সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪৮)

গড়ুরে চড়ে শ্রীবিষ্ণু বৈকুণ্ঠে আসলেন। দেবলোকে উৎসব আরম্ভ হল । বৈকুণ্ঠ ধামে উৎসব আরম্ভ হল। বৈকুণ্ঠের অধিবাসীরা সকলে স্বাগত জানালেন। দেখলেন শ্রীরামের কৃপায় সকলে উদ্ধার হয়ে দেব শরীর প্রাপ্ত করে বৈকুণ্ঠে এসেছেন । নারদ মুনি কীর্তন করছেন। গন্ধর্ব, অপ্সরা, চারণ, কিন্নররা নৃত্য সঙ্গীত পরিবেশন করছেন । বিবিধ বাদ্য বাজনা বাজছে। অপূর্ব শোভা সেই বৈকুণ্ঠপুরীর। সরস্বতী দেবী সহ বিরিঞ্চিদেব, পার্বতী সহ শঙ্কর পদার্পণ করেছেন। দেবতারা পুস্প বর্ষণ করে ভগবান বিষ্ণুকে স্বাগত জানাচ্ছেন। সেই কতকাল পর বৈকুণ্ঠে গমন । এরপর দেখলেন বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী লক্ষ্মী বরণডালা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছেন । ভগবান বিষ্ণুকে বরণ করলেন। অনন্ত নাগে লক্ষ্মী নারায়ণ অবস্থান করলেন। লক্ষ্মী দেবীকে বামে রেখে ভগবান নারায়ণ বসলেন। অপূর্ব যুগল মূর্তি দেখে সকলে সকলে ধন্য ধন্য করলো। পুস্পাদি, সুগন্ধ, চামর, পাখা ব্যাঞ্জন করে সকলে ভগবান নারায়ণের স্তব স্তুতি করলেন। মহেশ্বর বললেন- “হে নারায়ণ! আপনার শ্রীরাম রূপ ধন্য। এই ত্রেতা যুগে দেবী লক্ষ্মী যেমন সীতা রূপে নারীর অধিকার মর্যাদা প্রতিতিষ্ঠ করে এসেছেন, ঠিক আপনি শ্রীরাম রূপে ধর্ম স্থাপন করে জগতের সামনে আদর্শ স্থাপন করেছেন। ন্যায়, নীতি, সত্য, বৈরাগ্য, ত্যাগ, কর্তব্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। যুগে যুগে এই রামলীলা মানুষকে প্রেরণা দেবে।” শ্রী নারায়ণ বললেন- “হে মহাদেব। রাম রূপে আপনার কপি অবতারকে ভক্ত রূপে পেয়ে আমি ধন্য। হনুমানের সকল সেবায় আমি প্রসন্ন। যুগে যুগে যখন আমার রাম অবতারের পূজা হবে, সাথে আপনার অবতার হনুমানের পূজা হবে। হনুমানের পূজা না করে যে আমার পূজা করবে, তাহার পূজা আমি স্বীকার করবো না। আমার বৈষ্ণব ভক্ত গড়ুর, নারদ, ধ্রুব, প্রহ্লাদ, বলির সাথে সাথে হনুমানের পূজা হবে। যে বৈষ্ণব হনুমানের পূজা করবে না, তাহাকে আমি কদাপি কৃপা করবো না। যেখানে আমার ভক্তদের সম্মান, শ্রদ্ধা করা হয়, সেখানেই আমি থাকি। যেখানে আমার ভক্তের অপমান হয় সেখানে আমি কোনদিন বিরাজ করি না।” মাতা কমলা বললেন- “প্রভু! এই রূপে বারংবার আপনার থেকে আমার বিচ্ছেদ হয়েছে। আপনার সেবার সুযোগ পেলাম না। কথা দিচ্ছি আপনার আগামী অবতারে আমি বহু রূপে আবির্ভূতা হয়ে আপনার সেবা করবো।” রাধারানী সহ ও রুক্মিণী দেবী সহ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সকল ৮ পত্নীরা সেই লক্ষ্মী দেবীর অংশা ছিলেন।
ব্রহ্মা বললেন- “প্রভু! আপনাকে ফিরিয়ে আনতে আমি অধর্ম অর্থাৎ ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছি। আমি অপরাধী। আমাকে ক্ষমা করুন প্রভু।” ভগবান বিষ্ণু বললেন- “হে ব্রহ্মদেব। আমি নিজেই আমার রামাবতারের সময় নির্ধারিত করেছিলাম। এতে আপনার দোষ নেই। আপনি এইরূপ ছলচাতুরীর আশ্রয় না নিলে বিধির বিধান লঙ্ঘিত হতো। আপনি সঠিক কাজ করেছেন।” নারদ মুনি নারায়ন শব্দ উচ্চারণ করে ব্রহ্মাকে জিজ্ঞেস করলেন – “পিতা! এই রামলীলা অর্থাৎ ‘রামায়ণ’ এর মাহাত্ম্য কি?” ব্রহ্মা বললেন- “পুত্র নারদ! মহামুনি বাল্মিকীর লিখিত এই রামায়ণ কে আমি নিজে পূজা করি । দেবতা, গন্ধর্ব, সিদ্ধ, ব্রহ্মর্ষি সকলে শ্রদ্ধা সহ রামায়ণ শ্রবণ করেন । ইহা শ্রবণে পরমায়ু সৌভাগ্য লাভ হয় । শ্রাদ্ধকালে পণ্ডিত সর্বদা রামায়ণ পাঠ করিয়া সকলকে শ্রবণ করাবেন । রামায়ণ পাঠে পুত্রহীন পুত্র, ধনহীন ধন লাভ করিবে। রামায়নের এক অধ্যায় যে পড়িবে সে সর্ব পাপ হতে মুক্ত হবে । রামায়ণ পাঠক সন্তুষ্ট হলে দেবতারা তুষ্ট হন। সুতরাং রামায়ণ পাঠককে বস্ত্র, সুবর্ণ, ধেনু দান করা কর্তব্য। এই আয়ু বর্ধক ‘রামায়ণ’ পড়লে ইহকাল ও পরকালে মঙ্গল হয় । যে সকাল, দ্বিপ্রহর ও সন্ধ্যায় রামায়ণ পড়ে সে কদাপি অবসন্ন হয় না। সহস্র অশ্বমেধ, সহস্র বাজপেয় যজ্ঞে যেই ফল লাভ হয়, রামায়নের একটি অধ্যায় শুনিলে সেই ফল লাভ হয় । ” যাই হোক। অযোধ্যা এর পর দীর্ঘদিন জনশূন্য ছিলো। রাজা ঋষভের রাজত্বকালে পুনঃ অযোধ্যা জনপূর্ণ হল। অযোধ্যা ভারতবর্ষে উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে অবস্থিত। এখনও শ্রদ্ধালু ভক্তেরা সেখানে গিয়ে ভজন সাধন করেন । যেখানে যেখানে রামায়ণ পাঠ হয় সেখানে সেখানে হনুমান অবস্থান করেন। ইহা মিথ্যা নয় । কিন্তু আমাদের সেই নয়ন কোথায় যে হনুমানজিকে দর্শন করবো। তীর্থ স্থানে পবিত্র স্থানে ভ্রমণে যে ফল হয় রামায়ণ শ্রবনে সেই ফল হয়। কুরুক্ষেত্রে সূর্য গ্রহণের সময় যেব্যাক্তি প্রচুর সোনা দান করেন, আর যে রামায়ণ শ্রবণ করেন উভয়ে সমান ফল পায়। যে ব্যাক্তি শ্রদ্ধা সহ এই ‘রামায়ন’ শ্রবণ করবে সে সর্ব পাপ হতে মুক্ত হয়ে বিষ্ণুলোকে গমন করবে। মহর্ষি বাল্মিকী রচিত এই রামায়ণ শ্রদ্ধা সহ সত্য জ্ঞানে শ্রবণ করলে স্ত্রীপুত্র সন্ততি পরিবর্ধিত হয় । তাই সত্য জ্ঞানে শ্রবণ করা উচিৎ।
শ্রীরামচন্দ্র, সীতা, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব এবং হনুমানকে প্রনাম করি । যে যে স্থানে রামকথা পাঠ হয় সে সে স্থানে অশ্রুপূর্ণলোচনে অবস্থিত সেই রাক্ষসবিনাশক পবননন্দন হনুমান কে প্রনাম করি । সর্বশক্তিমান , রামভদ্র , রামচন্দ্র , রঘুনাথ, সীতানাথ, জগন্নাথ রামকে প্রণাম করি । এই পৃথিবীতে রামায়ণলেখক, রামায়ণপাঠক, রামায়ণ শ্রোতা এবং যে রাজ্যে রামায়ণ থাকে, সেই রাজ্যের রাজা- সকলেরই মঙ্গল হয়। ( রামায়ণ মাহাত্ম্য বাল্মিকী রামায়ন হতে লেখা )
জয় জয় রঘুপতি রাজা রাম,
পতিত- পাবন সীতা রাম ।
জয় জয় মঙ্গল পরশন রাজা রাম ,
পতিত- পাবন সীতা রাম ।।
বরাভয়দানরত রাজা রাম,
পতিত- পাবন সীতা রাম ।
দীন দয়াল প্রভু রাজা রাম ,
পতিত- পাবন সীতা রাম ।।
আশ্রিত – বৎসল রাজা রাম,
পতিত- পাবন সীতা রাম ।
দশরথ - নন্দন রাজা রাম ,
পতিত- পাবন সীতা রাম ।।
রাজা রাম জয় সীতা রাম ।
পতিত- পাবন সীতা রাম ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )
রামায়ণের আরতি
........................
আরতি শ্রীরামায়ণজী কী ।
কীরতি কলিত ললিত সিয় পী কী ।।
গাবত ব্রহ্মাদিক মুনি সারদ ।
বাল্মীক বিগ্যান বিসারদ ।।
সুক সনকাদি সেষ অরু সারদ ।
বরনি পবনসুত কীরতি নীকী ।।
গাবত বেদ পুরান অষ্টদস ।
ছঅ সাস্ত্র সব গ্রন্থন কো রস ।।
মুনি জন ধন সন্তন কো সবরস ।
সার অংস সম্মত সবহী কী ।।
গাবত সন্তত সম্ভু ভবানী ।
অরু ঘটসম্ভব মুনি বিগ্যানী ।।
ব্যাস আদি কবিবর্জ বখানী ।
কাগভুসূণ্ডি গরুড় কে হী কী ।।
কলিমল হরনি বিষয় রস ফীকী ।
সুভগ সিঙ্গার মুক্তি জুবতী কী ।।
দলন রোগ ভব মূরি অমী কী ।
তাত মাত সব বিধি তুলসী কী ।।
( তুলসীদাসী রামায়ণ )
হে দয়াময় শ্রীরাম তোমার লীলামাহাত্ম্য বলে শেষ হয় না। রামায়ণ লেখনীতে যে সকল ত্রুটি, ভুল – ভ্রান্তি, বিচ্যুতি অক্ষর বিচ্যুতি আদি দোষ হয়েছে তাহা তুমি নিজগুনে ক্ষমা করে সকলের ওপর আশীর্বাদ প্রদান করো। জয় সীতারাম । জয় শ্রীরাম । জয় হনুমান ।
এবার দেখি ভারতবর্ষে সব ভাষায় কোন কোন কবি ‘রামায়ণ’ লেখেছেন।
সংস্কৃত- মহর্ষি বাল্মিকী মুনি
বাংলা- কৃত্তিবাস ওঝা
হিন্দী- তুলসীদাস গোস্বামী
তামিল- কুম্ভন
তেলেগু- রঙ্গনাথন
অসমীয়া – মাধবকন্দলী
কানাড়া- তরাবে
মারাঠী- একনাথ
সকল রামায়ণ রচয়িতাদের দিগের চরণে প্রণাম জানাই ।
জয় সীতারাম । জয় মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম । জয় মাতা সীতা । জয় মহাবীর হনুমান । জয় রামায়ণ । জয় হিন্দুধর্ম ।
“রামায়ণ কথা” লিখতে যে সকল গ্রন্থের সহায়তা নিতে হয়েছে-
বাল্মিকী রামায়ণ, কৃত্তিবাসী রামায়ণ, তুলসীদাসী রামায়ণ, অমরচিত্রমালা, উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন সাইট ও ব্লগ, পদ্মপুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত, দেবীভাগবতপুরাণ, বৃহৎ ধর্ম পুরাণ, কালিকাপুরাণ, অদ্ভুত রামায়ন, অধ্যাত্ম রামায়ণ, রামায়ণ কথা, গুরুমুখী রামায়ণ, রামকথা , দশাবতারচরিত, ভারতের আদিযুগ ইত্যাদি।
( উত্তরকাণ্ড সমাপ্ত। রামায়ণ কথা সমাপ্ত )
0 comments

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪৭)



বিভীষন আসলেন। সুগ্রীব, জাম্বুবান, নল, নীল, অঙ্গদ, গবাক্ষ, মৈন্দ , দ্বিবিদ আদি সব বানরেরা আসলেন। হনুমান শ্রীরামের লীলাত্যাগ শুনে খুবুই রোদন করতে লাগলেন । প্রভু শ্রীরামের চরণে পড়ে বললেন- “প্রভু! আপনার বিহনে আমি বা কিরূপে থাকবো? এ কেমন সিদ্ধান্ত? অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত ত্যাগ করুন। কিছুতেই আপনাকে দেহ রাখতে অনুমতি দিতে পারি না।” শ্রীরামচন্দ্র বললেন- “বতস্য হনুমান! আমি নিত্য। আমি জন্ম মৃত্যুর ঊর্ধ্বে। হনুমান ! আমি আমার ভক্তদের ছেড়ে কোথায় থাকি ? যেখানে আমার ভক্তেরা আমাকে আহ্বান করেন, আমি সেইখানেই অবস্থান করি। আমার ভক্তের মধ্যেই আমি বিরাজ করি। তুমি নিজে বক্ষ বিদীর্ণ করে জগতকে এই শিক্ষাই ত দিয়েছো? তুমি এখন রোদন করছ? হনুমান। মানব কদাপি অমর হয় না। যে জন্মে সে একদিন দেহ রাখে। ইহাই সত্য। ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে শিশু ত ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যায়। প্রতি শ্বাস, প্রতি ক্ষণ তাহাকে ক্রমশ মৃত্যুর দিকেই নিয়ে যায়। সুতরাং এই শরীর আমাকে ত্যাগ করতে হবে।” এই বলে শ্রীরামচন্দ্র , হনুমান সহ বিভীষণ, সুগ্রীব, জাম্বুবান, নল, নীল, অঙ্গদ সকলকে এই অমৃত বার্তা প্রদান করলেন । সুগ্রীব বললেন- “প্রভু! আমি অঙ্গদকে কিস্কিন্ধ্যার রাজা করে এসেছি। আপনার সহিত আমিও গমন করবো। ইহাতে নিষেধ করতে পারবেন না। ইহাই আমার দৃঢ় সঙ্কল্প ।” ভগবান শ্রীরামচন্দ্র সেই ইচ্ছা মেনে নিলেন । এরপর ভগবান শ্রীরাম বিভীষণকে বললেন- “বিভীষণ তুমি ইক্ষাকু কুলের দেবতা সূর্যনারায়ন জগন্নাথের আরাধনা করো। ইহাতে তোমার পরম মঙ্গল হবে।” সকলে রোদন করতে লাগলেন। শ্রীরাম সকলকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- “ জাম্বুবান, অঙ্গদ , দ্বিবিদ, মৈন্দ, বিভীষণ তোমরা যতদিন কলিকাল না আসে ততদিন ধরণী তে থাকো। জাম্বুবানের সাথেই তোমরা থাকো।”

এরপর এলো সেই লীলা সংবরণের দিন। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র বললেন- “হনুমান। তুমি চার যুগে অমর। এই কথা বিস্মৃত হয়ো না। লব ও কুশ সহ অয্যোধ্যার রাজকুমারদের দেখো। আগামী যুগে তোমার পূজা প্রচলন হবে। তোমার অনেক মন্দির স্থাপনা হবে।” হনুমান রোদন করতে করতে বলল- “না প্রভু! সেবকের কেন পূজা হবে? আমি আমার পূজা চাই না। আপনার চরণ ভিন্ন আমার অন্য কিছু অভিলাষ নেই।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “হনুমান! মানুষের বিশ্বাস এর রূপ হচ্ছে মন্দির । মন্দিরের বিগ্রহ মানুষের বিশ্বাসেই নির্মাণ হয়। ঈশ্বর সর্বব্যাপী। তবুও মানুষ তাহাকে সেই রূপেই পূজা করেন, যেই রূপে শাস্ত্রে ব্যাখা হয়। তুমি ত্রানকর্তা, তুমি সংকটমোচন , তুমি মহাবীর। যারা তোমাকে পূজা করবে, আমি স্বহস্তে তাঁহাদিগের ভববন্ধন মোচন করে বৈকুণ্ঠে নিয়ে যাবো। তোমার ভক্তদের ওপর সর্বদা আমার কৃপা বর্ষণ হবে। তোমাকে ভগবান রূপে প্রকাশ হতেই হবে। তুমিই ধর্মের রক্ষা করবে। অধর্মের থেকে ধর্মকে ত্রান করবে। বিপদে পড়ে যে তোমার স্মরণ করবে তুমি তাহাকে রক্ষা করবে। তুমিই মুক্তি প্রদান করবে।” হনুমান অশ্রু মোচন করতে লাগলেন । রোদন করতে করতে বললেন- “প্রভু! আপনার দর্শন কবে পাবো? কবে আপনার সেবার সুযোগ পাবো?” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “হনুমান! দ্বাপরে আমি আবার অবতার গ্রহণ করে আসবো। তখন তোমার সাথে আমার আবার সাক্ষাৎ হবে। কথা দিলাম। তোমাকে আমি দ্বাপর যুগেও ‘রাম’ রূপে দর্শন দান দেবো। তোমাকে সেবার সুযোগ দেবো। হনুমান, বৈকুণ্ঠের দ্বার তোমার জন্য অবাধ। তোমার যখন ইচ্ছা বৈকুণ্ঠে এসে আমার দর্শন করতে পারবে।” হনুমান বললেন- “প্রভু! আমি জানি, আপনিই স্বয়ং নারায়ন। আপনার এই ‘রাম’ রূপ আমার হৃদয়ে অবস্থিত। কৃপা করে সদা সর্বদা আপনি এই ‘রাম’ রূপেই মাতা সীতা সহিত বিরাজ করবেন। এই প্রার্থনাই জানাই। যেখানে যেখানে আপনার লীলা, আপনার কীর্তন , রামায়ন পাঠ হবে – সেখানে আমি অবস্থান করবো। এই আপনাকে কথা দিলাম। ” শ্রীরাম সম্মতি প্রদান করলেন । নারায়ন, কৃষ্ণ, রাম সকলেই এক। যে তাঁহাকে যেই রূপে হৃদয়ে স্থান দেন, তিঁনি সেই রূপেই আসেন। রামভক্তের নিকট তিঁনি সর্বদা ধনুর্বাণ ধারী শ্রীরামচন্দ্র।

এই বলে শ্রীরামচন্দ্র রাজপুরী ছেড়ে বের হলেন। পেছনে ফেলে রেখে গেলেন অনেক স্মৃতি । মনে পড়লো কত পুরানো ঘটনা। বাল্যকাল থেকে এক এক করে সব মনে পড়লো। সকলেই ত স্বর্গ চলে গেছেন। ধরিত্রীর এই নিয়ম। যে আসে, তার গমন নির্ধারিত হয়েই যায়। এক এক করে সবাই চলে গেলো। অযোধ্যার অনেক বৃদ্ধ, কাণা , খোঁড়া ছুটে এলো। অনেক পুরুষ নারী এলো। সকলে শ্রীরামের সাথে যেতে চাইলেন। কিন্তু শ্রীরাম প্রথমে রাজী না হলেও, পরে ভক্তের কাছে রাজী হলেন । ভরত, শত্রুঘ্ন চললেন। সুগ্রীব চললেন। সকলের চোখে জল । হনুমান কাঁদছেন। শ্রীরামচন্দ্র বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, অগ্যস্ত ও অনান্য মুনিদিগকে একে একে সকলের কাছে প্রণাম জানালেন। মুনি- ঋষি- ব্রাহ্মণ দের ভূমি, গো, ধন সম্পদ দান করে আশীর্বাদ নিলেন। এরপর হনুমানকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- “হনুমান। তুমি আমার ভক্তদের সর্বদা রক্ষা করবে।সকলের কাছে আমার ভক্তি বিতরণ করবে। যখন যখন ধর্মের অবক্ষয় হবে, অধর্মের প্রাদুর্ভাব হবে তখন তখন আমি এই ধরণীতে আসবো।” তারপর সরয়ূর ঘাটে গিয়ে উপস্থিত হলেন। ধীরে ধীরে জলে নামলেন শ্রীরাম, ভরত, শত্রুঘ্ন । চলে গেলেন সোজা মাঝ নদীতে । আকাশে দেবতাবৃন্দ উপস্থিত হয়ে বিবিধ বাদ্য বাজনা বাজাতে লাগলেন। মাঝ নদীতে গেলে যোগ সমাধি দ্বারা ভরত ও শত্রুঘ্নের তেজ , শ্রীরামের বৈষ্ণবতেজে মিলিত হইল। দেবতারা পুস্পাদি বর্ষণ করতে লাগলেন । প্রজারা একে একে এসে সরয়ূর জলে প্রবেশ করলেন। দেহ ত্যাগ করে বৈকুণ্ঠ গমন করলেন। অবশেষে যোগ সাধনা দ্বারা শ্রীরামচন্দ্র দেহ রাখলেন । হনুমান দেখলেন অপূর্ব দিব্য তেজ সরয়ূর গর্ভ থেকে উঠে চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি ধারণ করে মহাকাশে বীলিন হলেন । সুগ্রীবও দেহ রাখলেন । ভগবানের লীলা কদাপি সমাপ্ত হয় না। ভগবানের জন্ম মৃত্যু বলেও কিছু হয় না। তিঁনি আবির্ভূত হন। আমাদের সুশিক্ষা প্রদান করেন। তাই আমাদের মাঝেই আসেন। আবার লীলান্তে লীলা সংবরণ করেন। কিন্তু ভক্তের শ্রদ্ধা বিশ্বাসে তিঁনি নিত্য বিরাজিত। নিত্য লীলা করেন ।

( ক্রমশঃ )
0 comments

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪৬)



শ্রীরামচন্দ্র হা হুতাশ করে বলতে লাগলেন- “ভ্রাতা! কেন তুমি মন্ত্রণা চলাকালীন এই কক্ষে প্রবেশ করলে? আমি কিরূপে তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেবো। কেনই বা আমি এই প্রতিজ্ঞা করলাম। আমি কিভাবে আমার প্রাণাধিক প্রিয় ভ্রাতাকে এইহেন শাস্তি দেবো। ভ্রাতৃহন্তা হয়ে আমি নরকেও ঠাঁই পাবো না। হে বিধাতা! কেনই বা আপনি আমার থেকে এই সকল কঠোর পরীক্ষা গ্রহণ করেন ? আপন স্ত্রীকে গর্ভস্থ অবস্থায় ত্যাগ করতে হল। স্ত্রীকে বসুমতী গর্ভে প্রবেশ করাও আমাকে সহ্য করতে হল। এখন নিজের ভ্রাতাকে মৃত্যু দিতে হবে? এ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। এই জীবন আমি আর রাখবো না।” লক্ষ্মণ বলল- “অগ্রজ! আমি কি করবো? মহর্ষি দুর্বাসা পদার্পণ করেছেন। তিঁনি আদেশ করেছেন এই মুহূর্তে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে। তিলেক বিলম্ব হলেই উনি অভিশাপ দিয়ে এই রাজপুরী, এই অযোধ্যা ভস্ম করবেন বলে জানিয়েছেন। অগ্রজ! অযোধ্যা আমাদের মাতৃভূমি। মাতৃভূমির জন্য এই একজনের বলিদান উপযুক্ত। কিন্তু একজনের জীবন রক্ষার নিমিত্ত গোটা অযোধ্যাকে আমি কিভাবে ভস্ম হতে দিতে পারি? আমি ত তোমার ভ্রাতা। বড় ভ্রাতা গুরুতুল্য। আপনি ত নিজেই ত্যাগী। আপনাকে দেখেই এই ত্যাগ আমি মাথা পেতে স্বীকার করলাম । এবার সত্ত্বর গিয়ে মহর্ষি দুর্বাসার সহিত সাক্ষাৎ করুন। পাছে বিলম্ব হলে মহর্ষি আবার ক্রোধে কাণ্ডজ্ঞান বিস্মৃত না হন।” ভগবান শ্রীরাম যথাউপযুক্ত ভাবে মহর্ষি দুর্বাসাকে প্রণাম জানিয়ে বললেন- “মহর্ষি আপনি ক্রুদ্ধ হবেন না। আপনার আগমন বার্তা পেয়েই আমি ছুটে এসেছি। এ আমার পরম সৌভাগ্য যে আপনার চরণ যুগল দর্শনের সৌভাগ্য হয়েছে । দয়া করে আপনি শাপ প্রদান করবেন না। কৃপা করে আপনার সেবা করার সুযোগ প্রদান করুন।” এই বলে মহারাজ শ্রীরাম সুগন্ধি বারি দ্বারা দুর্বাসা মুনির পদ ধৌত করে চরণ পূজা করে বসতে আসন দিলেন । মহর্ষি দুর্বাসা শান্ত হলেন ।

বিনয়ে বলেন রাম কোন্ প্রয়োজন ।
দুর্বাসা বলেন চাহি উচিৎ ভোজন ।।
এক বর্ষ করিয়াছি আমি অনাহার ।
দেহ অন্ন ব্যঞ্জন যে অমৃত সুসার ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

দুর্বাসা মুনি বললেন- “হে শ্রীরাম! এক বৎসর অনাহারে তপস্যা করে আমি এখন বড়ই ক্ষুধার্ত । আমাকে অন্ন ভোজন প্রদান করো।” শ্রীরামচন্দ্র বুঝতে পারলেন এও বিধাতার খেলা। যাহাতে লক্ষ্মণ আগে গমন করতে পারে । কারণ দুর্বাসা মুনি উগ্রতপা মুনি। সহস্র বৎসর অনাহারে তপস্যা করার ক্ষমতা রাখেন তিঁনি । কিন্তু এখন আর কি করবেন । সুগন্ধি উত্তম অন্ন বিবিধ ব্যঞ্জনাদি দ্বারা মহর্ষি কে সেবা করালেন। উৎকৃষ্ট তাম্বুল বিবিধ মশলা সহকারে মহর্ষিকে প্রদান করলেন। মহর্ষি দুর্বাসা গোপোনে বললেন- “হে শ্রীরাম! আপনি সাক্ষাৎ নারায়ণ। প্রভু মর্ত্যলোকে আপনার লীলা সমাপন হয়েছে। এবার বৈকুণ্ঠে গমনের সময় এসেছে। আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন। প্রজাপতি ব্রহ্মার আদেশে আমি এমন করেছি। যাহাতে আপনি বৈকুণ্ঠ গমন করতে পারেন । ” মহর্ষি বিদায় নিলেন । লক্ষ্মণ গিয়ে বললেন- “অগ্রজ! কাল্য আমি প্রভাতে দেহ রাখবো।” শুনে শ্রীরামচন্দ্র ক্রন্দন করলেন। বললেন- “ভ্রাতা! এ কি রূপে হয় ? আমি কিভাবে মৃত্যু পথে যেতে তোমাকে আদেশ দেবো?” লক্ষ্মণ বলল- “অগ্রজ! আপনি শপথ করেছিলেন যে মন্ত্রণা গৃহে যে আসবে তাকে মৃত্যু দেবেন । রঘুকুলের নিয়ম এটাই যে প্রাণ দিয়ে হলেও শপথ রক্ষা করতে হবে। এই কারণেই ত আপনি বনে গমন করেছিলেন। এই কারণেই ত প্রজার দাবী মেনে বৌঠাণ কে ত্যাগ করেছিলেন। আজ কেন এত দুর্বল আপনি? আমি আপনার ভ্রাতা। আমি কিভাবে আপনার শপথ ভঙ্গ হতে দিতে পারি?” লক্ষ্মণ এরপর শ্রীরামের চরণে পড়ে বললেন- “ভ্রাতা! আমি আমার যথাসাধ্য আপনার সেবা করার চেষ্টা করেছি। জানি অনেক ভুল ভ্রান্তি হয়েছে। আপনি তাহা স্নেহবশে ক্ষমা করেছেন। আশীর্বাদ করুন- পরজন্মে যেনো আপনার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হয়ে জন্মাতে পারি। কারণ এই রূপে আপনাকে বনে চতুর্দশ বৎসর কণ্টক, প্রস্তরের ওপর হাটতে দেখে বুক ফেটে গেলেও, আপনাকে আদেশ করার ধৃষ্টতা করতে পারিনি। যদি আমি আপনার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হতাম তবে আপনাকে কদাপি বনবাসে যেতে দিতাম না, বৌঠানকেও ত্যাগ করতে দিতে দিতাম না। যুগে যুগে যেনো আমি আপনার ভ্রাতা হতে পারি।”

শ্রীরাম ক্রন্দন করতে করতে বললেন- “ভ্রাতা! মন না চাইলেও অনুমতি দিতে হবে। সাধুগণের কাছে ত্যাগ করা আর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উভয় সমান। আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম ভ্রাতা। তোমার ন্যায় ভ্রাতা শত কোটি জন্মের পুণ্যের ফলেই প্রাপ্তি করা যায়। পরজন্মে তুমি আমার জ্যেষ্ঠ হয়ে আবির্ভূত হবে।” এই বলে শ্রীরামচন্দ্র, লক্ষ্মণকে আলিঙ্গন করে অনেক অশ্রু বিসর্জন করলেন । পর দিন প্রাতঃকালে লক্ষ্মণ সবার অলক্ষ্যে উঠে পড়ছেন। পাছে মায়া বশত পুনঃ শ্রীরামচন্দ্র তাহাকে যেতে না দেন। পুত্র চন্দ্রকেতু আর অঙ্গদ কে দেখে অযোধ্যাকে প্রণাম করে চললেন সরয়ূ নদীর দিকে। সেখানে প্রণাম, পূজাদি করে যোগসাধনায় বসলেন। মনে পড়লো কত পুরাণো স্মৃতি ঘটনা। এই অযোধ্যাকে ঘীরে, সমগ্র বনবাস স্মৃতি, লঙ্কার যুদ্ধ আদি সকল ঘটনা। ব্রাহ্ম মুহূর্তে চতুর্দিকে পাখীর কলরবে পরিপূর্ণ। মুনি, ঋষি, ব্রাহ্মণেরা উঠে স্নানে আসছেন। চতুর্দিক হতে মন্দিরের ঘণ্টা ধ্বনি ও পবিত্র মন্ত্র সকল ভেসে আসছে। আর একধারে সরয়ূর জল বয়ে যাওয়ার আওয়াজ। চোখ মুদ্রিত করে লক্ষ্মণ ধ্যানে বসলেন। আত্মা লক্ষ্মণের দেহ থেকে বের হয়ে গেলো। স্বর্গের অপ্সরা, দেবতা সকলে লক্ষ্মণের সেই পবিত্র দেহে পুস্প বর্ষণ করলেন । যোগসাধনা দ্বারা মৃত্যু বরন আর আত্মহত্যা কিন্তু এক জিনিষ না। যোগ দ্বারা দেহ রাখতে পারেন যোগী। কঠোর যোগসাধনায় সিদ্ধ যোগীরা এমন ভাবে দেখ রাখেন। হরিদ্বার, কাশী, প্রয়োগে এখনও এমন যোগসিদ্ধ যোগী দেখা যায়। আর আত্মহত্যা করে কাপুরুষেরা, যাদের বুদ্ধি বিবেক নষ্ট হয়, তাহারাই। যোগ সাধনা দ্বারা দেহ রাখলে আত্মা সেই পরমাত্মায় লীন হয়। আর আত্মহত্যা করলে ভূত, প্রেত হয়ে ঘুরে ঘুরে অশেষ দুঃখ যাতনা পেতে হয় । লক্ষ্মণের দেহ রাখার সংবাদে শ্রীরাম খুবুই দুঃখ পেলেন । হা হুতাশ করলেন। ভরত ও শত্রুঘ্ন কে ডেকে বললেন, তিঁনিও প্রান ত্যাগ করবেন। ভরত ও শত্রুঘ্ন অনুগমন করতে চাইলে শ্রীরাম বাধা দিলেন। কিন্তু তাঁহারা বলল যে- “অগ্রজ! আমরা সকলে আপনার অংশ। আপনিই বিষ্ণু। আপনার অংশ হতে আমরা আবির্ভূত। আপনি চলে গেলে অংশ রূপ কিভাবে থাকবে? আপনাকে চতুর্দশ বৎসর বনে নিবাসে আপত্তি জানালেও, আপনি রাখেন নি। বৌঠানকে ফিরিয়ে আনতে বললেও , আপনি শোনেন নি। জানি আপনার আদেশ না মান্য করার কারণে আমাদের অপরাধ হবে। কিন্তু এই মহাপাপ করতে রাজী, তবুও আপনাকে ভিন্ন একবিন্দু মর্ত্যে থাকতে ইচ্ছা করিনা ।” তখন শ্রীরামচন্দ্র রাজী হলেন। লঙ্কা, কিস্কিন্ধ্যায় দূত প্রেরণ করে জানানো হল যে শ্রীরাম দেখ রাখবেন সরয়ূর জলে ।

( ক্রমশঃ )
0 comments

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪৫)



এরপর শ্রীরামচন্দ্র রাজ্য ভাগ করলেন । লবকে অয্যোধ্যার রাজা বানালেন। কুশকে নন্দিগ্রামের রাজা করলেন । ভরতের পুত্র তক্ষকে তক্ষশীলা আর ভরতের অপর পুত্র পুষ্কর কে পুষ্করাবতীর রাজা বানালেন । লক্ষ্মণের পুত্র চন্দ্রকেতুকে অশ্বদেশ আর লক্ষ্মণের আর এক পুত্র অঙ্গদকে মল্লদেশের রাজা করলেন । শত্রুঘ্নের দুই পুত্র শত্রুঘাতী ও সুবাহুকে মথুরা রাজ্য দুভাগ করে দুভাগের রাজা বানালেন । এভাবে সকলকে রাজা বানালেন ভগবান শ্রীরাম । ধীরে ধীরে সময় বয়ে গেলো। ত্রেতা যুগ সমাপনের পথে । দ্বাপর যুগ প্রতীক্ষারত । একদিন ব্রহ্মলোকে দেবতারা সকলে একত্র হয়েছেন। দেবতারা বললেন- “প্রজাপতি! প্রভু শ্রীবিষ্ণু কবে রাম রূপ ত্যাগ করে বৈকুণ্ঠে আসবেন? ত্রেতা যুগ ত সমাপনের পথে।” ব্রহ্মা বললেন- হে দেবতাগণ তোমরা ঠিক বলেছ। আমার বিধানে রাম অবতারের সময় সীমা সমাপ্ত । কিন্তু যদি প্রভু শ্রীরাম আরোও মর্ত্যলীলা করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তবে থাকবেন। তবুও বিধান রক্ষার জন্য আমি সেখানে কালদেবকে প্রেরণ করবো।” এই বলে ব্রহ্মা, কালদেবকে আহ্বান করলেন। ব্রহ্মা বললেন- “হে কালদেব! রাম অবতারের সময় সমাপ্ত। তুমি এখন সেই লীলা তরান্বিত করো।” এই বলে প্রজাপতি ব্রহ্মা বুদ্ধি দিলেন কালদেবকে। অপরদিকে প্রজাপতি ব্রহ্মা দুর্বাসা কে দেখা দিয়ে বললেন- “মহর্ষি দুর্বাসা। তোমার ক্রোধের কথা জগত বিদিত। মর্তলোকে শ্রীরাম অবতারের সময়সীমা সমাপন হয়েছে। শ্রীহরি যাহাতে বৈকুণ্ঠে ফিরে আসতে পারেন, তাহার জন্য তোমাকে অগ্রনী ভূমিকা নিতে হবে ।” এই বলে প্রজাপতি ব্রহ্মা, মহর্ষি দুর্বাসাকে বুদ্ধি দিলেন। ব্রহ্মার ইচ্ছায় কালদেব একজন সাধু রূপ ধরে অযোধ্যায় আসলেন। সাধু এসেছেন শুনে লক্ষ্মণ গিয়ে ভগবান শ্রীরামকে সংবাদ দিলেন । ভগবান শ্রীরাম সাদরে আপ্যায়ন করে মুনির স্বাগত জানালেন। মুনির চরণ পূজা করে বসতে আসন দিলেন। বলিলেন- “হে মহর্ষি! আমি আপনার কিরূপে সেবা করতে পারি?” এই বলে ভগবান শ্রীরাম মুনিকে স্বাগত জানিয়ে গৃহে নিয়ে গেলেন। কালদেব বললেন- “হে শ্রীরাম! আমার আপনার সহিত অতি গোপনীয় কথা আছে। সেই কথা সবার সামনে প্রকাশ নিষেধ। সে কথা অন্যজনের শোনা নিষেধ। একটি শর্তেই আমি সেই কথা বলিব।” অবাক হলেন শ্রীরাম ।

সে কালপুরুষ কহে শুনহ বচন ।
যে কথা কহিব পাছে শুনে অন্য জন ।।
এ সময়ে যে করিবে হেথা আগমন ।
ব্রহ্মার বচনে তারে করিবে বর্জন ।।
( কৃত্তিবাস রামায়ণ )

কালদেব বললেন- “হে শ্রীরাম! আপনার সাথে বার্তা চলাকালীন যদি কেহ আমাদের বার্তাকক্ষে প্রবেশ করে কিংবা বার্তা শ্রবণ করে, তবে আপনি তাহাকে মৃত্যুদণ্ড দেবেন। ইহাই শর্ত।” ইহা শুনে আশ্চর্য হলেন। এমন কি কথা থাকতে পারে। পাছে মুনিবাক্য না মানলে মুনি শাপ দেন। তাই ভগবান শ্রীরাম বললেন- “অবশ্যই মহর্ষি। আমি দাশরথি রাম এই প্রতিজ্ঞা করছি যে আমাদের কথা চলাকালীন যদি কেহ কক্ষে আসে, বা সেই কথা শ্রবণ করে- তবে তাহাকে বধ করবো।” কালদেব তখন লক্ষ্মণকে বললেন- “হে লক্ষ্মণ। তুমি সর্বদা তোমার বড় ভ্রাতার আজ্ঞা মেনে চলেছো। এমনকি বনে গিয়ে সেবা করেছো। যুদ্ধে রাক্ষস বধ করেছো। এমনকি তাঁর আজ্ঞাতেই সীতাদেবীকে বনে রেখে এসেছো। তুমি কক্ষের দ্বার প্রহরা দেবে। ভুলেও সেই কক্ষে যেনো কেউ প্রবেশ না করে। কেউ যেনো আমাদের কথা শ্রবণ না করে।” লক্ষ্মণ দ্বার প্রহরায় থাকলো। সেই সময় কক্ষে কেবল শ্রীরাম ও কালদেব। কালদেব নিমিষে ছদ্দবেশ ত্যাগ করে আসল রূপে এসে বললেন- “ভগবান! আপনি কি আপনার স্বরূপ ভুলে গেছেন ? আপনিই ত ক্ষীরোদ সাগড়ে নাগশয্যায় শায়িত ভগবান বিষ্ণু। আপনি মধু কৈটভ বধ করে মেদিনী সৃষ্টি করেছেন। আপনার নাভি থেকেই পদ্মযোনি ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়েছেন। হে নারায়ণ । সেই চতুর্মুখ ব্রহ্মা আমাকে এখানে প্রেরণ করেছেন । আপনার রাম অবতারের সময় সীমা সমাপ্ত হয়েছে। আপনি রাম অবতার ধারণ করার পূর্বে যেটুকু সময় নির্ধারিত করেছিলেন, তাহা সমাপ্ত। যদি আপনি আরোও মর্তে থাকতে চান তাহলে আপনি থাকতে পারেন। এক্ষেত্রে তবে প্রজাপতির বিধান পরিবর্তন হবে। দেবতাদের প্রার্থনা আপনি এখন বৈকুণ্ঠে আগমন করুন।” ভগবান শ্রীরাম ভাবতে লাগলেন। সত্যি ত। রাম অবতারের সময় সীমা সমাপন হয়েছে। এই অবতারের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তিঁনি কালদেবের সাথে এই নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন ।

এই সময় মহর্ষি দুর্বাসা আসলেন। ব্রহ্মার বুদ্ধিমতো কর্ম করছেন। মহর্ষি দুর্বাসাকে শ্রদ্ধা সহকারে ভেতরে আনা হল। লক্ষ্মণ কে ডেকে বললেন- “লক্ষ্মণ! এই মুহূর্তেই আমি শ্রীরামের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই। তাহাকে জানাও যে আমি এসেছি।” কিন্তু শ্রীরামকে কিভাবে ডাকা সম্ভব! সেই ঘরে প্রবেশে মানা আছে। লক্ষ্মণ বিনম্র ভাবে বলল- “মহর্ষি! আপনি কিঞ্চিৎ বিশ্রাম করে আমাদের সেবার সুযোগ প্রদান করুন। মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র খানিক ক্ষণ পরেই আসবেন।” শুনে দুর্বাসা মুনি ক্ষেপে গেলেন। বললেন- “তোমার সাহস ত মন্দ নয়। মহর্ষি দুর্বাসাকে প্রতীক্ষা করতে বল কোন সাহসে? অযোধ্যায় কি এইভাবে মুনি ঋষিদের বসিয়ে রেখে স্বাগত জানানো হয়?” লক্ষ্মণ অনেক বুঝালো। দুর্বাসা মুনি নারাজ। সেই মুহূর্তেই সাক্ষাৎ চাই। দুর্বাসা মুনি ক্ষেপে গেলেন। রেগে বলতে লাগলেন- “দেখো আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গো না। তুমি কি জানো না আমার শাপে দেবতারা শ্রীভ্রষ্ট হয়েছিলেন। আমার ক্রোধে প্রলয় হতে পারে। এইভাবে আমার অপমান করলে আমি মেনে নেবো না। অবিলম্বে শ্রীরামকে ডেকে আনো। নচেৎ আমি শাপ দিয়ে এই অযোধ্যা, অয্যোধ্যার সকল অধিবাসী, তোমাদের চার ভ্রাতা, তোমাদের এই রাজপুরী ভস্ম করবো।” লক্ষ্মণ দেখলেন দুর্বাসা মুনির চোখ দিয়ে যেনো আগুন ঝড়ছে। রাঙা ক্রোধী চোখ। কিন্তু শ্রীরামচন্দ্র সেই কক্ষ প্রবেশে মানা করেছেন। যে যাবে , তাকেই মৃত্যু দন্ড দেবেন। সেই ঋষি এমনই শর্ত দিয়েছেন। আজকেই বা দুই দুই জন ঋষি আসলেন কেন ? দুর্বাসা মুনি বললেন- “তুমি কি এখুনি রামচন্দ্রকে ডেকে আনবে, নাকি আমি শাপ দিয়ে ভস্ম করবো?” লক্ষ্মণ দেখলেন এই মুহূর্তে দুর্বাসা মুনির দাবী না মানলে গোটা অযোধ্যা ভস্ম হবে। অপরদিকে শ্রীরামচন্দ্রের কক্ষে যে যাবে সে মৃত্যুর শাস্তি পাবে। লক্ষ্মণ ভাবল তার মৃত্যুতে ত অযোধ্যা বাঁচবে। দশের বদলে একের মরণই শ্রেয়। এই ভেবে লক্ষ্মণ সেই মন্ত্রণা কক্ষে ঢুকে পড়লেন। লক্ষ্মণকে দেখেই কালদেব অদৃশ্য হল। কক্ষে ঋষির বদলে দেবতাকে দেখে লক্ষ্মণ অবাক হলেন। শ্রীরামচন্দ্র বললেন- “হাঁ লক্ষ্মণ! তুমি এ কি করলে?”

( ক্রমশঃ )
0 comments

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪৪)

রামায়ণে আমরা দেখতে পাই, শ্রীরামচন্দ্র যুদ্ধে আপন বিক্রম দেখানোর অধিকার সবাইকে দিয়েছেন। লক্ষ্মণ নিজে লঙ্কার যুদ্ধে অবস্থান করেছিলেন। শত্রুঘ্ন লবণ অসুর বধ করেছিলেন। এবার ভরতের গন্ধর্ব দিগদের বধের পালা। শুভ দিনে তিন অক্ষৌহিণী সেনা তৈরী হল। গজ, অশ্বারোহী, পদাতিক সেনা সকল তৈরী হলে। কোটি রথে অসংখ্য বীর যোদ্ধা সকল নানান ঘাতক অস্ত্র নিয়ে উঠলো। মাণ্ডবী কুলদেবতা সূর্যনারায়ণের পূজা করে ভরতের হস্তে তরবারি দিলেন। কপালে তিলক দিয়ে বিজয় কামনা করলেন । পুস্প দ্বারা পূজিত করলেন। ধূপ দ্বারা আরতি করলেন । এরপর ভরত গেলেন শ্রীরামের কাছে। শ্রীরাম আশীর্বাদ করলেন। ভরতের দুই পুত্র তক্ষ ও পুষ্কর মহারাজকে প্রণাম করলে মহারাজ শ্রীরাম বললেন- “তোমাদের পিতা বীর। তোমরা বীরের বংশে জন্ম হয়েছো। কুলের মান গড়িমা বজায় রেখো। যুদ্ধে তোমাদের পিতাকে সহায়তা করো।” এরপর মহারাজ শ্রীরাম ভরতকে ‘সংবর্ত’ নাম এক অস্ত্র দিলেন। বললেন- “ভ্রাতা! গন্ধর্বেরা মায়াবিদ্যাতে পটু। বহু মায়া রচনা করবে। এই অস্ত্র প্রচুর বিধ্বংসী ক্ষমতা রাখে। সময় বুঝে এই অস্ত্রে গন্ধর্ব দিগকে নাশ করবে।”ভরত রথে উঠলেন। ঢাক- ঢোল- কাঁসর- ন্যাকড়া- দুন্দুভি- দামামা- শিঙা বেজে উঠলো। অসংখ্য শঙ্খে ধ্বনি উঠলো। ভরত গিয়ে রথে উঠলেন । দুপাশে দুই পুত্র রথে উঠলো। হস্তী গুলি ভূমি কাঁপিয়ে শুণ্ড তুলে গর্জন করে বের হল। অশ্ব গুলি বের হল। রথের চাকায় ধূলাঝড় উঠলো। এভাবে সমগ্র সেনা সকল বের হল। হৈহৈ করতে করতে সব সেনারা চলল। ভরত তার পুত্র সহ বের হলেন। সোজা সিন্ধু নদের দিকে চলল। আশেপাশে অনেক রাজা তাহাদের স্বাগত জানালেন। কারণ অশ্বমেধ যজ্ঞের সময় সকল রাজাই আনুগত্য স্বীকার করেছেন। কত গ্রাম, কত নদী, কত জনপদ, কত নগর, কত পর্বত পার হল। মাঝে মাঝে রাত নামলে সেইস্থানে শিবিড় রচনা করে দিন কাটালেন। এইভাবে সেই রাজ্যের উদ্দেশ্যে চললেন।

গন্ধর্বেরা খবর পেলো। গন্ধর্ব দেবতাদের অনুগত এক ধরনের জীব। যেমন- যক্ষ, রক্ষ, কিন্নর, বেতাল, কুস্মাণ্ড ইত্যাদি। গন্ধর্বেরা দেবতাদের খুব মান্য করেন। স্বর্গে সোমরস জোগান এরাই। আবার স্বর্গের নৃত্যে বিবিধ বাজনা বাজিয়ে তাল প্রদান করেন । গন্ধর্বেরা মায়াবী। বিভিন্ন ধরনের মায়া জানে তাহারা। এরা কিছু বদ হয় আবার কিছু উত্তম । এদের শরীর থেকে দিব্য সুগন্ধ বিচ্ছুরিত হয় । ভরতের সেনার পেছন পেছন রক্ত মাংসের আশায় ব্যাঘ্র, সিংহ, শৃগাল ও বিভিন্ন মাংসভোজী পক্ষী কুল চলছিলো। গৃধের দল আকাশে বিচরণ করতে করতে এই সেনা দলের পেছনে চলছিলো। শুধু কি তাই ! রক্তমাংস প্রিয় বেতাল, পিশাচেরা এই সেনা দলের পেছন পেছন চলছিলো। অবশেষে ভরত সেনা নিয়ে গন্ধর্ব প্রদেশে আবির্ভূত হল । সেই সিন্ধু নদের পাশে মনোরম পরিবেশ। সেই মনোরম পরিবেশ অতীব সুন্দর। সিন্ধ নদে বয়ে চলা জলের ধারার শব্দ শোনা যায়। মিষ্টি শীতল জল প্রবাহিত। দুপাশে অপূর্ব সুন্দর বন। বিভিন্ন গাছে বিভিন্ন সুগন্ধি পুস্প ভরে আছে। যাহার সুবাস বাতাস বহুদূর অবধি বহন করে নিয়ে যায়। আর মিষ্ট কতশত ফলে বৃক্ষ গুলি সজ্জিত হয়ে আছে। এই সুন্দর কানন প্রহরা দেয় তিন কোটি অত্যাচারী গন্ধর্ব। গন্ধর্বেরা খবর পেলো। শোনা মাত্রই হৈহৈ করে ছুটে এলো । এত সংখ্যক অয্যোধ্যার সেনাকে দেখে হাস্য করতে লাগলো। কারণ সংখ্যায় অল্প হলেও গন্ধর্বেরা ভাবল মায়াবিদ্যার সহায়তায় অল্প সময়ে এই সমস্ত কিছু নাশ করে দেবে । ভরতের নির্দেশ পেতেই সেনারা যুদ্ধে এগিয়ে গেলো। বর্শা, শর ইত্যাদি গন্ধর্ব দের দিগকে ছুড়তে লাগলো। গন্ধর্বেরা মায়া বিদ্যার সহায়তায় সেই সকল অস্ত্র চূর্ণ করতে আরম্ভ করলো। গন্ধর্বেরা খড়্গ, দিব্যদণ্ড, তরবারি নিয়ে যুদ্ধে অগ্রসর হল। যুদ্ধের সময় তারা বিভিন্ন মায়ার আশ্রয় নিতে লাগলো। অদৃশ্য হয়ে অয্যোধ্যার সেনাদের ওপর আঘাত হানতে লাগলো। মায়া দ্বারা বৃহৎ প্রস্তর রূপ ধারণ করে অয্যোধ্যার সেনাদের ওপর পড়তে লাগলো।

মায়া আক্রমণে অয্যোধ্যার সেনারা কোণঠাসা হচ্ছিল্ল। রক্তনদীর ধারা গিয়ে সিন্ধু নদে মিশল। চারিদিকে কেবল অসংখ্য মৃত শব দেখা গেলো। কিছু গন্ধর্ব আবার মায়া দ্বারা নানা অস্ত্র ভরতের দিকে নিক্ষেপ করতে লাগলো। তক্ষ ও পুষ্কর তখন বিবিধ দিব্যাস্ত্রের সন্ধান করে গন্ধর্ব দের অস্ত্র গুলি চূর্ণ করতে লাগলো। দুই বালকের বীক্রম দেখে গর্বে ভরতের বুক ফুলে উঠলো। এই ত হলেন বীর সূর্যবংশী। লবকুশের ভ্রাতা এমনই শক্তিমান হওয়ার প্রয়োজন । চোখের পলকে নানা অস্ত্র নিক্ষেপ করে গন্ধর্ব দের অস্ত্র নষ্ট করতে লাগলো। ভরত নিজেও যুদ্ধে অগ্রসর করলেন। কিন্তু নানা দিব্যাস্ত্রে গন্ধর্বেরা ধ্বংস হল না। উলটে নানা মায়া বিদ্যা প্রয়োগ করে ভরতকে অতীষ্ঠ করে তুলল। তখন ভরত ধনুকে সেই গন্ধর্বনাশক ‘সংবর্ত’ অস্ত্রের আহ্বান করলেন। প্রবল বিক্রমশালী সংবর্ত অস্ত্র ভরতের ধনুকে আপন মহিমায় আবির্ভূত হলেন । ভরত মন্ত্র পড়ে সেই বাণ ছুঁড়লেন। অতি উজ্জ্বল আলো উৎপন্ন হয়ে সেই অস্ত্র গন্ধর্ব দের দিকে ধেয়ে গেলো। সেই দেখে গন্ধর্বদের ভয়ে যেনো মুখ- হাত- পা শুকিয়ে গেলো। অনেক মায়াবিদ্যা, অনেক অস্ত্র ছুড়লেও ভরতের নিক্ষেপিত অস্ত্র বিফল হল না । নিমিষে সেই অস্ত্র তিন কোটি শক্তিশালী গন্ধর্বকে ছিন্নবিছিন্ন করে দিলো। গন্ধর্বদের রক্ত মাংসে মেদিনী ঢাকা পড়লো। মাংসাশী প্রানীরা তাহা ভক্ষণ করতে লাগলো। যুদ্ধে ভরত জয়লাভ করলেন । এরপর মহারাজ শ্রীরামের আদেশে সেই বিজিত রাজ্য দুভাগ করে দুই পুত্রকে দিলেন । ‘তক্ষশীলা’ নামক রাজ্যের রাজা হলেন ভরতের এক পুত্র তক্ষ। অপর পুত্র পুষ্কর ‘পুষ্করাবতী’ রাজ্যের রাজা হলেন । ভরত সেই বিজিত রাজ্য ‘তক্ষশীলা’ , ‘পুষ্করাবতী’ নামক রাজ্যে ভাগ করেছিলেন । শ্রীরামচন্দ্র ইহা শুনে অতীব প্রসন্ন হলেন। এইভাবে মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র এগাড়ো হাজার বর্ষ রাজত্ব করেছিলেন।

( ক্রমশঃ )
0 comments

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪৩)



এই শুনে শ্রীরাম শান্ত হয়ে বিষন্ন হয়ে বসলেন। মনে হল সীতাদেবী তাহার কর্ণে এসে বলছেন- “প্রভু! এ আপনি কি করছেন ? আমার জন্য আপনি এই ধরিত্রী নাশ করতে চলেছিলেন ? আমি আপনাকে ছেড়ে কোথায় গিয়েছি ? আপনার চরণেই ত আমি আছি। আপনার অন্তরেই ত আমি আছি। আপনি আর আমি কি আলাদা? এখন কঠোর হয়ে মনকে শান্ত করে সকলকে সান্ত্বনা দিন। আপনার পুত্রদের দেখুন।” ভূমিতে পড়ে রোদন করতে করতে শ্রীরামচন্দ্রের কিরীট, কন্ঠের স্বর্ণ মালা , অঙ্গের উত্তরীয় সকল কিছুই ধূলাময় হয়েছিলো। শ্রীরামচন্দ্রের মনে হতে লাগলো এই রাজধর্ম কত কঠিন। সকল লোকে রাজা হতে চায় কেবল ভোগ সুখে জীবন যাপনের জন্য। কিন্তু রাজধর্ম যে কত কঠিন, কত জলন্ত অঙ্গার বিছানো- তাহা কেবল একজন আদর্শ রাজাই বুঝতে পারে। সেই সিংহাসনের তলায় শেষে সীতার বলিদান হয়ে গেলো। শ্রীরামচন্দ্র উঠে মাতৃহারা লব ও কুশকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন । ক্রোড়ে তুলে পুত্রদের সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। মাণ্ডবী, ঊর্মিলা, শ্রুতকীর্তি আদি সকলে লব ও কুশকে ক্রোড়ে নিয়ে আদর করতে লাগলেন। মহর্ষি বাল্মিকী বললেন- “হে শ্রীরাম! আমি আমার সাধ্যানুযায়ী সকল প্রকার শাস্ত্র, অস্ত্র- শস্ত্র, বেদাদি জ্ঞান, সঙ্গীত শিক্ষা লব ও কুশকে প্রদান করেছি। এখন আপনি ইহাদিগকে মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে প্রেরণ করে বাকী সকল শিক্ষা প্রদান করিবেন। রামায়ণে দেবী সীতার অন্তিম যাত্রা এভাবেই উপস্থাপিত হতো- ইহা আমি জানিতাম। কিন্তু বিধিলিপি পরিবর্তনের শক্তি কাহারোও নেই।” এই বলে মহর্ষি বাল্মিকী বিদায় নিলেন। শ্রীরামচন্দ্র লব ও কুশকে রাজবেশ, রেশমি বস্ত্র, স্বর্ণ আভূষণ দ্বারা সাজিয়ে দিলেন । দুই রাজপুত্রকে দেখে সকলে আনন্দিত হল। অপরদিকে বৈকুণ্ঠে মাতা লক্ষ্মী দেবী পদার্পণ করলেন । তিঁনি ঐশ্বর্যের দেবী। দারিদ্র, অভাব দূর করেন তিঁনি । অপূর্ব শোভাময়ী তিঁনি। চঞ্চলা হয়ে থাকেন কিন্তু ভক্তের গৃহে স্থির হয়ে থেকে ধন সম্পদ বৃদ্ধি করেন ।

পদ্মালয়া, পদ্মহস্তা, পদ্মসুন্দরী দেবী সহস্র পদ্মে চরণ রেখে বৈকুণ্ঠে প্রবেশ করলেন। নানা আভূষণ ও দিব্য অলঙ্কারে তিঁনি ভূষিতা। কোটি তারকামালা যেনো অলঙ্কার হয়ে তাঁহার সর্বাঙ্গে শোভা পাচ্ছে। সহস্র কোটি শচী দেবীর সৌন্দর্য সেই লক্ষ্মী দেবীর রূপের কাছে পরাজিত হয় । অনুপমা দেবী পদ্ম ধারণ করে আছেন । বৈকুণ্ঠের অনুচরেরা নানা বিবিধ বাদ্য বাজিয়ে দেবী লক্ষ্মীকে স্বাগত জানালো। বৈকুণ্ঠপুরীর নিদারুন সৌন্দর্য লক্ষ্মী দেবীর আগমন ঠিক তেমন মনে হল, যেমন নক্ষত্রমালায় বিধু অবস্থান করে সেই সৌন্দর্য আরোও সুন্দর করে তোলেন। দেবীর সখীরা নানা সুগন্ধি দ্বারা দেবী লক্ষ্মীর অভিষেক করালেন। হিমালয়চূড়া সদৃশ চারিটি শ্বেত গজ স্বর্ণ কলসে দেবীর অভিষেক করলেন। সখীরা চামড়, পাখা, পুস্প প্রদান করতে লাগলেন। সেখানে দেবী লক্ষ্মী পদ্মাসনে বিরাজিতা হলেন। দেব দেবীরা স্তবাদি করতে লাগলেন । দেবী সরস্বতী, দেবী গৌরী সহ ভগবান শিব, প্রজাপতি ব্রহ্মা, শচী সহ মহেন্দ্র ও অনান্য দেবতারা সহধর্মিণী সহিত বিরাজিত ছিলেন । দেবী সরস্বতী বললেন- “দেবী হরিপ্রিয়া! আপনার এই সীতা রূপ ধন্য। বীরত্ব, ত্যাগ, মমতা, মাতৃত্বের একত্র সমন্বয় এই রূপে। জগত ধন্য হয়েছে আপনার আগমনে। আপনার সীতা অবতার জগতে সকল নারীদের কাছে আদর্শ উদাহরণ প্রস্তুত করেছে। ” দেবী গৌরী বললেন- “দেবী কমলা! আপনিই নারীর শ্রেষ্ঠত্ব জগতে স্থাপিত করেছেন আপনার নিজ জীবন দিয়ে। জগতের সকল নারী আপনাকেই অনুসরণ করে সতী রূপে দেবতাদের নমস্য হবেন। কারণ সতী নারীকে দেবতারাও শ্রদ্ধা করেন। আপনি প্রমান করেছেন নারীর আত্মত্যাগে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব। আপনিই শ্রীরামের সহায়িকা শক্তি হয়ে জগতে সকল পুরুষদের জীবনে স্ত্রীর ভূমিকা স্থাপন করেছেন। নারীজাতি সর্বদা আপনার এই সীতা রূপের কথা স্মরণে রাখবে। এই জগত যতদিন থাকবে ততদিন আপনার মাহাত্ম্য ঘোষিত হবে।” বৈকুণ্ঠের দ্বারপাল জয় বিজয় এসে বললেন- “মাতঃ! সনকাদি মুনির শাপে আমরা রাক্ষস হয়ে আপনার প্রতি কুনজর প্রদান করেছিলাম। আপনার অশেষ কৃপা আপনি আমাদের উদ্ধারের জন্য ভগবানের শক্তিরূপে অবতীর্ণা হয়েছিলেন।”

মাতা লক্ষ্মী দেবী বললেন- “নারী সৃষ্টির আধার। নারীই হলেন পুরুষের শক্তি। নারীই হলেন কল্যাণময়ী। জগতে এই সত্য যুগে যুগে নারীদের দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হবে । নারী ত্যাগেই পুরুষের বিজয়, শ্রেষ্ঠত্ব- ইহাই চরম সত্য। এই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই আমার মর্তে গমন। যুগে যুগে এভাবে নারীধর্ম প্রতিষ্ঠা, নারীর ভূমিকা প্রতিষ্ঠার জন্য আমি প্রভুর সহায়িকা শক্তি রূপে আগমন করবো।” এইভাবে বৈকুণ্ঠে মাতা লক্ষ্মীকে স্বাগত জানালো হল। ব্রহ্মা বললেন- “ত্রেতা যুগের বিদায়বেলা প্রায় উপস্থিত। এখন প্রভু শ্রীরামের মর্তলীলা সমাপনের পথে। খুব সত্বর তিঁনিও বৈকুণ্ঠে বিষ্ণু রূপে ফিরে আসবেন ।” শ্রীরামচন্দ্র খুব মন দিয়ে রাজ্য শাসন করলেন। রাম রাজত্বে ন্যায় বিচার হতো। কালের গর্ভে এক এক করে কৌশল্যা, কৈকয়ী, সুমিত্রা দেবী স্বর্গারোহণ করলেন । বৃদ্ধ মন্ত্রী সকলে পরলোক গমন করলেন । অয্যোধ্যার আট রাজকুমার এখন প্রায় কিশোর থেকে যুবক হওয়ার পথে । একদিনের কথা। কেকয় রাজা যুধাজিত মহর্ষি গার্গ্যমুনির সাথে দশ হাজার অশ্ব, কম্বল, চিত্র বস্ত্র , রত্ন ও নানাপ্রকার উপঢৌকণ নিয়ে অযোধ্যায় আসলেন। মহারাজ শ্রীরাম গার্গ্যমুনির চরণ পূজা করে বসতে আসন দিলেন । রাজা যুধাজিতকে যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন করলেন । রাজা যুধাজিত বললেন- “হে শ্রীরাম। সিন্ধু নদের দুপাশে যে রমণীয় উদ্যান সহিত দেশ আছে। তাহা গন্ধর্বেরা দখল করে রেখেছে। সেখানে গন্ধর্ব রাজ লোমশের অনুগত তিন কোটি শক্তিশালী গন্ধর্ব সেই দেশ প্রহরা দেয়। আপনি সেই দুই রাজ্যকে আপনার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করুন। গন্ধর্বেরা সেই সুন্দর অঞ্চলের বাসিন্দাদের ওপর নির্যাতন নিপীড়ন চালাচ্ছে।” মহারাজ শ্রীরাম বললেন- “সেই গন্ধর্ব দের অত্যাচার থেকে অবশ্যই আমি মুক্ত করবো সেই নিরীহ প্রজাদের।”এরপর ভগবান শ্রীরাম ভরতকে বললেন- “ভ্রাতা ভরত। এবার তোমার যুদ্ধবিক্রম দেখানোর পালা। অবিলম্বে তুমি যুদ্ধযাত্রা করে লোমশের অনুগত তিন কোটি গন্ধর্ব কে বধ করবে। তোমার সাথে যুদ্ধে তোমার দুই পুত্র তক্ষ ও পুষ্কর যাবে। তুমি সেই রাজ্য জয় করে সেই রাজ্যকে দুভাগ করে তোমার দুই পুত্রকে দেবে। তাহারাই সেই দেশের রাজা হবে।”

( ক্রমশঃ )
0 comments

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪২)



মাতা সীতার মুখ হতে এই রকম বাক্য শুনে সকলে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। শাস্ত্রজ্ঞ মুনি ঋষিদের মুখেও কোন উত্তর ছিলো না । মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র মাথা নীচু করে রইলেন । কারোর মুখে উত্তর নেই। সীতা দেবী চোখের জল মুছে বললেন- “আমি অনেক কটু কথা বলবার জন্য ক্ষমা চাইছি। আমি অযোধ্যা নরেশ মর্যাদা পুরুষোত্তমের স্ত্রী। কিন্তু তাহার পূর্বে আমি একজন নারী। একজন নারী রূপে এই সত্য জানানো উচিৎ ছিলো। নচেৎ আমার নারীধর্ম আমাকে ধিক্কার জানাতো। বারবার নারীর সতীত্বের পরীক্ষা গ্রহণ করা নারীধর্মের চূড়ান্ত অপমান। কিন্তু একজন যোগ্য স্ত্রী রূপে আমি এই পরীক্ষা দেবো। কারণ স্ত্রীর সতীত্বে স্বামীর যশ , খ্যাতি বৃদ্ধি পায়, আজ অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে আমি তাহা প্রমান করবো।” এই বলে দেবী সীতা করজোড়ে সকলের সামনে বললেন- “যদি আমি সতী নারী হয়ে থাকি, তবে এখুনি দেবী বসুন্ধরা তাহার গর্ভে আমাকে স্থান দিন। আমি শ্রীরাম ভিন্ন অপর কাহাকেও কখন মনে স্থান দেই নাই, এই সত্যবলে ভগবতী বসুন্ধরা আমাকে তাঁহার গর্ভে স্থান দান করুন। আমি কায়মনোবাক্যে সতত কেবল শ্রীরামের অর্চনা করিয়াছি , সেই সত্যবলে ভগবতী বসুন্ধরা আমাকে তাঁহার গর্ভে স্থান দান করুন । আমি শপথ করে বলছি , শ্রীরামচন্দ্র ভিন্ন আমি অন্য কাহাকেও জানি না, এই সত্যবলে ভগবতী বসুন্ধরা তাঁহার গর্ভে আমাকে স্থান দান দিন।” এইভাবে বারংবার সীতাদেবী শ্রীরামচন্দ্রের নামে শপথ দিতে লাগলেন। সহসা ভূমিকম্প আরম্ভ হল। দেখতে দেখতে চতুর্দিক দুলে উঠলো। সশব্দে সেই স্থানে ভূমি দুই ভাগ হয়ে গেলো। তাহার মধ্য থেকে একটি দিব্য সিংহাসন উপস্থিত হল। মণি , রত্ন দ্বারা খচিত ছিলো সেই দিব্য সিংহাসন । উৎকৃষ্ট রত্ন আভূষণে সজ্জিত নাগেরা দিব্য দেহে ঐ সিংহাসন ধারণ করিয়া উঠলেন। তাহার মধ্যে অধিষ্ঠিতা ছিলেন ধরিত্রী দেবী মাতা বসুধা । সীতাদেবীকে ক্রোড়ে তুলে নিলেন দেবী ধরিত্রী । সাদরে স্বাগত জানিয়ে সীতাদেবীকে অভিনন্দন জানালেন । করজোড়ে সীতা দেবী বসুন্ধরা মাতার ক্রোড়ে বসলেন ।

সীতাদেবী কে বসুধার ক্রোড়ে যেতে দেখে সকলে হায় হায় করে উঠলো। লব ও কুশ মাতার পেছন পেছন ধাইলো। কিন্তু সীতাদেবী বাধা দিলেন । উপস্থিত মুনি ঋষিরা অবধি মাতা সীতার সতীত্বের প্রশংসা করে ‘সাধু’, ‘সাধু’ করলেন । মহর্ষি বাল্মিকী পূর্বেই জানতেন এমন হবে । শ্রীরাম ছুটে এলেন । সন্দেহবাদী সেই সকল প্রজারা তখন ভূমিতে প্রণাম করে বললেন- “মা। আমরা ঘোরতর পাপী। আপনার ন্যায় সতী নারীর নামে কলঙ্ক দিয়েছি। আমাদের বিনাশ কেহ রোধ করতে পারবে না।” সীতামাতা বললেন- “না পুত্র! এমন হবে না। নারী ক্ষমা ও ধৈর্যের জীবন্ত মূর্তি। সে নাশ করে না বরং সৃষ্টি করে। যদি এমন না হতো তবে বহু আগেই কোন এক হতভাগ্যা নারীর শাপে এই সমাজ ভস্ম হত। নারীর ক্ষমা, ধৈর্য, নিঃস্বার্থ সেবা, স্বামীভক্তিই তাহার সতীত্বের লক্ষণ। সেই নারীকে দেবতারা শ্রদ্ধা করেন। ইহার পরে তাঁহার অগ্নিপরীক্ষা চাওয়া চূড়ান্ত অপরাধ। তোমাদের সকলের মঙ্গল হোক। আমি বিদায় গ্রহণ করছি।” এই বলে সীতাদেবী সকলকে প্রণাম করে লব ও কুশকে বললেন- “পিতার সেবা করাই পুত্রের ধর্ম। পিতার আজ্ঞা পালন পুত্রের অগ্র কর্তব্য। তোমার পিতাও তাই করেছেন। এখন তোমরা তোমাদের পিতার নিকট থাকো।” এই বলে সীতাদেবী ভগবান শ্রীরামকে প্রণাম করে বললেন- “প্রভু! যুগে যুগে যেনো তোমারই চরণদাসী হয়ে জন্মাতে পারি। ইহা ভিন্ন আমার কিছু কামনা নাই। লব ও কুশ আপনারই পুত্র। তাহাদের রাজধর্ম ও ক্ষত্রিয়ধর্মের শিক্ষা দিয়ে যোগ্য করে তুলুন।” সকলে শুনে রোদন করতে লাগলো। হনুমান রোদন করতে লাগলো। লব কুশ, তিন ভ্রাতা, সীতার তিন ভগিনী, সীতার পিতামাতা, তিন শাশুড়ী, অয্যোধ্যার প্রজারা, মুনি ঋষি , বিভীষণ সহ রাক্ষসেরা, সুগ্রীব, অঙ্গদ, জাম্বুবান, নল, নীল আদি সকল বানরেরা রোদন করতে লাগলেন। সকলেই সীতাদেবীকে যেতে মানা করলেন। ভগবান শ্রীরাম বললেন- “হে জানকী। তুমি ভিন্ন আমার অস্তিত্ব কি? দয়া করে তুমি আমাকে একলা রেখে যেয়ো না।” সীতামাতা বললেন- “প্রভু! আপনি আবার দুর্বল হচ্ছেন। মন কঠোর করে আমাকে বিদায় দিন। আমার ইহজন্মে এতটুকুই অধ্যায় ছিলো- যাহা পূর্ণ হয়েছে । এবার আমার ফিরে যাবার সময় এসেছে। আপনি রাজা। রাজাকে সর্বদা দুর্বলতা, আবেগ পরিত্যাগ করে চলতে হয়। তাতেই রাজ্য সুরক্ষিত থাকে। আপনি আপনার পুত্রদের দেখবেন।”

এই বলে মাতা সীতাদেবী বললেন- “সকলের মঙ্গল হোক।” এই বলা মাত্র ধরিত্রী দেবী সীতা সহিত পাতালে চলে গেলেন। দুভাগ হয়েছিলো যে ভূমি, তাহা আবার একত্র হল। শ্রীরাম সেই স্থানে এসে রোদন করতে করতে বলতে লাগলেন- “আমার স্মমুখেই আমার সীতা আমার থেকে চলে গেলেন।এই বিহন অসহনীয়। পূর্বে যখন সীতাকে রাবণ হরণ করেছিলো, তখনও এত শোক হয় নি। হা সীতা! তোমা বিনা আমার অস্তিত্ব কি? হে বসুমতী। আমি করজোড়ে অনুরোধ করছি আমার সীতাকে ফিরিয়ে দাও।” লব ও কুশ মাটিতে পড়ে রোদন করে বলতে লাগলো- “মা জন্ম হতে পিতাকে দেখি নাই। তুমি আমাদের মাতা আবার তুমি পিতা। কত কষ্টে আমাদের লালিত পালিত করেছো মা । আজ আমাদের ছেড়ে কেন চলে গেলে? তোমা বিনা আমরা কিরূপে বাঁচি?” জনক রাজা , সুনয়না দেবী রোদন করতে লাগলেন। মনে পড়লো সীতাদেবীকে ভূমি কর্ষণ উৎসবে প্রাপ্তি করেছিলেন। মাতা বসুমতী আবার তাঁর সন্তান কে ফিরিয়ে নিলেন । শ্রীরাম পুত্রদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- “হে বসুন্ধরা। সকল জীবকে তুমি আশ্রয় দাও, ঠিক যেমন মাতা তাঁর সন্তানকে আশ্রয় প্রদান করেন। তুমি সর্বংসহা। এত পাপী তোমার বুকে অবস্থান করা সর্তেও তুমি খণ্ড খণ্ড হও নি। হে বসুমতী! তুমি করুণার মূর্তি। কৃপা করে আমাদের দুঃখ দেখে সীতাকে ফিরিয়ে দাও। সীতা বিনা সকল কিছু অন্ধকার।” বসুমতী সাড়া দিলো না দেখে শ্রীরাম কঠোর হয়ে বললেন- “যদি তুমি আমাকে সীতা ফিরিয়ে না দাও, তাহলে ব্রহ্মাস্ত্রে মেদিনী ধ্বংস করে দেবো।” এই বলে কঠোর হয়ে শ্রীরাম, লক্ষ্মণকে আদেশ দিলেন- “ভ্রাতা সত্বর আমার ধনুর্বাণ নিয়ে আসো। আমি আজ ধরণী ধ্বংস করে সীতাকে ফিরিয়ে আনবো।” তখন প্রজাপতি ব্রহ্মা দৈববাণী করে বললেন- “হে শ্রীরাম! আপনি কি আপনার অবতারের প্রসঙ্গ ভুলে গেছেন? বরাহ অবতারে আপনি ধরিত্রী উদ্ধার করেছিলেন, আবার সেই ধরিত্রীকে ধ্বংস করতে চান ? সীতাদেবী সাক্ষাৎ দেবী লক্ষ্মী। তিনি পাতালে গিয়ে সীতারূপ ত্যাগ করে দেবী লক্ষ্মীরূপে নাগলোকের পথ ধরে বৈকুণ্ঠে গমন করেছেন। সেখানে তিঁনি আপনার জন্য প্রতীক্ষা করছেন।”

( ক্রমশঃ )
0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger