সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড পর্ব- ৪ )


পরদিবসে সুগ্রীব সেই বিজয়মাল্য গলে কিস্কিন্ধ্যায় গিয়ে বালিকে ডাকতে লাগলো। বলল- “বালি! তুমি কোথায় লুকিয়েছো? এসো দ্বন্দ্বযুদ্ধ করো। দেখি তোমার সাহস কতো । আমি তোমাকে যুদ্ধে আহ্বান জানাচ্ছি।” অপরদিকে সেখানে বৃক্ষের আড়ালে লুকিয়েছিলো ভগবান রাম ও লক্ষণ । বানর, লেঙুরেরা অবাক হোলো যে সুগ্রীবের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? কাল মরতে মরতে বেঁচে গিয়ে আজ আবার যুদ্ধ করতে এসেছে। ভাগ্য কি সবদিন সঙ্গ দেয়! আজ সুগ্রীবের মৃত্যু ঠিক বালির হাতে হবে। সুগ্রীব সমানে রূঢ় ভাষা বলে বালিকে যুদ্ধে আহ্বান করতে লাগলো। ভিতর থেকে বালি শুনে দাঁত কটমট করে বলল- “রোস! তোর যুদ্ধের ইচ্ছা আজ তোকে বধ করে পূর্ণ করবো। আজ তোর রক্তে আমি বিজয়তিলক ধারন করবো। আজ তোর ধরিত্রীতে অন্তিম দিন।” এই বলে বালি গদা নিয়ে বের হতে গেলে বালির স্ত্রী তারা বাধা দিয়ে বলল- “নাথ! আপনি যাবেন না। আজ আমি কুস্বপ্ন দেখেছি । নানা অশুভ লক্ষণ দেখতে পেয়েছি। সুগ্রীবের মনে কিছু কূটবুদ্ধি আছে। নচেৎ কাল সে পরাজিত হয়ে প্রান হাতে করে পলায়ন করলো। আজ আবার যুদ্ধে আপনাকে আহ্বান করছে। সে নিশ্চয়ই কিছু পরিকল্পনা করেছে।” বালি তখন তারাকে বকাঝকা করে বলল- “ঐ পিপীলিকার ভয়ে আমি গুটিয়ে থাকবো? রাক্ষসরাজ দশানন আমার নিকট পরাজিত হয়েছে, সুগ্রীব কোন ছাড়! ও যত রকম পরিকল্পনা করুক- আজ তার মুক্তি নেই। ওকে আমি হত্যা করে আজ ঘরে ফিরবো।” তারা নানা ভাবে বুঝিয়ে বলল- “সুগ্রীব একা নেই। শুনেছি ওর ওখানে নাকি অযোধ্যার রাজকুমার রাম ও লক্ষণ এসেছে। ওনারা দুজন খুবুই শক্তিমান। শুনেছি রাবন নাকি রামচন্দ্রের পত্নীকে অপহরণ করেছে। আমার ভয় করছে- যদি রামচন্দ্র সুগ্রীবকে সহায়তা প্রদান করে ত।” বালি বলল- “দেবী তুমি বৃথা শঙ্কা করছ। রামচন্দ্র মর্যাদা পুরুষোত্তম। তাঁহার সহিত আমার বিরোধ নেই। তিনি কেন আমার ক্ষতি করবেন ? আর ইন্দ্রদেবতার বরে আমি সকল দিক থেকে সুরক্ষিত। বৃথা চিন্তা নেই।” অপরদিকে সুগ্রীব বাহিরে আহ্বান করতেই থাকলো। বলল- “ওহে বালি- তুমি কোথায় ? ভয়ে কি স্ত্রীর আঁচলের তলায় লুকিয়েছো? এত ভীত তুমি?” অমনি বালি গদা নিয়ে বের হল। আবার দুই ভ্রাতাতে যুদ্ধ শুরু হল।

দুই বানরের যুদ্ধ থেকে অনান্য বানর, লেঙুর, শিম্পঞ্জী, হনুমানেরা সব যে যেদিকে পারলো লাঙুল তুলে ভয়ে পলায়ন করলো। গদা দিয়ে একে অপরকে প্রহার করতে লাগলো। আঁচর , কামড় বসাতে লাগলো। উভয়ের শরীর রক্তাক্ত হল। একে অপরের উপর তাল বৃক্ষ , শাল বৃক্ষ , প্রস্তর বর্ষণ করতে লাগলো। আঁচর, কামড় লম্ফঝম্ফ হতে লাগলো। অপরদিকে ভগবান রাম ধনুকে ঐষিক বাণ জুড়লেন । অপরদিকে যুদ্ধে সুগ্রীবের বুকে বালি অনবরত বজ্রমুষ্টি প্রহার করতে লাগলেন। সুগ্রীবের মুখ দিয়ে রক্তবমন বের হতে লাগলো। আজ ভগবান রামচন্দ্র যমজ ভাইয়ের মধ্যে গলায় মাল্য থাকবার জন্য সুগ্রীবকে চিনতে পারলেন। ঐষিক বাণ নিক্ষেপ করলেন বালির দিকে। বজ্রের সমান আলো উৎপন্ন হয়ে ঐষিক বাণ চোখের পলকে বালির বুক বিদীর্ণ করলো। ছিটকে গিয়ে বালি ভূপতিত হল । রক্তধারায় বালির বুক ভাসল । সুগ্রীব তখন বালিকে মৃত্যুযন্ত্রনায় ছটফট করতে দেখে হাতের অস্ত্র ফেলে ছুটে গিয়ে তাঁর নিকটে বসে রোদন করতে লাগলেন। বললেন- “আমাকে ক্ষমা করো দাদা। তোমাকে বহুবার ধর্ম পথে আসতে বলেছিলাম। এই শর ঈশ্বরের বিধান।” আড়াল থেকে ভগবান রাম, লক্ষণ, জাম্বুবান, মারুতি বের হয়ে আসলেন। বালি তখন বললেন- “হে রাম! আমি জাতিতে বানর। আমার চর্মে কোন কাজ হয় না। ব্যাঘ্র, মৃগ, হস্তী চর্ম সন্ন্যাসীরা ধারন করেন – কিন্তু কপির চর্ম কোন কাজেই আসে না। বানরের মাংস আহার্য নয়- কেন আমাকে বধ করার জন্য শর নিক্ষেপ করলেন? হে রাম! আপনি তো সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয়, ধর্মের রক্ষক। আপনি মর্যাদা পুরুষোত্তম। তবে আপনি আজ কেন যুদ্ধ নিয়ম উলঙ্ঘন করলেন ? এইভাবে আড়ালে থেকে কাউকে শর সন্ধান করা যুদ্ধ নিয়মের বিরোধী। অধর্ম ! হে রাঘব! আমি জানি আপনার পত্নীকে আমার কূট বন্ধু রাবন হরণ করে নিয়ে গেছে। আমি রাবণকে সাতবার লাঙ্গুলে পেঁচিয়ে সমুদ্রের জলে ডুবিয়েছিলাম। আপনি আমাকে একবার বলতেন আমি রাবণকে লাঙ্গুলে বেঁধে আপনার চরণে এনে ফেলেদিতাম। কিন্তু আপনি কেন সুগ্রীবের সহায়তা করে আমার সাথে অধর্ম করলেন? আপনার নামে কলঙ্ক রটবে। আপনি ধর্মের রক্ষক হয়েও অধর্ম করলেন।”

রামচন্দ্র বললেন- “বালি ! মৃত্যুর আগে আজ তোমার ধর্ম- অধর্ম বোধ জেগেছে ? আজ তোমার ধর্ম কথা মনে পড়ছে ? সন্দেহ বশে পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে নিজ ভ্রাতাকে বিতারিত করবার সময় তোমার ধর্মজ্ঞান কোথায় ছিলো? নিজ ভ্রাতাকে হত্যা করবার যখন কৌশল করেছিলে তখন তোমার ধর্ম জ্ঞান উদয় হয়নি? নিজ ভ্রাতার স্ত্রীকে কারাগারে আটকে তাকে বিবাহে সম্মত করার জন্য তার উপর নির্দয় ভাবে দিনের পর দিন অত্যাচার হেনেছিলে- তখন তোমার ধর্ম বুদ্ধি কোথায় ছিলো? জাম্বুবান মারফৎ আমি তোমাকে শান্তি প্রস্তাব দিলেও- তুমি তা গ্রহণ করো নি। আজ তুমি ধর্মের বিচার করছ। তুমি রাবণকে আমার চরণে এনে ফেলবার কথা বলছিলে- আরে তোমার আর রাবণের মধ্যে আমি কোন পার্থক্যই দেখি না। দুজনেই নারী নিপীড়ক, অধার্মিক। এক পাপী কখনো আর একজন পাপীর বিচার করতে পারে না। যে নিজে অজ্ঞানী সে অপরকে জ্ঞানের আলোক কিভাবে প্রদান করতে পারবে? সেইরূপ রাবণকেও শাস্তি দেবার কথা তোমার মুখে মানায় না। ভেবে দেখো বালি সারা জীবনে তুমি কত অন্যায় করেছো। এখন বলো তোমার ন্যায় পাপীর মুখে কি ধর্মের কথা শোভা পায়?” বালি নিজের ভুল বুঝতে পেরে রামচন্দ্রের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলো। রামচন্দ্র জানালেন তুমি সুগ্রীব আর রুমার কাছে ক্ষমা চাও। আমি কি তোমাকে ক্ষমা করবো? অপরদিকে মহল থেকে তারা, রুমা ও বালক অঙ্গদ ছুটে এলেন । তারা স্বামীর এই অবস্থা দেখে রোদন করতে লাগলেন। বালি তখন সুগ্রীব আর রুমার কাছে ক্ষমা চাইলো। স্ত্রী তারার কাছে ক্ষমা চাইলো। অতঃ ক্রন্দনরত সুগ্রীবকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল- “তুমি এই সিংহাসন সামলাও । তারা ও অঙ্গদের দায়িত্ব তোমার। অঙ্গদ যুবা হলে তাহাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করবে। তোমরা রোদন কোরো না। ভগবান রামচন্দ্রের হস্তে নিধন হওয়াও সৌভাগ্যের ব্যাপার।” এই বলে বালির শেষ নিঃশ্বাস উঠলো। তারপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। ভগবান রামচন্দ্র তাঁহাকে আশীর্বাদ করলেন । অঙ্গদের মস্তকে হাত বুলিয়ে ভগবান রাম বললেন- “তোমার নিকট আমি অপরাধী। জানি বালি তোমার পিতা। পিতৃঘাতককে কেহ পছন্দ করে না। আমি তোমাকে বরদান দিচ্ছি- পরজন্মে তুমি এক ব্যাধ হয়ে জন্মাবে। তোমার শরে আমি তখন জীবন ত্যাজিবো।” এমন বলা হয়- ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে যে ব্যাধ শর নিক্ষেপ করেছিলেন সে আগের জন্মে বালির পুত্র অঙ্গদ ছিলো। ভগবান রাম পরজন্মে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হয়ে ধরাধামে আসেন। এই বরদান ফলিত হয়। যাইহোক অঙ্গদের কিন্তু কোন প্রকার ক্ষোভ ছিলো না ভগবান রামচন্দ্রের প্রতি। তিনি জানতেন তার পিতা অধর্ম ও পাপ সঞ্চয় করার দরুন এমন দণ্ড প্রাপ্তি করেছে।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger