সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব- ১৯ )


বিশালাকার হয়ে হনুমান যখন পর্বত উপরে আনলো, তখন দেবতা সকল অবাক আর আশ্চর্য হল। পর্বত থেকে ব্যঘ্র, মৃগ, হরিণ, ভল্লুক আদি বন্য জাতীয় পশু যেযদিকে পারলো পালালো। ত্রিকোনাকার পর্বতের পাদদেশে মন্দির সুশোভিত ছিলো। পর্বতের নীচে দেখা গেলো বিভিন্ন বৃক্ষের শিকর ঝুলছে। যেনো প্রস্তর খণ্ড আঁকরে সর্পেরা ঝুলছিলো এমন মনে হচ্ছিল্ল । দেবতারা এই দেখে আশ্চর্য হলেন। রুদ্রাবতার হনুমানের ওপর পুস্পাদি বর্ষণ করতে লাগলেন । ঔষধি চিনতে না পেরে গোটা পর্বতটাই বাম হস্তে ধারণ করেছে। গন্ধমাদন পর্বত নিয়ে হনুমান যখন লম্ফ দিয়ে আকাশে উঠলো তখন মেদিনী কেঁপে উঠলো । তারপর ঝড়ের বেগে উড়ে চলতে লাগলো সমুদ্রের দিকে। মেঘের রাজ্য, নক্ষত্র ভরা আকাশের মাঝে উড়ে যেতে যেতে হনুমান , নিশাচর পক্ষী দিগকে দেখতে পেলো। চন্দ্রের আলোকে হিমালয়ের চূড়া সকল অতি মনোরম দেখাছিল্ল। শ্বেত শুভ্র ধবল হিমালয়ের চূড়াতে চন্দ্রালোকে দেবতারা আগমন করে। হিমালয়ের বিভিন্ন হ্রদের তীরে অপ্সরা, কিন্নর – কিন্নরী , বিদ্যাধর – বিদ্যাধরী , গন্ধর্ব সকলে আগমন করে নৃত্যগীতে রাত্রি যাপন করে। এই সব স্থানে সাধারণ মানব আসতে পারে না । এই সকল মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে হনুমান দ্রুত গতিতে উড়তে থাকলো । যত সম্ভব গতি বাড়ালো। সুদুর হিমালয় থেকে শ্রীলঙ্কা অনেকটাই দূর । অপরদিকে সমুদ্র তীরে বসে ভগবান শ্রীরাম বিলাপ করছিলেন, আর বলছিলেন- “ভ্রাতা আমার! আমি এই যুদ্ধের সূচনা করেছি। আজ আমার নিমিত্তই তোমার প্রাণ সঙ্কটে। আমি কিছুই করতে পারছি না। নিজেকে অসহায় বোধ হচ্ছে। প্রিয় ভ্রাতা! তোমার নিদারুন কষ্ট কেবল আমার কারণে।” লক্ষ্মণের বুকের ক্ষতস্থান ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে সমগ্র দেহে ছড়াতে লাগলো । লক্ষ্মণ ধীরে ধীরে ক্রমশ নিস্তেজ হতে লাগলো। নিঃশ্বাস ক্রমশ স্থির হতে লাগলো । প্রভু শ্রীরাম বিলাপ করতে লাগলেন। জাম্বুবান তখন সান্ত্বনা দিয়ে বলল- “প্রভু! পবন নন্দন শীঘ্রই আসবেন। আপনার ভ্রাতা সুস্থ হয়ে উঠবেন। এভাবে আপনি ভেঙ্গে পড়বেন না।”

উচু টিলা, সুবেল পর্বতের উচ্চ চূড়ায় উঠে বানরেরা দেখতে লাগলো হনুমান আসে নাকি । কিন্তু যতদূর দেখা যায় হনুমানকে দেখা যায় না। বানরেরা যত সম্ভব উচ্চ চূড়ায় উঠলো। রাতের আঁধারে তেমন স্পষ্ট দেখা যায় না। যতটুকু দেখা যায় কোথাও হনুমানকে দেখা গেলো না। সকলে কেবল প্রার্থনা করতে লাগলো হনুমান যেন তারাতারি ফিরে আসে ঔষধি নিয়ে । কারণ লক্ষ্মণের ক্ষতস্থান ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে। অপরদিকে লঙ্কায় আনন্দ হুল্লোর বয়ে যাচ্ছে। কতশত আতসবাজি পুড়িয়ে রাক্ষসেরা আনন্দ করছে। এমন করছে তারা যেনো যুদ্ধ জিতেই গেছে । সুষেণ বৈদ্য জানালো যে সূর্য উদয় হলে তখন ঔষধি দিয়েও আর কাজ হবে না। অতএব শীঘ্র হনুমানকে এসে পড়ুক । কিন্তু হনুমান আর আসে না। লঙ্কায় রাবণ গুপ্তচর মারফৎ সংবাদ পেয়ে আনন্দে বলল- “বোধ হয় কালনেমি , হনুমানের প্রাণ হরণ করেছে। বহুদিন পর অনেক সুখ আনন্দ প্রাপ্তি করলাম। হনুমান ওখানে মরবে। লক্ষ্মণ এখানে মরবে। তারপর দেখি ঐ ভিখারী রাম একা কি বা করতে পারে?” এই বলে রাবণ হাস্য করতে লাগলো। রাক্ষসেরা হাস্য করতে লাগলো । বানর শিবিরে কেবল রোদন । হনুমান অপরদিকে আকাশে প্রবল বেগে উরে উরে প্রবল বেগে আসতে লাগলেন । কত পাহার, পর্বত, নদ – নদী, জনপদ, জঙ্গল পার করলেন। একসময় অযোধ্যার উপর দিয়ে আসতে লাগলেন । অযোধ্যায় প্রভু শ্রীরামের নগরী দেখলেন । সেখানে হয়তো সীতা হরণের সংবাদ জানেই না। রাম- রাবণ যুদ্ধের কথাও জানে না। বিশাল পর্বত হস্তে নিয়ে সে অযোধ্যার আকাশ দিয়ে গমন করছিলো । সেই সময় নন্দীগ্রামে ভরত জেগে ছিলো। সেনারা এসে জানালো এক বৃহৎ মর্কট বিশাল পর্বত নিয়ে অযোধ্যার আকাশে ভ্রমণ করছে। বোধ হয় সে অযোধ্যা ধ্বংস করবে। অযোধ্যার ওপর সেই পর্বত নিক্ষেপ করবে। ভরত আতঙ্কিত হয়ে ধনুর্বাণ নিয়ে বাইরে আসলো। দেখলো সত্যই এক মর্কট , বৃহৎ প্রস্তর হস্তে অযোধ্যার আকাশে । ভরত আর দেরী না করে দিব্যাস্ত্র চালনা করলো। দিব্যাস্ত্র ফুটে হনুমান পর্বত সহ ভূমিতে নামলো । আক্ষেপ করে বলল- “হে প্রভু রামচন্দ্র ! আমি বোধ হয় আর তোমার সেবা করতে পারলাম না।” মর্কটের মুখে রামনাম শুনে ভরত ভাবল এ যখন শ্রীরামচন্দ্রের ভক্ত তখন অযোধ্যা ধ্বংস করবে না। এই বলে ভরত গিয়ে হনুমানকে নিজ পরিচয় দিলো। হনুমানের পরিচয় জানতে চাইলো ।

হনুমান যেখানে পতিত হয়েছিলো – সেই স্থান ভারতবর্ষের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে প্রয়োগধামে অবস্থিত । এখানে এখন হনুমানের বিশাল মন্দির ও বিগ্রহ আছে। মাটি থেকে অনেকটাই নীচে এই বিগ্রহ। এর পাশে ত্রিবেনীসঙ্গম । বর্ষার সময় মাতা গঙ্গা এসে প্রতি বছর এই বিগ্রহকে ঢেকে দেন পবিত্র বারি দ্বারা। বছরের অন্য সময় দর্শন করা যায় । হনুমান নিজ পরিচয় দিয়ে সব বললেন- শূর্পনাখার নাসিকা চ্ছেদন, মারীচ বধ, রাবণের সীতা হরণ, বালি বধ করে সুগ্রীবকে রাজ্য প্রদান, শত যোজন সেঁতু বেঁধে লঙ্কায় এসে রাবণের সাথে যুদ্ধ, রাবণের পুত্র মেঘনাদের অস্ত্রে লক্ষ্মণের অচৈতন্য হওয়া, সেই জন্যই ঔষধি আনতে হিমালয় যাওয়া, ঔষধি চিনতে না পেরে গোটা পর্বত তুলে আনা। ভরত আক্ষেপ করে বলল- “এত কিছু হয়ে গেলো, অগ্রজ একবারও আমাকে সংবাদ দিলেন না? আমাকে কি উনিই এখনও ক্ষমা করেন নি? ভ্রাতা লক্ষ্মণের এমন শোচনীয় অবস্থা! আমরা কিছুই জানি না। আমার মাতা কৈকয়ীর কুবুদ্ধির জন্য আমার অগ্রজ, আমার বৌঠাণ আর আমার ভ্রাতার জীবন কষ্টে ভরে গেলো। জীবনে আমি ঐ কুমাতাকে ক্ষমা করবো না।” এই বলে ভরত রোদন করতে লাগলেন । তারপর বললেন- “আমি কদাপি আর অগ্রজকে কষ্ট করতে দেবো না। আমি অযোধ্যার সমস্ত সেনা নিয়ে যাচ্ছি। আমি রাবণ বধ করে বৌঠানকে মুক্ত করে আনবো।” হনুমান বলল- “তার প্রয়োজন নেই। আমরা বানর সেনারাই সেই রাক্ষসকে বধ করতে সমর্থ। আর রাবণকে বধ করবেন স্বয়ং প্রভু শ্রীরাম । আপনি এখন আমাকে শরমুক্ত করুন। যাতে সূর্য উদয়ের আগে আমি লঙ্কায় পৌছাতে পারি।” ভরত বলল- “বেশ! আমি পবণ বাণ নিক্ষেপ করছি। এই বাণের প্রভাবে তুমি তিনগুণ অধিক বেগে লঙ্কায় পৌছাতে পারবে।” এই বলে ভরত বাণ মুক্ত করে পবন বাণ নিক্ষেপ করলো। যার ফলে হনুমান তিনগুণ গতিতে উড়ে চলল। আকাশে দেখতে পেলো সূর্য উদয় হতে। হনুমান প্রার্থনা করলো গুরুদেব সূর্যের প্রতি। সূর্য বলল- “এ হয় না। নির্দিষ্ট সময়ে আমাকে উদয় হতেই হয়। এ স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মার বিধান।” হনুমান ক্রোধে বলল- “বাল্যকালে আপনাকে ভক্ষণ করেছিলাম অজ্ঞান বশত! আজ প্রভু শ্রীরামের সেবার জন্য আপনাকে আবার ভক্ষণ করবো যতক্ষণ না লক্ষ্মণ ঠাকুর সুস্থ হন।” এই বলে হনুমান সূর্য দেবতাকে ভক্ষণ করলেন। তারপর লঙ্কায় উপস্থিত হলেন। বিশাল পর্বত সহ হনুমানকে লঙ্কার চরে উপস্থিত হতে দেখে সকলে আনন্দে গর্জন করলো।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger