সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ন কথা ( আদিকাণ্ড পর্ব -৯ )

রাবণ নন্দীদেবের অভিশাপ পেয়েও দমে নি। কৈলাসের দিকে অগ্রসর হবার সময় নন্দীকে মহাদেব আদেশ দিলেন রাবণের গতি রোধ না করতে । নন্দী বললেন, “রাবন তুমি জানো না কৈলাস মহাদেবের স্থান । তুমি ভগবান শিবের ধামে আক্রমণ করেছো। এবার দেখো তোমার কি গতি হয়।” রাবণ বলল- “আজ আমি শিব সমেত কৈলাস পর্বতকে তুলে নিক্ষেপ করে কুবেরকে বধ করবো।” এই বলে দশগ্রীব দশানন সমগ্র বাহু দিয়ে কৈলাস পর্বতকে তুলে ধরল । কৈলাসে প্রচণ্ড আলোড়ণ সৃষ্টি হোলো । কৈলাসের বরফের স্তূপ ভেঙ্গে প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত হতে লাগলো । ভয়ে ভীত হয়ে দেবী পার্বতী , মহাদেবকে জড়িয়ে ধরলেন । ভগবান মহেশ্বর অভয় দিয়ে বললেন- “হে দেবী। ভীত হয়ো না। আমি এখুনি রাবণের উদ্ধত আচরণকে ধ্বংস করবো ।” রাবণ কৈলাস পর্বতকে তুলে ছিলো। ভগবান শিব বাম চরণের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে মাটিতে চাপ দিলেন। সাথে সাথে কৈলাস পর্বত নেমে এসে রাবণের ওপর পতিত হোলো। রাবণের অর্ধ শরীর পর্বতের নীচে চলে গেলো । এইভাবে কিছুকাল গত হল। ব্রহ্মা দেব তখন সূর্য দেবতাকে দিয়ে রাবন কে সংবাদ প্রেরন করলেন । সূর্য দেবতা বললেন – “রাবণ । প্রজাপতি ব্রহ্মা এই সংবাদ দিয়েছেন । তুমি সাক্ষাৎ পরমপুরুষ শিবকে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলে। তিনি অনাদি, শাশ্বত, নিরাকার ব্রহ্মের সাকার রূপ। তুমি সেই স্বয়ম্ভু নীলকণ্ঠকে অপমান করেছো, তাই তোমার এই দশা। তুমি সেই পরব্রহ্মের স্তব করো। প্রজাপতি হংসবাহন ব্রহ্মা এই সংবাদ তোমাকে পাঠিয়েছেন ।”

রাবণ তখন শিব স্তব আরম্ভ করলেন । এই গুলি “শিবতাণ্ডবস্তব” নামে খ্যাত। যার বাংলা অনুবাদ হচ্ছে- যিনি জটারূপ অরণ্য থেকে নির্গত গঙ্গাদেবীর প্রবাহে পবিত্র করা সর্পের বিশাল মালা কণ্ঠে ধারন করে ডমরুতে ডম, ডম, ডম- এই শব্দ তুলে প্রচণ্ড নৃত্য করেছেন, সেই শিব যেন আমার কল্যাণ সাধন করেন । ১ যাঁর মস্তক জটারূপ কড়াইতে বেগে ভ্রমণকারী গঙ্গার চঞ্চল তরঙ্গ- লতাসমূহে সুশোভিত হচ্ছে, যাঁর ললাটাগ্নি ধক্ ধক্ করে জ্বলছে , মস্তকে অর্ধচন্দ্র বিরাজিত, সেই ভগবান শিবে যেন আমার নিরন্তর অনুরাগ থাকে । ২ গিরিরাজকিশোরী পার্বতীর বিলাসকালোপযোগী উচ্চ- নীচ মস্তকভূষণ দ্বারা দশদিক প্রকাশিত হতে দেখে যাঁর মন আনন্দিত, যাঁর নিত্য কৃপাদৃষ্টির ফলে কঠিন বাধাবিপত্তি দূর হয়ে যায়, সেই দিগম্বররূপ তত্ত্বে যেন আমার মন আনন্দ লাভ করে । ৩ যাঁর জটাজুটের মধ্যে সর্পের ফনায় অবস্থিত মণির প্রকাশিত পিঙ্গল ছটা দিশারূপিণী অঙ্গনাদের মুখে কুঙ্কুমের রং ছড়ায়, মত্ত হাতীর বিকশিত চর্মকে উত্তরীয় ( চাদর ) – রূপে ধারন করায় যিনি স্নিগ্ধবর্ণ লাভ করেছেন, সেই ভূতনাথে আমার চিত্ত অদ্ভুদ তৃপ্তি বোধ করুক । ৪ যাঁর চরণপাদুকা ইন্দ্রাদি সকল দেবতার ( প্রনামের সময় ) মস্তকের ফুলের পরাগে ধূসরিত হয় ; নাগরাজ ( শেষ ) এর মালায় বাঁধা জটাসম্পন্ন সেই ভগবান চন্দ্রশেখর আমার জন্য চিরস্থায়ী সম্পত্তির ব্যবস্থাপক হয়ে থাকুন। ৫ যিনি তাঁর ললাটরূপ বেদীতে প্রজ্বলিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গের তেজে কামদেবকে ভস্মীভূত করেছিলেন, যাঁকে ইন্দ্র নমস্কার করেন, চন্দ্রের কলা দ্বারা সুশোভিত মুকুট সম্পন্ন সেই শ্রীমহাদেবের উন্নত বিশাল ললাটের জটিল মস্তক আমার সম্পত্তির কারণ হোক । ৬ যিনি তাঁর ভীষণ কপালের ধক্ ধক্ রূপ জ্বলন্ত অগ্নিতে কামদেবকে আহুতিদান করেছিলেন, গিরিরাজকণ্যার স্তন্যাগ্রে পত্রভঙ্গ রচনা করার একমাত্র শিল্পী সেই ভগবান ত্রিলোচনের ওপর আমার রতি ( অনুরাগ ) থাকে। ৭

যাঁর কন্ঠে নবীন মেঘমালা বেষ্টিত অমাবস্যার অর্ধরাত্রের ন্যায় দরূহ্ অন্ধকারসম শ্যামলতা বিরাজ করে, যিনি গজচর্মপরিহিত, সেই জগদভার বহনকারী , চন্দ্রের অর্ধাকৃতিতে মনোহর ভগবান গঙ্গাধর যেন আমার সম্পত্তির বিস্তার করেন । ৮ যাঁর কন্ঠদেশ প্রস্ফুটিত নীলকমল সমূহের শ্যামশোভার অনুকরণকারী হরিণীর ছবির ন্যায় চিহ্নে সুশোভিত এবং যিনি কামদেব, ত্রিপুর, ভব ( সংসার ), দক্ষ- যজ্ঞ, হাতি( গজাসুর) , অন্ধকাসুর এবং যমরাজের উচ্ছেদকারী, আমি তাঁর ভজনা করি ।। ৯যিনি নিরাভিমান পার্বতীর কলারূপ কদম্বমঞ্জরীর মকরন্দস্রোতের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মাধুরী পানকারী মধুপ এবং কামদেব, ত্রিপুর, ভব, দক্ষ- যজ্ঞ, হাতি, অন্ধকাসুর ও যমরাজের বিনাশকারী, আমি তাঁর ভজনা করি ।। ১০যাঁর মস্তকের ওপর অত্যন্ত বেগে ঘূর্ণমান ভুজঙ্গের নিঃশ্বাসে ভয়ঙ্কর অগ্নি ক্রমাগত প্রজ্বলিত হচ্ছে, ধিমি ধিমি শব্দে মৃদঙ্গের গম্ভীর মঙ্গলধ্বনির সঙ্গে যিনি প্রচণ্ড নৃত্য করছেন, সেই ভগবান শঙ্করের জয় হোক । ১১ পাথর এবং সুন্দর কোমল বিছানায় সর্প ও মুক্তমালায়, বহু মূল্য রত্ন এবং মৃত্তিকায় , মিত্র ও শত্রুপক্ষে , তৃণ ও কমলনয়না তরুণীতে , সাধারণ প্রজা ও পৃথিবীর মহারাজার প্রতি যিনি সমভাব রাখেন, সেই সদাশিবকে আমি কবে ভজনা করব ! ১২ সুন্দর ললাটসম্পন্ন ভগবান চন্দ্রশেখরকে চিত্ত সমর্পণ করে নিজ কুচিন্তা পরিত্যাগ করে, গঙ্গার তীরে কোন কাননের অভ্যন্তরে থেকে মস্তকের ওপর হাত জোড় করে বিহ্বলনয়নে ‘শিব’ মন্ত্র উচ্চারণ করে আমি কবে সুখলাভ করব ? ১৩ যে ব্যাক্তি এভাবে উক্ত অতি উত্তম স্ত্রোত্র নিত্য পাঠ , স্মরণ এবং বর্ণনা করে, সে সদা শুদ্ধ থাকে এবং অতি শীঘ্র সুরগুরু শ্রীশঙ্করের প্রতি প্রকৃত ভক্তিভাব প্রাপ্ত হয় । সে কখনও বিপথে যায় না ; কারণ শ্রীশিবের সুচিন্তা প্রাণিবর্গের মোহ নাশ করে । ১৪ সায়ংকালে পূজা সমাপ্ত হলে দশানন রাবণ দ্বারা গীত এই শম্ভুপূজন সম্পর্কীয় স্ত্রোত্র যিনি পাঠ করেন, ভগবান শঙ্কর সেই ব্যক্তিকে রথ, হাতি, ঘোড়া সমন্বিত চিরস্থায়ী অনুকূল সম্পত্তি প্রদান করেন । ১৫ ( ১৫ টি শ্লোকে এই স্তব রাবন করেছিলেন )।
রাবণের স্তবে মুগ্ধ হয়ে দেবাদিদেব শিব আবির্ভাব হলেন । রাবণকে সেই দশা থেকে মুক্ত করলেন। রাবণ বললেন- “আজ থেকে রাবণের ইষ্ট রূপে দেবাদিদেবের এক নাম হবে রাবণেশ্বর । আমি, আপনি ছাড়া কারো চরণে নত হবো না ।” ভোলানাথ স্বল্পেতেই তুষ্ট হন। একটি বিল্বপত্র ও এক ঘটি গঙ্গা জলেই তুষ্ট তিনি । দেবাদিদেব রাবণকে “চন্দ্রহাস” নামক এক খড়গ দিয়ে বললেন- “হে রাবন তোমার যশ কীর্তি বৃদ্ধি হোক। এই চন্দ্রহাস খড়গ গ্রহণ করো। ত্রিলোকে এমন অস্ত্র নেই যে এই খড়গ কে বিফল করতে পারে। তবে আমার কোনো ভক্তের ওপর এই অস্ত্র নিক্ষেপ করলে এই অস্ত্র বিফল হয়ে আমার কাছে চলে আসবে।”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger