সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

”সনাতন ধর্ম” প্রাচীনতম ধর্ম কি না ?

প্রশ্নঃ ”সনাতন ধর্ম” প্রাচীনতম ধর্ম কি না?

উত্তরঃ বৈদিক শাস্ত্রসমূহ কোন সংকীর্ণমনা হিন্দু শাস্ত্র নয়, যা সাধারণত ভুলবশত ধারণা করা হয়। বৈদিক শাস্ত্রসমূহ স্মরণতীত কাল থেকে সমস্ত মানব জাতির জন্য লিখিত হয়েছে যেখানে “হিন্দু” শব্দটি এসেছে মাত্র কয়েক শতক পূর্বে। যখন মুসলিমগণ ভারতবর্ষ বিজয় করে, তখন থেকে তারা বৈদিক সংস্কৃতি অনুসরণকারীদের “সিন্দু” নামে ডাকা শুরু করে। কেননা তারা সিন্দু নদের তীরে বসবাস করতেন। 

যাই হোক, ‘সিন্ধু নামে প্রথম অক্ষর ‘স’ উচ্চারণ তাদের কাছে কষ্টকর হওয়ায়, তারা ভুলক্রমে এক ‘হিন্দু’ নামে পরিচিত এবং বৈদিক ধর্ম ‘হিন্দুত্বরাদ’ হিসেবে পরিচিত যদিও তারা নিজেরাই এই শব্দটি ব্যবহার করেন না। তাই বৈদিক শাস্ত্রে ‘হিন্দু’ নামে কোন কিছুর উল্লখ নেই, এমনকি বৈদিক অভিধানে হিন্দু শব্দটি পাওয়া যায় না। বৈদিক শাস্ত্র শিক্ষার উপযুক্ত পদ্ধতি যা স্বয়ং শাস্ত্রগুলোতে লিপিবদ্ধ আছে, তা হল “সনাতন ধর্ম” শাশ্বত এবং সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধর্ম যেটি কোন সময়, স্থান এবং অবস্থার প্রেক্ষিতে সীমিত নয়। 

সকল দিক থেকে সব রকমের আক্রমন হওয়া সত্ত্বেও সনাতন ধর্ম এখনো শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যদি পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস দেখি, তবে দেখব ইসলামের আবির্ভাব প্রয় ১৪০০ বছর পূর্বে। খ্রীষ্টীয় ধারা এসেছে প্রায় ২০০০ বছর পূর্বে এবং বৌদ্ধত্ববাদ এসেছে প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে। 

যদিও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবদগীতা বলেছিলেন ৫০০০ বছর পূর্বে কিন্তু তিনে স্বয়ং গীতাতে ব্যাখ্যা করেছিলেন, “আমি পূর্বে সূর্যদেব বিবস্বানকে এই অব্যয় নিষ্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞানযোগ বলেছিলাম। বিবস্বান তা মানবজাতির পিতা মনুকে বলেছিলেন এবং মনু তা ইক্ষাকুকে বলেছিলেন..... সেই সনাতন
যোগ আজ আমি তোমাকে বললাম, কারণ তুমি আমার ভক্ত ও সখা এবং তাই তুমি এই বিজ্ঞানের অতি গূঢ় রহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে।”

(শ্রীমদ্ভগবদগীতা ৪/১-৩)

সনাতন ধর্ম-প্রাচীনতম ধর্ম ও বিভিন্ন ধর্ম সমূহঃ-

সনাতন ধর্ম-সৃষ্টির শুরু থেকে চলে আসছে------

অর্জুনের নিকট ভগবদগীতা উপদেশ-৫০০০ বছর। বৌদ্ধ ধর্ম - ২৫০০ বছর।

খ্রীষ্টান ধর্ম - ২০০০ বছর।

ইসলাম ধর্ম - ১৪০০ বছর।

আমরা যদি মনে করি, মনুর জন্মের আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিবস্বানকে ভগবদগীতার জ্ঞান দান করেছিলেন, তা হলেও গীতা বলা হয় কমপক্ষে ১২ কোটি ৪০ লক্ষ বছর পূর্বে এরং মানব সমাজে এই জ্ঞান প্রায় ২ মিলিয়ন বছর ধরে বর্তমান । পাঁচ হাজার বছর আগে ভগবান এই জ্ঞান পুনরায় অর্জুনকে দান করে। গীতার বক্তা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বর্ণনা অনুযায়ী এই হচ্ছে গীতার ইতিহাস।

এই ভাবে, সবচেয়ে প্রাচীনতম ধর্ম হওয়ার জন্য সনাতন ( শাশ্বত) ধর্ম হচ্ছে অন্য সকল ধর্মের সূতিকাগার. বা বলা যায় সকল ধর্মের সুপার মার্কেট। এখানে বহু ধরণের ধর্মমত রয়েছে, কালের গতিতে চলমান বিশ্বমানব সভ্যতার নৈতিকভাবে হীন কিংবা আধ্যাত্মিকতার উন্নত - ভিন্ন ভিন্ন রুচির সকল মানুষের জন্যই সেগুলি মানানসই করে তৈরি।

Page: Sree Krishna - শ্রীকৃষ্ণ হতে
0 comments

আসুন শ্রীমদ্ভগবদ গীতা সম্পর্কে কিছু তথ্য জানি

১.শ্রীমদ্ভগবদ গীতা কি?
উ.ভগবান শ্রীকৃষ্ণনের অমৃত বাণী বা গান।
২.সংস্কৃতি ভাষায় গীতার অর্থ কি?
উ: গান।
৩.শ্রীমদ্ভগবত গীতির রচিয়তা কে?
উ:মহর্ষি ব্যাস দেব।
৪.শ্রীকৃষ্ণ গীতার জ্ঞান প্রথম কাকে দিয়েছিল?
উ:সূর্য্য দেব বিবস্বানকে।৪/১
৫.কত বছর আগে সূর্য্য দেব এই জ্ঞান পেল?
উ:এখন থেকে ১২,০৪,০০,০০০ আগে।
৬.সূর্য্য দেব পরে এই জ্ঞান কাকে দিয়েছিল?
উ:মানব জতির জনক মনুকে।
৭.এখন থেকে কত বছর আগে মনু পেয়েছে?
উ:আজ থেকে ২০,০০,০০০ বছর আগে।
৮.মনু এই গীতার জ্ঞান কাকে দিেয়ছিল?
উ: ইক্ষাকুকে।
৯.পুনরায় ভগবান শীকৃষ্ণ ঐই গীতার জ্ঞান কাকে দিয়েছিল?
উ:পান্ডু পুত্র অর্জুনকে।
১০.কত বছর আগে অর্জুন এই জ্ঞান লাভ করে?
উ:এখন থেকে প্রায় ৫,২০০ বছর আগে।
১১.মহাভারতের কোন অংশে এই গীতার জ্ঞান আছে?
উ:মহাভারতের ভীষ্মপর্বের ২৫-৪২ অধ্যায়ের।
১২.গীতাকে শপ্তশতী বলা হয় কেন?
উ:গীতায় ৭০০ শ্লোক আছে তাই।
১৩.গীতায় কয়টি শ্লোক আছে?
উ:শ্লোক সংখ্যা ৭০০ টি।
১৪.গীতায় কয়টি অধ্যায় অাছে?
উ: অধ্যায় সংখ্যা ১৮ টি
১৫.গীতার কয়টি নাম রয়েছে?
উ:১৮টি ১.গঙ্গা ২.গীতা ৩.সাবিত্রী ৪.সীতা ৫.সত্যা ৬.পতিব্রতা ৭.ব্রহ্মবিদ্যা ৮.ব্রহ্মাবলী ৯.ত্রিসন্ধ্যা ১০.মুক্তিগেহিনী১১.অর্ধমাত্রা ১২.চিতানন্দা ১৩.ভবগ্নী ১৪.ভ্রান্তিনাশিনী ১৫.বেদত্রয়ী ১৬.পরানন্দা ১৭.তত্ত্বার্থ ১৮জ্ঞানমঞ্জুরী
১৬.গীতায় কে কয়টি শ্লোক বলেছিল?
উ:ধৃতরাষ্ট ১টি,সঞ্জয় ৪০টি,অর্জুন ৮৫টি,শ্রীকৃষ্ণ ৫৭৪.
১৭.গীতা কোন ছন্দে রচিত?
উ:অনুষ্টুপ ছন্দে রচিত ,তবে কিছু শ্লোক ত্রিষ্টুপ ছন্দে রচিত।
১৮.অনুষ্টুপ ও ত্রিষ্টুপ শ্লোক সংখ্যা কত?
উ:অনুষ্টু শ্লোক সংখ্যা ৬৪৫টি,ত্রিষ্টুপশ্লোক সংখ্যা ৫৫টি।
১৯.অনুষ্টুপ ও ত্রিষ্টুপ ছন্দ কত অক্ষর বিশিষ্ট?
উ:অনুষ্টুপ ছন্দের প্রতিটি শ্লোক ৩২ অক্ষর বিশিষ্ট,ত্রিষ্টুপ ছন্দের প্রতিটি শ্লোক ৪৪ অক্ষর বিশিষ্ট
২০.গীতায় অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের কয়টি নাম উল্লেখ করা হয়েছে?
উ:অার্জুনের ২০টি নাম ও শকৃষ্ণের ৩৩টি নাম।
২১.গীতার ১-৬ অধ্যায়কে কি বলে?
উ:কর্ম ষটক
২২.গীতার ৭-১২ অধ্যায়বে কি বলে?
উ:ভক্তি ষটক।
২৩.গীতার ১৩-১৮ অধ্যায়কে কি বলে?
উ: জ্ঞান ষটক।
২৪.শ্রীকৃষ্ণ এই গীতার জ্ঞান কত দিন দিয়েছিল?
উ:যুদ্ধের মাঝখানে ১৮ দিনে।
২৫.শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই জ্ঞান কত মিনিটে প্রদান করেছিল?
উ: মাত্র ৪০ মিনিটে।
২৬.কোন গ্রন্থকে পঞ্চম বেদ বলা হয়?
উ:শ্রীমদ্ভগবদ গীতা।
২৭.কোন অধ্যায়কে গীতার সারসংক্ষেপ বলা হয়?
উ:২য় অধ্যায়কে।
২৮.কোন গ্রন্থকে সকল ধর্মীয় গ্রন্থের সার সংক্ষেপ বলা হয়?
উ:গীতা।
২৯.মানুষের সকল পাপ কিভাবে নষ্ট হয়?
উ:গীতা পড়ে ও গীতার জ্ঞান কাজে লাগিয়ে।
৩০.শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কিভাবে পূজা করতে বলেছেন?
উ:ভক্তি সহকারে পত্র,পুষ্প,ফল,জল অর্পনের মাধ্যমে।৯/২৬
৩১.অর্জুন কখন বুঝতে পারলেন শ্রীকৃষ্ণ ভগবান বা পরমেশ্বর ?
উ: ১১অধ্যায়ের বিশ্বরুপ-দর্শনযোগের মাধ্যমে।
৩২.শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কার উপাসনা ও আশ্রয় নিতে বলেছে?
উ: ১২অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাকার উপাসনা ও আশ্রয় নিতে বলেছেন।
লেখার মাধ্যমে যদি কোন ভূল হয় সবাই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
হরে কৃষ্ণ।
সংগৃহীতঃ
0 comments

দ্বাদশ পদাবলী

আমরা যারা সনাতন বা বৈদিক ধর্মাবলম্বী, তাদের কাছে শ্রীমদ্ভগবদ গীতা একখানি পবিত্র গ্রন্থ। এ শুধু গ্রন্থ বললে ভুল হবে, গীতা মানব জীবনের দিকনির্দেশনা প্রদান সহ সকল শাস্ত্রের আধার। এই পূণ্য গ্রন্থ পাঠের পুর্বে আমরা একটি শ্লোক বা স্তোত্র পাঠ করে থাকি।
"ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়!!"
এই শ্লোকে আছে বারটি বর্ণ।যা হলো, ওঁ, ন, মো, ভ, গ, ব, তে, বা, সু, দে, বা, য়। এই বারটি বর্ণ নিয়ে রচিত হয়েছে বারটি পদাবলী। যা সবার জানার জন্য পোস্ট করলাম। আশাকরি সবার ভাল লাগবে।
.
ওঁ-
বীজেতে ব্রহ্মা বিষ্ণু শিবকে বোঝায়,
রাগদ্বেষাদি যার কৃপায় জয় করা যায়!
রোগে শোকে কাল নিদ্রায় মোরা হই মগন,
দয়াকরে রক্ষা করো হে মধুসূদন!!
.
ন-
নমি তব শ্রীপদেতে নিলাম শ্মরণ,
অনাশ্রয়ে অনাথের রক্ষো হে মধুসূদন!!
.
মো-
মোহ মায়ায় স্ত্রীসন্তানে সদা নিমগন,
তৃষ্ণা নিবারণ করো হে মধুসূদন!!
.
ভ-
ভক্তিহীন শোকে তাপে রত অনুক্ষণ,
পাপ হতে রক্ষা করো হে মধুসূদন!!
.
গ-
গতাগতি বারংবার করো নিবারণ,
জন্মমৃত্যু রহিত করো হে মধুসূদন!!
.
ব-
বহুগামীর বহু যোনী করেছি ভ্রমণ,
গর্ভদুঃখ হতে রক্ষো হে মধুসূদন!!
.
তে-
তেমনি ভোগ করতে হয় কর্ম যেমন,
সংসার মায়ায় রক্ষো হে মধুসুদণ!!
.
বা-
বাক্য দিয়েছিলাম তোমা করিব সাধন,
মায়ামোহে তা' ভুলিলাম হে মধুসুদণ!!
.
সু-
সুকর্ম করিনি আমি আমার এ জীবন,
দুঃখার্ণবে রক্ষা করো হে মধুসুদণ!!
.
দে-
দেহান্তর ছিলাম কতো নাই তা স্মরণ,
জন্মমৃত্যু বন্ধ করো হে মধুসুদণ!!
.
বা-
বাসুদেবে যেনো আমি স্মরি চিরন্তন,
জরাব্যাধি মৃত্যু হতে রক্ষো মধুসুদণ!!
.
য়-
যথা যথা জন্ম আমি করি হে ধারণ,
তব পদে অচলাবস্থা ভক্তি দাও মধুসুদণ!!
.
হে পরমকরুনাময়, সচ্চিদানন্দ ভগবান
শ্রীকৃষ্ণ, তোমার সৃষ্টির সকল কিছুই তুমি রক্ষা করো প্রভু। সবার মঙ্গল আর কল্যাণ করো প্রভু দয়াময়।(দেবেন্দ্র)
!!হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম
রাম রাম হরে হরে!!
!!জয় শ্রীমধুসুদণ!!জয় রাধে!!

"কৃষ্ণ কথা" 
0 comments

সবাই বলে কেন একাদশী থাকবো? না থাকলে কি হবে?

আসুন দেখি আমাদের শাস্ত্রে একাদশী নিয়ে কি বলা আছে:

পদ্মপূরাণে একাদশী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। একসময় জৈমিনি ঋষি তাঁর গুরুদেব মহর্ষি ব্যাসদেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে গুরুদেব! একাদশী কি? একাদশীতে কেন উপবাস করতে হয়?একাদশী ব্রত করলে কি লাভ? একাদশী ব্রত না করলে কি ক্ষতি?এ সব বিষয়ে আপনি দয়া করে বলুন।মহর্ষি ব্যাসদেব তখন বলতেলাগলেন-সৃষ্টির প্রারম্ভে পরমেশ্বরভগবান এই জড় সংসারে স্হাবরজঙ্গম সৃষ্টি করলেন।মর্ত্যলোকবাসী মানূষদের শাসনেরজন্য একটি পাপপুরুষ নির্মাণ করলেনা।

সেই পাপপুরুষের অঙ্গণ্ডলি বিভিন্নপাপ দিয়ে নির্মিত হল। পাপপুরুষের মাথাটিব্রহ্মহত্যা পাপ দিয়ে, চক্ষুদুটি মদ্যপান,মুখ স্বর্ণ অপহরণ, দুই কর্ণ-ণ্ডরুপত্নীগমন,দুই নাসিকা-স্ত্রীহত্যা, দুই বাছ-গোহত্যা পাপ,গ্রীবা-ধন অপহরণ, গলদেশ-ভ্রুণহত্যা,বক্ষ-পরস্ত্রী-গমন, উদর-আত্মীয়স্বজন বধ,নাভি-;শরণাগতবধ, কোমর-আত্মশ্লাঘা,দুই ঊরু-ণ্ডরুনিন্দা, শিশ্ন-কন্যা বিক্রি,মলদ্বার-ণ্ডপ্তকথা প্রকাশ পাপ,দুই পা-পিতৃহত্যা, শরীরের রোম-সমস্ত উপপাতক।

এভাবে বিভিন্ন সমস্ত পাপ দ্বারা ভয়ঙ্কর পাপপুরুষ নির্মিত হল।পাপপুরুষের ভয়ঙ্কর রূপ দর্শন করে ভগবানশ্রীবিষ্ণুমর্ত্যের মানব জাতির দুক্ষ মোচনকরবার কথা চিন্তা করতে লাগলেন।একদিন গকড়ের পিঠে চড়ে ভগবানচললেন যমরা জের, মন্দিরে। ভগবানকে যমরাজউপযুক্ত স্বর্ণ সিদুহাসনে বসিয়ে পাদ্য অর্ঘ্যইত্যাদি দিয়ে যথাবিধি তাঁর পূজা করলেন।যমরাজের সঙ্গে কথোপকথনকালে ভগবানশুনতে পেলেন দক্ষিণ দিক থেকে অসংখ্যজীবের আর্তক্রন্দন ধ্বনি। প্রশ্ন করলেন-এ আর্তক্রন্দন কেন?

যমরাজ বললেন, হে প্রভু, মর্ত্যের ,পাপীমানূষেরা নিজ কর্মদোষে নরকযন্ত্রনাভোগ করছে। সেই যাতনার আর্তচীৎকার শোনা যাচ্ছে।যন্ত্রণাকাতর পাপাচারী জীবদের দর্শনকরে করুণাময় ভগবান চিন্তা করলেন–আমিইসমস্তপ্রজা সৃষ্টি করেছি, আমার সামনেইওরা কর্ম দোষে দুষ্ট হয়ে নরক যান্ত্রণা ভোগকরছে, এখন আমিই এদের সদগতির ব্যবস্হা করব।ভগবান শ্রীহরি সেই পাপাচারীদের সামনেএকাদশী তিথি রূপে এক দেবীমুর্তিতেপ্রকাশিত হলেন। সেই পাপীদেরকে একাদশীব্রত আচরণ করালেন। একাদশী ব্রতেরফলে তারা সর্বপাপ মুক্ত হয়ে তৎক্ষণাৎবৈকূণ্ঠধামে গমন করল।শ্রীব্যাসদেব বললেন, হে জৈমিনি! শ্রীহরিরপ্রকাশ এই একাদশী সমস্ত সুকর্মেরমধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং সমস্ত ব্রতের মধ্যে উত্তম ব্রত।কিছুদিন পরে ভগবানের সৃষ্ট পাপ পুরুষএসে শ্রীহরির কাছে করজোড়ে কাতর প্রার্থণাজানাতেলাগল-হে ভগবান ! আমি আপনারপ্রজা।

আমাকে যারা আশ্রয় করে থাকে,তাদের কর্ম অনূযায়ী তাদের দুঃখ দানকরাই আমার কাজ ছিল। কিন্তু সম্প্রতিএকাদশীরপ্রভাবে আমি কিছুই করতেপারছি না, বরং ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছি। কেননাএকাদশী ব্রতের ফলে প্রায় সব পাপাচারীরাবৈকূণ্ঠের বাসিন্দা হযে যাচ্ছে। হে ভগবান,এখন আমার কি হবে? আমি কাকে আশ্রয়করে থাকব? সবাই যদি বৈকূণ্ঠে চলে যায়,তবে এই মর্ত্য জগতের কি হবে? আপনিবা কার সঙ্গে এই মর্ত্যে ক্রীড়া করবেন?পাপপুরুষ প্রার্থনা করতে লাগল-হে ভগবান,যদি আপনার এই সৃষ্ট বিশ্বে ক্রীড়া করবারইচ্ছা থাকে তবে, আমার দুঃখ দূর করুন।একাদশী ভয় থেকে আমাকে রক্ষা করুন।হে কৈটভনাশন, আমি একমাত্র একাদশীরভয়ে ভীত হয়ে পলায়ন করছি।

 মানূষ,পশুপাখী, কীট-পতঙ্গ, জলত-স্হল,বনপ্রান্তর, পর্বত-সমূদ্র, বৃক্ষ, নদী,স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল সর্বত্রই আশ্রয় নেওয়ারচেষ্টা করেছি, কিন্ত একাদশীর প্রভাবেকোথাও নির্ভয় স্হান পাচ্ছি না দেখেআজ আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।হে ভগবান, এখন দেখছি, আপনার সৃষ্টঅনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একাদশীইপ্রাধান্য লাভ করেছে, সেইজন্য আমিকোথাও আশ্রয় পেভে পারছি না। আপনিকৃপা করে আমাকে একটি নির্ভয় স্হানপ্রদান করুন।পাপপুরুষেরপ্রার্থনা শুনে ভগবান শ্রীহরিবলতে লাগলেন-হে -পাপপুরুষ! তুমি দুঃখকরো না। যখন একাদশী এই ত্রিভুবনকেপবিত্র করভে আবির্ভুত হবে, তখন তুমিঅন্ন ও রবিশস্য মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করবেতা হলে আমার মুর্তি একাদশীভোমাকে বধ করতে পারবে না।
হরে কৃষ্ণ
 Sree Krishna - শ্রীকৃষ্ণ
0 comments

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম

জয় জয় গোবিন্দ গোপাল গদাধর।
কৃষ্ণচন্দ্র কর দয়া করুণাসাগর।।
জয় রাধে গোবিন্দু গোপাল বনমালী।
শ্রীরাধার প্রাণধন মুকন্দ মুরারি।।
হরিনাম বিনে রে গোবিন্দু নাম বিনে।
বিফলে মনুষ্য জন্ম যায় দিনে দিনে।।
দিন গেল মিছে কাজে রাত্রি গেল নিদ্রে।
না ভজিনু রাধাকৃষ্ণ চরণার বিন্দে।।
কৃষ্ণ ভজিবার তরে সংসারে আইনু।
মিছে মায়ায় বদ্ধ হ’য়ে বৃক্ষসম হৈনু।।
ফলরূপে পুত্র কন্যা ডাল ভাঙ্গি পড়ে।
কালরূপে সংসারেতে পক্ষী বাসা করে।।
যখন কৃষ্ণ জন্ম নিল দৈবকী উদরে।
মথুরাতে দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি করে।।
বসুদেব রাখি এলো নন্দের মন্দিরে।
নন্দের আলয়ে কৃষ্ণ দিনে দিনে বাড়ে।।
শ্রীনন্দ রাখিল নাম নন্দের নন্দন।
১ যশোদা রাখিল নাম যাদু বাছাধন।।
২ উপানন্দ নাম রাখে সুন্দর গোপাল।
৩ ব্রজবালক নাম রাখে ঠাকুর রাখাল।।
৪ সুবল রাখিল নাম ঠাকুর কানাই।
৫ শ্রীদাম রাখিল নাম রাখাল রাজা ভাই।।
৬ ননীচোরা নাম রাখে যতেক গোপিনী।
৭ কালসোনা নাম রাখে রাধা-বিনোদিনী।।
৮ কুজ্বা রাখিল নাম পতিত-পাবন হরি।
৯ চন্দ্রাবলী নাম রাখে মোহন বংশীধারী।।
১০ অনন্ত রাখিল নাম অন্ত না পাইয়া।
১১ কৃষ্ণ নাম রাখেন গর্গ ধ্যানেতে জানিয়া।।
১২ কন্বমুনি নাম রাখে দেব চক্রপাণী।
১৩ বনমালী নাম রাখে বনের হরিণী।।
১৪ গজহস্তী নাম রাখে শ্রীমধুসূদন।
১৫ অজামিল নাম রাখে দেব নারায়ন।।
১৬ পুরন্দর নাম রাখে দেব শ্রীগোবিন্দ।
১৭ দ্রৌপদী রাখিল নাম দেব দীনবন্ধু।।
১৮ সুদাম রাখিল নাম দারিদ্র-ভঞ্জন।
১৯ ব্রজবাসী নাম রাখে ব্রজের জীবন।।
২০ দর্পহারী নাম রাখে অর্জ্জুন সুধীর।
২১ পশুপতি নাম রাখে গরুড় মহাবীর।।
২২ যুধিষ্ঠির নাম রাখে দেব যদুবর।
২৩ বিদুর রাখিল নাম কাঙ্গাল ঈশ্বর।।
২৪ বাসুকি রাখিল নাম দেব-সৃষ্টি স্থিতি।
২৫ ধ্রুবলোকে নাম রাখে ধ্রুবের সারথি।।
২৬ নারদ রাখিল নাম ভক্ত প্রাণধন।
২৭ ভীষ্মদেব নাম রাখে লক্ষ্মী-নারায়ণ।।
২৮ সত্যভামা নাম রাখে সত্যের সারথি।
২৯ জাম্বুবতী নাম রাখে দেব যোদ্ধাপতি।।
৩০ বিশ্বামিত্র নাম রাখে সংসারের সার।
৩১ অহল্যা রাখিল নাম পাষাণ-উদ্ধার।।
৩২ ভৃগুমুনি নাম রাখে জগতের হরি।
৩৩ পঞ্চমুখে রাম নাম গান ত্রিপুরারি।।
৩৪ কুঞ্জকেশী নাম রাখে বলী সদাচারী।
৩৫ প্রহ্লাদ রাখিল নাম নৃসিংহ-মুরারী।।
৩৬ বশিষ্ঠ রাখিল নাম মুনি-মনোহর।
৩৭ বিশ্বাবসু নাম রাখে নব জলধর।।
৩৮ সম্বর্ত্তক নাম রাখে গোবর্দ্ধনধারী।
৩৯ প্রাণপতি নাম রাখে যত ব্রজনারী।।
৪০ অদিতি রাখিল নাম আরতি-সুদন।
৪১ গদাধর নাম রাখে যমল-অর্জুন।।
৪২ মহাযোদ্ধা নাম রাখি ভীম মহাবল।
৪৩ দয়ানিধি নাম রাখে দরিদ্র সকল।।
৪৪ বৃন্দাবন-চন্দ্র নাম রাখে বিন্দুদূতি।
৪৫ বিরজা রাখিল নাম যমুনার পতি।।
৪৬ বাণী পতি নাম রাখে গুরু বৃহস্পতি।
৪৭ লক্ষ্মীপতি নাম রাখে সুমন্ত্র সারথি।।
৪৮ সন্দীপনি নাম রাখে দেব অন্তর্যামী।
৪৯ পরাশর নাম রাখে ত্রিলোকের স্বাম।।
৫০ পদ্মযোনী নাম রাখে অনাদির আদি।
৫১ নট-নারায়ন নাম রাখিল সম্বাদি।।
৫২ হরেকৃষ্ণ নাম রাখে প্রিয় বলরাম।
৫৩ ললিতা রাখিল নাম বাদল-শ্যাম।।
৫৪ বিশাখা রাখিল নাম অনঙ্গমোহন।
৫৫ সুচিত্রা রাখিল নাম শ্রীবংশীবদন।।
৫৬ আয়ন রাখিল নাম ক্রোধ-নিবারণ।
৫৭ চন্ডকেশী নাম রাখে কৃতান্ত-শাসন।।
৫৮ জ্যোতিষ্ক রাখিল নাম নীলকান্তমণি।
৫৯ গোপীকান্ত নাম রাখে সুদাম ঘরণী।।
৬০ ভক্তগণ নাম রাখে দেব জগন্নাথ।
৬১ দুর্বাসা নাম রাখে অনাথের নাথ।।
৬২ রাসেশ্বর নাম রাখে যতেক মালিনী।
৬৩ সর্বযজ্ঞেশ্বর নাম রাখেন শিবানী।।
৬৪ উদ্ধব রাখিল নাম মিত্র-হিতকারী।
৬৫ অক্রুর রাখিল নাম ভব-ভয়হারী।।
৬৬ গুঞ্জমালী নাম রাখে নীল-পীতবাস।
৬৭ সর্ববেত্তা নাম রাখে দ্বৈপায়ণ ব্যাস।।
৬৮ অষ্টসখী নাম রাখে ব্রজের ঈশ্বর।
৬৯ সুরলোকে নাম রাখে অখিলের সার।।
৭০ বৃষভানু নাম রাখে পরম ঈশ্বর।
৭১ স্বর্গবাসী নাম রাখে সর্ব পরাৎপর।।
৭২ পুলোমা রাখেন নাম অনাথের সখা।
৭৩ রসসিন্ধু নাম রাখে সখী চিত্রলেখা।।
৭৪ চিত্ররথ নাম রাখে অরাতি দমন।
৭৫ পুলস্ত্য রাখিল নাম নয়ন-রঞ্জন।।
৭৬ কশ্যপ রাখেন নাম রাস-রাসেশ্বর।
৭৭ ভাণ্ডারীক নাম রাখে পূর্ণ শশধর।।
৭৮ সুমালী রাখিল নাম পুরুষ প্রধান।
৭৯ পুরঞ্জন নাম রাখে ভক্তগণ প্রাণ।।
৮০ রজকিনী নাম রাখে নন্দের দুলাল।
৮১ আহ্লাদিনী নাম রাখে ব্রজের গোপাল।।
৮২ দেবকী রাখিল নাম নয়নের মণি।
৮৩ জ্যোতির্ম্ময় নাম রাখে যাজ্ঞবল্ক্য মুনি।।
৮৪ অত্রিমুনি নাম রাখে কোটি চন্দ্রেশ্বর।
৮৫ গৌতম রাখিল নাম দেব বিশ্বম্ভর।।
৮৬ মরীচি রাখিল নাম অচিন্ত্য-অচ্যুত।
৮৭ জ্ঞানাতীত নাম রাখে শৌনকাদিসুখ।।
৮৮ রুদ্রগণ নাম রাখে দেব মহাকাল।
৮৯ সুরগণ নাম রাখে ঠাকুর দয়াল।।
৯০ সিদ্ধগণ নাম রাখে পুতনা-নাশন।
৯১ সিদ্ধার্থ রাখিল নাম কপিল তপোধন।।
৯২ ভাদুরি রাখিল নাম অগতির গতি।
৯৩ মৎস্যগন্ধা নাম রাখে ত্রিলোকের পতি।।
৯৪ শুক্রাচার্য্য নাম রাখে অখিল বান্ধব।
৯৫ বিষ্ণুলোকে নাম রাখে দেব শ্রীমাধব।।
৯৬ যদুগণ নাম রাখে যদুকুলপতি।
৯৭ অশ্বিনীকুমার নাম রাখে সৃষ্টি-স্থিতি।।
৯৮ অর্য্যমা রাখিল নাম কাল-নিবারণ।
৯৯ সত্যবতী নাম রাখে অজ্ঞান-নাশন।।
১০০ পদ্মাক্ষ রাখিল নাম ভ্রমরী-ভ্রমর।
১০১ ত্রিভঙ্গ রাখিল নাম যত সহচর।।
১০২ বংকচন্দ্র নাম রাখে শ্রীরূপমঞ্জরী।
১০৩ মাধুরা রাখিল নাম গোপী-মনোহারী।।
১০৪ মঞ্জুমালী নাম রাখে অভীষ্টপুরণ।
১০৫ কুটিলা রাখিল নাম মদনমোহন।।
১০৬ মঞ্জরী রাখিল নাম কর্ম্মব্রহ্ম-নাশ।
১০৭ ব্রজব নাম রাখে পূর্ণ অভিলাস।।
১০৮ দৈত্যারি দ্বারিকানাথ দারিদ্র-ভঞ্জন।
দয়াময় দ্রৌপদীর লজ্জা-নিবারণ।।
স্বরূপে সবার হয় গোলকেতে স্থিতি।
বৈকুন্ঠে ক্ষীরোদশারী কমলার পতি।।
রসময় রসিক নাগর অনুপম।
নিকুঞ্জবিহারী হরি নবঘনশ্যাম।।
শালগ্রাম দামোদর শ্রীপতি শ্রীধর।
তারকব্রহ্ম সনাতন পরম ঈশ্বর।।
কল্পতরু কমললোচন হৃষীকেশ।
পতিত-পাবন গুরু জ্ঞান-উপদেশ।।
চিন্তামণি চতুর্ভুজ দেব চক্রপাণি।
দীনবন্ধু দেবকী নন্দন যাদুমনি।।
অনন্ত কৃষ্ণের নাম অনন্ত মহিমা।
নারদাদি ব্যাসদেব দিতে নারে সীমা।।
নাম ভজ নাম চিন্ত নাম কর সার।
অনন্ত কৃষ্ণের নাম মহিমা অপার।।
শততার সুবর্ণ গো কোটি কন্যাদান।
তথাপি না হয় কৃষ্ণ নামের সমান।।
যেই নাম সেই কৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি।
নামের সহিত আছে আপনি শ্রীহরি।।
শুন শুন ওরে ভাই নাম সংকীর্তন।
যে নাম শ্রবণে হয় পাপ বিমোচন।।
কৃষ্ণনাম হরিনাম বড়ই মধুর।
যেই জন কৃষ্ণ ভজে সে বড় চতুর।।
ব্রহ্ম-আদি দেব যারেঁ ধ্যানে নাহি পায়।
সে ধন বঞ্চিত হলে কি হবে উপায়।।
হিরণ্যকশিপুর উদর-বিদরণ।
প্রহ্লাদে করিল রক্ষা দেব নারায়ণ।।
বলীরে ছলীতে প্রভু হইলা বামন।
দ্রৌপদীর লজ্জা হরি কৈলা নিবারণ।।
অষ্টোত্তর শতনাম যে করে পঠন।
অনায়াসে পায় রাধা কৃষ্ণের চরণ।।
ভক্তবাঞ্ছা পূর্ণকারী নন্দের নন্দন।
মথুরায় কংস-ধ্বংস লঙ্কায় রাবণ।।
বকাসুর বধ আদি কালীয়-দমন।
নরোত্তম কহে এই নাম সংকীর্ত্তণ।

হরে কৃষ্ণ সম্প্রদায়
0 comments

রাখে হরি মারিবে কে ?

বৃন্দাবন লীলায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মাতা এবং কংসের ভগিনী দেবকীকে তার স্বামী বসুদেবসহ কারাগারে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল , কেননা মাৎসৰ্যপরায়ণ রাজা কংসের ভয় ছিল যে দেবকীর অষ্টম পুত্ৰ ( কৃষ্ণ ) তাকে বধ করবেন। কৃষ্ণের পূর্বে দেবকীর গৰ্ভজাত সবকটি পুত্ৰকে কংস হত্যা করেছিল কিন্তু কৃষ্ণ এই বিপদ এড়াতে পেরেছিলেন কেননা বসুদেব তাকে তার পালক পিতা গোকুলের নন্দ মহারাজের গৃহে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

তেমনি কুন্তীদেবীও তার পুত্ৰসহ ভয়ঙ্কর বিপদরাশি থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুন্তীদেবীর প্রতি অধিক অনুগ্রহ প্ৰদৰ্শন করেছিলেন , কেননা যদিও তিনি দেবকীর অন্যান্য পুত্রদের রক্ষা করেননি , কিন্তু কুন্তীর পুত্ৰদের তিনি রক্ষা করেছিলেন । তিনি তা করেছিলেন কেননা দেবকীর পতি বসুদেব জীবিত ছিলেন , কিন্তু কুন্তীদেবী ছিলেন বিধবা এবং কৃষ্ণ ছাড়া তাকে সাহায্য করার আর কেউ ছিল না ।

অতএব সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে যারা অধিক বিপদগ্ৰস্ত কৃষ্ণ তাদের অধিক অনুগ্রহ করেন । কখনো কখনো তিনি তার শুদ্ধভক্তদের এইরকম বিপদে ফেলেন , কেননা সেই অসহায় ভক্ত ভগবানের প্রতি অধিক অনুরক্ত হন । ভক্ত ভগবানের প্রতি যত অনুরক্ত হন , তার সাফল্যও তত বেশি হয় ।

যেমন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, দুর্যোধন দ্বারা বিষমিশ্রিত খাদ্য থেকে পান্ডবদের রক্ষা করেছেন, জতুগৃহর মহাঅগ্নি থেকে তাদের রক্ষা করেছেন ,  বনবাস থাকাকালীন নরখাদক রাক্ষস থেকে রক্ষা করেছেন,
পাপচক্ৰান্তময় সভা থেকে দ্রোপদীর সম্মান রক্ষা করেছেন,  বনবাসের বিভিন্ন দুঃখ - কষ্ট থেকে ,
এবং যুদ্ধে বহু মহারথীর প্রাণঘাতী অস্ত্ৰসমূহ থেকে পান্ডবদের পরিত্ৰাণ করেছেন ।  এমনকি অশ্বথামার ব্ৰহ্মাস্ত্ৰ থেকে উত্তরাসহ তার পুত্র পরীক্ষিত মহারাজকে রক্ষা করেছেন।

পান্ডবেরা যে ধরনের বিপজনক ঘটনা পরম্পরার সম্মুখীন হয়েছিলেন তার সবগুলি বিপদ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উদ্বার করেছেন।

দেবকী একবার তার ঈৰ্ষাপরায়ণ ভ্ৰাতার কংসের দ্বারা সঙ্কটাপন্ন হয়েছিলেন , তা না হলে তিনি ভালই ছিলেন । কিন্তু কুন্তীদেবী এবং তার পুত্ররা বছরের পর বছর ধরে একের পর এক দুঃখ - দুৰ্দশার সন্মুখীন হয়েছিলেন ।

দুৰ্যোধন এবং তার দল তাদের নানা প্ৰকার অনিষ্ট সাধনের চেষ্টা করেছিল , এবং প্ৰতিবারই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাদের রক্ষা করেছিলেন । একবার ভীমকে বিষ প্ৰদান করা হয়েছিল , একবার তাদের জতুগৃহে পুড়িয়ে মারার চক্ৰান্ত করা হয়েছিল , এবং দ্ৰৌপদীকে একবার দুষ্ট কৌরবদের সভায় নিয়ে এসে তার বস্ত্ৰহরণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল । ভগবান অন্তহীনভাবে দ্ৰৌপদীকে বস্তু সরবরাহ করে তার লজানিবারণ করেছিলেন এবং দুৰ্যোধনের দল তাকে বিবস্ত্রারুপে দেখতে ব্যৰ্থ হয়েছিল । তেমনই তারা যখন বনে নিৰ্বাসিত হয়েছিলেন , তখন হিড়িম্ব নামক এক নরখাদক রাক্ষসের সঙ্গে ভীমকে যুদ্ধ করতে হয়েছিল , কিন্তু ভগবান তাকে রক্ষা করেছিলেন।

এইখানেই শেষ নয়।
এত সমস্ত দুঃখ - দুৰ্দশার পর কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে এক মহাযুদ্বের আয়োজন করা হয়েছিল এবং অর্জুনকে দ্ৰোণ , ভীষ্ম , কৰ্ণ প্ৰমুখ সমস্ত মহান শক্তিশালী যোদ্ধাদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার প্রিয় সখাকে বুদ্বি দিয়ে, সাহস দিয়ে ও নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে তাকে জয়ী করেছিলেন।

আর অবশেষে , সমস্ত কিছুর শুভসমাপ্তির পরেও উত্তরার গৰ্ভস্থ সন্তানকে হত্যা করার জন্য দ্ৰোণাচার্যের পুত্ৰ ব্ৰহ্মাস্ত্ৰ নিক্ষেপ করেছিল এবং তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গদাহাতে উত্তরার গর্ভস্থ কুরুবংশের একমাত্ৰ জীবিত বংশধর পরীক্ষিৎ মহারাজকে রক্ষা করেছিলেন।

তাই,
আমাদেরও কুন্তীপুত্রদের মত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আসক্তি থাকতে হবে। যখনই বিপদ আসবে ভগবানকে স্মরন করে অর্জুনের মত লড়াই করে যেতে হবে আর বিশ্বাস রাখতে হবে আমার সাথে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দাড়িয়ে আছে আমাকে রক্ষা করার জন্য।

বিশ্বাস রাখতে হবে ''অবশ্যই রক্ষিবে কৃষ্ণ''।

''রাখে হরি মারিবে কে ?''।। হরেকৃষ্ণ।।

( sodkirti das কপি পেস্ট করবেন না )

📮📮সবাইকে Share করুন📮📮
0 comments

কৃষ্ণ‌প্রিয়া মীরাবাঈ - শেষ পর্ব

মীরা ঃ এক চারণ ক‌বি ( ২ )

অ‌নেক বাধা , অ‌নেক নির্যাতন অ‌ন্তে , অব‌শে‌ষে মীরার বিজয়ী কন্ঠস্বর উ‌দ্ঘো‌ষিত -- এতটুকু আত্মগ‌রিমার অবকাশ না রেখে ঃ
সত্য কথা বলব লো সই ,
শরম আমার কী সে ?
‌প্রি‌য়ের লা‌গি হ‌া‌সি গাই
নাচি প‌থে প‌থে ।
‌প্রেম শ‌রে বিদ্ধা মীরা
আহার নিদ্রা ভুল
কৃষ্ণ সা‌থে প্রণয় লীলা
ত্যা‌জি জা‌তিকুল ।
‌দিব্যলীলা প্রচার ক‌রি
আত্মবন্ধু সা‌থে
মধুক্ষরা না‌মে তাঁ‌রি
ভক্ত জো‌টে লা‌খে ।
হ‌রি না‌মের পীযূষ পিয়ে
মত্ত শ্রোতকুল ;
কৃষ্ণ দাসী মীরা হি‌য়ে
আ‌জি আনন্দ আকুল ।
অপূর্ব এক ভজ‌নে মীরা ব্যক্ত ক‌রে‌ছেন তাঁর বিশ্বা‌সের গভীরতা তাঁর অননুকরণীয় ভাষায় ঃ
স্বামী মোর প্রিয় মোর প্রভু‌গি‌রিধারী
ময়ূর মুকুট শি‌রে শোভন ম‌নোহার‌ী ।
না‌হি পিতা মাতা ভাই আত্মীয় স্বজন
না‌হি কেহ মোর ওগ‌ো পতিত -পাবন।
তুচ্ছ জ্ঞা‌নে ত্যাজিয়াছি জা‌তি - কুল - মান
‌কে বা ক্ষ‌তি ক‌রে মোর , কি বা অপমান ?
সাধু স‌ঙ্গে সদা ক‌রি আলাপ কীর্তন
লজ্জাভয় বিসর্জন কৃ‌ষ্ণে রা‌খি মন ।
‌ছে‌ড়েছি জ‌রির সা‌জ , ম‌ণি - মুক্ত - মালা
‌বিরহ যাতনা কা‌রো বা ব‌লি
ওগো নিঠুর প্রিয়তম ?
চক্ষে যেন শল্য বেঁ‌ধে ;
পথ পা‌নে তব চা‌হি
‌মিলন রা‌তি আ‌সি‌বে ক‌বে
‌ধৈর্য কত বা স‌হি !
কত রা‌তি কা‌টে ব্যর্থ জাগর‌ণে
তব আ‌শে , ও‌গো দুঃখহারী ।
‌নি‌তি‌দিন মীরা বৃথা ক্রন্দনে
ডা‌কে কোথা প্রিয় গি‌রিধারী ?
এমন বহু গা‌নে মীরা উ‌ন্মোচন করে‌ছেন তাঁর বিরহকাতর আগ্নেয় অন্তরজ্বালা , তাঁর অসহনীয় ভগবৎ ব্যাকুলতার আ‌র্তি । কিছু গা‌নে রচনা ক‌রে‌ছেন তি‌নি কৃষ্ণলীলার দিব্য আ‌লেখ্য , কিছু গা‌নে বর্ণনা ক‌রে‌ছেন উদ্দীপনাময়ী প্রাকৃ‌তিক শোভা এবং কোথাও বা এক সা‌ধিকার আ‌বেদন - প্রার্থনা । কোন কোন গান আত্মজীবনীমূলক এবং কিছু ক্ষেত্রে আধ্যা‌ত্মিক জীব‌নের পথ নি‌র্দেশ । দীর্ঘ বিরহ ও কষ্ট‌ভো‌গের পর অব‌শে‌ষে এ‌ল সেই পরম আনন্দঘন মিলন মুহূর্ত ।
তি‌নি গাইলেন ঃ
বহুকাল পর এল প্রিয় মোর
‌মিলন মধু হ‌লো সই ;
‌বিরহ রা‌তি যুগকাল ভা‌তি
আ‌জি বু‌ঝি হ‌লো ভোর ।
দীপ আর‌তি , জানাই প্রণ‌তি
আবাহন ক‌রি মম গে‌হে
দয়াল হ‌রি করুণা বিত‌রি
মীরা‌কে বাঁ‌ধি‌লেন স্নেহে ।
এস এস ভাই , হ‌রিনাম গাই
আনন্দ ক‌রি স‌বে মি‌লে
এ মিলন রা‌তে এস প্রিয় সা‌থে
উৎসব ক‌রি সুখে ।
‌প্রিয় - সঙ্গ সুখে মীরা র‌সে ভা‌সে অঙ্গ‌নে ব‌হে প্রেমধারা
‌নির‌খি নিরখি শ্যামঅঙ্গরূপ
মীরা আত্মহারা ।
মীরার এ দিব্যসুখ তো কেউ ছি‌নি‌য়ে নি‌তে পার‌বে না ! তার এ প্রিয়‌মিলন তো ছিন্ন হবার নয় !
গভীর আত্ম‌বিশ্বা‌সে তি‌নি তাই জানালেন ঃ
‌নিরাভরণ অ‌ঙ্গে মোর তুচ্ছ বনমালা ।
পল্ল‌বিত প্রস্ফু‌টিত প্রেমলতা খা‌নি
অশ্রু সিঞ্চ‌নে দিল আনন্দ - ফল আ‌নি ।
মন্থন ক‌রিয়া দুগ্ধ ভ‌ক্তি অনুরা‌গে
নবনীত পরম প্রা‌প্তি , তত্রু সহ‌যো‌গে ।
জ‌ন্মিল মীরা ক‌রি‌তে ভ‌ক্তি আস্বাদন
সংসার চ‌ক্রে সে , হায় , ল‌ভিল বন্ধন ।
বন্দীশালা হ‌তে প্রভু কর হে উদ্ধার
জনম দাসী মীরা ভকত তোমার ।
এই আনন্দ , ধর্ম - জীব‌নের সার এই অমৃত , মীরা একান্ত ভ‌ক্তি সাধনার দ্বারা লাভ ক‌রে‌ছি‌লেন । নি‌জেদের সুখ - শা‌ন্তি ও হি‌তের জন্য এই অমৃ‌তের অধিকারী আমরাও হতে পা‌রি য‌দি আমরা চাই , তা সে যে - ই হোক না কেন । মীরার জীবন - কা‌হিনী কখ‌নো সমাপ্ত হবে না । তি‌নি ভক্ত‌দের মা‌ঝে বেঁ‌চে থাক‌বেন। মীরা মতো ভ‌ক্তি যার জীবনে এ‌সে‌ছে বা আস‌বে তার জীবন ধন্য । আমা‌দের সক‌লের উ‌চিত মীরার ম‌তো একান্তভাবে শ্রীহ‌রি সেবা করা নিঃস্বার্থভা‌বে । তি‌নি য‌দি কৃপা করেন তবে অসাধ্যও সাধ্য হ‌বে ।
জয় হোক স্বামী বুধান‌ন্দের যি‌নি কৃপা করে কৃষ্ণপ্রিয়া মীরা লি‌পিবদ্ধ ক‌রে‌ছেন । ওনার চর‌ণে প্রণ‌তি নি‌বেদন ক‌রি ।
ভক্তগণ এই ছি‌ল কৃষ্ণ‌প্রিয়া মীরাবাঈ এর ভক্তিকথা । আ‌মি শ্রীরাধাকৃষ্ণের কৃপায় শুধু প্র‌চেষ্টা করলাম । জা‌নি না কতটুকু কর‌তে পে‌রে‌ছি । প্রচারকা‌লে য‌দি লেখা ই অন্যকোন বিষয় যদি ভুলভ্রা‌ন্তি হ‌য়ে থা‌কে ত‌বে স‌ক‌লের চর‌ণে ক্ষমা প্রার্থনা কর‌ছি । সক‌ল ভক্তবৃন্দ মার্জনা কর‌বেন ।
জয় হোক শ্রীরাধা‌গোবি‌ন্দের ।
জয় হোক গি‌রিধারীলালের ।
জয় হোক ভ‌ক্তিম‌তি মীরার ।
জয় হোক সকল বৈষ্ণববৃ‌ন্দের ।
জয় হোক সকল ভক্তবৃ‌ন্দের ।
‌নিতাই গৌর প্রেমান‌ন্দে একবার হ‌রি হ‌রি ব‌ল

লেখকঃ - Joy Shree Radha Madhav
0 comments

কৃষ্ণ‌প্রিয়া মীরাবাঈ পর্ব - ৭

মীরা এক চারণ ক‌বি ( ১ )

এই হ‌লো মীরার জীবন - কা‌হিনী । এক‌টি জীবন যা ঈশ্বর অ‌ন্বেষ‌ণে নিঃ‌শেষে নি‌য়ো‌জিত , জগৎ ও জাগতিক ব্যাপা‌রে মহা তেজস্বী ও সম্পূর্ণ উদাসীন , এক‌টি জীবন যা মধুরভা‌বে ঈশ্বর সাধনায় পরম সিদ্ধ , যেমন‌টি ব্র‌জের গোপীরা লাভ ক‌রে‌ছি‌লেন ; এক‌টি জীবন যার কেন্দ্র‌বিন্দু হ‌তে উৎসা‌রিত অপ্র‌তি‌রোধ্য স্রোতধারায় আজও অ‌ভিস্নাত , উদ্দীপ্ত ভ‌ক্তিমা‌র্গের অনুসারী সাধক ।

মীরা তো নিছক এক ব্য‌ষ্টিমান‌বের হৃদ্ স্পন্দন নন , তিনি ভারতাত্মার প্রাণস্পন্দন । আর কেবল ভারতবর্ষই বা কেন ? সিদ্ধ মানব‌কে কি কোন জা‌তির বন্ধ‌নে সীমা‌য়িত করা যায় ? ঈশ্বর তাঁ‌দের এবং তাঁ‌রা ঈশ্ব‌রের । কোন এক আঞ্চ‌লিক কথ্যরূপই তাঁ‌দের ভাষা নয় , তাঁ‌দের ভাষা ঈশ্ব‌রের জন্য আত্মার ব্যাকুলতা এখা‌নে য‌দিও মীরার জীব‌নের কিছু ঘটনা বিবৃত করার প্রয়াস করা হ‌য়ে‌ছে , তথা‌পি একথা স্বীকার কর‌তেই হ‌বে , তাঁর প্রকৃত জীবন আ‌লেখ্য উপ‌স্থিত করা আমা‌দের সাধ্যাতীত ।
কারণ মীরার প্রকৃতরূপ তাঁর নিত্য‌দি‌নের ঘটনা , পরম্পরায় প্রকাশিত নয় , সে রূপ প্র‌তিভাসিত তাঁর আত্মার ব্যাকুলতায় , তাঁর দুঃখ ও বির‌হে , তাঁর রক্তাক্ত ও বেদনাদগ্ধ হৃদ‌য়ের আ‌র্তি‌তে ।
সেই প্রকৃত মীরার প‌রিচয় পে‌তে হ‌লে কান পে‌তে শুন‌তে হবে তাঁর সেই সকল হৃদয় নিঙড়া‌নো সঙ্গীত কোন এক কৃষ্ণভক্ত আত্ম‌নি‌বে‌দিত প্রেম সাধ‌কের কন্ঠে ।
তখনই মীরার অন্তঃসত্তার কি‌ঞ্চিৎ আভাস পাওয়া যে‌তে পা‌রে মাত্র । মীরা বেঁ‌চে আ‌ছেন তাঁর সঙ্গীত‌কে অবলম্বন ক‌রে । বিদ্যু‌তের মৃত্যু যেমন সম্ভব নয় , তেমনই প্রে‌মের মৃত্যুর কথা আমরা ধারণা কর‌তে পারি না । ভ‌ক্তি অবলম্বন ক‌রেই ভ‌ক্তের বেঁ‌চে থাকা । ভ‌ক্তির প্রবাহ কখ‌নো একমুখী নয় । তা হ‌লো ভক্ত হৃদ‌য়ে ভগবা‌নের অ‌ভিসার এবং ভগবান হৃদ‌য়ে ভক্তের অ‌ভিসার । ভ‌ক্তি হ‌লো প্রিয় মিলন । ভ‌ক্তি হ‌লো প্রিয়ত‌মের প্রেমময় আ‌লিঙ্গ‌নে নিঃ‌শে‌ষে আত্মসমর্পণ । ভ‌ক্তি হ‌লো যখন ম‌নে হ‌বে প্রিয়তম স‌ঙ্গ ছে‌ড়ে গে‌ছেন তাঁর জন্য ব্যাকুল হ‌ওয়া । ভ‌ক্তি হ‌লো প্রিয়ত‌মের নিকট নি‌জে‌কে সম্পূর্ণ সম‌র্পিত ক‌রে দেওয়া ।
চার বছর ব‌য়সে মীরা স্ব‌প্নে দে‌খেছিল গি‌রিধারীলা‌লের স‌ঙ্গে তাঁর বিবাহ অনুষ্ঠান । সে উপল‌ক্ষে র‌চিত রাজ তোরণ এর দৃশ্য‌টিও তার অন্তরে ছ‌বি হ‌য়ে ফু‌টে আ‌ছে । তারপর , সেই যে ছোট্ট বা‌লিকা‌টি মা‌য়ের কা‌ছে তার ' বর ' কে , এই প্র‌শ্নের উত্ত‌রে জে‌নে‌ছিল গি‌রিধারীলালাই তার স্বামী ; অতঃপর তার সারা জীব‌নে সেই এক‌টি ধারণাই সে আঁক‌ড়ে ছিল --
' মে‌রে তো গি‌রিধর গোপাল দুসরা ন কোঈ ।
যা‌কে সির মোর মুকুট মে‌রে প‌তি সোঈ . . . . . . '
' যাঁর শি‌রে শো‌ভে ময়ূর মুকুট , সেই গি‌রিধারী গোপালই আমার স্বামী , তি‌নি ছাড়া আমার আর তো কেউ নেই । '
প্রিয়‌মিল‌নের প‌থে তাঁ‌কে যে কত অন্তরায় অ‌তিক্রম কর‌তে হ‌য়ে‌ছে , কত যাতনা সহ্য কর‌তে হ‌য়ে‌ছে , সে সকল প্র‌তিফলিত হ‌য়ে‌ছে তাঁর গা‌নে । সত্য উচ্চার‌ণে তি‌নি অ‌তি‌রিক্ত পেলবতার আশ্রয় গ্রহণ ক‌রেন‌নি । তাঁর প্রে‌মের প্র‌তিশ্রু‌তি ঘোষণা ক‌রে‌ছেন নি‌র্দ্বিধায় । সেখা‌নে কোন লু‌কোচু‌রির প্রশ্রয় দেন‌নি । তাঁর হৃদয় যাতনা এতই তীব্র ছিল যে জাগ‌তিক ব্যাপা‌রে সং‌শ্লিষ্ট হবার অবকাশ তাঁর ছিল না । তা তাঁ‌কে ক‌রে তু‌লে‌ছিল নির্ভীক , নিলাজ ।
গৃহ , নিরাপত্তা , মর্যাদা প্রভৃ‌তি যে সকল বিষয় সাংসা‌রিক মানু‌ষের একান্ত কা‌ঙ্ক্ষিত ধন , সে সকল হ‌তে তি‌নি নিজে‌কে ব‌ঞ্চিত ক‌রে তাঁর প্রিয়ত‌মের জন্য বরণ ক‌রে‌ছি‌লেন সর্ব‌বিধ নির্যাতন । কিন্তু এত ক‌রেও কি পাওয়া যায় তাঁর দর্শন অনুক্ষণ ? প্রেম তো দেওয়া হ‌লো কিন্তু প্রিয়ত‌মের দেখা কই ! মীরার যাতনার কি শেষ নেই ?
কত কাল তু‌মি গিয়াছ নাথ
কত যুগ হ‌লো ভোর ;
তোমা‌রি লা‌গি আঁ‌খি হ‌লো ভার
শা‌ন্তি না‌হি মোর ।
মধুর তোমার কৃষ্ণ না‌মে
ব্যাকুল হিয়া সদাই কাঁ‌পে
পথ চা‌হি তব ক্লান্ত আঁখি
এ‌লে না তু‌মি তো প্রিয় ?
রাতগু‌লি মোর বিল‌ম্বিত
প্রহর গণি বর্ষ সম
‌বিরহী প্রে‌মিকা পাঠায় প্রেম লি‌পি
প্রবাসী প্রে‌মি‌কের ঠিকানায় ।
কৃষ্ণ রা‌গে র‌ঞ্জিতা মীরার দ‌য়িত
আ‌ছেন তার অন্ত‌রে ;
তাঁ‌কে জানায় সে প্রেমবারতা
গা‌নে গা‌নে , একান্ত আলাপ‌নে ।

লেখকঃ - Joy Shree Radha Madhav
0 comments

কৃষ্ণ‌প্রিয়া মীরাবাঈ পর্ব - ৬

প্রিয় মিলন

মীরা চি‌তোর ত্যাগ করার অন‌তিকাল প‌রেই মেবার রা‌জ্যে নে‌মে এল চরম দু‌র্যোগ । মুসলমান আক্রম‌ণের ফ‌লে সমগ্র রাজ্য বিপর্যয় উপ‌স্থিত হ‌লো এবং রাজধানী চি‌তোর অত্যন্ত বিশৃঙ্খল প‌রি‌স্থিতির সম্মুখীন হ‌লো । বিক্রমজীৎ রাণা , যি‌নি মীরা‌কে নির্বাসন দণ্ড দিয়ে‌ছি‌লেন তি‌নিও সিংহাসনচ্যূত হ‌লেন । নব অ‌ভি‌ষিক্ত রাজা উদয়‌সিংহ ধর্ম‌ভীরু প্রকৃ‌তির ছি‌লেন । তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হ‌লো , মীরার উপর রাজপ‌রিবা‌রের অন্যায় অত্যাচা‌রের কার‌ণে রা‌জ্যের এই দুর্ভাগ্য ।

কাল‌ক্ষেপ না ক‌রে তি‌নি রাজপু‌রো‌হিত ও কিছু নির্ভর‌যোগ্য পা‌রিষদ‌কে দ্বারকায় পাঠা‌লেন মীরা‌কে চি‌তো‌রে ফি‌রি‌য়ে আন‌তে । কিন্তু তাঁ‌দের পুনঃপুনঃ অনু‌রোধ উপ‌রোধ সত্ত্বেও মীরা চি‌তোর ফি‌রে যে‌তে সম্মত হ‌লেন না । প্রভুর আশ্রয় ছে‌ড়ে তি‌নি আর কোথাও যে‌তে রা‌জি নন । তাঁর কা‌ছে চি‌তো‌রের কি মূল্য ? অব‌শে‌ষে রাজপু‌রো‌হিত প্রভৃ‌তি রাণার প্র‌তি‌নিধিরা চরমপন্থা হিসা‌বে অনশন শুরু কর‌লেন । তাঁ‌দের এই সত্যাগ্রহ আ‌ন্দোলন মীরা‌কে বিচ‌লিত করল । তাঁকে উপলক্ষ ক‌রে কেউ মৃত্যুবরণ কর‌বে - এ যে তাঁর প‌ক্ষে অসহনীয় !

অসহায় মীরা ম‌ন্দি‌রের গর্ভগৃ‌হে প্র‌বেশ ক‌রে রণ‌ছোড়জীর শরণ নি‌লেন এবং করুণসু‌রে দেবতার কা‌ছে নি‌বেদন কর‌লেন দু‌টি ভজন ঃ
সকল জী‌বের দুঃখহারী তু‌মি তো গে গি‌রিধারী ।
দুঃখ শো‌কে তু‌মি আছ নাথ মীরা তব চিরদাসী ।
দ্বিতীয়‌টি‌তে তি‌নি গাই‌লেন ঃ
পূর্ণ হউক তোমার
ওগ‌ো প্রিয় সুন্দর
আমা প‌রে তব করুণা অপার
মোর ন‌হে কেহ প্রিয়তর
অনশ‌নে মোর বৃথা দিন যায়
রাত কা‌টে তব আ‌শে
‌দিনে দি‌নে ক্ষয় , তুচ্ছ এ কায়
পরাণ বু‌ঝি বা না‌শে ।
‌গি‌রিধারী নাগর , মীরা ডা‌কে কাতর
ভিখ্ মা‌গে তব পায়
‌দিও না দিও না ফাঁ‌কি , ওগো শ্যামসুন্দর
শেষ ক্ষ‌ণে কো‌লে নিও তায় ।
ক‌থিত আ‌ছে , রণ‌ছোড়জী সেই প‌বিত্র , আত্ম‌নিবে‌দিত হৃদ‌য়ের প্রার্থনা ও ব্যাকুল আ‌বেদ‌নে সাড়া দি‌য়ে‌ছি‌লেন । বাই‌রে তখন সমু‌দ্রের উত্তাল তরঙ্গমালা অ‌বিরত ম‌ন্দির প্রা‌ঙ্গণে সশ‌ব্দে আছ‌ড়ে পড়‌ছে ; গর্ভগ‌ৃ‌হের অন্তরা‌লে মীরার সঙ্গীতধ্ব‌নি দেবতার হৃদ‌য়ে শূণ্য আকাশে তো‌লে মহা আ‌লোড়ন । দেবাল‌য়ে মীরা তখন তার প্রিয়ত‌মের স‌ঙ্গে একাকী ।তাঁর বিরহ ব্যথা সুর হ‌য়ে ঝ‌রে প‌ড়ে । রাজপু‌রো‌হি‌ত তাঁর অনুচরবৃন্দসহ বাই‌রে তখন অ‌পেক্ষমান অ‌নেক আশা নি‌য়ে । চি‌তো‌রের ভাগ্যলক্ষ্মী‌কে তাঁরা ফি‌রি‌য়ে নি‌য়ে যা‌বেন তাঁর আপন রাজ্যে । সমুদ্রের তরঙ্গভঙ্গ ঘ‌টে চ‌লে অ‌বিরাম....... । সময় অ‌পেক্ষা ক‌রে না কা‌রো জ‌ন্যে । দেবাল‌য়ের সিংহদুয়ার থা‌কে তেমনই রুদ্ধ ।
অব‌শে‌ষে বাই‌রে থে‌কে যখন দুয়ার খোলা হলো , অদ্ভুত ব্যাপার , মীরা অন্ত‌র্হিত ।
রণ‌ছোড়জী মীরা‌কে যে‌তে দেন‌নি , তি‌নি তা‌কে টে‌নে নি‌য়ে‌ছেন আপন হৃদ‌য়ে ।
কোথায় তি‌নি গে‌লেন অথবা যে‌তে প‌া‌রেন ? মন্দির ছিল অর্গলবদ্ধ । রাজপু‌রো‌হিত অনুচর সহ বাই‌রে দুয়া‌রে পাহারারত । ভিত‌রে তন্ন তন্ন ক‌রে খোঁজা হ‌লো । ঠিক তখনই আকাশ হ‌তে ভে‌সে এল মীরার স্বর -- তাঁর গাওয়া গা‌নের অন্তিম দু‌টি পঙ‌ক্তি --
গি‌রিধারী নাগর , মীরা ডা‌কে কাতর ভিখ্ মা‌গে তব পা‌য়ে ।
‌দিও না দিও না ফাঁকি , ও‌গো শ্যামসুন্দর শেষ ক্ষ‌ণে কো‌লে নিও তায় । ।
কোথা হ‌তে আ‌সে এ কন্ঠস্বর ? মীরা কি কোথাও ল‌ু‌কি‌য়ে আ‌ছেন ? বহু অনুসন্ধান ক‌রেও কিন্তু কোথাও তাঁকে পাওয়া গেল না । মীরাকে আর চি‌তো‌রে ফি‌রি‌য়ে নেওয়া সম্ভব নয় । তি‌নি তাঁর চির - রাজ্য দ‌য়ি‌তের হৃদয় ম‌ধ্যে ফি‌রে গে‌ছেন চিরকা‌লের জন্য । প্রে‌মের জোরে মীরার স্থূল‌দেহ বিলীন হ‌য়ে গে‌ছে দেবতার শরী‌রে । সে সত্য প্রমা‌ণিত হ‌লো যখন , আ‌বিস্কৃত হ‌লো তাঁর ওড়নাখা‌নি রণ‌ছোড়জীর মূ‌র্তির মুখমণ্ড‌লে ।

ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ই‌তিহা‌সে এমন বেশ ক‌য়েক‌টি ঘটনা ঘ‌টে‌ছে , যেখা‌নে ভক্ত ই‌ষ্ট‌দেবতার মূ‌র্তি‌তে লীল হ‌য়ে গে‌ছেন । মীরার যেরূপ গি‌রিধারীলা‌লের প্র‌তি প্রেম , অনুরূপ উচ্ছৃ‌সিত প্রে‌মের আ‌বেগ অনুভব কর‌তেন অণ্ডাল তাঁর ইষ্ট‌দেবতা শ্রীরঙ্গনা‌থের প্র‌তি । তি‌নিও তাঁর প্রিয়তম রঙ্গনাথ ব্যতীত অপর কা‌কেও বিবাহ কর‌তে অস্বীকৃত হ‌য়ে‌ছি‌লেন এবং অব‌শে‌ষে এক‌দিন তাঁর আরাধ্য দেবতার শরী‌রে বিলীন হ‌য়ে গে‌ছি‌লেন , অথবা বলা যায় যেন শ্রীরঙ্গনাথ তাঁ‌কে আপনার ম‌ধ্যে আত্মসাৎ ক‌রে নি‌য়ে‌ছি‌লেন ।

তাঁর রচিত ভক্তিগীত যা অপূর্ব প্রেরণাদায়ক গীতিকাব্য ব‌লে তা‌মিল সা‌হি‌ত্যে প‌রিগ‌ণিত , সমগ্র দ‌ক্ষিণ ভার‌তে তামিল অধ্যু‌ষিত অঞ্চ‌লে সর্বত্র বি‌শেষত পে‌ৗষ মাঘ মা‌সে ঊষাকা‌লে প্রাতঃকালীন প্রার্থনা হিসা‌বে গীত হ‌য়ে থা‌কে । মীরার সমসাম‌য়িককা‌লে শ্রী‌চৈতন্য‌দেব সম্প‌র্কেও এরূপ জনশ্রুতি আ‌ছে যে , তি‌নি পুরীধা‌মে অ‌তি রহস্যজনক ভা‌বে শ্রীজগন্নাথ‌দেবের শরী‌রে লীন হ‌য়ে গে‌ছি‌লেন । তুকারাম না‌মে আর এক বিখ্যাত সাধক সম্প‌র্কেও অনুরূপ ঘটনা শোনা যায় । ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমা‌র্ধে মীরার অন্তর্ধান ঘ‌টে‌ছিল , এমন‌টি মোটামু‌টি সক‌লে বিশ্বাম ক‌রে থা‌কেন ।
লেখকঃ - Joy Shree Radha Madhav
0 comments

শিক্ষামূলক কথা: জগৎ - উদ্যান

কুরঙ্গমাতঙ্গ পতঙ্গভৃঙ্গমীনা হতাঃ পঞ্চ‌ভি‌রেব পঞ্চ ।
একঃ প্রমাদী স কথং ন হন‌্য‌তে যঃ সেব‌তে পঞ্চ‌ভি‌রেব পঞ্চ ।।

 ' মৃগ , হস্তী , পতঙ্গ , ভ্রমর ও মৎস্য - এই পঞ্চ - জীব পাঁ‌চ‌টি বিষ‌য়ের এক এক‌টির জন্য প্রাণ হা‌রি‌য়ে থা‌কে ; তাহ‌লে তো যে প্রমাদী একাই পঞ্চ - ই‌ন্দ্রিয় সেবন ক‌রে সে কেমন ক‌রে বাঁচ‌বে ? অতএব মনুষ্যমা‌ত্রেরই উ‌চিত যে , মন ও পঞ্চ - ই‌ন্দ্রি‌য়কে বিষয় থে‌কে দূ‌রে রে‌খে পরমাত্মার নিত্যযুক্ত করা ।

এই প্রস‌ঙ্গে একটা গল্প শুনুন ।

 এক চক্রবর্তী সম্রাট ঘোষণা ক‌রে‌ছি‌লেন - ' আগামীকাল যে ব্য‌ক্তি আমা‌কে দর্শন কর‌তে সক্ষম হ‌বে তা‌কে আ‌মি যুরবাজ পদ দেব । আ‌মি যে উদ্যানবা‌ড়ি‌তে বাস ক‌রি তা কাল সারা‌দিন অবারিত ( খোলা ) দ্বার থাক‌বে । যে কেউ আমার কা‌ছে আস‌তে পা‌রে । কা‌রো জন্য বাধা‌নি‌ষেধ নেই ।

 প্র‌ত্যে‌কে বা‌ড়ি‌তে ঘু‌রে বেড়াবার জন কেবল দুই ঘন্টা সময় দেওয়া হ‌বে , তার বে‌শি কাল কেউ ভিত‌রে থাক‌তে পার‌বে না । উদ্যা‌নে প্র‌বেশ ক‌রে আমার কা‌ছে আসবার জন্য কেবল আধ মি‌নির্টই য‌থেষ্ট , কারণ বা‌ড়ি‌র পথসকল সুগম ও সুলভ । অতএব যে ব্য‌ক্তি নির্ধা‌রিত সম‌য়ের ম‌ধ্যে আমার দর্শন ক‌রে নেবে তাকে যুবরাজ পদ দেওয়া হ‌বে আর যে উদ্যা‌নেই রমণ কর‌তে থাক‌বে তা‌কে দুই ঘন্টা পর বের ক‌রে দেওয়া হ‌বে । '

এই ঘোষণা রা‌জ্যের সর্বত্র প্রচা‌রিত হল । আর সকাল হ‌তেই লো‌কে উদ্যা‌নে প্র‌বেশ কর‌তে লাগল । বা‌ড়ি‌র দ্বারেই নিয়ামক - নিয়ন্ত্রণকর্তার নিবাসস্থান ছিল । সেই নিয়ন্ত্রণকর্তা উদ্যা‌নে প্র‌বেশকারী‌কে এক‌টি টি‌কিট দি‌চ্ছি‌লেন যার একটা প্র‌তি‌লি‌পি নি‌জের কা‌ছে রে‌খে দি‌চ্ছি‌লেন । এইভা‌বে অনুম‌তিপত্র নি‌য়ে লো‌কে উদ্যা‌নে প্র‌বেশ কর‌তে লাগল । উদ্যা‌নে ঢু‌কে কেউ নানারকম চা‌মে‌লি , কেওড়া , গোলাপ পু‌ষ্পের আঘ্রাণ উপ‌ভোগ ক‌রে বেড়া‌তে লাগল ; সুশীতল সুগন্ধযুক্ত বায়ু তা‌দের মুগ্ধ করে‌ছিল

আবার আরও কিছু লোক এ‌গি‌য়ে গি‌য়ে মেওয়া ও সমুধুর ফল পেড়ে খে‌তে ল‌াগল । আরও কিছু লোক আরও এ‌গি‌য়ে গি‌য়ে সার্কাস , সি‌নেমা , মিউ‌জিয়াম , নাট্য‌ভিনয় আর রত্নের স্তূপ আর সুবর্ণ রজতের মুদ্রা আর বহু ধ‌র‌ণের পূ‌র্বে না জানা , না দেখা জি‌নিস প্রত্যক্ষ করতে লাগল । কিছু লোক রমণী‌দের স‌ঙ্গে রমণ কর‌তে লাগল , আরও কিছু লোক এ‌গি‌য়ে গি‌য়ে যন্ত্রসংগীত , কন্ঠ সংগীত শুন‌তে লাগল ।

 এইভাবে লো‌কেরা উদ্যা‌নের সুখ , আরাম ও ভো‌গে যুক্ত থে‌কে রাজদর্শ‌নে নিরাশ হল এবং অজ্ঞানতার বশীভূত হ‌য়ে ভাব‌তে লাগল যে রাজ‌ার দর্শন ক‌রে কী হ‌বে ! তাদের ম‌ধ্যে একজন বৈরাগ্যযুক্ত পুরুষ ছি‌লেন যাঁর মন ই‌ন্দ্রিয় বশীভূত ছিল । তি‌নি সুখ , আরাম , স্বাদ , ভোগ আ‌দিকে দূ‌রে ঠে‌লে সোজ‌া মহারা‌জের কা‌ছে গি‌য়ে উপনীত হ‌লেন । মহারাজ তাঁ‌কে যুবরাজ পদ প্রদান কর‌লেন ।

 ব্যবস্থাপ‌কের অ‌নেক চর সেই উদ্যা‌নে ঘুর‌ছিল যারা নির্ধা‌রিত সময় শেষ হওয়া মাত্রই টি‌কিট ছি‌নি‌য়ে নি‌য়ে তাদের উদ্যা‌নের বাই‌রে বার ক‌রে দি‌চ্ছিল । কিন্তু যারা পুষ্প সুগন্ধ নি‌য়ে হাওয়া খা‌চ্ছিল তারা বলল - ' আমা‌দের আরও কিছুক্ষণ থাক‌তে দাও । ' কিন্তু দা‌রোয়ানগণ কড়া ছিল , কেউ এক মি‌নিটও বে‌শি থাক‌তে পার‌ছিল না - তারা তা‌দের ধাক্কা দি‌য়ে বের ক‌রে দি‌চ্ছিল ।

যে লোকেরা মেওয়া ও মধুর ফল খা‌চ্ছিল তারা দা‌রোয়ান‌কে বলল - ' ভাই ! আমা‌দের দুুই মি‌নিট আরও থাক‌তে দাও । আমরা মেওয়া ও ফল এক‌ত্রে ক‌রে‌ছি - বোঁচকাটা বেঁ‌ধে ফে‌লি । ' দারোয়ান জানাল -- ' এখা‌ন থে‌কে কেউ কো‌নো‌ জি‌নিস স‌ঙ্গে নি‌য়ে যে‌তে পা‌রে না । যা খে‌য়েছো তাতেই সন্তুষ্ট থা‌কো । ' এই ব‌লে দা‌রোয়ান বোঁচকা কে‌ড়ে নি‌য়ে ধাক্কা মে‌রে তা‌দের বাই‌রে বের ক‌রে দিল ।

যারা বি‌নোদন ও অভিনয় প্রভৃ‌তি দেখ‌ছিল তারা তো উঠ‌তে চাই‌ছিল না কিন্তু সেইখা‌নে কেউ এক মি‌নিটও বে‌শি থাক‌তে পা‌রে কি ? দা‌রোয়ান তা‌দের জোর ক‌রে বাই‌রে বের ক‌রে দিল । কত‌লোক টাকা , মোহর ও র‌ত্নের পুঁট‌লি ক‌রে নিল । দা‌রোয়ান জিজ্ঞাসা করল - ' এইটা কি ? ' তু‌মি পুঁট‌লি কেন বেঁ‌ধেছ ? ' তারা বলল - ' এই টাকা , মোহর ও রত্ন আমা‌দের স‌ঙ্গে নি‌য়ে যাব । ' দা‌রোয়ান তা‌দের লা‌ঠিপেটা কর‌তে কর‌তে বলল - ' মূর্খগণ ! এইগু‌লি তোমরা কেবল দর্শনই কর‌তে পার । এইখান থে‌কে কেউ এক আধলাও স‌ঙ্গে নি‌য়ে যে‌তে পার‌বে না । '

তা‌দের বাঁধা পুঁট‌লি ছে‌ড়ে যে‌তে বড় দুঃখ হ‌চ্ছিল ;‌ কিন্তু উপায় ছিল না , বাধ্য হ‌য়ে ছে‌ড়ে যে‌তেই হ‌বে । যারা রমণীসঙ্গ উপ‌ভোগ ক‌র‌ছিল তারা কিছু‌তেই বাই‌রে যে‌তে চাই‌ছিল না কিন্তু আইনত দা‌রোয়ান এক মুহূর্তও সেইখা‌নে থাক‌তে দিল না । সময় শেষ হ‌তেই দা‌রোয়ান লা‌ঠি মেরে তা‌দের বাই‌রে বের ক‌রে দিল আর যারা সংগীত আ‌দি শুন‌ছিল তারা তো জানতই না যে কত কাল অ‌তিবা‌হিত হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছে । দা‌রোয়ান তা‌দের টি‌কি‌কের নম্বর দেখে বলল - ' চলো তোমা‌দের যাওয়ার সময় হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছে । '

যারা শুন‌ছিল তারা বলল - ' আরে ভাই ! এই গানটা তো পু‌রো শুন‌তে দাও । ' দা‌রোয়ান বলল - ' তোমা‌দের সময় শেষ হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছে , তোমরা আর এক মুহূর্তও এইখা‌নে থাক‌তে পার‌বে না । ' তারাও লা‌ঠি‌পেটা খে‌য়ে উদ্যান থে‌কে বে‌রি‌য়ে এল ।

এ‌টি এক‌টি ক‌ল্পিত উদাহরণ । এ‌ক্ষে‌ত্রে ধ‌রে নি‌তে হ‌বে যে , চক্রবর্তী সম্রাট হ‌লেন ভগবান আর তাঁর উদ্যান হল এই জগৎ । রাজার ঘোষণাই শ্রু‌তি - স্মৃ‌তি আ‌দি ধর্মগ্রন্থ । লোক‌দের আসা - যাওয়াই সময় - কাল । উদ্যা‌নের জন্য নির্ধা‌রিত দুই ঘন্টা সময় হল মানু‌ষের আয়ু । রাজার দর্শন সক‌লের জন্যই প্রশস্ত তাই মানুষ মা‌ত্রের জন্য ঈশ্বর প্রা‌প্তির স্বতন্ত্রতার ঘোষণা । যুবরাজ পদই হল পরম নিঃ‌শ্রেয়স প্রা‌প্তি ।

 সহজ ও সুলভ প‌থে গি‌য়ে আধ মি‌নিটে পথ অ‌তিক্রম করাই হল ভ‌ক্তি আ‌দি উচ্চ‌কো‌টি সহজ সাধনার দ্বারা ছয় মা‌সে ঈশ্বর সাক্ষাৎকারের প‌থ । নিয়ামক ধর্মরাজ । টি‌কিট দেওয়া আয়ু । টিকি‌কের প্র‌তি‌লি‌পি রাখাই আয়ুর হিসাব । উদ্যা‌নে প্র‌বেশ ও নিষ্ক্রমণই হল মানু‌ষের জন্ম - মৃত্যু । উদ্যা‌নে প্র‌বেশ ক‌রে পুষ্পগন্ধযুক্ত বায়ু সেবনই এইখা‌নে না‌সিকা ই‌ন্দ্রিয়র বশীভূত হ‌য়ে মানু‌ষের পুষ্পমালা , আতর আ‌দি সুগ‌ন্ধে সময় নষ্ট করা ।

উদ্যা‌নে মেওয়া ও মধুর ফল ভক্ষণই জিহ্বা ই‌ন্দ্রিয় বশীভূত মানু‌ষের ভোজনা‌দি‌তে রসাস্বা‌দে সময় নষ্ট করা । উদ্যানে বি‌নোদন আ‌দি দেখা হল নেত্র ই‌ন্দ্রিয়র বশীভূত মানু‌ষের অবক্ষয়যুক্ত ক্ষণভঙ্গুর আশ্চর্যজনক পদার্থসকল দে‌খে নি‌জ অমূল্য সময় নষ্ট করা । উদ্যা‌নে রমণীসঙ্গ করা আ‌দিই এইখা‌নে স্পর্শ ইন্দ্রিয়ের বশীভূত মানু‌ষের স্পর্শা‌দি দ্বারা স্প‌র্শের যোগ্য বিনাশশীল ক্ষণভঙ্গুর পদার্থসকল উপ‌ভোগ ক‌রে নি‌জের জীব‌নকে বিপ‌দের মু‌খে নি‌য়ে যাওয়া । উদ্যা‌নে সংগীত আ‌দি শ্রবণ করা হল - ক‌র্ণে‌ন্দ্রিয় বশীভূত মানু‌ষের র‌সের কথা শ্রবণ ক‌রে নিজ অমূল্য জীব‌নকে বৃ‌থা নষ্ট করা ।

রাজার দর্শ‌নে নিরাশ হওয়া হল ঈশ্বরলা‌ভে শ্রদ্ধার ঘাট‌তির কার‌ণে সাধনায় অকর্মণ্যতা । উদ্যা‌নে সোজা রাজদর্শ‌নে গমনকারী যে মন - ই‌ন্দ্রিয় সংযমী বৈরাগ্যবান পুরুষ , সেই এইখানে পরম সাক্ষাৎকার - রূপ সি‌দ্ধি - লাভকারী উচ্চ‌কো‌টির সাধক । উদ্যা‌নে রাজদর্শনই ভগবৎ - সাক্ষাৎকার এবং যুবরাজ পদই পরমপদ প্রা‌প্তি । উদ্যা‌নে প‌রিভ্রমণকারী দারোয়ানই এই জগ‌তে ধর্মরাজের দূত । টি‌কি‌কের আয়ু শেষ হওয়াই এইখানে মানু‌ষের আয়ুর প‌রিসমা‌প্তি । উদ্যা‌নের বাই‌রে বের ক‌রে দেওয়াই মানুষ‌কে যমরা‌জের হাতে তুলে দেওয়া ।

উদ্যা‌নে ফল ও সম্প‌দের পুঁট‌লি বাঁধা হল মৃত্যুকা‌লে অজ্ঞান ও স্নেহবশত সম্পদা‌দি‌তে আসক্ত থাকা । আয়ুর প‌রিসমা‌প্তির ইচ্ছা না থাক‌লেও দা‌রোয়া‌নের লা‌ঠি‌পেটা ও ধাক্কা মেরে বাই‌রে বের ক‌রে দেওয়াই এইখা‌নে মৃত্যুর ইচ্ছা না থাক‌লেও যমদূত দ্বারা জোর ক‌রে যন্ত্রণা দি‌য়ে যমদ্বারে নি‌য়ে যাওয়া ।

উদ্যা‌নের মেওয়া , ফল , সম্পদ আ‌দি কো‌নো বস্তু স‌ঙ্গে না নি‌য়ে যে‌তে পারাই এই জগ‌তে মেওয়া মিষ্টান্ন , সম্পদ , স্ত্রী - পুত্র আ‌দি সকল এইখা‌নেই ত্যাগ ক‌রে যাওয়া , কারণ এই জগতে কি‌ঞিতমাত্রও বস্তু আজ পর্যন্ত কেউ স‌ঙ্গে ক‌রে নি‌য়ে যে‌তে পা‌রেনি , যাবেও না । তাই এই বিনাশশীল ক্ষণভঙ্গুর পদা‌র্থে ও বিষ‌য়ে বৈরাগ্য ধারণ ক‌রে মন - ই‌ন্দ্রিয়‌কে তা থে‌কে স‌রি‌য়ে পরমাত্মার নিত্যযুক্ত করা উ‌চিত ।

লেখকঃ - Joy Shree Radha Madhav
0 comments

ক‌পিল‌দেব

যত্তৎ সত্ত্বগুণং স্বচ্ছং শান্তং ভগবতঃ পদম্ ।
যদাহুর্বাসু‌দেবাখ্যং চিত্ত তম্মহদাত্মকম্ ।। ( ৩\ ২৬ \ ২১ )

ব্রহ্মার আ‌দে‌শে কর্দম মু‌নির দাম্পত্য ধর্মানু‌সা‌রে প্রজাবৃ‌দ্ধি করা এক ভয়ানক সমস্যারূ‌পে দেখা দি‌য়ে‌ছিল । সমস্যা সমাধা‌নে কর্দম মু‌নি সরস্বতী নদীর তী‌রে সুদীর্ঘ দশ সহস্র বৎসরকাল তপস্যা ক‌রে‌ছি‌লেন । সত্যযুগ আর‌ম্ভের প্রাক্কা‌লে কমলনয়ন ভগবান শ্রীহ‌রি কর্দম মু‌নির তপস্যায় তুষ্ট হ‌য়ে শব্দব্রহ্মময় রূপ ধারণ ক‌রে তাঁ‌কে দর্শন দান ক‌রেন ।

শ্রীহ‌রি দর্শন দান কা‌লে মস্ত‌কে সুবর্ণ‌নি‌র্মিত কিরীট , ক‌র্ণে দেদীপ্যমান কুণ্ডল ও হ‌স্তে শঙ্খ , চক্র , গদা ও শ্বেতপদ্ম ধারণ ক‌রে‌ছি‌লেন । তাঁর চরণকমল গরুড় স্ক‌ন্ধে সংস্থাপিত ছিল । বক্ষঃস্থ‌লে ছি‌লেন শ্রীলক্ষ্মীদেবী আর গলায় ছিল কে‌ৗস্তুভম‌ণি । শ্রীভগবান তখন অ‌নিন্দ্যসুন্দর জ্যো‌তির্ময় মূ‌র্তি‌তে আ‌বির্ভূত হ‌য়ে‌ছি‌লেন ।

কর্দম মু‌নি শ্রীভগবা‌নকে জানা‌লেন যে তি‌নি কো‌নো উপযুক্ত ও গার্হস্থ্য ধর্মানুকূল শীলবতী রমণী‌কে ভার্যারূ‌পে লাভ করবার অ‌ভিলা‌ষে তাঁর শরণাগত হ‌য়ে‌ছেন । কর্দম মু‌নি শ্রীভগবা‌নের স্তবস্তু‌তিও কর‌লেন ।

শ্রীভগবান বল‌লেন - ' হে কর্দম ! তোমার আত্মসংযম ও আরাধনায় আ‌মি প্রসন্ন হ‌য়ে‌ছি । তোমার অ‌ভিলাষ পূর্ণ করবার ব্যবস্থা তো হ‌য়েই আ‌ছে । আগামী পরশু পৃ‌থিবীর শাসক বিরাটকী‌র্তি স্বায়ম্ভুব মনু তাঁর ভার্যা শতরূপা‌কে স‌ঙ্গে নি‌য়ে তোমার নিক‌টে আস‌বেন । তাঁ‌দের কন্য রূপ - যৌবনসম্পন্না , সুশীলা , সদ্গুণা‌ন্বিতা , কৃষ্ণ‌লোচনা ও বিবাহ‌যোগ্য । তাঁরা সেই যোগ্য কন্যাই তোমাকে সম্প্রদান কর‌বেন । তোমাদের থে‌কে নয়‌টি কন্যা - সন্তান হ‌বে । মরী‌চি আ‌দি তাঁ‌দের বিবাহ কর‌বেন ।
তু‌মিও আমার আজ্ঞায় কর্মসকল অনুষ্ঠান করে শুদ্ধসত্ত্বময় হ‌য়ে সকল কর্মফল আমা‌তে সমর্পণ ক‌রে আমা‌কেই লাভ কর‌বে । সর্বজী‌বে দয়া ক‌রে তু‌মি আত্মজ্ঞান লাভ কর‌বে এবং আমা‌কে তোমার ম‌ধ্যে স্থিত দেখ‌বে । হে মহামু‌নি ! আ‌মিও নিজ অংশকলা রূ‌পে তোমার ম‌ধ্যে দি‌য়ে তোমার পত্নী দেবহূ‌তির গ‌র্ভে অবতীর্ণ হ‌য়ে তত্ত্বসং‌হিতা ( সাংখ্য শাস্ত্র ) প্রণয়ন কর‌র । '

শ্রীভগবান নিজ ধা‌মে গমন কর‌লেন আর মহ‌র্ষি কর্দম শ্রীহ‌রির উপ‌দিষ্ট সম‌য়ের জন্য তপস্যা‌ক্ষেত্র বিন্দু স‌রোব‌রের তী‌রেই অবস্থান ক‌রে রই‌লেন । যথাসম‌য়ে আ‌দিরাজ স্বায়ম্ভুব মনু কন্যাসহ শ্রেষ্ঠ তীর্থস্বরূপ সেই আশ্র‌মে প্র‌বেশ ত‌রে দেখ‌লেন যে মু‌নিবর কর্দম অ‌গ্নি‌তে হোম সম্পাদন ক‌রে আস‌নে উপ‌বিষ্ট । মহ‌র্ষি তখন উন্নতকায় , পদ্মপলাশ‌লোচন , জটাজুট সু‌শো‌ভিত ও চীরব‌সনেও দ্যু‌তিসম্পন্ন । মহ‌র্ষি কর্দম স্বায়ম্ভুব মনুর নানাবিধ গুণ ও ক‌র্মের উৎকর্ষ কীর্তন কর‌লেন ।

আত্মপ্রশংসায় ল‌জ্জিত সম্রাট মনু তখন বল‌লেন - ' হে মু‌নিপ্রবর ! নারদমু‌নির কাছ থে‌কে আপনার সুখ্যা‌তি শ্রবণ ক‌রে আমার কন্যা আপনা‌কে প‌তি‌ত্বে বরণ কর‌তে অ‌ভিলাষী । আ‌মি অতীব শ্রদ্ধা সহকা‌রে এই কন্যা‌কে আপনার হ‌স্তে সম্প্রদান কর‌ছি । আপ‌নি এ‌কে গ্রহণ করুন । গার্হস্থ্য ধ‌র্মের সমস্ত ক‌র্মে সর্ব‌তোভা‌বে এই কন্যা আপনার উপযুক্ত । ' মহ‌র্ষি কর্দম কন্যা‌কে গ্রহণ করবার সময়ে বল‌লেন - ' সন্তান উৎপাদনকাল পর্যন্ত আ‌মি গার্হস্থ্য ধর্মানু‌সা‌রে এঁর স‌ঙ্গে থাকব । অতঃপর শ্রীভগবা‌নের উপ‌দিষ্ট সন্ন্যাসপ্রধান অ‌হিংসা ধ‌র্মের সঙ্গে শম - দমা‌দি ধর্মসকল পালন করব । '

মহ‌র্ষি কর্দম ও দেবহূ‌তির বিবাহনুষ্ঠান সম্পন্ন হ‌য়ে গে‌লে কন্যার পিতা ও মাতা মনু ও শতরূপা স্ব‌দে‌শে প্রস্থান কর‌লেন । দেবহূ‌তি কাম , দম্ভ , বাসনা , লোভ , পাপ ও গর্ব প‌রিত্যাগ ক‌রে বিশ্বাস , প‌বিত্রতা , গৌরব , সংযম , শুশ্রূষা , প্রেম ও মধুরবাক্যা‌দি সদ্গুণ দ্বারা পরম তেজস্বী পতি‌দেবতা‌কে সন্তুষ্ট কর‌তে লাগ‌লেন । কমলনয়না দেবহূ‌তি প‌তি মহ‌র্ষি কর্দ‌মের আ‌দেশ অনুসা‌রে সরস্বতী নদীর প‌বিত্র জ‌লের আধার বিন্দ‌ু সরোব‌রে স্নান ক‌রে প‌তির যোগশ‌ক্তির বিভূ‌তি দে‌খে বি‌স্মিত হ‌য়ে গে‌লেন । দেব - দাম্পত্য শুরু হল ।

অনন্তর দেবহূ‌তি সর্বাঙ্গসুন্দর নয়‌টি কন্যাসন্তান প্রসব কর‌লেন । এ‌ইসময় শুদ্ধাসত্ত্বা সতী দেবহূ‌তি দেখ‌লেন যে পূর্বপ্র‌তিজ্ঞানুসা‌রে তাঁর প‌তি‌দেব সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণ ক‌রে বনগম‌নে উদ্যাত হয়ে‌ছেন । তখন দেবহূ‌তি অত্যন্ত ব্যাক‌ুল হ‌য়ে স্বামী‌কে বল‌লেন - ' আপ‌নি সন্ন্যাসী হ‌য়ে চ‌লে গে‌লে আপনার এই কন্যা‌দেরই তা‌দের যোগ্য পাত্র জোগাড় কর‌তে হ‌বে এবং আমার জন্ম - মরণরূপ বন্ধন থে‌কে মু‌ক্তির জন্য সদ্গুরুর প্র‌য়োজন হ‌য়ে পড়‌বে । আ‌মি শ্রীভগবা‌নের মায়ায় আপনার ম‌তো প‌তি‌দেবতা‌কে লাভ ক‌রেও সংসার বন্ধন থে‌কে মু‌ক্তিলা‌ভের জন্য চেষ্টা ক‌রি‌নি । '

দেবহূ‌তির কথায় মহ‌র্ষি কর্দ‌মেরর শ্রীভগবা‌নের দেওয়া আশ্বাস - বাণী ম‌নে পড়ল । তি‌নি তখন দেবহূ‌তি‌কে বল‌লেন - ' শ্রীভগবান স্বয়ং অংশকলারূ‌পে তোমার গ‌র্ভে আ‌বির্ভূত হ‌য়ে তোমা‌কে ব্রহ্মজ্ঞা‌নো‌পদেশ দান কর‌বেন । অতএব তু‌মি এখন শ্রীভগবা‌নের আরাধনায় প্রবৃত্ত হও । '
যথাসম‌য়ে শ্রীভগবান দেবহূ‌তির গ‌র্ভে পুত্ররূ‌পে জন্মগ্রহণ ক‌রে‌লেন । এই পুত্রই কপিল না‌মে প‌রি‌চিত । অতঃপর কর্দম মু‌নি তাঁর নয়‌টি কন্যার উপযুক্ত প‌তি সন্ধান ক‌রে তা‌দের সম্প্রদান ক‌রে সন্ন্যাস গ্রহ‌ণে কৃতসংকল্প হ‌লেন । কর্দম ঋ‌ষি তাঁর কলা নাম্নী কন্যা‌কে মরী‌চির হ‌স্তে , অন্সূয়া‌কে অ‌ত্রির হ‌স্তে , শ্রদ্ধা‌কে অ‌ঙ্গিরার হ‌স্তে , হ‌বির্ভূ‌কে পুলস্ত‌রে হ‌স্তে , গ‌তি‌কে পুল‌হের হ‌স্তে , ক্রিয়া‌কে ক্রত‌ুর হ‌স্তে । খ্যা‌তি‌কে ভৃগুর হ‌স্তে , অরুদ্ধতী‌কে ব‌শিষ্ঠ ও শা‌ন্তি‌কে অথর্বা ঋ‌ষির হ‌স্তে সম্প্রদান কর‌ে‌ছি‌লেন ।
এ‌দি‌কে সাক্ষাৎ দেবা‌দি‌দেব শ্রীহ‌রিই তাঁর গৃ‌হে অবতীর্ণ হ‌য়ে‌ছেন বুঝ‌তে পে‌রে কর্দম ঋ‌ষি একা‌ন্তে তাঁ‌কে প্রণাম করে বল‌লেন - ' তোমা‌কে আমার গৃ‌হে অবতরণ কর‌তে দে‌খে ধন্য হ‌য়ে‌ছি ।

 হে প্রভু ! তু‌মি ভ‌ক্তের সম্মান বৃ‌দ্ধি ক‌রে থাক । তু‌মি নিজ সত্য পালনা‌র্থে এবং সাংখ্য‌যোগ প্রচার করবার জন্যই আমার গৃ‌হে পদার্পণ ক‌রে‌ছে । সাধকগণ তত্ত্বজ্ঞানলা‌ভের ইচ্ছায় সর্বদাই তোমার পাদপীঠ বন্দনা ক‌রেন । ঐশ্বর্য , বৈরাগ্য , যশ , জ্ঞান , ব‌ীর্য ও শ্রী - এই ষ‌ড়ৈশ্ব‌র্যে তু‌মি প‌রিপূর্ণ । আমি তোমার শরণাগত হলাম । হে প্রভু ! তোমার কৃপ‌ায় আ‌মি ঋণত্রয় থে‌কে মুক্ত । এইবার আ‌মি সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণ ক‌রে তোমার চিন্তা কর‌তে কর‌তে সমস্ত দৈন্য থে‌কে মুক্ত হ‌য়ে ভূমণ্ড‌লে বিচরণ করব । অনুম‌তি দাও । '

শ্রীভগবান বল‌লেন - ' হে মু‌নিবর ! বৈ‌দিক ও লৌ‌কিক সমস্ত রক‌মের ক‌র্মে আমার বাক্যই প্রামাণ্য । এই জগ‌তে মু‌ক্তিকামী আত্মদর্শ‌নের উপ‌যোগী তত্ত্বা‌দি জ্ঞান সম্পাদ‌নের জন্য ও তা পুনঃপ্র‌ব‌র্তিত করবার জন্যই আমার অাগমন । হে মু‌নিবর ! আ‌মি অনুম‌তি দিলাম । তু‌মি স্বেচ্ছায় প্রস্থান ক‌রো আর সমস্ত কর্মফল আমা‌তে আহু‌তি দি‌য়ে দূর্জয় মৃত্যু‌কে অ‌তিক্রম ক‌রে মোক্ষপদ লা‌ভের জন্য আমার ভজনায় নিত্যযুক্ত হও । '

শ্রীভগবান বল‌লেন - ' হে মু‌নিবর ! বৈ‌দিক ও লৌ‌কিক সমস্ত রক‌মের ক‌র্মে আমার বাক্যই প্রামাণ্য । এই জগ‌তে মু‌ক্তিকামী আত্মদর্শ‌নের উপ‌যোগী তত্ত্বা‌দি জ্ঞান সম্পাদ‌নের জন্য ও তা পুনঃপ্র‌ব‌র্তিত করবার জন্যই আমার অাগমন । হে মু‌নিবর ! আ‌মি অনুম‌তি দিলাম । তু‌মি স্বেচ্ছায় প্রস্থান ক‌রো আর সমস্ত কর্মফল আমা‌তে আহু‌তি দি‌য়ে দূর্জয় মৃত্যু‌কে অ‌তিক্রম ক‌রে মোক্ষপদ লা‌ভের জন্য আমার ভজনায় নিত্যযুক্ত হও । '

আদেশ পে‌য়ে প্রজাপ‌তি কর্দম ঋ‌ষি শ্রীভগবান‌কে প্রদ‌ক্ষিণ ক‌রে হৃষ্ট‌চি‌ত্তে বনগমন কর‌লেন । বনগম‌নের পূ‌র্বে তি‌নি তাঁর কাছে এই প্র‌তিশ্রু‌তি লাভ ক‌রে‌ছি‌লেন যে ভার্যা দেবহূ‌তি‌কেও সমস্ত কর্মবন্ধন থে‌কে নিষ্কৃ‌তি প্রদানকারী আত্মজ্ঞান তি‌নিই দে‌বেন । কা‌লে কর্দম ঋ‌ষির ব‌ু‌দ্ধি অন্তর্মুখী ও নিস্তরঙ্গ সমু‌দ্রের মতন শান্ত হ‌য়ে গেল । পরমভক্তিভা‌বের দ্বারা সর্বান্তর্যামী সর্বজ্ঞ ভগবান বাসু‌দে‌বে চিত্ত স্থির হ‌য়ে যাওয়া‌তে তি‌নি সমস্ত বন্ধন থে‌কে মুক্ত হ‌য়ে গে‌লেন । সর্বভূ‌তে নিজ আত্মা শ্রীভগবান‌কে এবং শ্রীভগবা‌নের ম‌ধ্যে সর্বভূত‌কে দর্শন ক‌রে তি‌নি ইচ্ছা‌দ্বেষর‌হিত সমদর্শী হ‌য়ে ভ‌ক্তি‌যো‌গের সাধনদ্বারা শ্রীভগবান‌কে পরমপদ লাভ কর‌লেন ।

পিতা কর্দম ঋ‌ষি সন্ন্যাস গ্রহণ করে ব‌নে চ‌লে যাওয়ার পর ভগবান ক‌পিল জননীর কল্যাণ সাধ‌নের জন্য সেই বিন্দু স‌রোবর তী‌র্থেই অবস্থান কর‌তে লাগ‌লেন । এক‌দিন তত্ত্ব‌বেত্তা ভগবান ক‌পিল কর্ম সম্পাদন ক‌রে নিজাস‌নে উপ‌বিষ্ট ছি‌লেন । তখন দেবহূ‌তি তাঁ‌কে প্রশ্ন কর‌লেন ।

' দেবহূ‌তি বল‌লেন - ' হে বিরাট ! হে প্রভু ! দুষ্ট ই‌ন্দ্রিয়বর্গ ভো‌গের আস‌ক্তি‌তে আমা‌কে অ‌স্থির ক‌রছে আর আমা‌কে ঘোর অন্ধকারময় অজ্ঞা‌নে আবদ্ধ রে‌খে‌ছে । তু‌মি সমস্ত জী‌বের প্রভু ভগবান আ‌দিপুুরুষ তথা অজ্ঞানান্ধকা‌রে অন্ধ জী‌বের কা‌ছে নেত্রস্বরূপ সূ‌র্যের মতন উ‌দিত হ‌য়েছ । এই দেহ - গে‌হের প্র‌তি ' আ‌মি , আমার ' রূপ দুরাগ্রহ তোমারই দেওয়া , তাই তু‌মিই এই মহা‌মোহ দূর ক‌রো । তু‌মি তোমার ভক্তজ‌নের সংসাররূপ বৃক্ষ ছেদ‌নের কুঠারস্বরূপ । আ‌মি তোমার শরণাগত - প্রকৃ‌তি ও পুরু‌ষের তত্ত্বজ্ঞান লা‌ভের অ‌ভিলাষী । তু‌মি শ্রেষ্ঠ ভাগবত‌বেত্তা । তোমা‌কে প্রণাম কর‌ছি । '
ভগবান ক‌পিল বল‌লেন -- ' হে মাতা ! অধ্যাত্ম‌যোগই মানু‌ষের আত্য‌ন্তিক কল্যা‌ণের মুখ্য সাধন । এই যোগ প্রাকৃত সুখ ও দুঃখ নিবারণ ক‌রে । জী‌বের চিত্তই তার বন্ধন ও মু‌ক্তির কারণ । বিষয় চিত্ত বন্ধ‌নের কারণ আর পরমাত্মায় চি‌ত্তের মুক্তি । মানব মন যখন দেহা‌দি‌তে অহংবু‌দ্ধি ও গেহা‌দি‌তে মমত্ববু‌দ্ধিজ‌নিত কাম , লোভ আ‌দি বিকার থে‌কে মুক্ত হ‌য়ে শুদ্ধ নির্মল হ‌য়ে যায় তখন সেই মন সুখ - দুঃখর‌হিত হ‌য়ে সমভাবাপন্ন অবস্থায় এসে যায় ।

তখন জীব নিজ জ্ঞান - বৈরাগ্য ও ভ‌ক্তিযুক্ত হৃদ‌য়ে আত্মা‌কে সম্পর্কর‌হিত , একমেবা‌দ্বিতীয় , ভেদর‌হিত , অখণ্ড , স্বয়ং প্রকাশ , নি‌র্লিপ্ত ও সুখ - দুঃখর‌হিত রূ‌পে দর্শন ক‌রে এবং প্রকৃ‌তি‌কে দুর্বল ম‌নে ক‌রে ।যোগী‌দের কা‌ছে ভগবৎপ্রা‌প্তি‌র জন্য সর্বাত্মা শ্রীহ‌রির প্র‌তি একান্ত ভ‌ক্তি ছাড়া অন্য কোনো কল্যাণকর পথ নেই । বি‌বেকযুক্ত ব্য‌ক্তি জান‌তে পা‌রে যে আস‌ক্তি হল জীবাত্মার দৃঢ় বন্ধনপাশ আর তা সাধুমহাত্মা‌দের দি‌কে ঘু‌রি‌য়ে দি‌লে তবে মোক্ষ দ্বার উন্মুক্ত হয় । যারা স‌হিষ্ণু , দয়াল‌ু ,জী‌বে সমভাবাপন্ন , দ্বেষর‌হিত , শান্ত , সরল ও সজ্জন‌দের প্র‌তি সম্মান প্রদর্শনকারী , অনন্য ভ‌ক্তিসম্পন্ন , ঈশ্বর লা‌ভের জন্য স্বজন ও কর্ম প‌রিত্যাগী এবং মদ্গত‌চি‌ত্তে ভগবা‌নের প‌বিত্র লীলা শ্রবণ - কীর্তন ক‌রে , তা‌দের ত্রিতাপ ব্য‌থিত কর‌তে সক্ষম হয় না ।

হে মাতা ! এই সর্বসঙ্গপ‌রিত্যাগী মহাপুরুষগণই সাধু । সাধুসঙ্গই আসক্তি জ‌নিত সমস্ত দোষ হরণ ক‌রে নেয় । '
‌দেহহূ‌তি প্রশ্ন কর‌লেন -- ' হে ভগবান ! ভ‌ক্তির স্বরূপ কী ? যে যো‌গের দ্বারা তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয় , তার লক্ষণ কী ? সরল ক‌রে ব‌লো । '
শ্রীভগবান বল‌লেন - ' হে মাতা ! বেদ‌বি‌হিত ক‌র্মে নিরত ও বিষয়া‌দি‌র জ্ঞানপ্রকাশকারী ই‌ন্দ্রিয়া‌দির ও একাগ্র‌চি‌ত্তে পুরু‌ষের শুদ্ধসত্ত্বময় শ্রীহ‌রির প্র‌তি যে নিষ্কাম আকর্ষণ তার নামই ভগবা‌নে অ‌হৈতুকী ভ‌ক্তি । এই ভ‌ক্তি মু‌ক্তির চে‌য়েও শ‌ক্তিশালী কারণ তা কর্মসংস্কারের আধাররূপ লিঙ্গ শরীর‌কেও অবিল‌ম্বে ভস্মীভূত ক‌রে ।

ভগবানের সেবায় নিত্যযুক্ত ও তাঁর প্রসন্নতা অর্জনের জন্য কর্মানুষ্ঠানকারী এক‌নিষ্ঠ ভক্তগণ সম‌বেত লীলা সংকীর্তন কা‌লে আমার সাযুজ্য মোক্ষও কামনা ক‌রে না । এই ভক্তিই তা‌দের ব্রহ্মানন্দ লাভ ক‌রি‌য়ে থা‌কে । তারা ঐশ্বর্য কামনা ক‌রে না কিন্তু বৈকু‌ন্ঠধা‌মে গমন ক‌রে সেই সকল বিভূ‌তি স্বাভাবিকভা‌বেই লাভ করে থা‌কে । অনন্য ভক্ত‌কে আ‌মি ভবসাগর পার ক‌রি‌য়ে দি‌য়ে থা‌কি । তীব্র ভ‌ক্তি‌যো‌গের দ্বারা আমা‌তে চিত্ত সমা‌হিত কর‌াই হল এই জগ‌তে মানু‌ষের প‌ক্ষে পরম পুরুষার্থ লাভ ।
' হে মাতা ! পঞ্চ‌বিংশতি তত্ত্ব জান‌লে পুরুষ প্রকৃ‌তির গুণ অর্থাৎ অহংকারা‌দি থে‌কে মুক্ত হ‌তে পা‌রে । এই পঞ্চ‌বিংশ‌তি তত্ত্ব এইরকম ---
পুরুষ এবং পঞ্চমহাভূত ( ক্ষি‌তি , অপ , তেজ , মরুৎ , ব্যোম ) ,
পঞ্চতম্মাত্র ( গন্ধ , রস , রূপ , স্পশ , শব্দ ) ,
অন্তকরণ ( মন , বু‌দ্ধি , চিত্ত , অহংকার ) ,
পঞ্চ ক‌র্মে‌ন্দ্রিয় ( বাক্ , পা‌ণি , পাদ , পায়ু , উপস্থ ) ও
পঞ্চ জ্ঞা‌নে‌ন্দ্রিয় ( চক্ষু , কর্ণ , না‌সিকা , জিহ্বা , ত্বক্ ) । '
' পুরুষ অনা‌দি ( নিত্য ) , নির্গুণ , সর্বব্যাপী ও অনন্ত । তি‌নি হ‌লেন স্বপ্রকাশ ও চৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মা , ত্রিগুণময়ী প্রকৃ‌তি থে‌কে সম্পূর্ণ ভিন্ন । জড় জগ‌তের প্রকাশ পুরু‌ষের শ‌ক্তিদ্বারাই হ‌য়ে থা‌কে । এই পরমাত্মারূ‌প পুরুষ সৃ‌ষ্টি‌তে স‌চেষ্ট হলে নিজ ত্রিগুণা‌ত্মিকা শ‌ক্তি যা প্রকৃ‌তি না‌মে প‌রি‌চিত তা তার সম্মু‌খে উপ‌স্থি‌ত হয় । পুরুষ তা‌কে স্বীকার কর‌লে সৃ‌ষ্টি হয় । '

" সত্ত্বগুণপ্রধান , নির্মল , শান্ত ( বাসনা‌দির‌হিত ) , ভগবৎ উপল‌ব্ধি স্থান যে চিত্ত তাই মহতত্ত্ব এবং তা‌কেই ' বাসু‌দেব ' বলা হয় । ভূত , ই‌ন্দ্রিয় ও মনরূপ অহংকার‌কেই প‌ণ্ডিতগণ সাক্ষাৎ ' সংকর্ষণ ' নামক সহস্রশীর্ষ অনন্ত‌দেব ব‌লে থা‌কেন । ম‌নের সংকল্প ও বিকল্প দ্বারাই কামনার উৎপ‌ত্তি হয় । মনস্তত্ত্বই ই‌ন্দ্রিয়গ‌ণের অধীশ্বর ' অ‌নিরুদ্ধ ' না‌মে প্রসদ্ধি । "

" শ্রীভগবান বল‌লেন -- হে মাতা ! তৈজস অহংকার বিকারপ্রাপ্ত হ‌লে তার থে‌কে ' বু‌দ্ধি ' নামক তত্ত্ব উৎপন্ন হয় । বিষ‌য়ের প্রকাশরূপ বিজ্ঞান এবং ই‌ন্দ্রিয়‌বিষ‌য়ে সহায়ক হওয়া ও পদার্থসমূ‌হের বি‌শেষ জ্ঞান উৎপাদন - এ‌ই হল বু‌দ্ধিত‌ত্ত্বের কার্য । বৃ‌ত্তি‌ভেদ অনুসা‌রে সংশয় , বিপর্যয় ( বিপরীত জ্ঞান ) , নিশ্চয় , স্মৃ‌তি এবং নিন্দ্রাও ব‌ু‌দ্ধিরই লক্ষণ । এই বু‌দ্ধিতত্ত্বই ' প্রদ্যুম্ন ' । "

তদনন্তর ক‌পিল‌দেব মাতা‌কে ম‌নের মা‌লিন্য দূর করবার জন্য‌ পরি‌মিত আহার , শ্রীভগবানের স্মরণ - মনন , ব্রহ্মচর্য , তপস্যা , অষ্টাঙ্গ যোগ সাধন ইত্যা‌দির উপ‌দেশ দি‌লেন । শ্রীভগবা‌নের যে মূ‌র্তি‌তে সাধন মন স্থির ক‌রে থা‌কে , তার বর্ণনা দি‌লেন ।

ক‌পিল‌দেবের সবিস্তা‌রে দান করা উপ‌দেশসকল মাতা দেবহূ‌তি মন দি‌য়ে শুন‌লেন । পুত্ররূ‌পে অবতীর্ণ শ্রীভগবান ক‌পিল‌দেব মাতা‌কে মুক্তিমা‌র্গের সন্ধান দি‌লেন । ধ্যান‌যোগ অবলম্বন ক‌রে শ্রীভগবানের নি‌র্দে‌শিত প‌থে সাধনা ক‌রে মাতা অ‌চি‌রেই বা‌ঞ্ছিত মু‌ক্তি লাভ ক‌রে‌ছি‌লেন ।

মহা‌যোগী ভগবান ক‌পিলদেবও মাতৃ আজ্ঞা শি‌রোধার্য ক‌রে পিতার আশ্রম থে‌কে বে‌রি‌য়ে ঈশানকো‌ণের দি‌কে চ‌লে গেলেন । সেখা‌নে স্বয়ং সমুদ্র তাঁর পূজার্চনা করেন ও তাঁকে স্থান দেন । ত্রি‌লোকে শা‌ন্তি প্রদা‌নের জন্য তি‌নি যোগযুক্ত হ‌য়ে সমা‌ধিন্থ হন ।

লেখকঃ - Joy Shree Radha Madhav
0 comments

পৃথু উপাখ্যান - শেষ পর্ব

ভগবান ব্রহ্মা অতঃপর মহারাজ পৃথু‌কে বল‌লেন - ' রাজন্ ! আপ‌নি মোক্ষধর্মজ্ঞ । আপনার এই যজ্ঞানুষ্ঠা‌নের প্র‌য়োজন নেই । আপ‌নি ও ই‌ন্দ্র দুইজনই প‌বিত্রকী‌র্তি ভগবান শ্রীহ‌রির মূ‌র্তি , সুতরাং আপনার স্বরূপভূত ই‌ন্দ্রের প্র‌তি আপনার কু‌পিত হওয়া উ‌চিত নয় । তাঁর প্র‌তি বৈরীভাব প‌রিহার করুন । '
যজ্ঞ‌ভোক্তা য‌জ্ঞেশ্বর সর্বশ‌ক্তিমান ভগবান শ্রী‌বিষ্ণু মহারাজ পৃথুর উপর সন্তুষ্ট ছি‌লেন । তি‌নি তখন ইন্দ্র‌কে স‌ঙ্গে নি‌য়ে পৃথুর নিক‌টে উপ‌স্থিত হ‌লেন ।

ভগবান শ্রী‌বিষ্ণু বল‌লেন - ' রাজন্ ! এই ইন্দ্র তোমার য‌জ্ঞে বিঘ্ন উৎপাদন করে‌ছে তাই সে সন্তপ্ত । তু‌মি তাঁ‌কে ক্ষমা ক‌রে দাও । '

হে নর‌দেব ! যাঁরা সাধুপ্রকৃ‌তির ও সদ্বু‌দ্ধিসম্পন্ন নর‌লোকন তাঁরা শ্রেষ্ঠ । কো‌নো জী‌বের উপায় তাঁরা দ্রোহ পোষন ক‌রেন না । তোমার মতন ব্য‌ক্তিও য‌দি আমার দৈবী মায়ায় মো‌হিত হয় তাহ‌লে তো বল‌তে হয় যে জ্ঞানীজ‌নের দীর্ঘকাল সেবা ক‌রে তু‌মি বৃথা প‌রিশ্রম ক‌রেছ । আত্মজ্ঞানী ব্য‌ক্তি এই দেহ‌কে কেবলমাত্র অ‌বিদ্যা , বাসনা ও কর্মদ্বারা মো‌হিত জে‌নে এর প্র‌তি আসক্ত হয় না । এইভা‌বে যার দে‌হের উপরই আস‌ক্তি নেই সেই বি‌বেকযুক্ত ব্য‌ক্তি দে‌হের মাধ্য‌মে স্বীকৃত গৃহ , পুত্র অথবা ধনসম্প‌দের উপর কেমন ক‌রে আসক্ত হ‌বে ?

আত্মা এক ও অ‌দ্বিতীয় , শুদ্ধ , স্বপ্রকাশ , নির্গুণ , গুণাশ্রয় , সর্বব্যাপী , আবরণর‌হিত , সর্ব‌বিষ‌য়ে সাক্ষী , অ‌ধিষ্ঠানর‌হিত । অতএব দেখা যা‌চ্ছে যে আত্মা দেহ থে‌কে সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্তা । যার এই জ্ঞ‌ান হ‌য়ে‌ছে , তার বিষয়াস‌ক্তি থা‌কে না ; তত্ত্বজ্ঞান লাভ ক‌রে সে তখন ব্রহ্মানন্দে প্র‌তি‌ষ্ঠিত হয় - মোক্ষ লাভ ক‌রে । '
শ্রীভগবান পৃথু‌কে আবার বল‌লেন - ' হে বীর ! তু‌মি উত্তম মধ্যম ও অধম সক‌লের প্র‌তি সমদর্শী হ‌য়ে , সুখ ও দুঃ‌খে সমভাবাপন্ন থে‌কে এবং মন ও ই‌ন্দ্রিয়বর্গ‌কে জয় ক‌রে প্রজাপালন ক‌রো , তা‌তেই তু‌মি পরম শা‌ন্তি ও পরমপদ লাভ ক‌রবে । অতএব পুণ্যাত্মা ব্রাহ্মণ‌দের অনু‌মো‌দিত এবং সনাতন ধর্ম‌কেই প্রাধান্য দি‌য়ে ও অন্য সকল বিষ‌য়ে নিরাসক্ত হ‌য়ে এই পৃ‌থিবী শাসন ক‌রো । সক‌লেই তোমার গৃ‌হে সনকা‌দি সিদ্ধগ‌ণের দর্শন লাভ কর‌বে । তোমার গুণ ও চ‌রিত্রমাহাত্ম্য আমা‌কে প্রসন্ন ক‌রে‌ছে । তু‌মি ইচ্ছা মতন বর প্রার্থনা করে নাও । '

শ্রীভগবা‌নের আ‌দে‌শে মহরাজ পৃথু ই‌ন্দ্রের উপর তাঁর অসন্তোষ ত্যাগ কর‌লেন । কৃতক‌র্মের জন্য ল‌জ্জিত ইন্দ্র তাঁর পাদস্পর্শ ক‌রে ক্ষমা চাই‌তে উদ্যত হ‌লে পৃথু তাঁ‌কে প্রী‌তিভ‌রে আ‌লিঙ্গন কর‌লেন । অতঃপর মহারাজ পৃথু বিশ্বাত্মা ভক্তবৎসল ভগবান‌কে পূ‌জোপহার নি‌বেদন ক‌রে পরম ভ‌ক্তি সহকা‌রে তাঁর চরণকমলযুগল ধারণ কর‌লেন । বদ্ধাঞ্জ‌লি আ‌দিরাজ পৃথু নয়নযুগল প্রেমাশ্রুধারায় প্লা‌বিত হওয়ায় শ্রীভগবান‌কে দর্শন কর‌তে সক্ষম হ‌চ্ছি‌লেন না , কন্ঠ কল্পরুদ্ধ হ‌ওয়ায় কিছু বল‌তেও পারছিলেন না ।
তি‌নি শ্রীভগবান‌কে আ‌লিঙ্গন ক‌রে নিজ হৃদয়ে ধারণ কর‌লেন ও সেইভা‌বেই অবস্থান কর‌তে লাগ‌লেন । অব‌শে‌ষে পৃথু নি‌জে‌কে সংযত ক‌রে অতৃপ্ত নয়‌নে শ্রীভগবান‌কে দেখ‌তে লাগ‌লেন । শ্রীভগবা‌নের পাদপদ্ম ভূ‌মি স্পর্শ ক‌রে‌ছিল আর করাগ্র গরু‌ড়ের উন্নত স্কন্ধে বিন্যস্ত ছিলেন ।

অব‌শে‌ষে পৃথু বল‌তে লাগ‌লেন - ' হে মোক্ষপ‌তি প্রভু ! আপ‌নি ব্রহ্মা আ‌দি রবদাতা দেবতাগণ‌কেও রবদা‌নে সমর্থ । বিষয়সু‌খের মতন তুচ্ছ পদার্থ আ‌মি আপনার কা‌ছে প্রার্থনা ক‌রি না । মহাপুরু‌ষগ‌ণের মুখ‌নিঃসৃত আপনার লীলাগুণগান যেখা‌নে নেই তা য‌দি মোক্ষপদও হয় ও ত‌বে তাও আ‌মি চাই না । '
তি‌নি আ‌রো বল‌লেন - ' হে অনন্তকী‌র্তি ! আপনার মঙ্গয়ময় কী‌র্তিকথা একবার যে শ্রবণ ক‌রেছে সে য‌দি নিতান্তই পশুপ্রকৃ‌তির না হয় সে সতত তাই শ্রবণ কর‌তে আগ্রহী হবে । আপ‌নি আমা‌কে অসংক্য কর্ণ তথা শ্রব‌ণন্দ্রিয় দান করুন যা‌তে প্রাণ - ভ‌রে আপনার গুণকথা শ্রবণ কর‌তে পা‌রি । কেবলমাত্র দুই‌টি কা‌নে আপনার গুণকথা শু‌নে তৃ‌প্তি পা‌চ্ছি না । এই আমার প্রার্থনা । '

এইভা‌বে মহারাজ পৃথ‌ু শ্রীভগবা‌নের স্তু‌তি কর‌তেন লাগ‌লেন । তাঁর স্তু‌তি শ্রবণ ক‌রে সর্বসাক্ষী ভগবান শ্রীহ‌রি তাঁ‌কে বল‌লেন - ' রাজন্ ! আমার প্র‌তি তোমার ভ‌ক্তি হোক । মায়ার প্রভাব ত্যাগ ক‌রে তোমার চিত্ত যে আমা‌তে এইভা‌বে অনুরক্ত হ‌য়ে‌ছে তা অত্যন্ত সৌভাগ্যের কথা । এখন তু‌মি নি‌শ্চি‌ন্তে আমার আ‌দেশ পালন করো । তোমার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল হোক । '

মহার‌াজ পৃথুর পূজার্চনা গ্রহণ ক‌রে সকল অনুগ্রহ বর্ষণ ক‌রে শ্রীভগবান প্রস্থা‌নে উদ্যত হ‌লেন । মহারাজ পৃথু সমাহত দেবতা , ঋ‌ষি , পিতৃপুরুষ , গর্ন্ধব , সিদ্ধ , চারণ , নাগ , কিন্নর , অপ্সরা , মানব , পক্ষী ও অন্যান্য বহু‌বিধ প্রাণী ও শ্রীভগবা‌নের পার্ষদগণ - সক‌ল‌কেই ভ‌ক্তিপূর্বক সম্ভাষণ ও দ‌ক্ষিণা‌দি ধনদ্বারা যুক্তক‌রে সম্মান জ্ঞাপন করলেন । ভগবান অচ্যুতও সক‌লের চিত্ত হরণ ক‌রে বৈকুন্ঠধা‌মে গমন করলেন ।

অতঃপর মহারাজ পৃথু ন্যায় ও ধর্ম প‌থে অ‌বিচল থে‌কে নিষ্কামভা‌বে প্রজ‌াপালন কর‌তে লাগ‌লেন । তাঁর কর্ম নিষ্কাম হওয়ায় কর্মফল সঞ্চ‌য়ের প্রশান আ‌দৌ ছিল না । প্রারদ্ধ ক্ষয় হওয়ায় কর্ম‌শ্রোতরূপ জন্মমৃত্যু প্রবাহ রুদ্ধ হয়ে গি‌য়ে‌ছিল । তি‌নি জ্ঞান ও ভ‌ক্তির চরম সীমায় উপনীত হ‌তে সক্ষম হ‌য়ে‌ছি‌লেন । তি‌নি এক মহাযজ্ঞের আ‌য়োজন ক‌রে সকল‌কে অ‌তি সুন্দরভা‌বে নিজ কৃত্য - কর্ম সম্ব‌ন্ধে উপ‌দেশ দি‌য়ে‌ছি‌লেন । সক‌লেই মহারাজ পৃথুর প্রশংসা করেছিলেন ।

এই সম‌য়ে সূর্যসম দেদীপ্যমান মু‌নি চতুষ্ট‌য়ের আগমন হয় । মহারাজ পৃথু সসম্ভ্র‌মে দাঁড়ি‌য়ে উ‌ঠে ---
সনক , সনন্দন , সনাতন ও সনৎকুমরা‌কে পাদ্য অর্ঘ্য দি‌য়ে অভ্যর্থনা ক‌রে‌ছিলেন ।
মহারাজ পৃথু তখন সর্বজী‌বের মঙ্গ‌লের জন্য মু‌নি‌দের প্রশ্ন ক‌রেছি‌লেন ---
' কি‌সে সক‌লের মঙ্গল হ‌বে ? কেমন ক‌রে মঙ্গল হ‌বে ? '
সনৎকুমার উত্তর দি‌য়ে‌ছিলেন ---
" মঙ্গল কামনায় দেহা‌দির প্র‌তি অনাস‌ক্তি এবং পরব্রহ্মস্বরূপ আত্ম‌ার প্র‌তি প্রবল আস‌ক্তি , তীব্র অনুরাগ থাকা প্র‌য়োজন ; ঈশ্বরে অনুরা‌গ ও সংসা‌রে বিরাগ । ' আ‌মি , আমার ' ভাব , অহংভাব ত্যাগ কর‌লেই যথার্থ মঙ্গল হ‌বে ।
শ্রদ্ধা ও ভাগবত ধ‌র্মের অনুষ্ঠান , আত্মজ্ঞ‌ান লা‌ভের ইচ্ছা , আধ্যা‌ত্মিক যোগ সাধনায় নিষ্ঠা , স্মরণ - মনন ও কীর্তন দ্বারা আত্মা‌কে র‌তি ও দেহা‌দি‌তে অনা‌সক্তি হয় ।
শ্রীভগবানের উপর র‌তি ও বিষ‌য়ের বৈরাগ্য , অ‌হিংসা , নিবৃ‌ত্তি , কল্যা‌ণের জিজ্ঞাসা , লীলাকথা পা‌নে ব্যাকুলতা , সংযম , কামনাবাসনা ত্যাগ , শৌচা‌দি নিয়ম পালন , পর‌নিন্দায় অরু‌চি , স্পৃহারা‌হিত্য ও শ‌ীত - উষ্ণ আ‌দি দৈব সন্তাপ সহ্য করার কল্যাণ হ‌য়ে থা‌কে ।
শ্রীভগবা‌নের শরণাগত হ‌তে হয় । নিত্যমুক্ত , নির্মল , সত্যস্বরূপ শ্রীভগবান জ্ঞানরূ‌পে আ‌বির্ভূত হন । শরণাগত হ‌লেই তি‌নিই ভ‌ক্তের স‌কল ভার গ্রহণ ক‌রেন ।
শ্রীভগবা‌নের পাদপদ্ম স্মরণ ক‌রে সহ‌জেই অহংকার থে‌কে মু‌ক্তি লাভ করা যায় , জ্ঞান ও যোগ সা‌ধনার প‌থে মু‌ক্তি পাওয়া ক‌ঠিন তাই শরণাগত বৎসল ভগবান শ্রীবাসু‌দেবের ভজনা করা প্র‌য়োজন । "
যখন সনৎকুমার সুস্পষ্টভা‌বে বল‌লেন যে নির্গুণ নিরাকার ব্র‌হ্মের উপাসনার অর্থাৎ জ্ঞান প‌থের চে‌য়ে সগুণ সাকার উপাসনা অর্থাৎ ভ‌ক্তি‌যো‌গের পথ সহজ , তখন মহারাজ পৃথু তাই‌তেই মগ্ন হ‌য়ে গে‌লেন ।
মু‌নিগণের উপ‌দেশ দান ক‌রে আকাশপ‌থে গমন কর‌লেন । মহারাজ পৃথু নিরাসক্তভা‌বে রাজ্য শাসন কর‌তে থাক‌লেন । তি‌নি ক্ষমা গু‌ণে ছি‌লেন পৃ‌থিবীর মতন , লোক কল্যা‌ণে স্ব‌র্গের মতন আর তৃ‌প্তি বিধা‌নে ছি‌লেন মে‌ঘের মতন । তি‌নি বহুকাল রাজ্যপালন ক‌রে অবশে‌ষে বানপ্রস্থ অবলম্বন ক‌রে শ্রীভগবা‌নের আরাধনায় ব্রতী হ‌লেন । ক্র‌মে তাঁর অ‌বিদ্যা‌জনিত দেহবু‌দ্ধি দূর হ‌য়ে আত্মজ্ঞান লাভ হল আর তি‌নি পরম আকা‌ঙ্ক্ষিত শ্রীভগবা‌নের সা‌ন্নিধ্য লাভ ক‌রলেন । বানপ্র‌স্থে গমনকা‌লে তি‌নি পুত্র‌দের রাজ্যভার দি‌য়ে প্রজাপালন কার্য সম্পূর্ণ করে‌ছি‌লেন ।

মহারাজ পৃথু যেন সর্বকা‌লের অনুকরণীয় কল্যা‌ণের রাজমার্গসম ছি‌লেন । তাঁর জীব‌নে জ্ঞান ও ভ‌ক্তি দুইই পূর্ণরূ‌পে দেখা গি‌য়ে‌ছিল । তাঁ‌কে আদর্শরূ‌পে গ্রহণ ক‌রে ভবসাগর পার করা সম্ভব ।
মহ‌ামু‌নি মৈ‌ত্রেয় কর্তৃক মহাত্মা বিদুর‌কে এই মহারাজ পৃথু উপাখ্যান বর্ণিত হ‌য়ে‌ছিল । আজও ভক্তগ‌ণের প‌ক্ষে এই বৃত্তান্ত পূর্ণরূ‌পে প্রাস‌ঙ্গিক ব‌লেই প‌রি‌চিত ।
--------------------0-----------------------
লেখকঃ - Joy Shree Radha Madhav
0 comments

পৃথু উপাখ্যান ---পর্ব ১

সু‌ধিয়ঃ সাধ‌বো লো‌কে নর‌দেন ন‌রোত্তমাঃ ।
নাভিদ্রুহ্য‌ন্তি ভূতে‌ভ্যো য‌র্হি নাত্মা ক‌লেবরম্ ।। ( ভাগবত ৪\২০\৩ )

মহারাজ অঙ্গ রাজত্ব ত্যাগ ক‌রে চ‌লে যাওয়ায় প্রজাগ‌ণের ম‌ধ্যে অরাজকতা দেখা দি‌য়ে‌ছিল । তখন ব্রহ্মবাদী ভৃগু প্রমুখ মু‌নি মাতা সুনীথা‌কে আহ্বান ক‌রে ও তাঁর সম্ম‌তি নি‌য়ে বেন‌কে পৃ‌থিবীর অ‌ধিপ‌তিপ‌দে অ‌ভি‌ষিক্ত ক‌রে‌ছি‌লেন । সিংহাস‌নে আ‌রোহণ ক‌রে বেন অষ্ট লোকপাল দেবতার ম‌হিমার অংশভাগীরূপে প‌রিগ‌ণিত হ‌য়ে ঔদ্ধত্য ও অহংকারের চরম সীমা অ‌তিক্রম ক‌রল এবং নিজে‌কে সর্ব‌শ্রেষ্ঠ জ্ঞান ক‌রে মহাপুরু‌ষের অপমান কর‌তে লাগল । তার নি‌র্দেশ সকল যজ্ঞ , দান বা হোম নি‌ষিদ্ধ করা হল ।

বিপদগামী রাজা বেন‌কে অ‌যোগ্য জ্ঞান ক‌রে মু‌নিগণ তার উপর অসন্তুষ্ট হ‌লেন । শ্রীভগবান বিষ্ণুর নিন্দাকারী রাজা বেন মৃত্যুমু‌খে প‌তিত হ‌লে মু‌নিগ‌ণের পরাম‌র্শে অমাত্যগণ বে‌নের দেহজাত বালক পৃথু‌কে সিংহ‌াস‌নে বসা‌লেন । মু‌নিগণ দেখ‌লেন যে বালক পৃথু ভগবান বিষ্ণুর ভুবনপালককারী কলা ও লক্ষ্মীর অবতারস্বরূপ সং‌যোগ হ‌তে উৎপন্ন । রাজা‌দের ম‌ধ্যে পৃথু অগ্রগণ্য হ‌বেন । তাঁরা দেখ‌লেন যে ভগবান শ্রীহ‌রির অংশ পৃথুরূ‌পে অবতীর্ণ হ‌য়ে‌ছেন অর্থাৎ তি‌নি অংশাবতার ।

যখন ব্রাহ্মণগণ পৃথুর স্তু‌তি কীর্ত‌নে মুখর হ‌লেন , শ্রেষ্ঠ গন্ধর্বগণ গুণগান কর‌তে লাগ‌লেন , সিদ্ধগণ পুষ্পবৃ‌ষ্টি কর‌তে লাগ‌লেন তখন পৃথু সেই অল্প বয়‌সেই সহা‌স্যে জলদ গম্ভীর স্ব‌রে বল‌লেন - ' হে সৌম্য সূত - মাগধ - বন্ধীগণ ! এখনও ইহ‌লো‌কে আমার কো‌নো গুণই প্রকা‌শিত হয়‌নি । তাহ‌লে আপনারা আমার কোন্ গুণ‌কে অবলম্বন ক‌রে স্তু‌তি কর‌ছেন ? আমার সম্প‌র্কে আপনা‌দের ব্যক্ত উ‌ক্তি না ক‌রে অন্য কা‌রো স্তু‌তি করা উ‌চিত । পুণ্যশ্লোক ভগবান শ্রীহ‌রির গুণকীর্ত‌নের ম‌তো সাধুবাদ‌যোগ্য বিষয় থাকা স‌ত্ত্বেও তুচ্ছ মানু‌ষের স্তব করা কো‌নো শিষ্ট ব্য‌ক্তির প‌ক্ষে শোভনীয় নয় । ' উদারচ‌রিত্র ব্য‌ক্তিগণ ক্ষমতাসম্পন্ন ও খ্যা‌তিমান হ‌লেও নি‌জের প্রশংসা বাক্য শ্রবণ করা লজ্জাজনক ম‌নে ক‌রে থাকেন ও তার নিন্দা ক‌রেন ।

ব্রাহ্মণগণ মহারাজ পৃথু‌কে রাজ্যে অ‌ভি‌ষিক্ত ক‌রে তাঁ‌কে প্রজা‌দের রক্ষকরূ‌পে ঘোষণা কর‌লেন । সেই সময় পৃ‌থিবী অন্নহীন হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছিল ; চতু‌র্দি‌কে দু‌র্ভিক্ষ দেখা দি‌য়ে‌ছিল । ক্ষ‌ুধা তৃষ্ণায় কাতর শীর্ণ দে‌হে প্রজারা তখন তা‌দের প্রভু পৃথুর কা‌ছে এ‌সে নি‌বেদন করলন - ' আমরা নি‌রন্ন ও ক্ষুধার জ্বালায় পী‌ড়িত । আপ‌নি আমা‌দের রক্ষা করুন । '

প্রজা‌দের দুর্দশার কথা মহারাজ পৃথু শুন‌লেন । অন্নাভা‌বের কারণও তি‌নি অবগত হ‌লেন । তি‌নি বুঝ‌লেন যে পৃ‌থিবী সমস্ত অন্ন ও ঔষধির বীজ অন্ত‌রে লু‌কি‌য়ে রে‌খে‌ছে । এই সিদ্ধান্তে উপনীত হ‌য়ে তি‌নি পৃ‌থিবী‌কে শিক্ষা দেওয়ার জন্য ধনুর্বাণ তুল‌লেন । উদ্যত অস্ত্র পৃ‌থিবী‌কে ভীত ও ক‌ম্পিত ক‌রে তুলল । পৃ‌থিবী তখন গোরূপ ধারণ ক‌রে পলায়ন কর‌তে থাক‌লে মহারাজ পৃথু তার পশ্চাদ্ধাবন কর‌লেন , পৃথুর ক্রোধ থে‌কে তাঁর রক্ষা পাওয়া কঠিন ছিল । অব‌শে‌ষে পলায়‌নে ক্লান্ত ও প‌রিশ্রান্ত হ‌য়ে পৃ‌থিবী মহাভাগ পৃথু‌কে স‌ম্বোধন করে বল‌লেন - ' হে ধর্মজ্ঞ ও শরণাগত বৎসর মহারাজ ! আপ‌নি সর্বপ্রাণীর রক্ষাকর্তা , আমা‌কেও রক্ষা করুন । আ‌মি আপনার শরণাগত । '
মহারাজ পৃথু বল‌লেন - ' হে পৃ‌থিবী ! তু‌মি আমার শাসন অ‌তিক্রম ক‌রেছ । তু‌মি দেবতারূ‌পে য‌জ্ঞের ভাগ গ্রহণ ক‌রো অথচ তার প‌রিব‌র্তে আমা‌দের অনুদান করছ না । '
মহারাজ পৃথু জান‌তে পার‌লেন যে পুরা‌কা‌লে যে সকল ( ধান্য‌াদি ) ঔষ‌ধি সৃষ্ট হ‌য়ে‌ছিল তা অসৎ দুরাচারযুক্ত ব্য‌ক্তিগণ ভোগ কর‌ছে দে‌খে পৃথিবীই য‌জ্ঞের কার‌ণে সমস্ত ঔষু‌ধি নি‌জের ম‌ধ্যে স‌ঞ্চিত রে‌খে‌ছে । দীর্ঘ সময় অ‌তিক্রান্ত হওয়ায় তা জীর্ণ হ‌য়ে পড়‌ছে ।

তা পূর্বাচার্যগ‌ণের প্রদ‌র্শিত প‌থে উদ্ধার করা সম্ভাব । পৃ‌থিবী আরও বল‌লেন - ' হে লোকপালক মহাবাহু বীব ! আপ‌নি সর্বপ্রাণীর রক্ষায় বলপ্রদায়ক খাদ্য লাভ কর‌তে ইচ্ছা কর‌লে উপযুক্ত বৎস , দোহনপাত্র ও দোহনকর্তা সংগ্রহ করুন । আ‌মি সেই বৎ‌সের প্র‌তি স্নেহবশত দুগ্ধরূ‌পে আপনার অভীষ্ট সিদ্ধ করব ।
‌' হে প্রভু ! আরও এক‌টি নি‌বেদন শুনুন । আপ‌নি আমা‌কে সমতল করুন । আ‌মি সমতল হ‌লে জলসম্পদ ধারণ কর‌তে সক্ষম হব । '

মহারাজ পৃথু পৃ‌থিবীর এই প্রিয় ও কল্যাণকর উপদেশ স্বীকার করে নি‌লেন । তি‌নি স্বায়ম্ভুব মনু‌কে বৎস ক‌রে নি‌য়ে নি‌জের হা‌তে সমস্ত ধান্যা‌দি ঔষ‌ধি ও শস্য দুগ্ধরূ‌পে দোহন ক‌রে নি‌লেন । অন্যান্য বিজ্ঞজ‌নেরাও এইভা‌বে পৃ‌থিবীর কাছ থে‌কে অভীষ্ট বস্তু দোহন ক‌রে নি‌য়ে‌ছি‌লেন । ঋ‌ষিগণ বৃহস্প‌তি‌কে বৎস ক‌রে ই‌ন্দ্রিয় ( বাক্ , মন এবং শ্রোত্র ) পা‌ত্রে দেবী বসুন্ধরার কাছ থে‌কে বেদরূপ প‌বিত্র দুগ্ধ দোহন ক‌রে নি‌য়ে‌ছি‌লেন । ক‌পিল‌দেব‌কে বৎস ক‌রে আকাশরূপ পা‌ত্রে সিদ্ধগণ অ‌ণিমা‌দি অষ্ট‌সি‌দ্ধি ও বিদ্যাধরগণ আকাশচা‌রিতা প্রভৃ‌তি বিদ্যা দোহন ক‌রে‌ছি‌লেন ।

পৃ‌থিবীর দ্বারা এইভা‌বে সর্বজ‌নের সর্বক‌ামনা পূ‌র্তি হওয়ায় মহারাজ পৃথু স্নেহার্দ্রহৃদয় এই সর্বংসহা জীবধাত্রী‌কে নিজ আদ‌রের কন্যারূ‌পে স্বীকৃ‌তি দিলেন । নিজ ধনুর প্রান্তভাগ দ্বারা বহু পর্ব‌তের ঊর্ধ্বাংশ চূর্ণ ক‌রে ভূমির বিশাল অংশ সমতলে প‌রিণত কর‌লেন । অতঃপর মহারাজ পৃথু প্রজাপা‌লনে রত হ‌লেন । এই সমতলভূ‌মির বি‌ভিন্ন স্থা‌নে প্রজা‌দের জন্য যথা‌যোগ্য বাসভূ‌মি বিভাগ ক‌রে দি‌লেন । তি‌নি গ্রাম , ছোট ও বড় নগর , বহুপ্রকা‌রের দুর্গ , ঘোষপ‌ল্লি , গো - ম‌হি‌ষের বাসস্থান , সৈন্য‌শি‌বির , খ‌নি ও তৎস‌ন্নিত বাসভূ‌মি , কৃষকপল্লি সবই সুনি‌র্দিষ্টরূ‌পে বিভাগ ক‌রে মানু‌ষের বাসস্থানের প‌রিক‌ল্পিত নির্মাণরী‌তি প্রবর্তন কর‌লেন ।

এইবার ভগবান মনুর ব্রহ্মাবর্ত ক্ষেত্র - যেখা‌নে সরস্বতী নদী পূর্বমু‌খে প্রবা‌হিতা , সেইখা‌নে মহারাজ পৃথু শত অশ্ব‌মেধ যজ্ঞের জন্য দী‌ক্ষিত হ‌লেন । দেবরাজ ই‌ন্দ্র যজ্ঞানুষ্ঠা‌নের আ‌য়োজন দে‌খে শ‌ঙ্কিত হ‌য়ে উঠ‌লেন । মহারাজ পৃথুর য‌জ্ঞে যজ্ঞাত্মা সর্ব‌লোকগুরু জগদীশ্বর ভগবান শ্রীহ‌রি য‌জ্ঞেশ্বররূ‌পে সাক্ষাৎ দর্শন দি‌য়ে‌ছিলেন । তাঁর স‌ঙ্গে ব্রহ্মা , শিব এবং নিজ নিজ অনুচরবৃন্দ সহ লোকপালগণও উপস্থিত হয়ে‌ছি‌লেন । গর্ন্ধব , মু‌নি এবং অপ্সরাগণ তখন শ্রীভগবা‌নের স্তু‌তিগাণ কর‌ছি‌লেন ।

সি‌দ্ধ , বিদ্যাধর , দৈত্য , দানব , যক্ষ , সুনন্দ - নন্দা‌দি প্রধান পার্ষদগণ এবং যাঁরা সর্বদাই শ্রীভগবানের সেবার জন্য উৎসুক ছিল ক‌পিল ও নারদ , দত্তা‌ত্রেয় এবং সনকা‌দি যো‌গেশ্বরগণ সক‌লে শ্রীহ‌রির অনুগমন ক‌রে‌ছি‌লেন । যজ্ঞ‌ধেনুরূ‌পে উপ‌স্থিত পৃ‌থিবী কাম‌ধেনুরূ‌পে যজমান মহারাজ‌কে প্র‌য়োজনীয় সমস্ত দ্রব্যই প্রদান ক‌রে‌ছি‌লেন । নদীসকল ইক্ষু - দ্রাক্ষা‌দি সর্বপ্রকার রস বহন ক‌রে এ‌নে‌ছিল এবং অ‌তি বৃহৎ মধুবর্ষী বৃক্ষসমূহ দুগ্ধ , দ‌ধি , অন্ন এবং ঘৃতা‌দি বিভিন্ন দ্রব্য প্রদান ক‌রে‌ছিল । পর্বতসকল খাদ্যদ্রব্য ও লোকপালগণ বি‌বিধ উপহার দ্রব্য প্রদান ক‌রে‌ছি‌লেন ।

মহারাজ পৃথু কেবলমাত্র ভগবান শ্রীহ‌রি‌কে নি‌জ প্রভু ব‌লে ম‌নে কর‌তেন । শ্রীহ‌রির কৃপায় তাঁর প্রভূত শ্রী‌বৃ‌দ্ধি হ‌য়ে‌ছিল যা ই‌ন্দ্রের ঈর্ষ‌ার কারণ হয় । মহারাজ পৃথু যখন অ‌ন্তিম ( শততম ) যজ্ঞ দ্বারা ভগবান য‌জ্ঞেশ্ব‌রের আরাধনা ক‌রে‌ছিলেন তখন ইন্দ্র ঈর্ষাব‌শে গুপ্তরূ‌পে তাঁর য‌জ্ঞের অশ্ব হরণ ক‌রলেন। অশ্ব‌টি‌কে নি‌য়ে পলায়‌নের সম‌য়ে ভগবান অ‌ত্রিমু‌নি তাঁ‌কে দেখ‌তে পে‌লেন । ই‌ন্দ্র তখন মস্ত‌কে জটাজুট ধারণ ক‌রে থাকায় ও অ‌ঙ্গে ভস্ম ধারণ কর‌ায় পৃথু তনয় তাঁ‌কে মূ‌র্তিমান ধর্ম ম‌নে ক‌রে বাধা দি‌লেন না । কিন্তু মহ‌র্ষি অ‌ত্রি ই‌ন্দ্র‌কে চি‌নি‌য়ে দি‌লে পৃথুকুমার আকাশপ‌থে দ্রুত‌বে‌গে ই‌ন্দ্রের পশ্চাদ্ধাব করলেন ।

ই‌ন্দ্র ভীত হ‌য়ে অন্তর্ধান কর‌লে বীর রাজপুত্র য‌জ্ঞের অশ্ব ফি‌রি‌য়ে আন‌লেন । অতঃপর রাজকুমার ' বি‌জিতাশ্ব ' রূ‌পে মু‌নিগণ কর্তৃক প‌রি‌চিত হ‌লেন । ইন্দ্রের বারবার বাধাদান মহারাজ পৃথু‌কে ক্রোধা‌ন্বিত করল । তি‌নি রুদ্রমূ‌র্তি ধারণ ক‌রলেন । ঋ‌ত্বিকগণ দেখ‌লেন যে পরাক্রমশালী মহারাজ পৃথু ই‌ন্দ্র‌কে বধ করবার জন্য প্রস্তুত হ‌চ্ছেন । তাঁরা মহারাজ পৃথু‌কে বল‌লেন যে ,যজ্ঞে দী‌ক্ষিত হওয়ার পর কেবলমাত্র শাস্ত্র‌বি‌হিত যজ্ঞপশু ভিন্ন অন্য কাউ‌কে বধ করা অনু‌চিত । তাঁরা আরও বল‌লেন যে অ‌মোঘ মন্ত্রদ্বারা আবাহন করে ই‌ন্দ্র‌কে তাঁরা বলপূর্বক অ‌গ্নি‌তে আহু‌তি দি‌য়ে দে‌বেন ।

যজমান মহারাজ পৃথু‌কে এই কথা ব‌লে তাঁর ঋ‌ত্বিকগণ স‌ক্রো‌ধে ই‌ন্দ্র‌কে আবাহন কর‌লেন । তাঁরা আহু‌তি দি‌তে উদ্যত হ‌লে স্বয়ং ব্রহ্মা আ‌বির্ভূত হ‌য়ে বল‌লেন - হে ঋ‌ত্বিকগণ ! ইন্দ্র‌কে আহু‌তি দান অনু‌চিত কার্য , কারণ ই‌ন্দ্র তো যজ্ঞ না‌মে প‌রি‌চিত ; তা বস্তুত শ্রীভগবা‌নের মূ‌র্তি । তোমা‌দের যজ্ঞদ্বারা আরা‌ধিত দেবতাগণও ই‌ন্দ্রেরই অংশ‌বি‌শেষ । তাই যজ্ঞদ্বারা ই‌ন্দ্র‌কে বিনাশ করবার চিন্তা স‌ঠিক নয় । মহারাজ পৃথু বিপুল কী‌র্তিসমূ‌হের ম‌ধ্যে এক‌টি যজ্ঞ না হয় অসম্পূর্ণই রইল তাতে কিছু এ‌সে যা‌বে না । শতযজ্ঞ সম্পাদন না হয় না হল । '
বাকীঅংশ আগামীপ‌র্বে
=========O========
লেখকঃ - Joy Shree Radha Madhav
0 comments

প্রভু স্বয়ং ভক্তাধীন - শেষ পর্ব

ঘটনা অ‌ল্পেই রুষ্ট মহামু‌নি‌কে ক্রোধা‌ন্বিত ক‌রে‌ছিল । তি‌নি নিজ জটার শেষাংশ উৎপাটন ক‌রে তার দ্বারা অম্বরীষ‌কে বধ করবার জন্য এক কৃত্যা উৎপন্ন কর‌লেন । রাক্ষসী কৃত্যা প্রলয়কারীন অ‌গ্নিসম দেদীপ্যমান ছিল । তা অ‌গ্নিসম প্রজ্ব‌লিত হ‌য়ে হ‌স্তে তরবা‌রি ধারণ ক‌রে রাজা অম্বরীষের উপর ঝাঁ‌পি‌য়ে পড়ল । তার পদভা‌রে ধর‌ণি প্রক‌ম্পিত হ‌চ্ছিল । রাজা অম্বরীষ কিন্তু তা‌তে বিন্দুমাত্র বিচ‌লিত হ‌লেন না ।

এক পাও না স‌রে তিনি পূর্ববৎ দাঁ‌ড়ি‌য়ে রই‌লেন । পরমপুরুষ পরমাত্ম‌া শ্রীভগবান নিজ সেবক‌কে রক্ষা‌নি‌মিত্ত পূ‌র্বেই সুদর্শন চক্র‌কে নিযুক্ত ক‌রে রে‌খে‌ছি‌লেন । যেমন অ‌গ্নি ক্রোধা‌ন্বিত সর্প‌কে ভস্মসাৎ ক‌রে তেমনভা‌বেই চক্র দুর্বাসা মু‌নির কৃত্যা‌কে দগ্ধ ক‌রে ভ‌স্মে প‌রিণত করল ।


যখন শ্রীদুর্বাসা ‌দেখ‌লেন যে তাঁর সৃষ্ট কৃত্যা দগ্ধ হ‌য়ে যা‌চ্ছে আর সুদর্শন চক্র তাঁর দি‌কেই ছু‌টে আস‌ছে , তি‌নি তখন ভীত হ‌য়ে প্রাণরক্ষা হেতু পলায়ন কর‌তে লাগ‌লেন । প্রজ্ব‌লিত দাবানলসম চক্র আস‌ছে দে‌খে তি‌নি সু‌মেরু পর্বত গহ্ব‌রের দি‌কে ছুট‌লেন । মহামু‌নি প্রাণরক্ষা হেতু দিক , আকাশ , পৃ‌থিবী , পাতাল‌লোক , সমুদ্র , লোকপাল এবং তাঁ‌দের দ্বারা সুর‌ক্ষিত লোক এবং স্বর্গ পর্যন্ত গে‌লেন কিন্তু সহ্যাতীত তেজ সুদর্শন চক্র তাঁকে রেহাই দিল না । রক্ষক না পে‌য়ে তিনি আরও ভয় পে‌য়ে গে‌লেন ।

প্রাণ রক্ষা হেতু তি‌নি দেব‌শ্রেষ্ঠ শ্রীব্রহ্মার ক‌া‌ছে গি‌য়ে বল‌লেন - ' হে শ্রীব্রহ্মা ! আপ‌নি তো স্বয়ম্ভু । ভগবা‌নের এই তেজযুক্ত চক্র থেকে আমা‌কে রক্ষা করুন । '


শ্রীব্রহ্মা বল‌লেন - ' যখন আমার দুই পরার্ধ আয়ু সমাপন হ‌বে এবং কালস্বরূপ ভগবান নিজ লীলা সংবরণ ক‌রে নে‌বেন ও জগৎ‌কে ভস্মসাৎ কর‌তে চাই‌বেন তখন তাঁর ভ্রূচালনায় সমস্ত জগৎ এবং আমার লোকও লীন হ‌য়ে যা‌বে । তাঁর ভক্ত‌দ্রো‌হে অ‌ভিযুক্ত‌কে আ‌মি রক্ষা কর‌তে সমর্থ নই । '

তখন দুর্বাসা মু‌নি ভগবান শংক‌রের শরণাগত হ‌লেন ।



শ্রীমহা‌দেব বল‌লেন -- ' আমরা নিরুপায় ! স্বয়ং আ‌মি , সৎকুমার , নারদ , ভগবান ব্রহ্মা , ক‌পিল‌দেব -- কেউই ভগবানের মায়া‌কে জান‌তে সক্ষম হই‌নি । আমরাও তাঁরা মায়াধীন । চক্র বি‌শ্বেশ্ব‌রের অস্ত্র । একমাত্র তাঁর শরণাগ‌তিই তোমা‌কে রক্ষা কর‌তে সমর্থ । '


মহামু‌নি অগত্যা শ্রীভগবা‌নের পরমধাম বৈকুন্ঠ‌লো‌কে প্রবেশ কর‌লেন । তা লক্ষ্মীপ‌তির নিবাসস্থান ; লক্ষ্মীস‌হিত তি‌নি সেইখা‌নে অ‌ধি‌ষ্ঠিত । সুদর্শন চ‌ক্রের তা‌পে সন্তপ্ত শ্রীদুর্বাসা তাঁরই শরণাগত হ‌লেন । তি‌নি জানা‌লেন যে তাঁর মহাপরাধ হ‌য়ে‌ছে । তিনি যেন তাঁ‌কে ক্ষমা ক‌রেন ।



শ্রীভগবান তখন মহামু‌নি‌কে বল‌লেন - ' হে শ্রীদুর্বাসা ! আ‌মি সতত ভক্তাধীন , স্বতন্ত্র নই । ভক্তগণ আমা‌কে প্রেমপ্রী‌তি প্রদান ক‌রেন আ‌মিও তাঁ‌দের রক্ষা ক‌রি । যে ভক্ত আমার প্রী‌তি‌তে দারা , পুত্র , গৃহ , গুরুজন , প্রাণ , ধনসম্পদ , ইহ‌লোক ও পর‌লোক সব ত্যাগ ক‌রে , তাঁ‌কে ত্যাগ করবার কথা আ‌মি কল্পনাও কর‌তেন পারি না । আমার প্রেমী ভক্ত আমার হৃদয় আর আ‌মি তা‌দের হৃদয় স্বয়ং । একটা উপায় আ‌ছে । যাঁর অ‌নিষ্ট সাধন কর‌তে গি‌য়ে এই বিপ‌ত্তি হ‌য়ে‌ছে তাঁর শরণাগত হ‌লে অপরাধ স্খালন ও শা‌ন্তি লাভ সম্ভব ।


নিরপরাধ সাধুর অ‌নিষ্ট চেষ্টা কর‌লে অ‌নিষ্ঠকারী‌রই অমঙ্গল হ‌য়ে থাকে । নাভাগনন্দন পরম ভাগ্যবান রাজা অম্বরীষই এর প্র‌তি‌বিধা‌নে সমর্থ ।


অতএব মহামু‌নি দুর্বাসা‌কে আবার সেই অম্বরী‌ষের নিক‌টেই আস‌তে হল , সুদর্শন চক্রের তা‌পে সন্তপ্ত মহামু‌নি রাজা অম্বরী‌ষের পদযুগল ধারণ করে ক্ষমা প্রার্থনা কর‌লেন । শ্রীদুর্বাসা মু‌নির এই আচরণ রাজা অম্বরীষ‌কে ল‌জ্জিত করল । দয়ায় প‌রিপূর্ণ রাজা তখন সুদর্শন চ‌ক্রের স্তু‌তি কর‌তে লাগলেন ।

রাজা অম্বরীষ বল‌লেন -- ' হে প্রভু সুদর্শন ! আপ‌নি অ‌গ্নিস্বরূপ । আপ‌নি ____ সূর্য , চন্দ্র , জল , পৃ‌থিবী , আকাশ , বায়ু , পঞ্চতম্মাত্রা এবং সম্পূর্ণ ই‌ন্দ্রিয়সমূহ । আপ‌নিই __ ধর্ম , আপ‌নিই মধুর ও সত্য বাণী । আপ‌নি সকল য‌জ্ঞের অ‌ধিপ‌তি ও স্বয়ং যজ্ঞ । আপ‌নি ত্রি‌লোকরক্ষক ও সর্ব‌লোকস্বরূপ । আ‌পিনই পরমপুরুষ পরমাত্মার শ্রেষ্ঠ তেজ । আপ‌নি কৃপা ক‌রে আমার কু‌লের কল্যা‌ণে শ্রীদুর্বাসার কল্যাণ করুন ।


আ‌মি আপনার অনুগ্রহ‌কে মস্ত‌কে ধারণ ক‌রে রাখব । য‌দি আ‌মি কিছু কখ‌নো দান ক‌রে থা‌কে , যজ্ঞ ক‌রে থা‌কি অথবা নিজ ধর্ম পালন ক‌রে থা‌কি আর য‌দি আমার বং‌শের সক‌লে ব্রাহ্মণ‌দের নিজ আরাধ্য দেবতা জ্ঞান ক‌রে থাকেন তাহ‌লে যেন আপনার কৃপায় মুহামু‌নি দুর্বাসার সন্তাপ অপসৃত হয় । শ্রীভগবান সকল গু‌ণের একমাত্র আশ্রয় । য‌দি আ‌মি তাঁকে সমস্ত প্রাণীর আত্মাররূ‌পে দে‌খে থা‌কি আর তি‌নি আমার উপর প্রসন্ন থাকেন তাহ‌লে যেন শ্রীদুর্বাসার হৃদ‌য়ের সমস্ত দহন শান্ত হ‌য়ে যায় ।

রাজা অম্বরী‌ষের স্তুতি চক্রকে শান্ত কর‌ল । মহামু‌নি দুর্বাসা তখন রাজা অম্বরীষ‌কে উত্তম আশীর্বাদ দা‌নে আপ্লুত কর‌লেন । তি‌নি ভগবা‌নের প্রেমী ভক্ত‌দের মাহাত্ম্য স্বচ‌ক্ষে প্রত্যক্ষ কর‌লেন ।

যখন মহামু‌নি পলায়ন কর‌ছি‌লেন তখন থে‌কে রাজা অম্বরীষ আহার্য গ্রহণ ক‌রেন‌নি । এই এক বৎসর কাল তি‌নি তাঁর দর্শ‌নের আকাঙ্ক্ষায় কেবল জল পান ক‌রেই কাল যাপন ক‌রে‌ছি‌লেন । মহামু‌নি‌কে চ‌ক্রের হাত থেকে রক্ষা ক‌রে তি‌নি তাঁর চরণযু‌গল ধারণ ক‌রলেন এবং তাঁকে প্রসন্ন ক‌রে সসম্মা‌নে আহার করা‌লেন । মহামু‌নি দুর্বাসা তখন প‌রিতৃপ্ত ।



তি‌নি আশীর্বাদা‌দি ক‌রে স্থান ত্যাগ ক‌রলেন । মহামু‌নির প্রস্থা‌নের পর তাঁ‌র প্রসাদের অন্ন রাজা অম্বরীষ গ্রহণ কর‌লেন । নিজের জন্য মহামু‌নির দুঃখ ও তাঁর প্রার্থনায়ই মহামু‌নির নিষ্কৃ‌তি তি‌নি শ্রীভগবা‌নের ম‌হিমারূ‌পে দেখ‌লেন । অতঃপর পুত্র‌দের রাজ্যভার অর্পণ ক‌রে তিনি শ্রীভগবা‌নের নিত্য যুক্ত হ‌য়ে তাঁর সা‌ন্নিধ্য লাভ ক‌রলেন ।


লেখকঃ - Joy Shree Radha Madhav
0 comments

প্রভু স্বয়ং ভক্তাধীন - ১ম পর্ব

সাধ‌বো হৃদয়ং মহ্যং সাধূনাং হৃদয়ং ত্বহম্ ।
মদন্যৎ তে ন জান‌ন্তি নাহং তে‌ভ্যো মনাগ‌পি ।। ( ভাগবত ৯\৪\৬৮ )

রাজা অম্বরীষ অ‌তি ভাগ্যবান ব্য‌ক্তি ছি‌লেন । পৃথিবীর সপ্ত দ্বীপ , অতুল সম্প‌ত্তি ও অতুলনীয় ঐশ্বর্য তাঁর করায়ত্ত ছিল । য‌দিও এই সকল সম্পদ সাধারণ ব্য‌ক্তিগ‌ণের জন্য অ‌তি দুর্লভ বস্তু তবুও তি‌নি এই সকল‌কে স্বপ্ন তুল্যই ম‌নে কর‌তেন । তি‌নি জান‌তেন যে ধনসম্পদ নর‌কের দ্বারস্বরূপ । এই বস্তু অ‌নিত্য ।
তি‌নি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর প্রেমী সাধু‌দের উপ‌রে গভীর প্রেমপ্রী‌তি পোষণ করতেন । নিজ মন , বাণী , হস্ত , কর্ণ , সকলই ভগবান অচ্যু‌তের স‌ঙ্গে তি‌নি যুক্ত রে‌খে‌ছি‌লেন ; মন শ্রীপাদপ‌দ্মে , বাণী গুণ - সংকীর্ত‌নে , হস্ত মন্দির মার্জন - সেব‌নে , ও কর্ণ মঙ্গলময় কথা শ্রব‌ণে নিত্য যুক্ত থাকত । নেত্র মুকুন্দমূ‌র্তি ও ম‌ন্দির দর্শ‌নে , অঙ্গ ভগবদ্ভক্ত অঙ্গস্প‌র্শে , না‌সিকা তাঁর শ্রীপাদপ‌দ্মে স্পর্শ লাভ করা তুলসীর দিব্য ঘ্রাণ লা‌ভে এবং রসনা শ্রীভগবান অ‌র্পিত নৈ‌বেদ্য প্রসা‌দে যুক্ত থাকত ।
অম্বরী‌ষের চরণ , শ্রীভগবানের স্মৃতি বিজ‌ড়িত স্থান সকল প‌রিভ্রম‌ণে আর মস্তক ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের চরণ বন্দনায় যুক্ত থাকত । মাল্য চন্দন আ‌দি ভোগসামগ্রী তি‌নি শ্রীভগবা‌নের সেবায় সমর্পণ করে দি‌য়ে‌ছি‌লেন । তি‌নি বিশ্বাস কর‌তেন যে প‌বিত্রকী‌র্তি শ্রীভগবান , সকল প্রাণীর অন্তরাত্মায় বিরাজ ক‌রেন । তি‌নি তাঁর সমস্ত কর্ম যজ্ঞপুরুষ , ই‌ন্দ্রিয়াতীত ভগবানের প্র‌তি তাঁরা সর্বাত্মা ও সর্বস্বরূপ জ্ঞানে সমর্পণ ক‌রে দি‌য়ে ভগবদ্ভক্ত ব্রাহ্মণ‌‌দের আজ্ঞায় অনুকূ‌লে প‌ৃ‌থিবী শাসন কর‌তেন ।
ধম্ব নামক নির্জল দে‌শে সরস্বতী নদীর প্রবা‌হের সম্মু‌খে ব‌শিষ্ঠ , অ‌সিত , গৌতম আ‌দি বি‌ভিন্ন আচার্য দ্বারা তি‌নি মহান ঐশ্বর্যসম্পন্ন সর্বাঙ্গ প‌রিপূর্ণ ও বৃহৎ দ‌ক্ষিণাযুক্ত বহু অশ্ব‌মেধ যজ্ঞ ক‌রে যজ্ঞা‌ধিপতি শ্র‌ীভগবা‌নের আরাধনা ক‌রে‌ছিলেন । তিনি হৃদ‌য়ে অনন্ত প্রেম প্রদানকারী শ্রীহ‌রির নিত্য নিরন্তর দর্শন লাভ ক‌রতেন ।
এইভা‌বে রাজা অম্বরীষ তপস্যায় যুক্ত ভ‌ক্তিযোগ ও প্রজাপালনরূপ স্বধর্ম দ্বারা শ্রীভগবান‌কে প্রসন্ন কর‌তে লাগ‌লেন । তি‌নি জান‌তেন যে ভোগযুক্ত বস্তুসকল অ‌নিত্য । তাঁর অনন্য প্রেমময় ভ‌ক্তি‌তে প্রসন্ন হ‌য়ে শ্রীভগবান তাঁর রক্ষা নি‌মিত্ত সুদর্শন চক্র‌কে নিযুক্ত ক‌রে দি‌য়ে‌ছি‌লেন যা শত্রু‌দের জন্য যেমন ভী‌তিপ্রদ ছিল তেম‌নি মিত্র‌দের জন্য রক্ষাকবচ তুল্যও ছিল ।
রাজা অম্বরীষভার্যাও তাঁর মতন ধর্মপরায়ণা , সংসারে বৈরাগ্যসম্পন্না ও ভ‌ক্তিপরায়ণা ছি‌লেন । একবার রাজা অম্বরীষ নিজ ভার্যাসহ ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের আরাধনা করবার জন্য একবর্ষব্যাপী দ্বাদশীপ্রধান একাদশীব্র‌তের নিয়ম ধারণ কর‌লেন । ব্রত সমাপনে কা‌র্তিক মা‌সে তি‌নি ত্রিরা‌ত্রি উপবাস কর‌লেন এবং যুমনায় স্নান ক‌রে মধুব‌নে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজার্চনা কর‌লেন ।
তি‌নি মহা‌ভি‌ষেক বি‌ধি অনুসরণ ক‌রে সব সামগ্রী ও সম্প‌ত্তি দ্বার‌া শ্রীভগবানের অ‌ভি‌ষেক কর‌লেন এবং তম্ময়‌চি‌ত্তে বস্ত্র , আভরণ , চন্দন , মাল্য এবং অর্ঘ্য আ‌দি দ্বারা তাঁরা পূজা কর‌লেন । য‌দিও মহাভাগ্যবান ব্রাহ্মণ‌দের এই পূজায় প্র‌য়োজনীয়তা ছিল না । তাঁরা সিদ্ধ ছি‌লেন ও তাঁ‌দের কামনাসকল পূরণ হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছিল তবুও রাজা অম্বরীষ তাঁ‌দের ভ‌ক্তিভা‌বে পূজা কর‌লেন ।
তি‌নি ব্রাহ্মণ‌দের উত্তম আহা‌রে সেবাকার্য সমাপন ক‌রে ষাট কো‌টি সুস‌জ্জিত গাভী দান কর‌লেন ; দা‌নের পূ‌র্বে গাভীসমূহ শৃঙ্গ সুবর্ণ - ম‌ণ্ডিত , খুব রৌপম‌ণ্ডিত ও পৃষ্ট‌দেশ সুন্দর বস্ত্রদ্বারা সুস‌জ্জিত ক‌রে দেওয়া হ‌য়ে‌ছিল । গাভীসকল সুশীল , তরুণ , পৃষ্ট‌দেশ সুন্দর - দর্শন , সবৎসা ও দুগ্ধবতী ছিল । ব্রাহ্মণ‌দের দানকার্য সমাপ‌নে তাঁদের অনুম‌তি নি‌য়ে রাজা অম্বরীষ ব্রতপার‌ণের জন্য উ‌দ্যোগী হ‌লেন । এইকা‌লেই সহসা সেইখা‌নে দুর্বাসা মু‌নির অ‌তি‌থিরূ‌পে আগমন হল ।
রাজা অম্বরীষ তাঁ‌কে আস‌তে দে‌খেই অভ্যর্থনা ক‌রে তাঁ‌কে আসন দান কর‌লেন ও মাঙ্গ‌লিক দ্র‌ব্যা‌দি সহ‌যো‌গে তাঁর পূজার্চনা কর‌লেন । অতঃপর রাজ‌া মহামু‌নি‌কে সেবা গ্রহণ করবার জন্য অনু‌রোধ কর‌লেন । দুর্বাসা মু‌নি অম্বরী‌ষের প্রার্থনা স্বীকার ক‌রে আহা‌রের পূ‌র্বে স্না‌নের নিমিত্ত যমুনা নদী‌তে গমন কর‌লেন । তি‌নি ব্রহ্মাধ্যা‌নে নিমগ্ন হ‌য়ে যমুনার জ‌লে স্নান কর‌তে লাগ‌লেন ।
দ্বাদশী অবসান আসন্ন দে‌খে ধর্মজ্ঞ অম্বরীষ ধর্মসংকট থে‌কে মু‌ক্তি লাভ হেতু ব্রাহ্মণ‌দের পরামর্শ চাই‌লেন । তি‌নি বল‌লেন -- ' হে ব্রাহ্মণ‌দেবতাগণ ! ব্রাহ্মণ‌কে আহার না ক‌রি‌য়ে স্বয়ং আহার করা আবার অন্য‌দি‌কে দ্বাদশী পারণ না করা দুইই দোষযুক্ত । অতএব এখন আমার কী করা শ্রেয় যা‌তে আমার মঙ্গল হয় ও আ‌মি পা‌পের ভাগী না হই । ' ব্রাহ্মণকুল ভে‌বে‌চি‌ন্তে পরামর্শ দি‌য়ে বল‌লেন যে - ' হে রাজ‌র্ষি ! শ্রু‌তিকথন অনুসা‌রে কেবল জল পান ক‌রে নেওয়া দোষযুক্ত হয় না । '
তখন শ্রীভগবানের চিন্তায় নিমগ্ন থে‌কে রাজা অম্বরীষ জল পান ক‌রে নি‌লেন ; আর দুর্বাসামু‌নির আগ‌মনের প্র‌তীক্ষা কর‌তে লাগ‌লেন । আবশ্যক কার্যা‌দি সমাপন ক‌রে যখন দুর্বাসা মু‌নি ফি‌রে এ‌লেন তখন রাজা এ‌গি‌য়ে গি‌য়ে তাঁ‌কে অভ্যর্থনা কর‌লেন । দুর্বাস‌া মু‌নি কিন্তু অনুমা‌নে বুঝ‌তে পার‌লেন যে রাজা পারণকার্য সমাপন ক‌রে দি‌য়ে‌ছেন । মু‌নি তখন ভয়ানক ক্ষুধার্ত ছি‌লেন ।
পারণকার্য তাঁ‌কে আহার না ক‌রি‌য়েই ক‌রে নেওয়া হ‌য়ে‌ছে তাই তি‌নি অ‌তিশয় ক্রোধা‌ন্বিত হ‌লেন আর ক্রো‌ধে কাঁপ‌তে লাগ‌লেন । তি‌নি ভ্রূ কু‌ঞ্চিত ক‌রে ভয়াবহ মূ‌র্তি ধারণ ক‌রে বল‌লেন --- ' আ‌রে ! ক্রূর ! ধনসম্প‌দ‌মদে মত্ত দুর্মদ ! ভগবদ্ভ‌ক্তিহীন , তুই নি‌জে‌কে বড় ভা‌বিস ! আজ তুই ধর্ম লঙ্ঘন করে অ‌তি অন্যায় ক‌রে‌ছিস । আ‌মি অ‌তি‌থি হ‌য়ে এ‌সে‌ছি । অ‌তি‌থি সৎকা‌রের নিমন্ত্রণ দি‌য়েও অ‌তি‌থির আহা‌রের পূ‌র্বে আহার ক‌রেছিস ? এর উপযুক্ত শা‌স্তি তুই পা‌বি । '
==============
বাকী অংশ আগামীপ‌র্বে
==============
লেখকঃ - Joy Shree Radha Madhav
0 comments

স্বামী প্রণবানন্দ ব্রহ্মচারীর বীরভাবাপন্ন নমশূদ্র শ্রেনীকে বিরাট হিন্দুসমাজের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে দেন ।

নমশূদ্র সমাজ উচ্চবর্ণের হিন্দুর নিকট অবহেলিত , ঘৃণিত উপেক্ষিত । এরা ছিল অত্যন্ত সাহসী ও বীরভাবাপন্ন । চাষবাসে দক্ষ, লাঠি , ঢাল, সড়কী খেলায় ওস্তাদ । স্বামী প্রণবানন্দ ব্রহ্মচারী সেই নমশূদ্র শ্রেনীকে বিরাট হিন্দুসমাজের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে তাদেরকে আমন্ত্রণ করে নানাভাবে উৎসাহিত করতে লাগলেন। সর্বসাধারণের সহিত এক লাইনে বসিয়ে খাওয়ানো, যাত্রাগান শিক্ষা, কৃষ্ণলীলা , বিভিন্ন পৌরাণিক যাত্রার বই তাদের মধ্যে প্রচলণ করে তাদেরকে হিন্দুভাবে অনুপ্রাণিত করতে লাগলেন । নৌকা বাওয়া, ঢাল সড়কী খেলার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাদের মধ্যে বীরত্বের ভাব জাগিয়ে তুলতে লাগলেন । সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারীগণকে তাদের বাড়ী পাঠাতেন । ব্রহ্মচারী দিগদের মধ্যে কেহ কেহ পূর্ব সংস্কার বশত আপত্তির সুরে বলতেন যে, “নমশূদ্রদের বাড়িতে কি যাওয়া যায় ? ওখানে কি খাওয়া যায় ? কি করে রুচী হবে ইত্যাদি।”

তখন পতিত পাবন শ্রীঠাকুর কম্বুকণ্ঠে গর্জন করে উঠতেন। বলতেন- “কেন ওরা কি মানুষ না ? ওরা কি কারো থেকে পরিষ্কার কম থাকে ? উচ্চবর্ণের হিন্দু থেকেও সর্ববিষয়ে নিষ্ঠা সম্পন্ন ওরা । আমি নিজে ওদের হাতে খাই । ওদের ঘৃণা করবার কি আছে ? এত বড় একটা নমশূদ্র সমাজকে আমরা এই হিন্দুসমাজ থেকে বাদ দিয়ে চলব ? এ আমাদের সমাজের মহাপাপ । এতবড় একটা ক্ষত্রিয় জাতিকে বাদ দিয়ে হিন্দুসমাজ দাঁড়াবে কোথায় ? মানুষ মানুষকে ঘৃণা করবার কি আছে ? বড় যে, সে যদি ছোটকে তার দোষ ত্রুটি উপেক্ষা করে তাকে সৎ আচার বিচার শিক্ষা দিয়ে উঠিয়ে নিতে না পারল তবে বড়র মহত্ত্ব কোথায় ? শুধু বড় বলিলেই কি সে বড় হয়ে যায় ? তার গুণ থাকা চাই। আমি কি কাহাকেও ভুল পথ দেখাতে পারি ? আমি আজ যে পথ দেখাচ্ছি তাই-ই অভ্রান্ত পথ । সময় হইলে তখন নিজেরা বুঝবে, ভবিষ্যতে গুরুতর বিপদ আসছে। যার জ্ঞান আছে সে বুঝবে।”

শ্রীশ্রী আচার্যদেবের দর্শনে এসে নমশূদ্র সর্দারগণ তাঁকে প্রণাম করলে তিনি তাদের সকলকে বসতে আদেশ করলেন । এত স্নেহ, ভালোবাসা, এমন প্রাণ জুড়ানো মধুর বাণী তারা যেন কোথাও পায়নি । শুধু উচ্চবর্ণের হিন্দুর কাছে কেন, এমন আদর দরদ তারা জীবনে কখনও অনুভব করেনি কোথাও । তখন লীগ মন্ত্রীসভার শাসন । সবদিক দিয়ে হিন্দুরা কোণঠাসা । যুক্তবাংলার সেদিন সর্বত্র হিন্দুরা নির্যাতিত। লীগ নমশূদ্র নেতাকে মন্ত্রীসভায় এনে নমশূদ্র সম্প্রদায়ের মনোবল আকর্ষণ করিতেছে । পতিতপাবন শ্রীঠাকুর সেদিন হিন্দুসমাজকে এই ঘোরতর বিপদ হতে উদ্ধার করলেন। উচ্চবর্ণের মধ্যে একসময় রব উঠেছিল যে “আচার্য স্বামী প্রণবানন্দজী উচ্চবর্ণের হিন্দু ও নমশূদ্রদের একত্রে বসিয়ে জাতিচ্যুত করেছেন।” পরে যখন উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তাঁর আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও ভাব বুঝতে পারল তখন সেই ক্ষণিকের গুঞ্জন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল ।

( শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাবমধুর লীলাপ্রসঙ্গ- স্বামী অরূপানন্দ )
0 comments

গুরু ও শিষ্যের লক্ষণ

গুরু চিনব কি করে???

সূর্যকে প্রকাশ করতে মশালের প্রয়োজন হয় না।সূর্যকে দেখার জন্য আর বাতি জ্বালতে হয় না।সূর্য উঠলে আমরা স্বভাবতই জানতে পারি যে সূর্য উঠেছে।এইরূপ আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য লোকগুরুর আবির্ভাব হলে আত্মা স্বভাবতই জানতে পারে যে,তার উপর সত্যের সূর্যালোকপাত শুরু হয়েছে।সত্য স্বতঃপ্রমাণ,তাকে প্রমাণ করতে অপর কোন সাক্ষের প্রয়োজন নাই-এটা স্বপ্রকাশ।সত্য আমাদের অন্তস্থলে প্রবেশ করে,এর সামনে সমগ্র জগত এসে দাড়ালেও সে বলবে-"আমিই সত্য"।যে সকল আচার্যের হৃদয়ে জ্ঞান ও সত্য সূর্যালোকের ন্যায় উজ্বল,তারা জগতের মধ্যে সর্বোচ্চ পুরুষ।জগতের অধিকাংশ লোকই তাদের ঈশ্বর বলে পুজা করে।

কিন্তু আমরা অপেক্ষাকৃত অল্প জ্ঞানীর নিকটও আধ্যাত্বিক সাহায্য লাভ করতে পারি।আর আমাদের অন্তর্দৃষ্টি এমন প্রখর এবং নিখুত নয় যে,আমরা আচার্যের বা গুরুর সম্পর্কে যথার্থ বিচার করব।তাই গুরু-শিষ্যে দুজনেরই কতগুলি পরীক্ষা আবশ্যক।


শিষ্যের এই গুণগুলি আবশ্যক-পবিত্রতা,প্রকৃত জ্ঞানপিপাসা ও অধ্যবসায়।অশুদ্ধাত্মা পুরুষ কখনও ধার্মিক হতে পারে না।কেননা কায়মনোবাক্যে কেউ পবিত্র না হলে সে ধার্মিক হতে পারবে না।আর জ্ঞানতৃষ্ণা সম্পর্কে বলা যায়,আমরা যা চাই,তা পাই-এটাই সনাতন নিয়ম।কিন্তু অন্তরের সাথে একাত্ন না হয়ে চাইলেই কি সেই কাম্য প্রাপ্ত হয়?

ধর্মের জন্য প্রকৃত ব্যাকুলতা অনেক বড় জিনিস।আমরা ধর্মকে সচারচর যতটা সহজ মনে করি,ঠিক ততটা সহজ নয়।শুধুমাত্র ধর্মকথা শুনলে বা ধর্মগ্রন্থ পড়লেই প্রমানিত হয় না ধর্মপিপাসার কথা।যতদিন পর্যন্ত আমাদের প্রাণে ব্যাকুলতা জাগ্রত না হবে,যতদিন পর্যন্ত আমাদের প্রাণে প্রবৃত্তির উপর জয়লাভ না হবে,ততদিন আমাদের সংগ্রাম আবশ্যক।এই সংগ্রাম হবে পাশব প্রকৃতি ও অভ্যাসের উপর।দুই একদিনের কাজ নয় এটি,বছরের পর বছর,যুগান্তর কিংবা কয়েক জন্মও কেটে যেতে পারে।কারো জন্যে সহজেই সিদ্ধিলাভ হয়,আবার কারো জন্যে ধীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হয়।যদি অপেক্ষার কাল আসে তবে সেক্ষেত্রেও ধৈর্য ধরতে হবে।

যেই শিষ্য এইরূপ অধ্যবসায় সহকারে সাধনে প্রবৃত্ত হয়,তার সিদ্ধি অবশ্যম্ভাবী।


গুরু সম্পর্কে এটা দেখা দরকার তিনি শাস্ত্রের মর্মজ্ঞ কিনা।জগতের সকলেই বেদ,পুরান বা অন্যান্য গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করে।কিন্তু শাস্ত্রসমূহ কেবল কতগুলো শব্দ এবং ব্যাকরণ - ধর্মের কয়েকটি অস্থি মাত্র।যে গুরু শব্দ নিয়ে আলোচনা করেন এবং মনকে শুধু শব্দের ব্যাখ্যা দ্বারা চালাতে চান,তিনি ভাব হারিয়ে ফেলেন।আর শাস্ত্রের মর্ম যিনি জানেন,উনিই যথার্থ ধর্মাচার্য।
শাস্ত্রের শব্দজাল যেন মহারণ্য, মানুষ নিজেকে একবার হারিয়ে ফেললে পথ খুজে পায় না।
"শব্দজালং মহারণ্যং চিত্তভ্রমণকারণম।"(বিবেকচূড়ামণি)
অর্থাৎ শব্দজাল মহারণ্যের ন্যায়,চিত্তের ভ্রমনের কারন।শব্দযোজনা হচ্ছে বক্তৃতা ও শাস্ত্র মর্ম ব্যাখ্যা করবার জন্য,এটা কোনভানেই মুক্তির সহায়ক নয়।যারা এমন করেন,তাদের ইচ্ছা লোকসমাজে তাদের সম্মান হোক,পণ্ডিত বলে সবাই গণ্য করুক।কিন্তু জগতের প্রধান ধর্মাচার্যগণ কেউ এইভাবে শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করেন নি।তারা শাস্ত্রের শব্দার্থ ও অর্থ নিয়ে প্যাচান নাই,বরং জগৎকে শাস্ত্রের মহান ভাব শিক্ষা দিয়েছেন।আর যাদের শেখানোর কিছুই নেই,তারা দুই একটা শব্দ নিয়েই গবেষণা করে তার নাড়ি নক্ষত্র বের করার প্রয়াস করেন।


এক আম বাগানে কয়েকজন বেড়াতে গেল।বাগানে গিয়ে তারা হিসাব আরম্ভ করল-কয়টা আম গাছ,কি রকম আম ধরেছে,কোন ডালে কত পাতা,শাখা-প্রশাখা কেমন,আমের বর্ণ,আকৃতি,গন্ধ ইত্যাদি।পরস্পরের মধ্যে এরূপ বিচারে যুক্তি তর্ক বাধতে শুরু করল এক সময়।এদের মধ্যে একজন ছিলেন বিচক্ষন।সে আমের বিচার না করে আম পেড়ে খেতে শুরু করল।কে বেশি বুদ্ধিমান???
আম খেলে পুষ্টি পাবে,পাতা গুনে লাভ কি।পাতা গোনা এবং অন্যকে জানানো বন্ধ করে দাও।অবশ্য এরূপ কাজের কিছুটা উপযোগিতা আছে।তবে সেটা ধর্মরাজ্যে নয়।যারা এইরূপ পাতা গুনে বেড়ায় তাদের ভিতর থেকে একটি ধর্মকথাও বের করা সম্ভব হয় না।ধর্ম যদি জীবনের লক্ষ্য হয়,তবে সেই লক্ষ্যে পৌছাবার জন্য পাতা গোনার মত এতো কষ্ট না করলেও হবে।যদি ভক্ত হতে একান্তই ইচ্ছা জাগে,তবে শ্রীকৃষ্ণ মথুরায় কিংবা ব্রজে জন্মেছিলেন,শৈশবে কিংবা যৌবনে কি কাজ করেছিলেন,তা জানার আবশ্যকতা নেই।গীতায় কর্তব্য ও প্রেম সম্পর্কে যে সুন্দর শিক্ষা আছে,আগ্রহের সাথে তা অনুসরন করাই হবে ভক্তের কাজ।
শাস্ত্র প্রণেতা সম্পর্কে অন্যান্য বিষদ বিষয় জানা কেবল পন্ডিতদের আমোদের জন্য।তারা যা চায়,তাই নিয়ে থাকুক।তাদের পন্ডিতি তর্কবিচারে "শান্তিঃ শান্তিঃ" বলে আমাদের আম খাওয়াই শ্রেয়।


গুরুর নিষ্পাপ হওয়া আবশ্যক।অনেক সময়ে লোকে বলিয়া থাকে ,"গুরুর চরিত্র,গুরু কি করেন না করেন,দেখিবার প্রয়োজন কি? তিনি যা বলেন,তাহাই বিচার করিতে হইবে।সেইটি লইয়াই কাজ করা প্রয়োজন।" এ কথা ঠিক নয়।গতি-বিজ্ঞান,রসায়ন বা অন্য জড়-বিজ্ঞানের শিক্ষক যাহাই হউন না কেন,কিছু আসে যায় না।কারন উহাতে কেবল বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োজন হয়।কিন্তু অধ্যাত্মবিজ্ঞানের আচার্য অশুদ্ধচিত্ত হইলে তাঁহাতে আদৌ ধর্মালোক থাকিতে পারে না।অশুদ্ধচিত্ত ব্যক্তি কী ধর্ম শিখাইবে? নিজে আধ্যাত্মিক সত্য উপলব্ধি করিবার বা অপরে শক্তি সঞ্চার করিবার একমাত্র উপায়-হৃদয় ও মনের পবিত্রতা।

যতদিন না চিত্তশুদ্ধি হয়,ততদিন ভগবদ্দর্শন বা সেই অতীন্দ্রিয় সত্তার আভাসজ্ঞানও অসম্ভব। সুতরাং ধর্মাচার্যের সম্বন্ধে প্রথমেই দেখা আবশ্যক তিনি কি চরিত্রের লোক,তারপর তিনি কি বলেন তাহাও দেখিতে হইবে।তাহার সম্পূর্ণরূপে শুদ্ধচিত্ত হওয়া আবশ্যক।তবেই তাহার কথার প্রকৃত একটা গুরুত্ব থাকে,কারন তাহা হইলেই তিনি প্রকৃত শক্তি সঞ্চারকের যোগ্য হইতে পারেন।নিজের মধ্যেই যদি সেই শক্তি না থাকে,তবে তিনি সঞ্চার করিবেন কি?গুরুর মন এরূপ প্রবল আধ্যাত্বিক স্পন্দন সম্পন্ন হওয়া চাই যে তাহা যেন সমবেদনাবশে শিষ্যে সঞ্চারিত হইয়া যায়।গুরুর বাস্তবিক কার্যই এই- কিছু সঞ্চার করা,কেবল শিষ্যের বুদ্ধিবৃত্তি বা অন্য কোন শক্তি উত্তেজিত করিয়া দেওয়া নয়।বেশ স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়,গুরু হইতে শিষ্যে যথার্থই একটি শক্তি আসিতেছে।সুতরাং গুরুর শুদ্ধচিত্ত হওয়া আবশ্যক।


দেখা আবশ্যক,গুরুর উদ্দেশ্য কি? 

গুরু যেন অর্থ,নাম যশ বা কোন স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মশিক্ষাদানে প্রবৃত্ত না হন- সমগ্র মানবজাতির প্রতি শুদ্ধ প্রেমই যেন কার্যের নিয়ামক হয়।আধ্যাত্বিক শক্তি শুদ্ধ প্রেমের মাধ্যমেই সঞ্চারিত করা যাইতে পারে।কোনরূপ স্বার্থপূর্ণ ভাব,লাভ বা যশের ইচ্ছা এক মুহূর্তে এই সঞ্চারের মাধ্যম নষ্ট করিয়া ফেলে।ভগবান প্রেমস্বরূপ,আর যিনি ভগবানকে প্রেমস্বরূপ বলিয়া জানিয়াছেন,তিনিই মানুষকে ভগবদ্ভাব শিক্ষা দিতে পারেন।

আর যদি গুরুতে এই সব লক্ষণ বর্তমান থাকে,তবে জানিতে হইবে কোন আশঙ্কা নাই।নতুবা তাহার নিকট শিক্ষায় বিপদ আছে,তিনি হৃদয়ে সদ্ভাব সঞ্চার করিতে না পারেন,হয়তো অসদ্ভাব সঞ্চার করিবেন।এই বিপদ হইতে নিজেকে সর্বতোভাবে সাবধান রাখিতে হইবে।"যিনি বিদ্বান,নিষ্পাপ ও কামগন্ধহীন,যিনি শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মবিদ" তিনিই প্রকৃত সদগুরু।

গুরুই ধর্মশিক্ষার্থীর চক্ষু খুলিয়া দেন।সুতরাং কোন ব্যক্তির সহিত তাহার বংশধরের যে সম্বন্ধ,গুরুর সহিত শিষ্যেরও ঠিক সেই সম্বন্ধ।গুরুর প্রতি বিশ্বাস,বিনয়নম্র আচরণ,তাহার নিকট শরণগ্রহন ও তাহার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ব্যতিরেকে আমাদের হৃদয়ে ধর্মের বিকাশ হইতেই পারে না।আর ইহাও বিশেষ লক্ষ্য করিবার বিষয় যে,যে সব দেশে গুরু শিষ্যের এরূপ সম্বন্ধ আছে,কেবল সেই সব দেশেই অসাধারন ধর্মবীরগণ জন্মিয়াছেন।আর যেসব দেশে গুরু শিষ্যের এ সম্বন্ধ রক্ষা করা হয় নাই,সে সব দেশে ধর্মের শিক্ষক কেবল বক্তামাত্র।


0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger