• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

২১ অক্টোবর ২০১৪

শ্মশানে কেন মা কালীর পূজা হয় ?


“শ্মশান” শব্দের অর্থ- শম স্থান । মৃত স্থান । চলতি কথায় যেখানে শবদাহ করা হয় সেই ক্ষেত্র শ্মশান ভূমি নামে পরিচিত । করালবদনী আদ্যাশক্তি মায়ের বিচরণ ক্ষেত্র এই শ্মশান । মা কালীকে ধ্বংসের দেবী বলা হয়। এই “ধ্বংস” বলতে সর্বনাশ করা নয়। এর অর্থ- “সংহরন” অর্থাৎ দেবী নিজেই এই সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড রচনা করেছেন- আবার তিনিই গুটিয়ে নেন। ঠিক যেমন মাকড়শা নিজেই জাল বোনে আবার নিজেই গুটিয়ে নেয় । জীব কর্মফল ভোগান্তে মায়ের কোলে আশ্রয় পেয়ে পায় অসীম শান্তি ও আনন্দ । এই শ্মশান তাই মাকালীর ক্রীড়া ক্ষেত্র ।
শ্মশান কে বৈরাগ্যভূমি বলা হয়। শ্মশানকে তপঃ সাধনার ভূমি বলা হয় । ১০ মিনিট শ্মশানে বসে থাকলে জড় দেহের নশ্বরতার প্রতিচ্ছবি আমাদের চোখের সামনে আসে। জীব তাঁর খাঁচা নিয়ে বড়ই অহংকার করে , কিন্তু খাঁচা থেকে পাখী মুক্ত হলে খাঁচা শ্মশানে এক মুঠো ভস্মে পরিণত হয়। জ্ঞানী গণ এই তত্ত্ব উপলব্ধি করে দেহ সুখ বিসর্জন দিয়ে সাধন ভজনে মন দেয়। শ্মশান কেই তাই তপঃ সাধনার কেন্দ্র করে বহু যুগ থেকে অনেক সাধক সাধিকারা সাধন ভজনে নিমগ্ন হয় । মৃত্যু কাউকে ছাড়ে না। এক রূপবতী অপ্সরা তুল্যা কন্যার মৃত্যুর হলে শ্মশানে তার দেহ এক মুঠো ভস্ম হয়- অপরদিকে এক কুৎসিত চেহারা বিকৃত ব্যাক্তির মৃত্যু হলে তাঁর শ্মশানে দেহের পরিণতি এক মুঠো ছাই। মৃত্যুর কাছে কোন ভেদাভেদ নেই। ধনী গরীব নির্ধন কাঙ্গাল সকলের মৃত্যুর পর দেহ ভস্মেই পরিণত হয় । সাধু গণ এই তত্ত্ব জানেন। কালের করাল গ্রাস থেকে কারোর মুক্তি নেই। তাই কালের কাল মহাকালকে গ্রাসকারীনি আদ্যাশক্তি মহামায়া কালীর উপাসনাতেই নিমগ্ন হন ।
কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা, অহংকার, বাসনা গ্রস্ত এই শরীর । আত্মার এই সকল বোধ নেই। দেহান্তে এই রিপুগণের ক্রীড়া ক্ষেত্র শরীর টি জলন্ত চিতাতে ভস্ম হয়। রিপু গনের নাশ হলেই সাধকের মনে বৈরাগ্য জাগ্রত হয়। তাই এই রিপুর খেলার মাঠ শরীর টি জলন্ত চিতায় দগ্ধ হয় বলে মা কালী শ্মশানে বিরাজ করেন। মা তারা দেবী জলন্ত চিতায় অধিষ্ঠান করেন । ভগবতী ছিন্নমস্তা পদতলে মদন রতি দলিতা করেন । এই হোলো শ্মশানের পরিচয় । শ্মশান মন্দিরের মতোই পবিত্র। মন্দিরে শাস্ত্র পাঠ করে জড় দেহের পরিণামের কথা বলা হয়। শ্মশানে গেলে সেটার জীবন্ত উদাহরণ সচক্ষে দেখা যায়। তাই শ্মশান মা কালীর এত প্রিয় স্থান ।
ছবিটি আমার বন্ধু পিন্টু দাস বানিয়েছেন
Share:

১৫ অক্টোবর ২০১৪

শ্রীকৃষ্ণই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু


আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের তাৎপর্য সমন্বিত ভগবদ্গীতা যথাযথ যাঁরা পাঠ করেছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে জানতে পেরেছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্ব কারণের পরম কারণ এবং লীলা পুরুষোত্তম স্বয়ং ভগবান। গীতায় বিভিন্ন শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যে পরম পুরষ ভগবান তার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন -
মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয় (৭/৭)
অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে (১০/৮)
পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্ (১০/১২)
আমরা দেখতে পাই অষ্টাদশ অধ্যায় যুক্ত ভগবদ্গীতার বিভিন্ন উপদেশের মাধমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পরম ভক্ত ও সখা অর্জুনের মোহ মুক্ত করার জন্য বহুভাবে চেষ্টা করেছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে অর্জুনকে যুদ্ধ করতে বললেন, অর্থাৎ তাঁর শরণাগত হতে বললেন। কিন্তু অর্জুনের তাতে সংশয় দেখা দিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না তাঁর প্রকৃতপক্ষে কি করা উচিত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তা বুঝতে পেরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মাঝখানে অর্জুনকে আত্মতত্ত¡-বিজ্ঞান প্রদান করলেন, যাতে অর্জুন মোহ থেকে মুক্ত হয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ পালন করেন। প্রকৃতপক্ষে অর্জুন ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সখা অর্থাৎ নিত্য পার্ষদ, তাই অর্জুনের মায়ার দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ার কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। সমগ্র মায়াবদ্ধ জীবদের মায়া থেকে মুক্তির জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিত্যসখা অর্জুনকে নিমিত্ত করে এই ভগবদ্গীতার জ্ঞান প্রদান করেছিলেন। তিনি সর্বপ্রথমে অর্জুনের নিকট কর্মের ব্যাখ্যা করলেনÑকর্ম, বিকর্ম ও অকর্ম। তিনি ‘অকর্ম’ অর্থাৎ নিষ্কাম কর্মের উপর গুরুত্ব আরোপ করলেন। তারপর তিনি জ্ঞানযোগের কথা বললেন। অর্থাৎ, ভগবৎ-তত্ত¡বিজ্ঞান লাভের মাধ্যমে জড় ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করে কিভাবে ব্রহ্মের ধ্যান করা যায়। তারপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অষ্টাঙ্গ যোগের ব্যাখ্যা করলেনÑকিভাবে একজন যোগী যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম এবং অন্তিমে সমাধির স্তরে উপনীত হয়ে হৃদয়ে অবস্থিত অন্তর্যামী পরমাত্মার দর্শন লাভ করতে পারেন।
সর্ব পরিশেষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কি উপদেশ দান করলেন? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন-
সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ \
“সমস্ত রকমের ধর্ম পরিত্যাগ করে একমাত্র আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত রকম পাপকর্মের ফল থেকে মুক্ত করে উদ্ধার করব। তুমি তার জন্য চিন্তা করো না।” (গীতা ১৮/৬৬) এই শ্লোকে ভগবান কৃষ্ণ অর্জুনকে সম্পূর্ণরূপে তাঁর শরণাগত হতে বললেন। সর্বধর্মান পরিত্যজ্য বলতে কর্মফল প্রদানকারী কর্মকাণ্ডীয় কর্মই কেবল ত্যাগ নয়, এমন কি মুমুক্ষুদের জ্ঞানযোগ এবং সিদ্ধিকামীদের অষ্টাঙ্গযোগকেও ত্যাগ করতে বলেছেন। কারণ, কর্মকাণ্ডের প্রতি আসক্ত হলে স্বর্গসুখের বাসনা, জ্ঞানের প্রতি আসক্ত হলে ব্রহ্মে লীন হয়ে যাওয়ার বাসনা এবং অষ্টাঙ্গযোগের প্রতি আসক্ত হলে অনিমা, লঘিমা, ঈশিতা, বশিতা, প্রাপ্তি আদি জড়-জাগতিক সিদ্ধি লাভের প্রতি বাসনা জাগ্রত হয়, ফলে মানব জীবনের পরম প্রাপ্তি যে কৃষ্ণপ্রেম তা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। সেই সম্বন্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্ত উদ্ধবকে বলেছেন-
ন সাধয়তি মাং যোগো ন সাংখ্যং ধর্ম উদ্ধব।
ন স্বাধ্যায়স্তপস্ত্যাগো যথা ভক্তির্মমোর্জিতা \
“হে প্রিয় উদ্ধব! অষ্টাঙ্গযোগ, সাংখ্যযোগ, বেদ অধ্যয়ন, তপশ্চর্যা অথবা ত্যাগের মাধ্যমে আমাকে লাভ করা যায় না, একমাত্র আমার প্রতি শুদ্ধ ভক্তি অর্জন করে আমার ভক্ত অতি সহজেই আমাকে লাভ করতে পারে।”
সুতরাং কর্ম, জ্ঞান ও অষ্টাঙ্গ-যোগের দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে শরণাগতি হয় না, তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সব রকমের ধর্ম পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণরূপে তাঁর শরণাগত হতে বলেছেন। অর্থাৎ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ভক্তিযোগের মাধ্যমে তাঁর শরণাগত হতে বলেছেন। লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে কিভাবে শরণাগত হতে হবে, সেটিই হচ্ছে ভগবদ্গীতায় অর্জুনের প্রতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গুহ্যতম উপদেশ এবং তা হচ্ছেÑ
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যামী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে \
“সর্বদাই আমার স্মরণ কর, আমার ভক্ত হও, আমাকে পূজা কর এবং আমাকে প্রণাম কর। যদি তুমি তা কর, তবে নিঃসন্দেহে তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে। আমি তোমার কাছে প্রতিজ্ঞা করছি, কেন না তুমি আমার প্রিয় সখা।” (গীতা ১৮/৬৫) সমগ্র মানব সমাজের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই গুহ্যতম বাণী যথাযথভাবে পালন করা। অর্থাৎ ভক্তিযোগের আশ্রয় গ্রহণ করে চিন্ময় কৃষ্ণলোকে লীলা পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের কাছে ফিরে যাওয়া। একবার কেউ সনাতন চিন্ময় ভগবৎ ধামে ফিরে গেলে, তাকে আর জন্ম-মৃত্যুময় ভৌতিক জগতে ফিরে আসতে হয় না।
প্রথমে অর্জুনও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ পালন করতে অস্বীকৃত হয়েছিলেন। পরিশেষে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় অর্জুন সংশয় ও মোহ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন এবং তিনি সম্পূর্ণরূপে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হয়েছিলেন। তখন অর্জুন বলেছিলেনÑ
নষ্টো মোহ স্মৃতির্লব্ধা ত্বৎপ্রসাদান্ময়াচ্যুত।
স্থিতোহস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব \
“হে প্রিয় কৃষ্ণ! হে অচ্যুত! আমার মোহ দূরীভূত হয়েছে। তোমার কৃপায় আমার স্মৃতিশক্তি আমি পুনরায় ফিরে পেয়েছি। আমি এখন সম্পূর্ণরূপে সংশয় থেকে মুক্ত এবং তোমার উপদেশ মতো কাজ করতে আমি প্রস্তুত।” (গীতা ১৮/৭৩) শেষ পর্যন্ত অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে যুদ্ধ করেছিলেন। বহু অধার্মিক রাজাদের ধ্বংস করে ধর্মরাজ্য স্থাপনে শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাকে পূর্ণ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের কৃপার ফলে অর্জুুন পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্তরূপে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। যিনি অর্জুনের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন, তিনি এই জীবনে পরম সৌভাগ্যশালী তো হবেনই এবং পরবর্তী জীবনে চিত-জগতে কৃষ্ণলোকে ফিরে গিয়ে নিত্যকাল শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গলাভ করবেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
দ্বাপর যুগ শেষ হয়ে এখন কলিযুগ চলছে। কলির প্রভাবে মানুষ ক্রমশ অধিক থেকে অধিকতর অধঃপতনের দিকে এগিয়ে চলেছে। নেশা, মাংসাহার, জুয়া ও অবৈধ স্ত্রীসঙ্গের প্রতি মানুষের আসক্তি বৃদ্ধির ফলে ধর্মের তিনটি অঙ্গÑতপস্যা, শৌচ ও দয়া একেবারেই বিনষ্ট হয়ে যায়, অর্থাৎ একমাত্র সত্যের অস্তিত্ব রয়েছে। ভয়ংকর কলির দ্বারা এভাবেই দ্রুত করালগ্রস্ত হওয়ার দরুন মানুষ আর কেউই ধর্মের অনুশাসন গ্রহণ করতে চায় না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরম গুহ্যতম নির্দেশ-‘আমার শরণাগত হও’ মায়ামোহাচ্ছন্ন হয়ে সকলেই তা ভুলতে বসেছে। কলির ভয়ংকর তাণ্ডব নৃত্যের প্রভাবে অল্প-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ পারমার্থিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মানব-জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছে। মানুষ আহার, নিদ্রা ও স্ত্রীসঙ্গে আসক্ত হয়ে তাদের শাশ্বত, চিন্ময় স্বরূপকে ভুলে গিয়ে অনিত্য, নশ্বর জড় শরীরকেই তাদের স্বরূপ বলে মনে করতে থাকে। এই নিদারুণ শৌচনীয় অবস্থা থেকে উদ্ধারের পথ তাদের কে দেখাবে ? যার তার কথা তো মানুষ শুনবে না। সুহৃদং সর্বভূতানাম্Ñভগবান শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন সমগ্র জীবকুলের একমাত্র পরম উপকারী বন্ধু। যদি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবার এই কলিযুগে অবতীর্ণ হয়ে তাঁর পাদপদ্মে শরণাগত হবার পন্থা প্রদর্শন করেন, তবেই মায়াবদ্ধ জীবেরা ভক্তিমার্গের পন্থা গ্রহণ করবে, নচেৎ আশা নেই। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের থেকেও তাঁর একান্ত শরণাগত শুদ্ধ ভক্ত অধিকতর পরদুঃখে দুঃখী। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঠিক করলেন, ভগবৎ-ভক্তির পন্থা আচরণের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি ভক্তশ্রেষ্ঠ শ্রীমতী রাধিকার ভাব ও কান্তি অবলম্বন করে ভক্তরূপে এই কলিযুগে শচীগর্ভসিন্ধু থেকে অবতীর্ণ হবেন। তিনি হচ্ছেন কলিযুগের মহাবদান্য অবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, যিনি পাঁচশো কুড়ি বছর পূর্বে কলিযুগের যুগধর্ম হরিনাম সংকীর্তন প্রবর্তন করবার জন্য এই শ্রীধাম মায়াপুরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সেই সম্বন্ধে বলা হয়েছেÑ
মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য রাধাকৃষ্ণ নহে অন্য,
রূপানুগজনের জীবন।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে স্বয়ং রাধা-কৃষ্ণের মিলিত প্রকাশ, সেই সম্বন্ধে শ্রীল স্বরূপ গোস্বামীর কড়চায় বর্ণিত হয়েছে-
রাধা কৃষ্ণপ্রণয়বিকৃতির্হ্লাদিনীশক্তিরস্মা-
দেকাত্মানাবপি ভুবি পুরা দেহভেদং গতৌ তৌ।
চৈতন্যাখ্যাং প্রকটমধুনা তদ্দ্বয়ং চৈক্যমাপ্তং
রাধাভাবদ্যুতিসুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম্ \
“শ্রীরাধিকা শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়ের বিকার-স্বরূপা; সুতরাং শ্রীমতী রাধারানী শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি। এই জন্য তাঁরা (শ্রীমতি রাধারানী ও শ্রীকৃষ্ণ) একাত্মা; কিন্তু একাত্মা হলেও তাঁরা অনাদিকাল থেকে গোলোকে পৃথক দেহ ধারণ করে আছেন। এখন (কলিযুগে) সেই দুই দেহ পুনরায় একত্রে যুক্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে প্রকট হয়েছেন। শ্রীমতী রাধারানীর এই ভাব ও কান্তিযুক্ত শ্রীকৃষ্ণস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে আমি আমার প্রণতি নিবেদন করি।” (চৈঃ চঃ আদি ১/৫)
ভগবান শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে অবতরণের কারণ প্রসঙ্গে বিদগ্ধমাধবে (প্রথমাঙ্কে দ্বিতীয় শ্লোক) শ্রীল রূপ গোস্বামী উল্লেখ করেছেনÑ
অনর্পিতচরীং চিরাৎ করুণাবতীর্ণঃ কলৌ
সমর্পয়িতুমুন্নতোজ্জ্বলরসাং স্বভক্তিশ্রিয়ম্।
হরিঃ পুরটসুন্দরদ্যুতিকদম্বসন্দীপিতঃ
সদা হৃদয়কন্দরে স্ফুরতু বঃ শচীনন্দনঃ\
“পূর্বে যা অর্পিত হয়নি, সেই উন্নত ও উজ্জ্বল রসময়ী নিজের ভক্তিসম্পদ দান করার জন্য যিনি করুণাবশত কলিযুগে অবতীর্ণ হয়েছেন, স্বর্ণ থেকেও সুন্দর দ্যুতিসমূহ দ্বারা সমুদ্ভাসিত সেই শচীনন্দন শ্রীহরি সর্বদা তোমাদের হৃদয়-কন্দরে স্ফুরিত হোন।” লীলা পুরুষোত্তম ভগবান কলিযুগের যুগধর্ম হরিনাম সংকীর্তন প্রবর্তন ও প্রচারের জন্য এই কলিযুগে যে অবতীর্ণ হবেন, তা শ্রীমদ্ভাগবত, পুরাণ, উপনিষদ আদি বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে পরিদৃষ্ট হয়। পূর্বের কোনও প্রকার যোগ্যতা ছাড়া অকাতরে, নির্বিচারে, সকলকে দুর্লভ কৃষ্ণপ্রেম প্রদানের জন্যই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাই শ্রীল রূপ গোস্বামীপাদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে‘মহাবদান্য অবতার’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীধাম মায়াপুরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ফাল্গুনী পূর্ণিমায় চন্দ্রগ্রহণচ্ছলে হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই শ্রীধাম মায়াপুরে যে-মুহূর্তে আবির্ভূত হয়েছিলেন, ঠিক সে সময়ে চন্দ্রগ্রহণের পরিসমাপ্তি হওয়াতে লক্ষ লক্ষ বৈদিক ব্রাহ্মণ ও হিন্দুরা উচ্চস্বরে বৈদিক মন্ত্র পাঠ ও সংকীর্তন করে সকলে গঙ্গাস্নান করছিল। আর সেই হরিনামের চিন্ময় শব্দতরঙ্গে দশদিক আকাশ বাতাস মুখরিত হচ্ছিল। এভাবেই মহাপ্রভু অত্যন্ত সুকৌশলে কলিযুগের যুগধর্ম সংকীর্তনের সূচনা করেন। শিশুকালে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ক্রন্দনের ছলে হরিনাম কীর্তন করাতেন। শিশুকালে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মাঝে মধ্যে হঠাৎ কেঁদে উঠতেন। তখন পাড়া-প্রতিবেশীরা বিন্নিভাবে তাঁর ক্রন্দন থামাবার চেষ্টা করতেন, কিন্ত তিনি তাতে আরও বেশি কান্না করতেন। কিন্তু যেমাত্র হাত তালি দিয়ে সকলে মিলে উচ্চস্বরে-
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে \
এই মহামন্ত্র কীর্তন করত, তৎক্ষণাৎ শিশু নিমাই তাঁর কান্না বন্ধ করে দিয়ে হাসতে হাসতে সকলের মুখের দিকে তাকাতেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন দিব্যলীলা-বিলাস করছিলেন, তখন নবদ্বীপের সকলে তাঁকে নিমাই পণ্ডিত বলেই জানত। কিন্তু তিনি যে লীলা পুরুষোত্তম স্বয়ং ভগবান তা কেউ বুঝতে পারত না। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গোপিকাশ্রেষ্ঠ শ্রীমতী রাধারানীর ভাব অঙ্গীকার করে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। একদিন তিনি কৃষ্ণপ্রেমে উন্মত্ত হয়ে ‘গোপী’ ‘গোপী’ এই নাম জপ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর পড়–য়া ছাত্রগণ মহাপ্রভুর নিকটবর্তী হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তিনি কৃষ্ণনাম উচ্চারণ না করে গোপীনাম উচ্চারণ করছেন? মহাপ্রভু আবেশে রাগ প্রকাশ করে ঠেঙ্গা নিয়ে তাদের পিছনে তাড়া করলেন। পরিশেষে ছাত্ররা দলবদ্ধ হয়ে মহাপ্রভুকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অন্তর্যামী ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তা জানতে পারলেন। তিনি তখন ভাবতে লাগলেন, যদি এই সব ছাত্র তাঁর পাদপদ্মে অপরাধ করে, তবে কোনও দিনই তারা কৃষ্ণপ্রেম লাভ করতে পারবে না। অথচ শ্রীকৃষ্ণই মহাপ্রভুরূপে এসেছেন নির্বিচারে কৃষ্ণপ্রেম প্রদান করার জন্য। সকলেই যাতে তাঁকে শ্রদ্ধাভক্তি করে ব্রহ্মার দুর্লভ কৃষ্ণপ্রেম লাভ করতে পারে, তাই তিনি ঠিক করলেন গৃহস্থ-আশ্রম পরিত্যাগ করে সন্ন্যাস-আশ্রম গ্রহণ করবেন। কারণ সন্ন্যাসীকে সকলেই শ্রদ্ধাভক্তি করে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কাটোয়ায় কেশব ভারতীর কাছ থেকে সন্ন্যাস-ধর্ম গ্রহণ করে, শান্তিপুরে অদ্বৈত আচার্যের গৃহে শোকসন্তপ্তা ও বিরহবিধূরা শচীমাতা ও আপন প্রি
য় ভক্তদের সান্ত্বনা দানের পর শচীমায়ের অনুমোদন নিয়ে যখন জগন্নাথ পুরীতে জগন্নাথ মন্দিরে এসে প্রেমে বিহŸল হয়ে শ্রীজগন্নাথদেবকে আলিঙ্গন করবার জন্য বিগ্রহের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন, তখন গভীর ভাবের আবেগে মেঝেতে পতিত হয়ে মূর্ছাপ্রাপ্ত হলেন। নিকটেই বেদান্ত-দর্শনের ভারত বিখ্যাত দার্শনিক পণ্ডিত সার্বভৌম ভট্টাচার্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি মহাপ্রভুর সর্বাঙ্গে এই প্রকার অলৌকিক সাত্তি¡ক বিকার দর্শন করে আশ্চার্যান্বিত হলেন এবং চিন্তা করলেন, মনুষ্য-শরীরে এই প্রকার সাত্তি¡ক প্রেমের বিকার কিভাবে প্রকাশ হতে পারে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শরীরে কোন প্রকার স্পন্দন দেখতে না পাওয়ায় সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুকে তাঁর নিজের গৃহে এনে রেখেছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ পার্ষদ শ্রীল গোপীনাথ আচার্য সার্বভৌম ভট্টাচার্যকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে, মহাপ্রভু হচ্ছেন স্বয়ং ঈশ্বর। কিন্তু সার্বভৌম ভট্টাচার্য তা অস্বীকার করে গোপীনাথ আচার্যকে বললেন যে, তিনি কিসের ভিত্তিতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে ঈশ্বর বলে স্বীকার করছেন, তা ছাড়া কলিযুগে ভগবানের কোনও অবতার নেই। তখন গোপীনাথ আচার্য ঈশ্বরের অন্তর ও বহির লক্ষণ ব্যাখ্যা করে শাস্ত্রে যে কলিযুগে ভগবানের অবতার আছে, তা মহাভারত (দানধর্ম বিষ্ণুসহস্রনাম-স্তোত্র) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে শোনালেনÑ
সুবর্ণবর্ণো হেমাঙ্গো বরাঙ্গশ্চন্দনাঙ্গদী।
সন্ন্যাসকৃচ্ছমঃ শান্তো নিষ্ঠাশান্তিপরায়ণঃ \
“ভগবান তপ্ত কাঞ্চনের মতো অঙ্গকান্তি ধারণ করে (গৌরসুন্দর রূপে) অবতীর্ণ হবেন। তাঁর সুন্দর রূপ তপ্ত কাঞ্চনের মতো এবং চন্দনে চর্চিত। তিনি সন্ন্যাস-আশ্রম অবলম্বন করে কঠোরভাবে আত্মসংযমী হবেন এবং মায়াবাদী সন্ন্যাসীদের মতো নির্বিশেষবাদী না হয়ে তিনি ভগবৎ-ভক্তিতে নিষ্ঠাপরায়ণ হবেন এবং সংকীর্তন আন্দোলনের সূচনা করবেন।”
পরে সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুকে সাতদিন ধরে বেদান্ত-দর্শন শ্রবণ করিয়েছিলেন। মহাপ্রভু তার ভ্রান্ত নির্বিশেষপর মায়াবাদী ব্যাখ্যা খণ্ডন করে বেদান্তের নির্ভুল সবিশেষ-তত্ত¡ ব্যাখ্যা করলেন এবং পরিশেষে তাঁকে ষড়ভুজরূপে দর্শন দান করে এক মহান ভক্তরূপে পরিণত করলেন। সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুর কৃপা প্রাপ্ত হয়ে তাঁকে একশো শ্লোকদ্বারা বন্দনা করেছিলেন। সার্বভৌম ভট্টাচার্যের মতো অনেকেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুই যে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তা জানতে পারেননি। কারণ ভগবানের কৃপা ছাড়া ভগবানকে জানা যায় না। শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র যে শচীসূতরূপে অবতীর্ণ হবেন তা ভবিষ্যৎ পুরাণেও উল্লেখ আছে-
অজায়ধ্বমজায়ধ্বজয়ধ্বং ন সংশয়ঃ।
কলৌ সংকীর্তনারম্ভে ভবিষ্যামি শচীসুতঃ \
“কলিযুগে সংকীর্তন আরম্ভে আমি শচীসূতরূপে জন্মগ্রহণ করব, জন্মগ্রহণ করব, জন্মগ্রহণ করব, সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।” শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (আদি ৩/৪০) উল্লেখ আছেÑ
কলিযুগে যুগধর্মÑনামের প্রচার।
তথি লাগি’ পীতবর্ণ চৈতন্যাবতার \
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখনই অবতীর্ণ হন, তখনই তিনি নবদ্বীপের অন্তর্দ্বীপে অন্তর্গত এই শ্রীধাম মায়াপুরে শচীমায়ের গর্ভে অবতীর্ণ হন। তবে শ্রীকৃষ্ণের মতো তিনিও প্রতি কলিযুগে অবতীর্ণ হন না। তিনি ব্রহ্মার দিবসে অর্থাৎ এক হাজার চতুর্যুগের মধ্যে একবার মাত্র অবতীর্ণ হন। সেই সম্বন্ধে শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (আদি ৩/১০) উল্লেখ করা হয়েছে-
অষ্টাবিংশ চতুর্যুগে দ্বাপরের শেষে।
ব্রজের সহিত হয় কৃষ্ণের প্রকাশে \
“বৈবস্বত মন্বন্তরের অষ্টাবিংশ চতুর্যুগের দ্বাপরের শেষভাগে কৃষ্ণ নিজে ব্রজতত্তে¡র সমস্ত উপকরণ সহ প্রকাশ পান।” সেই প্রকার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও দ্বাপরের পরেই কলিতেই অবতীর্ণ হন। তিনি এসে কি করেন? অনর্পিত বস্তু প্রদান করেন, যা ভগবানের অন্য কোন অবতার ইতিপূর্বে প্রদান করেননি। তা হচ্ছে কৃষ্ণপ্রেম, বিশেষ করে ব্রজের পরকীয়া মাধুর্য প্রেম, যাকে উন্নতোজ্জ্বল রস বলা হয়েছে।
Share:

প্রহ্লাদ মহারাজ কর্তৃক সহপাঠীদের উপদেশ


প্রহ্লাদ মহারাজ, যিনি ছিলেন যথার্থই মহা জ্ঞানী, তিনি তাঁর সহপাঠীদের অত্যন্ত মধুর বাক্যে সম্ভাষণ করে, হেসে জড়-জাগতিক জীবনের নিরর্থকতা সম্বন্ধে শিক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন। তাদের প্রতি অত্যন্ত কৃপাপরবশ হয়ে, তিনি তাদের নিম্নলিখিত উপদেশগুলি দিয়েছিলেন।[৭/৫/৫৫]


হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, সমস্ত বালকেরা প্রহ্লাদ মহারাজের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত এবং শ্রদ্ধাশীল ছিল। তাদের অল্প বয়সের ফলে, দ্বৈতভাব এবং দেহসুখের প্রতি আসক্ত শিক্ষকদের উপদেশের দ্বারা তাদের অন্তঃকরণ দূষিত হয়নি। তারা তাদের খেলার সমস্ত উপকরণ পরিত্যাগ করে, প্রহ্লাদ মহারাজের কথা শ্রবণ করার জন্য তাঁকে ঘিরে বসেছিল। তাদের হৃদয় এবং নেত্র তাঁর উপর নিবদ্ধ ছিল এবং গভীর নিষ্ঠা সহকারে তারা তাঁর দিকে তাকিয়ে তাঁর কথা শুনছিল। অসুরকুলে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও প্রহ্লাদ মহারাজ ছিলেন একজন মহাভাগবত, এবং তিনি তাদের মঙ্গল কামনা করেছিলেন। তার ফলে তিনি তাদের জড়-জাগতিক জীবনের নিরর্থকতা সম্বন্ধে উপদেশ দিতে শুরু করেছিলেন। [৭/৫/৫৬-৫৭]


দৈত্যবালকদের প্রতি প্রহ্লাদের উপদেশ


প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন-প্রাজ্ঞ ব্যক্তি মনুষ্যজন্ম লাভ করে জীবনের শুরু থেকেই, অর্থ্যাৎ বাল্যকাল থেকেই, অন্য সমস্ত প্রয়াস ত্যাগ করে ভাগবত-ধর্ম অনুষ্ঠান করবেন। মনুষ্যজন্ম অত্যন্ত দূর্লভ, এবং অন্যান্য শরীরের মতো অনিত্য হলেও তা অত্যন্ত অর্থপূর্ণ, কারণ মনুষ্য-জীবনে ভগবানের সেবা সম্পাদন করা সম্ভব। নিষ্ঠাপূর্বক কিঞ্চিৎমাত্র ভগবদ্ভক্তির অনুষ্ঠান করলেও মানুষ পূর্ণসিদ্ধি লাভ করতে পারে। [৭/৬/১]


মনুষ্য-জীবন ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার সুযোগ প্রদান করে। তাই প্রতিটি মানুষের অবশ্য কর্তব্য ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্মের সেবায় যুক্ত হওয়া। এই ভগবদ্ভক্তি স্বাভাবিক, কারণ ভগবান শ্রীবিষ্ণু সকলেরই পরম প্রিয়, পরমাত্মা এবং পরম সুহৃদ্। [৭/৬/২]


প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন-হে দৈত্য-কুলোদ্ভূত বন্ধুগণ, দেহের সঙ্গে ইন্দ্রিয়-বিষয়ের সংযোগবশত যে ইন্দ্রিয় সুখ তা যে কোন যোনিতেই পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে লাভ হয়ে থাকে। এই প্রকার সুখ আপনা থেকেই কোন রকম প্রচেষ্টা ছাড়াই লাভ হয়, ঠিক যেমন বিনা প্রয়াসে দু:খলাভ হয়।[৭/৬/৩]




ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ অথবা অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের মাধ্যমে জড়সুখ ভোগের প্রয়াস করা উচিত নয়, কারণ তার ফলে বাস্তবিক কোন লাভ হয় না, পক্ষান্তরে কেবল সময় এবং শক্তিরই অপচয় হয়। মানুষের প্রয়াস যদি কৃষ্ণভক্তির দিকে পরিচালিত হয়, তা হলে নি:সন্দেহে আত্ম-উপলব্ধির চিন্ময় স্তর প্রাপ্ত হওয়া যায়। অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনে যুক্ত হওয়ার ফলে কোন লাভ হয় না। [৭/৬/৪]


অতএব জড় জগতে অবস্থান কালে (ভবমাশ্রিতঃ) পূর্ণরূপে সুযোগ্য ব্যক্তির কর্তব্য সৎ এবং অসতের পার্থক্য নিরূপণ করে, যে পর্যন্ত এই পরিপুষ্ট মানব-শরীরটি রয়েছে, ততক্ষণ ভীত না হয়ে জীবনের চরম উদ্দেশ্য লাভের জন্য যত্নশীল হওয়া। [৭/৬/৫]


মানুষের আয়ু বড় জোর একশ বছর। কিন্তু যে ব্যক্তি অজিতেন্দ্রিয়, তার সেই একশ বছরের অর্ধেক সময় অনর্থক অতিবাহিত হয়, কারণ অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে, রাত্রিবেলায় সে বার ঘন্টা ঘুমিয়ে থাকে। অতএব এই প্রকার ব্যক্তির আয়ুষ্কাল মাত্র পঞ্চাশ বছর। [৭/৬/৬]


বাল্যকালে মোহগ্রস্ত অবস্থায় দশ বছর অতিবাহিত হয়। তেমনই, কৈশোরে খেলাধুলায় মগ্ন থেকে আরও দশ বছর অতিবাহিত হয়। এইভাবে কুড়ি বছর বিফলে যায়। তেমনই, বৃদ্ধ বয়সে জরাগ্রস্ত হয়ে জড়-জাগতিক কার্যকলাপ অনুষ্ঠান করতে অক্ষম হওয়ার ফলে, আরও কুড়ি বছর বৃথা অতিবাহিত হয়। [৭/৬/৭]


যার মন এবং ইন্দ্রিয় অসংযত, তার অতৃপ্ত কামনা এবং প্রবল মোহের ফলে, পারিবারিক জীবনের প্রতি সে অত্যন্ত আসক্ত হয়। এই প্রকার উন্মত্ত ব্যক্তির বাকি জীবনও বিফলে যায়, কারণ সেই কয়টি বছরেও সে ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হতে পারে না। [৭/৬/৮]


গৃহস্থ-জীবনের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত কোন্ অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি মুক্ত হতে সমর্থ হয়? গৃহাসক্ত ব্যক্তি তার স্ত্রী-পুত্র এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের প্রতি স্নেহরূপ রজ্জুর দ্বারা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ। [৭/৬/৯]


ধন মানুষের এতই প্রিয় যে, সে ধনকে মধু থেকেও মধুরতর বলে মনে করে। তাই, সে ধন সংগ্রহের বাসনা কে ত্যাগ করতে পারে, বিশেষ করে গৃহস্থ-জীবনে? তস্কর, পেশাধারী ভৃত্য (সৈনিক)এবং বণিক-এরা নিজের প্রিয়তম প্রাণকে বিপন্ন করেও অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করে।[৭/৬/১০]


যে ব্যক্তি তার পরিবারের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, যার অন্তরের অন্তঃস্থল সর্বদা তাদের চিত্রে পূর্ণ, সে কিভাবে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে পারে? বিশেষত, স্নেহশীলা এবং সহানুভূতিশীলা পত্নীর নির্জন সঙ্গ স্মরণ করলে, কে তাকে পরিত্যাগ করতে পারে? শিশুদের মধুর আধো আধো বুলি স্মরণ করলে কোন্ স্নেহশীল পিতা তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করতে পারে? বৃদ্ধ পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা এরা সকলেই অত্যন্ত প্রিয়। কন্যা বিশেষ করে পিতার অত্যন্ত প্রিয় হয়, এবং যখন সে তার পতিগৃহে চলে যায়, তখন তার কথা পিতার সব সময় মনে হয়। সেই সঙ্গ কে পরিত্যাগ করতে পারে? আর তা ছাড়া গৃহে নানা রকম ভোগের উপকরণ থাকে, গৃহপালিত পশু এবং ভৃত্য থাকে। সেই সুখ কে পরিত্যাগ করতে পারে? গৃহাসক্ত ব্যক্তির অবস্থা ঠিক রেশমকীটের মতো, যে কোষ সে তৈরি করে, সেই কোষে বন্দী হয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারে না। কেবল জিহ্বা এবং উপস্থ-এই দুটি ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধনের জন্য মানুষ এই জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিভাবে সে তা থেকে মুক্তিলাভ করতে পারে? [৭/৬/১১-১৩]


যে ব্যক্তি অত্যন্ত আসক্ত সে বুঝতে পারে না যে, তার কুটুম্ব ভরণ-পোষণে সে তার জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় করছে। সে এও বুঝতে পারে না যে, পরম সত্যকে উপলব্ধি করার অত্যন্ত অনুকূল এই মনুষ্যজীবন সে অনর্থক নষ্ট করছে। কিন্তু, সে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা এবং সাবধানতার সঙ্গে দেখে যে, একটি পয়সাও যেন অনর্থক নষ্ট না হয়। এইভাবে জড় বিষয়াসক্ত ব্যক্তি নিরন্তর ত্রিতাপ দু:খ ভোগ করা সত্ত্বেও তার জড় অস্তিত্বের প্রতি বিতৃষ্ণা বোধ করে না।[৭/৬/১৪]


যদি কোন ব্যক্তি তার কুটুম্ব ভরণ-পোষণের কর্তব্যের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়, তা হলে সে তার ইন্দ্রিয়গুলি বশীভূত করতে পারে না এবং তার মন সর্বদাই ধন সংগ্রহের চিন্তায় মগ্ন থাকে। যদিও সে জানে যে পরের ধন অপহরণ করার ফলে সে আইনের দ্বারা দণ্ডিত হবে এবং মৃত্যুর পর যমরাজের আইনে দণ্ডভোগ করবে, তবুও সে ধন সংগ্রহ করার জন্য অন্যদের প্রতারণা করতে থাকে। [৭/৬/১৫]


হে বন্ধু, দানব-নন্দনগণ! এই জড় জগতে আপাতদৃষ্টিতে বিদ্বান ব্যক্তিরাও মনে করে, “এটি আমার এবং ওটি অন্যের।” তার ফলে তারা সর্বদাই অশিক্ষিত কুকুর-বিড়ালের মতো তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য জীবনের আবশ্যকতাগুলি প্রদান করার কাজে সর্বদা ব্যস্ত থাকে। তারা আধ্যাত্মিক জ্ঞান গ্রহণ করতে পারে না। পক্ষান্তরে তারা অজ্ঞানের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন হয়। [৭/৬/১৬]


হে আমার বন্ধু দৈত্যনন্দনগণ, কোন দেশে অথবা কোন কালে ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান-বিহীন ব্যক্তি নিজেকে জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে পারেনি। পক্ষান্তরে সেই সমস্ত ভগবদ্বিমুখ ব্যক্তিরা জড়া প্রকৃতির নিয়মে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। তারা প্রকৃতপক্ষে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের প্রতি আসক্ত, এবং তাদের একমাত্র লক্ষ্য স্ত্রীসম্ভোগ। বস্তুতপক্ষে তারা সুন্দরী রমণীর হস্তে ক্রীড়ামৃগতুল্য। এই প্রকার জীবনের শিকার হয়ে তারা পুত্র, পৌত্র এবং প্রপৌত্রদের দ্বারা পরিবোষ্টিত হয়, এবং এইভাবে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। যারা এই প্রকার জীবনের প্রতি আসক্ত, তাদের বলা হয় অসুর। অতএব, যদিও তোমরা দৈত্যনন্দন, সেই প্রকার ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাক এবং আদিদেব ভগবান শ্রীনারায়ণের শরণ গ্রহণ কর। কারণ নারায়ণের ভক্তদের চরম লক্ষ্য জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া। [৭/৬/১৭-১৮]


হে অসুর-নন্দনগণ, পরমেশ্বর ভগবান নারায়ণই সমস্ত জীবের মূল পরমাত্মা এবং পরম পিতা। তাই তাঁকে সন্তুষ্ট করতে অথবা তাঁর আরাধনা করতে বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে কারুরই কোন রকম প্রতিবন্ধকতা নেই। জীব এবং ভগবানের সম্পর্ক সর্বদাই বাস্তব, এবং তাই অনায়াসে ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করা যায়। [৭/৬/১৯]


পরম ঈশ্বর ভগবান যিনি অচ্যুত এবং অব্যয়, তিনি বৃক্ষলতা আদি স্থাবর জীব থেকে শুরু করে ব্রহ্মা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার জীবের মধ্যে বিরাজমান। তিনি নানা প্রকার জড় সৃষ্টিতে, জড় উপাদানে, মহত্তত্ত্বে, প্রকৃতির গুণে (সত্ত্বগুণ, রজোগুণ এবং তমোগুণ), অব্যক্ত প্রকৃতিতে এবং অহংকারেও বিরাজমান। তিনি যদিও এক, তবুও তিনি সর্বত্র বিরাজমান, এবং তিনি চিন্ময় পরমাত্মা এবং সর্বকারণের পরম কারণ, যিনি সমস্ত জীবের অন্তরে সাক্ষীরূপে বিরাজ করেন। তাঁকে ব্যাপ্য এবং সর্বব্যাপ্ত পরমাত্মা বলে ইঙ্গিত করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি বর্ণনাতীত। তিনি অবিকারী এবং অবিভাজ্য। তাঁকে কেবল পরম সচ্চিদানন্দরূপে অনুভব করা যায়। নাস্তিকদের কাছে মায়ার আবরণে আচ্ছাদিত থাকার ফলে, তারা মনে করে যে তাঁর অস্তিত্ব নেই। [৭/৬/২০-২৩]


অতএব দৈত্য কুলোদ্ভুত আমার বালক বন্ধুগণ, তোমরা সকলে এমনভাবে আচরণ কর যাতে অধোক্ষজ ভগবান তোমাদের প্রতি প্রসন্ন হন। তোমাদের আসুরিক প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে শত্রুতা এবং দ্বৈতভাব রহিত হয়ে কর্ম কর। ভগবদ্ভক্তির জ্ঞান প্রদান করে সমস্ত জীবের প্রতি তোমাদের করুণা প্রদর্শন কর, এবং এইভাবে তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী হও। [৭/৬/২৪]


সর্বকারণের পরম কারণ, সবকিছুর আদি উৎস ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করেছেন যে সমস্ত ভক্তেরা, তাঁদের পক্ষে কিছুই অপ্রাপ্য নয়। ভগবান অন্তহীন চিন্ময় গুণের উৎস। তাই, গুণাতীত ভক্তদের কাছে ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মুক্তির প্রচেষ্টা করার কি প্রয়োজন-যা প্রকৃতির গুণের প্রভাবে আপনা থেকেই লাভ হয়? আমরা ভগবদ্ভক্তেরা সর্বদাই ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের মহিমা কীর্তন করি, এবং তাই আমাদের ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ আদির বাসনা করার কোন প্রয়োজন হয় না। [৭/৬/২৫]


ধর্ম, অর্থ এবং কাম-এই তিনটিকে বেদে ত্রিবর্গ বা মোক্ষ লাভের তিনটি উপায় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই তিনটি বর্গের মধ্যেই আত্ম-উপলব্ধির বিদ্যা, বৈদিক নির্দেশ অনুসারে কর্ম অনুষ্ঠানের পন্থা, তর্কশাস্ত্র, দণ্ডনীতি এবং জীবিকা নির্বাহের বিভিন্ন বৃত্তি নিহিত রয়েছে। এগুলি বেদ অধ্যয়নের বাহ্য বিষয়, এবং তাই আমি এগুলিকে জড়-জাগতিক বলে মনে করি। কিন্তু, পরম পুরুষ শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্মে আত্ম-নিবেদনের পন্থাকে আমি দিব্য বলে মনে করি। [৭/৬/২৬]


সমস্ত জীবের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সুহৃদ ভগবান প্রথমে এই দিব্য জ্ঞান দেবর্ষি নারদকে উপদেশ দিয়েছিলেন। নারদ মুনির মতো মহাত্মার কৃপা ব্যতীত এই জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু যিনি শ্রীনারদ মুনির পরম্পরার শরণ গ্রহণ করেন, তিনি এই গুহ্য জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। [৭/৬/২৭]


প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন-এই জ্ঞান আমি দেবর্ষি নারদ মুনির কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়েছি, যিনি সর্বদা ভগবানের সেবায় যুক্ত। এই জ্ঞান, যাকে বলা হয় ভাগবত-ধর্ম, তা সর্বতোভাবে বিজ্ঞানসম্মত। তা ন্যায় এবং দর্শনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, এবং সমস্ত জড় কলুষ থেকে মুক্ত।[৭/৬/২৮]


দৈত্যনন্দনেরা বলল-হে প্রহ্লাদ, তুমি অথবা আমরা শুক্রাচার্যের পুত্র ষণ্ড এবং অমর্ক ব্যতীত অন্য কোন গুরুকে জানি না। আমরা শিশু এবং তারা আমাদের নিয়ন্তা। বিশেষ করে তোমার পক্ষে, যে সর্বদা প্রাসাদে থাকে, তার মহাত্মার সঙ্গ করা অত্যন্ত কঠিন। হে সৌম্য, দয়া করে আমাদের বল কিভাবে তুমি নারদ মুনির উপদেশ শ্রবণ করেছিলে? দয়া করে আমাদের এই সংশয় দূর কর। [৭/৬/২৯-৩০]
Share:

আমেরিকায় মন্দির ও হিন্দুরা

১১-ই সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩ সন। শিকাগো বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনের প্রাঙ্গন। গৈরিক বসনধারী দীর্ঘকায় এক পুরুষ মঞ্চে উঠে বললেন -  “I thank you in the name of the millions of Hindu people of all classes and sects."  দূর সাগরের পারে আমেরিকায় জনসমাজের সম্মূখে তিনি হিন্দুধর্মকে পরিচিত করালেন - "I am proud to belong to a religion which has taught the world both tolerance and universal acceptance. We believe not only in universal toleration, but we accept all religion as true." গম্ভীর মন্দ্র স্বরের বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে স্ত্রোত্র উচ্চারণের মাধ্যমে তিনি তাঁর ভগবৎ বিশ্বাসের কথা শোনালেন উপস্থিত শ্রোতৃমন্ডলীকে - “As the different streams having their sources in different places all mingle their water in the sea, O Lord, the different paths which men take through different  tendencies, various though they appear, crooked or straight, all lead to Thee." পৌত্তলিকতার বাইরে হিন্দুধর্মের মূলকথা যে পরধর্মসহিষ্ণুতা ও মনুষ্যত্বের ভজনা, সেই কথাই বিশ্ববাসীর সামনে বলে রাখলেন, - “I fervently hope that the bell that tolled this morning in honor of this convention may be the death-knell of all fanaticism, of all persecution with the sword or with the pen, and of all uncharitable feelings between persons wending their way to the same goal." এই ব্যক্তি আর কেউই নন - তিনি পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবশিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ।

যদিও বিবেকানন্দই সেই ব্যক্তি যিনি আমেরিকার বুকে হিন্দুধর্মকে সরাসরি পরিচিত করিয়েছিলেন, কিন্তু অনেকেই একথা মনে করেন যে হিন্দুধর্মের চর্চা অভিবাসীদের মাধ্যমে এদেশে ছিল প্রায় এর জন্মলগ্ন থেকেই। যদিও এই ধারণার বাস্তব ভিত্তি কতটা, সেটা তর্কসাপেক্ষ। তবে আমেরিকানদের সঙ্গে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির পরিচয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় আরও অনেক আগে। তৎকালীন আমেরিকার বিদ্বৎসমাজের দুই প্রতিভূ - Ralph Waldo Emerson এবং Henry David Thoreau - শ্রীমৎভাগবত গীতা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করছিলেন সেই সময়। সেই সময়কার বিভিন্ন চিঠিপত্র ও পত্রপত্রিকায় এই দুই লেখক ভবগত গীতা সম্পর্কে তাঁদের গবেষণালব্ধ চিন্তা ও সমীক্ষার অনেক নিদর্শন রেখে গেছেন। “Over Soul” নামে একটি প্রবন্ধে Ralph-এর চিন্তায় বেদিক দর্শনের প্রভাব পরিস্কার লক্ষ্যণীয়। তাঁরা দুজনেই একমত হয়ে বলেছিলেন গীতা এশীয় সংস্কৃতির এক অনবদ্য অবদান। গীতার দার্শনিক মূল্য যেমন অনস্বীকার্য্য, তেমনি আত্মোপলব্ধি, আত্মনুসন্ধান ও আত্মসংযম অভ্যাসের ক্ষেত্রেও গীতার তাৎপর্য্য অপরিসীম। শিকাগোর বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনের প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা এসব।

বিশ্ব ধর্মসম্মেলনোত্তর স্বামী বিবেকান্দের উদ্যোগই আমেরিকার বুকে হিন্দুধর্মকে পরিচিত করানোর প্রথম সংঘবদ্ধ উদ্যোগ একথা বললে অত্যুক্তি হয় না। মন্দির তখন আমেরিকাতে ছিল না। শিকাগোর মহাসম্মেলনের পর স্বামীজী আরও বছর দুই এদেশে কাটিয়েছিলেন এবং বস্টন, ডেট্রয়েট, নিউ ইয়র্ক প্রভৃতি অঞ্চলে বক্তৃতা করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে স্বামীজী নিউ ইয়র্কে ‘বেদান্ত সোসাইটি’ স্থাপন করলেন। বলা চলে এইটি আমেরিকার বুকে হিন্দু মন্দির স্থাপনের প্রথম ধাপ। সেই সময় এদেশীও অভিবাসীদের মধ্যে বেদান্ত-দর্শনের চর্চাই ছিল এই সোসাইটির উদ্দেশ্য। এর অব্যবহিত পরেই বাবা প্রেমানন্দ সরস্বতী আমেরিকায় থেকে প্রায় বছর পাঁচেক ধরে হিন্দু ধর্মের শিক্ষা নিয়ে বক্তৃতা করলেন এবং অবশেষে ‘কৃষ্ণসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করলেন। স্বামী পরমানন্দ বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নিউ ইর্য়ক বেদান্ত সোসাইটির দায়িত্বভার নিয়ে এলেন এবং শেষ পর্য্যন্ত বস্টন এবং লস এঞ্জেলেস-এ বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করলেন।

বলা হয়ে থাকে যে আমেরিকার প্রথম হিন্দু মন্দির স্থাপিত হয়েছিল ১৯০৬ সালে সান ফ্রান্সিস্কোতে। বেদান্ত সোসাইটির উদ্যোগে। তারপর আরও দুটি মন্দিরের কথা জানা যায়। ১৯৩৮ সালে হলিউড মন্দির ও ১৯৫৬ সালে সান্টা বারবারা মন্দির। যেহেতু এই সব মন্দিরগুলো স্থাপিত হয়েছিল বেদান্ত সোসাইটির তত্বাবধানে, এদের মূল লক্ষ্য ছিল বেদান্ত দর্শন এবং হিন্দু শাস্ত্র পঠন পাঠন। বেদান্তের শিক্ষার প্রধান কথা আত্মোপলব্ধি এবং মূল মন্ত্র হল মানুষই ঈশ্বর। পৌত্তলিক বিগ্রহ পূজা বেদান্তের লক্ষ্য নয়। তাই হিন্দু ধর্মবালম্বী যে সব সম্প্রদায় শিব, বিষ্ণু, নারায়ণ ইত্যাদি বহুরুপে ঈশ্বরের ভজনায় অভ্যস্ত, তাদের স্বদেশীয় মন্দিরের ধারনার সঙ্গে বেদান্তের ধারণার তফাৎ রয়েই গেল। অভাব পূরণ হল না। দেশের মত অপরূপ স্থাপত্য- ভাস্কর্য্যের মহিমামন্ডিত বিগ্রহ মন্দির গঠনের ইচ্ছা অভিবাসীদের মনে জেগে রইল তখনকার মত। সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না কেন না সেইরকম মন্দির গড়বার জন্য যে বিপুল অর্থ ও লোকবল দরকার, আমেরিকায় তখনও তা ছিল না। অভিবাসী হিন্দুর সংখ্যা তখনও আমেরিকায় নগন্যই বলা চলে।

১৯৬৫ সালে Immigration and Nationality Services (INS) Act চালু হওয়ার পর আমেরিকায় অভিবাসনের দরজা যেন খুলে গেল। ছাত্র, গবেষক, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ এবং ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে এদেশে আসতে শুরু করলেন এবং এদেশেই পাকাপাকি ভাবে বসবাস করতে শুরু করলেন। এদের সঙ্গে সঙ্গেই সম্প্রদায়ের ধর্মপ্রচারকেরাও। আবারও বলা ভাল এই প্রচার যতটা না ছিল আমেরিকার মূল স্রোতের মধ্যে হিন্দু র্ধম ও দর্শন সম্বন্ধে উৎসাহ জাগিয়ে তোলা, ততটা ছিল এদেশীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মাচরণের প্রয়োজনীয়তা মেটানো। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউ ইয়র্কে এসে পৌছালেন স্বামী প্রভুপাদ। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন -  ISKCON- International Society for Krishna Consciousness.

সনাতন ভারতীয় হিন্দু ভাবধারায় মূলতঃ দু’টি দিক দেখা যায়। প্রথমটি - ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ এবং দ্বিতীয়টি, প্রতিষ্ঠানিক এবং পূজারী নির্ভর ধর্মাচরণ এবং পূজাবিধি। প্রথমটির কোন প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই। দ্বিতীয়টির জন্য দেবস্থান বা মন্দির এবং পুরোহিত দরকার। আমেরিকাতেও হিন্দু ধর্ম-প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোটামুটি এই দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। বেদান্ত সোসাইটির মত আর যে সব প্রতিষ্ঠান এখানে যোগাভ্যাস, ধ্যান এবং হিন্দু শাস্ত্র পঠন পাঠনের ব্যবস্থা রেখেছে তারা প্রথম শ্রেণীভূক্ত।

১৯৬৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকাতে প্রধানতঃ এই ধারারই প্রচলন দেখা গেছে। ১৯৬৫ সালের পর প্রতিষ্টিত ইস্কন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচরণের প্রথম ক্ষেত্র বলা যেতে পারে। চৈতন্য-অনুসারী কৃষ্ণ-প্রেম ও ভক্তিই এদের মূল দর্শন। কৃষ্ণই প্রধান বিগ্রহ।  এদের বেশীর ভাগ ভক্তকুলই উত্তর ভারতীয়। যদিও এদের বেশ কিছু সংখ্যক অভারতীয় ভক্ত সম্প্রদায় আছেন। ভক্তরা মন্দিরে মিলিত হয়ে ‘হরেকৃষ্ণ’ মন্ত্রোচ্চারণ, ভক্তি-সঙ্গীত গায়ন এবং আরতি ও পূজাপাঠের মাধ্যমে ঈশ্বরের আশীর্বাদ অভিলাষী। আরতি-গান -কীর্তনের পর প্রসাদ বিতরণ। বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে ধর্মীয় ও তাত্বিক অনুশাসন সম্পর্কিত বক্তৃতাও চলে।

১৯৬৫ সালের পর থেকে, বিশেষ করে গত শতকের আশির দশকের পর থেকে অসংখ্য প্রযুক্তিবিদ এবং ছাত্র ভারত থেকে এদেশে এসেছেন। তার সঙ্গে আছে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। এই বিপুল সংখ্যক হিন্দু অভিবাসীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর্থিকভাবে সচ্ছল। দেশের মাটি থেকে বহুদূরে থাকার জন্যই তারা স্বদেশের বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান ও ধর্মাচরণ বিধির জন্য আকর্ষণ বোধ করেন। মূলতঃ এই শ্রেণীর উদ্যোগেই আমেরিকায় একের পর এক মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়ে চলেছে। পরিসংখ্যান বলে যে সারা উত্তর আমেরিকা জুড়ে হিন্দু মন্দিরের সংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে চারশো। বোর্ড অফ ট্রাষ্টি পরিচালিত এই সব মন্দিরের পূজা-বিধির ভার ন্যাস্ত থাকে দেশ থেকে আগত পূজারী বা পুরোহিতের উপর। অধিকাংশ মন্দিরের স্থাপত্য ভাস্কর্য্য ও বাহ্যিক শোভায় দেশের বিশিষ্ট মন্দিরের অনুকরন দেখা যায়। এই শ্রেণীর প্রথম মন্দির পিটসবার্গের শ্রী ভেস্কটেশ মন্দির। স্থাপিত জুন, ১৯৭৬ সালে। তার পরের বছরই নিউ ইয়র্কের ফ্লাশিং-এ প্রতিষ্ঠা হল শ্রী গণপতি দেবস্থানম। ১৯৮১-তে ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যালিব্যু হিন্দু মন্দির। এরই প্রায় সমসাময়িক লিভারমুরের (ক্যালিফোর্নিয়া) শিব-বিষ্ণু মন্দির। ১৫-ই জুন, ১৯৮৫।

মন্দির বলতে প্রথমেই ধর্মাচরণের স্থান মনে আসে। মন্দির মানে দেবস্থান, দেবতার বাসগৃহ। পূজা-অর্চনা ছাড়া আর কিছু মন্দিরের আওতায় আসে না। দেশের প্রেক্ষিতে এই ধারণা সর্বাংশে সত্য হলেও আমেরিকার হিন্দু মন্দিরে দু’টি অন্য মাত্রা যোগ হয়েছে। প্রথমতঃ মন্দিরের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দ্বিতীয়তঃ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন। একথা বলে রাখা ভাল আমেরিকায় হিন্দু মন্দিরের  এই বিপুল সংখ্যা কিন্তু কোনভাবেই প্রমান করে না যে হিন্দু ধর্ম বা বিশ্বাস আমেরিকার মূলস্রোতে বিরাট প্রভাব ফেলেছে। বরঞ্চ বলা যেতে পারে এইসব মন্দির ও তাদের কার্য্যকলাপ বিপুল সংখ্যাক ভারতীয় হিন্দু অভিবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে যে শূন্যতা ছিল তা পূরণে সর্মথ হয়েছে। অবশ্য সারা আমেরিকা জুড়ে মন্দিরের প্রসার ও বিস্তারের ফলে আমেরিকার মূলস্রোতে হিন্দু ধর্ম যে কিছুটা হলেও পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সেটা স্বীকার না করলে মিথ্যা ভাষণ হবে। তার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ২০০৭-এর ১২ই জুলাই আমেরিকার সিনেটে প্রথম হিন্দু শাস্ত্র থেকে প্রার্থনা ও মন্ত্রোচ্চারণ। প্রার্থনা পরিচালনা করেছিলেন  Rajan Zed, নেভাডার এক হিন্দু ধর্মযাজক। আমেরিকার ২১৮ বছরের সিনেটের ইতিহাসে এ রকম ঘটনার নজির আর নেই।

যাই হোক, আমেরিকার পটভূমিতে এই মন্দিরগুলি প্রধানত চারটি দায়িত্ব পালন করে থাকেঃ

১)  নিজেদের শেকড় ও সংস্কৃতি সম্বদ্ধে জনচেতনা গড়ে তোলার এবং সেই ভিত্তির উপর এক নতুন চিন্তা ও দর্শনের উদ্ভবের পথ সুগম করে তোলা।
২)  অপেক্ষাকৃত তরুণ সমাজের কাছে শাশ্বত হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির বিশ্বাস ও অনুশাসনগুলিকে সহজবোধ্য উপায়ে তুলে ধরা যাতে করে ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোঁড়া ধর্মীয় প্রচেষ্ঠাকে চিনে নেওয়া যায়।
৩)  হিন্দু ধর্মের আদর্শকে আমেরিকার প্রেক্ষিতে ব্যবহার করে এখানকার জনজীবনের সমস্যার গভীর অসুসন্ধান ও সমাধানের পথনির্দেশ।
৪)  হিন্দু ধর্মের মানবিক ও দার্শনিক চিন্তাভাবনার সাথে অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসের মেলবদ্ধনের প্রচেষ্টা।

একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে যে মন্দিরগুলি এখানে যতটাই ধর্মীয় উৎসব-অনুশাসনের চর্চার ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হয়, ঠিক ততটাই ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়। প্রায় বেশীরভাগ মন্দির কমিটির সঙ্গে ÔCultural Center' কথাটির ব্যবহার এই ধারণাকে সমর্থন করে। প্রায়শই দেখা যায় মন্দিরের একটি নিজস্ব কম্যুনিটি হল থাকে যা কিনা মন্দিরের নিজস্ব ব্যবহারের বাইরে অন্যান্য সংস্থার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ ক্যালফোর্নিয়ার সাভিনেল হিন্দু মন্দির ও কালচারাল সেন্টার, লিভারমুর শিব-বিষ্ণু মন্দিরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। লিভারমুর মন্দির সংস্থা-তে সংস্কৃত ভাষা ও যোগ ব্যায়াম শিক্ষার ব্যবস্থাও রেখেছে। স্যান লিয়ান্ড্রোর বদরিকাশ্রম তাদের প্রাঙ্গন উন্মুক্ত রেখেছেন নৃত্য-গীত ও অন্যান্য শিল্পকলার চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবে। পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি এখানে নিয়মিত সাঙ্গীতিক ও নৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। খরা-বন্যা-ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় এইসব মন্দিরগুলি ত্রাণের ব্যবস্থা করে সাহায্যের হাত বাড়ায়। সে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশেই হোক বা ছেড়ে আসা দেশে। অনেক মন্দির ভারতের দুঃস্থ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য স্কুল চালায় বা চালানোতে সাহায্য করে।

হিন্দু ধর্মে ধর্মীয় অনুসাশন এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক-দৈনন্দিন জীবন এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে একটিকে অন্যের থেকে আলাদা করাই ভার। আমেরিকার হিন্দু মন্দিরগুলি এই মেলবন্ধনের কাজটি প্রায় নিখুঁত ভারসাম্য রেখে করে চলেছে। তাই ফ্রিমন্ট মন্দির যখন রথযাত্রার আয়োজন করে, সেখানে জগন্নাথ পূজো ছাপিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও মেলামেশার দিকটি আগে চলে আসে। লিভারমুরের দূর্গাপূজোয় বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশিষে যোগদান এবং আনুষঙ্গিক সাংস্কৃতিক চর্চা এটিকে দেবস্থানের বাইরে এক মিলন মেলায় পরিণত করে। একথা অল্পবিস্তর আমেরিকার প্রায় অধিকাংশ মন্দির সম্বন্ধেই প্রযোজ্য।

পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আমেরিকার মন্দিরগুলি জ্ঞান ও মুক্ত চিন্তার বিকাশে আরও সক্রিয় হবে এই আশা রাখি। স্বদেশের অনেক মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে হয় অসংখ্য গলি-ঘুঁজি ও গুহা-অন্ধকার পেরিয়ে। আমেরিকার হিন্দু মন্দিরগুলির গর্ভগৃহ তুলনায় অনেক সুগম। মন্দিরের অন্দরমহল প্রশস্ত ও অনেক উন্মুক্ত। সুপবন বয়ে যাবার সুযোগ অনেক। সেই সুপবন হিন্দু মন্দির ছাপিয়ে সমস্ত মানুষের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নকে আন্দোলিত করুক-মুক্ত চিন্তার ভূমি আমেরিকার হিন্দু মন্দিরগুলির সেটাই হবে সার্থকতার নিদর্শন।

তথ্যসূত্রঃ

১. Excerpt from Swami Vivekananda's speech in Chicago, 1893.
২. Wood, Angela, "Hindu Temple"
৩. Pechilis, Karen, "The pattern of Hinduism and Hindu Temple building in the U.S"
৪. Kolapen, Mahalingum, "Hindu Temple in North America: A Celebration of Life."


লিখেছেনঃ প্রদোষ কান্তি সরকার
প্রবাসের সংগঠন ‘সংস্কৃতি’র কর্ণধার ও প্রবাসের নাট্য আন্দোলনের পুরোধা।
ফ্রিমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া
নভেম্বর ২, ২০০৯
Share:

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৪

মহালয়া আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ- এ যেন একই সূত্রে গাঁথা দুটি মুক্তা


১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসিত ভারতে All India Radio Medium Wave প্রচার তরঙ্গে এই অনুষ্ঠানের সূচনা। শুরু হয়েছিল নিছক একটি experiment হিসেবেই, হয়ে গেল কিংবদন্তী। কোন বেতার তরঙ্গে নিয়ম করে এতদিন ধরে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হওয়া, সারা বিশ্বে এমন নজির কোথাও নেই। আপামর বাঙ্গালিদের হৃদয়ের মণিকোঠায় চিরকালের জন্য অমর হয়ে রইল বাণীকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সুরারোপিত এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র দ্বারা উচ্চারিত শ্রীশ্রীচণ্ডীর শ্লোকসমূহ।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৩৪ সালে দুর্গাপূজার ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় প্রচারিত হয় দেবী মাহাত্ম্য বিষয়ক এক সঙ্গীত আলেখ্য। এটি প্রচারিত হবার পর অবিভক্ত বাংলায় ব্যাপক সাড়া ফেলে। তারপরই জন্ম নেয় আজকের "মহিষাসুরমর্দিনী।" প্রথমদিকে রেকর্ডিঙের ব্যবস্থা না থাকায় মহালয়ার ভোরে সব শিল্পীদের নিয়ে আকাশবাণীর গারস্টিন প্লেসের পুরাতন স্টুডিও থেকে এটি সরাসরি সম্প্রচারিত হত। রাশভারী বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে তখনকার দিনের তাবড় তাবড় শিল্পী ও কলাকুশলীরা সকলেই ভয় ও সমীহ করে চলতেন। তাঁর নির্দেশে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, শিপ্রা বসু, মানবেন্দ্র ইত্যাদি সঙ্গিত মহলের বিশিষ্ট নক্ষত্ররা রাত ৩টের মধ্যেই স্টুডিওতে এসে হাজির হয়ে যেতেন। ঠিক ৪টে থেকে শুরু হত অনুষ্ঠানটি।

সত্তরের দশকে আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের এই "মহিষাসুরমর্দিনী" বাতিল করে মহানায়ক উত্তমকুমারকে দিয়ে ভাষ্যপাঠ করিয়ে নবরূপে এই অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠান শেষে ভয়ংকর জনরোষ দেখা দেয়। কর্তৃপক্ষের কাছে অজস্র চিঠি আসতে থাকে। খ্যাতির মধ্যগগনে থাকা মহানায়ককেও বিপুল তিরস্কার হজম করতে হয়েছিল এই দুঃসাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। শোনা যায়, উত্তমকুমার নিজে গিয়ে এর জন্য বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছে ক্ষমা চেয়ে এসেছিলেন। আকাশবাণী দ্বিতীয়বার আর উত্তমকুমারের সেই অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করার সাহস করেনি। পরের বছর হতে পুনরায় "মহিষাসুরমর্দিনী" ফিরে আসে, আজও যা নতুন, আজও যা হ্রদয়গ্রাহী। পূজা এলেই যেন হৃদয়তন্ত্রীতে আপনেই বেজে ওঠে সেই চিরপরিচিত সুর-

"রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিশো জহি............ "

---Tamojit

Collected from: Fans of Durga Puja
Share:

০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪

স্বামী বিবেকানন্দের দুর্গাপুজো পর্ব-০২



এরপর দীর্ঘদিন কেটে গেছে। পুজোর সময়ও এসে গেল। কিন্তু পুজোর এক সপ্তাহ আগেও এ নিয়ে কোনও কথাবার্তা বা উদ্যোগ দেখা গেল না। হয়ত এ বারও বিবেকানন্দের ইচ্ছাটির পূরণ হল না। কিন্তু হঠাৎই একদিন, তখন পুজোর আর মাত্র চার-পাঁচ দিন বাকি, স্বামীজি কলকাতা থেকে নৌকা করে বেলুড়মঠে ফিরেই ‘রাজা কোথায়? রাজা কোথায়?’ বলে স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজের খোঁজ করতে লাগলেন। (স্বামী ব্রহ্মানন্দকে স্বামী বিবেকানন্দ রাজা বলে সম্বোধন করতেন)। স্বামী ব্রহ্মানন্দকে দেখতে পেয়েই বিবেকানন্দ বলে উঠলেন, ‘এবার মঠে প্রতিমা এনে দুর্গাপূজা করতে হবে, তুমি সব আয়োজন করে ফেল।’ সবে আর মাত্র চার-পাঁচটা দিন বাকি রয়েছে। এত কম সময়ের মধ্যে সব আয়োজন কীভাবে করবেন, প্রতিমাই বা পাওয়া যাবে কি না, এই সব ভেবে ব্রহ্মানন্দজি বিবেকানন্দের কাছে দুটো দিন সময় চাইলেন। বিবেকানন্দ বললেন, ‘আমি ভাব-চক্ষে দেখেছি এবার মঠে দুর্গোৎসব হচ্ছে এবং প্রতিমায় মার পূজা হচ্ছে।’ স্বামী ব্রহ্মানন্দজিও তাঁর এক অদ্ভুত কথা স্বামী বিবেকানন্দকে জানালেন। দিন চারেক আগের ঘটনা। ব্রহ্মানন্দজি বেলুড়মঠের গঙ্গাতীরে বসেছিলেন। হঠাৎই দেখলেন দক্ষিণেশ্বরের দিক থেকে মা দুর্গা গঙ্গা পার হয়ে মঠের বেলগাছতলায় এসে উঠলেন।

স্বামীজি আর ব্রহ্মানন্দ মহারাজের মধ্যেকার এই সব কথাবার্তা বেলুড়মঠের অন্যান্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তেই বেশ হই হই পড়ে গেল। ব্রহ্মানন্দ মহারাজ ব্রহ্মাচারী কৃষ্ণলালকে কলকাতার কুমারটুলিতে পাঠালেন কোনও প্রতিমা পাওয়া যাবে কি না দেখে আসতে। আর কী আশ্চর্য! ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল কুমারটুলিতে গিয়ে দেখলেন যে মাত্র একটিই সুন্দর প্রতিমা সেখানে অবশিষ্ট রয়েছে। যিনি বা যাঁরা সেই প্রতিমাটি তৈরি করতে দিয়েছিলেন, সে দিনও পর্যন্ত তাঁরা সেটি নিতে আসেননি। ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল শিল্পীকে ওই প্রতিমাটি পাওয়া যাবে কি না জিজ্ঞাসা করতে শিল্পী একটি দিন দেখে নেওয়ার সময় চাইলেন। বেলুড়মঠে ফিরে এসে এই খবর স্বামী বিবেকানন্দকে জানাতেই তিনি ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলালকে বললেন, ‘যেমন করেই হোক তুমি প্রতিমাখানি নিয়ে আসবে।’
....................................... মণীশ সিংহরায়


ক্রমশ..........................................।
সংগ্রহেঃ-কৃষ্ণকমল
সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৬ আশ্বিন ১৪০৯ রবিবার ১৩ অক্টোবর ২০০২
Share:

স্বামী বিবেকানন্দের দুর্গাপুজো পর্ব-০১


১৯০১ খ্রিস্টাব্দে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপুজো করলেন। আর সেই থেকেই বেলুড় মঠে দুর্গাপুজোর প্রচলন হল। সেই পুজোর মাত্র আট মাস পরেই ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই স্বামীজি মহাসমাধিস্থ হলেন। তাঁর শততম প্রয়াণ বর্ষে ফিরে দেখা যাক বিবেকানন্দের সেই দিনগুলিকে।

অনেক দিন ধরেই স্বামী বিবেকানন্দের মনে এই ইচ্ছেটা ছিল যে তিনি বেলুড়মঠে দুর্গাপুজো করবেন। কিন্তু নানা কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে বেলুড়মঠ প্রতিষ্ঠার পর স্বামীজি প্রায়ই তাঁর প্রিয় বেলগাছতলায় বসে সম্মুখে প্রবাহিতা গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আপন মনে গাইতেন ‘‘...বিল্ববৃক্ষমুলে পাতিয়া বোধন/গণেশের কল্যাণে গৌরীর আগমন।/ঘরে আনব চণ্ডী, কর্ণে শুনব চণ্ডী,/আসবে কত দণ্ডী, জটাজুটধারী।...’’ এরপর একদিন ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের মে-জুন মাস নাগাদ স্বামীজির অন্যতম গৃহী শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী বেলুড়মঠে এলে বিবেকানন্দ তাঁকে ডেকে রঘুনন্দনের ‘অষ্টবিংশতি তত্ত্ব’ বইটি কিনে আনার জন্য বললেন। শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি রঘুনন্দনের বইটি নিয়ে কি করবেন?’ স্বামীজি বললেন, ‘এবার মঠে দুর্গোৎসব করবার ইচ্ছে হচ্ছে। যদি খরচ সঙ্কুলান হয় ত মহামায়ার পুজো করব। তাই দুর্গোৎসববিধি পড়বার ইচ্ছা হয়েছে। তুই আগামী রবিবার যখন আসবি তখন ঐ পুস্তকখানি সংগ্রহ করে নিয়ে আসবি।’ যথাসময়েই শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী বইখানি বিবেকানন্দকে এনে দিয়েছিলেন। চার-পাঁচ দিনের মধ্যে বইটি পড়া শেষ করে বিবেকানন্দ তাঁর স্নেহভাজন শিষ্যের সঙ্গে আবার দেখা হতেই জানিয়েছিলেন, ‘রঘুনন্দনের স্মৃতি বইখানি সব পড়ে ফেলেছি, যদি পারি তো এবার মার পূজা করব।’


মণীশ সিংহরায়

ক্রমশ..........................................।
সংগ্রহেঃ-কৃষ্ণকমল

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৬ আশ্বিন ১৪০৯ রবিবার ১৩ অক্টোবর ২০০২
Share:

উপবাস




উপবাস হিন্দুদের আচার বিশেষ। সামাজিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য খাদ্য গ্রহণ না করাকেই বলে উপবাস। বিবাহ, পূজার্চনা এবং বিভিন্ন ব্রত উপলক্ষে উপবাস পালন করা হয়। সাধনক্ষেত্রে ইন্দ্রিয় সংযম অত্যাবশ্যক কর্ম, আর এ জন্য উপবাস একটি প্রধান উপায়। উপবাস শব্দটির মধ্যে দুটি বিষয়ের দ্যোতনা আছে; একটি হলো খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা এবং অপরটি কায়মনোবাক্যে ইষ্টদেবতার সান্নিধ্য অনুভব করা।

দেহ-মনকে সুস্থ ও নীরোগ রাখার জন্যও অনেকে নিয়মিত সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক উপবাস পালন করেন। তাঁদের ক্ষেত্রে দৈহিক ব্যাপারটিই প্রধান, মানসিক সংযম সেখানে গৌণ। অপরদিকে যাঁরা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উপবাস পালন করেন তাঁরা দেহ-মন উভয় দিক থেকেই সংযত হয়ে থাকেন। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ এগুলি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও উপবাস বিশেষ ভূমিকা রাখে। উপবাস দ্বারা সংযমী সাধক মন, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা দিয়ে আরাধ্য দেব-দেবীর সান্নিধ্য অনুভব করেন এবং এর মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করেন। তাই আত্মিক ভাবনায় ঋদ্ধ ব্যক্তিগণ দেহ ও মন উভয় সুস্থ রাখার জন্য সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে, একাদশী তিথিতে অথবা অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে উপবাস পালন করেন। এ ছাড়া বিশেষ পূজা-অর্চনাদির সময়ও ভক্তগণ উপবাস পালন করেন। যেমন সরস্বতী পূজা উপলক্ষে হিন্দু ছাত্র-ছাত্রীরা উপবাস পালন করে।

ব্যক্তিবিশেষের শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী উপবাসের প্রকৃতি বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। যদি কেউ পূর্ণ একটা তিথি (প্রায় চবিবশ ঘণ্টা) উপবাস থাকতে না পারেন তাহলে তিনি স্বাভাবিক আহারের পরিবর্তে কিঞ্চিৎ লঘুখাদ্য গ্রহণ করতে পারেন। আবার কেউ কেউ উপবাসের সময় পানীয় পর্যন্ত গ্রহণ করেন না। বহু সাধক-মহাপুরুষের জীবনে ক্রমাগত দুই, তিন, চার, পাঁচদিন ব্যাপী উপবাসের কাহিনীও জানা যায়। স্বাভাবিক উপবাস দেহ ও মনকে সুস্থ ও পবিত্র রাখে। [পরেশচন্দ্র মন্ডল]
Share:

শ্যামা বা আদ্যাশক্তি

 প্রধানত শাক্ত ধর্মাবলম্বীরা কালীর পূজা করেন। তন্ত্রশাস্ত্রের মতে, তিনি দশমহাবিদ্যা নামে পরিচিত তন্ত্রমতে পূজিত প্রধান দশ জন দেবীর মধ্যে প্রথম দেবী। শাক্তরা কালীকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদিকারণ মনে করে। বাঙালি হিন্দু সমাজে দেবী কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়।
পুরাণ ও তন্ত্র গ্রন্থগুলিতে কালীর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে সাধারণভাবে তাঁর মূর্তিতে চারটি হাতে খড়্গ, অসুরের ছিন্নমুণ্ড, বর ও অভয়মুদ্রা; গলায় মানুষের মুণ্ড দিয়ে গাঁথা মালা; বিরাট জিভ, কালো গায়ের রং, এলোকেশ দেখা যায় এবং তাঁকে তাঁর স্বামী শিবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
ব্রহ্মযামল মতে, কালী বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। কালীর বিভিন্ন রূপভেদ আছে। যেমন – দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি। আবার বিভিন্ন মন্দিরে "ব্রহ্মময়ী", "ভবতারিণী", "আনন্দময়ী", "করুণাময়ী" ইত্যাদি নামে কালীপ্রতিমা প্রতিষ্ঠা ও পূজা করা হয়।আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জাঁকজমক সহকারে পালিত হয়। এছাড়া মাঘ মাসে রটন্তী কালীপূজা ও জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালীপূজাও বিশেষ জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় প্রতি অমাবস্যা এবং প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবারে কালীপূজা হয়ে থাকে।
কালী দেবীর উপাসকরা হিন্দু বাঙালি সমাজে বিশেষ সম্মান পেয়ে থাকেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস ও তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ, রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ। কালীকে বিষয়বস্তু করে রচিত "শ্যামাসংগীত" বাংলা সাহিত্য ও সংগীত ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্গ। রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ কালী সাধকেরা এবং কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ বিশিষ্ট কবিরা অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত লিখেছেন। "মৃত্যুরূপা কালী" হল দেবী কালীকে নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের লেখা একটি বিখ্যাত দীর্ঘকবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামে একটি কালী-বিষয়ক বইও রচনা করেছিলেন।
Share:

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ কোন মাসের কত তারিখে আরম্ভ হয়? ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রী মুখ থেকে গীতা প্রকটের দিনই বা কবে?

আমরা মহাভারত থেকে জানতে পারি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের দশম দিনে পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায় পতিত হন। কিন্তু তিনি সে দিন মৃত্যুবরণ করেননি। সে সময় দক্ষিণায়ন চলছিল তাই তিনি বললেন ‘ভূতলে পতিত থেকেই আমি উত্তরায়ণের জন্যে প্রাণ ধারন করব। সূর্য দক্ষিণায়নে থাকতে আমি মরব না উত্তরায়ণের দেহত্যাগ করব। পিতা শান্তনুর বরে মৃত্যু আমার ইচ্ছাধীন।(মহাভারত, ভীষ্মপর্ব) এরপর মহাভারতের অনুশাসন পর্বের ২১ পরিচ্ছদে আমরা দেখি পিতামহ ভীষ্ম তাঁর মৃত্যুর সময়ে বলছেন তিনি ৫৮ দিন শরশয্যায় শুয়ে আছেন। আমরা জানি পৌষ সংক্রান্তিতে দক্ষিণায়নের অবসান হয়। তাহলে ১লা মাঘ উত্তরায়ণের প্রথম দিন তথা উত্তরায়ণের শুরু। আর তাই ১লা মাঘ পিতামহ ভীষ্ম মৃত্যুবরণ করছিলেন এ কথা প্রমাণিত।

তাহলে ১লা মাঘ থেকে শরশয্যার ৫৮ দিন এবং যুদ্ধের প্রথম ১০ দিন (৫৮+১০)=৬৮ দিন পিছিয়ে গেলে যে তারিখ পাওয়া যাবে সেটাই হবে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শুরুর দিন এবং গীতার আবির্ভাবের দিন। ৫৮ দিন পিছিয়ে গেলে পৌষ মাসের ২৯ দিন + অগ্রহায়ণ মাসের ৩০ দিন=৫৯ দিন, তাহলে পহেলা মাঘ থেকে পিছালে আমরা পাই ৩০ কার্তিক। এখন পুরো ৬৮ দিন পিছিয়ে যেতে আরও ৯ দিন পিছাতে হবে। ৩০ কার্তিক থেকে ৯ দিন পিছালে আমরা পাব ২১ কার্তিক। সুতরাং ‘২১ কার্তিকই’ হল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরু এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণী শ্রীমদ্ভগবদগীতা প্রকটের দিন।

পুনশ্চঃ ১. তবে বাংলা মাস বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের হয়, যেমন কোন বার কোন মাস ২৯ দিনে হয় আবার কোন বার ৩০ দিনে। দুই একদিন হেরফের করে ধরে নিলেও কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরু ও গীতার প্রকটের দিন কার্তিকের ২০/২১/২২ তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তবে এটাও বলে রাখা ভাল মহাভারতের যুগে এই ভাবে মাস গণনা করা হত না। সে সময় উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়ন, নক্ষত্র ইত্যাদি অনুসারে হিসাব হত। তাই এই তথ্য একেবারে অভ্রান্ত দাবী করা ঠিক হবে না।

তবে মহাভারত থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই হিসাবটি মোটামুটি সর্বজন গ্রাহ্য একটি হিসাব। ২. উত্তরায়ণ = মাঘ থেকে আষাঢ় এই ছয় মাস। ৩. দক্ষিণায়ন = শ্রাবণ থেকে পৌষ এই ছয় মাস। তথ্যসূত্রঃ ১. গীতা তত্ত্ববোধিনী, প্রফেসর নিখিল ভট্রাচার্য, প্রকাশকঃ নির্ঝর, নিসর্গ – হাসপাতাল সড়ক, হবিগঞ্জ প্রকাশ কালঃ ১ম জন্মাষ্টমী ১৪১২ এবং ২য় মহালয়া ১৪১৩ ২. মহাভারত, রাজশেখর বসু, এম সি সরকার অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেড, বঙ্কিম চ্যাটাজি স্ট্রীট, কলিকাতা। ৩. সংক্ষিপ্ত মহাভারত, গীতাপ্রেস।

লেখক: অগ্নি সম্পদ
Share:

দেবীর আশা-যাওয়ার নেপথ্যে

প্রতি বছর গজ, ঘোটক, নৌকা, দোলা এইসব যানবাহন করে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আসা ও যাওয়ার সময় শুভ, অশুভ, ক্ষয়ক্ষতি ও নানাভাবে মানুষের মৃত্যুসংবাদও শোনা যায়। পুরাকালের মুনি, ঋষি ও পণ্ডিতেরাও একসময় ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছিলেন, মায়ের আগমন ও গমন এবং পুজোর সময়ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মৃত্যু, ধ্বংস-এই সমস্ত অশুভ ঘটনার কারণ কী? তাঁরা আরও ভেবেছিলেন যে, শুভ ঘটনার চেয়ে অশুভ ঘটনার প্রাধান্যই বা কেন থাকে, তাছাড়াও দেব-দেবীরা এই ব্যাপারে নিরব কেন? ভাবনা চিন্তার পর তাঁরা ঠিক করলেন, পুজোর আগে, পুজোর সময় ও দুর্গার গমনের সময় সজাগ দৃষ্টি রাখবেন। যথাসময়ে তাঁদের দিব্যদৃষ্টিতে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে সবকিছু। ঘটনার গতি-প্রকৃতির অর্থাৎ দেবীর আগমন, গমন ও পুজোর সময় যে সব ঘটনা ঘটছে তা উপলব্ধি করে পারস্পরিক আলোচনায় দিন, তিথি ও নক্ষত্রের দিকে সন্দেহের আঙুল তুলে তাদের দোষী সাব্যস্ত করলেন। কিন্তু তাঁদের একথাও মনে হলো যে, এই তিথি, নক্ষত্র ও দিন এত শক্তি কোথা থেকে পেলো। আবার চলল অনুসন্ধান। এবার তাঁরা জানতে পারলেন যে, দেব-দেবীরাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখার জন্যেই এই সব তিথি-নক্ষত্রকে বিশেষভাবে শক্তিশালী করে তাঁদের পাহারাদারে নিযুক্ত করেছিলেন।

দেব-দেবীর দাপট বা শক্তি যতই থাকুক না কেন, দিন, তিথি ও নক্ষত্রের কর্তৃত্বকে এঁরা কেউই অস্বীকার করতে পারেননি কারণ এই তিন শক্তিকে তো দেবতারাই সৃষ্টি করেছেন।

আসলে শিল্প ও বাণিজ্য সংস্থার মতো দেব-দেবীরাও হিসেবের খাতায় সমতা রাখার জন্যে সৃষ্টি ও লয় এই দুটো অঙ্ককে মাথায় রেখেছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন, সৃষ্টিপ্রাপ্তদের সংখ্যাকে ক্রমশই বাড়তে দিলে, মহাপ্রলয়ের সূচনা হবে, তাই ধ্বংসের প্রয়োজন আছে। লয়কে সৃষ্টি করার জন্যে বন্যা, ভূমিকম্প, মহামারি ইত্যাদির দ্বারা তাকে শক্তিশালীও করা হয়েছিল। অবশ্য দেবর্ষি নারদের কাছ থেকে এই সংবাদ পেয়ে, মুনি-ঋষি ও পণ্ডিতেরা বুঝেছিলেন দুর্গতিনাশিনী দেবী প্রয়োজনবোধে কেন ধ্বংসকারিণী রূপে আবির্ভূতা হন। এই সমস্ত প্রকৃত তথ্য উন্মোচন হবার পর, মুনি-ঋষি ও পণ্ডিতেরা বিষয়টাকে বিধিবাক্য ও শাস্ত্রমতে চিহ্নিত করেছিলেন। অর্থাৎ দুর্গার আগমন ও গমনে যে বিপর্যয় ঘটে, সেই নিয়ে তাঁদের মনে আর সংশয় রইল না বলে আদি অনন্তকাল ধরে সেই নিয়মই চলে আসছে। জ্যেতিষীরা এই ব্যাপারটিকে ‘সিম্বলিক, বা প্রতীকি রূপে ব্যাখ্যা করেছেন। ভাগ্যগণনার সময় মানুষের ভাগ্যচক্রে তিথি, নক্ষত্র, দিন ও জন্মসময় ইত্যাদির বিষয়ে লক্ষ্য রেখে তাঁরা মানুষের জীবনে শুভ, অশুভ, শোক, দুঃখ ও আনন্দের ব্যাপারটাকে মেনে নিয়েছেন। তাই জন্মসময়, দিন ও গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির ওপর তাকিয়েই জ্যোতিষীরা কোষ্ঠী বিচার ও হাতে প্রতীকি ও অন্যান্য চিহ্ন দেখেই সার্বিক ভাগ্যচক্রের উত্থান, পতন, আয়ু, স্বাস্থ্য ইত্যাদির কথা বিচার করে থাকেন।

পৌরাণিক যুগে গজ, ঘোটক, নৌকো এবং দোলার ব্যবহার আমরা জেনেছি এবং পুরাকালেও মানুষ এই যানবাহনই প্রয়োজনবোধে কাজে লাগাতেন। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, চার যানবাহনের মধ্যে গজকেই বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়ে শুভ যাত্রার প্রতীক বলে চিহ্নিত করা হলো কেন।

আসলে পৌরাণিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত দেখা গেছে যে, গজ গোড়া থেকেই বিশেষ সম্মানীয় জায়গায় নিজের স্থান করে নিয়েছে। দেব-দেবী ছাড়াও রাজা, মহারাজা, জমিদারদের কাছেও “গজ” রাজকীয় মর্যাদা পেয়েছে। হয়তো তাই দেবী দুর্গার গজে আগমন ও গমনকে কেন্দ্র করে বলা হয়েছে-“গজে চ জলদা দেবী শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা।” অর্থাৎ এই আগমন ও গমনে বসুন্ধরা শস্যপূর্ণ হয়ে মানুষকে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্যে ভরিয়ে তুলবে। অন্যদিকে ঘোটক দেব-দেবী ও মানুষের কাজে ব্যবহৃত হলেও গজের মতো মর্যাদা না দিয়ে ঘোটকে মায়ের আগমন ও গমন নিয়ে বলা হয়েছে-“ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে”। অর্থাৎ ঘোটকে আগমন ও গমনে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংসারিক ক্ষেত্রেও অস্থিরতা প্রকাশ পাবে। যেমন, রাজনৈতিক উত্থান, পতন, সামাজিক স্তরে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ, দুর্ঘটনা, অপমৃত্যু ইত্যাদির প্রভাব বাড়বে। আবার নৌকায় আগমন ও গমনে বলা হয়েছে শস্যবৃদ্ধিস্তুথাজলম। এ ক্ষেত্রে প্রবল বন্যা, ঝড়, অতিবৃষ্টি ইত্যাদির জন্যে একদিকে প্লাবন ও ক্ষয়ক্ষতি এবং অন্যদিকে দ্বিগুণ শস্যবৃদ্ধি। এর মধ্যে ‘দোলায়’ আগমন ও গমন সবচেয়ে অশুভ। তাই দোলা সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, দোলায়াং মরকং ভবেৎ। মহামারি, ভূমিকম্প, যুদ্ধ, মন্বন্তর, খরা ইত্যাদির প্রভাবে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু তো ঘটাবেই, আবার সেই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতিও হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, একমাত্র গজ ছাড়া দেবী দুর্গার অন্য তিন যানবাহনের মাধ্যমে ধ্বংস বা লয়কে ব্যবহার করা হয়েছে। শুধুমাত্র গজই প্রয়োজনমতো বৃষ্টিধারায় বসুন্ধরাকে ধন-ধান্যে সমৃদ্ধ করে তুলবে।

এই প্রসঙ্গে কোন দিনে আগমন ও গমনে কি যানবাবন ব্যবহার করা হবে সেই ব্যাপারে বলা হয়েছে-“রবৌ চন্দ্রে গজারূঢ়া, ঘোটকে শনি ভৌময়োঃ, গুরৌ শুক্রে চ দোলায়াং নৌকায়াং বুধবাসরে।” সপ্তমীর দিনে যদি রবিবার এবং সোমবার হয়, তাহলে দুর্গার আগমন ও গমন হবে গজে। ফল-“গজে চ জলদা দেবী শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা”। ঠিক এই রকমই শনিবার ও মঙ্গলবারে দুর্গার আগমন ও গমন হলে, ঘোটকের প্রভাব থাকবে। অর্থাৎ ফল-“ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে”। যদি বুধবারে দেবী দুর্গার আগমন ও গমন হয়, তাহলে তিনি আসবেন এবং যাবেন নৌকায়। ফল-“শস্যবৃদ্ধিস্তুথাজলম”। আবার দুর্গার আগমন ও গমন যদি বৃহস্পতি ও শুক্রবারে হয় তাহলে তিনি দোলায় আসবেন এবং যাবেন। ফল-“দোলায়াং মরকং ভবেৎ”।

সৌজন্যেঃ- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল
Share:

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪

হিন্দু আইনের পরিবরর্তন ও পরিবর্ধন


নিম্নোক্ত এ্যক্টগুলো বাংলাদেশে প্রযোজ্য হিন্দু আইনকে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেছে-


  • ১৮৫০ সালের কাসট্ ডিসএ্যবিলিটিস রিমুভাল এ্যক্ট। n নাতন হিন্দু আইন ও প্রথা অনুযায়ী যদি কোন হিন্দু তার ধর্ম পরিত্যাগ করত, অথবা ধর্মসভা হতে বহিস্কৃত হতো অথবা জাতিচ্যুত হতো তাহরে এই পরিহার, বহিস্কার অথবা বঞ্চনার ফলে তার অধিকার ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়ে যেত এবং তাকে তার উত্তরাধিকার লাভের অধিকার হতে বঞ্চিত করা হতো। উপরোক্ত এ্যক্টের ফলে ব্রিটিশ ভারতের আদালতসমূহ ধর্মত্যাগের জন্য সৃষ্ট এই পরিণতিগুলো রহিত করে। এই এ্যক্ট ফ্রিডম অব রিলিজিয়ান এ্যক্ট নামেও পরিচিত।
  • ১৮৫৬ সালের হিন্দু উইডোজ রিম্যারেজ এ্যক্ট। কতিপয় ক্ষেত্রে এই এ্যক্ট হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহ অনুমোদন করেছে।
  • ১৯২৫ সালের সাকসেশন এ্যক্টের ধারা ৫৭, ২১৪ এবং তৃতীয় তফসীল। এই ধারা দুইটি এবং তফশীলে হিন্দু উইল সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে।
  • ১৮৬৬ সালের নেটিভ কনভার্টস ম্যারেজ ডিসসলিউশন এ্যক্ট। এই এ্যক্টের অধিনে কতিপয় অবস্থায় খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত একজন হিন্দু তার বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারে।
  • ১৮৭২ সালের স্পেশাল ম্যারেজ এ্যক্ট। এই এ্যক্ট ১৯২৩ সালে সংশোধন করা হয়েছে এবং কতিপয় বিবাহের ক্ষেত্রে এই এ্যক্ট প্রযোজ্য।
  • ১৮৮২ সালের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (১৯২৯ সালে যেভাবে সংশোধিত হয়েছে)। এই এ্যক্টের ১২৯ ধারায় উল্লেখিত কতিপয় বিষয় ব্যতীত এই এ্যক্ট সম্পত্তি হস্তান্তর বিষয়ে সমুদয় হিন্দু আইন বাতিল করে দিয়েছে।
  • ১৮৭৫ সালের মেজরিটি এ্যক্ট। এই এ্যক্ট নাবালত্বের বয়সসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং তা বিবাহ, বিবাহ-চিচ্ছেদ ও দত্তক গ্রহণের বিষয় ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে হিন্দুদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
  • ১৮৯০ সালের হিন্দু গার্ডিয়ানস এ্যন্ড ওয়ার্ডস এ্যক্ট। যে সকল ক্ষেত্রে আদালত কর্তৃক অভিভাবক নিযুক্ত হয়ে সেই সকল ক্ষেত্রে এই এ্যক্ট প্রযোজ্য।
  • ১৯২৮ সালের হিন্দু ইনহেরিট্যান্স (রিমুভাল অব ডিসএ্যবিলিটিস)এ্যক্ট। যে সকল অযোগ্যতা কোন হিন্দুকে উত্তরাধিকার ও পার্টিশনের মাধ্যমে অংশ লাভে বঞ্চিত করত এ এ্যক্ট যে সকল অযোগ্যতাকে সীমিত করেছে।
  • ১৯২৯ সালের হিন্দু ল’ অব ইনহেরিট্যান্স (এ্যামেন্ডমেন্ট) এ্যক্ট। এ এ্যক্ট পিতামহ বা পিতার-পিতার পরে এবং পিতার ভ্রাতার পূর্বে পুত্রের কন্যা, দৌহিত্রী, ভগিনি এবং ভগিনির পুত্রকে পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকার করেছে।
  • ১৯২৯ সালের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি(এ্যামেন্ডমেন্ট) সাপ্লিমেন্টারী এ্যক্ট। এই এ্যক্ট অজাত ব্যক্তির অনুকূলে হস্তান্তর ও রিকোয়েষ্ট সম্পর্কিত ১৯১৪ ও ১৯২১ সালের মাদ্রাজ এ্যক্ট এবং ১৯১৬ সালের হিন্দু ডিসপজিশন অব প্রপার্টি এ্যক্টকে সংশোধন করেছে।
  • ১৯৩০ সালের হিন্দু গেনস অব লানিংস এ্যক্ট। এই এ্যক্ট শিক্ষার সাহায্য অর্জিত সকল সম্পত্তিই অর্জনকারীর পৃথক সম্পত্তিতে রূপান্তর করেছে।
  • ১৯৩৭ সালের হিন্দু উইমেনস রাইটস্ টু প্রপার্টি এ্যক্ট। এই এ্যক্ট ১৯৩৭ সালের ১৪ এপ্রিল হতে কার্যকরী হয় এবং ইহা হিন্দু বিধবাদের উত্তরাধিকারের নতুন অধিকার দান করে মিতাক্ষরাসহ উত্তরাধিকারীত্বের মূলে কুঠারাঘাত করেছে।
  • ১৮৭২ সালের কন্ট্রাক্ট এ্যক্ট। এই এ্যক্ট হিন্দু চুক্তি আইনকে বাতিল করেছে। তবে ‘দামদুপাত’ নীতি চুক্তি আইনের দ্বারা বাতিল হয়নি।
  • ১৮৭২ সালের এভিডেন্স এ্যক্ট। এই আইন হিন্দু সাক্ষ্য আইনকে বাতিল করে দিয়েছে।
  • ১৮৬০ সালের পেনাল কোড। এই আইন সমুদয় হিন্দু দন্ড আইনকে বাতিল করেছে।
উপরোক্ত পরিবর্তন ছাড়াও ১৯৫৫ ও ১৯৫৬ সালে নিম্নোক্ত এ্যক্টসমূহের দ্বারা স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষের হিন্দু আইনে মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, স্মর্তব্য যে, এই আইনগুলো বাংলাদেশী হিন্দুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

  • ১৯৫৫ সালের হিন্দু ম্যারেজ এ্যক্ট। এই আইন স্বাধীনতাপূর্ব হিন্দু ম্যারেজ সংক্রান্ত আইনে যা, বাংলাদেশে প্রযোজ্য রয়েছে, আমুল পরিবর্তন সাধন করেছে। ভারতে এই আইনের পরিপন্থী পূর্বস্থিত সকল আইনই বাতিল বলিয়া বিবেচিত হবে।
  • ১৯৫৬ সালের হিন্দু সাকসেশন এ্যক্ট। এই আইন ভারতে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনকে আমুল পরিবর্তন করেছে। এই আইন হিন্দু আইনের উত্তরাধিকার আইনকে এমন একটি অভিন্ন ও ব্যাপক ব্যবস্থায় পরিণত করেছে যা সকল হিন্দুদের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। ২০০৫ সালের দ্য হিন্দু সাকসেসন এ্যক্ট হিন্দু মহিলাদের হিন্দু কোপার্সনারীর সদস্যরূপে স্বীকৃতি দান করেছে।
  • ১৯৫৬ সালের হিন্দু মাইনরিটি এ্যন্ড গার্ডিানশিপ এ্যক্ট। এই আইন যে সকল মৌলিক পরিবর্তন আনয়ন করেছে তাদের মধ্যে স্বাভাবিক অভিভাবকের তালিকা সীমিত করণ, স্বাভাবিক ও উইলমূলে নিযুক্ত অভিভাবকের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রন, ডি ফ্যাক্টো অভিভাবকের ক্ষমতা রহিতকরণ, মাতার অভিভাবক নিয়োগের ক্ষমতা প্রদান এবং ৫ বছর বয়সের নিম্নের নাবালক শিশুর তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব মাতাকে প্রদান ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
  • ১৯৫৬ সালের হিন্দু এ্যডপশনন্স এন্ড মেনটেনেন্স এ্যক্ট। এই আইনের অধীনে পুরুষ ও নারী সকল হিন্দু পুত্র কিংবা কন্যা দত্তক গ্রহণ করতে পারে অথচ প্রাক-স্বাধীনতা আইনে কেবলমাত্র স্বামী ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত বিধবা দত্তকপুত্র গ্রহণ করিতে পারিত। এই আইনের অধীনে দত্তকগ্রহণে স্ত্রীর অনুমতির কোন প্রয়োজন নাই। এই আইনে অবিবাহিতা মহিলা পুত্র দত্তক লইতে পারে এবং দত্তক গ্রহণে যে কোন গোত্রের পুত্রকে দত্তক লইকে পারবেন।
Share:

হিন্দুদের বর্ণভেদ বা বর্ণাশ্রম



হিন্দুরা চারবর্ণে বিভক্ত, বর্ণগুলো যথাক্রমে- ক) ব্রাহ্মণ বা পুরোহিত বর্ণ, খ) ক্ষত্রিয় বা যোদ্ধা বর্ণ, বৈশ্য বা ব্যবসায়িক শ্রেণীক বর্ণ এবং ঘ)শুদ্র বা কৃষি বর্ণ।
এই বর্ণগুলো প্রত্যেকটি আবার কয়েকটি উ-বর্ণে বিভক্ত। প্রথম তিনটি বর্ণের সদস্যদের দ্বিজ বা পুণর্জন্মা বলা হয়। বেদ বা ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ এবং উপনয়নের ন্যয় ধর্মীয় সংস্কার সম্পাদনের মাধ্যমে তারা দ্বিতীয় জন্ম লাভ করে। হিন্দুদের মধ্যে যে বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্কার রয়েছে তাদের মধ্যে কেবলমাত্র বিবাহ সংক্রান্ত সংস্কার ছাড়া শুদ্ররা অন্যকোন সংস্কার পালন করে না।
হিন্দুদের এই বর্ণ বা শ্রেণী বিভাগ আইনের ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রে দত্তক পুত্রকে অবশ্যই দত্তকগ্রহণকারী পিতার বর্ণের হতে হয়। বিবাহের ক্ষেত্রেও এক মতবাদ অনুযায়ী বিবাহ পক্ষগণকে এই বর্ণভূক্ত হতে হয়। হিন্দু আইনের কতকগুলো নীতি, বিশেষ করে দত্তক গ্রহণ অনুষ্ঠানে দত্তহোম পালনের ন্যয় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত নীতিসমূহ শুদ্রদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। শুদ্রবর্ণ নির্ধারণে রাজকুমার লাল ব. বিশ্বেশ্বর [(১৮৮৪) ১০ ক্যাল ৬৮৮] মামলায় কোলকাতা হাইকোর্ট কায়স্থদের সাধারণভাবে শুদ্র বলে অভিহিত করেছেন; অপরদিকে তুলসীরাম ব. বিহারীলাল [(১৮৯০) ১২ এলা ৩২৮] মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্ট ও ঈশ্বরী প্রসাদ ব. রায়হরি প্রসাদ [(১৯২৭) ৬ পার্ট ৫০৬] মামলায় পাটনা হাইকোর্ট কায়স্থদের শুদ্র নয় বরে তিনটি দ্বিজ বর্ণের যে কোন একটির, সম্ভবত ক্ষত্রিয় বর্ণের অন্তর্ভূক্ত বলে মন্তব্য করেছেন। সুবরাত্ত ব. রাধা [(১৯২৮) ৫২ বোম ৪৯৭] মামলায় বোম্বে হাইকোর্ট মারাঠাদের কিছু ক্ষত্রিয় এবং কিছু শুদ্র বর্ণভূক্ত বলে রায় দিয়েছেন। বেঙ্গলের বৈদ্যরা রাজনন্দিন ব. অশ্বিনী কুমার [(১৯৪১)১ ক্যাল ৪৫৭] মামলার এবং সদ গোপরা দূর্গাদান পান ব. সন্তোষকুমার পান [(১৯৪৫)১ ক্যাল ৬৭] মামলার রায় অনুযায়ী কার্য্যকর হয়।
Share:

শেষ জীবন



বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ মন্দির, বিবেকানন্দকে দাহ করার স্থানে বিবেকানন্দ কিছু দিন মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রমে এবং পরে বেলুড় মঠে অতিবাহিত করেন। অতঃপর শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বেলুড় মঠে অবস্থান করে রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের কাজ এবং ইংল্যান্ড ও আমেরিকার কাজ দেখাশোনা করে অতিবাহিত করেন। গোয়ালিয়রের মহারাজাসহ এ বছরগুলিতে হাজার হাজার দর্শক তাঁকে দেখতে আসেন। ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে দেখতে আসেন লোকমান্য তিলকসহ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয়রা। জাপানের ধর্ম মহাসভায় যোগ দেয়ার জন্য তিনি ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, কিন্ত্তু তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্য সেটি অসম্ভব করে তোলে। তাঁর শেষ দিনগুলিতে তিনি বোধগয়া ও বারাণসী তীর্থ করেন।[১১০]

তাঁর ভ্রমণসমূহ, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতাদান, ব্যক্তিগত আলোচনা এবং চিঠিপত্রের আদান-প্রদান তাঁর স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তিনি হাঁপানি, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য শারীরীক অসুখে ভুগছিলেন।[১১১] তাঁর দেহ ত্যাগের কিছুদিন পূর্বে তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে বর্ষপঞ্জি/পঞ্জিকা পড়তে দেখা যেত। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার তিনি দিন পূর্বে তাঁকে দাহ করার স্থান দেখিয়ে দেন-যে স্থানে বর্তমানে তাঁর স্মৃতিতে একটি মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কতিপয় লোকের কাছে মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচবেন না।[১১১]তাঁর দেহ ত্যাগ করার দিন তিনি বেলুড় মঠে সকালে কিছু ছাত্রকে শুক্লা-যজুর্বেদ শেখান।[১১২] তিনি ভ্রাতা-শিষ্য স্বামী প্রেমানন্দের সাথে হাটেন এবং তাকে রামকৃষ্ণ মঠের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্দেশনা দেন। বিবেকানন্দ ধ্যান করার সময় ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই রাত ৯টা ১০ মিনিটে দেহ ত্যাগ করেন। তাঁর শিষ্যদের মতে এটা ছিল মহাসমাধি।[১১৩] পরবর্তীতে তাঁর শিষ্যগণ লিপিবদ্ধ করেন যে তারা স্বামীজির নাসারন্ধ্র, তাঁর মুখ এবং চোখে “সামান্য রক্ত” লক্ষ্য করেছেন।[১১৪] ডাক্তাররা মন্তব্য করেন যে এটি হয়েছে তাঁর মস্তিষ্কে একটি রক্তনালী ফেটে যাবার কারণে, কিন্ত্তু তারা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করতে পারেননি। তাঁর শিষ্যদের মতানুসারে ব্রহ্মরন্ধ্র-মস্তিষ্কের চূড়ার রন্ধ্র-অবশ্যই ফেটে থাকবে যখন তিনি মহাসমাধি অর্জন করেছিলেন। বিবেকানন্দ তাঁর চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত বেচে না থাকার তাঁর নিজের ভবিষ্যৎবাণী পূরণ করেছিলেন।[১১২]
Share:

পরমপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ




স্বামী বিবেকানন্দ (১২ জানুয়ারি, ১৮৬৩ – ৪ জুলাই, ১৯০২) (পূর্বাশ্রমের নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত[২]) ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রসিদ্ধ হিন্দু ধর্মগুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য এবং রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা।[৩] স্বামী বিবেকানন্দ ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেদান্ত ও যোগশাস্ত্রের প্রচার ও প্রসারে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।[৩] ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে হিন্দুধর্মকে বিশ্বজনীন ধর্মের স্তরে উন্নীত করা তথা সর্বধর্মসমন্বয় চেতনার বিস্তারে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।[৪] আধুনিক ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন বিবেকানন্দ।[৫] তাঁর সর্বাধিক খ্যাতি ১৮৯৩ সালে বিশ্বধর্ম মহাসভায়[২] “আমেরিকান ভ্রাতা ও ভগিনী”দের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত[৬][৭] তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতাটির মাধ্যমে পাশ্চাত্য সমাজে হিন্দুধর্মের পরিচিতি প্রদানে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
১৮৬৩ সালে কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম। তাঁর চিন্তা-চেতনার অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর যুক্তিবাদী পিতা ও ধর্মপ্রাণা জননী। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মপিপাসা ও গভীর ঈশ্বরানুরাগ লক্ষিত হত। ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করেছেন এমন এক ব্যক্তির সন্ধানে বেরিয়ে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসের সান্নিধ্যে আসেন এবং পরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে অদ্বৈত বেদান্তের শিক্ষা দেন। তাঁর কাছ থেকেই বিবেকানন্দ শেখেন যে সব ধর্মই সত্য এবং মানুষের সেবাই সর্বোৎকৃষ্ট ঈশ্বরোপাসনা। গুরুর মৃত্যুর পর সন্ন্যাস অবলম্বন করে তিনি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ পদব্রজে পর্যটন করেন। পরবর্তীকালে শিকাগো যাত্রা করে ১৮৯৩ সালের বিশ্বধর্ম মহাসভায় হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফোরাম, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংঘ তাঁর বাগ্মীতায় মুগ্ধ হয়ে বক্তৃতাদানের আমন্ত্রণ জানান। একাধিক সাধারণ ও ব্যক্তিগত সভায় ভাষণ দিয়ে তিনি আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও আরও কয়েকটি দেশে বেদান্ত, যোগশাস্ত্র ও হিন্দুধর্মকে সুপরিচিত করে তোলেন। আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে তিনি স্থাপন করেন বেদান্ত সোসাইটি। ভারতে প্রত্যাবর্তন করে ১৮৯৩ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন নামে একটি মানবকল্যাণমূলক আধ্যাত্মিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। স্বামী বিবেকানন্দ ভারতে অন্যতম জাতি-স্রষ্টারূপে পরিগণিত হন। তাঁর শিক্ষা মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন প্রমুখ একাধিক জাতীয় নেতা ও দার্শনিককে প্রভাবিত করেছিল।[২][৫][৮
বংশ-পরিচয়
স্বামী বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী (১৮৪১-১৯১১)
বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “আমার জ্ঞানের বিকাশের জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী।”[৯]
স্বামী বিবেকানন্দ এক কায়স্থ দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই দত্ত-পরিবারের আদি নিবাস ছিল অধুনা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত দত্ত-ডেরিয়াটোনা বা দত্ত-ডেরেটোনা গ্রামে। দত্ত-পরিবার মুঘল আমল থেকে ওই গ্রামে বাস করছিলেন। তাঁরাই ওই গ্রামের জমিদার ছিলেন বলে অনুমিত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে দত্ত-পরিবারের রামনিধি দত্ত তাঁর ছেলে রামজীবন দত্ত ও নাতি রামসুন্দর দত্তকে নিয়ে গড়-গোবিন্দপুর (অধুনা কলকাতা ময়দান-ফোর্ট উইলিয়াম অঞ্চল) গ্রামে চলে আসেন। এখানে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণের কাজ শুরু হলে এলাকার অন্যান্য বাসিন্দাদের সঙ্গে দত্তরাও চলে আসেন সুতানুটিতে (অধুনা উত্তর কলকাতা)। সেখানে তাঁরা প্রথমে মধু রায়ের গলিতে একটি বাড়ি তৈরি করেন। রামসুন্দরের বড়ো ছেলে রামমোহন দত্ত ৩ নং গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়িটি নির্মাণ করেন। এই বাড়িতেই পরে স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম হয়। রামসুন্দরের বড়ো ছেলে দুর্গাপ্রসাদ ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ঠাকুরদা। তিনি তাঁর একমাত্র ছেলে বিশ্বনাথ দত্তের জন্মের পরই সন্ন্যাস অবলম্বন করে গৃহত্যাগ করেছিলেন। বিশ্বনাথ দত্ত দুর্গাপ্রসাদের ছোট ভাই কালীপ্রসাদ কর্তৃক প্রতিপালিত হন। কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাটর্নি হিসেবে তিনি সারা ভারতে সুনাম অর্জন করেছিলেন। বিশ্বনাথ দত্ত ইংরেজি, বাংলা, ফারসি, আরবি, উর্দু, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষা শিখেছিলেন। ইতিহাস পাঠে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি সুলোচনা (১৮৮০) ও শিষ্ঠাচার-পদ্ধতি (বাংলা ও হিন্দি ভাষায়, ১৮৮২) নামে দুটি বইও রচনা করেছিলেন। ধর্মবিষয়ে বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন উদার। বাইবেল ও দেওয়ান-ই-হাফিজ তাঁর প্রিয় বই ছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিধবাবিবাহ আন্দোলনকেও তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন। দুর্গাপ্রসাদের সংসারত্যাগের পর কালীপ্রসাদের অমিতব্যয়িতায় দত্ত-পরিবারের আর্থিক সাচ্ছল্য নষ্ট হয়েছিল। কিন্তু অ্যাটর্নিরূপে বিশ্বনাথ দত্তের সুদূর-প্রসারিত খ্যাতি সেই সাচ্ছল্য কিয়দংশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।[১০] তাঁর স্ত্রী ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন সিমলার নন্দলাল বসু মেয়ে। তিনি বিশেষ ভক্তিমতী নারী ছিলেন। তাঁর প্রথম কয়েকটি সন্তানের মৃত্যু ও কন্যাসন্তানের জন্মের পর পুত্রসন্তান কামনায় তিনি তাঁর এক কাশীবাসিনী আত্মীয়াকে দিয়ে কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরে নিত্য পূজা দেওয়ার ব্যবস্থা করান। এরপরই স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম হওয়ায় তাঁর বিশ্বাস হয় যে, তিনি শিবের কৃপায় পুত্রলাভ করেছেন।[১১]
জন্ম ও বাল্যজীবন
৩ নং গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিট, কলকাতা। এই বাড়িতেই নরেন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে বাড়িটি রামকৃষ্ণ মিশনের অন্যতম কেন্দ্র।
১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি (বাংলা ১২৬৯ সালের ২৯ পৌষ), সোমবার, মকর সংক্রান্তির দিন সকাল ৬টা ৪৯ মিনিটে[১২] কলকাতার সিমলা অঞ্চলের ৩ নং গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে[১৩] স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম।[১১] তাঁর নামকরণ করা হয় নরেন্দ্রনাথ দত্ত।[১৪] পিতার যুক্তিবাদী মন ও জননীর ধর্মীয় চেতনা স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তা ও ব্যক্তিত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।[৮] প্রথম জীবনেই পাশ্চাত্য দর্শন ও বিজ্ঞানের সহিত তাঁর পরিচিতি ঘটেছিল। এই কারণে অকাট্য প্রমাণ ও ব্যবহারিক পরীক্ষা ছাড়া কোনো বক্তব্যই তিনি গ্রহণ করতেন না। অন্যদিকে অতি অল্পবয়সেই ধ্যান ও বৈরাগ্যের আধ্যাত্মিক আদর্শের প্রতি তাঁর মন আকৃষ্ট হয়।[৮] নরেন্দ্রনাথের বাল্যশিক্ষার সূচনা ঘটে স্বগৃহেই। ১৮৭১ সালে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন এবং ১৮৭৯ সালে প্রবেশিকা (এন্ট্রান্স) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।[১৫] দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, শিল্পকলা, সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ ও পাণ্ডিত্য।[১৬] বেদ, উপনিষদ, ভাগবত গীতা, রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থের প্রতিও তাঁর আগ্রহের কথা সুবিদিত। কণ্ঠসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীত – শাস্ত্রীয় সংগীতের উভয় শাখাতেই তাঁর বিশেষ পারদর্শীতা ছিল। বাল্যকাল থেকেই খেলাধুলা, শারীরিক ব্যায়াম ও অন্যান্য সংগঠনমূলক কাজকর্মেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন।[১৬] অতি অল্পবয়সেই বিভিন্ন কুসংস্কার এবং ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য বিচারের যুক্তিগ্রাহ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।[১৭]
নরেন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক বিকাশে তাঁর মায়ের ভূমিকাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী জীবনে তিনি তাঁর মায়ের একটি কথা বারংবার উদ্ধৃত করতেন, সারা জীবন পবিত্র থাকো, নিজের সম্মান রক্ষা কোরো, অন্যের সম্মানে আঘাত কোরো না। কোমল হও, কিন্তু প্রয়োজনবোধে নিজের হৃদয়কে শক্ত রেখো[১৪] কথিত আছে, নরেন্দ্রনাথ ছিলেন ধ্যানসিদ্ধ; ঘুমের মধ্যে তিনি এক জ্যোতি দর্শন করতেন ও ধ্যানের সময় বুদ্ধের দর্শন পেতেন।[১৮
কলেজে ও ব্রাহ্মসমাজে
১৮৮০ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথম বর্ষের কলা বিভাগে ভর্তি হন নরেন্দ্রনাথ। পরের বছর তিনি চলে যান স্কটিশ চার্চ কলেজে। এই সময়েই তিনি অধ্যয়ন করেন পাশ্চাত্য যুক্তিবিজ্ঞান, পাশ্চাত্য দর্শন ও ইউরোপীয় জাতিসমূহের ইতিহাস।[১৭] ১৮৮১ সালে এফ.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ১৮৮৪ সালে ব্যাচেলর অফ আর্টস ডিগ্রি লাভ করেন।[১৯][২০] তাঁর অধ্যাপকদের মতে, নরেন্দ্রনাথ ছিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভাসম্পন্ন ছাত্র। স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেস্টি তাঁর সম্পর্কে লেখেন, “নরেন্দ্র ছিল সত্যকারের প্রতিভাবান। আমি বহু দেশ ভ্রমণ করেছি; এই ছেলেটির মধ্যে মেধা ও সম্ভাবনার যে সাক্ষর দেখি তা আমি কারোর মধ্যে পাইনি, এমনকি জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দর্শন বিভাগীয় ছাত্রদের মধ্যেও না।” (“Narendra is really a genius. I have travelled far and wide but I have never come across a lad of his talents and possibilities, even in German universities, among philosophical students.”)[২১] তিনি ছিলেন একজন শ্রুতিধর, অর্থাৎ অসামান্য স্মৃতিশক্তির অধিকারী ব্যক্তি।[২২][২৩] কথিত আছে, তাঁর সঙ্গে এক আলোচনার পর ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার বলেছিলেন, “আমি ভাবতেও পারিনি, এই রকম একটি বাচ্চা ছেলে এত কিছু পড়েছে।”[২৪]
ছেলেবেলা থেকে আধ্যাত্মিকতা, ঈশ্বরোপলব্ধি ও সর্বোচ্চ অধ্যাত্ম সত্যের উপলব্ধির জন্য তাঁর ব্যাকুলতা দৃষ্ট হয়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক ধ্যান-ধারণা নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় নেতার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সেযুগের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন ব্রাহ্মসমাজের সংস্পর্শে আসেন এবং ব্রাহ্মসমাজের একেশ্বরবাদ, অপৌত্তলিকতা ও সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার চেতনার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।[২৫] এই সময়ে ব্রাহ্মসমাজের দুই সর্বোচ্চ নেতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে সাক্ষাত করে তাঁদের কাছে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন রাখেন। কিন্তু কোনো সদুত্তর পান না।[২৬][২৭]
কথিত আছে, নরেন্দ্রনাথ ডেভিড হিউম, ইমানুয়েল কান্ট, জোহান গটলিব ফিচ, বারুখ স্পিনোজা, গেয়র্গ ভিলহেল্ম হেগল, আর্থার সোফেনহয়্যার, ওগুস্ত কোঁত, হারবার্ট স্পেনসার, জন স্টুয়ার্ট মিল ও চার্লস ডারউইন প্রমুখের রচনাবলি অধ্যয়ন করেছিলেন।[২১][২৮] হারবার্ট স্পেনসারের বিবর্তনবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি নিজের প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের জন্য স্পেনসারের এডুকেশন (Education) নামক গ্রন্থখানি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। কিছুকাল তাঁর সঙ্গে হারবার্ট স্পেনসারের পত্রালাপও হয়।[২৯][৩০] পাশ্চাত্য দার্শনিকদের রচনা অধ্যয়নের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভারতীয় সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থ তথা বহু বাংলা গ্রন্থও অধ্যয়ন করেছিলেন।[২৮]
অধ্যক্ষ হেস্টি সাহিত্যের এক ক্লাসে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের দি এক্সকার্সন (The Excursion) কবিতাটির আলোচনাকালে কবির প্রাকৃতিক-ভাবতন্ময়তার (nature-mysticism) বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংসের উল্লেখ করলে নরেন্দ্রনাথ প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণের কথা জানতে পারেন।[৩১] কবিতায় ব্যবহৃত trance শব্দটির অর্থ বোঝাতে গিয়ে হেস্টি তাঁর ছাত্রদের বলেন যে এই শব্দটির প্রকৃত অর্থ জানতে হলে তাদের দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যেতে হবে। এতে তাঁর কয়েকজন ছাত্র উদ্বুদ্ধ হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনে যান। তাঁদের মধ্যে নরেন্দ্রনাথ ছিলেন অন্যতম।[৩২][৩৩]
শ্রীরামকৃষ্ণ সমীপে রামকৃষ্ণ পরমহংস
“ঠাকুরের ঐদিনকার অদ্ভুত স্পর্শে মুহূর্তমধ্যে ভাবান্তর উপস্থিত হইল। স্তম্ভিত হইয়া সত্য সত্যই দেখিতে লাগিলাম, ঈশ্বর ভিন্ন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অন্য কিছুই আর নাই!… যখন প্রকৃতিস্থ হইলাম, তখন ভাবিলাম উহাই অদ্বৈতবিজ্ঞানের আভাস! তবে তো শাস্ত্রে ঐ বিষয়ে যাহা লেখা আছে, তাহা মিথ্যা নহে! তদবধি অদ্বৈততত্ত্বের উপরে আর কখনও সন্দিহান হইতে পারি নাই।”[৩৪][৩৫] ১৮৮১ সালের নভেম্বর মাসে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত নরেন্দ্রনাথের জীবনের ধারাটিকে পরিবর্তিত করে দেয়।[৩৬] এই সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গে নরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “তাঁহাকে [রামকৃষ্ণ] একজন সাধারণ লোকের মতো বোধ হইল, কিছু অসাধারণত্ব দেখিলাম না। অতি সরল ভাষায় তিনি কথা কহিতেছিলেন, আমি ভাবিলাম, এ ব্যক্তি কি একজন বড় ধর্মাচার্য হইতে পারেন? আমি সারা জীবন অপরকে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছি, তাঁহার নিকটে গিয়া তাঁহাকেও সেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘মহাশয়, আপনি কি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন?’ তিনি উত্তর দিলেন- ‘হাঁ।’ ‘মহাশয়, আপনি কি তাঁহার অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে পারেন?’ ‘হাঁ’। ‘কি প্রমাণ? ‘ ‘আমি তোমাকে যেমন আমার সম্মুখে দেখিতেছি, তাঁহাকেও ঠিক সেইরূপ দেখি, বরং আরও স্পষ্টতর, আরও উজ্জ্বলতররূপে দেখি।’ আমি একেবারে মুগ্ধ হইলাম। [...] আমি দিনের পর দিন এই ব্যক্তির নিকট যাইতে লাগিলাম। [...] ধর্ম যে দেওয়া যাইতে পারে, তাহা আমি বাস্তবিক প্রত্যক্ষ করিলাম। একবার স্পর্শে, একবার দৃষ্টিতে একটা সমগ্র জীবন পরিবর্তিত হইতে পারে। আমি এইরূপ ব্যাপার বারবার হইতে দেখিয়াছি।”[৩৬][৩৭]
যদিও প্রথমে নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণকে নিজের গুরু রূপে স্বীকার করতে সম্মত ছিলেন না। তিনি তাঁর ধ্যানধারণার বিরুদ্ধের প্রায়শই বিদ্রোহ প্রকাশ করতেন। তবু শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে বার বার তাঁর দর্শনে ছুটে যেতেন।[৩৮] প্রথম দিকে শ্রীরামকৃষ্ণের তুরীয় আনন্দের ভাব ও দর্শনকে কেবলমাত্র মনগড়া কল্পনা বলে মনে করতেন।[৮] [৩৯] ব্রাহ্মসমাজের সদস্য হিসেবে তিনি মূর্তিপূজা ও বহুদেববাদের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করতেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন কালীর উপাসক।[৪০] অদ্বৈত বেদান্ততত্ত্বকেও নরেন্দ্রনাথ নাস্তিকতা ও পাগলামি বলে উড়িয়ে দিতেন; এবং মাঝে মাঝেই তা নিয়ে উপহাস করতেন।[৩৯]
শ্রীরামকৃষ্ণের ধ্যানধারণা গ্রহণ করতে না পারলেও নরেন্দ্রনাথ তা উড়িয়ে দিতে পারতেন না। কোনো মত গ্রহণ করার আগে তা যাচাই করে নেওয়াই ছিল নরেন্দ্রনাথের স্বভাব। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণকে পরীক্ষা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণও কোনোদিন তাঁকে যুক্তিবর্জনের পরামর্শ দেননি। তিনি ধৈর্য সহকারে নরেন্দ্রনাথের তর্ক ও পরীক্ষার সম্মুখীন হন এবং তাঁকে সকল দৃষ্টিকোণ থেকেই সত্য পরীক্ষা করতে বলেন।[৩৮] পাঁচ বছর শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে থেকে নরেন্দ্রনাথ এক অশান্ত, বিভ্রান্ত, অধৈর্য যুবক থেকে এক পরিণত ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হন। ঈশ্বরোপলব্ধির জন্য তিনি সর্বস্ব ত্যাগে স্বীকৃত হন এবং শ্রীরামকৃষ্ণকে নিজের গুরু রূপে স্বীকার করে নিয়ে গুরুর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেন।[৩৮]
১৮৮৫ সালে শ্রীরামকৃষ্ণ গলার ক্যানসারে আক্রান্ত হন। এই সময় তাঁকে কলকাতার কাশীপুরে স্থানান্তরিত করা হয়। জীবনের অন্তিম পর্বে বিবেকানন্দ ও তাঁর গুরুভ্রাতাগণ তাঁর সেবাসুশ্রুষা করেছিলেন। এখানেই শ্রীরামকৃষ্ণের তত্ত্বাবধানে তাঁদের আধ্যাত্মিক শিক্ষা চলে। কথিত আছে, কাশীপুরেই বিবেকানন্দ নির্বিকল্প সমাধির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।[৪১] শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের শেষ পর্বে বিবেকানন্দ ও তাঁর কয়েকজন গুরুভ্রাতা গুরুর নিকট থেকে সন্ন্যাসীর গৈরিক বস্ত্র লাভ করেছিলেন। যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম রামকৃষ্ণ সংঘ।[৪২] গুরুর নিকট থেকে বিবেকানন্দ এই শিক্ষাই পান যে মানবসেবাই সর্বাপেক্ষা কার্যকরী ঈশ্বরোপাসনা।[৮][৪৩] কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারত্ব নিয়ে বিবেকানন্দের মনে সন্দেহের উদ্রেক হলে শ্রীরামকৃষ্ণ ঘোষণা করেছিলেন, “যে রাম, যে কৃষ্ণ, সে-ই রামকৃষ্ণ… “[৪৪] শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর অবর্তমানে নিজের শিষ্যদের দেখাশোনার দায়িত্ব দেন বিবেকানন্দের উপর, এবং তাঁর শিষ্যদেরও বিবেকানন্দকে নেতা বলে স্বীকার করতে বলেন।[৪৫] দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৮৮৬ সালের ১৬ অগস্ট অতিপ্রত্যুষে কাশীপুর উদ্যানবাটীতে রামকৃষ্ণ পরমহংসের মহাপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর শিষ্যদের মতে, এ ছিল তাঁর মহাসমাধি।[৪৫]
Share:

স্বামীজীর বিশ্বধর্ম মহাসভা এবং আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে বক্তৃতাদান



ধর্মসভা মঞ্চে স্বামী বিবেকানন্দ
ধর্মসভা ১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে উদ্বোধন হয়। এ দিন বিবেকানন্দ তাঁর প্রথম সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি ভারত এবং হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন।[৭৫] প্রথমদিকে বিচলিত থাকলেও তিনি বিদ্যার দেবী সরস্বতীর নিকট মাথা নোয়ালেন এবং তার বক্তৃতা শুরু করলেন এভাবে, “আমেরিকার ভ্রাতা ও ভগিনীগণ!”[৭৩][৭৬] তাঁর এ সম্ভাষণে প্রায় সাত হাজারের মত দর্শক-শ্রোতা দুই মিনিট দাঁড়িয়ে তাঁকে সংবর্ধনা জানান। নীরবতা ফিরে আসার পর তিনি তার বক্তৃতা শুরু করলেন। “যে ধর্ম বিশ্বকে সহিষ্ণুতা ও মহাজাগতিক গ্রহণযোগ্যতা শিখিয়েছে সে ধর্মের সর্বাধিক প্রাচীন সন্ন্যাসীদের বৈদিক ক্রমানুসারে” তিনি জাতিসমূহের কনিষ্ঠতমকে অভিবাদন জানালেন।[৭৭] এবং তিনি গীতা থেকে এ সম্পর্কে দুটি উদাহরণমূলক পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেন-“যেহেতু বিভিন্ন স্রোতধারাগুলির উৎসসমূহ বিভিন্ন জায়গায় থাকে, সেগুলির সবই সমুদ্রের জলে গিয়ে মিশে যায়, সুতরাং, হে প্রভু, বিভিন্ন প্রবণতার মধ্য দিয়ে মানুষ বিভিন্ন যে সকল পথে চলে, সেগুলো বিভিন্ন রকম বাঁকা বা সোজা মনে হলেও, সেগুলি প্রভুর দিকে ধাবিত হয়!” এবং “যে আকারের মধ্য দিয়েই হোক না কেন, যেই আমার নিকট আসে, আমি তাঁর নিকট পৌঁছাই; সকল মানুষই বিভিন্ন পথে চেষ্টা করছে যা অবশেষে আমার নিকট পৌঁছায়।”[৭৭] সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা হওয়া সত্ত্বেও এটি সভার আত্মা এবং এর বিশ্বজনীন চেতনা ধ্বনিত করে।[৭৭][৭৮]
সভার সভাপতি, ডঃ ব্যারোজ বলেন, “কমলা-সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মসমূহের মাতা ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং তাঁর শ্রোতাদের উপর সবচাইতে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করেছেন।”[৭৬] প্রেসে তিনি প্রচুর মনোযোগ আকর্ষণ করেন যাতে তিনি “ভারতের সাইক্লোন সন্ন্যাসী” হিসেবে অভিহিত হন। নিউ ইয়র্ক ক্রিটিক লিখেছিল, “ঐশ্বরিক অধিকারবলে তিনি একজন বক্তা এবং হলুদ ও কমলার চিত্রবৎ আধানে তাঁর শক্তিশালী, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার চেয়ে কম আগ্রহোদ্দীপক ছিল না ঐ সকল সমৃদ্ধ ও ছন্দোময়ভাবে উচ্চারিত শব্দসমূহ। নিউইয়র্ক হেরাল্ড লিখেছিল, “বিবেকানন্দ নিঃসন্দেহে ধর্মসভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর বক্তৃতা শুনে আমরা অনুভব করি এ শিক্ষিত জাতির নিকট মিশনারি পাঠানো কি পরিমাণ বোকামি।”[৭৯] আমেরিকার পত্রিকাসমূহ স্বামী বিবেকানন্দকে “ধর্মসভার সবচেয়ে মহান ব্যক্তিত্ব” এবং “সভার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তি” হিসেবে প্রতিবেদন লেখে।[৮০]
তিনি সভায় আরো অনেকবার হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কিত বিষয়ে বলেন। সভা ১৮৯৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর সমাপ্ত হয়। সভায় তাঁর সকল বক্তৃতার একটি সাধারন বিষয়বস্ত্তু ছিল – সর্বজনীনতা – অধিক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সহিষ্ণুতা।[৮১]
আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে বক্তৃতাদান:
শিকাগো আর্ট ইনস্টিটিউটে ১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে ধর্মসভা শেষ হবার পর বিবেকানন্দ পুরো দুই বছর পূর্ব ও কেন্দ্রীয় যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে শিকাগো, ডেট্রয়েট, বোস্টন এবং নিউইয়র্কে বক্তৃতা দেন। ১৮৯৫ সালের বসন্তকালের মধ্যে তাঁর অব্যাহত প্রচেষ্টার কারণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং তাঁর স্বাস্থ্য হয়ে পড়ে দুর্বল।[৮২] তাঁর বক্তৃতাদান সফর স্থগিত করার পর স্বামীজি বেদান্ত ও যোগের উপর বিনা মূল্যে ব্যক্তি পর্যায়ে শিক্ষা দেয়া শুরু করেন। ১৮৯৫ সালের জুন থেকে দুই মাসব্যপী তিনি থাউজ্যান্ড আইল্যান্ড পার্কে তাঁর এক ডজন শিষ্যকে ব্যক্তি পর্যায়ে শিক্ষা দেয়ার জন্য ভাষণ দেন। বিবেকানন্দ এটিকে আমেরিকায় তাঁর প্রথম ভ্রমণের সবচেয়ে সুখী অংশ বলে বিবেচনা করতেন। তিনি পরে “নিউইয়র্ক বেদান্ত সোসাইটি” প্রতিষ্ঠা করেন।[৮২]
আমেরিকায় তাঁর প্রথম পরিদর্শনের সময় তিনি ইংল্যান্ডে ভ্রমণ করেন দুইবার – ১৮৯৫ এবং ১৮৯৬ সালে। সেখানে তাঁর বক্তৃতাসমূহ সফল ছিল।[৮৩] এখানে তিনি সাক্ষাৎ পান এক আইরিশ মহিলা মিস মার্গারেট নোবলের যিনি পরে সিস্টার নিবেদিতা নামে পরিচিত হন।[৮২] ১৮৯৬ সালের মে মাসে তাঁর দ্বিতীয় ভ্রমণের সময় পিমলিকোতে এক গৃহে অবস্থানকালে স্বামীজি দেখা পান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিখ্যাত ভারত বিশেষজ্ঞ ম্যাক্স মুলারের যিনি পাশ্চাত্যে রামকৃষ্ণের প্রথম আত্মজীবনী লেখেন।[৭৮] ইংল্যান্ড থেকে তিনি অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশেও ভ্রমণ করেন। জার্মানীতে তিনি আরেক ভারত বিশেষজ্ঞ পল ডিউসেনের সাথে সাক্ষাৎ করেন।[৮৪]
তিনি দুটি শিক্ষায়তনিক প্রস্তাবও পান, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য দর্শনের চেয়ার এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরণের প্রস্তাব। তিনি উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে পরিভ্রমণকারী সন্ন্যাসী হিসেবে তিনি এই ধরণের কাজে স্থিত হতে পারবেন না।[৮২]
তিনি কতিপয় অকৃত্রিম শিষ্যকে আকৃষ্ট করেন। তাঁর অন্যান্য শিষ্যদের মধ্যে ছিল জোসেফিন ম্যাকলিয়ড, মিস মুলার, মিস নোবল, ই.টি.স্টার্ডি, ক্যাপটেন এবং মিসেস সেভিয়ের-যারা অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জে জে গুডউইন-যিনি তাঁর স্টেনোগ্রাফার হন এবং তাঁর শিক্ষা ও বক্তৃতাসমূহ রেকর্ড করেন।[৮২][৮৪] হেল ফ্যামিলি আমেরিকাতে তাঁর উষ্ণতম আতিথ্যকর্তাদের অন্যতম ছিলেন।[৮৫] তাঁর শিষ্যগণ-ফ্রেঞ্চ মহিলা ম্যাডাম লুই হন স্বামী অভয়ানন্দ এবং মিস্টার লিয়ন ল্যান্ডসবার্গ হন স্বামী কৃপানন্দ। তিনি কতিপয় অন্যান্য শিষ্যকে ব্রহ্মচারীতে দীক্ষা দেন।[৮৬]
স্বামী বিবেকানন্দের ধারণাসমূহ বেশ কয়েকজন পন্ডিত ও বিখ্যাত চিন্তাবিদ কর্তৃক প্রশংসিত হয়-উইলিয়াম জেমস, জোসেফ রয়েস, সি.সি. এভারেট, হার্ভার্ড ধর্মশাস্ত্র বিদ্যালয়ের ডিন, রবার্ট জি ইনগারসোল, নিকোলা টেসলা, লর্ড কেলভিন এবং অধ্যাপক হারম্যান লুডউইক ফারডিন্যান্ড ভন হেলমহোলটজ।[৮] অন্যান্য ব্যক্তিত্ব যারা তাঁর কথাবার্তায় আকৃষ্ট হন তারা হলেন হ্যারিয়েট মনরো এবং এলা হুইলার উইলকক্স-দুজন বিখ্যাত আমেরিকান কবি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম জেমস; ব্রুকলিন এথিক্যাল এসোসিয়েশনের সভাপতি ডক্টর লুইজ জি জেনস; নরওয়ের পিয়ানোবাদক ওলে বুলের স্ত্রী সারা সি বুল; ফ্রান্সের অভিনেত্রী সারাহ বার্ণহারট এবং ফ্রান্সের অপেরা সঙ্গীতশিল্পী ম্যাডাম এমা ক্যালভি।[৮৭]
পশ্চিম থেকেও তিনি তাঁর ভারতীয় কাজে গতি আনেন। বিবেকানন্দ ভারতে অবস্থানরত তাঁর অনুসারী ও সন্ন্যাসী ভাইদের উপদেশ দিয়ে এবং অর্থ পাঠিয়ে বিরামহীনভাবে চিঠি লেখেন। পাশ্চাত্য থেকে পাঠানো তাঁর চিঠিসমূহ সে দিনগুলিতে সামাজিক কাজের জন্য তাঁর প্রচারাভিযানের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।[৮৮] তিনি ভারতে তাঁর নিকট শিষ্যদের বড় কিছু করার জন্য অনুপ্রাণিত করতে চেষ্টা ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যান। তাদের নিকট পাঠানো তাঁর চিঠিসমূহে তাঁর সবচেয়ে কঠিন কিছু শব্দ ছিল।[৮৯] এ রকম একটি চিঠিতে তিনি স্বামী অক্ষরানন্দকে লিখেছিলেন, “খেতরী শহরের দরিদ্র ও নিচু শ্রেণীর ঘরে ঘরে যাও এবং তাদের ধর্মশিক্ষা দাও। ভূগোল এবং অন্যান্য বিষয়েও তাদের মৌখিক শিক্ষা দিও। অলসভাবে বসে থেকে, রাজকীয় খাবার খেয়ে আর “রামকৃষ্ণ, ও প্রভু!” বলে ভাল কিছু হবে না-যদি না তুমি দরিদ্রদের জন্য ভাল কিছু করতে পার।”[৯০][৯১] পরিণামস্বরুপ ১৮৯৫ সালে বেদান্ত শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিবেকানন্দের সরবরাহকৃত অর্থে মাদ্রাজে “ব্রহ্মাবদীন” নামে এক সাময়িকপত্র প্রকাশ করা শুরু হয়েছিল।[৯২] পরবর্তীকালে (১৮৮৯) “ব্রহ্মাবদীনে” “দি ইমিটেশন অফ ক্রাইস্ট” এর প্রথম ছয় অধ্যায়ের বিবেকানন্দকৃত অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।[৯৩]
বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্য ক্যাপ্টেন এবং মিসেস সেভিয়ের ও জে জে গুডউইনকে নিয়ে ১৮৯৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ইংল্যান্ড ছেড়ে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে তারা ফ্রান্স ও ইটালী ভ্রমণ করেন এবং লিওনার্ডো ডা ভিঞ্চির দি লাস্ট সাপার দর্শন করে ১৮৯৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর ভারতের উদ্দেশ্যে ন্যাপলস বন্দর ত্যাগ করেন।[৯৪] পরবর্তীতে মিস মুলার এবং সিস্টার নিবেদিতা ভারতে তাঁকে অনুসরণ করেন। সিস্টার নিবেদিতা তার বাকী জীবন ভারতীয় নারীদের শিক্ষায় এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে নিয়োজিত করেন।[৮২][৯৫]
Share:

বিবেকানন্দ মানবমুক্তির এক নব আবির্ভাব /স্বামী বেদানন্দ




একদা সেই দক্ষিণেশ্বরের ছোট্ট ঘরটিতে বসে শ্রীরামকৃষ্ণ যুবক নরেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “হ্যাঁরে, তুই কি চাস?” যুবক বেশ উদ্ধত ভাবেই উত্তর দিলেন, “আমি সমাধিতে ডুবে থাকতে চাই”। কথা শুনে শ্রীরামকৃষ্ণের মন ভরল না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ভাবশিষ্যকে মৃদু তিরস্কার করে বললেন, “বলিস কি রে? এই তুই সবচেয়ে বড় মনে করলি? আমি ভেবেছিলাম তুই একটা বড় মহীরুহ হবি আর তার তলায় শ্রান্ত পথিকেরা এসে আশ্রয় পাবে, শান্তি ও বিশ্রাম লাভ করবে, তা না হয়ে তুই-ও নিজের মুক্তির কামনা করছিস?” নরেন্দ্রনাথ চমকে উঠলেন। কিন্তু বেদবাক্যগুলির গভীর তাৎপর্য তখন তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি। পরে গুরুদেবের দেহত্যাগের পর পরিব্রাজক বেশে যখন তিনি তৎকালীন ভারতের প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে অবহিত হলেন তখনই বুঝতে শুরু করলেন। তিনি অনুধাবন করলেন, অতীব গৌরবোজ্জ্বল ভারতবর্ষ কতগুলি বদ্ধমূল ধারণা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। দেশের লোকসকল ধর্ম ধর্ম করে পরস্পর হৃদয়বত্তাকে আরও সংকীর্ণতা ও নিগূঢ় অনুশাসনে বেঁধে ফেলেছে। সর্বত্র দারিদ্রের প্রতাপ। শিক্ষার অভাব। চিন্তাধারার মধ্যেও সামাজিক ন্যায় ও গণতন্ত্রের কোনও অস্তিত্ব নেই। এ কী ভারতবর্ষ তিনি দেখছেন? যেখানে মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, দেশে দেশে কেবল বিভেদের প্রাচীর। অস্পৃশ্যতার বাড়বাড়ন্ত। এ সব দেখেশুনে গভীর বেদনায় ব্যথিত হয়ে উঠলেন জ্যোতি-তনয় বিবেকানন্দ। ফলে সন্ন্যাসীর আত্মমগ্নতা থেকে নেমে এলেন তিনি কঠিন বাস্তবতায়। দেশ ও জাতিকে আরও গভীর ভাবে চেনার জন্য আতিথ্য গ্রহণ করলেন রাজার প্রাসাদ থেকে দরিদ্রের কুটিরে। আরও আরও প্রত্যক্ষ করলেন দুঃখ, দারিদ্র, বন্ধন ও অজ্ঞতার গভীর অন্ধকার। শুনলেন নৈরাশ্য নিপীড়িত লক্ষ লক্ষ ভারত সন্তানের করুণ আর্তনাদ। ভারতবর্ষের এই বর্তমান দৈন্যরূপ তাঁর চিত্তকে দলিত মথিত করে তুলল।
আর সেই অস্থিরতার প্রশমনে ভারতের শেষ শিলাখণ্ডে ধ্যানমগ্ন হলেন নবযুগের ঋষি বিবেকানন্দ। তাঁর অন্তরমন ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করেই উপলব্ধি করল অখণ্ড গৌরবোজ্জ্বল ভারতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রূপ। এই সম্যক দর্শনে তিনি বুঝলেন, এই দেশের ঘোর অবনতির জন্য দায়ী প্রাণহীন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, জনসাধারণকে উপেক্ষা এবং নারীজাতিকে অবমাননা। তাই ভারতকে উঠতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছ বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা যা ভারতের ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের সমন্বয়সাধন করেই গড়ে উঠতে পারে। আর সেই সঙ্গে প্রয়োজন স্বদেশবাসীর দারিদ্র দুঃখ লাঞ্ছনা মোচনের জন্য কিছু করা এবং নারীজাতিকে তাঁর স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করা। তিনি এক্ষণে আরও উপলব্ধি করলেন শ্রীরামকৃষ্ণের অবতরণের মুখ্য উদ্দেশ্য হল, মানুষের দুঃখ দূর করা, মূর্খ-দরিদ্র-বঞ্চিত-শোষিত-নিপীড়িত-লাঞ্ছিত মানুষের সর্বাত্মক চেতনার জাগরণ ঘটানো, নরের মধ্যে নারায়ণকে দেখা জীবকে শিবজ্ঞানে সেবা করা।
স্বামীজি গুরুর এই আদর্শকে কার্যত এর পর থেকে প্রচার করতে ও কর্মে রূপ দিতে যত্নবান হলেন। ফলে, তিনি প্রথমেই হিন্দুর হাজার হাজার বছরের যে ধর্ম আকাঙ্ক্ষায় মানুষ ও সমাজকে অস্বীকার করে বিদ্যমান ছিল তার মূলে কুঠারাঘাত করলেন। তিনি বললেন, “নিজের মুক্তি চাস যে জাহান্নমে যাবি। সকলের মুক্তি কামনাই হল যথার্থ সন্ন্যাসের লক্ষণ।” সেই সঙ্গে সন্ন্যাস ধর্মের সামাজিকীকরণের কথা ঘোষণা করে বললেন, “বৃহৎ সংখ্যক মানুষ যদি ক্ষুধা, পীড়া ও অজ্ঞানের দ্বারা আচ্ছন্ন থাকে, সে ক্ষেত্রে কয়েক জন ব্যক্তি মানুষ যদি ঊর্ধ্বায়িত জীবনের আকাঙ্ক্ষা করে তা শুধু স্বার্থপরতার নয়, চরম পাপও। প্রয়োজন হল ব্যক্তির জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে শত শত লোকের কল্যাণ এবং এ ভাবে দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নতি।” তাঁর দৃঢ় মত হল, যত দিন জগতে একজনও বদ্ধ থাকবে, অজ্ঞানে আচ্ছন্ন থাকবে, আমি নিজের মুক্তি চাই না। আমি বারবার জন্মগ্রহণ করে তাদের কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করব। পরবর্তী কালে আমেরিকা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর বেলুড়ে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ সংঘ’ গঠন করে তাঁর মূল আদর্শবাণী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করলেন এই একটিই মহামন্ত্র ‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’ আত্মার মুক্তি ও জগতের কল্যাণ যা হল এই সংঘের মূল মন্ত্র।
বস্তুত স্বামীজি ছিলেন বিশ্ব আচার্য বা লোকশিক্ষক। তাঁকে কোনও বিশ্বের ধর্ম বা গোষ্ঠী নিজের বলে দাবি করতে পারেন না। তিনি মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্যই জগতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। আর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই আত্মমুক্তিকামী সাধারণ মানুষ থেকে পরিণত হয়েছিলেন মহান দেশপ্রেমিকে, সমাজ সংস্কারক ও জগৎ কল্যাণের ভূমিকায়। তিনি নিজে যেমন ছিলেন সৎ ও অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে ভরপুর, তেমন ভাবেই প্রত্যেক ভারতবাসীকে গঠন করতে চাইতেন। তাঁর মধ্যে অদ্ভুত ধীশক্তি, বজ্রদৃঢ় মনোবল, ঐকান্তিক ঈশ্বরনির্ভরতা, অসাধারণ মানবপ্রেম, অসম্ভব সহৃদয়তার প্রকাশ ঘটেছিল। তাই তিনি ছিলেন শাশ্বত ভারতাত্মার নবীন ও প্রেরণাদায়ী উজ্জ্বল মূর্তি। বলতে কি গুরুর আদর্শ শিরোধার্য করে বিবেকানন্দ সারা জীবনই মানবচেতনার সমৃদ্ধির জন্য নানা কথা বলে গেছেন। বিশেষত তাঁর মধ্যে মেয়েদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা সত্যিই ছিল অসাধারণ। স্বামীজির প্রত্যাশা ছিল মেয়েরা যেমন আত্মবোধে জাগ্রতা হবে, তেমনই কর্মক্ষেত্রেও স্বনির্ভরতার উজ্জ্বল আসনে প্রতিষ্ঠিত হবে। নারীদের পবিত্রতা ও সংযমের উপর জোর দিলেও স্বামীজি নারীর স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেননি। তিনি সে সময়ে বলেছিলেন, “আমরা স্ত্রীলোককে নীচ, অধম, মহা হেয়, অপবিত্র বলি। তার ফল আমরা পশু, উদ্যমহীন, দরিদ্র। তোমরা যদি মেয়েদের উন্নতি করিতে পার তবে আশা আছে। নচেৎ পশুজন্ম ঘুচবে না।” স্বামীজি মেয়েদের বলতেন এঁরা হলেন মূর্তিমতী শক্তি। যদি এই নারীশক্তিকে ঠিক মতো ব্যবহার করা যায়, তা হলে সহজেই দেশের উন্নতি হবে এবং সমাজও সার্বিক ভাবে সুন্দর হয়ে উঠবে। এ ব্যাপারে তাঁর যথাযোগ্য মন্তব্য হল “মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাধীনতা দাও। তা হলে তারা নিজেরাই নিজেদের গড়ে নেবে।”
এই নারীজাতির উন্নতির পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চা করা, ভাষার চর্চা, শিল্প স্থাপন করা এবং দরিদ্র জনগণ তথা কৃষক-শ্রমিকের জীবনের মানোন্নতির জন্যও তাঁর বড় অবদান রয়েছে। বস্তুত মানবসেবার সমস্ত উপকরণগুলির সম্বন্ধেই স্বামীজি সর্বদা সচেতন ছিলেন। স্বামীজি চেয়েছিলেন, সেবা ধর্মের আমূল পরিবর্তন যা সমস্ত মানুষকে এক দিব্যচেতনায় উদ্বুদ্ধ করবে। তাঁর মতে, ‘মানবসেবাই ঈশ্বরসেবা’ এটি স্বামীজি যে ভাবে প্রচার করে গেছেন তার তুলনা বিরল। বস্তুত স্বামীজির এই অসাধারণ সেবামার্গের অনুপ্রেরণাতে আকৃষ্ট হয়েই ভারতের বুকে নানা সেবাকাজ চলছে। এ আদর্শ অবশ্য যৌবনে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে শিখিয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ মনে করতেন, “চোখ বুজলে ভগবান আছেন আর চোখ খুললে তিনি কি নেই? প্রতিমায় ঈশ্বরের পুজো হয়, আর জীবন্ত মানুষে হয় না? …যত্র জীব তত্র শিব”। স্বামীজি বুঝেছিলেন ঠাকুরের নবযুগের এই মহামন্ত্র মানুষকে দেবে বাঁচার মন্ত্র, হতাশা থেকে মুক্তি, জীবত্ব থেকে শিবত্বের উত্তরণের এক অভিনব সুসমাচার।
স্বামীজির প্রবর্তিত এই সুমহান সেবাধর্মের বিজয়রথ এগিয়ে চলেছে দেশ হতে দেশান্তরে। তাঁর মহান জীবন এবং ততোধিক প্রাণপদ বাণী ভারতের ইতিহাসে এক নবযুগের যে সূচনা করেছে তাতে সন্দেহ নেই। বস্তুত শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদে বিবেকানন্দের কণ্ঠে যে স্বর ধ্বনিত হয়েছে তা ভারতেরই কণ্ঠস্বর। যে ভারত মরেনি, যে ভারত মরবে না। যে ভারত পুরোনো হয় কিন্তু কখনও স্থবির হয় না, জরায় নষ্ট হয় না যে ভারত চিরনবীন যে ভারত স্বীয় ব্রতসাধনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শ্রীঅরবিন্দ তাই লিখে গিয়েছেন, “বিবেকানন্দের যাত্রা, যে বিবেকানন্দকে তাঁর গুরু চিহ্নিত করেছিলেন সেই বিরাট শক্তিধর পুরুষ হিসেবে যিনি গোটা জগৎটাকে দু’হাতে ধরে পাল্টে দিতে সমর্থ ছিলেন, পৃথিবীর সম্মুখে এটা প্রমাণ হয়েছে যে ভারতবর্ষ জাগ্রত হয়েছে, শুধু নিজে বাঁচার জন্য নয়, জগৎকে জয় করার জন্যও।”
স্বামীজির সার্ধশতবর্ষের প্রাক্কালে আজ আরও একবার সকলকে স্মরণ করতে হবে এই মহামানবের অপরূপ বাণীটিও যা সতত প্রেরণাদায়ক। যা পথ চলার হাতিয়ার এবং মানবমুক্তির অন্যতম সোপান।
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।