২৩ নভেম্বর ২০১৭

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ত্রয়োদশ অধ্যায় – ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ-বিভাগযোগ

শ্রীঅর্জ্জুন উবাচ—
প্রকৃতিং পুরুষঞ্চৈব ক্ষেত্রং ক্ষেত্রজ্ঞমেব চ ।
এতদ্বেদিতুমিচ্ছামি জ্ঞানং জ্ঞেয়ঞ্চ কেশব ॥১॥

অর্জ্জুনঃ উবাচ (অর্জ্জুন কহিলেন) [হে] কেশব ! (হে কেশব !) [অহং] (আমি) প্রকৃতিং (প্রকৃতি) পুরুষং চ এব (ও পুরুষ) ক্ষেত্রং (ক্ষেত্র) ক্ষেত্রজ্ঞম্ এব চ (এবং ক্ষেত্রজ্ঞ) জ্ঞানং (জ্ঞান) জ্ঞেয়ং চ (ও জ্ঞেয়) এতৎ (এই সমস্ত) বেদিতুম্ (জানিতে) ইচ্চছামি (ইচ্ছা করি) ॥১॥

অর্জ্জুন বলিলেন—হে কেশব ! আমি প্রকৃতি, পুরুষ, ক্ষেত্র, ক্ষেত্রজ্ঞ, জ্ঞান ও জ্ঞেয় এই সমস্তের তত্ত্ব জানিতে ইচ্ছা করিতেছি ॥১॥

শ্রীভগবান উবাচ—
ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে ।
এতদ্ যো বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ ইতি তদ্বিদঃ ॥২॥

শ্রীভগবান্ উবাচ (শ্রীভগবান্ বলিলেন) [হে] কৌন্তেয় ! (হে কুন্তীনন্দন !) ইদং (এই) শরীরং (শরীর) ক্ষেত্রম্ (ক্ষেত্র) ইতি (এই নাম) অভিধীয়তে (কথিত হয়), যঃ (যিনি) এতৎ (এই দেহকে ক্ষেত্র বলিয়া) বেত্তি (জানেন), তং (তাঁহাকে) তদ্বিদঃ (ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের স্বরূপ-জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিগণ) ক্ষেত্রজ্ঞঃ ইতি (‘ক্ষেত্রজ্ঞ’ এই নামে) প্রাহুঃ (অভিহিত করেন) ॥২॥

শ্রীভগবান্ কহিলেন—হে অর্জ্জুন ! এই (স্থূল-সূক্ষ্ম) শরীর ‘ক্ষেত্র’ বলিয়া অভিহিত হয় । আর যিনি এই দেহ সত্ত্বার অনুভবকারী চেতন তাঁহাকেই (জীবত্মাকেই) তত্ত্বজ্ঞগণ ‘ক্ষেত্রজ্ঞ’ বলিয়া থাকেন ॥২॥

ক্ষেত্রজ্ঞঞ্চাপি মাং বিদ্ধি সর্ব্বক্ষেত্রেষু ভারত ।
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং যত্তজ্­জ্ঞানং মতং মম ॥৩॥

[হে] ভারত ! (হে ভারতবংশোদ্ভব !) অপি (আর) সর্ব্বক্ষেত্রেষু (সমস্ত দেহে) মাং চ (নিয়ন্তারূপে অবস্থিত আমাকেও) ক্ষেত্রজ্ঞং (ক্ষেত্রজ্ঞ বলিয়া) বিদ্ধি (জানিবে), ক্ষেত্র ক্ষেত্রজ্ঞয়োঃ (ক্ষেত্রের সহিত জীবাত্মা ও পরমত্মার) যৎ (যে) জ্ঞানং (এবম্বিধ স্বরূপ-জ্ঞান) তৎ (তাহাই) জ্ঞানং (জ্ঞান বলিয়া) মম (আমার) মতং (অভিমত) ॥৩॥

হে ভারত ! আর আমাকেও (অন্তর্যামী পরমাত্মা রূপে) সমস্ত ক্ষেত্রের ক্ষেত্রজ্ঞ বলিয়া জানিবে । ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের (জড় ও জীবাত্মা-পরমাত্মার) যে এই প্রকার যথাযথ তত্ত্বজ্ঞান, তাহাকেই আমি জ্ঞান বলিয়া মনে করি ॥৩॥

তৎক্ষেত্রং যচ্চ যাদৃক্ চ যদ্বিকারি যতশ্চ যৎ ।
স চ যো যৎপ্রভাবশ্চ তৎ সমাসেন মে শৃণু ॥৪॥

তৎ (সেই) ক্ষেত্রং (ক্ষেত্র) যৎ চ (যাহা) যাদৃক্ চ (যেরূপ ধর্ম্মবিশিষ্ট) যৎবিকারি (যাদৃশ বিকারযুক্ত) যতঃ চ (যাহা হইতে) যৎ (যেরূপে উৎপন্ন) সঃ চ (এবং সেই ক্ষেত্রজ্ঞ) যঃ (যৎস্বরূপ) যৎ প্রভাবঃ চ (ও যেরূপ প্রভাববিশিষ্ট) তৎ (তাহা) মে (আমার নিকট হইতে) সমাসেন (সংক্ষেপে) শৃণু (শ্রবণ কর) ॥৪॥

সেই ক্ষেত্র—যে বস্তু, যাদৃশ, ধর্ম্মবিশিষ্ট, যেরূপ বিকারযুক্ত, যাহা হইতে যেরূপে উৎপন্ন, এবং সেই ক্ষেত্রজ্ঞ যে স্বরূপবিশিষ্ট ও যেরূপ প্রভাবযুক্ত, সেই সমস্ত সংক্ষেপে আমার নিকট শ্রবণ কর ॥৪॥

ঋষিভির্বহুধা গীতাং ছন্দোভির্বিবিধৈঃ পৃথক্ ।
ব্রহ্মসূত্রপদৈশ্চৈব হেতুমদ্ভির্বিনিশ্চিতৈঃ ॥৫॥

[তৎ] (সেই ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞতত্ত্ব)ঋষিভিঃ (ঋষিগণ কর্ত্তৃক), বিবিধৈঃ (ভিন্ন ভিন্ন) ছন্দোভিঃ (বেদের দ্বারা) হেতুমদ্ভিঃ চ (ধুক্তিযুক্ত) বিনিশ্চিতৈঃ (সিদ্ধান্তপূর্ণ) ব্রহ্মসূত্রপদৈঃ (বেদান্ত বাক্যসকল দ্বারা) পৃথক্ (পৃথক্ পৃথক্ ভাবে) বহুধা এব (বহু প্রকারেই) গীতং (কীর্ত্তিত হইয়াছে) ॥৫॥

সেই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ তত্ত্ব—ঋষিগণ, বিভিন্ন বেদবাক্য সমূহ এবং যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্তবিশিষ্ট ব্রহ্মসূত্রনামক বেদান্ত-বাক্য সমূহ পৃথক্ পৃথক্ ভাবে বহু প্রকারেই বর্ণন করিয়াছেন ॥৫॥

মহাভূতান্যহঙ্কারো বুদ্ধিরব্যক্তমেব চ ।
ইন্দ্রিয়াণি দশৈকঞ্চ পঞ্চ চেন্দ্রিয়গোচরাঃ ॥৬॥
ইচ্ছাদ্বেষঃ সুখং দুঃখং সংঘাতশ্চেতনা ধৃতিঃ ।
এতৎ ক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারমুদাহৃতম্ ॥৭॥

মহাভূতানি (আকাশাদি পঞ্চমহাভূত) অহঙ্কারঃ (অহঙ্কার) বুদ্ধিঃ (মহত্তত্ত্ব) অব্যক্তম্ এব চ (ও প্রকৃতি) দশ ইন্দ্রিয়াণি (দশ ইন্দ্রিয়) একং চ (ও এক মন) পঞ্চ (পাঁচটি) ইন্দ্রিয়গোচরাঃ (শব্দ স্পর্শাদি ইন্দ্রিয়ের বিষয়) ; ইচ্ছা (ইচ্ছা), দ্বেষঃ (দ্বেষ) সুখং (সুখ) দুঃখং (দুঃখ) সংঘাতঃ (দেহ) চেতনা (জ্ঞানাত্মিকা মনোবৃত্তি) ধৃতিঃ (ধৈর্য্য) সবিকারম্ (জন্মাদি ষড়্­বিকার সহিত) এতৎ (এই সমস্ত) ক্ষেত্রং (ক্ষেত্র বলিয়া) সমাসেন (সংক্ষেপে) উদাহৃতম্ (কথিত হয়) ॥৬–৭॥

আকাশাদি পঞ্চমহাভূত, অহঙ্কার, মহত্তত্ত্ব, প্রকৃতি, চক্ষু কর্ণাদি পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়, মুখ হস্তাদি পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয়, অন্তরিন্দ্রিয় মন, শব্দস্পর্শাদি পাঁচটী ইন্দ্রিয়ের গ্রাহ্য বিষয় ; ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, শরীর, জ্ঞানাত্মিকা মনোবৃত্তি ও ধৈর্য্য,—জন্মাদি ছয়টি বিকারের সহিত—এ সকলই ক্ষেত্র বলিয়া সংক্ষেপে কথিত হয় ॥৬–৭॥

অমানিত্বমদম্ভিত্বমহিংসা ক্ষান্তিরার্জবম্ ।
আচার্য্যোপাসনং শৌচং স্থৈর্য্যমাত্মবিনিগ্রহঃ ॥৮॥
ইন্দ্রিয়ার্থেষু বৈরাগ্যমনহঙ্কার এব চ ।
জন্মমৃত্যুজরাব্যাধি-দুঃখদোষানুদর্শনম্ ॥৯॥
অসক্তিরনভষ্বঙ্গঃ পুত্ত্রদারগৃহাদিষু ।
নিত্যঞ্চ সমচিত্তত্ত্বমিষ্টানিষ্টোপপত্তিষু ॥১০॥
ময়ি চানন্যযোগেন ভক্তিরব্যভিচারিণী ।
বিবিক্তদেশসেবিত্বমরতির্জনসংসদি ॥১১॥
অধ্যাত্মজ্ঞাননিত্যত্বং তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্ ।
এতজ্­জ্ঞানমিতি প্রোক্তমজ্ঞানাং যদতোঽন্যথা ॥১২॥

অমানিত্বম্ (মানশূন্যতা), অদম্ভিত্বম্ (গর্ব্বহীনতা), অহিংসা (অহিংসা), ক্ষান্তিঃ (অপমানাদি সহিষ্ণুতা), আর্জ্জবম্ (সরলতা), আচার্য্যোপাসনং (অকৈতবে সদ্­গুরুর সেবা), শৌচং (বাহ্য ও অভ্যন্তরের পবিত্রতা), স্থৈর্য্যম্ (সন্মার্গে অবিচলিত নিষ্ঠা), আত্মবিনিগ্রহঃ (শরীর সংযম), ইন্দ্রিয়ার্থেষু (শব্দাদি ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বিষয়ে) বৈরাগ্যম্ (রুচির অভাব), অনহঙ্কারঃ এব চ (ও অহঙ্কার শূন্যতা), জন্মমৃত্যুজরাব্যাধি দুঃখদোষানুদর্শনম্ (জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধিতে দুঃখরূপ দোষের চিন্তন), পুত্ত্রদার গৃহাদিষু (পুত্ত্র, স্ত্রী ও গৃহাদিতে) অসক্তিঃ (প্রীতিত্যাগ),অনভিষ্বঙ্গঃ (অপরের সুখে বা দুঃখে অভিনিবেশ রাহিত্য), ইষ্টানিষ্টোপপত্তিষু (অনুকূল বা প্রতিকূল বিষয়ের উপস্থিতিতে) নিত্যং (সর্ব্বদা) সমচিত্তত্বম্ চ (হর্ষবিষাদশূন্যতা), ময়ি চ (এবং আমাতে) অনন্যযোগেন (জ্ঞান, কর্ম্ম, তপস্যা ও যোগ প্রভৃতির অমিশ্রণে) অব্যভিচারিণী (ঐকান্তিকী) ভক্তিঃ (ভক্তি), বিবিক্তদেশসেবিত্বম্ (নির্জ্জন স্থানপ্রিয়তা), জনসংসদি (প্রাকৃত লোকসঙ্ঘে) অরতিঃ (অরুচি), অধ্যাত্মজ্ঞাননিত্যত্বং (আত্মাদিবিষয়ক জ্ঞানের নিত্য অনুশীলন), তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্ (তত্ত্বজ্ঞানের প্রয়োজন যে মোক্ষ তৎসম্বন্ধে আলোচনা), এতৎ (এই বিংশতি সংখ্যক) জ্ঞানম্ (জ্ঞানের সাধন) ইতি (ইহা) [ঋষিভিঃ] (ঋষিগণ কর্ত্তৃক) প্রোক্তম্ (কথিত হইয়াছে), অতঃ (ইহা হইতে) যৎ (যাহা) অন্যথা (বিপরীত) [তৎ] (তাহাই) অজ্ঞানম্ (অজ্ঞান) ॥৮–১২॥

অমানিত্ব, গর্ব্বহীনত্ব, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, গুরুসেবা, প্রবিত্রতা, স্থিরতা, আত্মসংযম, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য-বিষয়ে বলেরাগ্য, অহঙ্কার শূন্যতা, জন্মমৃত্যু-জরাব্যাধি প্রভৃতির দুঃখরূপ দোষদর্শন, স্ত্রী-পুত্ত্র ও গৃহাদিতে আসক্তিশূন্যতা, অন্যের সুখে ও দুঃখে ঔদাসীন্য, ইষ্ট ও অনিষ্ট বস্তু সংযোগে সর্ব্বদা সমচিত্তত্ব, আমাতে অচঞ্চলা ও অবিমিশ্রা ভক্তি, নির্জ্জন প্রিয়তা, লোকসংঘট্টে অরুচি, অধ্যাত্ম-জ্ঞানের নিত্যত্ব-বোধ ও তত্ত্বজ্ঞানের প্রয়োজন উপলব্ধি—ইহাই জ্ঞান বলিয়া উক্ত হইয়াছে । এতদতিরিক্ত সমস্তই অজ্ঞান জানিবে ॥৮–১২॥

জ্ঞেয়ং যত্তৎ প্রবক্ষ্যামি যজ্­জ্ঞাত্বামৃতশ্নুতে ।
অনাদি মৎপরং ব্রহ্ম ন সত্তন্নাসদুচ্যতে ॥১৩॥

যৎ (যাহা) জ্ঞেয়ং (জ্ঞানের বিষয়), যৎ (যাহা) জ্ঞাত্বা (জানিয়া) অমৃতং (আমার ভক্তি রূপ অমৃত) অশ্নুতে (লাভ হয়) তৎ (তাহা) প্রবক্ষ্যামি (প্রকৃষ্টরূপে বলিব) তৎ (তাহা) অনাদি (নিত্য) মৎপরং (আমার আশ্রিত তত্ত্ব) ব্রহ্ম (‘ব্রহ্ম’ শব্দ বাচ্য) ন সৎ (কার্য্যাতীত) ন অসৎ (ও কারণাতীত) উচ্যতে (বলিয়া কথিত হন) ॥১৩॥

যাহা ‘জ্ঞেয়’ অর্থাৎ জ্ঞাতব্য, যাহা অবগত হইলে আত্মারামত্বরূপ অমৃতাস্বাদন অনুভূত হয়—তাহা বলিতেছি । সেই জ্ঞেয় বস্তু অনাদি অর্থাৎ সনাতন, মৎপর অর্থাৎ আমার আশ্রিত ও সদসদনির্ব্বচনীয় ‘ব্রহ্ম’—এই নামে অভিহিত হন ॥১৩॥

সর্ব্বতঃ পাণিপাদন্তৎ সর্ব্বতোঽক্ষিশিরোমুখম্ ।
সর্ব্বতঃ শ্রুতিমল্লোকে সর্ব্বমাবৃত্য তিষ্ঠতি ॥১৪॥

সর্ব্বতঃ (সর্ব্বত্র) পাণিপাদং (হস্তপদবিশিষ্ট) সর্ব্বতঃ (সর্ব্বত্র) অক্ষিশিরোমুখম্ (চক্ষু, মস্তক ও মুখবিশিষ্ট) সর্ব্বতঃ শ্রুতিমৎ (সর্ব্বত্র কর্ণ বিশিষ্ট) তৎ (তিনি) লোকে (জগতে) সর্ব্বম্ (সমস্ত বস্তুকে) আবৃত্য (ব্যাপিয়া) তিষ্ঠতি (অবস্থিত রহিয়াছেন) ॥১৪॥

সর্ব্বত্র হস্তপদবিশিষ্ট, সর্ব্বত্র চক্ষু, মস্তক ও মুখসংযুক্ত এবং সর্ব্বত্র কর্ণাদি বিশিষ্ট হইয়া ব্রহ্মাণ্ডস্থ সমস্ত বস্তুকে সম্যক্ ব্যাপিয়া (পরমাত্মারূপে) তিনি বিরাজমান ॥১৪॥

সর্ব্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্ব্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্ ।
অসক্তং সর্ব্বভৃচ্চৈব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ ॥১৫॥

সর্ব্বেন্দ্রিয় গুণাভাসং (সমস্ত ইন্দ্রিয় ও তাহাদের গুণ শব্দাদির সহিত বিরাজমান) [তদপি] (তাহা হইলেও) সর্ব্বেন্দ্রিয় বিবর্জ্জিতম্ (প্রাকৃত ইন্দ্রিয়রহিত), অসক্তং (আসক্তিশূন্য) সর্ব্বভৃৎ চ (শ্রীবিষ্ণুস্বরূপে সকলের পালক), নির্গুণং (সত্ত্বাদি প্রাকৃত গুণাতীত) গুণভোক্তৃ চ এব (এবং ত্রিগুণাতীত ‘ভগ’ শব্দবাচ্য ঐশ্বর্য্যাদি ষড়্­গুণেরই আস্বাদক) ॥১৫॥

সেই বৃহত্তত্ত্ব সমস্ত ইন্দ্রিয় ও তৎবিষয় প্রকাশক হইলেও জড়েন্দ্রিয় রহিত, অনাসক্ত হইয়াও (শ্রীবিষ্ণুরূপে) সকলের পালক এবং ত্রিগুণাতীত হইয়াও গুণাত্মিকা প্রকৃতির সেব্য ॥১৫॥

বহিরন্তশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ ।
সূক্ষ্মত্বাত্তদবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চান্তিকে চ তৎ ॥১৬॥

তৎ (সেই তত্ত্ব) ভূতানাং (সর্ব্বভূতের) বহিঃ (বাহিরে) অন্তঃ চ (ও অন্তরে অবস্থিত), অচরং (স্থাবর) চরম্ এব চ (এবং জঙ্গম), তৎ (তিনি) সূক্ষ্মত্বাৎ (প্রাকৃত রূপাদি শূন্যত্ব হেতু) অধিজ্ঞেয়ং (ইহাই সেই বস্তু এইরূপ স্পষ্ট জ্ঞানের অযোগ্য) দূরস্থং (অজ্ঞজনের পক্ষে দূরস্থিত) অন্তিকে চ (বিদ্বান্গণের সম্বন্ধে নিকটে অবস্থিত) ॥১৬॥

সেই তত্ত্ব সমস্ত ভূতের অন্তরে ও বাহিরে বর্ত্তমান, উহাই (শক্তি পরিণামে) চরাচর জগৎ, উহা অতি সূক্ষ্ম বলিয়া প্রাকৃত বিজ্ঞানের অগোচর এবং বহু দূরবর্ত্তী অথচ অতি নিকটেই অবস্থিত ॥১৬॥

অবিভক্তঞ্চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্ ।
ভূতভর্ত্তৃ চ তজ্­জ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ ॥১৭॥

তৎ (তিনি) ভূতেষু (পরস্পর ভিন্ন জীব সমূহে) অবিভক্তং চ (এক হইয়াও) বিভক্তম্ ইব চ (ভিন্ন ভিন্ন বলিয়া) স্থিতম্ (প্রতীত হন), [তৎ এব] (তিনিই) ভূতভর্ত্তৃ (শ্রীনারায়ণ স্বরূপে প্রাণি সমূহের পালক) গ্রসিষ্ণু চ (প্রলয়কালে সংহারক) প্রভবিষ্ণু চ (এবং স্থিতিকালে সৃষ্টিকর্ত্তা বলিয়া) জ্ঞেয়ম্ (জ্ঞাতব্য) ॥১৭॥

তিনি এক অখণ্ডতত্ত্ব হইয়াও সর্ব্বভূতে খণ্ডের ন্যায় অবস্থিত অর্থাৎ তিনি প্রত্যেক জীবাত্মার সহিত ব্যষ্টিপুরুষরূপে অবস্থিত হইয়াও সর্ব্বভূতের অন্তর্যামী এক অখণ্ড বিরাট্ সমষ্টিস্বরূপ পরমেশ্বর । তিনিই (শ্রীনারায়ণ স্বরূপে) জীবগণের পালক ও প্রলয়োৎপত্তিকারক বলিয়া কথিত হন ॥১৭॥

জ্যোতিষামপি তজ্জ্যোতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে ।
জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সর্ব্বস্য ধিষ্ঠিতম্ ॥১৮॥

তৎ (তিনি) জ্যোতিষাম্ অপি (জ্যোতিষ্কগণের) জ্যোতিঃ (প্রকাশক) তমসঃ (অজ্ঞানের) পরম্ (অতীত বলিয়া) উচ্যতে (কথিত হন) । [তৎ এব] (তিনিই) জ্ঞানং (বুদ্ধিবৃত্তিতে অভিব্যক্ত জ্ঞান), জ্ঞেয়ং (রূপাদির আকারে পরিণত জ্ঞেয়), জ্ঞানগম্যং (অমানিত্বাদি জ্ঞানের সাধন দ্বারা প্রাপ্য), সর্ব্বস্য (সকলের) হৃদি (হৃদয়ে) ধিষ্ঠিতম্ (পরমাত্মাস্বরূপে অবস্থির) ॥১৮॥

তিনি জ্যোতিষ্কগণেরও প্রকাশক এবং অন্ধকারেরও অতীত অব্যক্ত বলিয়া কথিত হন । তিনিই জ্ঞান ও জ্ঞেয়তত্ত্ব, এবং অমানিত্বাদি জ্ঞানসাধ্য, তিনিই সকলের হৃদয়ে পরমাত্মাস্বরূপে অবস্থিত রহিয়াছেন ॥১৮॥

ইতি ক্ষেত্রং তথা জ্ঞানং জ্ঞেয়ঞ্চোক্তং সমাসতঃ ।
মদ্ভক্ত এতদ্বিজ্ঞায় মদ্ভাবায়োপপদ্যতে ॥১৯॥

ইতি (এই) ক্ষেত্রং (মহাভূতাদি ধৃতি পর্য্যান্ত ক্ষেত্র) তথা জ্ঞানং (এবং অমানিত্বাদি তত্ত্বজ্ঞানার্থ দর্শন পর্য্যন্ত জ্ঞান) জ্ঞেয়ং চ (ও অনাদি হইতে ধিষ্ঠিত পর্য্যন্ত ব্রহ্ম, ভগবন্ ও পরমাত্মা শব্দবাচ্য জ্ঞেয় ও জ্ঞানগম্য তত্ত্ব) সমাগতঃ (সংক্ষেপে) উক্তং (কথিত হইল) । মদ্ভক্তঃ (আমার ভক্ত) এতৎ (ইহা) বিজ্ঞায় (বিদিত হইয়া) মদ্ভাবায় (আমার প্রতি প্রেম ভক্তি লাভের) উপপদ্যতে (যোগ্য হন) ॥১৯॥

এইরূপে ‘ক্ষেত্র’, ‘জ্ঞান’ ও (ব্রহ্ম, পরমাত্মা ও ভগবান্ শব্দবাচ্য) ‘জ্ঞেয়’ তত্ত্ব সংক্ষেপে বলা হইল । আমার ভক্তগণ এই সমস্ত বিশেষভাবে অবগত হইয়া আমার প্রতি নিরুপাধিক ভাবময় ভজনের যোগ্য হন ॥১৯॥

প্রকৃতিং পুরুষঞ্চৈব বিদ্ধ্যনাদী উভাবপি ।
বিকারাংশ্চ গুণাংশ্চৈব বিদ্ধি প্রকৃতিসম্ভবান্ ॥২০॥

প্রকৃতিং (প্রকৃতি অর্থাৎ মায়া) পুরুষং চ (ও ক্ষেত্রজ্ঞ শব্দবাচ্য জীবাত্মা) উভৌ অপি (উভয়কেই) অনাদী এব (অনাদি বলিয়াই) বিদ্ধি (জানিবে), বিকারান্ চ (এবং দেহ ও ইন্দ্রিয়াদি-বিকার সকল) গুণান্ চ (ও গুণ পরিণাম সুখ, দুঃখ, শোক, মোহাদিকে) প্রকৃতি সম্ভবাদ্ এব (প্রকৃতি হইতে উদ্ভুত বলিয়াই) বিদ্ধি (জানিবে) ॥২০॥

প্রকৃতি (মায়া) ও পুরুষ (জীবাত্মা) উভয়কেই অনাদি বলিয়া জানিও, এবং দেহ ও ইন্দ্রিয়াদি বিকার সকল ও গুণ পরিণাম সুখদুঃখ শোকমোহাদিকে প্রকৃতি হইতে উৎপন্ন বলিয়াই জানিবে ॥২০॥

কার্য্যকারণকর্ত্তৃত্বে হেতুঃ প্রকৃতিরুচ্যতে ।
পুরুষঃ সুখদুঃখানাং ভোক্তৃত্বে হেতুরুচ্যতে ॥২১॥

কার্য্য কারণ কর্ত্তৃত্বে (কার্য্য শরীর, কারণ ইন্দ্রিয়গণ এবং কর্ত্তা ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাতৃ দেবতা সমূহের তদাকারে পরিণতি বিষয়ে) প্রকৃতিঃ (পুরুষাধিষ্ঠিতা প্রকৃতিই) হেতুঃ (কর্ত্তা বলিয়া) উচ্যতে (কথিত হয়) । পুরুষঃ (জীব) সুখ দুঃখানাং (সুখ ও দুঃখের) ভোক্তৃত্বে (ভোগবিষয়ে) হেতুঃ (কর্ত্তা বলিয়া) উচ্যতে (কথিত হয়) ॥২১॥

কার্য্য—শরীর ও কারণ—ইন্দ্রিয়ের কর্ত্তৃত্বে প্রকৃতিই হেতু বলিয়া উক্ত হইয়াছে এবং সুখ ও দুঃখের ভোগ বিষয়ে (বদ্ধ) জীবকেই হেতু বলা হইয়াছে ॥২১॥

পুরুষঃ প্রকৃতিস্থো হি ভুঙ্­ক্তে প্রকৃতিজান্ গুণান্ ।
কারণং গুণসঙ্গোঽস্য সদসদ্­যোনিজন্মসু ॥২২॥

পুরুষঃ (জীব) প্রকৃতিস্থঃ হি (প্রকৃতির কার্য্যদেহে অধিষ্ঠিত বলিয়াই) প্রকৃতিজান্ (প্রকৃতিজাত) গুণান্ (সুখ দুঃখাদি বিষয় সমূহ) ভুঙ্­ক্তে (ভোগ করে) ।
গুণসঙ্গঃ (গুণময় দেহ ও ইন্দ্রিয়াদিতে আসক্তিই) অস্য (এই পুরুষের) সদসদ্­যোনিজন্মসু (দেবাদি ও পশ্বাদি যোনিতে জন্মের) কারণং (কারণ) [ভবতি] (হইয়া থাকে) ॥২২॥

পুরুষ প্রকৃতির বশীভূত হইয়াই প্রকৃতিজাত সুখদুঃখাদি ভোগ করে । প্রাকৃত গুণে আসক্তিই তাহার উত্তমাধম যোনিতে পুনঃ পুনঃ জন্মলাভের কারণ ॥২২॥

উপদ্রষ্টানুমন্তা চ ভর্ত্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ ।
পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো দেহেঽস্মিন্ পুরুষঃ পরঃ ॥২৩॥

অস্মিন্ (এই) দেহে (শরীরে) পরঃ (জীব ভিন্ন) পুরুষঃ (পরম পুরুষ) উপদ্রষ্টা (জীবের সমীপে পৃথক্ অবস্থান পূর্ব্বক সাক্ষী) অনুমন্তা (অনুমোদনকারী) ভর্ত্তা (ধারক) ভোক্তা (পালক) মহেশ্বরঃ (অধিপতি) পরমাত্মা (অন্তর্যামী পরমাত্মা) ইতি চ অপি (এইরূপও) উক্তঃ (কথিত হন) ॥২৩॥

এই দেহে (জীব হইতে পৃথকতত্ত্ব) পরম পুরুষ—জীবের সমীপে সাক্ষী, অনুমোদনকারী, ধারক, পালক ও মহেশ্বর স্বরূপে অবস্থিত হইয়া পরমাত্মা প্রভৃতি নামেও কথিত হইয়া থাকেন ॥২৩॥

য এবং বেত্তি পুরুষং প্রকৃতিঞ্চ গুণৈঃ সহ ।
সর্ব্বথা বর্ত্তমানোঽপি ন স ভূয়োঽভিজায়তে ॥২৪॥

যঃ (যিনি) এবং (এই প্রকারে) পুরুষং (পুরুষ ও পুরুষোত্তম) গুণৈঃ সহ (এবং সুখ দুঃখাদি পরিণামের সহিত) প্রকৃতিং চ (মায়াশক্তি ও জীবশক্তিকে) বেত্তি (জানেন), সঃ (তিনি) সর্ব্বথা (যে কোন অবস্থায়) বর্ত্তমানঃ অপি (বর্ত্তমান থাকিয়াও) ভূয়ঃ (পুনরায়) ন অভিজায়তে (জন্মগ্রহণ করেন না) ॥২৪॥

যিনি এই প্রকারে গুণময়ী প্রকৃতি ও পুরুষ-পুরুষোত্তম (জীবাত্মা-পরমাত্মা) তত্ত্ব অবগত হন, তিনি যে কোন অবস্থায় থাকিয়াও পুনর্জন্ম প্রাপ্ত হন না ॥২৪॥

ধ্যানেনাত্মনি পশ্যন্তি কেচিদাত্মানমাত্মনা ।
অন্যে সাংখ্যেন যোগেন কর্ম্মযোগেন চাপরে ॥২৫॥
অন্যে ত্বেবমজানন্তঃ শ্রুত্বান্যেভ্য উপাসতে ।
তেঽপি চাতিতরন্ত্যের মৃত্যুং শ্রুতিপরায়ণাঃ ॥২৬॥

কেচিং (কেহ কেহ) ধ্যানেন (চিদনুভূতিতে) আত্মনি [স্থিতং] (স্বহৃদয়ে অবস্থিত) আত্মানম্ (পরমাত্মাকে) আত্মনা (স্বয়ংই) পশ্যন্তি (দর্শন করেন), অন্যে (অপর কেহ কেহ) সাংখ্যেন (আত্মানাত্মবিবেক দ্বারা), অপরে (অন্য কেহ কেহ) যোগেন (অষ্টাঙ্গ যোগ দ্বারা), কর্ম্মযোগেন চ (অথবা নিষ্কাম কর্ম্মযোগ দ্বারা), অন্যে তু (আবার অপর কেহ কেহ) এবম্ (এই সকল উপায়) অজানন্তঃ (না জানিয়া) অন্যেভ্যঃ (অন্যের নিকট) শ্রুত্বা (শুনিয়া) উপাসতে (অনুরূপ উপাসনা করেন), তে অপি (তাহারাও) শ্রুতিপরায়ণাঃ [সন্তঃ] (তাদৃশ উপদেশ শ্রবণে নিষ্ঠাযুক্ত হইয়া) মৃত্যুং (মৃত্যুময় সংসারকে) অতিতরন্তি এব (নিশ্চয়ই অতিক্রম করিয়া থাকেন) ॥২৫–২৬॥

কেহ কেহ স্বহৃদয়ে অবস্থিত পরমাত্মাকে স্বয়ংই শুদ্ধচিদনুভূতিতে দর্শন করেন, কেহ কেহ আত্মানাত্মবিবেক দ্বারা এবং কেহ অষ্টাঙ্গযোগ দ্বারা অথবা নিষ্কাম কর্ম্মযোগ দ্বারা, আবার অপর কেহ এই সমস্ত উপায় না জানিয়া অন্যের নিকট শ্রবণ পূর্ব্বক তদনুরূপ উপাসনা করেন ; তাহারা সকলেই শ্রদ্ধালু হইয়া শ্রৌত উপদেশ শ্রবণে মৃত্যুময় এই সংসারকে সুনিশ্চিত অতিক্রম করিয়া থাকেন ॥২৫–২৬॥

যাবৎ সংজায়তে কিঞ্চিৎ সত্ত্বং স্থাবরজঙ্গমম্ ।
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংযোগাত্তদ্বিদ্ধি ভরতর্ষভ ॥২৭॥

[হে] ভরতর্ষভ ! (হে ভরতশ্রেষ্ঠ !) যাবৎ কিঞ্চিৎ (যাহা কিছু) স্থাবরজঙ্গমম্ (স্থাবর ও জঙ্গম) সত্ত্বং (প্রাণী) সংজায়তে (উৎপন্ন হয়), তৎ (সেই সমস্তই) ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংযোগোৎ (ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ হইতে জাত বলিয়া) বিদ্ধি (জানিও) ॥২৭॥

হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন ! জগতে স্থাবর ও জঙ্গম যত কিছু পদার্থ উৎপন্ন হয়, তৎসমুদয়ই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ হইতে জাত জানিও ॥২৭॥

সমং সর্ব্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্ ।
বিনশ্যৎস্ববিনশ্যন্তং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি ॥২৮॥

সর্ব্বেষু ভূতেষু (ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্য্যন্ত সকল প্রাণীতে) সমং (সমান ভাবে) তিষ্ঠন্তং (অবস্থিত), বিনশ্যৎসু (এবং বিনাশশীল বস্তুর মধ্যে) অবিনশ্যন্তং (অবিনাশী) পরমেশ্বরম্ (পরমাত্মা রূপ পরমেশ্বরকে) যঃ (যিনি) পশ্যতি (দেখেন), সঃ (তিনিই) পশ্যতি (যথার্থ দর্শন করেন) ॥২৮॥

ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্য্যন্ত সমস্ত প্রাণীতে সমভাবে অবস্থিত—বিনশ্বর বস্তুর মধ্যে থাকিয়াও অবিনশ্বর-স্বরূপ (পরমাত্মারূপ) পরমেশ্বরকে যিনি দর্শন করেন তিনিই (যথার্থ) দর্শন করেন ॥২৮॥

সমং পশ্যন্ হি সর্ব্বত্র সমবস্থিতমীশ্বরম্ ।
ন হিনস্ত্যাত্মনাত্মানং ততো যাতি পরাং গতিম্ ॥২৯॥

হি (যেহেতু) [সঃ] (তিনি) সর্ব্বত্র (সর্ব্বভূতে) সমঃ (সমভাবে) সমবস্থিতম্ (ও পূর্ণভাবে বিরাজমান) ঈশ্বরম্ (পরমেশ্বরকে) পশ্যন্ (দেখিয়া) আত্মনা (দুষ্ট স্বভাব দ্বারা) আত্মানং (জীবাত্মাকে) ন হিনস্তি (অধঃপাতিত করেন না), ততঃ (অতএব) পরাংগতিম্ (উত্তমাগতি) যাতি (প্রাপ্তি হন) ॥২৯॥

এইরূপে সর্ব্বত্র (পক্ষপাত শূন্য) সমভাব ও পূর্ণাধিকারে ঐশ্বরিক অধিষ্ঠান দর্শনকারী—দুষ্ট স্বভাব দ্বারা নিজ অধঃপাত ন ঘটাইয়া পরমগতি প্রাপ্ত হন ॥২৯॥

প্রকৃত্যৈব চ কর্ম্মাণি ক্রিয়মাণানি সর্ব্বশঃ ।
যঃ পশ্যতি তথাত্মানমকর্ত্তারং স পশ্যতি ॥৩০॥

যঃ (যিনি) সর্ব্বশঃ (সমুদয়) কর্ম্মাণি (কর্ম্ম) প্রকৃত্যা এব (দেহেন্দ্রিয়াদি আকারে পরিণতা প্রকৃতি কর্ত্তৃকই) ক্রিয়মাণানি (অনুষ্ঠিত হইতেছে), তথা (এইরূপ) পশ্যতি (দেখেন), সঃ (তিনি) আত্মানম্ (শুদ্ধাত্মাস্বরূপ নিজেকে—জীবাত্মাকে) অকর্ত্তারং (অকর্ত্তা) পশ্যতি (দর্শন করেন) ॥৩০॥

যিনি (দেহ ও ইন্দ্রিয়াদিরূপে পরিণত) প্রকৃতি কর্ত্তৃকই সর্ব্বপ্রকারে সমস্ত কর্ম্ম অনুষ্ঠতি হইতেছে,—এইরূপ দর্শন করেন, তিনিই শুদ্ধাত্ম-স্বরূপ নিজেকে—অকর্ত্তা দর্শন করেন, অর্থাৎ শুদ্ধাত্মা জড়ধর্ম্মী নহেন—ইহা অনুভব করেন ॥৩০॥

যদা ভূতপৃথগ্­ভাবমেকস্থমনুপশ্যতি ।
অতএব চ বিস্তারং ব্রহ্ম সম্পদ্যতে তদা ॥৩১॥

যদা (যখন) [সঃ] (তাদৃশ দ্রষ্টা) ভূতপৃথগ্­ভাবম্ (স্থাবরজঙ্গমাত্মক ভূত সমূহের সেই সেই পার্থক্য) একস্থম্ (একমাত্র প্রকৃতিতেই অবস্থিত) ততঃ এব চ (এবং সেই প্রকৃতি হইতেই) [ভূতানাং] বিস্তারং (ভূতগণের বিস্তৃতি) অনুপশ্যতি (জানিতে পারেন), তদা (তখন) ব্রহ্ম সম্পদ্যতে (ব্রহ্মস্বরূপ অনুভব করেন) ॥৩১॥

যখন বিবেকী পুরুষ, প্রাণিমাত্রের তত্তৎ জড়ীয় পার্থক্য মূলতঃ একমাত্র প্রকৃতিতেই (ক্ষেত্রত্বে) অবস্থিত ও (সৃষ্টি সময়ে) সেই প্রকৃতি হইতেই আবার তাহাদের বিস্তৃতি— বুঝিতে পারেন, তখন তিনি (প্রকৃতির আপেক্ষিকতায়) ক্ষেত্রজ্ঞসাম্য দর্শনে ব্রহ্মস্বরূপতা অনুভব করেন ॥৩১॥

অনাদিত্বান্নির্গুণত্বাৎ পরমাত্মায়মব্যয়ঃ ।
শরীরস্থোঽপি কৌন্তেয় ন করোতি ন লিপ্যতে ॥৩২॥

[হে] কৌন্তেয় ! (হে কুন্তীপুত্র !) অনাদিত্বাৎ (অনাদিত্ব) নির্গুণত্বাৎ (ও গুণ সম্বন্ধ রাহিত্য হেতু) অয়ম্ (এই) অব্যয়ঃ (নিত্যপূর্ণ) পরমাত্মা (পরমাত্মা) শরীরস্থঃ অপি (দেহ মধ্যে থাকিয়াও) [জীববৎ] ন করোতি (কোন কর্ম্ম করেন না) ন লিপ্যতে (এবং ক্ষেত্রধর্ম্মে লিপ্ত হন না) ॥৩২॥

হে অর্জ্জুন ! অনাদি, গুণাতীত ও নিত্যপূর্ণ স্বভাবহেতু এই পরমাত্মা দেহমধ্যে (জীবাত্মার সহিত) অবস্থিত থাকিয়াও (বদ্ধজীবের মত) কোন কর্ম্ম করেন না বা ক্ষেত্রধর্ম্মে লিপ্তও হন না ॥৩২॥

যথা সর্ব্বগতং সৌক্ষ্ম্যাদাকাশং নোপলিপ্যতে ।
সর্ব্বত্রাবস্থিতো দেহে তথাত্মা নোপলিপ্যতে ॥৩৩॥

যথা (যেমন) সর্ব্বগতং (সর্ব্বত্র অবস্থিত) আকাশং (আকাশ) সৌক্ষ্ম্যাৎ (সূক্ষ্মতাহেতু) ন উপলিপ্যতে (উপলিপ্ত হয় না) তথা (সেইরূপ) সর্ব্বত্র (সর্ব্বস্থান ব্যাপিয়া) দেহে (দেহ মধ্যে) অবস্থিতঃ (অবস্থিত) আত্মা (জীবাত্মা ও) ন উপলিপ্যতে (দেহ ধর্ম্মে লিপ্ত হন না) ॥৩৩॥

যেমন (পঙ্কাদি) সমস্ত স্থানে অবস্থিত আকাশ সূক্ষ্মত্বহেতু কাহারও সহিত লিপ্ত হয় না, তদ্রূপ দেহের সর্ব্বস্থান ব্যাপিয়া অবস্থিত বিবেকী জীবাত্মাও দেহধর্ম্মে লিপ্ত হন না ॥৩৩॥

যথা প্রকাশয়ত্যেকঃ কৃৎস্নং লোকমিমং রবিঃ ।
ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃৎস্নং প্রকাশয়তি ভারত ॥৩৪॥

[হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) যথা (যেমন) একঃ (এক) রবিঃ (সূর্য্য) ইমং (এই) কৃৎস্নং (সমগ্র) লোকম্ (জগৎকে) প্রকাশয়তি (প্রকাশ করেন), তথা (সেইরূপ) ক্ষেত্রী (পরমাত্মা ও জীবাত্মা) কৃৎস্নং (সমস্ত) ক্ষেত্রং (ক্ষেত্রকে) প্রকাশয়তি (প্রকাশিত করেন) ॥৩৪॥

হে ভারত ! এক সূর্য্য যেমন সমগ্র জগৎকে প্রকাশ করেন, তদ্রূপ ক্ষেত্রজ্ঞ পরমাত্মা সমগ্র জগৎকে (জীবাত্মাদিকেও) এবং ক্ষেত্রজ্ঞ জীবাত্মা সমস্ত দেহাদিকে প্রকাশিত করেন ॥৩৪॥

ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োরেবমন্তরং জ্ঞানচক্ষুষা ।
ভূতপ্রকৃতিমোক্ষঞ্চ যে বিদুর্যান্তি তে পরম্ ॥৩৫॥

যে (যাঁহারা) এবং (উক্ত প্রকারে) ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োঃ (ক্ষেত্রসহ ক্ষেত্রজ্ঞদ্বয়ের) অন্তরং (ভেদ) ভূতপ্রকৃতিমোক্ষং চ (এবং ভূতগণের প্রকৃতি হইতে মোক্ষের উপায়) জ্ঞান চক্ষুষা (জ্ঞান চক্ষু দ্বারা) বিদুঃ (জানিতে পারেন), তে (তাঁহারা) পরম্ (পরমপদ) যান্তি (প্রাপ্ত হন) ॥৩৫॥

যাঁহারা এইরূপে ক্ষেত্রের সহিত ক্ষেত্রজ্ঞদ্বয়ের পার্থক্য এবং জীবগণের প্রকৃতি হইতে মোক্ষের উপায়—জ্ঞানদৃষ্টি দ্বারা অবগত হন, তাঁহারাই পরমপদ লাভ করেন ॥৩৫॥

ইতি শ্রীমহাভারতে শতসাহস্র্যাং সংহিতায়াং বৈয়াসিক্যাং
ভীষ্মপর্ব্বণি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জ্জুনসংবাদে প্রকৃতিপুরুষ-বিবেক-
যোগো নাম ত্রয়োদশোঽধ্যায়ঃ ॥১৩॥


                                                                                                   গ্রন্থ-সম্পাদক—
                                                                                       ত্রিদণ্ডিভিক্ষু—শ্রীভক্তিরক্ষক শ্রীধর
                                                                                         শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ, নবদ্বীপ
                                                                                        শ্রীজন্মাষ্টমী বঙ্গাব্দ ১৩৬৮ সাল

২) আমি কেবল ক্ষেত্রজ্ঞ নহি, ক্ষেত্রও আমি । কারণ প্রকৃতির পরিণামই দেহ এবং সেই প্রকৃতি আমার বিভাব ও শক্তি [গী|৪|১০] ।

৪) ব্রহ্মসূত্র :
ব্রহ্মসূত্র বলিতে বেদান্ত দর্শন বুঝায় । বিভিন্ন ঋষিগণ বিভিন্ন উপনিষদে পৃথক্‌ পৃথক্‌ অধ্যাত্মতত্ত্বের আলোচনা করিয়াছেন । যুক্তিযুক্ত বিচার বিতর্ক দ্বারা ঐ সকল বিভিন্ন মতের সমন্বয় ও সামঞ্জস্য বিধান করিয়া বেদান্ত দর্শন রচিত হইয়াছে । এই শ্লোকে তাহাই বলা হইল । ঋষিগণ বিভিন্ন উপনিষদে পৃথক্‌ ভাবে যাহা আলোচনা করিয়াছেন, ব্রহ্মসূত্র তাহাই কার্যকারণহেতু দেখাইয়া নিঃসন্দিগ্ধরূপে ব্যাখ্যা করিয়াছে । এই হেতু উহার অপর নাম উত্তর মীমাংসা এবং উহাতে ক্ষেত্রজ্ঞের বিচার আছে বলিয়া উহাকে শারীরক সূত্রও বলে (শরীর=ক্ষেত্র) । ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্তদর্শন গীতার পরে রচিত হইয়াছে মনে করিয়া কেহ কেহ ‘ব্রহ্মসূত্র’ পদে ব্রহ্মপ্রতিপাদক সূত্র অর্থাৎ উপনিষদাদি এইরূপ অর্থ করেন । কিন্তু লোকমান্য তিলক প্রভৃতি আধুনিক পণ্ডিতগণের মত এই যে বর্তমান মহাভারত, গীতা এবং বেদান্তদর্শন বা ব্রহ্মসূত্র এই তিনই বাদরায়ণ ব্যাসদেবেরই প্রণীত । এই হেতু ব্রহ্মসুত্রকে ব্যাসসূত্রও বলে ।

৬) ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ : আমি সুখী, আমি দুঃখী, ‘আমার দেহ’, ‘আমার গৃহ’ – এই আমি কে ?
এই ‘আমি’ দেহ নহে, হস্তপদাদি-ইন্দ্রিয় নহে, মনও নহে, বুদ্ধিও নহে; ‘আমি’ এ-সকলের অতীত কোনো বস্তু, যাহার নাম জীব ও জীবাত্মা । কৃষক যেমন ক্ষেত্র হইতে ফল উৎপন্ন করিয়া ভোগ করে, জীবও তদ্রূপ এই দেহ অবলম্বন করিয়া প্রাক্তন-কর্মজনিত সুখ-দুঃখাদি ভোগ করেন, এই জন্য এই দেহের নাম ক্ষেত্র । আবার ক্ষেত্রস্বামী যেমন জানেন যে, ইহা আমার ক্ষেত্র, সুতরাং আমি মালিক, আমিই ভোক্তা, এইরূপ অভিমান করেন, সেইরূপ জীবও এই দেহ আমারই ভোগভূমি বলিয়া জানেন এবং আমার দেহ, আমার মন ইত্যাদি রূপ অভিমান করেন । এই হেতু জীবকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলা হয় । সুতরাং বেদান্তমতে দেহ ও আত্মার যে তত্ত্ব বা বিচার তাহারই নাম ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিচার । ইহাই সাংখ্যমতে প্রকৃতি-পুরুষ বিচার । [বিশদ]

সাংখ্যের ২৪ তত্ত্ব ব্যতীত ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, সংঘাত, চেতনা, ধৃতি – এই কয়েকটি অতিরিক্ত তত্ত্বের এ-স্থলে উল্লেখ করা হইয়াছে । ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ – মনেরই গুণ, সুতরাং মনেই উহাদের সমাবেশ হয় ।
চেতনা : জীবদেহে প্রাণের ক্রিয়া বা চেষ্টা-চাঞ্চল্য । চেতনা ও চৈতন্য এক কথা নহে । সুষুপ্তি-অবস্থায় চেতনা অর্থাৎ প্রাণের ক্রিয়া থাকে কিন্তু চৈতন্য বা আমি-জ্ঞান থাকে না । এই চেতনা নামক ক্রিয়া জড় দেহেরই গুণ, আত্মার নহে, এই জন্য ইহাকে ক্ষেত্রের মধ্যেই সমাবেশ করা হয় ।
ধৃতি : মন, প্রান ইত্যাদির ক্রিয়া শরীরের মধ্যে যে শক্তির দ্বারা স্থির থাকে । ইহাও জড়দেহেরই গুণ ।
সংঘাত = সমুচ্চয় বা সংহতি; জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রিয়, উভয়েন্দ্রিয়, মন, প্রাণ ইত্যাদি শারীরিক ও মানসিক সমস্ত তত্ত্বের যে সংহতি বা সমুচ্চয়, দার্শনিক ভাষায় তাহারই নাম সংঘাত বা শরীর । ক্ষেত্রের মধ্যেই উহার সমাবেশ করা হইয়াছে ।

১১) জ্ঞানীর ২০টি লক্ষণ : ‘যাহা পিণ্ডে তাহা ব্রহ্মাণ্ডে’ অর্থাৎ এই নশ্বর দেহেন্দ্রিয়াদির অতিরিক্ত যে অবিনশ্বর আত্মতত্ত্ব এবং নামরূপাত্মক নশ্বর ব্যক্ত জগতে অভিব্যাপ্ত যে অবিনশ্বর ব্রহ্মতত্ত্ব – এই উভয়ই এক; জীব, প্রকৃতি বা মায়ামুক্ত হইলেই এই একত্ব-জ্ঞান লাভ করে, উহাই প্রকৃত জ্ঞান । ইহাই আত্মজ্ঞান, ব্রহ্মাত্মৈক্যজ্ঞান, দেহাত্মবিবেক, পুরুষ-প্রকৃতি-বিবেক, ব্রাহ্মী-স্থিতি, কৈবল্য মুক্তি ইত্যাদি নানা কথায় ব্যক্ত করা হয় । বেদান্তী ও ব্রহ্মজ্ঞানী এক কথা নহে । যিনি এই জ্ঞান লাভ করেন, তাঁহার সর্বত্র সাম্যবুদ্ধি জন্মে, তাঁহার সর্বসময়ে শুদ্ধ বুদ্ধি, শুদ্ধ বাসনা ও শুদ্ধ আচরণ পরিদৃষ্ট হয় এবং তাঁহার অমানিত্ব, অদম্ভিত্ব প্রভৃতি গুণের উদ্রেক হয় ।

১৫) এই শ্লোকটি সম্পূর্ণ শেতাশ্বেতর উপনিষৎ [৩|১৬] হইতে আসিয়াছে ।

১৯) সাংখ্যমতে পুরুষ ও প্রকৃতি উভয়ই অনাদি এবং স্বতন্ত্র মূলতত্ত্ব; কিন্তু বেদান্তী বলেন, প্রকৃতি স্বতন্ত্র নহে, উহা পরমেশ্বর হইতেই উৎপন্ন, পরমেশ্বরেরই শক্তি এবং এই হেতুই অনাদি । গীতায় ইহাদিগকেই অপরা ও পরা প্রকৃতি বলা হইয়াছে ।

২১) পুরুষের সংসারিত্বের কারণ :
পুরুষ-প্রকৃতির সংসর্গবশত প্রকৃতির গুণ অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ, তমোগুণের ধর্ম সুখ-দুঃখ-মোহাদিতে আবদ্ধ হইয়া পড়েন এবং আমি সুখী, আমি দুঃখী, আমি কর্তা, আমার কর্ম ইত্যাদি অভিমান করিয়া কর্মপাশে আবদ্ধ হন । এই সকল কর্মের ফলভোগের জন্য তাঁহাকে পুনঃপুনঃ সদসদ্‌-যোনিতে জন্মগ্রহণ করিতে হয় । সত্ত্বগুণের প্রাবল্যে দেব-যোনিতে, রজোগুণের উৎকর্ষে মনুষ্য-যোনিতে এবং তমোগুণের আধিক্যে পশ্বাদি-যোনিতে তাঁহার জন্ম হয় ।

যিনি পুরুষকে প্রকৃতি হইতে পৃথক বলিয়া জানেন, যিনি জানেন যে পুরুষ অকর্তা, উদাসীন, উপদ্রষ্টা মাত্র – তিনিই জ্ঞানী, তিনিই এই জন্মকর্মের বন্ধন হইতে মুক্ত ।

২২) উপদ্রষ্টা = সমীপে থাকিয়া যিনি দেখেন অথচ নিজে ব্যাপৃত হন না;
ভর্তা : ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি প্রভৃতি জড় হইলেও চৈতন্যময় পুরুষের চৈতন্যাভাসে উদ্ভাসিত হইয়া থাকে । ইহাকেই পুরুষের ভরণ বলা হইয়াছে এবং এই হেতুই পুরুষকে ভর্তা বলা হয় ।
ভোক্তা : যিনি স্বরূপত নির্বিকার ও নির্লিপ্ত হইলেও সুখ-দুঃখাদি যেন উপলব্ধি করেন অর্থাৎ নিত্য চৈতন্যময় বলিয়া সুখ-দুঃখাদি বৃত্তিকেও চৈতন্যগ্রস্ত করিয়া প্রকাশ করেন, তাই তিনি ভোক্তা ।

সাংখ্য দর্শন যাহাকে স্বতন্ত্র মূলতত্ত্ব পুরুষ বলেন, তাহাকেই এস্থলে পরমপুরুষ পরমাত্মা বলা হইতেছে । সুতরাং এস্থলে সাংখ্য ও বেদান্তের সমন্বয় হইয়া গেল ।

২৩) প্রকৃতি-পুরুষ বিবেক :
এই জ্ঞেয় বস্তুই ক্ষেত্রজ্ঞ, পরমাত্মা বা পরব্রহ্ম এবং প্রকৃতি-সম্ভূত দেহেন্দ্রিয়াদিই ক্ষেত্র । বেদান্তে যাহা ক্ষেত্র বা ক্ষেত্রজ্ঞ, সাংখ্য-শাস্ত্রের পরিভাষায় তাহাই প্রকৃতি ও পুরুষ এবং ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ-জ্ঞানই সাংখ্যের পুরুষ-প্রকৃতি-বিবেক । এই প্রকৃতি-পুরুষের বিবেকজ্ঞান অর্থাৎ পার্থক্য-জ্ঞানেই কৈবল্য মুক্তি – যাঁহার এই জ্ঞান হইয়াছে, তাঁহার পক্ষে ধর্ম-কর্ম, বিধি-নিষেধ কিছু নাই; অনাসক্তভাবে কর্ম করিলেও তাঁহার কর্মবন্ধন নাই, কেননা তিনি ত্রিগুণাতীত মুক্তপুরুষ । প্রকৃতিই মায়া, উহাই সংসারের কারণ; সুতরাং তিনি মায়ামুক্ত, তাঁহার সংসারের ক্ষয় হইয়াছে ।

২৪) আত্মকারা : মন যখন নির্বিষয় হয়, তখন আর উহা মন থাকে না, আত্মকারাকারিত হয় । এই অবস্থায় আত্মদর্শন হয়; ‘আপনি আপনাতে আত্মদর্শন করেন’ [লোকমান্য তিলক] ।

২৫) ধ্যান, জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি – গীতা এই চারটি বিভিন্ন মার্গের উল্লেখ করিয়াছেন এবং ইহার যে কোন মার্গে সাধন আরম্ভ হউক না কেন, শেষে পরমেশ্বর প্রাপ্তি বা মোক্ষ লাভ হয়ই, ইহাই গীতার উদার মত । গীতোক্ত যোগ বলিতে ইহার ঠিক কোন একটা বুঝায় না । গীতা এই চারিটি মার্গের সমন্বয় করিয়া অপূর্ব যোগধর্ম শিক্ষা দিয়াছেন । সেই যোগ কি তাহা পূর্বে নানা স্থানে প্রদর্শিত হইয়াছে ।

২৬) বেদান্ত মতে এ সংযোগকে অধ্যাস, ঈক্ষণ ইত্যাদি বলা হয় । এই অধ্যাসের ফলে ক্ষেত্রজ্ঞের ধর্ম ক্ষেত্রে আরোপিত হয় এবং ক্ষেত্রের ধর্ম ক্ষেত্রজ্ঞে আরোপিত হয় ।

২৭) ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ বা প্রকৃতি ও পুরুষের সংযোগে সৃষ্টি, একথা পূর্বে বলা হইয়াছে । এই সংযোগের মধ্যে যিনি বিয়োগ দর্শন করেন অর্থাৎ প্রকৃতি হইতে পুরুষের, বা দেহ হইতে আত্মার পার্থক্য দর্শন করেন, এবং সেই এক বস্তুই সর্বত্র সমভাবে বিদ্যমান ইহা অনুভব করেন, তিনিই মুক্ত । এই শ্লোক এবং পরবর্তী কয়েকটি শ্লোকে এই তত্ত্বই বিবৃত হইয়াছে ।

২৮) আত্মঘাতী : এই দুর্লভ মানব-জন্ম লাভ করিয়াও যে আত্মার উদ্ধারের চেষ্টা করে না সে আত্মঘাতী । অথবা যিনি জানেন যে, পরহিংসা ও আত্মহিংসা একই কথা, তিনি ‘আত্মার দ্বারা আত্মাকে হনন করেন না’ । স্বামী বিবেকানন্দ দ্বিতীয় অর্থই গ্রহণ করিয়াছেন ।

৩০) জগতের নানাত্বের মধ্যে যিনি একমাত্র ব্রহ্মসত্ত্বাই অনুভব করেন, এবং সেই এক ব্রহ্ম হইতেই এই নানাত্বের অভিব্যক্তি ইহা যখন সাধক বুঝিতে পারেন, তখনই তাঁহার ব্রহ্মভাব লাভ হয় ।

৩২) যেমন আকাশ সর্বব্যাপী হইয়াও সুগন্ধ, দুর্গন্ধ, সলিল, পঙ্কাদির দোষ-গুণে লিপ্ত হয় না, সেইরূপ আত্মা সর্বদেহে অবস্থিত থাকিলেও দৈহিক দোষগুণে লিপ্ত হন না ।

৩৩) সূর্যের সহিত উপমার তাৎপর্য এই যে, যেমন এক সূর্য সকলের প্রকাশক অথচ নির্লিপ্ত, আত্মাও সেইরূপ ।
সংগ্রহঃ ০১। sanatandharmatattva.wordpress.com
             ০২। http://www.scsmathinternational.com

Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।