সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রাধা রানী অস্বীকারীদের যৌক্তিক উত্তর

আজ রাধারানীর সখী শ্রীললিতা দেবীর আবির্ভাব তিথি। কাল রাধাষ্টমী। বৃন্দাবনেশ্বরী , গোলকপুরীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রীরাধারানীর বৃষভানু কন্যা রূপে আবির্ভাব তিথি। আজকাল দেখা যাচ্ছে অনেকেই রাধার অস্তিত্ব অস্বীকার করছেন । এটা সত্য যে “রাধা” দেবীর অস্তিত্ব মহাভারত বা শ্রীমদ্ভাগবতে পাওয়া যায় না। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন মহাভারত কিন্তু পূর্ণ শ্রীকৃষ্ণজীবনী নয় । এখানে পঞ্চপাণ্ডব ও কুরুপাণ্ডব যুদ্ধ ও শ্রীমদ্ভগবতগীতাই মুখ্য। ঘটনাচক্রে এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আংশিক লীলার পরিচয় পাই । এখানে তিঁনি শান্ত অর্থাৎ পরব্রহ্ম রূপে আত্মপ্রকাশিত। আবার শ্রীমদ্ভাগবতে গুপ্তা দেবী রূপে রাধারানীর উল্লেখ আছে।

রাসলীলার আরম্ভে প্রধানা সখীকে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মণ্ডল থেকে- সেটা আছে। গুপ্তা দেবীরূপে রাধারানী সকল ভক্তকে কৃপা করেন। রাধারানী কৃপা না করলে সেই ভক্ত কোটি জন্মেও কৃষ্ণ কৃপা পায় না। রাধারানী কি কাল্পনিক ? মোটেও তা না। পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য অনেক লেখক শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র রচণা করেছেন, তাতে রাধারানী প্রসঙ্গ আনেন নি। কারণ বিপ্লববাদে “প্রেম” নয় সুদর্শন ধারী শ্রীকৃষ্ণের রূপ প্রয়োজন।

এখন পরিস্থিতি অনুসারে ভগবানের রূপ ধারণ। অসুর দমন কালে ভগবান কিন্তু অতি ক্রুদ্ধ নৃসিংহ রূপ ধরেছিলেন আবার সেই এক ভগবান রাসমণ্ডলে সখীদের বাসনা পূর্ণ করার জন্য শ্যামসুন্দর বংশীধারী রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এমনকি চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি ধারণ করলেও সখীরা সেই রূপে নয় বরং সেই বংশীধারী বনমালা শোভিত কৃষ্ণ স্বরূপকেই কামনা করেছিলেন । আর শ্রীমদ্ভাগবতগীতা বলার সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অদ্বৈতস্বরূপ এ এসে বিরাট ব্রহ্মের স্বরূপ তুলে ধরেছিলেন। সুতরাং গীতায় যে মাধুর্য রসের সাধিকা রাধা ও সখীদের নাম থাকবেই না ইহা বোঝাই যায়।
শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী মহাশয় ব্যক্ত করেছেন-
আত্মেন্দ্রিয়প্রীতি বাঞ্ছা- তারে বলি ‘কাম’।
কৃষ্ণেন্দ্রিয়প্রীতি- ইচ্ছা ধরে ‘প্রেম’ নাম ।।

“প্রেম” কাহাকে বলে ? একটি ছেলে একটি মেয়ের হাত ধরে বের হয়ে গেলো বা পর ধর্মের একজনকে বিয়ে করলো ভালোবাসা করে – সেটি কি ? না তা নয় । ভগবান এর প্রীতির জন্য যে ইচ্ছা তাহাই প্রেম । আর বাকী সব ইচ্ছা “কাম” নামেই পরিচিত। অর্থাৎ ইষ্টদেবের সেবা, আকুতি , মিনতি হল প্রেম । প্রেমের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ রূপে বলে বোঝানো যায় না। কৃষ্ণ ভজনের পথে নিজেই উপলব্ধি করা যায় । এবার আসা যাকা শ্রীরাধারানী প্রসঙ্গে। তত্ত্ব কথানুসারে জীবাত্মা মাত্রই “রাধা” বা প্রকৃতি । পুরুষোত্তম একমাত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ । জীবাত্মা আর পরমাত্মার যে মিলন হয় তাই “মহারাস”।

 এই মিলন অন্তরে দিব্য স্বরূপে হয়। জড়জাগতিক ভাবে এই মিলনের ব্যাখা বা উপলব্ধি কোনোটাই হবে না । অষ্টসখী ( ললিতা, বিশাখা, সুচিত্রা, চম্পকলতা , সুদেবী, রঙ্গদেবী, তুঙ্গরেখা ও ইন্দুরেখা ) হলেন রাধারানীর ‘পরমশ্রেষ্ঠসখী’। এঁনাদের পথ অবলম্বন করে মঞ্জরী ভাব নিয়ে যুগলের সেবাই সাধনা। গুরু পরম্পরা অনুসারে এই সাধনা গুপ্ত । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও ভগবান বিষ্ণু এক । বৈকুণ্ঠধাম হল ভগবান বিষ্ণুর নিবাস। যাঁরা নৃসিংহ, ভগবান শ্রীরাম, বরাহ, বামন, বুদ্ধ আদি অবতারের সাধনা করেন তারা এই বৈকুণ্ঠধাম প্রাপ্ত হন। এমনকি ভগবানের হস্তে নিহত অসুরেরাও এই লোকে আসেন। কিন্তু গোলোকধাম এই বৈকুণ্ঠধামের ওপর। যারা কুঞ্জসেবাদি করেন, তারাই এই ধামে আসেন। মাধুর্য ভাবেই এই ধামে আসা যায় ।

 বস্তুত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্যাতীত অপর কারোর মাধুর্য সেবা নাই। আর সখীরা চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি নয়, শ্যামসুন্দর শ্রীকৃষ্ণ স্বরূপই কামনা করেছিলেন । এই মাধুর্য সেবাই শ্রেষ্ঠ। যথা শ্রীল কবিরাজ গোস্বামী লিখেছেন রায় রামানন্দের সাথে মহাপ্রভুর আলাপ প্রসঙ্গে-
মহাপ্রভু, ভক্ত রায় রামানন্দ সনে এই গোপিনী প্রেমকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলেছিলেন-

পূর্ব পূর্ব রসের গুণ পরে পরে হয় ।
দুই তিন গণনে পঞ্চ পর্যন্ত বাঢ়য় ।।
গুণাধিক্যে স্বাদাধিক্যে বাঢ়ে প্রতি রসে ।
শান্তদাস্যসখ্যবাৎসল্যেরগুণমধুরেতে বৈসে ।।
আকাশাদির গুণ যেন পর পর ভূতে ।
দুই তিন ক্রমে বাঢ়ে পঞ্চ পৃথিবীতে ।।
পরিপূর্ণ কৃষ্ণপ্রাপ্তি এই প্রেমা হৈতে ।
এই প্রেমের বশ কৃষ্ণ কহে ভাগবতে ।।
( শ্রীচৈতন্যচরিতামমৃত – মধ্যলীলা )

রাধারাণী হলেন শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি। স্বামী স্ত্রী যখন একত্র হন তখনই সন্তানের জন্ম হয়। আদিমকাল থেকে এই ভাবেই চলছে। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড , কোটি কোটি নক্ষত্র যিঁনি সৃষ্টি করেছেন সেই ব্রহ্ম কে পুরুষ আবার প্রকৃতিও ধরা হয়। যিনি পুরুষ তিনিই প্রকৃতি। রামকৃষ্ণ দেব একজায়গায় বলেছেন- “বেদে যিনি ব্রহ্ম তন্ত্রে তিনিই শক্তি”। সেই পুরুষ প্রকৃতি( শক্তি) রূপ অর্ধনারীশ্বর । শিব আর কালী। কৃষ্ণ আর শ্রীরাধিকা । এই পুরুষ যখন নিস্ক্রিয় হন, প্রকৃতি বা শক্তি হন সক্রিয় । কালীমূর্তি দেখলে দেখবেন, মায়ের চরণে শান্ত অর্ধ নিদ্রিত ঢুলুঢুলু চোখে মহাদেব উপরে দেবীর চোখে তাকিয়ে আছেন, পুরুষ এখানে নিদ্রিত, তিঁনি দেবীর দিকে তাকিয়ে। আবার মা কালী নয়ন নীচে মেলে মহাদেবের নয়নে দৃষ্টি রেখেছেন, তিঁনি সক্রিয় – সৃষ্টি- স্থিতি- লয় করছেন ।

বস্তুত আদ্যাশক্তির রূপ হলেন রাধারানী। শক্তি যখন পুরুষের বামে অবস্থান করেন, তখন সেই রূপ হয় পরিপূর্ণ। দেখবেন কৃষ্ণ বামে মাথা হেলিয়ে সেই ভাবে আদ্যাশক্তি রাধারানীর দিকে তাকিয়ে আছেন, আর রাধারানী বরামুদ্রায় আছেন, অর্থাৎ আশীর্বাদ দিচ্ছেন। শ্রীকৃষ্ণের কোনো এমন ছবি দেখেছেন যেখানে রাধাকে বামে নিয়ে একহাতে বাঁশী ধরেছেন অপর হাতে আশীর্বাদ দিচ্ছেন? এমন দেখা আয় না। ব্রহ্ম এখন শক্তির দিকে চেয়ে আছেন, আর শক্তিরূপিনী রাধারানী আশীর্বাদ করে “কৃষ্ণপ্রেম” প্রদান করছেন । শ্রীরূপ গোস্বামী “উজ্জ্বলনীলমণি” গ্রন্থে লেখেছেন-
হ্লাদিনী যা মহাশক্তিঃ সর্বশক্তিবরীয়সী ।

হ্লাদিনী যে মহাশক্তি যিনি শক্তিগণ দ্বারা পূজিতা । আর সেই রাধারাণী “কৃষ্ণপ্রেম” প্রদান করেন । আপনি যদি সব সময় শ্রীকৃষ্ণের কাছে “প্রেম” চান উনি দেবেন না। গৌড়ীয়া মতে এই প্রেম প্রদান করেন রাধারানী । আর তার জন্য দরকার যুগলের সেবা, আকুতি মিনতি, সদগুরু দ্বারা মঞ্জরী সেবা গ্রহণ। আর চাই শাস্ত্র শ্রবণ, সাধুসঙ্গ , অসৎ আলাপ বর্জন । বস্তুত রাধারানী কাল্পনিক নয়। শ্রীমদ্ভাগবতের গুপ্তা দেবী তিনি । “রাধা” নামে আঁখি ধারা ঝড়লে সেই প্রেমের পথে গোবিন্দ প্রাপ্তি হয় । রাধারানী কাল্পনিক দেবী নন- তিনি বীজমন্ত্রস্বরূপা গুপ্তা দেবী।

সবার সামনে সেই তত্ত্ব প্রকাশ করা যায় না, করেও বোঝানো যায় না। ভজন হয় গোপোনে – মনে মনে। ফেসবুকে পোষ্ট দিয়ে ভজন হয় না, শাস্ত্রীয় তর্ক করেও ভজন হয় না। যারা ভজনহীন , সাধনহীন তাঁহাদিগের কাছে “রাধারানী” হামেশাই কাল্পনিক থাকবেন। আর একদিন তারাও একসময় কাল্পনিক হয়ে যাবেন। কারণ লক্ষ কোটি পশু জন্ম তারপর মানব জন্ম পেয়ে ঈশ্বর সাধনার সুযোগ মেলে- এটাকে হাতছাড়া করা উচিৎ না ।
0 comments

হিন্দু ধর্মের কিছু নিয়মের পেছেন কিছু যুক্তিগ্রাহ্য কারণ থাকে।

গর্ভবতী নারীদের ভূতের গল্প শুনতে নেই কেন ?

উঃ- গর্ভবতী নারীকে খুব সাবধানে থাকতে হয়। সামান্য ভুলের জন্য সন্তান এমনকি মায়ের জীবন সংশয়ও হতে পারে। ভূতের গল্প শুনে আমরা ভয় পাই । এমন কি একলা থাকলে সেই সব গল্প মনে জেগে উঠলে আমরা শঙ্কিত হই। স্বপ্ন দেখে চমকে উঠি। কারণ আমরা যা ভাবি, সেই গুলিই স্বপ্নে আসে। এখন প্রাচীন কালে বিদ্যুৎ আবিস্কার হয় নি। প্রদীপ, লণ্ঠন , হ্যাজাক ছিলো ভরসা। এই অবস্থায় ভূতের গল্প শুনে এবং একলা থাকা কালীন এসব ভেবে গর্ভবতী নারী ভয় পেলে বা স্বপ্নে চমকে উঠলে গর্ভের সন্তান ও মা দুজনের জীবন সংশয় হতে পারে। বিশেষ করে ভয় পেয়ে জ্বর হলে সেটা খারাপ। সেজন্য এই নিয়ম গর্ভবতী নারীদের ভূতের বা হিংসামূলক, খুন খারাপির গল্প শুনতে নেই।

গর্ভবতী নারীদের ঈশ্বরের কথা শোনা উচিৎ কেন ?

ঊঃ- হিন্দু পুরাণ বলে প্রহ্লাদ তাঁর মাতা কয়াদুর গর্ভে থাকাকালীন নারদ মুনির আশ্রমে হরিনাম শুনতে পেয়ে হরি ভক্ত হন। মহাভারতে বলে শুভদ্রার গর্ভে থাকাকালীন অভিমণ্যু পিতা অর্জুনের মুখের যুদ্ধবিদ্যা শুনে যুদ্ধ শিখেছিলেন। পৌরাণিক এই সকল আখ্যানের মাধ্যমে যে সত্যি পুরাণকার রা শেখাতে চেয়েছিলেন, তা হল- গর্ভকালীন অবস্থায় নারী যদি ঈশ্বরের কথা, শাস্ত্র পাঠ ইত্যাদি শোনেন- তবে তার মন প্রান উৎফুল্ল থাকবে। এটা গর্ভবতী নারীর পক্ষে উত্তম। সুস্থ, আনন্দিত থাকলে মনে ভয় টয় আসবে না। সন্তান ভালো থাকবে। তবে এই সময় পূজা পাঠ- উপোস নিষিদ্ধ, কারণ এতে শরীরের পরিশ্রম হয়। আর গর্ভবতী নারীদের বিশ্রাম নেওয়া খুব প্রয়োজন। সেজন্য গর্ভবতী নারীরা ভজন কীর্তন শুনবেন। ধার্মিক পুস্তক ও মহাপুরুষদের জীবনি পড়বেন ।

গর্ভবতী নারীদের খোলা আকাশের তলায় খেতে নেই কেন ?

ঊঃ - গর্ভবতী নারীদের খোলা আকাশের তলায় খেতে নেই। বলে খোলা আকাশের তলায় খেলে বেতাল, পিশাচ দের দৃষ্টি পড়ে গর্ভবতী নারীদের ওপর। এর কারণ আছে। গর্ভস্থ সন্তান খুব সেনসিটিভ। সামান্য ভুলে মা ও সন্তান উভয়েই মারা যেতে পারে। খোলা আকাশের তলায় খেলে উড়ন্ত পাখীর মল বা ধূলাবালি, জীবানু খাবারে পড়তেই পারে। অজান্তে তা খেলে কি হবে বোঝাই যায়। তাই গর্ভবতী নারীদের সাবধানে চলা উচিৎ।

গর্ভবতী নারীদের সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হওয়া বারণ কেন ?

ঊঃ- গর্ভবতী নারীদের সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে দেয় না। বলে ভূত প্রেতের দৃষ্টি পড়বে গর্ভের সন্তানের ওপর। এর কারণ আছে। আসলে প্রাচীন কালে বিদ্যুৎ আবিস্কার হয় নি। তখন সন্ধ্যায় বের হলে হোঁচট খেয়ে পড়লে গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু ত হতেই পারে সাথে মায়েরও। এছাড়া সূর্যাস্তের পর কিছু জীবানু সক্রিয় হয়। সূর্যের আলো বহু প্রকার জীবানু নাশ করে। সেইজন্য সন্ধ্যার পর জীবানু শরীরে আসতে পারে। এছাড়া শীতল বাতাসে ঠাণ্ডাজনিত রোগের শিকার হতে পারে গর্ভবতী নারী। যার কুপ্রভাব সন্তানের উপরেও পড়ে। এছাড়া বিষাক্ত পোকামাকড়, সাপ, বিছা এই রাতের অন্ধকারেই বের হয় । প্রাচীন কালে ত ইলেকট্রিক আবিস্কার হয় নি। সেই জন্য এই নিয়ম ।

সন্ধ্যাকালে প্রদীপ দেওয়া হয় কেন তুলসী তলায় ?

ঊঃ- সন্ধ্যাকালে গৃহের রমণীরা তুলসী তলায় প্রদীপ দিয়ে শাঁখ বাজান। এটি হিন্দু ঐতিহ্য । যদিও এখন সন্ধ্যাবেলায় অধিকাংশ বাড়ীতে টিভির আওয়াজ শোনা যায়। প্রথমত এটি হল গৃহ আঙিনা আলোকিত করার জন্য। দ্বিতীয় সন্ধ্যার পর কিছু ফসলের ক্ষতিকারী পোকা বের হয়। যারা আগুন দেখে লম্ফ দিয়ে পুড়ে মরে। যেমন পঙ্গপাল, শ্যামাপোকা, মাজরা পোকা ইত্যাদি। ফসলের ক্ষতি কম হয়। আর প্রাচীন কালে ছিলো মাইলকে মাইল বন জঙ্গল মাঠ, তারপর একটি গ্রাম। তখন ত ইলেকট্রিক, মোবাইল গুগলি ম্যাপ এগুলো কিছুই ছিলো না। সন্ধ্যার অন্ধকারে পথিক গ্রামের দিক ভ্রষ্ট হয়ে সোজা পড়তো বিপদের মুখে কারণ সে সময় বাঘ, ডাকাত, ঠক দের উৎপাত ছিলো । এজন্য প্রদীপের আলো দেখে পথিক গ্রামের দিশা দেখতে পেতো।

কার্ত্তিক মাসে আকাশপ্রদীপ দেওয়া হয় কেন ?

ঊঃ- কার্ত্তিক মাসে আকাশ প্রদীপ দেওয়া হয়। একটা উচু বাঁশ বা উচু জায়গার মাথায় একটি প্রদীপ দেওয়া হয়। একে আকাশ প্রদীপ বলে। এর একটি কারণ কার্ত্তিক মাসে খুব পোকার উৎপাত। পোকা গুলো আগুনে এসে পুড়ে মরে। আর একটি কারণ কার্তিক মাসে কুয়াশা পড়ে অল্পস্বল্প। মাইলকে মাইল মাঠের পর একটি গ্রাম থাকতো আগের দিনে। কুয়াশাতে দিক ভ্রষ্ট হতেই পারে । পথিক যাতে দিকভ্রষ্ট না হয় তার জন্য উঁচু জায়গাতে প্রদীপ দেওয়া হত ।
ভালো লাগলে বলবেন। আবার কিছু যুক্তি কারণ নিয়ে লেখবো।
0 comments

"! 'ওঁ' বা 'প্রণব' তত্ত্ব !"

'ওঁ' শব্দটি অতি পবিত্র। যার উচ্চারণ অ-উ-ম্। একে ওঙ্কার বা প্রণবও বলা হয়। ওঙ্কার শব্দটি এমন মহাপপবিত্র যে সর্ব্বাবস্থায় ব্যবহার করা উচিৎ নয়। এই জন্য এর আর এক নাম প্রণব। 'প্র' উপসর্গ পূর্ব্বক 'নু' ধাতুর 'অল্' প্রত্যয়ে 'প্রণব' গঠিত। 'নু' ধাতুর অর্থ ডাকা বা স্তব্ধ করা। প্রণব অর্থ প্রকৃষ্ট উপায়ে ডাকা, অতি সুন্দর ভাবে ডাকা, প্রীতির সাথে ডাকা।

মানুষের অনেক নাম থাকে। একটি পোষাকী নাম হয়, আর একটি থাকে ডাকনাম। কেউ যদি কাউকে ডাকনাম ধরে ডাকে, তাহলে তার অধিক প্রীতি হয়। বোঝা যায় সে অতি প্রিয় বা আপন জন। ব্রহ্মের অনেক নাম। কেউ যদি তাঁকে 'ওঁ' বলে ডাকে, তবে তিনি অধিক প্রীত হন। তাকে প্রিয়জন মনে করেন। ভগবানকে তুষ্ট করতে এই নামটি সুন্দর, মনোহর। এজন্য ওঙ্কারকে প্রণব বলে। শ্রেষ্ঠ পুরুষের বাচক শব্দ প্রণব। ঈশ্বর বাচ্য আর প্রণব বাচক। উপনিষদ বলছে, গাছের সব পাতা যেমন যেমন কান্ডের সাথে যুক্ত, ঠিক একই ভাবে সব শব্দই একত্রিত আছে 'ওঁ' উচ্চারণের মধ্যে।'ওঁ'ই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। শুধু মানুই নয়, সমগ্র মহাবিশ্বেরও এই একীভূত হওয়ার প্রচেষ্টা আছে সরলীকরণের মাধ্যমে। আর পরমেশ্বর ঈশ্বর এটাই আশা করেন।

'ওঁ' এর প্রথম অর্থ হলো, অন্য কোনো অর্থ যুক্ত না করে মূলতত্ত্বকে ঘনীভূত রুপ দেওয়া এবং সহজ করা। 'ওঁ' এর দ্বিতীয় মানুষের প্রয়োজনে হ্যাঁ বোধক সাড়া দেওয়া। 'ওঁ' ই হচ্ছে পরিপূর্ণতা। স্তোত্র, প্রার্থনা এবং ধ্যান শুরু হয় গায়ত্রী মন্ত্র দিয়ে। যার শুরু ও শেষ 'ওঁ' দিয়ে। এই দুটি বস্তুই বিভিন্ন ভাবে পরম পুরুষকেই বোঝায়। 'ওঁ' ই শ্বাশত ব্রাহ্মণ, 'ওঁ' ই শেষ অবলম্বন। যার উপর মানুষ নিজেকে সমর্পণ করে দিতে পারে জীবন যাত্রার শেষে। অর্থাৎ ব্রহ্মনে মিলিত হওয়ার সময়ে। 'ওঁ' এর প্রতি উচ্চারণেই গভীর থেকে গভীরতর উপলব্ধি আসে সেই পরম একের। 'ওঁ' উচ্চারিত হয়ে থাকে শাস্ত্রাদি পাঠ, পবিত্র কাজ ইত্যাদির আরম্ভে এবং শেষে। যোগী পুরুষেরা অনবরত 'ওঁ' ধ্বনি উচ্চারণ করে থাকেন।

বারবার 'ওঁ' ধ্বনি উচ্চারণ এবং শ্রবণ মঙ্গলকারক। 'ওঁ' কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রার্থনার বস্তু নয়, এ সকলের, সার্বজনীন। 'ওঁ' কোনো দেবতার প্রার্থনার মন্ত্র নয়। সমগ্র বিশ্বপ্রপঞ্চকের মূল কথা নিহিত আছে এই শব্দে। এই ডাকটি একটি স্বর্গীয় বস্তু। সামগ্রিক পরমার্থিক চিন্তার আত্মসমর্পণ বলা যায় 'ওঁ' কে। 'ওঁ' ধ্বনির বিনাশ নেই। 'ওঁ' ই ব্রাহ্মণ, 'ওঁ' ই শব্দব্রহ্ম। 'ওঁ' শুধু ধ্বনিই নয়, নীরবতাও। এই মহাধ্বনি উচ্চারণের মাধ্যমে এক নীরবতার স্তর আছে, যার নাম 'তুরীয়'। প্রকৃত ঞ্জান এবং আত্মোপলব্ধির জন্য এই মাধুর্যমন্ডিত নীরবতাই অভিপ্রেত। প্রকৃত সাধণার শুরু নীরবতায় এবং অনন্ত শাশ্বত নীরবতায়ই মানুষের পরম প্রাপ্তি। 'ওঁ' ই প্রথম শব্দ, মহাবিশ্বের প্রথম প্রতীক, প্রথম বিকাশ, বাস্তব সত্তার ঘনীভূত রুপ। ইহা পৃথিবীর আগে, ইহাই পৃথিবীর শেষ কথা, ইহাই সারকথা। এর নিজস্ব কোনো অর্থ নেই। কারণ সমগ্র অর্থের এই ই উৎস। 'ওঁ' একের প্রতীক। পরমকরুনাময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অতি প্রিয় এই ওঙ্কার শব্দ।

তাঁর শ্রীচরণে আমাদের ভক্তিপূর্ণ অর্ঘ্য,
"ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়।"
!!হরে কৃষ্ণ হরে কৃৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে!!
!!জয় শ্রীহরি!! জয় রাধে!!

Written by: Ripon Saha
Like our page: সনাতন সন্দেশ - Sanatan Swandesh
0 comments

সাত প্রকার স্ত্রী কথা ও বুদ্ধের উপদেশে সুজাতার আমূল পরিবর্তন

সুজাতা ছিলেন ধনঞ্জয় শ্রেষ্ঠীর কন্যা। বিশাখার ছোট বোন সুজাতা ছোটকাল হতে অত্যন্ত মুখর দাম্ভিক ছিলেন। বিশাখার সহোদরা হলেও দু'বোনের মধ্যে স্বভাবের কোন মিল নেই। বড় বোন বিশাখা ধীরস্থির, বিদুষী, বিনীতা, শান্তশীলা ও বুদ্ধিমতি আর ছোটবোন সুজাতা ঠিক তার বিপরীত।
ধনঞ্জয় শ্রেষ্ঠী কন্যা সুজাতাকে অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠীর বাড়ীতে বিবাহ কার্য্য সম্পন্ন করেন। সুজাতার পিতার অতুল ঐশ্বর্য্যের নিকট শ্বশুর অনাথপিণ্ডিকের সম্পত্তি কম হলেও উপেক্ষণীয় নয়। তবুও শ্বশুরকুলের বিত্ত সুজাতার মনকে সন্তোষ দিতে পারল না।

অনাথপিণ্ডিক জেতবন বিহার তৈরী করতে চুয়ান্ন কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করেন। তখন তিনি সেই সময় প্রতিদিন পাঁচশত ভিক্ষুসংঘকে পিণ্ডদান করতেন। কত কর্মচারী, দাস-দাসী রয়েছে! তবুও সুজাতার মন খুশী নয়। ধীরে ধীরে তার স্বভাব, আত্মগৌরব ও দাম্ভিকতা উন্মুখ হয়ে উঠল। পিতার সম্পত্তির গর্ব করে শ্বশুরকুলের প্রতি অমান্যতা, কর্কশ বাক্য আর উচ্চবাক্য প্রয়োগ করতে লাগল। সকলের শান্তি নষ্ট হল। শান্তিকামী সুখবিহারী অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠীর সুখ ভেঙ্গে গেল। তাদের সুখের সংসারে অশান্তির সূচনা হল। অনাথপিণ্ডিক চিন্তিত হলেন। পুত্রবধুর কুৎসা প্রচার রটানো কি অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠীর শোভা পায়? অগত্যা তিনি নীরবে থাকায় বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন।

একদিন অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠী তথাগত বুদ্ধকে ঘরে আহারের নিমন্ত্রণ করেন। তথাগত যথাসময়ে এসে সুসজ্জিত আসনে উপবেশন করলেন। এমন সময়ে অন্তঃপুরে কলহের উচ্চ শব্দ শুনতে পেয়ে বুদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন। এতে শ্রেষ্ঠীর মুখ বিমর্ষ হইল। দুঃখের সাথে বললেন, ভগবান, আমার পুত্রবধু সুজাতাই যত অনর্থের মূল। ধনকুবের ধনঞ্জয় শ্রেষ্ঠীর কন্যা কিনা, তাই তার এত অহংকার বেশী! সে শ্বশুর-শ্বাশুরীকে মান্য করে না, স্বামীকে অমান্য করে, অবহেলা করে। এমনকি প্রভু! আপনাকেও সম্মান প্রদর্শনে সে আগ্রহী নয় মনে করি। অন্যজনের কথাই বা কি! তথাগত সুজাতাকে আহ্বান করলেন। সুজাতা এসে বুদ্ধকে বন্দনা করে বসে পড়ল।

 বুদ্ধ বললেন, সুজাতা! আমি এখন তোমাকে পুরুষের সাত প্রকার ভার্য্যা সম্বন্ধে বলব; (১) বধকাসমা ভার্য্যা, (২) চৌরিসমা ভার্য্যা, (৩) আর্য্যাসমা ভার্য্যা, (৪) মাতৃসমা ভার্য্যা, (৫) ভগ্নিসমা ভার্য্যা, (৬) সখীসমা ভার্য্যা ও (৭) দাসীসমা ভার্য্যা - এই সাত প্রকার ভার্য্যার মধ্যে তুমি কোন প্রকারের ভার্য্যা? সুজাতা তখন বিনীতভাবে বললেন, প্রভু! আপনি সংক্ষেপে যা বললেন তা আমি বুঝলাম না। অনুগ্রহ করে আমাকে ভালভাবে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিন আমি যাতে বুঝতে পারি। বুদ্ধ তখন বললেন, শোন সুজাতা ----

(১) যে স্ত্রী প্রদুষ্টাচিত্তা, কলহ স্বভাবা, স্বামীর অমঙ্গলকারিনী, পরপুরুষে আসক্তা, নিজের স্বামীকে অবজ্ঞাকারিনী, স্বামীর ধনসম্পদ অপব্যয়কারিনী, অর্থ না পেলে অনর্থকারিনী, স্বামীকে হত্যা করার ভয় দেখায়, এমনকি হত্যা করতেও উন্মুখ হয়, তেমন স্ত্রীকে বধকাসমা ভার্য্যা বলা হয়।

(২) যে স্ত্রী স্বামীর শিল্প-বাণিজ্য ও কৃষি কর্মের দ্বারা উৎপন্ন ধন-সম্পদ উপভোগ করে, তবুও স্বামীর সম্পদ চুরি করার ইচ্ছা করে এবং অল্প হলেও চুরি করে, যেমন- রান্নার সময় ধৌত করার জন্য যে চাউল নেয়া হয়, তা হতেও চুরি করে। আর অন্যকিছুর কথাই বা কি? সেই রকম স্ত্রীকে চৌরিসমা ভার্য্যা বলা হয়।

(৩) যে স্ত্রী নিষ্কর্মা আলস্যপরায়ণ, অধিক ভোজনকারিনী, আর্য্যের বস্তুর প্রতি অধিকার ও লোভ পরায়ণা, মুখরা, প্রচণ্ডা, দুর্ভাষিনী, বাক্যের উপর বাক্য প্রয়োগ করে, স্বামীকে অবজ্ঞা করে, জনমণ্ডলীকে পরাস্থ করার চেষ্টা করে, স্বামীর উৎসাহ উদ্যম অসহনশীলা। এই রকম স্ত্রীকে আর্য্যাসমা ভার্য্যা বলে।

(৪) স্বামীর সঞ্চিত ধন যে স্ত্রী রক্ষা করে, সর্বদা স্বামীর হিত কামনা করে ও উপকারিনী, মাতা পুত্রকে রক্ষার ন্যায় স্বামীকে রক্ষা করে, এই রকম স্ত্রীকে মাতৃসমা ভার্য্যা বলা হয়।

(৫) জ্যেষ্ঠ সহোদরের প্রতি কনিষ্ঠ ভগ্নির আদর ও সম্মান প্রদর্শনের ন্যায় যে স্ত্রী স্বামীকে প্রতি আদর সম্মান করে, স্বামীর প্রতি লজ্জাবনতা ও স্বামীর প্রতি অনুবর্ত্তনী হয়। এই রকম স্ত্রীকে ভগ্নিসমা ভার্য্যা বলে।

(৬) দীর্ঘদিন পরে সখার আগমনে সখীর আনন্দিত হবার মত স্বামী দর্শনে যে স্ত্রী আনন্দিত হয় এবং কুল মর্যাদা রক্ষাকারিনী, শীলবতী ও পতিব্রতা হয়। সে স্ত্রীকে সখীসমা ভার্য্যা বলা হয়।

(৭) যে স্ত্রী স্বামী শাসন-অনুশাসন এবং লাঠি হস্তে তর্জন-গর্জন করলেও যে স্ত্রীর চিত্ত দূষিত হয় না বা ক্রোধ হয় না, হিংসা উৎপন্ন হয় না বরং স্বামীর শাসন সহ্য করে এবং ক্রোধহীনা, শান্তশীলা ও স্বামীর আনুগত্য হয়। সে স্ত্রীকে দাসীসমা ভার্য্যা বলা হয়।

এই সাত প্রকার ভার্য্যা বিষয়ে বর্ণনা করার পর বুদ্ধ আরো বললেন “সুজাতা, যে সকল ভার্য্যা বধকা, চোরী ও আর্য্যাসমা হয়, মুখরা, প্রচণ্ডা, দুঃশীলা, লজ্জাহীনা হয় ও পরুষবাক্য প্রয়োগ করে, স্বামীকে অনাদর করে, অখাদ্য খাওয়ায়, স্বামী রোগগ্রস্থ হলে সেবা করে না, সেইসব স্ত্রী মৃত্যুর পর নরকে জন্ম নিয়ে দুঃসহ দুঃখ ভোগ করে। আর যেইসব স্ত্রী মাতৃসমা, ভগ্নিসমা, সখীসমা এবং দাসীসমা তারা মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গে উৎপন্ন হয়। সুজাতা, এই সপ্ত প্রকারের মধ্যে তুমি কোন প্রকারের ভার্য্যা? সুজাতা তখন বিনীত বাক্যে বললেন, প্রভু! অদ্য হতে আমাকে দাসীসমা ভার্য্যা বলে জানবেন। সুজাতা আবার বলে উঠল, প্রভু! আমি এতদিন অন্ধকারে আবৃত ছিলাম।

এখন আপনার দয়ায় আলোকের সন্ধান পেয়েছি। বাবার ঐশ্বর্য্যের অহঙ্কার আত্মভিমান এখন আমার ধ্বংস হয়েছে। আমার ভ্রান্তি নিরসন হয়েছে। ভগবান! মহান বৌদ্ধকুল পরিবারের কুলবধু হয়ে আমার বিচ্যুতির জন্য আমি এখন খুবই লজ্জিত, অনুতপ্ত। আপনার অমৃতবাণী আমার মনে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। এই বলে সুজাতা বুদ্ধের চরণ তলে ক্ষমা ভিক্ষা প্রার্থনা করলেন। আর শ্বশুর-শ্বাশুরীকে ও স্বামীর পায়ে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।

সেই হতে সুজাতা ভদ্রা, বিনীতা, শান্তশীলা, প্রিয়ভাষিনী হলেন; মধুর মিষ্টি স্বরে সকলের প্রতি প্রাণে প্রীতি ও আনন্দ দান করতেন; ত্রিরত্নের উপাসিকা হয়ে দানে আত্মনিয়োগে রত থাকতেন, শীল সমাধিতে ও প্রজ্ঞায় অনুশীলনে তাঁর কুল মর্যাদার অক্ষুন্ন রাখতেন। অর্থাৎ সুজাতার বিভিন্ন গুণ বিদ্যমানে সবাই আনন্দমুখর হয়ে উঠল। সর্বজ্ঞ বুদ্ধের মহিমাময় প্রভাবেই সুজাতার এমন বর্ণনাতীত আমূল পরিবর্তন হল।

(c) Prithwish Ghosh
0 comments

সাধনা

প্রকৃতিকে দেবীরূপে ভজনা- এই বিশ্বাস, সাধনা, দর্শন ও আরাধনার সমস্ত প্রক্রিয়াকে আমরা একত্রে বলতে পারি- ‘তন্ত্র’। যে তান্ত্রিক বিশ্বাসের উন্মেষ হয়েছিল নিষাদদের ধর্মীয় চেতনায়, নিষাদদের মাতৃতান্ত্রিক ধর্মীয় ভাবনায়। কাজেই তন্ত্রের উদ্ভব প্রাচীন বাংলায়। এই দেবী বাঙালিসমাজে ‘শক্তি’ দেবী নামে পরিচিতা। যারা শক্তি দেবীর উপাসনা করেন তারাই ‘শাক্ত’ বলে পরিচিত। ধর্মতত্ত্বের ভাষায় -- শাক্ত-তান্ত্রিক। শক্তিদেবী অবশ্য বাঙালিসমাজে আরও নানা নামে পরিচিতা। তন্ত্র থেকে তত্ত্ব। তন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বা উদ্দেশ্য হল তত্ত্বের সিদ্ধান্তকে জীবনের কর্মক্ষেত্রে রূপদান করা। কাজেই তন্ত্রের প্রচারের মাধ্যম আচরণ বা থিওরি নয়, প্র্যাকটিস্।

তন্ত্রমতে নারী জগতের আদি কারণ। তন্ত্রের উদ্ভব প্রাচীন বাংলার মাতৃতান্ত্রিক নিষাদসমাজে হয়েছিল বলেই এমনটাই ভাবা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল।

নিষাদদের কৌম (গোত্রীয়) সমাজটির গড়ন ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সমাজবিকাশের অনিবার্য নিয়মে প্রথমে নিষাদসমাজ ছিল শিকারী ও খাদ্য সংগ্রহকারী। তারা বাংলার প্রাচীন অরণ্যে ফলমূল কুড়োত। পরে হাতিয়ারের উন্নতি হল; তারা বনভুমি কেটে জমি চাষ করতে থাকে। এভাবে ওদের কৃষি জীবনে উত্তরণ ঘটে । তবে অনুন্নত হাতিয়ারের (টুলস) কারণে কৃষিজীবন ছিল ভারি অনিশ্চিত। ওদিকে গোত্রের জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল। কাজেই প্রকৃতির কৃপার ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় কী!
সেই আদিম নিষাদসমাজটি মাতৃতান্ত্রিক ছিল বলেই প্রকৃতিকে তারা ‘চৈতন্যময়ী’ ভেবেছিল। তারা নারীকে জগতের আদি কারণ বলেও ভাবল কাজেই অদৃশ্য প্রকৃতিক শক্তিটি ওদের আদিম মনে একজন দেবী হিসেবে প্রকাশ পেলেন, দেবতা হিসেবে নন। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে আর্যরা ভারতবর্ষে আসার পূর্বে শিব ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধানতম অনার্য দেবতা। একইভাবে, প্রাচীন বাংলাতেও আর্যরা আসার পূর্বে শিব ছিলেন প্রধানতম অনার্য দেবতা। যে কারণে প্রকৃতিকে দেবী কল্পনা করলেও শিবের গুরুত্ব এতটুকু কখনওই হ্রাস পায়নি।

তন্ত্রের প্রধান একটি সিদ্ধান্তই হল এই যে প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী মনে করা।
কিন্তু, শক্তি কি?

বিশ্বজগতে সবই তো শক্তির সমাহার। যে শক্তিকে বিজ্ঞান নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়। আধুনিক সভ্যতা এই মূলতত্ত্বের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতির সূত্র আবিস্কার করে এই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা যৌক্তিক এই প্রশ্নও তো আজকাল উঠছে । এই দৃষ্টিভঙ্গি হটকারী কিনা, পরিবেশ বিপর্যয়ের মূলে এই দর্শন সক্রিয় কিনা- এসব প্রশ্নও নিয়েও তো আমরা আজ উদ্বিগ্ন।

তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। তার কারণ, তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী জেনেছে, মা বলে জেনেছে, মায়ের দেবীপ্রতিমা কল্পনা করেছে; দেবী মা (প্রাকৃতি কে) কে একজন তান্ত্রিক নিষ্ঠাভরে ভজনা করতে চায়, আরাধনা করতে চায়, পূজা করতে চায়। পাশাপাশি একজন তান্ত্রিক মনে করেন, একজন ভক্ত চৈতন্যময়ী শক্তির অনুগত থাকলে চৈতন্যময়ী শক্তির কৃপায় তার অশেষ কল্যাণ সাধিত হতে পারে। এই হল বিজ্ঞান এবং তন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য।

চৈতন্যময়ী প্রকৃতিরূপী নারীবাদী তন্ত্রের দেবী কালী- বাসুলী – তারা- শিবানী। কিন্তু তন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছেন (আমি আগেই একবার ইঙ্গিত দিয়েছি) অনার্য দেবতা শিব। তন্ত্রমতে শিব তাঁর শক্তি পেয়েছে কালীর কাছ থেকে। আবার শিব- এর রয়েছে পৃথক নিজস্ব শক্তি। তন্ত্রমতে পুরুষ শক্তিলাভ করে নারীশক্তি থেকে। শিব শক্তি লাভ করেছেন তাঁর নারীশক্তির প্রকাশ- গৌড়ীর শক্তি থেকে। তবে শিবের নিজস্ব শক্তিও স্বীকৃত। তন্ত্রসাধনার মূল উদ্দেশ্যই হল- (প্রাকৃতিক) শক্তি দেবীর সাধনা করে “শিবত্ব” লাভ তথা শক্তিমান হওয়া।

(c) Prithwish Ghosh
0 comments

"পিতৃপক্ষ এবং মহালয়াতে তর্পন"

তর্পন হল সেই কর্ম যার দ্বারা আমরা আমাদের পূর্বে মৃত দের উদ্যেশে তিল জল দিয়ে থাকি। তর্পন হল দুই প্রকার যথা --- ১> স্থানাঙ্গ ২> নিত্য। প্রতিদিন পুকুরে বা নদীতে স্থানের সময় যে তর্পন করা হয় তা স্থানাঙ্গ তর্পন। এর দ্বারা প্রতিদিনই পূর্বপুরুষ দের উদ্যেশে জল দেয়া হয়। কিন্তু আমরা এখন তা করতে অসমর্থ, তাই আমরা নিত্য তর্পন করি পিতৃপক্ষে। যা আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথির পরদিন থেকে শুরু হয় এবং মহালয়ার দিন আমাবস্যা পর্যন্ত এই কার্য করা যায়। আমাবস্যার দিন পিতৃপক্ষের শেষ এবং মাতৃপক্ষের শুরু হয় বলে এই দিনে বেশীর ভাগ মানুষ তর্পন করে থাকেন।

যদি আপনার বাবা বা মা অথবা দুজনেই মারা গিয়েছেন তাহলে আপনার তর্পন করা বাধ্যতা মূলক কর্তব্য। শুধুমাত্র আপনার মাতা পিতার উদ্যেশে তর্পন করবেন তা কিন্তু নয়, আপনি আপনার বংশের যত অগ্রজ ব্যক্তি আছেন যারা মারা গেছেন পূর্বে তাদের নামেও তর্পন করতে হবে। শুধুমাত্র আপনার বংশের নয়, আপনার মায়ের বংশের মৃতদের উদ্যেশেও তর্পন করতে হবে। আপনার স্ত্রী থাকলে তাহলে তার বংশের মৃতদের উদ্যেশেও তর্পন করতে হবে।

এবার জেনে নেই তর্পন কত প্রকার -- ১) মনুষ্য তর্পন, ২) ঋষি তর্পন, ৩) দিব্য পিতৃতর্পন, ৪) যম তর্পন, ৫) ভীষ্ম তর্পন, ৬) রাম তর্পন, ৭) শূদ্র তর্পন।
আপনার আঘে আপনার বংশে যারা মারা গিয়েছেন তারা এখন কোথায় আছেন? কেউ স্বর্গে, কেউ নরকে আর কেউ যদি খুব ভাল কাজ করে তাহলে বৈকুন্ঠ, কৈলাশে অথবা আবার পূর্নজন্ম নিয়েছেন। তারা যেখানেই থাকুন না কেন তাদের আত্মার এক সময় জল পাবার ইচ্ছা করে। তারা তাদের বংশধর দের কাছে জল প্রার্থনা করে। সেই জন্য আমরা তর্পন করে থাকি। এতে করে তাদের আত্মার শান্তি হয়। শুধু মাত্র আমাদের পূর্বজদের নয়, দেবতা ঋষি আদি মহান ব্যক্তিদের উদ্যেশেও তর্পন করতে হয়।

তর্পন করলে আমাদের মধ্যে শান্তির সঞ্চার হয়। পূর্ব পুরুষদের আশীর্বাদে আমাদের মঙ্গল হয়। শুধু পূর্বপুরুষ দের নয়, দেবতা ঋষি আদি দের আশীর্বাদও আমরা পাব। অপরপক্ষে, যদি আমরা তর্পন না করি তাহলে আমাদের পূর্বজদের আত্মা পীড়িত হয় হয়, তারা বিভিন্ন ভাবে আমাদের বুঝাতে চায় তাদের তৃষ্ণার কথা। অনেকে তাকে ভূতে উপদ্রব মনে করে কারণ তারা জানে না যে তাদের পূর্বজদের জলের প্রয়োজন। তাছাড়া সংসারে নেমে আসে অশান্তি।

****** (হয়ত) এখন অনেকেই জানতে চাইবেন তর্পন কীভাবে করতে হয়। এক কথায় বলছি জলাশয়ে নেমে তিল-জলে মন্ত্র উচ্চারণ করে তর্পন করতে হয়। মন্ত্র-তন্ত্র যা আছে সেই গুলো চাইলে আমি লিখতে পারতাম তবে এতে আপনারা বুঝতে পারবেন না আর তা অনেক বিস্তারিতও। তাই একজন অভিজ্ঞ পুরোহিতের শরণাপন্ন হতেই হবে।

(c) Prithwish Ghosh
0 comments

তন্ত্র ও 'পঞ্চ ম'-কারের সাধনা

তন্ত্র সাধনা একটা নেশা, যে কোনও কিছুর চেয়েও মারাত্মক নেশা। সাধারণে ভাবেন তান্ত্রিকেরা নেশা-ভাঙ করে, মাঝে মাঝে বেশ্যা এনে ফুর্তি করে, পঞ্চ ম-কারের সাধনা মানে মদ ও মহিলা ভোগ, তান্ত্রিকেরা সমাজে থাকতে পারে না, বা তাদের আলাদা একটা সমাজই আছে ইত্যাদি। আসলে তা মোটেই নয়, তন্ত্রশাস্ত্রে মানুষ প্রথম অবস্থায় পশু। প্রথম স্তরের যে মানুষ, স্ত্রী শক্তির সঙ্গত ছাড়া তার এক পাও উপরে ওঠার জো নেই, শক্তিকে আশ্রয় করেই তাকে এগোতে হয়। কারণ, পুরুষ শক্তির সঙ্গে প্রকৃতি শক্তির মিলন সম্পূর্ণ না-হলে সৃষ্টি হয় না। আর, পঞ্চ ম-কার এই পশু-স্তরের আচার। এই আচার শুধু তন্ত্রে নেই; ছাল চামড়া ছাড়ালে আমাদের আজকের তথাকথিত সভ্য সমাজেও দেখতে পাবেন। তন্ত্রে যা 'নিয়মানুগ', সমাজে তা ছাড়া গরু, অনিয়ন্ত্রিত, অপরিমিত, অমার্জিত --- তন্ত্রে এটা উপরে ওঠার রাস্তা, লোক-সমাজে তা নামার।

তান্ত্রিকেরা পারেন বাহ্যিক বিশ্বের পাশ কাটাতে, তাঁরা উৎকট সাধনে দিনের পর দিন কাটান। এ ভাবেই শেখেন ব্রহ্মাণ্ডের কোনও কিছুতেই ভয় না পেতে, জিততে শেখেন কামভাব, শেখেন গা ঘিনঘিন করা জিনিসকেও ঘেন্না না করতে। মন থেকে বাহ্যিক টানগুলো কেটে গেলেই তান্ত্রিক পূর্ণ জ্ঞান পান। তখন ওই পঞ্চ ম-কারের মানেই বদলে যায়।

-

সাধকদের কাছে মদ উত্তেজক নয় ----

মদ্য --

‘ব্রহ্মরন্ধ্র হতে যেই সুধা ঝরে অনিবার

পিয়ে মাতে সদানন্দে সেই মদ্যসাধক সার’।

মাংস --

‘মা শব্দে রসনা বুঝ, বাক্য তারই অংশ হয়,

সেই বাক্য রসনার অতি প্রিয় সুনিশ্চয়,

সে বাক্য ভক্ষণ করে বাকসংযত যেই,

নির্বাক সেই মহাসাধু মাংসের সাধক সেই’।

মৎস্য -----

ঈড়া-পিঙ্গলা ও সুষুম্নার ত্রিবেণীতে

যে সাধক সাঁতরে থাকে সুস্থ্য চিতে,

সে সাধক জানিবে ব্রহ্মময়ীর বৎস

সাধনায় সিদ্ধ হয়ে হয়েছে মৎস্য।

আর মৈথুন, তখন—

‘মৈথুন পরম তত্ত্ব সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় কারণ,

ব্রহ্ম আর তাঁর শক্তির নাইকো বারণ,

তাহাতে হইলে সিদ্ধি সুদুর্লভ লভে ব্রহ্মজ্ঞান

এই মৈথুনে রত যেই সে মৈথুনের সাধক প্রধান।’

-

পার্থিব ভোগ-বাধা কাটিয়ে পরম শক্তির সঙ্গে এক, একাত্ম হয়ে যাওয়ার রাস্তা খুলে দেয় তন্ত্র। এ কাজে তার সহায় প্রকৃতিরই এক অমোঘ নিয়ম— রোজ এক খাবার খেলে কিছু দিনেই তা বিস্বাদ লাগে, রুচি হয় না। যাঁরা এই রুচি হারিয়ে খাদ্যের সারাৎসারটা বুঝতে পারেন, তাঁরা তন্ত্রাদর্শে প্রথমে বীর সাধক, পরে দেবতা।

তন্ত্র কল্পনায় আমাদের মেরুদণ্ডের আগাগোড়া একটি অতি সূক্ষ্ম পথ আছে। সেই পথই প্রাণের পথ বা নাড়ী। চোখের পলক ফেলতে যতটা সময় লাগে, সেই সময়ে ওই নাড়ী বরাবর প্রাণের যে কত বার ঊর্ধ্ব-অধঃ যাতায়াত হয়, তা ভাবা যায় না। তন্ত্রে এই প্রাণশক্তিকে ‘মা’ আর তাঁর গতিক্রিয়াকে নৃত্য বলা হয়েছে। অর্থাৎ মা নাচ্ছেন, সে নাচের বিরাম নেই। এই প্রাণশক্তির পথ ধরে এগোলে মেরুদণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্তের উপরে একটি সূক্ষ্ণ ছিদ্র পথ পাওয়া যায়, যাকে বলে মূলাধার চক্র। লিঙ্গমূলে রয়েছে আর একটি ছিদ্র বা দ্বার। তান্ত্রিক নাম— স্বাধিষ্ঠান চক্র। সেই রকমই হৃৎপিণ্ডের সমসূত্রে মেরু পথে রয়েছে অনাহত চক্র। শরীরের গোপন শক্তির আরও কত উৎস! কণ্ঠের সমানে আছে বিশুদ্ধাক্ষ চক্র। যেখানে মেরুদণ্ড আরম্ভ, চলতি কথায় আমরা বলি দুই ভ্রূর মধ্যে, তাকে বলা হয় আজ্ঞা বা প্রজ্ঞা চক্র। তার উপরে পরমাত্মার রাজ্য— সহস্রার। তান্ত্রিক সাধনে এই ছয় চক্র ভেদ করা সম্ভব হলে জীব আত্মা পরমাত্মায় মিলিত হয়।

স্থুল ভাবের পশুপ্রবৃত্তিসম্পন্ন প্রথম স্তরের মানুষে এই জীবাত্মা প্রাণশক্তিকে অবলম্বন করে সাড়ে তিন পাক দিয়ে সাপের মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে, মূলাধার চক্রে অতি সূক্ষ্ণ দেহে থাকে। চৈতন্য বা সম্যক জ্ঞান পেলে জীবাত্মা পূর্ণ বিকশিত হয়। মূলাধার চক্রের গাঁট যাদের খোলে, তারা ঈশ্বরের টানে ছটফট করতে শুরু করে। গিয়ে ঠেকে প্রথমে স্বাধিষ্ঠান, পরে মণিপুর-চক্রে। এই অবধিই যা কিছু বিত্তবাসনার টান। প্রথমের এই তিন চক্র ছাড়ানোই ভীষণ কষ্টের। ব্যাপারটা আরও ভাল বুঝিয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। বলেছেন ‘‘যখন সংসারে মন থাকে, তখন, লিঙ্গ, গুহ্য ও নাভি মনের বাসস্থান, মনের চতুর্থ ভূমি হৃদয়, তখন প্রথম চৈতন্য হয়েছে। তখন আর নীচের দিকে মন যায় না। মনের পঞ্চম ভূমি কণ্ঠ। মন যার কণ্ঠে উঠেছে, তার ঈশ্বরীয় কথা বই অন্য কোনও কথা শুনতে বা বলতে ভাল লাগে না। মনের ষষ্ঠ ভূমি কপাল। সেখানে অহর্নিশি ঈশ্বরীয় রূপ দর্শন হয়। শিরোদেশে সপ্তম ভূমি। সেখানে মন গেলে ব্রহ্মের প্রত্যক্ষ দর্শন মেলে।’’ এটাই তন্ত্র-সাধনা। এ বিদ্যা পুরোপুরি গুরুমুখী। গুরু সহায় না হলে প্রতি পদে পা হড়কানোর ভয়।

----- তন্ত্র সাধনা মূল শক্তি দেয়, বাইরের নয়, ভিতরের। শক্তি চালনার ক্ষমতা পেলে নিজেকে সামলানো বড়ই কঠিন। তা ছাড়া, প্রতি পদে থাকে প্রলোভন। অর্থ, ক্ষমতা সব শক্তিই দেন কালী। অনেক সাধক তখন চার হাত-পায় ভোগে লেগে যায়, প্রবৃত্তি তার ঘাড়ে চেপে বসে। ফলও হয় মারাত্মক। যেখানে সেখানে শক্তি প্রয়োগ করে শেষে এক দিন শক্তি বিলকুল উবে গিয়ে জীবনটাই মিছে হয়ে যায়। এমন পচা কাদায় পড়ে যে, আর ওঠার ক্ষমতা থাকে না। প্রায়শ্চিত্তের চেষ্টাও যেখানে বিফল। এ পথ খেলুড়ে বা হঠকারীদের জন্য নয়। -- লাল-কালো শালু পরে, গলায় রুদ্রাক্ষ মালা দিয়ে, কপালে লাল সিঁদুরের ফোঁটা এঁকে, 'জয় জয় তারা' আওয়াজ করে তারাপীঠে বসত করে সিদ্ধিলাভ হয় না, মনই হ'ল একমাত্র তীর্থ। মনঃসংযম হ'ল তান্ত্রিকের সর্বপ্রধান অস্ত্র।

(c) Prithwish Ghosh
0 comments

যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও দ্বারকা নগরী

ম্লেচ্ছ-বিধর্মী ও স্বধর্মীয় কিছু অতি-পণ্ডিত মানুষ সনাতন হিন্দু ধর্মের দেবদেবী নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। সেইসব মানুষেরা ভগবান শ্রী কৃষ্ণ কে যথেষ্ট খারাপ ভাবে সমালোচনা করে। তাদের উদ্দেশ্যে এই পোস্ট।

যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও দ্বারকা নগরী

=================================

দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। পাশবিক শক্তি যখন সত্য সুন্দর ও পবিত্রতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন সেই অসুন্দরকে দমন করে মানবজাতিকে রক্ষা এবং শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠার জন্য যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবত গীতার বর্ণনায় শ্রীকৃষ্ণ দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে বিশৃঙ্খল ও অবক্ষয়িত মূল্যবোধের পৃথিবীতে মানবপ্রেমের অমিত বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলনই সে বাণীর মূল বিষয়। তাই তিনি ভক্তদের কাছে প্রেমাবতার।

দ্বাপর যুগের অস্তিত্ব এবং বর্তমান

==========================


দ্বাপর যুগের অস্তিত্ব এবং বিভিন্ন নিদর্শন বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকার রাজা ছিলেন। বর্তমান ভারতের গুজরাট প্রদেশে জামনগর জেলার গোমতি নদীর তীরে দ্বারকা নগরী অবস্থিত এবং এখানে প্রায় ৮০০ বছর আগে নির্মিত ৫৭ মিটার উঁচু কৃষ্ণ মন্দির আছে। এটাই সমস্ত সন্যাসীদের কাছে দ্বারকা বলে স্বীকৃত। অন্যদিকে মহাভারতে বলা হয়েছে যে শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃৃক প্রতিষ্ঠিত দ্বারকা সাগরে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই মহাকাব্যের পরিশিষ্ট অংশ হরিবংশে বলা হয়েছে-এই সমৃদ্ধ নগরী ভারতের পশ্চিম উপকূলে যেখানে গোমতী এসে সাগরে মিলেছে সেখানে অবস্থিত।

গোয়ায় অবস্থিত ন্যাশানাল ইন্সটিটিউট অব ওসেনোগ্রাফি এর মেরিন আরকিওলজি সেন্টারের প্রজেক্ট ডাইরেক্টর ড. এস আর রাও বলেছেন- জলনিমগ্ন দ্বারকা নগরী খুঁজে পাওয়া গেছে। এই প্রবন্ধে তিনি সমুদ্রে ডুবে যাওয়া জাহাজ আবিষ্কারের সময় খুঁজে পাওয়া জলের নিচে অবস্থিত হিন্দু মন্দিরসহ একটা নগরী আবিষ্কারের এক অত্যাশ্চর্য বর্ণনা দেন। রূপকথার গল্প থেকে তিনি তুলে আনেন দ্বারকা কে মানুষের চোখের সামনে। এই স্থানেই পাওয়া গেছে ২১০ টি জাহাজের ভগ্নাবশেষ যা প্রমাণ করে এখানে এক সময় অবস্থিত ছিল এক বিশাল সমুদ্র বন্দর যা আবার মানুষের চোখের সামনে ঊঠে আসছে। ভারতীয় সমুদ্র উপকূলে অনেক প্রাচীন বন্দর ডুবে গেছে তার মাঝে দ্বারকা অন্যতম। যদিও পুরানো দ্বারকার উপরই নতুন দ্বারকা অবস্থিত তবুও এর প্রকৃত পরিচয় ১৯৭৯-৮০ সালের আগে পাওয়া যায়নি।

এ সময় দ্বারকাধীশ মন্দিরের সামনের মাটি খুড়ে খ্রিষ্টপূর্ব ১৪ শতকের তিনটি মন্দিরের ধবংসাবশেষ পাওয়া যায় এবং ডুবন্ত নগরীটির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করা হয়। এর মাঝে খ্রীষ্টপূর্ব নবম শতকে নির্মিত বিষ্ণু মন্দির সবচেয়ে পুরোনো। এখানে বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও দেবাদিদেবের মূর্তি আছে। প্রথমদিকে মাটির স্থরে একটা লাল মাটির বস্তু পাওয়া গেছে। এটি প্রভাসক্ষেত্রের এবং বয়স ১৫শ খ্রিষ্টপূর্বের (কার্বন ১৪ প্রণালীতে বয়স পাওয়া গেছে)। প্রভাস হচ্ছে আরেকটি মহাভারতীয় তীর্থ যেটি সৌরাষ্ট্রের দক্ষিণে অবস্থিত। আরকিওলজিষ্ট হিসে বোরালা বলেছেন, মহাভারতের যুদ্ধ খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ শতকে হবার প্রমাণও পাওয়া গেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ শতকে সমুদ্রের তীরে বসতি ছিল বলে প্রমাণ পাওয়ার পর ডুবন্ত দ্বারকার খোঁজার সম্ভাবনা অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা কচ্ছ উপকূলে মাটি পরীক্ষা করে জানিয়েছেন ১০০০০ বছর আগে এই কচ্ছ উপসাগরীয় অঞ্চল ৬০ মিটার নিচু ছিল। হরিবংশে (বিষ্ণু পর্ব- ৫৭-১০৩) একে সমুদ্রের ভেতরে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান দ্বারকার ৩২ কিমি দুরে খুঁজতে শুরু করেন। এই দ্বারকাতেই পাওয়া গেছে হরপ্পা যুগের পুতির মালা, হাড়ি-পাতিল এবং পলা আকৃতির বিরাট দালানের খন্ডাংশ। এগুলো অনেক প্রাচীন বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। এছাড়া শামুক, ঝিনুক এর তৈরি দেয়াল, সিন্ধু সভ্যতার শঙ্খের সীলমোহরসহ আরো অনেক আরটিফেক্ট এ ভর্তি এই স্থান।

পানির ৬.৪১ মিটার নিচে একটি দুর্গ পাওয়া গেছে, যেটা চুনাপাথরের অর্ধ বৃত্তাকার ব্লক দিয়ে তৈরী। এটি সমুদ্র নারায়ণ মন্দির থেকে ৬০০ মিটার সমুদ্র গভীরে অবস্থিত। এখানে তিন ছিদ্র বিশিষ্ট ত্রিফলা নোঙর উদ্ধার করা হয়েছে- যা ক্ষয় রোধক দেয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হত সাথে সাথে শত্রুর আক্রমণ থেকেও বাঁচাত।

ডুবে যাওয়ার কারণ

===================

বিজ্ঞানীরা অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে- ১০০০০ বছর আগে সমুদ্র পৃষ্ঠ বর্তমান থেকে ৬০ মিটার নিচু ছিল। অতএব ৩৫০০ বছর আগে সমুদ্র ৯ মিটার নিচু ছিল। দ্বারকা ডুবে যাওয়ার কারণ সমুদ্র পৃষ্টের ঊচ্চতা বৃদ্ধি। এভাবে সমুদ্র উপকূল ধ্বংস হতে খুব একটা দেখা যায়না- শুধু মাত্র কার এস সিটি বাহরাইনের এক বন্দর এই সময় এই ডুবে যায়। দুই স্থানের বয়সকাল প্রায় একই বলে নির্ধারন করেছেন বিজ্ঞানীরা। দ্বারকায় যে তৈজসপত্র পাওয়া গেছে তা থেকে বিজ্ঞানীরা ধারনা করেন যে এস্থানে অনেক পুরোনো এক সভ্যতা ছিল যা মহাভারতে বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরীর সাথে মিলে যায়।

মহাভারতে আছে- শ্রীকৃষ্ণের বয়স যখন ১২৫ তখন যদু বংশ ধ্বংস হয় সামান্য এক কারণে। এটা দেখে শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম বনবাসী হবার সংকল্প করেন এবং অর্জুনকে সংবাদ পাঠান। বনে শ্রীকৃষ্ণ বসে থাকা অবস্থায় জরা নামে এক ব্যাধ হরিণ মনে করে কৃষ্ণ কে বান মারেন। শ্রীকৃষ্ণ সেখানেই দেহত্যাগ করেন। অর্জুন এই সংবাদ পেয়ে দ্বারকায় এসে শ্রীকৃষ্ণের দেহ সৎকার করেন। এর পর পরই দ্বারকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়। যে নগরী শ্রীকৃষ্ণ নিজের হাতে শাসন করেছিলেন সে নগরী শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর পর পরই সমুদ্রের মাঝে বিলীন হয়।

Courtesy by: Prithish Gosh
0 comments

গুরু নানক

কিছু মহামানবের জ্ঞানতাত্ত্বিক অবদানের কারণেই আজকের এই সমৃদ্ধ মানবজীবন। এই মহামানবেরা আজন্মকাল তাদের চিন্তা ও চেতনা দিয়ে আমাদের জীবন ও জগৎ পরিপূর্ণ করার চেষ্টা করে গেছেন। ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান সব শাখাই সমৃদ্ধ হয়েছে এই মহামানবদের হাতে। যাদের মমতার স্পর্শে মানুষে মানুষে রচিত হয়েছে বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন। তাদেরই একজন হচ্ছেন শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক।

ভারতে তখন সুলতানী আমল। পশ্চিম পাঞ্জাবের তালওয়ান্দি (বর্তমান নাম নানকানা সাহেব) গ্রামে থাকতেন মেহেতা কল্যাণ বাই নামে এক সামন্য চাষী। সামান্য কিছু জমিজমা ছিল তার। গাঁয়ের লোক তাকে ডাকত মেহেতা কালু বলে। তার স্থীর নাম ছিল ত্রিপতা। এই ত্রিপতার গর্ভেই ১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহন করেছিলন গুরু নানক। ছেলেবেলা থেকেই তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল পিতামাতার। একমাত্র সন্তান। তবু তার সবকিছুই যেন কেমন অদ্ভুত। আত্মভোলার মতো ঘুরে বেড়ান, সাধু-সন্ন্যাসীদের দেখলেই তাদের কাছে ছুটে যান। নির্জনে বসে থাকেন।

বাবা-মা ভেবেছিল লেখাপড়া করলেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। ৬ বছর বয়সে তাই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো গ্রামের পাঠশালায়। সেখানে মাতৃভাষা ছাড়াও শিখেছিলেন ফার্সি ভাষা। তিনবছর পর সংস্কৃত শিক্ষার জন্য তাকে পাঠানো হলো ব্রিজনাথ শর্মা নামে এক পন্ডিতের কাছে। কিন্ত নানকের পাঠ্যবিষয় বাদ দিয়ে ঈশ্বর, ধর্ম আধ্যাত্নিক বিষয়েই ছিল গভীর আগ্রহ। গতানুগতিক পড়াশুনাতে তার কোনো আগ্রহ নেই দেখে বাবা ঠিক করলেন নানককে বাড়ির গরু –ছাগল চরাবার ভার দেবেন।

একদিন নানক ঘুমিয়ে পড়লে তার গরুর পাল ঘুরতে ঘুরতে একজনের ক্ষেতে ঢুকে পড়ল। ক্ষেতের মালিক নালিশ জানালো জমিদারের কাছে। ডাক পড়লো নানকের। নানক জমিদারের কাছে গিয়ে বললেন, আমার গরু কোনো জমির ফসল নষ্ট করেনি। নানকের কথা শুনে জমিদারের লোকজন মাঠে গিয়ে দেখে জমির ফসল যেমন ছিল তেমনই আছে। ক্ষেতের মালিকতো বিস্ময়ে হতবাক।

নানককে এবার ভর্তি করা হলো ফার্সি ভাষার এক মৌলবীর স্কুলে। কিন্তু পড়ায় কোন মন নেই তার। বই-শ্লেট তুলে রেখে নানক মৌলবীকে জিজ্ঞাসা করে ঈশ্বরের কথা, ধর্মের কথা, এই জগৎ সৃষ্টির কথা। অধিকাংশ প্রশ্নেরই কোনো জবাব দিতে পারেন না মৌলবী। ছেলেকে বিষয়মুখী করতে না পেরে মহাভাবনায় পড়ে গেলেন বাবা। নানকের বোনের স্বামী জয়রাম ছিলেন সুলতান দৌলত খাঁ লোদীর দেওয়ান। অবশেষে তার সুপারিশে সুলতানের গুদাম ঘরের দেখাশুনার চাকরি পেলেন নানক। যখন কোনো দুঃখী মানুষ আসত তিনি গুদাম থেকে খাবার দান করতেন। নিজে যা মাইনে পেতেন তার অর্ধেকই গরিব-দুঃখী মানুষের পেছনে খরচ করতেন। কিন্তু নানকের এই সেবার কাজকে ভালোভাবে দেখত না কিছু মানুষ। তারা সুলতানের কাছে গিয়ে অভিযোগ জানাল, নানক গুদামের মাল বিলেয়ে দিচ্ছে। সুলতান কয়েকজন কর্মচারীর উপর তদন্তের ভার দিলেন। সবকিছু পরীক্ষা করে দেখা গেল গুদামের সব মাল হিসেব মতোই আছে।

এদিকে নানক কাজকর্মে মন দিয়েছে জেনে তার বাবা নানকের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। মেয়ের নাম সুলখানি। এই সুলখানির গর্ভে নানকের দুটি সন্তান জন্ম হয়-শ্রীচাঁদ ও লক্ষ্ণীদাস। একদিন খুব সকালে নানক নদীতে গেলেন গোসল করতে। গোসল শেষ করতেই তার অন্তরে এক অদ্ভুত অনুভূতি জেগে উঠল। নিজের অজান্তেই ছুটে গেলেন কিছুদূর একটি পাহাড়ের দিকে। সেখানে পাহাড়ের গুহায় বসে ধ্যানে মগ্ন হয়ে গেলেন। ভুলে গেলেন ঘর-বাড়ি, সংসার ও স্ত্রী-পুত্র। তিনদিন তিনরাত্রি কেটে গেল। অবশেষে তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব উপলব্ধি করলেন নিজ অন্তরে।

প্রায় কুড়ি বছর ধরে নানক দেশে দেশে তার ধর্মপ্রচার করেছিলেন। পাঁয়ে হেটে, বনজঙ্গল, নদী-নালা, কত মরুভূমির রুক্ষ প্রান্তর, পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে তাকে চলতে হতো। যেখানেই তিনি যেতেন, ফুলের সৌরভের মতো মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হতো। তিনি তাদের বলতেন, ঈশ্বর এক অদ্বিতীয়। তিনি সকলকে বলতেন, সত্য পথে চল, সৎ জীবন যাপন কর, ঈশ্বরের নামকর। তিনি বলতেন, ঈশ্বর মানুষের ধর্ম দেখেন না। তার জাতি দেখেন না, ধনী –দরিদ্র দেখেন না, তার চোখে সকলেই সমান। তিনি শুধু বিচার করেন মানুষের কর্ম। যে মানুষ যেমন কাজ করবে সে তেমনি ফল ভোগ করবে। ধর্মের নামে কুসংস্কার, গোঁড়ামী, বাহ্যিক আচার-আচরণকে তিনি কঠোর ভাষায় নিন্দা করতেন।

একবার নানক স্থির করলেন, মুসলমানদের দুই পবিত্র তীর্থস্থান মক্কা আর মদিনায় যাবেন। নানকের সঙ্গী হন পীর সৈয়দ আহমেদ হাসান ও পীর জালালউদ্দীন। এরা মুসলামান হলেও নানকের আধ্যাত্বিক শক্তি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। নানকের পরনে মুসলমান দরবেশের পোষাক। মক্কা-মদিনা হয়ে নানক যান প্যালেষ্টাইন। বহু দিন নিজের স্বদেশভূমি ত্যাগ করে এসেছেন এবার ফেরার পথ ধরলেন নানক। পথ চলতে চলতে নানক নির্জন প্রান্তরে এসে পৌঁছলেন। দীর্ঘ পথশ্রমে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। এক শিষ্যকে বললেন, দেখতো কাছাকাছি কোথাও জল আছে কিনা। শিষ্য গিয়ে দেখে কাছের গ্রামে একটা পুকুর রয়েছে। কিন্তু পুকুরে এক ফোটা জল নেই। শিষ্য ফিরে এসে সব কথা বলতেই নানক বললেন, গুরুর নাম করে সেখানে আবার যাও জল পাবে। এবার পুকুরে যেতেই শিষ্য বিস্ময়ে হতবাক, সমস্ত পুকুর জল আর জল, কি অপূর্ব সে জলর স্বাদ। ঠিক যেন অমৃত। লোকে তার নাম দিল অমৃত সায়র। আর তার থেকেই অমৃতসর কথাটির উৎপত্তি। ১৮০২ সালে মহারাজ রঞ্জিত সিং ওই পুকুর সংস্কার করে স্বর্ণমন্দির স্থাপন করেন। এই স্বর্ণমন্দির শিখদের এক পবিত্র তীর্থ।

১৫৩৯ সালের কথা- নানক বুঝতে পেরেছিলেন তার জীবনের কাল শেষ হয়ে এসেছে। তিনি সে কথা বলতেই দলে দলে তার শিষ্যরা এসে উপস্থিত হলো। এদের মধ্যে যেমন ছিল হিন্দু তেমনি ছিল মুসলমান। নানক বুঝতে পেরেছিলেন তার দেহ সৎকার করা নিয়া হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিবাদ দেখা দেবে। তাই দুই দলের শিষ্যদের ডেকে বললেন, তোমরা ফুল নিয়ে এসে আমার দুপাশে রাখ। যাদের ফুল সতেজ থাকবে তারাই আমার দেহের সৎকারের অধিকারী হবে। এবার তোমরা প্রার্থনা শুরু কর।

সমস্ত রাত ধরে চলল প্রার্থনা, ভজন, নামগান। ভোরবেলায় দরজা খুলতেই সকলে দেখল নানকের দেহ নেই। সেখানে রয়েছে রাশিরাশি তাজাফুল। সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। এইভাবে মৃত্যুর মধ্যেও মানুষের মিলন ঘটিয়ে গেলেন গুরু নানক।

Courtesy by: Prithwish Ghosh
0 comments

মনসা নামের উৎপত্তি

‘মনস’ শব্দের স্ত্রী লিঙ্গে ‘আপ’ প্রত্যয় করে মনসা শব্দের ব্যুৎপত্তি। সুতরাং এই দিক থেকে মনসা মনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। দেবী ভাগবত ও ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ পুরান বলেন – সর্প ভয় থেকে মনুষ্যদের উদ্ধারের জন্য পরম পিতা ব্রহ্মা কশ্যপ মুনিকে বিশেষ মন্ত্র বিশেষ বা বিদ্যা আবিস্কারের কথা বলেন। হয়তো এখানে বিষের ঔষধ আবিস্কারের কথা সেই সাথেও বলা হয়। কশ্যপ মুনি এই বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করছিলেন। তখন তাঁর মন থেকে এক দেবীর সৃষ্টি হয়। তিনটি কারনে দেবীর নাম হয় মনসা।

'সা চ কন্যা ভগবতী কশ্যপস্য চ মানসী ।
তেনৈব মনসা দেবী মনসা বা চ দীব্যতি ।।
মনসা ধ্যায়তে যা চ পরমাত্মানমীশ্বর ম্ ।
তেন যা মনসা দেবী তেন যোগেন দীব্যতি ।।
আত্মারামা চ সা দেবী বৈষ্ণবী সিদ্ধযোগিনী ।' ---- ( দেবীভাগবত পুরাণ )

প্রথমতঃ মনসা কশ্যপ মুনির মানস কন্যা, কেননা চিন্তা ভাবনার সময় মুনির মন থেকে উৎপন্না। দ্বিতীয় মানুষের মন তদীয় ক্রীড়া ক্ষেত্র, তৃতীয়তঃ নিজেও মনে মনে পরমাত্মার ধ্যান করেন বলে দেবীর নাম মনসা। মন মানুষের শত্রু আবার মন মানুষের মিত্র হতে পারে। “মন এব মনুষ্যানাং কারণং বন্ধমোক্ষয়োঃ।” মন যদি শুদ্ধ, একাগ্র চিত্ত, নিজ বশীভূত, ভগবৎপরায়ণ হয় - ত সেই মন মোক্ষের কারন। তাই এই মনকে ‘মিত্র’ বলা যাবে। কিন্তু মন যদি অশুদ্ধ, চঞ্চল, ইন্দ্রিয় পরায়ণ, ভগবৎ বিমুখ হয়- ত সেই মন নরক গমনের হেতু। এই মন হল শত্রু মন। কশ্যপ মুনি মানব কল্যাণের জন্য ঔষধ আবিস্কারের কথা ভেবেছিলেন - তাই তাঁর মন থেকে দেবীর সৃষ্টি হল। তাই শাস্ত্রের এই শিক্ষা যে, আমাদের সর্বদা কল্যাণকর, হিতকর, ভগবানের কথা-

ইত্যাদি মনে ভাবনা চিন্তা করতে হবে।

মনসা আদিবাসী দেবতা। পূর্বে শুধু নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যে তাঁর পূজা প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুসমাজেও মনসা পূজা প্রচলন লাভ করে। মনসার সাথে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের আত্মীয়তা কীভাবে গড়ে উঠলো সেই কথাটা একটু বলি। বর্তমানে মনসা আর আদিবাসী দেবতা নন, বরং তিনি একজন হিন্দু দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। হিন্দু দেবী হিসেবে তাঁকে নাগ বা সর্পজাতির পিতা কশ্যপ ও মাতা কদ্রুর সন্তান রূপে কল্পনা করা হয়েছে। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ্ মনসাকে শিবের কন্যারূপে কল্পনা করে তাঁকে শৈবধর্মের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সময় থেকেই প্রজনন ও বিবাহ রীতির দেবী হিসেবেও মনসা স্বীকৃতি লাভ করেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, শিব বিষপান করলে মনসা তাঁকে রক্ষা করেন; সেই থেকে তিনি বিষহরি নামে পরিচিতা হন। তাঁর জনপ্রিয়তা দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত প্রসারিত হয়। মনসার পূজকেরা শৈবধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও অবতীর্ণ হন। 

শিবের কন্যারূপে মনসার জন্মকাহিনি এরই ফলশ্রুতি। এর পরেই হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদী মূলধারায় মনসা দেবীরূপে স্বীকৃতিলাভ করেন। শ্রী আশুতোষ ভট্রাচার্য তার মনসামঙ্গল নামক সংকলন গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন- ‘’এখন দেখিতে হয় পশ্চিম-ভারতের ‘মনসা’ নামটি কখন হইতে জাঙ্গুলী দেবীর পরিবর্তে ব্যবহৃত হইতে আরম্ভ হয়। পূর্বেই বলিয়াছি জাঙ্গুলির সঙ্গে বৌদ্ধ সমাজের সম্পর্ক ছিল, তিনি তান্ত্রিক বৌদ্ধ দেবী ছিলেন। পাল রাজত্বের অবসানে সেন রাজত্বের যখন প্রতিষ্ঠা হইল, তখন এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের বিলোপ ও তাহার স্থানে হিন্দুধর্মের পুনরাভ্যুত্থান হইয়াছিল, সেই সময়ে যে সকল বৌদ্ধ দেবদেবীকে নুতন নাম দিয়া হিন্দুসমাজের মধ্যে গ্রহণ করা হইয়াছিল, এই সর্পদেবী তাহাদের অন্যতম। বৌদ্ধ সংস্রবের জন্য তাঁহার জাঙ্গুলী নাম পরিত্যাক্ত হয় এবং তাহার পরিবর্তে মনসা নামকরণ হয়। বাংলার পূর্বোক্ত অর্বাচীন পুরাণগুলি ইহার কিছুকাল মধ্যেই রচিত হয় এবং তাহার মধ্য দিয়া মনসাকে শিবের কন্যারুপে দাবী করিয়া হিন্দু-সমাজের মধ্যে গ্রহণ করা হয়।’’

-

মনসা দেবী বা সর্প দেবী হিসাবে পুজা বোধ হয় বৌদ্ধ ধর্ম থেকে এসেছে বৌদ্ধ গ্রন্থেই সর্প দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায় । ‘বিনয়বস্তু’ ও ‘সাধনমালা’ নামক বৌদ্ধ গ্রন্থে সর্পের দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে সর্পের দেবীর বর্ণনা আছে। ‘সাধনমালা’ গ্রন্থে সর্প দেবীকে ‘জাঙ্গুলি’ বা ‘জাঙ্গুলিতারা’ বলে উল্লেখ করা আছে। প্রাচীন যুগে সাপের ওঝাকে বলা হতো জাঙ্গুলিক (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস --- ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)। দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড় জাতির অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন ‘মঞ্চাম্মা’ বা ‘মনোমাঞ্চী’। পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রীর মতে মঞ্চামা নাম থেকেই ‘মনসা’ নামের উৎপত্তি। আবার ডাঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য বৌদ্ধ সর্প দেবী জাঙ্গুলিকেই ‘মনসা’ বলে মানেন।

 তাঁর মতে -- “অত্যন্ত প্রাচীনকাল হইতেই এই পূর্ব ভারতীয় বৌদ্ধ সমাজে জাঙ্গুলীদেবীর পূজা প্রচলিত হইয়া আসিতেছে। বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনার সূত্র গ্রন্থ 'সাধনমালা'-তে এই জাঙ্গুলী দেবীর পূজার প্রকরণ ও তাহার মন্ত্রের সম্বন্ধে বিস্তৃত উল্লেখ আছে। তাহা হইতে সহজেই অনুমতি হইতে পারে যে, এই জাঙ্গুলীদেবী বর্তমানে সমাজে পূজিতা সর্প দেবী।” গবেষকদের মতে মনসা অনার্য দেবতা, পরে আর্য দের পুরানে স্থান পেয়েছেন। গবেষকরা বলেন বঙ্গদেশ ছিল জঙ্গলে ভরা। সাপের উপদ্রব ছিল বেশী। বাংলা ছিল কৃষি প্রধান। এই বিষাক্ত সাপেদের সাথেই তাঁদের বসবাস ও দ্বন্দ্ব। একটি বিষাক্ত প্রানী, যার ছোবোলেই মৃত্যু। তাই 'মনসা পূজা' বঙ্গদেশে বিশেষ প্রসার পায়। ত্রিপুরা, ওড়িশা, আসাম, দুই বঙ্গ, বিহারে এই পূজোর প্রচলন বেশী। হিমালয়ের পাদদেশে জঙ্গলে ছিল সাপেদের অবাধ বিচরণ ভূমি। মানুষের বসতি বাড়লো, সাপেদের সাথে সংঘাত বাড়লো। প্রথমে নিম্ন জাতির মধ্যে এই পূজোর প্রসার থাকলে কালক্রমে ব্রাহ্মণ্য দেবী হয়ে ওঠেন মা মনসা।

Courtesy by: Prithwish Ghosh
0 comments

শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমে অন্যতম প্রধান শাক্তপীঠ তারাপীঠ।

বীরভূমের প্রধানতম তীর্থ তারাপীঠ আজ আন্তর্জাতিক কৌতূহলের কেন্দ্রভূমি। শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমে অন্যতম প্রধান শাক্তপীঠ তারাপীঠ। ঠিক কবে এই পীঠস্থান আবিস্কৃত হয়, তা যেমন সঠিক জানা যায় না তেমনই সুস্পষ্ট নয় তারাদেবী সংক্রান্ত খুঁটিনাটি। অতিপ্রাচীন দেবী-শিলা মা উগ্রতারা, বশিষ্ঠদেবের পরম্পরা, সর্বোপরি দিব্যপুরুষ বামাচরণ চট্টোপাধ্যায় বা বামাক্ষ্যাপাকে ঘিরে চলিত রয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি। রহস্যের পরে রহস্য আবৃত রেখেছে এই শক্তিপীঠকে।

দেখা যাক রহস্যাবৃত তারাপীঠের কয়েকটি জরুরি তথ্যকে।

১. তারাপীঠ ৫১ পীঠের অন্তর্বর্তী নয়। ‘মহাপীঠপুরাণ’-এ উল্লিখিত পীঠস্থান-তলিকায় তারাপীঠের উল্লেখ নেই। জনচিত্তে অবশ্য একথা অনেকদিন ধরেই প্রচলিত রয়েছে যে, সতীর তৃতীয় নয়ন এখানে পড়েছিল। কিন্তু পুরাণাদি গ্রন্থে এর কোনও সমর্থন পাওয়া যায় না।

২. কিন্তু এই ‘তৃতীয় নয়ন’-এর কাহিনিকে প্রতীকী ধরে বিচার করলে একথা বোঝাই যায়, তারাপীঠ এক মহাশক্তির কেন্দ্র। পরবর্তী কালে গণবিশ্বাস এবং পুরাণ একত্র হয়ে তারাপীঠ-মহিমাকে অন্য মাত্রা প্রদান করেছে।

৩. তারাপীঠ আসলে একটি ‘সিদ্ধপীঠ’। সুদূর অতীত থেকে এখানে বহু সাধক এসেছেন তপস্যা করার জন্য। এবং তাঁদের সিদ্ধিলাভেই ধন্য হয়েছে এই পীঠ। সুতরাং এই পীঠের মহিমা অন্য শক্তিপীঠগুলির চাইতে একাবেরেই আলাদা।

৪. দেবী তারা-র উল্লেখ মূলত রয়েছে বজ্রযানী বৌদ্ধ ধর্মে। আবার দশমহাবিদ্যা স্তোত্রেও তিনি উপস্থিত। ‘তারারহস্য’ ও অন্যান্য তন্ত্রগ্রন্থ পাঠে বোঝা যায়, তারা কাল্ট অতি প্রাচীন। বজ্রযান গড়ে উঠেছিল মহাযানবাদ এবং লোকধর্মের মিশ্রণে। সেখানে দেবী তারার অবস্থিতি বেশ গুরত্বপূর্ণ স্থানে। দশমহাবিদ্যা স্তোত্র অবশ্য অনেক পরের রচনা। সেখানে তারার উল্লেখ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

৫. তারাপীঠ মন্দিরের স্থাপত্য খুই সাধারণ। কিন্তু এই মন্দির-স্থাপত্যে বাংলার নিজস্ব স্থাপত্য ভাবনার ছাপ রয়েছে। চালা ডিজাইনের মন্দির বাংলার ঐতিহ্যকেই ব্যক্ত করে।

৬. মায়ের শিলারূপ ঢাকা থাকে একটি আচ্ছাদনে। সেই আচ্ছাদনকেই মাতৃরূপের প্রতীক ধরা হয়। এই মূর্তিই তারামূর্তি হিসেবে ঘরে ঘরে পূজিতা।

৭. তারাপীঠ মহাঋষি বশিষ্ঠের সাধনপিঠ হিসেব প্রসিদ্ধ। ঐতিহাসিকভাবে এই বশিষ্ঠ ঠিক কে, তা নিয়ে ধন্দ রয়েছে। তিনি কি মাহাকাব্য-পুরাণে উল্লিখিত বশিষ্ঠ? সম্ভবত বশিষ্ঠ একটি সাধক-পরম্পরা। এই পরম্পরারই কোনও মহাত্মা এখানে সিদ্ধিলাভ করেন। তারাপূজার অন্তর্গত গুরুপংতি পূজায় বশিষ্ঠানন্দনাথের পূজা করতে হয়, আমার ধারণা ইনি কোনও নাথযোগী-তারাসাধক ও ইনিই সেই বশিষ্ঠ, শ্রী রামচন্নের গুরু বশিষ্ঠ না।

৮. তারপীঠের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বামাচরণ চট্টোপাধ্যায় তথা বামাক্ষ্যাপা। তন্ত্রধর্মে তাঁর স্থান প্রশ্নাতীত উচ্চতায় স্থিত। তাঁকে ঘিরে যেমন আবর্তিত হয়েছে বাংলার তন্ত্রচর্চার একটি বড় অধ্যায়, তামনই তিনি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছেন অসংখ্য কিংবদন্তির।

৯. তারাপীঠ মহাশ্মশান আজও বহু তান্ত্রিকের বিচরণক্ষেত্র। তন্ত্রে উল্লিখিত শ্মাশানক্রিয়া সমাধা করতে সারা দেশ থেকে শাক্ত সাধকরা এখানে আসেন।

১০. তারাপীঠ দ্বারকা নদের তীরে অবস্থিত। দ্বারকা উত্তরবাহিনী জলধারা। উত্তরবাহিনী জলস্রোত কুলকুণ্ডলিনীর ঊর্ধ্বগতির প্রতীক। এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বিপুল।

১১. বাবা বামদেব ও মা তারার দর্শন অনেক মানুষ এখনও পেয়ে থাকেন।

১২. 'আধুনিকতার স্পর্শে তারাপীঠ সম্পূর্ণ বদলে গেছে ও তার মহিমা-মাহাত্ম্য ক্ষুণ্ণ হয়েছে' - বলে যারা উদ্বিগ্ন হ'ন, তারা মুর্খের স্বর্গে বাস করছেন।

১৩. তারাপীঠের অদুরেই 'মলুটী'-তে মা তারার আর একটি সাধনক্ষেত্র বাম বাবার লীলাক্ষেত্রও বটে।

১৪. তারামায়ের ভৈরব মল্লারপুরের মল্লেশ্বর শিব বলে অনেকে বলে থান। কারণ হিসাবে তারা বলেন - কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন মায়ের মুর্তি মন্দির থেকে বার করে তাই মল্লারপুরের মল্লেশ্বর শিব মন্দিরের দিকে মুখ করিয়ে বসানো হয়।

১৫. তারাপীঠ এক অদ্ভুত 'শক্তিকেন্দ্র' তাই মন্দিরের সংলগ্ন ও আশেপাশের গ্রামের পরিবারগুলিতে আদ্যশ্রাদ্ধের দিনেই মৎস্যমুখ হয় বা মাছ-ভাত খাওয়া হয়।

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

"যজ্ঞো বৈ শ্রেষ্ঠতম কর্মম্”--- যজ্ঞই শ্রেষ্ঠ কর্ম

★(এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলে আপনার একাধিক বন্ধুকে দয়া করে শেয়ার করুন)★

ব্রহ্মবিদরা বলে থাকেন দুটি বিদ্যা আয়ত্ত করতে হবে, 'পরা' এবং 'অপরা'। অপরা হল ঋগবেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ, শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ। আর পরা বিদ্যা হল তাই যার দ্বারা ব্রহ্মকে অধিকার করা যায়। ব্রহ্মবিদরা বলে থাকেন দুটি বিদ্যা আয়ত্ত করতে হবে, পরা এবং অপরা। অপরা হল ঋগবেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ, শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ। আর পরা বিদ্যা হল তাই যার দ্বারা ব্রহ্মকে অধিকার করা যায়।

বৈদিক সাহিত্যকে দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগে আছে ব্রহ্মবিদ্যা অর্থাৎ বিশ্বের মধ্যে যে অবিনাশী সত্তা প্রচ্ছন্নভাবে ক্রিয়াশীল তার সন্বন্ধে জ্ঞান সঞ্চয় করা। এই জ্ঞান লিপিবদ্ধ হয়েছিল বেদেরই অঙ্গীভূত এবং আশ্রিত এক শ্রেণীর রচনায়। তাদের আমরা উপনিষদ বলি। উপনিষদ অর্থে বুঝি বেদের প্রান্তে যা অবস্থিত। বেদান্ত অর্থেও তাই বুঝি। পরবর্তীকালের শঙ্করাচার্য প্রবর্তিত বেদান্তদর্শন এই উপনিষদ বা বেদান্তের রচনাকেই অবলম্বন করে রচিত হয়েছিল।

দ্বিতীয় ভাগে পড়ে আর সব কিছু। তাদের মধ্যে প্রথম আছে বেদের চারটি সংহিতা – ঋক্, সাম, যজু এবং অথর্ব। তারপর যেগুলি আছে সেগুলি সংখ্যায় ছ’টি এবং তাদের সাধারণ নাম বেদাঙ্গ। তারা হল শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ। তাদের কেন বেদাঙ্গ বলা হয় তা বুঝতে গেলে কিছু প্রাথমিক কথা বলার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

সনাতন বৈদিক ধর্মের প্রধান উৎস হল বিশ্বের মূল শক্তিকে শ্রদ্ধা, ভক্তি বা অর্ঘ্য নিবেদনের আকুতি। এই আকুতির প্রেরণা নানা রকম হতে পারে। বেদ অতি প্রাচীনকালে রচিত হয়েছে। সে যুগে মানুষ ভক্তের স্তরে উঠতে শেখেনি। সে যুগে দেবতার উপাসনার প্রেরণা ছিল ব্যবহারিক প্রয়োজন। বেদের যুগে উপাসনা রীতির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। ঠিক বলতে কি তা অনন্য-সাধারণ। এ ধরনের রীতি অন্য কোনও দেশে দেখা যায়নি। অবশ্য পারসিক সম্প্রদায় অগ্নির উপাসনা করত। তবে বৈদিক যজ্ঞরীতি ভিন্ন ধরনের।

প্রকৃতির বুকে সেকালের ঋষিগণ শক্তির বা সৌন্দর্যের উৎস আবিষ্কার করেছেন যেখানে, তার ওপরেই দেবত্ব আরোপ করে তার জন্য স্তোত্র রচনা করেছেন। এই স্তোত্রের নাম হল 'সূক্ত'। এইভাবে 'অগ্নি' দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি শুধু দেবতা নন 'পুরোহিত'-ও বটেন; ফলস্বরূপ অগ্নিতেই অন্য দেবতার উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হত। সূক্ত নিয়ে গঠিত বেদের এই মূল অংশকে বলা হয় সংহিতা। এখন শ্রদ্ধা নিবেদন বা প্রার্থনা জ্ঞাপন শুধু স্তোত্র পাঠেই হয় না। তার সঙ্গে কিছু আনুষঙ্গিক ক্রিয়া থাকে। বৈদিক যুগে সেই আনুষ্ঠানিক অংশ প্রধানতঃ রূপ নিত যজ্ঞানুষ্ঠানের। এই যজ্ঞের উপকরণ খুব সরল ছিল। একটি বেদী নির্মিত হত। তার উপর কাঠ দিয়ে আগুন জালানো হত। সেই সঙ্গে বৈদিক মন্ত্র পাঠ হত বা সুর সংযোগে গাওয়া হত। তার সঙ্গে ঘৃতের আহুতি দেওয়া হত। সোম নামে এক লতা সেকালে জন্মাত। তার রসও আহুতি হিসাবে দেবতাদের উদ্দেশ্য নিক্ষিপ্ত হত।

এখন বিভিন্ন ধরনের যজ্ঞ আছে। কোনোটিকে বলা হয় অগ্নিষ্টোম, কোনওটিকে জ্যোতিষ্টোম, কোনটিকে বিশ্বজিৎ। আবার কতদিন ধরে একটি যজ্ঞ স্থায়ী হত তার ভিত্তিতে বিভিন্ন নামকরণ হত। যেমন যে যজ্ঞ বারো দিনের বেশী স্থায়ী হত তাকে বলা হত 'সত্র'। এইসব বিষয় বিধি-নিষেধ নির্দেশ করবার জন্য ‘ব্রাহ্মণ’ শাস্ত্রের উৎপত্তি হয়। এই ব্রাহ্মণগুলিতে বিভিন্ন যজ্ঞ কি করে নিষ্পাদিত করতে হয় তার সবিস্তার বিবরণ আছে। যেমন ঋগ্বেদের অন্তর্ভূক্ত ঐতরেয় ব্রাহ্মণে রাজসূয় যজ্ঞের বিবরণ আছে। ব্রাহ্মণগুলি সংস্কৃত ভাষায় রচিত।

জৈমিণি বলেছেন মন্ত্রাতিরিক্ত বেদভাগের নামই ব্রাহ্মণ। (মীমাংসা সূত্র, ২।১।৩৩)। আরণ্যক ও উপনিষদ ব্রাহ্মণের অঙ্গ হলেও তাদের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য আছে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মন্ত্র, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ এই সমগ্র বৈদিক সাহিত্যকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। একটি কর্মকান্ড ও অপরটি জ্ঞানকান্ড।কর্মকান্ডে যজ্ঞ সম্পর্কিত বিষয়গুলি আছে। সুতরাং তার অন্তর্ভূক্ত হবে বেদের সংহিতা বা মন্ত্র অংশ এবং ব্রাহ্মণ অংশ; কারণ তাতে যজ্ঞের বিধি-নিষেধের আলোচনা আছে। জ্ঞানকান্ড হিসাবে উপনিষদেরই ভূমিকা প্রধান। যজ্ঞানুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন ভূমিকা থাকত।

যজ্ঞের সংজ্ঞা হিসাবে বলা হয়েছে ‘দেবতার উদ্দেশ্যে দ্রব্য ত্যাগ যজ্ঞ।’ অর্থাৎ যজ্ঞ করতে যে সমস্ত সামগ্রীর প্রয়োজন হতো, যেমন সমিধ বা কাঠ, আহুতির জন্য ঘৃত, সোমরস প্রভৃতি সরবরাহ করতে হত। যিনি দ্রব্য ত্যাগ করেন তিনি হলেন যজমান। অর্থাৎ তাঁরই কল্যাণ কামনায় যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হতো সুতরাং তাঁকেই এই দ্রব্যগুলি সরবরাহ করতে হত।

আর যাঁরা যজ্ঞের অনুষ্ঠান করতেন তাঁদের বলা হতো ঋত্বিক। এই ঋত্বিকদের মধ্যে আবার ভূমিকা বিভিন্ন ছিল। তার ভিত্তিতে তাঁদের মধ্যে শ্রেণী বিভাগ আছে। যেমন যিনি সূক্ত পাঠ করতেন তাঁর নাম হল হোতা। যিনি এই সূক্ত গান করে পাঠ করতেন তাঁর নাম হল উদ্গাতা। আর যিনি অগ্নিতে আহুতি দিতেন তাঁর নাম হল অধ্বর্যু। সুতরাং বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানে অনেকের ভূমিকা ছিল। আগুন জ্বেলে একটি ভাবগম্ভীর সমাবেশে তা অনেকের সাহচর্যে অনুষ্ঠিত হতো।

সাধারণত যজ্ঞ বলতে আমরা বুঝি একটি কুণ্ডে আগুন জ্বালিয়ে মন্ত্র পাঠ করে বিভিন্ন প্রকার দ্রব্য আহুতি দেয়া। বৈদিক ধর্মে এমনি নিত্য আচরিত একটি যজ্ঞ হচ্ছে হবন বা অগ্নিহোত্র। অনেক বস্তুবাদীই প্রশ্ন করতে পারেন অগ্নিহোত্র কি অর্থহীন আড়ম্বর নয়? মোটেও নয়, বরং এর মাঝে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের অন্যতম বিস্ময়।

আমাদের এ জগতে শক্তির মধ্যে তাপ শক্তি ও শব্দ শক্তি অন্যতম। যজ্ঞে এই দুই শক্তিরই সম্মেলনে আমরা অর্জন করতে পারি শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক উপকারিতা। যজ্ঞে বিভিন্ন পদার্থের দহন ঐ বস্তুর অন্তর্নিহিত সঞ্চিত শক্তির উন্মোচন ও পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়ার একটি উৎকৃষ্ট প্রক্রিয়া। অন্যদিকে যজ্ঞে উচ্চারিত মন্ত্রের কম্পাঙ্ক শক্তি বহন করে এক আধ্যাত্মিক প্রেরণা।

যজ্ঞে সমিধ হিসেবে যেসব দ্রব্য ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে থাকে নানা সুগন্ধি পদার্থ, ওষধি বৃক্ষের কাঠ, পুষ্টিকর খাদ্য ইত্যাদি। আপনাদের মনে হতে পারে এসব দ্রব্য পোড়ানোর ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড, বিষাক্ত কার্বন মনো অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড প্রভৃতি উৎপন্ন হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি বৈদিক কল্প ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থের বিধি মোতাবেক সঠিক অনুপাতে জ্বালানী, দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করেন এবং যজ্ঞকুণ্ড যদি শাস্ত্রীয় রীতি অনুসারে তৈরী করেন তবে কোনো বিষাক্ত গ্যাসই উৎপন্ন হবে না।

যে কার্বন ডাই অক্সাইড যজ্ঞকুণ্ডে উৎপন্ন হবে তা যজ্ঞকুণ্ডের প্রবল উত্তাপে বাষ্পের সঙ্গে ক্রিয়া করে ফরমালডিহাইড উৎপন্ন করবে যা যজ্ঞকুণ্ডের চারপাশের পরিবেশ সুগন্ধে পূর্ণ করে তুলবে। আর এই গ্যাস কেবল সুগন্ধিই নয়, বায়ুতে থাকা বিভিন্ন কীটাণু দমনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ যজ্ঞের মাধ্যমে আপনি পাবেন দুর্গন্ধ মুক্ত স্বাস্থ্যকর এক পরিবেশ।

আর যে অল্প পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে যাবে সেটি সালোকসংশ্লেষণ ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃতিতে বিলীন হয়ে যাবে। যা একই সাথে বৃক্ষরাজির খাদ্য ও পরিবেশে মুক্ত অক্সিজেনের যোগান দেবে। তাই যজ্ঞ কেবল যজ্ঞকারীর নয়, বরং সমগ্র পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ।

অনেকে বলতে পারেন যজ্ঞে ব্যবহৃত কাঠের জন্য তো প্রচুর বৃক্ষ নিধন করতে হবে। আপনাদের জন্য বলছি বৈদিক ঋষিগণ কেবল মৃত বৃক্ষের কর্তনেরই নির্দেশ দিয়েছেন। আর সেই সাথে মনু আদি মহর্ষিরা ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপনেরও নির্দেশ দিয়েছেন। তাই যজ্ঞের জন্য কোনো জীবিত বৃক্ষ কর্তনের প্রয়োজন নেই, বরং মৃত বা মৃতপ্রায় বৃক্ষের কাঠই যজ্ঞে সমিধারূপে ব্যবহৃত হবে।

বর্তমান পরিবেশ দূষণ ও রোগ মহামারীর যুগে যজ্ঞের আয়োজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ড. হাফকিন বলেছেন, “ঘি এবং চিনি মিশ্রণ করে যজ্ঞে পোড়ালে যে ধোঁয়া উৎপন্ন হয় তা বিভিন্ন রোগজীবাণু ধ্বংস করে।” প্রফেসর টিলওয়ার্ড বলেন, “চিনি মিশ্রিত হবিষ্যের পরিবেশ শোধনের শক্তি রয়েছে। এটি যক্ষ্মা, মিলস, বসন্ত প্রভৃতি জীবাণুনাশক।”

গায়ত্রী পরিবার আয়োজিত গোরখপুরে অশ্বমেধ যজ্ঞ চলাকালীন সময়ে “উত্তর প্রদেশ দূষণ রক্ষা বোর্ড” এর ডিরেক্টর ড. মনোজ গর্গ একদল বিজ্ঞানী নিয়ে বেশকিছু পরীক্ষা চালান। এই পরীক্ষার ফল “অখণ্ড জ্যোতি” সাময়ীকির সেপ্টেম্বর ’৯৭ সংখ্যাতে প্রকাশ পায়।

যা যজ্ঞের ব্যাপক উপযোগিতা ফুটিয়ে তুলে। বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যজ্ঞ সম্পাদনের পূর্বে সে স্থানে বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড ও নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩.৩৬ ও ১.১৬ ইউনিট এবং যজ্ঞ সম্পাদনের শেষে বিষাক্ত গ্যাস দুটির পরিমাণ কমে দাড়ায় যথাক্রমে ০.৮০ ও ১.০২ ইউনিট।

বিজ্ঞানীর দল যজ্ঞকুণ্ডের কিছু দূরে অবস্থিত জলাশয়ের জল পরীক্ষা করেও অভূতপূর্ব ফল লাভ করেন। তাঁরা দেখতে পান সংগৃহীত নমুনায় যজ্ঞের পূর্বে ব্যাকটেরিয়া ছিল ৪৫০০ এবং যজ্ঞের শেষে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কমে দাড়ায় ১২৫০।

যজ্ঞাবশিষ্ট যে ছাই বা বিভূতি ছিল তাতে মিনারেল পদার্থের পরিমাণ পরীক্ষা করে উত্তরপ্রদেশ কৃষির ডেপুটি ডিরেক্টর একে উত্তর মৃত্তিকা উর্বরকারক বলে মত দেন। ১৯৯৩-১৯৯৫ পর্যন্ত ২৭ টি যজ্ঞ ভিত্তিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, যার প্রত্যেকটিই বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে যজ্ঞের উপযোগিতা ব্যাপকহারে সমর্থন করে।

আপনারা অনেকেই ভূপাল ট্র্যাজেডির কথা শুনেছেন, যেখানে বিষাক্ত এমআইসি গ্যাস নির্গমনের ফলে শতশত মানুষ মারা যায় এবং সহস্র মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। এই গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল মাইলের পর মাইল।

৪মে ১৯৮৫ এর দৈনিক “দ্যা হিন্দি” এর একটি প্রতিবেদন সকলকে বিস্ময়ে হতবাক করে দেয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “দূষণ প্রতিরোধে বৈদিক উপায়।” যেখানে বলা হয় ওই গ্যাস প্ল্যান্টের খুব নিকটবর্তী সোহান লাল খুশওয়া এর পরিবারের কোনো সদস্যই ওই ঘটনার ফলে মৃত্যু তো দূরে থাক অসুস্থই হয় নি। কারণ কি? অগ্নিহোত্র। হ্যাঁ একমাত্র এই পরিবারটিই সেখানে নিয়মিত বৈদিক অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করত। যার ফল স্বরূপ এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবল থেকে রক্ষা পায় পরিবারটি। আর এই ঘটনা পরিবেশ দূষণ রোধে অগ্নিহোত্র যজ্ঞের কার্যকারিতা পুনরায় প্রতিপাদন করল। তাই তো বৈদিক ধর্ম ঘোষণা দিয়েছে “যজ্ঞো বৈ শ্রেষ্ঠতম কর্মম্”।

--------------------------------------------------------------------

বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় ---

'তারাপীঠ-কামাক্ষা সিদ্ধ TV-বাবা' মহাশয়দের ... তারাপীঠে বা নিজস্ব গৃহমন্দিরের হোমযজ্ঞ সম্পর্কে আমার কোনও জ্ঞান নেই।

এই আলোচনার সাথে কবচ্-মাদুলীর হোম-যজ্ঞ সম্পূর্ণ আলাদা।

-----------------------------------------------------------------------------

Courtesy by: Prithish Gosh

0 comments

আপনি কি নিজে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহীদের একজন?

১) আপনি কি হিন্দু?
২) আপনি নিজেকে ধর্মবিশ্বাসী বলে মনে করেন?
৩) আপনি কি নিজে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহীদের একজন?

উপরের তিনটি প্রশ্নের উত্তরে আপনি যদি 'হ্যাঁ' বলেন, তবে অবশ্যই এই পোস্টটি পড়ুন।
হিন্দু ধর্ম বুঝতে হলে প্রথমেই এর ঈশ্বরবাদ বুঝতে হবে, ঈশ্বর কয়জন, প্রথমেই এই প্রশ্নের উত্তর জেনে হিন্দু ধর্মে প্রবেশ করতে হবে। কারণ কেউ যদি না জানে যে ঈশ্বর কয়জন ও কি তবে ভক্তি অর্চনা করবে কাকে?

পরমাত্মা বা পরমব্রহ্ম হচ্ছেন সেই ঈশ্বর যিনি সৃষ্টির আদি হতে অন্ত পর্যন্ত আছেন এবং থাকবেন এবং তিনিই প্রকৃত আরাধ্য। ঈশ্বর, পরমাত্মা বা পরমব্রহ্ম হচ্ছেন নিরাকার, কিন্তু তিনি চাইলেই যে কোন সাকার রুপ ধারণ করতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণকে সেই পরমব্রহ্মের এক সাকার রূপ ধরা হয় এবং পরমেশ্বর মানা হয়। এখন কেউ যদি বলেন শ্রীকৃষ্ণ না শিবই আমার কাছে পরমেশ্বর তাতেও ভুল নেই কারণ তিনি যাঁকেই ডাকুন না কেন, সেই পরেমশ্বর কেই ভজনা করছেন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কৃষ্ণ বড় নাকি শিব বড়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের সৃষ্টিখন্ডে ঈশ্বর শিবকে বলছেন " যে তোমার ও আমার মাঝে বিভেদ করবে তার মত পাপী আর পৃথিবীতে নেই"।

মূল কথা হচ্ছে ঈশ্বর একজন তিনি নিরাকার বা সাকার, আমরা যাকেই ভক্তি বা পূজা করিনা কেন তা সেই ঈশ্বরকেই করা হয়। আমারা বিভিন্ন রুপের মূর্ত্তিকে পুজা করি তা কিন্তু ঈশ্বর থেকে আলাদা মনে করে না, মূর্ত্তির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকেই পূজা করা হয়। ঈশ্বরের বিভিন্ন রুপ কল্পনা করে আমরা পূজা করেলেও ঈশ্বর কিন্তু সেই একজনই। অনেকে প্রশ্ন করেন ভাত সোজা করে না খেয়ে এত ঘুরিয়ে খাও কেন? গীতায় ঈশ্বর বলেছেন -- "যে আমাকে যেভাবে ডাকবে আমি তাকে সেভাবেই ফলদান করব"। হিন্দু ধর্ম যে কতটা উদার তার প্রমাণ এখানেই পাওয়া যায়। আমি যেভাবে, যেরুপে তাকে ডাকব তিনি সেভাবেই আসবেন তা সে ৩৩ কোটির যে কোন একটা হোক না কেন।

আমাদের দেহে যে আত্মা আছে, তা সকল ধর্মেই বিশ্বাস করে। ঈশ্বর হচ্ছেন সকল আত্মার উৎস অর্থাৎ পরমাত্মা। আর প্রতিটি জীবের শরীরে যে আত্মা আছে তা হচ্ছে জীবাত্মা। সকল ধর্ম কর্মের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবাত্মা পরমাত্মার সাথে লীন হওয়া অর্থাৎ পৃথিবী থেকে মুক্ত হওয়া। পুরষ্কার অথবা শাস্তির শেষ আছে, মানে ভাল কাজের জন্য স্বর্গভোগ আর খারাপ কাজের জন্য নরকভোগ আছে। কর্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করতে হয়, দুই টাকায় ভালো করে ১০ টাকার মিষ্টি খাবেন তা হবে না। পাকা হিসাবে যতটুকু ভাল ততটুকুই মিষ্টি। কিন্তু প্রধান উদ্দেশ্য কিন্তু স্বর্গ নয় সেই পরমাত্মার সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া, এর আর কোন শেষ নাই।

আত্মার কোন ধ্বংশ বা শেষ নাই। এটা এক দেহ হতে অন্য দেহে গমন করে মাত্র। দেহের পরিবর্তন হয়, শিশু হতে কিশোর আবার কিশোর হতে যুবক, কিন্তু আত্মার পরিবর্তন নাই। গীতা অনুযায়ী মানুষ যেমন পুরাতন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে তেমনি আত্মা ও পুরাতন জীর্ন শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীরে গমন করে। একটু আধুনিক ভাবে বলা যায়, দেহ হচ্ছে প্রোগ্রাম করা কোন যন্ত্র আর আত্মা হচ্ছে এর ব্যাটারী যখন এই দুই একত্রিত হবে তখনই যন্ত্র সচল হবে এখানে ব্যাটারী দিয়ে কথা তা যে যন্ত্র বা শরীরে সেট করা হোক না কেন, এর চালনা শক্তি থাকলেই চলে।

Written by: Prithish Gosh
0 comments

সাকার নিরাকার উপাসনা ---- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সম্প্রতি কিছুকাল হইতে সাকার নিরাকার উপাসনা লইয়া তীব্রভাবে সমালোচনা চলিতেছে। যাঁহারা ইহাতে যোগ দিয়াছেন তাঁহারা এম্‌নি ভাব ধারণ করিয়াছেন যেন সাকার উপাসনার পক্ষ অবলম্বন করিয়া তাঁহারা প্রলয়জলমগ্ন হিন্দুধর্মের পুনরুদ্ধার করিতেছেন। নিরাকার উপাসনা যেন হিন্দুধর্মের বিরোধী। ...... বুলবুলের লড়াইয়ে যেমন পাখিতে পাখিতেই খোঁচাখুঁচি চলে অথচ উভয়পক্ষীয় লোকের গায়ে একটিও আঁচড় পড়ে না, আমি বোধ করি অনেক সময়ে সেইরূপ কথাতে কথাতে তুমুল দ্বন্দ্ব বাধিয়া যায় অথচ উভয়পক্ষীয় মত অক্ষত দেহে বিরাজ করিতে থাকে। সাকার ও নিরাকার উপাসনার অর্থই বোধ করি এখনো স্থির হয় নাই। কেবল দুটো কথায় মিলিয়া বাঁও-কষাকষি করিতেছে। 

 অসীমতা কল্পনার বিষয় নহে, সীমাই কল্পনার বিষয়। অসীমতা আমাদের সহজ জ্ঞান সহজ সত্য। সীমাকেই কষ্ট করিয়া পরিশ্রম করিয়া কল্পনা করিতে হয়। ..... সমুদ্রের মাঝখানে গেলে আমরা বলি সমুদ্রের কূলকিনারা নাই। আকাশের কোথাও সীমা কল্পনা করিতে পারি না, এইজন্য সহজেই আমরা আকাশকে বলি অসীম, আকাশকে সসীম কল্পনা করিতে গেলেই আমাদের মন অতিশয় ক্লিষ্ট হইয়া পড়ে, অক্ষম হইয়া পড়ে। কালকে আমরা সহজেই বলি অনন্ত, নক্ষত্রমণ্ডলীকে আমরা সহজেই বলি অগণ্য-- এইরূপে সীমার সহিত যুদ্ধ বন্ধ করিয়া অসীমের মধ্যেই শান্তি লাভ করি। অসীম আমাদের মাতৃক্রোড়ের মতো বিশ্রামস্থল, ......... সীমাতেই আমাদের শ্রান্তি, অসীমেই আমাদের শান্তি, ভূমৈব সুখং, ইহা লইয়া আবার তর্ক করিব কী! ...... পৌত্তলিকতার এক মহদ্দোষ আছে। 

চিহ্নকে যথার্থ বলিয়া মনে করিয়া লইলে অনেক সময়ে বিস্তর ঝঞ্ঝাট বাঁচিয়া যায় এইজন্য মনুষ্য স্বভাবতই সেইদিকে উন্মুখ হইয়া পড়ে। পুণ্য অত্যন্ত শস্তা হইয়া উঠে। পুণ্য হাতে হাতে ফেরে। পুণ্যের মোড়ক পকেটে করিয়া রাখা যায়, পুণ্যের পঙ্ক গায়ে মাখা যায়, পুণ্যের বীজ গাঁথিয়া গলায় পরা যায়। হরির নামের মাহাত্ম্যই এত করিয়া শুনা যায় যে, কেবল তাঁহার নাম উচ্চারণ করিয়াই ভবযন্ত্রণা হইতে অব্যাহতি পাওয়া যায় তৎসঙ্গে তাঁহার স্বরূপ মনে আনা আবশ্যকই বোধ হয় না। ......... আসল কথা, আমাদের সীমা ও অসীমতা দুইই চাই। আমরা পা রাখিয়াছি সীমার উপরে, মাথা তুলিয়াছি অসীমে। 


........ ঈশ্বরের আশ্রয়ে আছি বলিতে গিয়া ভক্তের মন মনুষ্যস্বভাববশত সহজেই বলিতে পারে "আমি ঈশ্বরের চরণচ্ছায়ায় আছি' তাহাতে আমার মতে পৌত্তলিকতা হয় না। কিন্তু যদি কেহ সেই চরণের অঙ্গুলি পর্যন্ত গণনা করিয়া দেয়, অঙ্গুলির নখ পর্যন্ত নির্দেশ করিয়া দেয়, তবে তাহাকে পৌত্তলিকতা বলিতে হয়। কারণ, শুদ্ধমাত্র ভাব- নির্দেশের পক্ষে এরূপ বর্ণনার কোনো আবশ্যক নাই-- কেবল আবশ্যক নাই যে তাহা নয়, ইহাতে করিয়া ভাব হইতে মন প্রতিহত হইয়া বস্তুর মধ্যে রুদ্ধ হয়। "চরণচ্ছায়ায় আছি' বলিতে গেলেই অমনি যে রক্তমাংসের একজোড়া চরণ মনে পড়িবে তাহা নহে। চরণের তলে পড়িয়া থাকিবার ভাবটুকু মনে আসে মাত্র। একটা দৃষ্টান্ত দিই।.... কে না জানেন চন্দ্রানন বলিলে থালার মতো একটা মুখ মনে পড়ে না, অথবা করপদ্ম বলিলে কুঞ্চিত দলবিশিষ্ট গোলাকার পদার্থ মনে আসে না-- কিন্তু তাই বলিয়া চাঁদের মতো মুখ ও পদ্মের মতো করতল চিত্রপটে যদি আঁকিয়া দেওয়া যায় তবে তাহাই যথার্থ মনে করা ব্যতীত আমাদের আর অন্য কোনো উপায় থাকে না।

 ....... আর-একটি কথা। কতকগুলি বিষয় আছে যাহা বিশুদ্ধ জ্ঞানের গম্য, যাহা পরিষ্কার ভাষায় ব্যক্ত করা যায় ও করাই উচিত। যেমন, ঈশ্বর ত্রিকালজ্ঞ। ঈশ্বরের কপালে তিনটে চক্ষু দিলেই যে ইহা আমরা অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার বুঝিতে পারি তাহা নহে। বরঞ্চ তিনটে চক্ষুকে আবার বিশেষ রূপে ব্যাখ্যা করিয়া বুঝাইয়া বলিতে হয় ঈশ্বর ত্রিকালজ্ঞ। বিশুদ্ধ জ্ঞানের ভাষা অলংকারশূন্য। অলংকারে তাহাকে আচ্ছন্ন করিয়া দেয়, বিকৃত করিয়া দেয়, মিথ্যা করিয়া দেয়। জ্ঞানগম্য বিষয়কে রূপকের দ্বারা বুঝাইতে গেলেই পৌত্তলিকতা আসিয়া পড়ে। ...... বিশুদ্ধ জ্ঞানের প্রতিনিধি রূপককে লইয়াও এইরূপ গোলযোগ ঘটিয়া থাকে। আমরা প্রথম দৃষ্টিতে তাহাকেই জ্ঞানের স্থলে অভিষিক্ত করিয়া লই ও জ্ঞানের পরিবর্তে তাহারই গলে বরমাল্য প্রদান করি-- অবশেষে ভ্রম ভাঙিলেও সহজে হৃদয় ফিরাইয়া লইতে পারি না। ইহার পরিণাম শুভ হয় না। কারণ, জ্ঞানোদয় হইলে অজ্ঞানের প্রতি আমাদের আর শ্রদ্ধা থাকে না, অথচ অভ্যাস অনুসারে শ্রদ্ধাসূচক অনুষ্ঠানও ছাড়িতে পারি না। 

...... জ্ঞানগম্য বিষয়কে রূপকে ব্যক্ত করা অনাবশ্যক ও হানিজনক বটে কিন্তু আমাদের ভাবগম্য বিষয়কে আমরা সহজ ভাষায় ব্যক্ত করিতে পারি না, অনেক সময়ে রূপকে ব্যক্ত করিতে হয়। ঈশ্বরের আশ্রয়ে আছি বলিলে আমার মনের ভাব ব্যক্ত হয় না, ইহাতে একটি ঘটনা ব্যক্ত হয় মাত্র; স্থাবর জঙ্গম ঈশ্বরের আশ্রয়ে আছে আমিও তাঁহার আশ্রয়ে আছি এই কথা বলা হয় মাত্র। কিন্তু ঈশ্বরের চরণের তলে পড়িয়া আছি বলিলে তবেই আমার হৃদয়ের ভাব প্রকাশ হয়-- ইহা কেবল আমার সম্পূর্ণ আত্মবিসর্জনসূচক পড়িয়া থাকার ভাব। অতএব ইহাতে কেবল আমারই মনের ভাব প্রকাশ পাইল, ঈশ্বরের চরণ প্রকাশ পাইল না। অতএব ভক্ত যেখানে বলেন, হে ঈশ্বর আমাকে চরণে স্থান দাও, সেখানে তিনি নিজের ইচ্ছাকেই রূপকের দ্বারা ব্যক্ত করেন, ঈশ্বরকে রূপকের দ্বারা ব্যক্ত করেন না।......... নিরাকার উপাসনাবিরোধীদের একটা কথা আছে যে, নিরাকার ঈশ্বর নির্গুণ অতএব তাঁহার উপাসনা সম্ভবে না। 

আমি দর্শনশাস্ত্রের কিছুই জানি না, সহজ বুদ্ধিতে যাহা মনে হইল তাহাই বলিতেছি। ঈশ্বর সগুণ কি নির্গুণ কী করিয়া জানিব! তাঁহার অনন্ত স্বরূপ তিনিই জানেন। কিন্তু আমি যখন সগুণ তখন আমার ঈশ্বর সগুণ। আমার সম্বন্ধে তিনি সগুণ ভাবে বিরাজিত। জগতে যাহা-কিছু দেখিতেছি তাহা যে তাহাই, তাহা কী করিয়া জানিব! তাহার নিরপেক্ষ স্বরূপ জানিবার কোনো সম্ভাবনা নাই। ................... ঈশ্বর সম্বন্ধে আমাদের হৃদয়ের যাহা উচ্চতম আদর্শ, তাহাই আমাদের পূজার ঈশ্বর, তাহাই আমাদের নেতা ঈশ্বর, তাহাই আমাদের সংসারের ধ্রুবতারা। তাঁহার যাহা নিগূঢ় স্বরূপ তাহার তথ্য কে পাইবে! কিন্তু তাই বলিয়া যে আমাদের দেবতা আমাদের মিথ্যা কল্পনা, আমাদের মনগড়া আদর্শ, তাহা নহে। ...... প্রতি পদক্ষেপে, উন্নতির প্রত্যেক নূতন সোপানে পুরাতন দেবতাকে ভাঙিয়া নূতন দেবতা গড়িতে হইতেছে না। অতএব আইস, অসীমকে পাইবার জন্য আমরা আত্মার সীমা ক্রমে ক্রমে দূর করিয়া দিই, অসীমকে সীমাবদ্ধ না করি। যদি অসীমকেই সীমাবদ্ধ করি তবে আত্মাকে সীমামুক্ত করিব কী করিয়া।

 ঈশ্বরকে অনন্ত জ্ঞান, অনন্ত দয়া, অনন্ত প্রেম জানিয়া আইস আমরা আমাদের জ্ঞান প্রেম দয়াকে বিস্তার করি, তবেই উত্তরোত্তর তাঁহার কাছে যাইতে পারিব। তাঁহাকে যদি ক্ষুদ্র করিয়া দেখি তবে আমরাও ক্ষুদ্র থাকিব, তাঁহাকে যদি মহৎ হইতে মহান বলিয়া জানি তবে আমরা ক্ষুদ্র হইয়াও ক্রমাগত মহত্ত্বের পথে ধাবমান হইব। নতুবা পৃথিবীর অসুখ অশান্তি, চিত্তের বিক্ষিপ্ততা বাড়িবে বৈ কমিবে না। সুখ সুখ করিয়া আমরা আকাশ-পাতাল আলোড়ন করিয়া বেড়াই, আইস আমরা মনের মধ্যে পুরাতন ঋষিদের এই কথা গাঁথিয়া রাখি "ভূমৈব সুখং' ভূমাই সুখস্বরূপ, কোনো সীমা কোনো ক্ষুদ্রত্বে সুখ নাই-- তা হইলে অনর্থক পর্যটনের দুঃখ হইতে পরিত্রাণ পাইব।

ভারতী, শ্রাবণ, ১২৯২

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

'সত্য' হলো 'ভগবান'

পরমাত্মা যে মানুষের মধ্যেই থাকেন এটা কিন্তু অনেক সুপ্রাচীন বিশ্বাস। অন্তত ধর্ম গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা যেসব কিংবদন্তী পাই তা থেকে বিষয়টা বোঝা যায়। ধর্ম তো আর আকাশ থেকে গল্প তৈরী করে আনেনি! প্রচলিত বিশ্বাসগুলোকে আর দর্শনকে সংকলিত কার হয়েছে ধর্মগ্রন্থে। স্থান ও কালের গন্ডিতে মোড়ানো এ জগতের দৃশ্যমান কোন দেহেই পরমাত্মা তার সব গুনাবলী নিয়ে আর্বিভূত হন না, আর সে কারনেই দেহ-খাঁচায় বন্দি আত্মা দেখতে পায় না তার আসল রূপ। কিন্তু সব দেহের তুলনায় মানবদেহেই আত্মা আর্বিভূত হন তার সবচেয়ে বেশী গুনাবলী বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এই কারণে মানুষের চিন্তা জগতের কোন সীমা পরিসীমা নেই। অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে মানুষের পক্ষে সব দেখা সম্ভব। নিজেকে চেনা সম্ভব। কিন্তু মানুষ চিনতে পারে না নিজেকে। রিপুর তাড়নায় মানুষ হয়ে পড়ে দেহ কেন্দ্রিক। তখন মানব আত্মার ভাবনা গুলো হয়ে পড়ে নিতান্তই দেহ কেন্দ্রিক। আত্মার প্রধান কাজই হয়ে পড়ে দেহজাত তাড়নাতে সাড়া প্রদান করা।

ঈশ্বর নিজেকে স্থান ও কালের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ করে মানবরুপে আর্বিভূত হয়েছেন কেননা পরমাত্মা দেখতে চান ভালবাসা দিয়ে দেহজাত সব তাড়নাকে পরাজিতা করা সম্ভব কিনা। ভালবাসা দিয়ে সাধন সিদ্ধ হয় যার, সেই আত্মা লীন হয় পরমে। আর ব্যর্থ আত্মা ফিরে আসে বার বার মানব দেহে যতবার না মানব-সাধন সিদ্ধ হয়। যে সত্য জানে সে নিজেকে খুঁজে পায়। মানবসাধন সেদিনই হবে সিদ্ধ যেদিন ভালবাসার আলোয় দেহ আর মন হবে একই স্বত্ত্বা।

ভাল আর মন্দ হলো জগতের আর সব দ্বান্দিক বিষয়ের মতই প্রতিনিয়ত চলমান। মূর্ত আর বিমূর্ত সব কিছুই কিন্তু জগতে দ্বান্দিক জোড়ায় বিদ্যমান। দ্বন্দের মাধ্যমে কি তিনি কোন মীমাংসায় পৌঁছতে চান? ভাল আর মন্দের দ্বান্দ্বিকতা জগতের নিয়ম। মায়াময় জগৎ ঈশ্বরেরই তৈরী ভ্রান্তি। এ মোহনীয় ভ্রান্তিকে সত্যের বিপরীতে তিনি দাঁড় করিয়ে সত্যের মহানুভবতাকে উদযাপন করেন। সত্য আর মিথ্যা যদি পাশাপশি না থাকে তাহলে সত্যের সৌন্দর্য আর গুরুত্ব তাৎপর্য্যহীন হয়ে পড়ে। তাই এ জগতে সত্যের পাশাপাশি থাকে মিথ্যা, সুন্দরের পাশাপাশি কদর্য, শুভর পাশেই থাকে অশুভ, ভালোর সাথে মন্দ।

মানবজনম তারই সার্থক হয় যে খুঁজে নিতে পারে সত্যকে। 'সত্য' হলো 'ভগবান', জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ভালবাসা আর মানবিকতা।

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

শ্রী গণেশ চতুর্থী বা বিনায়ক চতুর্থী

গণেশ চতুর্থী হ'ল হিন্দু দেবতা শ্রী গণেশের বাৎসরিক পূজা-উৎসব। শিব ও পার্বতী পুত্র গজানন গণেশ হিন্দুদের বুদ্ধি, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের সর্বোচ্চ দেবতা। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন গণেশ চতুর্থীর দিন গণেশ তাঁর ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে মর্ত্যে অবতীর্ণ হন। সংস্কৃত, কন্নড়, তামিল ও তেলুগু ভাষায় এই উৎসব বিনায়ক চতুর্থী বা বিনায়ক চবিথি নামেও পরিচিত। কোঙ্কণি ভাষায় এই উৎসবের নাম চবথ। ভারতের বাইরেও নেপালে গণেশ পূজা হয়ে থাকে। শ্রীলঙ্কার তামিল হিন্দুরাও গণেশ পুজো নিয়ে মত্ত থাকেন।

সিদ্ধিদাতা গণেশের জন্মোৎসব রূপে পালিত হয় এই উৎসব। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থী তিথিতে গণেশের পূজা সাধারণত এই দিনটি ২০ অগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মাঝে কোনো এক দিন পড়ে। দশদিনব্যাপী গণেশোৎসবের সমাপ্তি হয় অনন্ত চতুর্দশীর দিন। ভাদ্রপদ শুক্লপক্ষ চতুর্থী মধ্যাহ্নব্যাপিনী পূর্বাবিদ্ধ – এই পূজার প্রশস্ত সময়। চতুর্থী দুই দিনে পড়লে পূর্বদিনে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি দ্বিতীয় দিন মধ্যাহ্নের সম্পূর্ণ সময়ে চতুর্থী বিদ্যমান হলেও পূর্বদিন মধ্যাহ্নে এক ঘটিকার (২৪ মিনিট) জন্যও যদি চতুর্থী বিদ্যমান থাকে তবে পূর্বদিনেই গণেশ পূজা হয়।

গণেশ চতুর্থী নিয়ে হিন্দু সমাজে এক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে, একবার গণেশ চতুর্থীতে প্রতি বাড়িতে মোদক ভক্ষণ করে ভরা পেটে ইঁদুরে চেপে ফিরছিলেন গণেশ। পথে ইঁদুরের সামনে একটি সাপ এসে পড়লে সে ভয়ে কাঁপতে শুরু করে। এতে গণেশ পড়ে যান ও তাঁর পেট ফেটে সব মোদক রাস্তায় পড়ে যায়। গণেশ উঠে সেগুলি কুড়িয়ে পেটের মধ্যে পুরে পেটের ফাটা জায়গাটি ওই সাপ দিয়ে বেঁধে দেন। আকাশ থেকে চন্দ্র তা দেখে হেসে ফেলেন। তাই গণেশ শাপ দেন যে চতুর্থীর দিন চাঁদ কেউ দেখবে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য গণেশ অত্যন্ত মোদকপ্রিয় দেবতা। অন্যমতে, এই দিনে শিব গণেশকে লুকিয়ে কার্তিকেয়কে একটি ফল দিয়েছিলেন। চন্দ্র তা দেখে হেসে ফেলেন বলে শিব চন্দ্রকে অভিশাপ দেন।

গণেশের জন্ম থেকে শুরু করে তাঁর প্রথম পূজ্য হওয়া পর্যন্ত এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যা আমাদের অনেকের অজানা।

আগে জেনে নেওয়া যাক গণেশের জন্মের কাহিনী। কথিত আছে, উবটন বা গায়ের ময়লা দিয়ে একটি বালকের মূর্তি তৈরি করেন পার্বতী। এর পর তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। জীবনদানের পর ওই বালককে নিজের পুত্র স্বীকার করেন পার্বতী। শুধু তাই নয় পরম শক্তিশালী এবং বুদ্ধিমান হওয়ারও আশীর্বাদ দেন তাঁকে। যে সময় গণেশের জন্ম হয়, তখন শিব কৈলাশে ছিলেন না।

কৈলাশ ফেরার পর গুঁফাদ্বারে একটি বালককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। সেই গুঁফাতেই ছিলেন পার্বতী। মা-এর আদেশ মেনে শিবকে ওই গুঁফায় প্রবেশ করতে দেননি গণেশ। ফলে গণেশের ওপর রেগে যান মহাদেব। এর পরই দেবতাদের সঙ্গে গণেশের যুদ্ধ বাধে। একে একে সমস্ত দেবতাই গণেশের শক্তির সামনে পরাজিত হন। এর পর ত্রিশূল দিয়ে নিজের অজান্তেই পুত্র গণেশের শিরোশ্ছেদ করেন মহাদেব। গণেশের মৃত্যুতে ক্রুদ্ধ পার্বতীকে শান্ত করতে অবশেষে গণেশের প্রাণ ফিরিয়ে দেন শিব। হাতির মাথা ওই বালকের দেহে যুক্ত করা হয়।

জন্মের কিছু সময় পর পিতার সঙ্গে যুদ্ধ এবং তার পর প্রথম পূজ্যের আসন লাভ করেন তিনি। কিন্তু এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তাঁর জন্ম সময়ের কারণ।

শাস্ত্র মতে, ভাদ্রপদ শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে গণেশের জন্ম হয়। তাই শাস্ত্রে ভাদ্রপদ শুক্লপক্ষের চতুর্থী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনই সারা দেশে গণেশ চতুর্থী পালিত হয়।

জ্যোতিষশাস্ত্রে চতুর্থীকে রিক্তা তিথি বলা হয়েছে, সে দিন কোনও শুভ কাজ হয় না। কিন্তু সে দিনই গণেশের জন্মদিন হওয়ায় চতুর্থীতে রিক্তা তিথির দোষ গ্রাহ্য করা হয় না। তাই সমস্ত শুভ কাজ করা যায়। গণেশের কোষ্ঠীতে লগ্নে বৃশ্চিক রাশি রয়েছে এবং মঙ্গল বিরাজ করছে।

লগ্নস্থানে শনির পূর্ণদৃষ্টি রয়েছে। আবার সূর্যের ওপর শনির দৃষ্টি থাকার ফলেই বাবার হাতে পুত্রের শিরোশ্ছেদ হয়।

গণেশের কোষ্ঠীতে লগ্ন এবং লগ্নেশে বৃহস্পতির পূর্ণ দৃষ্টি রয়েছে। বৃহস্পতি দ্বিতীয় এবং পঞ্চম গৃহের স্বামী। অন্য দিকে বুধও স্বরাশির। এ কারণে গণেশ বুদ্ধি এবং জ্ঞানের দাতা এবং প্রথম পূজ্য।

গণেশের কোষ্ঠীতে পঞ্চমহাপুরুষ যোগের মধ্যে শশ এবং রুচক নামের যোগ তৈরি হয়। দশমেশ নিজের গৃহে রয়েছেন, তাই গণেশ শিবের গণের অধ্যক্ষ। তিনি গণাধ্যক্ষ নামেও পরিচিত।

গণেশের অপর নাম বিঘ্নহর্তা। কারণ তিনি সমস্ত ধরনের বিঘ্ন-বাধা দূর করেন। লগ্নে অবস্থিত মঙ্গলে শনি এবং বৃহস্পতির দৃষ্টির কারণে তিনি এই ক্ষমতা পান।

লেখকঃ Prithwish Ghosh
0 comments

জীবের প্রকারভেদ

পরমেশ্বর ভগবান সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের একমাত্র কর্তা। সকল জীবই তাঁর থেকে উৎপত্তি ও লয়প্রাপ্ত হয়। উৎপত্তি ভেদে জীব চার প্রকারের হয়ে থাকে। যা হলো,

01) জরায়ুজঃ জরায়ু থেকে উৎপন্ন হয় যারা, তাদের বলে জরায়ুজ প্রাণী। যেমন -মানুষ, গরু,
মহীষ, ভেড়া, ছাগল ইত্যাদি।

02) অন্ডজঃ অন্ডকোষ বা ডিম থেকে উৎপন্ন প্রাণীদের বলে অন্ডজ। যেমন -পক্ষী, সর্প,
টিকটিকি, গিরগিটি ইত্যাদি।

03) উদ্ভিজঃ পৃথিবীর মাটি ভেদ করে উপরে যে গুলি ওঠে, সেগুলো উদ্ভিজ। যেমন -বৃক্ষ, লতা, দুর্বা ইত্যাদি।

04) স্বেদজঃ স্বেদ বা ময়লা হতে উৎপন্ন জীবদের বলে স্বেদজ। যেমন উকুন, কেঁচো ইত্যাদি।

এই চারটি স্থান হতে চুরাশি লক্ষ জীব উৎপন্ন হয়। এগুলি হতে দুই প্রকার জীব জন্মায়, স্থাবর ও জঙ্গম। বৃক্ষ, লতা, দুর্বা ইত্যাদি একই স্থানে থাকায় এগুলিকে বলে 'স্থাবর' জীব। আর মানুষ, পশু, পাখি ইত্যাদি চলাফেরা করে যেসব জীব তাদের বলা হয় 'জঙ্গম' জীব। এই সব জীবের মধ্যে কেউ থাকে জলে, কেউ থাকে আকাশে এবং কেউ থাকে মাটিতে। এই চুরাশি লক্ষ জীব ব্যতীত দেবতা, পিতৃগণ, গন্ধর্ব, ভুত, প্রেত, পিশাচ, ব্রহ্ম-রাক্ষস ইত্যাদি নানা প্রকার জীব আছে। এই সমস্ত জীবেরই বীজ অর্থাৎ মূল কারণ হলেন একমাত্র ভগবান। তাৎপর্য হলো এই যে, অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডে অনন্ত জীব আছে, কিন্ত সবেরই বীজ সেই 'এক'। তাই সর্বভুতে একমাত্র ভগবানই বিরাজমান -'বাসুদেবঃ সর্বম্'।

বীজ হতে যেমন চারা হয়, তেমনই এক ভগবান হতে এই সম্পূর্ণ জগত সংসার সৃষ্ট হয়েছে। যেমন গম থেকে গম, পশু থেকে পশু, মানুষ থেকে মানুষই উৎপন্ন হয়, তেমনই ভগবান থেকে ভগবানই হয়। অর্থাৎ, জগত-সংসার রুপে ভগবানই প্রকটিত। স্বর্ণ নির্মিত গহনা যেমন স্বর্ণময়ই হয়, লৌহ নির্মিত দ্রব্যাদি যেমন লৌহময়ই হয়ে থাকে, তেমনই ভগবান হতে সৃষ্ট এই জগতও ভগবৎস্বরুপই হয়। লৌকিক বীজের একটি প্রকার থেকে একই প্রকারের চাষ হয়। যেমন গম বীজ হতে গমই উৎপন্ন হয়, এমন নয় যে গম বীজ থেকেই গম, বাজরা, মুগ ইত্যাদি সর্বপ্রথম শস্যই উৎপন্ন হবে। বীজই পৃথক পৃথক হয়ে থাকে। কিন্ত ভগবৎস্বরুপ বীজের বিশেষত্ব হল এই যে, সেই এক ভগবৎবীজ হতে নানা প্রকার জগৎ-সংসার সৃষ্টি হয় এবং এতো কিছু সৃষ্টি হলেও তাতে কোনো প্রকার বিকৃতি আসে না। তা একই ভাবে বিরাজ করে, কারণ এই বীজ হলো 'অব্যয়' এবং 'সনাতন'। এখানেই সচ্চিদানন্দ ভগবানের বিভুতি প্রকাশ। পরমকরুনাময় সচ্চিদানন্দ ভগবান শ্রীহরি সবার মঙ্গল আর কল্যাণ করুণ।

"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে!!"
!!জয় শ্রীগোবিন্দ!! জয় রাধে!!

Courtesy : দেবেন্দ্র
0 comments

লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবার বাণী

বাবা লোকনাথ একজন সিদ্ধ পুরুষ। তিনি মানবের কল্যাণে অসংখ্য অমৃত বাণী দিয়ে গেছেন যা অনুসরণ করলে মানব জাতি শান্তি ও স্বস্তি পাবে, মুক্তির পথ তার খুলে যাবে ............ আসুন হৃদয়ে ধারণ করি বাবার অমৃত বাণী ।

** সত্যের মতো পবিত্র আর কিছুই নেই। সত্যই স্বর্গমনের একমাত্র সোপানস্বরূপ, সন্দেহ নেই।

** যে ব্যক্তি সকলের সুহৃদ(বন্ধু), আর যিনি কায়মনোবাক্যে সকলের কল্যান সাধন করেন, তিনিই যথার্থ জ্ঞানী।

** গর্জ করবি, কিন্তু আহাম্মক (নির্বোধ) হবি না। ক্রোধ করিব কিন্তু ক্রোধান্ধ হবি না।

** দেখ-অর্থ উপার্জন করা , তা রক্ষা করা, আর তা ব্যয় করবার সময় বিষয় দুঃখ ভোগ করতে হয়। অর্থ সকল অবস্থাতেই মানুষকে কষ্ট দেয়। তাই অর্থ ব্যয় হলে বা চুরি হলে তার জন্যে চিন্তা করে কোন লাভই হয় না।

** যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞ, ধার্মিক, সত্যাচারী, উদারচিত্ত, ভক্তিপরায়ন, জিতেন্দ্রিয়, মর্যাদা রক্ষা করতে জানে, আর কখনো আপন সন্তানকে পরিত্যাগ করে না, এমন ব্যক্তির সঙ্গেই বন্ধুত্ব করবি।

** ওরে, সে জগতের কথা মুখে বলা যায় না, বলতে গেলেই কম পড়ে যায়। বোবা যেমন মিষ্টির স্বাদ বলতে পারে না, সেই রকম আর কি!

** আমিও তোদের মতো খাই-দাই, মল-মূত্র ত্যাগ করি। আমাকেও তোদের মতই একজন ভেবে নিস। আমাকে তোরা শরীর ভেবে ভেবেই সব মাটি করলি। আমি যে কে, তা আর কাকে বোঝাবো, সবাই তা ছোট ছোট চাওয়া নিয়েই ভুলে রয়েছে আমার প্রকৃত আমি কে।

** সমাধির উচ্চতম শিখরে গিয়ে যখন পরমতত্ত্বে পৌঁছালাম, তখন দেখি আমাতে আর অখিল ব্রহ্মান্ডের অস্তিত্বে কোন ভেদ নেই। সব মিলেমিশে একাকার।

** রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়বি, আমাকে স্মরণ করবি, আমিই রক্ষা করবো।

* অন্ধ সমাজ চোখ থাকতেও অন্ধের মতো চলছে।

* এই বিরাট সৃষ্টির মধ্যে এমন কিছু নেই যাকে উপেক্ষা করা চলে বা ছোট ভাবা যায়। প্রতিটি সৃ্ষ্টি বস্তু বা প্রাণী নিজ নিজ স্থলে স্বমহিমায় মহিমান্বিত হয়ে আছে জানবি।

* যা মনে আসে তাই করবি, কিন্তু বিচার করবি।

* যে কর্ম মনে তাপের সৃষ্টি করে তাই পাপ। যে কর্মের মধ্য দিয়ে আত্মসচেতন বা শান্তির ভাব মনকে ভরিয়ে তোলে তাই পুণ্য এবং স্বর্গতুল্য।

* ধার্মিক হতে চাইলে প্রতিদিন রাতে শোবার সময় সারাদিন কাজের হিসাব নিকাশ করবি, অর্থাৎ ভাল কাজ কি করেছিস এবং মন্দ কাজ কি করেছিস, সেটা ভেবে মন্দ কাজ যাতে আর না করতে হয় তার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হবি।

* দেখ-যেখানে ত্যাগ নেই, আছে মোহ ও আসক্তি সেখানেই যত দুঃখ, দৈন্য ও অশান্তি।

* যারা ধর্ম নেই মনে করে সাধুগণকে উপহাস করে, আর ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করে, তারা নি:সন্দেহে বিনাশ প্রাপ্ত হয়।

* সচেতন হতে হবে। অচেতনাই জীবনের ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরন্তর অভ্যাস এবং চেষ্টার ফলে তাকে সচেতনায় রূপান্তরিত করতে হবে।

* কাম, ক্রোধ সব রিপুই অবচেতন মনের স্তরে স্তরে সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। সুযোগ পেলেই তারা প্রকাশ হয়, কারণ মানুষ তাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়। অচেতন মন রিপুদের অবাধ ক্রীড়াক্ষেত্র।

* মন যা বলে শোন, কিন্তু আত্মবিচার ছেড়ো না। কারণ মনের মতন প্রতারক আর কেউ নেই। মহাপুরুষদের বাক্য, শাস্ত্র বাক্যে শ্রদ্ধাবান না হলে প্রকৃত আত্মবিচার সম্ভব নয়।

* আত্ম-বিশ্লেষণের ধারাটিকে সদাজাগ্রত রাখতে না পারলে, কামগন্ধহীন শুদ্ধ মনের জগতে প্রবেশ করা যায় না। কাম কলুষিত বিক্ষিপ্ত চিত্তে ধ্যান বা সমাধিও সম্ভব নয়।

* ক্রোধ ভাল, কিন্তু ক্রোধান্ধ হওয়া ভাল নয়।

* গুরু প্রদত্ত মন্ত্রের শুদ্ধাশুদ্ধ বিচার করা শিষ্যের কর্ম নয়। গুরু যা বলেছেন বিনা দ্বিধায় তা জপ করে যাওয়াই শিষ্যের কর্তব্য।

* বিদ্যা, তপস্যা, ইন্দ্রিয়সংযম ‍ও লোক পরিত্যাগ ছাড়া কেউই শান্তিলাভ করতে পারে না।

* অহং চলে গেলে নিজের মনই নিজের গুরু হয়, সৎ ও অসৎ বিচার আসে। জ্ঞানের সঙ্গে ভক্তির মণিকাঞ্চন যোগ হলে শ্রদ্ধা হবে তোদের আশ্রয়, শ্রদ্ধা হবে তোদের বান্ধব এবং শ্রদ্ধাই হবে তোদের পাথেয়।

* ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, যে সন্তান মায়ের আদেশ পালন করে, ভগবান তার মঙ্গল করেন।

* দীন দরিদ্র অসহায় মানুষের হাতে যখন যা দিবি তা আমিই পাব; আমি গ্রহণ করবো।
 * দরিদ্রতায় ভরা সমাজের দুঃখ দূর করার জন্য সর্বদা চেষ্টা করবি।

* তোরা যদি দীর্ঘায়ু হতে চাস্ তাহলে তোদের সদাচারী, শ্রদ্ধাশীল, ঈর্ষাহীন, সত্যবাদী, ক্রোধবিহীন ও সরল স্বভাব হতে হবে।

__ সংগ্রোহিত।
0 comments

জানতে হলে পড়তে হবে

প্রতিটি মুহূর্ত চলাফেরা অথবা কাজ করার সময় ভগবানের নাম মনে মনে স্মরন করুন বা জপ করুন এবং মনে প্রানে বিশ্বাস করুন ভগবান আমাকে রক্ষা করবেন সমস্ত বিপদ আপদ হতে । তাহলে নিজেই দেখতে পাবেন কিভাবে কত বিপদ হতে আপনারা রক্ষা পাচ্ছেন তবে অবশ্যই সৎ থাকতে হবে । ভগবান আমাদের হাজারো বিপদে ফেলে পরীক্ষা করেন এবং সতর্ক করে দেন আর এসব পরীক্ষা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় একান্ত ভাবে ভগবান কে স্মরন করেই ।
.
আর চেষ্টা করুন প্রতিদিন একটি করে হলেও শ্রীমদভগবত গীতার শ্লোক পরতে এবং তা মনোযোগ দিয়ে তার অন্ত নিহিত অর্থ বুঝতে । শ্রীমদভগবত গীতা কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মুখস্ত বা রিডিং পড়ে পূন্য অর্জন করার জন্য দেয়নি । এর মাধ্যমে দিয়েছে মানব কল্যানের পথ, দিয়েছে আত্মত্বত্ত লাভের পন্থা, দিয়েছে চির মুক্তির পন্হা, দিয়েছে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর, জীবনে চলার সঠিক রাস্তা । তাহলে কেন শুধু পুন্য অর্জনের জন্য মুখস্ত করছেন বা না বুঝে শুধু পড়ে যাচ্ছেন ? এবং আপনার সন্তানদের কেউ গীতা পাঠের অভ্যাস করান ।
আর আপনি নিজে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন মন্দিরে গিয়ে পাঠ শুনুন মন্দিরে গিয়ে এখানে সখানে বসে আড্ডা না মেরে এবং যাদের ছেলে মেয়ে আছে তাদেরকেও নিয়মিত মন্দিরে নিয়ে যান । ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে উৎসাহ দিন এবং তাদের সনাতনের এই বিশাল জ্ঞানভান্ডার কে জানান এবং নিজে জানুন । তবেই বৃদ্ধ বয়সে আপনার সন্তান আপনাকে ছেড়ে যাবে না অবহেলা করবে না । আপনার সন্তানদের সংস্কার দিন ও নিজেও সংস্কার জানুন । তবেই আপনার সন্তান তা লালন করবে ও ধারন করবে । তবেই সে ধর্মান্তরিত হবে না । মনে রাখবেন সন্তান আপনার কাছে যা শিখবে তাই লালান করবে । তাই নিজে মানুষ আপনার সন্তান এমনিতেই মানুষ হবে ।
.
নিজের ধর্মকে জানার চেষ্টা করুন তবেই আপনাকে বিধর্মীদের প্রশ্ন শুনে বিবরত হতে হবে না । তখন তাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে সুন্দর করে বোঝাতে পারবেন তখন তারাও বুঝবে ও অন্যকে বিরক্ত করবে না এবং নিজেও গর্ববোধ করবেন নিজেকে সনাতনী হিন্দু ভেবে । নিজে জানুন অন্যকে জানান ।
.
আর একটা কথা মনে রাখবেন সনাতন ধর্মে জাত প্রথা আছে এবং থাকবে তবে কখনই তা জম্মের ভিত্তিতে নয় তা হলো কর্মের ভিত্তিতে আর সেখানে কোন উচু জাত নিচু জাতের স্থান নেই । যার ব্রহ্ম জ্ঞান আছে বিদ্বান ও সৎ চরিত্রের অধিকারী তাকেই বলা হয় ব্রাহ্মন, এটা জম্মগত কোন অধিকার নয় । যিনি দেশ শাষন ও দেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত তিনি ক্ষত্রিয়, যেমনঃ সেনাবাহিনী, সরকার যা যে কেউ হতে পারে । যিনি ব্যবসা করেন তিনি বৈশ্য অর্থাৎ, টাটা আম্বানির মত ব্যবসায়ীরা । আর শুদ্র হলো যারা সেবা কাজে নিয়োজিত, যেমনঃ ডাক্তার, নার্স, আইনজীবী । সকলকেই কর্মের মাধ্যমেই ভাগ করা হয়েছে তবে কেন উচু জাত নিচু জাত এর কুসংস্কার নিয়ে বসে আছেন ? তাই বলি আগে জানুন তরে ব্যবহার করুন ।
লজ্জায় নয়, গর্ব করে বলুন আমি হিন্দু আমি সনাতন ।
লিখেছেনঃ অমিত
Like our page: সনাতন সন্দেশ - Sanatan Swandesh
Share this post
0 comments

লক্ষ্যে একনিষ্ঠতা

বর্তমানের যান্ত্রিক সভ্যতায় জীবন যাত্রার গতি যেমন দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে, তেমনি আমাদের চিন্তাচেতনায়ও অস্থিরতায় চকিত থাকে সর্বক্ষণ। আমরা ধর্ম পালন তো দুরের কথা, ধর্মতত্ত্ব শোনার বা পড়ারও সময় পাইনা। অথচ শ্রীমদ্ভগবদ গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের সর্বচিন্তা কর্মে ধর্মাধর্ম পালনের সুন্দর উপদেশ দিয়েছেন।

আমরা দেখি, সন্ন্যাস জীবনে মানুষ গৃহত্যাগী হয়ে বনেজঙ্গলে অথবা আশ্রমে জীবনাতিপাত করেন। সে তো শুধু নিজের আত্মার উন্নতিকল্পে। ঈশ্বর আমাদের এই সংসারের জীবদের কল্যাণের নিমিত্তে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি গীতায় বলেছেন যে সকল কর্ম করেও কর্মে বা কর্মফলে যে আশা করেনা, সেই প্রকৃত সন্ন্যাসী। অর্থাৎ সকল কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ করে লোক হিতার্থে কর্ম করাই আমাদের লক্ষ্যও উদ্দেশ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়।

মাদকের নেশা যেমন মানুষকে ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে টেনে নেয়, তেমনি ফলাকাঙ্ক্ষা কর্মেও মানুষের সর্বনাশ আর বন্ধন, তথা জীবন মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ করে। সংসারে আমাদের প্রধান লক্ষ্য সুখে শান্তিতে আপনজনদের সাথে জীবন যাপন করা। কিন্ত একবারও কি চিন্তা করে দেখেছি, সৎ পথে আর সুস্থ সুন্দর জীবনের জন্য আমাদের কর্তব্য কর্ম কেমন বা কিরুপ হলে আমরা ধর্মীয় চেতনা অক্ষুন্ন রেখে, সবদিক বজায় রাখতে পারি?

ফেসবুকে আজকাল দেখি প্রচুর ধর্মীয় পেজ গ্রুপ ইত্যাদিতে ভরপুর। যা দেখে সত্যিই ভাল লাগে। আরো ভাল লাগে, যখন কারো কারো লেখার চমৎকারিত্বে। যদি এসব লেখা মৌলিক হয়, তবে লেখককে সাধুবাদ না দিলে সেটা হবে অকৃতঞ্জতা। কারণ এদের শাস্ত্রঞ্জান সত্যিই লোকশিক্ষায় সহায়ক। আমরা যদি ধর্মকর্ম নাও করি, এই যে ধর্মীয় কাজে সময় ব্যয়, এটা তো মিথ্যা নয়। যতক্ষণ একটা পোস্ট করতে, লাইক বা কমেন্ট করতে সময় লাগে, ততক্ষণ তো ভগবান সান্নিধ্যে থাকা হলো।
এখানে কারো কাছে কিছুরই প্রত্যাশা নেই, আছে শুধু জিঞ্জাসা যা ভগবদ্ কর্ম তথা ভগবদ্ঞ্জান সংগ্রহের আকাঙ্খা। গীতার মতে এটা অবশ্যই নিষ্কাম কর্ম। আমরা সবাই যদি এমন কাজে ব্যপ্ত থাকি

তবে আর বেশি দিন নেই, যেদিন ভগবানের অপার কৃপায় ঘরে ঘরে "হরিনাম" কীর্ত্তিত হবে।

তাই সকল বন্ধুদের নিকট আমার সবিনয় নিবেদন, আমরা যেন অহং, কর্তৃত্বাভিমান ইত্যাকার আসুরিক ভাব গুলি দুরে রেখে, সবাই সবার জন্য মঙ্গল আর শান্তির জন্য কাজ করি। আর আমাদের উত্তরসুরিদের ধর্মীয় আদর্শ ও ভাবধারায় মানুষ করার চেষ্টা করি।

আমাদের চেষ্টায় যদি কোনো সংশয় বা কর্মে যদি কোনো আকাঙ্খা না থাকে, তবে নিশ্চয়ই আমরা সফল হবোই হবো। কারণ স্বয়ং ভগবান আমাদের সাথে আছেন। আর আমাদের মহা অস্ত্র, সর্ববিপদ সংহারী মহামন্ত্র তো আছেই।

"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে!!"
!!জয় শ্রীকৃষ্ণ!! জয় রাধে!!
!!জয় সকল ভক্তবৃন্দের!!

courtesy : দেবেন্দ্র
0 comments

কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম্

পরমকরুনাময় সচ্চিদানন্দঘন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সকল জীবের বীজ। যা তিনি শ্রীমদ্ভগবদ গীতায় বার বার বলেছেন যে তিনি সকল দেবতার দেবতা। সকল ঈশ্বরের ঈশ্বর। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের থেকে বড় কোনো ঈশ্বর নেই। এই চরম সত্যটা অনেকে মানতে চাননা। তাঁদের ধারণা বা বিশ্বাস এমনকি মনে করেন যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একজন একজন যোগী ছিলেন, ঈশ্বর নন।

যোগের আটটি অঙ্গ। যা হলো, যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধ্যান, ধারণা ও সমাধি। সর্ব প্রথমে যম কে ধরা হয়। যম পাঁচ প্রকার, অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ। সুতরাং যিনি যোগী, তিনি অবশ্যই 'যম' পালন করবেন। অর্থাৎ সত্য কথা তাঁকে বলতেই হবে। যদি তিনি অসত্য বা মিথ্যা কথা বলেন, তবে তিনি যোগী হতে পারেন না। কেননা তিনি যোগের প্রথম অঙ্গ 'যম'ই পালন করেননি। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কয়েক স্থানে নিজেকে ঈশ্বর বলে জানিয়েছেন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, তিনি যদি যোগী হয় থাকেন, তাহলে অবশ্যই সত্য কথা বলেছেন। আর তিনি যদি সত্য কথা বলে থাকেন, তাহলে তিনি যে সচ্চিদানন্দঘদ পরম ঈশ্বর একথা মানতেই হবে। কাজেই যাদের অঞ্জানতার ও অবিদ্যার ফলে এমন অহেতুক কথা প্রচার ও বিশ্বাস করেন, তাঁরা যত শিঘ্র নিজেদের ভুল বুঝতে পারবেন, ততই মঙ্গল। আর সবথেকে বড় প্রমাণ তো "কৃষ্ণ নাম"

জপ কীর্ত্তন। এই নাম জপ কীর্ত্তনে যে মানসিক তৃপ্তি ও শান্তি, তা' আর কোথায়?

তাই সকল বন্ধুদের আহবান করি এই মধুর নাম জপ কীর্ত্তন করার জন্য। নিশ্চয়ই ভগবান সবার মনের সংশয় কাটিয়ে পরম শান্তি প্রদান করবেন।

"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে!!"

!!জয় শ্রীকৃষ্ণ!! জয় রাধে!!

কার্টেসীঃ দেবান্দ্র
0 comments

শ্রীভগবানর্পনেই পূর্ণতা

সচ্চিদানন্দঘন, পরমেশ্বর ভগবান সকল উৎস্য ও সৃষ্টির কারণ। তিনি অনাদি ও অনন্ত, ষড়ৈশ্বর্যময়, চৌষট্টি কলায় পূর্ণতম। সকল জীবজড় তাঁর অস্তিত্বে এবং তিনি সকল জীবজড়ের অস্তিত্বে একীভূত। তাইতো তিনি সর্ববিভু, সর্বঞ্জ ও সকলের অন্তঃরাজ্যের অধিপতি। তাঁর পদে অর্পিত সকল কর্ম, চিন্তা, ধ্যান, ধারণা ইত্যাদি পূর্ণ থেকে পূর্ণময় হয়ে ওঠে।

আমরা অনেকে তানসেনের নাম শুনেছি। তিনি ছিলেন একজন গায়ক। তাঁর সঠিক গায়কী কুশলী আর সুরসৌষ্ঠবে প্রকৃতি সাড়া দিতেও অবহেলা করতো না। তানসেন ছিলেন দিল্লীর বাদশাহ আকবরের সভাগায়ক। তাঁর সঙ্গীত মুর্ছনায় আকবরের সভা বাঙ্ময় হয়ে উঠতো। আকবর বাদশাহ তানসেনের সঙ্গীতে এমন বিমোহিত হয়ে থাকতেন যে, তানসেনকে তুষ্টি করার ভাষা হারিয়ে ফেলতেন। একদিন তানসেন আকবরকে বললেন যে তিনি আর কি গান করেন, সঠিক গান করেন তাঁর সঙ্গীত গুরু হরিদাস ঠাকুর। আকবর বাদশাহ ছিলেন সত্যিকারের সঙ্গীত পিয়াসী মানুষ। তাই তিনি দাবী করলেন যে যেমন করেই হোক, হরিদাস ঠাকুরের গান তাঁকে শুনতেই হবে, তানসেন যেনো ব্যবস্থা করেন। তানসেন তাঁর গুরু হরিদাস ঠাকুরের নিকট যেয়ে বাদশাহর ইচ্ছার কথা জানালেন। হরিদাস ঠাকুর মহাকুন্ঠায় পড়লেন। তিনি যে সন্ন্যাসী মানুষ, রাজদর্শন যে মহা অপরাধ। তাই কিছুতেই তিনি রাজী হলেন না বাদশাহকে গান শোনাতে। 
তানসেন আকবরকে খুলে বললেন সব। কিন্ত বাদশাহ যে ছাড়বার পাত্র নয়, তিনি তানসেনকে বললেন যে ঠাকুরের গান তাঁকে শুনতেই হবে, তা যেমন করেই হোক। তানসেন জানতেন তাঁর গুরু কোন সময়ে গান করেন। তিনি আকবরকে বললেন যে রাতের অন্ধকারে গোপনে গুরুদেবের কুটিরে গেলে, ভাগ্য যদি প্রসন্ন হয় তবে শোনা যেতে পারে। যথারীতি বাদশাহ আকবর আর তানসেন ছদ্মবেশে রাতের অন্ধকারে হরিদাস ঠাকুরের কুটিরের পার্শ্বে লুকিয়ে রইলেন। সময় যেনো আর কাটে না। অবশেষে রাত দ্বিতীয় প্রহরের শেষে, তৃতীয় প্রহরের শুরুতে হরিদাস ঠাকুর গান শুরু করলেন। তিনি জানতেও পারলেন না, তাঁর এক পরম ভক্ত কতো কষ্ট ভোগ করে তাঁর গান শুনছেন। হরিদাস ঠাকুরের গান শুনে, আকবর এমন বিমোহিত হলেন যে, তাঁর মুখে কোনো ভাষা আসলো না। গান শেষে যেভাবে গোপনে দুজন এসেছিলেন, সেভাবে গোপনেই দরবারে চলে গেলেন।

এরপর তানসেনের গান আর খুব একটা ভাল লাগতো না আকবরের। একদিন তিনি বলেই ফেললেন তানসেনকে। "আপনার গুরু এমন ভাল গান করেন, কিন্ত আপনার গান তার ধারেকাছেও যায়না কেনো?"

উত্তরে তানসেন বললেন, "দেখুন নবাব, আমার গানের শ্রোতা দিল্লীশ্বর আর তাঁর সভাসদেরা, কিন্ত আমার গুরুদেবের গানের শ্রোতা স্বয়ং জগদীশ্বর আর তাঁর ভক্তরা। তাই শ্রোতার তারতম্যের ফলেই গানের এমন পার্থক্য।"

আসলেই তো তাই। ভগবদ্ভক্তরা যেমন ভগবদ্ভক্ত কথা শুনতে, জানতে আগ্রহের অন্ত রাখেনা, তেমনি ভগবানও ভক্তদের প্রাণের কথা শুনতে সদা উদগ্রীব হয়ে থাকেন। তিনি শুধু ভক্তদের তাঁর উপর আন্তরিকতার আর ভক্তির ভাবই দেখতে চান। তাই বন্ধুরা আমরা যেনো ভগবানের উদ্দেশ্যে যা কিছু করি, তা আড়ম্বরে না করে ভক্তিভাবে করি। আর নিরন্তর জপকীর্ত্তন করি।

"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে!!"

!!জয় শ্রীহরি!! জয় রাধে!!

Written by: দেবেন্দ্র
0 comments

সকল জীবই স্ব-আত্মীয়

এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির পূর্বে সচ্চিদানন্দ ভগবান ছিলেন "একমেবাদ্বিতীয়াম্"। সৃষ্টির মূলে যেমন তিনিই সব আবার স্থিতি ও ধ্বংসের কারণও তিনি একাই। তাঁর লীলামধুর্য্য তথা হ্লাদিনী শক্তির আস্বাদনের নিমিত্তে তিনি বহু হলেন। মাধুর্য্যাবগাহনে তাঁর বিভুতি প্রকাশে আমরা প্রত্যক্ষ করি অবাক বিশ্ময়ে। সকল জীবের মধ্যেই তাঁর প্রকাশ জীবাত্মা রুপে। যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়, তার সবথেকে প্রিয় ব্যাক্তি কে, নিশ্চয়ই উত্তর আসবে সে নিজেই। কারণ মানুষ নিজেকে যতোটা ভালবাসে, ততোটা আর কাউকে নয়। এর পরই আসে মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান তথা পরিবার। এর পর সেই ভালবাসার ক্ষেত্র ক্রমে পরিবর্ধিত হয়ে, পরিবার থেকে, আত্মীয়-স্বজন, সমাজ, গ্রাম, এলাকা, দেশ ছাড়িয়ে যায়। জাতীয় পর্যায় ছেড়ে ক্রমে এই ভালবাসা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছায় যখন মতে ও পথে মিল হয়। এমনকি পরিচয় বা সম্পর্ক জনিত কারণেও ভালবাসা প্রকাশিত হয়। এটা আমাদের সম্পর্কোন্নয়ন বা চেনা জানা গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্ত এই চেনা জানা বা সম্পর্কের বাইরে আর একটা কারণ আমরা চিন্তা করলেই বুঝতে পারবো।

এই যে ফেসবুকে কতজনের কত শত হাজার বন্ধু, হয়তো অনেকের সাথে অনেকের দেখাও হয়নি বা কোনোদিন হবে বলেও মনে হয় না। অথচ মনে হয় কেউ কেউ কতো আপন, যেন জন্ম জন্মান্তর ধরে পরিচিত। কেউ কি এর কারণ খোঁজার প্রয়াস করেছে? আমার মনে হয়, না। এটাই আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি, যা ভগবান গীতায় বলেছেন। আত্মায় আত্মায় মিলন হলেই তো আত্মীয় হয়। এই যে আমার দেহের যে জীবাত্মা, সে তো পরমাত্মারই অংশ। ওই যে কুকুর, সাপ, কীট, পতঙ্গ সহ লক্ষ কোটি জীব, সবার দেহের ভেতরের জীবাত্মা ও তো সেই এক পরমাত্মার অংশ। তাহলে কি বিশ্বের সকল জীবই আমার আত্মার সাথে সম্পর্কিত হলো না? এযে পরমেশ্বরের অকৃত্রিম বিভুতি, একে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মানুষে মানুষে, অন্য প্রাণীতে যতোই হানাহানি হোক না কেন, সবাই যে সবার পরমাত্মীয়, একথা অস্বীকার করার কোনো কারণও নেই।

তাইতো শ্রীগীতায় ভগবান "সর্বভূতে সমদর্শন" নামে একটা কঠিন অথচ প্রাণ্জল ও সার্ব্বজনীন শব্দ বসিয়ে সবাইকে সবার সাথে বেঁধে রেখেছেন। ঈশ্বর সর্বদা সর্বভুতে বিরাজমান। সকল জীব, বস্তু তার বাইরে নয়। তিনি যেমন অনন্ত অসীম, তেমনি সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতম। যেদিন আমরা পরস্পর পরস্পরকে সত্যিকার ভাবে আত্মীয় বা আপন ভেবে ভালবাসতে পারবো, সেদিন হবে আমাদের প্রকৃত ভক্তিতত্ত্বের প্রকাশ। আর তা যতদিন না হচ্ছে, যতোই আমরা ভগবদ্ ভক্ত বলে পরিচয় দেই বা আত্মশ্লাঘায় কালাতিপাত করি না কেন, আমাদের ভক্তি, "মদ্-ভক্ত" পর্যায়ে উঠতেই পারবে না। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আমরা 'গীতামৃত' রুপ ভগবদ্ বানী, যা সর্বোপনিষদ রুপী গাভীর দুগ্ধ, অমিয় তৃপ্তির সাথে আস্বাদন করতে পারছি। আমাদের প্রতি ভগবানের এটা বিশেষ কৃপা। আর এই অমৃতের উপভোগ তখনই সার্থক হবে, যখন তা' আমরা ব্যবহারিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বক্ষণ প্রয়োগ ও অনুসরণ করতে সক্ষম হবো। তদুপরি শ্রীমন্ মহাপ্রভুর বাণী, "সর্ব ঘরে হরি নাম সঙ্কীর্তন" ধ্বনীত হবে অহর্নিশি। সকল মত পথ ভুলে মানুষ একে অপরকে কাছে টেনে নেবে আত্মীয়তার বন্ধনে। অন্য জীবদেরও দিবে যথার্থ মর্য্যাদা, তবেই না সার্থক মানব জন্ম আর প্রকৃত ভক্ত থেকে মদ্-ভক্ত হয়ে ওঠা। আর তখনই এই জীবাত্মা পরমাত্মায় বিলীন হতে আর হবে না বিলম্ব। অন্তরে এই আশা আছে অনেক দিন ধরেই। আরো অনেকের নিশ্চয়ই এমন ভাবনায় ভাবিত হয় প্রাণ। পরমকৃপাময় সচ্চিনানন্দ ভগবান সকল জীবের কল্যাণ আর মঙ্গল করুণ। শ্রীহরির চরণকমলে এ অধমের এই প্রার্থনা।

"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে!!"

!!জয় শ্রীকৃষ্ণ!! জয় রাধে!!
!!জয় হোক সকল জীবের!!

কার্টেসীঃ দেবেন্দ্র
0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger