• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪

রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সংক্ষিপ্ত জীবনী


রামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৩৬ – ১৬ই আগস্ট, ১৮৮৬; পূর্বাশ্রমের নাম গদাধর চট্টোপাধ্যায়) ঊনবিংশ শতকের এক প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি যোগসাধক, দার্শনিক ও ধর্মগুরু। তাঁর প্রচারিত ধর্মীয় চিন্তাধারায় রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁরা উভয়েই বঙ্গীয় নবজাগরণের এবং ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর হিন্দু নবজাগরণের অন্যতম পুরোধাব্যক্তিত্ব। তাঁর শিষ্যসমাজে, এমনকি তাঁর আধুনিক ভক্তসমাজেও তিনি ঈশ্বরের অবতাররূপে পূজিত হন। রামকৃষ্ণ পরমহংস গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গের এক দরিদ্র বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে পৌরোহিত্য গ্রহণের পর বঙ্গীয় তথা ভারতীয় শক্তিবাদের প্রভাবে তিনি কালীর আরাধনা শুরু করেন। তাঁর প্রথম গুরু তন্ত্র ও বৈষ্ণবীয় ভক্তিতত্ত্বজ্ঞা এক সাধিকা। পরবর্তীকালে অদ্বৈত বেদান্ত মতে সাধনা করে নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন রামকৃষ্ণ। অন্যান্য ধর্মীয় মতে, বিশেষত ইসলাম ও খ্রিস্টীয় মতে সাধনা তাঁকে “যত মত, তত পথ” উপলব্ধির জগতে উন্নীত করে।পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক গ্রামীণ উপভাষায় ছোটো ছোটো গল্পের মাধ্যমে প্রদত্ত তাঁর ধর্মীয় শিক্ষা সাধারণ জনমানসে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে অশিক্ষিত হলেও রামকৃষ্ণ বাঙালি বিদ্বজ্জন সমাজ ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সম্ভ্রম অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৮৭০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের নিকট তিনি হয়ে ওঠেন হিন্দু পুনর্জাগরণের কেন্দ্রীয় চরিত্র। ততসঙ্গে সংগঠিত করেন একদল অনুগামী, যাঁরা ১৮৮৬ সালে রামকৃষ্ণের প্রয়াণের পর সন্ন্যাস গ্রহণ করে তাঁর কাজ চালিয়ে যান। এঁদেরই নেতা ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।১৮৯৩ সালে শিকাগোতে বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় বিবেকানন্দ তাঁর ধর্মীয় চিন্তাধারাকে পাশ্চাত্যের জনসমক্ষে উপনীত করেন। বিবেকানন্দ যে বিশ্বমানবতাবাদের বার্তা প্রেরণ করে তা সর্বত্র সমাদৃত হয় এবং তিনিও সকল সমাজের সমর্থন অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু দর্শনের সার্বজনীন সত্য প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি এরপর প্রতিষ্ঠা করেন বেদান্ত সোসাইটি এবং ভারতে রামকৃষ্ণের ধর্মীয় সমন্বয়বাদ ও “শিবজ্ঞানে জীবসেবা”র আদর্শ বাস্তবায়িত করার জন্য স্থাপনা করেন রামকৃষ্ণ মিশন নামে একটি ধর্মীয় সংস্থা।রামকৃষ্ণ আন্দোলন ভারতের অন্যতম নবজাগরণ আন্দোলনরূপে বিবেচিত হয়।২০০৮ সালে ভারত ও বহির্ভারতে রামকৃষ্ণ মিশনের মোট ১৬৬টি শাখাকেন্দ্র বিদ্যমান। এই সংস্থার প্রধান কার্যালয় পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার বেলুড় মঠে অবস্থিত।

জন্ম ও শৈশব
পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমায় অবস্থিত কামারপুকুর গ্রামে ১৮৩৬ সালে এক দরিদ্র ধর্মনিষ্ঠ রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্ম হয়। তিনি পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এবং মা চন্দ্রমণি দেবীর চতুর্থ ও শেষ সন্তান। কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মের পূর্বে তাঁর পিতামাতার সম্মুখে বেশ কয়েকটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। সন্তানসম্ভবা চন্দ্রমণি দেবী দেখেছিলেন শিবলিঙ্গ থেকে নির্গত একটি জ্যোতি তাঁর গর্ভে প্রবেশ করছে। তাঁর জন্মের অব্যবহিত পূর্বে গয়ায় তীর্থভ্রমণে গিয়ে ক্ষুদিরাম গদাধর বিষ্ণুকে স্বপ্নে দর্শন করেন। সেই কারণে তিনি নবজাতকের নাম রাখেন গদাধর।শৈশবে গদাই নামে পরিচিত গদাধর তাঁর গ্রামবাসীদের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। অঙ্কন ও মাটির প্রতিমা নির্মাণে তাঁর ছিল সহজাত দক্ষতা। যদিও প্রথাগত শিক্ষায় তাঁর আদৌ মনযোগ ছিল না। সেযুগে ব্রাহ্মণসমাজে প্রচলিত সংস্কৃত শিক্ষাকে তিনি “চালকলা-বাঁধা বিদ্যা” (অর্থাৎ পুরোহিতের জীবিকা-উপার্জনী শিক্ষা) বলে উপহাস করেন এবং তা গ্রহণে অস্বীকার করেন। তবে পাঠশালার শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি তাঁর ঔদাসিন্য থাকলেও নতুন কিছু শিখতে তাঁর আগ্রহের অন্ত ছিল না।গানবাজনা, কথকতা ও ধর্মীয় উপাখ্যান অবলম্বনে যাত্রাভিনয়ে তিনি অনায়াসে পারদর্শিতা অর্জন করেন।তীর্থযাত্রী, সন্ন্যাসী এবং গ্রাম্য পুরাণকথকদের কথকতা শুনে অতি অল্প বয়সেই পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতে বুতপত্তি অর্জন করেন গদাধর।মাতৃভাষা বাংলায় তাঁর অক্ষরজ্ঞান ছিল;কিন্তু সংস্কৃত অনুধাবনে সক্ষম হলেও সেই ভাষা তিনি বলতে পারতেন না।পুরীর পথে কামারপুকুরে বিশ্রামরত সন্ন্যাসীদের সেবাযত্ন করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ধর্মীয় বিতর্ক মন দিয়ে শুনতেন গদাধর। শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ছয়-সাত বছর বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক ভাবতন্ময়তা দেখা দিত। একবার ধানক্ষেতের পথে চলতে চলতে আকাশে কালো মেঘের পটে সাদা বলাকার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে তিনি বাহ্যজ্ঞানরহিত হন। পরবর্তীকালে তাঁর সেই অবস্থাকে তিনি ব্যাখ্যা করেন এক অনির্বচনীয় আনন্দের অভিজ্ঞতারূপে।বাল্যকালে আরও কয়েকবার তাঁর অনুরূপ ভাবতন্ময়তা দেখা দিয়েছিল – একবার দেবী বিশালাক্ষীর পূজার সময়, আরেকবার শিবরাত্রি উপলক্ষে যাত্রায় শিবের চরিত্রাভিনয়কালে। দশ-বারো বছর বয়স থেকে এই ভাবতন্ময়তা তাঁর নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।১৮৪৩ সালে পিতৃবিয়োগের পর পরিবারের ভার গ্রহণ করেন তাঁর অগ্রজ রামকুমার। এই ঘটনা গদাধরের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। ধর্মীয় জীবনযাপনের ইচ্ছা তাঁর মনে দৃঢ় হয়। পিতার অভাব তাঁকে মায়ের খুব কাছে নিয়ে আসে; ঘরের কাজ ও গৃহদেবতার পূজাপাঠে তিনি অধিকতর সময় ব্যয় করতে থাকেন; আত্মমগ্ন হয়ে থাকেন ধর্মীয় মহাকাব্য পাঠে। গদাধর যখন কিশোর, তখন তাঁর পরিবারের আর্থিক সংকট দেখা দেয়। রামকুমার কলকাতায় একটি সংস্কৃত টোল খোলেন ও পুরোহিতের বৃত্তি গ্রহণ করেন। ১৮৫২ সালে দাদাকে পৌরোহিত্যে সহায়তা করার মানসে গদাধর কলকাতায় পদার্পণ করেন।

দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে পৌরহিত্য
১৮৫৫ সালে কলকাতার অস্পৃশ্য কৈবর্ত সমাজের এক ধনী জমিদারপত্নী রানি রাসমণি দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠা করলে রামকুমার সেই মন্দিরে প্রধান পুরোহিতের পদ গ্রহণ করেন।নিম্নবর্ণীয়া এক নারীর প্রতিষ্ঠিত মন্দির হওয়া সত্ত্বেও সামান্য অনুরোধেই গদাধর সেই মন্দিরে চলে আসেন। তিনি ও তাঁর ভাগনে হৃদয়রাম রামকুমারের সহকারী হিসাবে প্রতিমার সাজসজ্জার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৫৬ সালে রামকুমারের মৃত্যু হলে গদাধর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। মন্দিরে উত্তর-পশ্চিম আঙিনায় তাঁকে একটি ছোটো ঘর দেওয়া হয়। এই ঘরেই তিনি অতিবাহিত করেন তাঁর অবশিষ্ট জীবন।অনুমিত হয়, রাণী রাসমণির জামাতা মথুরামোহন বিশ্বাস, যিনি মথুরবাবু নামে পরিচিত ছিলেন, তিনিই গদাধরকে রামকৃষ্ণ নামটি দিয়েছিলেন।অন্য মতে, এই নামটি তাঁর অন্যতম গুরু তোতাপুরীর দেওয়া।রামকুমারের মৃত্যুর পর রামকৃষ্ণের ভাবতন্ময়তা বৃদ্ধি পায়। কালীকে তিনি মা ও বিশ্বজননীভাবে প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেন। এই সময় দেবীর প্রত্যক্ষ রূপ দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস পাষাণপ্রতিমা জীবন্ত হয়ে অন্নগ্রহণ করতে শুরু করে। পূজা করতে করতে দেবীর দর্শন না পেয়ে তিনি চিতকার করে কেঁদে উঠতে থাকেন। রাত্রিকালে নিকটবর্তী জঙ্গলে গিয়ে বস্ত্র ও উপবীত ত্যাগ করে নির্জনে ধ্যান করতেও শুরু করেন।কেউ কেউ বলতে থাকে যে তিনি পাগল হয়ে গেছেন, আবার কেউ বলেন তিনি ঈশ্বরের প্রেমে আকুল হয়েছেন।একদিন অস্থিরতার বশে তিনি সংকল্প করেন দেবীর দর্শন না পেলে জীবন বিসর্জন দেবেন। দেওয়াল থেকে খড়্গ তুলে নিয়ে তিনি গলায় কোপ বসাবেন, এমন সময় অকস্মাৎ সমগ্র কক্ষ আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর প্রথম কালীদর্শনের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা নিম্নরূপ;
“সহসা মার অদ্ভুত দর্শন পাইলাম ও সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়িয়া গেলাম! তাহার পর বাহিরে কি যে হইয়াছে, কোন্ দিক দিয়া সেদিন ও ততপরদিন যে গিয়াছে, তাহার কিছুই জানিতে পারি নাই! অন্তরে কিন্তু একটা অননুভূত জমাট-বাঁধা আনন্দের স্রোত প্রবাহিত ছিল এবং মার সাক্ষাৎ প্রকাশ উপলব্ধি করিয়াছিলাম!… ঘর, দ্বার, মন্দির সব যেন কোথায় লুপ্ত হইল – কোথাও যেন আর কিছুই নাই! আর দেখিতেছি কি, এক অসীম অনন্ত চেতন জ্যোতিঃ-সমুদ্র! – যেদিকে যতদূর দেখি, চারিদিক হইতে তার উজ্জ্বল ঊর্মিমালা তর্জন-গর্জন করিয়া গ্রাস করিবার জন্য মহাবেগে অগ্রসর হইতেছে! দেখিতে দেখিতে উহারা আমার উপর নিপতিত হইল এবং আমাকে এককালে কোথায় তলাইয়া দিল! হাঁপাইয়া হাবুডুবু খাইয়া সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়িয়া গেলাম।উক্ত ঘটনার পর শ্রীরামকৃষ্ণ কালীর নিকট সম্পূর্ণত নিজেকে সমর্পণ করেন। কি সাধারণ, কি দার্শনিক – সকল ক্ষেত্রেই বালকসুলভ আনুগত্য নিয়ে তিনি দেবীর নিকট প্রার্থনা নিবেদন করতে শুরু করেন। রাণী রাসমণি ও তাঁর জামাতা মথুরবাবু যদিও পরম স্নেহবশত তাঁকে তাঁর ইচ্ছামতো পূজার অনুমতি দিয়েছিলেন, তবুও তাঁরা মনে করতেন শ্রীরামকৃষ্ণ দীর্ঘ ব্রহ্মচর্যজনিত কোনও দুরারোগ্য মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। মথুরবাবু তাঁর জন্য বারবণিতার বন্দোবস্ত করলেন। কিন্তু তাঁকে প্রলুব্ধ করার সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হল। তিনি সেই দেহোপজীবিনীর মধ্যেও দিব্য মাতৃমূর্তি দর্শন করেন।

বিবাহ
কামারপুকুরে গুজব রটে যায়, দক্ষিণেশ্বরে অতিরিক্ত সাধনার শ্রমে শ্রীরামকৃষ্ণ পাগল হয়ে গেছেন। মা ও মধ্যমাগ্রজ রামেশ্বর তাঁর বিবাহদানের চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, বিবাহের পর সাংসারিক দায়-দায়িত্বের ভার কাঁধে চাপলে আধ্যাত্ম সাধনার মোহ তাঁর কেটে যাবে – তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরে আসবেন।শ্রীরামকৃষ্ণ বিবাহে আপত্তি তো করলেনই না, বরং বলে দিলেন কামারপুকুরের তিন মাইল উত্তর-পশ্চিমে জয়রামবাটী গ্রামের রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গৃহে কন্যার সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে। ১৮৫৯ সালে পঞ্চমবর্ষীয়া বালিকা সারদার সঙ্গে তাঁর শাস্ত্রমতে বিবাহ সম্পন্ন হয়।শ্রীরামকৃষ্ণের বয়স তখন তেইশ। বয়সের এই পার্থক্য উনিশ শতকীয় গ্রামীণ বঙ্গসমাজে কোনও অপ্রচলিত দৃষ্টান্ত ছিল না। যাই হোক, ১৮৬০ সালের ডিসেম্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ সারদা দেবীকে ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৮৬৭ সালের মে মাসের আগে তাঁদের আর সাক্ষাৎ হয়নি।

সাধনা
বিবাহের পর শ্রীরামকৃষ্ণ কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করে পুণরায় মন্দিরের কাজ গ্রহণ করেন। তবে ভাবতন্ময়তা কাটার পরিবর্তে তাঁর অধ্যাত্ম-পিপাসা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ব্রাহ্মণের জাত্যভিমান দূর করার জন্য তিনি নিম্নবর্ণীয়দের হাতে খাদ্যগ্রহণ, অন্ত্যজ পারিয়াদের (চাকর ও ঝাড়ুদার) সেবা করতে থাকেন।স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রাকে মাটির ঢেলার সঙ্গে মিশিয়ে তিনি বলতে শুরু করেন “টাকা মাটি, মাটি টাকা”। এবং অর্থকে লোষ্ট্রজ্ঞানে গঙ্গায় নিক্ষেপ করেন। লোকে মনে করতে থাকেন, সত্যিই তিনি পাগল হয়ে গেছেন।কথিত আছে, এই অবস্থায় তিনি এতটাই সংবেদনশীল হয়ে উঠেছিলেন, যে ঘুমন্ত অবস্থাতে কেউ মুদ্রা স্পর্শ করালে, তাঁর দেহ সংকুচিত হয়ে আসত।তাঁর শরীরে তীব্র দাহ উপস্থিত হল। তিনি নিদ্রারহিত হলেন। ফলে মন্দিরের কাজকর্ম তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ল। চিকিতসকগণ আহূত হলেন। কিন্তু তাঁদের একজন বললেন যে রোগীর এই অবস্থার কারণ আধ্যাত্মিক উত্তেজনা। কোনও ঔষধ একে সুস্থ করতে সক্ষম নয়।

ভৈরবী ব্রাহ্মণী ও তন্ত্রসাধনা
১৮৬১ সালে ভৈরবী ব্রাহ্মণী নামে গৈরিক বস্ত্র পরিহিতা এক যোগিনী দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল যোগেশ্বরী এবং বয়স ছিল চল্লিশের কাছাঁকাছি।দক্ষিণেশ্বরে আগমনের পূর্বে তাঁর জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না।তবে তিনি ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞা ও তন্ত্র ও বৈষ্ণব সাধনে সিদ্ধা।শ্রীরামকৃষ্ণ ভৈরবীর কাছে তাঁর ভাবতন্ময়তা ও দৈহিক পীড়ার বর্ণনা দিলেন।ভৈরবী তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করলেন যে তিনি পাগল হয়ে যাননি; বরং আধ্যাত্মিক ‘মহাভাব’ তাঁকে আশ্রয় করেছে।এই মহাভাবের বশেই তিনি দিব্যপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছেন।বিভিন্ন ভক্তিশাস্ত্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখালেন রাধা ও চৈতন্য মহাপ্রভুরও একই ভাব উপস্থিত হয়েছিল।ভৈরবী তাঁর দৈহিক পীড়া অবসানের নিদানও দিলেন।ভৈরবীর পথনির্দেশনায় শ্রীরামকৃষ্ণ তন্ত্রমতে সাধনা শুরু করলেন। এই সাধনায় তাঁর সমস্ত শারীরিক ও মানসিক পীড়ার উপশম হল।ভৈরবীর সহায়তায় তিনি তন্ত্রোল্লেখিত ৬৪ প্রকার প্রধান সাধন অভ্যাস করলেন।জপ ও পুরশ্চরণের মতো মন্ত্রসাধনায় চিত্ত শুদ্ধ করে পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ স্থাপন করলেন। তন্ত্রসাধনায় সাধারণত বামাচারের মতো ধর্মবিরোধী পন্থাও অভ্যাস করতে হয়; যার মধ্যে মাংস ও মতস্য ভক্ষণ, মদ্যপান ও যৌনাচারও অন্তর্ভুক্ত।শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর জীবনীকারগণের কথা থেকে জানা যায়, শেষোক্ত দুটি তিনি অভ্যাস করেননি, শুধুমাত্র সেগুলির চিন্তন করেই কাঙ্খিত সাধনফল লাভ করেছিলেন।শ্রীরামকৃষ্ণ বামাচারকে একটি জ্ঞানমার্গ বলে উল্লেখ করলেও, অন্যদের এই পথে সাধন করতে নিষেধ করতেন।পরে তাঁর প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ যখন তাঁকে বামাচার সম্পর্কে প্রশ্ন করেন, তিনি বলেন, “(এই পথ) বড় কঠিন, ঠিক রাখা যায় না, পতন হয়।”২১ সেপ্টেম্বর ১৮৭৯, কেশবচন্দ্র সেনের গৃহে শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবসমাধি।ভাগিনেয় হৃদয় ব্রাহ্ম ভক্তবেষ্টিত শ্রীরামকৃষ্ণকে ধরে আছেন। ভৈরবী শ্রীরামকৃষ্ণকে কুমারী পূজা শিক্ষা দেন।এই পূজায় কোনও কুমারী বালিকাকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়।এছাড়াও ভৈরবীর নির্দেশনায় শ্রীরামকৃষ্ণ কুণ্ডলিনী যোগেও সিদ্ধ হন।১৮৬৩ সাল নাগাদ তাঁর তন্ত্রসাধনা সম্পূর্ণ হয়।শ্রীরামকৃষ্ণ ভৈরবীকে মাতৃভাবে দেখতেন।অন্যদিকে ভৈরবী তাঁকে মনে করতেন ঈশ্বরের অবতার।তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রথম সর্বসমক্ষে শ্রীরামকৃষ্ণকে অবতার বলে ঘোষণা করেন।কিন্তু নানা লোকের কথা শুনেই শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে তাঁর অবতারত্ব সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন।যাই হোক, ভৈরবীর নিকট তন্ত্রসাধনা তাঁর আধ্যাত্ম-সাধনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্ব বিবেচিত হয়।

বৈষ্ণবীয় ভক্তিসাধনা
বৈষ্ণব ভক্তিশাস্ত্রে ঈশ্বরের প্রতি প্রেম নিবেদনে পাঁচটি ভাবের উল্লেখ রয়েছে – শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাতসল্য ও মধুর।শ্রীরামকৃষ্ণ এই ভাবগুলির কয়েকটি অভ্যাস করেন।কালীদর্শন ও বিবাহে মধ্যবর্তী সময়ে কিছুকালের জন্য তিনি দাস্যভাবে সাধনা করেছিলেন।এই সময় তিনি হনুমানভাবে ভাবিত হয়ে রামচন্দ্রের আরাধনা করেন। এইসময় তাঁর হাবভাব সকলই হনুমানের মতো হয়েছিল। তিনি কদলীভক্ষণ করতেন, অধিকাংশ সময় বৃক্ষশাখায় কাটাতেন, এমনকি বানরের মতো অস্থির চোখের দৃষ্টিও লাভ করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, তাঁর মেরুদণ্ডের নিচে সামান্য অংশও এই সময় লেজের মতো প্রসারিত হয়েছিল।দাস্যভাবে সাধনার সময় তিনি রামের পত্নী সীতাদেবীর দর্শন পান এবং সীতার সেই মূর্তি তাঁর নিজদেহে অন্তর্হিত হতে দেখেন।১৮৬৪ সালে দেবীপ্রতিমায় মাতৃভাব আরোপ করে শ্রীরামকৃষ্ণ বাতসল্যভাবের সাধনা করেন। এই সময় তিনি ‘রামলালা’ অর্থাৎ বালক রামচন্দ্রের একটি ধাতুমূর্তি পূজা করতেন।পরে তিনি বলেছিলেন, এই সময় তাঁর হৃদয় মাতৃভাবে পূর্ণ হত।তাঁর মধ্যে নারীর ভাব ফুটে উঠত এমনকি তাঁর কথাবার্তা ও হাবভাবও মেয়েলি আকার নিত।শ্রীরামকৃষ্ণ আরও বলেছেন যে এই সময় তিনি ধাতুমূর্তিতেই জীবন্ত বালক রামচন্দ্রকে চাক্ষুষ করতেন।পরবর্তীকালে গোপিনী রাধার ভাব আরোপ করে কৃষ্ণের প্রেমিকরূপে মধুর ভাব সাধনা করেন শ্রীরামকৃষ্ণ।এই প্রেম উপলব্ধি করার জন্য তিনি দীর্ঘকাল নারীর বেশে নিজেকে বৃন্দাবনের গোপিনী কল্পনা করেছিলেন। এই সাধনার অন্তে তাঁর সবিকল্প সমাধি হয় – তিনি কৃষ্ণের সাথে আধ্যাত্মিক মিলনে মিলিত হন।নদিয়ায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভক্তিবাদের প্রবর্তক চৈতন্য ও নিত্যানন্দের জন্মস্থান ভ্রমণকালে তিনি ভাবচক্ষুতে দুই নৃত্যরত বালককে তাঁর দেহে অন্তলীন হতে দেখেছিলেন।

তোতাপুরী ও বৈদান্তিক সাধনা
১৮৬৪ সালে তোতাপুরী নামক জনৈক পরিব্রাজক বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর নিকট শ্রীরামকৃষ্ণ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন।তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী তোতাপুরী ছিলেন জটাজুটধারী এক বিশালবপু উলঙ্গ নাগা সন্ন্যাসী।গুরুর নাম গ্রহণ করা শাস্ত্রমতে বারণ; তাই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে ‘ল্যাংটা’ বা ‘ন্যাংটা’ বলে উল্লেখ করতেন।তোতাপুরী ‘নেতি নেতি’ দৃষ্টিকোণ থেকে জগৎ দর্শন করতেন। তাঁর মতে সকলই ছিল মায়া। দেব-দেবীর মূর্তিপূজাকেও তিনি উপহাস করতেন। বিশ্বাস করতেন এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মে।তোতাপুরী প্রথমে সকল জাগতিক বন্ধন থেকে শ্রীরামকৃষ্ণকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে তাঁকে সন্ন্যাস প্রদান করেন। অতঃপর তোতা তাঁকে অদ্বৈত তত্ত্ব শিক্ষা দেন। নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাব, দেশকালাদি দ্বারা সর্বদা অপরিচ্ছিন্ন একমাত্র ব্রহ্মবস্তুই নিত্য সত্য। অঘটন-ঘটন-পটীয়সী মায়া নিজপ্রভাবে তাঁহাকে নামরূপের দ্বারা খণ্ডিতবৎ প্রতীত করাইলেও তিনি কখনও বাস্তবিক ঐরূপ নহেন। … নামরূপের দৃঢ় পিঞ্জর সিংহবিক্রমে ভেদ করিয়া নির্গত হও। আপনাতে অবস্থিত আত্মতত্ত্বের অন্বেষণে ডুবিয়া যাও।অদ্বৈত বেদান্তের নানা তত্ত্ব শিক্ষা দেওয়ার জন্য তোতা এগারো মাস দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট রয়ে যান। তিনি বিদায় নিলে আরও ছয় মাস শ্রীরামকৃষ্ণ আধ্যাত্মিক ভাবতন্ময়তার জগতে অবস্থান করেন।শ্রীরামকৃষ্ণের কথা অনুযায়ী, এরপর তিনি দেবী কালীর নিকট থেকে নির্দেশ প্রাপ্ত হন – “তুই ভাবমুখে থাক” (অর্থাৎ, সমাধি ও সাধারণ অবস্থার মুখে অবস্থান করে লোকশিক্ষা দান কর)।

ইসলাম ও খ্রিস্টমতে সাধনা
১৮৬৬ সালে সুফিমতে সাধনাকারী হিন্দু গুরু গোবিন্দ রায়ের কাছে ইসলাম ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা করেন শ্রীরামকৃষ্ণ।তিনি বলেছেন, “ঐ সময়ে ‘আল্লা’মন্ত্র জপ করিতাম, মুসলমানদিগের ন্যায় কাছা খুলিয়া কাপড় পরিতাম; ত্রিসন্ধ্যা নমাজ পড়িতাম এবং হিন্দুভাব মন হইতে এককালে লুপ্ত হওয়ায় হিন্দুদেবদেবীকে প্রণাম দূরে থাকুক, দর্শন পর্যন্ত করিতে প্রবৃত্তি হইত না।তিনদিন অনুরূপ সাধনার পর তিনি “এক দীর্ঘশ্মশ্রুবিশিষ্ট, সুগম্ভীর, জ্যোতির্ময় পুরুষপ্রবরের (মহানবী) দিব্যদর্শন লাভ” করেন। সেই পুরুষ তাঁর দেহে লীন হন।১৮৭৩ সালের শেষভাগ নাগাদ শম্ভুচরণ মল্লিক তাঁকে বাইবেল পাঠ করে শোনালে তিনি খ্রিস্টীয় মতে সাধনা শুরু করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, এই সময় তাঁর চিত্ত খ্রিস্টীয় ভাবে পূর্ণ হয়েছিল এবং তিনি কালীঘরে যাওয়া বন্ধ করেছিলেন। একদিন মেরিমাতার কোলে যিশু খ্রিস্টের চিত্রে তিনি জীবন্ত যিশুর দিব্যদর্শন লাভ করেছিলেন। তাঁর ঘরে হিন্দু দেবদেবীদের সঙ্গে পিতরকে ত্রাণরত যিশুর একটি চিত্র ছিল, সেটিতে তিনি প্রত্যহ সকাল ও সন্ধ্যায় ধূপারতি করতেন।

সারদা দেবী
সেকালের প্রথা অনুযায়ী সতেরো-আঠারো বছর বয়স হলে সারদা দেবী স্বামীগৃহে যাত্রা করলেন। স্বামী পাগল হয়ে গেছেন – এইরূপ একটি গুজব শুনে তিনি অত্যন্ত দুঃখিত ছিলেন। আবার এও শুনেছিলেন, তাঁর স্বামী একজন বিশিষ্ট সাধকে পরিণত হয়েছেন।শ্রীরামকৃষ্ণ এই সময় ষোড়শী পূজার আয়োজন করেন। এই পূজায় তিনি সারদা দেবীকে দিব্য মাতৃকাজ্ঞানে পূজা নিবেদন করেছিলেন। তাঁকে দেবী কালীর পীঠে বসিয়ে পুষ্প ও ধূপদানে তাঁর পূজা সম্পাদন করেন শ্রীরামকৃষ্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, তিনি যে নারীমাত্রেই জগজ্জননীর রূপ দর্শন করেন, তাঁর নিজের স্ত্রীও তার ব্যতিক্রম নয়।এমনকি তিনি রূপপোজীবিনী বারবণিতাদেরও মাতৃসম্বোধন করতেন।দাম্পত্যজীবনে সারদা দেবীর মধ্যে মাতৃজ্ঞান করায় তাঁদের বিবাহ অসাধারণত্বে উন্নীত হয়।সারদা দেবীর স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ কোনও দিন তাঁকে ‘তুই’ সম্বোধন করেননি। কখনও রূঢ়বাক্য প্রয়োগ বা তিরস্কারও করেননি।সারদা দেবীকেই শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম অনুগামী মনে করা হয়। তাঁর শিষ্য ও ভক্তসমাজে সারদা দেবী ‘শ্রীমা’ বা ‘মাতাঠাকুরানী’ নামে পরিচিতা হন। শ্রীরামকৃষ্ণের তিরোভাবের পর তিনিই রামকৃষ্ণ আন্দোলনের কেন্দ্রস্বরূপা হয়েছিলেন।

ব্রাহ্ম ও ভদ্রলোক সমাজে প্রভাব
১৮৭৫ সালে প্রভাবশালী ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেনের সহিত শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ হয়।কেশব খ্রিস্টধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং আদি ব্রাহ্মসমাজের সহিত তাঁর বিচ্ছেদও ঘটেছিল। তিনি প্রথমে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করেছিলেন। পরে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের বহুদেববাদ গ্রহণ করেন এবং তাঁর সর্বধর্মসমন্বয়, ঈশ্বরে মাতৃভাব আরোপ এবং ব্রাহ্ম ও বহুদেববাদের সম্মিলনের আদর্শে “নববিধান” প্রতিষ্ঠা করেন।নববিধানের পত্রপত্রিকায় কেশব বেশ কয়েকবছর শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশাবলি প্রচারও করেছিলেন।এর ফলে বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণী, অর্থাৎ ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ও ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয়গণ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন।কেশবচন্দ্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর মতো অন্যান্য ব্রাহ্মগণও শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট যাতায়াত শুরু করেন, ও তাঁর মতের অনুগামী হয়ে পড়েন। প্রতাপচন্দ্র মজুমদার, শিবনাথ শাস্ত্রী ও ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল প্রমুখ কলকাতার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ১৮৭১ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নিময়িত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। প্রতাপচন্দ্র মজুমদার প্রথম ইংরেজিতে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী রচনা করেন। ১৯৭৯ সালে থেইস্টিক কোয়ার্টারলি রিভিউ পত্রিকায় দ্য হিন্দু সেইন্ট নামে প্রকাশিত সেই জীবনী জার্মান ভারতবিদ ম্যাক্স মুলার প্রমুখ পাশ্চাত্য পণ্ডিতের দৃষ্টি শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট করে।এছাড়াও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অন্যান্য ব্রাহ্মদের বক্তৃতা ও নিবন্ধ থেকেও বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণী শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুসারে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রেম ও ভক্তির বাণী বাঙালি সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে এবং বহু বিপথগামী যুবককে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও স্বামী দয়ানন্দের সঙ্গেও ধর্মবিষয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের বাক্যালাপ হয়েছিল।তবে ব্রাহ্মসমাজে তাঁর মত ও ধর্মবিশ্বাসের বিরোধিতাও অনেকে করেছিলেন। তাঁর সমাধি অবস্থাকে তাঁরা স্নায়ুদৌর্বল্য বলে উপহাস করেন।ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় তাঁর অবতারত্ব অস্বীকার করেছিলেন।শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব কলকাতার শিক্ষিত সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর জীবদ্দশাতেই পণ্ডিত-বিদ্বজ্জন মহলের গণ্ডী টপকে তাঁর ধর্মীয় চিন্তাধারণা ও উপদেশের প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল বাংলার বাউল ও কর্তাভজা সম্প্রদায়ের মধ্যে, এমনকি বাংলার বাইরেও। অবশ্য মৃত্যুর পূর্বে রামকৃষ্ণ আন্দোলনের কাজ বিশেষ কিছুই সাধিত হয়নি।ব্রাহ্মসমাজ ও নবোত্থিত হিন্দু পুনর্জাগরণ আন্দোলনের মধ্যে যোগসূত্র হিসাবে বাংলার নবজাগরণে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব অবিস্মরণীয়।সেই যুগে শ্রীরামকৃষ্ণের পাশ্চাত্য গুণগ্রাহীদের অন্যতম ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজের তদনীন্তুন অধ্যক্ষ ডক্টর ডব্লিউ ডব্লিউ হেস্ট।শ্রেণীকক্ষে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ রচিত দ্য এক্সকারসন কবিতাটিতে ব্যবহৃত ট্র্যান্স শব্দটি বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, শব্দটির প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করতে হলে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট যাওয়া আবশ্যক। তাঁর এই কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বেশ কয়েকজন তরুণ দক্ষিণেশ্বরে যান। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত; যিনি পরে স্বামী বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন।

ভক্ত ও শিষ্য
১৮৭৯ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নিজের প্রধান শিষ্যদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সাক্ষাৎ হয়। এঁদের অনেকেই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত। কেউ আবার ছিলেন একান্তই নাস্তিক; নিছক কৌতূহলের বশেই তাঁরা শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ এঁদের সকলের মধ্যেই গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং এঁরা সকলেও তাঁর অনুরাগী ভক্তে পরিণত হন। প্রবল যুক্তিবাদী সুরেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন, তাঁর ‘কান মলে’ দেওয়ার জন্য; কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হন।তাঁর অননুকরণীয় ধর্মপ্রচারের ভঙ্গি অনেক সংশয়বাদী ব্যক্তির মনেও দৃঢ় প্রত্যয়ের উন্মেষ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল।
তাঁর প্রধান শিষ্যদের মধ্যে উল্লেখনীয়:
• গৃহস্থ শিষ্য – মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অক্ষয়কুমার সেন প্রমুখ;
• ত্যাগী বা সন্ন্যাসী শিষ্য – নরেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দ), রাখালচন্দ্র ঘোষ (স্বামী ব্রহ্মানন্দ), কালীপ্রসাদ চন্দ্র (স্বামী অভেদানন্দ), তারকনাথ ঘোষাল (স্বামী শিবানন্দ), শশীভূষণ চক্রবর্তী (স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ), শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী (স্বামী সারদানন্দ) প্রমুখ।
• এছাড়া নারী ভক্তদের একটি ছোটো অংশও তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল। এঁদের মধ্যে গৌরী মা ও যোগীন মা উল্লেখযোগ্য। এঁদের কেউ কেউ মন্ত্রদীক্ষার মাধ্যমে তাঁর থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন। তবে তপস্যার বদলে শহরে অবস্থান করে নারীসমাজের সেবাতেই তাঁদের উতসাহিত করতেন শ্রীরামকৃষ্ণ।
তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সকল জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আসতে শুরু করেন – “কি মহারাজা কি ভিখারি, কি পত্রিকাকার কি পণ্ডিত, কি শিল্পী কি ভক্ত, কি ব্রাহ্ম কি খ্রিস্টান কি মুসলমান, সকল মতের সকল পেশার আবালবৃদ্ধ বণিতা”।জীবনীকারদের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ছিলেন খুবই মিশুকে ও তুখোড় আলাপচারী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক নাগাড়ে বলে যেতে পারতেন – নিজের অধ্যাত্ম অভিজ্ঞতার কথা, নানা গল্প; খুব সাধারণ দৃষ্টান্তের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে চলতেন বেদান্তের দুর্বোধ্য তত্ত্ব; রসিকতা, গান বা অন্যদের নকল করারও মাধ্যমে আমোদ-প্রমোদেও পিছপা হতেন না। সকল শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধের টেনে রাখতেন তাঁর কাছে। কিছু সন্ন্যাসী শিষ্য থাকলেও, তিনি সকলকে গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসী হতে বলতেন না।আবার ত্যাগী শিষ্যদের সন্ন্যাসজীবনের জন্য প্রস্তুত করার মানসে তাদের জাতিনির্বিশেষে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষা করার নির্দেশ দিতেন। এঁদের তিনি সন্ন্যাসী জীবনের প্রতীক গৈরিক বস্ত্র ও মন্ত্রদীক্ষাও দান করেছিলেন।

শেষ জীবন
১৮৮৫ সালের প্রারম্ভে তিনি ক্লার্জিম্যান’স থ্রোট রোগে আক্রান্ত হন; ক্রমে এই রোগ গলার ক্যান্সারের আকার ধারণ করে। কলকাতার শ্যামপুকুর অঞ্চলে তাঁকে নিয়ে আসা হয়।বিশিষ্ট চিকিতসক মহেন্দ্রলাল সরকার তাঁর চিকিতসায় নিযুক্ত হন। অবস্থা সংকটজনক হলে ১১ ডিসেম্বর, ১৮৮৫ তারিখে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় কাশীপুরের এক বিরাট বাগানবাড়িতে।এই সময় তাঁর শিষ্যগণ ও সারদা দেবী তাঁর সেবাযত্ন করতেন। চিকিৎসকগণ তাঁকে কথা না বলার কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করে তিনি অভ্যাগতদের সঙ্গে ধর্মালাপ চালিয়ে যান।কথিত আছে, মৃত্যুর পূর্বে বিবেকানন্দকে তিনি বলেছিলেন, “আজ তোকে যথাসর্বস্ব দিয়ে ফকির হয়েছি। এই শক্তির সাহায্যে তুই জগতের অশেষ কল্যাণ করতে পারবি। কাজ শেষ হলে আবার স্বস্থানে ফিরে যাবি।” এও কথিত আছে বিবেকানন্দ তাঁর অবতারত্ব সম্পর্কে সন্ধিহান হলে তিনি বলে ওঠেন, “যে রাম, যে কৃষ্ণ, সে-ই রামকৃষ্ণ…”তাঁর শেষের দিনগুলিতে তিনি বিবেকানন্দকে ত্যাগী শিষ্যদের দেখাশোনার ভার অর্পণ করে যান। এরপরেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং তিনি ১৬ অগস্ট, ১৮৮৬ অতি প্রত্যুষে পরলোকগমন করেন। তাঁর শিষ্যদের কথায় এই তাঁর মহাসমাধি।তাঁর প্রয়াণের পর বিবেকানন্দ সন্ন্যাসী শিষ্যদের নিয়ে বরাহনগরে একটি পোড়ো বাড়িতে ওঠেন এবং গৃহী শিষ্যদের অর্থসাহায্যে প্রথম মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু হয় রামকৃষ্ণ মিশনের যাত্রা।
Share:

“ওম” গ্রন্থের সূচনা অংশ – দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য





সত্যকে জানা বা তাকে জানার চেষ্টা করা প্রত্যেকটি মানুষেরই উচিত। কারন সত্যই শিব। আর শিবই সুন্দর। “সত্যম শিবম সুন্দরম”। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত সেই সত্য যা সুন্দর তাকে জানার চেষ্টায় নিজেকে নিযুক্ত করা। তাতে একাধারে যেমন নিজের উন্নতি তেমনই উন্নতি সমাজের। কারন মানুষ সামাজিক জীব। মানুষের নিজের উন্নতি হলেই সমাজেরও কল্যান ও উন্নতি হতে বাধ্য। এখন তাই আমাদের উচিত সমাজের প্রতিটি মানুষকে সঠিক জ্ঞান দ্বারা উন্নত করে সমাজসংস্কার করা। আমার মতে কোন একটি বিশেষ মানুষ বা দল বা গোষ্ঠির কিছু সুন্দর কাজের মাধ্যমে সমাজের কিছু অংশের উন্নতি সাধন সম্ভব। কিন্তু সম্পুর্ণ উন্নতি নয়। তার জন্যে একমাত্র প্রয়োজন সবাইকে উন্নত করা। শিক্ষিত করা। শিক্ষিত মানে এই নয় যে লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত। কারন আজকাল এমন অনেকই তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ অশিক্ষিতের মতই আচরন করে। তাই পুঁথগত শিক্ষায় শিক্ষিত নয়, সেটাতো লাগবেই, তাছাড়া আত্মোন্নতি ও সত্যকে সঠিক ভাবে জেনে যে শিক্ষিত আমি তার কথাই বলছি। এবার প্রশ্ন হল এই শিক্ষা কিভাবে কোথা থেকে কি বিষয় এবং কি উপায় পাওয়া সম্ভব। আসুন সেই পথটিই প্রথমে খোঁজার চেষ্টা করি। শূন্য থেকে শুরু করি।
সত্যজ্ঞানের অভাবেই এই জগতে সৃষ্টি হয়ে এসেছে একের পর এক কুসংস্কার। মানুষ অন্ধকারে দুবে থাকছে আর সেই সুযোগের সদ্ব্যাবহার করে জন্ম নিয়েছে হাজার হাজার লোক ঠকানো জ্যোতিষী, তান্ত্রিক, বাবা ইত্যাদি। যেখানে জ্যোতিষ শাস্ত্র একটি অতি উন্নত বিজ্ঞান সেখানে এই সমস্ত ভন্ড মানুষদের নিচ মানসিকতা, ও লোভের কারনে সেই অতি উত্তম শাস্ত্রকে ভুল কাজে ব্যাবহার করার ফলে আজ মানুষ সেই শাস্ত্রকেও অবহেলা করছে। জ্যোতিষের কথা শুনলেই তাই আজ শিক্ষিত মানুষরা জ্যোতিষশাস্ত্রের কত শক্তি, কত উন্নত সেই বিজ্ঞান তা না জেনেই, বা তার বিচার বিশ্লেষন না করেই তাকে অবজ্ঞা করতে শিখেছে। আর এর ফলেই ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়েছে ধর্ম, শাস্ত্র ইত্যাদির প্রতি মানুষের অণীহা। আর এর জন্যে দায়ী সেই সব পাষন্ড, ধর্মের নামে নিজের স্বার্থসিদ্ধি চরিতার্থ করতে তৎপর লোভী মানুষের দল। এখন আবার নতুন একটি সমস্যা। সব জ্যোতিষীই তবে লোভী বা ভুল? না তাও নয়। অনেক ভালো মানুষ আজও এই পৃথিবীতে আছেন। তা না থাকলে আজও একটি লোক রোদে মাথা ঘুরে পরে গেলে বা ট্রেনে উঠতে গিয়ে পরে গেলে দশজন মানুষ তাকে সাহায্য করতে, তাকে ধরতে ছুটে আসত না। আমার এই ভারত প্রেমের দেশ। এখানে ভালোবাসা সবথেকে ওপরে। তাই হে ভারতবাসী, আজ আমাদের একজোট হয়ে জাগতে হবে। এই সমস্ত ভন্ড দের মাধ্যমে তাদের লোভ চরিতার্থের কারনে আমাদের এই মহান ধর্মকে আমরা খারাপ হতে, কলুষিত হতে দেবনা। সমস্ত অন্ধ কুসংস্কারকে ধুয়ে ফেলে শুধু ধর্মের মুল সারটুকু তুলে এনে সমগ্র সমাজকে সেই সারের সুধারসে ভাসিয়ে দিতে চাই। তবেই এই সমাজের কল্যান। মানবকল্যানে বোধকরি এর চেয়ে ভালো কাজ আর কিছু হতে পারেনা।
কিন্তু আমরা জানব কিকরে কে ঠিক আর কে ভুল? প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ। ভগবানের সর্বচ্চ সৃষ্টি আমরা। অর্থাৎ মানুষ। ভগবান আমাদের মধ্যে এমন একটি জিনিস দিয়েছেন যার থেকে দামি কিছু বোধহয় কিছু হয়ে না। আর তা হোল মানুষের মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্ককে সঠিক ভাবে কাজে লাগিয়েই আমরা পেতে পারি সত্যের সন্ধান। তবে তার জন্যে চাই সত্যের জ্ঞান, সেই জ্ঞান কিভাবে হতে পারে আসুন সরল ভাবে কিছুটা আলোচনা করা যাক।
আমি পন্ডিত ব্যাক্তি নই। আমি পন্ডিতদের জন্যেও লিখি না। আমি সাধারন, তাই লিখিও সাধারনদের জন্যেই। তাই আমি অনেক সাধারন উদাহরনের মাধ্যম দিয়ে সব ব্যাপার গুলিকে বোঝানোর চেষ্টা করি মাত্র। কিন্তু প্রশ্ন হল সেই উদাহরন যা আমি দি তা যখন কেই পড়ে, তারকাছে তা গ্রহনযোগ্য মনে হয়, হয়েতো বা হয়েনা, কেন এই বিভেদ। বা কখন তা সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য হবে? কখন হবেনা। সেটাই বা জানি কিকরে? এবারে আমি এই সূত্র ধরেই সরাসরি আলোচনার বিষয়বস্তুর কেন্দ্রে প্রবেশ করছি।
ধরাযাক ১০০ জন মানুষকে একসাথে দাঁড় করিয়ে প্রচন্ড গরমের মধ্যে কনকনে ঠান্ডা একটি করে আইসক্রিম হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করা হল এটি ঠান্ডা না গরম? তারা কি উত্তর দেবে বলে আপনার মনে হয়? যদি সকলেই সুস্থ মস্তিকের মানুষ হয় বা মিথ্যা না বলে তাহলে সকলেই আশা করা যায় যে বলবে “ঠান্ডা”। তাইতো? কিন্তু আবার তাদেরই যদি একে একে জিজ্ঞেস করতে শুরু করা হয় যে তাদের প্রত্যেকে পছন্দের রঙ কি কি, তারা দেখবেন হয়েত প্রত্যেকে কখনই একটি রঙই সবার পছন্দ তা বলবেন না। এর কারন কি? এর কারন অনুভুতি। অর্থাৎ অনুভুতির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানকে বলা যেতে পারে “অবিসংবাদী সত্য” (Universal Truth) । তাই মানুষ যে দলেরই হোক না কেন, যে দেশেরই হোক না কেন তাদের কাছে এই অনুভুতির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান সর্বদাই একই হবে। পৃথক হবেনা। তাই সূর্য উঠলে দিন হয় আবার অস্ত গেলে রাত হয় ইত্যাদি সারা দুনিয়ার লোক মানবে। কিন্তু লক্ষ করুন এই ধরনের মানার বা “অবিসংবাদী সত্য” এর সংখ্যা কিন্তু অনেকই কম। আর তার কারন হোল অনুভুতির অভাব। আর এই কারনেই মানুষের নানা ধরনের বিচার বুদ্ধির কারনে মানুষের মধ্যে আজ এত দন্ধ এত মারামারি। কিন্তু প্রকৃতির এই অপুর্ব মায়ায় সৃষ্ট এই বিষয়টিকে কেউই হাত করতে পারবে না যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের একই ধরনের চিন্তা হবে। আর তা উচিতও নয়। কারন তাহলে সৃষ্টিই আর হবেনা। কারন ভাবুন সবাই যদি বলে মিষ্টি ভালোবাসিনা তাহলে মিষ্টির দোকান চলবে কিকরে? সবাই যদি বলে রাস্তার খাবার খাবোনা তবে সেই লোকগুলির পেট চলবে কিকরে যারা রাস্তার ধারে খাবার বিক্রয়ের মাধ্যমে সংসার প্রতিপালন করেন? তবে কি দাঁড়াল? দাঁড়াল এই, যে, আমরা অযথা এইসব বিষয়গুলোতে মানুষের একই অনুভুতি বা একই চিন্তার জাগোরনের কথা বলছিনা। আমি বলছি আধ্যাত্মিক অনুভুতির কথা। সেই চেতনার কথা, যা জাগ্রত হলে সবার কাছেই সেই অনুভূতি একই হবে। সবাই একই কথা বলবে যে ঈশ্বর সুন্দর। এই অনুভুতি অপার তৃপ্তিদায়ক এ বিষয় কারর মনেই কোন সন্দেহ থাকবেনা। তাই আমার উদ্দেশ্য কোনভাবে এই অনুভুতির জাগোরন। আর সেই অনুভুতি একবার জাগলে, একবার মায়ের কৃপা পেলে আর কোন দন্ধ থাকেনা। সকল অন্ধকার কেটে যায়। তখন জ্ঞানালোকে মানুষ শুধু সত্যিটাকেই দেখে। আসুন এবার সেই কাজ কিকোরে সম্ভব একটু ভেবে দেখি।
একজন আমার কাছে বেশকয়েকদিন আগে বেশ কিছু বিষয় তর্ক তুলেছিল। সে নিজেকে আমার কাছে খুব গর্বের সাথে পরিচয় দিয়েছিল “আমি নাস্তিক” বলে। তাতে তার খুব গর্ব একথা বুঝেছিলাম। এখন তার কিছু প্রশ্ন ও আমার কিছু উত্তর দিলাম। আবার স্মরন করাই আমি অতি সাধারন, তাই কোন ভারি ভারি তত্ত কথা তাকে আমি বলতে পারিনি। আমি সহজভাবেই তাকে উত্তর দিয়েছিলাম। একখানি প্রশ্ন ও উত্তর আলোচনার প্রয়োজনে এখানে তুলে ধরছিঃ
প্রথম প্রশ্নঃ আমাদের হিন্দুধর্মে শুরু থেকেই স্ববিরোধিতা। কেউ বলে কালী আসল, কেউ বলে কৃষ্ণ, কেউ বলে শিব। একেকটি পুরানে একএকজনকে বড় ও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। তবে আসল কে? বড় কে?
আমার উত্তরঃ মনে কর একটি পাওয়ার সাপ্লাই ইউনিট আছে যেখান থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়। এখন সেই বিদ্যুৎ তোমার বাড়িতে একটি মেন পয়েন্ট থেকে এসে বাড়িতে পাখা চালাও, আলো জ্বালাও। এবার বল পাখার কারেন্টটা বড়? নাকি আলোরটা? কোনটা আসল?
সে বলেঃ একই যায়গা থেকে আসছে সবকটি একই হবে। আলাদা আলাদা জিনিস যাযা চলছে তাদের ক্ষমতা অনুযাই আলাদা। কিন্তু বিদ্যুৎ একি আসছে।
আমি বলিঃ এই আমাদের ধর্মের আসল কথা। গোড়ার কথা। ঈশ্বর এক। একটাই শক্তি। একটাই উৎস। কিন্তু তার বিভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ। কখন আলো জ্বালাতে চাও তো কখন জল গরম করতে চাও। তেমনি কখনো মা কালী রূপে বা শিব রূপে ধ্বংস করেন, কখনো বা বিষ্ণুরূপে পালন করেন। ব্রম্মারূপে সৃষ্টি করেন। ইত্যাদি। কিন্তু উৎস এক। সেই পরব্রম্ম পরমাত্মা।
সে মেনেছিল এই সহজ উত্তরে তার বোঝার সুবিধা হয়েছে। আগে অনেক যায়গায় সে এর উতর খুঁজেছে, পেয়েওছে, কিন্তু বোধগম্য হয়েনি। ঠিক এই কারনেই আমি এই লেখা শুরু করি। আমার একটি ধারনা আছে। কতটা সঠিক জানিনা। তাও বলি। এই তত্ত কথা দিয়ে যেখানে যে বইতে লেখা থাকে সেই বইগুলি যারা পরেন তারাও জ্ঞানি। কিন্তু যারা কিছুই জানেন না তারা এই বইএর লেখা কি বুঝবেন? মায়ের স্বরূপ বর্ননা করতে গিয়ে যে মহান ভাষার ব্যাবহার দেখি চন্ডী ইত্যাদি গ্রন্থে তা কি এই যুগের সাধারন মানুষের বা সেই মহা জ্ঞানালোকের ছোঁয়া না পাওয়া মানুষের সম্পুর্ন রূপে বোধগম্য হওয়া সম্ভব? আমার ধারনায়, এই যুগে এমন গ্রন্থ রচনা করতে হবে, যা ঘরে ঘরে খেটে খাওয়া তত্তজ্ঞানশূন্য মানুষকেও সরল ভাষায় দেখাতে পারে সেই মহাজ্ঞানের পথের আলো। আমাদের মহান ধর্মের সর্বরস সংগ্রহ করে মূল রসটিকে বের করে এনে, সমস্ত দন্ধকে ছেঁটে ফেলে রচনা করতে হবে এমন এক গ্রন্থ যা পড়লে মানুষের মনে কালী কৃষ্ণের ভেদভাব চলে গিয়ে চারিদিকে দেখবে একটাই আলো আর যে আলোর থেকে একি সাথে একি শরীরে বেড়িয়ে এসে সামনে দাঁড়াবেন কালী ও কৃষ্ণ। তখন এই প্রতিভাত হবে যে এরা পৃথক সত্তা নন। এরা এক। এবং নিজেও এদের থেকে পৃথক নন। নিযেও এঁরই অংশ। এই বৈদান্তিক সত্যকে সরল ভাষায় পৌঁছবার দায়িত্ব আমি পেয়েছি তাঁরই নির্দেশে। তাঁরই আদেশে। সেই মহান পরমেশ্বর এই কাজে আমাকে এগিয়ে নিয়ে যান তাঁর পরম কৃপায় এই কামনা তাঁর শ্রী চরনে। আর কিছু চাই না। এই কার্যের মাধ্যমে সমাজের কল্যান করে এ জীবনকে সার্থক করতে চাই। যাতে তাঁর সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বলতে পারি। “ওগো প্রিয়, আমি তোমার সৃষ্টির মান রেখেছি গো। এস, আমায় তোমার চরণে আশ্রয় দাও”।
Share:

হিন্দু দেবতাদের মাঝে অন্যতম জগন্নাথ দেব; ইনি ভগবান শ্রী কৃষ্ণের একটি বিশেষ রূপ


জগন্নাথদেবকে কেন্দ্র করে দুটি জনপ্রিয় কাহিনি প্রচলিত আছে। প্রথম কাহিনি অনুসারে, কৃষ্ণ তাঁর ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যন্মুর সম্মুখে আবিভূর্ত হয়ে পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে আসা একটি কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে তাঁর মূর্তি নির্মাণের আদেশ দেন। মূর্তিনির্মাণের জন্য রাজা একজন উপযুক্ত কাষ্ঠশিল্পীর সন্ধান করতে থাকেন। তখন এক রহস্যময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কাষ্ঠশিল্পী তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হন এবং মূর্তি নির্মাণের জন্য কয়েকদিন সময় চেয়ে নেন। সেই কাষ্ঠশিল্পী রাজাকে জানিয়ে দেন মূর্তি নির্মাণকালে কেউ যেন তাঁর কাজে বাধা না দেন। বন্ধ দরজার আড়ালে শুরু হয় কাজ। রাজা ও রানি সহ সকলেই নির্মাণকাজের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রতিদিন তাঁরা বন্ধ দরজার কাছে যেতেন এবং শুনতে পেতেন ভিতর থেকে খোদাইয়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। ৬-৭ দিন বাদে যখন রাজা বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন এমন সময় আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। অত্যুৎসাহী রানি কৌতুহল সংবরণ করতে না পেরে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন। দেখেন মূর্তি তখনও অর্ধসমাপ্ত এবং কাষ্ঠশিল্পী অন্তর্ধিত। এই রহস্যময় কাষ্ঠশিল্পী ছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। মূর্তির হস্তপদ নির্মিত হয়নি বলে রাজা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কাজে বাধাদানের জন্য অনুতাপ করতে থাকেন। তখন দেবর্ষি নারদ তাঁর সম্মুখে আবির্ভূত হন। নারদ রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তি পরমেশ্বরের এক স্বীকৃত স্বরূপ।

দ্বিতীয় কাহিনিটির অবতারণা করা হয়েছিল পূর্বোল্লিখিত উপখ্যানটির ব্যাখ্যা ও সংশয় নিরসনের উদ্দেশ্যে। বৃন্দাবনে গোপীরা একদিন কৃষ্ণের লীলা ও তাঁদের কৃষ্ণপ্রীতির কথা আলোচনা করছিলেন। কৃষ্ণ গোপনে সেই সকল কথা আড়ি পেতে শুনছিলেন। কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রা নিয়োগ করা হয়েছিল গোপীরা যখন কৃষ্ণের কথা আলোচনা করেন তখন কৃষ্ণ যেন তাঁদের নিকটবর্তী না হতে পারে সেদিকে নজর রাখার জন্য। কিন্তু গোপীদের কৃষ্ণপ্রীতি দেখে পরিতুষ্ট সুভদ্রা তাঁদেরই কথা শুনতে শুনতে বিমোহিত হয়ে গেলেন। দেখতে পেলেন না যে তাঁদের দুই দাদা কৃষ্ণ ও বলরাম এগিয়ে আসছেন। শুনতে শুনতে দুই ভাইয়ের কেশ খাড়া হয়ে উঠল, হাত গুটিয়ে এল, চোখদুটি বড় বড় হয়ে গেল এবং মুখে আনন্দের উচ্চ হাসির রেখা ফুটে উঠল। এই কারণেই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার এইপ্রকার রূপ।বৈষ্ণবেরা কৃষ্ণের এই বিমূর্ত রূপটিকে পূজা করেন।
জগন্নাথ মন্দির

পুরীর জগন্নাথ মন্দির ভারতের অন্যতম প্রসিদ্ধ মন্দির। জগন্নাথ-আরাধনার ইতিবৃত্ত এতই প্রাচীন যে এর কোনো ঐতিহাসিক রেকর্ড পাওয়া সম্ভব নয়। জগন্নাথ মন্দিরে অহিন্দুদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরটি শ্রীমন্দির নামে সমধিক পরিচিত। গর্ভগৃহের মাথায় রয়েছে একটি সুউচ্চ শিখর বা চূড়া। প্রদীপ উৎসর্গের জন্য রয়েছে ফসিল হয়ে যাওয়া কাঠের একটি স্তম্ভ। মন্দিরের প্রধান দ্বার সিংহদ্বারের রক্ষক দেবতা জয়া ও বিজয়া। মূল প্রবেশপথের সামনে রয়েছে অরুণস্তম্ভ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। খুরদার রাজা কোনার্কের সূর্যমন্দির থেকে এটি নিয়ে আসেন।

তিন দেবতাকে সাধারণত মন্দিরের অভ্যন্তরেই পূজা করা হয়। তবে প্রতি বছর আষাঢ় মাসে তাঁদের রাজপথে বের করে রথারূহ করে তিন কিলোমিটার দূরে মাসি মা’র মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সময় ভক্তরা দেবতাকে গণদর্শনের সুযোগ পান। এই বিরাট বিরাট রথগুলি প্রতি বছর কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা হয়। এই সুদীর্ঘ রথগুলিই ইংরেজি শব্দ ‘juggernaut’। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর কৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের প্রতীকী রূপে পালিত হয়ে থাকে এই রথযাত্রা উৎসব। রথযাত্রার সময় সারা পৃথিবী থেকে এখানে ভক্ত সমাগম হয়। পুরীর রাজা রথের সম্মুখে রাস্তা ঝাঁট দেন।

রথযাত্রাবা রথদ্বিতীয়া- একটি আষাঢ় মাসে আয়োজিত অন্যতম প্রধান হিন্দু ধর্মীয় উৎসব।দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ভগবান কৃষ্ণের প্রত্যাবর্তনের স্মরণে এই উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে।

কথিত আছে সূর্য গ্রহনের সময় তীর্থস্থান দর্শন করার ধর্মীয় নির্দেশ আছে,সেসময়ে হিন্দুধর্মালম্বীরা সূর্য গ্রহনের সময় কুরুক্ষেত্র দর্শনে যান।বৃন্দাবন থেকে আগত ভক্তবৃন্দ জানতে পারেন তাদের পরম প্রিয় ভগবান শ্রী কৃষ্ণ ভক্তসাধারণের সাথে দেখা করতে জনসন্মুখে এসেছেন,সেই খবর জানা মাত্র ভক্তবৃন্দ ভগবানের দর্শন পেতে ছুটে যান।সেখানে গিয়ে তারা ভগবানের রাজবসন দেখতে পেয়ে শ্রী কৃষ্ণের কাছে আবদার করে বসেন তারা তাদের পরম প্রিয় ভগবানকে পুর্বের বেশে দেখতে চান এবং শ্রী কৃষ্ণকে রথে চড়িয়ে বৃন্দাবন নিয়ে যেতে চান।কিন্তু শ্রী কৃষ্ণ যাবেন সেখানে কি ভাই বলরাম ও বোন সুভদ্রা ছাড়া যাওয়া যায়? তাই ভাই বলরাম ও বোন সুভদ্রাকে আলাদা রথে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হলো।এই জন্য তিনটি রথ টানা হয়।
উৎসব

রথযাত্রার দিন পুরীর জগন্নাথ মন্দির সহ ভারতের ও বিশ্বের সকল জগন্নাথ মন্দিরে জগন্নাথ,বলরাম,সুভদ্রা ও সুদর্শন চক্র মূর্তি মন্দির বাহিরে সর্বসমক্ষে বাহির করা হয়। তারপর তিনটি সুসজ্জিত রথে (কোনো কোনো স্থলে একটি সুসজ্জিত সুবৃহৎ রথে) বসিয়ে দেবতাদের পূজা সম্পন্নপূর্বক রথ টানা হয়।

পুরীতে রথ টানতে প্রতি বছর লক্ষাধিক পূণ্যার্থীর সমাগম হয়। এখানে তিন দেবতাকে গুগিচা মন্দিরে জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। পুরীতে বছরে এই একদিনই অহিন্দু ও বিদেশীদের মন্দির চত্বরে এসে দেবদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়। পুরীতে যে রথগুলি নির্মিত হয় তাদের উচ্চতা ৪৫ ফুট। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক টেলিভিশন চ্যানেলে এই রথযাত্রা সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।

ইসকনের ব্যাপক প্রচারনা ও আন্দোলনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই রথযাত্রা পালিত হয়।বাংলাদেশের ধামরাইয়ের রথযাত্রা বেশ পুরনো ও প্রসিদ্ধ।বর্তমানে ইসকনের প্রচারনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনায় এ রথযাত্রা পালিত হয়।

– দেবাশিষ ভট্টাচার্য্য (সংগ্রাহক)
Share:

স্বামী বিবেকানন্দ প্রবর্তিত সেবাযোগের ভিত্তি – তাপস ঘোষ, কলকাতা।



প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে যে মৌলিক প্রভেদ দেখা যায় , তা হল – প্রাচ্যবাসীরা অন্তর্জগতের অনুসন্ধানে তাঁদের অধিকাংশ শক্তি ব্যয় করেছেন । প্রাচীন ভারতবর্ষ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় প্রভুত উন্নতি সাধন করা সত্ত্বেও সেগুলোকে ‘ অপরা বিদ্যা ‘ বলে চিহ্নিত করে ‘ পরা বিদ্যা ‘ অর্থাৎ অন্তর্জগতের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করেছিল ।

অন্তর্জগত-সন্ধানী ঋষিরা ক্রমশঃ এই দৃশ্যমান জগতের অবাস্তবতা অনুধাবন করলেন । এই দৃশ্যমান জগৎ পরিবর্তনশীল , আর যা পরিবর্তনশীল তা নিত্য বা পরম ( absolute ) হতে পারেনা । বিষয়টি বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের relativity তত্ত্বের সাথে তুলনীয় । জগতের ঘটনাগুলি নির্দিষ্ট frame of reference এর সাপেক্ষেই সত্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে । frame of reference বদলে গেলেই তা অন্যভাবে প্রতিভাত হবে । আমাদের ঋষিগণ খুঁজতে চেয়েছেন এই পরিবর্তনশীল অনিত্যতার পিছনে কি সেই নিত্যবস্তু , যাকে পরম সত্য (absolute truth) বলে নির্দেশ করা যাবে ? এই সন্ধানই ভারতে অধ্যাত্মবিদ্যার জন্ম দিয়েছে ।

অপরপক্ষে পাশ্চাত্য দেশের মানুষ জড়জগতের রহস্যভেদ করতে গিয়ে জড়বিজ্ঞানে ক্রমশঃ পারদর্শী হয়ে উঠেছে । পাশ্চাত্য সভ্যতা তাই বহির্মুখী এবং প্রাচ্য তথা ভারতীয় সভ্যতা অন্তর্মুখী । ভারতের বেদান্তবাদী ঋষিরা এই ভ্রমাত্মক দৃশ্যমান জড়জগৎকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দৃশ্যমান জড়জগতের কারণ স্বরূপ যে absolute সত্ত্বার সন্ধান পেয়েছেন, তাকে তাঁরা ‘ সদ্ – চিৎ – আনন্দ ‘ – এই নামে অভিহিত করলেন । ‘ সদ্ ‘ , অর্থাৎ সত্য স্বরূপ বা নিত্য , ‘ চিৎ’, অর্থাৎ চৈতন্য বা জ্ঞানস্বরূপ এবং ‘আনন্দ’, অর্থাৎ প্রেমস্বরূপ । এই ‘ সদ্ – চিৎ – আনন্দ ‘ কে ‘ব্রহ্ম’ নামেও অভিহিত করা হয় । ‘ব্রহ্ম’ই পরম ( absolute ) , ‘ব্রহ্ম’ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে আর কোনকিছুরই অস্তিত্ব নেই । ব্রহ্মের যেটুকুতে ‘সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়’ নামক এই পরিবর্তনশীল জগতের ভ্রম সাধিত হচ্ছে , বেদান্ত তাকেই নির্দেশ করল – ‘ঈশ্বর’ বা ‘ভগবান’ নামে । ঈশ্বর হলেন এই পরিবর্তনশীল জগৎ চক্রের কেন্দ্র স্বরূপ , আবার তিনিই পরিবর্তনশীল জগৎ রূপে নিজেকে অভিব্যক্ত করছেন । সুতরাং দেখা গেল – ভ্রমাত্মক দৃষ্টিতে যা বহুত্বময় জগৎ , জ্ঞানদৃষ্টিতে তাই ঈশ্বর ।

জগৎকে এই ভ্রমাত্মক দৃষ্টিতে দেখার ফলে আমরা নিজেদেরকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলেছি । ” আমার থেকে অমুক আলাদা ” -এটা ভ্রমাত্মক দৃষ্টির উপলব্ধি । জ্ঞানদৃষ্টিতে আমরা সকলেই একই পরমসত্তা – ঈশ্বরের প্রকাশ ।

এখানথেকেই স্বামী বিবেকানন্দের practical বেদান্তের ধারণার উদ্ভব । তত্ত্বগত ভাবে বেদান্ত ঘোষণা করে – ” সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম ” – সবই সেই ব্রহ্মের প্রকাশ, কিন্তু ব্যবহারিক স্তরে তার প্রকাশ এযাবত তেমন ভাবে দেখা যায়নি । স্বামীজী তাই প্রবর্তন করলেন ‘সেবা যোগ ‘ । ” ব্রহ্ম হতে কীট-পরমাণু , সর্বভুতে সেই প্রেমময় ; মন – প্রাণ – শরীর অর্পণ কর সখে এ সবার পায় । / বহুরূপে সম্মুখে তোমার , ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর ! / জীবে প্রেম করে যেই জন – সেই জন সেবিছে ঈশ্বর । /

আমাদের শরীরগত আমিত্ববুদ্ধি থেকে আমরা যে সব কাজ করি , তাকে বলে ‘ প্রবৃত্তি মূলক কাজ ‘ , যা আমাদের ভ্রমাত্মক উপলব্ধিকে আরও দৃঢ় করে । অপরপক্ষে সর্বভূতস্থিতঈশ্বরের সেবার জন্যে আমরা যে কর্ম করি , তা ‘নিবৃত্তি মূলক কর্ম’ । এই কর্ম আমাদের দেহগত আমিত্বকে ক্ষয় করে । জগতের মূল কারণ স্বরূপ একমেবাদ্বয়ম ব্রহ্মের পুজাই হল এই অভেদবুদ্ধিতে সেবা-রূপ কর্ম । এই কর্ম । এই কর্ম আমাদের স্বার্থপর , ভ্রমাত্মক আমিত্বের নাশ করে । আর এই ভ্রমদৃষ্টি তিরোহিত হলেই আমরা মুক্ত হয়ে যাই জন্ম-মরণ কুহেলিকার বন্ধন থেকে । সত্যদৃষ্টি উন্মোচনের মাধ্যমে অনন্ত স্ব- স্বরূপে ।
Share:

সকল হিন্দুর বেদে সম অধিকার লেখক — সম্পদ দাশ ( অগ্নি সম্পদ ) , বাংলাদেশ





বেদ আমাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ , আমাদের কারও কারও মধ্যে একটি ধারণা আছে যে বেদে ব্রাহ্মন ছাড়া আর কারও অধিকার নাই ।এটা পুরোটাই ভুল , কারন যর্জুবেদে বলা হয়েছে –

‘ ওঁ যথেমাং বাচং কল্যানীমাবদানি জনেভ্যঃ ।বহ্ম রাজন্যাভ্যাং শূদ্রায় চার্য্যায় চ স্বায় চারণায়।।প্রিয়ো দেবানাং দক্ষিণায়ৈ দাতুরিহ ,ভূয়াসময়ং মে কামঃ সমৃধ্যতামুপ মাদো নমতু ।। ‘ — যজুর্বেদ ২৬/২

অনুবাদ :হে মনুষ্যগনআমি যেরূপে ব্রাক্ষণ ,ক্ষত্রিয় ,বৈশ্য ,শূদ্র , স্ত্রীলোক এবং অন্যান্য সমস্ত জনগনকে এইকল্যানদায়িনী পবিত্র বেদবানী বলিতেছি ,তোমরাও সেই রূপ কর । যেমন বেদবানীর উপদেশকরিয়া আমি বিদ্বানদের প্রিয় হয়েছি ,তোমরাওসেরুপ হও ।আমার ইচ্ছা বেদ বিদ্যা প্রচার হোক ।এর দ্বারা সকলে মোক্ষ এবং সুখ লাভ করুক ।

এখানে দেখা যাচ্ছে বেদের সত্যদ্রষ্টা ঋষি বলছেনব্রাহ্মণ ,ক্ষত্রিয় ,বৈশ্য ,শূদ্র স্ত্রীলোকএবং অন্যান্য সকল জনগনের জন্যই এই পবিত্র বেদবানী ।সুতরাং বেদ মন্ত্র উচ্চারণে সকলেরইসমান অধিকার । সব থেকে মজার বিষয় হল বেদের মন্ত্রদ্রষ্ট্রা ঋষিদের মধ্যে মহিলা ঋষিও রয়েছেন যেমন

১/ ১ম মন্ডল১৭৯সূক্তেরদেবতা রতি ,ঋষি অগস্ত্যের পত্নী লোপামুদ্রা ।

২/ ৫মন্ডল ২৮সুক্তেরদেবতা অগ্নী ,ঋষি অত্রিকন্যা বিশ্ববারা ।

৩/ ৮মন্ডল ৯৬ সুক্তেরদেবতা ইন্দ্র ,ঋষি অত্রি কন্যা অপালা ।

৪/ ১০মন্ডল ৩৯ ও ৪০ সুক্তেরদেবতা অশ্বিদয় ,ঋষি কক্ষিবত্ কন্য ঘোষা ।

৫/ ১০মন্ডল ৮৫সুক্ত যা বিবাহ সূক্ত বলে খ্যাততার ঋষি সাবিত্রি সূর্যা ।

৬/ ১০মন্ডল ১২৫সুক্তেরদেবতা আত্মা ,ঋষি অশ্ভৃণ কন্যা বাকৃ

৭/ ১০মন্ডল ১৮৫ সুক্তেরদেবতা সপত্নীবাধন ,ঋষি ইন্দ্রানী ।

আমরা উপরে পেলাম সাত জনমহিলা ঋষি যথাক্রমে :লোপামুদ্রা ,বিশ্ববারা ,অপালা ,ঘোষা ,সূর্যা ,বাকৃএবং ইন্দ্রানী ।আমাদের একটা প্রচলিতকথা আছে যে বেদে মেয়েদেরও অধিকার নেই ।এটা আসলে ঠিক নয় ,কারণ দেখা যাচ্ছে – বেদের মন্ত্রদ্রষ্ট্রা ঋষিদের মধ্যে নারীরাও রয়েছেন ।যাঁদের অধিকারই নাই তারা ঋষি এবং মন্ত্রদ্রষ্ট্রা হন কেমন করে ?আসলে এগুলো অসাধু মহলের কারসাজি । এসব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে ।

তাহলে উপরক্ত প্রমান অনুসারে আমরা অবশ্যইবলতে পারি বেদে সকলেরই সমান অধিকার ।
Share:

আধুনিক বিজ্ঞান ও সনাতন হিন্দু ধর্ম – তাপস ঘোষ, কলকাতা।


সনাতনধর্মের ( প্রকৃত হিন্দু ধর্মের ) প্রাচীন মুনি ঋষি গণ এবং তাঁদের উত্তরসূরি হিন্দু সাধক গণ তাঁদের সাধনার মধ্যে দিয়ে বহুত্বময় এই জগতের কারণ স্বরূপ এক , অখণ্ড , অনন্ত চৈতন্যকে ( consciousness ) উপলব্ধি করেছেন । এই চিৎ সত্তা বা চৈতন্যকেই তাঁরা জগতের নিমিত্ত ও উপাদান কারণ রূপে চিহ্নিত করেছেন । জগতের ভিত্তি স্বরূপ এই অখণ্ড অনন্ত চৈতন্যকেই ঈশ্বর বলা হয় ।


বেদের উপমা অনুযায়ী বলা যায় , মাকড়সা নিজদেহ থেকে জাল উৎপন্ন করে স্বয়ং সেই জালে অবস্থান করে । এখানে জালের উপাদান হল মাকড়সার দেহ , কাজেই মাকড়সাই জালের উপাদান কারণ । আবার মাকড়সা নিজেই জাল তৈরী করেছে তাই জালের নিমিত্ত-কারণও ( কর্মের কর্তা ) মাকড়সা । ঠিক তেমনই চৈতন্য স্বরূপ ঈশ্বর এই জগতের নিমিত্ত ও উপাদান কারণ দুইই ।
হিন্দু দর্শন ঈশ্বরের বিশেষণ হিসাবে ‘ সচ্চিদানন্দ ‘ শব্দটি প্রয়োগ করে । সচ্চিদানন্দ শব্দটি বিশ্লেষণ করলে আমরা সৎ ( শাশ্বত বা সনাতন ) , চিৎ ( চেতনা বা জ্ঞানময়তা ) এবং আনন্দ ( প্রেমময়তা ) এই শব্দ গুলি পাই । এই শাশ্বত চৈতন্যময় সত্তাই জগৎ কারণ ঈশ্বর ।জগতের সবকিছুর মুল উপাদান হওয়ায় তিনি আমাদের সকলের আত্মস্বরূপ বা ‘ আত্মা ‘ ( self ) । হিন্দু শাস্ত্রে এই চৈতন্যময় সত্তাকে ‘ আত্মা ‘ নামেও অভিহিত করা হয় । এই আত্মাই জগত রূপে প্রতিভাত হচ্ছেন ।
শ্রী ভগবান গীতায় শিক্ষা দিচ্ছেন , ” সমং সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্ ।/ বিনশ্বৎস্ববিনশ্যন্তং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।। / সমং পশ্যন্ হি সর্বত্র সমবস্থিতমীশ্বরম্ । / ন হিনস্ত্যাত্মনাত্মানং ততো যাতি পরাং গতিম্ ।। / ” ( গীতা – ১৩ /২৮-২৯ )
অর্থাৎ, বিনাশশীল সর্বভূতে অবিনাশী ঈশ্বরকে যিনি সমভাবে দেখেন তিনিই যথার্থ দর্শন করেন ; কারণ সর্বত্র সমভাবে সেই ঈশ্বর অবস্থিত দেখে সেই সমদর্শী আর কাউকে হিংসা করতে পারেননা । সেইজন্য তিনি পরম গতি প্রাপ্ত হন ।
আমাদের উপনিষদে এই জাগতিক সবকিছুর স্বরূপ হিসাবে সেই অনন্ত চৈতন্যময় ঈশ্বরকেই চিহ্নিত করা হয়েছে । ” ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি ত্বং কুমার উত বা কুমারী । / ত্বং জীর্ণো দন্ডেন বঞ্চসি ত্বং জাতো ভবসি – বিশ্বতোমুখঃ ।। / ( শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৪/৩) অর্থাৎ তুমি স্ত্রী , তুমি পুরুষ , তুমি কুমার , তুমি কুমারী , তুমি বৃদ্ধ – দণ্ডহস্তে ভ্রমণ করছ , তুমি জাত হয়ে নানা রূপ ধারণ করেছ ।
সুতরাং দেখাযাচ্ছে হিন্দুধর্ম তত্ত্ব অনুযায়ী এই বহুত্ব পূর্ণ জগতের পিছনে একত্ব রয়েছে । এবং জগতের ভিত্তি স্বরূপ সেই একত্ব হল অখণ্ড চৈতন্য বা ঈশ্বর ।
আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞান quantum potential ভিত্তিক holistic approach দ্বারা জগতের এই একত্বের দিকে , এই স্বরূপতঃ অখণ্ডতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে । বিজ্ঞানী ডেভিড বোহম্ , বিজ্ঞানী বেসিল হিলি প্রমুখ বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানীর গবেষণা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য । বিজ্ঞানী বোহম্ পরীক্ষা করে প্রমাণ করেছেন Bell’s Theorem কে , যা জগতের এক ও অখণ্ড সত্তার কথা বলে । এই তত্ত্ব অনুসারে বিশ্বের সবকিছু যুক্ত আছে unbroken wholeness এর সঙ্গে ।
আমাদের বেদান্ত দর্শনে জগতের কারণ স্বরূপ নিত্যমুক্ত অখণ্ড চৈতন্যের কথা বলা হয় । আধুনিক বিজ্ঞানীগণ নিত্যমুক্ত অখণ্ড চৈতন্য ( consciousness )কে মূল হিসাবে ধরে জীবের individual চৈতন্যের ব্যাখ্যা করতে চাইছেন । বিজ্ঞানের এই নতুন পদক্ষেপকে বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী অমিত গোস্বামী চিহ্নিত করেছেন ‘ monistic ontological approach ‘ নামে । এই monistic ontological approach আসলে চৈতন্যের বিজ্ঞান ( science within consciousness ) যা অধ্যাত্ম সাধকের তুরীয় অনুভূতির সমর্থক ।
হাজার হাজার বছর আগে ভারতীয় ঋষি গণ তাঁদের অধ্যাত্ম গবেষণার ফলাফল রেখে গেছেন বেদ নামক পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থে । বেদান্ত বা উপনিষদ হল এই বেদেরই সারভাগ বা নির্যাস । এই যুক্তি ও প্রত্যক্ষ অনুভূতি নির্ভর অধ্যাত্মতত্ত্বের উপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সনাতন হিন্দু ধর্ম । বর্তমান জড় বিজ্ঞানও ভিন্ন পথে এগিয়ে চলেছে একই সত্যের দিকে । বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি এখনও শেষ হয়নি । হয়তো এমন দিন আসতে চলেছে যেদিন জড় বিজ্ঞানীরা তাঁদের ভাষায় তাঁদের মতো করে ঘোষণা করবেন , ” শৃন্বতু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ । / আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থূঃ ।। / বেদাহমেতাং পুরুষং মহান্তম্/ আদিত্য বর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ । / তমেব বিদিত্বাহতিমৃত্যুমেতি / নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহনায় ।। / ” {শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (২/৫ ও ৩/৮ ) }
— ” হে দিব্যধামবাসী অমৃতের সন্তানগণ তোমরা শ্রবণ কর , আমি পথ খুঁজে পেয়েছি । যিনি সকল অন্ধকারের পারে , তাকে জানলেই মৃত্যুকে অতিক্রম করা যায় । 
Share:

অভ্রান্ত বৈদিক জ্ঞান

আমরা কেন বেদসমূকে সত্য বলে স্বীকার করব ?
বেদসমূহ হচ্ছে সরাসরি ভগবানের বাণী, যা সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রকাশিত হয়েছিল । যখন আপনি একটি মোটর সাইকেল কেনেন, তখন তার সঙ্গে একটি ইন্স্ট্রাক্শন ম্যানুয়াল বা ব্যবহার-বিধি নির্দেশিকা থাকে, যাতে ব্যাখ্যা করা থাকে কিভাবে ঐ মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করা যেতে পারে । ঠিক তেমনি, সৃষ্টির সময়ে ভগবান আমাদেরকে বৈদিক শাস্ত্র প্রদান করেন, যাতে ব্যাখ্যা করা থাকে এই জগত কেমন, কোথা থেকে উদ্ভূত, কিভাবে এই জগতে আচরণ করা উচিত ।
কয়েকটা দৃষ্টান্তের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কিভাবে বৈদিক জ্ঞান অভ্রান্ত । স্মরণাতীত কাল পূর্বে রচিত হলেও এমন সব তথ্য বেদে বর্নিত হয়েছে, বিজ্ঞান যা অতি সম্প্রতি আবিষ্কার করতে শুরু করেছে ।


১. ডালটন পরমানু আবিষ্কার করেছেন দু’শো বছরও হয় নি । আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে রচিত শ্রীমদ্ভাগবতের মূল শ্লোকে পরমানু অবিভাজ্য ক্ষুদ্রতম কণা – এই তথ্য দেওয়া হয়েছে । ব্রহ্মসংহিতাতেও(৫/৩৫) বলা হয়েছে যে, শৃঙ্খলাযুক্ত জড় পদার্থের বিন্যাসে বৃহত্তম ইউনিট বা একক হচ্ছে ব্রহ্মান্ড, ক্ষুদ্রতম একক হচ্ছে পরমাণু (অন্ডান্তরস্থপরমাণুচয়া-অন্তরস্থং) । এইরকম সর্ববৃহৎ ইউনিট বা ব্রহ্মান্ড একটি নয়, কোটি কোটি (একোহপ্যসৌরচয়িতুং জগদন্ডকোটিং – ব্রহ্মসংহিতা ৫/৩৬) ।


২. পাঁচশো বছর আগে ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলেই এই বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, পৃথিবী সমতল – গোল নয় । বেদে (যা সময়ের আদি থেকে বিদ্যবান এবং পাঁচ হাজার বছর আগে যা লিপিবদ্ধ হয়েছে) সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে যে পৃথিবী গোল – ‘ভূ-গোল’ ।


৩. ক্রিস্টোফার কলম্বাস পাঁচশো বছর আগে জানতেন না যে পৃথিবীতে সাতটি মহাদেশ রয়েছে । রয়েছে সাতটি মহাসাগর । কিন্তু বৈদিক শাস্ত্রে স্মরণাতীত কাল থেকে এই সব তথ্য রয়েছে ।


৪. আইনস্টাইন স্থান ও কালের আপেক্ষিক সম্পর্ক বা আপেক্ষিকতাবাদ আলোচনা করেছেন মাত্র কিছু বছর আগে । কিন্তু ভাগবতপুরাণে ৫০০০ বছর পূর্বেই কুকুদ্মি মুনির আপেক্ষিকতা বিষয়ক অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে ।


৫. জড় বিজ্ঞান এখনো মন কি তা জানাতে পারছে না; আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে বৈদিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে স্থূল-শরীর কঠিন(ভূমি), তরল(জল), গ্যাসীয়(বায়ু), তাপ(অগ্নি), আকাশ – ইত্যাদি পাঁচটি স্থূল উপাদানে তেরী, এবং মন, বুদ্ধি ও অহংকার – এই তিনটি সূক্ষ উপাদানে তেরী সূক্ষ শরীর । অর্থাৎ মন একটি জড় উপাদান (ভ.গী. – ৭/৪) ।


৬. বলা হয় যে শতকের গুণনীয়কের হিসাব ২/৩ হাজার বছর পূর্বে উদ্ভাবিত হয়েছে । অথচ বেদে অজস্র স্থানে শতকের গুণনীয়ক সংখ্যায় সহস্র-লক্ষ-কোটি-অর্বুদ-পরার্দ্ধের পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে । যেমন ৮৪ লক্ষ জীব প্রজাতির হিসাব (চতুর্লক্ষশ্চ মানবাঃ), আত্মার আয়তন (কেশাগ্রের ১০০০০ ভাগের এক ভাগ), কোটি কোটি ব্রহ্মান্ডের হিসাব (একোহপ্যসৌ রচয়িতুং জগদন্ডকোটিং/কোটিষ্বশেষ বসুধাদি বিভূতি ভিন্নম্ – ব্রহ্মসংহিতা ৫/৩৬) ইত্যাদি ।
গত শতাব্দীর ৯০ এর দশকে যখন বিশ্বের গণিতবিদ্ বিজ্ঞানীরা একটি অংকের কোণোভাবেই সমাধান করতে পারছিলেন না, দক্ষিণ ভারতের ক্ষণজন্মা গণিতবিদ্ (৩২ বছরে মারা যান) রামানুজম্ বৈদিক গণিতের সাহায্যে দুইভাবে সেই জটিল অংকের সমাধান বের করে গণিতবিদদের বিস্মিত করেন ।


৭. এমন কি চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে সম্পর্ক-রহিত, সম্পূর্ণ অপ্রাকৃত মহাগ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবত এও আমরা মানব ভ্রূণবিদ্যা বা গাইনিকোলজির এক উজ্জল বিবরণ দেখতে পাই, যেখানে মাতৃগর্ভে ১ম মাস থেকে ১০ম মাস পর্যন্ত মাসানুযায়ী ভ্রূণদেহের বিকাশের পরযায়ক্রমিক বিশদ ও পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা প্রদত্ত হয়েছে । আজ অত্যাধুনিক জটিল যন্ত্রপাতির সাহায্যে যা জানা যাচ্ছে বৈদিক শাস্ত্রে তা হাজার হাজার বছর পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে ।


৮. বেদে বলা হয়েছে যে উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষ – সকল জীবের দেহের মধ্যে রয়েছে প্রাণ, জীবনী শক্তি বা আত্মা । অথচ বিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল ধরে এই বিশ্বাস প্রচার করতেন যে উদ্ভিদের প্রাণ নেই – যতদিন না জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখলেন যে উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে ।


৯. বেদ দাবী করেন যে এমনকি আগুনের মধ্যেও জীব রয়েছে । কিন্তু বিজ্ঞানীরা ভাবতেন যে, ফোটানো জলে বাঁচতে পারে না ব্যকটেরিয়া (সে জন্যই তাঁরা জল ফোটানোর মাধ্যমে নির্জীবকরণ করতেন) । কিন্তু সাম্প্রতিক চিকিৎসা গবেষনায় দেখা গিয়েছে যে, এক ধরনের জীবানু রয়েছে যারা আগুনের মধ্যেও বাঁচতে সক্ষম, তাঁরা এর নাম দিয়েছেন ‘আগুন ব্যকটেরিয়া’ (Fire Bacteria) । এছাড়া বহু প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণে এবং এমনকি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখেও তাঁরা ব্যকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন ।


১০. বেদে বিভিন্ন অবতারসমূহ বা মহাপরুষগনের বিশদ বিবরন-সহ ভবিষ্যতে তাঁদের আবির্ভাবের নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী প্রদত্ত হয়েছে । শ্রীমদ্ভাগবতে এরকম সাত জন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাবের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছেঃ- বুদ্ধদেব – শ্রীমদ্ভাগবতঃ- ১/৩/২৪, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু – শ্রীমদ্ভাগবতঃ- ১১/৫/৩২, মহাভারত – ১২৭/৯২/৭৫; চাণক্য –শ্রীমদ্ভাগবতঃ- ১২/১/১১; চন্দ্রগুপ্ত এবং সম্রাট অশোক – শ্রীমদ্ভাগবতঃ- ১২/১/১২, যীশু – ভবিষ্যপুরাণ


১১. মেডিকেল বিজ্ঞানে এখন উন্নতর মানের সার্জারী আমরা দেখতে পাই কিন্তু আমাদের শাস্ত্রে তা আগে বর্ণনা করা হয়েছে যেমনঃ- ঘনেশের মাথায় হাতির মাথা সংযোজন, দক্ষের মাথায় ছাগলের মাথা সংযোজন ইত্যাদি ।


১২. আজকাল দেখা যাচ্ছে টেষ্টটিউব বেবি উৎপাদন হচ্ছে যা আমাদের শাস্ত্রেও বনর্ণা করা হয়েছে যেমনঃ- দ্রোনাচার্য, গান্ধারির ১০০ পুত্র ইত্যাদি ।


১৩. বেদে উল্লেখ আছে সব মল অপবিত্র কিন্তু গরুর গোবর পবিত্র, তাই যে কোন পূজাপার্বণে বা মাটির ঘরে গোবর লেপন করা হয় । বিজ্ঞানীরা ১৯৪০ সালে গোবরের মধ্যে প্রতিষেধক গুনাবলি আবিষ্কার করেন ।
১৪. বর্তমানে আমরা যে মেডিটেশন বা বিভিন্ন মেথড দেখতে পাই তা আমরা বেদ থেকেই পেয়ে থাকি ।


১৫. গণিতশাস্ত্রে যে পাটিগণিত ও জ্যামিতি দেখতে পাই তা আগে যজুর্বেদে বনর্ণা করা রয়েছে ।


১৬. গোবিন্দ স্বামী নিউটনের ১৮০০ বছর পূর্বেই ‘ইন্টারপোলেশন ফর্মূলা’ (Interpolation formula) আবিষ্কার করেন । ভটৈশ্বরাচার্য নিউটনের ১০০০ বছর পূর্বেই ‘ব্যাকওয়ার্ড ইন্টারপোলেশন ফর্মূলা’ (Backward Interpolation formula) আবিষ্কার করেন । নীলকান্ত মুণি নিউটনের ৮০০ বছর পূর্বেই ‘সমধর্মী ক্রম’ (Infinite Geometric Progression convergent series) আবিষ্কার করেন ।


১৭. পরমেশ্বরাচার্য লুইলারের ৪০০ বছর পূর্বেই ‘লুইলার ফর্মূলা’ আবিষ্কার করেন ।


১৮. ইতিবাচক ও নেতিবাচক (Positive and Negative) সংখ্যা প্রথম লেখা হয় ব্রহ্মগুপ্ত কতৃক রচিত ‘ব্রহ্মস্পুত সিধান্তে’ গ্রন্থে । তাও হাজার বছর আগে ।


১৯. কোপার্নিকাসের চেয়ে কমপক্ষে ১০০০ বছর পূর্বে আর্যাভট্ট ‘নিগূঢ় তত্ত্ব’ আবিষ্কার করেন ।


২০. বৈদিক শাস্ত্রে পৃথিবীর ব্যাস হল ৭৮৪০ মাইল আর বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর ব্যাস ৭৯২৬.৭ মাইল । বৈদিক শাস্ত্রে লেখা আছে পৃথিবী থেকে চাঁদের দুরত্ব ২৫৩০০০ মাইল দূরে আর বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবী থেকে চাঁদের দুরত্ব ২৫২৭১০ মাইল ।


২১. বোদ্ধায়ন কতৃক সর্বপ্রথম পাই “pi” এর মান গনণা করা হয় এবং তিনি পিথাগোরাস তত্ত্বের ধারনা ব্যাখ্যা করেন । ইউরোপিয় গনিতবিদদের পূর্বে ৬ষ্ঠ শতকে তিনি এটি আবিষ্কার করেছিলেন । ব্রিটিশ পন্ডিতগন কতৃক ১৯৯৯ সালে তা পরীক্ষিত হয় ।


২২. ভারত থেকে বীজগণিত, ত্রিকনোমিতি এবং ক্যালকুলাস এসেছে । একাদশ শতকে শ্রীধরআচার্য কতৃক দ্বিঘাতের সহসমীকরন (Quadratic equations) নির্ণীত হয় ।


২৩. গ্রীক ও রোমানদের দ্বারা ব্যবহৃত সবচেয়ে বড় সংখ্যা ছিল ১০৬ যেখানে বৈদিক সময়ে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ বছর শুরুর দিকে হিন্দুরা সুনির্দিষ্ট নাম সহ 1053 এর মতো বড় । এমনকি বর্তমানেও সবচেয়ে বড় ব্যবহৃত সংখ্যা হচ্ছে টেরাঃ 1012 । – সংগৃহীত
Share:

শুভ-কর্মে তাঁর রুচি ছিল বলে পরে তিনি অর্জুন নামে পরিচিত


অর্জুন পাণ্ডু ও কুন্তির তৃতীয় পুত্র। অর্জুনের জন্মনাম ছিল কৃষ্ণ। শুভ-কর্মে তাঁর রুচি ছিল বলে পরে তিনি অর্জুন নামে পরিচিত হন। অর্জুনের আরও অনেকগুলি নাম ছিল। পৃথার (কুন্তির জন্মনাম) পুত্র বলে তিনি ওঁকে অনেকে পার্থ বলে সম্বোধন করতেন। ওঁর অন্য নামগুলি হল – ধনঞ্জয়, বিজয়, শ্বেতবাহন, ফাল্গুন, কিরীটী, বিভৎসু , সব্যসাচী , জিষ্ণু ও গুড়াকেশ। অর্জুন ছিলেন কৌরব ও পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের প্রিয়তম শিষ্য। গুরুদক্ষিণা স্বরূপ দ্রোণাচার্য যখন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের বন্দিত্ব চান, তখন মূলত অর্জুনের বীরত্বতেই তা সম্ভব হয়। ওঁদের শৌর্যবীর্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে ধৃতরাষ্ট্র ও তাঁর পুত্ররা ওঁদের হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন জেনে পাণ্ডবরা বেশ কিছুদিন ছদ্মবেশে ছিলেন।এই সময় ব্রাহ্মণবেশে অর্জুন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের যজ্ঞবেদিসম্ভূত কন্যা দ্রৌপদী স্বয়ংবর সভায় লক্ষ্যভেদ করে তাঁর বরমাল্য পান। পুত্র ঘরে কি এনেছে না দেখে মাতা কুন্তি, সবাই সমান ভাবে ভাগ করে নেও, বলায় পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গেই দ্রৌপদীর বিবাহ হয়।

দেবর্ষি নারদের উপদেশে পাণ্ডবরা নিয়ম করেছিলেন যে, দ্রৌপদী যে সময়ে এক ভ্রাতার সঙ্গে থাকছেন,সেই সময় অন্য কোনও ভ্রাতা তাঁদের শয়ন-গৃহে প্রবেশ করতে পারবেন না। করলে তাঁকে ১২বছর বনবাস করতে হবে। ঘটনাচক্রে এক ব্রাহ্মণের গোধন রক্ষা করার জন্য অস্ত্র আনতে অর্জুন যুধিষ্ঠির ও কৃষ্ণার শয়ন-গৃহে ঢুকতে বাধ্য হলেন। যুধিষ্ঠির এতে নিয়ম ভঙ্গ হয় নি বললেও, অর্জুন বনবাসে চলে যান।বনবাস সময়কালে একে একে চিত্রাঙ্গদা , সুভদ্রার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় । দ্রুপদ-রাজের কন্যা দ্রৌপদী ছাড়াও অর্জুনের আরও তিনজনকে বিবাহ করেছিলেন। এঁরা হলেন – কৌরব্যনাগের কন্যা উলুপী, মণিপুররাজ চিত্রবাহনের কন্যা চিত্রাঙ্গদা এবং কৃষ্ণ ভগিনী সুভদ্রা। ওঁর চার পুত্রের নাম শ্রুতকীর্তি (দ্রৌপদীর গর্ভজাত) ,ইরাবান্ (উলুপীর গর্ভজাত), বভ্রুবাহন (চিত্রাঙ্গদার গর্ভজাত) ও অভিমন্যু (সুভদ্রার গর্ভজাত)।

অগ্নিদেবের হিতার্থে খাণ্ডব অরণ্য যাতে কৃষ্ণ ও অর্জুন দহনে করতে পারেন,তারজন্য বরুণদেব অর্জুনকে একটি রথ আর সেই সঙ্গে বিখ্যাত গাণ্ডীবধনু ও অক্ষয় তূণ দিয়েছিলেন। এই অস্ত্র পেয়ে অর্জুন বিশেষভাবে বলশালী হন। দ্যূতক্রীড়ায় পরাজিত হয়ে পাণ্ডবরা যখন বনবাস করছিলেন,তখন যুধিষ্ঠিরের আদেশে দিব্যাস্ত্রলাভের জন্য অর্জুন ইন্দ্রলোকে যান। ইন্দ্র তাঁকে মহাদেবের আরাধনা করতে বলেন।তাই করে অর্জুন মহাদেবের কাছ থেকে পাশুপত অস্ত্র পান। এরপর ইন্দ্র নিজেও অর্জুনকে নানাবিধ দিব্যাস্ত্রে শিক্ষা দেন। ইন্দ্রের নির্দেশে ইন্দ্রসখা চিত্রসেন অর্জুনকে গীত ও নৃত্যে পারদর্শী করেন। সেইখানে নৃত্যরতা অপ্সরাদের মধ্যে উর্বশীর দিকে অর্জুন বারবার তাকাচ্ছিলেন বলে, ইন্দ্র উর্বশীকে অর্জুনের সাথে দেখা করতে বলেন। অর্জুন কামনা করে উর্বশী দিকে তাকান নি, উর্বশীকে পুরু বংশের জননী হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু অর্জুন উর্বশীকে প্রত্যাখ্যান করায় উর্বশী অপমানিত হয়ে অর্জুনকে অভিশাপ দিলেন যে, অর্জুনকে নর্তকরূপে স্ত্রীলোকদের মধ্যে নপুংশক হয়ে থাকবেন। উর্বশীর এই অভিশাপ পাণ্ডবরা যখন বিরাটরাজের সভায় অজ্ঞাতবাস করছিলেন,তখন খুব কাজে লেগেছিল। সেখানে অর্জুন বৃহন্নলা সেজে বিরাটরাজের অন্তঃপুরচারিণীগনকে নৃত্য, গীত ইত্যাদি শিক্ষা দিয়েছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয়ের অন্যতম কারণ হল অর্জুনের রণনৈপুন্য। কৌরবদের বহু বীর যুদ্ধকালে ওঁর হস্তে নিহত হয়েছেন। সন্মুখ সমরে ভগদত্ত, জয়দ্রথ, কর্ণকে তিনি বধ করেছেন।
Share:

কৃষ্ণই ভগবান । তবুও মন্দিরে রাধারানী এবং সখীবৃন্দেরও উপাসনা হয় কেন ?


কৃষ্ণ ভগবান । রাধারাণী হচ্ছেন মূর্তিমতী ভক্তি । সখীবৃন্দ হচ্ছেন রাধারাণীর বিস্তার বা কায়ব্যূহ । মূর্তিমতী ভক্তির মাধ্যমে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণকে উপলব্ধি করা সম্ভব হয় । শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যদি কেউ আমাকে জানতে চায় তবে তাকে অবশ্য ভক্তির আশ্রয়ে থাকতে হবে । ভক্ত্যা মাম্ অভিজানাতি । হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রে প্রথমেই ‘হরে’ কথাটি বলতে ‘হে রাধারাণী’ বা ‘হে শ্রীকৃষ্ণের আনন্দদায়িনী’ বা হরা শক্তিকে বোঝায় । অভিমানী ব্যাক্তিরা আগে কৃষ্ণকে ভগবান মনে করে আর নিজেকে ভক্ত মনে করে । কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শিখিয়েছেন যারা কৃষ্ণের সেবা করছেন সর্বক্ষণ সর্বভাবে তাঁদের দাসানুদাস হতে । তাই সেই নিত্য সেবাভাব পরিস্ফুট করবার জন্য শ্রীকৃষ্ণের চতুস্পার্শে তাঁর সেবাপরায়ণা শক্তি সমূহ বিরাজ করছেন । তাছাড়া কৃষ্ণ কখনও একাকী থাকতে চান না, সর্বদা তাঁর সঙ্গে কেউ না কেউ থাকবেনই । অতএব সেইভাবে শ্রীকৃষ্ণ উপাসনাই পূর্ণ ও যথার্থ বলে স্বীকার্য। – সংগৃহীত -
Share:

রাধারাণী বিবাহিতা হয়েও কৃষ্ণকে আবার কিভাবে বিবাহ করলেন ?




লহ্মীদেবী যেমন নারায়ণের নিত্যশক্তি । কখনও লহ্মীদেবীকে বিবাহ করে নারায়ণ পত্নীত্বে বরণ করেছিলেন-এমন নয় । তারা চিরকাল নিত্য পতি পত্নী রূপেই বিরাজমান । তেমনই গোলোকে শ্রীরাধারাণী ও শ্রীকৃষ্ণ নিত্য দম্পতিরূপে বিরাজমান । কিন্তু ভৌম ব্রজলীলায় রাধারাণীর সঙ্গে অভিমন্যু বা আয়ান ঘোষের যে বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল তা বিশেষ লীলারস আস্বাদন করার জন্য ভগবানের যোগমায়া শক্তির অঘটন-ঘটন পটীয়সী ব্যবস্থাপনা মাত্র । ভগবান শ্রীহরিকে দর্শনের জন্য অভিমন্যু পূর্ব জীবনে কঠোর তপস্যায় ব্রতী হয়েছিলেন । তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান শ্রীহরি তাঁকে দর্শন দিয়েছিলেন এবং প্রশ্ন করেছিলেন, “তুমি কি বর চাও ? যখন তপস্বী বলেছিলেন, “হে ভগবান ! আপনি আমাকে কি দিতে পারেন ?” শ্রীহরি বলেছিলেন, “তুমি যা চাইবে তাই দেবো ।” শ্রীহরির এই বাক্যের সততাকে পরীক্ষা করবার জন্য তপস্বী বলেছিলেন, “আমি চাই লহ্মীদেবীকে পত্নীরূপে লাভ করতে ।”
তপস্বীর এই রকম অদ্ভূত বর শুনে পরমেশ্বর শ্রীহরি বলেছিলেন, “হে তপস্বী ! তুমি যখন দ্বাপরে জটিলার পুত্ররূপে জন্মগ্রহন করবে তখন তোমার বাসনা পূর্ণ হবে, কিন্তু কখনও তুমি লহ্মীকে স্পর্শ করতে পারবে না ।” এই বলে শ্রীহরি অদৃশ্য হলেন ।
পরবর্তীতে সেই তপস্বী জটিলাদেবীর পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন । কিন্তু বিবাহ লগ্নে তাঁর বুদ্ধিভ্রম হয় । তিনি দর্শকের মতোই বসে থাকেন । রাধারানী শ্রীকৃষ্ণের কাছে বহু মিনতি করেছিলেন যাতে শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া তার বরণ মালা কেউ যেন গ্রহণ না করে । ঘটনা ক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণই বিবাহ বেদীতে রাধারাণীর মালা গ্রহণ করেছিলেন । কিন্তু উপস্থিত জনতার কাছে শ্রীকৃষ্ণ অভিমন্যু রূপেই প্রতিভাত হন । যেভাবে মথুরায় কংসযুদ্ধে তিনি বিভিন্নরূপে প্রতিভাত হয়েছিলেন ।
শ্রীকৃষ্ণ কাউকেই বিরক্ত করতে চাননি । কিন্তু লীলার খাতিরে পূর্বে রাধারাণী অভিশপ্ত হয়েছিলেন যে, শতবর্ষ তাকে কৃষ্ণবিরহে থাকতে হবে । তাই অভিমন্যুর ঘরেই শ্রীমতী রাধারাণী গৃহিণীমাত্র হয়ে দিন অতিবাহিত করে সর্বক্ষণ শ্রীকৃষ্ণ চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন । এটিই ছিল অভিমন্যুর পূর্বজীবনের তপস্যার ফল স্বরূপ । প্রকৃতপক্ষে শ্রীরাধারাণীর বিবাহ শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গেই হয়েছিল, অভিমন্যুর সঙ্গে কদাপি নয় । – সংগৃহীত -
Share:

রাধারাণী কি কৃষ্ণের মামী ?



শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে বলা হয়েছে –
কৃষ্ণবাঞ্ছা-পূর্তি হেতু করে আরাধনে ।
অতএব রাধিকা নাম পুরাণে বাখানে ।।
পুরাণে বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণের বাম পার্শ্ব থেকে আবির্ভূত হয়ে সহসা তার শ্রীপাদপদ্ম সেবার জন্য যিনি ধাবিত হয়ে পুস্পচয়ন করে শ্রীকৃষ্ণের প্রথম আরাধনার বিধান করলেন তিনি হচ্ছেন রাধা ।
শ্রীমতী রাধারাণী সম্বন্ধে শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী লিখেছেন –
মহাভাবস্বরূপ শ্রীরাধাঠাকুরাণী ।
সর্বগুণখনি কৃষ্ণকান্তা-শিরোমণি ।।
অর্থাৎ, “মহাভাব-স্বরূপিনী শ্রীমতী রাধারাণী হচ্ছেন সমস্ত গুণের আধার এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রেয়সীগণের শিরোমণি ।”
গোলকে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধা নিত্য কান্ত ও কান্তারূপে বিরাজমান । সেই কথা শ্রীব্রহ্মা ব্রহ্মসংহিতায় (৫/৩৭ শ্লোকে) বর্ণনা করেছেন, “পরম আনন্দদায়িনী শ্রীমতী রাধারাণীর সঙ্গে যিনি স্বীয় ধাম গোলকে অবস্থান করেন এবং শ্রীমতী রাধারাণীর অংশ-প্রকাশ চিন্ময় রসের আনন্দে পরিপূর্ণ ব্রজগোপীরা যার নিত্য লীলাসঙ্গিনী, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি ।”
ভগবানের ভক্ত পার্ষদগণ কত সুন্দরভাবেই শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণের কথা উল্লেখ করেছেন । কিন্তু জড়বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা সেই সব সুন্দর সরল কথাগুলি জেনেও ‘সাতকান্ড রামায়ণ পড়ে সীতা রামের মাসী’ বলে চিন্তাকরতে থাকেন । জটিল আর কুটিল মানসিকতা সম্পন্ন লোকেরাই রাধারাণীকে কৃষ্ণের মামী বলে ব্যাখ্যা করতেই পারেন । কারণ আপন লাম্পট্য ভাবধারা দিয়ে ভগবানের চরিত্র ব্যাখ্যা করে তারা আমোদ পেতে খুবই আগ্রহী । ষড় গোস্বামীর গ্রন্থ অধ্যয়ন করলে তারা কখনও অনর্থক কথাগুলি বলতে পারেন না । শ্রী রাধারাণী হচ্ছেন কৃষ্ণপ্রিয়া আর শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন রাধানাথ । – সংগৃহীত -
Share:

ব্র্রাজিল – আর্জেন্টিনার এক মধুর মিলন


ফুটবল জগতে বর্তমানে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা পরস্পরের শত্রু হিসেবে মনে করা হয় । অথচ সেই ব্র্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার দ্বৈত প্রচেষ্টায় কিনা ভগবানের শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয় । একেই বলে ভাতৃত্ববোধ বা কৃষ্ণভাবনার শক্তিমত্তা । যে শক্তির ফলে দুটি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের এ যেন মধুর মৈত্রীর সেতুবন্ধন । এক্ষেত্রে যে শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয়েছে তা ব্র্রাজিলেই । তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল বিগ্রহদ্বয় মানে শ্রীশ্রী গৌর নিতাই আগেই আর্জেন্টিনার একটি ফার্মে কিছুদিন অবস্থান করে এরপরই ব্রাজিলে নিয়ে আসা হয় । আর এই বিগ্রহদ্বয় তৈরি হয় ভারতের জয়পুরে । ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের অপূর্ব মনোহর এই বিগ্রহদ্বয় ইতোমধ্যেই সবার মন কেড়ে নিয়েছে । সেই কোমল দুই বাহু সেই নৃত্যরত ভঙ্গিমায় দাড়ানো, মধুর হাসি সবাইকে মনোমুগ্ধ করে রেখেছে । এই বিগ্রহদ্বয় দেখার জন্য ব্রাজিল মন্দিরে প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে ।
তবে ব্রাজিলে এই বিগ্রহদ্বয় খুব সহজেই আসেনি । প্রথমদিকে রাশিয়ার ইসকন ভক্তরা এই বিগ্রহ তৈরির জন্য বললে নির্মানের পর তারা মত পাল্টায় । সেই সুযোগে আর্জেন্টিনার রোজিরিওর ভক্তরা বিগ্রহদ্বয় দেখে মুগ্ধ হলে তারা সেগুলো জয়পুর থেকে রোজিরিওতে নিয়ে এসে একটি ফার্ম কমিউনিটিতে রাখা হয় । হঠাৎ ব্রাজিলে ধনবনতরী স্বামী একসময় স্বপ্নে এই বিগ্রহগুলো দর্শন লাভ করে, যার ফলে তিনি আর্জেন্টিনার ভক্তদের কাছে এই বিগ্রহ চাইলে তা স্থায়ীভাবে ব্রাজিলের কমপিনা গ্রান্ডে নিয়ে আসা হয় । এভাবে শ্রীশ্রী গৌরনিতাই আর্জেন্টিনা হয়ে ব্রাজিলে আসে । উপরের ঘটনা থেকে বোঝা যায় বিগ্রহ স্ব-ইচ্ছায় কোন নির্দিষ্ট স্থানে গমন করেন এবং ভক্তবৃন্দের কাছ থেকে সেবা গ্রহনের অভিলাষ করেন । গত ৩১ অক্টোবর ২০১০ সালে এ বিগ্রহদ্বয়ের শুভ অভিষেক উৎসব উদযাপিত হয় । ঐ দিন দিনব্যাপী হরিনাম কী্র্তনসহ নানা রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, উক্ত অনুষ্ঠানে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা ছাড়া বিশ্বের অনেক ভক্ত যোগদান করেন ।
Share:

দ্বিবিধা ভক্তি — উত্তম অধিকারী — ঈশ্বরদর্শনের উপায়



কিন্তু ভক্তি অমনি করলেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না। প্রেমাভক্তি না হলে ইশ্বরলাভ হয় না। প্রেমাভক্তির আর একটি নাম রাগভক্তি। প্রেম, অনুরাগ না হলে ভগবানলাভ হয় না ঈশ্বরের উপর ভালবাসা না এলে তাঁকে লাভ করা যায় না।
“আর-একরকম ভক্তি আছে। তার নাম বৈধী ভক্তি। এত জপ করতে হবে, উপোস করতে হবে, তীর্থে যেতে হবে, এত উপচারে পূজা করতে হবে, এতগুলি বলিদান দিতে হবে — এ-সব বৈধী ভক্তি। এ-সব অনেক করতে করতে ক্রমে রাগভক্তি আসে। কিন্তু রাগভক্তি যতক্ষণ না হবে, ততক্ষণ ঈশ্বরলাভ হবে না। তাঁর উপর ভালবাসা চাই। সংসারবুদ্ধি একেবারে চলে যাবে, আর তাঁর উপর ষোল আনা মন হবে, তবে তাঁকে পাবে।
“কিন্তু কারু কারু রাগভক্তি আপনা-আপনি হয়। স্বতঃসিদ্ধ। ছেলেবেলা থেকেই আছে। ছেলেবেলা থেকেই ঈশ্বরের জন্য কাঁদে। যেমন প্রহ্লাদ। ‘বিধিবাদীয়’ ভক্তি — যেমন, হাওয়া পাবে বলে পাখা করা। হাওয়ার জন্য পাখার দরকার হয়। ঈশ্বরের উপর ভালবাসা আসবে বলে জপ, তপ, উপবাস। কিন্তু যদি দক্ষিণে হাওয়া আপনি বয়, পাখাখানা লোকে ফেলে দেয়। ঈশ্বরের উপর অনুরাগ, প্রেম, আপনি এলে, জপাদি কর্ম ত্যাগ হয়ে যায়। হরিপ্রেমে মাতোয়ারা হলে বৈধী কর্ম কে করবে?
“যতক্ষণ না তাঁর উপর ভালবাসা জন্মায় ততক্ষণ ভক্তি কাঁচা ভক্তি। তাঁর উপর ভালবাসা এলে, তখন সেই ভক্তির নাম পাকা ভক্তি।
“যাঁর কাঁচা ভক্তি, সে ঈশ্বরের কথা, উপদেশ, ধারণা করতে পারে না। পাকা ভক্তি হলে ধারণা করতে পারে। ফটোগ্রাফের কাচে যদি কালি (Silver Nitrate) মাখানো থাকে, তাহলে যা ছবি পড়ে তা রয়ে যায়। কিন্তু শুধু কাচের উপর হাজার ছবি পড়ুক একটাও থাকেনা — একটু সরে গেলেই, যেমন কাচ তেমনি কাচ। ঈশ্বরের উপর ভালবাসা না থাকলে উপদেশ ধারণা হয় না।”
বিজয় — মহাশয়, ঈশ্বরকে লাভ করতে গেলে, তাঁকে দর্শন করতে গেলে ভক্তি হলেই হয়?
শ্রীরামকৃষ্ণ — হাঁ, ভক্তি দ্বারাই তাঁকে দর্শন হয়, কিন্তু পাকা ভক্তি, প্রেমাভক্তি, রাগভক্তি চাই। সেই ভক্তি এলেই তাঁর উপর ভালবাসা আসে। যেমন ছেলের মার উপর ভালবাসা, মার ছেলের উপর ভালবাসা, স্ত্রীর স্বামীর উপর ভালবাসা।
“এ-ভালবাসা, এ-রাগভক্তি এলে স্ত্রী-পুত্র, আত্মীয়-কুটুম্বের উপর সে মায়ার টান থাকে না। দয়া থাকে। সংসার বিদেশ বোধ হয়, একটি কর্মভূমি মাত্র বোধ হয়। যেমন পাড়াগাঁয়ে বাড়ি কিন্তু কলকাতা কর্মভূমি; কলকাতায় বাসা করে থাকতে হয়, কর্ম করবার জন্য। ঈশ্বরে ভালবাসা এলে সংসারাসক্তি — বিষয়বুদ্ধি — একেবারে যাবে।
“বিষয়বুদ্ধির লেশমাত্র থাকলে তাঁকে দর্শন হয় না। দেশলাইয়ের কাঠি যদি ভিজে থাকে হাজার ঘষো, কোনরকমেই জ্বলবে না — কেবল একরাশ কাঠি লোকসান হয়। বিষয়াসক্ত মন ভিজে দেশলাই।
“শ্রীমতী (রাধিকা) যখন বললেন, আমি কৃষ্ণময় দেখছি, সখীরা বললে, কই আমরা তো তাঁকে দেখতে পাচ্ছি না। তুমি কি প্রলাপ বোকচো? শ্রীমতী বললেন, সখি! অনুরাগ-অঞ্জন চক্ষে মাখো, তাঁকে দেখতে পাবে। (বিজয়ের প্রতি) তোমাদের ব্রাহ্মসমাজেরই গানে আছে:
“প্রভু বিনে অনুরাগ, করে যজ্ঞযাগ, তোমারে কি যায় জানা।
“এই অনুরাগ, এই প্রেম, এই পাকা ভক্তি, এই ভালবাসা যদি একবার হয়, তাহলে সাকার-নিরাকার দুই সাক্ষাৎকার হয়।”

– কাকলী সোম
Share:

বৈদিক শাস্ত্রের আলোকে সময় বা কাল



ভাগবতে সময় সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে । বিজ্ঞানের আলোচনায় দেখেছি যত উপরে যাওয়া যায় সময় সেখানে তত ধীরে চলে । এ বিষয়টি ভাগবতের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায় । ভাগবতে আছে ককুদ্মী রাজা সর্বোচ্চ গ্রহ ব্রহ্মলোকে গিয়ে ২০ মিনিট দেরী করেছিল সেজন্য পৃথিবীতে ১১৬৬৪০০০০ বছর অতিবাহিত হয়েছিল । ককুদ্মী রাজা ব্রহ্মলোক থেকে ফিরে তার কোন আত্মীয় স্বজনের কোন খবর পান নেই । এ আলোচনা থেকে সিধান্ত নেওয়া যায় বিজ্ঞানীরা যে বলেছেন উপরের অল্প সময় নীচের বেশি সময়ের সমান সেই বিষয়টি ভাগবতের আলোকে সঠিক ।
সময় বিষয়ে বিজ্ঞানের একটি আলোচনা উপস্থাপন করছি
কল্পনা করা যাক টেবিল থেকে একটি কাঁচের পেয়ালা মেঝেতে পড়ে গিয়ে টুকরা টুকরা হয়ে গেল । এর একটি আলোক চিত্র নিলে আপনি সহজেই বলতে পারবেন চিত্রটি অগ্রগামী ও পশ্চাৎগামী । আপনি অতীতের দিকে চালনা করলে দেখবেন টুকরাগুলো মেঝে থেকে হঠাৎ একত্রিত হয়ে লাফিয়ে টেবিলের উপরে উঠে একটি সম্পূর্ণ পেয়ালা তৈরী হল । আপনি বলতে পারবেন আলোক চিত্রটি পশ্চাৎগামী, কারণ এরকম আচরণ সাধারণ জীবনে কখনও দেখা যায় না । এ রকম হলে চীনা মাটির ব্যবসা উঠে যেত । পেয়ালার ভাঙ্গা টুকরোগুলি মেঝে থেকে কেন আবার একত্রিত হয়ে টেবিলে উঠে না, এর কারণ সাধারণত দেখানো হয় তাপ গতি বিদ্যার দ্বিতীয় বিধি অনুসারে এটা নিষিদ্ধ । এই বিধি অনুসারে যে কোন বদ্ধ তন্ত্রে (Closed system) কালের সঙ্গে বিশৃঙ্খলা (Entropy) বৃদ্ধি পায় । জিনিষ পত্র সব সময় গোলমাল হয়ে যেতে চায় । টেবিলের উপরে না ভাঙ্গা পেয়ালাটি একটি উঁচুদরের সংগঠিত অবস্থা, মেঝের উপরে ভাঙ্গা পেয়ালাটি একটা বিশৃঙ্খলা অবস্থা । টেবিলের উপরের অতীতের পেয়ালা থেকে মেঝের উপরের ভবিষ্যতের ভাঙ্গা পেয়ালার স্বাচ্ছন্দে যাওয়া যায় কিন্তু উল্টো দিকে যাওয়া না । আধুনিক বিজ্ঞান অনুসারে ৩ ধরণের কালের তীর আছে । যেমন
১) তাপগতীর কালের তীর
(Therm o-dynamic)
এই তীর অনুসারে কালের সাথে সাথে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায় ।
২) মণস্তাত্বিক কালের তীর
(Psychological arrow of time)
এই তীর অনুসারে আমরা কালের স্রোত বোধ করি, যে অভিমুখে অতীত স্মরণ করি কিন্তু ভবিষ্যৎ স্মরণ করি না ।
৩) মহাবিশ্ব তত্ত্বভিত্তিক কালের তীর (Cosmological arrow of time)
এই মহাবিশ্ব সংকুচিত না হয়ে যে অভিমুখে সম্প্রসারিত হচ্ছে এটা হল সেই অভিমুখ । সময় সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের এ আলোচনার বিপরীতে ভাগবতের আলোচনা প্রদান করছি
কাল এক প্রকার শক্তি
এবং কালোহপ্যনুমিতঃ সৌক্ষ্ম্যে স্থৌল্যে চ সত্তম ।
সংস্থানভুক্ত্যা ভগবানবক্তো ব্যক্তভুগ্বিভুঃ ।। (ভাগবত ৩/১১/৩)
অনুবাদ
পরমাণু সমন্বিত শরীরের গতিবিধির মাপ অনুসারে কালের গণনা করা যায় । কাল সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর ভগবান হরির শক্তি, যিনি জড় জগতের অগোচর হইলেও সমস্ত পদার্থের গতিবিধি নিয়ন্ত্রন করেন ।
এই শ্লোকে কাল গণনার পদ্ধতি আলোচনা করা হয়েছে এখানে বর্ণনা করে বলা হয়েছে পরমাণু দ্বারা শরীর বা মহাবিশ্ব গঠিত যার গতিবিধি দ্বারা কাল মাপা হয় । পৃথিবী নামক গ্রহ পরমাণু দ্বারা গঠিত, যা এর কক্ষপথে একবার ভ্রমণ করলে এক সৌর বৎসর হয় অর্থাৎ পরমাণুর তৈরী বস্তু দ্বারা কালের গণনা করা যায় ।
শ্লোকে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে সেটা হল কাল বা সময় এক প্রকার সূক্ষ্ম শক্তি যা দ্বারা এই মহাবিশ্বের সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কিন্তু ইহা চোখে দেখা যায় না । কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন কাল একটি মনস্তাত্বিক (Psychological) ব্যাপার মাত্র এর বাস্তব কোন ভিত্তি নেই কিন্তু ভাগবতে এর প্রতিবাদ করে বলেছে কাল হল এক প্রকার সূ্ক্ষ্ম শক্তি যা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে সুপ্ত অবস্থায় ছিল (এ বিষয়ে আমি ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি)। ভাগবত বলছে সময় বা কাল মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে সুপ্ত অবস্থা থেকে ক্রিয়াশীল হয় এবং পরবর্তীতে এর প্রভাবে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয় অর্থাৎ কাল অব্যক্ত মহাবিশ্বের উপর ক্রিয়া করে একে ব্যক্ত রূপে প্রকাশ করে । কাল যতক্ষণ সুপ্ত অবস্থা থেকে ক্রিয়াশীল না হয় ততক্ষণ অব্যক্ত জগত ব্যক্ত হয় না ।
কালের প্রভাবে এ মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে বর্তমানে অবস্থান করছে এবং একে চূড়ান্ত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে । এ জন্য কালকে ভাগবতে ভগবানের বশীকরণ শক্তি হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে যা দ্বারা সব কিছু বশ হয় ।
পারমাণবিক কালের বর্ণনা
স কালঃ পরমাণুর্বৈ যো ভুঙক্তে পরমাণুতাম্ ।
সতোহবিশেষভুগযস্ত্ত স কালঃ পররমো মহান্ ।। (ভাগবত ৩/১১/৪)
অনুবাদ
পারমাণু আয়তনকে অতিক্রম করে যেইটুকু সময়, সেই অনুসারে পারমাণবিক কালের আয়তনকে মাপা হয় । যে কাল সমগ্র পারমাণুর সামগ্রিক অব্যক্ত সমষ্টিকে আবৃত করে, তাহাকে বলা হয় পরম-মহৎ কাল ।
এ শ্লোকে কাল এবং স্থানের বর্ণনা আছে । কাল এবং স্থান পরস্পর সম্পর্কিত তত্ত্ব একে অপর থেকে বিছিন্ন নয় । কালকে মাপা হয় কোন নির্দিষ্ট স্থানকে পারমাণু দ্বারা আবৃত করবার ক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থাৎ স্থানের দ্বারা কালের পরিমাপ করা হয় । সেজন্য স্থান এবং কাল পরস্পর অভিন্ন বস্তু । এ বিষয়টি আধুনিক বিজ্ঞানীরা ইদানিং প্রমাণ করেছে । পারমাণবিক কাল মাপা হয় সূর্যের গতি অনুসারে । একটি পারমাণুকে অতিক্রম করতে সূর্যের যেটুকু সময় লাগে তাহা হচ্ছে পারমাণবিক কাল । সমগ্র মহাবিশ্বকে আবৃত করে যে কাল তা হচ্ছে পরম মহৎ কাল । সব কয়টি গ্রহ আবর্তিত হচ্ছে এবং স্থানকে অতিক্রম করছে এবং সেই স্থানের গণনা হয় পারমাণুর মাধ্যমে অর্থাৎ গ্রহটি কি পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করল ।
প্রতিটি গ্রহের আবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষপথ রয়েছে যার মধ্যে সে গ্রহটি অবিচলিত ভাবে ভ্রমণ করে এবং তেমনই সূর্যের নিজস্ব কক্ষপথ রয়েছে । সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়ের কালের সম্পূর্ণ পরিমাণ যা সৃষ্টির শেষ পর্যন্ত গ্রহমন্ডলীর আবর্তন দ্বারা মাপা হয় তাকে বলা হয় পরম মহৎ কাল ।
Share:

কলিযুগ



কলিযুগের ব্যাপ্তিকাল ৪লক্ষ ৩২হাজার বছর । খ্রীস্টপূর্ব ৩১০১ এ কলিযুগের আরম্ভ হয় । বর্তমানে এযুগের ৫১১৩ বছর চলছে । দ্বাপরের অবসানে ব্রহ্মার পৃষ্ঠদেশ হতে অধর্মের সৃষ্টি হয় । কলিযুগের অবতার সমূহ-
•১→ বুদ্ধ অবতার । আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমী তিথিতে জন্মগ্রহন করেন ।
•২→ কল্কি অবতার । (কল্কি অবতার কলিযুগের অন্তে মানে শেষের দিকে আর্বিভাব ঘটবে ।শম্ভল গ্রামে (মোরাদাবাদ জেলায় ) সুমতি নামে ব্রাহ্মণ কন্যার গর্ভে , বিষ্ণুযশা নামে ব্রাহ্মণের বাড়িতে , কল্কি নামে ভগবান বিষ্ণুর দশম অবতারের আর্বিভাব ঘটবে । কল্কি হবে বিষ্ণুযশা-সুমতির চতুর্থ সন্তান । বিষ্ণুযশা-সুমতির প্রথম তিন সন্তানের নাম হবে যথাক্রমে কবি, প্রাজ্ঞ আর সুমন্তক ।)
▓ কলিযুগের বৈশিষ্ট্যসমূহ ▓
☯ কলিযুগের তিনপাদ অর্থাত্‍ চারভাগ অধর্ম ও একপাদ বা চারভাগের একভাগ মাত্র ধর্ম পালন করে ।
☯ কলিযুগের মানুষের আয়ুষ্কাল ১০০বছর।
☯ মহারাজ পরীক্ষিতের সময় কলিযুগের শুরু হয়।
☯ ভাগবতে বলা আছে ছলনা মিথ্যা আলস্য নিদ্রা হিংসা দুঃখ শোক ভয় দীনতা প্রভৃতি হবে এযুগের বৈশিষ্ট।
☯ বিষ্ণু পুরাণ মতে কম ধনের অধিকারী হয়ে মানুষ এ যুগে বেশী গর্ব করবে ।ধর্মের জন্য অর্থ খচর করবে না ।
☯ ধর্মগ্রন্থের প্রতি মানুষের আর্কষন থাকবে না ।
☯ মাতাপিতাকে মানবে না । পুত্র পিতৃহত্যা বা পিতা পুত্র হত্যা করতে কুন্ঠিত হবে না ।
☯ কলিযুগের প্রধান গুন হচ্ছে মানুষ কম পরিশ্রমে বেশী পূণ্য অর্জন করবে ।
☯ দান করাই হবে কলিযুগের শ্রেষ্ঠ ধর্ম ।
☯ চৈতন্য মহাপ্রভুর মতে হরিনাম সংকীর্তনই হবে কলিযুগের একমাত্র ধর্ম ।
☯ বিষ্ণু পুরাণ (৬/১/৮) এর মতে-
• মানুষ বৈদিক ক্রিয়া আচার সমূহ করবে না ।
• ধর্মানুসারে কেউ বিবাহিত থাকবে না ।
• স্ত্রীলোকরা কেবল চুলের বাহদুরী করেই নিজেকে সুন্দরী বলে মনে করবে ।
• ধনহীন পতিকে স্ত্রীরা ত্যাগ করবে । আর ধনবান পুরুষরা সেই স্ত্রীগণের স্বামী হবে ।।
• কলিযুগে ধর্মের জন্য ব্যয় না করে কেবল গৃহাদি নির্মাণে অর্থ ব্যয় করবে ।
• মানুষ পরকালের চিন্তা না করে কেবল অর্থ উর্পাজনের চিন্তাতেই নিরন্তর নিমগ্ন থাকবে ।
• কলিযুগে নারীরা সাধারনতঃ স্বেচ্ছাচারিণী ও বিলাস উপকরণে অতিশয় অনুরাগিণী হবে এবং পুরুষরা অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করতে অভিলাষী হবে ।
• সুহ্বদদের প্রার্থনাতে মানুষ নিজের অনুমাত্র স্বার্থ পরিত্যাগ করবেনা ।
• অসমর্থ মানুষরা ধনহীন হয়ে নিরন্তর দুর্ভিক্ষ ও ক্লেশ ভোগ করবে ।
• কলিকালে মানুষ স্নান না করে ভোজন করবে ।
• কলিকালে স্ত্রীলোকরা নিতান্তই লোভী হবে , বহু ভোজনশীল হবে ।
• স্ত্রীরা দুহাতে মাথা চুলকাতে চুলকাতে অনায়াসে পতি আজ্ঞা অবহেলা করবে । নিজের দেহ পোষণে ব্যস্ত থাকবে , নিরন্তন কঠোর ও মিথ্যা বাক্য বলবে ।
• আচারহীন ব্রাহ্মণপুত্ররা ব্রহ্মচারীর বেশ ধারন বেদ অধ্যয়ন করবে ।
• গৃস্থরা হোমাদি করবেন না এবং উচিত দানসমূহও প্রদান করবেন ।
• মানুষ অশাস্ত্রীয় তপস্যা করবে ।
• কলি কালে ৮থেকে ১০বছরের বালকেরা সহবাসে ৫থেকে ৭বছর বয়সের বালিকারা সন্তান প্রসব করবে ।
• মানুষ সর্বোচ্চ ২০ বছর বাঁচবে ।
• কলিকালে মানুষের বুদ্ধি অতি অল্প ,তাঁদের ইন্দ্রিয় প্রবৃত্তি অতিশয় কুত্‍ সিত ,তাদের অন্তকরণ অতিশয় অপবিত্র হবে । আর অল্প কালেই বিনাশ লাভ করবে । •
• যখন পাষন্ড লোকের প্রভাব অত্যন্ত বাড়বে , তখন সমাজের ভালো লোক কোন দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকবে না । সজ্জনের হানি লক্ষিত হবে ।
• অল্প বৃষ্টি হবে, কলিকালে ফসল কম হবে ।
• কলিকালে মানুষ শ্বশুরের অনুগত হয়ে, কার মাতা কার পিতা এরকম কথা বলবে ।
• সুন্দরী স্ত্রী যার তার সাথে বন্ধুত্ব হবে , নিজ ভাইয়ের সাথে শত্রুভাব পোষন করবে ।
Share:

ঈশ্বর ও দেবীদুর্গা – ড. শরদিন্দু ভট্টাচার্য



হিন্দু শাস্ত্র মতে, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান। আর তাই তিনি ইচ্ছে করলেই যে কোনো সময়ে কোনো কাজ সম্পাদন করতে পারেন এবং ইচ্ছে করলেই যে কোনো সময় যে কোনো রূপও ধারণ করতে পারেন। তার নিরাকার রূপের নাম ব্রহ্ম; আর সাকার রূপের নাম দেবতা। ঈশ্বরের নিরাকার রূপটি নির্দিষ্ট হলেও সাকার রূপ অনির্দিষ্ট। মানুষের জ্ঞাত, অজ্ঞাত যে কোনো রূপ ধারণ করার ক্ষমতা তার আছে বলেই এই রূপটি নির্দিষ্ট নয়। অবশ্য সবসময় যে তার রূপ নিজের ইচ্ছের ওপরই নির্ভরশীল; এমন নয়। ভক্তের ইচ্ছের ওপরও অনেক সময় এই রূপ নির্ভর করে। অর্থাৎ কোনো মানুষ যদি ভক্তির সঙ্গে যে কোনো বাস্তব, অবাস্তব, কাল্পনিক কিংবা অন্য কোনো রূপে তাকে আরাধনা করে; তবে সেই রূপেরও তিনি তাকে কৃপা করতে পারেন। ঈশ্বরের রূপ তাই মুখ্য নয়; ভক্ত কোন আকৃতিতে তাকে আরাধনা করল এটা কোনো বিষয় নয়; তার ভক্তি, শ্রদ্ধা ও উদ্দেশ্যই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
ঈশ্বরের সঙ্গে হিন্দুদের মূলত প্রেমের সম্পর্ক বিদ্যমান। এই প্রেমের একটি দাস্য প্রেম; অন্যটি বাৎস প্রেম। অর্থাৎ হিন্দুদের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্কের এটি প্রভু-দাস রূপ; অন্যটি মাতৃ-সন্তানরূপ। নিজেদের দাস ভাবে ভাবিত করে ঈশ্বরের (শ্রীকৃষ্ণ) প্রেমে বিভোর হওয়া এক ধরনের সাধনা। আবার নিজেদের সন্তান রূপে সজ্জিত করে ঈশ্বরকে মায়ের আসনে স্থান দেয়া (দুর্গা); অন্য আর এক ধরনের উপাসনা। দুই স্থলেই গভীর প্রেম ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে। কোন প্রেমের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি; তা অবশ্য বলা দুষ্কর। তবে যে প্রেমই বড় হোক না কেন; বাঙালি এখন দুই ভাবেই তাকে ভজনা করে। অবশ্য নিজেকে প্রেমিকা হিসেবে (রাধা) কল্পনা করে; ঈশ্বরকে (কৃষ্ণ) প্রেমিক হিসেবে আরাধনা করার চিত্রও বাংলায় দুর্লক্ষ নয়। মধ্যযুগে এ ধরনের আরাধনা চিত্রই বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।
ঈশ্বরের মাতৃ রূপের নাম দুর্গা। তিনি দুর্গতি নাশ করেন বলে দুর্গা; আবার দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছেন বলেও দুর্গা। অবশ্য তিনি মহিষাসুরকে সংহার করেছেন বলে মহিষাসুর মর্দিনী এবং জগতের সব শক্তি ও মায়ার আধার বলে মহামায়া-মহাশক্তি। বিভিন্ন গুণ ও রূপের ওপর ভিত্তি করে অবশ্য তাকে চণ্ডী, কালী, তারা, কাত্যায়নী, উমা প্রভৃতি নামেও করা হয় সম্বোধন। তবে রূপ তার যতই বৈচিত্র্যময় হোক না কেন; দুর্গার মূল পরিচয় শক্তি দেবী হিসেবে। তিনি ঈশ্বরের শক্তির প্রতীক। বিশ্বের সব শক্তির উৎস হিসেবে তাকে কল্পনা করা হয়। আর তাই ক্রেতা যুগে অবতার রামচন্দ্র রাবণ বধের আগে এই দেবীর পূজা সম্পাদন করেছিলেন। শুধু তাই নয়; দ্বাপর যুগে অবতার কৃষ্ণও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অব্যবহতি পূর্বে অর্জুনকে দুর্গার আরাধনা করার জন্য দিয়েছিলেন পরামর্শ (দ্রঃ মহাভারত-ভীষ্মপর্ব)।
পুরাকালে দশদিক থেকে শক্তি সংগ্রহ করে মহিষাসুর নামক এক মহাপরাক্রমশালী দৈত্যকে দেবী দুর্গা পরাস্ত করেন। উল্লেখ্য, মহিষাসুর ঈশ্বরের একসময়কার পরম ভক্ত। কঠোর তপস্যা দ্বারা তিনি কোনো একসময় স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। তবে আনন্দিত স্রষ্টা যখন তাকে প্রসন্ন চিত্তে কিছু বর নিতে আগ্রহী হলেন; তখন মহিষাসুর কেবল অমরত্বের চর চাইলেন। অন্য বর কামনার জন্য বার বার অনুরোধ করার পরও মহিষাসুর যখন তার সিদ্ধান্তে রইলেন অটল; তখন সৃষ্টিকর্তা তাকে সেই বর দিয়ে দিলেন। কিন্তু এই বর প্রাপ্তির পরই মহিষাসুরের চেহারা গেল পাল্টে। তিনি ত্রিভুবনের অধীশ্বর হয়ে সর্বপ্রকার সুখ ও ভোগের মালিক হওয়ার জন্য শুরু করে দিলেন ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা। তার এই নিষ্ঠুরতা এমন একটা পর্যায়ে গেল যে, দেবতারাও হলেন স্বর্গচ্যুত।
স্বর্গচ্যুত দেবতারা এতে ভীষণ ক্রুদ্ধ হলেন এবং তাদের ক্রোধরাশি থেকে তৈরি হতে থাকল তেজদীপ্ত মহাশক্তি। এ মহাশক্তি আর কিছুই নয়; এই শক্তিই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনন্ত শক্তি; সব দেবতার সম্মিলিত শক্তি; নারী রূপধারিণী মাতৃস্বরূপা দেবীদুর্গা। জগতের সব শক্তি একত্রভাবে সঞ্চিত হয়েই দেবীদুর্গা রূপে আসে মহিষাসুর দমনে।
কিন্তু মহিষাসুর তো অমর; অজেয়। তাকে কীভাবে সংহার করা যায়? দেবতারা স্রষ্টা (ব্রহ্মা) প্রদত্ত খানিক নিরীক্ষা করলেন এবং এরই ফাঁক নির্ণয় করে দুর্গার হাতে তুলে দিলেন অস্ত্র। দেবীদুর্গা অস্ত্র হাতে পেয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন; ঝাঁপিয়ে পড়লেন শত্রুর ওপর। কিন্তু অশুভ শক্তি বহুরূপী। বার বার সে রূপ পাল্টায়। তাকে চিহ্নিত করাই এক সময় দুর্গার জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও তিনি মহাশক্তি; বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হলেও একসময় ঠিকই তিনি শত্রুকে চিহ্নিত করতে পারেন এবং পদানত করে তার বক্ষে বসিয়ে দেন শূল।
তবে দেবতার (ব্রহ্ম) বর একেবারে বিফলেও গেল না। আসুরিক শক্তি সবসময়ই রয়ে গেল জগতে। ভালোর সঙ্গে মন্দ কাজও চলতে থাকল তার নির্দিষ্ট গতিতেই। অবশ্য শূল বিদ্ধ অসুরের পক্ষে যেমন যুদ্ধ জয় করা অসম্ভব; তেমনি শুভশক্তির পদানত অবস্থায় অশুভ শক্তির চূড়ান্ত বিজয় লাভ করাও দুষ্কর। আসুরিক তাই শূল বিদ্ধ অবস্থাতেই দুর্গার পদতলে রয়ে গেল চিরকাল।
পৌরাণিক কাহিনী বরাবরই প্রতীক ও রূপকধর্মী। এসব কাহিনীর সত্যতা-অসত্যতায় তাই কিছু আসে যায় না। কাহিনীর সভ্যতার চেয়ে এর অভ্যন্তরীণ তাৎপর্য বা ব্যঞ্জনাই মানুষের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ থেকেই মানুষ নিজেকে তৈরি করতে শেখে এবং তার কর্তব্য করতে পারে নির্ধারণ। এতদ্ব্যতীত ঈশ্বর যেহেতু উপনিষদে ভক্তকে যে কোনো রূপে তার উপাসনা করার দিয়েছেন অনুমতি এবং বেদে যেহেতু বলা হয়েছে দেবতার কোনো ইতর-বিশেষ নেই, অর্থাৎ আকৃতি কিংবা বয়সের ভিন্নতা সত্ত্বেও সব দেবতাই যেহেতু সমান, তাই দশ হাত ও ত্রিনয়নারূপী এই দেবীকে ঈশ্বর হিসেবেই ভক্তগণ করে থাকে উপাসনা ভক্তি।
বস্তুত মায়ের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক অচ্ছেদ্য; সব প্রিয় বস্তুকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করা তার চিরন্তন স্বভাব। মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির মতো ঈশ্বরকেও বহু আগে থেকেই একদল মানুষ তাই মায়ের চোখে প্রত্যক্ষ করে আসছেন। এ যুগেও ঘটেনি এর ব্যত্যয়। জগন্মাতা দেবীদুর্গা আজও বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় আশ্রয়। মহাশক্তি দেবী দুর্গার পূজা আজ অবধি তাই বাঙালি হিন্দুর সর্বাপেক্ষা বড় উৎসব।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাকিপ্রবি, সিলেট
Share:

শ্রীমদ্ভগবদগীতার উত্‍পত্তি ও ইতিকথা



শ্রীমদ্ভগবদগীতা বহু প্রাচীন কাল থেকে একটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে । আজ থেকে হাজার হাজার বছর পূর্বে দ্বাপর যুগে শ্রীগীতার এ অমিয় বাণী কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে অর্জুনকে ব্যক্ত করেছিলেন । কৃষ্ণদ্বৈপায়ন যিনি মহর্ষি ব্যাসদেব নামে সমধিক পরিচিত তিনি মহাভারত রচনা করে এই কথোপকথন ভীষ্ম পর্বের ২
৫ অধ্যায় হতে ৪২ অধ্যায় পর্যন্ত সপ্তশতী শ্লোকে অন্তর্ভূক্ত করেন । মহর্ষি শংকরাচার্য সর্বপ্রথম মূল মহাভারতে নিহিত শ্রীগীতা অংশের কোনরূপ বিকৃত না করে পরম যত্নসহকারে প্রতিটি অধ্যায়কে হুবহু চয়ন করে একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থরূপে শ্রীমদ্ভগবদগীতা প্রবর্তন করেন । অবশ্য শ্রীগীতার উত্‍পত্তি আর ও অনেক প্রাচীন । শ্রীমদ্ভগবদগীতার ৪র্থ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে এর উত্‍পত্তি ও ইতিকথা সর্ম্পকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে ।
ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্‌ ।
বিবস্বান্‌মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেহব্রবীত্‍ । ৪/১
অনুবাদ :
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন – আমি পূর্বে সূর্যদেব বিবস্বানকে এই অব্যয় নিষ্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞানযোগ করেছিলাম । সূর্য তা মানব জাতির জনক মনুকে বলেন এবং মনু তা ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলেন ।
শ্রীমদ্ভগবদগীতার উত্‍পত্তি ইতিহাস অতি পুরাতন । পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই শ্রীগীতার ইতিহাস বর্ণনা করেছেন । সূর্যকে একটি শক্তিরূপে কল্পনা করে প্রাচীন কাল থেকে তাকে দেবতা হিসেবে মনে করা হত। তিনি সকল গ্রহের রাজা । অশেষ তেজবিশিষ্ট এবং জগতের চক্ষুস্বরূপ । মানুষ যেমন চক্ষু ব্যতীত কোন কিছু দেখতে পায়না তেমনি সূর্য ছাড়া সারা পৃথিবী অন্ধকার । তিনি অন্যান্য গ্রহকে তাপ ও আলো দান করেন । ভগবান অতি কৃপা করে প্রথম শিষ্যরূপে সূর্যদেব (বিবস্বান)কে গ্রহণ করেন এবং তাকে শ্রীমদ্ভগবদগীতার সমুদয় জ্ঞান করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বিবস্বানের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রহের রাজাদেরকেও তা দান করেছিলেন ।পৃথিবীতে যখন ত্রেতা যুগ শুরু হয় তখন তার প্রারম্ভে ভগবত্‍তত্ত্ব জ্ঞান বিবস্বান (সূর্যদেব) মানব জাতির জনক মনুকে দান করেন । মনু পরবর্তীকালে এই তত্ত্বজ্ঞান তার পুত্র সসাগরা পৃথিবীর অধিশ্বর এবং রঘু বংশের জনক ইক্ষ্বাকুকে দান করেন । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে রঘু বংশে শ্রীরামচন্দ্র আর্বিভূত হন । অতএব এই শ্রীগীতার তত্ত্ববাণীর জ্ঞান শুরু থেকে শিষ্যতে পরম্পরাক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ও প্রবাহিত হয়ে আসছে । কিন্তু এক সময় এই পরম্পরা ছিন্ন হয়ে যায় এবং এই জ্ঞান আমরা হারিয়ে ফেলি । তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে এসে আবার এই জ্ঞান দান করলেন ।
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন সূর্যদেব বিবস্বনকে শ্রীমদ্ভগবদগীতা শোনান তখন অর্জুনও অন্যকোন রূপে সেখানে উপস্থিত ছিলেন । কিন্তু ভগবানের সাথে পার্থক্য হচ্ছে যে , অর্জুন তা ভুলে গেছেন । কিন্তু ভগবান তা ভোলেন নি । তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীগীতার ৪র্থ অধ্যায়ের ৫ম শ্লোকে বলেছেন-
বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন ।
তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ ॥ ৪/৫
অনুবাদ
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন – হে পরন্তপ অর্জুন, আমার এবং তোমার বহু জন্ম অতীতে হয়েছে । আমি সেই সমস্ত জন্মের কথা স্মরণ করতে পারি কিন্তু তুমি তা পারো না ।
মানুষ কথনো পূর্ব জন্মের ঘটনা প্রবাহ জানতে পারেনা । তাই দ্বাপর যুগে অর্জুন কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার বিপক্ষীয় কুরুবংশের আত্মীয় স্বজনদের বধ করে রাজ্য লাভ করতে কিছুতেই রাজী হচ্ছিলেন না । কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই পূর্বে প্রচারিত শ্রীমদ্ভাগবদগীতার বাণী পুনরায় শোনানোর কারণে অর্জুনের জ্ঞান ফিরে আসে এবং ধর্মযুদ্ধ করতে মনস্থির করলেন ।
Share:

সনাতন হলো সত্তের ধারক



প্রমানিত সত্য হলো বিজ্ঞান, আর সনাতন হলো সত্তের ধারক। নিত্য নতুন আবিষ্কার কে সনাতন সব সময় শ্রদ্ধা করেছে। সনাতন প্রকৃতিকেই ঈশ্বর বলে (বেদ মতে), সুতরাং বিজ্ঞান ও সনাতনের মধ্যে কোন প্রতিযোগিতা নেয়। সনাতন সত্যকে মেনে নিতে সদা প্রস্তুত। বিজ্ঞান এ
র আবিষ্কার মানুষ কে আজ অনেক অনেক উন্নত করেছে। সভ্যতাকে করেছে বিকশিত, কিন্তু মানুষ এখনো অনেক অসহায়, কারণ প্রকৃতির সাহায্য ছাড়া এখনো এ
কটি বালি কনাও তৈরি করতে পারেনি মানুষ। আমার মনে হয় সনাতন এর সাথে বিজ্ঞানের দৈরথ তৈরি না করে সনাতন এর ধারণা কে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞান কে আরো সমৃদ্ধ করা উচিৎ। সূর্যের সাত রঙের বর্ণনা বেদ ও বিষ্ণু পুরাণে আছে। কিন্তু বেদ কে অন্ধকারে রাখার কারণে সেটি প্রকাশিত হয় নি। মহা জ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন পড়ে টা আবিষ্কার করেন। আমি প্রতিটি বিজ্ঞানী কে এক এক জন ঋষি মনে করি, তিনি যে ধর্মের অবলম্বী হোন না কেন বা ধর্ম বিশ্বাসে বিশ্বাসী না হলেও তাঁকে আমি ঋষিই মনে করি। প্রজুক্তির কোন সাহায্য ছারাই সপ্ত মণ্ডল সহ মাহাকাশের অনেক অনেক ধারণা কে বেদ উল্লেখ করেছে অনেক অনেক আগেই। বেদ এর সেই আবিষ্কার কে আমি বিজ্ঞান ই বলি। সুতরাং সনাতন ও বিজ্ঞান অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত।
আমাদের মহা জ্ঞান বেদ কে আমি চর্চা করার চেষ্টা করছি বেশ কিছুদিন ধরেই। যা শিখছি চেষ্টা করছি সবার সাথে তা শেয়ার করার জন্যে। আমি অবাক ও বিস্মিত হচ্ছি এই ভেবে যে, হাজার হাজার বছর আগে কিভাবে আমাদের মহা জ্ঞানী মুনি ঋষিরা এতো এতো আবিষ্কার আমাদের জন্যে করে গেলেন। কত বেশী জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তাঁরা। আমরা চর্চা করি না বলেই সনাতন কে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। আমি বেদ চর্চার সময় ভালো বা খারাপ কোন রকমের ধারণা ছারাই শুদ্ধ ও শূন্য মনেই শুরু করি। যাতে আমার নিজের কোন ধারণা জ্ঞান চর্চায় অন্তরায় না হয় এবং আমি যত বেদ এর জ্ঞানের মধ্যে প্রবেশ করছি তত বিস্মিত হচ্ছি। এতো এতো সমৃদ্ধ জ্ঞান থাকতে কেন এমন একটা জ্ঞান কে অন্ধকারে রেখেছে সমাজ !!!!!!!! দয়া করে কেও, কার দোষ বেদ কে অন্ধকারে রাখার পেছনে এ নিয়ে তর্ক করবেন না। তার চেয়ে বেদ পড়ার অভ্যাস করুণ। এতে মহা জ্ঞান সবার ঘড়ে ঘড়ে প্রবেশ করব। সমাজ কুসংস্কার মুক্ত হবে। আমি এ কথা নিশ্চিৎ ভাবেই বলছি বৈদিক সমাজ আধুনিক ত্বম সমাজ ছিলো।
ধর্ম মানতে হবে হবে কথা নেয়, কিন্তু ধর্ম কে জানতে হবে। সবচেয়ে আদি সনাতন ধর্মে কি আছে তা জানার চেষ্টা করুণ কেন তা এতদিন ধরে টিকে আছে? কি আছে এতে? মিথ্যে হলে তো এতদিন ধরে টিকে থাকতে পারতো না।
সনাতন ধর্মের নির্যাশ বলতে আমি পেয়েছি “জীব আত্মায় পরম আত্মা” “যত্র জীব তত্র শিব” “সকল পথ ই ঈশ্বরের দিকে ধাবিত” “যত মত তত পথ” “জীবে প্রেম করে যে জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর” “মেরেছিস কলশীর কানা তা বলে কি প্রেম দিব না” তাহলে আপনি নাস্তিক হোন আর আস্তিক সনাতন এর সাথে আপনার তো কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। লোকাচার কে ধর্ম বলে অনেকেই ভুল করেন বলেন এবং মনে করেন সনাতন কুসংস্কারে ভরা। যেমন ধরুন সতী দাহ প্রথা বা বিধবা প্রথা এগুলি কি ছিলো বেদে? অথচ অনেকেই মনে করেন এগুলি আমাদের সনাতনের কু-সংস্কার।
সনাতন ধরমালম্বিরা প্রকৃতি পূজারী। সনাতন ধর্ম মতে প্রকৃতিই হলো ভগবান। আপনার খেয়াল করলে দেখবেন আমাদের প্রত্যেকটি পুজাতেই গাছ পালার ব্যবহার আছে। যেমন ধরেন বেল পাতা, তুলশী পাতা, বট পাতা, অশত্ত পাতা, আম পাতা সহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুল, ফল সহ প্রকৃতির সব সব কিছুকেই ব্যবহার করতে বলেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতি সংরক্ষণ। পূজার মাধ্যমে প্রকৃতি কে সংরক্ষণ করতে বলেছে সনাতন। আবার প্রাণী কুল কে রক্ষার জন্যে প্রত্যেক দেব দেবী এক এক টা বাহন নিয়েছেন, যা আমাদের ইকোসিস্টেম কে রক্ষার কাজে সহায়তা করে। এত বড় গনেশ দেবতা কিন্তু তার বাহন ইঁদুর, আবার প্যাঁচা হলো লক্ষ্মীর বাহন === এভাবে প্রাণী কুল কে ও সন্মানিত করেছে সনাতন।
অথচ না জেনে না বুঝে অনেকেই বলেন আমরা বহু ঈশ্বর বাদী। প্রকৃত পক্ষে ঈশ্বর নিজে কিছু করেন না তিনি করান। তাঁর শক্তি কে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন জনের মধ্যে সেই শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। একে গণতন্ত্র ও বলতে পারেন। তাহলে সনাতনে গণতন্ত্র অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিলো।
সবার প্রতি আমার অনুরোধ “ধর্ম মানতে হবে কথা নেয় জানতে হবে” না জেনে কেও কুমন্তব্য করবেন না। সনাতনের একটি ঘটনা দিয়ে কোন বিষয় কে বিশ্লেষণ করবেন না সনাতনের এক এক টা ঘটনার পেছনে অনেক অনেক গুলি কারণ জড়িত থাকে। যেমনঃ স্বর্গের দার রক্ষী অভিশপ্ত হয়ে তিন বার পৃথিবীতে জন্ম নেন ১/- হিরন্যক ২/- রাবণ ৩/- কংশ। অথচ নচিকেতা বলে বসলেন রাম যদি হেরে যেত রাবণ রাজ হতো সেখানে (রবন ছিলেন মহা জ্ঞানী তিনি নিজেই জান্তেন রাম দ্বারা তিনি নিহত হবেন। আর এ কারণেই অকাল বোধনে নিজেই দুর্গা পূজা করে নিজের মৃত্যু কে ডেকে এনেছেন এবং মুক্ত হয়েছিলেন পৃথিবী থেকে)
তায় না জেনে কোন মন্তব্য করবেন না, জানার জন্যে প্রশ্ন করুণ। যারা জানবেন তাঁরা উত্তর দিবেন। সবার কাছে সব কিছু জানা থাকবে এমন ও কোণ কথা নেয়।
Share:

হরিনামের জোয়ারে বাংলায় পরম ভক্তিবাদের প্রতিষ্টা করেছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু


শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬ – ১৫৩৪) ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। তিনি অধুনাপশ্চিমবঙ্গের নদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার মনে করেন। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য ছিলেন ভাগবত পুরাণ ওভগবদ্গীতা-য় উল্লিখিত দর্শনের ভিত্তিতে সৃষ্ট বৈষ্ণব ভক্তিযোগ মতবাদের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা। তিনি বিশেষত রাধা ও কৃষ্ণ রূপে ঈশ্বরের পূজা প্রচার করেন এবং হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন। সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষাষ্টক নামক প্রসিদ্ধ স্তোত্রটিও তাঁরই রচনা। গৌড়ীয় বৈষ্ণবমতানুসারে, ভাগবত পুরাণের শেষের দিকের শ্লোকগুলিতে রাধারানির ভাবকান্তি সংবলিত শ্রীকৃষ্ণের চৈতন্য রূপে অবতার গ্রহণের কথা বর্ণিত হয়েছে।[


চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমের নাম গৌরাঙ্গ বা নিমাই। তাঁর গাত্রবর্ণ স্বর্ণালি আভাযুক্ত ছিল বলে তাঁকে গৌরাঙ্গ বা গৌর নামে অভিহিত করা হত। অন্যদিকে নিম বৃক্ষের নিচে জন্ম বলে তাঁর নামকরণ হয়েছিল নিমাই। ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বাংলা সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। সেযুগে একাধিক কবি চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্য চরিতামৃত, বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের চৈতন্য ভাগবত এবং লোচন দাস ঠাকুরের চৈতন্যমঙ্গল।
চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি দোলপূর্ণিমার রাত্রে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদিয়ার মায়াপুরে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম। তাঁর পিতামাতা ছিলেন অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার অন্তর্গত নবদ্বীপের অধিবাসী জগন্নাথ মিশ্র ও শচী দেবী। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ওড়িশার জাজপুরের আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র ওড়িশা থেকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন।
চৈতন্যদেবের পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত। তর্কশাস্ত্রে নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিতের খ্যাতি ছিল অবিসংবাদিত। জপ ও কৃষ্ণের নাম কীর্তনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যে ছেলেবেলা থেকেই বজায় ছিল, তা জানা যায় তাঁর জীবনের নানা কাহিনি থেকে। কিন্তু তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সংস্কৃত গ্রন্থাদি পাঠ ও জ্ঞানার্জন। পিতার মৃত্যুর পর গয়ায় পিণ্ডদানকরতে গিয়ে নিমাই তাঁর গুরু ঈশ্বর পুরীর সাক্ষাৎ পান। ঈশ্বর পুরীর নিকট তিনি গোপাল মন্ত্রে দীক্ষিত হন। এই ঘটনা নিমাইয়ের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর পণ্ডিত থেকে ভক্ত রূপে তাঁর অপ্রত্যাশিত মন পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় বৈষ্ণব সমাজ আশ্চর্য হয়ে যান। অনতিবিলম্বে নিমাই নদিয়ার বৈষ্ণব সমাজের এক অগ্রণী নেতায় পরিণত হন।
কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাসব্রতে দীক্ষিত হওয়ার পর নিমাই শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নাম গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি জন্মভূমি বাংলা ত্যাগ করে কয়েক বছর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান পর্যটন করেন। এই সময় তিনি অবিরত কৃষ্ণনাম জপ করতেন। জীবনের শেষ চব্বিশ বছর তিনি অতিবাহিত করেন জগন্নাথধাম পুরীতে। ওড়িশার সূর্যবংশীয় হিন্দু সম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপরুদ্র দেব শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে ভগবান কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন। মহারাজা প্রতাপরুদ্র চৈতন্যদেব ও তাঁর সংকীর্তন দলের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছিলেন। ভক্তদের মতে, জীবনের শেষপর্বে চৈতন্যদেব ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতেন এবং অধিকাংশ সময়েই ভাবসমাধিস্থ থাকতেন।
গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মতে, চৈতন্য মহাপ্রভু ঈশ্বরের তিনটি পৃথক পৃথক রূপের আধার: প্রথমত, তিনি কৃষ্ণের ভক্ত; দ্বিতীয়ত, তিনি কৃষ্ণভক্তির প্রবক্তা; এবং তৃতীয়ত, তিনি রাধিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ কৃষ্ণের স্বরূপ। ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত চৈতন্য জীবনীগ্রন্থগুলির বর্ণনা অনুসারে, তিনি একাধিকবার অদ্বৈত আচার্য ও নিত্যানন্দ প্রভুকে কৃষ্ণের মতো বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন।
Share:

হিন্দু ধর্ম মানবের ধর্ম

হিন্দু ধর্ম মানবের ধর্ম। হিন্দু নামটা আমাদের দেওয়া নয়, পরের দেওয়া নাম। সংস্কৃতে এ শব্দটি নেই, কিন্তু এই নামটা আমরাও ছাড়তে পারি না। একেবারে চামড়ার সাথে মিশে গেছে। যেমন, একটি মানুষের নাম ঢেমনা। ঢেমনা মানে একটি লতার শেকড়। কিন্তু, নাম একবার হয়ে গেছে, তাই মানুষ তার নাম ঢেমনাই বলতে হবে। তেমনি, আমাদের ধর্মের নামও থাকবে হিন্দু। কিন্তু, হিন্দু আমাদের নাম নয়। এর একটি সুন্দর নাম আছে। নামটি হল “সনাতন ধর্ম”।
সনাতন মানে চিরস্থায়ী, চিরকালের ধর্ম। আসল নামটা হল মনুষ্যত্ব- এটাই মূল ধর্ম। মূল তত্ত্বটাই “মানবধর্ম”। প্রাচীন নাম সনাতন ধর্ম- মানব মাত্রেই এটা ধর্ম। আর এ জন্যই এই ধর্মে “conversion” নেই। ধর্মে কখনো convert করা যায় না। আপনার মধ্যে যদি মনুষ্যত্ব না থাকে, তবে আপনাকে মনুষ্যত্ব দেবার চেষ্টা করতে হবে। কি করে দেব? উপদেশ আর আদর্শ। আমি নিজে মানুষ হয়ে আপনার সাথে মেলামেশা করতে করতে আপনি আমাকে দেখে মানুষ হয়ে যাবেন। এই জন্যই হিন্দু ধর্মে convert করার কোন চেষ্টাই করা হয় নি। যেটা মানব ধর্ম, সেখানে আবার conversion কিসের? আপনি মানুষ আপনাকে অপর ধর্মে নেবার কোন অর্থ হয় না। যে মনুষ্যত্ব অর্জন করে নি, তাকে মনুষ্যত্ব দেবার চেষ্টা করা যায়; মানুষকে মনুষ্যপদ বাচ্য করে তোলবার চেষ্টা করা যায়।
তবে হ্যাঁ, শুধুমাত্র উপদেশ দিয়ে মানুষ গড়া কষ্টকর। চুরি করো না, মিথ্যা বলো না, হিংসা করো না, মানুষ হও, মানুষ হওয়া উচিত- ইত্যাদি উপদেশের সাথে একটি পরম আদর্শের যোগ করে দিতে হয়- যার কাছে যেতে হলে, যার কৃপা পেতে হলে আগে মানুষ হওয়া দরকার। যে চোর, সে তার অনুগ্রহ পায় না। যে মিথ্যাবাদী, তিনি তাকে শাস্তি দেন। এ ভাবে একটি বড় জিনিসের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়। যেমন, মানুষকে ভাল করার জন্য পুলিশের ভয়, রাজার ভয়, জেলখানার ভয়- ইত্যাদি ব্যবস্থা সমাজকে রাখতে হয়েছে। তেমনি, মানুষকে মানুষ করার জন্য ভয়, ভালোবাসা, প্রেম, প্রীতি ইত্যাদি মিলিয়ে ঈশ্বরের সাথে একটা সম্পর্ক রাখতে হয়। অর্থাৎ মনুষ্যত্বের সাথে দেবত্বের আলো দেওয়া প্রয়োজন। লক্ষ্যটা মনুষ্যত্ব পর্যন্তই থাকবে না, আরও উপরে লক্ষ্যটি রাখতে হবে, তবেই ঠিক ঠিক মনুষ্যত্ব লাভ হবে।
আর তবেই, সার্থক হবে “মানবধর্ম”, সার্থক হবে “সনাতন ধর্ম”।
(সহায়ক গ্রন্থ : মানবধর্ম, ডঃ মহানামব্রত ব্রক্ষচারী)
Share:

স্বামীজীর শিক্ষা ও দর্শন এবং প্রভাব

শিক্ষা ও দর্শন:-

স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন যে আদি শঙ্করের ভাষ্যের ভিত্তিতে বেদান্ত দর্শনে হিন্দু ধর্মের সারাংশ সবচেয়ে ভালভাবে প্রকাশিত হয়েছে । তিনি নিম্নলিখিতভাবে বেদান্তের শিক্ষাসমূহের সারসংক্ষেপ করেন, প্রত্যেক আত্মাই সম্ভাব্যরুপে ঐশ্বরিক/দেবসুলভ । লক্ষ্য হচ্ছে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের দ্বারা এ দেবত্বকে সুষ্পষ্টভাবে দেখানো । কর্ম, বা পূজা, বা মন নিয়ন্ত্রণ, বা দর্শন- একটির দ্বারা, বা অধিকের দ্বারা, বা এ সকলগুলির দ্বারা এটি কর – এবং মুক্ত হ্‌ও । এটি হচ্ছে ধর্মের সমগ্রতা । মতবাদ, বা গোঁড়া মতবাদ, বা ধর্মীয় আচার, বা গ্রন্থ, বা মন্দির, বা মূর্তি হচ্ছে গৌণ খুঁটিনাটি বিষয় ছাড়া কিছুই নয় । যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দেশের একটি কুকুরও ক্ষুধার্ত, আমার সমগ্র ধর্মকে একে খাওয়াতে হবে এবং এর সেবা করতে হবে, তা না করে অন্য যাই করা হোক না কেন তার সবই অধার্মিক । জেগে ওঠো, সচেতন হও এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না । শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা উৎকর্ষের প্রকাশ । ধর্ম হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা দেবত্বের প্রকাশ । মানুষের সেবা করা হচ্ছে ঈশ্বরের সেবা করা । বিবেকানন্দের মতানুসারে, রামকৃষ্ণ থেকে পাওয়া তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে “জীব হচ্ছে শিব” । এটি তাঁর মন্ত্রে পরিণত হয়, এবং দরিদ্র নারায়ণ সেবার ধারণা উদ্ভাবন করেন- (দরিদ্র) মানুষের মধ্যে এবং মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেবা । “যদি সত্যিই সকল ইন্দ্রিয়গোচর বস্ত্তু বা বিষয়ের নিমিত্তে ব্রহ্মের একতা থাকে, তাহলে কিসের ভিত্তিতে আমরা অন্যদের থেকে আমাদের ভাল বা মন্দ বিবেচনা করব?”- এ প্রশ্ন তিনি নিজেকে করতেন । শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে এ পার্থক্য বা স্বাতন্ত্র্যসমূহ একতা/সমগ্রতার মধ্যস্থিত আলোর শূন্যতায় মিলিয়ে যায় যখন ভক্ত মোক্ষে পৌঁছেন । তখন এ একতা/সমগ্রতা সম্পর্কে অসচেতন “ব্যক্তিদের” জন্য সমবেদনা এবং তাদের সাহায্য করার দৃঢসংকল্প জাগ্রত হয় । বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল রাত্রে, কন্যাকুমারী, তামিলনাড়ু স্বামী বিবেকানন্দ বেদান্তের সে শাখার অঙ্গীভূত বলে নিজেকে মনে করতেন যে শাখার মতে কেউই প্রকৃতভাবে মুক্ত হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের সকলেই মুক্ত হচ্ছি । এমনকি ব্যক্তিগত পাপমোচনের আকাঙ্খা ত্যাগ করতে হবে, এবং শুধুমাত্র অন্যদের পাপমোচনের জন্য ক্লান্তিহীন কর্ম আলোকিত মানুষের প্রকৃত চিহ্ন । আত্মনো মোক্ষার্থম জগতহিতায় চ (নিজের পাপমোচনের জন্য এবং জগতের মঙ্গলের জন্য)- এ নীতিতে তিনি শ্রী রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা করেন । বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্যদের পবিত্র, অস্বার্থপর হতে এবং শ্রদ্ধা/বিশ্বাস যাতে থাকে সে উপদেশ দেন । তিনি ব্রহ্মাচর্য চর্চা করতে উপদেশ দেন । তাঁর শৈশবের বন্ধু প্রিয় নাথ সিনহার সাথে এক আলোচনায় তিনি তার দৈহিক ও মানসিক শক্তি এবং বাগ্মিতার উৎস/কারণ হিসেবে ব্রহ্মাচর্য চর্চাকে অভিহিত করেন । বিবেকানন্দ প্যারাসাইকোলজি এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের আবির্ভূত ক্ষেত্রকে সমর্থন করেননি (এর এক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর এ বক্তৃতায় মানুষ নিজেই তাঁর ভাগ্য নির্মাতা, সম্পূর্ণ কর্ম, ভলিউম ৮, নোটস অফ ক্লাস টকস এবং বক্তৃতাসমূহ) এ কারণে যে তাঁর মতে এ ধরণের কৌতুহল আধ্যাত্মিক অগ্রগতিকে সাহায্য করে না বরং তা ব্যাহত করে ।

প্রভাব:-

স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্ণর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালচারী একদা লক্ষ্য করেন যে “বিবেকানন্দ হিন্দু ধর্মকে বাঁচিয়েছেন, ভারতকে বাঁচিয়েছেন ।” -সুভাষ চন্দ্র বোসের মতে বিবেকানন্দ “আধুনিক ভারতের নির্মাতা” এবং মহাত্মা গান্ধীর জন্য, বিবেকানন্দের প্রভাব বাড়িয়েছে তাঁর “দেশের জন্য ভালবাসা কয়েক হাজার গুণ ।” তাঁকে স্মরণ করতে ভারতে ১২ই জানুয়ারী তাঁর জন্মদিনে ভারতীয় যুব দিবস পালিত হয় । এটা ছিল ভারতীয় যুবকদের সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের সবচেয়ে যথাযথ ইঙ্গিত এবং কিভাবে আধুনিক জগতে সম্পূর্ণভাবে অংশগ্রহণের সাথে সাথে তাদের প্রাচীন মূল্যবোধসমূহ ধরে রাখতে লড়াই করা উচিত । স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের স্বাধীনতা লড়াইয়ের আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছেন বলে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয় । তাঁর লেখাসমূহ সুভাষ চন্দ্র বোস, অরবিন্দ ঘোষ এবং বাঘা যতীনসহ স্বাধীনতা যোদ্ধাদের এক পুরো প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিল । বিবেকানন্দ ছিলেন বিপ্লবী স্বাধীনতা যোদ্ধা ভুপেন্দ্রনাথ দত্তের ভাই । ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সুভাষ চন্দ্র বোস বলেছিলেন, আমি বিবেকানন্দ সম্পর্কে না লিখে পারছি না । এমনকি তাঁর সঙ্গে যারা অন্তরঙ্গ হবার বিশেষাধিকার পেয়েছে তাদের মধ্যে খুব অল্প কয়েকজনই তাঁকে বুঝতে পারত বা তাঁর গভীরতা মাপতে পারত । তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল সমৃদ্ধ, সুগভীর, জটিল… ত্যাগে তিনি বেপরোয়া, কর্মে তিনি বিরতিহীন, ভালবাসায় তিনি সীমাহীন, জ্ঞানে তিনি প্রগাঢ় ও বিচিত্রগামী, আবেগে তিনি প্রাণোচ্ছ্বল, আক্রমণে তিনি করুণাহীন তথাপি শিশুর মত সরল, আমাদের পৃথিবীতে তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব । অরবিন্দ ঘোষ বিবেকানন্দকে তাঁর আধ্যাত্মিক বিষয়ে বিজ্ঞ পরামর্শদাতা হিসেবে বিবেচনা করতেন । বিবেকানন্দ ছিলেন এক সক্ষম আত্মা যদি কখনও এ ধরণের কিছু থেকে থাকে, মানুষের মধ্যে এক সিংহ, কিন্ত্তু তাঁর সৃষ্টিশীল ক্ষমতা ও শক্তির যে নিশ্চায়ক কর্ম তিনি রেখে গেছেন তা আমাদের ধারণায় তুলনায় অযোগ্য । তাঁর প্রভাব এখনও প্রচন্ডভাবে কাজ করছে বলে আমরা মনে মনে উপলব্ধি করি, আমরা ভালভাবে জানি না কিভাবে, আমরা ভালভাবে জানি না কোথায়, কোন কিছুতে যার এখনও আকার দেয়া হয়নি, কিছুটা সিংহসদৃশ, মহিমান্বিত, অন্তর্জ্ঞানী, বৈপ্লবিক উত্থান যা ভারতের আত্মায় প্রবেশ করেছে এবং আমরা বলি, “লক্ষ করো, বিবেকানন্দ এখনও তাঁর মাতার আত্মায় বেঁচে আছে এবং তাঁর শিশু-সন্তানদের আত্মায় বেঁচে আছে । যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনো প্রবন্ধে বিবেকানন্দের সরাসরি উল্লেখ নেই, কবি রোমা রোলাকে বলেছিলেন, “যদি আপনি ভারতকে জানতে চান, তবে বিবেকানন্দ পড়ুন, তাঁর মধ্যে সবকিছুই ইতিবাচক এবং কিছুই নেতিবাচক নয় ।” এটি বিবেকানন্দের ব্যপারে ঠাকুর যে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন তা দেখায় । বিবেকানন্দের গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব সম্পর্কে ঠাকুর একটি কবিতা লেখেন: “রামকৃষ্ণ পরমহংস রামকৃষ্ণ দেবের প্রতি”
বহু সাধকের
বহু সাধনার ধারা,
ধেয়ানে তোমার
মিলিত হয়েছে তারা;
তোমার জীবনে
অসীমের লীলাপথে
নূতন তীর্থ
রূপ নিল এ জগতে;
দেশ বিদেশের
প্রণাম আনিল টানি
সেথায় আমার
প্রণতি দিলাম আনি।।
Share:

বঙ্গের প্রথম জগদ্ধাত্রী মন্দির, পশ্চিম বঙ্গ



রাঢ় বঙ্গের প্রাচীন জনপদ সোমড়া। প্রাচীনতার বহু নিদর্শন রয়েছে এখানে। বৈদ্যপ্রধান গ্রামটিতে রামশঙ্কর ছিলেন ঢাকার দেওয়ান। তিনি ১৬৭৭ শকাব্দে নবরত্নশোভিত মন্দির তৈরি করে ‘মহাবিদ্যা’ নামে জগদ্ধাত্রী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই বঙ্গের প্রথম জগদ্ধাত্রী মন্দির। সোমড়ার সুখড়িয়া গ্রামটি আদর্শ গ্রাম রূপে পরিচিত। ইতিহাস বলে, ভাগীরথীর তীরে এ অঞ্চলটি তন্ত্র সাধনার ক্ষেত্র ছিল। গ্রামের মাঝে গঙ্গার তীরে প্রাচীন বটগাছের তলায় প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে সিদ্ধকামের দেবী ‘সিদ্ধেশ্বরী মাতা’ রয়েছেন। ওই প্রাচীন মন্দিরটি স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় সংস্কৃত হয়ে এক দর্শনীয় রূপ পেয়েছে।


উলার মুস্তৌফি বংশের বীরেশ্বর মুস্তৌফি ১৭৩৫ শকাব্দে নির্মাণ করেন ‘আনন্দময়ী মন্দির’। পঁচিশটি চূড়া বিশিষ্ট সত্তর ফুট উঁচু মন্দিরে বেদির উপর মহাদেব মাথার উপর হাত রেখে দু-পা ভাঁজ করে শায়িত। বুকের উপর পদ্মাসনে মা-কালী। রানি রাসমণি এই মন্দিরের টেরাকোটার কাজ দেখে আপ্লুত হন। এর অনুকরণেই গড়ে তোলেন দক্ষিণেশ্বরের মন্দির। পাশেই নিস্তারিণী কালী মন্দির। ১২৪৫ বঙ্গাব্দে নির্মিত। শ্বেতপাথরের পদ্মফুলের উপর শায়িত শিবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে দেবী নিস্তারিণী। আর একটু এগিয়ে ‘হরসুন্দরী কালী’ মন্দির। স্টিমার ঘাটের কাছে মধ্যপাড়ায় সংস্কার করা মন্দিরে আছেন প্রায় সাতশো বছরের প্রাচীন শিব ‘ভুজঙ্গভূষণ’। সব মিলিয়ে সোমড়ায় প্রাচীনতার অনেক নিদর্শন আছে। সঙ্গে আছে গঙ্গাবক্ষে ‘সবুজ দ্বীপ’। হুগলি জেলাপরিষদের অধীনে বলাগড় পঞ্চায়েত সমিতির তত্ত্বাবধানে সবুজ দ্বীপকে সুন্দর করে তুললে এই প্রাচীন সোমড়া এক অনবদ্য পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
Share:

প্রকৃত শিক্ষা হতাশা দূর করে

সম্প্রতি সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারলাম দিল্লীর জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করতে না পারার শোকে একজন যুবক আত্মহত্যা করেছে । জড়জাগতিক জ্ঞানের চর্চিত পরিবেশে তথাকথিত আধুনিক সভ্যতায় এমনই হয়ে থাকে।
আমরা একটি দুটি যুবক বা যুবতীর আত্মহত্যার খবর হয়ত কখনও কখনও সংবাদ মাধ্যম থেকে পাই । কিন্তু আরও কত এমন হতভাগ্য তরুণ তরুণি যে, কেবলমাত্র জীবনের প্রকৃত শিক্ষার অভাবে নিজেদের অকালে নিভৃতে শেষ করে দিচ্ছে তাঁর খোঁজ ক’জন রাখছে । এহেন মৃত্যু বর্তমান এই যুগেরই ফসল, তথাকথিত উন্নয়নমুখী সমাজ ও ভোগবাদী শিক্ষারই দান ।
আজকের যুগের ছেলে মেয়েরা জন্মের পর থেকে কি পাচ্ছে ? শুধুই জড় জাগতিক বিভিন্ন বিদ্যা শিক্ষার চাপ । প্রচুর টাকার বিনিময়ে তথাকথিত বড় বড় স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রতিযোগিতা । যেন ঐ সব স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পেলে জীবনটাই বৃথা । তার ফলে আজকাল এই ধরনের বহু স্কুল গজিয়ে উঠেছে । স্কুলগুলো হয়ে উঠেছে এক একটি ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান । আর সেইসব স্কুলে ও বাড়িতে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে উঠছে কেবলই জড় জাগতিক পড়াশুনার চাপের মধ্যে যান্ত্রিক ভাবে ।
পারমার্থিকতা তো দুরের কথা, সাধারণভাবে মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কোন শিক্ষাই তার লাভ করে না । শিশু কাল থেকেই তাদের মধ্যে এক জাগতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ।
সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষাটি কি ? সেটি হল, ‘তোমাকে বড় হতে হবে ।’ এই বড় হওয়াটি কি রকম ? সেটি হল, ‘তোমাকে অনেক বড় চাকরী করতে হবে ।’ কেন এই বড় চাকরী ? সেটি এই জন্য যে তোমাকে অনেক টাকা মাইনে পেতে হবে , অনেক অর্থ রোজগার করতে হবে, তারই এক প্রতিযোগিতা । যখন কেউ কোন প্রতিযোগিতায় নামে তখন তার উদ্দেশ্যটি থাকে আমি অন্য সবাইকে হারিয়ে জিতব, অন্যকে ওটা করতে দেব না বা নিতে দেব না ইত্যাদি । তখন সে যেমন অন্য প্রতিযোগীদের শত্রু অন্যেরাও তার শত্রু । এইভাবে ছাত্রাবস্থা থেকেই আজকের তরুণ তরুণীদের মধ্যে এক নীরব শত্রুতাবোধ গড়ে ওঠে ।
অথচ পৃথিবীতে প্রকৃত সভ্যতা ও শান্তি গড়ে তোলার জন্য চাই মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মিত্রতাবোধ । তো আজকের মানুষ যখন শুধু ভোগাকাঙ্ক্ষাকে জীবনের উদ্দেশ্য করে পারস্পরিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এক নিভৃত শত্রুতাবোধের দ্বারা সমাজকে গড়ে তুলছে, সেই সমাজে আমার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাঘাত ঘটলেই বা কারো থেকে কোন ভাবে পিছেয়ে পড়লেই আশে হতাশা ।
আর সেই হতাশারই শিকার হয়ে আজকের নবীন প্রজন্মের অনেকেই আত্মহত্যায় প্রবৃত হয় । দুর্লভ মনুষ্য জন্মের উদ্দেশ্য কি সেটি হৃদয়ঙ্গম করা বা জানাই এই জীবনের আসল শিক্ষা লাভ । অনেকেই অনেক বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছরই পাশ করছে, বড় বড় ডিগ্রী লাভ করছে, মোটা চাকুরী পাচ্ছে, প্রচুর অর্থ রোজগার করছে, জড় প্রাচুর্য লাভ করেছে, প্রতি বছরই এসব ঘটছে । কিন্তু তারা সুখী হয়েছে কি ?
শান্তি লাভ করেছে কি ? আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ হয়েছে কি ? না, এসবের কোনটাই কেউ প্রাপ্ত হয় নি । বরং পৃথিবীতে অশান্তি ও হতাশা ক্রমশই বেড়ে চলেছে । আমাদের তাই কোন নামী স্কুল বা কলেজে ভর্তি হলাম কি হলাম না, উচ্চ রোজগারের চাকরী পেলাম কি পেলাম না সেসব হিসাবের মধ্যে না গিয়ে এটা হৃদয়ঙ্গম করা উচিত যে আমি এই দেহটি নই ।
আমি এই মনুষ্য দেহটি লাভ করেছি পারমার্থিক তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করার জন্য এবং সেটিই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য । তাই মহাজনগণের নির্দেশ ও শাস্রজ্ঞান অনুসরণ করে ‘সরল জীবন উচ্চ চিন্তা’র নীতি জীবনে প্রয়োগ করে এই মনুষ্য জীবনের সদ্ব্যবহার করা উচিত । তাহলেই পূর্ণ আনন্দ আমরা প্রাপ্ত হব আর দূর হবে সমস্ত হতাশা ।
সংগ্রহ : হরেকৃষ্ণ সমাচার
Share:

জেনে নিন ওম ( OM )এর তাৎপর্য


ওম সনাতন ধর্মে অনুসৃত প্রতীক চিহ্নের মধ্যে অত্যন্ত্ গুরুত্বপূর্ন চিরন্তন চিহ্ন এবং এই শব্দের ধ্বনি ধ্যানের জন্য ব্যাবহৃত হয়ে থাকে । এছাড়া সকল ধরনের প্রার্থনার প্রথমে ওম শব্দ উচ্চারন করা হয় । মূলত ওম শব্দ মহাবিশ্ব ও প্রকৃত বাস্তবতাকে নির্দেশ করে থাকে । ওম শব্দ দিয়ে ভগবানের তিনটি প্রকৃতি অর্থাৎ ব্রহ্মা , বিষ্ণু এবং মহেশ্বর নির্দেশ করে থাকে ।


স্বামী বিবেকানন্দের মতে, ওঁ-কার “সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক, ঈশ্বরেরও প্রতীক।

ধর্মীয় চিহ্ন হলেও ব্যবহারিক জীবনে ওঁ-কারের প্রয়োগ আরও ব্যাপক। প্রত্যেকটি মন্ত্র ওঁ-কার দিয়ে শুরু হয়। চিঠিপত্রের শুরুতেও কেউ কেউ ওঁ-কার লিখে থাকেন। মন্দির, ঠাকুরঘর প্রভৃতি ধর্মীয় স্থানের প্রতীকচিহ্ন রূপেও ওঁ-কার ব্যবহৃত হয়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত , যোগব্যায়ামে ওম দিয়ে শুরু হয় ।
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।