সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

হোলি : ধর্মের জয়ের আনন্দোৎসব




হোলি : ধর্মের জয়ের আনন্দোৎসব

হিন্দুধর্ম তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও উৎসবের আনন্দে মানবতার বাণীকেই ধারণ করে আছে যুগ যুগ ধরে। বারো মাসে তেরো পার্বণের ন্যায় হিন্দুধর্মে লেগে আছে ঋতুভিত্তিক উৎসব। এই সকল উৎসব ধর্মের গণ্ডী অতিক্রম করে সর্বমানবীয়, উদার দার্শনিক তত্ত্বে ঋদ্ধ। প্রাচীন ঋষিরা তাই হিন্দু ধর্মকে ক্ষুদ্র গণ্ডীতে আবদ্ধ করেননি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর ইতিহাস হিন্দু ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোত জড়িত। হোলিও তেমনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির উত্থানের ইতিহাস।





































দৈত্যরাজ হিরণ্যকিশপুর কাহিনী আমরা সকলে জানি। ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। ভগবান











শ্রীহরির ভক্ত ছিলেন প্রহ্লাদ। ঈশ্বরবিদ্বেষী হিরণ্যকশিপু তার পুত্রকে শ্রীহরিকে ভক্তি করতে নিষেধ করেন। তার নিষেধ অমান্য করেন ভক্তরাজ প্রহ্লাদ। ফলে ক্রুদ্ধ রাজা হিরণ্যকশিপু তার পুত্রকে হত্যার নির্দেশ দেন। কিন্তু যতভাবেই প্রহ্লাদকে হত্যা করার চেষ্টা করেন মহারাজ, ততবারই ভগবান শ্রীহরি তাঁকে রক্ষা করেন। তাঁকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ, হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে, আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করেন। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় হোলিকার প্রাপ্ত বর ফলপ্রসূ হয়নি। হোলিকা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এই দহনকে হোলিকা দহন বলা হয়। এদিকে বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদ অক্ষত থাকেন। ভগবান এভাবেই ভক্তকে বারবার রক্ষা করেন। ভক্তের জয় আর আসুরিক অপশক্তির পরাজয় হয়। ভক্তের জয়ের এই আনন্দ অপরাপর ভক্তদের মাঝে উৎসবে পরিণত হয়। হোলিকা দহনের এই উৎসবই কালের আবর্তে এখন হোলি উৎসব নামে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

অন্যদিক বসন্তের পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান  শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন। কোথাও কোথাও অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর তার রক্ত ছিটিয়ে সকলে আনন্দ করেছিলেন। এই অন্যায় শক্তিকে ধ্বংসের আনন্দ মহানন্দে পরিণত হয়।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হোলির রীতি ও বিশ্বাস বিভিন্ন। বাংলা অঞ্চলে বৈষ্ণব প্রাধান্য রীতি প্রচলিত। রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একতা থাম বানিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয়। পরের দিন রঙ খেলা।

বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম, একে আমরা বলি ‘চাঁচর’। এই চাঁচরেরও অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে। দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব। পাতাঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন ‘চাঁচর’ উদযাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়।



অঞ্চলভেদে হোলি বা দোল উদযাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদযাপনের রীতি এক। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন। যুগে যুগে এর উদযাপন রীতি পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন।

দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও ‘জৈমিনি মীমাংসা’য় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক ‘হোলিকোৎসব’ পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। হর্ষবর্ধনের নাটক ‘রত্নাবলী’তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে। এমনকি আল বেরুনীর বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সংযুক্ত হত।

মধ্যযুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পগুলোর অন্যতম প্রধান বিষয় রাধা-কৃষ্ণের রঙ উৎসব। এই রাধা-কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে হোলির যে অতি বৈষ্ণবীয় আচার তা অবশ্যই প্রশ্নযুক্ত। কেননা এটি শ্রীকৃষ্ণের জীবন ইতিহাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শ্রীকৃষ্ণ ১২ বছর বয়সে বৃন্দাবন ত্যাগ করার পর আর কখনোই সেখানে তাঁর যাওয়া হয়নি। অন্যদিকে বহু গবেষক রাধার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছেন। শ্রীকৃষ্ণের ঝুলন থেকে দোল কথার উদ্ভব। এই উৎসবের নাম ‘ঝুলন যাত্রা’ বা ‘দোল যাত্রা’ও বলে।



সে যাই হোক রাধা-কৃষ্ণ তত্ত্বকে দাঁড় করিয়ে বিপরীত লিঙ্গের মাঝে অবাধ হোলি খেলা অবশ্যই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থনযোগ্য নয়। আবার বিষাক্ত রঙের ব্যবহারও উচিত নয়। তাই হোলি নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের অসামাজিকতা পরিহার করা জরুরী।

হোলি সম্পর্কে বড় একটি তথ্য অনেকে এড়িয়ে যায়। ধর্ম ও সমাজ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আর একটি উৎসব বা দিন আরও পবিত্র হয়ে ওঠে যদি উক্ত দিনে পৃথিবী কোন মহান পুরুষের জন্ম দেয়। বাঙালি তথা হিন্দু সমাজের অন্যতম মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যের জন্মতিথি হচ্ছে এই পূর্ণিমা তিথি তথা হোলি তিথি। এই মহান পুরুষের জন্ম হোলি উৎসবের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আর তাই এর অপর নাম ‘গৌর পূর্ণিমা’।


পৃথিবী পাপে ভারাক্রান্ত হলে ঈশ্বর সেই ভার লাঘব করেন অবতাররূপে। বর্তমান পৃথিবী এমন অন্যায় ভারে ভারাক্রান্ত তাই মানুষের মধ্যে প্রয়োজন শুভবোধ, প্রতিবাদী শক্তি, সংগ্রাম ও সত্যের প্রতি সমর্পণ। ধর্মীয় গণ্ডী ছাড়িয়ে হোলি উৎসবের এই মহান আদর্শ আমাদের পাপ-পঙ্কিল ধরণীকে পরশ পাথরে সত্য করে তুলুক। অন্যায়কে পরাজিত করার আনন্দে সকলের মন রাঙিয়ে উঠুক। মহানপুরুষের আবির্ভাবে সকলের মন আনন্দে নেচে উঠুক, তবে তা অবশ্যই অসামজিকতায় নয়।

রবীন্দ্রনাথের সুরে হোলির রঙ আমাদের মর্মে লাগুক-

ওরে গৃহবাসী খোল, দ্বার খোল, লাগলো যে দোল।

স্থলে জলে বনতলে লাগলো যে দোল।

দ্বার খোল, দ্বার খোল।।


লেখক: সঞ্জয় সরকার, প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

এইবেলাডটকম/এমআর
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger