সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

বলিপ্রথা কি সত্যই হিন্দু তথা সনাতন ধর্মে নিষিদ্ধ?

মনসাপূজা, দুর্গাপূজা এবং কালীপূজা আসলেই দেখি কিছু মানুষ একটিভ হয়ে লেখালেখি এবং প্রচারণা শুরু করে দেয় শাস্ত্রীয় বলিপ্রথার বিরুদ্ধে। তাদের কিছু বালখিল্য যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চায় সনাতন ধর্মে পশুবলি অধর্মাচরণ এবং অশাস্ত্রীয় । তবে একথা সত্য যে বলি প্রথা অমানবিক এবং অনেকটা দৃষ্টিকটুও বটে।কিন্তু বলিপ্রথা কি সত্যই ধর্মে নিষিদ্ধ?

আমাদের পূজা পদ্ধতি প্রধানত দুইটি ধারায় বিকশিত বৈদিক এবং তান্ত্রিক শাস্ত্রাচার পদ্ধতি । এই দুটি পদ্ধতিতেই পশুবলির বিধান দেয়া আছে।
সারা পৃথিবীর হিন্দু সম্প্রদায় প্রধানত তিনটি প্রধান মতে বিভক্ত শাক্ত, শৈব এবং বৈষ্ণব। এ তিনটি মতের মধ্যে বৈষ্ণব মতটিকে বাদ দিলে অন্যদুটি মতে পূজা উপাসনার অত্যাবশ্যকীয়ভাবেই পশুবলির বিধান দেয়া আছে। শাক্ত মতের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দ্বাদশ অধ্যায় (১০,১১, ২০) সহ একাধিক স্থানেই দেবীপুজায় পশুবলির কথা বলা আছে। একইভাবে শৈবদের গ্রন্থাবলীতেও পশুবলির বিধান আবশ্যকীয়ভাবে দেয়া আছে।

শুধুমাত্র বৈষ্ণব পুরাণ এবং শাস্ত্রাবলিতে পশুবলির আবশ্যকতা খুব একটা পাওয়া যায় না। এর অন্যতম কারণ বৈষ্ণব শাস্ত্রাদিতে ও উপাসনায় অহিংসা তত্ত্বের প্রভাব এবং শ্রীরামানুজাচার্য, শ্রীমধ্বাচার্য, শ্রীনিম্বার্ক এই প্রধান চার বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রধান আচার্যবৃন্দ সকলেই দক্ষিণ ভারতের। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, দক্ষিণ ভারতে ঐতিহাসিকভাবেই নিরামিষাশী প্রভাব প্রবল। সেখানে বহু মুসলিম এবং খ্রিস্টানরাও নিরামিষাশী।এই নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসেরই সরাসরি প্রভাব পরেছে বৈষ্ণব সম্প্রদায়গুলোর উপরে।

বেদের পরে বৈষ্ণবদের প্রধান গ্রন্থ হলো শ্রীমদ্ভাগবত এবং বিষ্ণু পুরাণ। তবে বৈষ্ণবদের জীবনে শ্রীমদ্ভাগবতের প্রভাব তীব্র এবং অসীম। ফেসবুকে যেহেতু বেশী কথা লেখার সুযোগ নেই তাই পশুবলি এবং মাংসাহার সম্পর্কিত ভাগবতের দুটি স্কন্ধের কয়েকটি শ্লোকের বাংলা অনুবাদ তুলে দিচ্ছি। আপনারা নিজেরা পড়ে নিজেরাই বুঝে যাবেন যে পশুবলি এবং মাংসাহার সম্পর্কে ভাগবতের মতাদর্শ কি।
( এখানে অনুবাদে রণব্রত সেন সম্পাদিত এবং ত্রিপুরাশংকর সেনশাস্ত্রী ভূমিকা সম্বলিত হরফ প্রকাশিত শ্রীমদ্ভাগবত ব্যবহৃত হয়েছে)
"অজগর যাকে গ্রাস করেছে সে যেমন অন্যকে রক্ষা করতে পারে না, তেমনি কাল, কর্ম ও ত্রিগুণের অধীন পাঞ্চভৌতিক এই দেহের পক্ষে অন্য কাউকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। ভগবানই সকলের উপযুক্ত জীবিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খায়, পা যুক্ত পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ ঘাস-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের হত্যা করে। জীবই জীবের জীবিকা - এই নিয়ম। এ জগৎ ভগবানই। তিনিই সর্বজীবের আত্মা, অথচ অদ্বিতীয়, ঐভাবে স্বপ্রকাশ। তিনিই অন্তরস্থ, তিনিই বহিঃস্থ। এক ঈশ্বরকে মায়া প্রভাবে দেব,মানুষ প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে উপস্থিত দেখ।"
( শ্রীমদ্ভাগবত: প্রথম স্কন্ধ, ১৩ অধ্যায়, ৪৫-৪৭)
"শাস্ত্রে দেবোদ্দেশে পশুবধের বিধান থাকলেও বৃথা হিংসার বিধান নেই।....... কিন্তু ভোগাসক্ত মানুষ এই বিশুদ্ধ ধর্ম জানে না। শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ, গর্বিত ও পণ্ডিতম্মন্য সেই পাপাচারী নিঃশঙ্কচিত্তে পশুবধ করে, কিন্তু পরলোকে সেই নিহত পশুরাই তাদের মাংস খেয়ে থাকে। এইভাবে যারা পশুহিংসা দ্বারা পরদেহের প্রতি হিংসা করে, তারা সেই সর্বান্তর্যামী শ্রীহরিকেই দ্বেষ করে।"
(শ্রীমদ্ভাগবত : একাদশ স্কন্ধ, ৫ম অধ্যায়, ১৩-১৪)
শ্রীমদ্ভাগবতের দুটি কোটেশনে আপনাদের দুটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করবো-
১.হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খায়, পা যুক্ত পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ ঘাস-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের হত্যা করে। জীবই জীবের জীবিকা - এই নিয়ম। এ জগৎ ভগবানই।
২. শাস্ত্রে দেবোদ্দেশে পশুবধের বিধান থাকলেও বৃথা হিংসার বিধান নেই।....... কিন্তু ভোগাসক্ত মানুষ এই বিশুদ্ধ ধর্ম জানে না।
আশাকরি এখানেই আপনারা আপনাদের উত্তর পেয়ে গেছেন যে শ্রীমদ্ভাগবতে পশুবলি এবং মাংসাহার নিষিদ্ধ কি নিষিদ্ধ না?
একারণেই মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে -
দেবোদ্দেশং বিনা ভদ্রে হিংসা সর্বত্র বর্জয়েৎ।(১১.১৪৩)
দেবোদ্দেশে বলিদান উৎসর্গ ব্যতীত সর্বত্রই হিংসা বর্জন করতে হবে।
এবং এ বিষয়ে আরো বলা হয়েছে-
কৃতায়াং বৈধহিংসায়াং নরঃ পাপৈর্ন লিপ্যতে। (১১.১৪৩)
দেবোদ্দেশে বলিদানে যে হিংসা শাস্রে তাকে বৈধহিংসা বলা হয়েছে। হিংসা পাপ, কিন্তু বৈধহিংসায় পাপ স্পর্শ করে না।
আমি বিশ্বাস করি আর না করি, শাস্ত্রে আছে বলিকৃত পশু সকল বন্ধন মুক্ত হয়ে মুক্তিলাভ করে। আমাদের ষড়রিপুর নাশের প্রতীক হিসেবেই পশুবলি দেয়া হয়। যেমন পাঠা হলো অনিষ্টকর কামের প্রতীক, মহিষ হলো ক্রোধের প্রতীক। তবে পশুবলি হয়তো প্রতিকী, কিন্তু সত্যিকারের পশুবলি দেবতার উদ্দেশ্যে আমরা তখনই দিতে পারবো যখন সত্যিসত্যি আমরা আমাদের দেহ থেকে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ,মদ ও মাৎসর্য রূপ শরীরস্থ এই ষড়রিপুকেই বিনাশ করে পশুত্ব থেকে
প্রথমে মনুষ্যত্ব এবং অন্তে দেবত্বে পৌছতে পারবো।

শ্রীভগবানের কাছে এই হোক আমাদের প্রার্থনা -
#ধিয়ো_যো_নঃ_প্রচোদয়াৎ।।

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী

( আমি জানি আমার লেখাটায় কিছু মানুষ দুঃখ পেয়েছেন, অথবা আমার উপরে বিরক্ত হয়েছেন; কিন্তু ঠিক কিছুই করার নেই আমার। গত কয়েকদিনের পশুবলির বিরুদ্ধে প্রচারণায়, অসংখ্য মানুষ আমার কাছে এ বিষয়ে আমার মতামত চায় ম্যসেঞ্জারে অথবা মোবাইলে ফোন করে। তখন আমি তাদের বলি, আমি বিষয়ে ধারাবাহিক দুইতিনটা পোস্ট দিয়ে দেবো। তাই বাধ্য হয়ে ঢেঁকিগেলার মতো এই পোস্টটি দেয়া। কেউ দুঃখ বা কষ্ট পেয়ে থাকলে, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত!)
0 comments

হিন্দুরা কেন মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে? জানতে হলে পড়তে হবে।

প্রায়ই আপনার মুসলমান বন্ধুদের কাছে আপনাকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় - হিন্দুরা কেন মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে? কবরও তো দিতে পারতো বা অন্যকিছু করতে পারতো। পুড়িয়ে ফেলা কি অমানবিক নয়?
আমাদের অজ্ঞতার কারণে আমরা প্রশ্নটির সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হই। প্রথমে যে ইনফরমেশনটি আপনার জানা প্রয়োজন তা হলো পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ হিন্দু-বৌদ্ধ রীতি অনুসরণ করে অর্থাত মৃতদেহ পুড়িয়ে সৎকার করে। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি জাপান থেকে শুরু করে চীন, করিয়া, ভারত ও অনান্য জাতি এই রীতি অনুসরণ করে। তাহলে আপনি প্রথমত: পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন : ১. পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি জাপানিরা কি তাহলে অমানবিক ? পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কি অমানবিক ? যদি এই অর্ধেক মানুষ অমানবিক হয় তবে এদের মধ্যে কেন আমরা সবচেয়ে কম হানাহানি দেখতে পাই ?
আসুন এবার প্রকৃত উত্তরের দিকে যাই।

১. হিন্দুধর্মে কবর দেয়া বা সমাধি দেয়া নিষিদ্ধ নয়। স্মৃতিশাস্ত্রে স্পষ্টভাবেই এটা অনুমোদিত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে এখনও এটা প্রচলিত আছে। যেমন- নাথ বা যোগী সম্প্রদায় এবং সন্ন্যাসীদেরকে সমাধি দেয়া হয়। অনেক জায়গায় দেখা যায় কারও অপমৃত্যু হলে তার শব সমাধি দেয়া হয়, পোড়ানো হয় না।

২. আমরা কথ্য ভাষায় 'লাশ পোড়ানো' বলি, কিন্তু শাস্ত্রীয় ভাষায় এটা 'অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া'। এটা আবার কী? অন্ত+ইষ্টি=অন্ত্যেষ্টি। ইষ্টি মানে যজ্ঞ। অন্ত্যেষ্টি হলো জীবনের শেষ যজ্ঞ।
আমরা জানি, আমাদের সুপ্রাচীন পূর্বপুরুষদের বৈদিক সমাজ ছিল যজ্ঞপ্রধান। জীবনের শুরু 'গর্ভাধান' থেকে জীবনের শেষ 'দেহত্যাগ' সবই হতো ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে। জীবৎকালে প্রতিদিনই পঞ্চমহাযজ্ঞ করতে হতো (এখনও করার বিধান)। এছাড়া অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মতো বিবিধ যজ্ঞে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে 'হবি' (বর্তমানে পূজায় অর্ঘ্য নিবেদনের মতো) উৎসর্গ করা হতো। এ হলো ঈশ্বরের দেয়া জীবন ও দেহ দ্বারা ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রকৃতির উপাদানসমূহ ভোগ করার প্রেক্ষিতে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতাপূর্বক তাঁর উপাসনা করা। তাই অন্ত্যেষ্টি তথা জীবনের শেষ যজ্ঞে ঈশ্বরপ্রদত্ত এই দেহখানি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই 'হবি' বা অর্ঘ্যরূপে উৎসর্গ করা হয়। এটা সত্যিই চমৎকার একটা ব্যাপার!

৩. প্রাচীন দর্শন অনুযায়ী বিশ্বচরাচর তথা আমাদের দেহও পাঁচটি ভূত বা উপাদান দ্বারা তৈরি। একে 'পঞ্চভূত' বলে। এগুলো হলো- ক্ষিতি (মাটি), অপ (জল), তেজ (আগুন), মরুৎ (বাতাস), ব্যোম (আকাশ বা শূন্যস্থান)। যারা বলেন 'মাটির দেহ' বা দেহ শুধু মাটি দিয়ে তৈরি, তাই একে মাটির সাথেই মিশিয়ে দেয়া উচিৎ, তারা অবশ্যই ভুল বলেন। বাস্তবে দেহ এই পাঁচটি উপাদানের সমষ্টি। শবদাহ করার মাধ্যমে দেহকে এই ৫টি উপাদানেই মিশিয়ে দেয়া হয় প্রত্যক্ষভাবে। দাহ শেষে অবশিষ্টাংশ জলে বিসর্জন দেয়া হয়। এজন্য শ্মশান সর্বদাই জলাশয়ের পাশে হয়ে থাকে।
অপরদিকে সমাধি বা কবর দিলে দেহ পঞ্চভূতে লীন হয় বটে, তবে পরোক্ষ ও ধাপে ধাপে। কারণ দেহ মাটির সাথে মেশে পঁচন প্রক্রিয়ায়। কোটি কোটি অনুজীব, পোকা-মাকড়ের খাবারে পরিণত হয় দেহ। এভাবে পঁচে গলে মাটিতে মেশানোই বরং দাহ করার চেয়ে বেশি অমানবিক মনে হয়।
একটা মজার তথ্য দিই। অনেক সময় আমরা বলি, লোকটা তো মরে ভূত হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে সে প্রকৃতিতে (পঞ্চভূতে) লীন হয়েছে -এটাই বুঝতে হবে।

৪. মৃত্যু হয় দেহের; আত্মার নয়। অবিনাশী আত্মা অজর, অমর, অক্ষয়, অব্যয়। এটা জগদীশ্বর পরমাত্মার অংশ। ('বিদ্রোহী' কবিতার কয়েক লাইন মনে পড়ে কি?) জড় প্রকৃতির পঞ্চভূতে গড়া দেহ ফিরে যায় পঞ্চভূতে, আর জীবাত্মা ফিরে যায় পরমাত্মাতে। (মৃত্যুর পরে অবশ্যই আর কখনোই আপনি পুরনো দেহে ফিরে আসবেন না, বা কোন প্রকার শাস্তি/আজাব ভোগ করবেন না। শবদাহ করার পরে/মাটিতে মিশে যাওয়ার পরে নিশ্চয়ই লীন হওয়া দেহকে শাস্তি/আজাব যৌক্তিকভাবে সম্ভব নয়।)

৫. মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে শোকের কোন ব্যাপার নয়। তীর্থস্থান বেনারস বা কাশীতে মৃত্যুও একটা উৎসবের ব্যাপার। 
"জাতস্য হি ধ্রুবর্মৃত্যো ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ"-গীতা। 
যে জন্মেছে তার মৃত্যু নিশ্চিত, যে মরেছে তার জন্মও নিশ্চিত।
অতএব, দেহান্তরের নিছক সাধারণ ঘটনায় শোক কেন? বরং জরাজীর্ণ রোগশোকে আক্রান্ত দেহ ছেড়ে জীবাত্মার নতুন সুস্থ-সুন্দর দেহে জীবন আরম্ভের প্রাক্কালে মৃতকে হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানানোই উচিত।

Courtesy by: Rana Nandi

➤ লাইক এবং শেয়ার করে সকলকে জানার জন্য সুযোগ করে দিন।
➤ পোষ্ট গুলো ভালো লাগলে কৃপা পূর্বক পেজটিকে লাইক দিয়ে রাখুন।
0 comments

ব‌লি রাজা ও বামন অবতার


প্রহ্লা‌দের পৌত্র ব‌লি । প্রহ্লা‌দ ছিলেন পরম হ‌রিভক্ত । ব‌লি ছিলেন বিষ্ণু‌দ্বেষী । বিষ্ণু‌নিন্দা করার জন্য প্রহ্লাদ ব‌লি‌কে অ‌ভিশাপ দি‌য়ে‌ছিলেন - " বিষ্ণু‌নিন্দার জন্য রাজ্য হারা‌বে ।তোমার দারুণ অধঃপতন হ‌বে । " ব‌লি ইহাতে ভয় পাইয়া ব‌লি‌লেন - " কি উপায় হ‌বে , পিতামহ ? এমন শাপ কেন দি‌লেন ? "

প্রহ্লাদ বলি‌লেন - " উপায় আবার কি ? শ্রীহ‌রি‌তে ভ‌ক্তি জন্মা‌লেই সব ফি‌রে পা‌বে । "

প্রহ্লাদ হ‌রিভক্ত ছি‌লেন - তাই ব‌লিয়া ই‌ন্দ্রের প্রতি বি‌দ্বেষ তাঁহার কম ছিল না । দেবতা‌দের তি‌নি শত্রু ব‌লিয়াই ম‌নে করি‌তেন । একশত বৎসর ধ‌রিয়া প্রহ্লা‌দ দেবতা‌দের স‌ঙ্গে অ‌বিরত যুদ্ধ চালান । বৃদ্ধ বয়‌সে প্রহ্লাদ পরা‌জিত হইয়া রাজত্ব ত্যাগ ক‌রেন । তি‌নি পৌত্র ব‌লি‌কে রা‌জ্যে অ‌ভি‌ষিক্ত ক‌রিয়া গদ্ধমাদন পর্ব্ব‌তে তপস্যার জন্য চ‌লিয়া যান ।

ব‌লি রাজা হইয়া দেবতাদের স‌ঙ্গে যুদ্ধ চালাইতে থাকেন । ব‌লির অ‌ন্ত‌রে বিষ্ণুভ‌ক্তি তখনও জা‌গে নাই । পিতামহের অ‌ভিশা‌পের ফ‌ল ফ‌লিল । ইন্দ্র বিষ্ণুর সহায়তায় ব‌লি‌কে রাজ্যভ্রষ্ট ক‌রি‌লেন ।ই‌ন্দ্রের ভ‌য়ে ব‌লি নানাস্থা‌নে লুকাইয়া বেড়াই‌তেন । একবার তি‌নি গর্দ্দ‌ভের রূপ ধ‌রিয়া ভ্রমণ ক‌রি‌তে‌ছি‌লেন । ছদ্মরূপ ধ‌রিলেও তাহা দেবতা‌দের দৃ‌ষ্টি এড়ায় না । ইন্দ্র তাঁহা‌কে দে‌খিয়া চি‌নিয়া ব‌লি‌লেন - " হে দৈত্যরাজ , আজ না হয় তু‌মি রাজ্যহারা হ‌য়েছ । তাই ব‌লে এ কি দুর্গ‌তি তোম‌রি ! ছি ছি ! কাপুরু‌ষের মত তু‌মি একটা গর্দ্দ‌ভের মধ্যে আত্মগোপন ক'‌রে আছ ! বড়ই লজ্জার কথা । "

দৈত্যরাজ উত্তর দি‌লেন - " এ‌তে আর লজ্জা বা দুঃখ কি আ‌ছে ? তোমা‌দের হত্তাকর্ত্তা বিধাতা বিষ্ণু মৎস , কূর্ম্ম , বরাহ ইত্যা‌দির রূপ ধ‌রে‌ছি‌লেন প্র‌য়োজন‌সি‌দ্ধির জন্য । তু‌মি নি‌জেও ব্রহ্মহত্যা ক‌রে মানস - স‌রোব‌রে পদ্মপাতার তলায় আশ্রয় নি‌য়ে‌ছি‌লে ।

আজ আমার দু‌র্দ্দিন - তাই আমাকে ধিক্কার দিচ্ছ । ইন্দ্র , আমার এ‌দিন থাকবে না । চাকা উ‌ল্টে যাচ্ছে । ইহ‌লো‌কের ঐশ্বর্য্য , ধনসম্পদ আজ আ‌ছে , কাল নেই । তা নি‌য়ে গর্ব্ব করছ , কর । দু'‌দিন পরে তোমার দশাও এম‌নি হবে । "

দৈত্যগুরু ব‌লি‌কে নানাস্থা‌নে খুঁ‌জি‌তে খুঁ‌জি‌তে সহসা একদিন আ‌বিস্কার করি‌লেন । তি‌নি ব‌লি‌কে বিশ্ব‌জিৎ য‌জ্ঞে অ‌ভি‌ষিক্ত ক‌রিলেন । সেই য‌জ্ঞের অ‌গ্নি‌তে আহু‌তি দিবামাত্র ই‌ন্দ্রের র‌থের মত এক‌টি রথ , ই‌ন্দ্রের অ‌শ্বের মত অশ্ব , সিংহ‌চি‌হ্নিত ধ্বজা , স্বর্ণময় ধনু , দিব্য কবচ ও দুই‌টি অক্ষয় বা‌ণে পূর্ণ তূণ উত্থিত হইল । শুক্রাচার্য্য এক‌টি বিজয়শঙ্খ দান ক‌রি‌লেন ।

নবরূ‌পে স‌জ্জিত হইয়া ব‌লি দৈত্য‌সেনা লইয়া প্রথ‌মে পৃ‌থিবীর রাজ্য অ‌ধিকার ক‌রি‌লেন ও তারপর স্বর্গরাজ্য - জ‌য়ের জন্য যাত্রা ক‌রি‌লেন । দেবগণ ভীত হইয়া বৃহস্প‌তির শরণ লই‌লেন ।

বৃহস্প‌তি ব‌লি‌লেন - " তোমরা যুদ্ধ কর‌তে যেও না । তোমরা এখন দুর্ব্বল । শুক্রাচার্য্য সঞ্জীবনী বিদ্যার দ্বারা দৈত্য‌দের বাঁ‌চিয়ে দে‌বে । তা ছাড়‌া , দুর্ব্বাসার অভিশাপ তোমা‌দের উপর চল‌ছে । তোমরা সব স্বর্গ হ'‌তে স'‌রে পড় । মর্ত্ত‌লো‌কে গিয়ে মানুষ ও জীবজন্তুর ম‌ধ্যে লু‌কি‌য়ে থা‌ক । "
ব‌লি বিনাযু‌দ্ধে স্বর্গরাজ্য অধিকার ক‌রিয়া লই‌লেন ।

শুক্রাচা‌র্য্যের উপ‌দে‌শে ব‌লি একশত বার অশ্ব‌মেধ যজ্ঞ ক‌রিলেন ।

বহস্প‌তি দেবতা‌দের উপ‌দেশ দি‌লেন - " দেখ , সমুদ্রমন্থন ক'‌রে অমৃত উদ্ধার করতে না পার‌লে আর দৈত্য‌দের তাড়া‌নো যা‌বে না । অমৃত পেলে তোমরা অমর হ'‌য়ে যাবে ।

শুক্রাচা‌র্য্যের সঞ্জীবনী বিদ্যা তখন বে‌শি অ‌নিষ্ট কর‌তে পার‌বে না । সমুদ্রমন্থন খুব দুরূহ কাজ । তোমরা একা পারবে না - দৈত্য ও দেবতা দুই দ‌লে মি‌লে মন্থন কর‌তে হবে । ব‌লির কা‌ছে গি‌য়ে প্রস্তাব ক‌রো । ও‌দের সাহা‌য্যে সমুদ্রমন্থন ক'‌রে অমৃত উঠলে ফাঁ‌কি দি‌য়ে তোমরা অমৃতভাণ্ডটা অ‌ধিকার ক'‌রে নি‌তে পার‌বে । বিষ্ণুর স‌ঙ্গে পরামর্শ কর । "

দেবগণ ব‌লির স‌ঙ্গে সাক্ষাৎ ক‌রিয়া সমুদ্রমন্থনের প্রস্তাব ক‌রি‌লেন । ব‌লি সম্মত হই‌লেন । দেবতারা দৈত্য‌দের সঙ্গে যোগ দিয়া সমুদ্রমন্থন ক‌রিয়া অমৃত অধিকার ক‌রিলেন । তাহা‌তে দেবাসু‌রে সংগ্রাম ঘোরতর হইয়া উ‌ঠিল । দেবতারা কিছু‌তেই স্বর্গরাজ্য হই‌তে দৈত্য‌দের তাড়াই‌তে পারি‌লেন না । দেবতামা অ‌দি‌তি বিষ্ণুর শরণাপন্ন হই‌লেন । অ‌দি‌তি ব‌লি‌লেন - " বৎস , তু‌মি ছাড়া ত ' আমার ছে‌লে‌দের আর স্বর্গরাজ্য ফি‌রে পাওয়ার উপায় দেখ‌ছি না । তু‌মি একটা উপায় কর । "

বিষ্ণু বলি‌লেন - " মা , প্র‌তিকার করবার জন্য তোমার গ‌র্ভেই আ‌মি একবার জন্ম নেব । তু‌মি নি‌শ্চিন্ত হ‌য়ে যাও । এবার আ‌মি বামন হয়ে জন্মাব । "

শ‌্রী‌বিষ্ণু অ‌দি‌তির গ‌র্ভে বামনরূপে জন্ম লই‌লেন ।

ক‌য়েক বৎসর প‌রের কথা । নর্ম্মদাতী‌রে ভূগুকচ্ছ নামক স্থা‌নে ব‌লি এক‌টি বিরাট যজ্ঞ ক‌রিলেন । সে য‌জ্ঞে ব‌লি যে যাহা চা‌হি‌তে‌ছিল , তাহাই দান করি‌তে‌ছিলেন । বাম‌ন‌দেব সেই যজ্ঞস্থ‌লে অ‌তি‌থি হইলেন । ব‌লি বামন‌দেবকে সমাদর ক‌রিয়া পাদ্য - অর্ঘ্য দিয়া অভ্যর্থনা ক‌রিয়া জিজ্ঞাসা ক‌রিলেন - " হে ব্রাহ্মণ , আপনার প্রার্থনা কি ? যা চান তা- ই পাবেন । "
বামন বলি‌লেন - " আমার প্রার্থনা সামান্য । আ‌মি ধনরত্ন চাই না , আ‌মি চাই সামান্য ত্রিপাদ ভূ‌মি । "
শুক্রাচার্য্য দে‌খিয়া বু‌ঝি‌লেন - এই বামন নিশ্চয় ছদ্ম‌বে‌শী বিষ্ণু । ইহার উ‌দ্দে‌শ্যে ভাল নয় । ব‌লি‌কে তি‌নি ব‌লি‌লেন - " মহারাজ , সাবধান ! এই বামন যা চাই‌বে , তা - ই‌ দি‌তে সম্মত হ‌বেন না । এই বামন এ‌সে‌ছে আপনা‌কে ছলনা কর‌তে । "
ব‌লি ব‌লি‌লেন - " আ‌মি যখন অঙ্গীকার ক‌রে‌ছি , তখন ই‌নি যা চান , তা - ই দেবই । "

দান ক‌রিবার আগে আচমন ক‌রি‌তে হয় । আচম‌নের জল যাহাতে ব‌লি না পান , সেজন্য শুক্রাচার্য্য ভূঙ্গারের মধ্যে প্র‌বেশ ক‌রিয়া জল‌রোধ ক‌রি‌লেন ।ভূ্ঙ্গার ভরা , অথচ জল প‌ড়ে না ! তখন বামন এক‌টি কুশ লইয়া ভূঙ্গা‌রের ন‌লের ম‌ধ্যে খোঁচা দিলেন - তাহা‌তে শুক্রাচা‌র্য্যের এক‌টি চোখ কানা হইয়া গেল ।
যাহাই হোক , ব‌লি আচমন ক‌রিয়া দা‌নে উদ্যত হই‌লেন । বামন‌দেব তখন বিশ্বরূপ ধারণ ক‌রি‌লেন । এক পা‌য়ে তি‌নি পৃ‌থিবী , অন্য পায়ে তি‌নি স্বর্গ আক্রমণ ক‌রি‌লেন । তাঁহার না‌ভি‌দেশ হই‌তে তৃতীয় এক‌টি চরণ নিঃসৃত হইল ।

বামন‌দেব ব‌লি‌লেন - " এই পদ‌টি কোথায় ফেলব , দৈত্যরাজ ? "

প্রহ্লা‌দের পৌত্র ব‌লি , র‌ক্তের ম‌ধ্যে হ‌রিভ‌ক্তি ছিল - সেই ভ‌ক্তির চরম নি‌দর্শন দেখাইবার সময় আ‌সিয়া‌ছে । ব‌লি তৃতীয় প‌দের জন্য নি‌জের মাথা পা‌তিয়া দি‌লেন ।

‌ত্রি‌বিক্রম বামন‌দেব ব‌লির মাথার উপর তৃতীয় পদ রা‌খি‌লেন । ব‌লি চির‌দি‌নের জন্য ব‌ন্দী হই‌লেন ।

স্বর্গম‌র্ত্ত্যে আর ব‌লির ঠাঁই হইল না । ব‌লি পাতাল আশ্রয় ক‌রি‌লেন । তি‌নি পাতালের রাজা হইয়াই থা‌কি‌লেন । দেবতারা বাম‌নের ছলনায় স্বর্গরাজ্য ফি‌রি‌য়া পাই‌লেন । হ‌রিও চির‌দি‌নের জন্য ব‌লির কা‌ছে বন্দী হ‌ইয়া র‌হিলেন ।

স্বর্গম‌র্ত্ত্যে আর ব‌লির ঠাঁই হইল না । ব‌লি পাতাল আশ্রয় ক‌রি‌লেন । তি‌নি পাতালের রাজা হইয়াই থা‌কি‌লেন । দেবতারা বাম‌নের ছলনায় স্বর্গরাজ্য ফি‌রি‌য়া পাই‌লেন । হ‌রিও চির‌দি‌নের জন্য ব‌লির কা‌ছে বন্দী হ‌ইয়া র‌হিলেন ।

ব‌লি দৈত্যহ‌লেও অব‌শে‌ষে বিষ্ণুর নিকট পরা‌জিত হই‌লেন । তাই তি‌নিও ভ‌ক্তে প‌রিণত ।

হ‌রিবল

Courtesy: Joy Shree Radha Madhav
0 comments

শ্রী শ্রী দুর্গার ভৈরব রূপে শ্রী শ্রী নারদের পূজা হয়।

শ্রী শ্রী দুর্গার ভৈরব রূপে শ্রী শ্রী নারদের পূজা হয়।
অনেকের ভাবেন দুর্গার ভৈরব নারদ আর পরমবৈষ্ণব দেবর্ষি নারদ এক ব্যক্তি।
কিন্তু আসলে তা নয়।তোড়ল তন্ত্র স্বয়ং সদাশিব বলেছেন:
দুর্গায়া দক্ষিণেদেশে নারদং পরিপূজয়েৎ।
নাকারঃ সৃষ্টিকর্ত্তা চ দকারঃ পাকঃ সদা।
রেফঃ সংহারূপত্বান্নারদঃ পরিকীর্ত্তিতা।।
দুর্গার দক্ষিন দিকে ভৈরব নারদের পূজা করিবে।এস্থলে নারদের ন কারের অর্থ সৃষ্টিকর্তা,দ কারের অর্থ পালনকর্তা ,রকার সংহার রূপ বলিয়া ইনি নারদ নামে কীর্তিত হইয়াছেন,অর্থাৎ যিনি সৃষ্টি ,স্থিতি,সংহারকর্ত্তা তিনিই নারদ
অর্থাৎ নারদ অর্থে পরমেশ্বর শিব।
0 comments

এই শিবমন্দিরে নন্দীর মূর্তি থেকে ঝরে পড়ে রহস্যময় জলধারা। এ কি ঐশ্বরিক লীলা?



এই মন্দিরের রহস্যময়তা অন্যত্র নিহিত। যে ষাঁড়ের মূ্র্তিটি সবার আগে নজরে এসেছিল বাসিন্দাদের, সেই মূ্র্তিটি ছিল আসলে শিবের সহচর নন্দীর মূ্র্তি। সেই মূর্তির মুখে জমে থাকা মাটি পরিষ্কার করতেই দেখা যায়, নন্দীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে একটি ক্ষীণ জলধারা।


১৯৯৭ সালের কোনও এক সকালবেলার ঘটনা। বেঙ্গালুরুর মাল্বেশ্বরম এলাকার বাসিন্দাদের কাছে দিনটা শ‌ুরু হয়েছিল আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই। কিন্তু দিনটির বিশিষ্টতা একটু পরেই বোঝা গেল যখন বিখ্যাত মল্লিকার্জুন স্বামী মন্দিরের সামনের জমিটিতে কোনও একটি নির্মাণকাজের প্রয়োজনে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হল। কয়েক হাত মাটি খুঁড়তেই কোদাল ঠেকল শক্ত কোনও জিনিসে। মাটি সরাতে পাওয়া গেল এক ষাঁড়ের মূ্র্তি। স্থানীয় বাসিন্দারা তড়িঘড়ি খবর দিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ বিভাগে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এসে গভীরতর খননকার্য চালিয়ে মাটির তলা থেকে তুলে আনলেন একটি আস্ত শিবমন্দিরকে। গবেষণা করে জানা গেল, এই মন্দির ৪০০ বছর আগে তৈরি। মন্দিরটি পরিচিত হয় নন্দীকেশ্বর বা দক্ষিণমুখ নন্দীতীর্থ মন্দির নামে।


ভারতের মতো ঐতিহাসিক সমৃদ্ধিসম্পন্ন একটি দেশে এরকম অদ্ভুতভাবে একটি প্রাচীন মন্দিরের আবিষ্কার খুব অস্বাভাবিক হয়তো নয়। কিন্তু এই মন্দিরের রহস্যময়তা অন্যত্র নিহিত। যে ষাঁড়ের মূ্র্তিটি সবার আগে নজরে এসেছিল বাসিন্দাদের, সেই মূ্র্তিটি ছিল আসলে শিবের সহচর নন্দীর মূ্র্তি। সেই মূর্তির মুখে জমে থাকা মাটি পরিষ্কার করতেই দেখা যায়, নন্দীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে একটি ক্ষীণ জলধারা। আরও মাটি খোঁড়ার পরে দেখা যায়, নন্দীর মূর্তিটির সামনে ফুট দশেক নীচে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। নন্দীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা জল সোজা এসে পড়ছে সেই শিবলিঙ্গের উপর। শিবলিঙ্গের গা ধুইয়ে দিয়ে সেই জল এসে জমা হচ্ছে আরও নীচে অবস্থিত একটি পুকুরে (সেই পুকুরের বর্তমান নাম কল্যাণী)। আশ্চর্যের বিষয় হল, নন্দীর মুখ থেকে যে জলধারা বেরোতে শুরু করেছিল সেই ১৯৯৭ সালে সেই জলধারা আজও বন্ধ হয়নি। নিরন্তর জল ঝরে চলেছে নন্দীর মুখ থেকে।




কিন্তু এই জলধারার উৎস কী? কী বলছেন বিজ্ঞানীরা? তাঁরা মনে করছেন, ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডারের সঙ্গে কোনওরকম সংযোগ রয়েছে নন্দীর মূর্তিটির। সাইফোন পদ্ধতিতে সেই জল মাটির তলা থেকে নন্দীর মু‌খে উঠে আসছে। কিন্তু সেরকম কোনও ভূগর্ভস্থ জলাধারের খোঁজ পেয়েছেন কি বিজ্ঞানীরা? না, তা তাঁরা পাননি। তবে তাঁরা আশাবাদী যে, অদূর ভবিষ্যতে সেই জলাধারের সন্ধান মিলবে। সে যাই হোক, ভক্তরা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ধার ধারেন না। তাঁদের ধারণা, সবটাই ঈশ্বরের লীলা। স্বয়ং ঈশ্বরের পরিকল্পনাতেই নন্দীর মূর্তির মুখ থেকে নিরন্তর বহে চলেছে জল। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে ভক্তদের মনে এক বিশিষ্ট জায়গা করে নিয়েছে এই নন্দীকেশ্বর মন্দির।

-এবেলা
0 comments

কথিত আছে এই মন্দিরেই বিয়ে করেছিলেন শিব ও পার্বতী

সতীর আত্মাহুতির পর শিবের জীবনে এসেছিলেন পার্বতী। বিশ্বাস করা হয়, সতীর পরজন্ম ছিল পার্বতী রূপে। শিব প্রথমে পার্বতীকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু, পার্বতীর প্রেমকে দূরে ঠেলে ফেলে দিতে পারেননি শিব।

দেবতাদের দেশ উত্তরাখণ্ড

হিমালয়ের কোলে থাকা এই মন্দিরটিকে কেদারনাথের শিব মন্দিরের মতো দেখতে লাগলেও আসলে এর নাম ‘ত্রিযুগিনারায়ণ মন্দির’। ‘ত্রিযুগি’ মানে তিনটি যুগ। আর নারায়ণ মানে বিষ্ণু। স্থানীয়দের বিশ্বাস বছরের পর বছর এই মন্দিরের ভিতরে এক অদৃশ্য পবিত্র অগ্নি প্রজ্বলিত হয়ে আসছে। যার আনুমানিক বয়স তিনটি যুগ পেরিয়ে গিয়েছে। এই তিন যুগকেই হিন্দিতে ‘ত্রিযুগ’ বলা হয়। আর যেহেতু এটি নারায়ণ মন্দির। তাই এর নাম ‘ত্রিযুগিনারায়ণ মন্দির’। যা উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগে।


বরফে ঢাকা গৌরীকুণ্ড

স্থানীয় কথা অনুযায়ী, পার্বতী ছিলেন ‘ত্রিযুগিনারায়ণ’-এর রাজা হিমাবত-এর কন্যা। কিন্তু, সতীর মৃত্যুর পর কার্যত পাগলপারা দশা হয়েছিল শিবের। পার্বতী ছিলেন শিবের পূজারিনী এবং শিবকেই মনে মনে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু, সতী বিরহে কাতর শিব কোনওভাবেই পার্বতীকে নিজের জীবনে প্রবেশ করতে দিতে রাজি ছিলেন না। শেষমেশ গৌরীকুণ্ডে পার্বতীর নাচ এবং ভালবাসার বিকিরণে চমকিত হন শিব। পার্বতীর প্রেমকে এরপর আর দূরে ঠেলে দিতে পারেননি তিনি।


গুপ্তকাশীতে মন্দাকিনী নদী

বিশ্বাস করা হয় গুপ্তকাশী থেকে কেদারনাথ যাওয়ার পথে মন্দাকিনী নদীর তীরে শিব বিবাহের প্রস্তাব দেন পার্বতীকে।

‘ত্রিয়ুগিনারায়ণ মন্দির’-এ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন শিব-পার্বতী
রাজা হিমাবতের ব্যবস্থাপনায় রাজধানী ত্রিযুগিনারায়ণের ত্রিযুগিনারায়ণ মন্দিরেই বসেছিল বিয়ের আসর। ‘ত্রিযুগিনারায়ণ’-এর পবিত্র অগ্নির সামনেই পার্বতীর সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন শিব। সেই থেকে এই অগ্নিকুণ্ড এবং ‘ত্রিযুগিনারায়ণ মন্দির’-কে দেবতাদের স্থান হিসাবেই ধরা হয়। বিয়ের আসরে পার্বতীর ভাই-এর ভূমিকা পালন করেছিলেন স্বয়ং বিষ্ণু। আর এই মেগা বিবাহের পুরোহিত ছিলেন খাস ব্রহ্মা। এমনকী বিয়ের আচার পালনের সময়ে শিব ও পার্বতী তিনটি কুণ্ডে স্নান করেছিলেন। যা পরবর্তীকালে ব্রহ্মকুণ্ড, রুদ্রকুণ্ড এবং বিষ্ণুকুণ্ড বলে পরিচিতি পায়।

বর্তমানে যাঁরা এই মন্দিরে আসেন তাঁরা সঙ্গে করে একটি কাঠের টুকরো নিয়ে প্রবেশ করেন। ‘অখণ্ড ধুনি’ নামে এই আগুনে সেই কাঠের টুকরো পুড়িয়ে দেন তাঁরা। এরপর সেই কাঠের টুকরোর ছাইকে প্রসাদ হিসাবে গ্রহণ করেন। যাঁরা প্রথমবার এই মন্দিরে আসেন তাঁরা একইসঙ্গে পাঁচ কিলোমিটার দূরে থাকা গৌরীকুণ্ড এবং সরস্বতীকুণ্ড ঘুরে যায়।
বিশ্বাস করা হয়, নিঃসন্তান দম্পতি এই ‘ত্রিযুগিনারায়ণ মন্দিরে’ এসে পুজো দিলে মনস্কামনা পূরণ হয়। এমনকী, সদ্য বিবাহিত দম্পতি এই মন্দিরে পূজো দিতে পারলে তাঁদের সাংসারিক জীবনে সুখ ও শান্তি বিরাজ করে বলেই দাবি করা হয়।

#এবেলা
0 comments

বই-এ পড়া, নিশির ডাক এর উৎপত্তি বাঙালী বিশ্বাস থেকে একটু ভিন্ন

বই-এ পড়া, নিশির ডাক এর উৎপত্তি বাঙালী বিশ্বাস থেকে একটু ভিন্ন। আদতে ব্যাপারগুলো সঠিক, তবে 'নিশি' কোন ভূত/প্রেত নয়। এইটি একটি উচ্চাটন বিধি যেইটা আন্দাজ অসম থেকে এসেছে। নিশির ডাক এর বিধি এইরকম: কোনো মুমূর্ষু ব্যক্তি, যার বাঁচার আশা নাই, তার পরিবারের লোকেরা অসম থেকে কাপালিকদের প্রেরণ করে আনেন। এইবার সেই কাপালিক বিধির দিন সন্ধ্যা কাটলে (এতে বোঝা যায় যে ব্যাপারটি ঘৃণ্য, ও অপদেবতাদের তুষ্ট করিয়ে করা, কারণ সন্ধ্যা পবিত্র সময়) কিছু মন্ত্র-পুজা করে, তারপর শহর /গ্রামের এক উচ্চস্থানে (পাহাড় জাতীয়) দাঁড়িয়ে মন্ত্রপূত ধুনো দিতে থাকে, সেই ধুনোর শক্তি নাকি সাংঘাতিক , এবং সেই ধোঁয়া পুরো গ্রামকে ঘুমে আচ্ছন্ন করে দেয়। কাপালিক এবার নিজের যা বিধি সেই করে একটি মাথাকাটা ডাবের জল অভিমন্ত্রিত করে মাঝরাত্রে বের হয়। তার সাথে পাড়ার যতলোক সবার নাম। প্রতিটি গৃহের সামনে গিয়ে সেই কাপালিক তিনবার গৃহস্বামীর নাম ধরে ডাকে, হাতে ডাব। যদি কোনো ভাগ্যহারা তিনবারের ভিতরে সাড়া দেয়, 'খপ' করে ডাবের মাথা বন্ধ করে দেয়া হয়। সেই ডাবের জল মুমূর্ষু ব্যক্তিকে পান করালে সেই ব্যক্তি সুস্থ হয়ে বেঁচে ওঠে এবং যিনি সাড়া দিয়েছিলেন তিনি দেহত্যাগ করেন। কিন্তু এইসব পিশাচসিদ্ধদের কারবার। বড় নোংরা, এবং ভগবান তাদের রসাতলেও স্থান দেন না। আরো শুনেছি, এই পিশাচসিদ্ধরা কখনোই সাধারণ মৃত্যু পায় না, অপঘাতে মরে।



কাপালিকদের সম্পর্কে ভারতীয় সমাজে যে সাধারণ ধারণাটি চালু রয়েছে, তার সারমর্ম এই—
• কাপালিকরা তান্ত্রিকদেরই একটা দলছুট সম্প্রদায়। তান্ত্রিকরা যদি ‘ডার্ক’ হয়ে থাকেন, কাপালিকরা আরও বেশি ছায়াচ্ছন্ন।

• কাপালিক মাত্রেই নরবলি দেন। শবসাধনা করেন।
• কাপালিকরা কালোজাদুর চর্চা করেন। তাঁরা অশুভশক্তির উপাসক।
• কাপালিকরা যে কোনও মানুষের যখন তখন ক্ষতি করতে তৎপর।
কিন্তু একথা স্বীকার করতেই হবে, বাস্তবে কোনও সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীই নিজেকে ‘কাপলিক’ বলে ঘোষণা করেন না। তান্ত্রিকরা তো ননই। পুরাণ অনুযায়ী, ত্রিজগতে একজনই ‘কাপালিক’। তিনি স্বয়ং শিব। ‘শিবপুরাণ’ থেকে জানা যায়, ব্রহ্মার সৃষ্টিতে মহাদেব মোটেই খুশি ছিলেন না। কিন্তু ব্রহ্মা তাঁর সৃষ্টি নিয়ে যথেষ্ট গর্ব পোষণ করতেন। এই গর্ব থেকেই চতুর্মুখ ব্রহ্মার শিরে আরও একটি মুণ্ড দেখা দেয়। শিব এই মুণ্ডটি কেটে ফেলেন। পরে ব্রহ্মা তাঁকে জানান, সব কিছু সৃষ্টি করলেও তিনি দুঃখ-দুর্দশা সৃষ্টি করেননি। জীবজগতের অজ্ঞতাই তাদের দুর্দশার জন্য দায়ী। শিব অনুতপ্ত হন। এবং তাঁর উপরে ব্রহ্মহত্যার পাপ এসে লাগে। প্রায়শ্চিত্তের জন্য তিনি ব্রহ্মকপালে ভিক্ষান্ন গ্রহণ করতে শুরু করেন। সেই থেকে তিনি ‘কাপালিক’ নামে পরিচিত হন।
আরও পড়ুন
শ্মশানভস্ম মাখেন, নগ্ন থাকেন, মৃতদেহ খান, তবু অঘোরীরা পূজিত হন কেন?
কাপালিক নামে ভারতে এক শৈব সম্প্রদায় বিদ্যমান। তাঁরা শিবকে আদর্শ বলে মনে করেন। কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন তাঁদের জীবনযাপনের একমাত্র পন্থা। তাঁরা গৃহত্যাগী, প্রান্তবাসী। অনেক সময়েই তাঁদের শ্মশানে বাস করতে দেখা যায়। এঁদের সাধনার একমাত্র লক্ষ্য আত্মোপলব্ধি।
এই অবসরে জেনে নেওয়া যেতে পারে কারা প্রকৃত কাপালিক।
• কাপালিকরা একধরণের তান্ত্রিক শৈব দর্শনে বিশ্বাসী।
• তাঁদের সামগ্রিক তত্ত্বধারণা ‘ভৈরবতন্ত্র’ নামের এক প্রাচীন গ্রন্থ থেকে গৃহিত।
• কাপালিকরা নরকরোটি বা নরকপাল সঙ্গে রাখেন। তাঁদের ভিক্ষাপাত্রটিও নরকপাল-নির্মিত।
• অঘোরীদের মতো তাঁরাও শ্মশানবাসী। তাঁরাও ভস্ম মাখেন। খাদ্যাখাদ্যভেদ করেন না।
• কাপালিকরা অনেক সময়েই বেদ-এর সিদ্ধান্ত মানেন না।
• তাঁরা আত্মোপলব্ধির জন্য শক্তি উপাসনা করেন। দেবীশক্তিকে তুষ্ট করে ক্ষমতালাভই তাঁদের সাধনপন্থা।
•  কাপালিকরা হঠযোগ অভ্যাস করেন। হঠযোগের মাধ্যমে শক্তি আহরণ করতে চান।
• সাম্প্রতিক গবেষণা থেক জানা যাচ্ছে, বৌদ্ধতান্ত্রিক যুগে কাপালিকদের সঙ্গে সিদ্ধাচার্যদের কিছু লেনা-দেনা হয়। এই আদান-প্রদান পরে কাপালিকতন্ত্রকে অন্য আকার দেয়।
কাপলিক সম্প্রদায় ভারতে আজও বর্তমান। তবে তাঁদের সঙ্গে কালো জাদু, অনিষ্টকর ক্রিয়া বা অভিচার ইত্যাদির কোনও সম্পর্ক নেই।
0 comments

শিবকে চেনেন, কিন্তু তাঁর বাহন নন্দীর মাহাত্ম্য জানেন কি

যে কোনও শিব মন্দিরে প্রবেশ করার সময়ে সবার আগে যাঁর দিকে দৃষ্ট যায়, তিনি এক মহাষণ্ড। যাঁকে আমরা নন্দী বলেই জানি। এবং তাঁর পরিচয় শিবের বাহন হিসেবে। কিন্তু এ কথা আমাদের অনেকেরই জানা নেই, নন্দী স্বয়ং শিবেরই অবতার।
‘শিবপুরাণ’ জানাচ্ছে, নন্দী কৈলাসে শিবালয়ের দ্বাররক্ষী। শৈব ঐতিহ্য অনুসারে, তিনি নন্দীনাথ সম্প্রদায়ের আট প্রধান পুরুষের গুরু। যে আটজনের মধ্যে যোগদর্শনের প্রবক্তা মহামুনি পতঞ্জলীও রয়েছেন। এই আট প্রবক্তাই শৈব দর্শনকে আট দিকে ছড়িয়ে দেন বলে বিশ্বাস।
নন্দীকে ষণ্ড বা ষাঁড় রূপে কল্পনা করা হয়। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘লোকায়ত দর্শন’ গ্রন্থে সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে টোটেম হিসেবে ষাঁড়ের উপাসনার কথা জানিয়েছিলেন। ষাঁড় অনেক সভ্যতাতেই সূর্য ও শৌর্যের প্রতীক হিসেবে পূজিত হত। পরে তা শৈব ধর্মের অঙ্গীভূত হয়। এবং শিবের বাহন হিসেবে তাকে গণ্য করা হতে থাকে।
























পুরাণ অনুসারে নন্দী শিলদ মুনির সন্তান। শিলদ শিবের কাছে থেকে এক অমর সন্তান চেয়েছিলেন। শিবের প্রসাদেই চিরঞ্জীব নন্দীর জন্ম হয়। নন্দী কোনও মানবীর গর্ভজাত নন। তিনি অযোনিসম্ভূত, যজ্ঞাগ্নি থেকেই তাঁর উদ্ভব।
আগম ও তন্ত্র ঐতিহ্যে নন্দীকে প্রবল জ্ঞানী বলে মনে করা হয়। এই জ্ঞান তিনি স্বয়ং শিবের কাছ থেকেই প্রাপ্ত হন। এই জ্ঞানই তিনি তাঁর আট শিষ্যকে দান করেন। এই আট জন হলেন— সনক, সনাতন, সানন্দন, সনৎকুমার, তিরুমুলার, ব্যগ্রপদ, পতঞ্জলী এবং শিবযোগ।
বিবিধ পুরাণ থেকে জানা যায়, নন্দী অসংখ্য বার বিভিন্ন পরাক্রান্ত বীরের মোকাবিলা করেছিলেন। তিনিই রাবণকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তাঁর স্বর্ণলঙ্কা এক বানর দগ্ধ করবে।
আজও মন্দী দ্বাররক্ষী হয়ে বিরাজ করছেন তাবৎ শিব মন্দিরে। তিনি বিরাজ করছেন বিভিন্ন শৈব সম্প্রদায়ের পতাকা। উল্লেখ্য, কর্ণাটকে নন্দীশ্বর মন্দির স্বয়ং নন্দীর প্রতিই উৎসর্গীকৃত।

প্রতিবেদন, এবেলা.ইন

0 comments

এই শিবমন্দিরে দিনে তিনবার বদলে যায় শিব লিঙ্গের রং

অনেকের অনুমান শিবলিঙ্গের রং পরিবর্তনের পিছনে সূর্যালোকের ক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু তেমন কোনও প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি।


অচলেশ্বর শিব মন্দির। ছবি: ইউটিউব থেকে
কথিত আছে, এই স্থানে নাকি মহাদেবের গোড়ালির ছাপ বিদ্যমান। আর তাই কালনিরবধি এটি এক পুণ্যতীর্থ। রাজস্থানের আরাবল্লী রেঞ্জের ছোট জনপদ ঢোলপুর। সন্নিহিত এলাকা বেহড়, চম্বল। একদিকে যদি পাক থেকে থাকে ডাকু মালখান সিং, মান সিং আর ফুলনদেবীর কিংবদন্তি, তা হলে অন্য দিকে অবিচল হয়ে রয়েছে অচলেশ্বর মহাদেবের পুরাণকথা।

















অচলেশ্বর শিবলিঙ্গ, ছবি: ইউটিউব
মিথোলজি যা-ই বলুক না কেন, এই মন্দিরের মহিমা শুধু কাহিনিতে নয়। ঢোলপুর শিব মন্দিরের বিশেষত্ব এখানেই যে, এই মন্দিরে অবস্থানরত শিবলিঙ্গটি দিনে তিন বার রং বদলায়। এই দৃশ্য দেখতেই হাজার হাজার পুণ্যার্থার ভিড় হয় এই মন্দিরে। মানুষের বিশ্বাস, শিবমহিমাতেই এই ‘অলৌকিক’ সম্ভব।































নন্দীমূর্তি, ছবি:ইউটিউব
স্থানীয় কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, এই দেবস্থান ২৫,০০০ বছরেরেও বেশি পুরনো। মন্দির সংলগ্ন একটি পুকুরের পাড়ে পাথরের তিনটি মহিষ মূর্তি রয়েছে, যাদের আকৃতি ও শৈলিই বলে দেয় এই স্থানের প্রাচীনত্ব।মন্দিরের প্রবেশদ্বারে অষ্টধাতুর এক বিশাল নন্দীমূর্তি। কথিত, এই নন্দীর কৃপাতেই নাকি এই মন্দির বার বার রক্ষা পেয়েছে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে।



















রহস্যময় মহিষমূর্তি, ছবি:ইউটিউব
আজকের মন্দিরটি আনুমানিক খ্রিষ্টিয় নবম শতকে তৈরি। মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ শিবলিঙ্গটি স্বয়ম্ভূ। অনেকের অনুমান শিবলিঙ্গের রং পরিবর্তনের পিছনে সূর্যালোকের ক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু তেমন কোনও প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি। তেমন কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণাও সম্ভব হয়নি এই লিঙ্গকে ঘিরে। যা দেখা যায়, তা হল এই— সকালে এই লিঙ্গের রং থাকে লাল, বেলা বাড়লে তা গেরুয়া হয়ে ওঠে এবং রাত্রে এর রং একেবারেই কালো।

প্রতিবেদন, এবেলা.ইন 
0 comments

মৃত্যুর পরে সাধের মানবদেহ


মৃত্যুর পরে শরীরে ধীরে ধীরে পচন ধরতে শুরু করে -- এ কথা সবারই জানা। কিন্তু মৃত্যুর পর মুহূর্ত থেকে পচন ধরা পর্যন্ত কী কী শারীরিক পরিবর্তন হয় বা কোন কোন পথ ধরে শরীরে পচন ধরতে শুরু করে, আসুন তা জেনে নিই -----
চিকিৎসা শাস্ত্র মতে, মৃত ঘোষণার অর্থ এই নয় যে শরীরের প্রতিটি কোষের মৃত্যু হয়েছে। হৃদযন্ত্র পাম্প করা বন্ধ করলে, কোষ গুলো অক্সিজেন পায় না। অক্সিজেন পাওয়া বন্ধ হলে পেশিীগুলো শিথিল হতে শুরু করে। পাশাপাশি অন্ত্র এবং মূত্রস্থলী খালি হতে শুরু হয়।শরীরের মৃত্যু ঘটলেও, অন্ত্র, ত্বক বা অন্য কোনও অংশে বসবাসকারী কোটি কোটি ব্যাক্টেরিয়া তখনও জীবিত থাকে। মৃত্যুর পর শরীরের অভ্যন্তরে যা ঘটে, সে সবের পিছনেই এই কোটি কোটি ব্যাক্টেরিয়ার অবদান থাকে।
মৃত্যুর পর সর্বপ্রথম শরীরের তাপমাত্রা প্রতি ঘণ্টায় ১.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট কমতে থাকে। এক্ষেত্রে শরীরের নিম্নাংশে রক্ত এবং তরল পদার্থ জমা হয়। ব্যক্তির ত্বকের আসল রঙের ভিত্তিতে তা ধীরে ধীরে গাঢ় বেগুনি-নীল রঙে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। এরপর অত্যধিক ক্যালসিয়াম ক্ষরণের ফলে পেশী গুলো শক্ত হয়ে যায়। ২৪-৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত এই অবস্থা থাকে।
এরপর শরীরে পচন ধরতে শুরু করে। রক্ত চলাচল বন্ধ হলে কার্বন-ডাই অক্সাইডের গঠন শুরু হয়, অম্লের মাত্রা বাড়তে থাকে। এর ফলে কোষগুলোতে ভাঙন ধরে। দুই-তিন দিনে শরীর পচতে শুরু করে। পরিপাকনালীতে থাকা ব্যাক্টেরিয়া এবং আণুবীক্ষণিক প্রাণীরা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তলপেট সবুজ বর্ণ ধারণ করে এবং তাতে গ্যাস তৈরি হয় আর তার চাপে শরীরের মলমূত্র নিষ্কাশিত হয়। 'পিউট্রেসিন' এবং 'ক্যাডাভেরিনের' মতো জৈবিক যৌগ শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়লে, দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করে। এই গন্ধই মৃতদেহের অন্যতম বৈশিষ্ট।
'নেক্রোসিস' পদ্ধতিতে এরপর শরীরের রং কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। মৃতদেহের দুর্গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ভিড় জমায় উচ্ছিষ্ট-ভোগী পোকা-মাকড়। মৃত শরীরকে খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়াও, এই সমস্ত পরজীবী কীট সেখানে ডিমও পাড়ে। ডিম ফুটে বেরোনো শূককীট মাত্র এক সপ্তাহে শরীরের ৬০ শতাংশ নিকেশ করতে পারে। এভাবেই কেটে যায় প্রথম সাতদিন। এর পর ধীরে ধীরে প্রাণহীন মানবদেহ ক্রমে মাংস-চামড়ার খোলস ত্যাগ করে পরিণত হয় হাড় সর্বস্ব কঙ্কালে।
-
এই হ'ল আমাদের সাধের মানবদেহের স্বাভাবিক পরিণতি।

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, বিখ্যাত কিংবদন্তী চিকিৎসক, মানবদরদী, সকলের প্রিয় ও সদালাপী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়

স্বাধীন ভারতে বিখ্যাত নাগরিকদের ঘিরে পাঠযোগ্য জীবনকথা লেখার রেওয়াজ উঠে গিয়েছে। যা এখন পাওয়া যায় তা অষ্টোত্তর শতনাম অথবা চুপিচুপি প্রচারিত কেচ্ছাকথা। অথচ এঁদের সম্বন্ধে বিপুল তথ্য এবং শতসহস্র আলোকচিত্র বিভিন্ন জায়গায় এখনও ছড়িয়ে রয়েছে।
ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এ বিষয়ে কিছুটা ভাগ্যবান, চিকিৎসক হিসেবে তাঁর নানা গল্পগাথা আজও রূপকথার মতো বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে আছে এবং তাঁর গুণমুগ্ধ কর্মচারীরা পরবর্তী সময়ে কিছু মূল্যবান লেখা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন। সে সব ধৈর্যসহকারে উল্টে দেখলে বোঝা যায় এক কিংবদন্তি চিকিৎসক বঙ্গীয় ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে তাঁর মাসিক লাখ টাকার প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে বিপন্ন বাঙালিদের রক্ষার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এই জীবনকথা কিছুটা জানা থাকলে নিরন্তর জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত ও হতাশ বঙ্গবাসীরা কিছু নতুন পথ খুঁজে পেতে পারেন।
আমার এক পরলোকগত বন্ধু রসিকতা করে বলতেন, পরের ধন অপহরণ করে নিজের বলে চালানোয় আমরা কারও থেকে কম যাই না। তা না হলে কটকের সন্তান সুভাষচন্দ্র বসু এবং পটনার সন্তান বিধানচন্দ্রকে আমরা সেন্ট পার্সেন্ট বেঙ্গলি স্ট্যাম্প দিয়ে দিলাম, চেপে গেলাম যে এঁদের কেউই এন্ট্রান্স পাশ করার আগে কলকাতায় বসবাস করেননি।
পরবর্তী কালে বিধানচন্দ্র বাংলা-বিহার সংযুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন কিন্তু পারেননি। তিনি সফল হলে কী হত তা আন্দাজ করতে আজ আর কারও আগ্রহ নেই।
সীমাহীন প্রতিভা, মানুষের জন্য অনন্ত ভালবাসা, বিস্ময়কর পরিশ্রমের ক্ষমতা নিয়ে বিধানচন্দ্র সংখ্যাহীন মানুষের ভালবাসা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু জীবনকালে তিনি যে সব নিন্দা অকারণে নতমস্তকে গ্রহণ করে গিয়েছেন তারও তুলনা নেই। তাঁর চরিত্র নিয়ে দেওয়াল লিখন ছড়িয়েছে। নিন্দুকরা তাঁকে ঘিরে ধরে কুৎসিত গালাগালি করেছে, এমনকী জামা গেঞ্জি ছিঁড়ে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এবং যিনি দেশের কাজে একের পর এক সম্পত্তি বন্ধক দিয়েছেন অথবা বিক্রি করে দিয়েছেন, তাঁকে চোর বলা হয়েছে এবং সরকারকে ঠকিয়েছেন বলা হয়েছে।
আঘাত পেলেও ডাক্তার রায়কে বিচলিত দেখাত না। তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, “তোমার সাধ্যমতো চেষ্টা করো, এবং বাকিটা ভগবানের উপর ছেড়ে দাও।” আবার কখনও কখনও মেডিক্যাল কলেজের প্রিয় মাস্টারমশাই কর্নেল লুকিসকে স্মরণ করে বলতেন, “হাত গুটিয়ে বসে থাকার চেয়ে চেষ্টা করে হেরে যাওয়া ভাল।”
আবার কখনও কখনও মা-বাবাকে স্মরণ করতেন। “মা-বাবার কাছ থেকে তিনটে জিনিস শিখেছিলাম স্বার্থহীন সেবা, সাম্যের ভাব এবং কখনও পরাজয় না মেনে নেওয়া।”
আর যাঁরা তাঁর নিন্দায় মুখর ছিলেন তাঁদের সম্বন্ধে জীবনসায়াহ্নে বলেছিলেন, “আমি যখন মরব তখন ওই লোকগুলোই বলবে, ‘লোকটা ভাল ছিল গো, আরও কিছু দিন বাঁচলে পারত’।”
.....
ঠাকুমা নাম রেখেছিলেন ভজন। আর তাঁর ভাল নাম রাখার দিনে হাজির ছিলেন কেশবচন্দ্র সেন। পটনার মেধাবী ছেলে কলকাতায় উচ্চশিক্ষার জন্য এসে যে সব কাণ্ড করলেন তা বুলেট পয়েন্টে বলে নেওয়া যেতে পারে।
ডাক্তারি পড়বার বিশেষ বাসনা বিধানচন্দ্রের ছিল না, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ফর্মের জন্য আবেদন করেছিলেন। ডাক্তারির ফর্মটা আগে আসায় ওইটাই আবেদন করলেন। পূরণ করে পাঠিয়ে দিলেন।
থাকতেন কলেজ স্ট্রিট ওয়াই এম সি এ-তে। অর্থাভাব প্রবল, মাস্টারমশায়রা ছাত্রকে অবসর সময়ে ধনী রোগীদের বাড়িতে মেল নার্স হবার সুযোগ করে দিতেন। রোগীর বাড়িতে বারো ঘণ্টার ডিউটিতে পারিশ্রমিক আট টাকা।
মহাপুরুষরা সমকালের অক্লান্ত যন্ত্রণা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে পারেন না। জেনে রাখা ভাল, যাঁর চিকিৎসাখ্যাতি এক দিন কিংবদন্তি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এমবি পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। আবার তিনিই মাত্র ১২০০ টাকা সম্বল করে বিলেত গিয়ে দু’বছরে মেডিসিন ও সার্জারির চূড়ান্ত সম্মান এম আর সি পি এবং এফ আর সি এস প্রায় একই সঙ্গে অর্জন করেছিলেন।
বিভিন্ন অপমান কাণ্ডের সঙ্গে সায়েবরা জড়িত ছিলেন। কিন্তু দেশবাসীরা তাঁর জীবনকালে যে সব যন্ত্রণা ও অপমান তাঁকে করেছিলেন তা ভাবা যায় না।
যখন লাখ টাকার প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন তখন হাওড়া-কলকাতার দেওয়ালে দেওয়ালে কুৎসিত ভাষায় লেখা হল: ‘বাংলার কুলনারী হও সাবধান, বাংলার মসনদে নলিনী বিধান।’
১৯১১ সালে ডাক্তার রায় বিলেত থেকে যখন কলকাতায় ফিরলেন তাঁর কাছে মাত্র পাঁচ টাকা। বিলেত যাবার আগে কলকাতায় বিধানবাবুর ফি ছিল দু’টাকা।
আদিতে তাঁর ঠিকানা ৬৭/১ হ্যারিসন রোড, পরে দিলখুশ কেবিনের কাছে, ৮৪ হ্যারিসন রোড। সেখানে ছিলেন ১৯১৬ পর্যন্ত, এর পর আসেন ওয়েলিংটন স্ট্রিটের বাড়িতে। শোনা যায়, উপার্জন বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় তিনি বাড়িতে রক্ত ইত্যাদি পরীক্ষার জন্য প্যাথলজিকাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করেন।
পেশায় বিপুল সাফল্য বিধানচন্দ্রকে বিশেষ সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মাত্র সাড়ে আট বছরের প্র্যাকটিসে কলকাতায় প্রাসাদোপম বাড়ি এবং গাড়ির মালিক হওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না।
তাঁর রোগীর তালিকায় তখন কোন বিখ্যাত মানুষ নেই? এর মধ্যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও আছেন। শোনা যায়, গোড়ার দিকে জোড়াসাঁকোর জন্যও ভিজিট নিতেন, যদিও পরবর্তী সময়ে দু’জনে খুব কাছাকাছি আসেন।
চিত্তরঞ্জন দাশের মহাপ্রয়াণের পর দেশবন্ধুর একটা ছবি বিক্রি করে বিধানচন্দ্র কিছু টাকা তোলবার পরিকল্পনা করেন। এ বিষয়ে পরবর্তী কালে রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য একটি চিঠিতে লেখেন, “চিত্তরঞ্জনের একটা ছবি নিয়ে বিধানচন্দ্র রায় কবির কাছে গিয়ে বললেন এর উপর একটা কবিতা লিখে দিন।
“ডাক্তার, এ তো প্রেসক্রিপশন করা নয়। কাগজ ধরলে আর চটপট করে লেখা হয়ে গেল।”
উত্তর: “বেশ অপেক্ষা করছি।”
কিন্তু বেশি ক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ছবির উপর সেই অপূর্ব কবিতাটি লেখা হল এসেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ/ মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”
ডাক্তার রায়ের বিশাল প্র্যাকটিসের কোনও মাপজোক আজও হয়নি। কলকাতার বাইরেও বার্মা থেকে বালুচিস্তান পর্যন্ত তাঁর ডাক্তারি দাপট, যার একমাত্র তুলনা স্যর নীলরতন সরকার। শোনা যায়, তাঁর এক আপনজনের প্রতি তরুণ চিকিৎসক এক সময় আসক্ত হন, কিন্তু আর্থিক বৈষম্য সেই শুভকর্মকে সম্ভব করেনি।
প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের পর বিধানচন্দ্র এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন নেতাজির জন্মদিন ২৩ জানুয়ারি ১৯৪৮ এবং তার সাত দিন পর শুক্রবার দিল্লিতে গাঁধীজি নিহত হলেন।
যখন ডা. রায় মুখ্যমন্ত্রী হলেন তার আগের মাসে ডাক্তারি থেকে আয় ৪২০০০ টাকা, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নিজেই মাইনে ঠিক করলেন ১৪০০ টাকা, বয়স ৬৫। নিকটজনদের বললেন, “দশটা বছর কম হলে ভাল হত।” তার উপর চোখের সমস্যা, ম্যাগনিফাইং গ্লাস ব্যবহার করতেন এবং খুব লম্বা কিছু পাঠ এড়িয়ে চলতেন। এই জন্যই বোধ হয় নিন্দুকেরা প্রচার করেছিল, ডা. রায় বাংলার দিগ্বিজয়ী লেখকদের কোনও লেখাই পড়েন না, যদিও ক্ষণজন্মা লেখকরা সানন্দে তাঁকে স্বাক্ষরিত বই দিতেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি খুবই খাতির করতেন। এবং স্বাভাবিক সৌজন্যে বলতেন, লেখার অভ্যাসটা যেন ছেড়ে দেবেন না।
তবু বাংলা সাহিত্য ও সিনেমার মস্ত উপকার তিনি করেছিলেন। বান্ধবী বেলা সেনের কথায়, সত্যজিৎ রায়ের অসমাপ্ত ছবি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ‘পথের পাঁচালী’ তিনি দেখেন এবং সরকারি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে এই ছবিটির সরকারি প্রযোজনার ব্যবস্থা করেন।
১৯৪৮ থেকে বাংলার ইতিহাসের কঠিনতম সময়ে বিধানচন্দ্র রাইটার্সের লালবাড়িতে সাড়ে চোদ্দো বছর বসেছিলেন। তাঁর সেক্রেটারি সরোজ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, প্রথম দু’বছর তিনি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছেন। জমি বিক্রি করলেন, শেয়ার বিক্রি করলেন, এমনকী শৈলশহর শিলং-এর প্রিয় বাড়িটাও বিক্রি করলেন।
মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বাড়িতে বিনা পয়সায় নিয়মিত রোগী দেখতেন সকাল সাতটায়। এবং তার জন্য দু’জন ডাক্তারকে নিজের পয়সায় নিয়োগ করেছিলেন। ব্যক্তিগত স্টাফের মাইনে দিতেন নিজের গ্যাঁট থেকে।
ডাক্তার রায়ের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে নানা রকম গুজব রটত। কিন্তু তাঁর প্রথম জীবনীকার কে পি টমাস স্পষ্ট বলেছেন, তিনি ধূমপান বা মদ্যপান কোনওটাই করতেন না।
কে পি টমাস লিখেছেন, তাঁর চিরকুমারত্বের পিছনে কোনও কাহিনি আছে কিনা তা তিনি কখনও জানতে চাননি। একদিন (১৯৫৫) দিল্লি-বোম্বাই পরিভ্রমণ করে বিমানে ফিরলেন দুপুর একটায়। সঙ্গে সঙ্গে রাইটার্সে চলে গেলেন, ফিরলেন সাড়ে ৭টায়।
৬৫ বছর বয়সে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে বিধানচন্দ্র যে অমানুষিক পরিশ্রমের বোঝা বহন করেছেন তার কিছু বিবরণ জীবনীকাররা আমাদের দিয়েছেন।
ভোর পাঁচটায় উঠে গীতা ও ব্রহ্মস্তোত্র পড়ে, স্নান সেরে, সাড়ে ৬টায় ব্রেকফাস্ট খেয়ে, দু ঘণ্টা ধরে বিনামূল্যে ১৬ জন রোগী দেখে রাইটার্স বিল্ডিংস-এ আসতেন সবার আগে।
ব্রেকফাস্টে থাকত একটি টোস্ট, একটি ডিম, বেলপানা অথবা পেঁপে ও এক কাপ কফি। ভাল কফির সমঝদার ছিলেন। ভাল কফি পেলেই বন্ধুদের খাওয়াতেন।
তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কৃষ্ণ মেনন তাঁকে ডিফেন্স কারখানায় বিশেষ ভাবে তৈরি কফি গ্রাইন্ডার উপহার দিয়েছিলেন। খুবই মিতাহারী ছিলেন। সাধারণত বাইরে নিমন্ত্রণ খেতে যেতেন না। রসিকতা করতেন হসপিটালিটি অনেক সময় হসটিলিটি হয়ে যায়। রাইটার্সে সকাল ন’টা থেকে দশটা জরুরি ফাইল দেখতেন। তারপর সচিবদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা।
দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথাবার্তা চলত বারোটা থেকে সাড়ে বারোটা, তারপর অ্যান্টি চেম্বারে গিয়ে মধ্যাহ্নভোজন ও বিশ্রাম। পরবর্তী সময়ে অসুস্থতার পরিপ্রেক্ষিতে বাড়ি চলে এসে খাওয়াদাওয়া করে সামান্য বিশ্রামের পরে আবার রাইটার্স। এবং সেখানে রাত ৮টা পর্যন্ত। তাঁর ছিল দুটি দুর্বলতা। কয়েকবার স্নান করে নিতেন এবং সবাইকে বলতেন রাত ন’টায় শুয়ে পড়া ভাল।
এ বার ধন্বন্তরির নিজের স্বাস্থ্য! সর্দিকাশি ইত্যাদি ছোট ছোট রোগে সেই ছোটবেলা থেকেই ভুগতেন। তাঁর প্রথম হার্ট অ্যাটাক করেছিল ১৯৩০ সালে, তখন তিনি কংগ্রেসের কাজে আমদাবাদ থেকে দিল্লির পথে।
এই অ্যাটাক নিয়ে তেমন হইচই হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক মুখ্যমন্ত্রিত্ব কালে। এবারেও তাঁকে অমানুষিক পরিশ্রম থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে যেতে হয়নি। শুধু দৈনিক রুটিনের পরিবর্তন করে দুপুরে ওয়েলিংটন স্ট্রিটের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করতে আসতেন এবং বাড়িতেই ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম করে আবার রাইটার্সে যেতেন।
অন্তিমপর্বের শুরু ২৪ জুন ১৯৬২। রাইটার্সে ওইটাই তাঁর শেষ দিন। নিমপীঠের এক সন্ন্যাসীকে বললেন, “শরীর যেমন ঠেকছে কাল নাও আসতে পারি।’ মাথায় তখন যন্ত্রণা।
পরের দিন বাড়িতে ডাক্তার শৈলেন সেন ও যোগেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকা হল। তাঁদের সিদ্ধান্ত হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। ৩০ জুন ডাক্তার রায় তাঁর প্রিয় বন্ধু ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে বললেন, ‘‘আমি তিরিশ বছর হৃদরোগের চিকিৎসা করে আসছি, আমার কতটা কী হয়েছে আমি তা ভাল করেই বুঝতে পারছি। কোনও ওষুধই আমাকে ভাল করতে পারবে না।”
১ জুলাই তাঁর জন্মদিন। সেদিনই তাঁর তিরোধান দিবস। ওই দিন তাঁর আত্মীয়স্বজনরা এলেন। পরিচারক কৃত্তিবাসের হাত থেকে এক গ্লাস মুসুম্বির রস খেলেন। বন্ধু সার্জেন ললিতমোহনকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, ললিত আমার গুরুও বটে, ওর কাছ থেকে কত কিছু শিখেছি।
তার পর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে বললেন, “আমি দীর্ঘ জীবন বেঁচেছি। জীবনের সব কাজ আমি সমাধা করেছি। আমার আর কিছু করার নেই।” এর পর বললেন, আমার পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। এর পরেই নাকে নল পরানো, ইঞ্জেকশন এবং ১১টা ৫৫ মিনিটে অমৃতপথ যাত্রা।
দুঃসংবাদ পেয়ে দেশবন্ধুর স্ত্রী বাসন্তীদেবী বলেছিলেন, বিধান পুণ্যাত্মা, তাই জন্মদিনেই চলে গেল। ভগবান বুদ্ধও তাঁর জন্মদিনে সমাধি লাভ করেছিলেন।
দেহাবসানের কয়েক বছর আগে কেওড়াতলা শ্মশানের বৈদ্যুতিক চুল্লির সূচনা করতে এসে বিধানচন্দ্র বলেছিলেন, “ওহে আমাকে এই ইলেকট্রিক চুল্লিতে পোড়াবে।” ২ জুলাই ১৯৬২ তাঁর সেই ইচ্ছা পূর্ণ করা হয়েছিল।

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

‘পঞ্চ ইন্দ্রিয়’র সংযমে ‘ষড়রিপু’র দমন


পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা আমরা মানুষেরা রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ এ পঞ্চগুণের উজ্জীবিত ও সজীব জীবনের উপস্থিতি লাভ করি আমাদের মানব জীবনে। এই রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ দ্বারা জীবনের সকল সুখ খুঁজে বেড়াই, পূরণ করার চেষ্টা করি ষড়রিপু’র দাবীসমুহকে। আর শাস্ত্রসমূহ মানবজাতিকে শিক্ষা দান করেছেন ‘সংযম’ শিক্ষার মাধ্যমে নিজ পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা লাভ করে সারা বছর ব্যাপী ষড়রিপু’কে দমন করে একটি সুন্দর এবং সুস্থ মানব জীবন পরিচালনার সামর্থ্য অর্জন করার জন্য।
সাধকের প্রাথমিক সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান শিক্ষা হল ভোগস্পৃহা নিয়ন্ত্রণ করে দেহমনকে ত্যাগের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে তোলা। আর তাই সাধনা মূল বিষয় ‘সংযম’ এবং ‘ত্যাগ’। একজন স্বাভাবিক মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় রয়েছে এ কথা আমরা সবাই জানি। ইন্দ্রিয়গুলো হলো--- কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, চক্ষু ও ত্বক। আর রয়েছে ‘ষড়রিপু’ অর্থাৎ মানুষের চরম ও প্রধান ছ'টি শত্রু হ'ল ---- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। সমস্ত আধ্যাত্মিক শিক্ষার মূল শিক্ষা হল এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে এই ষড়রিপু’কে ধ্বংস করা।
অথচ বাস্তবে কি হচ্ছে? আজ আমরা জীবিকার প্রতিটি টাকা 'ভোগ'-এর পিছনে হিসাব করে খরচ করছি পরিকল্পনা করে। দান করছি কই! দান-খয়রাত করতে গেলে আগে দেখি মানিব্যাগে খুচরা টাকা-পয়সা আছে কি না, আর তার মধ্যে ময়লা-ছেঁড়া থাকলে আরও সুবিধা হয়। কিন্তু ভোগের বেলায়, শরীর-মনের উত্তেজনাকারী খাদ্য-পানীয় নিত্য উদরসাৎ করছি মহোৎসাহে। যে পরিমাণ ভোগ-বিলাস আর অপচয়-অপব্যায়ে আমরা মত্ত হই তা আমাদের সংযম শেখায় না, শেখায় না ষড়রিপুকে দমন করার কৌশল। বরং বিপরীতটাই আমাদের অবচেতনে শিকড় গেঁড়ে বসে যাচ্ছে, আর পরবর্তী প্রজন্মকে শিখাচ্ছে ------ 'খাও, পিয়ো অউর মৌজ কারো’। তথাকথিত প্রগতিশীলতা এবং আধুনিকতার দোহাই দিয়ে ষড়রিপু চরিতার্থ করতে সমাজে আজ যা হচ্ছে তা থেকে ধর্মগ্রন্থ আমাদের কতটুকু বিরত রাখতে সক্ষম হচ্ছে আর আমরাই বা কতটুকু শিক্ষা নিচ্ছি?
আধুনিক ফার্স্টফুড আর ব্র্যান্ড ফুডকোর্ট, নাইটক্লাব ও বার, ডিস্কোথেকগুলো ব্যবসার পসরা বসিয়েছে 'প্রগতিশীলতা এবং আধুনিকতা' নামেরর দুই অনুষঙ্গকে ঘিরে। যেখানে মানবিক ও লৌকিক অনেক মৌলিক নীতি ও বিধি লঙ্ঘনের সাথে সাথে চলছে 'অপচয় আর অপব্যায়’ যা ‘সংযম’ আর ‘ত্যাগ’ এর সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যবহার।
সবশেষে কি আর বলব? অত্যন্তঃ দুঃখের সাথে কাতর আবেদন জানাচ্ছি আসুন, সুস্থ্য জীবন ও সুন্দর সমাজ গড়তে --- মন্ত্র-দীক্ষা গ্রহণ করুন, সাধুসঙ্গ করুন, গীতা পাঠ করুন, প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করুন, আত্মজ্ঞান লাভ করে অন্যকে পথ দেখান। নিজের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ষড়রিপু’কে দমন করার কৌশল আয়ত্ত করে সারা বছর জুড়ে একটি সুখী এবং সুন্দর জীবন গড়ার শিক্ষা নিই শ্রী গুরুর কৃপায়। শ্রী গুরুর কৃপা সবার জন্য কল্যাণকর হোক্ --- এই কামনায় শেষ করছি আমার বিনম্র আবেদন।

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

নারদ ও এক শিকারী

ভগবানের নাম জপ করতে করতে নারদ মুনি একদিন গঙ্গায় স্নান করার জন্য বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন এই সময় তিনি এক বীভৎস দৃশ্য দেখতে পেলেন।
নারদ মুনি - কে ভগবানের সৃষ্টির এই অবস্থা করলো? নিশ্চয়ই কোন দুর্বুদ্ধি বোকা এই ভয়ানক পাপ কর্ম করেছে! কিছু আত্মা প্রাণীদের উপর এমন অত্যাচারের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যতকে অন্ধকারময় তৈরী করছে! ---- নারদ মুনি কৃষ্ণ কর্তৃক প্রদত্ত তাঁর দিব্য বীণাতে টঙ্কার দিলেন আর তাতে সমস্ত পশুরা সেই স্থান পরিত্যাগ করলো।
শিকারী - এটি কিসের শব্দ? এটি কি ঘটছে? আমার সমস্ত পশুরাই এই স্থান থেকে চলে গেল।
নারদ মুনি - শিকারী, আমি তোমার কাছেই এসেছিলাম।
শিকারী - তুমি কে? আমি তো তোমার মত কাউকে চিনি না, তুমি আমার কাছে কি চাও?
নারদ মুনি - আমি নারদ, আমি তোমার কাছে এসেছিলাম যদি তুমি আমাকে আমার পথ চিনতে সাহায্য কর।
শিকারী - আমি একজন শিকারী আর তুমি কিনা আমার সমস্ত বন্দী পশুকে তাড়িয়ে দিলে, তুমি কেন এমন করলে?
নারদ মুনি - আমি যখন এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন দেখলাম যে এই সমস্ত পশু যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। এই হীন, পাপ কার্য কে করেছে?
শিকারী - পাপ কাজ! তুমি এসব কি বলছ?. আমিই তো এসব করেছি, এ সব কিছুই সঠিক আছে।
নারদ মুনি - তুমি এই দুর্বল খরগোশটিকে অর্ধমৃত কর রেখেছ আর বলছ এসবই সঠিক?
শিকারী - প্রভু, এতে পার্থক্য কোথায়, আমার পিতাই এই শিক্ষা প্রদান করেছেন, আর যখন আমি কোন খরগোশকে মৃত্যু যন্ত্রণায় কষ্ট পেতে দেখি, তা আমাকে আরো বেশি আনন্দ দান করে।
নারদ মুনি - শিকারী আমি তোমার কাছে শুধু একটি জিনিসই চাই, বল তুমি আমাকে তা দান করবে।
শিকারী - আপনি কি কোন কিছু পুষতে চান? আপনি আমার বাড়িতে চলুন আমি আপনাকে হরিণ, বাঘ, যা চান না কেন তাই দিয়ে দিব।
নারদ মুনি - আমার এইসব কিছুই চাই না। আমি শুধু চাই যে, তুমি পশুদেরকে এভাবে অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রেখ না। তোমায় কষ্ট ভোগ করতে
শিকারী - কিন্তু, আমি এই কষ্ট ভোগ করতে পারবনা।
নারদ মুনি - কিন্তু এটাই ঘটবে। তোমাকে প্রত্যেক পাপ কর্মের জন্য তার ফল ভোগ করতেই হবে।
শিকারী - হে প্রভু, আমি তাহলে কিভাবে এই পাপময় কর্ম থেকে মুক্তি পেতে পারি? আমি আপনার কাছে এই মিনতি নিবেদন করছি, দয়া করে আমাকে এই অবস্থায় বিপদ থেকে রক্ষা করুন। আমাকে পথ প্রদর্শণ করান।
নারদ মুনি - আমি তোমাকে প্রকৃত পথ দেখাতে পারি, কিন্তু তোমাকে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
শিকারী - অবশ্যই প্রভু, আমি তা থেকে বিরত হবো না।
নারদ মুনি- তাহলে প্রথমেই তুমি তোমার ধনুক ভেঙ্গে ফেল।
----- শিকারী তার ধনুক ভেঙ্গে ফেলে সেই শিকারীটি এবার নারদ মুনির নির্দেশনা শুনতে লাগল। সে তার সমস্ত বল, সম্পদ-সমৃদ্ধি ফেলে মাত্র একটি বসন পরে নারদের কাছে আসল।
শিকারী - আমার অতীত ছিল রাতের ভয়ংকর স্বপ্নের মত এবং এখন আমি জাগ্রত হতে চাই। কিন্তু কিভাবে এই বদ স্বভাবগুলো থেকে মক্তি পেতে পারি।
নারদ মুনি - হে শিকারী তুমি কি জান না কৃষ্ণ কত দয়াময়। তিনিই তোমাকে সকল রকম ব্যবস্থা করে দিবেন। তুমি শুধু তাঁর চরণে আত্মসমর্পণ কর। শিকারী ও তার স্ত্রী নদীর তীরে একটি ছোট্ট কুটির তৈরী করল।
শিকারীর স্ত্রী - তুমি আমাকে অনেক আনন্দ দান করেছ। এখন কৃপা করে নারদ মুনি যা তোমাকে বলেছে তা আমাকে বল। তুমি এখন যা করছ তাই প্রকৃত মুক্তির পথ এবং আমরা এখনই কেবল মাত্র বনের অন্য পশুর থেকে আলাদা হতে পারি।
শিকারী- তুমি আমাকে আমার আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশনা পালনে সাহায্য কর। তুমি আমার সাথে যোগদান কর আর আমার গুরুদেব যে পারমার্থিক সেবা প্রদান করেছেন তাতে অংশগ্রহণ কর।
শিকারী এবার ‘হরেকৃষ্ণ’ মহামন্ত্র নাম জপ করতে শুরু করল এবং তারা অন্যের দয়া নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করত। তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছুই গ্রহণ করত না।
তিনি তার বাড়িতে পরম পবিত্র তুলসী মহারাণীকে প্রতিদিন জলদান করতেন। এসব দেখে পাশের বাড়ির লোকেরা বলাবলি করতে লাগল -- আমাদের বাড়ির জানালা থেকে আমরা প্রায়ই দেখি যে তোমার স্বামী ভগবৎ ভজনা করছে, আর দেখ এমন তাঁর মুখমন্ডল কেমন জ্যোতির্ময় এবং উৎফুল্ল দেখাচ্ছে।
শিকারীর স্ত্রী - এটি সার্বিকভাবে নারদ মুনির কৃপা, ঐ তুলসী গাছটি দেখ। আমার স্বামী নারদ মুনির কাছ থেকে শুনেছে যে, শুধুমাত্র তুলসী গাছে জল সেচনের দ্বারা নিজেদের পবিত্র করে তুলতে পারা যায়। কারণ তুলসী মহারাণী ভগবানের পরমা প্রিয়া, দেখ দেখ, শিকারী এখন ভক্তে পরিণত হয়ে গেছে। গ্রামবাসী প্রত্যহ তার জন্য কিছু না কিছু খাবার নিয়ে আসত।
ভক্তবৃন্দ - সে সকল কিছুই বুঝতে পারছে, আমি বলছিলাম না আমরা খুবই ভাগ্যবান কারন আমরা এখন এমন একজনের সাক্ষাৎ পেয়েছি যিনি নারদ মুনির শিষ্য।
----- আর এরপর থেকে দশ থেকে বিশ জন প্রত্যেক দিন সেই শিকারীর সাথে প্রসাদ গ্রহণ করত।
ভক্তবৃন্দ - সবই তোমার কৃপা, আমরা তোমাকে আর কখনো পশুদের শত্রু বলব না। আমরা তোমাকে একজন সাধু বলে ডাকতে পারি। আর তোমার জন্য কিছু ফল নিয়ে এসেছিলাম।
শিকারী - দয়া করে আমাকে নারদ মুনির শিষ্য বলে ডাকলেই চলবে। আমি এর বেশি কিছুই নই।
---- একদিন নারদ মুনি এবং তার বন্ধু পর্বত মুনি সেই বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
নারদ মুনি - পর্বত মুনি আমার এক শিষ্য এরই পাশে কোথাও বাস করে তো দেখি এখন সে কি করছে?
পর্বত মুনি- আমি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্তদের খবুই ভালবাসি এবং তাদের দর্শনে আনন্দ উপভোগ করি, নারদ দয়া করে আমাকে সেখানে নিয়ে যাও। তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও। ঐ যে সেই শিকারী, দেখ দেখ।
শিকারী নারদ মুনিকে দেখে বললেন, “ঐ যে দেখ, আমার শ্রদ্ধেয় পরমারাধ্য শ্রী গুরুদেব আসছেন।” যখন শিকারী মাঠ পার হতে যাচ্ছিল সে দেখলো তার পায়ের ঠিক নিচে কিছু পিঁপড়া। সে বলল হে আমার প্রিয় বন্ধুরা তোমরা ভয় পেয় না, আমি তোমাদের কোন ক্ষতি করব না। এই দৃশ্য দেখে নারদ মুনি বললেন তুমি সত্যই বলিহারি শিকারী, তুমিই প্রকৃত ভক্ত। এটিই কাম্য যে, কোন কৃষ্ণ ভক্ত কোন ভাবেই জীবকে কষ্ট দিতে চায় না, এমনকি একটি পিঁপড়াকেও না। শিকারী নারদ মুনির চরণে দন্ডবৎ হয়ে বললেন, “গুরুদেব আমার পিঁপড়া ব্যাথা পেত তাই কৃপা পূর্বক সেই পিঁপড়াগুলোকে সরে যেতে দিন।”
নারদ মুনি - সকল কিছু কি ঠিক মত চলছে?
শিষ্য - হ্যাঁ গুরুদেব। দেখুন তুলসী মহারাণী কিভবে বর্ধিত হচ্ছে।
মহামুনি নারদ আপনি দয়া করে আমাদের সাথে প্রসাদ গ্রহণ করুন।
পর্বত মুনি - আমি দেখছি যে তুমি এখানে ভাল আছো এবং তোমার ভক্তি জীবন খুব ভালোভাবে চলছে এবং তোমার এমন হৃদ্যতায় আমি খুব খুশি হয়েছি।
শিষ্য - মহতী আপনি জানেন যে আমরা মহানাম থেকে সকল সময়ই কৃপা পেয়ে থাকি আর এই মহামন্ত্র নারদ মুনিই আমাকে দান করেছেন। আপনি জানেন যে এই মহামন্ত্র খুবই সুমধুর আর তাই আমরা সকল সময়ই এই মহামন্ত্র জপ করতে থাকি।
---- পূর্বের শিকারী এবং তার স্ত্রী হরিনামের উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে পড়ল। তারা তাদের এই অনুভূতিকে কৃষ্ণনামের মাধ্যমে উপভোগ করতে লাগল।
নারদ মুনি - সকল প্রশংসাই সমস্ত গৌরভক্তবৃন্দের। সকল প্রশংসাই ভগবান রাধাকৃষ্ণের।
পর্বত মুনি - নারদ মুনি সত্যিই তুমি একটি পরশ পাথর। তোমার স্পর্শেই আজ এই ঘৃণ্য শিকারী মানব জীবনের পরম প্রাপ্তি কৃষ্ণ প্রেম লাভ করেছে।
নারদ মুনি - তুমি কি ঠিক মত প্রসাদ পাচ্ছ প্রিয় শিষ্য?
শিষ্য - হ্যাঁ, গুরুদেব, আমি প্রত্যহ বিশজন ভক্তকে নিয়ে একত্রে প্রসাদ পাচ্ছি।
পর্বত মুনি - ঠিক আছে, এখন তুমি এবং তোমার স্ত্রী ভালভাবে কৃষ্ণ ভক্তি যাজন করো, কৃষ্ণ তোমাদের মঙ্গল এবং সুখী করুন।
শিকারী - মহৎ সাধুরা সকল সময় কৃষ্ণের কথাই বলেন। যিনি পরম ঈশ্বর ভগবান এবং দেবদেবীরাও তাঁকে জানেন, যিনি সমস্ত কিছুর পরম নিয়ন্তা। কিন্তু আমি এতই অধম যে, আমি কৃষ্ণকে জানতেও পারলাম না, ,আমি শুধুমাত্র আমার আধ্যাত্মিক গুরুর সেবা পূজা করতে পারি, যিনি আমাকে তাঁর পরম কৃপায় এই অজ্ঞতার অন্ধকারকে দূর করে, আমাকে দিব্য চক্ষুদান করেছেন।
কীর্তন - ভগবানের পবিত্র নামের গুণে শিকারীর বাড়ির আঙ্গিনা মধুর পরিবেশের সৃষ্টি, ঠিক যেন শুষ্ক মরুভূমিতে বসন্তের এক পশলা বৃষ্টি। সবাই 'হরিবোল হরিবোল' বলে চিৎকার করে উঠল।
.
.
একমাত্র নারদি পারেন এক দুর্বৃত্তকে সাধু বানাতে .......


Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার যোগই ভারতীয় সনাতন সাধনার মূল প্রতিপাদ্য

জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার যোগই ভারতীয় সনাতন সাধনার মূল প্রতিপাদ্য। ভারতীয় ঋষিরা যোগচর্চার বেশ কয়েকটি পথের কথা উল্লেখ করেছেন। এই পথগুলিকে যোগমার্গ বা সাধনমার্গ বলা হয়। এর সংখ্যা নিয়ে মতান্তর আছে। সাধারণত যে যোগমার্গগুলির নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হলো ----

* কর্মযোগ
-- কর্মেই মুক্তি- এই বিশ্বাস থেকে কর্মযোগের সৃষ্টি। কর্মযোগের সূত্র ক্রিয়াযোগ ও জ্ঞানযোগের বিকাশ ঘটে। কর্মযোগের দ্বারা পাপক্ষয় হলে- জ্ঞানের উদ্ভব হয়। কর্মযোগের মূল লক্ষ্য ব্রহ্মজ্ঞান লাভ। কর্মের প্রকৃতি অনুসারে কর্মযোগকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগ দুটি হলো―
১। নিষ্কাম কর্মযোগ -- এর দ্বারা মোক্ষ লাভ হয়।
২। সকাম কর্মযোগ -- স্বর্গ লাভ হয়।
* ক্রিয়াযোগ -- কর্মযোগ সম্পন্ন করার জন্য ক্রিয়াত্বক উদ্যোগ থাকে তাই হলো- ক্রিয়াযোগ। এই যোগানুশীলনের সকল কর্মযোগই ক্রিয়াযোগ দ্বারা সম্পন্ন হয়।

* জ্ঞানযোগ -- পরম ব্রহ্মকে পাওয়া বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করার জন্য যে যোগানুশীলন করা হয়, তাই হলো- জ্ঞানযোগ। এক্ষেত্রে অন্তজ্ঞানকে বাস্তব জ্ঞানে পরিণত করা হয়। প্রকৃতি ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভিতর এর মানব ধর্মের অন্বেষণ করার প্রক্রিয়ার ভিতরই জ্ঞানযোগের মূল সূত্র নিহিত। যোগীর মনে উদ্ভুত বিভিন্ন প্রশ্নের সদুত্তর অন্বেষণ এবং এরই ভিতর পরম সত্যে পৌছার জন্য ধ্যানই হলো জ্ঞানযোগ। এর জন্য কোন প্রচলিত পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট নেই। বিভিন্ন পরিস্থিতি সাপেক্ষে এর বিচার ও সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়। জ্ঞানযোগে বিশ্বাসের চেয়ে উপলব্ধিকে বড় করে দেখা হয়। সেই কারণে এই যোগে আত্ম-জিজ্ঞাসা এবং তাঁর সদুত্তর খুঁজতে হয়। এই দুটি প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যে অভিজ্ঞতা লাভ হয়, তাই হলো জ্ঞানযোগের সঞ্চয়। জ্ঞানযোগ দ্বারা সঞ্চিত জ্ঞানের সাহায্যে বাস্তব সমস্যার সমাধান করা হয়। এই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে জ্ঞানযোগী নিজেকে সমৃদ্ধ করে থাকেন।

* ব্যক্তিযোগ -- বিশ্বাস স্থাপন করে নিজেকে নিবেদন করা বা নিজ ব্যক্তিত্ব বিলীন করার প্রক্রিয়াই হলো ব্যক্তিযোগ। সাধারণত বিভিন্ন ধর্মালবলম্বী আল্লাহ, পরমেশ্বর বা কোন দেবতার প্রতি বিশ্বাস রেখে নিজ ব্যক্তিত্বকে সমর্পণ করেন। এক্ষেত্রে কখনো কখনো এই বিশ্বাস সরাসরি ঈশ্বর হতে পারেন বা তার কোন প্রতীকীরূপ হতে পারে। যেমন পরমব্রহ্ম হবেন সরাসরি ঈশ্বর, কিন্তু রাম বা কৃষ্ণ হবে বিষ্ণুর অবতার হিসাবে। খ্রীষ্টধর্মালম্বীরা যেমন ত্রিত্ববাদের সূত্রে যিশুর আরাধনা করেন। কোন ব্যক্তি বিশেষের প্রবর্তিত পথ অনুসারে, উক্ত ব্যক্তিকে সম্মান করা বা তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণও ব্যক্তিযোগের পর্যায়ে পড়ে। ব্যক্তিযোগের পর্যায়ে কোন মহান শিক্ষক বা গুরু হতে পারেন। এক্ষেত্রে এই আরাধনা গুরু-ভজনা হিসাবে অভিহিত করা হয়।

* মন্ত্রযোগ -- মন্ত্রের সাধারণ সমার্থ হলো- পরামর্শ, বিচার ইত্যাদি অন্যদিকে বেদের উপাসনার উপযোগী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো (বাক্য বা পদ) মন্ত্র নামে অভিহিত করা হয় শাস্ত্র মোতাবেক মন্ত্র ও ঈশ্বর নাম জপ করতে করতে, নিজেকে ঈশ্বরে বিলীন করার পদ্ধতিই হলো মন্ত্রযোগ এই পথ ধরেই পরমব্রহ্মের সাথে সাধকের মিলন ঘটে এবং অনন্ত মুক্তিলাভ ঘটে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে- মহাদেব এই যোগের সাধনা করেছিলেন।

* রাজযোগ -- যোগ-চর্চার জন্য যতগুলি পথ বা মার্গ রয়েছে, তার ভিতরে রাজযোগ একটি। মন ও শরীরকে স্থির বা সমাধিস্থ করে যে যোগ-প্রক্রিয়া সাধিত হয়, তাকে রাজযোগ বলে। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে পতঞ্জলি, দত্তাদেয় প্রমুখ ঋষিরা এই যোগ সাধনার দ্বারা সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। যম ও নিয়মের অনুশীলনের দ্বারা মানুষের আচরণ এবং ব্যক্তিত্বের সংশোধন বিকাশ করার প্রক্রিয়ার ভিতর রাজযোগ প্রতিষ্ঠা পায়। সেই কারণে, সুস্থ মন ও শরীরের চর্চা এই যোগের বিষয় হিসাবে মূখ্য স্থান অধিকার করে আছে।

* লয়যোগ -- শরীরের নাড়িগ্রন্থিস্থানে মন বা চিত্তকে বিলীন করে যোগ সাধন করা এবং এর সাহায্যে মোক্ষ লাভ করার পথ হলো লয়যোগ। কথিত অাছে প্রখ্যাত মহর্ষি বেদব্যাস এই পথ অনুসরণে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন।

* হঠযোগ -- পিঙ্গল ও ইড়াকে অবলম্বন করে যে যোগ চর্চা বা সাধনা করা হয়, তাকেই হঠযোগ বলা হয়। দেহ থেকে শরীর পৃথক করে, মনকে ঈশ্বর বা পরমাত্মার সাথে মিলনের প্রক্রিয়াই হলো হঠযোগ। বর্তমানে হঠ্ যোগকে দেহচর্চার পদ্ধতি হিসাবেই বিবেচনা করা হয়। এই যোগ সাধনাকে কার্যকরী করার প্রক্রিয়াকে অঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই অঙ্গের প্রকারভেদ নিয়ে কিছুটা মত পার্থক্য আছে। গোরক্ষ মুনির মতে যোগাঙ্গ ছয়টি। এগুলো হলো― আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণ, ধ্যান ও সমাধি। পক্ষান্তরে মার্কেণ্ডয় মুনির মতে― যোগাঙ্গের সংখ্যা আটটি। এগুলো হলো― যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণ, ধ্যান ও সমাধি।

মনের ইচ্ছা ও একাগ্রতা দিয়ে কোন বিশেষ শক্তি বা ক্ষমতাকে আয়ত্ব করার প্রক্রিয়াই হলো সাধনা। পতঞ্জলির যোগসূত্র গ্রন্থের সাধনপাদ অংশে, সাধনা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণ, ধ্যান, শোধন ও সমাধি দ্বারা সাধনা করতে হয় সম্পন্ন হয়। আবার সাধনাকে চরিতার্থ করার জন্য রয়েছে সাধনবিধি। এই বিধিগুলো হলো শোধন, দৃঢ়তা, স্থৈর্য, ধৈর্য, লাঘব, প্রত্যক্ষ ও নির্লিপ্ত।


Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

ভবিষ্যত কি?


চৈতন্যদেব থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ থেকে রবীন্দ্রনাথ --- মিল এক জায়গায়। প্রত্যেকেই তথাকথিত ধর্মসম্পর্কিত ভাবনা এবং ধারণাকে ভেঙেচুরে নতুন আলো দেখাতে চেয়েছেন। স্বাধীনতার এত বছর পরেও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের নাগরিক হিসেবে আমাদের বহুবিধ জটিল ও জরুরী প্রশ্নের একটি আমাদের ধর্মভাব নিয়ে। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ এই যে, ধর্ম মানুষকে যতখানি সম্পন্ন করে ততখানিই বিপন্নও করে।

অথচ ভারত এক স্বাধীন সার্বভৌম গণতন্ত্র। ভারত এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান-পার্সী-বৌদ্ধ-জৈন সবাই সমান। হিন্দুরা চাইছেন বেশি করে হিন্দু হতে, মুসলমান চাইছেন বেশি করে মুসলমান হতে, খ্রিস্টান চাইছেন আরো অনেক মানুষকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে। এই চাওয়ার মধ্যে একটা শব্দ বারবার বাদ পড়ে যাচ্ছে। সেই শব্দটি হল 'মানুষ'। একজন হিন্দু 'মানুষ', মুসলমান 'মানুষ' বা খ্রিস্টান 'মানুষ' হতে চাইলে অনেক সমস্যারই আশু সমাধান হয়।

পৃথিবীর প্রতি ধর্মের উদ্দেশ্য হয়তো সর্বজনীন কল্যাণ: ভ্রাতৃত্ব, বিশ্বমৈত্রী, শান্তি ইত্যাদি। ভালো করে নিজের ধর্মশিক্ষাটুকু অনুসরণ করলে এ সংঘাতের সমস্যা মিটে যায়।
পুজো, অর্চনা, প্রার্থনা। নিয়ম করে দিনে পাঁচবার পাঠ, উপাসনা। পোষাক থেকে শুরু করে বহুবিধ আয়োজন। নানা আচার অনুষ্ঠান। সেখানে সমর্পণের ভাবনাকে ছাপিয়ে ওঠে বাহ্যিক আড়ম্বর। মানুষের জীবনদেবতাকে নিয়ে যে ধর্ম, যে ধর্ম সেই সত্যকে নিয়ে, যা সমাজ এবং ব্যক্তিমানুষকে ‘ধারণ’ করে, সে ধর্ম কোথায়?

ঠিক এইখান থেকে আমার ধর্মজিজ্ঞাসার শুরু। বুদ্ধদেব, চৈতন্যদেব, যীশু -- সবার ভাষ্যে মিল এক জায়গায় -- 'মানুষ'-এর এক নতুন চৈতন্যলোক চাই। আবহমান কাল ধরে পৃথিবীর দাবি একটাই -- মানবতাবোধে বিশ্বাসী নতুন ‘বিশুদ্ধ’ মানুষ।

কিন্তু এই যে দিকে দিকে মানবতা বিরোধী ইসলামিক জঙ্গী আক্রমণ চলছে ISIS ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর নামে, এটা কি ধর্ম? মানবতাবোধে বিশ্বাসী নতুন ‘বিশুদ্ধ’ মানুষের কাজ? তথাকথিত শুভবুদ্ধি সম্পন্ন, শিক্ষিত মানুষের প্রতিবাদ কই! ভারতবর্ষকে জঙ্গী আতুরঘর বানিয়ে ফেলেছে এরা! খাগড়াগড় এর প্রকৃষ্ট প্রমান। প্রশাসনের হাত পা বেঁধে ফেলেছে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা। থানায় পুলিশের উপর আক্রমণ এর উদাহরণ।

সত্যিই কি স্বাধীন দেশে মুক্ত ভাবে বাস করছি আমরা? আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিস্তির্ণ Border অঞ্চল দিয়ে অস্ত্র-ড্রাগ-নকল টাকা-গরু পাচার চলছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদতে ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সক্রিয় সহযোগিতায়। পুলিশ দুস্কৃতিদের পাকড়াও করলে ঐ সম্প্রদায়ের মানুষ সংগঠিত ভাবে তাদের ছিনিয়ে নিয়ে যায় পুলিশের হাত থেকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের মদতে। মানবতা ধর্ষিত, রাজনীতি ভুলুণ্ঠিত, দলতন্ত্র নগ্ন শুধুমাত্র ভোটের স্বার্থে। হিন্দু আজ নিজভুমে পরবাসীর জীবন ধারণ করে। ভবিষ্যত কি?

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

কালসর্প যোগ


ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্রে গ্রহগণের অবস্থান অনুযায়ী শুভ ও অশুভ যোগ সৃষ্টি হয়। এমনি এক অশুভ যোগ হল কালসর্প যোগ। রাহু এবং কেতু সব সময় নিজেদের সম সপ্তমে অর্থাৎ ১৮০ ডিগ্রি দুরত্বে অবস্থান করে। রাহু ও কেতুর মাঝখানে যখন সমস্ত গ্রহ চলে আসে তখন এই যোগ হয়। রাহু কে সাপের মুখ ও কেতুকে সাপের লেজ মান্য করা হয়। এর মধ্যে অর্থাৎ (সাপের পেটে) সমস্ত গ্রহ চলে আসে তখন এই যোগ সৃষ্টি হয়। এই যোগ খুব পীড়াদায়ক হয়। বিশেষ করে রাহু, কেতুর দশা মহাদশায় এবং গোচরে রাহু, কেতু যখন নিজ ভাব দিয়ে পাস করবে। রাহু ও কেতুর অবস্থান অনুযায়ী ১২ টি ভাবের জন্য ১২ রকম কালসর্প যোগ হয় এবং প্রত্যেক কালসর্প যোগ আলাদা আলাদা ফল দেয়।
১> অনন্ত নাগ কালসর্প যোগ
-------------------------------------------
রাহু লগ্নে ও কেতু সপ্তমে থাকলে অনন্ত কালসর্প যোগ হয়। এই যোগে পীড়িত ব্যাক্তিরা শারিরিক ও মানসিক ভাবে খুব বিব্রত থাকেন এবং মামলা মকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েন এই যোগের ব্যাক্তিরা খুব সাহসী হয়ে থাকেন ।
২> কুলিক কালসর্প যোগ
--------------------------------------
রাহু দ্বিতীয়ে ও কেতু অষ্টমে থাকলে কুলিক কালসর্প যোগ হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিরা আর্থিক কষ্টে ভোগেন। পারিবারিক অশান্তি লেগেই থাকে এবং সামজিক ভাবে ও কর্মে প্রতিষ্ঠা পায়না।
৩> বাসুকি নাগ কালসর্প যোগ
-------------------------------------------
রাহু তৃতীয়ে ও কেতু নবমে থাকলে এই কালসর্প যোগ হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিদের জীবন খুব সংঘর্ষ ময় হয়। চাকরি এবং ব্যাবসায় সমস্যা লেগেই থাকে। ভাতৃ সুখের অভাব হয়। ভাগ্য এদের কখনও সাথ দেয় না।
৪> শঙ্খপাল কালসর্প যোগ
---------------------------------------
রাহু চতুর্থে এবং কেতু দশমে অবস্থান করলে এই যোগ হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিদের কিছুটা অর্থ কষ্ট ভোগ করতে হয়। মানসিক ভাবে এবং পরিবার পরিজনের কাছ থেকে এরা কষ্ট পেয়ে থাকে। এদের মাতৃ সুখ হয় না। জমি, বাড়ি নিয়ে এরা সমস্যায় থাকেন।
৫> পদ্মনাগ কালসর্প যোগ
-------------------------------------
পঞ্চমে রাহু ও একাদশে কেতু থাকলে পদ্মনাগ কালসর্প যোগ হয় । এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিদের মিথ্যা বদনাম হয় । সন্তান সুখে বাধা । উচ্চ শিক্ষা ও ধন প্রাপ্তিতে বাধা হয় ।
৬> মহাপদ্ম নাগ কালসর্প যোগ
------------------------------------------
ষষ্ঠে রাহু ও দ্বাদশে কেতু থাকলে এই যোগ হয়। এদের মাতুল সুখ হয় না বা মাতুল থেকে কষ্ট পেয়ে থাকেন। প্রেমে সাফল্য আসে না। এবং অনেক লম্বা সময় পর্যন্ত এরা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগে থাকে।
৭> তক্ষক কালসর্প যোগ
-----------------------------------
এই যোগ অনন্ত কাল যোগের ঠিক উল্টো অর্থাৎ কেতু লগ্নে ও রাহু সপ্তমে অবস্থান করে। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিদের বিবাহিত জীবন খুব অশান্তি পূর্ণ হয়ে থাকে এবং চাকরি ও ব্যাবসায় বার বার ক্ষতি হয়। এবং মানসিক অশান্তি হয়।
৮> কর্কটক কালসর্প যোগ
------------------------------------
দ্বিতিয়ে কেতু ও অষ্টমে রাহু থাকলে এই যোগ হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিরা খুব ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করেন। এরা কখনও শান্ত ভাবে থাকতে পারেনা। পর্যাপ্ত টাকা পয়সা কখনও এদের হাতে থাকে না।
৯> শঙ্খচূড় কালসর্প যোগ
-------------------------------------
তৃতীয়ে কেতু ও নবমে রাহু অবস্থান করলে এই যোগ সৃষ্টি হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিদের পিতৃ সুখ হয় না। ভাগ্য সবসময় নিজের অনুকুলে থকে না। নিজের ব্যবসায় লোকসান হয়ে থাকে।
১০> ঘাতক কালসর্প যোগ
-------------------------------------
কোষ্ঠীতে চতুর্থে কেতু ও দশমে রাহু থাকলে এই যোগ হয়ে থাকে। এই যোগে গৃহে কলহ অশান্তি লেগে থাকে। কর্ম ক্ষেত্রে খুব সংঘর্ষ করতে হয়।
১১> বিষধর কালসর্প যোগ
-------------------------------------
কেতু পঞ্চমে ও রাহু একাদশে অবস্থান করলে এই যোগ হয়। এই যোগে প্রভাবিত ব্যাক্তিরা নিজের সন্তানের কাছ থেকে কষ্ট পেয়ে থাকেন। এদের নেত্র ও হৃদ রোগ হতে পারে। এদের স্মরণ শক্তি খুব দুর্বল হয়। উচ্চ শিক্ষায় বাধা এবং সামজিক ভাবে এরা প্রতিষ্ঠা পায় না।
১২> শেষনাগ কালসর্প যোগ
--------------------------------------
ষষ্ঠে কেতু ও দ্বাদশে রাহু থাকলে এই যোগ হয়। এই যোগের ব্যাক্তিদের প্রচুর গুপ্ত শত্রু থাকে যারা এদের প্রতি সবসময় ষড়যন্ত্র করতে থাকে এমনকি শত্রুরা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেয়। এই যোগে মানসিক অশান্তি ও মিথ্যা বদনাম হয়। এই যোগের ব্যাক্তিদের মৃত্যুর পরে মানুষ খুব গুণগান করে।
আপনার কোষ্ঠীতে কালসর্প যোগ থাকলেই যে সব সময় অশুভ ঘটনা ঘটবে তা কিন্তু নয়। কিছু শুভ গ্রহের বা শুভ ভাবের দৃষ্টি অথবা প্রেক্ষা পেলে অশুভ ভাব কিছুটা কাটবে।

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

আর্থিক অনটনের শাস্ত্রসম্মত সমাধান


আমরা অনেকেই অনেক সময় আর্থিক অনটনে কাটাই, আয় ঠিক নয়, কোনওভাবেই সংসার চালাতে পারছি না, আবার আয় হলেও ব্যয় বেশী হয়ে যাচ্ছে এমনকি সঞ্চয়েও হাত পড়ে যাচ্ছে, এমন কি আমরা ভেবেও কুল পাচ্ছি না, হিন্দু শাস্ত্রমতে আমাদের কিছু কু-অভ্যাস এবং শাস্ত্র সম্পর্কে অজ্ঞতাই আমাদের এই অবস্থার জন্য দায়ী। আসুন, জেনে নিই এবং শাস্ত্রসম্মত ভাবে সংশোধন করি নিজেদের ------
ক => বাথরুম নোংরা করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং বাথরুম ব্যবহার করার পরে জলে ভিজে থাকা মেঝেও মুছে ফেলা দরকার।
খ => দুপুর ও রাত্রে খাবার সময় খাবার নষ্ট করাটা উচিত নয়, তেমনই খাওয়া-খাওয়ার পরে অতি দ্রুত প্লেট ধুয়ে নির্দিষ্ট স্থানে রাখা উচিত বলেও শাস্ত্রে বর্ণিত আছে।
গ => সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানা গুছিয়ে রাখতে হবে।
ঘ => বহু মানুষই অনেক রাত করে ঘুমোতে যান। এতে দুর্ভাগ্যকে আহ্বান করা হয়।
ঙ => যত্রতত্র থুতু ফেলে আশপাশের জায়গা নোংরা করলে লক্ষ্ণী রুষ্ট হন।
চ => শাস্ত্রমতে সূর্যাস্তের পরে ঘর মোছা বা ঘর ঝাড়ার অর্থ নিজের সৌভাগ্যকে মুছে ফেলা বলে দাবি করা হয়েছে শাস্ত্রে।
ছ => বাড়ীর পয়ঃপ্রণালী বা ড্রেণ ঢেকে রাখতে হয়।
জ => শাস্ত্রমতে উত্তরদিকে দেবতাদের বাস এবং সেখানে ধনসম্পত্তি থাকে। এই দিকটি খোলা ও পরিস্কার রাখা উচিৎ।
ঝ => বহু মানুষই ঘরের জানলা দিনের পর দিন খোলেন না। শাস্ত্রমতে এটা দুর্ভাগ্যের লক্ষণ।
ঞ => ঘরের সমস্ত ঘড়ি যেন ঠিকমতো কাজ করে তা নজরে রাখা উচিত। নচেৎ, সৌভাগ্য তো আসবেই না, বরং নেমে আসবে দুর্ভাগ্য।
ট => বাড়িতে যেন কিছুতেই কোনও পায়রার বাসা না থাকে। পায়রার বাসা আর্থিক অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের মূল হিসেবে কাজ করে।
ঠ => বাড়িতে মৌচাক থাকার অর্থ, দারিদ্র্য ও দুর্ভাগ্যকে টেনে আনা। কাজেই বাড়িতে মৌচাক থাকলে তা ভেঙে ফেলুন।
ড => মাড়সার জাল শুধু যে ঘর নোংরা করে তা-ই নয়, এটি সাংসারিক জীবনে টেনে আনে দুর্ভাগ্যও।
ঢ => বাড়ির দেওয়াল যদি চটা ওঠা, ভাঙা চোরা কিংবা ফাটল ধরা তবে, বাস্তু মতে, তা ভাগ্যে কুপ্রভাব ফেলে।
ণ => বাড়ির কোনও কল থেকে জল ক্রমাগত টুপ টুপ করে জল চুঁইয়ে পড়লে শুধু যে তা বাড়িতে নেতিবাচক শক্তি টেনে আনছে তা-ই নয়, আপনার বাড়ির ভিতরকার ইতিবাচক শক্তিকেও হ্রাস করছে।
ত = > বাড়ির কোনও বৈদ্যুতিক তার আলগা হয়ে দেওয়াল থেকে ঝোলা, কিংবা কোনও বৈদ্যুতিক যন্ত্রে লুজ কানেকশনের সমস্যা দুর্ভাগ্যের কারণ হতে পারে।
থ => বাড়ীতে কোনও ক্যাকটাস বা কাঁটাগাছ রাখা বা তা দিয়ে ঘর সাজানো ঐ বাড়ীর কিছু মানুষের মনে অবসাদ আনতে পারে।


Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

মহেশ্বর

দেবাদিদেব মহাদেব শিব যুগ-যুগান্তর ধরে সনাতন ধর্মের সাধনপীঠে বিরাজিত রয়েছেন। তিনিই সহস্রাধিক দিব্য নামে নিত্য বন্দিত হন আসমুদ্র হিমাচলের শত সহস্র দেবালয়ে ও ভক্তদের হৃদয়মন্দিরে। সনাতন হিন্দু ধর্ম একেশ্বরবাদী হলেও সত্যদ্রষ্টা মুনিঋষিগণ তাঁদের হৃদয়বেদিতে অভিষিক্ত করেছেন বিভিন্ন সাকার বিগ্রহে কিংবা লিঙ্গমূর্তিতে। উপনিষদে তাঁকে বলা হয়েছে ‘শান্তং শিবং অদ্বৈতম্‌’ অর্থাৎ নির্বিকার অদ্বিতীয় শিব চৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মা) রূপে, আবার সশক্তিকে প্রকাশে বর্ণিত করা হয়েছে, ‘তমীশ্বরানাং পরমং মহেশ্বরং, তং দেবতানাং পরমং চ দৈবতম্‌’’ পরমদেবতারূপে। প্রকৃতপক্ষে ‘শিব’ শব্দটি হল পরমমঙ্গলের পরিচায়ক। তিনিই আবার সর্বসংহারকারী ধ্বংসের দেবতা রুদ্ররূপেও বন্দিত হয়েছেন বেদ-উপনিষদে।

শিবের এক হাজার আট নামের মধ্যে রুদ্র নামটি বিশেষ নিরিখে মানুষই অভিহিত করেছে। মানুষ যখন বাঁচার তাগিদে অরণ্যে বা পার্বত্য অঞ্চলে দাবানল, নদীতটে বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, কিংবা সমতলে অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে মোকাবিলা করত, সেই ভয় ও ত্রাসের মধ্যে তাদের মনে প্রকটিত হয়েছে এক সংহারকারী সর্বশক্তিমান মহামানবের অস্তিত্বের বোধ। সেই অভিজ্ঞতার নিরিখেই মানুষ তাঁকে অভিহিত করেছে ‘রুদ্র’ নামে।

যজুর্বেদের মহীধর ভাষ্যে আছে, ‘‘যিনি সত্যনিষ্ঠকে জ্ঞানদান করেন, কিন্তু পাপীগণকে দুঃখভোগের মাধ্যমে ক্রন্দন করান, তিনিই রুদ্র।’’ রবণং রুৎ জ্ঞানং... রোদয়তি রুদ্রঃ’’। মানুষ তখনই বিশেষ অনুভূতি দ্বারা প্রত্যক্ষ করেছে, অলক্ষ্যে বিরাজমান এক নিষ্ঠুর ভয়ংকর দেবতাকে। যাকে তুষ্ট করলে আধিদৈবিক দুর্যোগগুলি থেকে রক্ষা পাওয়া হয়তো সম্ভব হত। কিন্তু চেতনার ক্রমবিকাশে, পরিণত মননে ক্রমে তাঁরা অনুভব করেছে এই অদৃশ্য সত্তার আর একটি পরিচয়ও আছে। ধ্বংসেরই অদৃষ্ট নিয়ন্তার কর্মধারার বাহ্যিক প্রকাশের অন্তরালেই রয়েছে নতুন সৃষ্টির উদ্বোধন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ ধ্বংসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সৃষ্টির বীজ।

প্রলয়ান্তে যে নবীন সৃষ্টির ধারা, সেটি তো ধ্বংসের মধ্য দিয়েই উন্মিষিত হয়। সুতরাং, ধ্বংস ও সৃষ্টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রলয়ের উৎস যিনি, সৃষ্টির উৎসও অলক্ষ্যে অবশ্যই তিনি। তাই পালনও তাঁর দ্বারাই হয়ে থাকে। কারণ সৃষ্ট বস্তু মাত্রই যেমন আপাতভাবে তাঁর দ্বারাই পালিত হচ্ছে, তেমনই প্রকৃতপক্ষে সময়ের মাত্রা ধরে সেটিও ধ্বংসের দিকেই ক্রমশ এগিয়ে যায়। কোনও বস্তু সৃষ্ট হলেও তার ক্ষয় হওয়াটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। তাই সৃষ্টিকর্তা, পালন কর্তা ও লয়কর্তাকে আলাদা করা যায় না। তাই তাঁর রূপের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ব্রহ্মা বিষ্ণু ও মহেশ্বর।

মহাভারতে যেমন তাঁর সৌম্য শান্তরূপের বর্ণনা আছে, তেমনই আছে উগ্ররূপেরও। সৌম্যরূপের বর্ণনায় আছে, তিনি চন্দ্রশোভিত জটাযুক্ত প্রসন্নবদন, মৃগচর্মে বস্ত্রাবৃত অভয়প্রদানকারী। কথিত আছে রুদ্রের এই উগ্ররূপটি দেখেছিলেন একমাত্র অশ্বত্থামা। গভীর রাতে ঘুমন্ত পঞ্চপাণ্ডবকে হত্যা করার জন্য তিনি যখন পাণ্ডবদের শিবিরদ্বারে কাপুরুষের মতো উপস্থিত হয়েছিলেন তখন তিনি এক অতিকায় ভয়ানক দেবমূর্তিকে দণ্ডায়মান দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলেন। সেই অতিকায় তীব্র দীপ্তি-সমন্বিত পুরুষের পরিধানে ছিল রক্তাক্ত ব্যাঘ্রচর্ম, কৃষ্ণাজিন ও কণ্ঠে নাগোপবীত। তাঁর দেহাঙ্গ অগ্নিমুখ সর্প দ্বারা বেষ্টিত ছিল। মহাভারতে বলা হয়েছে, বিগ্রহ নির্মাণ করেই অশ্বত্থামা শিব পূজা করতেন। সুতরাং মহাভারতীয় যুগ থেকেই মূর্তি গড়ে শিবপুজোর প্রচলন ছিল। অশ্বত্থামার পূজিত শিববিগ্রহ হলেন ‘পঞ্চানন’।
সাকাররূপে শিবের পঞ্চানন বিগ্রহের ধ্যানমন্ত্রে আছে, ‘‘পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রং’’। শিবের এই পাঁচটি মুখের নাম উল্লিখিত রয়েছে তৈত্তিরীয় আরণ্যকে। এই নামগুলি হল—সদ্যোজাত, বামদেব, অঘোর, তৎপুরুষ ও ঈশান। নির্বাণতন্ত্রের মতে, ‘সদ্যোজাত’ মুখটি শুদ্ধ স্ফটিকের মতো শুক্লবর্ণ—সেটি পশ্চিমে, ‘বামদেব’ পীতবর্ণ সৌম্য মনোহর—সেটি উত্তরে, ‘অঘোর’ কৃষ্ণবর্ণ ভয়ংকর—সেটি দক্ষিণে; ‘তৎপুরুষ’ রক্তবর্ণ দিব্য মনোরম—সেটি পূর্বে; এবং ‘ঈশান’ শ্যামল সর্বদেব-স্বরূপ শিব সেটি ঊর্ধ্বে। কথিত আছে, শিবের এই পঞ্চমুখ থেকেই ২৮টি আগম (তন্ত্র) রচিত হয়েছে।

কুলার্ণবতন্ত্রে বলা হয়েছে, স্বয়ং শিবের পঞ্চমুখ থেকে ‘পঞ্চ আম্নায়’ [চতুর্বেদ ও আয়ুর্বেদ (ভেষজ বিদ্যা)] প্রকাশিত হয়েছে। কালক্রমে অগ্নি ও ডমরুধারী প্রলয়নৃত্যরত নটরাজরূপী শিবের অভিব্যক্তিকে আশ্রয় করে বিকশিত হয়েছে নান্দনিক শিল্পের বহুমুখী প্রসার। বস্তুত ভারতীয় সংস্কৃতিতে নৃত্য, গীত ও বাদ্যচর্চার সুমহান ঐতিহ্যের মূলে রয়েছে শৈব-সংস্কৃতির ভূমিকা।
শুধু পঞ্চানন, রুদ্র বা শিবরূপেই নয়, বিভিন্ন মূর্তিতে এবং বিভিন্ন নামে যুগ যুগ ধরে তিনি আরাধিত। কিন্তু তাঁর যে প্রতীকী রূপটি পুরাকাল থেকে মহাপূজ্যরূপে সমাদূত, সেটি হল তাঁর লিঙ্গরূপ। শাস্ত্রবচনে লিঙ্গের সংজ্ঞায় আছে—‘‘লীয়তে গম্যতে যত্র যেন সর্বং চরাচরম্‌। তদেব লিঙ্গং ইত্যুক্তং লিঙ্গ তত্ত্ব পরায়ণৈঃ।।’’ অর্থাৎ, নিখিল বিশ্ব চরাচর যাঁকে আশ্রয় করে উদ্ভূত হয়ে ক্রিয়াশীল হয় এবং শেষে যাঁর মধ্যে লীন হয়ে যায় সেই অস্তিত্বই ‘লিঙ্গ’। আবার ‘‘যস্মিন সর্বাণি ভূতানি লীয়ন্তে বুদ্বুদাইব।’’ সমুদ্রে যেমন উত্তাল ঢেউয়ে বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়ে পরক্ষণেই আবার সেখানেই লয় প্রাপ্ত হয়, তেমনই সবই ব্যাপ্তিস্বরূপ শিব-অস্তিত্বের মধ্যেই উৎপন্ন হয়ে আবার সেইখানেই লয়প্রাপ্ত হয়। তাই সর্বভূতের সৃষ্টি ও লয়স্থানরূপে লিঙ্গপ্রতীকে শিব আরাধিত হন।

প্রধানত দুই রূপে শিবলিঙ্গের প্রকাশ ঘটে থাকে। প্রথমটি প্রকৃতিজাত ‘স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ’ যা পৃথিবীর ভূমি ভেদ করে উত্থিত। অপরটি মনুষ্য দ্বারা নির্মিত ধাতব, প্রস্তর কিংবা মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্ট লিঙ্গ। এই দুটি ছাড়াও বাণলিঙ্গ এবং পঞ্চভূতাত্মক লিঙ্গ আছে; তেমন ক্ষিতিলিঙ্গ (শর্ব), জললিঙ্গ (ভব), অগ্নিলিঙ্গ (রুদ্র), বায়ুলিঙ্গ (উগ্র) ও আকাশলিঙ্গ (ভীম)। প্রতিটি শিবলিঙ্গেরই একটি পীঠিকা বা ‘আসন’ থাকে। স্কন্দপুরাণে আছে, -- ‘‘আকাশং লিঙ্গ নিত্যাহুঃ। পৃথিবী তস্য পীঠিকা।’’ অর্থাৎ আকাশও একটি লিঙ্গ যার পীঠিকা পৃথিবীই। বস্তুত স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ মাত্রেরই আসন বা পীঠিকা এই পৃথিবী। মানুষের দ্বারা নির্মিত লিঙ্গগুলির পীঠ উত্তরমুখী করে স্থাপিত হয়। এই পীঠিকাকে গৌরীপীঠ বা গৌরীপট্টও বলা হয়। এই পঞ্চতত্ত্ব লিঙ্গ অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ্‌, তেজ, মরুৎ, ব্যোম এই পঞ্চভূতের নামে পাঁচটি শিবলিঙ্গ দক্ষিণ ভারতের পাঁচটি তীর্থে আছে।

ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠেও পঞ্চতত্ত্বের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ঠাকুরের কথায়, অখণ্ড তত্ত্ব যদি হন অগ্নি, তাহলে আলো হল তাঁর চৈতন্য আর দহনক্ষমতা হল তাঁর শক্তি। তিনি যদি হন সাগর, তবে জল হল তাঁর চৈতন্যস্বরূপ আর ঢেউরূপে প্রবহমানতা হল তাঁর শক্তি-পরিচয়। এই অখণ্ডসত্তা চৈতন্যরূপে যেমন সর্বশক্তিমান, তেমনই শক্তিরূপে চৈতন্যস্বরূপিণী। অর্থাৎ চৈতন্য ও শক্তি অভেদ। একক অদ্বিতীয় অখণ্ড সত্তার নিত্য স্থিতিশীল দিকটি যেমন ‘ব্রহ্মচৈতন্য’ বা শিবস্বরূপ, তেমনই নিত্যগতিশীল দিকটি ব্রহ্মশক্তি। এই হল অখণ্ড শক্তিব্রহ্মবাদ বা শিব-শক্তি তত্ত্বের মূলকথা।
আর ‘বাণলিঙ্গ’ হল ক্ষুদ্রাকার মসৃণগাত্রের শিলাপিণ্ড যা নর্মদা নদীতে পাওয়া যায়। শিবভক্ত বাণাসুরের নামে পরিচায়িত এই লিঙ্গ একাদশ প্রকারের হয়ে থাকে। এই বাণলিঙ্গগুলি প্রতিষ্ঠিত হয় তদুপযোগী আয়তনের ধাতব পীঠিকা নির্মাণ করে, যেটি শুধু পূজাকালেই ব্যবহার্য। এই প্রকৃতির বিস্ময় এই বাণলিঙ্গ সৃষ্টি হত ওঁকারেশ্বরের জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের অনতিদূরে নর্মদার কোলে ধাবরি কুণ্ডে। মামলেশ্বর বাঁধ নির্মাণের সময় এই প্রকৃতির বিস্ময় ধাবরি কুণ্ডটি বিনষ্ট হয়ে যায়। সেই থেকে বাণলিঙ্গের সৃষ্টি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আর মৃত্তিকানির্মিত শিবলিঙ্গ প্রতিবার পূজাকালে নির্মাণ করে পূজান্তে বিসর্জন দিয়ে দিতে হয়।

যে কোনও শিবলিঙ্গেরই তিনটি ভাগ থাকে। নিম্নাংশকে ‘ব্রহ্মা-পীঠ’, মধ্যেরটিকে ‘বিষ্ণু-পিঠ’ এবং উপরিভাগটিকে ‘শিব-পীঠ’ নামে পরিচিত। লিঙ্গরূপী মহাদেবকে কেন্দ্র করে চতুর্দিকের একশত হস্ত পরিমিত স্থানকে ‘শিবক্ষেত্র’ রূপে গণ্য করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভারতভূমির বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত স্বয়ম্ভূ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গকে বিশেষ ‘শিবক্ষেত্র’ রূপে মহাতীর্থ মর্যাদায় মান্য করা হয়। তার মধ্যে সমুদ্রতীরে দুটি (সোমনাথ, রামেশ্বর), নদীতীরে তিনটি (বিশ্বেশ্বর, ত্র্যম্ব঩কেশ্বর, মহাকাল), পর্বতে চারটি (কেদারনাথ, মল্লিকার্জুন, ওংকারেশ্বর বা অমলেশ্বর, ভীমাশঙ্কর) এবং সমতলে তিনটি (বৈদ্যনাথ, ঘৃষ্ণেশ্বর ও নাগেশ্বর) জ্যোতির্লিঙ্গ বিরাজমান। এছাড়াও হিমালয়ের গহনে রয়েছে পঞ্চকেদার শিব।

এই জগৎরূপটি দশাগতভাবে নিত্য পরিবর্তনশীল প্রকাশের হলেও এটির আধাররূপ চৈতন্যস্বরূপের কোনও পরিবর্তন নেই। জাগতিক প্রকাশগত ভাবে যে ভেদমূলক অনন্ত নামরূপ সবই সেই অরূপ সত্তারই অন্তর্গত আপেক্ষিক বিকাশপ্রবাহ। তিনিই এক এবং অদ্বিতীয়ম্‌। তিনিই আমাদের সৃষ্টি, রক্ষা, গড়ে তোলেন আবার প্রয়োজনে লয় করেন। তাঁর পুজোয় কোনও আড়ম্বর নেই। বেলপাতা, ধুতরো ফুল আর গঙ্গাজল। এতেই তিনি তুষ্ট।

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

আসুন, জেনে নিই - দেবীর আশা-যাওয়ার নেপথ্যে

বাংলা সন ১৪২৪ বা ইং সন ২০১৭........ এই বৎসর মহামায়ার আগমন নৌকায় - ফলম্ শস্যবৃদ্ধিস্তথাজলম্।।
মহামায়ার গমন - ঘোটক - ফলম্ - ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে।।
.

আসুন, জেনে নিই - দেবীর আশা-যাওয়ার নেপথ্যে
===================================
প্রতি বছর গজ, ঘোটক, নৌকা, দোলা এইসব যানবাহন করে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আসা ও যাওয়ার সময় শুভ, অশুভ, ক্ষয়ক্ষতি ও নানাভাবে মানুষের মৃত্যুসংবাদও শোনা যায়। পুরাকালের মুনি, ঋষি ও পণ্ডিতেরাও একসময় ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছিলেন, মায়ের আগমন ও গমন এবং পুজোর সময়ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মৃত্যু, ধ্বংস-এই সমস্ত অশুভ ঘটনার কারণ কী? তাঁরা আরও ভেবেছিলেন যে, শুভ ঘটনার চেয়ে অশুভ ঘটনার প্রাধান্যই বা কেন থাকে, তাছাড়াও দেব-দেবীরা এই ব্যাপারে নীরব কেন --- ভাবনা চিন্তার পর তাঁরা ঠিক করলেন, পুজোর আগে, পুজোর সময় ও দুর্গার গমনের সময় সজাগ দৃষ্টি রাখবেন। 

যথাসময়ে তাঁদের দিব্যদৃষ্টিতে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে সবকিছু। ঘটনার গতি-প্রকৃতির অর্থাৎ দেবীর আগমন, গমন ও পুজোর সময় যে সব ঘটনা ঘটছে তা উপলব্ধি করে পারস্পরিক আলোচনায় দিন, তিথি ও নক্ষত্রের দিকে সন্দেহের আঙুল তুলে তাদের দোষী সাব্যস্ত করলেন। কিন্তু তাঁদের একথাও মনে হলো যে, এই তিথি, নক্ষত্র ও দিন এত শক্তি কোথা থেকে পেলো। আবার চলল অনুসন্ধান। এবার তাঁরা জানতে পারলেন যে, দেব-দেবীরাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখার জন্যেই এই সব তিথি-নক্ষত্রকে বিশেষভাবে শক্তিশালী করে তাঁদের পাহারাদারে নিযুক্ত করেছিলেন।
দেব-দেবীর দাপট বা শক্তি যতই থাকুক না কেন, দিন, তিথি ও নক্ষত্রের কর্তৃত্বকে এঁরা কেউই অস্বীকার করতে পারেননি কারণ এই তিন শক্তিকে তো দেবতারাই সৃষ্টি করেছেন।

আসলে শিল্প ও বাণিজ্য সংস্থার মতো দেব-দেবীরাও হিসেবের খাতায় সমতা রাখার জন্যে সৃষ্টি ও লয় এই দুটো অঙ্ককে মাথায় রেখেছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন, সৃষ্টিপ্রাপ্তদের সংখ্যাকে ক্রমশই বাড়তে দিলে, মহাপ্রলয়ের সূচনা হবে, তাই ধ্বংসের প্রয়োজন আছে। লয়কে সৃষ্টি করার জন্যে বন্যা, ভূমিকম্প, মহামারি ইত্যাদির দ্বারা তাকে শক্তিশালীও করা হয়েছিল। অবশ্য দেবর্ষি নারদের কাছ থেকে এই সংবাদ পেয়ে, মুনি-ঋষি ও পণ্ডিতেরা বুঝেছিলেন দুর্গতিনাশিনী দেবী প্রয়োজনবোধে কেন ধ্বংসকারিণী রূপে আবির্ভূতা হন। এই সমস্ত প্রকৃত তথ্য উন্মোচন হবার পর, মুনি-ঋষি ও পণ্ডিতেরা বিষয়টাকে বিধিবাক্য ও শাস্ত্রমতে চিহ্নিত করেছিলেন। অর্থাৎ দুর্গার আগমন ও গমনে যে বিপর্যয় ঘটে, সেই নিয়ে তাঁদের মনে আর সংশয় রইল না বলে আদি অনন্তকাল ধরে সেই নিয়মই চলে আসছে। জ্যেতিষীরা এই ব্যাপারটিকে ‘সিম্বলিক, বা প্রতীকি রূপে ব্যাখ্যা করেছেন। ভাগ্যগণনার সময় মানুষের ভাগ্যচক্রে তিথি, নক্ষত্র, দিন ও জন্মসময় ইত্যাদির বিষয়ে লক্ষ্য রেখে তাঁরা মানুষের জীবনে শুভ, অশুভ, শোক, দুঃখ ও আনন্দের ব্যাপারটাকে মেনে নিয়েছেন। তাই জন্মসময়, দিন ও গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির ওপর তাকিয়েই জ্যোতিষীরা কোষ্ঠী বিচার ও হাতে প্রতীকি ও অন্যান্য চিহ্ন দেখেই সার্বিক ভাগ্যচক্রের উত্থান, পতন, আয়ু, স্বাস্থ্য ইত্যাদির কথা বিচার করে থাকেন।

পৌরাণিক যুগে গজ, ঘোটক, নৌকো এবং দোলার ব্যবহার আমরা জেনেছি এবং পুরাকালেও মানুষ এই যানবাহনই প্রয়োজনবোধে কাজে লাগাতেন। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, চার যানবাহনের মধ্যে গজকেই বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়ে শুভ যাত্রার প্রতীক বলে চিহ্নিত করা হলো কেন।

আসলে পৌরাণিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত দেখা গেছে যে, গজ গোড়া থেকেই বিশেষ সম্মানীয় জায়গায় নিজের স্থান করে নিয়েছে। দেব-দেবী ছাড়াও রাজা, মহারাজা, জমিদারদের কাছেও “গজ” রাজকীয় মর্যাদা পেয়েছে। হয়তো তাই দেবী দুর্গার গজে আগমন ও গমনকে কেন্দ্র করে বলা হয়েছে-“গজে চ জলদা দেবী শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা।” অর্থাৎ এই আগমন ও গমনে বসুন্ধরা শস্যপূর্ণ হয়ে মানুষকে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্যে ভরিয়ে তুলবে। 

অন্যদিকে ঘোটক দেব-দেবী ও মানুষের কাজে ব্যবহৃত হলেও গজের মতো মর্যাদা না দিয়ে ঘোটকে মায়ের আগমন ও গমন নিয়ে বলা হয়েছে-“ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে”। অর্থাৎ ঘোটকে আগমন ও গমনে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংসারিক ক্ষেত্রেও অস্থিরতা প্রকাশ পাবে। যেমন, রাজনৈতিক উত্থান, পতন, সামাজিক স্তরে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ, দুর্ঘটনা, অপমৃত্যু ইত্যাদির প্রভাব বাড়বে। আবার নৌকায় আগমন ও গমনে বলা হয়েছে শস্যবৃদ্ধিস্তুথাজলম। এ ক্ষেত্রে প্রবল বন্যা, ঝড়, অতিবৃষ্টি ইত্যাদির জন্যে একদিকে প্লাবন ও ক্ষয়ক্ষতি এবং অন্যদিকে দ্বিগুণ শস্যবৃদ্ধি। এর মধ্যে ‘দোলায়’ আগমন ও গমন সবচেয়ে অশুভ। তাই দোলা সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, দোলায়াং মরকং ভবেৎ। মহামারি, ভূমিকম্প, যুদ্ধ, মন্বন্তর, খরা ইত্যাদির প্রভাবে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু তো ঘটাবেই, আবার সেই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতিও হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, একমাত্র গজ ছাড়া দেবী দুর্গার অন্য তিন যানবাহনের মাধ্যমে ধ্বংস বা লয়কে ব্যবহার করা হয়েছে। শুধুমাত্র গজই প্রয়োজনমতো বৃষ্টিধারায় বসুন্ধরাকে ধন-ধান্যে সমৃদ্ধ করে তুলবে।

এই প্রসঙ্গে কোন দিনে আগমন ও গমনে কি যানবাবন ব্যবহার করা হবে সেই ব্যাপারে বলা হয়েছে-“রবৌ চন্দ্রে গজারূঢ়া, ঘোটকে শনি ভৌময়োঃ, গুরৌ শুক্রে চ দোলায়াং নৌকায়াং বুধবাসরে।” সপ্তমীর দিনে যদি রবিবার এবং সোমবার হয়, তাহলে দুর্গার আগমন ও গমন হবে গজে। ফল-“গজে চ জলদা দেবী শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা”। 
ঠিক এই রকমই শনিবার ও মঙ্গলবারে দুর্গার আগমন ও গমন হলে, ঘোটকের প্রভাব থাকবে। অর্থাৎ ফল-“ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে”। যদি বুধবারে দেবী দুর্গার আগমন ও গমন হয়, তাহলে তিনি আসবেন এবং যাবেন নৌকায়। ফল-“শস্যবৃদ্ধিস্তুথাজলম”। 

আবার দুর্গার আগমন ও গমন যদি বৃহস্পতি ও শুক্রবারে হয় তাহলে তিনি দোলায় আসবেন এবং যাবেন। ফল-“দোলায়াং মরকং ভবেৎ”।

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger