সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-২৬)

রাবণের শত রানীর পুত্রদের অধিকাংশ যুদ্ধে মারা গেছে। কুম্ভকর্ণ কি বিভীষণ তাদের সন্তানরাও নিহত। রাবণ রাজসভায় বসলেন। রাজসভা শূন্য প্রায় । রাক্ষস সেনার পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসছে। লঙ্কায় যতদূর দেখা যায় তত দূর কেবল অন্ধকার। কোন বাটিটে আলো জ্বলছে না । সর্বত্র শোক। রাক্ষসদের কান্না ভিন্ন আর কিছুই শোনা যায় না। রাবণ ভাবছিলো কি করা যায়। সীতাকে ফিরিয়ে দেওয়া অসম্ভব। কারন এতে ত্রিলোকবিজয়ী রাবণের বীরত্ব নিয়ে সংশয় হবে। নিজের কাছেই নিজে লজ্জিত হবে। ইন্দ্রজিৎ এসে রাবণ কে সান্ত্বনা দিলো। বলল- “পিতা! এই যুদ্ধ শক্তি বলে জয় করা অসম্ভব। আমি শুনেছি- শ্রীরাম বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র মুনি থেকে অতি ভয়ানক দিব্যাস্ত্র সকল প্রাপ্ত করেছেন। এছারা দেবতারা ওনাকে শার্ঙ্গ ধনুক ও নানা দিব্যাস্ত্র সকল প্রদান করেছেন । অতএব আমাদের চতুরতার অবলম্বন করা উচিৎ। পূর্বে একবার সেই রামকে মায়া দ্বারা নির্মিত সীতার মুণ্ড দেখিয়েছিলাম। শোকে সে দুর্বল হয়েছিলো। এবার সেই উপায় পুনঃ অবলম্বন করা উচিৎ। আমি বিদ্যুৎজিহ্ব কে সংবাদ দিয়েছি। সে এসে পুনঃ এক নকল মূর্তি মায়া দ্বারা গঠন করবে। এবার আর কাটা মুণ্ড নয়। জীবন্ত এক সীতার মূর্তি। আমি তাহাকে রামের সামনে বধ করলে সে নিশ্চয়ই শোক পেয়ে উম্মাদ হয়ে যুদ্ধ থেকে পলায়ন করবে।” বিদ্যুৎজিহ্ব রাক্ষস আসলো। রাবণ তাহাকে অনেক ধনরত্ন প্রদান করলো। মায়াবী বিদ্যুৎজিহ্ব একরাতের মধ্যে একটি নকল সীতার মূর্তি নির্মাণ করলো। সেই সীতা ছিলো একদম রামের প্রেয়সী সীতার ন্যায়। এমনকি তাঁর চালচলন, কথাবার্তা সব কিছুই জানকীর ন্যায়। সে সীতার মতোই পোশাক পরিহিত ছিলো । রাবণ সব দেখে অট্টহাস্য করে বলল- “পুত্র মেঘনাদ! কালই তুমি এই মায়াবী সীতাকে বধ করবে। এমন নিষ্ঠুর ভাবে বধ করবে যেনো রামচন্দ্র শোকে উম্মাদ হয়ে ‘হা সীতা’ বলে রোদন করে বেড়াতে থাকে। একবার রামকে ধ্বংস করতে পারলেই ঐ বনের পশু গুলিকে পিষে বধ করা যাবে।”

পরের দিন সকালে মেঘনাদ তার রথে মায়াবী সীতাকে বসালো। মায়াবী সীতাকে সকল কিছুই বোঝানো হয়েছিলো। ঝলমলে আকাশ আজ। আকাশে কেবল মেঘের রাশি। শরতের শোভা চতুর্দিকে খেলে গেছে । বানরেরা বৃক্ষ, প্রস্তর ধারন করে অপেক্ষা করছিলো কখন লঙ্কার দ্বার খুলে রাক্ষসেরা বের হবে। না জানি আজ কোন বীর আসবে। বিভীষণ বলেছিল লঙ্কার আর তেমন বড় কোন বীর আর বেঁচে নেই। যে আসবে, তাহাকেই সমুচিত জবাব দিতে হবে। হঠাত আকাশে শোনা গেলো এক নারীকণ্ঠ। সে আর্তনাদ করে চেঁচিয়ে বলছিল – “কোথায় আছেন আমার স্বামী রঘুনাথ। এই পাপীর হস্ত থেকে আমাকে রক্ষা করুন। এ আমাকে বধ করবে। হে দেবর লক্ষ্মণ! আমাকে রক্ষা করো।” হনুমান নিজেও ধোঁকার ফাঁদে পড়লো। সে সীতাদেবীকে দেখেছিলো। সে বলল- “মেঘনাদ! এমন করিস না। বীর পুরুষের নারীহত্যা নিন্দনীয়। এসে আমাদের সাথে যুদ্ধ কর। নারী হত্যা নিকৃষ্ট কর্ম।” মেঘনাদ অট্টহাস্য করে বলল- “কোথায় তোর রাম? ডাক তাহাকে। সে এসে দেখুক লঙ্কারাজ রাবণের সাথে যুদ্ধের পরিণাম কি? অনেক দিন আমরা রোদন করেছি। আজ সে রোদন করবে , আমরা তাহা দেখে আনন্দ উপভোগ করবো।” মায়াবী সীতা বলল- “পুত্র হনুমান! আমাকে রক্ষা করো বাবা! এই রাক্ষসের হস্ত থেকে আমাকে উদ্ধার করো।” শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ দৌড়ে যুদ্ধভূমিতে এসে বললেন- “মেঘনাদ! তুমি এমন পাপ করো না। তুমি বীর! ইন্দ্রকে পরাজিত করেছো। কেন এমন নারী বধের ন্যায় কাপুরুষতার কর্ম করবে? এখুনি সীতাকে এনে আমাকে প্রদান করো। আমি কথা দিচ্ছি এই মুহূর্তে আমি যুদ্ধ বন্ধ করে চলে যাবো।” মেঘনাদ বলল- “দেখ রাম ! তোর সামনেই আমি তোর স্ত্রীকে হত্যা করবো। স্বজন হারানোর বেদনা এবার তুই পাবি।” এই বলে মেঘনাদ তরবারির এক আঘাতে মায়া সীতার মস্তক কেটে ফেলল। মায়া সীতার রক্ত আকাশ থেকে বৃষ্টির ন্যায় ভূমিতে পড়লো। শ্রীরাম সেখানে বসে শোকে স্তব্ধ হলেন। মুখের কথা আর বের হল না। চলন গমন দেখা গেলো না। লক্ষ্মণ বলল- “মেঘনাদ! তোর আমি এমন অবস্থা করবো যে রাক্ষসেরা আর কোনদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, যদি এই যুদ্ধে তোকে আমি বধ না করতে পারি, আমি নিজে সমুদ্রে ঝাঁপ দেবো।”

এরপর লক্ষ্মণ গিয়ে তাঁর ভ্রাতাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলো। শ্রীরাম বললেন- “হে লক্ষ্মণ! আর কি লাভ যুদ্ধে ? সীতাই যখন নেই, তখন এই রাম আর কিভাবে ধনুক ধরবে । সীতাই ছিলো আমার শক্তি, আমার অনুপ্রেরণা। সীতাই, হনুমান মারফৎ আমাকে সংবাদ দিয়ে আমাকে কঠোর হতে বলেছিলেন। আমি তাই হয়েছি। কিন্তু আজ যখন সীতাই নেই, আর কি হবে কঠোর হয়ে যুদ্ধ করতে ? যার জন্য যুদ্ধ, সেতো আর বেঁচে নেই। সীতা বিহীন শ্রীরামও আর থাকবে না। আমি এই নরদেহ এখন ত্যাগ করে বৈকুণ্ঠ গমন করবো।” বিভীষণ দূত মারফৎ সব সংবাদ পেয়েছিলো। সে জানতো আসল সীতা অশোক বনে জীবিত। বিভীষণ বলল- “প্রভু! আর শোক করবেন না। এ এক মায়া ছিলো। আপনার কি স্মরণ আছে যে যুদ্ধ শুরুর আগে এমন নকল সীতাদেবীর মুণ্ড আপনাকে দেখানো হয়েছিলো? আসলে আমার অগ্রজ দশানন চান যে সীতা নিহত ভেবে আপনি দুর্বল হয়ে যুদ্ধ ত্যাগ করে চলে যান। মায়াবী রাক্ষস বিদ্যুৎজিহ্ব এই সবের মূলে। সে পুনঃ মায়া সীতার মূর্তি রচে মায়ার খেলা দেখিয়েছে। প্রভু আপনি স্বয়ং মায়াধীশ। মায়ার কবলে আপনি পড়বেন না।” বিভীষণের কথা শূনে ভগবান রাম সুস্থ হলেন। বিভীষণের দূতেরা জানালো সে সত্যই সীতাদেবী অশোক বনে সুরক্ষিত আছেন। শ্রীরাম বললেন- “এবার মায়াবী বিদ্যুৎজিহ্ব রাক্ষসের বধ প্রয়োজন। জানি সে শিল্পী। সে যুদ্ধে আসে না। কিন্তু বারংবার মায়া রচনা করে রাবণকে সহায়তা করে অধর্মের সঙ্গ দিচ্ছে। যে অধর্ম করে আর যে অধর্মের সঙ্গ দেয়- উভয়ে সমান পাপী। অতএব বিদ্যুৎজিহ্ব কে নাশ করা প্রয়োজন।” ভগবানের আদেশে রাত্রিকালে হনুমানের পৃষ্ঠে আরোহণ করে লক্ষ্মণ আর বিভীষণ লঙ্কায় প্রবেশ করলেন । বিভীষণ হনুমানকে চিনিয়ে দিলো বিদ্যুৎজিহ্বের বাটি । লক্ষ্মণ সেখানে প্রবেশ করতেই বিদ্যুৎজিহ্ব আর লক্ষ্মণের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হল। সংবাদ পেয়ে রাক্ষসেরা ছুটে আসতে লাগলো। লক্ষ্মণ বলল- “রে দুরাচারী! তুই যুদ্ধ করিস নি ঠিকই । কিন্তু বারংবার মায়াজাল রচনা করে রাবণকে সহায়তা করছিস। এই পাপে তোর বধ করতে বাধ্য হলাম।” এই বলে লক্ষ্মণ ধনুকে “খড়্গ বাণ” প্রকট করে সেই বাণ ছুড়লেন। দেখতে দেখতে লক্ষ্মণের নিক্ষিপ্ত অস্ত্রে মায়াবী রাক্ষস বিদ্যুৎজিহ্বের দেহ তিন টুকরো হল। এরপর বিভীষণ ও লক্ষ্মণ উভয়ে হনুমানের পৃষ্ঠে বসলেন। হনুমান লম্ফ দিয়ে শূন্যে উঠে পুনঃ ফিরে আসলেন।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger