সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রুরু-চরিত, ডুণ্ডুভ-উপাখ্যান, রুরুর সর্পমাত্র হিংসার কারণ, আস্তীকপর্ব্ব-খগম-ঋষিবৃত্তান্ত, সর্পযজ্ঞের প্রশ্ন, জরৎকারু-চরিত্র, জরৎকারুর বিবাহ

অষ্টম অধ্যায়

রুরু-চরিত
সূত কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! ভৃগুনন্দন চ্যবন সুকন্যার গর্ভে পরমতেজস্বী প্রমতি নামে এক পুৎত্র উৎপাদন করেন। ঘৃতাচীর গর্ভে প্রমতির রুরু-নামক এক সন্তান হয়। রুরুর ঔরসে প্রমদ্বরার গর্ভে শুনক নামে তনয় জন্মে। সেই মহাতেজা রুরুর সমস্ত বৃত্তান্ত সবিস্তর বর্ণনা করিতেছি, শ্রবণ করুন।
পূর্ব্বকালে সর্ব্বভূতহিতৈষী, সর্ব্ববিদ্যাবিশারদ, তপোনিরত স্থূলকেশ নামে এক মহর্ষি ছিলেন। ঐ সময়ে গন্ধর্ব্বরাজ বিশ্বাবসুর সংযোগে অপ্সরা মেনকা গর্ভবতী হইয়াছিল। অকরুণা মেনকা প্রসবকাল উপস্থিত দেখিয়া মহর্ষি স্থূলকেশের আশ্রমে গমন এবং তথায় গর্ভবিমোচন করিয়া নদীতীরে পলায়ন করিল। সেই গর্ভে এক পরমা সুন্দরী কুমারী জন্মিয়াছিল। তপোধনাগ্রণী স্থূলকেশ কিয়ৎক্ষণ পরে আশ্রমে উপস্থিত হইয়া সেই সুরকন্যাতুল্য সদ্যঃপ্রসূত কন্যাকে অসহায়া নির্জ্জনে পতিতা দেখিয়া কারুণ্যরসে আর্দ্রচিত্ত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ তাহাকে গ্রহণ করিয়া ঔরসকন্যা-নির্ব্বিশেষে লালন পালন করিতে লাগিলেন। তিনি স্বয়ং তাহার জাতকর্ম্মাদি সমস্ত কর্ম্ম বিধিপূর্ব্বক নির্ব্বাহ করিলেন। কন্যা সেই আশ্রমে শশিকলার ন্যায় দিনে দিনে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। মহর্ষি স্থূলকেশ সেই কন্যাকে কি রূপে, কি গুণে, কি শীলে সর্ব্বপ্রকারেই সমস্ত প্রমদাগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দেখিয়া তাহার নাম প্রমদ্বরা রাখিলেন।
একদা প্রমতিনন্দন রুরু স্থূলকেশের আশ্রমে সেই প্রমদ্বরাকে নিরীক্ষণ করিয়া অত্যন্ত কামাতুর হইলেন। পরে আপন বয়স্যগণ দ্বারা পিতার নিকট স্বীয় অভিলাষ জানাইলেন। প্রমতি তদনুসারে মহর্ষি স্থূলকেশের নিকট গিয়া আপন পুৎত্রের নিমিত্ত সেই কন্যা প্রার্থনা করিলেন। মহর্ষি স্থূলকেশ ফল্গুনী নক্ষত্রযুক্ত দিবসে বিবাহের দিন নির্দ্ধারিত করিয়া রুরুকে প্রমদ্বরা সম্প্রদান করিলেন।
একদা বরবর্ণিনী প্রমদ্বরা আপন সহচরীগণ সমভিব্যাহারে ক্রীড়াকৌতুক করিতে করিতে দৈবগত্যা প্রসুপ্ত ও কেলিভূমিতে পতিত এক কৃষ্ণসর্পকে পাদাহত করিল। সর্প ক্রুদ্ধ হইয়া বিষাক্ত দশন-পংক্তি দ্বারা তৎক্ষণাৎ তাহাকে দংশন করাতে সে বিবর্ণা, বিচেতনা ও ভ্রষ্টাভরণা হইয়া ছিন্নমূল কদলীর ন্যায় ভূতলে পড়িল। তদীয় সখীগণ তাহাকে মুক্তকেশা, ভ্রষ্টবেশা ও ভূপৃষ্ঠে পতিতা দেখিয়া বিষাদ-সাগরে নিমগ্ন হইয়া হাহাকার করিতে লাগিল। কিন্তু প্রমদ্বরা ভূজঙ্গবিষে অভিভূতা ও বিবর্ণা হইয়াও পুনর্ব্বার পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর রমণীয় হইয়া উঠিল। ফলতঃ তখন তাহাকে বোধ হইতে লাগিল, যেন অকাতরে নিদ্রা যাইতেছে।
তদীয় পিতা মহর্ষি স্থূলকেশ ও অন্যান্য মহর্ষিগণ প্রমদ্বরাকে বিগতাসু ও ভূতলে পতিত দেখিলেন। তদনন্তর স্বস্ত্যাত্রেয়, মহাজানু, কুশিক, শঙ্খমেখল, উদ্দালক, কঠ, শ্বেত, ভারদ্বাজ, কৌণকূৎস, আর্ষ্টিষেন, গৌতম, প্রমতি, রুরু ও অন্যান্য তপোবনবাসী তপোধনগণ কারুণ্য-রস-পরবশ হইয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। পরে সেই পরমাসুন্দরী কন্যাকে আশীবিষ বিষার্দ্দিত মৃত ও ভূতলে পতিত দেখিয়া সকলেই রোদন করিতে লাগিলেন। রুরু প্রিয়তমাকে তদবস্থ দেখিয়া নিতান্ত উদ্‌ভ্রান্ত ও একান্ত কাতর হইয়া তথা হইতে বহির্গমন করিলেন।


নবম অধ্যায়
ডুণ্ডুভ-উপাখ্যান
সৌতি কহিলেন, সেই সকল মহাত্মা দ্বিজগণ তথায় উপবিষ্ট হইলে, রুরু সাতিশয় দুঃখিত হইয়া অরণ্যানী প্রবেশপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন এবং শোকে একান্ত ব্যাকুল হইয়া স্বীয় প্রিয়তমা প্রমদ্বরাকে স্মরণ করিয়া করুণস্বরে এইরূপে বিলাপ করিতে লাগিলেন – “আমার ইহা অপেক্ষা আর দুঃখের বিষয় কি হইতে পারে যে, আমার ও বন্ধুবর্গের শোকবর্দ্ধিনী সেই সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী রমণী ধরাতলে পড়িয়া আছে? আমি যদি দান, তপশ্চরণ ও গুরুজনের শুশ্রূষা করিয়া থাকি, তবে আমার প্রিয়া পুনঃসঞ্জীবিত হউক। আমি জন্মাবধি আত্মসংযম ও ব্রতানুষ্ঠান করিয়া যে-সকল পুণ্যসঞ্চয় করিয়াছি, এক্ষণে আমার প্রাণপ্রিয়া প্রমদ্বরা সেই পুণ্যবলে ভূমিশয্যা হইতে গাত্রোত্থান করুক।”
রুরু স্বীয় প্রিয়তমা প্রমদ্বরাকে উদ্দেশ করিয়া এইরূপে বিলাপ করিতেছেন, ইত্যবসরে দেবদূত তৎসন্নিধানে আসিয়া কহিলেন, “রুরু! তুমি দুঃখার্ত্ত হইয়া যেরূপ প্রার্থনা করিতেছ, উহা নিতান্ত অসম্ভব; যেহেতু, মনুষ্য একবার কালগ্রাসে পতিত হইলে আর কদাচ পুনর্জ্জীবিত হয় না। এই প্রমদ্বরা গন্ধর্ব্বের ঔরসে অপ্সরাগর্ভে জন্মগ্রহণ করে, এক্ষণে আয়ুঃশেষ হইয়াছে বলিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। অতএব হে বৎস! তুমি আর শোকসাগরে নিমগ্ন হইও না। পূর্ব্বে দেবগণ এই বিষয়ে একটি উপায় নির্দ্দেশ করিয়াছেন, যদি তাহা করিতে পার, তবে পুনর্ব্বার প্রমদ্বরাকে লাভ করিতে পারিবে।” রুরু কহিলেন, “হে দেবদূত! দেবগণ এই বিষয়ে কি উপায় স্থির করিয়াছেন, যথার্থ করিয়া বল, আমি এই দণ্ডেই তদনুযায়ী কর্ম্ম করিব।” দেবদূত কহিলেন, “হে ভৃগুনন্দন! তুমি স্বীয় ভার্য্যাকে আপনার পরমায়ুর অর্দ্ধেক প্রদান কর, তাহা হইলেই সে পুনর্জ্জীবিতা হইবে।” রুরু কহিলেন, “আচ্ছা আমি প্রমদ্বরাকে আপন পরমায়ুর অর্দ্ধভাগ প্রদান করিলাম, সে মৃত্যুশয্যা হইতে গাত্রোত্থান করুক।” তখন গন্ধর্ব্বরাজ ও দেবদূত উভয়ে-যম-সমীপে গমন করিয়া নিবেদন করিলেন, “হে ধর্ম্মরাজ! যদি আপনি অনুমতি করেন, তবে রুরুর মৃতভার্য্যা প্রমদ্বরা স্বীয় ভর্ত্তার অর্দ্ধায়ু লইয়া পুনর্জ্জীবিত হয়।” ধর্ম্মরাজ কহিলেন, “হে দেবদূত! যদি তোমার ইচ্ছা হইয়া থাকে, তবে রুরুপত্নী রুরুর অর্দ্ধ পরমায়ু পাইয়া পুনর্জ্জীবিত হউক।” ধর্ম্মরাজ এই কথা কহিবামাত্র প্রমদ্বরা রুরুর অর্দ্ধ পরমায়ু প্রাপ্ত হইল এবং তৎক্ষণাৎ সুপ্তোত্থিতার ন্যায় ধরাতল হইতে গাত্রোত্থান করিল। এইরূপে প্রমদ্বরা পুনর্জ্জীবিত হইলে, রুরুর পিতা এবং প্রমদ্বরার পিতা উভয়ে আনন্দ-সাগরে মগ্ন হইয়া শুভলগ্নে পুৎত্র-কন্যার বিবাহবিধি নির্ব্বাহ করিলেন। তাঁহারাও পরস্পরের হিতসাধনে তৎপর হইয়া পরমানন্দে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। রুরু এইরূপে কমলসমপ্রভা সুদুর্লভা প্রিয়তমাকে পুনর্লাভ করিয়া সর্পবংশ ধ্বংস করিতে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলেন। সর্প অবলোকন করিবামাত্র তিনি ক্রোধে কম্পান্বিত-কলেবর হইয়া শস্ত্রাঘাতে তাহাকে বিনাশ করিতেন।
একদা তিনি এক নিবিড় অরণ্যানী প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, এক অতি জীর্ণ-কলেবর ডুণ্ডুভ সর্প শয়ন করিয়া রহিয়াছে। রুরু তাহাকে দেখিবামাত্র ক্রোধান্ধ হইয়া যমদণ্ডের ন্যায় নিজ দণ্ড উদ্ধৃত করিয়া তাহার নিধন-সাধনে উদ্যত হইলেন। ডুণ্ডুভ তাঁহাকে জিঘাংসু দেখিয়া কহিল, “হে তপোধন! আমি ত’ তোমার কোন অপরাধ করি নাই, তবে কেন অকারণে রোষপরবশ হইয়া আমার প্রাণবধে উদ্যত হইতেছ?”


দশম অধ্যায়
রুরুর সর্পমাত্র হিংসার কারণ
রুরু কহিলেন, “হে ভুজঙ্গম! এক দুষ্ট সর্প আমার প্রাণতুল্যা প্রেয়সীকে দংশন করিয়াছিল, সেই অবধি আমি এই অনুল্লঙ্ঘনীয় দৃঢ়-প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে, সর্প দেখিতে পাইলেই তাহার প্রাণসংহার করিব; অতএব আমি তোমাকে হত্যা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। অদ্য আমার হস্তে তোমার প্রাণসংহার হইবে।” ডুণ্ডুভ কহিল, “হে ব্রহ্মন্! যে-সকল সর্পেরা মনুষ্যদিগকে দংশন করে, তাহারা স্বতন্ত্র জাতি; ডুণ্ডুভেরা সেরূপ নহে। ইহারা কখন কাহারও হিংসা করে না; অতএব হে মহর্ষে! কেবল সর্পনামের গন্ধমাত্র পাইয়া নিরপরাধ ডুণ্ডুভগণকে বধ করা তোমার সমুচিত কর্ম্ম হয় না। ডুণ্ডুভদিগের সুখভোগাভিলাষ অন্যান্য ভুজঙ্গমের সদৃশ নহে; কিন্তু ইহারা অনর্থ-ঘটনার সময় তাহাদের সমভাগী, অতএব তুমি ধার্ম্মিক হইয়া এবম্ভূত হতভাগ্য নিরপরাধ ডুণ্ডুভদিগকে বধ করিও না।”
রুরু ভয়ার্ত্ত ডুণ্ডুভের এই কাতরোক্তি-শ্রবণে অত্যন্ত দয়ার্দ্র হইয়া তাহার প্রাণসংহারে পরাঙ্মুখ হইলেন এবং শান্তবাক্যে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে ভুজঙ্গম! তুমি কে, কি কারণেই বা সর্পযোনি প্রাপ্ত হইয়াছ, আমাকে বল।” সর্প কহিল, “আমি পূর্ব্বে সহস্রপাদনামা মুনি ছিলাম। ব্রহ্মশাপগ্রস্ত হইয়া ভুজঙ্গ-কলেবর ধারণ করিয়াছি।” ইহা শুনিয়া রুরু কহিলেন, “হে ভুজঙ্গোত্তম! ব্রাহ্মণ কি নিমিত্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তোমাকে শাপ প্রদান করিয়াছিলেন, আর কত কালই বা তোমাকে এই শরীরে থাকিতে হইবে সবিস্তর শুনিতে ইচ্ছা করি।”


একাদশ অধ্যায়
আস্তীকপর্ব্ব-খগম-ঋষিবৃত্তান্ত
‌ ডুণ্ডভ কহিল, “সত্যবাদী ও তপোবীর্য্য-সম্পন্ন খগম নামে এক ব্রাহ্মণ আমার বাল্যকালের সখা ছিলেন। একদা তিনি অগ্নিহোত্র-কার্য্যানুষ্ঠানে অত্যন্ত আসক্ত আছেন, এমত সময়ে আমি বালস্বভাবসুলভ কৌতুকের পরতন্ত্র হইয়া তৃণ-নির্ম্মিত ভুজঙ্গম দ্বারা তাঁহাকে বিভীষিকা প্রদর্শন করিয়াছিলাম। তদ্দর্শনে তিনি মূর্চ্ছিত হইয়া মেদিনীপৃষ্ঠে পতিত হইলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে চৈতন্য-প্রাপ্ত হইলে ক্রোধে দুই চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া আমাকে কহিলেন, ‘তুমি আমাকে ভয় প্রদর্শন করিবার নিমিত্ত যাদৃশ বীর্য্যহীন সর্প নির্ম্মাণ করিয়াছ, আমি তোমাকে শাপ দিতেছি, তুমি সেইরূপ নির্বীর্য্য সর্প হও।’ আমি তদীয় তপঃপ্রভাব অবগত ছিলাম; অতএব অত্যন্ত উদ্বিগ্নচিত্তে তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলাম, ‘ভ্রাতঃ! আমি সখা বলিয়া পরিহাসার্থ তোমার প্রতি এই কুকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াছি; অতএব এক্ষণে ক্ষমা-প্রদর্শন-পুরঃসর আমাকে শাপ হইতে বিমূক্ত কর।’
“খগম আমাকে এইরূপ ব্যাকুলিত দেখিয়া বারংবার দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক কহিলেন, ‘আমি যাহা কহিয়াছি, তাহা কদাচ মিথ্যা হইবার নহে; অতএব এক্ষণে যাহা কহিতেছি, তাহা সাবধানে শুনিয়া সর্ব্বকাল মনে করিয়া রাখিবে। মহাত্মা প্রমতির রুরু নামে এক পরম-পবিত্র পুৎত্র জন্মিবে, তাঁহাকে দর্শন করিলেই তোমার শাপ-বিমোচন হইবে।’ আপনি সেই প্রমতি-পুৎত্র রুরু, আজি আমি আপনার সন্দর্শন পাইয়াছি, এক্ষণে আমি স্বীয় পূর্ব্বরূপ লাভ করিয়া আপনাকে কিছু হিতোপদেশ দিতেছি, শুনুন।”
শাপভ্রষ্ট সহস্রপাদ এই বলিয়া সর্প-কলেবর পরিত্যাগ পূর্ব্বক নিজ ভাস্বরমূর্ত্তি পুনঃপ্রাপ্ত হইলেন এবং কহিলেন, “হে মহাত্মন্ রুরো! অহিংসা পরম ধর্ম্ম নিমিত্ত ব্রাহ্মণদিগের কখন কোন জীবহিংসা করা উচিত নহে। বেদে এইরূপ কথিত আছে যে, ব্রাহ্মণরা সর্ব্বদা শান্তমূর্ত্তি, বেদবেদাঙ্গবেত্তা ও সর্ব্বজীবের অভয়প্রদ হইবেন। অহিংসা, সত্যবাক্য, ক্ষমা ও বেদবাক্য-ধারণ এইগুলি ব্রাহ্মণের পরম ধর্ম্ম। দণ্ডধারণ, উগ্রত্ব ও প্রজাপালন এই সমস্ত ক্ষত্রিয়ের পরম ধর্ম্ম। আপনি ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণের ক্ষৎত্রিয়ধর্ম্ম অবলম্বন করা অনুচিত। দেখুন, পূর্ব্বকালে রাজা জনমেজয়ের যজ্ঞে সর্পকুল বিনষ্ট হইতে আরম্ভ হইয়াছিল; কিন্তু তপোবলসম্পন্ন বেদবেদাঙ্গপারগ, ব্রাহ্মণাগ্রগণ্য আস্তীক মহাশয় ভয়ার্ত্ত সর্পগণকে পরিত্রাণ করেন।”


দ্বাদশ অধ্যায়
সর্পযজ্ঞের প্রশ্ন
রুরু কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! ভূপতি জনমেজয় কি নিমিত্ত সর্পকুল ধ্বংস করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, আর কি জন্যই বা ধীমান্ আস্তীক মুনি তাহাদিগকে রক্ষা করিলেন, আমি সবিশেষ শুনিতে ইচ্ছা করি।” “আপনি ব্রাহ্মণদিগের মুখে আস্তীক-বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিবেন” এই বলিয়া মহর্ষি সহস্রপাদ অন্তর্হিত হইলেন। রুরু তিরোহিত ঋষিকে অন্বেষণ করিয়া সমস্ত বন ভ্রমণ করিলেন। পরিশেষে নিতান্ত ক্লান্ত ও একান্ত মোহপরতন্ত্র এবং অচেতনপ্রায় হইয়া ধরাতলে পড়িলেন। অনন্তর চৈতন্য-লাভ করিয়া সহস্রপাদের উপদেশবাক্য পুনঃ পুনঃ স্মরণ করিতে করিতে স্বকীয় আশ্রমে প্রত্যাগমন করিলেন এবং স্বীয় জনক-সন্নিধানে সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করাতে তিনি তাঁহাকে আস্তীকাখ্যান সবিস্তর শ্রবণ করাইলেন।


ত্রয়োদশ অধ্যায়
জরৎকারু-চরিত্র
শৌনক কহিলেন, “হে সৌতে! মহারাজ জনমেজয় কি নিমিত্ত সর্পযজ্ঞ করিয়া সর্পগণকে ধ্বংস করিয়াছিলেন এবং কি কারণেই বা তপোধনাগ্রগণ্য আস্তীক মুনি প্রদীপ্ত হুতাশন হইতে ভুজঙ্গমদিগকে রক্ষা করিয়াছিলেন, তাহা সবিশেষ বর্ণন কর। যে রাজা সর্পসত্রের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, তিনি কাহার পুৎত্র এবং সেই দ্বিজবর আস্তীক মুনিই বা কাহার পুৎত্র, ইহাও বর্ণন কর।” “হে মুনিবর! আমি আপনার নিকট অতি বিস্তীর্ণ আস্তীকোপাখ্যান আনুপূর্ব্বিক বর্ণনা করিতেছি, শ্রবণ করুন।” শৌনক কহিলেন, “হে সূতপুৎত্র! প্রাচীন মহর্ষি আস্তীকের ঐ মনোহর উপাখ্যান আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ জন্মিয়াছে।”
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, আমার পিতা নৈমিষারণ্যবাসী বিপ্রগণ কর্ত্তৃক অভ্যর্থিত হইয়া সর্ব্বপাপবিনাশক ব্যাসোক্ত ঐ পুরাতন ইতিহাস তাঁহাদিগকে শ্রবণ করাইয়াছিলেন। আমি তৎসমীপে যে প্রকার শ্রবণ করিয়াছি, অবিকল সেইরূপ বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। তপোধন আস্তীকের পিতা জরৎকারু মুনি সাক্ষাৎ প্রজাপতিসদৃশ ব্রহ্মচারী, ঊর্দ্ধরেতা ও পরম ধার্ম্মিক ছিলেন। তিনি সর্ব্বদা ব্রতানুষ্ঠান, উগ্রতপস্যা ও আহারসংযমে একান্ত তৎপর থাকিতেন। সেই তপোবলসম্পন্ন মহাত্মা সর্ব্বদা তীর্থপর্য্যটন ও তীর্থে অবগাহন করিয়া অবনীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন এবং যেস্থানে সায়ংকাল উপস্থিত হইত, সেই স্থানে অবস্থিতি করিতেন। এইরূপে বহুকাল আহার নিদ্রা পরিত্যাগ ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিয়া তিনি শীর্ণকলেবর হইয়া ছিলেন; তথাপি বায়ুমাত্র ভক্ষণপূর্ব্বক কঠোর ব্রতের অনুষ্ঠান করিতেন।
একদা জরৎকারু মুনি ভ্রমণ করিতে করিতে কোন স্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, কতিপয় ব্যক্তি ঊর্দ্ধপাদ ও অধোমস্তক হইয়া মহাগর্ত্তে লম্বমান রহিয়াছেন; তদ্দর্শনে তিনি কৃপাপরবশ হইয়া তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসিলেন; “আপনারা কে? কি নিমিত্তই বা মূষিকচ্ছিন্নমূল উশীরস্তম্ব [বেণার মূলের গুচ্ছ] মাত্র অবলম্বন করিয়া অধোমুখে এই মহাগর্ভে লম্বমান রহিয়াছেন?” পিতৃগণ কহিলেন, “আমরা যাযাবর [অতিশয় পর্য্যটনশীল- যাহারা একস্থানে স্থির থাকে না।] নামে ঋষি; সন্তানক্ষয় হওয়াতে অধঃপতিত হইতেছি। আমার নিতান্ত হতভাগ্য! আমাদিগের জরৎকারু নামে এক পুৎত্র আছে, সেই দুর্ম্মতি পুৎত্রার্থ দার পরিগ্রহ না করিয়া সংসারসুখে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক অহর্নিশ কেবল তপস্যায় কালাতিপাত করিতেছে। সুতরাং কুলক্ষয় উপস্থিত দেখিয়া এই মহাগর্ত্তে লম্বমান রহিয়াছি; আমাদিগের বংশবর্দ্ধন জরৎকারু থাকিতেও আমরা অনাথ ও দুষ্কৃতীর ন্যায় হইয়াছি; তুমি কে, কি নিমিত্তই বা আমাদিগের দুঃখ দেখিয়া বান্ধবের ন্যায় অনুশোচনা করিতেছ, জানিতে বাসনা করি।”
জরৎকারু তাঁহাদিগের কাতরোক্তি শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “আপনারা আমার পূর্ব্বপুরুষ, আমারই নাম জরৎকারু; এক্ষণে আজ্ঞা করুন, কি করিব?” পিতৃগণ কহিলেন, “বৎস! তোমার এবং আমাদিগের পারত্রিক মঙ্গল-সম্পাদন করিবার নিমিত্ত কুলরক্ষা-বিষয়ে যত্নবান হও। লোকে পুৎত্রৎপাদন দ্বারা যেরূপ সদ্‌গতিসম্পন্ন হয়, ধর্ম্মফল দ্বারা সেরূপ সদ্‌গতি লাভ করিতে পারে না। অতএব হে পুৎত্র! আমাদিগের নির্দ্দেশানুসারে দারপরিগ্রহ করিয়া সন্তানোৎপাদনে যত্নবান্ হও। ইহা করিলেই আমদিগের পরম হিতসাধন করা হইবে।”
জরৎকারু কহিলেন, “আমি সম্ভোগার্থে দারপরিগ্রহ বা জীবিকার্থে ধনোপার্জ্জন করিব না, কেবল আপনাদিগের হিতসাধনার্থে বিবাহ করিতে সম্মত হইলাম; কিন্তু তদ্বিষয়ে এই এক প্রতিজ্ঞা রহিল যে, যদি কন্যা আমার সনাম্নী হয় এবং তাহার বন্ধুবান্ধবগণ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক আমাকে সেই কন্যা ভিক্ষাস্বরূপ সম্প্রদান করে, তাহা হইলেই আমি তাহাকে যথাবিধি বিবাহ করিব; কিন্তু আমি অত্যন্ত দরিদ্র, বোধ করি, দরিদ্রকে কন্যা সম্প্রদান করিতে কেহই সম্মত হইবে না। হে পিতামহগণ! আমি এই নিয়মে দারপরিগ্রহ করিতে যত্নবান্ হইব, অন্যথা এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতে পারিব না। এইরূপে পরিণীতা ভার্য্যার গর্ভে সন্তান জন্মিলে আপনারা উদ্ধার হইবেন এবং অক্ষয় স্বর্গলাভ করিয়া পরম-সুখে কালযাপন করিতে পারিবেন।”


চতুর্দ্দশ অধ্যায়
জরৎকারুর বিবাহ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তদনন্তর জরৎকারু মুনি গার্হস্থ্য আশ্রম করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়া পত্নীলাভার্থ সমস্ত মহীমণ্ডল ভ্রমণ করিতে লাগিলেন, কিন্তু কেহই তাঁহাকে কন্যা প্রদান করিল না। একদা তিনি পিতৃলোকের বাক্য স্মরণ করিয়া বনপ্রবেশপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে তিনবার কন্যা ভিক্ষা করিলেন। তাঁহার সেই ভিক্ষা-বাক্য শ্রবণে নাগরাজ বাসুকি স্বীয় ভগিনীকে আনয়ন করিয়া সম্প্রদান করিতে উদ্যত হইলেন। কিন্তু জরৎকারু সেই কন্যা সনাম্নী নহে, এই ভাবিয়া তাহার পাণিগ্রহণ পরাঙ্মুখ হইলেন; কারণ, মহাত্মা জরৎকারু প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, যদি সনাম্নী কন্যা পান ও তাহার বন্ধু বান্ধবগণ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক ভিক্ষাস্বরূপ তাঁহাকে সেই কন্যা সম্প্রদান করে, তাহা হইলেই তাহাকে সহধর্ম্মিণী করিবেন।
অনন্তর মহাপ্রাজ্ঞ মহাতপা জরৎকারু বাসুকিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে ভুজঙ্গম! তুমি যথার্থ করিয়া বল, তোমার এই ভগিনীর নাম কি? বাসুকি কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! আমার এই অনুজার নাম জরৎকারু। আমি আপনাকে এই ভগিনীটি সম্প্রদান করিতেছি, আপনি ইহাকে গ্রহণ করুন।” এই বলিয়া বাসুকি জরৎকারুকে স্বীয় ভগিনী প্রদান করিলেন। তিনিও বিধিপূর্ব্বক তাহার পাণিগ্রহণ করিলেন।

Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger