• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বাঙলার হিন্দু সমাজের লোকক্ষয়ー২

বস্তুতঃ ১৯১০ সালে লে. কর্নেল মুখোপাধ্যায় বাঙলার হিন্দুসমাজের যে ক্ষয় ব্যাধি ধরিয়াছিলেন, তাহা প্রশমিত হওয়া দূরে থাকুক, উত্তরোত্তর প্রবলাকার ধারণ করিতেছে । তাহার পর ১৯১১, ১৯২১, ১৯৩১ সালে তিনটি আদমসুমারী হইয়াছে। প্ৰত্যেক আদম-সুমারীতেই হিন্দুসমাজের অবস্থা ক্রমশ অধিকতর শোচনীয় হইয়াছে , লক্ষ্য করিতেছি । ১৯৪১ সালের আদমসুমারীতেও উপজাতীয় হিন্দুদের (Tribal Hindus) বাদ দিলে বাঙালী হিন্দুদের অবস্থা পূর্ববৎ শোচনীয় ।

নিম্নে আমরা কতকগুলি তথ্য দিলাম । তথ্যগুলি বিশদভাবে বুঝাইবার জন্য আমরা যে চিত্রটি দিলাম (১নং চিত্র) তাহা হইতে বিষয়টি সম্যকরূপে উপলব্ধি করা যাইবে । তথ্যগুলি এই:
বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের সংখ্যা ও শতকরা অনুপাতー
বৎসর
হিন্দু (সংখ্যা হাজারে)
মুসলমান
শতকরা হি.
শতকরা মু.
১৮৭২
১৭২.৫৮
১৬৬.৮২
৫০.২
৪৮.৫
১৮৮১
১৮০.৭১
১৮৩.৯৪
৪৮.৮
৪৯.৭
১৮৯১
১৮৯.৭৮
২০১.৭৫
৪৭.৭
৫০.৭
১৯০১
২০১.৫৬
২১৯.৫৫
৪৭.০
৫১.২
১৯১১
২০৯.৪৮
২৪২.৩৭
৪৫.২
৫২.৩
১৯২১
২০৮.১৩
২৫৪.৮৬
৪৩.৭
৫৩.৫
১৯৩১
২২২.১২
২৭৮.১০
৪৩.৫
৫৪.৪
১৯৪১
২৫৮.০২
৩৩৩.৭২
৪২.০
৫৪.৩
১৯৪১
২৭২.০৭1

৪৪.৩2

নিম্নে আমরা যে চিত্রটি ( ১নং চিত্র ) দিলাম, তাহা হইতে বিষয়টি সম্যকরূপে উপলব্ধি করা যাইবে :ー



 চিত্র নং ১ - বাংলা
নীচের চিত্রে দেখা যাইবে যে, ইং ১৮৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে হিন্দু ও মুসলমানের সংখ্যা প্ৰায় সমান ছিল,ーসমগ্ৰ লোকসংখ্যার শতকরা ৪৯ ভাগ হিসাবে। কিন্তু তারপর হইতেই মুসলমানের সংখ্যা দ্রুত বাড়িয়া চলিয়াছে এবং ১৯৩১ সালে তাহাদের সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে লোকসংখ্যার শতকরা প্রায় ৫৪.৫ ভাগে। আর ঐ ১৮৮১ সাল হইতেই বাঙলায় হিন্দুদের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস হইতেছে এবং ১৯৩১ সালে তাঁহাদের সংখ্যা আসিয়া নামিয়াছে শতকরা ৪৩ ভাগে। অর্থাৎ অৰ্দ্ধ শতাব্দীর মধ্যে বাঙলার হিন্দুদের সংখ্যা শতকরা ৬ ভাগ হ্রাস হইয়াছে, আর মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৬ ভাগ বাড়িয়াছে। এই অবস্থা বিপৰ্য্যয়ের কারণ কি, তাহা চিন্তাশীল বাঙালী হিন্দু মাত্রেই গভীরভাবে ভাবিয়া দেখা অত্যাবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। যদি এইভাবে ক্রমাগত বাঙালী হিন্দুর সংখ্যা হ্রাস হইতে থাকে, তবে আগামী অৰ্দ্ধ শতাব্দীর মধ্যে তাহারা বাঙলাদেশে নগণ্য সংখ্যালঘিষ্ঠে পরিণত হইবে ;— এক শতাব্দীর মধ্যে জাতি হিসাবে লুপ্তপ্রায় হইবে, ইহাও অমূলক আশঙ্কা নহে।
১৮৮১-১৯৩১ এই পাঁচ দশকে ( অর্থাৎ ৫০ বৎসরে ) পাঞ্জাবের হিন্দু ও মুসলমানের লোকসংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধির তুলনা করিলে বাঙলার সঙ্গে আশ্চৰ্য্য রকমের সাদৃশ্য দেখা যায়। সম্প্রতি পাঞ্জাবের অধ্যাপক রুচিরাম সাহানা বিষয়টির তুলনামূলক আলোচনা করিয়া বাঙলা ও পাঞ্জাবের হিন্দুদের শোচনীয় অবস্থার প্রতি সমগ্ৰ হিন্দু ভারতের মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছেন ।
২নং চিত্রে দেখা যাইবে, পাঞ্জাবের মুসলমানেরা ১৮৮১ সালে পাঞ্জাবের সমগ্ৰ লোকসংখ্যার শতকরা ৪৭.৫ ভাগ ছিল,-আর ১৯৩১ সালে তাহাদের সংখ্যা উঠিয়াছে লোকসংখ্যার শতকরা ৫২.৫ ভাগে। এই ৫০ বৎসরের মধ্যে প্রথম দশ বৎসরে মুসলমানদের সংখ্যা ঈষৎ হ্রাস হইয়াছিল বটে, কিন্তু তারপর ৪০ বৎসরে তাহদের সংখ্যা দ্রুত বাড়িয়াছে । পক্ষান্তরে হিন্দু ও শিখদের সংখ্যা ঐ ৫০ বৎসরে দ্রুত হ্রাস হইয়াছে ৷



 চিত্র নং ২ - পাঞ্জাব
১৮৮১ সালে তাহাদের সংখ্যা ছিল লোকসংখ্যার শতকরা ৫২.৫ ভাগ, আর ১৯৩১ সালে তাহাদের সংখ্যা নামিয়াছে শতকরা ৪৬ ভাগে। অর্থাৎ ৫০ বৎসরের মধ্যে তাহারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হইতে সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়ে পরিণত হইয়াছে।



 চিত্র নং ৩ - পাঞ্জাব
২নং চিত্রে হিন্দু ও শিখদের লোকসংখ্যা একত্র করিয়া দেখানো হইয়াছে। শিখদের সংখ্যা যদি পৃথকভাবে হিসাব করা যায়, তবে পাঞ্জাবে হিন্দুদের অবস্থা আরও শোচনীয় প্রতীয়মান হইবে। ৩নং চিত্রে শিখদের সংখ্যা পৃথকভাবে দেখানো হইল।
৩নং চিত্রে দেখা যাইবে যে, ১৮৮১ সালে শিখেরা পাঞ্জাবের সমগ্ৰ লোকসংখ্যার শতকরা ৮ ভাগ ছিল, আর ১৯৩১ সালে তাহদের সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে শতকরা ১৪ ভাগে। অর্থাৎ ৫০ বৎসরে তাহাদের সংখ্যা প্ৰায় দ্বিগুণ হইয়াছে। সুতরাং পাঞ্জাবে শিখসম্প্রদায়কে বাদ দিলে, কেবলমাত্র হিন্দুদের সংখ্যা যে শোচনীয়রূপে হ্রাস হইয়াছে, তাহা সহজেই বুঝা যাইতে পারে।
গত ৫০ বৎসরে পাঞ্জাব ও বাঙলায়, হিন্দু ও মুসলমানের লোকসংখ্যার এই হ্রাসবৃদ্ধি তুলনা করিয়া অধ্যাপক রুচিরাম সাহানী প্রশ্ন করিয়াছেন, এই পার্থক্যের কারণ কি ? উভয় সম্প্রদায়ই একই দেশে, একই জলবায়ুতে পাশাপাশি বাস করিতেছে, রাজনৈতিক অবস্থাও উভয়েরই সমান। তৎসত্ত্বেও এরূপ বিপরীত অবস্থা হয় কেন ? স্বভাবতঃই অনুমান করিতে হয়, হিন্দুদের সমাজব্যবস্থা এবং জীবনযাপন প্ৰণালীর মধ্যে এমন কিছু আছে, যাহার ফলে তাহদের লোকসংখ্যার ক্ষয় হইতেছে। পাঞ্জাব বাঙলার মত ম্যালেরিয়াগ্ৰস্ত নহে। সুতরাং পাঞ্জাবের হিন্দুদের দুর্দশ ম্যালেরিয়ার দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না । কিন্তু পাঞ্জাব ও বাঙলায় উভয়ত্ৰই হিন্দুদের সামাজিক অবস্থা, আচার, প্ৰথা, সংস্কার ইত্যাদি প্রায়ই একরূপ। অতএব এই সমস্তের মধ্যেই হিন্দুসমাজের ক্ষয়ব্যাধির কারণ অনুসন্ধান করিতে হইবে।
অধ্যাপক রুচিরাম সাহানীর মতে হিন্দুসমাজের ক্ষয়ব্যাধির কারণগুলি এই :-(১) জাতিভেদ প্ৰথা এবং তজ্জনিত ভেদবুদ্ধি ও সঙ্কীর্ণতা । (২) বাল্যবিবাহ। (৩) হিন্দু সমাজে বিধবাবিবাহের প্রচলন, পক্ষান্তরে মুসলমান সমাজে বিধবা বিবাহে ও বহুবিবাহ প্রথার অপ্রচলন। (৪) হিন্দুরা সহজেই অন্য ধৰ্ম্ম গ্ৰহণ করিতে পারে এবং সেই সব ধৰ্ম্ম সম্প্রদায়ে যথাযোগ্য সম্মান পায়, পক্ষান্তরে অন্যধৰ্ম্মাবলম্বীর পক্ষে হিন্দুধর্মে প্ৰবেশ করা পূর্ব্বে একেবারেই অসম্ভব ছিল, বৰ্তমানে অসম্ভব না হইলেও দুঃসাধ্য। (৫) হিন্দুরা বেশীর ভাগ সহরে বাস করে, আর মুসলমানেরা বেশীর ভাগ গ্রামে মুক্ত বায়ুতে কৃষক জীবন যাপন করে। (৬) হিন্দুৱা প্ৰধানতঃ নিরামিষাশী, আর মুসলমানেরা প্ৰধানতঃ মাংসাশী।
অধ্যাপক রুচিরাম সাহানী মনে করেন যে, এই সমস্ত কারণ সমবায়েই হিন্দুসমাজের লোকসংখ্যার হার ক্রমশঃ হ্রাস হইতেছে। অধ্যাপক সাহানীর কথাগুলি বিশেষভাবে চিন্তা ও আলোচনার যোগ্য । বাঙলাদেশের হিন্দুসমাজের মধ্যেও ঐ সব কারণ বর্ত্তমান আছে এবং তাহাদের সমাজজীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করিতেছে। বাঙলাদেশের বিশেষ অবস্থার মধ্যে আরও কতকগুলি আর্থিক ও সামাজিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হইয়া উহার সমস্যাকে অধিকতর জটিল করিয়া তুলিয়াছে!

• শেষের অঙ্ক ও অনুপাত উপজাতীয় হিন্দুদের ধরিয়া↩

• শেষের অঙ্ক ও অনুপাত উপজাতীয় হিন্দুদের ধরিয়া↩


চলবে ...
গ্রন্থঃ ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু
লেখকঃ প্রফুল্লকুমার সরকার
সংগৃহীতঃ হিন্দুত্ববুক্স হতে ।
বিঃদ্রঃ আরো পোষ্ট পেতে লাইক ও শেয়ার করুন
Share:

বাঙ্গালার হিন্দুসমাজের লোকক্ষয়

বহুজাতিভেদ ও শ্রেণীভেদ, অস্পৃশ্যতা ও অনাচরণীয়ত, বিবাহক্ষেত্রের সঙ্কীর্ণতা ও আন্তর্ব্বিবাহ প্ৰভৃতির জন্য হিন্দুসমাজের সংহতি শক্তি হ্রাস হইয়া উহা যেমন ক্রমেই দুৰ্ব্বল ও আত্মরক্ষায় অক্ষম হইয়া পড়িতেছে, অন্যদিকে প্রধানতঃ এই সব কারণেই হিন্দুসমাজের লোকসংখ্যারও ক্ষয় হইতেছে। বাঙ্গালার হিন্দুসমাজে এই লোকক্ষয়ের লক্ষণ সুস্পষ্ট, এমন কি উহা আশঙ্কার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বাংলাদেশে অনেকেরই হয়ত স্মরণ আছে যে, ১৯১০ সালে লে. কৰ্ণেল উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় “A dying race” নাম দিয়া একখানি ক্ষুদ্র পুস্তিকা প্ৰকাশ করেন। ১৮৮০-১৯০১ এই দুই দশকের আদমসুমারীর বিবরণ হইতে তথ্য সংগ্ৰহ করিয়া তিনি দেখান যে, বাঙলার হিন্দুসমাজের লোকসংখ্যার হার ক্রম হ্রাস হইতেছে, পক্ষান্তরে মুসলমান সমাজের লোকসংখ্যার হার ক্রমশ বাড়িতেছে। উহার অৰ্দ্ধ শতাব্দীর পূর্ব্বেও বাঙলায় যে-হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, অৰ্দ্ধ শতাব্দীর ব্যবধানে তাহারাই সংখ্যালঘিষ্ঠ হইয়া দাড়াইয়াছিল। কেন এরূপ হইল ? লে. কৰ্ণেল মুখোপাধ্যায় তাঁহার পুস্তিকায় উহার কতকগুলি কারণ নিৰ্দ্দেশ করিতেও চেষ্টা করেন। এই পুস্তিকা প্ৰকাশের ফলে শিক্ষিত সমাজে একটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং কয়েকজন চিন্তাশীল পণ্ডিত ব্যক্তি এই সমস্যা লইয়া আলোচনা করিতে থাকেন ।

 কেহ কেহ সমস্যাটাকে তুচ্ছ ও অবাস্তব বলিয়া উড়াইয়া দিতে চেষ্টা করেন ; কিন্তু অনেকেই উহার মূল অনুসন্ধান করিতে প্ৰবৃত্ত হন। তাহার পর হইতে গত ৩০ বৎসরে এ বিষয়ে বহু ব্যক্তি আলোচনা করিয়াছেন এবং স্বীয় বিচারবুদ্ধি অনুসারে এই জটিল সমস্যার কারণ নির্ণয় ও তাহার প্ৰতিকারের পন্থা নির্দেশ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। আমরা নিজেও এ বিষয়ে বিবিধ সাময়িকপত্ৰে প্ৰবন্ধ লিখিয়া আলোচনা করিয়াছি।


লে. কৰ্ণেল মুখোপাধ্যায় তাহার পুস্তিকায় হিন্দুসমাজের লোকসংখ্যার ক্ষয়ের কারণ নির্ণয় করিতে যাইয়া প্ৰধানত হিন্দুর সামাজিক ব্যবস্থা, তাহাদের বৃত্তি, খাদ্যব্যবস্থা ইত্যাদির উপরেই জোর দিয়াছিলেন। কলিকাতা হাইকোর্টের খ্যাতনামা আইনজীবী প্ৰগাঢ় পণ্ডিত স্বৰ্গীয় কিশোরীলাল সরকার মহাশয় উহার প্রতিবাদ স্বরূপ “Dying race-how dying” নামক যে গ্ৰন্থ লিখেন, তাহাতে তিনি দেখাইতে চেষ্টা করেন, হিন্দুসমাজ ব্যবস্থার দোষ নাই, ম্যালেরিয়া ও দারিদ্র্যই বাঙলার হিন্দুর সংখ্যা হ্রাসের প্রধান কারণ। তিনি বলেন যে, পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গেই প্ৰধানত হিন্দুদের বাস এবং পূর্ব্ব ও উত্তরবঙ্গে প্ৰধানত মুসলমানদের বাস। আর যেহেতু পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গের গ্রামগুলি ম্যালেরিয়ার প্রকোপে ধ্বংস হইতেছে, সেই কারণে সমগ্র বঙ্গে হিন্দুর সংখ্যা কমিতেছে। পক্ষান্তরে পূর্ব্ব ও উত্তর-বঙ্গে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ অপেক্ষাকৃত সামান্য, সুতরাং মুসলমানের সংখ্যা বাঙ্গলা দেশে বাড়িতেছে।


স্বৰ্গীয় সরকার মহাশয়ের সিদ্ধান্তে যে কিছু সত্য আছে তাহা অস্বীকার করা যায় না । কিন্তু উহা সৰ্ব্বাংশে সত্য নহে । বাঙ্গলা দেশ নদীমাতৃক-বাঙ্গলার হিন্দুসভ্যতা উত্তর ভারতের সভ্যতার মতই গাঙ্গেয় সভ্যতা। আর প্রাচীন কাল হইতে প্ৰধানতঃ পশ্চিম, মধ্য ও উত্তর বঙ্গই হিন্দুদের আবাসভূমি এবং হিন্দু সভ্যতার পীঠস্থান ছিল। বড় বড় হিন্দু রাজ্য এই সব অঞ্চলেই স্থাপিত হইয়াছিল। যাহাকে আমরা পূর্ব্ববঙ্গ বলি তাহা অপেক্ষাকৃত নূতন অঞ্চল। নিদারুণ দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রাকৃতিক বিপর্য্যয়ে পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গ এবং কতকাংশে; উত্তরবঙ্গ আজি ম্যালেরিয়াগ্ৰস্ত ও অস্বাস্থ্যকর হইয়া লোকবসতির অযোগ্য হইয়া উঠিয়াছে। নদীমাতৃক বাঙ্গলাদেশের নদীর গতিপরিবর্ত্তন এবং ভাগীরথী ও তাহার শাখা প্রশাখাগুলি হাজিয়া মজিয়া যাওয়াতেই এই বিপৰ্যয়ের সৃষ্টি হইয়াছে। বলিতে গেলে অষ্টাদশ শতাব্দী হইতে পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গের মধ্য দিয়া প্ৰবাহিত নদীগুলির এই শোচনীয় অবস্থা হইয়াছে ।

তাহার ফলেই পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গে ম্যালেরিয়ার আবির্ভাব। মানুষ চেষ্টা করিলে বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিবলে নানা উপায় প্রয়োগ করিয়া এই নদীগুলিকে রক্ষা করিতে পারিত । তাহা তো তাহার করেই নাই, উপরন্তু রেলওয়ে বাঁধ, সেতু, রাস্তা প্রভৃতি নির্ব্বোধের মত নিৰ্ম্মাণ করিয়া নদী নালা ও স্বাভাবিক জলনিকাশের পথগুলির আরও সর্ব্বনাশ করিয়াছে । তাহার ফলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ আরও দশগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে। ম্যালেরিয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসিয়াছে কৃষির অবনতি ও দারিদ্র্য । ডা. বেণ্টলী বহু পূর্ব্বেই চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিয়া গিয়াছেন যে ম্যালেরিয়া, কৃষির অবনতি ও দারিদ্র্য এই তিনটীর সঙ্গে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ॥ 1 পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গে আজ এই তিনটীরই যোগাযোগ ঘটিয়াছে । আর তাহার সমষ্টিফল স্বরূপ বাঙ্গলার এই অঞ্চল ধ্বংসের পথে অগ্রসর হইতেছে।

 যাহা ছিল এককালে বাঙ্গালার সমৃদ্ধিশালী এবং জনবহুল অঞ্চল, তাহাই এখন লোকশূন্য অরণ্য ও জলাভূমিতে পরিণত হইতে চলিয়াছে। মুর্শিদাবাদ হইতে আরম্ভ করিয়া কলিকাতা পৰ্য্যন্ত ভাগীরথীর দুই তীরে ঘে সব বড় বড় গ্রাম ছিল, সেগুলি আজ ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। যেহেতু এই পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গই ছিল হিন্দু প্ৰধান, সেই কারণে এই দুই অঞ্চলের লোকক্ষয় বাঙ্গলার হিন্দু জনসংখ্যার উপর সমগ্রভাবে অনিষ্টকর প্রভাব বিস্তার করিতেছে। অবস্থা যেরূপ দাঁড়াইতেছে, তাহাতে শীঘ্রই বৈজ্ঞানিক উপায়ে নদীসংস্কার ও জলসেচের দ্বারা প্ৰতিকারের ব্যবস্থা করিতে না পারিলে অদূর ভবিষ্যতে পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গ শ্মশানে পরিণত হইবে । প্ৰাকৃতিক বিপৰ্য্যয়ের ফলে বহু উন্নত লোকসমাজ ও তাহার সভ্যতা বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। সময় থাকিতে উপযুক্ত প্ৰতিকারের ব্যবস্থা না করিলে পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গেরও সেই দশা হইবে । সঙ্গে সঙ্গে সমগ্রভাবে বাঙলার সভ্যতা ও সংস্কৃতিও লোপ পাইবে ।
পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গের লোকসমাজের ক্ষয় কিরূপ দ্রুত হইতেছে, তাহা নিম্নের তালিকা হইতে দেখা যাইবে:-
(১৯০১ -১৯৩১ )
                                                    বর্দ্ধমান     নদীয়া    মুর্শিদাবাদ   যশোর    হুগলী
কর্ষিত ভূমির হ্রাস( শতকরা )              ৪০           ৭            ১৪           ৩১        ৪৫
ম্যালেরিয়ার প্রকোপ                           ৫০.৪      ৫৭.৫      ৪১.৭          ৪৮.২    ৪৬.৬
লোকসংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধি                       +৩.৭      -৮.১      +২২.৯        -৭.২     +৬.২

ইহার সঙ্গে পূর্ব্ববঙ্গের কয়েকটী জেলার তুলনা করা যাক ;- দেখা যাইবে এখানে কৰ্ষিতভূমি ও লোকসংখ্যা কিরূপ দ্রুত বাড়িতেছে :-
(১৯০১-১৯৩১)
                                           ঢাকা       মৈমনসিংহ      ফরিদপুর
কৰ্ষিতভূমির হ্রাসবৃদ্ধি            +৫৭             +১৯           +১৩
ম্যালেরিয়ার প্রকোপ               ৯.৭             ১১.১০         ২৬.৬
লোকসংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধি          +২৮.৯         +২৮.৫        +২১.৮

* * * *
কিন্তু মোটের উপর পূর্ব্ববঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের তুলনায় ম্যালেরিয়াগ্ৰস্ত পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গের লোকসংখ্যা হ্রাস ও কৃষির অবনতি ঘটিলেও, কি ম্যালেরিয়াপ্রধান পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গে, কি ম্যালেরিয়ামুক্ত পূর্ব ও উত্তর বঙ্গে সর্ব্বত্রই মুসলমানের তুলনায় হিন্দুর জনসংখ্যাহার ক্রমশ হ্রাস হইতেছে। প্ৰত্যেক জেলার লোকসংখ্যা লইয়া তুলনামূলক আলোচনা করিলেও ঐরূপ শোচনীয় অবস্থাই দেখা যাইবে । আমরা প্ৰত্যক্ষভাবে বাঙলার অনেক গ্রামের কথা জানি। সেখানে হিন্দু ও মুসলমান একই গ্রামে একই জলবায়ুর মধ্যে পাশাপাশি বহুকাল হইতে বাস করিয়া আসিতেছে, অথচ হিন্দুর সংখ্যা কমিতেছে, আর মুসলমানের সংখ্যা বাড়িতেছে। ইহার কারণ কি ? কেবল প্রাকৃতিক বিপৰ্য্যয় ও ম্যালেরিয়ার দ্বারা ইহার ব্যাখ্যা করা যায় না। স্বাভাবিক ভাবেই মনে হয় উভয় সম্প্রদায়ের ধৰ্ম্ম ও সমাজব্যবস্থা, জীবনযাপন প্ৰণালী, আহারব্যবচার ইত্যাদির মধ্যে এমন কোন পার্থক্য আছে, যাহার ফলে এই বিপরীত অবস্থা ঘাঁটিতেছে৷
ম্যালেরিয়ামুক্ত পূর্ব্ববঙ্গে তথা ম্যালেরিয়াগ্ৰস্ত পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গে সৰ্ব্বত্রই মুসলমানের তুলনায় হিন্দুর জনসংখ্যার তার কিরূপ হ্রাস হইতেছে তাহ নিম্নলিখিত তালিকা কয়েকটা হইতে সুস্পষ্টরূপে বুঝা যায়। দেখা যায়, স্বাস্থ্যকর পূর্ব্ববঙ্গে যেমন, অস্বাস্থ্যকর মধ্য ও পশ্চিমবঙ্গেও তেমনই হিন্দুরা ক্রমেই জীবনযুদ্ধে হটিয়া যাইতেছে :-

পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গ-হিন্দু ( প্ৰতি হাজার )ঃ
 
                       বর্ধমান        মুর্শিদাবাদ     নদীয়া
১৮৯১              ৮০৩           ৪৯৬           ৪১৯
১৯০১               ৭৯৭            ৪৮৩           ৪০৬
১৯১১               ৭৯৩           ৪৬৯           ৩৯৭
১৯২১               ৭৮০           ৪৫০            ৩৯১
১৯৩১              ৭৮৬           ৪৩০          ৩৭৫

পূর্ব্ববঙ্গ — হিন্দু (প্রতি হাজার )ঃ

                     বাখরগঞ্জ       ফরিদপুর        ঢাকা
১৮৯১             ৩১৬             ৩৭৮         ৩৮৬
১৯০১              ৩১১              ৩৭৯          ৩৭৩
১৯১১              ২৯৬             ৩৬৫         ৩৫৫
১৯২১              ২৮৭             ৩৬২          ৩৪২
১৯৩১             ২৭৬             ৩৫৯          ৩২৭

১৮৮১-১৯৩১ ( পঞ্চাশ বৎসরে )  হিন্দু মুসলমানের তুলনায় শতকরা বৃদ্ধিঃ


                              হিন্দু                     মুসলমান
পশ্চিমবঙ্গ                ১৫.৪                      ২৭.৭
মধ্যবঙ্গ                   ২৬.৭                      ২৭.৪
উত্তরবঙ্গ                 ১৩.১                      ২৭.১
পূর্ব্ববঙ্গ                 ৩৮.৯                      ৮৭.৫
সমগ্রবঙ্গ                ২২.৯                        ৫১.২

• Dr. Bentley, Malaria and Agriculture↩

চলবে ...
গ্রন্থঃ ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু
লেখকঃ প্রফুল্লকুমার সরকার
সংগৃহীতঃ হিন্দুত্ববুক্স হতে ।
বিঃদ্রঃ আরো পোষ্ট পেতে লাইক ও শেয়ার করুন


Share:

বিবাহ সমস্যার জটিলতা

বহু জাতি উপজাতি ও শাখা প্রশাখায় বিভক্ত হিন্দুসমাজ যে কেবল দুর্ব্বল ও সংহতিশক্তিহীন হইয়া পড়িয়াছে, তাহা নহে, উহার ফলে বিবাহসমস্যা এই সমাজে অত্যন্ত জটিল হইয়া উঠিয়াছে। বৰ্ত্তমান সমাজব্যবস্থার মূল ভিত্তি বিবাহ, সুতরাং এই প্রথার উপরে সমাজের উন্নতি বা অবনতি যে বহুল পরিমাণে নির্ভর করে, তাহা বলা বাহুল্য মাত্র। হিন্দুসমাজে বহু জাতি উপজাতি শ্রেণী শাখা প্ৰশাখার সৃষ্টি হওয়ার ফলে বিবাহের ক্ষেত্র ক্রমশ সঙ্কীর্ণ হইতে সঙ্কীর্ণতর হইয়া আসিয়াছে। এই সঙ্কীর্ণ পরিধির মধ্যে বিবাহযোগ্য পাত্র ও পাত্রী পাওয়াই অনেক সময় দুর্ঘট। অনেক স্থলে পাত্র ও পাত্রীর মধ্যে রক্তের সম্বন্ধ এমন ঘনিষ্ঠ হয় যে, বিবাহের ফল কখন ভাল হইতে পারে না,- বংশানুক্রমের নিয়ম (Law of heredity) অনুসারে জাতির উৎকর্ষ সাধিত হইতে পারে না। সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে পৃথক দুইটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জাতির (Race) মধ্যে বিবাহ যেমন বাঞ্জনীয় নহে, তেমনি যাহাদের মধ্যে রক্তের সম্বন্ধ নিকটতম তাহাদের মধ্যে বিবাহও প্ৰশস্ত নহে।

জাতিভেদের আদর্শ অনুসরণ করিয়া বিবাহ ব্যাপারে হিন্দুসমাজ কোথায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহার মোটামুটি একটা হিসাব করা যাক। ডা. ভগবান দাস বলেন যে, সমগ্ৰ ভারতের হিন্দুসমাজের জাতি উপজাতি শ্রেণী শাখা প্ৰশাখা প্ৰভৃতি বিচার করিলে প্ৰায় তিন হাজার বিভাগ হইয়া দাঁড়ায়। কেবলমাত্র বাঙলাদেশের হিন্দুসমাজের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেও ডা. ভগবান দাসের মন্তব্য অত্যুক্তি বা অতিরঞ্জিত বলিয়া মনে হইবে না। বাঙলার হিন্দু সমাজ “ছত্ৰিশ জাতিতে বিভক্ত” এইরূপ একটা চলতি কথা আছে। প্রকৃতপক্ষে জাতির সংখ্যা তাহা অপেক্ষা অনেক বেশী, বোধ হয়। কয়েক শতের কম হইবে না। কেন না সম্ভব অসম্ভব সমস্ত রকম বিভিন্ন বৃত্তিকে অবলম্বন করিয়া এক একটা স্বতন্ত্র জাতি গড়িয়া উঠিয়াছে। যে সমস্ত আদিম জাতি ও পাহাড়িয়া জাতিরা হিন্দু সমাজের মধ্যে আসিয়া প্ৰবেশ করিয়াছে, তাহারাও এক একটা স্বতন্ত্র জাতি হইয়াছে। এই “কয়েক শত জাতির” মধ্যে আবার উপজাতি, শ্রেণী, শাখা, প্ৰশাখা আছে। তাহাদের পরস্পরের মধ্যেও বিবাহ হয় না। ব্ৰাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য প্ৰভৃতি উচ্চজাতিদের কথা দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যাইতে পারে। বাঙ্গলার ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে রাঢ়ী, বারেন্দ্ৰ, বৈদিক, সপ্তশতী বা সারস্বত, শাকদ্বীপী-এই কয়েকটি প্রধান বিভাগ আছে।

বাগাড়ী ব্ৰাহ্মণ নামেও এক শ্রেণীর ব্ৰাহ্মণ আছে, কিন্তু ইহারা বৰ্ত্তমানে রাঢ়ীয় ব্ৰাহ্মণদের অন্যতম শাখা বলিয়া গণ্য। প্ৰাচীন বাঙলায় রাঢ়, বরেন্দ্ৰ, বাগড়ী, বঙ্গ, মিথিলা-এই কয়েকটি বিভাগ ছিল। রাঢ়ী, বারেন্দ্র, বাগড়ী প্রভৃতি ব্ৰাহ্মণদের নাম এই সমস্ত বিভাগ হইতেই হইয়াছে। এইসব প্ৰধান বিভাগ ছাড়া বর্ণ ব্ৰাহ্মণ, ভাট ব্ৰাহ্মণ, অগ্ৰদানী ব্ৰাহ্মণ প্ৰভৃতিও আছে। ইহাদের প্ৰত্যেকের মধ্যে আবার শ্রেণীভেদ ও শাখা প্ৰশাখা ভেদ আছে। যথা- রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের মধ্যে কুলীন, বংশজ, শ্রোত্ৰিয় প্রভৃতি ভেদ আছে। বারেন্দ্ৰ ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে কৌলীন্য প্ৰথা তো আছেই, তাহা ছাড়া নয়টি পটী আছে।1 বৈদিক ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে পাশ্চাত্য বৈদিক ও দাক্ষিণাত্য বৈদিক এই দুই শাখা আছে। শাকদ্বীপী ব্রাহ্মণ বা গ্রহবিপ্ৰদের মধ্যেও দুইটি শাখা-রাঢ়ীয় ও নদীয়া বঙ্গসমাজ আছে। এই নদীয়া বঙ্গসমাজেরই একটি শাখা বারেন্দ্ৰ সমাজ। শাকদ্বীপী ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে কৌলীন্য প্ৰথাও আছে।


কায়স্থদের মধ্যে উত্তর রাঢ়ী, দক্ষিণ রাঢ়ী, বারেন্দ্র ও বঙ্গজ এই ৪টি প্ৰধান শ্রেণী আছে। বলা বাহুল্য, ব্ৰাহ্মণদের ন্যায় কায়স্থদের প্রত্যেক শ্রেণীর মধ্যে আবার কুলীন, মৌলিক প্রভৃতি ভেদ আছে। বৈদ্য জাতির মধ্যেও রাঢ়ী ও বারেন্দ্ৰ শ্রেণীবিভাগ আছে।


ব্ৰাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্যদের এই সমস্ত বিভিন্ন শ্রেণী ও শাখা প্ৰশাখার ভিতর পরস্পর বিবাহ হয় না। যথা— রাঢ়ী ও বারেন্দ্ৰ ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে বিবাহ হয় না, সপ্তসতী বা শাকদ্বীপী ব্ৰাহ্মণদের সঙ্গেও রাঢ়ী বা বারেন্দ্ৰ ব্ৰাহ্মণদের বিবাহ হয় না। কায়স্থ ও বৈদ্যের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যেও বিবাহ চলে না। আজকাল বিভিন্ন শ্রেণীর কায়স্থদের পরস্পরের মধ্যে ২৪টা বিবাহ হইতেছে বটে, কিন্তু উহার সংখ্যা নগণ্য, কায়স্থ সমাজে তাহা ‘শিষ্ট বিবাহ’ বলিয়া এখনও প্ৰসন্ন মনে গৃহীত হয় না। রাঢ়ী ও বারেন্দ্ৰ ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে বিবাহ হয় না বলিলেই ঠিক হয়। ইদানীং যে ২/১টি বিবাহ হইয়াছে, তাহা ঐ দুই সমাজে শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত হয় নাই। আমি জানি, কোন রাঢ়ী ব্রাহ্মণের পুত্ৰ বারেন্দ্ৰ কন্যাকে বিবাহ করাতে পিতা মনের ক্ষোভে গৃহত্যাগ করেন।



ব্ৰাহ্মণ ও কায়স্থ এই উভয় জাতির মধ্যেই কৌলীন্য প্রথা বিবাহের জটিলতা আরও বৃদ্ধি, এবং নানাদিক দিয়া সমাজের ঘোর অনিষ্ট করিয়াছে। কৌলীন্যের অনিষ্টকর প্রভাব সৰ্ব্বাপেক্ষা বেশী দেখা যায় রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ ও কায়স্থদের মধ্যে। কৌলীন্য প্রথা রাঢ়ীয় ব্ৰাহ্মণ সমাজে কিরূপ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভেদ সৃষ্টি করিয়াছে এবং উহার ফলে বিবাহ সমস্যা অসম্ভব রকম জটিল হইয়া উঠিয়াছে, তাহা প্ৰসিদ্ধ ঐতিহাসিক ডা. রমেশচন্দ্র মজুমদার তাহার একটি প্ৰবন্ধে সংক্ষেপে বর্ণনা করিয়াছেন:

“বল্লাল সেনের কৌলীন্য প্ৰথা ব্যক্তিগত গুণের উৎকর্ষের উপর প্ৰতিষ্ঠিত, বংশানুক্রমিক ছিল না। . . . বল্লাল সেনের পরে দুইটা বিষয়ে নিয়ম প্ৰণালী বিধিবদ্ধ হইয়া কৌলীন্য প্রথাটিকে জটিল করিয়া তুলিল। লক্ষ্মণ সেন নিয়ম করিলেন যে, কুলীন কন্যা যে ঘরে প্রদত্ত হইবে, আবার সেই ঘর হইতে কন্যা গ্ৰহণ করিতে হইবে। ইহার নাম বংশ পরিবর্ত্তন। দ্বিতীয়তঃ, কুলীনদের মধ্যে কে কিরূপ উচ্চনীচ কুলে আদানপ্ৰদান করিয়াছে তাহা নির্ণয় করিয়া কুলীনদের পদমৰ্য্যাদার সমতা স্থির করা হইবে। ইহার নাম সমীকরণ। রাঢ়ীয় ব্ৰাহ্মণ সমাজে ইহার প্রচলন হয়, বারেন্দ্ৰ সমাজে এই ব্যবস্থা গৃহীত হয় নাই। প্রথম সমীকরণে সাতজন কুলীন সমান বলিয়া গণ্য হইলেন। দ্বিতীয় সমীকরণে চৌদ্দজন সমান বলিয়া গণ্য হইলেন। ইহারাই কুলীনদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলিয়া গণ্য হইলেন। এতদ্ব্যতীত লক্ষ্মণ সেনের সময়েই জটিল দার্শনিক তত্ত্বের দ্বারা কৌলীন্যের ব্যাখ্যা হয় এবং সূক্ষ্ম ন্যায়ের তর্ক ‘দ্বারা কৌলীন্যের উৎকর্ষ স্থির করার ব্যবস্থা প্ৰবৰ্ত্তিত হয়।” 2


লক্ষণ সেনের কয়েক শত বৎসর পরে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে দেবীবর ঘটক “মেলবন্ধন” করিয়া কৌলীন্য প্রথাকে জটিলতম করিয়া তুলিলেন। ডা. রমেশচন্দ্র মজুমদারের প্রবন্ধ হইতে পুনরায় আমরা উদ্ধত করিতেছিঃ—
“দেবীবর দেখিলেন সকল কুলীনই অল্পবিস্তর দোষাশ্রিত। যাহাঁদের বেশী দোষ ছিল অথবা যাঁহারা তাঁহার বিরুদ্ধ পক্ষ ছিলেন, দেবীবর তাহাদিগকে নিষ্কুলীন করিলেন। তাঁহারা দেবীবরের ছাঁটা ‘বংশজ’ বলিয়া গণ্য হইলেন। অল্প দোষাশ্ৰিত অন্য কুলীনগণকে দেবীবর ছত্রিশভাগে অথবা মেলে বিভক্ত করিলেন। মহারাজ বল্লাল সেন গুণ অনুসারে কৌলীন্য মৰ্য্যাদা দিয়াছিলেন, আর দেবীদ্বরের বিধানে যে দোষী, তিনি প্ৰধান কুলীন বলিয়া গণ্য হইলেন। এক এক প্রকার দোষে দুষ্ট কুলীনদিগকে লইয়া এক এক ‘মেল’ সৃষ্ট হইল। দেবীবর প্রতি মেলে দুই দুইজনকে প্ৰধান বলিয়া স্বীকার করিলেন। যাঁহার হইতে মেলের উৎপত্তি তিনি “প্ৰকৃতি’ এবং তাঁহার সহিত কুল করিয়া যিনি সমমৰ্য্যাদাসম্পন্ন হইলেন, তিনি ‘পালটি’। দেবীবর নিয়ম করেন, প্ৰত্যেক মেলের মধ্যে যে যাহার প্রকৃতি, যে যাহার ‘পালটি’—তাঁহাদেরই মধ্যে পরস্পর আদান-প্ৰদান বা কুলকাৰ্য্য চলিতে পরিবে। তাহার বাহিরে কেহ কুলকাৰ্য্য করিতে পরিবে না, করিলে কুল নষ্ট হইবে।”3


বলা বাহুল্য, এই অদ্ভুত, অস্বাভাবিক, মূঢ় ব্যবস্থার ফলে কুলীন ব্রাহ্মণ সমাজে বহুবিবাহ প্ৰবেশ করিল। অনেক সময়ে বহুবিবাহেও কুলাইত না, কন্যারা অবিবাহিত জীবন যাপন করিতে বাধ্য হইত। ইচ্ছার ফলে যে ঘোর দুনীতি ও অনাচার ব্ৰাহ্মণ সমাজে প্রবেশ করিল, কয়েক শতাব্দী ধরিয়া বাঙালী জাতি তাহার ফল ভোগ করিয়াছে এবং এখনও করিতেছে। এক একজন কুলীন ব্রাহ্মণ ৫০/৬০ হইতে ১০০। ১৫০টি পৰ্যন্ত বিবাহ করিতেন। তাহাও আবার বহু অর্থ দিয়া এই সব কুলীন জামাইকে সংগ্ৰহ করিতে হইত। বিবাহের পরও কন্যারা অনূঢ়ার মত পিতৃগৃহেই থাকিয়া যাইত। কৌলীন্যের ফলে অনাচার ও ব্যভিচার সমাজে কি ভাবে প্ৰবেশ করিয়াছিল, পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্ন তৎকৃত ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নাটকে তাহার জ্বলন্ত চিত্র অঙ্কিত করিয়া সমাজকে কষাঘাত করিয়াছেন। ইদানীং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “বামুনের মেয়ে” উপন্যাসেও কৌলীন্য প্রথার শোচনীয় পরিণতি আর একদিক দিয়া দেখানো হইয়াছে। প্রধানত পুণ্যশ্লোক ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের চেষ্টায়। এই ‘বহুবিবাহ প্রথার’ প্ৰাবল্য হ্রাস পায়। 4
কুলীনদের মধ্যে কন্যার বিবাহ দেওয়া যেমন দুঃসাধ্য, “বংশজ”দের মধ্যে তেমনি আবার ছেলের বিবাহ দেওয়া দুঃসাধ্য। ইহাদিগকে কন্যা সংগ্রহের জন্যই ‘পণ’ দিতে হয়। ফলে অনেক বংশজ ব্ৰাহ্মণ বিবাহ করিতে পারে না, হয়ত বৃদ্ধ বয়সে শেষ পৰ্য্যন্ত একটি বালিকার পাণিগ্রহণ করিতে বাধ্য হয়। আবার কন্যা বিক্রয় করিয়া মূল্য পাইবার লোভে প্ৰতারকেরা বহু অ-ব্রাহ্মণের কন্যাকেও ব্রাহ্মণকন্যা পরিচয় দিয়া বিবাহ দেয়। পূর্ব্বে এরূপ ঘটনা বহু ঘটিত, বৰ্ত্তমানকালে উহার সংখ্যা হ্রাস হইয়াছে।


এক শতাব্দী পূর্ব্বে এ বিষয়ে হিন্দুসমাজের অবস্থা কিরূপ ছিল, তাহা ১৮৩৭ সালের ১৭ই জুন তারিখের “সমাচার দর্পণ” সংবাদপত্রে উদ্ধৃত নিম্নলিখিত পত্ৰ হইতে পাওয়া যায়ঃ-
“সম্পাদক মহাশয়, এ দেশের কুলীন বংশজ ব্রাহ্মণেরাই জাতি লোপ করিয়াছেন। তাহার কারণ আমি বিশেষ করিয়া বলি আপনি বিবেচনা করিবেন। বংশজ ব্ৰাহ্মণেরা কন্যা ক্ৰয় করিয়া বিবাহ করেন, কিন্তু তাহাতে অনেক জাতির কন্যা চলিয়া যায়। অধিক কি কহিব, কন্যা ক্রয় করিয়া বিবাহকরণ ব্যবহার থাকাতে বংশজ ব্ৰাহ্মণ মোসলমানের কন্যা পৰ্যন্তও বিবাহ করিয়াছেন, আমি ইহার একক প্ৰমাণ লিখিতেছি। (ইহার পর বর্দ্ধামানের একটি ঘটনার উল্লেখ আছে।) ভাটপাড়াতেও এক ব্ৰাহ্মণ ক্রীতকন্যা বিবাহ করেন এবং বস্তু কাল সহবাস করিয়া শেষে জানিলেন, পোদ জাতীয় বৈষ্ণবের কন্যা গ্ৰহণ করিয়াছেন। এতদ্ভিন্ন কলিকাতা সহরের মধ্যে এরূপ স্ত্রী অনেক আছে আমি সাহসপূর্বক বলিতে পারি, ভারিভারি পণ্ডিত ন্যায়রত্বের ও প্রধান প্রধান বাঁড়ুয্যের ঘরে যে, তাঁহাদিগের পুত্ৰ-পৌত্ৰাদির গৃহিণী সকল আছেন, তাহাদিগের অনেকেই ধোপা, নাপিত, বৈষ্ণব, মালি, কামার, কাপালিক কন্যা, কিন্তু সম্পত্তিশালী ব্ৰাহ্মণের ঘরে পড়িয়া পবিত্ৰ ব্ৰাহ্মণী হইয়া গিয়াছেন, এখন তাঁহাদিগের পাকান্ন সকলেই পবিত্ৰ জ্ঞান করেন। 5


“ভরার মেয়ে” কথাটি কেহ কেহ হয়ত শুনিয়া থাকিবেন। কিন্তু ইহার মধ্যে হিন্দুসমাজের কৌলীন্য প্রথার কি শোচনীয় ক্ষত লুক্কায়িত আছে, তাহা হয়ত অনেকে জানেন না। পশ্চিম বঙ্গে যেমন, পূর্ব্ববঙ্গেও তেমনই এই কৌলীন্যের ফলে বংশজ ব্ৰাহ্মণের কন্যার অভাবে বিবাহ করিতে পারিতেন না ইহা পূৰ্বেই বলিয়াছি। ইহার ফলে ‘কন্যা ব্যবসায়ী’ এক দল লোকের সৃষ্টি হইয়াছিল। তাহারা অন্যান্য স্থান হইতে কন্যা সংগ্ৰহ করিয়া আনিয়া ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল প্ৰভৃতি অঞ্চলে বিবাহার্থী বংশজ ব্ৰাহ্মণদের নিকট বিক্রয় করিত। এইসব মেয়ে প্রায়ই নিম্নজাতীয়া হইত, কিন্তু বিবাহাৰ্থ ব্ৰাহ্মণেরা নির্ব্বিচারে তাহাদিগকে ক্রয় করিয়া বিবাহ করিতেন। “ভরা” বা নৌকাতে করিয়া কন্যা ব্যবসায়িগণ এইসব মেয়েকে বিক্রয়ার্থ আনিত বলিয়া লোকে চলতি কথায় ইহাদিগকে “ভরার মেয়ে’ বলিত। যে”রক্তের বিশুদ্ধতা” রক্ষার জন্য কৌলীন্য প্রথার সৃষ্টি-সেই ‘রক্তের বিশুদ্ধতা’ রক্ষা এইভাবেই হইত! কৌলীন্য প্রথার কৃপায় ব্রাহ্মণ সমাজে কত যে নিম্ন বর্ণের রক্ত মিশিয়া গিয়াছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। “কুলীনের ছেলে।” সেকালে একটা গালি বলিয়া গণ্য হইত।
বারেন্দ্ৰ ব্ৰাহ্মণ, রাঢ়ীয় কায়স্থ সমাজ প্রভৃতিতেও কৌলীন্য প্রথা ঘোর অনিষ্ট করিয়াছে। বারেন্দ্ৰ ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে ‘করণ’ প্রথার নাম কেহ কেহ হয়ত শুনিয়াছেন। প্রথাটি বড়ই অদ্ভুত।

উপযুক্ত কুলীন পাত্র না পাওয়া গেলেও মেয়েকে যোগ্য অকুলীন পাত্রে যদি কেহ দান করেন, তবে তাহাকে এই ‘করণ’ প্রথার আশ্রয় লইতে হয়। প্ৰথমে একটি ‘কুশপুত্তলিকা’রূপী কুলীন বরের সঙ্গে কন্যাকে বিবাহ দিতে হয়, তারপর ঐ ‘কুশপুত্তলিকা’ দাই করিয়া আসল ‘অকুলীন’ বরের সঙ্গে মেয়ের বিবাহ দেওয়া হয়। কৌলীন্য প্রথার ইহা যে কত বড় হাস্যকর পরিণতি, তাহা সহজেই বুঝা যায়। “মনকে চোখ ঠারিতে” গিয়া লোকে যে প্রকৃতপক্ষে ‘বিধবা কন্যার বিবাহ দিত ইহা ভাবিত না। বারেন্দ্ৰ ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে যেমন “করণ’ প্ৰথা, দক্ষিণ রাঢ়ী কায়স্থ সমাজে তেমনই “আদ্যিরস” । ইহা “করণ’ প্রথার তুলনায় অত্যন্ত নিষ্ঠুর। মৌলিক গোষ্ঠীপতি কায়স্থ তাঁহার কন্যাকে কোন মুখ্য কুলীনের ছেলের সঙ্গে বিবাহ দিবার পূর্ব্বে, প্রথমে ঐ কুলীন ছেলেকে একটি কুলীনের মেয়ের সঙ্গে বিবাহ দেওয়াইতেন । ইহাতে ছেলের “কুলরক্ষা” হইত। তারপর ঐ ছেলেকে গোষ্ঠীপতি মৌলিক নিজের মেয়ের সঙ্গে বিবাহ দিতেন। ইহাকেই বলে “আদিরস”। বলা বাহুল্য, এরূপ বিবাহে প্রথমোক্ত কুলীনের মেয়েটি প্রায়ই পরিত্যক্তা থাকিত এবং দ্বিতীয় স্ত্ৰী গোষ্ঠীপতি মৌলিকের কন্যাকে লইয়াই স্বামী বাস করিত। দীনবন্ধু মিত্রের “জামাইবারিক” ব্যঙ্গনাট্যে রাঢ়ী কায়স্থ সমাজে কৌলীন্যের এই সব অনাচার সম্বন্ধে শ্লেষাত্মক চিত্ৰ আছে।
কৌলীন্য প্রথা এবং তাহার আনুষঙ্গিক রীতিনীতি হিন্দুসমাজের উচ্চ জাতিদের মধ্যে যে কিভাবে বিবাহসঙ্কটের সৃষ্টি করিয়াছে, তাহার সামান্য কিছু পরিচয়ই আমরা দিলাম।

• [^06] দ্রষ্টব্য↩

• কৌলীন্য প্রথা—‘ভারতবর্ষ’।↩

• দেবীবর ঘটকের এই প্ৰচেষ্টার মধ্যে একটা হয়ত উদার উদ্দেশ্য ছিল। যে ব্ৰাহ্মণদের বংশে “পাঠান দোষ” ও “মোগল দোষ” (ব্যাখ্যা অনাবশ্যক) ঘটিয়াছিল, সম্ভবতঃ তাহাদিগকে সমাজের মধ্যে স্থান দিবার জন্য তিনি “দোষের” উপর ভিক্তি করিয়া মেলবন্ধন করিয়াছিলেন।—লেখক↩

• পূর্ব্ববঙ্গে রাসবিহারী মুখোপাধ্যায় বহু বিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন করেন। তিনি গ্রামে গ্রামে গান গাহিয়া বেড়াইয়া বহু বিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে প্রচারকাৰ্য্য করিতেন। তিনি নিজে কুলীন ব্ৰাহ্মণ ছিলেন এবং বহুবিবাহ করিয়া উহার কুফল ভোগ করিয়াছিলেন।—লেখক↩

• শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় । “ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বাঙালী সমাজের সমস্যা”-সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, ৩য় সংখ্যা, ১৩৪৬↩

চলবে ...
গ্রন্থঃ ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু
লেখকঃ প্রফুল্লকুমার সরকার
সংগৃহীতঃ হিন্দুত্ববুক্স হতে ।
বিঃদ্রঃ আরো পোষ্ট পেতে লাইক ও শেয়ার করুন

Share:

অস্পৃশ্যতার অভিশাপ


বহুজাতিভেদ যে হিন্দুসমাজের দৌর্ব্বল্য ও সঙ্ঘবদ্ধহীনতার প্রধান কারণ, নিতান্ত অন্ধ ভিন্ন একথা কেহই অস্বীকার করিতে পারে না। মুসলমান সমাজে বংশগত জাতিভেদ নাই,-ইসলামের দৃষ্টিতে সব মুসলমানই সমান। তাহারা সকলেই এক সঙ্গে মসজিদে নামাজ পড়িতে পারে, একসঙ্গে আহার-ব্যবহার করিতে পারে,- এমন কি বিবাহের আদান-প্ৰদানেও কোন বংশগত দুরতিক্রমণীয় বাধা নাই। প্রত্যেক মুসলমানই জানে যে, সে যতই দরিদ্র হোক, বিশাল মুসলমান সমাজেরই একজন। সে বিপন্ন হইয়া হাঁক দিলে আর দশজন মুসলমান ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে সাহায্য করিবে। এমন কি, সে যদি কোন অন্যায় কাৰ্য্যও করে, তাহা হইলেও তাহাকে সমাজের পক্ষ হইতে রক্ষা করিবার জন্য সঙ্ঘবদ্ধ প্ৰচেষ্টা হইবে। মুসলমান সমাজের এই বৈশিষ্ট্য তাহার একটা প্ৰচণ্ড শক্তি। সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় যাহাকে Herd instinct, group consciousness-“গোষ্ঠিচৈতন্য” বা সঙ্ঘচৈতন্য বলে,- মুসলমান সমাজে তাহা যথেষ্ট পরিমাণেই আছে। এই group consciousness -সঙ্ঘচৈতন্য বা গোষ্ঠিচৈতন্যের একটা বৈশিষ্ট্য এই যে, ব্যক্তিগতভাবে মানুষ যেরূপ প্ৰকৃতিরই হোক না কেন, তাহারা সকলে যখন কোন গোষ্ঠী বা সঙ্ঘের অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন সেই গোষ্ঠী বা সঙ্ঘ যেন একটা স্বতন্ত্র সত্তা হইয়া দাঁড়ায় এবং সেই সত্তার স্বতন্ত্র মন ও ইচ্ছা শক্তির বিকাশ হয়। সঙ্ঘ বা গোষ্ঠীর মতামত এবং সিদ্ধান্তই তখন ব্যক্তিকে পরিচালিত করে। একক ব্যক্তি দুর্বল ও অসহায় হইতে পারে, কিন্তু সঙ্ঘশক্তি বলে সেও প্ৰবল শক্তিশালী হইয়া উঠে।

 জনৈক পাশ্চাত্য মনীষী এই সম্পর্কে বলিয়াছেন-
A member of a large assemblage is more sensitive to the voice of the herd than any other influence. It can inhibit or stimulate his thought or conduct; it is the source of his moral codes, of his ethics and philosophy. It can endow him with energy, courage and endurance.
মুসলমান সমাজ যে সঙ্ঘশক্তি বলে বলীয়ান তাহার প্রমাণ আমরা সর্বদাই পাইতেছি। কিন্তু জাতিভেদের ফলে শতধাবিচ্ছিন্ন হিন্দুসমাজে এই সজঘশক্তির একান্ত অভাব। হিন্দু সমাজের গঠনই এমন যে, তাহাতে কেবল স্বতন্ত্রীকরণের প্রবৃত্তিই বাড়িতে থাকে। কোন একটী গ্রামের হিন্দু সমাজের কথা চিন্তা করিলেই আমাদের বক্তব্য সুপরিস্ফুট হইবে। একটা বড় গ্রামের হিন্দুসমাজে অন্ততপক্ষে ৩০/৪০ রকমের জাতি আছে। উহারা প্ৰত্যেকে পৃথক পৃথক দল বিশেষ, কাহারও সঙ্গে কাহারও বন্ধন নাই। তথাকথিত উচ্চজাতিরা “নিম্নজাতি”দিগকে করুণামিশ্র অবজ্ঞার চোখে দেখে, নিম্নজাতিরাও স্তর ভেদে নিম্নতর জাতিদিগকে ঠিক সেই ভাবেই দেখে। কোন নিম্নজাতীয় হিন্দু বিপদগ্ৰস্ত হইলে উচ্চজাতীয়েরা তাহার সাহায্যাৰ্থ অগ্রসর হয় না। কেননা তাহারা যে একই বিশাল হিন্দুসমাজের অন্তর্গত এ বোধ পরস্পরের মনে জাগ্রত হয় নাই। সকলকে একই সঙ্ঘশক্তির পতাকাতলে সমবেত করিবার চেষ্টা করা দূরের কথা,-সামান্য ভুল, ক্রটি বিচ্যুতি ধরিয়া অন্যকে সমাজ হইতে বহিস্কৃত করিবার প্রবৃত্তিটাই বেশী। চলিত ভাষায় ইহারই অপর নাম জাতিচ্যুত বা ‘একঘরে’ করা। এই প্ৰবৃত্তি যেখানে প্ৰবল, সেখানে কোন কালেই সঙ্ঘশক্তির বিকাশ হইতে পারে না, “আমি হিন্দু” এই কথা ভাবিয়া কেহ বল ও ভরসাও পাইতে পারে না।

 জন কয়েক উচ্চ বর্ণের লোক বেদ বেদান্ত উপনিষদের শ্লোক আওড়াইয়া হিন্দুধৰ্ম্ম তথা আৰ্য্যকীৰ্ত্তির গৌরব ঘোষণা করিয়া আত্মপ্ৰসাদ লাভ করিতে পারেন, কিন্তু হিন্দু সাধারণের উহাতে কোনই ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না। তাহারা পরম ঔদাসীন্যের সঙ্গেই ঐ সব কথা শুনে। হিন্দুসমাজের ক্ষয়রোগের নিদান নির্ণয় করিতে হইলে এই Psychological factor বা মনোবিজ্ঞানের তথ্যকে উপেক্ষা করিলে চলিবে না। একজন মুসলমান জানে, তাহার পিছনে সমগ্র মুসলমানসমাজ আছে, কিন্তু একজন হিন্দু ঠিক সেইভাবে, সে যে বিশাল হিন্দুসমাজের একজন একথা অন্তরের সঙ্গে উপলব্ধি করিতে পারে না। ব্যক্তিহিসাবে সে দুর্বল, অসহায়, বিরাট সঙ্ঘশক্তির মধ্যে তাহার স্থান নাই। ইহার ফলে সাধারণভাবে হিন্দুর জীবনীশক্তি যদি হ্রাস হয়, তাহার লোকসংখ্যার হার নিম্নাভিমুখী হয়, তবে তাহা আশ্চর্য্যের বিষয় নয়,-বরং এই উভয়ের মধ্যে কাৰ্য্যকারণ সম্বন্ধ আছে বলিয়াই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। হিন্দু সমাজ হইতে যে এত লোক বাহির হইয়া গিয়া ধৰ্ম্মান্তর গ্ৰহণ করিয়াছে বা করিতেছে, তাহার সঙ্গেও এই সঙ্ঘশক্তিহীনতার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে।
জাতিভেদেরই সঙ্গে অচ্ছেদ্যরূপে সংসৃষ্ট “অস্পৃশ্যতা” হিন্দুসমাজের দৌর্ব্বল্য ও সঙ্ঘবদ্ধহীনতার অন্যতম প্ৰধান কারণ। “অস্পৃশ্যতা” কিরূপে হিন্দুসমাজে প্রবেশ করিল, তাহার গবেষণা ঐতিহাসিকেরা করিবেন। খুব সম্ভব আর্য্য-অনার্য্য সংস্পর্শের ফলে ইহার উদ্ভব হইয়াছিল। নিজেদের “রক্তের বিশুদ্ধিতা” রক্ষার জন্যই আৰ্য্যগণ এই পন্থা প্ৰথমত অবলম্বন করিয়াছিলেন, ঠিক যেভাবে নাৎসী জাৰ্ম্মানী আজ ইহুদী বিতাড়ন এবং বিবাহের কঠোর আইন-কানুন করিয়া বিশুদ্ধ আৰ্য্য জাৰ্ম্মানবংশ রক্ষার চেষ্টা করিতেছে। আমাদের সন্দেহ হয়, ভারতের আর্য্যদের মধ্যে “অস্পৃশ্যতা’ জাতিভেদ প্ৰথা অপেক্ষাও প্রাচীন। পরবর্ত্তীকালে জাতিভেদ প্ৰথা বদ্ধমূল হইবার সঙ্গে সঙ্গে “অস্পৃশ্যতা’ও হিন্দুসমাজে শিকড় গাড়িয়া বসিল।1

জাতিভেদ প্ৰথা যেমন বহু শাখাপ্ৰশাখায় আজ হিন্দুসমাজকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে—অস্পৃশ্যতাও তেমনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া বিশ্বের বিস্ময়ের বস্তু হইয়া উঠিয়াছে। ধৰ্ম্মশাস্ত্রে ও স্মৃতিনিবন্ধে এই অস্পৃশ্যতার সম্বন্ধে যে বিধি বিধান আছে, দেশাচার ও লোকাচার তাহাকে আরও জটিল ও দুর্বোধ্য করিয়া তুলিয়াছে। ফলত লৌকিক আচারে অস্পৃশ্যতার সম্বন্ধে একটা স্বতন্ত্র স্মৃতিশাস্ত্ৰই গড়িয়া উঠিয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হয় না। যথা অবাঞ্ছিতের দর্শন ও স্পৰ্শন বাঁচাইয়া চলা, যদি কোন কারণে ঐ রূপ দোষ ঘটে। তবে স্নান করিয়া শুদ্ধ ও পবিত্ৰ হওয়া, অন্যের স্পৃষ্ট আহাৰ্য্য ও পানীয় গ্ৰহণ না-করা, এই উদ্দেশ্যে রান্নাঘর ও “ভাতের হাঁড়িকে” অতি সযত্নে ও নিরাপদে রক্ষা করা, অন্যের সঙ্গে একাসনে না-বসা, এক পংক্তিতে ভোজন না-করা ইত্যাদি। পূর্ব্বেই বলিয়াছি, বাঙলার হিন্দুসমাজের মধ্যে ‘অস্পৃশ্য’ ও ‘অনাচরণীয়’ দুই রকম ভেদ আছে; অনাচরণীয়দের স্পর্শ করা যায়, কিন্তু তাহাদের স্পৃষ্ট অন্নপানীয় গ্ৰহণ করা যায় না, তাহাদের সঙ্গে সামাজিক ব্যবহারও চলে না; - আর অস্পৃশ্যদের দেহ এমন কি ছায়া পৰ্য্যন্ত স্পর্শ করিলে ‘দোষ’ হয় এবং তাহার জন্য স্নান করিয়া ও ইষ্টমন্ত্র জপিয়া শুদ্ধ হইতে হয়। অস্পৃশ্যেরা এবং কতকগুলি ‘অনাচরণীয়’ জাতিও দেবমন্দিরে প্রবেশ করিতে পারে না। ইহাদের স্বতন্ত্র মন্দিরে স্বতন্ত্রভাবে যে সব পুরোহিত ব্ৰাহ্মণ পূজা করে, তাহারাও অনাচরণীয়, এমন কি কোন কোন স্থানে অস্পৃশ্য বলিয়া গণ্য। এই অস্পৃশ্যতার ব্যাধি আরও কতদূর নামিয়া গিয়াছে, তাহার নিদর্শন—নাপিতেরা হিন্দুসমাজেরই অন্তর্ভুক্ত কতকগুলি নিম্ন জাতির ক্ষৌরকাৰ্য্য করে না, পাটনীরা তাহাদিগকে নৌকায় পার করে না ও ধোপারা তাহদের কাপড় কাচে না। (অথচ আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, ঐ সকল হতভাগ্য জাতিরাই যখন মুসলমান বা খ্রীস্টান হয়, তখন তাহাদের ক্ষোরকাৰ্য্য করিতে, কাপড় কাচিতে বা তাহাদিগকে পার করিতে উহাদের আপত্তি হয় না।)

ফলে “অস্পৃশ্যতা” হিন্দুসমাজের মধ্যে এরূপ একটা জঘন্য, অস্বাভাবিক, এমন কি পাশবিক প্রথা হইয়া দাঁড়াইয়াছে যে, উহার নিন্দা করিবার মত ভাষা খুজিয়া পাওয়া যায় না! পৃথিবীতে কোথাও ইহার তুলনা নাই। এই ‘অস্পৃশ্যতা’ যে হিন্দুসমাজকে ক্ৰমে ছত্রভঙ্গ করিয়া দিতেছে, তাহাকে তিলে তিলে ধবংস করিতেছে, তাহা প্ৰতিনিয়তই আমরা চোখের সম্মুখে দেখিতে পাইতেছি। মানুষের ঘৃণার উপর যে প্রথার প্রতিষ্ঠা তাহা কস্মিনকালে কোন সমাজের কল্যাণ করিতে পারে না, উহাকে মৃত্যুর পথে টানিয়া লইয়া যায়। হিন্দুসমাজে বিভিন্ন সময়ে মহাপুরুষেরা আবির্ভূত হইয়া এই আত্মহত্যাকর প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্ৰাম ঘোষণা করিয়াছেন, কিন্তু বটগাছের শিকড়ের মত হিন্দুসমাজের জরাজীর্ণ অট্টালিকাকে উঠা এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে ভেদ করিয়াছে যে, উহা নিৰ্ম্মল করা অসম্ভব বলিয়াই মনে হয়। প্রাচীনকালের বুদ্ধ, চৈতন্য, কবীর, নানক হইতে আরম্ভ করিয়া আধুনিক যুগের স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধী পৰ্যন্ত অনেকেই হিন্দুসমাজের এই জঘন্য প্রথা দূর করিবার জন্য প্ৰাণপণ চেষ্টা করিয়াছেন, ফল বিশেষ কিছু হয় নাই। কিন্তু জাতিভেদের ন্যায়। এই অস্পৃশ্যতা ব্যাধিও দূর করিতে না পারিলে হিন্দুসমাজকে রক্ষা করিবার কোন উপায় নাই।

• ডা. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত বলেন, পৌরাণিক যুগেই অস্পৃশ্যতা হিন্দুসমাজে দৃঢ়বদ্ধ হইয়াছিল । ‘ভারতীয় সমাজপদ্ধতির উৎপত্তি ও বিবর্তনের ইতিহাস’—পরিচয়, ১৩৪৮ ।— লেখক↩

চলবে ...
গ্রন্থঃ ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু
লেখকঃ প্রফুল্লকুমার সরকার
সংগৃহীতঃ হিন্দুত্ববুক্স হতে ।
বিঃদ্রঃ আরো পোষ্ট পেতে লাইক ও শেয়ার করুন
Share:

জাতিভেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ

বৌদ্ধধৰ্ম্ম তাহার সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শ লইয়া হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথার উপর প্রবল আঘাত করিয়াছিল সন্দেহ নাই। কিন্তু বৌদ্ধধৰ্ম্মের অধঃপতনের সঙ্গে সঙ্গে সনাতন হিন্দু ধৰ্ম্ম উহাকে অপূর্ব কৌশলে গ্ৰাস করিয়া ফেলিল, জাতিভেদ প্ৰথা আরও বেশী শক্তিশালী হইয়া শাখা প্ৰশাখা বিস্তার করিয়া হিন্দু সমাজকে আচ্ছন্ন করিল। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধৰ্ম্মের সহস্ৰ বৎসরের কাজ বহুল পরিমাণে ব্যর্থ হইয়া গেল।

কিন্তু জাতিভেদের বিরুদ্ধে সেই বিদ্রোহের বাণী একেবারে ব্যর্থ হয় নাই। নানা আকারে, নানা রূপান্তরের মধ্য দিয়া সে জাতিভেদকে আঘাত করিয়া আসিয়াছে, এখনও করিতেছে। ষোড়শ শতাব্দীতে জাতিভেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের যে প্ৰবল বন্যা আসিয়াছিল, তাহা প্ৰায় একই সময়ে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন মূৰ্ত্তিতে দেখা দিয়াছিল। বাঙলাদেশে শ্ৰীচৈতন্য, মধ্যভারতে কবীর এবং পাঞ্জাবে গুরু নানক এই বিদ্রোহের পতাকাধারী। মহাপ্ৰভু শ্ৰীচৈতন্যের প্ৰেমধৰ্ম্ম যে মহান আদশের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাহার মধ্যে প্ৰকৃতপক্ষে জাতিভেদের স্থান নাই। তিনি উচ্চকণ্ঠে প্রচার করিলেন,—
চণ্ডালোঽপিমুুণিশ্রেষ্ঠো বিষ্ণুভক্তো দ্বিজাধিকঃ 1
অথবা,-
‘মুচি হয়ে শুচি হয় যদি কৃষ্ণ ভজে।’
বৈষ্ণব কবি লোচন দাস সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া বলিলেন-
চণ্ডালে ব্ৰাহ্মণে করে কোলাকুলি
কবে যা ছিল এ রঙ্গ।

এগুলি শুধু মুখের কথা নয়, কাৰ্য্যতও মহাপ্ৰভু শ্ৰীচৈতন্য ও তাঁহার ভক্তগণ ঐরূপ আচরণ করিয়াছিলেন—‘আপনি আচরি ধৰ্ম্ম জগতে শিখায়।’ তখনকার সমাজ পরিস্থিতি বিবেচনা করিলে, এই ধৰ্ম্মান্দোলনের গুরুত্ব যে কত বেশী, তাহা উপলব্ধি করিতে পারা যায়। ইসলাম ধৰ্ম্ম তাহার সাম্যবাদ লইয়া বিজয়ী বেশে এদেশে তখন আবির্ভূত হইয়াছে। একদিকে সমাজের উপেক্ষা ও নিৰ্য্যাতন, অন্যদিকে ইসলামের সাম্যের আদর্শ ও শাসক জাতির প্রলোভন—এই উভয়ের প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু সমাজের নিম্নজাতিগুলি দলে দলে মুসলমান হইতে লাগিল। যে সব “নিৰ্য্যাতিত ও ভ্ৰষ্টাচারী” বৌদ্ধ অথবা প্ৰচ্ছন্ন বৌদ্ধ ছিল, তাহারা তো সাগ্রহে ইসলাম ধৰ্ম্ম গ্ৰহণ করিতে লাগিল। হিন্দু সমাজের এই সঙ্কট-সন্ধিক্ষণে মহাপ্ৰভু যদি তাঁহার প্ৰেমধৰ্ম্মের আদর্শ লইয়া না দাঁড়াইতেন, তবে বাঙলার হিন্দুসমাজের অবস্থা কি হইত বলা যায় না। আজকাল কোন কোন গোঁড়া সনাতনী প্ৰমাণ করিতে চেষ্টা করিতেছেন, মহাপ্ৰভু জাতিভেদে পরম বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি এ বিষয়ে শাস্ত্ৰোক্ত বিধিনিষেধ হইতে তিলমাত্র বিচ্যুত হন নাই।

কিন্তু মহাপ্রভুর ধৰ্ম্মের আদর্শ, তাঁহার কাৰ্য্যাবলী এবং তাঁহার ভক্ত ও পার্ষদগণের আচরণ পৰ্য্যালোচনা করিলে স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়, তাহার প্ৰেমধৰ্ম্মের আদর্শের মধ্যে প্রচলিত জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে প্ৰচণ্ড একটা বিদ্রোহের ভাব ছিল। প্ৰথমেই দেখা যাক, তাঁহার ধৰ্ম্মপ্রচারের প্রধান সহায় ও মুখপত্ৰ কাহারা। রূপ সনাতন দুই ভাই যে ব্ৰাহ্মণ সমাজে পতিত বলিয়া গণ্য হইতেন, একথা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। অথচ এই রূপ সনাতনই মহাপ্রভুর প্ৰেমধৰ্ম্ম প্রচারের প্ৰধান সেনাপতিদ্বয়। এই দুই পতিত ব্ৰাহ্মণকে কেবল তিনি ‘কোল দেন’ নাই, তাহাদিগকে প্ৰেমধৰ্ম্মের গভীর তত্ত্বসমূহ শিক্ষা দিয়া মানবসমাজের শিরোমণি করিয়া তুলিয়াছিলেন। মহাপ্রভুর ধৰ্ম্মপ্রচারের অন্যতম প্ৰধান সহায় শ্ৰীনিত্যানন্দ ছিলেন অবধূত, জাতিবিচার তিনি মানিতেন না। বঙ্গদেশের গ্রামে গ্রামে প্ৰধানত নিত্যানন্দই প্ৰেমধৰ্ম্ম প্রচার করেন। কোন কোন মনীষী তাহাকে খ্রীস্টধৰ্ম্ম প্রচারক সেণ্ট পলের সঙ্গে তুলনা করিয়াছেন। কাহারও কাহারও মতে জগতে এত বড় ধৰ্ম্মপ্রচারক আর জন্মগ্রহণ করেন নাই। ঠাকুর হরিদাস বা যবন হরিদাস ছিলেন মহাপ্ৰভু প্রচারিত প্ৰেমধৰ্ম্মের অন্যতম স্তম্ভস্বরূপ। তিনি মুসলমানের ঘরে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, কিন্তু পরে পরম বৈষ্ণব হন। এত বড় মহান চরিত্র যে কোন দেশে, যে কোন যুগে দুর্ল্লভ। মুহাপ্ৰভু যে তাঁহাকে কতদূর শ্রদ্ধা ও সম্মান করিতেন, তাহা “শ্ৰীচৈতন্য চরিতামৃতের” পাঠক মাত্ৰেই জানেন। শ্ৰীঅদ্বৈতাচাৰ্য্য ছিলেন বারেন্দ্ৰ ব্ৰাহ্মণসমাজের সমাজপতি-নিষ্ঠাবান সনাতনী এবং বৈদান্তিক পণ্ডিত।

কিন্তু মহাপ্রভুর প্রভাবে পরম ভক্ত। ও বৈষ্ণব হইয়া উঠেন। শ্ৰীনিত্যানন্দকে তিনি কুলত্যাগী ও জাতিনাশা। বলিয়া বিদ্রুপ করিতেন বটে, কিন্তু বৈষ্ণব হইয়া তিনি নিজেও জাতিবিচার করিতেন না। যবন চরিদাস বা ঠাকুর হরিদাসকে ব্রাহ্মণের তুল্য সম্মান করিয়া অদ্বৈতাচাৰ্য্যই শ্রাদ্ধের অন্ন নিবেদন করিয়াছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে বহু অ-ব্রাহ্মণ-বৈদ্য, কায়স্থ প্রভৃতি গুরুর আসন অধিকার করিয়াছেন, - সনাতন ব্রাহ্মণ্যাচারের বিরুদ্ধে ইহা একটা বড় রকমের বিদ্রোহ। মহাপ্ৰভু প্রচারিত বৈষ্ণবধৰ্ম্ম গ্ৰহণ করিয়া বহু অন্ত্যজ, অস্পৃশ্য, অনাচরণীয় জাতি বাঙ্গলাদেশে “জলচল” ও “আচরণীয়” হইয়া গিয়াছে। কেবল তাহাই নহে, মহাপ্রভুর প্ৰেমধৰ্ম্ম হিন্দুধৰ্ম্মের সম্মুখে দিগ্বিজয়ের একটা নূতন পথ খুলিয়া দিয়াছিল। বহু আদিম ও অনাৰ্য্য জাতি বৈষ্ণব ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিয়া হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে। শ্ৰীঅদ্বৈতাচাৰ্য্যের পুত্র বীরভদ্র গোস্বামী আসাম ও মণিপুরের পাহাড়িয়া জাতিদের মধ্যে বৈষ্ণবধৰ্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন। যদি পরবর্ত্তীকালে বৈষ্ণবাচাৰ্য্যগণ এই ধারা অনুসরণ করিতেন, তবে বাঙলার প্রান্তভাগের সমস্ত আদিম, অনাৰ্য্য ও পাহাড়িয়া জাতিরা হিন্দু হইয়া যাইত এবং “আজি যে আমরা জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার সমস্যা লইয়া বিব্রত হইয়া উঠিয়াছি, বহুকাল পূর্ব্বেই তাহার একটা সমাধান হইত।


কিন্তু তীক্ষ্ণবুদ্ধি, কৌশলী ব্ৰাহ্মণেরা একদিন যেমন বৌদ্ধধৰ্ম্মের সমস্ত প্ৰচেষ্টা ব্যর্থ করিয়া দিয়াছিলেন, মহাপ্রভুর প্ৰেমধৰ্ম্মের প্রতিও তাঁহারা অনুরূপ আচরণ করিলেন। ব্ৰাহ্মণ পণ্ডিতেরা যখন গুরু ও গোস্বামী বেশে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্ৰবেশ করিলেন, তখনই উহার মধ্যে আবার সেই সনাতনী মনোবৃত্তি আসিয়া প্ৰবেশ করিল, জাতিভেদ-উচ্চ-নীচ ভেদের মহিমা প্রচারিত হইতে লাগিল। এমন-কি, এই সব ব্ৰাহ্মণ গোস্বামীদের প্রভাবে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের জন্য নূতন স্মৃতিশাস্ত্ৰই রচিত হইয়া গেল। যে সব অস্পৃশ্য, অনাচরণীয়, অন্ত্যজ প্রভৃতি বৈষ্ণব হইয়া হিন্দু সমাজে কতকটা মৰ্য্যাদালাভ করিয়াছিল, তাহারা ‘জাত-বৈষ্ণব’ নামে একটা স্বতন্ত্র জাতিতেই পরিণত হইল। অর্থাৎ জাতিভেদের কঠোরতা হ্রাস হওয়া দূরে থাকুক, হিন্দু সমাজে আর একটা নূতন জাতির সৃষ্টি হইল। মহাপ্রভুর প্ৰেমধৰ্ম্মে সমাজ সংস্কারের যে বিরাট সম্ভাবনা ছিল, সনাতনী ব্ৰাহ্মণেরা এইভাবে তাহার গতিরোধ করিলেন।
গুরু নানক যে ধৰ্ম্মসম্প্রদায় প্ৰবৰ্ত্তন করিয়াছিলেন, তাহার মধ্যে জাতিভেদের স্থান ছিল না, একথা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। নবম গুরু গোবিন্দ সিং মোগল সম্রাটদের অত্যাচার হইতে এই শিখ সম্প্রদায়কে রক্ষা করিবার জন্য উহাকে সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও শক্তিশালী করিয়া তুলেন। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতি বিচার ছিল না,—ব্রাহ্মণ, জাট, রাজপুত-সকল শিখই ছিল সমান।

কিন্তু সনাতন হিন্দুসমাজ এতটা সাম্যবাদ বরদাস্ত করিতে পারিল না। ফলে শিখ সম্প্রদায় হিন্দুসমাজ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক হইয়া গেল, শিখধৰ্ম্ম হিন্দুধৰ্ম্ম হইতে একটা স্বতন্ত্র ধৰ্ম্ম বলিয়াই গণ্য হইল। আজ পাঞ্জাবে শিখেরা একটা শক্তিশালী ধৰ্ম্ম সম্প্রদায়, হিন্দু সমাজের সঙ্গে তাহাদের কোন সম্বন্ধ তাহারা স্বীকার করে না। তাহাদের সংখ্যাও নগণ্য নহে। পাঞ্জাবের হিন্দুসমাজ যে এইভাবে দ্বিখণ্ডিত হইয়া গেল, ইহার জন্য দায়ী কে ?

হিন্দুসমাজের জাতিভেদ ও ব্ৰাহ্মণ্য প্রাধান্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আর একটি আধুনিক দৃষ্টান্ত দিব। উড়িষ্যা, গঞ্জাম ও মধ্যভারতে “মহিমাধৰ্ম্ম” নামে একটি ধৰ্ম্ম সম্প্রদায়ের নাম অনেকেই হয়ত শুনিয়াছেন। ৭০/৮০ বৎসর পূর্ব্বে উড়িষ্যার দেশীয় রাজ্যে মহিমা গোসাই নামক জনৈক সাধু এই ধৰ্ম্ম প্রচার করেন। কিন্তু ইহারই মধ্যে এই ধৰ্ম্ম বহুবিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছে। ইহাদের প্রধান কেন্দ্র ও পীঠস্থানে (জোড়নদা—ঢেনকানাল) আমরা গিয়াছি এবং সমস্ত বিষয় মোটামুটী জানিবার সুযোগ লাভ করিয়াছি। এই ধৰ্ম্মের মধ্যে এমন কতকগুলি ভাব আছে, যাহাতে মনে হয়, বৌদ্ধধৰ্ম্মের নিকট ইহা বহুল পরিমাণে ঋণী।।

 স্বর্গীয় নগেন্দ্ৰনাথ বসু মহাশয় তা ইহাকে প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধধৰ্ম্মই বলিয়াছেন। কিন্তু এই ধৰ্ম্মের ধৰ্ম্মতত্ত্ব আমাদের আলোচ্য বিষয় নহে। এই ধৰ্ম্ম সম্প্রদায়ের সামাজিক ব্যবস্থাই আমাদের লক্ষ্যস্থল। ইহারা নিজেদের “হিন্দু”ই বলে, কিন্তু ইহাদের মধ্যে জাতিভেদ নাই,-ব্ৰাহ্মণ, রাজপুত, কায়স্থ, ধোপা, মুচি, ডোম-মহিমা ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিলে, সকলেই সমান বলিয়া গণ্য ভয়। পরস্পরের মধ্যে আহার-ব্যবহার ও বিবাহের আদানপ্ৰদান চলে। ইহাদের মধ্যে বিবাহপদ্ধতিও সনাতন হিন্দুপ্ৰথা সম্মত নহে। বলা বাহুল্য, সনাতন হিন্দু সমাজ ইহাদের এই চরম সাম্যবাদ। বরদাস্ত করিতে পারে নাই,-মহিমা সম্প্রদায়কে তাহারা হীন ও পতিত বলিয়াই গণ্য করে।

• বৃহন্নারদীয়পুরাণম্ । পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, দ্বিতীয় সংস্করণ, দ্বাত্রিংশোধ্যায়, ৩৯ শ্লোক, ১৩১৬

চলবে ...
গ্রন্থঃ ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু
লেখকঃ প্রফুল্লকুমার সরকার
সংগৃহীতঃ হিন্দুত্ববুক্স হতে ।
Share:

পাতিত্য দোষ-২

‘পীরালি’ ব্ৰাহ্মণেরা কোণঠাসা হইয়াও তবু হিন্দুসমাজে স্থান পাইয়াছে। কিন্তু এমন কয়েকটি শ্রেণী আছে, যাহারা। ‘যবনস্পর্শ দোষে’ অভিশাপগ্ৰস্ত হইয়া, না-হিন্দু-না-মুসলমান—এইরূপ একটা ত্রিশঙ্কু অবস্থার মধ্যে বাস করিতেছে। মালকানা রাজপুতদের কথা শুদ্ধি ও সংগঠন আন্দোলনের সময় অনেকেই শুনিয়াছেন। তাহারা নামে মাত্র মুসলমান হইয়াছিল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহারা ‘পতিত’ হিন্দু। আচার ব্যবহারে সর্বপ্রকারে তাহারা হিন্দুই আছে, কিন্তু হিন্দু সমাজ তাহাদিগকে হিন্দু বলিয়া স্বীকার করিতে চায় না। শুদ্ধি সংগঠন আন্দোলনের সময় ইহারা হিন্দু হইবার জন্য আগ্ৰহ প্ৰকাশ করে এবং শুদ্ধি আন্দোলনের পরিচালক স্বামী শ্রদ্ধানন্দের চেষ্টায় বহু মালকানা রাজপুত হিন্দুসমাজে গৃহীতও হয়। কিন্তু হিন্দুসমাজে গৃহীত হয় নাই, এমন সব মালকানা রাজপুত এখনও আছে এবং তাহারা পূর্ববৎ “ত্রিশঙ্কু” অবস্থার মধ্যেই বাস করিতেছে। বাঙলাদেশে ‘পটুয়া” (চিত্রকর) নামে একটিশ্রেণী আছে, যাহাদের অবস্থা অনেকটা মালকানা রাজপুতদের মতই। ইহারা কবে ’মুসলমান’ হইয়াছিল তাহা সঠিক বলা যায় না, তবে অনুমান ৩০০/৪০০ বৎসরের পূর্ব্বে নয়। কিন্তু ইহাদের আচার-ব্যবহার অনেক বিষয়েই হিন্দুদের মতই, বিবাহ পৰ্যন্ত অনেকটা হিন্দু প্ৰথাতেই হয়। কিন্তু তবুও হিন্দু সমাজ হইতে ইহারা বহিষ্কৃত। অথচ নামে মুসলমান ধৰ্ম্ম গ্ৰহণ করিলেও মুসলমান সমাজেও ইহারা সম্পূর্ণরূপে স্থান পায় নাই। আমাদের মনে হয়, কোনরূপ “যবন সংস্পৰ্শ” দোষে এক সময় এই বৃহৎ শ্রেণীকে হিন্দু সমাজপতিরা পাইকারী ব্যবস্থায়—‘পতিত’ ও সমাজচ্যুত করিয়াছিলেন। তাহার পর হইতেই-ইহারা ‘না ঘাটকা না ঘরকা’ অবস্থায় কাল কাটাইতেছে। আমরা যতদূর জানি, শুদ্ধি আন্দোলনের সময় ইহাদের মধ্যে কতকগুলি পরিবার হিন্দু হইয়াছিল। কিন্তু এখনও অনেকে পূর্ব অবস্থাতেই আছে।

‘মগো কায়েত’, ‘মগো বামুন” প্রভৃতির নাম আধুনিক শিক্ষিতদের মধ্যে অনেকেই হয়ত শুনেন নাই। শুনিলেও ইহার অর্থ বুঝা অবস্থাভিজ্ঞ ভিন্ন সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। বাঙলার ইতিহাস পাঠকেরা জানেন, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে মগ দস্যুরা বাঙলার সমুদ্রকুলবৰ্ত্তী পূর্ব্বাঞ্চলে প্রায়ই অত্যাচার ও লুণ্ঠন করিত। তাহারা সমুদ্রপথে বড় বড় নৌকা বা দেশী জাহাজে করিয়া আসিত এবং হঠাৎ দল বাধিয়া নামিয়া গ্রাম আক্রমণ করিত। তখনকার দিনে বাঙলার গ্রামবাসীরা এমন নিবীৰ্য্য হয় নাই। সুতরাং তাঁহারাও অস্ত্রশস্ত্ৰ লইয়া মগ দস্যুদের প্রতিরোধ করিত। যুদ্ধে কখনও কখনও মগ দস্যুরা পরাজিত হইয়া পলায়ন করিত, কখনও বা তাহারা জয়লাভ করিয়া গ্রামবাসীদের বাড়ীঘর লুণ্ঠন করিত। কেবলই যে টাকাকড়ি, মূল্যবান দ্রব্যাদিই মগের লইয়া যাইত তাহা নহে, সময়ে সময়ে নারীহরণও করিত। যাহাদের স্ত্রী-কন্যাদি মগ দস্যুরা হরণ করিয়া লইয়া যাইত, তাহাদের একেই লজ্জা ও কলঙ্ক রাখিবার স্থান থাকিত না, তাহার উপর গ্রামের সকলে মিলিয়া ঐ “অপরাধে” তাহাদের জাতিচ্যুত বা পতিত বলিয়া গণ্য করিত। ঐ সব পতিত গৃহস্থাদিগকেই “মগো বামুন’, “মগো কায়েত’, ‘মগো বৈদ্য’, ‘মগো নাপিত” প্ৰভৃতি বলা হইত। অর্থাৎ ঐ সব হতভাগ্য ব্ৰাহ্মণ, কায়স্থ প্রভৃতির গৃহ হইতে মগ দস্যুরা যে জোর করিয়া নারীহরণ করিয়া লইয়া যাইত, সমাজ তাহার জন্য হীনতার ছাপ চিরদিনের জন্য ঐ হতভাগ্যদেরই কপালে দাগিয়া দিবার ব্যবস্থা করিত।

 সে কলঙ্কের চিহ্ন এখনও তাহাদের বংশধধরেরা বহন করিতেছে। যশোর, খুলনা, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলায় কোন কোন অঞ্চলে বহু ‘মগো বামুন’, ‘মগো কায়েত’, ‘মগো বৈদ্য’, ‘মগো নাপিত” প্রভৃতি আছে। ভাল ব্রাহ্মণ, কায়স্থ প্রভৃতি ইহাদের হাতে জল খায় না, কোনরূপ আহার ব্যবহার করে না। ‘মাগো’রা নিজেদের মধ্যেই আহারব্যবহার করে, পুত্রকন্যার বিবাহ দেয়। কয়েক বৎসর পূর্ব্বে যশোরে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটিয়াছিল। যশোর বার লাইব্রেরীর জনৈক উকীল জাতিতে “মগো কায়স্থ” ছিলেন। তাঁহার জন্য পৃথক জলখাবারের স্থান ছিল। একদিন তিনি ভ্ৰমক্রমে বা অন্য কোন কারণবশত উচ্চজাতিদের জন্য নির্দিষ্ট জলখাবারের ঘরে প্রবেশ করিয়া জলপান করেন। জনৈক উচ্চ জাতীয় উকীল। এই অনাচার দেখিতে পাইয়া “মগো কায়স্থ” উকীলকে তিরস্কার করেন। ফলে উভয়ে বচসা হয়, এমন কি মারপিটও হয়। শেষ পৰ্য্যন্ত ব্যাপারটা আদালত পৰ্যন্ত গড়ায়। সেই সময়ের সংবাদপত্রে ঘটনাটি প্ৰকাশিত হইয়াছিল।
হিন্দুসমাজ নূতন নূতন “জাতি” সৃষ্টি করিয়া এবং নানা বিচিত্র ও অদ্ভুত কারণে কতকগুলি শ্রেণীকে ‘হীন’ ও ‘পতিত’ ঘোষণা করিয়া যেভাবে আত্মহত্যা করিতেছে, তাহার কতকগুলি দৃষ্টান্ত আমরা দিয়াছি। আরও কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করিব। “বৰ্ণ ব্ৰাহ্মণ” নামে এক শ্রেণীর পতিত ব্ৰাহ্মণ আছেন, তাহা হয়ত অনেকেই শুনিয়াছেন। ইহাদের পাতিত্যের কারণ কি ? যতদূর জানা যায়, এই ব্ৰাহ্মণের শূদ্র ও অন্ত্যজ জাতিদের পৌরোহিত্য করিতে স্বীকৃত হইয়াছিলেন বলিয়াই তাঁহাদের পাতিত্যদোষ ঘটিয়াছে।

যথা ধোপার ব্ৰাহ্মণ, নমশূদ্রের ব্ৰাহ্মণ, জেলের ব্ৰাহ্মণ-ইহারা সকলেই “বৰ্ণ ব্ৰাহ্মণ” এবং সাধারণ ব্ৰাহ্মণের নিকট হীন, পতিত বলিয়া গণ্য। পূর্বকালে যাঁহারা গ্রহপূজা, কোষ্ঠী বিচার প্রভৃতির ব্যবসা করিতেন, তাঁহারা ছিলেন গ্রহবিপ্ৰ। এই ‘গ্রহবিপ্রেরা’ও হীন ব্ৰাহ্মণ বলিয়া গণ্য। শ্রাদ্ধের পিণ্ডাদি যাঁহারা গ্ৰহণ করেন,-সেই “অগ্ৰদানী” ব্ৰাহ্মণেরাও হীন ব্রাহ্মণ বলিয়া গণ্য। ভাট, চারণ, নট প্রভৃতির কাৰ্য্য যে সব ব্রাহ্মণ করিত, তাহারাও হীন বলিয়া গণ্য হইত। তাহাদের বংশধরেরা এখনও সেই পাতিত্য দোষে লাঞ্ছিত। পণ্ডিত দিগিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচাৰ্য্য তাঁহার প্রসিদ্ধ “জাতিভেদ” গ্রন্থে মনুসংহিতা ও অন্যান্য স্মৃতি গ্রন্থ হইতে বহুশ্লোক উদ্ধৃত করিয়া দেখাইয়াছেন, হিন্দু সমাজে “বৃত্তির দোষে।” ও অন্যান্য তথাকথিত “অপরাধে” কত লোক হীন ও পতিত বলিয়া গণ্য হইয়াছে। সেই সুদীর্ঘ তালিকা দেখিলে হতবুদ্ধি হইতে হয়। কিন্তু পরবর্ত্তীকালের দেশাচার ও লোকাচার স্মৃতির অনুশাসনও ছাড়াইয়া গিয়াছে। নূতন নূতন কারণে পাতিত্য দোষ ঘটিয়াছে। এইরূপে হিন্দু সমাজ কেবলই নিজেকে বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন, খণ্ডবিখণ্ড করিতে করিতে চলিয়াছে, আর সকলকে হাঁকিয়া বলিতেছে-‘তফাৎ যাও, তফাৎ যাও’।

চলবে ...
গ্রন্থঃ ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু
লেখকঃ প্রফুল্লকুমার সরকার
সংগৃহীতঃ হিন্দুত্ববুক্স হতে ।
Share:

পাতিত্য দোষ - ০১

সমাজের সর্বপ্রধান শক্তি-সংহতিশক্তি বা সঙ্ঘশক্তি । এই শক্তিবলেই সমাজ বিধৃত হইয়া থাকে এবং বাহিরের আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারে । সংহতিসক্তিশক্তির প্রধান লক্ষণ বিছিন্নকে একত্র করা, বৈষম্যের মধ্য হইতে সাম্যের ভিত্তিতে সকলকে কেন্দ্রীভূত করা । যে সমাজে এই শক্তি যত বেশী বিকাশপ্রাপ্ত হয়, সে-সমাজ তত বেশী জীবন্ত । দুৰ্ভাগ্যক্রমে হিন্দুসমাজে ইহার বিপরীত লক্ষণই দেখিতে পাইতেছি। এ সমাজে বিকর্ষণী শক্তিই প্রবল, ইহা সকলকে এক সাম্যের সূত্রে গ্রথিত করিবার চেষ্টা করা দূরে থাকুক, পৃথক্ করিয়া দিবার জন্যই যেন ব্যস্ত। পুরুভূজের দেহের মত হিন্দুসমাজ নিজেকে কেবলই ভাগ করিতেছে এবং সেই সব পৃথক পৃথক ভাগ হইতে এক একটা স্বতন্ত্র উপসমাজের সৃষ্টি হইতেছে। ইহাদের কাহারও সঙ্গে কাহারও যেন যোগ নাই। অন্য একটা উপমা দিয়া বলিতে পারা যায়, হিন্দুসমাজ যেন একটা ভাসমান দ্বীপপুঞ্জ;-অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ ইহার মধ্যে আছে, কিন্তু তাহাদের কাহারও সঙ্গে কাহারও ঘনিষ্ঠ বন্ধন নাই। অনেক সময় ভাবিলে বিস্ময় বোধ হয়, এতকাল ধরিয়া বিকর্ষণীশক্তিপ্রধান এই সমাজ কিরূপে টিকিয়া আছে। কিন্তু এই জরাজীর্ণ প্ৰাচীন সমাজের চারিদিকে যেমন ফাটল ধরিয়াছে, বৈষম্যনীতি যেমন প্ৰবল হইতে প্ৰবলতর হইতেছে, তাহাতে ইহার ভবিষ্যৎ মোটেই আশাপ্ৰদ মনে হয় না।

 অবস্থা এমন শোচনীয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে যে, তথাকথিত “নিম্ন জাতিরাও” পরস্পরকে হীন ও ক্ষুদ্ৰ মনে করে এবং একে অন্যকে “অস্পৃশ্য ও অনাচরণীয়” বলিয়া ঘুণা করে। “শুদ্ধি ও সংগঠন” আন্দোলন যাঁহারা পরিচালনা করিয়াছেন, তাঁহাদের এ সম্বন্ধে সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতা আছে। একজন সংস্কারপন্থী ব্ৰাহ্মণ কি কায়স্থ হয়ত মুচি, মেথর বা ডোমের হাতে জল খাইবে, কিন্তু মুচি, মেথর বা ডোম কেহই পরস্পরের হাতের জল খাইবে না, এক পংক্তিতে বসিয়া ভোজন করা তো দূরের কথা। এজন্য দায়ী তাহারা নহে-দায়ী উচ্চ জাতীয়েরাই। উচ্চ জাতীয়েরা যে বৈষম্যের মন্ত্র নিম্ন জাতিদের কানে দিয়াছে, এ তাহারই পরিণাম। চেলারা এখন গুরুদের ছাড়াইয়া গিয়াছে। আজ যে বৃটিশ শাসকেরা নিম্ন জাতিদের লইয়া একটা কৃত্ৰিম তপশীলী সম্প্রদায় সৃষ্টি করিতে পারিয়াছেন এবং এই ‘তপশীলীরা’ নিজেদের সমগ্ৰ হিন্দুসমাজ হইতে পৃথক বলিয়া ভাবিতে শিখিতেছে এবং তদনুসারে কার্য্যও করিতেছে,-এ-ও উচ্চ জাতীয়দের বৈষম্যনীতিরূপ পাপের ফল।

বিকর্ষণী শক্তির প্রভাবে কেবল যে অসংখ্য জাতি, উপজাতি, শাখাজাতি প্ৰভৃতিরই সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা নহে; হিন্দুসমাজে বহুলোক নানাভাবে হীন, পতিত ও ভ্ৰষ্ট হইয়া আছে। বৌদ্ধধৰ্ম্মের অধঃপতন ও সনাতন হিন্দু ধৰ্ম্মের পুনরভ্যুদয়ের ফলে বহু বৌদ্ধ সনাতন হিন্দুসমাজের মধ্যে ফিরিয়া আসিল বটে, কিন্তু যাহারা ফিরিয়া আসিল না, তাহারা হীন ও পতিত বলিয়া গণ্য হইল। এমন কি ২/৩ পুরুষ পরে উহাদের মধ্যে যাহারা স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ফিরিয়া আসিল, তাহাদেরও পাতিত্যদোষ সম্পূর্ণ ঘুচিল না; সমাজের নিম্নস্তরে অস্পৃশ্য বা অনাচরণীয় হইয়াই তাহারা রহিল। পূর্ব্বেই বলিয়াছি, বাঙলাদেশে হিন্দু ধৰ্ম্মের নব অভ্যুদয় একটু বিলম্বে হইয়াছিল। রাজা বল্লাল সেনের পরেও ২৩ শতাব্দী পৰ্য্যন্ত বহুলোক বৌদ্ধাচার সম্পূর্ণ ত্যাগ করে নাই। শেষ পৰ্য্যন্ত ইহাদের মধ্যে অনেকেই হিন্দুসমাজের মধ্যে আসিতে বাধ্য হইয়াছিল বটে, কিন্তু সমাজে তাহারা উচ্চস্থান পায় নাই। এই জাতিভেদপ্ৰপীড়িত দেশে ঐতিহাসিক তথ্যের আলোচনা করাও সব সময়ে নিরাপদ নয়, লোকের বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কা আছে। তৎসত্ত্বেও দুই একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করিতে চেষ্টা করিব। যে ‘ডোম’ জাতি এখন অস্পৃশ্য বলিয়া গণ্য, তাহারা এককালে বৌদ্ধ ছিল—তাহাদের মধ্যে অনেকে বৌদ্ধাচাৰ্য্য ও পুরোহিতের কার্য্যও করিত। সেদিন পৰ্য্যন্ত প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধদেবতা ধৰ্ম্মঠাকুরের পূজা প্ৰধানত এই ‘ডোম’ পুরোহিতেরাই করিয়াছে। ‘যোগী’ সম্প্রদায়েরা পূর্বপুরুষেরা যে বৌদ্ধ ছিল, তাহাতে সন্দেহের অরসর নাই। ইতিহাস পাঠকেরা জানেন, সুবর্ণবণিকদের মধ্যে একটা বৃহৎ অংশ বল্লাল সেনের পরেও বহুকাল পৰ্য্যন্ত বৌদ্ধ ছিল। সেইজন্যই পরবর্ত্তী কালে হিন্দুসমাজে তাহারা তাহাদের প্রাপ্য উচ্চস্থান পায় নাই। অথচ সুবর্ণবণিকেরা হিন্দুসমাজের কোন তথাকথিত উচ্চজাতির চেয়েই কোন দিক দিয়া নিকৃষ্ট নহে।

নবজাগ্ৰত হিন্দুসমাজ বৌদ্ধ ও বৌদ্ধাচারসম্পন্নদিগকে কেবল যে হীন ও পতিত করিয়া রাখিয়াছিল তাহা নহে, তাহাদের উপর বহু নিৰ্য্যাতন ও অত্যাচারও করিয়াছিল। ফলে অনেকে দেশ ছাড়িয়া নেপাল, তিব্বত প্ৰভৃতি স্থানে পলাইয়াছিল, যাহারা ছিল তাহারা হিন্দু সমাজে আশ্রয় লইতে বাধ্য হইয়াছিল অথবা আত্মগোপন করিয়াছিল। সুতরাং ইসলাম ধৰ্ম্ম তাহার সাম্যের বাণী লইয়া যখন এদেশে দেখা দিল, তখন এই সব নিৰ্য্যাতিত বৌদ্ধ এবং বৌদ্ধাচারীরা দলে দলে ইসলাম ধৰ্ম্ম গ্ৰহণ করিতে লাগিল। ইসলাম বিজেতা শাসকদের ধৰ্ম্ম হওয়াতে এই ধৰ্ম্মান্তর গ্রহণের কাৰ্য্য আরও সহজ হইল। প্রলোভনের অভাব ছিল না। বাঙলা দেশে নিম্ন জাতীয়দের মধ্যেই বৌদ্ধের সংখ্যা বেশী ছিল এবং ইহারাই বেশীর ভাগ মুসলমান হইল।

ব্ৰাহ্মণশাসিত হিন্দুসমাজ ইসলাম ধৰ্ম্মের এই প্ৰবল আক্রমণ রোধ করিবার জন্য ভ্ৰান্তপথে অগ্রসর হইল। অধিকতর সাম্যভাব বা উদারতর নীতি অবলম্বন করা দূরে থাকুক, হিন্দুসমাজ নিজের চারিদিকে দুর্ভেদ্য দুর্গ রচনা করিল; জাতিভেদের কঠোরতা আরও বর্দ্ধিত হইল, অস্পৃশ্যতা ও অনাচরণীয়তা আরও বেশী প্ৰবল হইল। ইহার ফলে কোনরূপ “যবন সংস্পৰ্শ” ঘটিলেই তাহা পাতিত্যের কারণ বলিয়া গণ্য হইতে লাগিল। “শ্ৰীচৈতন্য চরিতামৃতে” রূপসনাতন ও সুবুদ্ধি রায়ের যে কাহিনী আছে, তাহা হইতে এই “যবন সংস্পৰ্শজনিত” পাতিত্য দোষের স্বরূপ বেশ বুঝা যায়। রূপ সনাতন দুই ভ্ৰাতা গৌড়ের বাদশাহের 1 প্রধান অমাত্য ছিলেন। অনেক সময়েই তাঁহাদিগকে রাজকাৰ্য্য ব্যপদেশে বাদশাহের ভবনেই থাকিতে হইত, ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশাও করিতে হইত। সম্ভবত “আহার্য্য দোষও” কিছু ঘটিয়া থাকিবে। তাঁহারা ছিলেন মূলত কানাড়ী ব্ৰাহ্মণ—তাঁহাদের পূর্বপুরুষেরা বাঙলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করাতে তাঁহারা বাঙালী ব্ৰাহ্মণসমাজেই মিশিয়া গিয়াছিলেন। কিন্তু গৌড়ের বাদশাহের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসাতে ব্ৰাহ্মণসমাজ তাঁহাদিগকে “পতিত” বলিয়া গণ্য করিলেন। শ্ৰীগৌরাঙ্গের কৃপায় ইহারা উভয়েই সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী হন এবং বৃন্দাবনে থাকিয়া ভক্তিধৰ্ম্ম প্রচার করিতে থাকেন। তাহারা বাদশাহের মন্ত্রীরূপে কেবল যে রাজকাৰ্য্যে বিচক্ষণ ছিলেন তাহা নহে, সৰ্বশাস্ত্ৰে প্ৰগাঢ় পণ্ডিতও ছিলেন। তাঁহারা যে সব বৈষ্ণব দর্শনের গ্ৰন্থ লিখিয়া গিয়াছেন, তাহাতেই তাহাদের পাণ্ডিত্য ও অগাধ শাস্ত্ৰজ্ঞানের পরিচয় সুপ্ৰকাশ। গৌড়ীয় বৈষ্ণবধৰ্ম্ম ও দর্শন প্রচারে তাঁহারাই যে অগ্রণী, এমন কি সর্বশ্রেষ্ঠ, একথা বলিলে অত্যুক্তি হয় না। অথচ সমাজের অলঙ্কারস্বরূপ এই দুই ভ্ৰাতাকেই তদানীন্তন ব্ৰাহ্মণসমাজ ‘পতিত’ বলিয়া গণ্য করিয়াছিলেন ।


সুবুদ্ধি রায়ের কাহিনীও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তিনি পূর্ব্বে গৌড়ের রাজা ছিলেন, পরে স্বীয় মুসলমান মন্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতায় রাজ্যচু্যত হন। এই মুসলমান মন্ত্রীই পরে বাদশাহ হন এবং তঁহারই ছলনাতে একবার সুবুদ্ধি রায় কোন “অখাদ্য” দ্রব্যের ভ্রাণ গ্ৰহণ করিয়াছিলেন। সেই অনিচ্ছাকৃত মহা অপরাধের জন্য ব্ৰাহ্মণ পণ্ডিতেরা ব্যবস্থা দিলেন, তাহাকে “তুষানল প্ৰায়শ্চিত্ত” করিতে হইবে। অর্থাৎ তুষের আগুনে ধীরে ধীরে পুড়িয়া আত্মহত্যা করিতে হইবে। মহাপ্ৰভু শ্ৰীগৌরাঙ্গের রূপায় অবশেষে তিনি এই আত্মহত্যার দায় হইতে মুক্তিলাভ করেন এবং একজন ঈশ্বরভক্ত পরম বৈষ্ণব হইয়া উঠেন। 2


বাঙলাদেশে “পীরালি” 3 ব্ৰাহ্মণদের ইতিহাসও ঠিক এই শ্রেণীর ঘটনার সহিত সংসৃষ্ট। এই “পীরালি” ব্ৰাহ্মণদের সম্বন্ধে নানারূপ কাহিনী প্ৰচলিত আছে। তবে কোনরূপ “যবন সংস্পৰ্শ” দোষেই যে তাঁহারা “পীরালিত্ব” প্ৰাপ্ত হইয়াছিলেন, সমস্ত কাহিনীতেই এইরূপ কথা আছে। সম্ভবত এই “পীরালিদের” পূৰ্বপুরুষ রূপ-সনাতনের মতই কোন মুসলমান নবাব বা বাদশাহের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসিয়াছিলেন অথবা সুবুদ্ধি রায়ের মত “অখাদ্যের” ভ্ৰাণ গ্ৰহণ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। কেহ কেহ মনে করেন, ইহাদের কোন পূৰ্বপুরুষ কোন একজন মুসলমান পীরের ভক্ত হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। যে কারণই সত্য হউক, কোনরূপ “যবন সংস্পৰ্শ’ই যে ইহাদের পাতিত্যের কারণ, তাহাতে সন্দেহ নাই। এই “অপরাধে”র জন্য পুরুষপরম্পরাক্রমে ইহাঁরা হিন্দুসমাজে কোণঠাসা হইয়া আছেন। আধুনিককালে যদিও “পীরালি” ঠাকুর বংশের বংশধরগণ নিজেদের বিদ্যা-বুদ্ধি-প্ৰতিভায় বাঙালী হিন্দুসমাজে শীর্ষস্থান অধিকার করিয়াছেন, তবুও তাঁহাদের সেই “মালিন্য” তিরোহিত হয় নাই। হিন্দুসমাজের এই আত্মহত্যাকর নীতির দ্বারা তাহার যে কি গুরুতর ক্ষতি হইয়াছে, তাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

• হুসেন শাহ↩

• প্রায়শ্চিত্ত পুঁছিল তিঁহো পণ্ডিতের স্থানে
 ‌ তাঁরা কহে তপ্তঘৃত খাঞা ছাড় প্রাণে ॥
 প্রভু কহে ইঁহা হইতে যাহ বৃন্দাবন ।
 নিরন্তর কৃষ্ণনাম কর সঙ্কীর্তন ॥
 এক নামাভাষে তোমার পাপ দোষ যাবে ।
 আর নাম লইতে কৃষ্ণ চরণ পাইবে ॥
 শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত—মধ্যলীলা, ২৫শ পরিচ্ছেদ


• মুসলমানের অন্নগ্রহণ দোষপৃষ্ট ব্রাহ্মণ । ঘ্রাণের দ্বারাও অর্ধভোজন হয়, সুতরাং নিষিদ্ধ খাদ্যের ঘ্রাণ-গ্রহণ করলেও পতিত হবার রীতি ছিল । জোড়াসাঁকোর ঠাকুররা ছিলেন পীরালি ব্রাহ্মণ ।

চলবে ...
গ্রন্থঃ ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু
লেখকঃ প্রফুল্লকুমার সরকার
সংগৃহীতঃ হিন্দুত্ববুক্স হতে ।

Share:

জাতিভেদের পরিণাম

এই জাতিভেদের আবির্ভাবের ফলে ভারতের হিন্দুসমাজের দেহ যে বহুল পরিমাণে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছিল, তাহা অনুমান করা কঠিন নহে। আৰ্য্যেরা প্রথমত বিজিত ও অনুন্নত অনাৰ্য্যদিগকে শূদ্ররূপে সমাজদেহে স্থান দিয়া একটা সমন্বয়ের চেষ্টা করিয়াছিলেন বটে। কিন্তু বৰ্ণভেদ এবং উহার অনিষ্টকর পরিণাম জাতিভেদের জন্য তাঁহাদের সেই মহৎ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হইয়া গেল,-হিন্দুসমাজ সঙ্ঘবদ্ধ শক্তিশালী হওয়া দূরে থাকুক, উহার মধ্যে নানাবিধ ভেদ ও অনৈক্যের সৃষ্টি হইল। জাতিভেদের এই অনিষ্টকর পরিণামকে প্ৰতিরোধ করিবার প্ৰবল চেষ্টা হয়। জৈন ধৰ্ম্ম ও বৌদ্ধ ধৰ্ম্মের পক্ষ হইতে। এই দুই ধৰ্ম্মের মূল নীতিই সাম্য ও মৈত্রী। জাতিভেদের বিরুদ্ধে, বিশেষভাবে ব্ৰাহ্মণ্য প্রাধান্যের বিরুদ্ধে উভয়েই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বৌদ্ধধৰ্ম্ম বিশেষভাবে এই কাৰ্যসাধন করে। খ্রীস্টপূর্ব্ব প্রায় ৫ শতক হইতে খ্রীস্টাব্দ প্ৰায় ৭ শতক পৰ্য্যন্ত প্ৰায় ১২০০ শত বৎসরকাল ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধৰ্ম্মের প্রবল প্লাবন বহিয়া গিয়াছিল;– ঐ প্লাবনে হিন্দুসমাজের বর্ণাশ্রম ধৰ্ম্ম যে বিপৰ্য্যস্ত হইয়া গিয়াছিল, জাতিভেদের ভিত্তি শিথিল হইয়া পড়িয়াছিল, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। বৌদ্ধধৰ্ম্ম আরও নানাভাবে হিন্দুসমাজ তথা ভারতের জনসাধারণের উপর প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল বটে, কিন্তু বর্ত্তমানে সেই সমস্ত আলোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নহে। বৰ্ত্তমান প্ৰবন্ধে এই পর্য্যন্ত বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, সনাতন ধৰ্ম্ম বা ‘সদ্ধর্ম্ম’ বৌদ্ধ ধৰ্ম্মের তুলনায় তখন মান হইয়া পড়িয়াছিল, দ্বিজাতি বিশেষভাবে ব্ৰাহ্মণদের পূর্ব্ব প্ৰতাপ ও প্ৰভুত্ব আর ছিল না, - জাতিধৰ্ম্মনির্ব্বিশেষে একটা সাম্যের আদর্শও সমাজে প্ৰতিষ্ঠিত হইয়াছিল।

কিন্তু খ্রীস্টাব্দ ৮ শতক হইতেই বৌদ্ধধৰ্ম্মের প্রভাব হ্রাস হইতে থাকে এবং হিন্দু ধৰ্ম্মের পুনরুত্থান বা নব অভ্যুদয়ের সূচনা হয়। ইহার কারণ একদিকে বৌদ্ধধৰ্ম্মের অধঃপতন এবং বৌদ্ধসঙ্ঘের আভ্যন্তরীণ দুর্নীতি,—অন্যদিকে হিন্দুসমাজে শঙ্করাচাৰ্য্য, কুমারিল ভট্ট প্রভৃতি অশেষ প্ৰতিভাশালী ধৰ্ম্মাচাৰ্য্যগণের আবির্ভাব। বৌদ্ধ ধৰ্ম্মের পতনোন্মুখ সৌধে। ইঁহারা যে প্ৰবল আঘাত করিতে লাগিলেন, উহা প্ৰতিহত করিবার শক্তি ঐ জরাজীর্ণ ধৰ্ম্ম ও সমাজের ছিল না। অবশ্য এই কাৰ্য্য ২/৪ বৎসরে হয় নাই, উহা সম্পন্ন করিতে কয়েক শতাব্দী লাগিয়াছিল। তীক্ষ্ণবুদ্ধি ধীরমস্তিষ্ক ব্রাহ্মণ মনীষী ও ধৰ্ম্মচাৰ্য্যেরা অপূর্ব কৌশলে বৌদ্ধধৰ্ম্মকে হিন্দু ধৰ্ম্মের মধ্যে আত্মসাৎ করিয়া ফেলিতে লাগিলেন। বৌদ্ধ দেবদেবীর নাম পরিবর্ত্তন করিয়া হিন্দু দেবদেবীতে রূপান্তরিত করা হইল; বৌদ্ধমন্দির হিন্দুমন্দিরের মধ্যে আত্মগোপন করিল; বৌদ্ধ আচার, অনুষ্ঠান, উৎসব প্ৰভৃতি নূতন পরিচ্ছদ পরিয়া হিন্দু পূজা-পাৰ্বণ ও অনুষ্ঠানের মধ্যে মিশিয়া গেল। এমন কি হিন্দু দার্শনিকেরা বৌদ্ধ দর্শন ও মতবাদ পৰ্য্যন্ত বেমালুম হজম করিয়া ফেলিলেন। 1
বাঙলাদেশে বৌদ্ধধৰ্ম্ম বিলুপ্ত হইতে সর্বাপেক্ষা বেশী সময় লাগিয়াছিল।

কেননা ভারতবর্ষের কোন প্রদেশে বৌদ্ধ ধৰ্ম্ম এত বেশী আধিপত্য বিস্তার করে নাই। খৃষ্টিয় নবম শতাব্দীর মধ্যেই ভারতের অন্যান্য প্রদেশে হিন্দু ধৰ্ম্মের নবজাগরণ প্ৰায় সম্পূর্ণরূপেই হইয়াছিল, কিন্তু বাঙলাদেশে দ্বাদশ শতাব্দীরও কিয়দংশ পৰ্যন্ত বৌদ্ধ ধৰ্ম্মের প্রাবল্য ছিল। সেইজন্য অন্যান্য প্রদেশের সনাতনপন্থী হিন্দুরা বৌদ্ধাচারপ্লাবিত বাঙলাদেশকে রীতিমত অবজ্ঞার চক্ষেই দেখিতেন। বাঙলাদেশের একাধিক হিন্দুরাজা বৈদিক যজ্ঞহোমাদি অনুষ্ঠান করিবার জন্য কান্যকুব্জ হইতে সাগ্নিক বেদজ্ঞ ব্ৰাহ্মণ আনাইয়া ছিলেন, কেননা বাঙলাদেশে বেদজ্ঞ ব্ৰাহ্মণ ছিলেন না। ;-এইরূপ জনশ্রুতি ইতিহাসের মধ্যেও স্থান পাইয়াছে। বাঙলাদেশের তখনকার অবস্থা বিবেচনা করিলে এই জনশ্রুতি অমূলক বলিয়া মনে হয় না। বাঙলাদেশের পাল রাজগণ বৌদ্ধ ছিলেন। সেন রাজগণের সময়েই প্ৰথম হিন্দুধৰ্ম্মের পুনরুত্থান আরম্ভ হয় এবং যতদূর জানা যায়, রাজা বল্লাল সেনের সময়েই হিন্দু ধৰ্ম্মের পূর্ব গৌরব আবার বহুল পরিমাণে ফিরিয়া আসে। রাজা বল্লাল সেন নিজে শাস্ত্ৰজ্ঞ ও পণ্ডিত ছিলেন, পাণ্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থাবলীও রচনা করিয়াছিলেন। তাঁহার সভাতেও বহু শাস্ত্ৰজ্ঞ ও পণ্ডিত ব্ৰাহ্মণ ছিলেন। বল্লাল সেন তাঁহাদের সহযোগিতায় হিন্দুসমাজের পুনর্গঠন করেন এবং নূতন করিয়া জাতিভেদের পত্তন করেন। আমরা বলিয়াছি, ভারতের অন্যান্য প্রদেশে হিন্দু ধৰ্ম্মের পুনপ্রতিষ্ঠা তাহার দুই তিনশত বৎসর পূর্ব্বেই হইয়াছিল। 2

কি ভারতের অন্যান্য প্রদেশে, কি বাঙলাদেশে বৌদ্ধধৰ্ম্ম ও বৌদ্ধাচারের অবসানের ফলে প্রতিক্রিয়ার স্বাভাবিক নিয়মে জাতিভেদ পূৰ্ব্বাপেক্ষা আরও প্রবলাকার ধারণ করিল। বৃত্তিভেদ অনুসারে নানা নূতন নূতন জাতির সৃষ্টি হইল, উচ্চ-নীচ ভেদ আরও আত্যন্তিক হইল। প্রাচীন বৰ্ণাশ্রমের ধারা বহুপূর্ব্বেই লুপ্ত হইয়া গিয়াছিল, এখন আর তাহার চিহ্নমাত্র রহিল না। তাহার স্থানে হিন্দুসমাজে দেখা দিল অসংখ্য পরস্পরবিচ্ছিন্ন জাতি উপজাতি শাখাজাতি। রাজা বল্লাল সেন বাঙলাদেশে যখন নূতন করিয়া হিন্দুসমাজ বন্ধন করিলেন, তখন তিনি নাকি ছত্রিশটি জাতিতে সমাজকে বিভক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু জাতির সংখ্যা ক্রমেই বাড়িয়া যাইতে লাগিল,- ভাগ-উপভাগ, শাখা-প্ৰশাখা ক্ৰমেই বিস্তৃত হইয়া পড়িতে লাগিল।

বল্লাল সেনের কয়েক শতাব্দী পরে ষোড়শ শতাব্দীতে বাঙলাদেশে নূতন করিয়া আবার সমাজবন্ধন করিলেন স্মাৰ্ত্ত রঘুনন্দন। তখন বোধ হয় ছত্ৰিশ জাতিতে কুলাইতেছিল না, উহার সংখ্যা কমপক্ষে ২৩৬-এ গিয়া পৌঁছিয়াছিল। বৰ্ত্তমানে ডা. ভগবান দাসের হিসাবে হিন্দুসমাজের অন্তর্ভুক্ত জাতি, উপজাতি, শাখাজাতি প্রভৃতির সংখ্যা প্রায় তিন হাজার । অবস্থাভিজ্ঞ মাত্রেই বলিবেন, ইহা কিছুমাত্র অত্যুক্তি নহে । এক বাংলাদেশেই যত রকম সম্ভব অসম্ভব বৃত্তি আছে, তত রকমের জাতিও আছ । যথা-ধোপা, নাপিত, ভূঁইমালী, স্বর্ণকার, গোপ, কুম্ভকার, কাংস্যকার, তন্তুবায়, শঙ্খকার (শাঁখারি), লৌহকার, সূত্রধর, চর্মকার, মোদক, ধীবর, গন্ধবণিক, সুবর্ণবণিক প্রভৃতি । ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য প্রভৃতি তো আছেই । ইহাদের প্রত্যেকের মধ্যে আবার শাখা-প্রশাখা আছে । বাংলাদেশে এক ব্রাহ্মণ জাতির মধ্যেই প্রায় শতাধিক শাখা-প্রশাখা আছে । 3 কি অদ্ভুত উপায়ে এইসব শাখা-প্রশাখার সৃষ্টি হইয়াছে তাহা ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয় । ৩/৪ পুরুষ পূর্ব্বেও যাহারা একই জাতি ছিল, তাহারা বৃত্তিভেদে কিরূপে ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে পরিণত হইয়াছে, তাহার নানা দৃষ্টান্ত এখনও চোখের উপর ভাসিতেছে । ৫০/৬০ বা একশত বছর পূর্ব্বেও যাহাদের মধ্যে আহারব্যবহার বা বৈবাহিক সম্বন্ধ চলিত, তাহারা এখন পরস্পরে সম্পূর্ণ পৃথক জাতি-কেহ কাহারও স্পৃষ্ট অন্ন খায় না, বিবাহাদি তো পরস্পরের মধ্যে হয়-ই না ।

বাংলার কোন এক জাতির পূর্ব পুরুষদের মধ্যে কেহ কেহ মৎস্যজীবী ছিল, আর কতক ছিল চাষী । ইহারাই কালক্রমে দুইভাগ হইয়া দুইটি স্বতন্ত্র জাতিতে পরিণত হইয়াছে । চাষীরা এখন মৎস্যজীবীদের নিজেদের চেয়ে ছোট জাতি মনে করে, াহাদের সঙ্গে কোন জ্ঞাতিত্বই স্বীকার করে না । আর একটা জাতির পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেহ কেহ কাপড় বুনিত আর কতকাংশ সেই কাপড় বিক্রয়ের ব্যবসা করিত । কালক্রমে তাহারা এখন দুইটি পৃথক জাতি হইয়া দাঁড়াইয়াছে । যাহাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেহ কেহ দুধের ব্যবসা করিত এবং কেহ কেহ বা চাষ করিত, তাহাদের মধ্যেও এইরূপ দুইটি স্বতন্ত্র জাতি হইয়াছে । ‘চাষা ধোপা’, ‘মধু মোদক’ প্রভৃতি নামে যে সব স্বতন্ত্র জাতির সৃষ্টি হইয়াছে, তাহাও ঠিক এই প্রণালীতে । হিন্দু সমাজে কিরূপ অদ্ভুত উপায়ে নূতন নূতন জাতির সৃষ্টি হয়, তাহার একটি বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত নিজ অভিজ্ঞতা হইতে এখানে উল্লেখ করিব। উড়িষ্যায় নাপিতদের মধ্যে দুইটি শাখা আছে-‘চাম-মুটিয়া’ এবং ‘কণামুটীয়া’ । প্রাচীনকাল হইতে উড়িষ্যার সব নাপিতই ‘কণামুটীয়া’ ছিল অর্থাৎ তাহারা কাপড়ের ‘ভাঁড়’ 4 ব্যবহার করিত । কিন্তু আধুনিককালে বিদেশ হইতে চামড়ার ‘ভাঁড়ের’ আমদানী হওয়াতে কতকগুলি ‘প্রগতিপন্থী’ নাপিত ঐ চামড়ার ‘ভাঁড়’ কিনিয়া ব্যবহার করিতে লাগিল । ইহাতে প্রাচীনপন্থী নাপিতেরা চটিয়া গিয়া চামড়ার ভাঁড় ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সমস্ত সামাজিক সম্বন্ধ ছিন্ন করল । ফলে ‘কণামুটীয়া’ এবং ‘চাম-মুটীয়া’ এই দুইটি স্বতন্ত্র নাপিত সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হইল । এই দুই নাপিত সম্প্রদায়ের মধ্যে আহারব্যবহার, বৈবাহিক আদানপ্রদান নাই !

• পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, নগেন্দ্রনাথ বসু, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ প্রভৃতির সিদ্ধান্ত দ্রষ্টব্য ।—লেখক↩

• প্রকৃতপক্ষে ষোড়শ শতাব্দীতেও বাঙলাদেশে বৌদ্ধপ্রভাব ছিল। শ্ৰীচৈতন্য প্রচারিত বৈষ্ণব ধৰ্ম্মই উহাকে পরিশেষে আত্মসাৎ করিয়া ফেলে। উড়িষ্যাতেও ঐরূপ ঘটে।-লেখক↩

• মহিমচন্দ্র মজুমদার । ‘গৌড়ে ব্রাহ্মণ’ ২য় সংস্করণ, ১৯০০ ।—লেখক↩

• নাপিতের ক্ষুর—কাঁচি রাখবার আধার↩

চলবে ...
গ্রন্থঃ ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু
লেখকঃ প্রফুল্লকুমার সরকার
সংগৃহীতঃ হিন্দুত্ববুক্স হতে ।

Share:

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বর্ণাশ্রমধর্ম্ম ও জাতিভেদ

ডা. ভগবান দাসের মতে জাতিভেদই হিন্দুসমাজের বর্তমান দুৰ্গতির মূল কারণ। যাহা পূৰ্ব্বে সমাজের স্বাভাবিক অবস্থায়।“বর্ণাশ্ৰমধৰ্ম্ম” ছিল, তাহাই কালক্রমে বিকৃত হইয়া এই ঘোর অনিষ্টকর জাতিভেদ প্রথায় পরিণত হইয়াছে। মহাত্মা গান্ধী এবং আরও কোন কোন মনীষীও এই রূপ কথা ইতিপূৰ্ব্বে বলিয়াছেন। কথাটা অনেকটা সত্য হইলেও, আমাদের মনে হয়, ইহার সবখানি ঐতিহাসিক সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নহে। প্রাচীন ভারতীয় আর্য্যদের মধ্যে বর্ণাশ্রম বা কৰ্ম্মবিভাগের উপর প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থা ছিল বটে, কিন্তু জাতিভেদ যে একেবারেই ছিল না এমন কথা বলা যায় না। জাতিভেদের আরম্ভ হইয়াছিল সেই কালে, যে কালে দ্বিজাতি ও শূদ্র এই দুই বৃহৎ শ্রেণীবিভাগ হইয়াছিল। দ্বিজাতি বলিতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিন বর্ণকে বুঝাইত। ইহারা সকলেই ছিলেন আর্য্য। এই তিন বর্ণের মধ্যে আহার ব্যবহারে, বিবাহের আদান- প্রদানে বিশেষ কোন ভেদ ছিল না। ইহার পরেই একটা দুর্ল্লঙ্ঘ্য গণ্ডী টানিয়া দেওয়া হইয়াছিল—আর সেই গণ্ডীর অপর পারে ছিল শূদ্রেরা।

শূদ্র বলিতে ‘অনাৰ্য্যদের’ বুঝাইত। আর্য্যেরা ভারতে আসিয়া আদিম অধিবাসী অনাৰ্য্যদের যুদ্ধে পরাজিত করিয়া কতকাংশকে ধ্বংস করিয়া ফেলিলেন। যে সব অনার্য্য আর্য্যদের শরণাপন্ন হইল, তাহাদের দাস বা অনুগত হইয়া বাস করিতে সম্মত হইল, তাহারাই আখ্যা পাইল শূদ্র (মূল শব্দ ‘ক্ষুদ্র’)। তাহারা আর্য্যদের পরিচর্য্যা করিয়া তাহাদের সমাজের আওতায় কোনরূপে জীবন ধারণ করিতে লাগিল (‘পরিচর্য্যাত্মকং কৰ্ম্ম শূদ্ৰস্যাপি স্বভাবজং)। কিন্তু শুধু পরিচর্য্যার অধিকারটুকুই তাহারা পাইল,— আৰ্য্যেরা তাহাদের সঙ্গে আহার-ব্যবহার মেলা-মেশা করিতেন না, বৈবাহিক আদান-প্রদান তো দূরের কথা। ‘অস্পৃশ্যতা’ ও ‘অনাচরণীয়তার’ সূচনা হইল এইখানেই।
কিন্তু এইখানেই শেষ নয়। শূদ্রদের মধ্যেও আবার একটা গণ্ডী টানা হইল। তাহাদের মধ্যে যাহারা নিতান্ত হীন, অধম বা বৰ্ব্বর বলিয়া বিবেচিত হইল, তাহারা হইল ‘অন্ত্যজ’। ইহারা আর্য্যদের অধ্যূষিত গ্রামে বা নগরে থাকিতে পারিত না, উহার বাহিরে প্রান্তসীমায় থাকিতে বাধ্য হইত। শূদ্রেরা চতুর্থবৰ্ণ বলিয়া গণ্য হইয়াছিল। আর এই অন্ত্যজদের বলা হইত ‘পঞ্চমবৰ্ণ। 1 ভারতের সকল প্রদেশেই এই পঞ্চমবর্ণের অস্তিত্ব এককালে ছিল।

এখনও দক্ষিণ ভারতে বিশেষত মাদ্রাজে তাহার জীবন্ত নিদর্শন বিদ্যমান। এই পঞ্চমবর্ণয়েরা এমনই ‘হীন ও অধম’ যে, তাহারা গ্রাম বা সহরের এলাকার বাহিরে বাস করিতে বাধ্য হয়, রাজপথ দিয়া হাটিতে পারে না। সাধারণের ব্যবহার্য্য কূপ হইতে জল তুলিতে পারে না। ব্রাহ্মণ দেখিলে পলায়ন করে, পাছে তাহাদের গায়ের বাতাস লাগিয়া ব্রাহ্মণ অশুচি হয়। আমাদের বাঙ্গলা দেশেও অন্ত্যজদের বংশীয়েরা আছে, কিন্তু তাহাদের এতটা সামাজিক নিৰ্য্যাতন বা দুর্ভোগ সহ করিতে হয় না।

এই যে দ্বিজাতি, শূদ্র এবং অন্ত্যজ—ইহাই হিন্দুসমাজে প্রথম জাতিভেদ। আর্য্যেরা অবশ্য নিজেদের রক্তের বিশুদ্ধি তথা সভ্যতা সংস্কৃতি রক্ষার জন্যই এরূপ সতর্কতা অবলম্বন করিয়াছিলেন। কিন্তু উহার ফলে যে বিষবৃক্ষের বীজ উপ্ত হইয়াছিল, তাহাই কালক্রমে বৰ্দ্ধিত ও শাখা- প্রশাখা সমম্বিত হইয়া সহস্রশীর্ষ জাতিভেদরূপে প্রকট হইল।
হিন্দু সমাজে যে অস্পৃশ্যতারূপ ব্যাধি প্রবল হইয়া উঠিয়াছে, তাহারও ভিত্তি পূৰ্ব্বোক্ত আৰ্য-অনাৰ্য্য ভেদের উপর। দ্বিজাতির শূদ্র ও অন্ত্যজদের স্পর্শ করিতেন না, করিলে ‘ধৰ্ম্মহানি’ হইত, তাহাদের প্রস্তুত বা পৃষ্ট আহাৰ্য্য-পানীয় গ্রহণ করা তো দূরের কথা। কালক্রমে পরিচর্য্যার গুণে শূদ্রদের মধ্যে কেহ কেহ দ্বিজাতিদের স্পৃশ্য ও আচরণীয় হইল বটে, কিন্তু অনেকে পূৰ্ব্ববং অস্পৃশ্য ও অনাচরণীয়ই রহিয়া গেল। অন্ত্যজদের তো কাহারও ভাগ্যের উন্নতি হইলই না। বাঙ্গলা দেশের হিন্দুসমাজে অস্পৃশ্য ও অনাচরণীয় উভয়ই আছে। কতকগুলি জাতি অনাচরণীয়? (যাহাদের জল ‘চল’ নহে) কিন্তু অস্পৃশ্য নহে, – অপর কতকগুলি উভয়ই।

সুতরাং ডাক্তার ভগবান দাস যে বলিয়াছেন, প্রাচীনকালে হিন্দু- সমাজে বর্ণাশ্রম ছিল, জাতিভেদ ছিল না, তাহার মধ্যে এইটুকু সত্য যে, আৰ্য্য ‘দ্বিজাতিদের’ মধ্যে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য) জাতিভেদ ছিল না,—আহার-ব্যবহার, বৈবাহিক আদান-প্রদান তাহাদের পরস্পরের মধ্যে চলিত। একের বংশধরেরা অন্যের বৃত্তি অবলম্বন করিতে পারিত। কিন্তু এরূপ “বিশুদ্ধ” বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা খুব বেশীদিন অব্যাহত ছিল বলিয়া মনে হয় না। মহাভারতের যুগেও দেখি,—দ্বিজাতিদের মধ্যে বৃত্তি অনেকটা বংশানুক্রমিক হইয়া উঠিয়াছে অর্থাৎ বর্ণাশ্রম জাতি- ভেদের আকার ধারণ করিতে আরম্ভ করিয়াছে। ব্রাহ্মণের বংশধরেরা ব্রাহ্মণের বৃত্তিই অবলম্বন করিত, কেহ কদাচিৎ ক্ষত্রিয় বৃত্তি অবলম্বন করিত।
আবার ক্ষত্রিয়দের মধ্যেও কেহ কদাচিৎ ব্রাহ্মণ্য-বৃত্তি অবলম্বন করিত। কিন্তু লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে, ক্ষত্ৰিয়বৃত্তি অবলম্বনকারী ব্রাহ্মণের “ক্ষত্ৰিয়” বলিয়া গণ্য হইতেন না, ব্রাহ্মণই থাকিয়া যাইতেন। যথা দ্রোণাচাৰ্য্য, কৃপাচাৰ্য্য, অশ্বথামা প্রভৃতি। পরশুরামের কথাও এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। বৈশ্য অধিরথ-পুত্র কর্ণ ক্ষত্ৰিয়বৃত্তি গ্রহণ করিলেও ক্ষত্রিয় বলিয়া গণ্য হন নাই। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য-এই তিন বর্ণের মধ্যে বিবাহের আদান-প্রদান চলিত বটে, কিন্তু তাহার দৃষ্টান্ত অল্প। এই সমস্ত হইতে বুঝা যায়, মহাভারতের যুগেই দ্বিজাতিদের মধ্যে জাতিভেদ বেশ দানা বাঁধিয়া উঠিয়াছিল এবং অনেকটা পাকাপাকি- ভাবেই ‘বৃত্তি’ বংশানুক্রমিক হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।

সঙ্গে সঙ্গে আর একটা ব্যাপার ঘটিল—যাহাতে জাতিভেদের কাঠামো আরও বেশী দৃঢ়তর হইল। আর্য্যসমাজের প্রথমাবস্থায় দ্বিজাতিদের মধ্যে উচ্চনীচ-ভেদ বিশেষ ছিল না, সকলেরই মর্য্যাদা সমান ছিল। কিন্তু কালক্রমে নানা কারণে ব্রাহ্মণদের মর্যাদা খুব বাড়িয়া গেল, তাঁহারাই সমাজের শীর্ষস্থান অধিকার করিলেন। ক্ষত্রিয়ের মর্যাদা ব্রাহ্মণের পরে এবং বৈশ্যের মর্য্যাদা ক্ষত্রিয়ের পরে নির্দিষ্ট হইল। ফলে, পরস্পরের মধ্যে আহারব্যবহার, বৈবাহিক আদানপ্রদান ক্রমশ লুপ্ত হইল। ব্রাহ্মণ যদি ক্ষত্রিয়ের চেয়ে বেশী মানী হন, তাহার বাড়ীতে অন্নগ্রহণ না করেন, তবে তিনি ক্ষত্রিয়ের কন্যাকে বিবাহ করিবেন কিরূপে? ক্ষত্ৰিয়ই বা ব্রাহ্মণকন্যার পাণি-পীড়নের সাহস সঞ্চয় করিবেন কিরূপে? মহাভারতে যে সমাজের দৃশ্য অঙ্কিত হইয়াছে, তাহাতে এই সব প্রথা তখনই যে অনেকটা বদ্ধমূল হইয়াছিল, তাহা বেশ বুঝিতে পারা যায়।

এইভাবে দ্বিজাতিদের মধ্যে জাতিভেদ যখন বেশ পাকারকম হইয়া দাঁড়াইল, তখন আর একটা জটিল সমস্যার সৃষ্টি হইল। বর্ণবিভাগকে গণ্ডী টানিয়া জাতিভেদে পরিণত করা যায়, কিন্তু সহস্ৰ চেষ্টা করিয়াও বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ বন্ধ করা যায় না। সেক্ষেত্রে জীবপ্রকৃতি মানুষের সকল বিধিনিষেধকে অগ্রাহ করিয়া সমাজশাসনের অনভিপ্রেত কাণ্ড করিয়া বসে। সুতরাং বিধিনিষেধ সত্ত্বেও ব্রাহ্মণ-ক্ষত্ৰিয়, ক্ষত্রিয়-বৈশ্য, বৈশ্য-ব্রাহ্মণ প্রভৃতির বৈবাহিক মিলন ঘটিতে লাগিল। ফলে, বিভিন্ন মিশ্র জাতি বা সঙ্করজাতির সৃষ্টি হইতে লাগিল। বলা বাহুল্য, এই প্ৰাকৃতিক নিয়ম হইতে অনাৰ্য্য শূদ্রেরাও বাদ গেল না-তাহাঁদের যুবকযুবতীদের সঙ্গেও ব্রাহ্মণ, ক্ষত্ৰিয়, বৈশ্যের বৈবাহিক মিলন ঘটিতে লাগিল। কালক্রমে এই যে সব সঙ্করজাতির সৃষ্টি হইল, তাহাদিগকে সমাজের কোথায় স্থান দেওয়া হইবে, ইহা এক মহাসমস্যা হইয়া দাড়াইল।

এই সমস্যার বিপুলতা ও জটিলতার প্রমাণ “মনুসংহিতা’ হইতে পাওয়া যায়। সঙ্করজাতির সৃষ্টি অবশ্য মোটেই বাঞ্ছনীয় ছিল না, বরং অত্যন্ত নিন্দনীয়ই ছিল। “গীতায়’ অৰ্জ্জুন বলিয়াছেন, ‘সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্যচ’ 2। কিন্তু তৎসত্ত্বেও “বৰ্ণসঙ্কর”দের কিছুতেই অগ্ৰাহ্য বা উপেক্ষা করা গেল না, সমাজে তাহাদিগকে স্থান দিতেই হইল; চারিবর্ণ বা চারিজাতি ভাঙ্গিয়া বহুবর্ণ বহুজাতিতে পরিণত হইল। এইরূপে জাতিভেদ বেশ জাঁকালো রকমে বহু বিচিত্ৰ মূৰ্ত্তিতে হিন্দুসমাজে তাহার শাখাপ্রশাখা বিস্তার করিল।

চলবে ...

গ্রন্থঃ ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু
লেখকঃ প্রফুল্লকুমার সরকার
সংগৃহীতঃ হিন্দুত্ববুক্স হতে ।



Share:

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কুরুক্ষেত্রের সৃষ্টি কিভাবে হলো ? কুরুক্ষেত্র কি শুধুই যুদ্ধক্ষেত্র নাকি অন্য কিছু ?

কুরুক্ষেত্র একটি চক্র বা জনপদ। ঐ চক্র এখনকার স্থানেশ্বর বা থানেশ্বর নগরের দক্ষিণবর্ত্তী। আম্বালা নগর হইতে উহা ১৫ ক্রোশ দক্ষিণ। পানিপাট হইতে উহা ২০ ক্রোশ উত্তর। কুরুক্ষেত্র ও পানিপাট ভারতবর্ষের যুদ্ধক্ষেত্র, ভারতের ভাগ্য অনেক বার ঐ ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি পাইয়াছে। “ক্ষেত্র” নাম শুনিয়া ভরসা করি, কেহ একখানি মাঠ বুঝিবেন না। কুরুক্ষেত্র প্রাচীন কালেই পঞ্চ যোজন দৈর্ঘ্যে এবং পঞ্চ যোজন প্রস্থে। এই জন্য উহাকে সমন্তপঞ্চক বলা যাইত। চক্রের সীমা এখন আরও বাড়িয়া গিয়াছে।





কুরু নামে এক জন চন্দ্রবংশীয় রাজা ছিলেন। তাঁহা হইতেই এই চক্রের নাম কুরুক্ষেত্র হইয়াছে। তিনি দুর্য্যোধনাদির ও পাণ্ডবদিগের পূর্ব্বপুরুষ; এজন্য দুর্য্যোধনাদিকে কৌরব বলা হয়, এবং কখন কখন পাণ্ডবদিগকেও বলা হয়। তিনি এই স্থানে তপস্যা করিয়া বর লাভ করিয়াছিলেন, এই জন্য ইহার নাম কুরুক্ষেত্র। মহাভারতে কথিত হইয়াছে যে, তাঁহার তপস্যার কারণেই উহা পুণ্যতীর্থ। ফলে চিরকালই কুরুক্ষেত্র পুণ্যক্ষেত্র বা ধর্ম্মক্ষেত্র বলিয়া প্রসিদ্ধ। শতপথ ব্রাহ্মণে আছে, “দেবাঃ হ বৈ সত্রং নিষেদুরগ্নিরিন্দ্রঃ সোমো মখো বিষ্ণুর্বিশ্বেদেবা অন্যত্রেবাশ্বিভ্যাম্। তেষাং কুরুক্ষেত্রং দেবযজনমাস। তস্মাদাহুঃ কুরুক্ষেত্রং দেবযজনম্।” অর্থাৎ দেবতারা এইখানে যজ্ঞ করিয়াছিলেন, এজন্য ইহাকে “দেবতাদিগের যজ্ঞস্থান” বলে।

মহাভারতের বনপর্ব্বের তীর্থযাত্রা পর্ব্বাধ্যায়ে কথিত হইয়াছে যে, কুরুক্ষেত্র ত্রিলোকীর মধ্যে প্রধান তীর্থ। বনপর্ব্বে কুরুক্ষেত্রের সীমা এইরূপ লেখা আছে-“উত্তরে সরস্বতী, দক্ষিণে দৃষদ্বতী; কুরুক্ষেত্র এই উভয় নদীর মধ্যবর্ত্তী।” (৮৩ অধ্যায়) মনুসংহিতায় বিখ্যাত ব্রহ্মাবর্ত্তেরও ঠিক সেই সীমা নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে।-
সরস্বতীদৃষদ্বত্যোর্দেবনদ্যোর্যন্তরং।
তং দেবনির্ম্মিতং দেশং ব্রহ্মাবর্তং প্রচক্ষতে || ২। ১৭।

অতএব কুরুক্ষেত্র এবং ব্রহ্মাবর্ত্ত একই। কালিদাসের নিম্নলিখিত কবিতাতে তাহাই বুঝা যাইতেছে।
ব্রহ্মাবর্ত্তং জনপদমথচ্ছায়য়া গাহমানঃ
ক্ষেত্রং ক্ষত্রপ্রঘনপিশুনং কৌরবং তদ্ভজেথাঃ।
রাজন্যানাং শিতশরশতৈর্যত্র গাণ্ডীবধন্বা
ধারাপাতৈস্ত্বমিব কমলান্যভ্যবর্ষন্ মুখানি ||
-মেঘদূত ৪৯।
কিন্তু মনুতে আবার অন্য প্রকার আছে। যথা-
কুরুক্ষেত্রঞ্চ মৎস্যাশ্চ পঞ্চলাঃ শূরসেনকাঃ।
এষ ব্রহ্মর্ষিদেশো বৈ ব্রহ্মাবর্ত্তাদনন্তরঃ ||

অপেক্ষাকৃত আধুনিক সময়ে চৈনিক পরিব্রাজক হিউন্থসাঙ্‌ও ইহাকে স্বীয় গ্রন্থে “ধর্ম্মক্ষেত্র” বলিয়াছেন।1
কুরুক্ষেত্র আজিও পুণ্যতীর্থ বলিয়া ভারতবর্ষে পরিচিত; অনেক যোগী সন্ন্যাসী তথা পরিভ্রমণ করেন। কুরুক্ষেত্রে অনেক ভিন্ন ভিন্ন তীর্থ আছে। তাহার মধ্যে কতকগুলি মহাভারতের যুদ্ধের স্মরাক স্বরূপ। যে স্থানে অভিমন্যু সপ্তরথিকর্ত্তৃক অন্যায়-যুদ্ধে নিহত হইয়াছিলেন, সে স্থানকে এক্ষণে ‘অভিমন্যুক্ষেত্র’ বা ‘অমিন’ বলিয়া থাকে। যেখানে আজিও পুত্রহীনারা পুত্রকামনায় অদিতির মন্দিরে অদিতির উপাসনা করে। যেখানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত যোদ্ধাদিগের সৎকার সমাপন হইয়াছিল, ক্ষেত্রের যে ভাগ সেই বীরগণের অস্থিতে সমাকীর্ণ হইয়াছিল, এখনও তাহাকে ‘অস্থিপুর’ বলে। যেখানে সাত্যকিতে ও ভূরিশ্রবাতে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়, এবং অর্জ্জুন সাত্যকির রক্ষার্থ অন্যায় করিয়া ভূরিশ্রবার বাহুচ্ছেদ করেন, সে স্থানকে এক্ষণে ‘ভোর’ বলে। জনপ্রবাদ আছে যে, ভূরিশ্রবার সালঙ্কার ছিন্ন হস্ত পক্ষীতে লইয়া যায়। সেই ছিন্ন হস্তের অলঙ্কারে একখণ্ড বহুমূল্য হীরক ছিল। তাহাই কহীনুর, এক্ষণে ভারতেশ্বরীর অঙ্গে শোভা পাইতেছে। কথাটা যে সত্য, তাহার অবশ্য কোন প্রমাণ নাই।

কুরুক্ষেত্রের নাম বাঙ্গালীমাত্রেরই মুখে আছে। একটা কিছু গোল দেখিলে বাঙ্গালীর মেয়েরাও বলে, “কুরুক্ষেত্র হইতেছে”। অথচ কুরুক্ষেত্রের সবিশেষ তত্ত্ব কেহই জানে না। বিশেষ টম্‌সন, হুইলর প্রভৃতি ইংরেজ লেখকেরা সবিশেষ না জানিয়া অনেক গোলযোগ বাধাইয়াছেন। তাই কুরুক্ষেত্রের কথা এখানে এত সবিস্তারে লেখা গেল।

 সংগৃহীত
Share:

২৩ আগস্ট ২০১৮

বঙ্গীয় হিন্দু সমাজে সামাজিক একতা এত লুপ্তপ্রায় কেনো ?

বর্তমান দিনে আমরা একটা বাস্তব কথার সাথে খুব পরিচিত:

"যদি কিছু হিন্দুর সাথে কিছু মুসলিমের ঝামেলা হয় তাহলে হিন্দুদের দল থেকে কিছু হিন্দু পলায়ন করবে আর অপর দিকে মুসলিমের দলে কিছু মুসলিম যোগ দান করবে"
যদি এর কারণ অনুসন্ধান করা যায়, তাহলে আমার মতে এর ৫টা কারণ হতে পারে:-







১. ভ্রাত্রিয়তা বোধের অভাব:-

বর্তমান বঙ্গীয় হিন্দু সমাজে সামাজিক একতা লুপ্তপ্রাপ্তির একটা প্রধান কারণ এটি। একটা উদাহরণ দিচ্ছি-
ধরুণ আমি কোনো স্থানে বিনা দোষে কোনো মুসলিম বা হিন্দুর দ্বারা অত্যাচারীত হচ্ছি। আর আপনি আমার কাছে আছেন, আর আমি আপনার কাছে সাহায্যের জন্য বার বার আবেদন করছি। আর আপনি সব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন আর মনে মনে Ignore করছেন ও সাহায্যের জন্য এগিয়েও আসছেন না। আপনি মনে মনে ভাবছেন "আমি আপনার কে হই, যার জন্য আমাকে আপনি সাহায্য করবেন"। এবার ঘটনা টিকে উল্টে দেওয়া যাক-
অত্যাচারীত হচ্ছেন আপনি আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। আপনি আমার কাছে সাহায্য চাইছেন আর আমিও Ignore করছি। এই সময় আপনার মানসিক অবস্থা কেমন হবে আশা করছি আমাকে আর বলতে হবে না।
কিন্তু যদি আপনার ও আমার মধ্যে ভ্রাত্রিয়তা বোধ টুকু থাকতো তাহলে আপনাকে বিনা দোষে নিপীড়ন হবার কোনো প্রশ্নই থাকতো না, কারণ ভ্রাত্রিয়তা বোধের জন্য আমি আপনার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতাম। কিন্তু বর্তমানে "প্রতিটি হিন্দু পরস্পরের ভাই" এই কথা টা যেন লুপ্তপ্রায় হচ্ছে। ফলে আমাদের সামাজিক একতায় ফাটল ধরছে।বর্তমান দিনে হিন্দু সমাজে সামাজিক একতা কে ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হল পরস্পরের মধ্যে সাহায্যের আদান প্রদান করা।তাই আমি প্রতিটি হিন্দুদের বলছি আপনারা যথাসাধ্য মতো অপর এক হিন্দুদের সাহায্য করুণ ও নিজেদের মধ্যে ভ্রাত্রিয়তা বোধ গড়ে তুলুন, যাতে আমরা একে অপরের সাহায্যে সময় বিনা দ্বিধাবোধে এগিয়ে আসতে পারি।চেস্টা করুন চেস্টা করতে দ্বিধাবোধ করছেন কেনো।

২. স্বার্থপরতা:-
 
বর্তমান বঙ্গীয় হিন্দু সমাজে সামাজিক একতা লুপ্তপ্রাপ্তির এটি আরেকটি কারণ। আমাদের বঙ্গীয় হিন্দু সমাজে এক শ্রেণীর মানুষ আছে যাদের "নিজ স্বার্থপরতা" গুনের জন্য সামাজিক একতা ও ভ্রাত্রিয়তা বোধের মধ্যে ফাটল সৃস্টি করে। এই শ্রেণীর মানুষেরা সাহায্য নেবার সময় সবসময় প্রস্তুত কিন্তু সাহায্য দেবার সময় হাত গুটিয়ে নেবে, একমাত্র নিজের স্বার্থ ছাড়া কাউকে সাহায্য করবে না, এমন কি এই সব মানুষের দ্বারা যারা প্রতারিত হয় তাদেরও মন থেকে ভ্রাত্রিয়তা বোধ উড়ে যায় এবং সেও স্বার্থপর হয়ে উঠে। যার ফলে সামাজিক একতা ও ভ্রাত্রিয়তা বোধের লুপ্তপ্রায় ঘটে।এই শ্রেণীর মানুষদের শোধন এর জন্য আমাদের প্রতিবার এদের সামনে একটি করে বাস্তব বোধমূলক উদাহরণ তুলে ধরতে হবে, যে উদাহরণের দ্বারা সে বুঝতে পারে নিজ স্বার্থপরতার দরুণ সে কিভাবে অন্য মানুষের কাছে ছোটো হচ্ছে ও সমাজে সামাজিক একতা মধ্যে ফাটল ধরাচ্ছে। এরপর যদিও সে বুঝতে না পারে তাহলে যতটা পারবেন ওনাকে Ignore করার চেস্টা করবেন।কারণ দুস্ট গোরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভালো।

৩. সাহসিকতার অভাব:-
 
সামাজিক একতা তৈরির জন্য সাহসিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাহসিকতার অভাবে একতা তৈরির হলেও সেটা কার্যকারী হয়ে উঠতে পারে না। আপনার মধ্যে সাহসিকতার আছে কিনা তা জানার জন্য আপনি নিজে কে ৫টি প্রশ্ন করুন:-
১) আপনি কি অন্যায় কে সহ্য করে মাথা নিচু করে বাঁচবেন না ন্যায় কে সঙ্গী করে মাথা উঁচু করে বাঁচবেন ?
২) আপনার উপকারে যদি কতগুলি মানুষের উপকার হয় তবে আপনি কি সেই উপকারে উপস্থিত থাকবেন না সেখান থেকে কেটে পরবেন ?
৩) আপনি কি ঐ মানুষদের উপকার করে তাদের কাছে থেকে "একজন সত্যিকারের বন্ধু" হিসাবে পরিচিত হতে চান না "বেইমান" হিসাবে পরিচিত হতে চান?
৪) ঐ মানুষদের উপকারের জন্য যদি আপনাকে কয়েকটি আঘাত খেতে হয়, তবে আপনি কি সেখান থেকে পলায়ন করবেন না একজন সহকারী হিসাবে সেখানে উপস্থিত থাকবেন ?
৫) আপনার একটি সাহায্য যদি পরস্পরের ভ্রাত্রিয়তা বোধ সম্পর্ক কে পুনঃজীবন দিতে পারে তবে আপনি কি সেই সাহায্য করবেন ?
যদি আপনার মন আপনাকে কার্য করার জন্য উৎসাহ দেয় তাহলে আপনি নিঃসন্ধেহে একজন ন্যায়বাদী সাহসী, আর যদি বাধাদেয় তাহলে আপনি নিঃসন্ধেহে একজন দূর্বল মানসিকতা সম্পন্ন বেক্তি।আরেকটা জিনিস আমাদের ভালোভাবে মনে রাখতে হবে -"একটি লাঠি যদি অল্পচাপ পাই তাহলে সেটা ভেঙে যায় কিন্তু লাঠির সংখ্যা বাড়ানোর সাথে সাথে বেশী চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাই ও একটি অভঙ্গুর লাঠি স্তম্ভ তৈরি করে"।

৪. হিন্দু সামাজিক Cast System:-


বঙ্গীয় হিন্দু সমাজে সামাজিক একতা ভাঙনের এটা একটা প্রধান কারণ, এখনও বর্তমান দিনে বঙ্গীয় হিন্দুরা এই মিথ্যা Cust System কে মেনে চলে। কিন্তু হিন্দুধর্ম মতে Cust System এর কোনো স্থান নেই এবং প্রতিটি মানুষ সমান অধীকারী, এই Cust System এর জন্য হিন্দু্দের মধ্যে ভেদা ভেদ তৈরী হয়, একজন বলে "আমি জ্ঞানী, আমি উঁচু, আমি মাথা" অপর জন বলে "আমি জ্ঞানী, আমি উঁচু, আমি মাথা" "তুই মূর্খ, তুই নিচু, তুই ল্যাজ। এই মনোভাবের জন্য দুটি ভিন্ন Cust এর হিন্দু্দের মধ্যে একতা তৈরী হয় না। এর জন্য আমাদের এই মিথ্যা Cust System কে ভুলে, মনে রাখতে হবে স্বামী বিবেকানন্দের কথা -
"হে ভারত ভুলিও না নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত তোমার ভাই"
"হে বীর, সাহস অবলম্বন কর, সদর্পে বল-আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই"
(স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা ৬ খন্ড ২৪৯ পৃস্ঠা)
আবারও বলছি চেস্টা করুন অন্য জনকে অনুপ্রেরণা জোগান, এটা সম্ভব নয় বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না, চেস্টা করুন, আপনি কয়বার চেস্টা করেছেন ???

৫. উপযুক্ত সনাতনী শিক্ষার অভাব:-

 
বর্তমান দিনে উপযুক্ত সনাতনী শিক্ষার অভাব মানুষের অধঃপতনের একটি মুখ্য কারণ। মুসলিমরা যেমন মাদ্রাসাতে গিয়ে সঠিক ইসলামিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, স্কুল কলেজে গিয়ে ইসলামিক শিক্ষার উপর ডিগ্রী গ্রহণ করতে পারে, যার ফলে ওরা শুধু নিজের জাতি কে এগিয়ে নিয়ে যাবার উৎসাহ পাই। কিন্তু আমরা হিন্দুরা এই দিকে অনেক পিছিয়ে আছি। তাই আমরা আস্তে আস্তে লুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বর্তমান সালের সাথে সাথে যত আমরা এগিয়ে যাচ্ছি তেমনি উপযুক্ত সনাতনী শিক্ষার অভাবে আমরা অন্ধকার রূপী কুসংস্কার, অনৈতিক, অধার্মিক, অমানবিক প্রবৃত্তির দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছি। ফলে সামাজিক একতা তো দূরে থাক নিজের মায়ের পেটের ভাই এমন কি নিজের জন্মদাতা বাবা মায়ের সঙ্গেও সঠিক সম্পর্ক রাখতে চাই না। ফলে সামাজিক ও পারিবারিক একতা দুটি শুন্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

তাই আমি প্রতিটি হিন্দুদের বলছি- নিজ সন্তান সন্তানীদের শুধমাত্র পুঁথিগত বিদ্য না দিয়ে, উপযুক্ত সনাতনী শিক্ষায় শিক্ষিত করুন। অথ্যাৎ ভগবত গীতা বা বেদ এর জ্ঞানের সাথে পরিচয় করান, কারণ এই জ্ঞান তার ভবিষ্যৎ জীবন যাত্রার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যদি সময়ের অভাব হয় তাহলে সারাদিনে একবার ভগবত গীতা বা বেদ এর একটি শ্লোক বা মন্ত্র পড়ান ও বুঝান।

এই একতা কেই ভিত্তি করে প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান দিন পর্যন্ত বহু জীবজন্তু এখনো বেঁচে রয়েছে, যদি তাদের এই একতা নস্ট হত তাহলে তাদের আর এই বর্তমান দিনে দেখা যেতোনা, এমন কি এই একতা নস্ট হবার জন্য অনেক জীবজন্তু লুপ্ত হয়ে গেছে। কারণ এদের উপর ডারউইনের যোগ্যতমের উদবর্তন (Survival of the fittest) ও প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural selection) নীতি প্রয়োগ হয়েছিল, আমরা মানুষ হলেও আমরা একটি জীব তাই এই নীতি আমাদেরও উপর প্রয়োগ হতে পারে, তাই "সাবধান"।

এখন এই বর্তমান দিনে যদি আমরা নিজেদের মধ্যে একতা গড়ে তুলতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে আমাদের কাছে কেবল মাত্র ২টি রাস্তা খোলা থাকবে
১. কারো গোলামি করা.
২. লুপ্ত হয়ে যাওয়া.
Choice is yours?
লেখার মাধ্যমে যদি কোন ভূল হয় সবাই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

আপনার বন্ধুদের আমাদের ওয়েভসাইটে  #ইনভাইট করুন যাতে করে তারাও আপনার মত ধর্মীয় ঞ্জান অর্জনের সুযোগ পায়।

☀  হরে কৃষ্ণ  ☀

Collected:   আশীর্বাদ - Ashirbad
Share:

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রকৃত ও অলৌকিক ইতিহাস

ঢাকেশ্বরী মন্দির কত পুরাতন তা সঠিক ভাবে কেহই বলতে পারেনি । বহুবছর অাগে এখানে কিছু কাঠুরে জঙ্গলে কাঠ কাটতে এসে একটি অষ্টভূজা দূর্গা দেবীর মুর্তি লতাপাতা দ্বারা অাবৃত অবস্থায় দেখতে পান । তারপর তারা সেখানে কুড়ে ঘড়ের মন্দির নির্মাণ করে এবংস্থানটি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বলে উক্ত দেবীকে গঙ্গা দেবী রূপে পূজা অর্চনা শুরু করেন । এখানে ঈশ্বরী লতা পাতায় ঢাকা ছিল বিধায় উক্ত মন্দিরটি ঢাকা+ঈশ্বরী = ঢাকেশ্বরী মন্দির বলা হয় । ধীরে ধীরে এখানে ভক্ত সমাগম বাড়তে থাকে ।


বহুকাল পরে ১১০০ খ্রিষ্টাব্দে ‌সেন অামলে রাজা বল্লাল সেন এর মাতা রাজা বিজয় সেনের স্ত্রী অষ্টমী স্নান করার জন্য লাঙ্গলবন্দ এসেছিলেন । এখানে রাত্রিবাসকালীন তিনি দেবী দূর্গার সপ্নাদেষ পান তার স্নান সিদ্ধ হওয়ার জন্য দেবী দর্শন অাবশ্যক। তখন তিনি লোকজনের থেকে খোঁজ নিয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে অাসেন এবং মায়ের দর্শন লাভ করে তীর্থ পূর্ণ করেন । তিনি সেই সময় ঢাকেশ্বরীতে অষ্ট ধাতু দিয়ে মায়ের দশভূজা দূর্গা মুর্তি স্থাপন করেন । বিগ্রহের উচ্চতা দেড় ফুটের মতো ,দেবীর দশ হাত, কাত্যায়নী মহিষাসুরমর্দিনী দূর্গা রূপী, পাশে লক্ষী-সরস্বতী ও নিচে কার্তিক-গণেশ ।বাহন রূপে পশুরাজ সিংহ দন্ডায়মান যার ওপর দাঁড়িয়ে দেবী মহিষাসুরকে বধ করেছেন ।


এবং তিনি এক কক্ষ বিশিষ্ট স্থায়ী মন্দির নির্মাণ করেন, যাহা বর্তমানে মূল মন্দিরের মধ্যের কক্ষ । এবং তিনি ভক্তদের জলের সুবিধার জন্য তিনটি জলকূপও খনন করেন । স্থানীয় লোকজনের নিজ চোখে দেখা এই তিনটি কুপের একটিতে গভীর রাতে দেবী দূর্গা লাল পাইড়ের সাদা শাড়ি পরে স্নান করে অাবার মন্দিরে প্রবেশ করে অদৃশ্য হয়ে যেতেন । প্রচলিত নিয়ম অনুসারে প্রত্যেক ভক্তই তাদের অষ্টমী স্নানের পূর্ণতা পাওয়ার জন্য স্নানের পর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে অাসতেন ।


পরবর্তীতে মোঘল অামলে সম্রাট অাকবরের সেনাপতি মানসিংহ সোনারগাঁও এ বারো ভূইয়াদের বিদ্রোহ দমন করতে বাংলায় অাসেন এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ভগ্নাদশা দেখে তিনি তার ব্যক্তিগত তহবিলের অর্থে তার নিজ এলাকা সুদূর রাজস্থান থেকে মিস্ত্রি ও শ্রমিক এনে রাজস্থানী ঘরোনার নকশা অনুযায়ী মূল মন্দিররটি ‌তিন কক্ষ বিশিষ্ট করেন এবং দেবী দূর্গার দুই পাশের কক্ষে শিবলিঙ্গ স্থাপন করেন । মন্দিরের নিরাপত্তার জন্য দুইটি প্রবেশ দ্বার নির্মান করেন । তিনি ভক্তদের বসবাসের জন্য একটি ধর্মশালাও নির্মান ও একটি পুকুর খনন করেন সর্বশেষ তিনি তার চার বার বাংলা অাগমনের নিদর্শন স্বরূপ চারটি শিব মঠ স্থাপন করেন । মানসিংহ এই বিগ্রহ ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করার পর আজমগড়ের এক তিওয়ারি পরিবারকে সেবায়েত এবং বাংলাদেশের জনৈক দাস পরিবারকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিযুক্ত করেন ।


পরবর্তীতে ভাওয়ালের জমিদার রাজা রাজেন্দ্রনারায়ন রায়বাহাদুর ভাওয়াল ষ্টেটের মালিকানা নির্ধারনের জন্য মন্দির রক্ষণাবেক্ষণকা
রী সুধীর কুমার দাস গং কে ৫ শতাংশ মালিকানা এবং সেবায়েত গং দের ১ আনি ভোগত্বর সহ ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ২০ বিঘা জায়গা দেবোত্তর হিসেবে সিএস রেকর্ডভূক্ত করিয়া দেন ।


দেবী ঢাকেশ্বরী আসল ৮০০ বছরের পুরোনো অাদি বিগ্রহটি ৪৮ সালে দেশভাগ-পরবর্তী হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার সময় অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেড় ধরে সেবায়েত তিওয়ারী পরিবারের শেষ বংশধর বিশাল তেওয়ারীর স্ত্রী কর্তৃক ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় । মূর্তিটি বর্তমানে কলকাতার কুমারটুলি অঞ্চলে দুর্গাচারণ স্ট্রিটে বিরাজ করছে । ‌সেখানেও মন্দিরের নাম শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির | এখন যে বিগ্রহটি ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আছে তা হলো মূল মূর্তির প্রতিরূপ। কলকাতায় বিগ্রহটি আনার পর প্রথম দু'বছর হরচন্দ্র মল্লিক স্ট্রিটে দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরির বাড়িতে দেবী পূজিতা হন । পরে ১৯৫০ নাগা ব্যাবসায়ী দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী কুমোরটুলি অঞ্চলে দেবীর মন্দির নির্মাণ করে দেন ও প্রতিষ্ঠা করে দেবীর নিত্য সেবার জন্য কিছু দেবোত্তর সম্পত্তি দান করেন এবং অদ্যবধি এখানেই দেবী পূজিতা হয়ে চলেছেন ।


১৯৬৪ সালে সেই পরিবারের বংশধরেরাই কলকাতায় এসে পুনরায় সেবায়েত নিযুক্ত হন, এখনো তারাই দেবীর নিত্য সেবা করেন । এই ঢাকেশ্বরী দেবীর পূজা পদ্ধাতিও বাংলার চিরপুরাতন পদ্ধতির চেয়ে আলাদা । শারদীয়া দুর্গাপূজার সময় দেবীর পূজা হয় উত্তর ভারতের নবরাত্রির বিধি মেনে । দেবীকে যেভাবে অলংকারহীন এবং প্রায় বিবস্ত্র অবস্থায় লুকিয়ে আনা হয়েছিল, তার ছবিও এই মন্দিরে সংরক্ষিত আছে। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রচারের আলোয় ঢাকা পড়ে গেছে কলকাতার ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির। শোভাবাজার ছাড়িয়ে কুমোরটুলির এক অপরিসর গলিতে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে নীরবে নিভৃতে বিরাজমান এই ঢাকেশ্বরী মাতা । ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আদি বিগ্রহ এখানেই প্রতিষ্ঠিত ।


মায়ের অলৌকিক সব ঘটনা বিজড়িত মূল ঢাকেশ্বরী মন্দিরটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত । প্রতিদিন বহূ পূণ্যার্থীর অাগমন ঘটে এখানে । ৪৭ এর দেশভাগ, ৬৪ এর দাঙ্গা, ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ বহু ঘাতপ্রতিঘাত, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগের ইতিহাস বুকে নিয়ে সুধীর কুমার দাস ও মন্দিরে বসবাসকারী হিন্দুদের অাত্ম ত্যাগের বিনিময়ে ঢাকেশ্বরী মন্দির আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে.....।
জঁয় মা ঢাকেশ্বরী
পল্টন দাস, সেবায়েত,
শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির ।

written by: Deb Prosad
Share:

আমাদের সনাতন ধর্ম, আমাদের গর্ব

কি নেই আমাদের ধর্মে ? বেদান্ত জ্ঞান , রামায়ন ও মহাভারত এর সদাচার শিক্ষা , পুরান এর মানবিক শিক্ষা , গীতার জীবন দর্শন , চন্ডীর শক্তি তত্ত্ব ।

আমাদের সনাতন ধর্ম একমাত্র সত্য ধর্ম । আমরা হিন্দু । আমরা গর্বিত । ঈশ্বরকে ধন্যবাদ তিনি আমাদের সনাতন কূলে জন্ম দিয়েছেন । আমাদের ধর্মেই সব আছে , নীতি শিক্ষা বা সদাচার শিক্ষার জন্য অন্য ধর্মের অনুকরণ বা আদর্শ গ্রহণ না করলেও চলবে ।


আমরা সেইভৃগু , শুক্র, বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ, পুলস্ত, কশ্যপ আদি মহান ঋষি মুনিদের বংশধর । ঋষি রক্তআমাদের শিরায় শিরায় বইছে । সেই মহান আচার্য গণ আমাদের জন্য বিবিধ জ্ঞান ভাণ্ডার রেখে গেছেন ।আমরা সেই জ্ঞান থাকতে অন্য জ্ঞান কেনো নেবো ।

তার সাথে আছে ভারতীয় দর্শন এমনকি চার্বাক নামক নাস্তিক দর্শন কেও আমরা আমাদের সংস্কৃতি তে স্থান দিয়েছি । আয়ুর্বেদ দিয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞান । গাছ গাছড়ার থেকে ঔষধ । যোগা দিয়েছে যোগাসন , প্রানায়াম- শরীর সুস্থ রাখার এক পদ্ধতি । এই ধর্ম এত বিশাল ও ব্যপক সব কিছুই আছে ।

এমনকি রতি শাস্ত্রের ওপর ঋষি বাৎস্যায়ন, বাভ্র রচনা করেছেন গ্রন্থ।যেহেতু ‘ধর্ম , অর্থ , কাম , মোক্ষ’ কে চতুর্বিধ ফল বলা হয় । সব এখানেই পাওয়া যাবে । তাই যে সব হিন্দু গণ অন্য ধর্মের মতামত নিয়ে সদাচার শিখতে যান – তারা গঙ্গার জল ফেলে দূরে ডোবার জল আনতে যান । পতিত পাবনী গঙ্গা থাকতে কেন আমরা সাধারন জল দিয়ে কলসি ভরবো?

এই ধর্ম সব সদাচারের স্রষ্টা । আচার্য শঙ্কর বেদান্ত জ্ঞান দিয়েছেন । মহাপ্রভু দিয়েছেন ভক্তি, ক্ষমা, ভালোবাসার আদর্শ । ক্ষমা শীলতা শিখতে হলে এখানেই শেখা যাবে । অন্য মত নিতে হবে না । ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব এসেছেন । তিনি বেদান্ত, বৈষ্ণব , তন্ত্র কে এক সুতোয় গেঁথে দেখিয়েছেন- সব সনাতন পথ সত্য ।তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ আমাদের শিখিয়েছেন ‘নিজের অন্তরের সুপ্ত শক্তিকে জাগরণের তত্ত্ব’ ।

আমি হিন্দু ।আমি গর্বিত । গর্ব করে বল আমি হিন্দু ।ভারতের দেব দেবী সত্য। তেঁনারা আমার পূজ্য । সেবা , ত্যাগ , ব্রহ্মচর্যের , হিন্দুত্বের কথা এই সন্ন্যাসী গোটা বিশ্ব মাঝে প্রচার করেছিলেন । স্বামী প্রনবানন্দ মহারাজ আশ্রম স্থাপন পূর্বক হিন্দু ধর্মের বিরাট দর্শন , ত্যাগের ভাবনা , দেশ ও ধর্মের প্রতি কর্তব্য , নিষ্ঠা , সদাচার শেখালেন ।স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী মহারাজ এলেন । তিনি ভক্তি , তন্ত্র , জ্ঞান সাধনা করে সমস্ত ব্রহ্মজ্ঞান আমাদের জন্যই রেখে গেলেন । এসেছেন লোকনাথ বাবা ।এসেছেন ঠাকুর সীতারাম ওমকার নাথ , এসেছেন তারাপীঠ ভৈরব বামাদেব , এসেছেন রাম ঠাকুর ।

এমন অনেক মহা মানব, মনিষী বৃন্দ এসে আমাদের ধর্মের মাধ্যমে আমাদের সদাচার শেখালেন । ভিন্ন মত নিয়ে নয় । গুরুদেব সুধীন কুমার মিত্র শাক্ত সাধনা করেছেন । তিনি দেখালেন এই সনাতন ধর্মের সাথে মানব ধর্মের কোন ভেদ নেই । কারন আমাদের সনাতন ধর্ম মানবিক মূল্যবোধ শেখায় , অপরকে এমনকি ভিন্ন ধর্মী কেও কাছে এনে ভালোবাসার শিক্ষা দেয় । এর দাম হিন্দু দের যদিও অনেক ক্ষতি পূরণ দিয়ে দিতে হয় বারংবার ।

তাই অন্তিমে বলি আমি আমার ধর্মের জন্য গর্বিত । আপনারা যারা নিষ্ঠাবান হিন্দু আছেন- তাঁরাও গর্ব করেন । আমরা ভিন্ন ধর্মী দের উপাসনা লয় ভাঙ্গি না । আমরা কারোর পেছনে লাগি না । আমরা বিশ্বাস করি নিজেও ভালো থাকি , অপর কেউ ভালো রাখি । কেউ পর নয় , তাই বারংবার আঘাত খেয়েও আমরা ফুল, মিষ্টি দেই । এখানেই আমাদের জয় । সব শিক্ষা আমাদের ধর্মেই আছে । একটু জানুন নিজ ধর্ম সম্বন্ধে ।

কৃতজ্ঞতাঃ Babai Basak
Share:

হরিনাম করলে কি ফল লাভ হয়?

একবার দেবর্ষি নারদ তাঁর আরাধ্য প্রভু নারায়ণকে জিজ্ঞাসা করলেন," হে প্রভু, হরিনাম করলে কি ফল হয়?"
জগতপালক শ্রী নারায়ণ তখন একটু হেসে নারদকে বললেন," হে নারদ, তুমি পৃথিবীতে গিয়ে যাকে সবার প্রথম দেখবে তাকে এই প্রশ্নটি করবে।তখন তুমি এর মহিমা বুঝতে পারবে। "

নারদ তখন মর্ত্যে গেলেন। মর্তে গিয়েই কিছুদুর যেতেই দেখতে পেলেন একটি গরু বিষ্ঠা ত্যাগ করেছে তার মধ্যে একটি কৃমি লাফাচ্ছে, নারদ সেই কৃমির কাছে জিজ্ঞাসা করলেন,"হে ক্ষুদ্র কৃমি, তুমি আমায় বলো যে হরিনাম করলে কি ফল লাভ হয়?"

তখন সঙ্গে সঙ্গে সেই কৃমিটি মারা গেল। নারদ ভাবল আমার কারনে হয়তো কৃমিটি মারা গেল। তিনি আবার বৈকুন্ঠে ফিরে গেলেন ফিরে গিয়ে সব জানালেন। নারায়ণ সব শুনে বললেন," হে ধর্মিক নারদ, এবার তুমি পূর্ব দিক বরাবর চলে যাও দেখবে একটা গরুর বাছুর হয়েছে তাকে এই প্রশ্নটি করো।"

নারদ তখন নারায়ণের কথা মত পূর্বদিকে গিয়ে দেখলেন সত্যিই সেখানে একটি গরুর বাছুর হয়েছে।নারদ তখন সেই সদ্যজাত বাছুরকে গিয়ে বললেন, "হে গোবৎস, হরিনাম করলে কি ফল হয়?"

বাছুরটিও তখন সাথে সাথে মারা গেল।
নারদ এবার ভয় পেয়ে গেলেন তিনি মনে করলেন আমি গোহত্যার অপরাধে অপরাধি হলাম। তিনি তাড়াতাড়ি করে বৈকুন্ঠে উপস্থিত হলেন আর নারায়ণকে সব খুলে বললেন।

শ্রীনারায়ন তখন বললেন," বৎস, তাহলে তুমি এবার দক্ষিন দিক বরাবর যাও দেখবে সেখানে রাজার একটি সন্তান হয়েছে তাকেও তুমি এই একই প্রশ্নটি করো।"
নারদ বললেন," প্রভু, এবার যে তবে আমি নর হত্যার অপরাধে অপরাধি হব!"
নারায়ন বললেন,"এবার তুমি তোমার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।'
তখন নারদ গিয়ে রাজার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করল," হে রাজকুমার, তুমি কি জানো যে হরিনাম করলে কি ফল হয়?"
তখন ছেলেটি বলে উঠল," হে মুনিবর, আমি তো কোনদিন হরিনাম করিনি কিন্তু হরিনাম শুনে আমি কৃমি যোনি থেকে মুক্তি পেয়ে গোবৎস রুপে জন্ম গ্রহণ করলাম।গোবৎস রুপে যখন হরিনাম শুনলাম তখন মানব জনম পেলাম আর মানব হিসাবে এখন হরিনাম শুনে আমার জন্ম জন্মান্তরের মায়ার বন্ধন
ছিন্ন হয়েছে। এখন আমি মুক্তি লাভ করেছি।তাহলে আপনিই ভাবুন হরিনাম শুনে যদি আমি মুক্তি লাভ করতে পারি তবে অপরাধ শুন্য হয়ে হরিনাম করলে কি লাভ হতে পারে।"
নারদ বুঝতে পারলেন হরিনাম করলে কি ফল লাভ করা যায় তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তাই আসুন আমরা সবাই এই মধুমাখা হরিনাম জপ করি।
"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।"

জয় শ্রী নারায়ন

---প্রীতিরাজ চক্রবর্ত্তী (তুষার)
★এডমিন
সনাতন কথামৃত
ব্রহ্মযোগ
সত্য সনাতন
ডেউয়াতলী লক্ষ্মী-নারায়ন অলকা মঞ্জুরী
সেবাশ্রম (DLNAMS)
ব্রাহ্মন কমিটি*এপার ও ওপার বাংলা*
★মোডারেট
সনাতনি ব্রহ্মবিদ্যা সাংসদ
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।