সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

হিন্দুরা কেন ধর্মান্তরিত হবে না ? একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।


যে ধর্মে আমরা সঠিক ভাবে কেউ জানি না ঈশ্বর কে? সে ধর্মে মানুষ কি ভাবে থাকবে?

আমার নিজেরই মাঝে মাঝে কেমন জানি লাগে। কারন কি জানেন?

১ / আমি ছোট বেলায় লোকনাথ বাবার ভক্ত ছিলাম।তখন জানতাম লোকনাথ বাবাই সব।

২ / যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি, তখন এক সৎসঙ্গের এক ঋৃত্বিক দাদা আমাদের বাড়িতে আসে।বাবাকে অনেক বুঝায়, আপনার মেয়েকে সদগুরুর দীক্ষা দিয়ে দেন,দেখবেন পরিক্ষায় প্রথম হবে,ভাল ঘরে বিয়ে হবে, আরো অনেক কিছু বলে আমাকে দীক্ষা দিল।
আমাকে শিখালো কলিযুগে অনুকূল ঠাকুরি সব।যারা অনুকূল ঠাকুরকে না ধরবে,তাদের কোন দিন উন্নতি হবে না।অনুকূল ঠাকুর কৃষ্ণের থেকেও উপরে।তখন থেকেই মনে প্রাণে ইষ্টিভৃতি করা, সকাল সন্ধ্যায় প্রার্থনা করা,জপ করা শুরু করি।খুব ভালই ছিলাম, দেওঘর গিয়েছি কয়েক বার, ঠাকুর পরিবারের সবাইকে দেবতা জ্ঞান করতাম।

৩ / ছোট বেলা থেকেই আমার ধর্ম সম্পর্কে জানার খুব আগ্রহ,সে হেতু একদিন আমি আর আমার বন্ধু মিলে রামকৃষ্ণ মিশনে যাই।সেখানে গেরুয়া পোষাক পড়া এক ব্রহ্মচারীর সাথে কথা হয়।
তার কথা শুনে আমার মাথা গরম হয়ে গেলে।আমাকে বলে তুমি ভুল পথে আছো,অনুকূল তো একজন ভন্ড। তার শালীকে ছলনা করে বিয়ে করেছে।এজন্য মানুষের কাছে মার খেয়েছে।নেশা করতো, সব সময় হুক্কা টানতো।মানুষের কাছ থেকে ইষ্টি ভৃতির কথা বলে টাকা নিয়ে চলে।আরো কত কি যে বললো, আমার সারা শরীরে জ্বালা করতে ছিল।আমার গুরুদেব সম্পর্কে এমন কথা, আমি জীবনে ভাবতেই পারিনি।
শেষে বুঝালো রামকৃষ্ণ মিশন থেকে দীক্ষা নাও,তিনি কলিযুগের যুগাবতার, এটা প্রমাণিত, তাকে ধরলেই তুমি মুক্তি লাভ করবে।
এপর আমি ওখান থেকে চলে আসি, কয়েক দিন খুব খারাপ লেগেছে।

৪ / এর একবছর পরে ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর, কেন যেন মনে হল বেদ গীতা সম্পর্কে পড়া লেখা করবো।কিন্তু কোথায় বেদ গীতা সম্পর্কে পড়ায় আমি জানি না।এক বন্ধু বললো,ইসকনরা অনেক প্রচার করে, নিশ্চয় ওদের কাছে গেলে শিখতে পারবি।
তাই একদিন ইসকন মন্দিরে গেলাম।যেয়ে ভালই লাগলো,দেখী সবাই মিলে হরেকৃষ্ণ কীর্তন করতেছে।বেশ কিছুক্ষণ পর এক প্রভুর সাথে পরিচিত হলাম।সে আমাকে কৃষ্ণ সম্পর্কে বুঝাল,গীতা খোলে খোলে দেখাল।আমার মনে হতে লাগলো কৃষ্ণই একমাত্র ঈশ্বর, একমাত্র সৃষ্টি কর্তা। কৃষ্ণের উপরে আর কেউ নেই।ঐ প্রভুটি নিজের টাকা খরচ করে,প্রভুপাদের আত্ম জ্ঞান লাভের পন্থা নামক একটা বই উপহার দিল।
আমি ঐ দিন রাতে ঘুমাতে পারিনি।সারারাত আমার মাথায় শুধু কৃষ্ণ ঘুড়েছে।
পরেদিন থেকে বইটি পড়া শুরু করলাম, অনেক ভাল লাগতে ছিল।আস্তে আস্তে কৃষ্ণকে ভালবেসে ফেললাম।মোটামোটি কৃষ্ণ ভক্ত হয়ে গেলাম।মালা নিয়ে এখনো হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করি।

৫ / ভার্সিটিতে একশিব ভক্ত দাদার সাথে পরিচয় হল।আমি তাকে বললাম, দাদা আপনি কৃষ্ণ ভক্ত হয়ে যান,শিবও তো কৃষ্ণ ভক্ত, পরম বৈষ্ণব। সে রেগে মেগে আমাকে বললো তর কৃষ্ণই শিব ভক্ত,পরম শৈব।তার কথা গুলো শুনে অনেক কষ্ট পেয়েছি, আমার চোখে জল এসে গিয়ে ছিল।আমি কান্না করে দিয়েছি।পরে দাদা বলল, থাক তুই তর কৃষ্ণকে নিয়ে থাক আমি আমার শিবকে নিয়ে থাকি।
কিছুদিন পর দাদাটি আমাকে কিছু পেজ দিল, শৈব ধর্ম সম্পর্কিত। দিয়ে বলল এটা পড়।জানতে তো সমস্যা নেই, না মানলি।

এটা পড়ে বুঝলাম, এখানে প্রমাণ করা হয়েছে সদাশিবই সব।মহাদেবের উপরে আর কেউ নেই।বিভিন্ন গ্রন্থের রেফারেন্স রয়েছে,বেদ,উপনিষদ,মহাভারত,শিব পুরান,শিব গীতা।বিষ্ণু,রাম,কৃষ্ণ সবাই শিব ভক্ত।
তখন থেকে আমার শুধু মনে হয়, আমাদের ধর্ম এ রকম কেন?

৬ / এর পর " আমার ধর্ম সনাতন" ব্লকটি চোখে পড়লো। এই ব্লক থেকে আমার মনের অনেক প্রশ্নের উওর পেলাম।মনের সব সংশয় দূর হয়ে গেল।বুঝতে পারলাম শিব,কৃষ্ণ, কালি, ব্রহ্ম একজনই আলাদা কেউ নয়। একজনেরই বিভিন্ন নাম বা বিভিন্ন রুপের প্রকাশ।সাকার, নিরাকার যাকেই উপাসনা করা হোক,এক ঈশ্বরেরই উপসনা করা হয়।
তাহলে আর কোন সমস্যা রইলো না, শিব,কৃষ্ণ, কালি,নিরাকার ব্রহ্ম, যার যেটা ভাল লাগে উপাসনা করুক।শুধু জানুক এগুলো এক ঈশ্বরেই বিভিন্ন নাম বা রুপ।তাহলে হিন্দুদের মধ্যে ঈশ্বর নিয়ে আর কোন সমস্যা থাকবে না।সকল হিন্দুরা মিলে মিশে থাকতে পারবে।

৭ / কিন্তু বর্তমানে ফেসবুকে হিন্দুদের মধ্যে ধর্ম নিয়ে কথা কাটাকাটি, তর্ক, বকাঝকা শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি। আমাদের বর্তমানে হিন্দুদের মিলে মিশে থাকা উচিত, তা না করে আমরা আরো বিভেদ সৃষ্টি করছি।
আর্য সমাজ নামে নতুন একটা দল দেখলাম ফেসবুকে। আমিতো প্রথমে মনে করেছিলাম, এরা বুঝি মুসলমান। জাকির নায়েক যে কথা গুলো বলতো তারাও দেখি একই কথা বলে।ঈশ্বর শুধুই নিরাকার, তিনি সাকার হতে পারেন না।বেদে মূর্তি পুজা নেই, সকল মূর্তি ভেঙ্গে ফেলবো।কৃষ্ণ একজন মানুষ, যারা কৃষ্ণ ভক্ত তারা মূর্খ। কৃষ্ণকে সাধারণ মানুষ বানানোর যেন তাদের সংঘের প্রচারের মূল কাজ। ইসকন ভন্ড দল, প্রভুপাদকে তারা ডাকে পাদেশ্বর, আবার দেখি ইসকনরাও দয়ানন্দকে ডাকে গাজানন্দ।এসব কি?? এ সব করে কি আমরা সনাতন ধর্মের প্রচার করতে পারবো?। আবার বাংলাদেশের আর্য সমাজের কে যেন সুভাষ শাস্ত্রি, তার যে মুখের ভাষা, তা বলার মত না।তিনি তো হিন্দুদের কুত্তার বাচ্চা ছাড়া কথাই বলেন না।।

৮/ আমাদের এই অবস্থায় সাধারণ হিন্দুদের তার নিজ ধর্মের প্রতি কতটুকু আস্তা থাকবে।যে ধর্মে সে তার সৃষ্টিকর্তাকেই চিনতে পারে না, সেখানে তার ধর্মীয় বিশ্বাস, অনুভূতি কতটুকু কাজ করবে।আর এর পাশে মুসলমানদের মগজধুলাই তো আছে।তা হলে লাভ জিহাদ বা হিন্দুরা ধর্মান্তরিত কেন হবে না?

৯/ এখনো সময় আছে হিন্দুদের এক হওয়ার।মনে রাখতে হবে, হিন্দু স্বার্থে আমরা সকল হিন্দুরা ভাই ভাই।আমরা এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী। তিনি একজনই।

তিনিই ব্রহ্ম, তিনিই বিষ্ণু, তিনি শিব,তিনিই কৃষ্ণ, তিনিই কালী।আলাদা কেউ নয় একজনই।

আমরা আমাদের প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদ গীতায় বিশ্বাসী।

আর শাস্ত্রের উল্লেখ্য ছাড়া কাউকে অবতার,যুগাবতার, পরমপুরুষ, পুরুষোত্তম এব সব বানাতে যাবেন না।

প্রতিটি হিন্দু সংগঠন গুলো মিলে মিশে থাকুন। নিজস্ব মতবাদ বাদ গিয়ে, শুধু বেদ গীতায় যা আছে, তাই প্রচার করুন।নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বন্ধ করুন।আমার কৃষ্ণ ভক্তই সবাইকে হতে হবে,অথবা নিরাকার উপাসকই সবাইকে হতে হবে, এসব একঘুয়ে চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিয়ে, কিভাবে মিলে মিশে থাকা যায়, আসুন সে চিন্তা করি।

জয় শ্রীকৃষ্ণ
হরহর মহাদেব
ওঁ পরমাত্মায় নমঃ

" রুপা চক্রবর্তী "
কলকাতা
0 comments

মহ‌র্ষি ব্যাস‌দে‌বের রাজা যু‌ধি‌ষ্ঠির‌কে অশ্মা মু‌নির ক‌থিত ধ‌র্মোপ‌দেশ বর্ণনা

শ্রী বৈশম্পায়ন বল‌লেন -- জন‌মেজয় ! পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠপুত্র রাজা যু‌ধি‌ষ্ঠির‌কে তাঁর আত্মীয়‌দের শো‌কে সন্তপ্ত হ‌য়ে প্রাণ‌বিসর্জন দি‌তে প্রস্তুত দেখে শ্রীব্যাস‌দেব তাঁর শোক দূর করার উ‌দ্দে‌শ্যে বল‌লেন -- " যু‌ধি‌ষ্ঠির ! এই বিষ‌য়ে অশ্মা ব্রাহ্মণ ক‌থিত এক প্রাচীন ই‌তিহাস আ‌ছে , মন দি‌য়ে শো‌নো ।

একবার বি‌দেহরাজ জনক দুঃখ ও শো‌কের বশীভূত হ‌য়ে মহাম‌তি বিপ্রবর অশ্মা‌কে জিজ্ঞাসা‌ কর‌লেন যে , " যারা নি‌জেদের কল্যাণ চায় , তা‌দের কীরূপ আচরণ করা উ‌চিত ? "

অশ্মা বল‌লেন __ " রাজন ! মানুষ যখন জন্মায় , তখন থে‌কেই দুঃখ ও শোক তার নিত্যসঙ্গী । এগু‌লি মানু‌ষের জ্ঞান‌কে এমনভা‌বে ছিন্ন‌ভিন্ন ক‌রে যেমন বায়ু মেঘ‌কে ক‌রে থা‌কে । সেইজন্যই মানু‌ষের ম‌নে দৃঢ় ধারণা হয় যে " আ‌মি কুলীন , আ‌মি সিদ্ধ , আ‌মি কো‌নো সাধারণ মানুষ নই । " সেই ধারণার বশীভূত হ‌য়ে সে পিতা পিতামহ থে‌কে প্রাপ্ত সম্পদ খরচ ক‌রে ভিখা‌রি হ‌য়ে যায় এবং অ‌ন্যের অর্থ হস্তগত করার চিন্তা কর‌তে থা‌কে । নি‌জের মর্যাদার বিষয় তার খেয়াল থা‌কে না । সে অনু‌চিত প‌থে ধন জমা‌তে থা‌কে । তাই রাজারা তা‌কে দণ্ডপ্রদান ক‌রেন ।

তাই মানু‌ষের সুখ বা দুঃখ যাই আসুক , তা স্বাভা‌বিকভা‌বে মে‌নে নেওয়াই উ‌চিত । কারণ তা দূর করার কো‌নো উপায় নেই । অ‌প্রিয় ঘটনা , প্রিয়জ‌নের বি‌চ্ছেদ - বি‌য়োগ , ইষ্ট , অ‌নিষ্ট , সুখ - দুঃখ _ এসবই প্রারব্ধ ( ভাগ্য ) অনুুসা‌রে হয় । তেমনই জন্ম - মৃত্যু ও লাভ - ক্ষ‌তিও দৈবাধীন । চি‌কিৎসক‌কেও রোগী হ‌তে দেখা যায় , বলবান ব্য‌ক্তিও কখ‌নো কখ‌নো শ‌ক্তিহীন হ‌য়ে প‌ড়ে , ধনী ব্য‌ক্তি‌কেও ভিখারী হ‌তে দেখা যায় । কা‌লের এই গ‌তি বড় রহস্যময় ।

উচ্চবং‌শে জন্ম , পুরুষার্থ , আ‌রোগ্য , রূপ , সৌভাগ্য , ঐশ্বর্য _ এ সবই প্রার‌ব্ধের অধীন । যে ভিখারী , প্র‌তিপাল‌নের কষ্ট হ‌লেও ক‌য়েক‌টি সন্তান তার গৃ‌হে জন্ম নেয় , আর যে সম্পন্ন , এক‌টি সন্তানও তার ভাগ্যে জো‌টে না । বিধাতার কর্ম বড়ই বি‌চিত্র । ব্যা‌ধি , অ‌গ্নি , জল , শস্ত্র , ক্ষুধা , তৃষ্ণা , বিপদ , বিষ , জ্বর , মৃত্যু , উচ্চস্থান থে‌কে পতন __ এ সবই জী‌বের জন্মা‌নোর স‌ঙ্গেই স্থির হ‌য়ে যায় । সেই নিয়ম অনুসা‌রেই তা‌কে এই প‌রি‌স্থি‌তি‌তে যে‌তে হয় । আজ পর্যন্ত কেউ এর থে‌কে মু‌ক্তি পায়‌নি , পা‌বেও না ।

এইভা‌বে কা‌লের প্রভা‌বেই জীব‌দের অনুকূল ও প্র‌তিকূল পদা‌র্থের স‌ঙ্গে সম্পর্ক স্থা‌পিত হয় । বায়ু , আকাশ , অ‌গ্নি , চন্দ্র , সূর্য , দিন , রাত , নক্ষত্র , নদী ও পবর্ত‌কেও কাল ব্যতীত অন্য কে সৃ‌ষ্টি ক‌রে এবং স্থির রা‌খে ? শীত - গ্রীষ্ম ও বর্ষার চক্রও কাল‌যো‌গে প‌রিব‌র্তিত হয় । মানু‌ষের সুখ - দুঃ‌খের বিষ‌য়েও একই ব্যাপার । রাজন্ ! মানু‌ষের ওপর যখন জরা - মৃত্যুর আক্রমণ হয় তখন কো‌নো ওষুধ , মন্ত্র , হোম , যজ্ঞ তা‌কে রক্ষা কর‌তে পা‌রে না ।

ইহজগ‌তে বহু পিতা - মাতা , স্ত্রী - পুত্র আমা‌দের হ‌য়ে‌ছিল , কিন্তু বাস্ত‌বে চিন্তা ক‌রে দেখ , তারা কার এবং আমরা কা‌দের আপন বলব ? পথ চলার সময় পথচারী‌দের ম‌তোই আমা‌দের স্ত্রী - বন্ধু ও সুহৃদগ‌ণের স‌ঙ্গে কালযাপন হয় । সুতরাং বিচারশীল মানুষ‌দের ম‌নে ম‌নে চিন্তা করা উ‌চিত যে __ " আ‌মি কোথায় ? " " কোনখা‌নে যাব ? " " আ‌মি কে ? " " এখা‌নে কেন এ‌সে‌ছি " এবং " কার জন্য কেন শোক কর‌ছি ? " এই জগৎ - সংসার অ‌নিত্য , চ‌ক্রের ন্যায় তা প‌রিব‌র্তিত হ‌য়ে চ‌লে‌ছে । জীবন - প‌থে মাতা - পিতা , ভাই - বোন , মিত্রা‌দির সমাগম যেমন পাস্থশালায় এক‌ত্রিত প‌থিক‌দের ম‌তো ।

কল্যাণকারী ব্য‌ক্তি‌দের শাস্ত্রাজ্ঞা উল্লঙ্ঘন না ক‌রে তা‌তে শ্রদ্ধা রাখা উ‌চিত । পিতৃ - পিতাম‌হের শ্রাদ্ধ - তর্পণ , দেবতা‌দের পূজা এবং যজ্ঞানুষ্ঠান ঠিকম‌তো সম্পন্ন ক‌রে ত‌বেই ধর্ম - অর্থ - কাম উপ‌ভোগ করা উ‌চিত । হায় ! এই সমগ্র জগৎ অগাধ কালসমু‌দ্রে ভে‌সে যা‌চ্ছে । এ‌তে জরা - মৃত্যুর ন্যায় অসংখ্য জন্তু ভ‌র্তি ; কিন্তু জী‌বের তা‌তে খেয়ালই নেই । চিকিৎসকগ‌ণও অত্যন্ত তীক্ষ্ম - কটু নানা প্রকার ঔষধ দি‌য়ে থা‌কেন , তবুও জীব এই মৃত্যু্কে উল্লঙ্ঘন কর‌তে সক্ষম হয় না ।

বড় বড় চি‌কিৎসকগণও যেমন এই জরা - বৃদ্ধত্ব দূর কর‌তে পা‌রেন না , তেমনই তপস্বী , স্বাধ্যায় - শীল , দানী , বড় বড় যজ্ঞকারী ব্য‌ক্তিগণও জরা - মৃত্যু রোধ কর‌তে পা‌রেন না । দিন - রাত , পক্ষ , মাস , বর্ষ উপ‌স্থিত হ‌য়ে চির‌দি‌নের জন্য হা‌রি‌য়ে যায় , মৃত্যুর এই দীর্ঘ পথ সকল জীব‌কেই অ‌তিক্রম কর‌তে হয় ।

সুতরাং এমন কোন মানুষ নেই , যা‌কে কা‌লের বশীভূত হ‌য়ে যে‌তে না হয় । নিজ দে‌হের স‌ঙ্গেই যখন চিরস্থায়ী সম্পর্ক থা‌কে না , তখন অন্যান্য জ‌নের স‌ঙ্গে কী ক‌রে থাক‌বে ? রাজন্ ! আজ তোমার পিতা - পিতামহ কোথায় গে‌লেন ? এখন তু‌মিও তাঁ‌দের দেখ‌তে পাচ্ছ না , তাঁরাও তোমা‌কে দেখ‌চ্ছেন না । স্বর্গ বা নরক‌কে মানুষ চর্মচ‌ক্ষে দেখ‌তে পায় না । সেগু‌লি দেখার জন্য সৎপুরু‌ষেরা শা‌স্ত্রের সাহায্য নেন । সুতরাং তু‌মি শাস্ত্রানুরূপ আচরণই ক‌রো ।

মানু‌ষের প্রথম জীব‌নে ব্রহ্মচর্য পালন করা উ‌চিত । তারপর গৃহস্থাশ্র‌মে এ‌সে পিতৃ - পিতামহ ও দেবতা‌দের ঋণ থে‌কে মুক্ত হওয়ার জন্য যজ্ঞানুষ্ঠান এবং সন্তান উৎপাদন কর‌বে । এরূপ সূক্ষ্মদর্শী গৃহস্থ‌দের নিজ হৃদ‌য়ের শোক প‌রিত্যাগ ক‌রে ইহ‌লোক , স্বর্গ‌লোক ও পরমাত্মার আরাধনা করা উ‌চিত । যে রাজা শাস্ত্রানু‌সা‌রে ধর্ম আচরণ ও দ্রব্য সংগ্রহ ক‌রেন , সমস্ত জগ‌তে তাঁর সুষশ ছ‌ড়ি‌য়ে প‌ড়ে ।

ব্যাস‌দেব বল‌লেন -- যু‌ধি‌ষ্ঠির ! অশ্মা মু‌নির কা‌ছে এইভাবে ধর্মরহস্য জে‌নে রাজা জন‌কের বু‌দ্ধি শুদ্ধ হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছিল , তাঁর সমস্ত ম‌নোরথ পূর্ণ হ‌য়ে‌ছিল এবং তি‌নি শোকহীন হ‌য়ে মু‌নির অনুম‌তি নি‌য়ে নিজ ভব‌নে চ‌লে গি‌য়েছি‌লেন । তু‌মিও তাঁ‌র ম‌তো শোক ত্যাগ ক‌রে উ‌ঠে দাঁড়াও । মন‌কে প্রসন্ন ক‌রো এবং শাস্ত্রধর্ম অনুসা‌রে জয় করা এই পৃ‌থিবীর রাজ্যশাসন ক‌রো ।

জয় রাধে ।
জয় হোক সকল ভক্তবৃ‌ন্দের ।
শ্রীম‌তি রাধারাণী সক‌লের মঙ্গল করুণ ।
0 comments

জীবনের প্রকৃত সমস্যা কি??

একসময় যমরাজ,যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করেন-পৃথিবীতে সবচেয়ে আশ্চর্যকর জিনিষ কি? উত্তরে তিনি বলেন-মানুষ দেখছে তার পিতামাতা,বন্ধুবান্ধব,আত্মীয়স্বজন,সবার মৃত্যু হচ্ছে,তবুও সে ভাবে-সে বেঁচে থাকবে!
ঠিক একটা ছাগলকে বলি দেওয়া দেখেও,অপর ছাগল সন্তুষ্ট মনে ঘাস খেতে থাকে। শুধু ইন্দ্রিয় সুখভোগ নিয়েই তৃপ্ত।
আবার যদি কারও মৃত্যুর জ্ঞান আছে,তাহলে এটা জানেনা মৃত্যুর পরে কি হবে? জিজ্ঞাসা করে দেখুন,বলবে-আমার জানা নেই!
এটাই প্রকৃত সমস্যা।


আমাদের প্রধাণ চারটি সমস্যা - জন্ম,মৃত্যু,জরা, ব্যাধি। আমরা মরতে চাইনা,তবুও মৃত্যু আসে। রোগাক্রান্ত হতে কেউ চায় না। কিন্তু যখন রোগে ধরে,তখন ভাবে-ডাক্তারের কাছে যাব,কতকগুলি ওষুধ দেবেন,সেগুলি সেবন করলে আমি ভাল হয়ে যাব,ব্যাস problem solved.
আর বৃদ্ধ হতে তো কেউই চায় না। সারাজীবন জওয়ান থাকব। তা কি হয়? এগুলোই সমস্যা।
শ্রীকৃষ্ণ মহাভারতে ১২৫ বছর বয়সেও ২৫ বছরের যুবক মনে হতো। কারন সেটা চিন্ময় শরীর। আমাদেরও ভগবান সেই দেহ দিতে উৎসুক। তবে তার জন্য চেষ্টাতো করতে হবে।

কিভাবে চেষ্টা করব?
দেখুন ছোটবেলায় ১ থেকে ৯ এবং ০ যথাযথ শিখে নিয়ে,আজ সমস্ত গণিতশাস্ত্র জানা হয়ে গেছে। ঠিক তেমন,কেউ যখন কৃষ্ণকে জানতে পারে,তার সমস্ত জানা হয়ে যায়।
তবে কৃষ্ণকে জানব কিভাবে?
যেখানে ব্রহ্মা হাজার বছর চেষ্টা করেও কৃষ্ণকে জানতে পারেনি!
কৃষ্ণের মতো কৃপালু আর নেই। মহাপ্রভু শিক্ষাষ্টকে বলেছেন-
" চেতোদর্পণমার্জনম "-অর্থাৎ মনরূপী আয়নাকে ঘষে ঘষে আগে পরিস্কার করো-মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন দিয়ে। যত বড় পাপীই হোক এই একটা মন্ত্রেই সিদ্ধি,,সাথে গুরু
মন্ত্র।
জগাই-মাধাই এই নামে উদ্ধার পেল। হরিদাস ঠাকুরকে বিচলিত করতে গিয়ে,এক বেশ্যা শুধু এই মহামন্ত্রের বলে ভক্তে পরিনত হলো।

অনেক পন্ডিত ব্যক্তি তর্কে আসেন-নাকি বেদান্ত পড়তেই হবে। অবশ্যই বেদান্ত=বেদ+অন্ত--অর্থাৎ শিক্ষার যেখানে শেষ।
আচ্ছা ভক্ত ধ্রুব ও প্রহ্লাদ ওইটুকু বয়সেই কি বেদান্ত পড়েছিল? আর কোনো অশিক্ষিত ব্যক্তি যদি বেদান্ত না পড়তে পারে,ভগবান কি তাকে স্বীকার করবেন না?
কলিযুগে বেদান্ত নয়,তবে ভাগবত আর গীতা পড়তেই হবে।
যে যুগে যেটা সম্ভব।

আমার গুরু বলেন-
টাকা মাটি-এই কথাটা ঠিক না। টাকা কি করে মাটি হয়? কিন্তু টাকাকে উল্টান,হবে কাটা।
টাকা- কাটা। টাকা বেশী হয়ে গেলে সেই টাকাই আপনাকে কাঁটার মতো বিঁধবে-ইহা সত্য।

বেদ-পন্ডিতগণ এটা কি জানেন,ডাক্তারের কাছে সব রোগের জন্য একটা ওষুধ থাকে- that is called " panancea ".
শ্রীকৃষ্ণ যেমন- সর্বকারনকারনম
তেমনই
মহামন্ত্র--সর্বদুঃখহরণম।

প্ররোচিত না হয়ে মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন করে যান। চিন্তা নেই,মহাপ্রভু কথা দিয়েছেন-উদ্ধার করবেন।

(c) Joy Shree Radha Madhav
0 comments

পরমাত্মাতত্ত্ব যখন এতই সুগম যে সেই দি‌কে দৃ‌ষ্টি দেওয়া মাত্র তার প্রা‌প্তি হয়ে যায় , তাহ‌লে এ‌তে বাধা কী ?

 যে রী‌তি‌তে সাংসা‌রিক বস্তু পাওয়া যায় সেই রী‌তি‌তে পরমাত্মারও প্রা‌প্তি হয় -- এটা মে‌নে নেওয়াই পরমাত্ম‌াপ্রা‌প্তির পথে বড় বাধা । সাংসা‌রিক বস্তুর প্রা‌প্তি তো ক‌র্মের দ্বারা হয় কিন্তু তার পরমাত্মার প্রাপ্তি ক‌র্মের দ্বারা হয় না , তা হয় ভাব এবং বো‌ধের দ্বারা । তার কারণ সাংসা‌রিক বস্তুগু‌লি‌কে তৈ‌রি কর‌তে হয় , উৎপন্ন কর‌তে হয় , কোথাও থে‌কে নি‌য়ে আস‌তে হয় , তার জন্য কোথাও যে‌তে হয় । কিন্তু পরমাত্মার জন্য কোথাও যে‌তে হয় না ।

পর‌মেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং পরমাত্মারূ‌পে সক‌লের হৃদ‌য়ে আ‌ছেন । শ্রীকৃষ্ণ হ‌লেন খুব কা‌ছের আপনজন । প‌রিবার ব‌লেন বা সমাজ বা দেশ সক‌লে তো বিপ‌দে অনেক প‌রে আ‌স‌বে কিন্তু য‌দি শ্রীকৃষ্ণ‌কে স্মরণ করা হয় ত‌বে তি‌নি কোন না কোনভা‌বে রক্ষা কর‌বেন । তাই আমা‌দের সব‌চে‌য়ে আপনজন হ‌লে আমাদের হৃদ‌য়ে থাকা শ্রীকৃষ্ণ । আপ‌নি য‌দি একাগ্রভা‌বে তাঁ‌কে ডা‌কেন তি‌নি অবশ্যই সাড়া দি‌বেন য‌দি ম‌নে দৃঢ় বিশ্বাস থা‌কে ।

পরমাত্ম সমগ্র দেশ , কাল , বস্তু , ব্য‌ক্তি , প‌রি‌স্থি‌তি , ঘটনা অবস্থা প্রভৃ‌তি‌তে যেমনকার তেমন বিদ্যামান থাকেন । তাঁর প্রা‌প্তি‌র জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষা নেই , এই জন্যই তাঁ‌কে পাওয়া যা‌চ্ছে না । আকাঙ্ক্ষা না হওয়ার কারণ শরী‌রের স‌ঙ্গে একত্ব মে‌নে নি‌য়ে সুখ‌ভোগ করা । যেমন জা‌লে আটকে পড়া মাছ এ‌গো‌তে পা‌রে না তেমনই সাংসা‌রিক সু‌খে জ‌ড়ি‌য়ে পড়া মানু‌ষের দৃ‌ষ্টি পরমাত্মার দি‌কে এ‌গো‌তে পা‌রে না । কেবল এইটুকু নয় , সাংসারিক সুখ ( ভোগ এবং সংগ্রহ ) - এ আসক্ত মানুষ পরমাত্মা‌কে প্রাপ্ত করার সিদ্ধান্তও নি‌তে পা‌রে না ।

সুখ‌ভোগ হল নি‌জের বি‌বেক‌কে অনাদর করা । য‌দি মানুষ নি‌জের বি‌বেক‌কে গুরুত্ব দেয় তাহ‌লে সে সুখ ভোগ কর‌তে পা‌রে না । কারণ ভোগ্য বস্তু‌কে স্থায়ী ম‌নে ক‌রেই সুখ‌ভোগ হ‌য়ে থা‌কে । তাকে স্থায়ী ম‌নে না কর‌লে সুখ‌ভোগ হ‌তেই পা‌রে না । শরীর - সংসার প্রতি মুহূ‌র্তে বদলা‌চ্ছে , মুহূ‌র্তের জন্যও স্থির থাকে না - এই বোধ হ‌লে মানুষ সুখ‌ভোগ কর‌তেই পা‌রে না ।

কারণ বি‌বেক জাগ্রত হ‌লে মানু‌ষের স্থি‌তি শরীরে থা‌কে না , তা থা‌কে স্বরূ‌পে । তাই মানু‌ষের উ‌চিত বি‌বেক‌কে গুরুত্ব দেওয়া । বি‌বেক‌কে মানুষ য‌দি গুরুত্ব না দেয় ত‌বে কি গাছ গুরুত্ব দে‌বে ? জন্তুরা গুরুত্ব দে‌বে ? তাহলে মানু‌ষের স‌ঙ্গে জন্তুর প্র‌ভেদ কোথায় হল ?

সংসা‌রে কো‌নো বস্তুই স্থির নয় । প্র‌ত্যেক বস্তু প্র‌তি মুহূ‌র্তে বিনা‌শের দি‌কে যা‌চ্ছে । এই কথা‌টি শিখ‌তে হ‌বে না , বুঝ‌তে হ‌বে , অনুভব কর‌তে হ‌বে । অনুভব কর‌লে সুখাস‌ক্তি থাক‌বে না ।
0 comments

এক‌টি শিক্ষামূলক গল্প ( সাধু - স‌ন্তের শরণাগ‌তি )

এক গ্রা‌মে এক রাজপুত ছিল । তার আত্মীয় স্বজ‌নের ম‌ধ্যে এক‌টি ছে‌লে ছাড়া আর কেউ বেঁ‌চে ছিল না । সে সেই রাজপু‌তের বা‌ড়ি‌তে কাজ কর‌তে লাগল । প্র‌ত্যেক দিন ভো‌রে সে গোরু বাছুর চরা‌তে যেত আর ফি‌রে এ‌সে খাবার খেত । এইভাবে দিন কাটছিল ।

এক‌দিন দুপু‌রে সে গোরু চ‌রি‌য়ে ফি‌রে এ‌লে রাজপু‌তের প‌রিচারিকা তা‌কে ঠাণ্ডা রু‌টি খে‌তে দিল । তখন ছে‌লে‌টি বলল " একটু দই / ঘোল পে‌লে ভা‌লো হত । " প‌রিচা‌রিকা বলল -- " যা - যা তোর জন্য আবার এসব কর‌তে পারব না । যা , এম‌নিই খে‌য়ে নে , না খে‌লে তোর যা ইচ্ছা কর । " সেই ছে‌লে‌টির তখন খুব রাগ হ‌লো , সে ভাবল যে আ‌মি এত রো‌দে গোরু চ‌রি‌য়ে এলাম , একটু দই চাইলাম তো মুখ ঝাম্ টা দিল । সে ক্ষি‌ধে নি‌য়েই সেখান থে‌কে চ‌লে গেল ।

গ্রা‌মের কা‌ছেই এক‌টি শহর ছিল । সেই শহরে এক‌টি সাধু‌দের দল এ‌সে‌ছিল । ছে‌লেটি সেইখানে চ‌লে গেল । সাধুরা তাকে খে‌তে দিল আর জিজ্ঞাসা করল - " তোমার সংসা‌রে কে কে আ‌ছে ? " সে বলল , " কেউ নেই । " তখন সাধুরা বলল - " তু‌মি সাধু হ‌য়ে যাও । " ছে‌লে‌টি সাধু হ‌য়ে গেল । প‌রে সে পড়া‌শোনা ক‌রার জন্য কাশী গেল । সেখা‌নে লেখাপড়া শিখে খুব বিদ্বান হ‌লো । ক‌য়েক বছর প‌রে সে মণ্ড‌লেশ্বর ( মোহন্ত ) নির্বা‌চিত হল । মণ্ড‌লেশ্বর হবার পর এক‌দিন তার সেই পুরা‌নো শহর থে‌কে নিমন্ত্রণ এ‌লো । সেই সাধু‌টি তখন নি‌জের মণ্ডলীর সাধু‌দের নি‌য়ে সেখা‌নে এ‌লেন ।

যে রাজপু‌তের কা‌ছে তি‌নি আ‌গে কাজ কর‌তেন , সেই রাজপুত বৃদ্ধ হ‌য়ে‌ছি‌লো । সেই রাজপুত তাঁর কা‌ছে এ‌সে সৎসঙ্গ কর‌লেন এবং প্রার্থনা জানা‌লেন - " মহারাজ ! একবার আমার কু‌টি‌রে পদার্পণ করুন , যা‌তে আমার কু‌টির প‌বিত্র হয় । " মণ্ড‌লেশ্বর সেই নিমন্ত্রণ গ্রহণ কর‌লেন ।

মণ্ড‌লেশ্বর তাঁর মণ্ডলীর সাধু‌দের নি‌য়ে রাজপু‌তের গৃ‌হে গে‌লেন । খাবার সময় হ‌লে পং‌ক্তি ভোজ‌নের ব্যবস্থা হ‌লো এবং সক‌লে মি‌লে খে‌তে বস‌লেন । গীতার পঞ্চদশ অধ্যায় পাঠ করা হ‌লো এবং তারপরে সক‌লে খে‌তে শুরু কর‌লেন । মহারা‌জের সাম‌নে নানাপ্রকার সুখাদ্য থ‌রে থরে সাজা‌নো ছিল । সেই রাজপুত মণ্ড‌লেশ্বর মহারা‌জের কা‌ছে এ‌লেন , তাঁর স‌ঙ্গে তাঁর প‌রিচারক হা‌তে হালুয়ার পাত্র নি‌য়ে এ‌লো ।

রাজপুতও মহারা‌জকে অনু‌রোধ কর‌তে লাগলেন যা‌তে তি‌নি অনন্তঃ একটু হালুয়া তাঁর হাত থে‌কে নেন । মহারাজ তাই‌তে হে‌সে ফেল‌লেন । তাঁর হা‌সি দে‌খে রাজপুত আশ্বর্যান্বিত হ‌য়ে জিজ্ঞাসা কর‌লেন , " আপ‌নি হাস‌ছেন কেন ? " মহারাজ বল‌লেন , " আমার একটা পুরা‌নো কথা ম‌নে প‌ড়ে হা‌সি পেল । " রাজপুত জিজ্ঞাসা কর‌লেন , " কি কথা , আমাকে বলুন ! "

মহারাজ তখন সবাই‌কে উ‌দ্দে‌শ্য ক‌রে বল‌লেন , " ও‌হে , তোমরা একটু অ‌পেক্ষা ক‌রো , ব‌সো , জ‌মিদার এক‌টি পু‌রো‌নো কথা জান‌তে চাই‌ছেন , তাই ব‌লি শো‌নো । " মহারাজ রাজপুত‌কে জিজ্ঞাসা কর‌লেন , " আপনার জ্ঞা‌তির একজন আপনার স‌ঙ্গে থাকত , সেই প‌রিবা‌রের কেউ আ‌ছে কি ? " রাজপুত বল‌লেন , " এক‌টি ছে‌লে শুধু ছিল , সে কিছু‌দিন গোরু চরাত , তারপর কি জা‌নি কোথায় চ‌লে গেল ! অ‌নেক‌দিন হ‌য়ে গেল , আর সে ফি‌রে এ‌লো না । "

মহারাজ বল‌লেন , " আমিই সেই ছে‌লে ! কা‌ছেই এক সাধুমণ্ডল এ‌সে‌ছি‌লো , আ‌মি সেখানেই গি‌য়ে‌ছিলাম । প‌রে কাশী চ‌লে যাই , সেখা‌নে লেখাপড়া শি‌খে প‌রে মণ্ড‌লেশ্বর হ‌য়ে‌ছি । এই সেই দালান , এখা‌নেই এক‌দিন আপনার বা‌ড়ির প‌রিচা‌রিকা আমাকে সামান্য একটু দই দি‌তে আপ‌ত্তি ক‌রে‌ছিল । আজ সেই আমিই আর এই সেই দালান , আপ‌নিও সেই একই ব্য‌ক্তি , যি‌নি নি‌জের হাতে আমা‌কে মোহন‌ভোগ দি‌য়ে বল‌ছেন যে দয়া ক‌রে আ‌মি যেন আপনার হাত থে‌কে একটু মোহন ভোগ খাই ! "

" চাই‌লে পাওয়া যায় না ঘোল , তবু হলাম ধন্য ।

গলায় বা‌ধে মোহন ভোগ এ‌তো সাধু স‌ঙ্গের পুণ্য ।। "

সাধু‌দের শরণ গ্রহণ কর‌লে এমনই হয় যে , যেখা‌নে সামান্য ঘোল পাওয়া যায় না , সেখা‌নে মোহন ভোগও গলায় আট‌কে যায় । য‌দি কেউ ভগবা‌নের শরণ গ্রহণ ক‌রেন তাহ‌লে তি‌নি সাধু‌দেরও বরণীয় হ‌য়ে ও‌ঠেন । লক্ষপ‌তি বা কো‌টিপ‌তি হ‌লে নয় , ভগবানের শরণাগত হ‌লে , ভগবানের ভক্ত হ‌লে ত‌বেই স্বাধীন হওয়া যায় এবং তা একমাত্র মনুষ্যজ‌ন্মেই সম্ভব ।

ম‌নে রাখা দরকার যে , আমরা একজন ব্য‌ক্তির বাই‌রে দে‌খে বিচার ক‌রি কিন্তু তার মধ্যে কি আ‌ছে তা আমরা জা‌নি না । তাই যে যেমনই হোক না কেন কাউ‌কে নিচু বা খারাপ ম‌নে করা উ‌চিত নয় । যেমন আ‌জ যে সাধারণ সে হয়ত একজন ডাক্তার হ‌বে আর চি‌কিৎসা করার জন্য তার কা‌ছে যে‌তে হ‌বে । যার জন্ম যেমনই হোক না কেন মানুষ তার ক‌র্ম্মে প‌রিচিত হয় ।

 (c) Joy Shree Radha Madhav
0 comments

মানুষ কর্ম কর‌লে আবদ্ধ হয় না , প্রত্যুত " অন্যত্র কর্ম " কর‌লে অর্থাৎ নি‌জের জন্য কর্ম কর‌লে আবদ্ধ হয়

মানুষ কর্ম কর‌লে আবদ্ধ হয় না , প্রত্যুত " অন্যত্র কর্ম " কর‌লে অর্থাৎ নি‌জের জন্য কর্ম কর‌লে আবদ্ধ হয় । মানুষ কর্মবন্ধন থে‌কে তখনই মুক্ত হ‌তে সক্ষম হয় , যখন সে জগৎসংসার থে‌কে প্রাপ্ত শরীর , বস্তু , যোগ্যতা এবং সামর্থ্য জগ‌তেরই সেবায় নি‌য়ো‌জিত ক‌রে এবং তার প‌রিবর্তে কো‌নো কিছু আশা না ক‌রে , কেননা আমরা প্রকৃতপ‌ক্ষে যা চাই জগৎ আমা‌দের তা দি‌তেই পা‌রে না ।

আমরা সুখ চাই , অমরত্ব চাই , নি‌শ্চিন্ততা চাই , নির্ভয় হ‌তে চাই , স্বাধীনতা চাই । কিন্তু এসব সংসার থে‌কে পাওয়া সম্ভব নয় । সংসার থে‌কে সম্পর্ক ছেদ হ‌লেই তা পাওয়া সম্ভব । সংসা‌রের স‌ঙ্গে সম্পর্ক বি‌ছিন্ন করার জন্য আমা‌দের উ‌চিত সংসার থে‌কে প্রাপ্ত বস্তু সংসা‌রের সেবা‌তেই নি‌য়োগ করা ।

সৎ - অসৎ - এর বিচার করায় অসমর্থ পশু - পক্ষী - বৃক্ষ ইত্যা‌দির দ্বারা স্বাভা‌বিক প‌রোপকার ( কর্তব্য ) পালিত হয় । কিন্তু মানুষ ভগবৎ - কৃপায় বি‌শেষভা‌বে বি‌বেচনা করার শ‌ক্তি ( বি‌বেক ) লাভ ক‌রে‌ছে । সুতরাং সে য‌দি নিজ বি‌বেচনা‌কে ( বি‌বেক‌কে ) গুরুত্ব দি‌য়ে কো‌নোরূপ অকর্তব্য না ক‌রে , ত‌বে তার দ্বারা স্বাভা‌বিকভা‌বেই লোক - হিতার্থ কর্ম হওয়া সম্ভব ।


ব্রহ্মা মানুষ‌কে বল‌লেন , " তোমরা নি‌জে‌দের কর্তব্য পালন দ্বারা সব‌কিছুর বৃ‌দ্ধি‌তে সহায়তা ক‌রো , উন্ন‌তি‌তে সাহায্য ক‌রো । এরূপ কর‌লে তোমরা কর্তব্যকর্ম করার উপ‌যোগী সামগ্রী পে‌তে থাক‌বে , কখনো তার অভাব হ‌বে না । " ভগবা‌নের নি‌র্দে‌শে এবং তাঁর শ‌ক্তি‌তে ব্রহ্মা প্রজা সৃ‌ষ্টি ক‌রেন । সুতরাং মূল স্রষ্টা প্রকৃতপ‌ক্ষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণই । নিষ্কামভা‌বে অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের জন্য কর্ম কর‌লে মানুষ মুক্ত হ‌য়ে যায় এবং সকামভা‌বে অর্থাৎ শুধুমাত্র নি‌জের জন্য কর‌লে মানুষ বন্ধন দ্বারা আবদ্ধ হ‌য়ে প‌ড়ে । কেননা সকামক‌র্মে ফ‌লের আশায় থাকায় সেই ফল ভোগ কর‌তে হয় তাই সকামকর্ম বন্ধনের কারণ ।

প্রকৃতপ‌ক্ষে চিন্তা কর‌লে দেখা যায় , বর্তমান মানব সমা‌জে আমা‌দের উন্ন‌তি থে‌কে অবন‌তি বে‌শি হয় । কেননা প্রথমত মিথ্যা কথা বলা , হিংসা , লোভ - লালসা , অহংকার , ক্রোধ ইত্যা‌দির বি‌ভিন্ন কার‌ণে আমরা অপর‌কে কষ্ট দি‌য়ে থা‌কি । ফ‌লে অপ‌রের তো ক্ষ‌তি হয়ই বরং নি‌জের বে‌শি ক্ষ‌তি হ‌য়ে যায় । আমরা চিন্তা না ক‌রে কর্ম ক‌রি । প‌রে অনুশোচনা কর‌তে হয় ।

মানু‌ষের শরীর প্রকৃতপ‌ক্ষে ভোগসু‌খের জন্য নয় । তাই " সাংসা‌রিক সুখ‌ভোগ ক‌রো " -- এরূপ নি‌র্দেশ বা বিধান কো‌নো সৎ - শা‌স্ত্রে নেই । সমাজও যেমন সুখ ভোগ করার নি‌র্দেশ দেয় না । শাস্ত্র এবং সমাজ অপর‌কে সুখী করার নি‌র্দেশই দি‌য়ে থা‌কে । কিন্তু আমরা কতটা কর‌তে পা‌রি সেটা আমাদের উপর নির্ভর ক‌রে । অপ‌রের উপকার কর‌লে নি‌জের কোন ক্ষ‌তি হয় না । যতটুকু সম্ভব সক‌লের সেবা করার কর্তব্য ।

কর্ম‌যোগী সর্বদা দেওয়ার ভাবই পোষণ ক‌রেন , গ্রহণ করার নয় । শুধু টাকা দি‌য়ে সাহায্য কর‌তে হ‌বে এমন নয় , কত কর্ম আ‌ছে যা টাকা ছাড়াও করা যায় । য‌দি আমাদের অপর‌কে কিছু দেওয়ার প‌রিবর্তে নি‌জের স্বা‌র্থের জন্য কিছু গ্রহণ ক‌রার ইচ্ছা থা‌কে তাহ‌লে তা কল্যানপ্রাপ্তি‌তে বাধা দেয় এবং তার স‌ঙ্গে সাংসা‌রিক বস্তুসামগী প্রা‌প্তি‌তেও অন্তরা‌য়ের সৃ‌ষ্টি হয় । প্রায় সক‌লেই অনুভব ক‌রে যে সংসা‌রে যারা চা‌হিদা পোষণ ক‌রে তা‌দের কেউই কিছু দি‌তে চায় না । তাই ব্রহ্মা ব‌লে‌ছেন যে , কো‌নো কিছুর আশা না ক‌রে নিঃস্বার্থভা‌বে কর্তব্যপালন কর‌লেই মানুষ নিজ উন্ন‌তি ( কল্যাণ ) সাধন কর‌তে সক্ষম হয় ।

কেউ আমার উপকার করুক বা না করুক , আমার কর্তব্য হল তা‌কে সেবা করা । এখা‌নে শুধু পদ‌সেবার কথা বলা হয়‌নি , অ‌নেক রকম সেবা করা যায় । অ‌ন্যে কী ক‌রে , কী ক‌রে না , আমা‌কে সুখ দেয় , না দেয় দুঃখ দেয় এসব আমার দেখার দরকার নেই , কারণ অপ‌রের কর্ত‌ব্যের খোঁজ যে ক‌রে সে নিজ কর্তব্য হ‌তে বিচ্যুত হয় । প‌রিণা‌মে তার পতন ঘ‌টে । অন্য‌কে দি‌য়ে কর্তব্যপালন করা‌নো আমার অ‌ধিকার নয় । সক‌লের হিতা‌র্থে শুধু আমা‌দের নি‌জের নিজের কর্তব্যপালন কর‌তে হ‌বে যা‌তে সবাই সুখী হয় । সেবা করার সময় নি‌জের বু‌দ্ধি , সামর্থ্য , সময় এবং বস্তুসামগ্রী পুর‌োপু‌রিভা‌বে অপ‌রের হিতা‌র্থে নি‌য়োগ করা চাই অর্থাৎ যৎ‌কি‌ঞ্চিৎও নি‌জের জন্য অ‌বশিষ্ট রূ‌পে রাখা উ‌চিত নয় ।

🌹🌹 জয় শ্রীরা‌ধে 🌺🌺
==============


(c)  Joy Shree Radha Madhav
0 comments

একাগ্রভা‌বে গবানকে স্মরণ কর‌তে হ‌বে, তবেই ভগবানের সাক্ষাৎ পাবেন ।

কেউ যেমনই অজ্ঞানী অথবা মূর্খ হোক না কেন , য‌দি সে ঈশ্ব‌রের অনন্যভ‌ক্তি কর‌তে শুরু ক‌রে বা জ্ঞানী মহাত্মার কা‌ছে গমন ক‌রে কিছু শ্রবণ ক‌রে আর তদনুসা‌রে আচরণ শুরু ক‌রে তাহ‌লে সেও পরমপদ পে‌তে পা‌রে । অর্থাৎ শ্রবণ তারপর নি‌র্দেশ অনুসা‌রে চল‌লে জীবন ধী‌রে ধী‌রে প‌রিবর্তন হ‌তে থাক‌বে ফ‌লে পারমা‌র্থিক জীব‌নে এ‌গি‌য়ে যাওয়া যা‌বে ।

মূর্খ হ‌লেও চিন্তা নেই তা‌কে মহাত্মা বা স্বয়ং ভগবানই জ্ঞান দান কর‌তে পা‌রেন । পাপী , মূর্খ হ‌লেও আয়ুর অল্পকাল অবশিষ্ট থাক‌লেও ভগবা‌নের কৃপায় মু‌ক্তি হতে পা‌রে । কেবল এক‌টি কাজ কর‌তে হ‌বে । " ভগবান আ‌ছেন " --- এই সুদৃঢ় বিশ্বাস নি‌য়ে ওঠা বসা , ক্ষুধা - তৃষ্ণা নিবারণ , চলা - ফেরা , শোওয়া - জাগ‌রণ সবসময় সতত ভগবান‌কে স্মর‌ণে রাখ‌তে হ‌বে ।

ধরুন , পরীক্ষা ১ বছর পর হ‌বে । এখন আ‌মি কি করলাম আজ যে পড়া ছিল চিন্তা করলাম আগামীকাল পড়ব , আগামীকাল বললাম পরশু পড়ব , এমন কর‌তে করতে পরীক্ষা চ‌লে এ‌লো । সারাবছর তো পড়া হয়‌নি তাই পরীক্ষার আ‌গের দিন কিছু প‌ড়ে নি‌লে অনন্তপ‌ক্ষে পরীক্ষার দিন কিছু লিখ‌তে পার‌বে হয়ত পাসও হ‌য়ে যা‌বে । তেম‌নি সারা‌দিন থে‌কে কিছু সময় ভগবা‌নের নাম স্মর‌ণে ব্যস্ত রাখ‌লে অ‌ন্তি‌মে ভা‌লো কিছু হ‌বেই ।

আপ‌নি বল‌বেন যে নিদ্রাগমন কা‌লে তো ভগবান‌কে স্মরণ হয় না । তাহ‌লে বলব য‌দি দি‌নে ভগবা‌নের স্মরণ - মনন চ‌লে তাহ‌লে রা‌ত্রেও তা অব্যাহত থাক‌বে কারণ যে কার্য দি‌নে করা হয় তা রা‌ত্রেও স্ব‌প্নে আস‌তে থা‌কে । রা‌ত্রিকা‌লে স্মরণ যা‌তে হয় তার একটা সহজ উপায় আ‌ছে । শয়নকা‌লে শু‌য়েও তা করা যে‌তে পা‌রে । দশ - প‌নে‌রো মিনিট জাগ‌তিক সংকল্প প্রবাহ থে‌কে দূ‌রে গি‌য়ে ভগবা‌নের নাম রূপ স্মরণ ক‌রে ও তাঁর লীলাসকল মনন কর‌তে কর‌তে ঘু‌মি‌য়ে পড়ুন । তা‌তে রা‌ত্রে ভগবা‌নের স্মরণ হ‌তে থা‌কবে ।

হ্যাঁ ত‌বে লীলা সকল একাগ্রভা‌বে স্মরণ কর‌তে হ‌বে । প্রিয়া যেমন প্রিয়ার প্র‌তি একাগ্র থা‌কে তেম‌নি আপ‌নিও ভগবা‌নের প্রে‌মের প্র‌তি একাগ্র থে‌কে লীলা সকল স্মরণ কর‌বেন । আসল কথা যে , সতত ভগবান‌কে ম‌নে রাখুন , কখ‌নো তাঁ‌কে ভু‌ল‌বেন না । য‌দি ত্রিভুব‌নের রাজ্যলাভও হয় সে‌টিও অ‌তি নগন্য ম‌নে ক‌রে ত্যাগ কর‌বেন কিন্তু ভগবানের স্মরণ - মনন ছাড়‌বেন না । য‌দি কখ‌নো ভগবা‌নের বিস্মরণ না হয় আর যার একমাত্র ভগবানই পরম‌প্রিয় ও সর্বস্ব , সেই ধন্য ।

শ্রীমদ্ভাগব‌তে বলা আ‌ছে --

‌ত্রিভুব‌বিভব‌হেত‌বেহপ্যকুন্ঠস্মৃ‌তির‌জিাত্মসুরা‌দি‌ভি‌র্বিমৃগ্যাৎ ।

ন চল‌তি ভগবৎপদার‌বিন্দাল্লব‌নি‌মিষার্ধম‌পি যঃ স বৈষ্ণবাগ্র্য়ঃ ।।

‌বিসৃ‌জ‌তি হৃদয়ং ন যস্য সাক্ষাদ্ধ‌রিরবশা‌ভি‌হিতোহপ্যঘৌঘনাশঃ ।

প্রণয়রশনয়া ধৃতাঙ্‌ঘ্রিপদ্মঃ স ভব‌তি ভাগবতপ্রধান উক্তঃ ।। ( ১১ \ ২ \ ৫৩ , ৫৫ )

" ত্রিভুব‌নের রাজ্য‌বৈভ‌বের জন্য যার ভগবৎ‌চিন্তা বি‌ঘ্নিত হয় না , যে ভগবা‌নেরই মন স‌ন্নি‌বিষ্টকারী , দেবতা‌দি দ্বারা কা‌ঙ্ক্ষিত ভগবৎ চরণকম‌লের স্মর‌ণে মুহূ‌র্তের জন্যও বিচ্যুত হয় না , সেই ভগবদ্ভ‌ক্ত‌দের ম‌ধ্যে অগ্রগণ্য হয় । বিবশ হ‌য়ে নাম উচ্চারণকারীরও যি‌নি সম্পূর্ণ পাপ ধ্বংস ক‌রেন , সেই সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম পর‌মেশ্বর ভক্ত‌কে কখ‌নো ত্যাগ কর‌তে পা‌রেন না কারণ তাঁর পাদপদ্ম ভ‌ক্তের প্রেম রজ্জু দ্বারা আবদ্ধ থা‌কে । তা‌কেই ভগবদ্ভক্ত‌দের ম‌ধ্যে শ্রেষ্ঠ বলা হয় । "

 (c) Joy Shree Radha Madhav
0 comments

সংস‌ার ও ভগবান

এই দুই‌য়ের সম্পর্ক দুপ্রকা‌রের । সংসা‌রের স‌ঙ্গে শুধু মে‌নে নেওয়া সম্পর্ক আর ভগবা‌নের স‌ঙ্গে সম্পর্ক বাস্ত‌বিক । সাংসা‌রিক সম্পর্ক মানুষ‌কে পরাধীন ক‌রে , গোলাম বানায় , ভগবা‌নের সম্পর্ক মানুষ‌কে স্বাধীন ক‌রে , চিন্ময় ক‌রে ।

‌কোনো বিষ‌য়ে নি‌জের ম‌ধ্যে কো‌নো বৈ‌শিষ্ট্য দেখা হল প্রকৃতপ‌ক্ষে পরাধীনতা । মানুষ য‌দি বিদ্যা , বু‌দ্ধি , ধন - সম্প‌ত্তি , ত্যাগ , বৈরাগ্য ইত্যা‌দি কো‌নো বিষ‌য়ের জন্য নি‌জে‌কে বি‌শিষ্ট ব‌লে ম‌নে ক‌রে তাহ‌লে প্রকৃতপ‌ক্ষে তা ওই বিদ্যা ইত্যাদিরই পরাধীনতা , দাসত্ব হ‌য়ে থাকে ।
যেমন ,‌ কেউ য‌দি অ‌র্থের জন্য নি‌জে‌কে বি‌শিষ্ট ব‌লে ম‌নে ক‌রে , তাহ‌লে সেই বৈ‌শিষ্ট্য অ‌র্থেরই , মানুষ‌টির নয় । সে নি‌জে‌কে অ‌র্থের মা‌লিক ম‌নে কর‌লেও , আস‌লে সে অ‌র্থের গোলাম ।

সংসা‌রের বৈ‌শিষ্ট্যই হল যে সাংসা‌রিক কো‌নো বস্তু নি‌য়ে যে ব্য‌ক্তি নি‌জে‌কে বি‌শেষ কিছু ব‌লে ম‌নে ক‌রে , সেই বস্তু‌টিই তাকে তুচ্ছ ক‌রে দেয় , পদদ‌লিত করে রা‌খে । কিন্তু যিনি ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের আ‌শ্রিত হ‌য়ে সর্বদা তাঁর ওপর নির্ভর করে থা‌কেন , তি‌নি নিজস্ব কো‌নো বৈ‌শিষ্ট্য দে‌খেন না , বরং ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই অ‌লৌ‌কিকত্ব , বি‌শেষত্ব ও বি‌চিত্র - ভাব প্রত্যক্ষ ক‌রেন ।


ভগবান তাঁ‌কে তাঁর মাথার মণি ক‌রে রাখুন , বা নি‌জের প্রভু করে নিন , তাহ‌লেও তার কো‌নো বিষ‌য়ে অহংভাব আসে না । এরূপ ভ‌ক্তের ম‌ধ্যে শ্রীকৃ‌ষ্ণের বি‌শেষ আ‌বির্ভূত হয় । কারও কারও ম‌ধ্যে এই বি‌শেষ ভাব এত বে‌শি দেখা যায় যে তাঁর শরীর , ই‌ন্দ্রিয় , মন , বু‌দ্ধি ইত্যা‌দি প্রাকৃত বস্তুগু‌লিও চিন্ময় হ‌য়ে ও‌ঠে । তাঁর ম‌ধ্যে জড়‌ত্বের একান্তই অভাব হয়ে যায় ।

এরূপ ভগবা‌নের কত প্রে‌মিক ভক্ত ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণে মি‌শে গে‌ছেন , শেষকা‌লে তাঁদের দেহও পাওয়া যায়‌নি । যেমন , ভ‌ক্তিম‌তি মীরা সশরী‌রে ভগবানের বিগ্র‌হে লীন হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছি‌লেন । কেবল চিহ্নরূ‌পে তাঁর শা‌ড়ির এক‌টি ছোট টুক‌রো বিগ্র‌হের মু‌খে আট‌কে ছিল , আর কিছুই ছিল না । এইভা‌বে সন্ত তুকারামও সশরী‌রে বৈকু‌ন্ঠে গমন ক‌রে‌ছি‌লেন ।

জ্ঞানমা‌র্গে শরীর চিন্ময়ত্ব লাভ ক‌রে না । কারণ জ্ঞানী অসৎ - এর স‌ঙ্গে সম্বন্ধ বি‌চ্ছেদ ক‌রে , অসৎ - এর থে‌কে পৃথক হ‌য়ে স্বয়ং চিন্ময় - ত‌ত্ত্বে স্থিত হন । কিন্তু ভক্ত যখন ভগবা‌নের সম্মুখীন হন , তখন তাঁর দেহ - মন - প্রাণ - ই‌ন্দ্রিয় সবই ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের সম্মুখীন হ‌য়ে যায় । তাৎপর্য হল এই যে , যাঁর দৃষ্টি‌তে চিন্ময় - তত্ত্ব ছাড়া জড়‌ত্বের কো‌নো পৃথক অ‌স্তিত্ব নেই , সেই চিন্ময়তা তাঁর শরীর ইত্যা‌দি‌তে প‌রিব্যাপ্ত হ‌য় এবং শরীরা‌দি চিন্ময়ত্ব লাভ ক‌রে । সাধারণ লো‌কে তাঁর শরী‌রে জড়ত্ব দেখ‌লেও , বাস্ত‌বে তাঁর শরীর চিন্ময় হ‌য়ে যায় ।

সর্ব‌তোভা‌বে ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের শরণাগত হ‌লে শ্রীকৃষ্ণের কৃপা শরণাগতের জন্য বি‌শেষভা‌বে প্রক‌টিত হয় , কিন্তু জগৎ‌কে স্নেহপূর্বক পালনকারিণী এবং শ্রীকৃ‌ষ্ণে অ‌ভিন্ন বাৎসল্যময়ী মাতা লক্ষ্মী‌দেবীর প্রভুর শরণাগত‌দের প্র‌তি কত স্নেহ , কত ভা‌লোবাসা , তার বর্ণনা কেউ কর‌তে পা‌রে না ।

সর্ব‌তোভা‌বে ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের শরণাগত হ‌লে শ্রীকৃষ্ণের কৃপা শরণাগতের জন্য বি‌শেষভা‌বে প্রক‌টিত হয় , কিন্তু জগৎ‌কে স্নেহপূর্বক পালনকারিণী এবং শ্রীকৃ‌ষ্ণে অ‌ভিন্ন বাৎসল্যময়ী মাতা লক্ষ্মী‌দেবীর প্রভুর শরণাগত‌দের প্র‌তি কত স্নেহ , কত ভা‌লোবাসা , তার বর্ণনা কেউ কর‌তে পা‌রে না । লৌ‌কিক ব্যবহা‌রেও দেখ‌া যায় যে প‌তিব্রতা স্ত্রী পিতৃভক্ত পুত্র‌কে অত্যন্ত ভা‌লোবা‌সেন ।

আমা‌দের ম‌নে রাখ‌তে হ‌বে যে , আমরা জড় জগতে মায়ার দ্বারা আবদ্ধ । ফ‌লে আমাদের বিবেক- বু‌দ্ধিও মায়ার দ্বারা আবদ্ধ । তাই জড় বু‌দ্ধি য‌দি যখন আমরা বিচার ক‌রি তা সবসময় স‌ঠিক হয় না । ভ্রমবশত আমা‌দের নানা প্রকার বস্তু‌তে দৃ‌ষ্টি আকর্ষণ হওয়ায় আমা‌দের বু‌দ্ধিও ভ্রষ্ট হয় । তাই ম‌নে রাখা উ‌চিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সকল কিছুর ঊ‌র্ধ্বে আর আমরা তাঁর সেবকমাত্র । তাই সর্বস্ব শ্রীকৃষ্ণ‌কে সমর্পণ ক‌রে একাগ্রতার সা‌থে জীবন অ‌তিবা‌হিত করা উ‌চিত ।


(c) Joy Shree Radha Madhav
0 comments

শরীর , ই‌ন্দ্রিয় , মন , বু‌দ্ধি , প্রাণ ইত্যা‌দি সব‌কিছু ভগবা‌নেরই , নি‌জের নয়

শরীর , ই‌ন্দ্রিয় , মন , বু‌দ্ধি , প্রাণ ইত্যা‌দি সব‌কিছু ভগবা‌নেরই , নি‌জের নয় । সুতরাং এ‌দের দ্বারা হওয়া ক্রিয়াগু‌লি‌কে ভ‌ক্তি‌যোগী কী ক‌রে নি‌জের ব‌লে ম‌নে কর‌বেন ? সেইজন্য তাঁর এই ভাব থা‌কে , ' ক্রিয়ামাত্রই ভগবা‌নের দ্বারা এবং ভগবা‌নের জন্যই হ‌চ্ছে , আ‌মি তো নি‌মিত্তমাত্র । ' শ্রীকৃষ্ণই নিজ ( আমার ) ই‌ন্দ্রি‌য়ের দ্বারা নি‌জেই সব ক্রিয়া কর‌ছেন - এই কথা‌টি ঠিকভা‌বে উপল‌ব্ধি করে সমস্ত ক্রিয়াগু‌লির কর্তা শ্রীকৃষ্ণ এরূপ স্বীকার করা হল উপ‌রের পদগু‌লির অর্থ ।


শরীরা‌দি বস্তুসকল নি‌জের নয় , বস্তুত এগু‌লি এখা‌নে প্রাপ্ত হ‌য়ে‌ছে এবং ছে‌ড়ে চ‌লে যা‌চ্ছে । এগু‌লি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্য , ভগবৎ প্রীতা‌র্থে অপ‌রের সেবা করার জন্যই পাওয়া গি‌য়ে‌ছে । এগু‌লির উপর আমা‌দের স্বতন্ত্র অ‌ধিকার নেই অর্থাৎ এগু‌লি আমরা নিজ ইচ্ছানুযায়ী রাখ‌তেও পা‌রি না , প‌রিবর্তন কর‌তেও পা‌রি না । সেইজন্যই এই শরীর ইত্যা‌দি‌কে এবং এর দ্বারা হওয়া কর্মসকল‌কে নি‌জের ব‌লে ম‌নে করা সততা নয় । অতএব মানুষ‌কে সততার স‌ঙ্গে , যাঁর বস্তু তাঁর ( অর্থাৎ শ্রীকৃ‌ষ্ণের ) ব‌লে মান‌তে হ‌বে । কারণ এই সমস্ত বস্তুই তাঁর ।

কর্ম‌যোগী তাঁর সমস্ত ক্রিয়া এবং পদার্থ " জগৎ - সংসার " - কে , জ্ঞানযোগী " প্রকৃ‌তি " - কে এবং ভ‌ক্তি‌যোগী " ভগবান শ্রীকৃষ্ণ‌কে " - কে অর্পণ ক‌রেন । প্রকৃ‌তি এবং সংসার - দু‌য়েরই প্রভু ভগবান । সুতরাং ক্রিয়া এবং পদার্থ সমস্ত শ্রীকৃষ্ণ‌কে অর্পণ করাই হল শ্রেষ্ঠতা । কো‌নো প্রাণী , পদার্থ , শরীর , ই‌ন্দ্রিয় , মন , বু‌দ্ধি , প্রাণ , ক্রিয়া ইত্যা‌দি‌তে বিন্দুমাত্র অনুরাগ , আকর্ষণ , আস‌ক্তি , গুরুত্ব , মমতা , কামনা ইত্যা‌দি না থাকাই হল সর্ব‌তোভা‌বে আস‌ক্তি ত্যাগ ।

শাস্ত্রীয় দৃ‌ষ্টি‌তে জন্ম - মৃত্যুর কারণ " অজ্ঞান " হ‌লেও সাধ‌নের দৃ‌ষ্টি‌তে আস‌ক্তি - ই জন্ম - মৃত্যুর প্রধান কারণ । অজ্ঞান ( জ্ঞা‌নের অভাব ) আস‌ক্তির ওপ‌রে স্থিত । সেইজন্য আ‌সক্তি চ‌লে গে‌লে অজ্ঞানও নাশ হয় । এই অনুরাগ বা আস‌ক্তি হ‌তেই কামনা উৎপন্ন হয় । কামনাই সমস্ত পা‌পের মূল । এইজন্য পা‌পের মূল কারণ আস‌ক্তি ত্যা‌গের কথা এখা‌নে বলা হ‌য়ে‌ছে । কারণ এ‌টি থাক‌লে মানুষ পা‌পের হাত থে‌কে রক্ষা পায় না আর এ‌টি না থাক‌লে মানুষ পা‌পে লিপ্ত হয় না ।

কো‌নো ক্রিয়া করার সময় ক্রিয়াজ‌নিত সুখ গ্রহণ কর‌লে বা তার ফ‌লে আসক্ত হ‌লে সেই ক্রিয়া হ‌তে সম্বন্ধ ত্যাগ হয় না , বরং আস‌ক্তি দূর হওয়ার প‌রিব‌র্তে আরো বে‌ড়ে যায় । কো‌নো ক্ষুদ্র বা বৃহৎ ক‌র্মের ফলস্বরূপ কো‌নো বস্তু কামনা করাই যে আস‌ক্তি তাই নয় , এমন‌কি ক্রিয়ার সময়ও আপনা‌তে মহত্ব বা ভা‌লোত্ব আ‌রোপ করা আর অন্য‌দের দি‌য়ে ভা‌লো বলা‌নোর ভাব পোষণ করাও আস‌ক্তিই ।

সেইজন্য নি‌জের জন্য কিছু কর‌তে নেই । যে কর্ম দ্বারা নি‌জের বিন্দুমাত্র সুখ পাবার ইচ্ছা হয় , সেই কৃতকর্ম নি‌জের জন্য হয়ে যায় । নিজ সুখ - সু‌বিধা এবং সম্মা‌নের ইচ্ছা সর্ব‌তোভা‌বে ত্যাগ ক‌রে কর্ম করাই উপ‌রিউক্ত পদগু‌লির অ‌ভিপ্রায় ।

এ‌টি অত্যন্ত লক্ষণীয় বিষয় যে , ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের শরণাগত হ‌য়ে ভ‌ক্তি‌যোগী সংসা‌রে থে‌কে ভগবা‌নে নি‌বে‌দিতভা‌বে কর্মসম্পন্ন কর‌লে কর্ম দ্বারা বন্ধনপ্রাপ্ত হন না । যেমন পদ্মপাতা জ‌লে উৎপন্ন হ‌য়ে , জ‌লে থে‌কেও জল থে‌কে নি‌র্লিপ্ত থা‌কে , তেম‌নি ভ‌ক্তি‌যোগী সংসারে থে‌কে সমস্ত ক্রিয়া কর‌লেও ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের শরণাগত হওয়ায় সংসা‌রে সর্বদা সর্ব‌তোভা‌বে নি‌র্লিপ্ত থা‌কেন ।

ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের প্র‌তি বিমুখ হ‌য়ে সংস‌া‌রের কামনা করাই সমস্ত পা‌পের প্রধান কারণ । কামনা উৎপন্ন হয় আ‌স‌ক্তি থে‌কে । তাই আ‌সক্তি সর্ব‌তোভা‌বে দূর হ‌লে কামনা থা‌কে না । আর তার ফ‌লে পাপ হওয়ার সম্ভাবনাও থা‌কে না । ধূম্রে অ‌গ্নির ন্যায় সকল ক‌র্মেই কো‌নো না কোনো দোষ যুক্ত থা‌কে । কিন্তু যি‌নি আশা , কামনা এবং আস‌ক্তি ত্যাগ ক‌রে‌ছেন , তাঁকে এই দোষগু‌লি স্পর্শ ক‌রে না । আস‌ক্তি র‌হিত হ‌য়ে ভগবা‌নের জন্য কর্ম কর‌লে এর প্রভাবে স‌ঞ্চিত সমস্ত পাপ বিলীন হ‌য়ে যায় । সুতরাং ভ‌ক্তি‌যোগীর কো‌নোভা‌বেই পা‌পের সঙ্গে সম্পর্ক থা‌কে না ।

" পা‌পেন " পদ‌টি কর্ম দ্বারা হওয়া সেই পাপ - পূণ্যরূপ ফ‌লের বাচক , যে‌টি পরবর্তী জন্ম আর‌ম্ভের কারণ হয় । ভ‌ক্তি‌যোগী সেই পাপ - পুণ্যরূপ ফলে কখ‌নো লিপ্ত হন না অর্থাৎ বন্ধনপ্রাপ্ত হন না ।

এখা‌নে সগুণ ঈশ্বর‌কে ' ব্রহ্ম ' বলার অর্থ হল যে ঈশ্বর সগুণ , নির্গুণ , সাকার , নিরাকার সবই ; কারণ তি‌নি সমগ্র । সমগ্রর ম‌ধ্যে সবই অন্তর্ভুক্ত । শ্রীমদ্ভাগব‌তেও ব্রহ্ম ( নির্গুণ - নিরাকার ) , পরমাত্মা ( সগুণ - নিরাকার ) এবং ভগবান ( সগুণ - সাকার ) এই তিন‌কে একই বলা হ‌য়ে‌ছে । তাৎপর্য এই যে " সগুণ " - এর ম‌ধ্যে ব্রহ্ম , পরমাত্মা এবং ভগবান - এই তিন‌টিই অন্তর্ভুক্ত , কিন্তু ' নির্গুণ ' - এর ম‌ধ্যে কেবল ব্রহ্মকেই ধরা হয় , কারণ নির্গু‌ণে গুণ নিষিদ্ধ । তাই নির্গুণ সী‌মিত আর সগুণ সমগ্র ।

‌বৈষ্ণবভক্তগণ সগুণ - সাকার ভগবা‌নের উৎসব‌কে " ব্রহ্মোৎসব " না‌মে অ‌ভি‌হিত ক‌রেন । অর্জুনও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ‌কে " ব্রহ্ম " না‌মে অ‌ভি‌হিত ক‌রেছেন - " পরং ব্রহ্ম পরং ধাম প‌বিত্রং পরমং ভবান্ " । গীতায় ব্রহ্ম‌কে তি‌ন‌টি না‌মে অ‌ভি‌হিত করা হয়ে‌ছে __ " ওঁ " , " তৎ " , এবং " সৎ " । নাম - নামীর স‌ঙ্গে সম্প‌র্কিত হওয়ায় এ‌টি সগুণ ।

 (C) Joy Shree Radha Madhav
0 comments

ভগবদ্ভক্ত প্রহ্লাদের গু‌ণের বর্ণন‌

                                                      ওঁ ন‌মো ভগব‌তে বাসু‌দেবায়


দেব‌র্ষি নারদ বল‌লেন ---- হে যু‌ধি‌ষ্ঠির ! দৈত্যরাজ হিরণ্যক‌শিপুর বড়ই অদ্ভূত চার‌টি পুত্র ছিল । তা‌দের ম‌ধ্যে প্রহ্লাদ সর্ব - ক‌নিষ্ঠ হ‌লেও গুণবত্তায় শ্রেষ্ঠ ছি‌লেন । তি‌নি দ্বিজভক্ত , সৌম্যস্বভাব , সত্যপ্রতিজ্ঞ , জি‌তে‌ন্দ্রিয় , সর্বভূ‌তের প্র‌তি আত্মবৎ দৃষ্টিসম্পন্ন , সর্বজন‌প্রিয় এবং জীবকু‌লের প্রকৃত হি‌তৈষী ছি‌লেন ।

মান্যজ‌নের চর‌ণে সেব‌কের ম‌তো প্রণত থাক‌তেন । দ‌রিদ্র‌দের প্র‌তি তাঁর ছিল পিতৃসম স্নেহ । সমবয়সী‌দের তি‌নি ভ্রাতৃসম প্রী‌তির চ‌ক্ষে দেখতেন । আর গুরুজন‌দের তো ভগবা‌নের ম‌তো ভ‌ক্তি কর‌তেন । বিদ্যা , ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যসম্পন্ন এবং উচ্চকুলজাত হওয়া স‌ত্ত্বেও অহংকার এবং ঔদ্ধ‌ত্যের লেশমাত্রও তাঁর ম‌ধ্যে ছিল না ।

মহৎ দুঃ‌খেও তিনি তিলমাত্র ভীত হ‌তেন না । ইহ‌লোক এবং পর‌লো‌কের সকল বিষয়ে তাঁর প্রভূত দেখা এবং শোনা অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞান ছিল কিন্তু সেসবই তি‌নি অসার এবং অসত্য ব‌লে ম‌নে কর‌তেন । সেইজন্য তাঁর ম‌নে কো‌নো বস্তুর প্র‌তি আকাঙ্ক্ষা ছিল না । তাই তাঁ‌র চিত্তে কো‌নো প্রকার কামনার উ‌দ্রেক হত না । অসুরকু‌লে জন্ম হওয়া স‌ত্ত্বেও তার ম‌ধ্যে আসু‌রিক প্রবৃ‌ত্তির লেশমাত্রও ছিল না ।

ভগবান যেমন অনন্তগুণসম্পন্ন , প্রহ্লা‌দেরও তেমন গুণাব‌লির কোনো সীমা ছিল না । যু‌গে যু‌গে মহাত্মা এবং ক‌বিবৃন্দ তাঁ‌কে আদর্শ হিসা‌বে গ্রহণ ক‌রে তাঁর চ‌রিত্র বর্ণনায় ব্রতী হ‌য়ে‌ছেন কিন্তু অদ্যাব‌ধি তাঁর মাহা‌ত্ম্যের সীমা নির্ণয় কর‌তে পা‌রেন‌নি ।

হে যু‌ধি‌ষ্ঠির ! সাধারণভা‌বে দেবগণ অসুর‌দের শত্রু তবু্ও ভগবদ্ভক্তদের চরিত্রগাথা শোনার জন্য আহূত সভায় তাঁরা অন্যভক্ত‌দের প্রহ্লা‌দের স‌ঙ্গে তুলনা ক‌রে তাঁ‌দের সম্মান প্রদর্শন ক‌রেন । অতএব আপনার ম‌তো অজাতশত্রু ভগবদ্ভক্ত যে তাঁর সম্মান কর‌বেন এ‌তে আর স‌ন্দেহ কী ?

তাঁর ( প্রহ্লা‌দের ) ম‌হিমা বর্ণনা করার জন্য অগ‌ণিত গুণরাশির কীর্তন বা শ্রব‌ণের কোনো প্র‌য়োজন নেই । ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের চর‌ণে জন্মগত স্বাভাবিক ভা‌লোবাসা - তাঁর ম‌হিমা প্রকা‌শের জন্য এই এক‌টি গুণই য‌থেষ্ট ।

হে যু‌ধি‌ষ্ঠির ! প্রহ্লাদ বাল্যকা‌লেই খেলাধুলা ত্যাগ ক‌রে ভগবানের ধ্যা‌নে তন্ময় হ‌য়ে নিশ্চলভা‌বে অবস্থান কর‌তেন । শ্রীকৃ‌ষ্ণের অনুগ্রহ তাঁর হৃদয়‌কে এমনভা‌বে আচ্ছন্ন ক‌রে রে‌খে‌ছিল যে জাগ‌তিক ( সুখ দুঃ‌খের ) কোনো বোধই তাঁর থাকত না । তাঁর ম‌নে হত যে ভগবান সকল সময় তাঁ‌কে নি‌বিড় অা‌শ্লে‌ষে বেঁ‌ধে রে‌খে‌ছেন তাই তাঁর শোওয়া - বসা , খাওয়া - জলপান , হাঁটা - চলা বা কথা বলার সম‌য়েও - এসব বিষ‌য়ের সম্প‌র্কে কো‌নো বোধই থাকত না ।

কখ‌নো কখ‌নো " এই বু‌ঝি ভগবান আমায় ছে‌ড়ে চ‌লে গে‌লেন " - এই ম‌নে ক‌রে তাঁর হৃদয় দুঃ‌খে এতটাই কাতর হত যে , তি‌নি উ‌চ্চৈঃস্ব‌রে ক্রন্দন কর‌তেন । আবার কখ‌নো অন্তরে ভগবান‌কে নি‌বিড়ভাবে অনুভব করে এতই আন‌ন্দিত হ‌তেন যে হা হা ক‌রে হে‌সে উঠ‌তেন । কখ‌নো ভগব‌চ্চিন্তায় এতই মধুর আ‌বে‌শে আ‌তিষ্ট হ‌তেন যে তি‌নি গাই গাই‌তেন ।

কোনোসময় হঠাৎ উৎক‌ন্ঠিত হয়ে চিৎকার ক‌রে উঠ‌তেন । কখ‌নো লোকলজ্জ‌া ত্যাগ ক‌রে প্রেমভরে নৃত্য কর‌তেন । আবার কখনো বা ভগবা‌নের লীলা চিন্ত‌নে এমন মগ্ন হ‌য়ে যে‌তেন যে নি‌জেকেই হা‌রি‌য়ে ফে‌লে ভগবা‌নের অনুকরণ কর‌তে আরম্ভ কর‌তেন । কখ‌নো অন্ত‌রে ভগবা‌নের কোমল স্প‌র্শ অনুভব ক‌রে আনন্দমগ্ন চি‌ত্তে নির্বাক হ‌য়ে শান্তভা‌বে ব‌সে থাক‌তেন । সেইসময় তি‌নি পুল‌কে রোমা‌ঞ্চিত হ‌তেন । ভা‌বে বি‌ভোর অর্ধ - নিমী‌লিত নে‌ত্রে অ‌বিচল প্রে‌মের আনন্দাশ্রু টলমল করত ।

ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের চরণকম‌লে এইরকম ঐকা‌ন্তিক ভ‌ক্তি একমাত্র ভগবদ্ভক্ত নি‌ষ্কিঞ্চন মহাত্মা‌দের সঙ্গ কর‌লেই লাভ করা যায় । কৃষ্ণ‌প্রে‌মে তি‌নি পরমান‌ন্দে মগ্ন থাক‌তেন এবং সেইসব দুর্ভাগ্য ব্য‌ক্তি যারা কুসঙ্গে প‌ড়ে মান‌সিকভা‌বে অত্যন্ত দীন হীন , তা‌দেরও বারবার শা‌ন্তি প্রদান কর‌তেন ।

যু‌ধি‌ষ্ঠির ! প্রহ্লাদ ভগবা‌নের পরম প্রে‌মিক ভক্ত , অত্যন্ত ভাগ্যশালী এবং উচ্চ‌কো‌টির মহাত্মা পুরুষ ছি‌লেন । হিরণ্যক‌শিপু এইরকম ধা‌র্মিক পুত্র‌কে অপরাধী ঘোষণা ক‌রে তাঁর অ‌নিষ্ট করার চেষ্টা কর‌তে লাগলেন ।

(C)  Joy Shree Radha Madhav
0 comments

শ্রীকৃ‌ষ্ণের না‌মের ম‌হিমা - শেষ পর্ব

তখন যমরাজ চিন্তা কর‌লেন , নারদজী কৃষ্ণনাম সবসময় নেন , হ‌রিনাম প্রচার ক‌রেন । নারদজী‌কে জিজ্ঞাসা কর‌তে হবে কি করা যায় এ‌কে নি‌য়ে । তখন যমরাজ নারদ‌ মু‌নি‌কে স্মরণ কর‌লেন আর নারদ মু‌নি হা‌তে বীণা বাজা‌তে লাগ‌লেন আর " নারায়ণ নারায়ণ " বল‌তে বল‌তে হা‌জির হ‌লেন ।

নারদ মু‌নি বল‌লেন , কি প্র‌য়োজ‌নে স্মরণ কর‌লেন । যমরাজ নারদ‌কে জিজ্ঞাসা কর‌লেন , " আপ‌নি তো কৃষ্ণনাম জপ করেন " । নারদ মু‌নি বল‌লেন , " হ্যাঁ ক‌রি " । যমরাজ বল‌লেন , একটা সমস্যা তৈ‌রি হ‌য়ে‌ছে । এই ব্য‌ক্তি জীবনভর পাপ করে‌ছে কিন্তু একবার " কৃষ্ণ " নাম নি‌য়ে‌ছে , এখন এ‌কে নি‌য়ে কি করব । আপ‌নি বলুন নারদজী ।

নারদ মু‌নি বল‌লেন , আ‌মি হ‌রিনাম ক‌রি , নারায়‌ণের নাম নিই ঠিক কিন্তু এই ব্য‌ক্তি পাপও ক‌রে‌ছে আবার " কৃষ্ণ " নামও নি‌য়ে‌ছে , কি করা যায় তার সমাধান আমার কা‌ছে নেই । নারদ চিন্ত‌া ক‌রে বল‌লেন , মহা‌দেব তো ধ্যান ক‌রেন হয়ত তি‌নি জান‌বেন । তখন যমরাজ মহা‌দেব‌কে স্মরণ কর‌লেন , মহা‌দেব হা‌তে ত্রিশূল নি‌য়ে হাজির ।

মহা‌দেব উপ‌স্থিত হ‌য়ে বল‌লেন , কি জন্য স্মরণ কর‌লেন যমরাজ । তখন যমরাজ পূর্ণরায় একই কথা বল‌লেন । তখন মহা‌দেব বল‌লেন , আমার কাজ হ‌চ্ছে প্রলয় করা । য‌দি ব‌লেন ত‌বে প্রলয় কর‌তে পা‌রি কিন্তু একবার " কৃষ্ণ " নাম নি‌লে কি হয় তা জা‌নি না । কি কর‌বেন , কি কর‌বেন তখন পিতামহ ব্রহ্মার কথা স্মরণে আস‌লো । মহা‌দেব ব‌ললেন , ব্রহ্মা হা‌তে বেদ নি‌য়ে প‌ড়েন , হয়ত তি‌নি জানবেন । কিন্তু ব্রহ্মা তো এখা‌নে আসবেন না , তখন যমরাজ , নারদ মু‌নি , মহা‌দেব , আর প‌াপী সক‌লে ব্রহ্ম‌লো‌কে গে‌লেন ।

ব্রহ্ম‌লো‌কে আসার পর , ব্রহ্মা সকল‌কে স্বাগত জান‌া‌লেন , আর বল‌লেন এই ব্য‌ক্তি‌টি আবার কে ? তখন যমরাজ বললেন , এ পৃ‌থিবীর অ‌নেক বড় পাপী । ব্রহ্মা বল‌লেন , তাহ‌লে পাপী‌কে এখা‌নে নি‌য়ে এ‌সে‌ছেন কেন ? যমরাজ বল‌লেন , এ জীবনভর পাপ কর‌ছে কিন্তু একবার " কৃষ্ণ " নাম নি‌য়ে‌ছে । আপ‌নি তো বেদ প‌ড়েন ত‌বে আপ‌নি বলুন এ‌কে নি‌য়ে কি করব ।

তখন ব্রহ্মা বল‌লেন , অ‌নেকবার বেদ প‌ড়ে‌ছি , কিন্তু এমন কথা প‌ড়ি‌নি যে পাপও ক‌রে‌ছে আবার কৃষ্ণনামও নি‌য়ে‌ছে এর কি করা যায় । তখন সক‌লে চিন্তায় পড়লো । পরে ব্রহ্মা বল‌লেন , এক কাজ ক‌রি যাঁর নাম তাঁর কা‌ছে যাই , তি‌নি বল‌তে পার‌বেন তাঁর না‌মের ম‌হিমা কি ? এখন যে পাপী সে বল‌লো আ‌মি যে‌তে পারব না , যা করার আপনারা এখা‌নে ক‌রেন ।

ব্রহ্মা , মহা‌দেব , নারদ , যমরাজ বল‌লেন , তোমা‌কে যে‌তেই হ‌বে । স‌ঠিক বিচার করার জন্য নারায়‌ণের কা‌ছে যে‌তে হ‌বে । পাপী বল‌লেন য‌দি যে‌তে হ‌বে ত‌বে পাল‌কি আনেন । আমি এক কদমও যাব না তা না হ‌লে । তখন পাল‌কি আনা হ‌লো । এখন তুল‌বে কে । অব‌শে‌ষে যমরাজ বল‌লেন , আবার কা‌কে ডাকব আমরা চারজন তো আ‌ছি , আ‌মি ( যমরাজ ) , মহা‌দেব , ব্রহ্মা , নারদজী । চ‌লেন আমরা নি‌য়ে যাই । কি আর করা নি‌য়ে যে‌তে হ‌লো পাল‌কি ক‌রে " নারায়‌ণের " কা‌ছে ।

পাপী‌কে পাল‌কি ক‌রে " নারায়‌ণের " কা‌ছে নি‌য়ে আস‌লেন চারজন মি‌লে । নারায়ণ অনন্ত না‌গের ওপর বিরাজ কর‌ছি‌লেন । মাতা লক্ষ্মী নারায়‌ণের সেবা কর‌ছেন । ব্রহ্মা , শিব , নারদ , যমরাজ‌কে দে‌খে তাঁ‌দের স্বাগত জানা‌লেন । , " নারায়ণ বল‌লেন , আপনারা চারজন এইখা‌নে আর ই‌নি কে , কোন মাহাত্মা না‌কি " । তখন যমরাজ বল‌লেন , না প্রভু ! এ‌ কোন মাহাত্মা নয় , এ হ‌লো অ‌নেক ব‌ড় পাপী ।

শ্রীহ‌রি বল‌লেন , তাহলে এ‌কে এখা‌নে নি‌য়ে আস‌লেন কেন ? তখন যমরাজ বল‌লেন , হে প্রভু ! এই জীবনভর পাপ কর‌ছে কিন্তু একবার আপনার নাম নি‌য়ে‌ছে ! এখন তা‌কে নি‌য়ে কি করা যায় আপ‌নিই বলুন । আপনার না‌মের ম‌হিমা কি ? তখন শ্রীহরি বল‌লেন , আচ্ছা এই কথা । আপনারা কি গীতা প‌ড়েন নি । গীতায় কি লেখা আ‌ছে !

শ্রীহরি বল‌লেন , " যে একবার আমার বৈকুন্ঠধা‌মে আ‌সে সে আর কখ‌নোই ফি‌রে যান না । " আর আমার নাম একবার নেওয়ার __ " ফল " আপনারা তো দেখ‌লেন । না‌মের সব‌চেয়ে বড় ম‌হিমা হ‌লো , আপনারা চারজন মি‌লে পাল‌কি ক‌রে নি‌য়ে এ‌সে‌ছেন এর চে‌য়ে বড় ম‌হিমা আর কি হ‌তে । সেই এখা‌নে থাক‌বে আপনারা নিজ নিজ ক‌র্মে যান ।

ভক্তগণ ভগবানের নাম অনন্ত । তাঁর লীলাও অপার । নামী থে‌কে নাম বড় । তাই শ্রীকৃষ্ণের নাম ভাব নি‌য়ে নি‌তে হয় । আপ‌নি শ্রদ্ধা , ভ‌ক্তি , প্রেম , ভাব নি‌য়ে ভগবা‌নের নাম স্মরণ করুন দেখবেন আনন্দ ল‌াভ কর‌বেন । তখন আর দুঃখ ব‌লে কিছু থাক‌বে না । জীব‌নে যাই কিছু করুন তা ভে‌বে চিন্তা কর‌বেন । আর শ্রীকৃষ্ণের নাম যত পা‌রেন জপ কর‌বেন । তা নি‌জের জন্যও ভা‌লো অপ‌রের জন্য ভা‌লো ।

জয় র‌া‌ধে ।

শ্রীহ‌রির জয় ।

ভূলক্রটি মার্জনা করবেন ।
0 comments

শ্রীকৃষ্ণ না‌মের ম‌হিমা - ১ম পর্ব

দুই ভাই ছি‌লেন । বড়ভাই অ‌নেক পাপী , ভোগী , কামনা - বাসনায় লিপ্ত ছি‌লেন কিন্তু ছোটভাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত ছি‌লেন । ছোট ভাই‌য়ের ইচ্ছা ছিল যে , তার বড়ভাই যেন কৃষ্ণ নাম নেন , শ্রীকৃ‌ষ্ণের ভ‌ক্তি ক‌রেন । ছোটভাই অ‌নেক চেষ্টা কর‌লেন কিন্তু বড়ভাই কোনভাবেই কৃষ্ণ নাম ব‌লেন না ।

ছোটভাই প্রায় ম‌ন্দি‌রে যে‌তেন কৃষ্ণকথা শ্রবণ কর‌তেন । এক‌দিন ছোটভাই মন্দি‌র গে‌লেন এবং ম‌ন্দি‌রের কোন একজন সন্ত‌কে বল‌লেন , আপনারা আমা‌দের গৃ‌হে আ‌সবেন এবং প্রবচন ক‌রবেন , হ‌রিনাম কীর্তন কর‌বেন আর আমার বড় ভাই‌কে একটু বুঝা‌বেন যেন আমার ভাইও কৃষ্ণনাম জপ ক‌রেন ।

তখন সাধু বল‌লেন , আমরা তো আপনা‌দের ঘরে যে‌তে পা‌রি কিন্তু আপনার বড় ভাই আমা‌দের কে কি ঘ‌রে আস‌তে দে‌বে । প্রথ‌মে বড় ভ‌াই থেকে অনুম‌তি নি‌য়ে আ‌সেন ।তখন ছোটভাই ঘরে এ‌সে বড় ভাই‌কে বল‌লেন , ভাইয়া আ‌মি ক‌য়েকজন সাধু - সন্ত‌কে ঘ‌রে আন‌তে চাই প্রবচন , হ‌রিনাম করা জন্য আ‌প‌নি অনুম‌তি দিন ।

বড় ভাই বল‌লেন কখনোই না । আ‌মি জা‌নি সাধু কেমন হয় । আ‌মি সাধু‌দের মুখ দেখ‌তে চাই না । ছোট ভাই অ‌নেক বুঝা‌লেন ,ভাইয়া একবার সাধু‌দের আস‌তে দেন । অব‌শে‌ষে অ‌নেক বলার পর বড় ভাই মে‌নে নি‌লেন আর বল‌লেন , যখন সাধুরা আস‌বেন তখন আ‌মি অন্য ঘ‌রের ভেতর দরজা বন্ধ ক‌রে থাক‌ব । আ‌মি সাধু‌দের দর্শন করব না । তোমার যা করার ক‌রে ওনা‌দের বিদায় দিবে ।

যখন সাধুরা চ‌লে যাবেন তখন বল‌বে আ‌মি ঘর থেকে বের হবো । তখন ছোটভাই সাধু‌দের আসার জন্য আমন্ত্রণ জানা‌লেন । সাধুরা আস‌লেন , প্রবচন কর‌লেন , হ‌রিনাম কীর্তন কর‌লেন , প্রসাদ বিতরণ কর‌লেন । যখন সব‌কিছু শে‌ষ হ‌লো , তখন সাধুরা ছোটভাই‌কে বল‌লেন , আপ‌নি তো সবসময় আপনার বড় ভাই‌য়ের কথা ব‌লেন । কিন্তু আমরা তো তা‌কে দেখ‌লাম না ।

কোথায় তি‌নি ! ছোট ভাই‌য়ের মনে ভয় ঢুকল য‌দি বড় ভাই কিছু ক‌রে ব‌সেন । তখন ইশারা দি‌য়ে বল‌লেন , ভেত‌রের রু‌মে আ‌ছেন । তখন সাধুরা দরজা ঠোকা দি‌য়ে বল‌লেন , দরজা খো‌লো । বড়ভাই বল‌লো , আ‌মি দরজা খুল‌বো না । আ‌মি আপনা‌দের মুখ দর্শন করতে চাই না , চ‌লে যান ।

সাধুরা বল‌লেন , দরজা তো খু‌লো , যখন বারবার বলার পর দরজা খুল‌লো না , তখন সাধুরা বল‌লেন দে‌খো আমরা তোম‌ার জন্য কি নি‌য়ে এ‌সে‌ছি । যখন কোন জি‌নিসের কথা শুন‌লো তখন দরজা খু‌লে দিয়ে দেখ‌লে সাধুরা কিছু আনেন নি । তখন তো বড় ভাই‌য়ের কিছু করার ছিল না ।

সাধুর‌া ভেত‌রের রুমে গে‌লেন এবং তা‌কে বল‌লেন তোম‌াকে দেখার জন্য এসে‌ছি , আমরা চ‌লে যাচ্ছি কিন্তু একবার " হ‌রে কৃৃষ্ণ " ব‌লে‌া । তখন সে বল‌লো আ‌মি এসব বল‌বো না । সাধুরা বল‌লো শুধু একবার ব‌লো " হ‌রেকৃষ্ণ "। সে বল‌লো না । এমন করতে কর‌তে যখন কিছু‌তে রাজী হ‌লো না তখন সাধুরা তার হাত পিছ‌নে দি‌কে মো‌ড়ে ধর‌লো । সাধুরা হা‌তে চাপ দি‌য়ে বল‌লো " হ‌রেকৃষ্ণ" ব‌লো । ‌সে বল‌লো না । অব‌শে‌ষে ব্যাথা বে‌শি লাগার কার‌ণে সে ব‌লে‌ই দিলো " হ‌রেকৃষ্ণ " ।

ভক্তগণ জোর ক‌রে কাউকে কিছু করা‌নো যায় না । ত‌বে কৌশল দি‌য়ে কর‌তে হ‌বে । এখা‌নে আপনারা ম‌নে কর‌বেন না যে আবার অত্যাচার ক‌রে ভগবানের নাম ব‌লা‌নো হ‌চ্ছে । ভগবা‌নের নাম তো ভাবের মাধ্য‌মে নি‌তে হয় । তারপরও সাধুর অ‌নেক চেষ্ট‌া করার পর সে " হ‌রেকৃষ্ণ " বল‌লো ।

কিছুদিন পর বড়ভাই গাড়ী এক্সিডেন্টে দেহত্যাগ করলো । জীবনভর পাপ কর‌ছে ফলে নর‌কে তো যেতে হবে । তখন যতদূতরা এ‌সে তা‌কে নর‌কে নি‌য়ে গেল । যমরাজ বল‌লেন , চিত্রগুপ্ত দেখো এ জীব‌নে কি কি ক‌রে‌ছে । তখন চিত্রগুপ্ত হিসাবের খাতা খুল‌তে দেখ‌লো যে , সারাজীব‌নে শুধু পাপ আর পাপ । কিন্তু একবার কৃষ্ণ নাম নি‌য়ে‌ছে ।

চিত্রগুপ্ত যমরাজকে বল‌লেন , মহ‌রাজ এ শুধু জীবনভর পাপই ক‌রে‌ছে কিন্তু একবার কৃষ্ণনাম নি‌য়ে‌ছে এখন কি করা যায় । তখন যমরাজ বল‌লেন , এমন তো কখনো হয়নি । যাঁরা ভক্ত তাঁরা ভ‌ক্তি ক‌রেন , যারা পাপী তারা পাপ ক‌রে । এখন কি করা যায় এ‌কে নি‌য়ে ? ?

===============
জয় রা‌ধে । বাকীঅংশ আগামীকাল।

আমরাও আগামীকাল জানব যে পাপী‌কে নি‌য়ে কি কর‌ছেন যমরাজ চিত্তগুপ্ত ।

(C)  Joy Shree Radha Madhav
0 comments

কেন ক্লাবে বিয়ে নয়, আর কেনই বা মন্দির ভিত্তিক বিয়ে?

যে সমস্ত কারণে কমিউনিটি সেন্টার বা ক্লাবে বিয়ের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্হান;-

1/ সকালে গরু কেটে যে পাত্রে রান্না হয় সেই পাত্র পরিষ্কার না করেই বিকেলে হিন্দু বিয়ের জন্য রান্না হয় ।

2/ সকালে গরুর রক্ত না শুকানোর পূর্বেই সেখানে নারায়ণ শিলা প্রতিষ্ঠিত করে বিয়ে করানো হয় ।

3/ একদিকে মাছ-মাংস খাওয়ার টেবিল সমূহ সাজানো হয়েছে, আরেকদিকে অগ্নি প্রজ্জলন করে অগ্নিকে সাক্ষী করে এবং সমগ্র দেবতাদের ডেকে এনে বিয়ের কাজ সমাধা করা হয় ।

4/ লগ্নের দিন বিয়ে করানোর কারণে ক্লাবের তুলনায় বিয়ের সংখ্যা বেশি থাকে এবং সেই কারণে বিশ হাজার টাকায় যে ক্লাব পাওয়া যায় তা এখন এক থেকে দেড় লক্ষ টাকা দিতে হচ্ছে, এই টাকা তাদের হাতেই যাচ্ছে যারা আমাদেরকে ধ্বংস করছে ।

5/ একই মানুষকে সাত বার আমন্ত্রণ জানিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে যা অর্থ ও সময়ের অপচয় ছাড়া অন্য কিছু নয় ।

6/ ক্লাবের বিয়েতে খাওয়ার সময় বাইরের লোক চলে আসে, যা কন্যা পক্ষকে বহন করতে হয় ।

7/ আর্শীবাদ অনুষ্ঠান শুধু মাত্র পাঁচ থেকে দশজন বয়োজ্যেষ্ঠকে নিয়ে মঙ্গলাচরণ

সম্পন্ন করা যায় । সেখানে পাঁচশত লোককে ডেকে খাইয়ে অর্থ শ্রাদ্ধ করানো হচ্ছে, এই অনুষ্ঠানও অনেক সময় ক্লাবে হচ্ছে, যার ফলে একটি মধ্যবিত্ত কন্যাপক্ষকে অতিরিক্ত ছয় থেকে আট লক্ষ টাকা খরচ করতে হচ্ছে ।

8/ সমস্ত খরচ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কন্যা পক্ষের উপর ।

9/ পাত্রপক্ষ ইদানিং বৌভাত অনুষ্ঠান তুলে দিচ্ছে কারণ অর্থ নষ্ট হয়, কিন্তু কন্যাপক্ষের অর্থ নষ্ট করতে ক্ষতি নেই ।

এখন, আমাদের হিন্দু অভিভাবকরা টাকার অভাবে ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষিত করার সাধ্য নেই, কিন্তু মেয়েকে বিয়ে দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হতে আপত্তি নেই। তাহলে আমরা আর কবে বুঝবো যে বিয়েটা সাত্ত্বিক ভাবে মন্দিরে করতে হবে এবং অপব্যয়টাও রোধ করতে হবে । ছেলেমেয়েকে শিক্ষিত করে সমাজকে শ্রেষ্ঠ করতে হবে । মন্দিরে বিয়ে করিয়ে পাত্র ও পাত্রী উভয় পক্ষ মিলে একটি সামাজিক অনুষ্ঠান করলে আমাদের অপব্যয় কমবে, বিয়েটাও সাত্ত্বিক ভাবে হবে এবং মন্দিরগুলিও লাভবান হবে ।

যেমন এখন বর্তমানে ইসকনের ভক্তরা সেটা করছে।

দেখুন আমাদের সনাতন অবলম্বিদের ঘড়ে যখন একটা শিশুর জন্মের পর তার মুখে প্রথম ভাত দেওয়া হয় মন্দিরে ভগবানের বিগ্রহের সামনে।

কেন মন্দিরে ভগবানের বিগ্রহের সামনে প্রথম মুখে ভাত বা প্রসাদ দেওয়া হয়?

তার কারন শিশুটির যেন মঙ্গল হয় এবং শিশুটি যেন বড় হয়ে ভগবানের ভক্ত হয়।

আর ঠিক একই রখম বিয়েও হচ্ছে একটা মঙ্গল কাজ।

তাই আর নয় ক্লাবে বিয়ে

আসুন আমরা সবাই মিলে মন্দির ভিত্তিক বিয়ের প্রচলন করি। আর পৃথিবীর বহু দেশে যেমন ভারতে, নেপালে, পাকিস্তানে, জাপানে, মালয়েশিয়াতে, ইন্দোনেশিয়াতে এবং থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে হিন্দু বিয়েগুলি মন্দিরেই সম্পন্ন হচ্ছে । তাহলে বাংলাদেশে নয় কেন? আমরা কি তাদের চেয়ে একটু আলাদা, অবশ্যই নয় ।


আর তাই আমাদের সমাজের শিক্ষিত জ্ঞানি হিন্দুদের কাছে প্রশ্ন রইল,এই কথা গুলি একটু ভেবে দেখবেন ?

Collected
0 comments

সংস্কৃত কি ও কেন পড়বেন?

আমার আজকের পোস্টটাও সংস্কৃত সম্বন্ধে। অনেকটাই বড়, একটু ধৈর্য ধরে পড়তে হবে। আপনাদের ভাল লাগলে অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন।

                                                       সংস্কৃত কি ও কেন পড়বেন?
 
আপনি কি বাংলা বা ইংলিশ বা হিন্দি সাহিত্যের বা দর্শনের বা ইতিহাসের বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বা সমাজতত্ত্বের বা অর্থনীতির বা বিজ্ঞানের ছাত্র, শিক্ষক বা অধ্যাপক? স্কুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে পড়েন বা পড়ান?
আপনি কি নিজের সাব্জেক্ট ভালভাবে জানতে চান,বা নিজেকে পারফেক্ট্রূপে দেখতে চান (relative perfection), আপনার লেখালেখির মান উন্নত করতে চান?
অন্যদের কাছে বেশী গ্রহণযোগ্য হতে চান, তাহলে বন্ধু, সংস্কৃতভাষায় লেখা উক্ত সমস্ত বিষয়ে অনেক বই আছে। বইগুলো একটু পড়ে দেখুন। আশা করি আপনি হতাশ হবেন না।
(এটা সংস্কৃতের বিজ্ঞাপন নয়, প্রকৃত সত্য।)

                                                                                                         অনেকের একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে
সংস্কৃত একটা ভাষা। কিন্তু না বন্ধু,
সংস্কৃত শুধুই একটা ভাষা নয়, এটা আমাদের culture, আমাদের Identity,
আমাদের পরিচয়, আমাদের উপমহাদেশীয় জাতিসত্তার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সংস্কৃত আমাদের গর্ব, সংস্কৃত আমাদের অলংকার, সংস্কৃত আমাদের অহঙ্কার,
আমাদের জীবনের অমৃত রসায়ন । এর রস একটু পান করে দেখুন আনন্দে বুঁদ হয়ে যাবেন। আমাদের প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছিলেন—

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি পৃথিবীর মুখ খুঁজিতে চাই না আর
তেমনি আপনিও বলবেন—
সংস্কৃতের রস আমি পান করিয়াছি , অন্য রস খুঁজিতে চাই না আর।

অন্য সকল জাতির পূর্বপুরুষেরা যখন বনে-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন,
তখন আমাদের পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীর সর্বপ্রথম সাহিত্য ও দর্শনের উন্নত গ্রন্থ বেদ লিখে ফেলেছেন। গণিত,
জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতির অনেক উন্নত চর্চা আমাদের মুনিঋষিরা করে গেছেন। পৃথিবীর সর্বপ্রথম ভাষাতত্ত্বের ও ব্যাকরণের গ্রন্থ আমাদের মনীষীদেরই রচনা। আচার্য পাণিনির ব্যাকরণ কতটা scientific তা আমরা জানি, কিন্তু আমাদের তো নিজেদের ভালটাকেও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবার স্বভাব আছে, যে পর্যন্ত বিদেশীরা স্বীকৃতি না দেবে, সেই পর্যন্ত আমরা তার দাম দিই না।
ঠিক আছে—আমি সেই সার্টিফিকটটাই (মূল্যায়ন) আপনাদের দেখাই---

the grammar of Panini—is one of the greatest monuments of human intelligence.’’ (Leonard Bloomfield)
—the earliest scientific work in any language any Indo-European language.’’
(Prof. R.H. Robins)

‘‘What is more, it seems that even Panini’s grammar can be interpreted as a fragment of such a ‘generative grammar’ in essentially the contemporary sense of this term.’’ (Noam Chomsky)

(সংস্কৃতে লেখা বইয়ের উপর বিদেশী স্কলারদের অসংখ্য এত ভাল ভাল সার্টিফিকেট (মূল্যায়ন) আছে যে, যারা সংস্কৃতকে অবজ্ঞা করেন,
তারা উপমহাদেশীয় হিসাবে লজ্জা পাবেন। )

আপনি কি নাস্তিক? তাহলে বেদ-উপনিষদগুলি একবার পড়ে দেখুন তো?
না না, আপনার ভয় নেই, আপনি নাস্তিকই থাকবেন, কিন্তু আপনার দৃষ্টিভঙ্গী আরো স্বচ্ছ হবে।
আপনি যদি আস্তিক হন, তাহলে বেদ-উপনিষদ-গীতা, রামায়ণ, মহাভারত পড়া ছাড়া আপনার অন্য কোন বিকল্প নেই।
আপনি কি ডাক্তারি পড়েন বা করেন বা মেডিকেল সায়েন্স নিয়ে গবেষণা করেন বা কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়েন বা গবেষণা করেন? তাহলে কষ্ট করে একবার আমাদের চরকসংহিতা, সুশ্রুতসংহিতা এবং আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের অন্যান্য গ্রন্থগুলি একবার পড়ে দেখুন । অঙ্ক নিয়ে যাদের কারবার তাঁরা ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্করাচার্য, শ্রীধরাচার্য প্রমুখের গ্রন্থ পড়ে দেখুন। আর যদি আর্কিটেক্চার নিয়ে কাজকর্ম করেন তাহলে আমদের প্রাচীন বাস্তুশাস্ত্রের বইগুলি পড়ে দেখুন। আশা করি আপনারা নিরাশ হবেন না। এই প্রসঙ্গে আপনাদের একটা তথ্য দিচ্ছি--
আপনারা নিশ্চয়ই বিখ্যাত বাঙ্গালী বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নাম জানেন, যাঁর অনেক বিখ্যাত গবেষণা এবং উদ্যোগ বাংলার অনেক উন্নতি সাধন করেছিল সেই প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তিনি টানা ১৫ বছর নিবিষ্টচিত্তে সংস্কৃত পড়েছেন এবং প্রাচীন রসায়ন শাস্ত্রের অনেক গ্রন্থের রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন। তিনি ২০০-এর বেশী রসায়ন শাস্ত্রের গ্রন্থের কথা বলেছেন।

যারা ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব নিয়ে পড়ছেন বা পড়াচ্ছেন বা গবেষণা করছেন তাঁরা মহাভারত, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, কামন্দকীয় নীতিসার, নীতিবাক্যামৃত, শুক্রনীতিসার, মনুসংহিতা, যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা, পরাশর সংহিতা, বৃহস্পতি সংহিতা, বিদূরনীতি ইত্যাদি গ্রন্থ থেকে অনেক তথ্য পেতে পারেন।

যারা রাজনীতি করেন, নেতা-মন্ত্রী হন, দেশ চালান, তাদের আমি অনুরোধ করব—আপনারা উক্ত বইগুলি পড়ে দেখুন,আপনারা যে পদ্গুলিতে আসীন আছেন সেই পদের গুরুত্ব, সেই পদলাভের যোগ্যতা, কাজের ধরণ, কি কি Moral code of conduct মেনে চলতে হয়, তা যদি আপনারা অনুসরণ করেন, তাহলে সাধারণ পাবলিক আপনাদের salute জানাবে।
যারা কাব্যতত্ত্ব ও নাট্যতত্ত্ব চর্চা করেন, তাদের তো সংস্কৃত কাব্যতত্ত্ব ও নাট্যতত্ত্ব আরো ভাল করে পড়তে হবে। দীর্ঘ প্রায় ২০০০ বছর ধরে সংস্কৃতে এর আলোচনা হয়েছে। আমি কয়েকটি গ্রন্থের নাম উল্লেখযোগ্য করছি—
ভরতের নাট্যশাস্ত্র, ধনঞ্জয়ের দশরূপক, সাগরনন্দীর নাটকলক্ষণরত্নকোষ, আনন্দবর্ধনের ধ্বন্যালোক, দন্ডীর কাব্যাদর্শ, মম্মটের কাব্যপ্রকাশ, বিশ্বনাথের সাহিত্যদর্পণ, রাজশেখরের কাব্যমীমাংসা, কুন্তকের বক্রোক্তিজীবিত, জগন্নাথের রসগঙ্গাধর ইত্যাদি।
যারা দর্শন নিয়ে পড়াশুনা, গবেষণা বা শিক্ষকতা করেন, তাদের তো original সংস্কৃতে লেখা বই পড়তে হয়। যেমন—তর্কসংগ্রহ, ভাষাপরিচ্ছেদ, সাংখ্যতত্ত্ব কৌমুদী, সাংখ্যপ্রবচনভাষ্য, যোগসূত্র, বেদান্তসার, ব্রহ্মসূত্র-শাঙ্করভাষ্য প্রভৃতি। তাঁদের অনেকেরই কেবলমাত্র বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদের উপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। ফলে মূলের রস তারা পান না।

আপনারা কি জানেন—যাকে এতদিন আমরা শুধুই ধর্মগ্রন্থরূপে মেনে এসেছি, সেই ‘গীতা’ নিয়ে এখন নতুন করে চিন্তা-ভাবনা চলছে—
কীভাবে আধুনিক ম্যানেজমেন্টে গীতার উপদেশ কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে?
যে কোন আকর গ্রন্থের বৈশিষ্টই তাই। যুগে যুগে মানুষের প্রয়োজনে তার নতুন করে মূল্যায়ন হয়, মানুষ তা থেকে বাঁচার রসদ খুঁজে পায়। সেইজন্য ক্লাসিক গ্রন্থ এবং প্রাচীন সংস্কৃতির নিত্য নতুন আলোচনা ও গবেষণার প্রয়োজন।
.
সংস্কৃত আমাদের জীবনে যে কতটা প্রয়োজনীয় সেই সম্বন্ধে আপনাদের কিছু তথ্য দিচ্ছি—
আপনি হয়তো কোন প্রিয়জনের শোকে মুহ্যমান, একটু থিতু হয়ে গীতার সাংখ্যযোগ, জ্ঞানযোগ অধ্যায় দুটি একটু মনোযোগ দিয়ে পাঠ করুন, দেখবেন আপনার এক অনির্বচনীয় অনুভূতি হবে। আপনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, আপনার ভিতরেও অনেক পরিবর্তন আসবে যেটা সারা জীবন আপনাকে হিতাকাঙ্ক্ষী অভিভাবকের মতো গাইড করবে। মনে যে কোন ধরণের অশান্তি এলে গীতা-উপ নিষদ একাগ্রচিত্তে পাঠ করলে মন শান্ত হয়। এটা শুধু আমার একার কথা নয়, এটা অনেক মনীষীর উপলব্ধি।

জ্ঞানের কোন জাত নেই, ধর্ম বা সম্প্রদায়ও নেই। জ্ঞানে সকলের সমান অধিকার। তাই যে কোন লোক এই বইগুলি পড়তে পারে। পড়ে দেখুন উপকার ছাড়া অপকার হবে না। original সংস্কৃতে এবং যথাযথ উচ্চারণ করে পাঠ করলে দেখবেন মনে কি নিবিড় প্রশান্তি! আপনি হয়তো ঝিমিয়ে পড়েছেন, কাজে উৎসাহ পাচ্ছেন না, এনার্জি লস, আপনি শ্রী শ্রী চন্ডী পড়ুন, বা ঋগ্বেদের বাক্ সূক্তের মন্ত্রগুলি জোরে জোরে পাঠ করুন, দেখবেন আপনার সমস্ত জড়তা কেটে গেছে।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে Music therapy, Counselling এর কার্যকারিতা এখন স্বীকার করা হয়। আমাদের বেদ,
উপনিষদ, গীতা এবং অন্যান্য অনেক গ্রন্থে যে সমস্ত মন্ত্র এবং শ্লোক আছে সেগুলির ছন্দ এবং ধ্বনিমাধুর্য অপূর্ব। এগুলির যথাযথ আবৃত্তির মাধ্যমে সেই therapy-র কাজ করা যেতে পারে।

ভাবছেন আমি কায়দা করেআপনাদের সংস্কৃত পড়ার জন্য প্রভাবিত করার চেষ্টা করছি? তা কিন্তু একেবারেই নয়। শব্দের যে অপরিমেয় শক্তি আছে তা আমাদের প্রত্যক্ষ-লব্ধ জ্ঞান। আপনি যদি সুন্দর করে কথা বলেন, প্রিয় কথা বলেন,
দেখবেন আপনি নিজেও অন্য সকলের প্রিয় হয়ে গেছেন।
এই শব্দশক্তির বা বাক্ শক্তির গূঢ় রহস্যের কথা আমাদের দার্শনিক এবং বৈয়াকরণরা সবিস্তারে বলে গেছেন। আমি কয়েকটি লাইন আপনাদের বলছি—

‘’ইদমন্ধংতমঃ কৃৎস্নং জায়েত ভুবনত্রয়ম্।
যদি শব্দাহ্বয়ং জ্যোতিরাসংসারং ন দীপ্যতে।।
(কাব্যাদর্শ/১ম পরিচ্ছেদ)

(এই ত্রিভুবন ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকত, যদি শব্দরূপ জ্যোতি সমগ্র সংসারকে আলোকিত না করত।)

গৌর্গৌঃ কামদুঘা সম্যক্ প্রযুক্তা স্মর্যতে বুধৈঃ।
দুষ্প্রযুক্তা পুনর্গোত্বং প্রযোক্তুঃ সৈব শংসতি।।
(কাব্যাদর্শ/১ম পরিচ্ছেদ)

(বুধগণ বা পন্ডিতগণ সম্যক্ভাবে প্রযুক্ত শব্দ বা বাক্ -কে কামধেনুর মত মনে করেন। অর্থাৎ শব্দ ঠিক ঠিক ভাবে প্রয়োগ করলে তা থেকে অভীপ্সিত অর্থ লাভ করা যায়। আবার, এই শব্দই যদি ঠিকভাবে প্রয়োগ করা না হয়,
তাহলে বক্তার মূর্খতাই প্রতিপাদন করবে। )

আচার্য ভর্তৃহরি শব্দ নিয়ে অনেক গভীর দার্শনিক আলোচনা করেছেন। তাঁর বাক্যপদীয় গ্রন্থটি অনেক দার্শনিক, বৈয়াকরণ ও ভাষাতত্ত্ববিদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। এখনও এই বই নিয়ে গবেষণা চলছে।
কেউ বলেন—সংস্কৃত dead language, কেউ বলেন— living language, আমি বলি সংস্কৃত নিয়ে তর্ক করো না। সংস্কৃত ভারতের আত্মা (Soul), সংস্কৃত ভারতের চেতনা (conciousness) । সংস্কৃত ছাড়া ভারতবর্ষ অস্তিত্বহীন। আপনারা অনেকেই জানেন ভারতবর্ষকে ভালবেসে কত বিদেশী মনীষী সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছেন। কিসের জন্য?
ভারতবর্ষে কী ছিল যার জন্য তাঁদের এই আত্মত্যাগ? তাঁদের জীবনব্যাপী নিরলস সাধনা? কীসের জন্য? তা হল—
ভারতবর্ষের সংস্কৃতি যা সংস্কৃতে বিধৃত।

ভারতবর্ষের প্রাচীন মুনি-ঋষিরা সুদীর্ঘকাল যাবৎ কঠোর তপস্যায় জগৎ ও জীবনের যে সুগভীর সত্য উপলব্ধি করেছিলেন, তাই সংস্কৃত ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন। যুগে যুগে সেই জীবন সত্যের সন্ধান পেতে বিদেশী পর্যটকরা এসেছেন। নিজেদের দেশে নিয়ে গেছেন আমাদের পূর্বপুরুষদের সত্যসন্ধানী আলো। এর দ্বারা তাঁরা জীবন-পথের দিশা খুঁজে পেয়েছেন।

বিশ্বমানবতাবাদ- প্রতিষ্ঠা, মানুষে মানুষে মৈত্রীস্থাপন, সমগ্র জীবজগৎ ও জড়জগৎ-এর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কস্থাপন, এককথায় সমস্ত বিশ্ববাসীর কল্যাণসাধন ভারতবর্ষের চিরন্তন সাধনা। আমাদের উপনিষদে বার বার এই কথাই ধ্বনিত হয়েছে। আমরা আমাদের গৌরবময় অতীতকে ভুলেছি বলেই আজ আমাদের এই দুর্দশা। আমাদের নীতি-নৈতিকতা আজ তলানিতে ঠেকেছে। আমাদের সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। আমরা মানবিক গুণগুলি হারিয়ে ফেলছি। সমাজের creamy layer বলে যারা সম্মানিত তাঁরাও আজ অবক্ষয়ের শিকার। এই চোরাবালিতে পড়ে আমরা যেন অসহায়ভাবে নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই দেখতে পাচ্ছি।
এই অবস্থায় একমাত্র প্রতীকার হতে পারে যদি কালবিলম্ব না করে সংস্কৃতের ব্যাপক চর্চা শুরু করা যায়। আসুন না আমরা সবাই মিলে একটু চেষ্টা করি—
সংস্কৃত পড়ে জীবনে তার প্রয়োগ করে নিজেদের এবং সমাজকে একটু বদলাতে পারি কি না। সবশেষে প্রার্থনা করি—

‘’সমানী ব আকূতিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ।
সমানমস্তু বো মনো যথা বঃ সুসহাসতি।।"
(ঋগবেদ—সংজ্ঞানসূক্ত)

(তোমাদের অভিপ্রায় এক হোক, অন্তঃকরণ এক হোক, মন এক হোক, তোমরা যেন সর্বাংশে সম্পূর্ণরূপে একমত হও।)

ধন্যবাদন্তে--
শ্রী লিটন দে
সংস্কৃত বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
0 comments

শরভ_বা_শরভেশ্বর_অবতার

ভগবান বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতার ধারন করে হিরণ্যকশিপু নামক অসুরকে দমন করেন,তা অনেকেরই জানা কিন্তু ভগবান নৃসিংহ দেব হিরণ্যকশিপুকে বধ করলেও কিছুতেই তাঁর ক্রোধ শান্ত হচ্ছিলো না। প্রহ্লাদ, মা লক্ষ্মীসহ আরো অনেক দেবতা ভগবানের ক্রোধ শান্ত করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। সেই ক্রোধে বিশ্ব সংসারের ইতির আশঙ্কা করছিলেন দেবতা ও ঋষিগণ। এরপর পিতামহ ব্রহ্মা সহ সব দেবতা এবং ঋষিগণ ভগবান শিবের স্মরণে চলে যান।তাদের অনুরোধে ভগবান নৃসিংহদেবের ক্রোধ শান্ত করতে প্রথমে বীরভদ্র কে পাঠান। কিন্তু রজঃগুণ সম্পন্ন রক্ত পান করার কারনে কিছুতেই তাঁর ক্রোধ শান্ত হচ্ছিলো না। ব্যর্থ হয়ে বীরভদ্র মহাদেবের হস্তক্ষেপ প্রার্থণা করেন। এরপর দেবাদিদেব মহাদেব তাঁর ওমকার স্বরুপের সবচেয়ে ভয়ংকর রুপ ধারন করেন।

এই রুপ শরভ অবতার বা শ্রী শরভেশ্বর নামে পরিচিত। এই ভয়ংকর রুপে শক্তি তথা সঙ্গী হিসেবে মা আদিশক্তির দুইটি রুপ তথা মা প্রাত্যাঙ্গীরা দেবী এবং মা শ্রী শুলিনী দেবী ছিলেন। মহাদেবের এই শরভ রুপ মানুষ, সিংহ এবং ঈগলের সমন্বয়। এই রুপের সহস্র মুখ এবং দুইটি বিশাল ডানা ( যা মা শ্রী শুলিনী এবং মা প্রাত্যাঙ্গীরা দেবীর প্রতীক), অষ্টপদ এবং নানা অস্ত্রধারী চার হস্তের কথার উল্লেখ পাওয়া যায়। এইরুপে উড়ে এসে ভগবান নৃসিংহকে শান্ত করতে চাইলে এর বিপরীত হয়। প্রচণ্ড ক্রোধে ভগবান নৃসিংহদেব অষ্টমুখী "কাণ্ডাবেড়ুণ্ডা" নামক পক্ষীরুপ ধারন করেন এবং শ্রী শরভেশ্বর অবতারের সাথে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধ ১৮দিন স্থায়ী ছিল। এরপর মহাদেব তাঁর এই দিব্য খেলার সমাপ্তি ঘোষনা করতে চাইলেন। শ্রী শরভেশ্বরের ডানা থেকে মা প্রাত্যাঙ্গীরা দেবী উদ্ভূত হলেন এবং বিরাট আকৃতির রুপ নিয়ে কাণ্ডাবেড়ুণ্ডা নামক পক্ষীরুপকে গ্রাস করে নিলেন। এরপর নৃসিংহদেবের ক্রোধ শান্ত হয় এবং শ্রী শরভেশ্বরের স্তুতি গাইলেন, যা বর্তমানে শ্রী শরভেশ্বরের ১০৮ নামাবলী হিসেবে পরিচিত। এভাবেই দেবাদিদেব মহাদেব ভগবান নৃসিংহদেব কে সমস্ত ভক্তদের জন্য উপলভ্য করেন।

বিভিন্ন বৈষ্ণব শাস্ত্রে ভগবান নৃসিংহদেবের হিরণ্যকশিপু বধ পরবর্তী ধ্বংসলীলার এবং দেবাদিদেব মহাদেবের শরভ অবতার গ্রহণের বর্ণনা বিস্তারিত দেওয়া নেই। কিন্তু ভারতবর্ষে অজস্র মন্দির এবং চিত্র অংকন খুঁজে পাওয়া যায় মহাদেবের এই রুপ নিয়ে। শ্রীমদ ভগবতম এর মত মহাপুরাণেও শরভ অবতারের বর্ননা পাওয়া যায় না। ভগবান নৃসিংহদেব সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পূরাণ এবং উপনিষদেও উল্লেখ পাওয়া যায় না। বরং হিরণ্যকশিপু বধের পর ভক্ত প্রহ্লাদ ও মা লক্ষ্মী সহ অন্যান্য দেবদেবীর প্রচেষ্টায় তাঁর ক্রোধ শান্ত হবার কথা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রধান চারটি বেদের একটি অথর্ববেদ এবং ৩১টি উপনিষদের এক শরভ উপনিষদে মহাদেব শিব শম্ভুর শ্রী শরভেশ্বর অবতারের বিভিন্ন স্তুতি এবং কিভাবে এই রুপে নৃসিংহ দেবের ক্রোধ শান্ত করেন তাঁর বর্ণনা পাওয়া যায়। শরভ উপনিষদের ৩ নং শ্লোকে অতি সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। ঋগবেদেও এই রুপের উল্লেখ পাওয়া যায় কিছু মন্ত্রের মধ্যে।

শিব মহাপুরাণ, লিঙ্গপূরাণ, স্কন্ধপূরাণ, ব্রহ্মাণ্ড পূরানে এর বিস্তারিত উল্লেখ আছে। শ্রী ললিতা সহস্রনামার উত্তরভাগে, শ্রী শরভেশ্বর অবতারের একটি বৈদিক মন্ত্র পাওয়া যায় যা অথর্ববেদে উল্লেখিত। মহাঋষি বেদব্যাস লিঙ্গপূরাণের ৯৬ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন শ্রী শরভেশ্বর অবতারের আরাধনা করলে সবরকমের বিপদ আপদ থেকে কিভাবে রক্ষা পাওয়া যায়। শ্রী নৃসিংহ সহস্র নামায় "শ্রী শরভ" নামের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা পিতামহ ব্রহ্মা ভগবানের ক্রোধ শান্ত করতে পাঠ করেছিলেন। অজ্ঞাত কিছু উৎস থেকে পাওয়া যায়, ভগবান নৃসিংহের ক্রোধ শান্ত করার পর দেবাদিদেব মহাদেব বলেছিলেন "অসুরদের দমন করতে ভগবান নৃসিংহ অবতার ধারন করে এসেছিলেন, এবং তাঁর ক্রোধকে শান্ত করতে আমি শরভেশ্বরের রুপ ধারন করেছি।কিন্তু এই দুই রুপের কোন পার্থক্য নেই এবং এক হিসেবেই আরাধনা করতে হবে।" এজন্যেই শ্রী শরভেশ্বর রুপের আরাধনা করার পূর্বে ভগবান নৃসিংহদেবের আরাধনা করতে হয়।
দক্ষিন ভারতে মহাদেবের শরভ রুপের আরাধনা বেশি হয়, এই আরাধনা সূচনা করেছিলেন স্বয়ং পিতামহ ব্রহ্মা।।
জয় মা মঙ্গলা।
জয় ভগবান শরভেশ্বর।।
জয় ভগবান নৃসিংহ।।

(C) Apurba Halder
0 comments

কৃষ্ণ কে? গীতায়, ভাগবতে কৃষ্ণ সম্পর্কে কি বলা হয়েছে?

কৃষ্ণ হচ্ছে সর্বশক্তিমান, সর্বশ্রেষ্ঠ, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র মালিক,একমাত্র উপাস্য,একমাত্র স্রষ্টা, পরম পুরুষোত্তম, পরমেশ্বর ভগবান।তিনিই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং সংহারকর্তা। গীতা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণী।
দেখা যাক ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার নিজের সম্পর্কে গীতায় কি বলেছেন-

১/ যে ব্যক্তি কৃষ্ণভাবনায় যুক্ত নয়,তার মন সংযত নয়। (২/৬৬)
২/ সকলেই সর্বতোভাবে আমার পথ অনুসরণ করে।(৪/১১)
৩/ আমি সর্বলোকের মহেশ্বর (মহ+ঈশ্বর)। (৫/২৯)
৪/ আমিই সমস্ত জগতের উৎপত্তি ও প্রলয়ের মূল কারণ। (৭/৬)
৫/ আমার থেকে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই। (৭/৭)
৬/ পরমাত্মা রুপে আমি সকলের হৃদয়ে বিরাজ করি। (৭/২১)
৭/ পরমেশ্বর ভগবান রুপে আমি অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সম্পূূর্ণরুপে অবগত। (৭/২৬)
৮/ আমাকে প্রাপ্ত হলে আর পূর্ণজন্ম হয় না। (৮/১৬)
৯/ সর্বশ্রেষ্ঠ পরমেশ্বর ভগবানকে অনন্যা ভক্তির মাধ্যমেই কেবল লাভ করা যায়। (৮/২২)
১০/ অব্যক্ত রুপে আমি সমস্ত জগতে ব্যাপ্ত আছি। (৯/৪)
১১/ আমি নিজেই সমস্ত সৃষ্টির উৎস। (৯/৫)
১২/ এই জগৎ আমারই প্রকৃতির অধীন। (৯/৮)
১৩/ আমিই এই জগতের পিতা। (৯/১৭)
১৪/ আমিই এই জগতের বিধাতা  (সৃষ্টিকর্তা) । (৯/১৭)
১৫/ আমি সকলের গতি। (৯/১৮)
১৬/ আমি তাপ প্রদান করি এবং আমি বৃষ্টি বর্ষণ করি ও আকর্ষণ করি। (৯/১৯)
১৭/ আমিই সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা ও প্রভু। (৯/২৪)
১৮/ আমি সকলের প্রতি সমভাবাপন্ন। (৯/২৯)
১৯/ সব কিছু আমার থেকে প্রবর্তিত হয়। (১০/৮)
২০/ মনুষ্যদের মধ্যে আমি সম্রাট। (১০/২৭)
২১/ অব্যয় অমৃতের,শাশ্বত ধর্মের এবং ঐকান্তিক সুখের আমিই আশ্রয়। (১৪/২৭)
২২/ আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য এবং আমিই বেদান্তকর্তা ও বেদবিৎ। (১৫/১৫)
২৩/ বেদে আমি পুরুষোত্তম নামে বিখ্যাত। (১৫/১৮)
২৪/ সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরনাগত হও। (১৮/৬৬)

আর ভাগবতে বলা হয়েছে -
১/ ভগবান হচ্ছেন দ্রষ্টা। (৩/৫/২৫)
২/ ভগবান নিত্য আনন্দময় এবং জ্ঞানময়।(৩/৯/৩)
৩/ শ্রীকৃষ্ণ সর্ব মঙ্গলময়।(৩/৯/৭)
৪/ শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং। (১/৩/২৮)
৫/ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সর্বকারণের পরম কারণ।( ৩/১১/২৪)
৬/ পরমেশ্বর ভগবানের শক্তি অনন্ত। (৩/৯/২৫)
৭/ ভগবানের রুপ সর্বদাই তরুন।( ৪/৮/৪৬)
৮/ ভগবান একজন পুরুষ।(৪/৮/৪৭)
৯/ শ্রীকৃষ্ণ সর্বশক্তিমান। ( ৪/৯/৬)
১০/ শ্রীকৃষ্ণ সব কিছুর সংহারকর্তা। তার আদি নেই,যদিও তিনি সব কিছুর আদি।(৪/১১/১৯)

(C)  হিমাদ্রী পূর্বা স্তূতি
2 comments

সনাতন ধর্ম অনুসারে একজন পুরুষ কিংবা একজন নারী কোন সম্পর্কের ব্যাক্তিকে বিবাহ করতে পারবেনা ?

প্রথম বলে দেওয়া ভালো সনাতন ধর্মের নিজ বংশের মধ্যে বিবাহ সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। যদিও অনেকে বলে সনাতন ধর্মের এরকম কথা কোথাও বলা হয়নি কাকে বিবাহ করবে আর কাকে করবেনা?

দেখা যাক সনাতন শাস্ত্র কি বলেছে এই সম্পর্কে?

মনুসংহিতা ৩/৪:
গুরুণামতঃ স্নাত্বা সমাবেত্তো যথাবিধি।
উদ্বহেত দ্বিজো ভার্য্যাং সবর্ণাং লক্ষাণান্বিতাং।।

অনুবাদ:- “গুরু অনুমতি করিলে পর, সমাবর্ত্তনানস্তর বিধানানুসারে ব্রতাঙ্গ স্নান সমাপন করিয়া সেই ব্রাহ্মণাদি বর্ণত্রয় সুলক্ষণাক্রান্তা সবর্ণা স্ত্রী বিবাহ করিবেন”

অর্থাৎ গুরু গৃহ থেকে বিদ্যা লাভ করে , গুরুদেবের অনুমতি নিয়ে বিবাহ করার কথা বলা হয়েছে।

মনুসংহিতা ৩/৫:-
অসপিন্ডা চ যা মাতুরসগোত্রা চ যা পিতুঃ।
সা প্রশস্তা দ্বিজাতীনাং দারকর্ম্মাণি মৈথুনো।।

অনুবাদ:-  “যে স্ত্রী মাতার সপিন্ডা না হয়, অর্থ্যাৎ সপ্তপুরুষ পর্য্যন্ত মাতামহাদি বংশজাত না হয় ও মাতামহের চতুর্দ্দশ পুরুষ পর্য্যন্ত সগোত্রা না হয় এবং পিতার সগোত্রা বা সপিন্ডা না হয় অর্থ্যাৎ পিতৃয়স্রাদি সন্ততি সম্ভূতা না হয়, এমন স্ত্রীই দ্বিজাতিদিগের বিবাহের যোগ্যা জানিবে”

স্বপিন্ড মানে হলো নিজ বংশ। আর এই শ্লোকে এটা স্পস্ট যে নিজ রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিবাহ করা যাবেনা।

মনুসংহিতা ৩/৬:-
মহান্ত্যপি সমৃদ্ধানি গোহজাবিধনধান্যতঃ।
স্ত্রী সম্বন্ধে দশৈতানি কুলানি পরিবর্জয়েৎ।।

অনুবাদ:-  “গো, মেষ, ছাগ ও ধন-ধান্য দ্বারা অতিসমৃদ্ধ মহাবংশ হইলেও বিবাহ বিষয়ে এই বক্ষ্যমাণ দশ কুল পরিত্যাগ করিতে হইবে”

এই শ্লোকের মূলকথা কোটিপতি কিংবা ধনাঢ্য ব্যক্তি হলেও স্বপিন্ডেরর মধ্যে বিবাহ করতে পারবেনা। অন্তত দশ পুরুষ পর্যন্ত।
লেখার মাধ্যমে যদি কোন ভূল হয় সবাই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
 হরে কৃষ্ণ

(C) প্রিয়নত্রিলা দাশ সস্তিকা
0 comments

বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

১১৩৭ বঙ্গাব্দ বা ইংরেজী ১৭৩০ খ্রীষ্টাব্দের কথা, তৎকালীন যশোহর জেলা আর বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমা- এর চৌরশী চাকলা নামক গ্রামে শ্রী শ্রী বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ছিল রামনারায়ন এবং মায়ের নাম কমলা দেবী। বাবা ছিলেন একজন ধার্মীক ব্রাহ্মণ।


বাবা মায়ের চতুর্থ সন্তান ছিলেন লোকনাথ বাবা। সেই সময়কার মানুষের ধ্যান ধারণা ছিল কোন এক পুত্রকে যদি সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করানো যায় তাহলে তার বংশ উদ্ধার হয়। সে জন্য রামনারায়ন তার প্রথম সন্তান থেকেই চেষ্টা করেছিলো প্রতিটি সন্তানকে সন্যাসী বানানোর জন্য। কিন্তু স্ত্রীর জন্য পারিনি। তবে চতুর্থ সন্তনের বেলায় আর সেটা হইনি। এ জন্য শ্রীরামনারায়ন লোকনাথকে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করানো জন্য ১১ বছরে উপনয়নের কার্য সমাপ্ত করে পাশ্ববর্তী গ্রামের জ্যোর্তিময় দেহধারী ভগবান গাঙ্গুলীর হাতে তুলে দেন। এ সময় লোকনাথের সঙ্গী হন তারই বাল্যবন্ধু বেনীমাধব। লোকনাথের নাম দিয়েছিলেন ভগবান গাঙ্গুলী নিজেই।


উপনয়ন শেষে লোকনাথ, বেনীমাধব ও ভগবান গাঙ্গুলী পদযাত্রা শুরু করেন। বিভিন্ন গ্রাম শহর নদ-নদী জঙ্গল অতিক্রম করে প্রথমে কালীঘাটে এসে যোগ সাধনা শুরু করেন। এই রূপে গুরুর আদেশে বিভিন্ন স্থানে যোগ সাধনা ও ব্রত করে শেষ পর্যন্ত লোকনাথ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন। তারপর শুরু হয় দেশ ভ্রমন। প্রথমে হিমালয় থেকে কাবুল দেশে আসেন। সেখানে মোল্লা সাদী নামে এক মুসলমানের সঙ্গে কোরান, বেদসহ বিভিন্ন শাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করে ইসলামধর্মের তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেন। এবার গুরুকে বাদ দিয়ে তাঁরা দুজনে পদযাত্রায় আবার দেশ ভ্রমন শুরু করেন। প্রথমে আফগানিস্থান, পারস্য, আরব, মক্কা-মদিনা, মক্কেশ্বর তীর্থস্থান, তুরস্ক, ইতালী, গ্রীস, সুইজার- ল্যান্ড, ফ্রান্স, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমন করিয়া দেশে ফিরে আসেন এবং পরে দেশের ভিতর হরিদ্বার, হিমালয় তীর্থ, বদ্রীনাথ, সুমেরু পর্বত, কাশিধাম ও কাবুল পরিদর্শন করেন। দিনে দিনে গুরুর বয়স একশত বছর ও শিষ্যদের বয়স পঞ্চাশ বছর হলো। গুরুদেব ভগবান গাঙ্গুলী শিষ্য দুজনকে শ্রী তৈলঙ্গস্বামীর (হিতলাল নামে যিনি পরিচিত) হাতে তুলে দিয়ে পরলোক গমন করেন। এবার লোকনাথ ও বেনীমাধব সুমেরু থেকে চন্দ্রনাথ পর্বতে আসেন। সেখান থেকে লোকনাথ ও বেনীমাধব বিভক্ত হয়ে যান। বেনীমাধবের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে লোকনাথ একা একা চলে আসেন কামাখ্যা হয়ে ত্রিপুরা জেলার দাউদকান্দি গ্রামে। সেখানে কোন এক সুভক্ষণে দেখা হয় ডেঙ্গু কর্মকারের সঙ্গে। ডেঙ্গু কর্মকারের বাড়ি কিছু দিন অবস্থান করার পর তারই সঙ্গে নারায়নগঞ্জের বারদীতে আসেন।



বারদীর জমিদার নাগ মহাশয় বাবার কথা শুনে বাবার থাকার জন্য জমি দান করেন এবং বাবা নিজ পছন্দের জমিতে মহা ধুম-ধামের সাথে আশ্রম স্থাপন করেন। বাবার আশ্রমের কথা শুনে দেশ-দেশন্তার হতে বহু ভক্তগন এসে ভিড় জমাতে থাকেন। ভক্তগনের মনের অভিব্যাক্তি “তারা বাবার কাছে যাই চায় তাই পায়। এ ভাবে একটু সময়ের ব্যাবধানেই বাবার আশ্রম তীর্থভূমিতে পরিণত হয়। কোন এক সময় ভাওয়ালের মহারাজ বাবার অনুমতি নিয়ে বাবার ফটো তুলে রাখেন। যে ফটো বর্তমান ঘরে ঘরে পূজিত হয়। এ ভাবে ঘনিয়ে আসে বাবার মহাপ্রয়ানের দিন।


সে দিন ছিল ১৯শে জৈষ্ঠ, রবিবার বাবা নিজেই বললেন তার প্রয়ানের কথা। এ কথা শুনে বহু নর-নারী এলো বাবাকে শেষ দর্শন করার জন্য। বাবার শেষ বাল্যভোগ নিয়ে আসেন আশ্রম মাতা। বাল্যভোগ প্রসাদে পরিণত হওয়ার পর ভক্তগন মহাআনন্দের সথে তা ভক্ষণ করিল। প্রসাদ ভক্ষণ হওয়ার পর বাবা মহাযোগে বসেন। সবাই নির্বাক অবাক হয়ে অশ্র“ সজল চোখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন বাবার দিকে কখন বাবার মহাযোগ ভাঙ্গবে। কিন্তু বাবার ঐ মহাযোগ আর কখনও ভাঙ্গেনি। শেষ পর্যন্ত ১১. ৪৫ মিনিটে দেহ স্পর্শ করা হলে দেহ মাটিতে পড়ে যায়। ভক্তগণ কাঁদতে থাকে উচ্চস্বরে এবং বাবার শরীর মন্দির থেকে তুলে এনে বিল্বতলে রাখা হয়। দেহ সৎকারের জন্য আনা হয় থরে থরে ঘৃত ও চন্দন। বাবার কথা মতে (পূর্বের) বাবার দেহ আশ্রমের পাশে চিতায় রেখে দাহকৃত সমাপ্ত হয়। এই ধরাধাম থেকে চলে গেলেন লোকনাথ বাবা। কিন্তু রেখে গেলেন বাবার পূর্ণ স্মৃতি। আর রেখে গেলেন বাবার অমর বাণী।
‘‘ রণে বনে জলে জঙ্গলে
যখনই বিপদে পড়িবে
আমাকে স্মরণ করিও
আমিই রক্ষা করিব ’’।
_______________________


পরম পুরুষ বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী তাঁর ভক্তদের জন্য যেসব অমৃত বাণী দিয়ে গেছেন সেগুলো অমূল্য রত্ন বিশেষ। তাঁর এ অমৃত বাণী সংসারক্লিষ্ট মানুষের মনে শান্তি ও স্বস্তি আনবে, এই আশা নিয়েই সকলের জন্য তাঁর অসংখ্য অমৃত বাণী থেকে কিছু বাণী এখানে সংকলিত হলোঃ
★ প্রত্যক্ষেই হোক্ আর পরোক্ষেই হোক্ বাক্য -মন-ইঙ্গিত দ্বারা কারও নিন্দা করা উচিত নয়।
★ নিজেকে বড় না করে তাঁকে বড় কর, নিজে কর্তা না সেজে তাঁকে কর্তা জ্ঞান করার চেষ্টা কর, তাহলেই ত্যাগ আসবে।
★ যে কারনে মোহ আসে, তা যদি জানা থাকে, আসতে না দিলেই হয়।
★ বাক্যবাণ ,বন্ধু -বিচ্ছেদবাণ এবং বিত্ত-বিচ্ছেদবাণ এই তিনটি বাণ সহ্য করতে পারলে মৃত্যুকে জয় করা যায়।
★ আমার দান ছড়ানো পড়ে আছে,কুড়িয়ে নিতে পারলেই হলো।
★ অন্ধ সমাজ চোখ থাকতে ও অন্ধের মতো চলছে।
★ যা মনে আসে তাই করবি, কিন্তুু বিচার করবি।
এবং ত্রোধ ভাল, কিন্তুু ত্রোধান্ধ হওয়া ভাল নয়।
ভালা লাগলে শেয়ার করবেন।
দেখবেন বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী কখনো না কখনো আপনার মঙ্গল করবেই।।
জয় গুরু দেব
দেব ঈশ্বর মহাদেব
জয় বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জয়।

সবাইকে জানার এবং পড়ার জন্য শেয়ার করবেন এবং লিখুন জয় বাবা লোকনাথ ।



(C) Songita Pal Supti
0 comments

বিষ্ণু পুরানে সৃষ্টিতত্ত্ব

প্রথমে এ বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টির পুর্বে এই মহাবিশ্বে কিছুই ছিল না সম্পূর্ন শূন্য ছিল। সেই শূন্যতার সৃষ্টি মহাজ্যোতি পূঞ্জ থেকে। সেই জ্যোতি ধীরে ধীরে মানুষ রূপ ধারনকরে। সেই আদি পূরুষ হচ্ছে ভগবান নারায়ন।




তারপর নারায়ন যোগ নিদ্রায় মগ্ন হয়। সেই যোগ নিদ্রা থেকে ব্রহ্মজল নির্গত হয় ও ক্ষীর সাগরের তৈরী হয়। এরপর শ্রী নারায়নের নাভী থেকে একটি পদ্মফুলের কলি সৃষ্টি হয় এবং নারায়নের একটি প্রতিরুপ গিয়ে ঐ পদ্মফুলকে প্রস্ফুটিত করে।




ঐ পদ্মথেকে ব্রহ্মার সৃষ্টি হয়। এরপর নারায়নের ভ্র থেকে একটি রুদ্রাক্ষের সৃষ্টি হয়। পরে নারায়নের একটি প্রতিরূপ গিয়ে তার বিষ্ফোরন ঘটিয়ে শিবের সৃষ্টি করে। এরপর ব্রহ্মা ও শিব নারায়নের স্তুতি করে ও তাঁদের পরিচয় জানতে চান, তাঁরা বলেন হে জগদীশ জন্ম যখন দিয়েছেন পরিচয়ও দিন। তখন শ্রী নারায়ন মধুর হাসি হেসে বলেন আমিও যা আপনারাও তা। আমার প্রতিরূপ আপনারা। হে পঞ্চমুখী আপনি ব্রহ্মা (ব্রহ্মা প্রথমে পাঁচ মুখ বিশিষ্ট ছিল এরপর শিব ত্রিশূল দিয়ে একবার ব্রহ্মার একটি মস্তক কাটেন ও ব্রহ্মার পূজা নিষিদ্ধ করেন) আর হে জটাধারী হে ত্রিনেত্রেশ্বর আপনি শিব। আমরা.তিনজন ত্রিদেব।


শ্রী নারায়নের এই উত্তরের পর ব্রহ্মা ও শিব তাঁদের জন্মের উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন। তখন শ্রী নারায়ন বললেন, হে ব্রহ্মা, হে মহেশ্বর এই সংসারে জন্ম নিলে তাকে কর্মও করতে হয়। আপনাদেরও কর্ম করতে হবে। হে ব্রহ্মা আপনি সৃষ্টিকর্তা আপনি সৃষ্টি করবেন। আর হে মহেশ্বর আপনি সংহার কর্তা আপনি সংহার করবেন।
আর আমি নারায়ন যখন নিরাকার রূপ থেকে সাকার রূপ ধারন করেছি তখন আমাকেও কর্মকরতে হবে। আমি বিষ্ণু রুপে জগতের পালন করব। হে ব্রহ্মা আপনি গিয়ে সৃষ্টি রচনার প্রারম্ভ করুন।🎁🎁

এরপর ব্রহ্মা ও শিব প্রস্হান করলেন। এরপর শ্রীবিষ্ণু শীষ নাগের শয্যা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রনব মন্ত্র 'ওঁ' এর উচ্চরন করলেন। তখন তাঁর বাম হাত থেকে মা মহালক্ষী আবির্ভূত হলেন। তখন মা মহালক্ষী শ্রী নারানকে বললেন হে পরমশ্রেষ্ঠ আপনি নিজেই তো সম্পূর্ন ছিলেন, তবে আমায় কেন সৃষ্টি করলেন?

তখন শ্রীবিষ্ণু মধুর হাসি হেসে.বললেন আমি জানি আমি সমূর্ন আমি সেই প্রদীপের মত পূর্ণ যার থেকে অন্য প্রদীপ জ্বালালেও তার পূর্ণ আলো পূর্ণই থাকে। তবু হে প্রিয়া, চাঁদ যেমন চাঁদনী ছাড়া, ফুল যেমন সুগন্ধ ছাড়া, সূর্য যেমন তেজ ছাড়া অপূর্ণ তেমনি আমিও তোমাকে ছাড়া অপূর্ণ। আর আজ থেকে আমি ঘোষনা করছি যে কোন পুরুষ নারীকে ছাড়া সম্পূর্ণ হবে না, আর এই সম্পূর্নতাই নতুন প্রজন্মকে জন্ম দিবে। আর তোমাকেও একটি বর দিচ্ছি আমার নাম
আজ থেকে লক্ষীপতি এবং আমার নারায়ন নামের পূর্বে তোমার নাম যুক্ত হবে। আমার নাম আজ থেক লক্ষীনারায়ন। তখন মা লক্ষী বললেন,.তোমায় কোটি কোটি প্রনাম শ্রীহরি। এবার আমার কাজ বলে দাও। শ্রীবিষ্ণু বললেন তুমি আমার প্রেরণা। আমি তোমার কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই সৃষ্টি পালন করব। আর তুমি ব্রহ্মা
সৃষ্ট প্রানীদের উপর ধনের বর্ষা করবে।



এরপর শ্রীনারায়ন ব্রহ্মার কাজে সহায়তার জন্য যোগ নিদ্রায় মগ্ন হলেন এবং যোগের মাধ্যমে ব্রহ্মাকে শক্তি প্রদান করতে থাকলেন। ভগবান শ্রী বিষ্ণুর এবং ব্রহ্মার শক্তি একত্রিত হয়েও সৃষ্টি রচনার কাজ অগ্রসর হচ্ছিল না। এটাও প্রকৃত পক্ষে শ্রীবিষ্ণুর লীলারই অংশ ছিল। এদিকে সৃষ্টি রচনার কাজ এগোচ্ছে না দেখে ব্রহ্মা বিষ্ণুর শরনাপন্ন হলেন। তখন বিষ্ণু যোগ নিদ্রা মগ্ন ছিলেন। ব্রহ্মা গিয়ে বিষ্ণুর স্তব করতে লাগলেন। বিষ্ণু স্তবে খুশি হয়ে চোখ
খুললেন। ব্রহ্মা বিষ্ণুকে বললেন হে ক্ষীরসাগর বাসী কমল নয়ন রক্ষা কর। বিষ্ণু তাঁর সুমধুর হাসি হেসে বললেন, শান্ত হোন আদি প্রজাপতি, শান্ত হন। অধীরতা ত্রিদেবের মাঝে শোভা পায় না। ব্রহ্মা বললেন কিভাবে শান্ত হব জগদীশ বলুন। আমি সৃষ্টি করার জন্য জন্ম নিয়েছি। কিন্তু আমার এবং আপনার শক্তি মিলেও তো এই
মহান কার্যকে রূপ দিতে পারছে না।



এভাবে চলতে থাকলে তো আমার জন্ম বৃথা হয়ে যাবে। আমাকে এই সংকট থেকে বাঁচান প্রভু। নারায়ন হাসলেন, বললেন, আপনি সৃষ্টি কর্তা, আমি পালন কর্তা কিন্তু আমরা ছাড়াও আর একজন আছে যাঁর কাছে একটা মহান কাজের দায়িত্ব আছে মহাদেব। আপনি তাঁর কাছে যান। তিনি আপনাকে সহায়তা করবে। আর তখনি সৃষ্টি রচনার কাজ সার্থক হবে। কারন সৃষ্টির অর্থই জন্ম পালন এবং ধ্বংস। তিনি সংহার কর্তা। তাঁর শক্তিই সৃষ্টি রচনাতে সাহায্য করবে। শ্রীবিষ্ণুর আদেশে ব্রহ্মা শিবের কাছে গেলেন এবং তাঁকে শ্রীবিষ্ণুর কথা ও অনুরোধ জানালেন। শিব তখন যোগের মাধ্যমে শিব এবং শিবা এই দুই খন্ডে ভাগ হয়ে গেলেন। এই শিবাই আদি শক্তি। এরপর ত্রিদেবের একত্রিত.শক্তি দিয়ে নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্লহ, জীব ও.জড় তৈরী করলেন। এদিকে বিষ্ণু যখন যোগনিদ্রা মগ্ন থেকে ব্রহ্মাকে শক্তি দিচ্ছিলেন তখন তাঁর কান থেকে মধু ও কৈটভ নামে দুটো অসুর জন্ম নিল। তারা প্রচন্ড শক্তিশালী ছিল। তারা সামনে ব্রহ্মাকে পেয়ে আক্রমন করল। ব্রহ্মা তাদের কাছ থেকে পালিয়ে বিষ্ণুর শ্মরণে এলেন এবং বিষ্ণু তাদের গদাপ্রহারে হত্যা করলেন। গদার আঘাতে এই বিশালদেহী অসুরদের মেদ ছড়িয়ে পরল। তখন বিষ্ণুর আদেশে ব্রহ্মা এই মেদ বা চর্বি দিয়ে পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। এজন্য পৃথিবীর অপর নাম মেদিনী।

সমগ্র জড় জগৎ সৃষ্টির পর ব্রহ্মা তাঁর চার হাত থেকে চারজন ছোট ছেলেকে তৈরী
করলেন। তাদের নাম সনদ, সনাতন,সনন্দন ও সনদকুমার। ব্রহ্মা তাদের সৃষ্টি পরিচালনা ও
বংশবিস্তার করতে আদেশ দিলেন। কিন্তু তাদের ইচ্ছার অভাব ছিল তাই তারা এতে অপারগতা প্রকাশ করে। যার ফলে ব্রহ্মা ক্রুদ্ধ হয় এবং তাদের দূর করে দেন ব্রহ্মলোক থেকে। এবার ব্রহ্মা ভাবলেন সৃষ্টি রচনার আগে প্রয়োজন ভাল শিক্ষকের তাই তিনি সপ্তর্ষিকে তৈরী করলেন। এরপর তৈরী করলেন ব্রহ্মার মানসপুত্র দক্ষ
এবং নারদকে। তিনি দক্ষকে প্রজাপতি নিযুক্ত করলেন এবং দেবর্ষি নারদকে ভগবত
ভক্তি প্রচারের নির্দেশ দিলেন। এবার তৈরী করলেন মনু ও শতরূপাকে। এই মনু ও শতরূপাই আমাদের আদি পিতামাতা।



এরপর ব্রহ্মার মনে হলো যে তিনি এই মহান সৃষ্টি রচনা করেছেন। তাঁর মনে অহংকার তৈরী হল। তখন শিব দেখলেন এই অহংকার ঠিক না এতে করে সৃষ্টিতেও অরাজকতা তৈরী হবে তাই তিনি ব্রহ্মার নিকটে গেলেন। কিন্তু ব্রহ্মার অহংকার এতটা চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল যে শিব শত চেষ্টা করেও বোঝাতে পারলেন না ব্রহ্মাকে। ব্রহ্মা একসময় শিবের অপমান করতে শুরু করলেন। তখন শিব ক্রুদ্ধ হয়ে মহারূদ্র রূপ ধারন করে তাঁর ত্রিশুল ব্রহ্মার দিকে নিক্ষেপ করলেন যা ব্রহ্মার একটি মস্তক কেটে ফেলল। ব্রহ্মাকে শিব সব ধরনের পূজা অর্চনা থেকে
বহিস্কার করলেন। ব্রহ্মা মস্তক কাটার পরে ভগবান সদা শিবের স্বরূপ চিনলেন।
তিনি শিবের স্তব করতে লাগলেন। শিব খুশি হলেন। তিনি বললেন ব্রহ্মাকে, হে আদি
প্রজাপতি অহংকার পতনের মুল। আপনার পন্ঞ্চম মাথাটি ছিল অহংকারের স্বরূপ
যা আমি কেটে ফেলেছি। আপনার অহংকার সমূলে নাশ হয়েছে। এটা বলে শিব অন্তর্ধান হয়ে গেলেন। ব্রহ্মার পুত্রদের মধ্যে সপ্তর্ষি এবং নারদ বুঝেছিলেন যে শিব ব্রহ্মার মঙ্গলেই তাঁর মাথা কেটেছান। এই মাথাটা না কাটলে অহংকারের
কারনে ব্রহ্মা ত্রিদেব হওয়ার মর্যাদা হারাতেন। কিন্তু ব্রহ্মাপুত্র দক্ষ এটা বুঝলেন না। তিনি শিবকে শত্রু ভাবতে লাগলেন।



পরমকরুনাময় সচ্চিদানন্দ গোলোকপতি ভগবান শ্রীহরি ও তাঁর একান্ত হ্লাদিনী
শক্তি শ্রীরাধার চরণকমলে সবার মঙ্গলময়, কল্যাণময়, সুন্দরময় আর শান্তিময়
জীবনের প্রার্থনা আমাদের।




🇯🇦🇾 🇸🇷🇮 🇰🇷🇮🇸🇭🇳🇦

(C)  প্রসেনজিৎ মোহন দাশ
0 comments

শ্রীকৃষ্ণের পরম চমৎকারিত্ব

দীর্ঘকাল পূর্বে সরস্বতী নদীর তীরে মহান ঋষিগনের এক সভা বসেছিল যারা সত্ৰ নামে এক যজ্ঞ করেছিলেন। এধরণের সভায় উপস্থিত মহান ঋষিগন সাধারণত বৈদিক বিষয় আর দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, আর এই বিশেষ সভায় নিম্নোক্ত প্রশ্ন গুলো উঠলো: এই জড় জগতের ত্রিদেব, ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব, যাঁরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত ব্যাপার পরিচালনা করছেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে? এই প্রশ্নের ওপর দীর্ঘ আলোচনার পর ব্রহ্মার পুত্র মহর্ষি ভৃগুকে ত্রিদেব কে পরীক্ষা করে তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কে তা এই সভাকে জানানোর দায়িত্বে নিযুক্ত করা হলো।


এভাবে নিযুক্ত হয়ে মহর্ষি ভৃগু প্রথমে তাঁর পিতার নিবাস ব্রহ্মলোকে গেলেন। ত্রিদেব তিন পার্থিব গুণ যাদের নাম সত্ব, রজ আর তম গুণের নিয়ন্ত্রা।ঋষিগনের মহর্ষি ভৃগুকে পরীক্ষা করতে নিযুক্ত করার উদ্দেশ্য ছিল জানা এই যে কে সাত্বিক গুনে পরিপূর্ণ। সুতরাং ভৃগু মুনি তাঁর পিতা ব্রহ্মার কাছে যখন পৌঁছলেন, যেহেতু পরীক্ষা করতে ইচ্ছুক ছিলেন, তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই প্রণাম বা প্রার্থনা করে সম্মান জ্ঞাপন করলেন না। পুত্র বা শিষ্যের কর্তব্য পিতা বা গুরুর কাছে গেলে সম্মান জ্ঞাপন করা ও যথাযথ প্রার্থনা করা। কিন্তু ভৃগু মুনি ব্রহ্মাকে অবহেলার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য ইচ্ছা করেই এমন করলেন না। ব্রহ্মা তাঁর পুত্রের ধৃষ্টতায় খুব ক্রোধান্বিত হলেন, এবং তাঁর ভাব ভঙ্গিমায় এটা বোঝা গেল। তিনি এমনকি অভিশাপ দিয়ে দণ্ডাদেশ দেওয়ার জন্যও উদ্যত হলেন, কিন্তু যেহেতু ভৃগু তাঁর পুত্র ছিল, তিনি তাঁর মহৎ বুদ্ধিমত্তার দ্বারা নিজের রাগ সম্বরন করলেন। এর অর্থ যদিও রাজসিক গুন তাঁর মধ্যে সর্বাত্মক ছিল, কিন্তু তাঁর এটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ছিলো। ব্রহ্মার ক্রোধ আর তাঁর ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করা আগুন আর জলের সাথে সম্পর্কিত। সৃষ্টির শুরুতে আগুন থেকে জল তৈরি হয়, কিন্তু জল দিয়েই আগুন নেভানো যায়। অনুরূপ ভাবে রাজসিক গুণের কারণে ব্রহ্মা যদিও রেগে গিয়েছিলেন, তবুও তিনি তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন কারণ ভৃগু ছিলেন তাঁর পুত্র।

ব্রহ্মদেব কে পরীক্ষা করার পর, ভৃগু মুনি সরাসরি কৈলাশ পর্বতে গেলেন, যেখানে শিব বাস করেন। ঘটনাচক্রে ভৃগু মুনি ছিলেন শিবের ভাই। তাই ভৃগু মুনি যেতেই শিব খুব খুশি হয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করতে নিজেই উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু যখন শিব এগিয়ে এলেন, ভৃগু মুনি তাঁকে আলিঙ্গন করতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন "আমার প্রিয় ভ্রাতা, তুমি সব সময় খুব অপবিত্র থাকো। যেহেতু তুমি অঙ্গে ভস্ম লেপন করে থাকো, তুমি খুব পরিষ্কার নও। তাই দয়া করে আমায় স্পর্শ কোরো না।" শিব অপবিত্র একথা বলে যখন ভৃগুমুনি তার ভ্রাতাকে আলিঙ্গন করতে অস্বীকার করলেন, শিব খুব রেগে গেলেন। বলা হয় যে শরীর, মন বা বাক্য দ্বারা অপরাধ করা হয়। ভৃগুমুনির প্ৰথম অপরাধ যা তিনি ব্রহ্মদেবের কাছে করেছিলেন, তা ছিলো মনের দ্বারা কৃত অপরাধ। তাঁর দ্বিতীয় অপরাধ যা তিনি শিবের কাছে করেছিলেন তাঁকে অপমান করে, তা ছিলো বাক্যের দ্বারা কৃত অপরাধ। যেহেতু তামস গুন শিব এর মধ্যে প্রধাণ, ভৃগুর অপমানসূচক বাক্য শুনে তৎক্ষণাৎ ক্রোধে তাঁর চক্ষু লাল হয়ে গেলো। অনিয়ন্ত্রিত উষ্মায় তিনি ত্রিশূল নিয়ে ভৃগুমুনিকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। সেই সময় শিবপত্নী পার্বতী উপস্থিত ছিলেন। শিবের মতোই তাঁর ব্যক্তিত্বও তিন গুণের সংমিশ্রণ, তাই তাঁকে ত্রিগুনময়ী বলা হয়। এক্ষেত্রে তিনি শিবের সাত্বিক গুন জাগিয়ে তুলে পরিস্থিতি সামলালেন। তিনি তাঁর স্বামীর চরণে পড়লেন আর তাঁর মধুর বচনের দ্বারা ভৃগু মুনির হত্যার বিবেচনা মুক্ত করালেন।
----জয় শ্রীJরাধে গৌবিন্দ---

(C)  Bishojit Das
0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger