতি। ১৮৭৩ সালে ঘটে তার শিল্পীজীবনের স্বীকৃতির শুরু, মাদ্রাস চিত্রকর্ম প্রদর্শনীতে প্রথম পুরষ্কার লাভের মধ্য দিয়ে। সেই একই বছরে ভিয়েনা প্রদর্শনীতেও প্রথম পুরষ্কার পেয়ে খ্যাতির সীমানা পৌঁছে যায় দেশ থেকে এবার বিদেশে। এরপর শিকাগো কলাম্বিয়ান প্রদর্শনীতে গিয়ে তিনটি স্বর্ণপদক অর্জনের মধ্য দিয়ে রাজা রবি বর্মার নাম যুক্ত হয়ে যায় বিশ্ববিখ্যাতদের তালিকায়ও। ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন, রাজা রবি বর্মাকে ‘কায়সার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদকে ভূষিত করেন। তার খ্যাতির বিড়ম্বনা হিসেবে একবার কিলিমানুর পোস্ট অফিসে দেশ-বিদেশের অগণিত চিঠির বন্যা বয়ে গিয়েছিলো!
তিনি ছিলেন তার জীবনকালে প্রথম আধুনিক ভারতীয় চিত্রশিল্পী। তাকে ‘আধুনিক ভারতীয় দৃশ্য সংস্কৃতির জনক’ও বলা হয়েছে। ইউরোপীয় শিল্পের প্রকৃতিবাদ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভারতের প্রকৃতি থেকে নির্যাস নিয়ে যান তার শিল্পে। যা তার চোখে সুন্দর ছিলো, তিনি সে সৌন্দর্যকে সেঁচে আনতে চাইতেন… সম্পূর্ণরূপে ঢেলে দিতে চাইতেন ক্যানভাসে। সৌন্দর্যেরে পূজারী এই চিত্রকর সৌন্দর্যকে ধরে রাখতে এতটাই বদ্ধপরিকর ছিলেন যে প্রায়ই ভুলে বসতেন স্থান-কাল-পাত্র! যে সৌন্দর্য তার চোখকে মুগ্ধ করেছে, তাকে স্থায়ী রূপ না দেয়া পর্যন্ত শান্ত হতে পারতো না তার শিল্পীমন! তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনকিছুর সৌন্দর্যই চিরস্থায়ী হয়না…কিন্তু শিল্প চিরস্থায়ী হয়।
তার চিত্রে দীপ হাতে রমণী।
ভারতের আপামর জনগণকে শিল্পের কাছাকাছি আনতে, সংস্কৃতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত করতে রাজা রবি বর্মা এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তার চিত্রকর্মগুলো যেন শুধু একটি নির্দিষ্ট অভিজাত গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে ভারতের উঁচু-নিচু সকল স্তরে। বিশেষজ্ঞরা তার চিত্রকর্ম সম্পর্কে কী মতামত দেন তারচাইতেও বেশি তিনি ভাবতেন আপামর জনতা তার চিত্রকর্মগুলোকে কতটা নিজেদের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারে, কতটা আপন ভাবতে পারে তা নিয়ে…তাই তিনি একটি পথ বেছে নিলেন যাতে করে তার শিল্প পৌঁছে যাবে প্রতিটি মানুষের কাছে। সেই বেছে নেয়া পথটি ছিল ‘মুদ্রণ শিল্প’, এবং এও বলা হয়ে থাকে যে মুদ্রণ শিল্পকলায় সর্বাপেক্ষা সফল শিল্পী ছিলেন কেরালার রাজা রবি বর্মা। ১৮৯৪ সালে তিনি একটি লিথোগ্রাফি ছাপাখানা স্থাপন করেন ও তার আঁকা ছবিগুলোর প্রতিলিপি বাংলাসহ সারা ভারতে অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা অর্জন করে। রবি বর্মার কাছে এই ছিলো তার সাফল্য, এই ছিলো তার পরম অর্জন।
তার তৈলচিত্রগুলো সত্যিই আলো আঁধারির খেলা জানে!
৫৮ বছর বয়সে রাজা রবি বর্মা ত্রাভানকোরের কিলিমানুর গ্রামে মৃত্যুবরণ করেন। কেরালা সরকার তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ‘রাজা রবি বর্মা পুরষ্কারম’ প্রবর্তন করেছে। শিল্প-সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য বার্ষিকভাবে এই পুরষ্কারটি দেয়া হয়ে থাকে।
তথ্যসূত্র:
https://en.m.wikipedia.org>wiki>raja_ravi_varma
www.thefamouspeople.com
Film: ‘Rangrasiya’
Book: Art nationalism in colonial India, Partha Mitter
ছবি উৎস:
www.webneel.com
লেখকঃAnindeta Chowdhury

সংগ্রহঃ https://roar.media
0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger