সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

বিনতার দাসীভাবপ্রাপ্তি, সূর্য্যের সরর্বসংহারক মূর্ত্তিধারণ, কদ্রু কর্ত্তৃক ইন্দ্রস্তব, ইন্দ্রের বারিবর্ষণ, বিনতার দাসীত্বমুক্তির উপায় অনুসন্ধান, অমৃত আহরণে গরুড়ের যাত্রা,

ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
বিনতার দাসীভাবপ্রাপ্তি
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কদ্রু ও বিনতা সমুদ্র অতিক্রম করিয়া অতিসত্বর তুরগ-সমীপে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, অশ্বটি শশাঙ্ক [চন্দ্র]-কিরণের ন্যায় শুভ্রবর্ণ, কেবল তাহার পুচ্ছদেশের কেশগুলি কৃষ্ণবর্ণ। তদবলোকনে বিনতা অতিমাত্র বিষণ্ণ হইলেন। পরে কদ্রু তাঁহার দাসীর কার্য্য করিতে আদেশ দিলেন। বিনতা পণে পরাজিতা হইয়াছেন, সুতরাং তাঁহাকে অগত্যা সপত্নীর দাস্যকর্ম্ম আশ্রয় করিতে হইল।
এই সময় গরুড় অবসর বুঝিয়া মাতার প্রযত্ন-ব্যতিরেকে স্বয়ং অণ্ডবিদারণপূর্ব্বক বহির্গত হইলেন। মহাসত্ত্ব, মহাবল সম্পন্ন, সৌদামিনীসমনেত্র, কামরূপ, কামবীর্য্য, কামচারী বিহঙ্গমরাজ প্রদীপ্ত হুতাশনরাশির ন্যায় স্বকীয় প্রভামণ্ডলে সহসা দশদিক্ আলোকময় করিয়া আকাশে আরোহণ ও ঘোরতর বিরাব [বিকট শব্দ] পরিত্যাগপূর্ব্বক ভয়ঙ্কর প্রকাণ্ড কলেবর ধারণ করিলেন। তাহা দেখিয়া দেবগণ ভীত ও বিস্মিত হইলেন। পরে তাঁহারা আসনস্থ বিশ্বরূপী ভগবান অগ্নির শরণাগত হইয়া যথাবিধি প্রণতিপূর্ব্বক অতি বিনীতবচনে কহিলেন, “হে হুতাশন! তুমি আর পরিবর্দ্ধিত হইও না, তুমি কি আমাদিগকে দগ্ধ করিতে ইচ্ছা করিয়াছ? ঐ দেখ, পর্ব্বতাকার প্রজ্বলিত অগ্নিরাশি ইতস্ততঃ প্রসূত হইতেছে।” অগ্নি কহিলেন, “হে অসুর-নিসূদন সুরগণ! তোমাদিগের আপাততঃ যাহা বোধ হইতেছে, উহা বস্তুতঃ সেরূপ নহে। আমার তুল্য তেজস্বী বলবান্ বিনতানন্দন গরুড় জন্মগ্রহণ করিয়া কলেবর বৃদ্ধি করিতেছেন; তাঁহার তেজোরাশি নিরীক্ষণ করিয়া তোমরা মোহাবিষ্ট হইয়াছ। ঐ নাগকুলান্তক কশ্যপাত্মজ সর্ব্বদা দেবতাদিগের হিতানুষ্ঠান ও দৈত্যরাক্ষসদিগের অনিষ্ট চেষ্টা করিবেন। অতএব তোমাদিগের কোন ভয় নাই, আইস, আমরা সমবেত হইয়া গরুড়ের নিকট যাই।”
অনন্তর দেবগণ ও ঋষিগণ তৎসন্নিধানে গমন করিয়া গরুড়কে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। “হে মহাভাগ পতগেশ্বর! তুমি ঋষি, তুমি দেব, তুমি প্রভু, তুমি সূর্য্য, তুমি প্রজাপতি, তুমি ব্রহ্মা, তুমি ইন্দ্র, তুমি হয়গ্রীব, তুমি শর, তুমি জগৎপতি, তুমি সুখ, তুমি দুঃখ, তুমি বিপ্র, তুমি অগ্নি, তুমি পবন, তুমি ধাতা, তুমি বিধাতা, তুমি বিষ্ণু, তুমি অমৃত, তুমি মহদ্‌যশঃ, তুমি প্রভা, তুমি আমাদের পরিত্রাণস্থান, তুমি বল, তুমি সাধু, তুমি মহাত্মা, তুমি সমৃদ্ধিমান্, তুমি অন্তক, তুমিই স্থিরাস্থির সমস্ত পদার্থ, তুমি অতি দুঃসহ, তুমি উত্তম, তুমি চরাচরস্বরূপ, হে প্রভূতকীর্ত্তে গরুড়! ভূত ভবিষ্যৎ ও বর্ত্তমান তোমা হইতেই ঘটিতেছে, তুমি স্বকরমণ্ডলে দিবাকরের শোভা প্রাপ্ত হইয়াছ, তুমি স্বকীয় প্রভাপুঞ্জে সূর্য্যের তেজোরাশি সমাক্ষিপ্ত করিতেছ, হে হুতাশনপ্রভ! তুমি কোপাবিষ্ট দিবাকরের ন্যায় প্রজাসকলকে দগ্ধ করিতেছ, তুমি সর্ব্বসংহারে উদ্যত যুগান্তবায়ুর ন্যায় নিতান্ত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করিয়াছ। আমরা মহাবল-পরাক্রান্ত, বিদ্যুৎসমানকান্তি, গগনবিহারী, অমিত-পরাক্রমশালী, খগকুলচূড়ামণি গরুড়ের শরণ লইলাম। হে জগৎপ্রভো! তোমার তপ্তসুবর্ণসম রমণীয় তেজোরাশি দ্বারা এই জগন্মণ্ডল নিরন্তর সন্তপ্ত হইতেছে। তুমি ভয়বিহ্বল ও বিমানারোহণপূর্ব্বক আকাশপথে ইতস্ততঃ পলায়মান সুরগণকে পরিত্রাণ কর। হে খগবর! তুমি পরমদয়ালু মহাত্মা কশ্যপের পুৎত্র, অতএব ক্রোধ সংবরণ করিয়া জগতের প্রতি দয়া প্রকাশ কর। তুমি ঈশ্বর, এক্ষণে ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক আমাদিগকে অনুকম্পা কর। আমরা বিষম বিপদে আক্রান্ত হইয়াছি। তোমার বজ্রনির্ঘোষ-সদৃশ ঘোররবে নভোমণ্ডল, দিঙ্মণ্ডল, দেবলোক, ভূলোক ও আমাদিগের হৃদয় সতত কম্পমান হইতেছে। তুমি অগ্নিতুল্য স্বীয় শরীরের সঙ্কোচ কর। কুপিত কৃতান্তের ন্যায় তোমার অতি ভীষণ কলেবর দর্শনে আমাদের মন ব্যথিত ও শঙ্কিত হইতেছে। হে ভগবান্ খগাধিপতে! প্রসন্ন হইয়া শরণাগতজনের সুখাবহ হও।”

চতুর্ব্বিংশ অধ্যায়
সূর্য্যের সরর্বসংহারক মূর্ত্তিধারণ
গরুড় দেবতা ও ঋষিদিগের এইরূপ স্তুতিবাদ শ্রবণ করিয়া এবং আপনার অতি প্রকাণ্ড কলেবর অবলোকন করিয়া স্বীয় তেজঃপুঞ্জের প্রতিসংহার করিলেন এবং কহিলেন, “আমি আত্মতেজের সঙ্কোচ করিতেছি, আর কাহাকেও ভীত হইতে হইবে না।” এই বলিয়া বিহঙ্গরাজ গরুড় অরুণকে আত্মপৃষ্ঠে আরোহণ করাইয়া পিতৃগৃহ হইতে সমুদ্রের অপরপারবর্ত্তিনী স্বীয় জননীর সন্নিধানে গমন করিলেন। ঐ সময় সূর্য্যদেব দেবতাদিগের প্রতি কূপিত হইয়া প্রখর করজাল বিস্তারপূর্ব্বক ত্রিলোকী দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছেন দেখিয়া খগরাজ স্বীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা অরুণকে পূর্ব্বদিকে স্থাপন করিলেন।
রুরু কহিলেন, “সূর্য্য কি নিমিত্তে ত্রিলোক দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন এবং দেবতারাই বা তাঁহার কি অপকার করিয়াছিলেন যে, তিনি তাঁহাদিগের প্রতি এইরূপ কুপিত হইলেন?” প্রমতি কহিলেন, “যৎকালে চন্দ্র ও সূর্য্য রাহুকে প্রচ্ছন্নভাবে অমৃত পান করিতে দেখিয়া দেবতাদিগের নিকট প্রকাশ করিয়া দেন, তদবধি তাঁহাদিগের সহিত রাহুর বৈরানুবন্ধ হওয়াতে ঐ ক্রুরগ্রহ রাহু মধ্যে মধ্যে সূর্য্যদেবকে গ্রাস করিত। পরে ভগবান্ সূর্য্য এই অভিপ্রায়ে রোষাবিষ্ট হইলেন যে, আমি দেবতাদিগেরই হিতানুষ্ঠানের নিমিত্ত রাহুর কোপে পড়িলাম এবং তজ্জন্য কেবল আমিই একাকী বহু অনর্থকর পাপের ফলভাগী হইলাম, বিপৎকালে কাহাকেও সাহায্য করিতে দেখি না। রাহু যখন আমাকে গ্রাস করে, দেবতারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াও তাহা অনায়াসে সহ্য করিয়া থাকে; অতএব আমি অদ্য সমস্ত লোক বিনাশ করিব, সন্দেহ নাই। দিবাকর এইরূপ অভিসন্ধি করিয়া অস্তাচল চূড়াবলম্বী হইলেন এবং বিশ্বসংসার সংহার করিবার মানসে স্বকীয় তেজোরাশি পরিবর্দ্ধিত করিতে লাগিলেন। তদনন্তর মহর্ষিগণ দেবতাদিগের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, “অদ্য নিশীথসময়ে সর্ব্বলোকভয়াবহ মহাদাহ আরম্ভ হইবে।”
তখন দেবগণ মহর্ষিদিগের সমভিব্যাহারে সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার নিকট উপনীত হইয়া বিনীতবচনে নিবেদন করিলেন, “ভগবান্! কোথা হইতে ভয়ঙ্কর মহাদাহ উপস্থিত হইল? সূর্য্য লক্ষিত হইতেছে না, অথচ সর্ব্বলোকক্ষয় উপস্থিত। না জানি, সূর্য উদিত হইলে কি দুর্দ্দশা ঘটিবে।” পিতামহ কহিলেন, “দিবাকর সর্ব্বসংহারে উদ্যত হইয়াছেন। তিনি উদিত হইয়া ক্ষণকালমধ্যেই আমাদিগের সমক্ষে সমস্ত লোক ভস্মসাৎ করিবেন; কিন্তু ইতিপূর্ব্বেই আমি ইহার প্রতি বিধান করিয়া রাখিয়াছি। মহাত্মা কশ্যপের অরুণ নামে এক মহাবীর্য্যসম্পন্ন পুৎত্র জন্মিয়াছে। সে সূর্য্যের সম্মুখে থাকিয়া তাঁহার সারথ্য-কার্য্য করিবে এবং তদীয় তেজঃ প্রতিসংহার করিবে; তাহা হইলেই দেবগণ, ঋষিগণ ও সমস্ত লোকের মঙ্গললাভের সম্ভাবনা।” প্রমতি কহিলেন, “তদনন্তর অরুণ পিতামহের আদেশানুসারে সূর্য্য উদিত হইলেই তাঁহাকে আবরণ করিয়া তদীয় সম্মুখে উপবিষ্ট রহিলেন। সূর্য্যদেব যে কারণে কোপাক্রান্ত হইয়াছিলেন এবং অরুণ যে নিমিত্ত তাঁহার সারথ্য-স্বীকার করেন, তাহা আদ্যোপান্ত সমুদয় কীর্ত্তন করিলাম। এক্ষণে পূর্ব্বোল্লিখিত প্রশ্নের প্রত্যুত্তর প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর।

পঞ্চবিংশ অধ্যায়
কদ্রু কর্ত্তৃক ইন্দ্রস্তব
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, “তৎপরে মহাবলপরাক্রান্ত কামচারী বিহঙ্গমরাজ গরুড় সমুদ্রের অপরপারস্থ স্বকীয় জননী-সন্নিধানে গমন করিলেন। তথায় তাঁহার মাতা বিনতা পণে পরাজিতা হইয়া আপন সপত্নীর দাস্যবৃত্তি অবলম্বনপূর্ব্বক দুঃসহ দুঃখে কালক্ষেপ করিতেছিলেন। একদা বিনতা পুৎত্রের নিকট উপবিষ্টা আছেন, এমত সময়ে কদ্রু তাঁহাকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, “দেখ বিনতে! সমুদ্রের মধ্যে এক পরম রমণীয় দ্বীপ আছে, ঐ দ্বীপে নাগগণ বাস করে, তথায় আমাকে লইয়া চল।” বিনতা আজ্ঞাপ্রাপ্তিমাত্রে কদ্রুকে পৃষ্ঠদেশে আরোহণ করাইয়া চলিলেন এবং গরুড়ও মাতৃনির্দ্দেশক্রমে কদ্রুপুৎত্র নাগগণকে পৃষ্ঠে লইয়া তাঁহার অনুসরণ করিলেন। বিনতানন্দন গরুড় সূর্য্যাভিমুখে গমন করাতে পন্নগগণ দুঃসহ তপনতাপে অত্যন্ত সন্তপ্ত হইয়া মূর্চ্ছিত হইতে লাগিল।
কদ্রু স্বীয় পুৎত্রদিগের তাদৃশ দুরবস্থা দেখিয়া বৃষ্টিবাসনায় সুরপতি ইন্দ্রকে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। “হে শচীপতে সহস্রলোচন দেবরাজ! তুমি বল, নমুচি ও বৃত্রাসুরকে নষ্ট করিয়াছ। এক্ষণ তোমাকে নমস্কার করি। প্রচণ্ড-রবিকিরণসন্তপ্ত মদীয় পুৎত্রদিগের উপর বারিবর্ষণ কর। হে সুরপতে! সম্প্রতি তোমা ব্যতিরেকে আমাদিগের প্রাণরক্ষার আর কোন উপায়ান্তর নাই; যেহেতু, তুমিই প্রচুর বারিবর্ষণ করিতে সমর্থ। তুমি বায়ু, তুমি মেঘ, তুমি অগ্নি, তুমি গগন মণ্ডলে সৌদামিনীরূপে প্রকাশমান হও এবং তোমা হইতেই ঘনাবলী পরিচালিত হইয়া থাকে; তোমাকেই লোকে মহামেঘ বলিয়া নির্দ্দেশ করে; তুমিই ঘোর ও প্রকাণ্ড বজ্র জ্যোতিঃস্বরূপ, তুমি আদিত্য, তুমি বিভাবসু, তুমি অত্যাশ্চর্য্য মহাভূত, তুমি নিখিল দেবগণের অধিপতি, তুমি বিষ্ণু, তুমি সহস্রাক্ষ, তুমি দেব, তুমি পরমগতি, তুমি অক্ষয় অমৃত, তুমি পরমপূজিত, সৌম্যমূর্ত্তি, তুমি মুহূর্ত্ত, তুমি তিথি, তুমি বল, তুমি ক্ষণ, তুমি শুক্লপক্ষ, তুমি কৃষ্ণপক্ষ, তুমি কলা, কাষ্ঠা, ত্রুটি, মাস,ঋতু, সংবৎসর ও অহোরাত্র; তুমি সমস্থ পর্ব্বত ও বন সমাকীর্ণা বসুন্ধরা; তুমি তিমিরবিরহিত ও সূর্য্যসংস্কৃত আকাশ, তুমি তিমি-তিমিঙ্গিলসহিত ও উত্তুঙ্গতরঙ্গ-কুলসঙ্কল মহার্ণব, তুমি অতি যশস্বী, এই নিমিত্তই প্রতিভাসম্পন্ন মহর্ষিগণ প্রশান্তমনে তোমার আরাধনা করিয়া থাকেন। আর তুমি স্তবে পরিতুষ্ট হইয়া যজমানের হিতসাধনার্থে যজ্ঞীয় পবিত্র হবিঃ ও সোমরস পান করিয়া থাক। ব্রাহ্মণেরা একমাত্র পারত্রিক শুভলাভের প্রত্যাশায় সতত তোমার উপাসনা করিয়া থাকেন। হে বিপুলবিক্রমশালিন্! অখিল বেদ বেদাঙ্গ তোমারই অচিন্তনীয় অনন্ত মহিমা কীর্ত্তন করে এবং যজ্ঞপরায়ণ দ্বিজাতিগণ তোমার স্বরূপ অবধারণের নিমিত্ত প্রযত্ন-সহকারে সতত সে সকল বেদ-বেদাঙ্গের মীমাংসা করিয়া থাকেন।


ষড়্‌বিংশ অধ্যায়
ইন্দ্রের বারিবর্ষণ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দেবরাজ ইন্দ্র কদ্রুকৃত স্তব শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া নীলবর্ণ জলদজালে দিঙ্মণ্ডল আচ্ছন্ন করিলেন এবং মেঘদিগকে অনবরত মুষলধারে বারিবর্ষণ করিতে আদেশ দিলেন। জলদগণ ইন্দ্রের আদেশ পাইয়া ঘোরতর গভীর গর্জ্জনপূর্ব্বক মুহুর্মুহুঃ সৌদামিনীস্ফুরণ ও প্রচুর বারিবর্ষণ করিতে লাগিল। তৎকালে বোধ হইল যেন, আকাশে প্রলয়কাল উপস্থিত হইয়াছে কিংবা মেঘনির্ঘোষ, বিদ্যুৎ প্রকাশ ও বাহুচালিত নীরধারা দ্বারা যেন আকাশমণ্ডল নৃত্য করিতেছে। সেই মেঘাচ্ছন্ন দুর্দ্দিনে চন্দ্র-সূর্য্য এককালে অন্তর্হিত হইলেন। তখন নাগগণ যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইল। বিশ্বমণ্ডলী সলিলভারে মগ্নপ্রায় হইল। সুশীতল বিমল জলধারা রসাতলে প্রবিষ্ট হইতে লাগিল। পরিশেষে সর্পগণ মাতার সহিত রামণীয়কদ্বীপে উপনীত হইল।

সপ্তবিংশ অধ্যায়
বিনতার দাসীত্বমুক্তির উপায় অনুসন্ধান
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগগণ প্রচুর জলধারায় অভিষিক্ত হইয়া অতি প্রহৃষ্টমনে সুপর্ণ [গরুড়] পৃষ্ঠে আরোহণপূর্ব্বক সেই মকর সমূহের আকর-ভূমি, বিশ্বকর্ম্মবিরচিত রামণীয়কদ্বীপে উপনীত হইল; তথায় যাইয়া প্রথমতঃ অতি ভয়ঙ্কর লবণ-মহার্ণব অবলোকন করিল; পরে সেই দ্বীপের অন্তর্ব্বর্ত্তী পরমশোভাকর এক পবিত্র কাননে প্রবেশ করিয়া বিহার করিতে লাগিল। ঐ কানন সাগর-জলে নিরন্তর অভিষিক্ত হইতেছে; উহাতে বহুবিধ বিহঙ্গমগণ সর্ব্বদা মধুরস্বরে কলরব করিতেছে; বৃক্ষশ্রেণী নিরন্তর ফল-পুষ্পে সুশোভিত রহিয়াছে; ঘন-সন্নিবিষ্ট তরুরাজি, সুরম্য হর্ম্ম্য [অট্টালিকা] পদ্মাকর [যেখানে পদ্ম জন্মে] সরোবর ও স্বচ্ছসলিলপূর্ণ অলৌকিক হ্রদসমূহ সর্ব্বদা উহার অপূর্ব্ব শোভা সম্পাদন করিতেছে; তথায় সুগন্ধ সমীরণ অনুক্ষণ ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতেছে; অত্যুন্নত চন্দন ও অন্যান্য বহুবিধ বৃক্ষগণ সতত বিরাজিত রহিয়াছে; ঐ সকল বৃক্ষ বায়ুবেগ-সহকারে বিকম্পিত হইয়া অবিরত পুষ্পবর্ষণ করিতেছে; মধুকরগণ মধুগন্ধে অন্ধ হইয়া মৃদু মধুরবে আগন্তুক ব্যক্তির মনোহরণ করিতেছে। ঐ উদ্যান গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরাদিগের প্রীতিস্থান এবং উহা দেখিলে তদ্দণ্ডেই অন্তঃকরণে আনন্দের সঞ্চার হইয়া থাকে।
কদ্রুপুৎত্রেরা সেই কাননে কিয়ৎক্ষণ বিহার করিয়া মহাবল পরাক্রান্ত গরুড়কে কহিল, “দেখ, তুমি আমাদিগকে অন্য কোন নির্ম্মল জলসম্পন্ন সুরম্য দ্বীপে লইয়া চল। তুমি সমস্ত মনোহর স্থান অবশ্যই জান; কারণ, তুমি গগনে উড্ডীন হইলে কোন রমণীয় স্থান তোমার নয়নের অগোচর থাকে না।” গরুড় সর্পদিগের এইরূপ আদেশবাক্য শ্রবণ করিয়া অতিবিষণ্ণমনে স্বীয় জননী-সন্নিধানে নিবেদন করিলেন, “মাতঃ! আমাকে কি কারণে সর্পগণের আদেশ প্রতিপালন করিতে হইবে, তাহা বল।” বিনতা কহিলেন, “বৎস! আমি দুরদৃষ্টক্রমে নাগগণের মায়াজালে পতিত ও পণে পরাজিত হইয়া সপত্নীর দাস্যবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছি।” গরুড় মাতৃসন্নিধানে এই কারণ শ্রবণ করিয়া অতিশয় পরিতাপ পাইলেন ও অনতিবিলম্বে সর্পগণের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, “হে নাগগণ! কোন্ বস্তু আহরণ বা কিরূপ পৌরুষ প্রকাশ করিলে আমরা দাসত্ব-শৃঙ্খল হইতে মুক্ত হইতে পারি, তাহা জানিতে ইচ্ছা করি।” তাহা শ্রবণ করিয়া সর্পেরা কহিল, “হে বিহঙ্গমরাজ! যদি তুমি পৌরুষ প্রকাশ করিয়া অমৃত আহরণ করিতে সমর্থ হও, তাহা হইলেই দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে পারিবে।”

অষ্টাবিংশ অধ্যায়
অমৃত আহরণে গরুড়ের যাত্রা
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, গরুড় এইরূপ অভিহিত হইয়া মাতার নিকট যাইয়া কহিলেন, “জননি! আমি অমৃত আহরণ করিতে চলিলাম; পথে কি আহার করিব, বলিয়া দাও।” বিনতা বলিলেন, “বৎস! সমুদ্রমধ্যে বহুসহস্র নিষাদ বাস করে, তুমি তাহাদিগকে ভোজন করিয়া অমৃত আনয়ন কর; কিন্তু হে বৎস! দেখিও, যেন ব্রাহ্মণবধে কদাচ তোমার বুদ্ধি না জন্মে। অনলসমান ব্রাহ্মণগণ সর্ব্বজীবের অবধ্য। ব্রাহ্মণ কুপিত হইলে অগ্নি, সূর্য্য, বিষ ও শস্ত্রতুল্য হয়েন। ব্রাহ্মণ সর্ব্বজীবের গুরু; এই নিমিত্ত ব্রাহ্মণ সর্ব্বভূতের আদরণীয়। অতএব হে বৎস! তুমি অতিশয় কুপিত হইয়াও যেন কোনক্রমে ব্রাহ্মণের হিংসা বা তাঁহাদিগের সহিত বিদ্রোহাচরণ করিও না। নিত্যনৈমিত্তিক জপহোমাদি ক্রিয়াকলাপে নিয়ত, বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ ক্রুদ্ধ হইলে যেরূপ দগ্ধ করিতে পারেন, কি অগ্নি কি সূর্য্য, কেহই সেরূপ পারেন না। ব্রাহ্মণ সর্ব্বজীবের অগ্রজাত, সর্ব্ববর্ণের শ্রেষ্ঠ এবং সর্ব্বভূতের পিতা ও গুরু।”
গরুড় মাতৃসন্নিধানে ব্রাহ্মণের এইরূপ অভাবনীয় প্রভাব অবগত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাতা! ব্রাহ্মণের কীদৃশ আকার, কি প্রকার স্বভাব ও কিরূপই বা পরাক্রম? ব্রাহ্মণ কি হুতাশনের ন্যায় সর্ব্বদা প্রদীপ্ত কিংবা অতিশয় সৌম্যমূর্ত্তি? যে-সকল শুভলক্ষণ দ্বারা ব্রাহ্মণকে চিনিতে পারা যায়, তুমি হেতুনির্দ্দেশপূর্ব্বক তাহা আমাকে বিশেষরূপে কহিয়া দাও।” বিনতা কহিলেন, “যিনি তোমার জঠরদেশে প্রবেশ করিলে বড়িশের ন্যায় নিতান্ত দুঃসহ ক্লেশদায়ক হইবেন এবং প্রজ্বলিত অঙ্গারের ন্যায় কণ্ঠদাহ করিবেন, তিনিই সুব্রাহ্মণ। তুমি অতিমাত্র ক্রুদ্ধ হইয়াও ব্রাহ্মণকে বধ করিতে প্রবৃত্ত হইও না।” বিনতা পুৎত্রবাৎসল্য প্রযুক্ত গরুড়কে পুনর্ব্বার কহিলেন, “বৎস! যিনি তোমার জঠরদেশে জীর্ণ হইবেন না, তাহাকেই সুব্রাহ্মণ বলিয়া জানিবে।” সর্পবঞ্চিতা পরমদুঃখিতা বিনতা পুৎত্রের অতুল পরাক্রম বুঝিতে পারিয়াও অতি প্রীতমনে তাঁহাকে আশীর্ব্বাদ করিলেন, “বৎস! বায়ু তোমার দুই পক্ষ রক্ষা করুন, চন্দ্র ও সূর্য্য তোমার পৃষ্ঠ, অগ্নি মস্তক এবং বসুগণ ত্বদীয় সর্ব্বাঙ্গ সর্ব্বদা নির্ব্বিঘ্নে রাখুন। হে পুৎত্র! আমিও তোমার স্বস্তি-শান্তি-বিষয়ে তৎপর হইয়া নিরন্তর ত্বদীয় শুভানুধ্যানে এই স্থানেই রহিলাম। তুমি কার্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত নিরাপদে প্রস্থান কর।”
গরুড় মাতৃবাক্য-শ্রবণানন্তর পক্ষদ্বয় বিস্তারপূর্ব্বক গগনমার্গে উড্ডীন হইয়া বুভুক্ষা [ক্ষুধা] প্রযুক্ত সাক্ষাৎ কৃতান্তের ন্যায় নিষাদ-পল্লীতে উপনীত হইলেন এবং নিষাদ-সংহারের নিমিত্ত ধূলিরাশি দ্বারা নভোমণ্ডল আচ্ছন্ন ও সমুদ্রের জল শোষণ করিয়া সমীপস্থ সমস্ত মহীধরগণকে বিচালিত করিতে লাগিলেন। পরিশেষে বিহঙ্গরাজ প্রকাণ্ড মুখব্যাদানপূর্ব্বক নিষাদনগরীর পথ রুদ্ধ করিয়া বসিলেন। বিষাদসাগরে নিমগ্ন নিষাদগণ প্রবলবাত্যাহত ধূলিপটলে অন্ধপ্রায় হইয়া ভুজঙ্গভোজী গরুড়ের অতি-বিস্তীর্ণ আননাভিমুখে ধাবমান হইল। যেমন প্রবল বায়ুবেগে সমস্ত বন ঘূর্ণিত হইলে পক্ষিগণ আকাশমার্গে উঠে, সেইরূপ নিষাদেরাও গরুড়ের অতি বিশাল মুখবিবরে প্রবিষ্ট হইল। পরিশেষে ক্ষুধার্ত্ত বিহঙ্গরাজ মুখ মুদ্রিত করিয়া বহুসংখ্যক নিষাদ ভক্ষণ করিলেন।

ঊনত্রিংশ অধ্যায়
শাপগ্রস্ত গজ-কচ্ছপবৃত্তান্ত
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, এক ব্রাক্ষণ ভার্য্যা সমভিব্যাহারে গরুড়ের কণ্ঠদেশে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তিনি জ্বলন্ত অঙ্গারের ন্যায় তাঁহার কণ্ঠদাহ করিতে লাগিলেন। তখন গরুড় মাতৃবাক্য স্মরণ করিয়া কহিলেন, “হে দ্বিজোত্তম! আমি মুখব্যাদান [প্রসারণ—বড়রকমের হা ] করিতেছি, তুনি অতি সত্বর বহির্গত হও; ব্রাহ্মণ সর্ব্বদা পাপচরণতৎপর হইলেও আমার অবধ্য।” ব্রাক্ষণ খগাধিরাজ গরুড়ের এই কথা শ্রবণ করিয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, “তবে আমার ভার্য্যা, নিষাদীও আমার সহিত বহির্গত হউক।” গরুড় কহিলেন, “ভাল, তুমি নিষাদীকে সঙ্গে লইয়া অবিলম্বে আমার আস্যবিবর [মুখগহ্‌বর] হইতে বহির্গত হও। তুমি এখনও আমার উদরে প্রবেশ করিয়া ভস্মাবশেষ হও নাই। অতএব বিলম্ব না করিয়া শীঘ্র আত্মরক্ষা কর।” তখন ব্রাক্ষণ নিষাদীর সহিত নিষ্ক্রান্ত হইয়া গরুড়কে সংবর্দ্ধনা করিয়া অভিলষিত প্রদেশে প্রস্থান করিলেন।
এইরূপে ব্রাহ্মণ ও তদীয় ভার্য্যা নিষাদী বহির্গত হইলে খগরাজ স্বকীয় পক্ষজাল বিস্তার করিয়া প্রবলবেগে অন্তরীক্ষে উত্থিত হইলেন এবং অনতিবিলম্বে স্বীয় পিতা কশ্যপকে দেখিতে পাইলেন। মহর্ষি কশ্যপ আপন সন্তানের সন্দর্শন পাইয়া কুশলপ্রশ্নানন্তর জিজ্ঞাসা করিলেন, “বৎস! মনুষ্যলোকে তোমার পর্য্যাপ্ত আহার-লাভ হইয়া থাকে?” তখন গরুড় কহিলেন, “পিতাঃ! আমার মাতা ও ভ্রাতা কুশলে আছেন এবং আমারও সর্ব্বাঙ্গীণ মঙ্গল বটে; কিন্তু মর্ত্ত্যলোকে আমার প্রচুর আহারদ্রব্য প্রাপ্ত হওয়া দুষ্কর হইয়াছে।” আরও কহিলেন, “নাগেরা আমাকে অমৃত আহরণ করিতে প্রেরণ করিয়াছে; আমি জননীর দাসীভাব মোচন করিবার নিমিত্ত অদ্য তাহা আনয়ন করিব; মাতা নিষাদগণকে ভক্ষণ করিতে কহিয়াছিলেন, বহুসংখ্যক নিষাদ ভক্ষণ করিয়াছি, তথাপি আমার সমুচিত তৃপ্তিলাভ হয় নাই; অতএব হে ভগবান্! এক্ষণে অপর কোন ভক্ষ্যদ্রব্য নির্দ্দেশ করিয়া দিন, যাহা আহার করিলে আমি অমৃত আহরণ করিতে সমর্থ হইব। হে প্রভো! বলবতী ক্ষুৎপিপাসায় আমার কণ্ঠতালু শুষ্কপ্রায় হইয়াছে।”
তখন মহর্ষি কশ্যপ কহিলেন, “বৎস! অনতিদূরে ঐ পবিত্র সরোবরটি দেখিতেছ. উহা দেবলোকেও বিখ্যাত। ঐ স্থলে দেখিতে পাইবে, এক হস্তী অবাঙ্মুখ [অধোবদন—নিম্নমুখ] হইয়া কূর্ম্মরূপী স্বকীয় জ্যেষ্ঠ সহোদরকে আকর্ষণ করিতেছে। উহাদিগের আকারের পরিমাণ ও জন্মান্তরীণ বৈরবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর।”
বিভাবসু নামে অতি কোপনস্বভাব এক মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার কনিষ্ঠ সহোদর মহাতপা সুপ্রতীক ভ্রাতার সহিত একান্নে থাকিতে নিতান্ত অনিচ্ছুক; এই নিমিত্ত তিনি আপন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নিকট সর্ব্বদা পৈতৃক ধনবিভাগের কথা উত্থাপন করিতেন। একদা বিভাবসু ক্রুদ্ধ হইয়া সুপ্রতীককে কহিলেন, “দেখ, অনেকেই মোহপরবশ হইয়া পৈতৃকধন বিভাগ করিতে অভিলাষ করে; কিন্তু বিভাগানন্তর ধনমদে মত্ত হইয়া পরস্পর বিরোধ আরম্ভ করে। স্বার্থপর মূঢ় ব্যক্তিরা স্বীয় ধন অধিকার করিলে শত্রুপক্ষ মিত্রভাবে প্রবেশ করিয়া তাহাদিগের আত্মবিচ্ছেদ জন্মাইয়া দেয় এবং ক্রমশঃ দোষ দর্শাইয়া পরস্পরের রোষবৃদ্ধি ও বৈরভাব বদ্ধমূল করিতে থাকে। এইরূপ হইলে তাহাদিগের সর্ব্বদাই সর্ব্বনাশ ঘটিবার সম্ভাবনা। এই কারণে ভ্রাতৃগণের ধনবিভাগ সাধুদিগের অভিপ্রেত নহে। কিন্তু তুমি নিতান্ত অনভিজ্ঞের ন্যায় ঐ কথারই বারংবার উত্থাপন করিয়া থাক। আমি বারণ করিলেও তাহাতেও কর্ণপাত কর না; অতএব তুমি বারণযোনি [হস্তি-জন্ম] প্রাপ্ত হও।” সুপ্রতীক এইরূপে শাপগ্রস্ত হইয়া বিভাবসুকে কহিলেন, “তুমিও কচ্ছপযোনি প্রাপ্ত হও।”
এইরূপে সুপ্রতীক ও বিভাবসু পরস্পরের শাপপ্রভাবে গজত্ব ও কচ্ছপত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন। এক্ষণে তাঁহারা রোষদোষে তির্য্য্গ‌যোনি-প্রাপ্ত, পরস্পর বিদ্বেষরত এবং শরীরের গুরুত্ব ও বলদর্পে একান্ত দর্পিত হইয়া জন্মান্তরীণ বৈরাসুসারে এই সরোবরে অবস্থান করিতেছেন। ঐ দেখ, গজের বৃংহিত [সক্রোধ ধ্বনি] শব্দে মহাকায় কচ্ছপ সরোবর আলোড়িত করিয়া জলমধ্য হইতে সত্বর উত্থিত হইতেছে। গজ তাহাকে দেখিতে পাইয়া অতি প্রকাণ্ড শুণ্ডাদণ্ড [শুঁড়] আস্ফালনপূর্ব্বক জলে অবগাহন করিতেছে। উহার শুণ্ডদণ্ড, লাঙ্গুল ও পদচতুষ্টয়ের তাড়নে সরোবরে অবস্থান করিতেছেন। উহার শুণ্ডাদণ্ড, লাঙ্গুল ও পদচতুষ্টয়ের তাড়নে সরোবর বিক্ষোভিত হইতেছে। অতি-পরাক্রান্ত কূর্ম্মও মস্তক উন্নত করিয়া যুদ্ধার্থে অভ্যাগত হইতেছে। গজের কলেবর ছয় যোজন উন্নত ও দ্বাদশ যোজন আয়ত। কূর্ম্ম তিন যোজন উন্নত ও তাহার পরিধি দশ যোজন। হে বৎস! উহারা পরস্পরের বিনাশে কৃতসঙ্কল্প হইয়া যুদ্ধে মত্ত হইয়াছে, উহাদিগকে ভক্ষণ করিয়া আপনার অভীষ্টসিদ্ধি কর। যাও, তুমিও এই মহাগিরিসদৃশ ঘোররূপী হস্তীকে ভোজন করিয়া অমৃত আহরণ কর।”
মহর্ষি কশ্যপ গরুড়কে ভক্ষ্যদ্রব্য নির্দ্দেশ করিয়া দিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন, “বৎস! দেবতাদিগের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলে তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে। পূর্ণকুম্ভ, গো, ব্রাহ্মণ এবং আর যে কিছু মাঙ্গল্যবস্তু আছে, সে সকলই তোমার শুভপ্রদ হউক। হে মহাবলপরাক্রান্ত! যৎকালে তুমি দেবতাদিগের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবে, তখন ঋক্, যজু:, সাম এই তিন বেদ, যজ্ঞীয় পবিত্র বহিঃ ও রহস্য [বেদের শক্তি—দৈবশক্তি] তোমার বলাধান করিবে।” গরুড় পিতার আশীর্ব্বাদ গ্রহণ করিয়া অনতিদূরে সেই নির্ম্মল জলপূর্ণ হ্রদ দেখিতে পাইলেন এবং তাহাতে নানাবিধ জলচর পক্ষিসকল কলরব করিতেছে দেখিলেন। তখন তিনি পিতৃবাক্য স্মরণ করিয়া এক নখে গজ ও অপর নখে কচ্ছপকে গ্রহণ করিয়া সত্বরে আকাশপথে উত্থিত হইলেন; অনন্তর অলম্ব নামক তীর্থে সমুপস্থিত হইয়া দেববৃক্ষগণের উপর আরোহণ করিতে ইচ্ছা করিলেন। বিটপি-মণ্ডলী [বৃক্ষশ্রণী] গরুড়ের পক্ষ-পবনে [পাখার বাতাস] আহত হইয়া শাখাভঙ্গভয়ে শঙ্কিত ও কম্পিত হইতে লাগিল। বিহঙ্গরাজ সেই অভীষ্টফলপ্রদ দিব্য সুবর্ণময় তরুদিগকে ভঙ্গভয়ে কম্পিত দেখিয়া অতীব উন্নত অন্যান্য বৃক্ষের সমীপে গমন করিলেন। সেই পরম রমণীয় বৃক্ষগুলির সুস্বাদু ফলসকল কাঞ্চনময় ও রজতময়, শাখাসমুদয় প্রবালময় এবং উহাদিগের মূলদেশ সর্ব্বদা সাগরজলে প্রক্ষালিত হইতেছে। তম্মধ্যে অত্যুচ্চ এক বটবিটপী পক্ষিরাজ গরুড়কে আগমন করিতে দেখিয়া কহিল, “হে গরুত্মন! তুমি আমার এই শত যোজন-বিস্তীর্ণ, অতিপ্রকাণ্ড শাখায় উপবেশন করিয়া গজ-কচ্ছপ ভক্ষণ কর।” মহীধর-তুল্য-কলেবর পতগেশ্বর প্রবলবেগে বহুসহস্রপক্ষিসেবিত সেই বৃক্ষশাখায় আরোহণ করিবামাত্র তাহা ভগ্ন হইল।
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger