সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

মীরা বাঈ কে! তাকে নিয়েই বা এত আরাধনা কেন! জল্পনা-কল্পনাই বা কেন?

মীরা  বাঈের বাড়ি রাজস্থান। মীরা  বাঈের বাবা যোধপুরের প্রতিষ্ঠাতা সম্মানিত এবং প্রতাপশালী রতন সিং। গ্রামে একদিন এক সন্ন্যাসী ঘন সবুজ অরণ্যের ভেতর থেকে আর্বিভূত হলেন। রতন সিং এর কার্যকলাপে খুশী হয়ে তিনি তাকে একটি কৃষ্ণের মূর্তি উপহার দিলেন। ছোট খাট এই মূর্তিটি গাড় নীল- মাথার চারিদিকে সোনালী আরও বিভিন্ন রঙ এর ছটা। রঙ এবং ছোটখাট গঠনের জন্য মূর্তিটি খুব গভীর লাগে। মীরার বয়স তখন মাত্র তিন বছর। কৃষ্ণের এই মূর্তি নিজের অধিকারে পাবার জন্য মীরা  বাঈ অনুরোধের পাশাপাশী কান্না-কাটি জুড়ে দিল।

ছোট্ট মীরার কাছে কৃষ্ণের অবহেলা হতে পারে ভেবে তার বাবা কিছুতেই তাকে তা দিতে রাজি হলেন না। কিন্তু মীরার যে তা লাগবেই- সে যেন নাছোড়াবান্দা! একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তার বাবা সেটি তাকে দিয়ে দিলেন। এরপর থেকেই কৃষ্ণ হয়ে উঠলো মীরার পরম বন্ধু। সে সারাদিন কৃষ্ণের সাথে কথা বলে, সময় কাটায়। কৃষ্ণ সম্পর্কে যেকোনো গল্পের প্রতি মীরার তীব্র কামনা। ধীরে ধীরে কৃষ্ণ হয়ে উঠল মীরার প্রেমিক। মীরা কৃষ্ণকে হরি বলে ডাকতো- তাকে ভেবে এমন গান লিখতো যেগুলো ‘ভজন’ নামে পরিচিত।

শ্রীকৃষ্ণ দুজন নারীকে ভয়ানক রকম পাগলিনী করেছিলেন। এর মধ্যে একজন বাংলার রাধা, আরেকজন এই রাজস্থানের মীরা বাঈ। রাধা অবশ্য কবি জয়দেবের কল্পনায় সৃষ্টি। কাল্পনিক চরিত্র। কিন্তু মীরা বাঈ খুবই ঐতিহাসিকভাবে সত্য একজন নারী যে কৃষ্ণপ্রেমে উজাড় হয়ে ছিলেন সারাটা জীবন।
আজ থেকে কম করে হলেও ৫০০ বছর আগের এই ঘটনা বহুদিন পর্যন্ত মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থেকেছে। মীরা প্রায় চার হাজার ভজন রচনা করেছিলেন। ভারতের পথে পথে এমনকি বাংলাদেশের রাস্তায়ও এগুলো এখনো শোনা যায়। তাছাড়া ইউটিউবে অনেক মীরার ভজন পাবেন। কি চমৎকার সুরেলা আর লিরিকের প্রচণ্ড আবেদন।

একদিন মীরা আর তার মা সময় কাটাচ্ছিল। মায়ের সাথে পুতুলের বিয়ে-পুতুলের বিয়ে খেলতে মীরার বিষয়টা খুব চমৎকার লাগল। ও আগ্রহ নিয়ে মাকে বলল, “মা, আমার স্বামী কে হবে?” মা খুব একটা অবাক হলেন না। তখন ৯-১০ বছরেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। তখন অল্প বয়সে বিয়ে ভাবনা এখনকার মতো এরকম লজ্জাকর নয়। মা বললেন, “তোমার তো স্বামী আছেই, কৃষ্ণ তোমার স্বামী।”
এরপর থেকেই কৃষ্ণের প্রতি মীরার ভাব বদলাতে লাগল। একথাটাই হয়তো মীরাকে সাবালিকা করেছিল। কিছুদিন পরে মাত্র আট বছর বয়সে মীরার একবার বিয়ে হয়ে গেল মেওয়ারের রাজার সঙ্গে। সে বিবাহের কারণটি ছিল রাজনৈতিক। শেষ পর্যন্ত, সে বিয়ে টেকেনি। মীরা সাবালিকা হতে থাকল।

খুব অল্প বয়সে ভারত বর্ষের হিন্দু মেয়েরা রাধা-কৃষ্ণের কাহিনি জেনে যায়। বিশেষ করে মথুরা-বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণের উপাখ্যানটি। আর দশ জনের মতো মীরাও জেনেছিল। কিন্তু মীরার কৃষ্ণের প্রতি যে প্রেম, যে কামনা- তা সে অস্বীকার করতে পারত না। তার মনের মধ্যে ছটফট, সারা দিন শুধু কৃষ্ণের ভাবনা। সে ভজনে ভজনে সুরের তালে জানতে চাইল-

ওরে নীল যমুনার জল
বললে মোরে বল
কোথায় ঘনশ্যাম।

কৃষ্ণের গায়ের রং-কে মীরা ঘনশ্যাম বলেছে। হরি ছাড়াও কৃষ্ণের আরেক নাম শ্যাম। গানে আছে,

শামরে তোমার সনে/শামরে তোমার সনে
একেলা পাইয়াছি রে আজ (২)
এই নিঠুর বনে
আজ পাশা খেলব রে শ্যাম

মীরার মা মারা গেলে মীরা পড়ে গেল জীবনের গভীর জলে। তার বাবা তাকে রাজা ভোজরাজের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল। অবশ্য শ্বশুরবাড়ি গিয়েও মীরা কৃষ্ণচর্চা চালিয়ে যেতে লাগল। এই নিয়ে পারিবারিক ঝামেলাও হলো। রাজা ভোজরাজের মা কিছুতেই মীরার এই অতি ‘কৃষ্ণপ্রীতি’ পছন্দ করতে পারছিলেন না, তিনি ভোজরাজের উপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করছিলেন এই ব্যাপারে। ভোজরাজ প্রথমে অনুরোধ করলেন, কৃষ্ণ ছেড়ে কালীর দিকে মনোযোগ দিতে। মীরার উত্তর,  “আমি তো পারিনা”। ভোজরাজ পরে কঠোর হলেন, অন্যায় করলেন। মীরার একই উত্তর, “আমি যে পারি না”।

মীরার মন-প্রান জুড়ে কৃষ্ণ। কৃষ্ণ বন্দনা। এই গাইছে- এই নাচছে। সারাদিন কৃষ্ণকে ভেবে ভেবে হয় না তার কোন কাজ। বিশেষ করে সন্ধ্যা নামলেই যখন সবকিছু চুপচাপ হয়ে যায়। নীরব পরিবেশে মনের উপর নিয়ন্ত্রন করা যায় বেশী, তখন গভীর ধ্যানে কৃষ্ণ ভজন না গাইলে যেন শান্তি আসে না মীরার মনে-প্রাণে। মীরা কৃষ্ণকে পুরো মন দিয়ে, সারা দেহ দিয়ে পেতে চাইত। এই ইরোটিক দিকটি মীরার ভজনে (ভক্তিগীতি) এক বিশেষভাবে উঠে আসে। একটা ভজনে মীরা, শ্রোতাকে নিজের পরিচয় দিয়ে বলে,

“আনন্দের সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে মীরা ওকে অভ্যন্তরে নেয়!”

 প্রচণ্ড সত্যবাদী ছিলেন মীরা বাঈ। ইতিহাসে এরকম বেশী একটা দেখা যায় না। শ্রী কৃষ্ণের প্রতি মীরার টানটা মানসিক। কারণ সে শ্রী কৃষ্ণকে ভালোবেসেছিল। ভারতবর্ষের চিরায়ত ভক্তি দিয়েই মীরা শ্রীকৃষ্ণকে ভালোবেসেছিল। গানে গানে মীরার মন ভরত।

কথাগুলো শুনতে মজার মনে হলেও মীরার জন্য এসব করা অতটা সহজ ছিল না। শাশুড়ি মীরার নাচ এবং ভজনে বাধা দিতেন। কয়েকদিন বাকযুদ্ধ চলল। পরে শুরু হল ধারাবাহিক নির্যাতন। ক্রমাগত নির্যাতন।

এদিকে পথে পথে ছড়িয়ে গেছে মীরার গান। মুখে মুখে পৌছে গেছে সে সুর। মীরার জনপ্রিয়তা বাড়ল এবং অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্বও বাড়ল। ওদিকে নানারকম কুৎসা রটনা হল তার নামে। চরিত্রকে নষ্টা মেয়ে হিসাবে উপস্থাপন করা হলো। তাতে অবশ্য মীরার কিছু গেলো-আসলো না। মীরাকে দমাবে সাধ্য কার! মীরা ঘোষনা দিল ‘মীরা মীরাকে কৃষ্ণের মধ্যে বিলীন করে দিয়েছে’। বাইজেন্টাইন সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রার মতো মীরাকেও সাপ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে মারার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু মীরাকে ‘শেষ করে দেয়া’ সম্ভব হলো না।

উত্তর ভারত ছাড়িয়ে মধ্য ভারতে পৌছে গেল মীরার ভজন। তার খ্যাতি মোগল সম্রাট আকবর পর্যন্ত পৌছে গেল এবং ফলাফলে আকবরও তার কাছে পৌছালেন; এরকম ‘সংশয়ী ইতিহাস’ পাওয়া যায়। নানান শত্রুতার ঝুট ঝামেলা পেরিয়ে আকবর মীরার এলাকায় আসলেন। রাজপোশাক ছেড়ে ভিক্ষুক বেশে তানসেনকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলেন মীরা বাইয়ের বাড়ির দিকে।

আকবর উপহার দিলেন মীরাকে। আকবরের আসা নিয়ে, উপহার দেয়া নিয়ে, স্বামীর সাথে কাটাকাটি হল মীরার। জাত-পাতের ব্যাপার ছিল তখনকার ধর্মে। মীরার স্বামী মীরাকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মারা যেতে বললেন। প্রথমে মীরা রাজী হল, নদীর দিকে গেল। মীরার যা স্বভাব- একটু পরে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে সাথে কিছু ভক্ত নিয়ে সোজা বিন্দাবনের দিকে হাঁটা ধরল।

তারপরে সেখানের মন্দিরে থেকেই কৃষ্ণ ভক্তি করতে থাকল সে। ওর সর্বাধিক গান এখানে বসেই লেখা। মন্দিরে নিশ্চয়ই মীরা সঠিক সুযোগ পেয়েছিল- পেয়েছিল যথেষ্ট স্বাধীনতা। মন ভরে কৃষ্ণনাম জব করতে পেরেছে সে। কৃষ্ণের মূর্তির কাছে বিলিয়ে দিতে পেরেছে নিজেকে। কৃষ্ণ যাতে মীরার প্রতিটা নিশ্বাস শুনতে পাক- সেই চেষ্টা করেছে।

গাইতে গাইতে, অধীর, এক চাঁদ জাগা রাতে,
নাচতে নাচতে, মীরা, সকাল করে পৃথিবিতে।

মীরা লিখেছে- ‘আমি সহমরণে যাব না। আমি গান গাইব কৃষ্ণের। আমি সহমরণে যাব না। কেননা আমার হৃদয়ে যে শুধুই হরি নাম অঙ্কিত।’

শেষের বছরগুলোতে সন্ন্যাসীনি হয়ে গুজরাটের দ্বারকায় মীরাকে দেখা গিয়েছিল। ১৫৪৭ সাল থেকে মীরা আর নেই। নানা কাহিনি প্রচলিত মীরাকে নিয়ে। অনেকে বলেন মীরা প্রায় ৫ হাজার গান লিখেছে। যদিও পাওয়া যায় ৪০০-৫০০। মীরাকে নিয়ে শুধু গান নয়, হয়েছে সিনেমা-নাটক-সিরিয়াল। লেখা হয়েছে উপন্যাস-কবিতা। আঁকা হয়েছে মীরা আর কৃষ্ণের হাজার হাজার ছবি। ভারতের অসাধারন কবি গুলজার নিজেই মীরা-কে নিয়ে একটা চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মান করেছেন। সেখানে মীরা চরিত্রে অভিনয় করেছে হেমা মালিনী। অসাধারন এই মুভিতে ফুটে উঠেছে মীরার একটা দিক।

By Jubaead Dweep
0 comments

সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তরঃ ঈশ্বরবাদ ( প্রশ্নঃ-০১ - ০৩ )

প্রশ্নঃ- ০১। ইশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে মানুষের বহুরূপ কল্পনা কেন ?

উত্তরঃ-

                   মানুষের মন চঞ্চল । তীব্রগতির এ মনকে সংযত করা, স্থির করার ব্যবস্থাই এ রূপকল্পনা । আমাদের চোখের পর্দায় (রেটিনায়) যে ছবি পড়ে তা থেকেই চোখ দেখে এবং তা মন পর্যন্ত পৌছায় । মন সে ছবিকে ধরে রাখতে পারে । ইচ্ছেমত পরবর্তীতে যে কোন সময় সে ছবির বণর্নাও করতে পারে । অর্থাৎ ছবিটি মনের পর্দায় থেকে যায় । এতেই মন ঐ ছবিটির মাধ্যমে স্থির হতে পারে। রূপকল্পনা মনকে স্থির করারই একটি উপায় মাত্র ।

মূর্তির রূপকল্পনা মিথ্যে কিন্তু সে মন স্থির করতে সাহায্য করে এবং পরিশেষে 'ঈশ্বর সত্য' এটা উপলব্ধি করতে শেখায় ও সেখানে পৌছাতে পারে। তাই প্রতিমা পূজা সনাতন ধর্মের একটি বৈশিষ্ট্য বটে। মানুষের মন বিচিত্রধর্মী একই জিনিস বা রূপ নিয়ে সে পরিতৃপ্ত হতে পারে না । তাই সে বিভিন্ন রূপের মধ্যে নিজের মনের কাঙ্ক্ষিত রূপ খুজে বের করে নেয়। এ জন্যই ঈশ্বরের বহুরূপ কল্পনা ।
এছাড়া ঈশ্বরও বহুরূপে, বিচিত্র সৌন্দর্যে বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন ।

তথ্যসুত্রঃ দেবদবীর পরিচয় ও বাহন রহস্য

প্রশ্নঃ- ০২। হিন্দুধর্মের বৈশিষ্ট্য ও ধর্মচর্চ্চার ভিন্নতা দৃষ্টে হিন্দুদেরকে বহু ঈশ্বরবাদী বলা যায় কি ?

উত্তরঃ

          হিন্দুধর্মে সাধনার বৈচিত্র্য বর্তমান । কেউ নিরাকারভাবে, কেউ বা সাকারভাবে ঈশ্বরের আরাধনা করতে পারেন । মাতৃভাবে, পিতৃভাবে, সখাভাবে, এমনকি পুত্রভাবেও ঈশ্বরের আরাধনা করা যেতে পারে । যিনি যেভাবেই আরাধনা করুন না কেন তিনি সেভাবেই ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করতে পারবেন । পাহাড় থেকে যেমন জলধারা বিভিন্ন পথে অগ্রসর হয়ে পরিশেষে সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হয় তেমনি মত ও পথ বিভিন্ন হলেও গন্তব্যস্থল ঈশ্বর ।

এ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতগীতায় শ্রীভগবান বলেছেন, '' আমাকে যে যে-ভাবে ভজনা করে আমি তাকে সেভাবেই অনুগ্রহ করি । হে পার্থ, মনুষ্যগণ বিভিন্ন পথে আমারই অনুসরণ করে ।''
হিন্দুধর্মে বহু দেব-দেবীর উপসনা প্রচলিত । বহুরূপে একই ঈশ্বরের আরাধনা করাই হিন্দুধর্মের বৈশিষ্ট্য । তাই বলে হিন্দুধর্ম বহু ঈশ্বরবাদী নয় ।

প্রশ্নঃ- ০৩। ঈশ্বর কি বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ? তাই যদি হয় তাহলে ব্রহ্মা ও বিশ্বকর্মা কি সৃষ্টি করেন ?

উত্তরঃ
             ঈশ্বর বা পরমব্রহ্ম স্বয়ং এ বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বরের দুটি ভাব আছে - স্বগুন ও নির্গুন । তিনি যখন নির্গুনভাবে অবস্থান করেন তখন তাঁর কাজটি পরিচালন করেন তাঁরই প্রতিনিধি স্বরূপ ব্রহ্মা। অর্থাৎ ব্রহ্মা পরমব্রহ্মেরই আজ্ঞাবহ মাত্র ।

'বিশ্বকর্মা' শব্দের অর্থ বিশ্বের নির্মাণকর্তা । ঋগ্বেদের বর্ণনা অনুসারে বিশ্বকর্মা সর্বদর্শী । এঁর চক্ষু, মুখমন্ডল, বাহু ও পদদ্বয় সর্বদিকে বিস্তৃত । বাহু ও পদদ্বয়ের সাহায্যে তিনি স্বর্গ ও মর্ত্য নির্মান করেন । পুরান মতে বিশ্বকর্মা ঈশ্বরের স্থাপত্য শিল্পের স্রষ্টা এবং আমাদের শিল্প নৈপুন্যের পথ-পদর্শক ।

তথ্যসুত্রঃ জ্ঞান মঞ্জুরী

[ কার্টেসী ব্যতীত কপি পোষ্ট নিষিদ্ধ ]
0 comments

প্রতি গ্রীষ্মেই জল থেকে বেরিয়ে আসে বাঁকুড়ার প্রাচীন এই লক্ষ্মী মন্দির

মুকুটমণিপুরে কংসাবতী জলাধারে বছরের অধিকাংশ সময় ডুবে থাকে শতাব্দী প্রাচীন লক্ষ্মী জনার্দনের মন্দির। মার্চের শেষে জলস্তর কিছুটা কমলে দেখা মেলে ইঁট-সুরকির তৈরি এই মন্দিরটি। তাই গরমের মধ্যেও শুধু এই মন্দিরের টানে এখানে ছুটে আসেন রাজ্য ও তার বাইরের পর্যটকরা।

১৯৫০ সালের মাঝামাঝি সময়ে কেন্দ্রীয় নদী কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ঠিক হয় খাতড়া ব্লকে নির্মাণ করা হবে জলাধারটি। কিন্তু পরে এই প্রকল্পের বাস্তুকার জওহরলাল দাসের নেতৃত্বে মুকুটমণিপুর সংলগ্ন চিটগিরি-অম্বিকানগরের মাঝে কাঁসাই ও কুমারী নদীর সঙ্গমস্থলে এই প্রকল্পের স্থান নির্বাচন হয়। ১৯৫৯ সালের ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কংসাবতী প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্পে ১৭৩টি মৌজার মধ্যে বাঁকুড়ার খাতড়ার ৩০টি, রানিবাঁধের ৩৩টি ও পুরুলিয়ার মানবাজার ব্লকের ১১০টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত হয়।

কুমারী অববাহিকায় থাকা সারেঙ্গগড়, চিয়াদা, কাটাকুমারী, ঘোলকুড়ি, পুড্ডি গ্রামের সঙ্গে বড্ডি গ্রামটিও জলের তলায় নিমজ্জিত হয়। এই বড্ডি গ্রামের সুবুদ্ধি পদবিধারী উৎকল ব্রাহ্মণদের কুলদেবতা লক্ষ্মী জনার্দন। এই প্রকল্পের ফলে বাস্তুচ্যুত হলে কুলদেবতা লক্ষ্মী জনার্দনকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমান হিড়বাঁধ ব্লকের দিঘি-ভগড়া আমবাগানে চলে যান সুবুদ্ধিরা। বর্তমানে সেখানে নতুন মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। আর কংসাবতী প্রকল্পের মধ্যে পড়ে থাকে বিগ্রহশূন্য লক্ষ্মী জনার্দনের মন্দিরটি।

সুবুদ্ধি পরিবারের বর্তমান সদস্য দয়াময় সুবুদ্ধি বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষ কৃষ্ণচন্দ্র পতি ছিলেন অম্বিকানগরের রাজার সভাপণ্ডিত। অম্বিকানগরের তৎকালীন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র পতির বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে তাঁকে সুবুদ্ধি উপাধি দেন। এবং একই সঙ্গে ঝরিয়া, পরেশনাথ ও পূর্ণাপানি এই তিনটি মৌজা নিষ্কর দান করেন। তখন কৃষ্ণচন্দ্র পতি (সুবুদ্ধি) ইন্দপুরের ফুলকুসমার আদি বাসস্থান ছেড়ে কুমারী নদী সংলগ্ন রানিবাঁধের বড্ডি গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। সেখানে লক্ষ্মী জনার্দনকে একটি মাটির বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করে পূজা শুরু করেন। পরে বাংলা এই বংশের হরগোপাল সুবুদ্ধি ইঁট-সুরকি দিয়ে নতুন মন্দির নির্মাণ করেন।

কিন্তু কংসাবতী প্রকল্পের মধ্যে এই এলাকাটি পড়ায় মন্দির ও বাসস্থান ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তাঁরা। মন্দির সংলগ্ন এলাকায় বাঁধ নির্মাণের জন্য খোঁড়াখুড়ি হলেও প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মী ও ইঞ্জিনিয়ারদের সৌজন্যে অক্ষত থেকে যায় মন্দিরটি। যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ, মন্দিরে ব্যবহৃত কড়ি-বরগা চুরি করে নিয়ে গেছে দুষ্কৃতীরা।

সারা বছর জলের নীচে থাকা লক্ষ্মী জনার্দনের মন্দির দেখতে এই গ্রীষ্মেও কলকাতার বেহালা থেকে ছুটে এসেছেন ইমন ভট্টাচার্য, দুর্গাপুরের তিথি মল্লিকরা। তাঁদের কথায়, এর আগেও এখানে এসেছেন তাঁরা। তখনই জলে ডুবে থাকা এই মন্দিরের কথা শোনেন। তাই এই প্রাচীন মন্দিরটি দেখতে চড়া গরমেও এখানে ছুটে আসা।

বিশিষ্ট গবেষক সৌমেন রক্ষিত বলেন, ইঁট-সুরকি নির্মিত প্রাচীন এই মন্দিরটির সংরক্ষণ জরুরি। মুকুটমণিপুরের পর্যটন মানচিত্রে এটিও একটি অন্যতম দ্রষ্টব্য হতে পারে। একই দাবি জানিয়েছেন, সুবুদ্ধি পরিবারের বর্তমান সদস্যরাও। দীপ সুবুদ্ধি ও হিমাংশু সুবুদ্ধি বলেন, মন্দিরের প্রাচীনতা ও মুকুটমণিপুরে আসা পর্যটকদের কথা ভেবে সরকারের উচিত লক্ষ্মী জনার্দনের ভগ্নপ্রায় মন্দিরটি দ্রুত সংস্কার করে সংরক্ষণ করা।

সংগৃহিত

0 comments

সন্ধিপূজা

দুর্গাপূজায় অষ্টমীর শেষ ও নবমী তিথির প্রথম দণ্ডে ৪৮ মিনিট কেই "সন্ধিপূজা" বলা হয়। এই সময় দেবী দুর্গার মধ্যে "চামুণ্ডা" দেবীর আবির্ভাব ঘটে । এই সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা করা হয়। সন্ধিপূজা যথাবিহিত সুসম্পন্ন হলে দুর্গাপূজা সার্থক হয়েছে বলা চলে। এই সময় দেবীর ধ্যান, দেবীর লীলা চিন্তন স্মরণ , বীজ মন্ত্র জপ করলে তা অতি উত্তম হয় ।

কে এই দেবী চামুণ্ডা! শুম্ভ নিশুম্ভ বধ করতে দেবী পার্বতীর থেকে তাঁরই মতোন দেখতে কৌশিকী দেবী প্রকট হন। এই কৌশিকী দেবীকে পরাজিত করবার মানসে শুম্ভ ও নিশুম্ভ চণ্ড ও মুণ্ড নামক মহাসুর দ্বয়কে প্রেরণ করে। চণ্ড মুণ্ডকে সেনা সহ আসতে দেখে দেবী কৌশিকী ভ্রুকুটি থেকে দেবী চামুণ্ডার আবির্ভাব হয়। তিনি বিচিত্র নর কঙ্কাল ধারিনী, নৃমুণ্ডমালিনী, ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা , অস্থি চর্ম সার দেহ দেবীর। অতি ভীষনা , বিশাল বদনা , লোলজিহ্বা , ভয়ঙ্করী , কোটর গতা , আরক্ত চক্ষু বিশিষ্টা এবং সিংহ নাদে দিক মণ্ডল পূর্ণ কারিনী । সেই ভয়ংকরা দেবী ভীষন হুঙ্কার দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন । সেই দেবী প্রচুর অসুর সেনাকে মূঠে মূঠে তুলে চিবিয়ে খেতে লাগলেন ।

 অসুরেরা যত অস্ত্র দেবীর পানে নিক্ষেপ করল , দেবীর শরীরে লাগতেই অস্ত্র গুলো ভেঙ্গে যেতে লাগল । দেবী হাজারে হাজারে অসুর সেনাদের ভক্ষণ করতে লাগলেন । রথ , অশ্ব , হাতী গুলোকে ধরে মুখে নিয়ে তা চিবিয়ে খেতে লাগলেন । রক্তে তার দন্ত গুলি লাল হয়ে গেল । কত গুলি অসুরকে দেবী তার চরণ ভারে পিষে বধ করলেন । কোন কোন অসুর দেবীর খড়গের আঘাতে মারা গেল । আবার কিছু অসুর দেবীর দাতে চর্বিত হয়ে মারা গেলো । যুদ্ধক্ষেত্রে এই ভাবে দেবী অসুর দের ধ্বংস করে ফেললেন ।

এ দেখে চণ্ড অসুর হাজার হাজার চক্রাস্ত্র নিক্ষেপ করে দেবীকে আচ্ছন্ন করে ফেললেন । বাণের প্রভাবে সূর্য ঢাকা পড়ল । দেবী তখন তার খড়গ তুলে ‘হং’ শব্দ করে চন্ডের দিকে ধেয়ে গেল । দেবী চন্ডের চুলের মুঠি ধরে এক কোপে চণ্ডের শিরোচ্ছেদ করে ফেললেন । চন্ড অসুর বধ হল ।
চন্ড নিহত হয়েছে দেখে ক্রোধে মুন্ড দেবীর দিকে ধেয়ে গেলো । দেবী তার রক্তাক্ত খড়গ দিয়ে আর এক কোপে মুন্ড এর শিরোচ্ছেদ করলেন । এভাবে মুণ্ড বধ হল । বাদবাকী জিবীত অসুর রা এ দেখে ভয়ে পালালো । দেবতারা আনন্দে দেবীর জয়ধ্বনি করলেন ।

দেবী চন্ড আর মুণ্ড এর ছিন্ন মস্তক নিয়ে দেবী মহামায়ার কাছে এসে বিকট অট্টহাসি হেসে বললেন – “ এই যুদ্ধরূপ যজ্ঞে আমি আপনাকে চন্ড ও মুন্ড নামে দুই মহাপশুর মস্তক উপহার দিলাম । এখন আপনি নিজেই শুম্ভ ও নিশুম্ভ কে বধ করবেন ।”

দেবী অম্বিকা মধুর স্মরে বললেন – “ হে দেবী , যেহেতু তুমি চন্ড ও মুণ্ডের বধ করে মাথা দুটি আমার নিকট নিয়ে এসেছো , সেজন্য আজ থেকে তুমি জগতে ‘চামুন্ডা’ নামে বিখ্যাত হবে ।”

চামুণ্ডার ধ্যান
= = = = =
কালী করালবদনা বিনিস্ক্রান্তসিপাশিনী ।।
বিচিত্র- খট্টাঙ্গধরা নরমালাবিভূষণা ।
দ্বীপিচর্ম- পরীধানা শুস্কমাংসাতিভৈরবা ।।
অতিবিস্তারবদনা জিহ্বাললনভীষণা ।
নিমগ্নারক্তনয়না নাদাপূরিতদিঙমুখা ।।
Like us: সনাতন সন্দেশ - Sanatan Swandesh
0 comments

রাজা বিক্রমাদিত্য পূজিত দেবী হরসিদ্ধি দেবী

৫১ শক্তিপীঠে দেবী দুর্গা ৫১ দেবী রূপে বিরাজিতা আছেন। ছবিতে দেখুন রাজা বিক্রমাদিত্য পূজিত দেবী হরসিদ্ধি দেবী। এই দেবীকেই কেও কেও উজানী মঙ্গলচণ্ডী শক্তিপীঠ বলে ধরেন। যদিও মতভেদ আছে। "উজ্জয়নী" রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী। আর তাঁর ইষ্টদেবী ছিলেন এই দেবী হরসিদ্ধি। পীঠনির্ণয়তন্ত্র বলে-"উজ্জয়িন্যাং কূপারশ্চ মাঙ্গল্য কপিলাম্বর । ভৈরবঃ সিদ্ধিদঃ সাক্ষাদ্দেবী মঙ্গলচণ্ডীকা ।।' এখানে দেবীর কূর্পর কুনুই পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম মঙ্গলচণ্ডীকা আর ভৈরব হলেন কপিলাম্বর ।
দেবী হরসিদ্ধির মন্দির দর্শন করে অপূর্ব শান্তি লাভ হয় । দেবীর নামের এক মাহাত্ম্য আছে। মহাকাল জ্যোতি লিঙ্গের মন্দিরের অদূরে ‘রুদ্রসাগর’ নামক এক জলাধার আছে। এই জলাধারের তীরে দেবী হরসিদ্ধির মন্দির । স্কন্দপুরানে আমরা এই তীর্থের বিবরণ পাই । সেই কাহানী হল- এক সময় হর আর মা গৌরী কৈলাসে বসে দ্যুত ক্রীড়া বা পাশা খেলছিলেন । সেই সময় চণ্ড ও প্রচণ্ড নামক দুই দৈত্য সেখানে এসে উপস্থিত হল। এই দুই দৈত্য মার্কণ্ড পুরানের অসুর রাজ শুম্ভ নিশুম্ভের সেনাপতি চণ্ড ও মুন্ড কিনা- সেই বিষয়ে পরিষ্কার ভাবে বলা নেই । তবে পুরান গুলিতে এক অসুরের নাম দুবার করে করেও পাওয়া যায় । এই চণ্ড ও প্রচণ্ড হয়তো অন্য অসুর । সেই অসুর দ্বয় এসে ভগবান শিব আর মা পার্বতীর খেলাতে উপদ্রব সৃষ্টি করতে লাগলো ।
ভগবান শিব এতে বিরক্ত হয়ে উঠলেন। অপরদিকে মা পার্বতী দেখলেন ভগবান শিব খেলায় অমনোযোগী । দুই অসুরের উৎপাতে যত গণ্ডগোলের সৃষ্টি। এতে মা পার্বতী ভয়ানক ক্ষিপ্ত হলেন। মা গৌরী পাশে থাকা একটি মুগুর তুলে চণ্ড ও প্রচণ্ডকে প্রহার করে বধ করলেন । ভগবান ত্রিপুরারি তখন হেসে বললেন- “হে দেবী। তুমি আজ আমার প্রীতির জন্য এই দুই দানবকে বিনাশ করে আমার মনোরঞ্জন করলে। আজ থেকে তোমার এক নাম হবে হরসিদ্ধি।” বলা হয় এই পীঠ দর্শন করলে মানবের অভীষ্ট ফললাভ হয় । ‘হরসিদ্ধি’ চার অক্ষর নাম জপ করলেই মানবের দারিদ্র ও শত্রু ভয় নষ্ট হয় ।
👉 নানা ধর্মীয় তথ্য ও দেবমাহাত্ম্যকথা জানতে লাইক করুন এই পেজটি https://www.facebook.com/shonatonsondesh/
0 comments

মা লক্ষ্মীর আবির্ভাব কি ভাবে হয়েছিলো ?

এই ঘটনা জানতে যেতে হবে পৌরাণিক যুগে। বহু পূর্বের কথা। এক সময় দুর্বাসা মুনি একটি পুস্পমাল্য দেবরাজ ইন্দ্রকে উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজা ইন্দ্রদেব তুচ্ছ জ্ঞান করে সেই পুস্পমাল্য দিলেন ঐরাবতকে । ঐরাবত সেই পুস্পমাল্যের কদর বুঝতে না পেরে পায়ে পিষ্ট করে ফেলল। ইন্দ্রদেবতা আর তার বাহনের এই রূপ আস্ফালন দম্ভ দেখে দুর্বাসা মুনি ক্রোধে ইন্দ্রকে শ্রীভ্রষ্ট হবার শাপ দিলেন। লক্ষ্মী দেবীকে হারিয়ে দেবতারা খুব দুঃখে কষ্টে পড়ে ত্রিদেবের আদেশে ক্ষীর সমুদ্র মন্থন করার পরামর্শ দিলেন। এই মন্থনের অন্য উদ্দেশ্য ছিলো অমৃত প্রাপ্তি। মন্দার পর্বতকে মন্থন দণ্ড বানিয়ে ভগবান নারায়ন কূর্ম অবতার নিয়ে পৃষ্ঠে নিলেন, বাসুকী নাগ হলেন রজ্জু।
ত্রিদেবের আদেশে দেবতা ও অসুরেরা মিলে মন্থন আরম্ভ করলেন । ক্ষীর সমুদ্র মন্থন আরম্ভ হতেই একে একে উঠে আসতে লাগলো বারুনী, সুন্দরী অপ্সরা সকল, ৩ রকমের অদ্ভুদ দিব্য ক্ষমতা সম্পন্ন প্রানী, কামধেনু সুরভি, ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্ব , মণি মুক্তা, কৌস্তভ মণি। কিন্তু মন্থন দণ্ড তে ঘুরতে ঘুরতে যখন বাসুকী নাগ বিষবমি আরম্ভ করলো তখন মন্থন স্তব্ধ হল। বিষের প্রভাবে দেবতাকূল এমনকি অসুরকূল যারা বাসুকী নাগের মস্তকের দিকে ছিলো তারা ত বটেই, সমস্ত দিকে বিষাক্ত আবহাওয়াতে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠলো। এরপর ভগবান শিব সেই “হলাহল” নামক বিষ পান করে হলেন “নীলকণ্ঠ”।
পারিজাত নামক বৃক্ষ উঠে এলো। শার্ঙ্গ ধনুক, চন্দ্র দেবতা উঠে এলেন । শঙ্খ, জ্যেষ্ঠা , বরুণ দেবের ছাতা, দেবমাতা অদিতির কুণ্ডল, কল্পতরুবৃক্ষ, নিদ্রা উঠে এলো। অন্তিমে এলেন মা লক্ষ্মী দেবী। ঐশ্বর্য ও “শ্রী”, ধন সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা লক্ষ্মী উঠে এলেন। এরপর এলেন ধন্বন্তরি দেব, হস্তে অমৃত কলস নিয়ে। এসব পৌরাণিক আখ্যান। মানুষের মনেই দেবতা ও অসুর দুই পক্ষই থাকে। এই দুই পক্ষের মধ্যেই অবিরত টানাহ্যাঁচড়া চলে।
দেবতার পাল্লা যখন প্রবল হয় তখন দেবী লক্ষ্মীর মতো সদাচারশীলা দেবী, হস্তির ন্যায় শান্ত ধীর বিচক্ষনতা, অশ্বের ন্যায় জড়তা ভাব নষ্টকারী ইত্যাদি দেখা যায়। অসুরের পাল্লা ভারী হলে নিদ্রা, অলসতা , মদিরা, বিষ ইত্যাদি প্রভাব দেখা যায়, অবশ্য আশার আলো ভগবানের শরণ নিলে তিনি এই বিষও হরণ করেন । দেবী লক্ষ্মীর এক নাম “সাগরনন্দিনী”- কারণ মা লক্ষ্মী সমুদ্রে প্রবেশ করেছিলেন সাগর রাজার কন্যারূপে। সাগররাজ রত্নাকর দেবীর পিতা রূপে ভগবান বিষ্ণুর সাথে কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন। মা হলেন সাগরকন্যা, তাই ত সাগর থেকে জাত কড়ি, শঙ্খ মা লক্ষ্মীর এত প্রিয়।
লাইক দিনঃ www.facebook.com/shonatonsondesh
⚠ ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে আরো বেশী মানুষের কাছে পৌছাতে সাহায্য করবেন ।
0 comments

দুষ্টের দমনে শিষ্টের পালনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ.

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধুমাত্র একজন ভাল বংশীবাদক নয়, একজন সফল কূটনীতিবিদ, যোদ্ধা এবং একজন সাহসী বীরপুরুষ হিসেবে চিন্তুা করতে, জানতে ও বলতে শিখুন।

আমরা জানি যে শুধু মাত্র ভাগবত পুরাণে কৃষ্ণকে প্রায়শই বংশী-বাদনরত এক কিশোরের রূপে বর্ণনা করা হয়েছে কিন্তু ভগবদ্গীতায় তিনি এক পথপ্রদর্শক এবং সহায়ক তরুণ রাজপুত্র। এছাড়া সমগ্র মহাভারত কাব্যে তিনি একজন কূটনীতিজ্ঞ হিসাবে পাণ্ডবপক্ষে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের রথের সারথিরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। হিন্দু দর্শন ও ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে কৃষ্ণ-সংক্রান্ত উপাখ্যানগুলি বহুধা পরিব্যাপ্ত যেখানে তাঁকে কল্পনা করা হয়ে থাকে বিভিন্ন রূপে: কখনো শিশুদেবতা, কখনো রঙ্গকৌতুকপ্রিয়, কখনো আদর্শ প্রেমিক, কখনো দিব্য নায়ক, আবার কখনো বা সর্বোচ্চ ঈশ্বর যার কয়েকটি গুনের বাস্তবিক উদাহরণ বিশ্লেষণ সহ নিম্নে আলোচনা করা হয়েছে।

শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন সু-পরামর্শ ও উপদেশ প্রদানকারী, শান্তি স্থাপনকারী একজন আদর্শ পুরুষ। তিনি পাণ্ডব এবং কৌরবদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে যথাসম্ভব উদ্যোগী হয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন যখন উপলব্ধি করলেন যে যাঁরা তাঁর প্রতিপক্ষ তাঁরা তাঁর আত্মীয়বর্গ এবং অত্যন্ত প্রিয়জন তখন তিনি যুদ্ধের বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি সমস্ত আশা ত্যাগ করে তাঁর ধনুক গাণ্ডীব নামিয়ে রাখলেন। তখন অর্জুনের মোহ দূর করার জন্য কৃষ্ণ অর্জুনকে সেই ধর্মযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে উপদেশ দেন যা ভগবদ্গীতা নামে খ্যাত।

#শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন একজন প্রখর কূটবুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষ এবং মহাভারতের যুদ্ধ ও তার পরিণতিতে তাঁর অস্বাভাবিক প্রগাঢ় প্রভাব ছিল। ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণের শিরশ্ছেদ করতে তিনি ভীমকে নির্দেশ দিয়েছিলেন অশ্বত্থামা নামক একটি হাতিকে বধ করতে এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে দ্রোণাচার্যের পুত্রের নামও অশ্বত্থামা। এরপর কৃষ্ণের নির্দেশে যুধিষ্ঠির দ্রোণাচার্যকে গিয়ে চতুরতার সাথে বলেন যে অশ্বত্থামা নিহত হয়েছেন এবং তারপর খুব মৃদুস্বরে বলেন যে সেটি একটি হাতি। কিন্তু যেহেতু যুধিষ্ঠির কখনও মিথ্যাচার করতেন না তাই দ্রোণাচার্য তাঁর প্রথম কথাটি শুনেই মানসিক ভাবে অত্যন্ত আহত হন ও অস্ত্র পরিত্যাগ করেন। এরপর কৃষ্ণের নির্দেশে ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণের শিরশ্ছেদ করেন।

#শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন একজন তেজী যোদ্ধা ও সাহসী বীরপুরুষ। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধকালে পিতৃ-পিতামহের বিরুদ্ধে সঠিক মনোবল নিয়ে যুদ্ধ না করার জন্য তিনি অর্জুনের উপর ক্রুদ্ধ হন। একবার তাঁকে আঘাত করার অপরাধে কৃষ্ণ একটি রথের চাকাকে চক্রে পরিণত করে ভীষ্মকে আক্রমণ করতে উদ্যত হন। তখন ভীষ্ম সমস্ত অস্ত্র পরিত্যাগ করে কৃষ্ণকে বলেন তাঁকে হত্যা করতে। কিন্তু এরপর অর্জুন কৃষ্ণের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং পূর্ণ উদ্যম নিয়ে যুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা করেন।
আর এই সবকিছুর পরিপ্রেক্ষিত তাইতো তিনি গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের (জ্ঞানযোগ) ৭ ও ৮ নং শ্লোকে উদাত্ত স্বরে বলেছিলেন-
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ।।৭।।
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।৮।।

হে ভারত ! যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যূত্থান হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই। সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।

বাপ্পী চন্দ্র কুরী।
৩০.০৮.২০১৭
0 comments

ধর্ম পালন করতে গিয়ে সমালোচিত হবেন না


সাধু সাবধান! ধর্ম পালন করতে গিয়ে সমালোচিত হবেন না। কোনটি উচিত আর কোনটি অনুচিত সেগুলো ধর্ম পালনের পূর্বে চিন্তা করুন। নিজে সতর্ক হয়ে অন্যকে সতর্ক করুন।
মাঝে মাঝে কয়েকটি বিষয়ে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হই । আমরা জানি যে অধিকাংশ হিন্দু পাড়া গুলোতে সাপ্তাহিক হরিসভার আয়োজন করা হয়। যেখানে সন্ধ্যা আরতি থেকে শুরু করে গুরুর গান, গৌর আরতি, দেহতত্ত্ব, পঞ্চতত্ত্ব, ভক্তিগীতি, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও ভাগবত পাঠ সহ ভিবিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করা হয়। কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় আমি আমার নিজ এলাকা সহ বেশকিছু এলাকায় খেয়াল করি যে হরিসভার মধ্যবর্তী সময়ে মুড়ি, চানাচুর , চা, পান ইত্যাদির জল খাবারের ব্যবস্থা করে থাকে উপস্থিত ভক্ত বৃন্দদের জন্য।

উক্ত খাবার গুলো খাওয়া শেষে আবার তারা হরিসভা শুরু করে। হরিসভা বলুন আর গোবিন্দের সেবা বলুন আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো ভক্তি সহকারে গোবিন্দের সেবা করা এবং ঠাকুর ঘরে যদি অন্যান্য দেব-দেবী থাকে তাদের সাথে গুরু সেবা দেওয়া। পাশাপাশি কিছু ভক্তিমূলক গান, হরিনাম সংকীর্তন, গীতা পাঠ সহ ধর্মীয় ও ভক্তিমূলক আলোচনা করা এবং পূজার শেষ প্রসাদ নেওয়া। এখন প্রশ্ন হলো মাঝখানে চা, মুড়ি, চানাচুর, এমনকি পান সিগারেট দিয়ে যে জলখাবারে পর্ব আয়োজন করা হয় তাকে কি আপনি ধর্ম পালন ব্যবস্থার নিয়ম হিসেবে স্বীকৃতি দিবেন নাকি নিয়মের বাহিরের কর্ম কান্ডে স্বীকার করবেন ??

আমাদের ধর্ম গ্রন্থ গুলোতে খাবারের উচ্ছিষ্ট বলে একটা কথা প্রায় শুনা যায়। হরিসভার মাঝখানে এইসব মুড়ি, চানাচুর, চা, পান খেয়ে একই জায়গায় বসে মৃদঙ্গ, করতাল, কাসা, জুড়ি ও হারমুনিয়াম দিয়ে হরিনাম সংকীর্তন করা ও ধর্মীয় আলোচনার মধ্যে কতটুকু শুদ্ধতা বজায় থাকে তা আপনারই ভাল বলতে পারেন।

পরের বিষটি পড়ার পর বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কিছু নামধারী বৈষ্ণব আমাকে গালমন্দ করতে এক মিনিটও সময় নিবে না। কিন্তু তাতে কি? সঠিক নিয়মে আসার জন্য ভুলকে সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। মহোৎসবে গোবিন্দ, জগন্নাথের ভোগের শেষে যে প্রসাদ ভক্তদের মাঝে বিতরন করা হয় তাই মহাপ্রসাদ। আচ্ছা, ধরুন অদ্য দিবসে আপনার বাড়িতে মহোৎসব, এক হাজার ভক্তের জন্য প্রসাদ তৈরি করতেছে পাঁচ থেকে ছয় জন বৈষ্ণব। আপনার হঠাৎ চোখে পড়লো কয়েকজন বৈষ্ণব মহাপ্রসাদ রান্নার চলাকালীন সময়ে মুখে পান সুপারি দিয়ে বেশ চিবাচ্ছে অথবা চা কিংবা কোল্ড ড্রিংকস খেয়ে প্রশান্তি নিচ্ছে। সত্যি করে বলুনতো বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখবেন?

নামধারী ঐসব বৈষ্ণবরা কি শুদ্ধতা ও সঠিক নিয়মকানুন মেনে মহাপ্রসাদ রান্না করতেছে ? নাকি শুধু ভোগের জন্য আলাদা করে পরিমাণ মতো তৈরি করে ভক্তদের জন্য চিরাচরিতভাবে সম্পূর্ণ শুদ্ধতা ও নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে দায়িত্ব পালন করতেছে। আমি মনে করি এসবের জন্য শুধু নামধারী
বৈষ্ণবদের দোষারপ না করে নিজদেরকে (আয়োজনকারী) সচেতন হতে হবে। তাহলেই এই সীমাবদ্ধতা থেকে কাটিয়ে উঠতে পারবো আমরা। আর তা না হলে ধর্ম পালন করতে গিয়ে এই ধরনের ভুল ত্রুটি বংশ পরম্পরাক্রম যেইভাবে চলে আসতেছে সেইভাবে ভবিষৎ প্রজন্মে চলতে থাকবে।

বাপ্পী চন্দ্র কুরী।।
(সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৭)
0 comments

গীতা পাঠের সময় গীতায় উল্লেখিত কিছু সাঙ্কেতিক চিহ্নের অর্থ ও ব্যাখ্যা

গীতা পাঠের সময় আমরা প্রায়ই অর্থ ও ব্যাখ্যার মধ্যে কিছু সাঙ্কেতিক চিহ্ন দেখতে পাই, কিন্ত আমরা অনেকে এসব সাঙ্কেতিক চিহ্ন না বুঝে এড়িয়ে যায়। বুঝতে চেষ্টা করি না এইসব সাঙ্কেতিক চিহ্ন দ্বারা মূলত কি বুঝানো হয়েছে। তাই গীতায় উল্লেখিত কিছু সাঙ্কেতিক চিহ্নের অর্থ তুলে ধরলাম।
১) ঋক্ - ঋগ্বেদ;
২) ঈশ - ঈশাবাস্যোপনিষৎ;
৩) কঠ - কঠোপনিষৎ;
৪) কেন - কেনোপনিষৎ;
৫) কৌষী - কৌষীতক্যুপনিষৎ;
৬) ছান্দোঃ - ছান্দোগ্যোপনিষৎ;
৬) তৈত্তি - তৈত্তিরীয় উপনিষৎ;
৭) মু বা মুন্ডক - মিন্ডকোপনিষৎ;
৮) মান্ডু - মান্ডুক্যোপনিষৎ;
৯) মৈত্র্য - মৈত্র্যুপনিষৎ;
১০) শ্বেত - শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ;
১১) ব্রঃ সূঃ বা বেঃ সূত্র - বেদান্ত দর্শন বা ব্রহ্মসূত্র;
১২) প্রশ্ন - প্রশ্নোপনিষৎ;
১৩) বৃঃ বা বৃহ - বৃহদারণ্যকোপনিষৎ;
১৪) সাঃ সূঃ - সাংখ্যসূত্র;
১৫) সাঃ কাঃ - সাংখ্যকারিকা;
১৬) যোঃ সূঃ বা যোগসূত্র - পাতঞ্জল যোগসূত্র;
১৭) যোঃ বাঃ - যোগবাশিষ্ঠ;
১৮) ভঃ রঃ সিঃ - ভক্তিরসামৃতসিন্ধু;
১৯) ভাঃ - শ্রীমদ্ভাগবত ( স্কন্ধ, অধ্যায়, শ্লোক) (ভাঃ ৪।২।১) অর্থাৎ শ্রীমদ্ভাগবতের চতুর্থ স্কন্ধ দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম শ্লোক।
২০) মভাঃ - মহাভারত (পর্ব প্রথম অক্ষর বা প্রথম দুই অক্ষর পর্বজ্ঞাপক; যথা - শাং = শান্তি পর্ব, বন = বন পর্ব,), অধ্যায়, শ্লোক;
২১) গী, গীঃ বা গীতা - প্রথম সংখ্যা অধ্যায়জ্ঞাপক, পরবর্তী সংখ্যা শ্লোকজ্ঞাপক;
২২) বিঃ পুঃ - বিষ্ণুপুরাণ;
২৩) বৃহঃ নাঃ পুঃ - বৃহন্নারদীয় পুরাণ ;
২৪) চৈঃ চঃ - শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত; খন্ড, অধ্যায়, শ্লোক;
২৫) (।।) - প্রত্যেকটা সংস্কৃত শ্লোকের শেষ লাইনের শেষে দুইটি দাঁড়ি (।।) চিহ্ন দেখা যায়, যার অর্থ কিংবা যা দ্বারা বুঝানো হয় উক্ত লাইনটি দুই বার পাঠ করতে হবে।

লেখকঃ বাপ্পী কুড়ি
0 comments

মা লক্ষ্মী “শীল”, “সদাচার”, “সৌন্দর্য”, “পরিছন্নতা”, “পবিত্রতা”এর দেবী

মা লক্ষ্মী “শীল”, “সদাচার”, “সৌন্দর্য”, “পরিছন্নতা”, “পবিত্রতা”এর দেবী। যেখানে অপরিষ্কার, মাকড়সার জ্বাল, যেখানে সর্বদা ঝগড়া- অশান্তি- পরনিন্দা – অন্যের সমালোচনা, মারামারি হয় সেখানে দেবী লক্ষ্মী বিরাজ করেন না । এই সব স্থান অলক্ষ্মী দেবীর পছন্দের জায়গা । লক্ষ্মীর পাঁচালী যারা পড়েন তারা দেখবেন মা লক্ষ্মী কিভাবে বর্ণনা দিয়েছেন – যেখানে সর্বদা মারামারি, ঝগড়া, হাতাহাতি, চিৎকার কোলাহল হয় সেই সব স্থান থেকে দেবী কমলা বিদায় নেন । যে সব নর নারী শাস্ত্র বহির্ভূত কাজ করে, অবাধে সঙ্গম করে, অখাদ্য কুখাদ্য ভোজন করে দেবী সেই সকল নর নারীর ওপরে কদাপি কৃপাদৃষ্টি প্রদান করেন না । যদি দেখা যায় সমস্ত পরিবারে গৃহকর্ত্রী বা স্ত্রীরাই হলেন “গৃহলক্ষ্মী”। দেবী হরিপ্রিয়া বৈকুণ্ঠনিবাসিনী এই গৃহলক্ষ্মীদের মাধ্যমেই সংসারে কল্যাণ করেন। কিন্তু সেজন্য গৃহলক্ষ্মী মানে প্রতি গৃহের স্ত্রীদের সেই কৃপা প্রাপ্তির জন্য তৈরী করতে হয়। যেমন সকলকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানোর আগে সকলের জন্য নানা ব্যাঞ্জন রন্ধন করে আহারের তৈরী করতে হয়- তেমনি সমস্ত কর্মের জন্য নিজেকে তৈরী করতে হয় ।

নারী ধর্মের আদর্শ স্থাপনের জন্য পৌরাণিক যুগ হতে আধুনিক যুগ পর্যন্ত কত মহীয়সী নারীর আবির্ভাব ঘটেছে- যেমন সীতা, সাবিত্রী, গার্গী, অপালা, মৈত্রেয়ী আধুনিক কালে মা সারদাকেই দেখুন। যে সব নারী অগ্রে খেয়ে পরে স্বামীকে খেতে দেয়, যে সব নারী গুরু- ব্রাহ্মণ- শাস্ত্রকে অবহেলা করে, যে সব স্ত্রী সকালে আঙিনা পরিষ্কার না করে, গৃহ পরিষ্কার না করে, যে সব বিবাহিতা নারী আলতা – সিঁদূর – শাঁখা- পলা- শাড়ী না পরে আধুনিক বস্ত্র পড়ে, যে সব নারী স্বর্ণ অলঙ্কার না পরে লোহার গয়না পড়ে- লক্ষ্মী দেবী সেই সব নারীর সংসারের থেকে বিদায় লন । গুরু – ব্রাহ্মণ আর শাস্ত্র নিন্দুকদের সর্ব অগ্রে দেবী লক্ষ্মী ত্যাগ করেন । যে সব নারী পিতামাতা- প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া করে- গুরুজনের সামনে ঘোমটা না দেয়, অভুক্তকে আহার না দেয়, গুরুজন- শ্বশুর শাশুড়ীর সাথে ঝগড়া করে , বার- ব্রত না করে, অতিথি দেখলেই ক্ষিপ্ত হয়- দেবী লক্ষ্মী এদেরও ত্যাগ করেন। এছাড়া কালো রক্তচক্ষু পায়রা যেখানে থাকে সেই স্থানে দেবী লক্ষ্মী থাকেন না। সাদা পায়রা যেই স্থানে থাকে সেই স্থান দেবীর প্রিয়। এছারা যে সব নারী সন্ধ্যাকালে ধূপ দীপ ঈশ্বরকে না দেখায় তথা শঙ্খ না বাজায় – দেবী লক্ষ্মী সেই স্থানেও থাকেন না। মলিন বস্ত্রে, ছিন্ন বস্ত্রে এমনকি যে নারী কেশ যত্ন করে না কিংবা লোহার গয়না পড়ে ( লোহার গয়না অলক্ষ্মী দেবীর প্রিয় ) , ঝগড়াটে এমন নারীকে দেবী কৃপা করেন না।

দেবীর কৃপা পেতে হলে নারীকে দেবীর মতোই সুপ্রসন্না , পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান, কেশ বিন্যাস, মৃদুভাষিনী, লজ্জাশীলা , গুরু- ব্রাহ্মণ- শাস্ত্রে ভক্তিমতী, অভুক্তকে অন্ন প্রদায়িনী, সাধ্যমতো স্বর্ণ অলঙ্কার ভূষিতা, উদার মন, যত্নশীলা, সকলের সাথে মিষ্ট ব্যবহারকারিনী, পতিভক্তিপরায়ণা হতে হবে। “পতি পরম গুরু”- ইহা মানতে হবে । বার ব্রত উপবাস, গৃহ পরিষ্কার , সন্ধ্যাকালে তুলসী তলায় ধূপ দীপ দেওয়া, অতিথির প্রতি যত্নশীলা হতে হবে। শুধু নারীদের দায়িত্ব না , পুরুষদেরও আছে। “লজ্জা” নারীর ভূষণ আর “সংযম” হল পুরুষের অলঙ্কার । যে সব পুরুষ , স্ত্রীকে ধরে নির্যাতন করে, জুয়া- মদ্য- বেশ্যায় আসক্ত সেই সব পুরুষেরাও মা লক্ষ্মীর কৃপা পায় না । যে সব পুরুষ গুরু - ব্রাহ্মণ( এই পেজেই একটা পোষ্টে কিছুকাল আগে কমেন্ট এ অনেকেই ব্রাহ্মণ কে গালাগালি করেছিলেন) – শাস্ত্রকে অমর্যাদা করে তারাও দেবীর কৃপা পান না। যে সব পুরুষ বার- ব্রত- উপবাস পালন করে না তারাও কৃপা পান না। সুতরাং পুরুষকেও মর্যাদাশীল হতে হবে । মনে রাখবেন দেবী লক্ষ্মী যেই স্থান থেকে বিদায় নেন সেখানে অলক্ষ্মী দেবী প্রবেশ করে। আর অলক্ষ্মী দেবীর প্রবেশ মাত্রই নবগ্রহ কুপিত হয়, হাহাকার- মৃত্যু- জরা- মারন রোগে গ্রাস করে, দরিদ্র হয়- দুর্ভাগ্য আসতেই থাকে। সুতরাং বিধিবিধানে নিয়ম পালন করে লক্ষ্মী দেবীর পূজা করে পাঁচালিতে যেমন লেখা আছে সেই ভাবে জীবন পালন করবেন নর ও নারী দুজনেই।

এবার বৃহস্পতিবারে লক্ষ্মী পূজা পড়েছে। এখন সবার প্রশ্ন তবে কি দুবার লক্ষ্মী পূজো করতে হবে ? উত্তর- হ্যাঁ। প্রতি বৃহস্পতিবার ত আমরা ঘট বসিয়ে পূজো করি। সেই নিয়ম মেনে “নিত্যলক্ষ্মী” র পূজা ঘট পেতে করে নেবেন। এবার যখন কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা করবেন- তখন কিন্তু আলাদা ঘট স্থাপন করতে হবে। বৃহস্পতিবারে বসানো ঘটে কোজাগরী লক্ষ্মী দেবীর পূজা হবে না। আর একটা কথা বৃহস্পতিবারে কখনো ঘট তুলবেন না। বুধবার করে রাত্রে ঠাকুর শয়নের পর ঘট তুলবেন। যদি কখনো ভুল হয় তবে বৃহস্পতিবার করে ঘট তুলবেন না, পুরানো ঘটেই পূজা করবেন। ঘট গঙ্গামাটির ওপর স্থাপন করবেন। ঘটে পুত্তলিকা আঁকবেন, জলপূর্ণ করে আমের পল্লব দেবেন ( অভাবে দুটো বোটা শুদ্ধো পান ) তার ওপর সশীষ পুত্তলিকা অঙ্কিত কচি ডাব ( অভাবে কলা বা হরিতকি বা যেকোনো গোটা ফল ) দিয়ে নতুন গামছা দিয়ে ঢেকে একটা ফুলের মালা দেবেন। চাইলে নতুন বস্ত্র বা লাল শালু দিয়ে ঘট ঢেকে দেবেন। লক্ষ্মী পূজায় তুলসী পত্র, ঝিঁন্টি পুস্প, কাঁসর বা ঘণ্টা বাদন নিষেধ। লক্ষ্মী পূজার উপযুক্ত সময় যখন সন্ধ্যায় আকাশে পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র দেখা দেবে। গোলাঘরে, লাঙলে, ট্রাক্টরে , আলমারি, পয়সা জমানোর ঘটে মা লক্ষ্মীর পায়ের চিহ্ন আল্পনা দিয়ে আঁকবেন। লোহার বাসন অলক্ষ্মী দেবীর প্রিয়, তাই লোহার বাসন বা লোহার কিছু লক্ষ্মী পূজায় ব্যবহার করবেন না। মা লক্ষ্মীর ঘট মাটির বা পিতল বা তামার দেবেন। ভক্তিচিত্ত হয়ে মা লক্ষ্মীর ও ভগবান শ্রীনারায়নের পূজা করেন। লক্ষ্মী দেবীর সাথে ভগবান নারায়নের অবশ্যই পূজা করবেন।
লাইক দিনঃ www.facebook.com/shonatonsondesh
⚠ ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে আরো বেশী মানুষের কাছে পৌছাতে সাহায্য করবেন ।
0 comments

রাধা রানী অস্বীকারীদের যৌক্তিক উত্তর

আজ রাধারানীর সখী শ্রীললিতা দেবীর আবির্ভাব তিথি। কাল রাধাষ্টমী। বৃন্দাবনেশ্বরী , গোলকপুরীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রীরাধারানীর বৃষভানু কন্যা রূপে আবির্ভাব তিথি। আজকাল দেখা যাচ্ছে অনেকেই রাধার অস্তিত্ব অস্বীকার করছেন । এটা সত্য যে “রাধা” দেবীর অস্তিত্ব মহাভারত বা শ্রীমদ্ভাগবতে পাওয়া যায় না। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন মহাভারত কিন্তু পূর্ণ শ্রীকৃষ্ণজীবনী নয় । এখানে পঞ্চপাণ্ডব ও কুরুপাণ্ডব যুদ্ধ ও শ্রীমদ্ভগবতগীতাই মুখ্য। ঘটনাচক্রে এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আংশিক লীলার পরিচয় পাই । এখানে তিঁনি শান্ত অর্থাৎ পরব্রহ্ম রূপে আত্মপ্রকাশিত। আবার শ্রীমদ্ভাগবতে গুপ্তা দেবী রূপে রাধারানীর উল্লেখ আছে।

রাসলীলার আরম্ভে প্রধানা সখীকে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মণ্ডল থেকে- সেটা আছে। গুপ্তা দেবীরূপে রাধারানী সকল ভক্তকে কৃপা করেন। রাধারানী কৃপা না করলে সেই ভক্ত কোটি জন্মেও কৃষ্ণ কৃপা পায় না। রাধারানী কি কাল্পনিক ? মোটেও তা না। পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য অনেক লেখক শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র রচণা করেছেন, তাতে রাধারানী প্রসঙ্গ আনেন নি। কারণ বিপ্লববাদে “প্রেম” নয় সুদর্শন ধারী শ্রীকৃষ্ণের রূপ প্রয়োজন।

এখন পরিস্থিতি অনুসারে ভগবানের রূপ ধারণ। অসুর দমন কালে ভগবান কিন্তু অতি ক্রুদ্ধ নৃসিংহ রূপ ধরেছিলেন আবার সেই এক ভগবান রাসমণ্ডলে সখীদের বাসনা পূর্ণ করার জন্য শ্যামসুন্দর বংশীধারী রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এমনকি চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি ধারণ করলেও সখীরা সেই রূপে নয় বরং সেই বংশীধারী বনমালা শোভিত কৃষ্ণ স্বরূপকেই কামনা করেছিলেন । আর শ্রীমদ্ভাগবতগীতা বলার সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অদ্বৈতস্বরূপ এ এসে বিরাট ব্রহ্মের স্বরূপ তুলে ধরেছিলেন। সুতরাং গীতায় যে মাধুর্য রসের সাধিকা রাধা ও সখীদের নাম থাকবেই না ইহা বোঝাই যায়।
শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী মহাশয় ব্যক্ত করেছেন-
আত্মেন্দ্রিয়প্রীতি বাঞ্ছা- তারে বলি ‘কাম’।
কৃষ্ণেন্দ্রিয়প্রীতি- ইচ্ছা ধরে ‘প্রেম’ নাম ।।

“প্রেম” কাহাকে বলে ? একটি ছেলে একটি মেয়ের হাত ধরে বের হয়ে গেলো বা পর ধর্মের একজনকে বিয়ে করলো ভালোবাসা করে – সেটি কি ? না তা নয় । ভগবান এর প্রীতির জন্য যে ইচ্ছা তাহাই প্রেম । আর বাকী সব ইচ্ছা “কাম” নামেই পরিচিত। অর্থাৎ ইষ্টদেবের সেবা, আকুতি , মিনতি হল প্রেম । প্রেমের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ রূপে বলে বোঝানো যায় না। কৃষ্ণ ভজনের পথে নিজেই উপলব্ধি করা যায় । এবার আসা যাকা শ্রীরাধারানী প্রসঙ্গে। তত্ত্ব কথানুসারে জীবাত্মা মাত্রই “রাধা” বা প্রকৃতি । পুরুষোত্তম একমাত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ । জীবাত্মা আর পরমাত্মার যে মিলন হয় তাই “মহারাস”।

 এই মিলন অন্তরে দিব্য স্বরূপে হয়। জড়জাগতিক ভাবে এই মিলনের ব্যাখা বা উপলব্ধি কোনোটাই হবে না । অষ্টসখী ( ললিতা, বিশাখা, সুচিত্রা, চম্পকলতা , সুদেবী, রঙ্গদেবী, তুঙ্গরেখা ও ইন্দুরেখা ) হলেন রাধারানীর ‘পরমশ্রেষ্ঠসখী’। এঁনাদের পথ অবলম্বন করে মঞ্জরী ভাব নিয়ে যুগলের সেবাই সাধনা। গুরু পরম্পরা অনুসারে এই সাধনা গুপ্ত । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও ভগবান বিষ্ণু এক । বৈকুণ্ঠধাম হল ভগবান বিষ্ণুর নিবাস। যাঁরা নৃসিংহ, ভগবান শ্রীরাম, বরাহ, বামন, বুদ্ধ আদি অবতারের সাধনা করেন তারা এই বৈকুণ্ঠধাম প্রাপ্ত হন। এমনকি ভগবানের হস্তে নিহত অসুরেরাও এই লোকে আসেন। কিন্তু গোলোকধাম এই বৈকুণ্ঠধামের ওপর। যারা কুঞ্জসেবাদি করেন, তারাই এই ধামে আসেন। মাধুর্য ভাবেই এই ধামে আসা যায় ।

 বস্তুত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্যাতীত অপর কারোর মাধুর্য সেবা নাই। আর সখীরা চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি নয়, শ্যামসুন্দর শ্রীকৃষ্ণ স্বরূপই কামনা করেছিলেন । এই মাধুর্য সেবাই শ্রেষ্ঠ। যথা শ্রীল কবিরাজ গোস্বামী লিখেছেন রায় রামানন্দের সাথে মহাপ্রভুর আলাপ প্রসঙ্গে-
মহাপ্রভু, ভক্ত রায় রামানন্দ সনে এই গোপিনী প্রেমকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলেছিলেন-

পূর্ব পূর্ব রসের গুণ পরে পরে হয় ।
দুই তিন গণনে পঞ্চ পর্যন্ত বাঢ়য় ।।
গুণাধিক্যে স্বাদাধিক্যে বাঢ়ে প্রতি রসে ।
শান্তদাস্যসখ্যবাৎসল্যেরগুণমধুরেতে বৈসে ।।
আকাশাদির গুণ যেন পর পর ভূতে ।
দুই তিন ক্রমে বাঢ়ে পঞ্চ পৃথিবীতে ।।
পরিপূর্ণ কৃষ্ণপ্রাপ্তি এই প্রেমা হৈতে ।
এই প্রেমের বশ কৃষ্ণ কহে ভাগবতে ।।
( শ্রীচৈতন্যচরিতামমৃত – মধ্যলীলা )

রাধারাণী হলেন শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি। স্বামী স্ত্রী যখন একত্র হন তখনই সন্তানের জন্ম হয়। আদিমকাল থেকে এই ভাবেই চলছে। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড , কোটি কোটি নক্ষত্র যিঁনি সৃষ্টি করেছেন সেই ব্রহ্ম কে পুরুষ আবার প্রকৃতিও ধরা হয়। যিনি পুরুষ তিনিই প্রকৃতি। রামকৃষ্ণ দেব একজায়গায় বলেছেন- “বেদে যিনি ব্রহ্ম তন্ত্রে তিনিই শক্তি”। সেই পুরুষ প্রকৃতি( শক্তি) রূপ অর্ধনারীশ্বর । শিব আর কালী। কৃষ্ণ আর শ্রীরাধিকা । এই পুরুষ যখন নিস্ক্রিয় হন, প্রকৃতি বা শক্তি হন সক্রিয় । কালীমূর্তি দেখলে দেখবেন, মায়ের চরণে শান্ত অর্ধ নিদ্রিত ঢুলুঢুলু চোখে মহাদেব উপরে দেবীর চোখে তাকিয়ে আছেন, পুরুষ এখানে নিদ্রিত, তিঁনি দেবীর দিকে তাকিয়ে। আবার মা কালী নয়ন নীচে মেলে মহাদেবের নয়নে দৃষ্টি রেখেছেন, তিঁনি সক্রিয় – সৃষ্টি- স্থিতি- লয় করছেন ।

বস্তুত আদ্যাশক্তির রূপ হলেন রাধারানী। শক্তি যখন পুরুষের বামে অবস্থান করেন, তখন সেই রূপ হয় পরিপূর্ণ। দেখবেন কৃষ্ণ বামে মাথা হেলিয়ে সেই ভাবে আদ্যাশক্তি রাধারানীর দিকে তাকিয়ে আছেন, আর রাধারানী বরামুদ্রায় আছেন, অর্থাৎ আশীর্বাদ দিচ্ছেন। শ্রীকৃষ্ণের কোনো এমন ছবি দেখেছেন যেখানে রাধাকে বামে নিয়ে একহাতে বাঁশী ধরেছেন অপর হাতে আশীর্বাদ দিচ্ছেন? এমন দেখা আয় না। ব্রহ্ম এখন শক্তির দিকে চেয়ে আছেন, আর শক্তিরূপিনী রাধারানী আশীর্বাদ করে “কৃষ্ণপ্রেম” প্রদান করছেন । শ্রীরূপ গোস্বামী “উজ্জ্বলনীলমণি” গ্রন্থে লেখেছেন-
হ্লাদিনী যা মহাশক্তিঃ সর্বশক্তিবরীয়সী ।

হ্লাদিনী যে মহাশক্তি যিনি শক্তিগণ দ্বারা পূজিতা । আর সেই রাধারাণী “কৃষ্ণপ্রেম” প্রদান করেন । আপনি যদি সব সময় শ্রীকৃষ্ণের কাছে “প্রেম” চান উনি দেবেন না। গৌড়ীয়া মতে এই প্রেম প্রদান করেন রাধারানী । আর তার জন্য দরকার যুগলের সেবা, আকুতি মিনতি, সদগুরু দ্বারা মঞ্জরী সেবা গ্রহণ। আর চাই শাস্ত্র শ্রবণ, সাধুসঙ্গ , অসৎ আলাপ বর্জন । বস্তুত রাধারানী কাল্পনিক নয়। শ্রীমদ্ভাগবতের গুপ্তা দেবী তিনি । “রাধা” নামে আঁখি ধারা ঝড়লে সেই প্রেমের পথে গোবিন্দ প্রাপ্তি হয় । রাধারানী কাল্পনিক দেবী নন- তিনি বীজমন্ত্রস্বরূপা গুপ্তা দেবী।

সবার সামনে সেই তত্ত্ব প্রকাশ করা যায় না, করেও বোঝানো যায় না। ভজন হয় গোপোনে – মনে মনে। ফেসবুকে পোষ্ট দিয়ে ভজন হয় না, শাস্ত্রীয় তর্ক করেও ভজন হয় না। যারা ভজনহীন , সাধনহীন তাঁহাদিগের কাছে “রাধারানী” হামেশাই কাল্পনিক থাকবেন। আর একদিন তারাও একসময় কাল্পনিক হয়ে যাবেন। কারণ লক্ষ কোটি পশু জন্ম তারপর মানব জন্ম পেয়ে ঈশ্বর সাধনার সুযোগ মেলে- এটাকে হাতছাড়া করা উচিৎ না ।
0 comments

হিন্দু ধর্মের কিছু নিয়মের পেছেন কিছু যুক্তিগ্রাহ্য কারণ থাকে।

গর্ভবতী নারীদের ভূতের গল্প শুনতে নেই কেন ?

উঃ- গর্ভবতী নারীকে খুব সাবধানে থাকতে হয়। সামান্য ভুলের জন্য সন্তান এমনকি মায়ের জীবন সংশয়ও হতে পারে। ভূতের গল্প শুনে আমরা ভয় পাই । এমন কি একলা থাকলে সেই সব গল্প মনে জেগে উঠলে আমরা শঙ্কিত হই। স্বপ্ন দেখে চমকে উঠি। কারণ আমরা যা ভাবি, সেই গুলিই স্বপ্নে আসে। এখন প্রাচীন কালে বিদ্যুৎ আবিস্কার হয় নি। প্রদীপ, লণ্ঠন , হ্যাজাক ছিলো ভরসা। এই অবস্থায় ভূতের গল্প শুনে এবং একলা থাকা কালীন এসব ভেবে গর্ভবতী নারী ভয় পেলে বা স্বপ্নে চমকে উঠলে গর্ভের সন্তান ও মা দুজনের জীবন সংশয় হতে পারে। বিশেষ করে ভয় পেয়ে জ্বর হলে সেটা খারাপ। সেজন্য এই নিয়ম গর্ভবতী নারীদের ভূতের বা হিংসামূলক, খুন খারাপির গল্প শুনতে নেই।

গর্ভবতী নারীদের ঈশ্বরের কথা শোনা উচিৎ কেন ?

ঊঃ- হিন্দু পুরাণ বলে প্রহ্লাদ তাঁর মাতা কয়াদুর গর্ভে থাকাকালীন নারদ মুনির আশ্রমে হরিনাম শুনতে পেয়ে হরি ভক্ত হন। মহাভারতে বলে শুভদ্রার গর্ভে থাকাকালীন অভিমণ্যু পিতা অর্জুনের মুখের যুদ্ধবিদ্যা শুনে যুদ্ধ শিখেছিলেন। পৌরাণিক এই সকল আখ্যানের মাধ্যমে যে সত্যি পুরাণকার রা শেখাতে চেয়েছিলেন, তা হল- গর্ভকালীন অবস্থায় নারী যদি ঈশ্বরের কথা, শাস্ত্র পাঠ ইত্যাদি শোনেন- তবে তার মন প্রান উৎফুল্ল থাকবে। এটা গর্ভবতী নারীর পক্ষে উত্তম। সুস্থ, আনন্দিত থাকলে মনে ভয় টয় আসবে না। সন্তান ভালো থাকবে। তবে এই সময় পূজা পাঠ- উপোস নিষিদ্ধ, কারণ এতে শরীরের পরিশ্রম হয়। আর গর্ভবতী নারীদের বিশ্রাম নেওয়া খুব প্রয়োজন। সেজন্য গর্ভবতী নারীরা ভজন কীর্তন শুনবেন। ধার্মিক পুস্তক ও মহাপুরুষদের জীবনি পড়বেন ।

গর্ভবতী নারীদের খোলা আকাশের তলায় খেতে নেই কেন ?

ঊঃ - গর্ভবতী নারীদের খোলা আকাশের তলায় খেতে নেই। বলে খোলা আকাশের তলায় খেলে বেতাল, পিশাচ দের দৃষ্টি পড়ে গর্ভবতী নারীদের ওপর। এর কারণ আছে। গর্ভস্থ সন্তান খুব সেনসিটিভ। সামান্য ভুলে মা ও সন্তান উভয়েই মারা যেতে পারে। খোলা আকাশের তলায় খেলে উড়ন্ত পাখীর মল বা ধূলাবালি, জীবানু খাবারে পড়তেই পারে। অজান্তে তা খেলে কি হবে বোঝাই যায়। তাই গর্ভবতী নারীদের সাবধানে চলা উচিৎ।

গর্ভবতী নারীদের সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হওয়া বারণ কেন ?

ঊঃ- গর্ভবতী নারীদের সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে দেয় না। বলে ভূত প্রেতের দৃষ্টি পড়বে গর্ভের সন্তানের ওপর। এর কারণ আছে। আসলে প্রাচীন কালে বিদ্যুৎ আবিস্কার হয় নি। তখন সন্ধ্যায় বের হলে হোঁচট খেয়ে পড়লে গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু ত হতেই পারে সাথে মায়েরও। এছাড়া সূর্যাস্তের পর কিছু জীবানু সক্রিয় হয়। সূর্যের আলো বহু প্রকার জীবানু নাশ করে। সেইজন্য সন্ধ্যার পর জীবানু শরীরে আসতে পারে। এছাড়া শীতল বাতাসে ঠাণ্ডাজনিত রোগের শিকার হতে পারে গর্ভবতী নারী। যার কুপ্রভাব সন্তানের উপরেও পড়ে। এছাড়া বিষাক্ত পোকামাকড়, সাপ, বিছা এই রাতের অন্ধকারেই বের হয় । প্রাচীন কালে ত ইলেকট্রিক আবিস্কার হয় নি। সেই জন্য এই নিয়ম ।

সন্ধ্যাকালে প্রদীপ দেওয়া হয় কেন তুলসী তলায় ?

ঊঃ- সন্ধ্যাকালে গৃহের রমণীরা তুলসী তলায় প্রদীপ দিয়ে শাঁখ বাজান। এটি হিন্দু ঐতিহ্য । যদিও এখন সন্ধ্যাবেলায় অধিকাংশ বাড়ীতে টিভির আওয়াজ শোনা যায়। প্রথমত এটি হল গৃহ আঙিনা আলোকিত করার জন্য। দ্বিতীয় সন্ধ্যার পর কিছু ফসলের ক্ষতিকারী পোকা বের হয়। যারা আগুন দেখে লম্ফ দিয়ে পুড়ে মরে। যেমন পঙ্গপাল, শ্যামাপোকা, মাজরা পোকা ইত্যাদি। ফসলের ক্ষতি কম হয়। আর প্রাচীন কালে ছিলো মাইলকে মাইল বন জঙ্গল মাঠ, তারপর একটি গ্রাম। তখন ত ইলেকট্রিক, মোবাইল গুগলি ম্যাপ এগুলো কিছুই ছিলো না। সন্ধ্যার অন্ধকারে পথিক গ্রামের দিক ভ্রষ্ট হয়ে সোজা পড়তো বিপদের মুখে কারণ সে সময় বাঘ, ডাকাত, ঠক দের উৎপাত ছিলো । এজন্য প্রদীপের আলো দেখে পথিক গ্রামের দিশা দেখতে পেতো।

কার্ত্তিক মাসে আকাশপ্রদীপ দেওয়া হয় কেন ?

ঊঃ- কার্ত্তিক মাসে আকাশ প্রদীপ দেওয়া হয়। একটা উচু বাঁশ বা উচু জায়গার মাথায় একটি প্রদীপ দেওয়া হয়। একে আকাশ প্রদীপ বলে। এর একটি কারণ কার্ত্তিক মাসে খুব পোকার উৎপাত। পোকা গুলো আগুনে এসে পুড়ে মরে। আর একটি কারণ কার্তিক মাসে কুয়াশা পড়ে অল্পস্বল্প। মাইলকে মাইল মাঠের পর একটি গ্রাম থাকতো আগের দিনে। কুয়াশাতে দিক ভ্রষ্ট হতেই পারে । পথিক যাতে দিকভ্রষ্ট না হয় তার জন্য উঁচু জায়গাতে প্রদীপ দেওয়া হত ।
ভালো লাগলে বলবেন। আবার কিছু যুক্তি কারণ নিয়ে লেখবো।
0 comments

"! 'ওঁ' বা 'প্রণব' তত্ত্ব !"

'ওঁ' শব্দটি অতি পবিত্র। যার উচ্চারণ অ-উ-ম্। একে ওঙ্কার বা প্রণবও বলা হয়। ওঙ্কার শব্দটি এমন মহাপপবিত্র যে সর্ব্বাবস্থায় ব্যবহার করা উচিৎ নয়। এই জন্য এর আর এক নাম প্রণব। 'প্র' উপসর্গ পূর্ব্বক 'নু' ধাতুর 'অল্' প্রত্যয়ে 'প্রণব' গঠিত। 'নু' ধাতুর অর্থ ডাকা বা স্তব্ধ করা। প্রণব অর্থ প্রকৃষ্ট উপায়ে ডাকা, অতি সুন্দর ভাবে ডাকা, প্রীতির সাথে ডাকা।

মানুষের অনেক নাম থাকে। একটি পোষাকী নাম হয়, আর একটি থাকে ডাকনাম। কেউ যদি কাউকে ডাকনাম ধরে ডাকে, তাহলে তার অধিক প্রীতি হয়। বোঝা যায় সে অতি প্রিয় বা আপন জন। ব্রহ্মের অনেক নাম। কেউ যদি তাঁকে 'ওঁ' বলে ডাকে, তবে তিনি অধিক প্রীত হন। তাকে প্রিয়জন মনে করেন। ভগবানকে তুষ্ট করতে এই নামটি সুন্দর, মনোহর। এজন্য ওঙ্কারকে প্রণব বলে। শ্রেষ্ঠ পুরুষের বাচক শব্দ প্রণব। ঈশ্বর বাচ্য আর প্রণব বাচক। উপনিষদ বলছে, গাছের সব পাতা যেমন যেমন কান্ডের সাথে যুক্ত, ঠিক একই ভাবে সব শব্দই একত্রিত আছে 'ওঁ' উচ্চারণের মধ্যে।'ওঁ'ই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। শুধু মানুই নয়, সমগ্র মহাবিশ্বেরও এই একীভূত হওয়ার প্রচেষ্টা আছে সরলীকরণের মাধ্যমে। আর পরমেশ্বর ঈশ্বর এটাই আশা করেন।

'ওঁ' এর প্রথম অর্থ হলো, অন্য কোনো অর্থ যুক্ত না করে মূলতত্ত্বকে ঘনীভূত রুপ দেওয়া এবং সহজ করা। 'ওঁ' এর দ্বিতীয় মানুষের প্রয়োজনে হ্যাঁ বোধক সাড়া দেওয়া। 'ওঁ' ই হচ্ছে পরিপূর্ণতা। স্তোত্র, প্রার্থনা এবং ধ্যান শুরু হয় গায়ত্রী মন্ত্র দিয়ে। যার শুরু ও শেষ 'ওঁ' দিয়ে। এই দুটি বস্তুই বিভিন্ন ভাবে পরম পুরুষকেই বোঝায়। 'ওঁ' ই শ্বাশত ব্রাহ্মণ, 'ওঁ' ই শেষ অবলম্বন। যার উপর মানুষ নিজেকে সমর্পণ করে দিতে পারে জীবন যাত্রার শেষে। অর্থাৎ ব্রহ্মনে মিলিত হওয়ার সময়ে। 'ওঁ' এর প্রতি উচ্চারণেই গভীর থেকে গভীরতর উপলব্ধি আসে সেই পরম একের। 'ওঁ' উচ্চারিত হয়ে থাকে শাস্ত্রাদি পাঠ, পবিত্র কাজ ইত্যাদির আরম্ভে এবং শেষে। যোগী পুরুষেরা অনবরত 'ওঁ' ধ্বনি উচ্চারণ করে থাকেন।

বারবার 'ওঁ' ধ্বনি উচ্চারণ এবং শ্রবণ মঙ্গলকারক। 'ওঁ' কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রার্থনার বস্তু নয়, এ সকলের, সার্বজনীন। 'ওঁ' কোনো দেবতার প্রার্থনার মন্ত্র নয়। সমগ্র বিশ্বপ্রপঞ্চকের মূল কথা নিহিত আছে এই শব্দে। এই ডাকটি একটি স্বর্গীয় বস্তু। সামগ্রিক পরমার্থিক চিন্তার আত্মসমর্পণ বলা যায় 'ওঁ' কে। 'ওঁ' ধ্বনির বিনাশ নেই। 'ওঁ' ই ব্রাহ্মণ, 'ওঁ' ই শব্দব্রহ্ম। 'ওঁ' শুধু ধ্বনিই নয়, নীরবতাও। এই মহাধ্বনি উচ্চারণের মাধ্যমে এক নীরবতার স্তর আছে, যার নাম 'তুরীয়'। প্রকৃত ঞ্জান এবং আত্মোপলব্ধির জন্য এই মাধুর্যমন্ডিত নীরবতাই অভিপ্রেত। প্রকৃত সাধণার শুরু নীরবতায় এবং অনন্ত শাশ্বত নীরবতায়ই মানুষের পরম প্রাপ্তি। 'ওঁ' ই প্রথম শব্দ, মহাবিশ্বের প্রথম প্রতীক, প্রথম বিকাশ, বাস্তব সত্তার ঘনীভূত রুপ। ইহা পৃথিবীর আগে, ইহাই পৃথিবীর শেষ কথা, ইহাই সারকথা। এর নিজস্ব কোনো অর্থ নেই। কারণ সমগ্র অর্থের এই ই উৎস। 'ওঁ' একের প্রতীক। পরমকরুনাময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অতি প্রিয় এই ওঙ্কার শব্দ।

তাঁর শ্রীচরণে আমাদের ভক্তিপূর্ণ অর্ঘ্য,
"ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়।"
!!হরে কৃষ্ণ হরে কৃৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে!!
!!জয় শ্রীহরি!! জয় রাধে!!

Written by: Ripon Saha
Like our page: সনাতন সন্দেশ - Sanatan Swandesh
0 comments

সাত প্রকার স্ত্রী কথা ও বুদ্ধের উপদেশে সুজাতার আমূল পরিবর্তন

সুজাতা ছিলেন ধনঞ্জয় শ্রেষ্ঠীর কন্যা। বিশাখার ছোট বোন সুজাতা ছোটকাল হতে অত্যন্ত মুখর দাম্ভিক ছিলেন। বিশাখার সহোদরা হলেও দু'বোনের মধ্যে স্বভাবের কোন মিল নেই। বড় বোন বিশাখা ধীরস্থির, বিদুষী, বিনীতা, শান্তশীলা ও বুদ্ধিমতি আর ছোটবোন সুজাতা ঠিক তার বিপরীত।
ধনঞ্জয় শ্রেষ্ঠী কন্যা সুজাতাকে অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠীর বাড়ীতে বিবাহ কার্য্য সম্পন্ন করেন। সুজাতার পিতার অতুল ঐশ্বর্য্যের নিকট শ্বশুর অনাথপিণ্ডিকের সম্পত্তি কম হলেও উপেক্ষণীয় নয়। তবুও শ্বশুরকুলের বিত্ত সুজাতার মনকে সন্তোষ দিতে পারল না।

অনাথপিণ্ডিক জেতবন বিহার তৈরী করতে চুয়ান্ন কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করেন। তখন তিনি সেই সময় প্রতিদিন পাঁচশত ভিক্ষুসংঘকে পিণ্ডদান করতেন। কত কর্মচারী, দাস-দাসী রয়েছে! তবুও সুজাতার মন খুশী নয়। ধীরে ধীরে তার স্বভাব, আত্মগৌরব ও দাম্ভিকতা উন্মুখ হয়ে উঠল। পিতার সম্পত্তির গর্ব করে শ্বশুরকুলের প্রতি অমান্যতা, কর্কশ বাক্য আর উচ্চবাক্য প্রয়োগ করতে লাগল। সকলের শান্তি নষ্ট হল। শান্তিকামী সুখবিহারী অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠীর সুখ ভেঙ্গে গেল। তাদের সুখের সংসারে অশান্তির সূচনা হল। অনাথপিণ্ডিক চিন্তিত হলেন। পুত্রবধুর কুৎসা প্রচার রটানো কি অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠীর শোভা পায়? অগত্যা তিনি নীরবে থাকায় বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন।

একদিন অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠী তথাগত বুদ্ধকে ঘরে আহারের নিমন্ত্রণ করেন। তথাগত যথাসময়ে এসে সুসজ্জিত আসনে উপবেশন করলেন। এমন সময়ে অন্তঃপুরে কলহের উচ্চ শব্দ শুনতে পেয়ে বুদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন। এতে শ্রেষ্ঠীর মুখ বিমর্ষ হইল। দুঃখের সাথে বললেন, ভগবান, আমার পুত্রবধু সুজাতাই যত অনর্থের মূল। ধনকুবের ধনঞ্জয় শ্রেষ্ঠীর কন্যা কিনা, তাই তার এত অহংকার বেশী! সে শ্বশুর-শ্বাশুরীকে মান্য করে না, স্বামীকে অমান্য করে, অবহেলা করে। এমনকি প্রভু! আপনাকেও সম্মান প্রদর্শনে সে আগ্রহী নয় মনে করি। অন্যজনের কথাই বা কি! তথাগত সুজাতাকে আহ্বান করলেন। সুজাতা এসে বুদ্ধকে বন্দনা করে বসে পড়ল।

 বুদ্ধ বললেন, সুজাতা! আমি এখন তোমাকে পুরুষের সাত প্রকার ভার্য্যা সম্বন্ধে বলব; (১) বধকাসমা ভার্য্যা, (২) চৌরিসমা ভার্য্যা, (৩) আর্য্যাসমা ভার্য্যা, (৪) মাতৃসমা ভার্য্যা, (৫) ভগ্নিসমা ভার্য্যা, (৬) সখীসমা ভার্য্যা ও (৭) দাসীসমা ভার্য্যা - এই সাত প্রকার ভার্য্যার মধ্যে তুমি কোন প্রকারের ভার্য্যা? সুজাতা তখন বিনীতভাবে বললেন, প্রভু! আপনি সংক্ষেপে যা বললেন তা আমি বুঝলাম না। অনুগ্রহ করে আমাকে ভালভাবে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিন আমি যাতে বুঝতে পারি। বুদ্ধ তখন বললেন, শোন সুজাতা ----

(১) যে স্ত্রী প্রদুষ্টাচিত্তা, কলহ স্বভাবা, স্বামীর অমঙ্গলকারিনী, পরপুরুষে আসক্তা, নিজের স্বামীকে অবজ্ঞাকারিনী, স্বামীর ধনসম্পদ অপব্যয়কারিনী, অর্থ না পেলে অনর্থকারিনী, স্বামীকে হত্যা করার ভয় দেখায়, এমনকি হত্যা করতেও উন্মুখ হয়, তেমন স্ত্রীকে বধকাসমা ভার্য্যা বলা হয়।

(২) যে স্ত্রী স্বামীর শিল্প-বাণিজ্য ও কৃষি কর্মের দ্বারা উৎপন্ন ধন-সম্পদ উপভোগ করে, তবুও স্বামীর সম্পদ চুরি করার ইচ্ছা করে এবং অল্প হলেও চুরি করে, যেমন- রান্নার সময় ধৌত করার জন্য যে চাউল নেয়া হয়, তা হতেও চুরি করে। আর অন্যকিছুর কথাই বা কি? সেই রকম স্ত্রীকে চৌরিসমা ভার্য্যা বলা হয়।

(৩) যে স্ত্রী নিষ্কর্মা আলস্যপরায়ণ, অধিক ভোজনকারিনী, আর্য্যের বস্তুর প্রতি অধিকার ও লোভ পরায়ণা, মুখরা, প্রচণ্ডা, দুর্ভাষিনী, বাক্যের উপর বাক্য প্রয়োগ করে, স্বামীকে অবজ্ঞা করে, জনমণ্ডলীকে পরাস্থ করার চেষ্টা করে, স্বামীর উৎসাহ উদ্যম অসহনশীলা। এই রকম স্ত্রীকে আর্য্যাসমা ভার্য্যা বলে।

(৪) স্বামীর সঞ্চিত ধন যে স্ত্রী রক্ষা করে, সর্বদা স্বামীর হিত কামনা করে ও উপকারিনী, মাতা পুত্রকে রক্ষার ন্যায় স্বামীকে রক্ষা করে, এই রকম স্ত্রীকে মাতৃসমা ভার্য্যা বলা হয়।

(৫) জ্যেষ্ঠ সহোদরের প্রতি কনিষ্ঠ ভগ্নির আদর ও সম্মান প্রদর্শনের ন্যায় যে স্ত্রী স্বামীকে প্রতি আদর সম্মান করে, স্বামীর প্রতি লজ্জাবনতা ও স্বামীর প্রতি অনুবর্ত্তনী হয়। এই রকম স্ত্রীকে ভগ্নিসমা ভার্য্যা বলে।

(৬) দীর্ঘদিন পরে সখার আগমনে সখীর আনন্দিত হবার মত স্বামী দর্শনে যে স্ত্রী আনন্দিত হয় এবং কুল মর্যাদা রক্ষাকারিনী, শীলবতী ও পতিব্রতা হয়। সে স্ত্রীকে সখীসমা ভার্য্যা বলা হয়।

(৭) যে স্ত্রী স্বামী শাসন-অনুশাসন এবং লাঠি হস্তে তর্জন-গর্জন করলেও যে স্ত্রীর চিত্ত দূষিত হয় না বা ক্রোধ হয় না, হিংসা উৎপন্ন হয় না বরং স্বামীর শাসন সহ্য করে এবং ক্রোধহীনা, শান্তশীলা ও স্বামীর আনুগত্য হয়। সে স্ত্রীকে দাসীসমা ভার্য্যা বলা হয়।

এই সাত প্রকার ভার্য্যা বিষয়ে বর্ণনা করার পর বুদ্ধ আরো বললেন “সুজাতা, যে সকল ভার্য্যা বধকা, চোরী ও আর্য্যাসমা হয়, মুখরা, প্রচণ্ডা, দুঃশীলা, লজ্জাহীনা হয় ও পরুষবাক্য প্রয়োগ করে, স্বামীকে অনাদর করে, অখাদ্য খাওয়ায়, স্বামী রোগগ্রস্থ হলে সেবা করে না, সেইসব স্ত্রী মৃত্যুর পর নরকে জন্ম নিয়ে দুঃসহ দুঃখ ভোগ করে। আর যেইসব স্ত্রী মাতৃসমা, ভগ্নিসমা, সখীসমা এবং দাসীসমা তারা মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গে উৎপন্ন হয়। সুজাতা, এই সপ্ত প্রকারের মধ্যে তুমি কোন প্রকারের ভার্য্যা? সুজাতা তখন বিনীত বাক্যে বললেন, প্রভু! অদ্য হতে আমাকে দাসীসমা ভার্য্যা বলে জানবেন। সুজাতা আবার বলে উঠল, প্রভু! আমি এতদিন অন্ধকারে আবৃত ছিলাম।

এখন আপনার দয়ায় আলোকের সন্ধান পেয়েছি। বাবার ঐশ্বর্য্যের অহঙ্কার আত্মভিমান এখন আমার ধ্বংস হয়েছে। আমার ভ্রান্তি নিরসন হয়েছে। ভগবান! মহান বৌদ্ধকুল পরিবারের কুলবধু হয়ে আমার বিচ্যুতির জন্য আমি এখন খুবই লজ্জিত, অনুতপ্ত। আপনার অমৃতবাণী আমার মনে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। এই বলে সুজাতা বুদ্ধের চরণ তলে ক্ষমা ভিক্ষা প্রার্থনা করলেন। আর শ্বশুর-শ্বাশুরীকে ও স্বামীর পায়ে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।

সেই হতে সুজাতা ভদ্রা, বিনীতা, শান্তশীলা, প্রিয়ভাষিনী হলেন; মধুর মিষ্টি স্বরে সকলের প্রতি প্রাণে প্রীতি ও আনন্দ দান করতেন; ত্রিরত্নের উপাসিকা হয়ে দানে আত্মনিয়োগে রত থাকতেন, শীল সমাধিতে ও প্রজ্ঞায় অনুশীলনে তাঁর কুল মর্যাদার অক্ষুন্ন রাখতেন। অর্থাৎ সুজাতার বিভিন্ন গুণ বিদ্যমানে সবাই আনন্দমুখর হয়ে উঠল। সর্বজ্ঞ বুদ্ধের মহিমাময় প্রভাবেই সুজাতার এমন বর্ণনাতীত আমূল পরিবর্তন হল।

(c) Prithwish Ghosh
0 comments

সাধনা

প্রকৃতিকে দেবীরূপে ভজনা- এই বিশ্বাস, সাধনা, দর্শন ও আরাধনার সমস্ত প্রক্রিয়াকে আমরা একত্রে বলতে পারি- ‘তন্ত্র’। যে তান্ত্রিক বিশ্বাসের উন্মেষ হয়েছিল নিষাদদের ধর্মীয় চেতনায়, নিষাদদের মাতৃতান্ত্রিক ধর্মীয় ভাবনায়। কাজেই তন্ত্রের উদ্ভব প্রাচীন বাংলায়। এই দেবী বাঙালিসমাজে ‘শক্তি’ দেবী নামে পরিচিতা। যারা শক্তি দেবীর উপাসনা করেন তারাই ‘শাক্ত’ বলে পরিচিত। ধর্মতত্ত্বের ভাষায় -- শাক্ত-তান্ত্রিক। শক্তিদেবী অবশ্য বাঙালিসমাজে আরও নানা নামে পরিচিতা। তন্ত্র থেকে তত্ত্ব। তন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বা উদ্দেশ্য হল তত্ত্বের সিদ্ধান্তকে জীবনের কর্মক্ষেত্রে রূপদান করা। কাজেই তন্ত্রের প্রচারের মাধ্যম আচরণ বা থিওরি নয়, প্র্যাকটিস্।

তন্ত্রমতে নারী জগতের আদি কারণ। তন্ত্রের উদ্ভব প্রাচীন বাংলার মাতৃতান্ত্রিক নিষাদসমাজে হয়েছিল বলেই এমনটাই ভাবা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল।

নিষাদদের কৌম (গোত্রীয়) সমাজটির গড়ন ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সমাজবিকাশের অনিবার্য নিয়মে প্রথমে নিষাদসমাজ ছিল শিকারী ও খাদ্য সংগ্রহকারী। তারা বাংলার প্রাচীন অরণ্যে ফলমূল কুড়োত। পরে হাতিয়ারের উন্নতি হল; তারা বনভুমি কেটে জমি চাষ করতে থাকে। এভাবে ওদের কৃষি জীবনে উত্তরণ ঘটে । তবে অনুন্নত হাতিয়ারের (টুলস) কারণে কৃষিজীবন ছিল ভারি অনিশ্চিত। ওদিকে গোত্রের জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল। কাজেই প্রকৃতির কৃপার ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় কী!
সেই আদিম নিষাদসমাজটি মাতৃতান্ত্রিক ছিল বলেই প্রকৃতিকে তারা ‘চৈতন্যময়ী’ ভেবেছিল। তারা নারীকে জগতের আদি কারণ বলেও ভাবল কাজেই অদৃশ্য প্রকৃতিক শক্তিটি ওদের আদিম মনে একজন দেবী হিসেবে প্রকাশ পেলেন, দেবতা হিসেবে নন। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে আর্যরা ভারতবর্ষে আসার পূর্বে শিব ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধানতম অনার্য দেবতা। একইভাবে, প্রাচীন বাংলাতেও আর্যরা আসার পূর্বে শিব ছিলেন প্রধানতম অনার্য দেবতা। যে কারণে প্রকৃতিকে দেবী কল্পনা করলেও শিবের গুরুত্ব এতটুকু কখনওই হ্রাস পায়নি।

তন্ত্রের প্রধান একটি সিদ্ধান্তই হল এই যে প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী মনে করা।
কিন্তু, শক্তি কি?

বিশ্বজগতে সবই তো শক্তির সমাহার। যে শক্তিকে বিজ্ঞান নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়। আধুনিক সভ্যতা এই মূলতত্ত্বের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতির সূত্র আবিস্কার করে এই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা যৌক্তিক এই প্রশ্নও তো আজকাল উঠছে । এই দৃষ্টিভঙ্গি হটকারী কিনা, পরিবেশ বিপর্যয়ের মূলে এই দর্শন সক্রিয় কিনা- এসব প্রশ্নও নিয়েও তো আমরা আজ উদ্বিগ্ন।

তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। তার কারণ, তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী জেনেছে, মা বলে জেনেছে, মায়ের দেবীপ্রতিমা কল্পনা করেছে; দেবী মা (প্রাকৃতি কে) কে একজন তান্ত্রিক নিষ্ঠাভরে ভজনা করতে চায়, আরাধনা করতে চায়, পূজা করতে চায়। পাশাপাশি একজন তান্ত্রিক মনে করেন, একজন ভক্ত চৈতন্যময়ী শক্তির অনুগত থাকলে চৈতন্যময়ী শক্তির কৃপায় তার অশেষ কল্যাণ সাধিত হতে পারে। এই হল বিজ্ঞান এবং তন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য।

চৈতন্যময়ী প্রকৃতিরূপী নারীবাদী তন্ত্রের দেবী কালী- বাসুলী – তারা- শিবানী। কিন্তু তন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছেন (আমি আগেই একবার ইঙ্গিত দিয়েছি) অনার্য দেবতা শিব। তন্ত্রমতে শিব তাঁর শক্তি পেয়েছে কালীর কাছ থেকে। আবার শিব- এর রয়েছে পৃথক নিজস্ব শক্তি। তন্ত্রমতে পুরুষ শক্তিলাভ করে নারীশক্তি থেকে। শিব শক্তি লাভ করেছেন তাঁর নারীশক্তির প্রকাশ- গৌড়ীর শক্তি থেকে। তবে শিবের নিজস্ব শক্তিও স্বীকৃত। তন্ত্রসাধনার মূল উদ্দেশ্যই হল- (প্রাকৃতিক) শক্তি দেবীর সাধনা করে “শিবত্ব” লাভ তথা শক্তিমান হওয়া।

(c) Prithwish Ghosh
0 comments

"পিতৃপক্ষ এবং মহালয়াতে তর্পন"

তর্পন হল সেই কর্ম যার দ্বারা আমরা আমাদের পূর্বে মৃত দের উদ্যেশে তিল জল দিয়ে থাকি। তর্পন হল দুই প্রকার যথা --- ১> স্থানাঙ্গ ২> নিত্য। প্রতিদিন পুকুরে বা নদীতে স্থানের সময় যে তর্পন করা হয় তা স্থানাঙ্গ তর্পন। এর দ্বারা প্রতিদিনই পূর্বপুরুষ দের উদ্যেশে জল দেয়া হয়। কিন্তু আমরা এখন তা করতে অসমর্থ, তাই আমরা নিত্য তর্পন করি পিতৃপক্ষে। যা আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথির পরদিন থেকে শুরু হয় এবং মহালয়ার দিন আমাবস্যা পর্যন্ত এই কার্য করা যায়। আমাবস্যার দিন পিতৃপক্ষের শেষ এবং মাতৃপক্ষের শুরু হয় বলে এই দিনে বেশীর ভাগ মানুষ তর্পন করে থাকেন।

যদি আপনার বাবা বা মা অথবা দুজনেই মারা গিয়েছেন তাহলে আপনার তর্পন করা বাধ্যতা মূলক কর্তব্য। শুধুমাত্র আপনার মাতা পিতার উদ্যেশে তর্পন করবেন তা কিন্তু নয়, আপনি আপনার বংশের যত অগ্রজ ব্যক্তি আছেন যারা মারা গেছেন পূর্বে তাদের নামেও তর্পন করতে হবে। শুধুমাত্র আপনার বংশের নয়, আপনার মায়ের বংশের মৃতদের উদ্যেশেও তর্পন করতে হবে। আপনার স্ত্রী থাকলে তাহলে তার বংশের মৃতদের উদ্যেশেও তর্পন করতে হবে।

এবার জেনে নেই তর্পন কত প্রকার -- ১) মনুষ্য তর্পন, ২) ঋষি তর্পন, ৩) দিব্য পিতৃতর্পন, ৪) যম তর্পন, ৫) ভীষ্ম তর্পন, ৬) রাম তর্পন, ৭) শূদ্র তর্পন।
আপনার আঘে আপনার বংশে যারা মারা গিয়েছেন তারা এখন কোথায় আছেন? কেউ স্বর্গে, কেউ নরকে আর কেউ যদি খুব ভাল কাজ করে তাহলে বৈকুন্ঠ, কৈলাশে অথবা আবার পূর্নজন্ম নিয়েছেন। তারা যেখানেই থাকুন না কেন তাদের আত্মার এক সময় জল পাবার ইচ্ছা করে। তারা তাদের বংশধর দের কাছে জল প্রার্থনা করে। সেই জন্য আমরা তর্পন করে থাকি। এতে করে তাদের আত্মার শান্তি হয়। শুধু মাত্র আমাদের পূর্বজদের নয়, দেবতা ঋষি আদি মহান ব্যক্তিদের উদ্যেশেও তর্পন করতে হয়।

তর্পন করলে আমাদের মধ্যে শান্তির সঞ্চার হয়। পূর্ব পুরুষদের আশীর্বাদে আমাদের মঙ্গল হয়। শুধু পূর্বপুরুষ দের নয়, দেবতা ঋষি আদি দের আশীর্বাদও আমরা পাব। অপরপক্ষে, যদি আমরা তর্পন না করি তাহলে আমাদের পূর্বজদের আত্মা পীড়িত হয় হয়, তারা বিভিন্ন ভাবে আমাদের বুঝাতে চায় তাদের তৃষ্ণার কথা। অনেকে তাকে ভূতে উপদ্রব মনে করে কারণ তারা জানে না যে তাদের পূর্বজদের জলের প্রয়োজন। তাছাড়া সংসারে নেমে আসে অশান্তি।

****** (হয়ত) এখন অনেকেই জানতে চাইবেন তর্পন কীভাবে করতে হয়। এক কথায় বলছি জলাশয়ে নেমে তিল-জলে মন্ত্র উচ্চারণ করে তর্পন করতে হয়। মন্ত্র-তন্ত্র যা আছে সেই গুলো চাইলে আমি লিখতে পারতাম তবে এতে আপনারা বুঝতে পারবেন না আর তা অনেক বিস্তারিতও। তাই একজন অভিজ্ঞ পুরোহিতের শরণাপন্ন হতেই হবে।

(c) Prithwish Ghosh
0 comments

তন্ত্র ও 'পঞ্চ ম'-কারের সাধনা

তন্ত্র সাধনা একটা নেশা, যে কোনও কিছুর চেয়েও মারাত্মক নেশা। সাধারণে ভাবেন তান্ত্রিকেরা নেশা-ভাঙ করে, মাঝে মাঝে বেশ্যা এনে ফুর্তি করে, পঞ্চ ম-কারের সাধনা মানে মদ ও মহিলা ভোগ, তান্ত্রিকেরা সমাজে থাকতে পারে না, বা তাদের আলাদা একটা সমাজই আছে ইত্যাদি। আসলে তা মোটেই নয়, তন্ত্রশাস্ত্রে মানুষ প্রথম অবস্থায় পশু। প্রথম স্তরের যে মানুষ, স্ত্রী শক্তির সঙ্গত ছাড়া তার এক পাও উপরে ওঠার জো নেই, শক্তিকে আশ্রয় করেই তাকে এগোতে হয়। কারণ, পুরুষ শক্তির সঙ্গে প্রকৃতি শক্তির মিলন সম্পূর্ণ না-হলে সৃষ্টি হয় না। আর, পঞ্চ ম-কার এই পশু-স্তরের আচার। এই আচার শুধু তন্ত্রে নেই; ছাল চামড়া ছাড়ালে আমাদের আজকের তথাকথিত সভ্য সমাজেও দেখতে পাবেন। তন্ত্রে যা 'নিয়মানুগ', সমাজে তা ছাড়া গরু, অনিয়ন্ত্রিত, অপরিমিত, অমার্জিত --- তন্ত্রে এটা উপরে ওঠার রাস্তা, লোক-সমাজে তা নামার।

তান্ত্রিকেরা পারেন বাহ্যিক বিশ্বের পাশ কাটাতে, তাঁরা উৎকট সাধনে দিনের পর দিন কাটান। এ ভাবেই শেখেন ব্রহ্মাণ্ডের কোনও কিছুতেই ভয় না পেতে, জিততে শেখেন কামভাব, শেখেন গা ঘিনঘিন করা জিনিসকেও ঘেন্না না করতে। মন থেকে বাহ্যিক টানগুলো কেটে গেলেই তান্ত্রিক পূর্ণ জ্ঞান পান। তখন ওই পঞ্চ ম-কারের মানেই বদলে যায়।

-

সাধকদের কাছে মদ উত্তেজক নয় ----

মদ্য --

‘ব্রহ্মরন্ধ্র হতে যেই সুধা ঝরে অনিবার

পিয়ে মাতে সদানন্দে সেই মদ্যসাধক সার’।

মাংস --

‘মা শব্দে রসনা বুঝ, বাক্য তারই অংশ হয়,

সেই বাক্য রসনার অতি প্রিয় সুনিশ্চয়,

সে বাক্য ভক্ষণ করে বাকসংযত যেই,

নির্বাক সেই মহাসাধু মাংসের সাধক সেই’।

মৎস্য -----

ঈড়া-পিঙ্গলা ও সুষুম্নার ত্রিবেণীতে

যে সাধক সাঁতরে থাকে সুস্থ্য চিতে,

সে সাধক জানিবে ব্রহ্মময়ীর বৎস

সাধনায় সিদ্ধ হয়ে হয়েছে মৎস্য।

আর মৈথুন, তখন—

‘মৈথুন পরম তত্ত্ব সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় কারণ,

ব্রহ্ম আর তাঁর শক্তির নাইকো বারণ,

তাহাতে হইলে সিদ্ধি সুদুর্লভ লভে ব্রহ্মজ্ঞান

এই মৈথুনে রত যেই সে মৈথুনের সাধক প্রধান।’

-

পার্থিব ভোগ-বাধা কাটিয়ে পরম শক্তির সঙ্গে এক, একাত্ম হয়ে যাওয়ার রাস্তা খুলে দেয় তন্ত্র। এ কাজে তার সহায় প্রকৃতিরই এক অমোঘ নিয়ম— রোজ এক খাবার খেলে কিছু দিনেই তা বিস্বাদ লাগে, রুচি হয় না। যাঁরা এই রুচি হারিয়ে খাদ্যের সারাৎসারটা বুঝতে পারেন, তাঁরা তন্ত্রাদর্শে প্রথমে বীর সাধক, পরে দেবতা।

তন্ত্র কল্পনায় আমাদের মেরুদণ্ডের আগাগোড়া একটি অতি সূক্ষ্ম পথ আছে। সেই পথই প্রাণের পথ বা নাড়ী। চোখের পলক ফেলতে যতটা সময় লাগে, সেই সময়ে ওই নাড়ী বরাবর প্রাণের যে কত বার ঊর্ধ্ব-অধঃ যাতায়াত হয়, তা ভাবা যায় না। তন্ত্রে এই প্রাণশক্তিকে ‘মা’ আর তাঁর গতিক্রিয়াকে নৃত্য বলা হয়েছে। অর্থাৎ মা নাচ্ছেন, সে নাচের বিরাম নেই। এই প্রাণশক্তির পথ ধরে এগোলে মেরুদণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্তের উপরে একটি সূক্ষ্ণ ছিদ্র পথ পাওয়া যায়, যাকে বলে মূলাধার চক্র। লিঙ্গমূলে রয়েছে আর একটি ছিদ্র বা দ্বার। তান্ত্রিক নাম— স্বাধিষ্ঠান চক্র। সেই রকমই হৃৎপিণ্ডের সমসূত্রে মেরু পথে রয়েছে অনাহত চক্র। শরীরের গোপন শক্তির আরও কত উৎস! কণ্ঠের সমানে আছে বিশুদ্ধাক্ষ চক্র। যেখানে মেরুদণ্ড আরম্ভ, চলতি কথায় আমরা বলি দুই ভ্রূর মধ্যে, তাকে বলা হয় আজ্ঞা বা প্রজ্ঞা চক্র। তার উপরে পরমাত্মার রাজ্য— সহস্রার। তান্ত্রিক সাধনে এই ছয় চক্র ভেদ করা সম্ভব হলে জীব আত্মা পরমাত্মায় মিলিত হয়।

স্থুল ভাবের পশুপ্রবৃত্তিসম্পন্ন প্রথম স্তরের মানুষে এই জীবাত্মা প্রাণশক্তিকে অবলম্বন করে সাড়ে তিন পাক দিয়ে সাপের মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে, মূলাধার চক্রে অতি সূক্ষ্ণ দেহে থাকে। চৈতন্য বা সম্যক জ্ঞান পেলে জীবাত্মা পূর্ণ বিকশিত হয়। মূলাধার চক্রের গাঁট যাদের খোলে, তারা ঈশ্বরের টানে ছটফট করতে শুরু করে। গিয়ে ঠেকে প্রথমে স্বাধিষ্ঠান, পরে মণিপুর-চক্রে। এই অবধিই যা কিছু বিত্তবাসনার টান। প্রথমের এই তিন চক্র ছাড়ানোই ভীষণ কষ্টের। ব্যাপারটা আরও ভাল বুঝিয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। বলেছেন ‘‘যখন সংসারে মন থাকে, তখন, লিঙ্গ, গুহ্য ও নাভি মনের বাসস্থান, মনের চতুর্থ ভূমি হৃদয়, তখন প্রথম চৈতন্য হয়েছে। তখন আর নীচের দিকে মন যায় না। মনের পঞ্চম ভূমি কণ্ঠ। মন যার কণ্ঠে উঠেছে, তার ঈশ্বরীয় কথা বই অন্য কোনও কথা শুনতে বা বলতে ভাল লাগে না। মনের ষষ্ঠ ভূমি কপাল। সেখানে অহর্নিশি ঈশ্বরীয় রূপ দর্শন হয়। শিরোদেশে সপ্তম ভূমি। সেখানে মন গেলে ব্রহ্মের প্রত্যক্ষ দর্শন মেলে।’’ এটাই তন্ত্র-সাধনা। এ বিদ্যা পুরোপুরি গুরুমুখী। গুরু সহায় না হলে প্রতি পদে পা হড়কানোর ভয়।

----- তন্ত্র সাধনা মূল শক্তি দেয়, বাইরের নয়, ভিতরের। শক্তি চালনার ক্ষমতা পেলে নিজেকে সামলানো বড়ই কঠিন। তা ছাড়া, প্রতি পদে থাকে প্রলোভন। অর্থ, ক্ষমতা সব শক্তিই দেন কালী। অনেক সাধক তখন চার হাত-পায় ভোগে লেগে যায়, প্রবৃত্তি তার ঘাড়ে চেপে বসে। ফলও হয় মারাত্মক। যেখানে সেখানে শক্তি প্রয়োগ করে শেষে এক দিন শক্তি বিলকুল উবে গিয়ে জীবনটাই মিছে হয়ে যায়। এমন পচা কাদায় পড়ে যে, আর ওঠার ক্ষমতা থাকে না। প্রায়শ্চিত্তের চেষ্টাও যেখানে বিফল। এ পথ খেলুড়ে বা হঠকারীদের জন্য নয়। -- লাল-কালো শালু পরে, গলায় রুদ্রাক্ষ মালা দিয়ে, কপালে লাল সিঁদুরের ফোঁটা এঁকে, 'জয় জয় তারা' আওয়াজ করে তারাপীঠে বসত করে সিদ্ধিলাভ হয় না, মনই হ'ল একমাত্র তীর্থ। মনঃসংযম হ'ল তান্ত্রিকের সর্বপ্রধান অস্ত্র।

(c) Prithwish Ghosh
0 comments

যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও দ্বারকা নগরী

ম্লেচ্ছ-বিধর্মী ও স্বধর্মীয় কিছু অতি-পণ্ডিত মানুষ সনাতন হিন্দু ধর্মের দেবদেবী নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। সেইসব মানুষেরা ভগবান শ্রী কৃষ্ণ কে যথেষ্ট খারাপ ভাবে সমালোচনা করে। তাদের উদ্দেশ্যে এই পোস্ট।

যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও দ্বারকা নগরী

=================================

দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। পাশবিক শক্তি যখন সত্য সুন্দর ও পবিত্রতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন সেই অসুন্দরকে দমন করে মানবজাতিকে রক্ষা এবং শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠার জন্য যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবত গীতার বর্ণনায় শ্রীকৃষ্ণ দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে বিশৃঙ্খল ও অবক্ষয়িত মূল্যবোধের পৃথিবীতে মানবপ্রেমের অমিত বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলনই সে বাণীর মূল বিষয়। তাই তিনি ভক্তদের কাছে প্রেমাবতার।

দ্বাপর যুগের অস্তিত্ব এবং বর্তমান

==========================


দ্বাপর যুগের অস্তিত্ব এবং বিভিন্ন নিদর্শন বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকার রাজা ছিলেন। বর্তমান ভারতের গুজরাট প্রদেশে জামনগর জেলার গোমতি নদীর তীরে দ্বারকা নগরী অবস্থিত এবং এখানে প্রায় ৮০০ বছর আগে নির্মিত ৫৭ মিটার উঁচু কৃষ্ণ মন্দির আছে। এটাই সমস্ত সন্যাসীদের কাছে দ্বারকা বলে স্বীকৃত। অন্যদিকে মহাভারতে বলা হয়েছে যে শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃৃক প্রতিষ্ঠিত দ্বারকা সাগরে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই মহাকাব্যের পরিশিষ্ট অংশ হরিবংশে বলা হয়েছে-এই সমৃদ্ধ নগরী ভারতের পশ্চিম উপকূলে যেখানে গোমতী এসে সাগরে মিলেছে সেখানে অবস্থিত।

গোয়ায় অবস্থিত ন্যাশানাল ইন্সটিটিউট অব ওসেনোগ্রাফি এর মেরিন আরকিওলজি সেন্টারের প্রজেক্ট ডাইরেক্টর ড. এস আর রাও বলেছেন- জলনিমগ্ন দ্বারকা নগরী খুঁজে পাওয়া গেছে। এই প্রবন্ধে তিনি সমুদ্রে ডুবে যাওয়া জাহাজ আবিষ্কারের সময় খুঁজে পাওয়া জলের নিচে অবস্থিত হিন্দু মন্দিরসহ একটা নগরী আবিষ্কারের এক অত্যাশ্চর্য বর্ণনা দেন। রূপকথার গল্প থেকে তিনি তুলে আনেন দ্বারকা কে মানুষের চোখের সামনে। এই স্থানেই পাওয়া গেছে ২১০ টি জাহাজের ভগ্নাবশেষ যা প্রমাণ করে এখানে এক সময় অবস্থিত ছিল এক বিশাল সমুদ্র বন্দর যা আবার মানুষের চোখের সামনে ঊঠে আসছে। ভারতীয় সমুদ্র উপকূলে অনেক প্রাচীন বন্দর ডুবে গেছে তার মাঝে দ্বারকা অন্যতম। যদিও পুরানো দ্বারকার উপরই নতুন দ্বারকা অবস্থিত তবুও এর প্রকৃত পরিচয় ১৯৭৯-৮০ সালের আগে পাওয়া যায়নি।

এ সময় দ্বারকাধীশ মন্দিরের সামনের মাটি খুড়ে খ্রিষ্টপূর্ব ১৪ শতকের তিনটি মন্দিরের ধবংসাবশেষ পাওয়া যায় এবং ডুবন্ত নগরীটির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করা হয়। এর মাঝে খ্রীষ্টপূর্ব নবম শতকে নির্মিত বিষ্ণু মন্দির সবচেয়ে পুরোনো। এখানে বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও দেবাদিদেবের মূর্তি আছে। প্রথমদিকে মাটির স্থরে একটা লাল মাটির বস্তু পাওয়া গেছে। এটি প্রভাসক্ষেত্রের এবং বয়স ১৫শ খ্রিষ্টপূর্বের (কার্বন ১৪ প্রণালীতে বয়স পাওয়া গেছে)। প্রভাস হচ্ছে আরেকটি মহাভারতীয় তীর্থ যেটি সৌরাষ্ট্রের দক্ষিণে অবস্থিত। আরকিওলজিষ্ট হিসে বোরালা বলেছেন, মহাভারতের যুদ্ধ খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ শতকে হবার প্রমাণও পাওয়া গেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ শতকে সমুদ্রের তীরে বসতি ছিল বলে প্রমাণ পাওয়ার পর ডুবন্ত দ্বারকার খোঁজার সম্ভাবনা অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা কচ্ছ উপকূলে মাটি পরীক্ষা করে জানিয়েছেন ১০০০০ বছর আগে এই কচ্ছ উপসাগরীয় অঞ্চল ৬০ মিটার নিচু ছিল। হরিবংশে (বিষ্ণু পর্ব- ৫৭-১০৩) একে সমুদ্রের ভেতরে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান দ্বারকার ৩২ কিমি দুরে খুঁজতে শুরু করেন। এই দ্বারকাতেই পাওয়া গেছে হরপ্পা যুগের পুতির মালা, হাড়ি-পাতিল এবং পলা আকৃতির বিরাট দালানের খন্ডাংশ। এগুলো অনেক প্রাচীন বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। এছাড়া শামুক, ঝিনুক এর তৈরি দেয়াল, সিন্ধু সভ্যতার শঙ্খের সীলমোহরসহ আরো অনেক আরটিফেক্ট এ ভর্তি এই স্থান।

পানির ৬.৪১ মিটার নিচে একটি দুর্গ পাওয়া গেছে, যেটা চুনাপাথরের অর্ধ বৃত্তাকার ব্লক দিয়ে তৈরী। এটি সমুদ্র নারায়ণ মন্দির থেকে ৬০০ মিটার সমুদ্র গভীরে অবস্থিত। এখানে তিন ছিদ্র বিশিষ্ট ত্রিফলা নোঙর উদ্ধার করা হয়েছে- যা ক্ষয় রোধক দেয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হত সাথে সাথে শত্রুর আক্রমণ থেকেও বাঁচাত।

ডুবে যাওয়ার কারণ

===================

বিজ্ঞানীরা অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে- ১০০০০ বছর আগে সমুদ্র পৃষ্ঠ বর্তমান থেকে ৬০ মিটার নিচু ছিল। অতএব ৩৫০০ বছর আগে সমুদ্র ৯ মিটার নিচু ছিল। দ্বারকা ডুবে যাওয়ার কারণ সমুদ্র পৃষ্টের ঊচ্চতা বৃদ্ধি। এভাবে সমুদ্র উপকূল ধ্বংস হতে খুব একটা দেখা যায়না- শুধু মাত্র কার এস সিটি বাহরাইনের এক বন্দর এই সময় এই ডুবে যায়। দুই স্থানের বয়সকাল প্রায় একই বলে নির্ধারন করেছেন বিজ্ঞানীরা। দ্বারকায় যে তৈজসপত্র পাওয়া গেছে তা থেকে বিজ্ঞানীরা ধারনা করেন যে এস্থানে অনেক পুরোনো এক সভ্যতা ছিল যা মহাভারতে বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরীর সাথে মিলে যায়।

মহাভারতে আছে- শ্রীকৃষ্ণের বয়স যখন ১২৫ তখন যদু বংশ ধ্বংস হয় সামান্য এক কারণে। এটা দেখে শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম বনবাসী হবার সংকল্প করেন এবং অর্জুনকে সংবাদ পাঠান। বনে শ্রীকৃষ্ণ বসে থাকা অবস্থায় জরা নামে এক ব্যাধ হরিণ মনে করে কৃষ্ণ কে বান মারেন। শ্রীকৃষ্ণ সেখানেই দেহত্যাগ করেন। অর্জুন এই সংবাদ পেয়ে দ্বারকায় এসে শ্রীকৃষ্ণের দেহ সৎকার করেন। এর পর পরই দ্বারকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়। যে নগরী শ্রীকৃষ্ণ নিজের হাতে শাসন করেছিলেন সে নগরী শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর পর পরই সমুদ্রের মাঝে বিলীন হয়।

Courtesy by: Prithish Gosh
0 comments

গুরু নানক

কিছু মহামানবের জ্ঞানতাত্ত্বিক অবদানের কারণেই আজকের এই সমৃদ্ধ মানবজীবন। এই মহামানবেরা আজন্মকাল তাদের চিন্তা ও চেতনা দিয়ে আমাদের জীবন ও জগৎ পরিপূর্ণ করার চেষ্টা করে গেছেন। ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান সব শাখাই সমৃদ্ধ হয়েছে এই মহামানবদের হাতে। যাদের মমতার স্পর্শে মানুষে মানুষে রচিত হয়েছে বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন। তাদেরই একজন হচ্ছেন শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক।

ভারতে তখন সুলতানী আমল। পশ্চিম পাঞ্জাবের তালওয়ান্দি (বর্তমান নাম নানকানা সাহেব) গ্রামে থাকতেন মেহেতা কল্যাণ বাই নামে এক সামন্য চাষী। সামান্য কিছু জমিজমা ছিল তার। গাঁয়ের লোক তাকে ডাকত মেহেতা কালু বলে। তার স্থীর নাম ছিল ত্রিপতা। এই ত্রিপতার গর্ভেই ১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহন করেছিলন গুরু নানক। ছেলেবেলা থেকেই তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল পিতামাতার। একমাত্র সন্তান। তবু তার সবকিছুই যেন কেমন অদ্ভুত। আত্মভোলার মতো ঘুরে বেড়ান, সাধু-সন্ন্যাসীদের দেখলেই তাদের কাছে ছুটে যান। নির্জনে বসে থাকেন।

বাবা-মা ভেবেছিল লেখাপড়া করলেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। ৬ বছর বয়সে তাই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো গ্রামের পাঠশালায়। সেখানে মাতৃভাষা ছাড়াও শিখেছিলেন ফার্সি ভাষা। তিনবছর পর সংস্কৃত শিক্ষার জন্য তাকে পাঠানো হলো ব্রিজনাথ শর্মা নামে এক পন্ডিতের কাছে। কিন্ত নানকের পাঠ্যবিষয় বাদ দিয়ে ঈশ্বর, ধর্ম আধ্যাত্নিক বিষয়েই ছিল গভীর আগ্রহ। গতানুগতিক পড়াশুনাতে তার কোনো আগ্রহ নেই দেখে বাবা ঠিক করলেন নানককে বাড়ির গরু –ছাগল চরাবার ভার দেবেন।

একদিন নানক ঘুমিয়ে পড়লে তার গরুর পাল ঘুরতে ঘুরতে একজনের ক্ষেতে ঢুকে পড়ল। ক্ষেতের মালিক নালিশ জানালো জমিদারের কাছে। ডাক পড়লো নানকের। নানক জমিদারের কাছে গিয়ে বললেন, আমার গরু কোনো জমির ফসল নষ্ট করেনি। নানকের কথা শুনে জমিদারের লোকজন মাঠে গিয়ে দেখে জমির ফসল যেমন ছিল তেমনই আছে। ক্ষেতের মালিকতো বিস্ময়ে হতবাক।

নানককে এবার ভর্তি করা হলো ফার্সি ভাষার এক মৌলবীর স্কুলে। কিন্তু পড়ায় কোন মন নেই তার। বই-শ্লেট তুলে রেখে নানক মৌলবীকে জিজ্ঞাসা করে ঈশ্বরের কথা, ধর্মের কথা, এই জগৎ সৃষ্টির কথা। অধিকাংশ প্রশ্নেরই কোনো জবাব দিতে পারেন না মৌলবী। ছেলেকে বিষয়মুখী করতে না পেরে মহাভাবনায় পড়ে গেলেন বাবা। নানকের বোনের স্বামী জয়রাম ছিলেন সুলতান দৌলত খাঁ লোদীর দেওয়ান। অবশেষে তার সুপারিশে সুলতানের গুদাম ঘরের দেখাশুনার চাকরি পেলেন নানক। যখন কোনো দুঃখী মানুষ আসত তিনি গুদাম থেকে খাবার দান করতেন। নিজে যা মাইনে পেতেন তার অর্ধেকই গরিব-দুঃখী মানুষের পেছনে খরচ করতেন। কিন্তু নানকের এই সেবার কাজকে ভালোভাবে দেখত না কিছু মানুষ। তারা সুলতানের কাছে গিয়ে অভিযোগ জানাল, নানক গুদামের মাল বিলেয়ে দিচ্ছে। সুলতান কয়েকজন কর্মচারীর উপর তদন্তের ভার দিলেন। সবকিছু পরীক্ষা করে দেখা গেল গুদামের সব মাল হিসেব মতোই আছে।

এদিকে নানক কাজকর্মে মন দিয়েছে জেনে তার বাবা নানকের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। মেয়ের নাম সুলখানি। এই সুলখানির গর্ভে নানকের দুটি সন্তান জন্ম হয়-শ্রীচাঁদ ও লক্ষ্ণীদাস। একদিন খুব সকালে নানক নদীতে গেলেন গোসল করতে। গোসল শেষ করতেই তার অন্তরে এক অদ্ভুত অনুভূতি জেগে উঠল। নিজের অজান্তেই ছুটে গেলেন কিছুদূর একটি পাহাড়ের দিকে। সেখানে পাহাড়ের গুহায় বসে ধ্যানে মগ্ন হয়ে গেলেন। ভুলে গেলেন ঘর-বাড়ি, সংসার ও স্ত্রী-পুত্র। তিনদিন তিনরাত্রি কেটে গেল। অবশেষে তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব উপলব্ধি করলেন নিজ অন্তরে।

প্রায় কুড়ি বছর ধরে নানক দেশে দেশে তার ধর্মপ্রচার করেছিলেন। পাঁয়ে হেটে, বনজঙ্গল, নদী-নালা, কত মরুভূমির রুক্ষ প্রান্তর, পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে তাকে চলতে হতো। যেখানেই তিনি যেতেন, ফুলের সৌরভের মতো মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হতো। তিনি তাদের বলতেন, ঈশ্বর এক অদ্বিতীয়। তিনি সকলকে বলতেন, সত্য পথে চল, সৎ জীবন যাপন কর, ঈশ্বরের নামকর। তিনি বলতেন, ঈশ্বর মানুষের ধর্ম দেখেন না। তার জাতি দেখেন না, ধনী –দরিদ্র দেখেন না, তার চোখে সকলেই সমান। তিনি শুধু বিচার করেন মানুষের কর্ম। যে মানুষ যেমন কাজ করবে সে তেমনি ফল ভোগ করবে। ধর্মের নামে কুসংস্কার, গোঁড়ামী, বাহ্যিক আচার-আচরণকে তিনি কঠোর ভাষায় নিন্দা করতেন।

একবার নানক স্থির করলেন, মুসলমানদের দুই পবিত্র তীর্থস্থান মক্কা আর মদিনায় যাবেন। নানকের সঙ্গী হন পীর সৈয়দ আহমেদ হাসান ও পীর জালালউদ্দীন। এরা মুসলামান হলেও নানকের আধ্যাত্বিক শক্তি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। নানকের পরনে মুসলমান দরবেশের পোষাক। মক্কা-মদিনা হয়ে নানক যান প্যালেষ্টাইন। বহু দিন নিজের স্বদেশভূমি ত্যাগ করে এসেছেন এবার ফেরার পথ ধরলেন নানক। পথ চলতে চলতে নানক নির্জন প্রান্তরে এসে পৌঁছলেন। দীর্ঘ পথশ্রমে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। এক শিষ্যকে বললেন, দেখতো কাছাকাছি কোথাও জল আছে কিনা। শিষ্য গিয়ে দেখে কাছের গ্রামে একটা পুকুর রয়েছে। কিন্তু পুকুরে এক ফোটা জল নেই। শিষ্য ফিরে এসে সব কথা বলতেই নানক বললেন, গুরুর নাম করে সেখানে আবার যাও জল পাবে। এবার পুকুরে যেতেই শিষ্য বিস্ময়ে হতবাক, সমস্ত পুকুর জল আর জল, কি অপূর্ব সে জলর স্বাদ। ঠিক যেন অমৃত। লোকে তার নাম দিল অমৃত সায়র। আর তার থেকেই অমৃতসর কথাটির উৎপত্তি। ১৮০২ সালে মহারাজ রঞ্জিত সিং ওই পুকুর সংস্কার করে স্বর্ণমন্দির স্থাপন করেন। এই স্বর্ণমন্দির শিখদের এক পবিত্র তীর্থ।

১৫৩৯ সালের কথা- নানক বুঝতে পেরেছিলেন তার জীবনের কাল শেষ হয়ে এসেছে। তিনি সে কথা বলতেই দলে দলে তার শিষ্যরা এসে উপস্থিত হলো। এদের মধ্যে যেমন ছিল হিন্দু তেমনি ছিল মুসলমান। নানক বুঝতে পেরেছিলেন তার দেহ সৎকার করা নিয়া হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিবাদ দেখা দেবে। তাই দুই দলের শিষ্যদের ডেকে বললেন, তোমরা ফুল নিয়ে এসে আমার দুপাশে রাখ। যাদের ফুল সতেজ থাকবে তারাই আমার দেহের সৎকারের অধিকারী হবে। এবার তোমরা প্রার্থনা শুরু কর।

সমস্ত রাত ধরে চলল প্রার্থনা, ভজন, নামগান। ভোরবেলায় দরজা খুলতেই সকলে দেখল নানকের দেহ নেই। সেখানে রয়েছে রাশিরাশি তাজাফুল। সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। এইভাবে মৃত্যুর মধ্যেও মানুষের মিলন ঘটিয়ে গেলেন গুরু নানক।

Courtesy by: Prithwish Ghosh
0 comments

মনসা নামের উৎপত্তি

‘মনস’ শব্দের স্ত্রী লিঙ্গে ‘আপ’ প্রত্যয় করে মনসা শব্দের ব্যুৎপত্তি। সুতরাং এই দিক থেকে মনসা মনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। দেবী ভাগবত ও ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ পুরান বলেন – সর্প ভয় থেকে মনুষ্যদের উদ্ধারের জন্য পরম পিতা ব্রহ্মা কশ্যপ মুনিকে বিশেষ মন্ত্র বিশেষ বা বিদ্যা আবিস্কারের কথা বলেন। হয়তো এখানে বিষের ঔষধ আবিস্কারের কথা সেই সাথেও বলা হয়। কশ্যপ মুনি এই বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করছিলেন। তখন তাঁর মন থেকে এক দেবীর সৃষ্টি হয়। তিনটি কারনে দেবীর নাম হয় মনসা।

'সা চ কন্যা ভগবতী কশ্যপস্য চ মানসী ।
তেনৈব মনসা দেবী মনসা বা চ দীব্যতি ।।
মনসা ধ্যায়তে যা চ পরমাত্মানমীশ্বর ম্ ।
তেন যা মনসা দেবী তেন যোগেন দীব্যতি ।।
আত্মারামা চ সা দেবী বৈষ্ণবী সিদ্ধযোগিনী ।' ---- ( দেবীভাগবত পুরাণ )

প্রথমতঃ মনসা কশ্যপ মুনির মানস কন্যা, কেননা চিন্তা ভাবনার সময় মুনির মন থেকে উৎপন্না। দ্বিতীয় মানুষের মন তদীয় ক্রীড়া ক্ষেত্র, তৃতীয়তঃ নিজেও মনে মনে পরমাত্মার ধ্যান করেন বলে দেবীর নাম মনসা। মন মানুষের শত্রু আবার মন মানুষের মিত্র হতে পারে। “মন এব মনুষ্যানাং কারণং বন্ধমোক্ষয়োঃ।” মন যদি শুদ্ধ, একাগ্র চিত্ত, নিজ বশীভূত, ভগবৎপরায়ণ হয় - ত সেই মন মোক্ষের কারন। তাই এই মনকে ‘মিত্র’ বলা যাবে। কিন্তু মন যদি অশুদ্ধ, চঞ্চল, ইন্দ্রিয় পরায়ণ, ভগবৎ বিমুখ হয়- ত সেই মন নরক গমনের হেতু। এই মন হল শত্রু মন। কশ্যপ মুনি মানব কল্যাণের জন্য ঔষধ আবিস্কারের কথা ভেবেছিলেন - তাই তাঁর মন থেকে দেবীর সৃষ্টি হল। তাই শাস্ত্রের এই শিক্ষা যে, আমাদের সর্বদা কল্যাণকর, হিতকর, ভগবানের কথা-

ইত্যাদি মনে ভাবনা চিন্তা করতে হবে।

মনসা আদিবাসী দেবতা। পূর্বে শুধু নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যে তাঁর পূজা প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুসমাজেও মনসা পূজা প্রচলন লাভ করে। মনসার সাথে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের আত্মীয়তা কীভাবে গড়ে উঠলো সেই কথাটা একটু বলি। বর্তমানে মনসা আর আদিবাসী দেবতা নন, বরং তিনি একজন হিন্দু দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। হিন্দু দেবী হিসেবে তাঁকে নাগ বা সর্পজাতির পিতা কশ্যপ ও মাতা কদ্রুর সন্তান রূপে কল্পনা করা হয়েছে। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ্ মনসাকে শিবের কন্যারূপে কল্পনা করে তাঁকে শৈবধর্মের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সময় থেকেই প্রজনন ও বিবাহ রীতির দেবী হিসেবেও মনসা স্বীকৃতি লাভ করেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, শিব বিষপান করলে মনসা তাঁকে রক্ষা করেন; সেই থেকে তিনি বিষহরি নামে পরিচিতা হন। তাঁর জনপ্রিয়তা দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত প্রসারিত হয়। মনসার পূজকেরা শৈবধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও অবতীর্ণ হন। 

শিবের কন্যারূপে মনসার জন্মকাহিনি এরই ফলশ্রুতি। এর পরেই হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদী মূলধারায় মনসা দেবীরূপে স্বীকৃতিলাভ করেন। শ্রী আশুতোষ ভট্রাচার্য তার মনসামঙ্গল নামক সংকলন গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন- ‘’এখন দেখিতে হয় পশ্চিম-ভারতের ‘মনসা’ নামটি কখন হইতে জাঙ্গুলী দেবীর পরিবর্তে ব্যবহৃত হইতে আরম্ভ হয়। পূর্বেই বলিয়াছি জাঙ্গুলির সঙ্গে বৌদ্ধ সমাজের সম্পর্ক ছিল, তিনি তান্ত্রিক বৌদ্ধ দেবী ছিলেন। পাল রাজত্বের অবসানে সেন রাজত্বের যখন প্রতিষ্ঠা হইল, তখন এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের বিলোপ ও তাহার স্থানে হিন্দুধর্মের পুনরাভ্যুত্থান হইয়াছিল, সেই সময়ে যে সকল বৌদ্ধ দেবদেবীকে নুতন নাম দিয়া হিন্দুসমাজের মধ্যে গ্রহণ করা হইয়াছিল, এই সর্পদেবী তাহাদের অন্যতম। বৌদ্ধ সংস্রবের জন্য তাঁহার জাঙ্গুলী নাম পরিত্যাক্ত হয় এবং তাহার পরিবর্তে মনসা নামকরণ হয়। বাংলার পূর্বোক্ত অর্বাচীন পুরাণগুলি ইহার কিছুকাল মধ্যেই রচিত হয় এবং তাহার মধ্য দিয়া মনসাকে শিবের কন্যারুপে দাবী করিয়া হিন্দু-সমাজের মধ্যে গ্রহণ করা হয়।’’

-

মনসা দেবী বা সর্প দেবী হিসাবে পুজা বোধ হয় বৌদ্ধ ধর্ম থেকে এসেছে বৌদ্ধ গ্রন্থেই সর্প দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায় । ‘বিনয়বস্তু’ ও ‘সাধনমালা’ নামক বৌদ্ধ গ্রন্থে সর্পের দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে সর্পের দেবীর বর্ণনা আছে। ‘সাধনমালা’ গ্রন্থে সর্প দেবীকে ‘জাঙ্গুলি’ বা ‘জাঙ্গুলিতারা’ বলে উল্লেখ করা আছে। প্রাচীন যুগে সাপের ওঝাকে বলা হতো জাঙ্গুলিক (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস --- ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)। দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড় জাতির অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন ‘মঞ্চাম্মা’ বা ‘মনোমাঞ্চী’। পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রীর মতে মঞ্চামা নাম থেকেই ‘মনসা’ নামের উৎপত্তি। আবার ডাঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য বৌদ্ধ সর্প দেবী জাঙ্গুলিকেই ‘মনসা’ বলে মানেন।

 তাঁর মতে -- “অত্যন্ত প্রাচীনকাল হইতেই এই পূর্ব ভারতীয় বৌদ্ধ সমাজে জাঙ্গুলীদেবীর পূজা প্রচলিত হইয়া আসিতেছে। বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনার সূত্র গ্রন্থ 'সাধনমালা'-তে এই জাঙ্গুলী দেবীর পূজার প্রকরণ ও তাহার মন্ত্রের সম্বন্ধে বিস্তৃত উল্লেখ আছে। তাহা হইতে সহজেই অনুমতি হইতে পারে যে, এই জাঙ্গুলীদেবী বর্তমানে সমাজে পূজিতা সর্প দেবী।” গবেষকদের মতে মনসা অনার্য দেবতা, পরে আর্য দের পুরানে স্থান পেয়েছেন। গবেষকরা বলেন বঙ্গদেশ ছিল জঙ্গলে ভরা। সাপের উপদ্রব ছিল বেশী। বাংলা ছিল কৃষি প্রধান। এই বিষাক্ত সাপেদের সাথেই তাঁদের বসবাস ও দ্বন্দ্ব। একটি বিষাক্ত প্রানী, যার ছোবোলেই মৃত্যু। তাই 'মনসা পূজা' বঙ্গদেশে বিশেষ প্রসার পায়। ত্রিপুরা, ওড়িশা, আসাম, দুই বঙ্গ, বিহারে এই পূজোর প্রচলন বেশী। হিমালয়ের পাদদেশে জঙ্গলে ছিল সাপেদের অবাধ বিচরণ ভূমি। মানুষের বসতি বাড়লো, সাপেদের সাথে সংঘাত বাড়লো। প্রথমে নিম্ন জাতির মধ্যে এই পূজোর প্রসার থাকলে কালক্রমে ব্রাহ্মণ্য দেবী হয়ে ওঠেন মা মনসা।

Courtesy by: Prithwish Ghosh
0 comments

শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমে অন্যতম প্রধান শাক্তপীঠ তারাপীঠ।

বীরভূমের প্রধানতম তীর্থ তারাপীঠ আজ আন্তর্জাতিক কৌতূহলের কেন্দ্রভূমি। শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমে অন্যতম প্রধান শাক্তপীঠ তারাপীঠ। ঠিক কবে এই পীঠস্থান আবিস্কৃত হয়, তা যেমন সঠিক জানা যায় না তেমনই সুস্পষ্ট নয় তারাদেবী সংক্রান্ত খুঁটিনাটি। অতিপ্রাচীন দেবী-শিলা মা উগ্রতারা, বশিষ্ঠদেবের পরম্পরা, সর্বোপরি দিব্যপুরুষ বামাচরণ চট্টোপাধ্যায় বা বামাক্ষ্যাপাকে ঘিরে চলিত রয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি। রহস্যের পরে রহস্য আবৃত রেখেছে এই শক্তিপীঠকে।

দেখা যাক রহস্যাবৃত তারাপীঠের কয়েকটি জরুরি তথ্যকে।

১. তারাপীঠ ৫১ পীঠের অন্তর্বর্তী নয়। ‘মহাপীঠপুরাণ’-এ উল্লিখিত পীঠস্থান-তলিকায় তারাপীঠের উল্লেখ নেই। জনচিত্তে অবশ্য একথা অনেকদিন ধরেই প্রচলিত রয়েছে যে, সতীর তৃতীয় নয়ন এখানে পড়েছিল। কিন্তু পুরাণাদি গ্রন্থে এর কোনও সমর্থন পাওয়া যায় না।

২. কিন্তু এই ‘তৃতীয় নয়ন’-এর কাহিনিকে প্রতীকী ধরে বিচার করলে একথা বোঝাই যায়, তারাপীঠ এক মহাশক্তির কেন্দ্র। পরবর্তী কালে গণবিশ্বাস এবং পুরাণ একত্র হয়ে তারাপীঠ-মহিমাকে অন্য মাত্রা প্রদান করেছে।

৩. তারাপীঠ আসলে একটি ‘সিদ্ধপীঠ’। সুদূর অতীত থেকে এখানে বহু সাধক এসেছেন তপস্যা করার জন্য। এবং তাঁদের সিদ্ধিলাভেই ধন্য হয়েছে এই পীঠ। সুতরাং এই পীঠের মহিমা অন্য শক্তিপীঠগুলির চাইতে একাবেরেই আলাদা।

৪. দেবী তারা-র উল্লেখ মূলত রয়েছে বজ্রযানী বৌদ্ধ ধর্মে। আবার দশমহাবিদ্যা স্তোত্রেও তিনি উপস্থিত। ‘তারারহস্য’ ও অন্যান্য তন্ত্রগ্রন্থ পাঠে বোঝা যায়, তারা কাল্ট অতি প্রাচীন। বজ্রযান গড়ে উঠেছিল মহাযানবাদ এবং লোকধর্মের মিশ্রণে। সেখানে দেবী তারার অবস্থিতি বেশ গুরত্বপূর্ণ স্থানে। দশমহাবিদ্যা স্তোত্র অবশ্য অনেক পরের রচনা। সেখানে তারার উল্লেখ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

৫. তারাপীঠ মন্দিরের স্থাপত্য খুই সাধারণ। কিন্তু এই মন্দির-স্থাপত্যে বাংলার নিজস্ব স্থাপত্য ভাবনার ছাপ রয়েছে। চালা ডিজাইনের মন্দির বাংলার ঐতিহ্যকেই ব্যক্ত করে।

৬. মায়ের শিলারূপ ঢাকা থাকে একটি আচ্ছাদনে। সেই আচ্ছাদনকেই মাতৃরূপের প্রতীক ধরা হয়। এই মূর্তিই তারামূর্তি হিসেবে ঘরে ঘরে পূজিতা।

৭. তারাপীঠ মহাঋষি বশিষ্ঠের সাধনপিঠ হিসেব প্রসিদ্ধ। ঐতিহাসিকভাবে এই বশিষ্ঠ ঠিক কে, তা নিয়ে ধন্দ রয়েছে। তিনি কি মাহাকাব্য-পুরাণে উল্লিখিত বশিষ্ঠ? সম্ভবত বশিষ্ঠ একটি সাধক-পরম্পরা। এই পরম্পরারই কোনও মহাত্মা এখানে সিদ্ধিলাভ করেন। তারাপূজার অন্তর্গত গুরুপংতি পূজায় বশিষ্ঠানন্দনাথের পূজা করতে হয়, আমার ধারণা ইনি কোনও নাথযোগী-তারাসাধক ও ইনিই সেই বশিষ্ঠ, শ্রী রামচন্নের গুরু বশিষ্ঠ না।

৮. তারপীঠের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বামাচরণ চট্টোপাধ্যায় তথা বামাক্ষ্যাপা। তন্ত্রধর্মে তাঁর স্থান প্রশ্নাতীত উচ্চতায় স্থিত। তাঁকে ঘিরে যেমন আবর্তিত হয়েছে বাংলার তন্ত্রচর্চার একটি বড় অধ্যায়, তামনই তিনি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছেন অসংখ্য কিংবদন্তির।

৯. তারাপীঠ মহাশ্মশান আজও বহু তান্ত্রিকের বিচরণক্ষেত্র। তন্ত্রে উল্লিখিত শ্মাশানক্রিয়া সমাধা করতে সারা দেশ থেকে শাক্ত সাধকরা এখানে আসেন।

১০. তারাপীঠ দ্বারকা নদের তীরে অবস্থিত। দ্বারকা উত্তরবাহিনী জলধারা। উত্তরবাহিনী জলস্রোত কুলকুণ্ডলিনীর ঊর্ধ্বগতির প্রতীক। এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বিপুল।

১১. বাবা বামদেব ও মা তারার দর্শন অনেক মানুষ এখনও পেয়ে থাকেন।

১২. 'আধুনিকতার স্পর্শে তারাপীঠ সম্পূর্ণ বদলে গেছে ও তার মহিমা-মাহাত্ম্য ক্ষুণ্ণ হয়েছে' - বলে যারা উদ্বিগ্ন হ'ন, তারা মুর্খের স্বর্গে বাস করছেন।

১৩. তারাপীঠের অদুরেই 'মলুটী'-তে মা তারার আর একটি সাধনক্ষেত্র বাম বাবার লীলাক্ষেত্রও বটে।

১৪. তারামায়ের ভৈরব মল্লারপুরের মল্লেশ্বর শিব বলে অনেকে বলে থান। কারণ হিসাবে তারা বলেন - কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন মায়ের মুর্তি মন্দির থেকে বার করে তাই মল্লারপুরের মল্লেশ্বর শিব মন্দিরের দিকে মুখ করিয়ে বসানো হয়।

১৫. তারাপীঠ এক অদ্ভুত 'শক্তিকেন্দ্র' তাই মন্দিরের সংলগ্ন ও আশেপাশের গ্রামের পরিবারগুলিতে আদ্যশ্রাদ্ধের দিনেই মৎস্যমুখ হয় বা মাছ-ভাত খাওয়া হয়।

Written by: Prithwish Ghosh
0 comments

"যজ্ঞো বৈ শ্রেষ্ঠতম কর্মম্”--- যজ্ঞই শ্রেষ্ঠ কর্ম

★(এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলে আপনার একাধিক বন্ধুকে দয়া করে শেয়ার করুন)★

ব্রহ্মবিদরা বলে থাকেন দুটি বিদ্যা আয়ত্ত করতে হবে, 'পরা' এবং 'অপরা'। অপরা হল ঋগবেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ, শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ। আর পরা বিদ্যা হল তাই যার দ্বারা ব্রহ্মকে অধিকার করা যায়। ব্রহ্মবিদরা বলে থাকেন দুটি বিদ্যা আয়ত্ত করতে হবে, পরা এবং অপরা। অপরা হল ঋগবেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ, শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ। আর পরা বিদ্যা হল তাই যার দ্বারা ব্রহ্মকে অধিকার করা যায়।

বৈদিক সাহিত্যকে দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগে আছে ব্রহ্মবিদ্যা অর্থাৎ বিশ্বের মধ্যে যে অবিনাশী সত্তা প্রচ্ছন্নভাবে ক্রিয়াশীল তার সন্বন্ধে জ্ঞান সঞ্চয় করা। এই জ্ঞান লিপিবদ্ধ হয়েছিল বেদেরই অঙ্গীভূত এবং আশ্রিত এক শ্রেণীর রচনায়। তাদের আমরা উপনিষদ বলি। উপনিষদ অর্থে বুঝি বেদের প্রান্তে যা অবস্থিত। বেদান্ত অর্থেও তাই বুঝি। পরবর্তীকালের শঙ্করাচার্য প্রবর্তিত বেদান্তদর্শন এই উপনিষদ বা বেদান্তের রচনাকেই অবলম্বন করে রচিত হয়েছিল।

দ্বিতীয় ভাগে পড়ে আর সব কিছু। তাদের মধ্যে প্রথম আছে বেদের চারটি সংহিতা – ঋক্, সাম, যজু এবং অথর্ব। তারপর যেগুলি আছে সেগুলি সংখ্যায় ছ’টি এবং তাদের সাধারণ নাম বেদাঙ্গ। তারা হল শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ। তাদের কেন বেদাঙ্গ বলা হয় তা বুঝতে গেলে কিছু প্রাথমিক কথা বলার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

সনাতন বৈদিক ধর্মের প্রধান উৎস হল বিশ্বের মূল শক্তিকে শ্রদ্ধা, ভক্তি বা অর্ঘ্য নিবেদনের আকুতি। এই আকুতির প্রেরণা নানা রকম হতে পারে। বেদ অতি প্রাচীনকালে রচিত হয়েছে। সে যুগে মানুষ ভক্তের স্তরে উঠতে শেখেনি। সে যুগে দেবতার উপাসনার প্রেরণা ছিল ব্যবহারিক প্রয়োজন। বেদের যুগে উপাসনা রীতির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। ঠিক বলতে কি তা অনন্য-সাধারণ। এ ধরনের রীতি অন্য কোনও দেশে দেখা যায়নি। অবশ্য পারসিক সম্প্রদায় অগ্নির উপাসনা করত। তবে বৈদিক যজ্ঞরীতি ভিন্ন ধরনের।

প্রকৃতির বুকে সেকালের ঋষিগণ শক্তির বা সৌন্দর্যের উৎস আবিষ্কার করেছেন যেখানে, তার ওপরেই দেবত্ব আরোপ করে তার জন্য স্তোত্র রচনা করেছেন। এই স্তোত্রের নাম হল 'সূক্ত'। এইভাবে 'অগ্নি' দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি শুধু দেবতা নন 'পুরোহিত'-ও বটেন; ফলস্বরূপ অগ্নিতেই অন্য দেবতার উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হত। সূক্ত নিয়ে গঠিত বেদের এই মূল অংশকে বলা হয় সংহিতা। এখন শ্রদ্ধা নিবেদন বা প্রার্থনা জ্ঞাপন শুধু স্তোত্র পাঠেই হয় না। তার সঙ্গে কিছু আনুষঙ্গিক ক্রিয়া থাকে। বৈদিক যুগে সেই আনুষ্ঠানিক অংশ প্রধানতঃ রূপ নিত যজ্ঞানুষ্ঠানের। এই যজ্ঞের উপকরণ খুব সরল ছিল। একটি বেদী নির্মিত হত। তার উপর কাঠ দিয়ে আগুন জালানো হত। সেই সঙ্গে বৈদিক মন্ত্র পাঠ হত বা সুর সংযোগে গাওয়া হত। তার সঙ্গে ঘৃতের আহুতি দেওয়া হত। সোম নামে এক লতা সেকালে জন্মাত। তার রসও আহুতি হিসাবে দেবতাদের উদ্দেশ্য নিক্ষিপ্ত হত।

এখন বিভিন্ন ধরনের যজ্ঞ আছে। কোনোটিকে বলা হয় অগ্নিষ্টোম, কোনওটিকে জ্যোতিষ্টোম, কোনটিকে বিশ্বজিৎ। আবার কতদিন ধরে একটি যজ্ঞ স্থায়ী হত তার ভিত্তিতে বিভিন্ন নামকরণ হত। যেমন যে যজ্ঞ বারো দিনের বেশী স্থায়ী হত তাকে বলা হত 'সত্র'। এইসব বিষয় বিধি-নিষেধ নির্দেশ করবার জন্য ‘ব্রাহ্মণ’ শাস্ত্রের উৎপত্তি হয়। এই ব্রাহ্মণগুলিতে বিভিন্ন যজ্ঞ কি করে নিষ্পাদিত করতে হয় তার সবিস্তার বিবরণ আছে। যেমন ঋগ্বেদের অন্তর্ভূক্ত ঐতরেয় ব্রাহ্মণে রাজসূয় যজ্ঞের বিবরণ আছে। ব্রাহ্মণগুলি সংস্কৃত ভাষায় রচিত।

জৈমিণি বলেছেন মন্ত্রাতিরিক্ত বেদভাগের নামই ব্রাহ্মণ। (মীমাংসা সূত্র, ২।১।৩৩)। আরণ্যক ও উপনিষদ ব্রাহ্মণের অঙ্গ হলেও তাদের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য আছে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মন্ত্র, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ এই সমগ্র বৈদিক সাহিত্যকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। একটি কর্মকান্ড ও অপরটি জ্ঞানকান্ড।কর্মকান্ডে যজ্ঞ সম্পর্কিত বিষয়গুলি আছে। সুতরাং তার অন্তর্ভূক্ত হবে বেদের সংহিতা বা মন্ত্র অংশ এবং ব্রাহ্মণ অংশ; কারণ তাতে যজ্ঞের বিধি-নিষেধের আলোচনা আছে। জ্ঞানকান্ড হিসাবে উপনিষদেরই ভূমিকা প্রধান। যজ্ঞানুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন ভূমিকা থাকত।

যজ্ঞের সংজ্ঞা হিসাবে বলা হয়েছে ‘দেবতার উদ্দেশ্যে দ্রব্য ত্যাগ যজ্ঞ।’ অর্থাৎ যজ্ঞ করতে যে সমস্ত সামগ্রীর প্রয়োজন হতো, যেমন সমিধ বা কাঠ, আহুতির জন্য ঘৃত, সোমরস প্রভৃতি সরবরাহ করতে হত। যিনি দ্রব্য ত্যাগ করেন তিনি হলেন যজমান। অর্থাৎ তাঁরই কল্যাণ কামনায় যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হতো সুতরাং তাঁকেই এই দ্রব্যগুলি সরবরাহ করতে হত।

আর যাঁরা যজ্ঞের অনুষ্ঠান করতেন তাঁদের বলা হতো ঋত্বিক। এই ঋত্বিকদের মধ্যে আবার ভূমিকা বিভিন্ন ছিল। তার ভিত্তিতে তাঁদের মধ্যে শ্রেণী বিভাগ আছে। যেমন যিনি সূক্ত পাঠ করতেন তাঁর নাম হল হোতা। যিনি এই সূক্ত গান করে পাঠ করতেন তাঁর নাম হল উদ্গাতা। আর যিনি অগ্নিতে আহুতি দিতেন তাঁর নাম হল অধ্বর্যু। সুতরাং বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানে অনেকের ভূমিকা ছিল। আগুন জ্বেলে একটি ভাবগম্ভীর সমাবেশে তা অনেকের সাহচর্যে অনুষ্ঠিত হতো।

সাধারণত যজ্ঞ বলতে আমরা বুঝি একটি কুণ্ডে আগুন জ্বালিয়ে মন্ত্র পাঠ করে বিভিন্ন প্রকার দ্রব্য আহুতি দেয়া। বৈদিক ধর্মে এমনি নিত্য আচরিত একটি যজ্ঞ হচ্ছে হবন বা অগ্নিহোত্র। অনেক বস্তুবাদীই প্রশ্ন করতে পারেন অগ্নিহোত্র কি অর্থহীন আড়ম্বর নয়? মোটেও নয়, বরং এর মাঝে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের অন্যতম বিস্ময়।

আমাদের এ জগতে শক্তির মধ্যে তাপ শক্তি ও শব্দ শক্তি অন্যতম। যজ্ঞে এই দুই শক্তিরই সম্মেলনে আমরা অর্জন করতে পারি শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক উপকারিতা। যজ্ঞে বিভিন্ন পদার্থের দহন ঐ বস্তুর অন্তর্নিহিত সঞ্চিত শক্তির উন্মোচন ও পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়ার একটি উৎকৃষ্ট প্রক্রিয়া। অন্যদিকে যজ্ঞে উচ্চারিত মন্ত্রের কম্পাঙ্ক শক্তি বহন করে এক আধ্যাত্মিক প্রেরণা।

যজ্ঞে সমিধ হিসেবে যেসব দ্রব্য ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে থাকে নানা সুগন্ধি পদার্থ, ওষধি বৃক্ষের কাঠ, পুষ্টিকর খাদ্য ইত্যাদি। আপনাদের মনে হতে পারে এসব দ্রব্য পোড়ানোর ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড, বিষাক্ত কার্বন মনো অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড প্রভৃতি উৎপন্ন হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি বৈদিক কল্প ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থের বিধি মোতাবেক সঠিক অনুপাতে জ্বালানী, দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করেন এবং যজ্ঞকুণ্ড যদি শাস্ত্রীয় রীতি অনুসারে তৈরী করেন তবে কোনো বিষাক্ত গ্যাসই উৎপন্ন হবে না।

যে কার্বন ডাই অক্সাইড যজ্ঞকুণ্ডে উৎপন্ন হবে তা যজ্ঞকুণ্ডের প্রবল উত্তাপে বাষ্পের সঙ্গে ক্রিয়া করে ফরমালডিহাইড উৎপন্ন করবে যা যজ্ঞকুণ্ডের চারপাশের পরিবেশ সুগন্ধে পূর্ণ করে তুলবে। আর এই গ্যাস কেবল সুগন্ধিই নয়, বায়ুতে থাকা বিভিন্ন কীটাণু দমনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ যজ্ঞের মাধ্যমে আপনি পাবেন দুর্গন্ধ মুক্ত স্বাস্থ্যকর এক পরিবেশ।

আর যে অল্প পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে যাবে সেটি সালোকসংশ্লেষণ ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃতিতে বিলীন হয়ে যাবে। যা একই সাথে বৃক্ষরাজির খাদ্য ও পরিবেশে মুক্ত অক্সিজেনের যোগান দেবে। তাই যজ্ঞ কেবল যজ্ঞকারীর নয়, বরং সমগ্র পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ।

অনেকে বলতে পারেন যজ্ঞে ব্যবহৃত কাঠের জন্য তো প্রচুর বৃক্ষ নিধন করতে হবে। আপনাদের জন্য বলছি বৈদিক ঋষিগণ কেবল মৃত বৃক্ষের কর্তনেরই নির্দেশ দিয়েছেন। আর সেই সাথে মনু আদি মহর্ষিরা ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপনেরও নির্দেশ দিয়েছেন। তাই যজ্ঞের জন্য কোনো জীবিত বৃক্ষ কর্তনের প্রয়োজন নেই, বরং মৃত বা মৃতপ্রায় বৃক্ষের কাঠই যজ্ঞে সমিধারূপে ব্যবহৃত হবে।

বর্তমান পরিবেশ দূষণ ও রোগ মহামারীর যুগে যজ্ঞের আয়োজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ড. হাফকিন বলেছেন, “ঘি এবং চিনি মিশ্রণ করে যজ্ঞে পোড়ালে যে ধোঁয়া উৎপন্ন হয় তা বিভিন্ন রোগজীবাণু ধ্বংস করে।” প্রফেসর টিলওয়ার্ড বলেন, “চিনি মিশ্রিত হবিষ্যের পরিবেশ শোধনের শক্তি রয়েছে। এটি যক্ষ্মা, মিলস, বসন্ত প্রভৃতি জীবাণুনাশক।”

গায়ত্রী পরিবার আয়োজিত গোরখপুরে অশ্বমেধ যজ্ঞ চলাকালীন সময়ে “উত্তর প্রদেশ দূষণ রক্ষা বোর্ড” এর ডিরেক্টর ড. মনোজ গর্গ একদল বিজ্ঞানী নিয়ে বেশকিছু পরীক্ষা চালান। এই পরীক্ষার ফল “অখণ্ড জ্যোতি” সাময়ীকির সেপ্টেম্বর ’৯৭ সংখ্যাতে প্রকাশ পায়।

যা যজ্ঞের ব্যাপক উপযোগিতা ফুটিয়ে তুলে। বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যজ্ঞ সম্পাদনের পূর্বে সে স্থানে বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড ও নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩.৩৬ ও ১.১৬ ইউনিট এবং যজ্ঞ সম্পাদনের শেষে বিষাক্ত গ্যাস দুটির পরিমাণ কমে দাড়ায় যথাক্রমে ০.৮০ ও ১.০২ ইউনিট।

বিজ্ঞানীর দল যজ্ঞকুণ্ডের কিছু দূরে অবস্থিত জলাশয়ের জল পরীক্ষা করেও অভূতপূর্ব ফল লাভ করেন। তাঁরা দেখতে পান সংগৃহীত নমুনায় যজ্ঞের পূর্বে ব্যাকটেরিয়া ছিল ৪৫০০ এবং যজ্ঞের শেষে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কমে দাড়ায় ১২৫০।

যজ্ঞাবশিষ্ট যে ছাই বা বিভূতি ছিল তাতে মিনারেল পদার্থের পরিমাণ পরীক্ষা করে উত্তরপ্রদেশ কৃষির ডেপুটি ডিরেক্টর একে উত্তর মৃত্তিকা উর্বরকারক বলে মত দেন। ১৯৯৩-১৯৯৫ পর্যন্ত ২৭ টি যজ্ঞ ভিত্তিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, যার প্রত্যেকটিই বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে যজ্ঞের উপযোগিতা ব্যাপকহারে সমর্থন করে।

আপনারা অনেকেই ভূপাল ট্র্যাজেডির কথা শুনেছেন, যেখানে বিষাক্ত এমআইসি গ্যাস নির্গমনের ফলে শতশত মানুষ মারা যায় এবং সহস্র মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। এই গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল মাইলের পর মাইল।

৪মে ১৯৮৫ এর দৈনিক “দ্যা হিন্দি” এর একটি প্রতিবেদন সকলকে বিস্ময়ে হতবাক করে দেয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “দূষণ প্রতিরোধে বৈদিক উপায়।” যেখানে বলা হয় ওই গ্যাস প্ল্যান্টের খুব নিকটবর্তী সোহান লাল খুশওয়া এর পরিবারের কোনো সদস্যই ওই ঘটনার ফলে মৃত্যু তো দূরে থাক অসুস্থই হয় নি। কারণ কি? অগ্নিহোত্র। হ্যাঁ একমাত্র এই পরিবারটিই সেখানে নিয়মিত বৈদিক অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করত। যার ফল স্বরূপ এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবল থেকে রক্ষা পায় পরিবারটি। আর এই ঘটনা পরিবেশ দূষণ রোধে অগ্নিহোত্র যজ্ঞের কার্যকারিতা পুনরায় প্রতিপাদন করল। তাই তো বৈদিক ধর্ম ঘোষণা দিয়েছে “যজ্ঞো বৈ শ্রেষ্ঠতম কর্মম্”।

--------------------------------------------------------------------

বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় ---

'তারাপীঠ-কামাক্ষা সিদ্ধ TV-বাবা' মহাশয়দের ... তারাপীঠে বা নিজস্ব গৃহমন্দিরের হোমযজ্ঞ সম্পর্কে আমার কোনও জ্ঞান নেই।

এই আলোচনার সাথে কবচ্-মাদুলীর হোম-যজ্ঞ সম্পূর্ণ আলাদা।

-----------------------------------------------------------------------------

Courtesy by: Prithish Gosh

0 comments

আপনি কি নিজে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহীদের একজন?

১) আপনি কি হিন্দু?
২) আপনি নিজেকে ধর্মবিশ্বাসী বলে মনে করেন?
৩) আপনি কি নিজে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহীদের একজন?

উপরের তিনটি প্রশ্নের উত্তরে আপনি যদি 'হ্যাঁ' বলেন, তবে অবশ্যই এই পোস্টটি পড়ুন।
হিন্দু ধর্ম বুঝতে হলে প্রথমেই এর ঈশ্বরবাদ বুঝতে হবে, ঈশ্বর কয়জন, প্রথমেই এই প্রশ্নের উত্তর জেনে হিন্দু ধর্মে প্রবেশ করতে হবে। কারণ কেউ যদি না জানে যে ঈশ্বর কয়জন ও কি তবে ভক্তি অর্চনা করবে কাকে?

পরমাত্মা বা পরমব্রহ্ম হচ্ছেন সেই ঈশ্বর যিনি সৃষ্টির আদি হতে অন্ত পর্যন্ত আছেন এবং থাকবেন এবং তিনিই প্রকৃত আরাধ্য। ঈশ্বর, পরমাত্মা বা পরমব্রহ্ম হচ্ছেন নিরাকার, কিন্তু তিনি চাইলেই যে কোন সাকার রুপ ধারণ করতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণকে সেই পরমব্রহ্মের এক সাকার রূপ ধরা হয় এবং পরমেশ্বর মানা হয়। এখন কেউ যদি বলেন শ্রীকৃষ্ণ না শিবই আমার কাছে পরমেশ্বর তাতেও ভুল নেই কারণ তিনি যাঁকেই ডাকুন না কেন, সেই পরেমশ্বর কেই ভজনা করছেন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কৃষ্ণ বড় নাকি শিব বড়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের সৃষ্টিখন্ডে ঈশ্বর শিবকে বলছেন " যে তোমার ও আমার মাঝে বিভেদ করবে তার মত পাপী আর পৃথিবীতে নেই"।

মূল কথা হচ্ছে ঈশ্বর একজন তিনি নিরাকার বা সাকার, আমরা যাকেই ভক্তি বা পূজা করিনা কেন তা সেই ঈশ্বরকেই করা হয়। আমারা বিভিন্ন রুপের মূর্ত্তিকে পুজা করি তা কিন্তু ঈশ্বর থেকে আলাদা মনে করে না, মূর্ত্তির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকেই পূজা করা হয়। ঈশ্বরের বিভিন্ন রুপ কল্পনা করে আমরা পূজা করেলেও ঈশ্বর কিন্তু সেই একজনই। অনেকে প্রশ্ন করেন ভাত সোজা করে না খেয়ে এত ঘুরিয়ে খাও কেন? গীতায় ঈশ্বর বলেছেন -- "যে আমাকে যেভাবে ডাকবে আমি তাকে সেভাবেই ফলদান করব"। হিন্দু ধর্ম যে কতটা উদার তার প্রমাণ এখানেই পাওয়া যায়। আমি যেভাবে, যেরুপে তাকে ডাকব তিনি সেভাবেই আসবেন তা সে ৩৩ কোটির যে কোন একটা হোক না কেন।

আমাদের দেহে যে আত্মা আছে, তা সকল ধর্মেই বিশ্বাস করে। ঈশ্বর হচ্ছেন সকল আত্মার উৎস অর্থাৎ পরমাত্মা। আর প্রতিটি জীবের শরীরে যে আত্মা আছে তা হচ্ছে জীবাত্মা। সকল ধর্ম কর্মের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবাত্মা পরমাত্মার সাথে লীন হওয়া অর্থাৎ পৃথিবী থেকে মুক্ত হওয়া। পুরষ্কার অথবা শাস্তির শেষ আছে, মানে ভাল কাজের জন্য স্বর্গভোগ আর খারাপ কাজের জন্য নরকভোগ আছে। কর্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করতে হয়, দুই টাকায় ভালো করে ১০ টাকার মিষ্টি খাবেন তা হবে না। পাকা হিসাবে যতটুকু ভাল ততটুকুই মিষ্টি। কিন্তু প্রধান উদ্দেশ্য কিন্তু স্বর্গ নয় সেই পরমাত্মার সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া, এর আর কোন শেষ নাই।

আত্মার কোন ধ্বংশ বা শেষ নাই। এটা এক দেহ হতে অন্য দেহে গমন করে মাত্র। দেহের পরিবর্তন হয়, শিশু হতে কিশোর আবার কিশোর হতে যুবক, কিন্তু আত্মার পরিবর্তন নাই। গীতা অনুযায়ী মানুষ যেমন পুরাতন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে তেমনি আত্মা ও পুরাতন জীর্ন শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীরে গমন করে। একটু আধুনিক ভাবে বলা যায়, দেহ হচ্ছে প্রোগ্রাম করা কোন যন্ত্র আর আত্মা হচ্ছে এর ব্যাটারী যখন এই দুই একত্রিত হবে তখনই যন্ত্র সচল হবে এখানে ব্যাটারী দিয়ে কথা তা যে যন্ত্র বা শরীরে সেট করা হোক না কেন, এর চালনা শক্তি থাকলেই চলে।

Written by: Prithish Gosh
0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger