২২ নভেম্বর ২০১৭

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা: দ্বিতীয় অধ্যায় – সাংখ্যযোগ

সঞ্জয় উবাচ—
তং তথা কৃপয়াবিষ্টমশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম্ ।
বিষীদন্তমিদং বাক্যমুবাচ মধুসূদনঃ ॥১॥

সঞ্জয়ঃ উবাচ (সঞ্জয় বলিলেন) তথা (তথাবিধ) কৃপয়া আবিষ্টম্ (কৃপাপরবশ) অশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম্ (অশ্রুপূর্ণাকুলনয়ন) বিষীদন্তং তং (বিষণ্ণ বদন অর্জ্জুনকে) মধুসূদনঃ (শ্রীকৃষ্ণ) ইদং বাক্যম্ (এই বাক্য) উবাচ (বলিলেন) ॥১॥

সঞ্জয় কহিলেন—মধুসূদন তখন সেই অশ্রুপূ্র্ণ আকুল নয়ন কৃপাবিষ্ট বিষণ্ণানন অর্জ্জুনকে এই কথা বলিলেন ॥১॥

শ্রীভগবান্ উবাচ—
কুতস্ত্বা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্ ।
অনার্য্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্ত্তিকরমর্জ্জুন ॥২॥

শ্রীভগবান্ উবাচ (শ্রীভগবান্ বলিলেন) [হে] অর্জ্জুন ! (হে অর্জ্জুন ! ) কুতঃ (কি হেতু) বিষমে (এই সংগ্রাম-সংকটে) অনার্য্যজুষ্টম্ (আর্য্যগণের অযোগ্য) অস্বর্গ্যম্ (স্বর্গ-প্রতিবন্ধক) অকীর্ত্তিকরম্ (এবং অযশস্কর) ইদং কশ্মলম্ (এই মোহ) ত্বা (তোমার) সমুপস্থিতম্ (উপস্থিত হইল) ॥২॥

শ্রীভগবান্ বলিলেন—হে অর্জ্জুন ! এই বিষম যুদ্ধ সময়ে কি জন্য তোমার অনার্য্যোচিত, অস্বর্গকর ও কীর্ত্তি নাশক এই মোহ উপস্থিত হইল ? ॥২॥

ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ নৈতৎ ত্বয়্যুপপদ্যতে ।
ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্ব্বল্যং ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ ॥৩॥

[হে] পার্থ ! (হে কুন্তীপুত্ত্র !) ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ (কাতরতাপ্রাপ্ত হইও না) এতৎ (এই কাতরতা) ত্বয়ি (তোমাতে) ন উপপদ্যতে (শোভা পায় না) । [হে] পরন্তপ ! (হে শত্রু তাপন !) ক্ষুদ্রং হৃদয়-দৌর্ব্বল্যম্ (ক্ষুদ্র মানসিক দুর্ব্বলতা) ত্যক্ত্বা (পরিত্যাগ করিয়া) উত্তিষ্ঠ (উঠ, যুদ্ধার্থ উত্থিত হও) ॥৩॥

হে পার্থ ! কাতরতা ত্যাগ কর, কাতরতা তোমার উপযুক্ত নহে । হে পরন্তপ ! ক্ষুদ্র হৃদয়দৌর্ব্বল্য পরিত্যাগ করিয়া যুদ্ধার্থ উত্থিত হও ॥৩॥

অর্জ্জুন উবাচ—
কথং ভীষ্মমহং সংখ্যে দ্রোণঞ্চ মধুসূদন ।
ইষুভিঃ প্রতিযোৎস্যামি পূজার্হাবরিসূদন ॥৪॥

অর্জ্জুনঃ উবাচ (অর্জ্জুন কহিলেন) [হে] অরিসূদন ! মধুসূদন ! (হে শত্রু নাশক মধুসূদন !) অহং (আমি) পূজার্হৌ (পূজনীয়) ভীষ্মং দ্রোণঞ্চ (ভীষ্ম ও দ্রোণকে) [লক্ষীকৃত্য] (লক্ষ্য করিয়া) কথং (কি প্রকারে) সংখ্যে (যুদ্ধে) ইষুভিঃ (বাণ দ্বারা) প্রতিযোৎস্যামি (প্রতি যুদ্ধ করিব) ॥৪॥

অর্জ্জুন কহিলেন—হে অরিনিসূদন মধুসূদন ! যুদ্ধে আমি কি প্রকারে পূজনীয় পিতামহ ভীষ্ম ও আচার্য্য দ্রোণের সহিত বাণের দ্বারা প্রতিযুদ্ধ করিব ॥৪॥

গুরূনহত্বা হি মহানুভাবান্ শ্রেয়ো ভোক্তুং ভৈক্ষ্যমপীহ লোকে ।
হত্বার্থকামাংস্তু গুরূনিহৈব ভুঞ্জীয় ভোগান্ রুধিরপ্রদিগ্ধান্ ॥৫॥

মহানুভাবান্ গুরূন্ (মহানুভাব গুরুদিগকে) অহত্বা হি (বধ না করিয়া) ইহ লোকে (এই জগতে) ভৈক্ষ্যম্ অপি ভোক্তুং (ভিক্ষালব্ধ অন্ন ভোজন করাও) শ্রেয়ঃ (ভাল) । তু (কিন্তু) গুরূন্ হত্বা (গুরুবর্গকে বধ করিয়া) ইহ এব (ইহলোকেই) রুধিরপ্রদিগ্ধান্ (শোণিত লিপ্ত) অর্থ কামান্ ভোগান্ (অর্থ ও কামাদি ভোগ্য বস্তুসকল) ভুঞ্জীয় (আমাকে ভোগ করিতে হইবে) ॥৫॥

মহানুভাব গুরুজনদিগকে হত্যা না করিয়া ইহলোকে ভিক্ষান্ন ভক্ষণ করাও মঙ্গলজনক, কিন্তু গুরুজনদিগকে হত্যা করিলে এই জগতেই তাহাদের রুধিরাক্ত অর্থ ও কামাদি ভোগ্যসমূহ আমাকে ভোগ করিতে হইবে ॥৫॥

ন চৈতদ্বিদ্মঃ কতরম্নো গরীয়ো যদ্বা জয়েম যদি বা নো জয়েয়ুঃ
যানেব হত্বা ন জিজীবিষামস্ তেঽবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্ত্তরাষ্ট্রাঃ ॥৬॥

যদ্ধা (যদিই) [বয়ং] (আমরা) জয়েম (জয় করি) যদি বা (কিংবা) [এতে] (ইহারা) নঃ জয়েয়ুঃ (আমাদিগকে জয় করুক) নঃ (আমাদের সম্বন্ধে) এতৎ কতরৎ (ইহার মধ্যে কোন্টি) গরীয়ঃ (অধিক শ্রেয়স্কর) ন চ বিদ্মঃ (তাহা বুঝিতেছি না) যান্ হত্বা (যাহাদিগকে বধ করিয়া) ন জিজীবিষামঃ এব (বাঁচিতেই ইচ্ছা করি না) তে ধার্ত্তরাষ্ট্রাঃ (সেই ধৃতরাষ্ট্র পুত্ত্রগণ) প্রমুখে (যুদ্ধার্থ সম্মুখে) অবস্থিতাঃ (উপস্থিত রহিয়াছে) ॥৬॥

কোন্টি কোনটি আমাদের অধিক শ্রেয় তাহা বুঝিতেছি না । কেন না, জয় পরাজয় যাহাই হউক, যাহাদিগকে বধ করিয়া আমরা বাঁচিতেও ইচ্ছা করি না, সেই ধৃতরাষ্ট্র পুত্ত্রগণ যুদ্ধার্থ পুরোভাগে অবস্থিত রহিয়াছে ॥৬॥

কার্পণ্য-দোষোপহতস্বভাবঃ পৃচ্ছামি ত্বাং ধর্ম্মসংমূঢ়চেতাঃ ।
যচ্ছ্রেয়ঃ স্যান্নিশ্চিতং ব্রুহি তন্মে শিষ্যস্তেঽহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম্ ॥৭॥

কার্পণ্যদোষোপহতস্বভাবঃ (চিত্তের দীনতা ও কুলক্ষয়জনিত দোষদ্বারা অভিভূত স্বভাব) [তথা] (এবং) ধর্ম্মসংমূঢ়চেতাঃ (ধর্ম্মাধর্ম্মনিশ্চয়বিষয়ে সন্দিগ্ধচিত্ত) [অহং] (আমি) ত্বাং (আপনাকে) পৃচ্ছামি (জিজ্ঞাসা করিতেছি) মে (আমার পক্ষে) যৎ (যাহা) নিশ্চিতং শ্রেয়ঃ (যথার্থ মঙ্গলজনক) তৎ (তাহা) [ত্বম্] ব্রূহি (আপনি বলুন) । অহং (আমি) তে (আপনার) শিষ্যঃ (শাসনার্হ) [অতঃ] (অতএব) ত্বাং প্রপন্নম্ (আপনার শরণাগত) মাং (আমাকে) শাধি (শিক্ষা দান করুন) ॥৭॥

এক্ষণে কার্পণ্যদোষে আমার স্বভাব অভিভূত হওয়ায় ধর্ম্মবিষয়ে বিমূঢ়চিত্ত আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি যে, আমার পক্ষে যাহা শ্রেয়স্কর তাহা আপনি নিশ্চয় করিয়া বলুন । আমি আপনার শিষ্য, অতএব আপনার শরণাপন্ন আমাকে শিক্ষা প্রদান করুন ॥৭॥

ন হি প্রপশ্যামি মমাপনুদ্যাদ্যচ্ছোকমুচ্ছোষণমিন্দ্রিয়াণাম্ ।
অবাপ্য ভূমাবসপত্নমৃদ্ধং রাজ্যং সুরাণামপি চাধিপত্যম্ ॥৮॥

ভূমৌ (পৃথিবীতে) অসপত্নম্ (নিষ্কণ্টক) ঋদ্ধং (সমৃদ্ধ) রাজ্যং (রাজ্য) সুরাণামপি (এবং দেবতাগণেরও) আধিপত্যং চ অবাপ্য (আধিপত্য প্রাপ্ত হইয়া) যৎ (যে কর্ম্ম) ইন্দ্রিয়াণাম্ (ইন্দ্রিয়গণের) উচ্ছোষণম্ অতি শোষণ কর) মম (আমার) শোকম্ (শোক) অপনুদ্যাৎ (দূর করিবে) তৎ (তাহা) [অহং] (আমি) ন হি প্রপশ্যামি (দেখিতে পাইতেছি না) ॥৮॥

পৃথিবীর কণ্টকশূন্য সমৃদ্ধিশালী রাজ্য ও স্বর্গের আধিপত্য, আমি এমন কোন উপায় দেখিতেছি না যাহা আমার ইন্দ্রিয়শোষণকারী এই শোক অপনোদন করিতে পারে ॥৮॥

সঞ্জয় উবাচ—
এবমুক্ত্বা হৃষীকেশং গুড়াকেশঃ পরন্তপঃ ।
ন যোৎস্য ইতি গোবিন্দমুক্ত্বা তূষ্ণীং বভূব হ ॥৯॥

সঞ্জয়ঃ উবাচ (সঞ্জয় বলিলেন) পরন্তপঃ (শক্র মর্দ্দনকারী) গুড়াকেশঃ (জিতনিদ্র অর্জ্জুন) হৃষীকেশম্ (শ্রীকৃষ্ণকে) এবম্ উক্ত্বা (এরূপ বলিবার পর) [অহং] (আমি) ন যোৎস্যে (যুদ্ধ করিব না) ইতি (ইহা) গোবিন্দম্ (গোবিন্দকে) উক্ত্বা (বলিয়া) তূষ্ণীং (মৌনী) বভূব হ (হইয়া রহিলেন) ॥৯॥

সঞ্জয় কহিলেন—ইন্দ্রিয়াধিপতি শ্রীকৃষ্ণকে এই কথা বলিবার পর, জিতনিদ্র শত্রুতাপন অর্জ্জুন গোবিন্দকে ‘আমি যুদ্ধ করিব না’ এই বলিয়া মৌনী হইয়া রহিলেন ॥৯॥

তমুবাচ হৃষীকেশঃ প্রহসন্নিব ভারত ।
সেনয়োরুভয়োর্ম্মধ্যে বিষীদন্তমিদং বচঃ ॥১০॥

[হে] ভারত ! (হে ধৃতরাষ্ট্র!) হৃষীকেশঃ (হৃষীকেশ) প্রহসন্ ইব (প্রসন্ন বদন হইয়া) উভয়োঃ সেনয়োঃ মধ্যে (দুই পক্ষের সৈন্যমধ্যে ) বিষীদন্তম্ (বিষাদগ্রস্ত) তম্ (অর্জ্জুনকে) ইদং বচঃ (এই কথা) উবাচ (বলিলেন) ॥১০॥

হে ভারত ! অনন্তর ভগবান্ হৃষীকেশ উভয় সেনার মধ্যস্থলে বিষাদগ্রস্ত পার্থকে হাস্যযুক্ত প্রসন্ন বদনে এইকথা বলিলেন ॥১০॥

শ্রীভগবান্ উবাচ—
অশোচ্যানন্বশোচস্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে ।
গতাসূনগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ ॥১১॥

শ্রীভগবান্ উবাচ (শ্রীভগবান্ বলিলেন) ত্বম্ (তুমি) অশোচ্যান্ (যাহাদের জন্য শোক করা অনুচিত তাহাদের জন্য) অন্বশোচঃ (শোক করিতেছ) প্রজ্ঞাবাদান্ চ ভাষসে (পণ্ডিতের ন্যায় কথাও বলিতেছ) [কিন্তু] পণ্ডিতাঃ (পণ্ডিতগণ) গতাসূন্ (মৃত) অগতাসূন্ চ (ও জীবিত বন্ধুদিগের জন্য) ন অনুশোচন্তি (অনুশোচনা করেন না) ॥১১॥

শ্রীভগবান্ বলিলেন—হে অর্জ্জুন ! তুমি যে বিষয়ে শোক করা অনুচিত সেই বিষয়ে শোক করিতেছ আর পাণ্ডিত্যপূর্ণ বাক্য বলিতেছ । কিন্তু পণ্ডিতগণ কি জীবিত, কি মৃত কাহারও নিমিত্ত শোক করেন না ॥১১॥

ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ ।
ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্ব্বে বয়মতঃ পরম্ ॥১২॥

অহং (আমি) জাতু (কদাচিৎ অর্থাৎ ইতঃপূর্ব্বে) ন আসম্ (ছিলাম না) ইতি তু ন এব (ইহা কিন্তু নহে) ত্বং ন (তুমি যে ছিলে না) [ইতি] (ইহাও) ন (নহে), ইমে জনাধিপাঃ (এই সকল নৃপতিগণ) ন (ছিলেন না) [ইতি] (ইহাও) ন (নহে) অতঃপরম্ চ (এবং অতঃপর) সর্ব্বে বয়ং (আমরা সকলে) ন ভবিষ্যামঃ (থাকিব না) [ইতি] (ইহাও) ন এব (নহে) ॥১২॥

পূর্ব্বে যে আমি কখনও ছিলাম না তাহা নহে । তুমিও যে ছিলে না এমনও নয় । এই রাজন্যবর্গও যে ছিল না তাহাও নহে । অর্থাৎ আমরা যেমন এখন আছি সেইরূপ পূর্ব্বেও ছিলাম এবং পরেও থাকিব ॥১২॥

দেহিনোঽস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা ।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি ॥১৩॥

যথা (যেমন) দেহিনঃ (দেহাভিমানী জীবের) অস্মিন্ দেহে (এই স্থূলদেহে) কৌমারং (কৌমার) যৌবনং (যৌবন) জরা (ও জরা) [ভবতি] (ঘটে) তথা (তেমন) দেহান্তর-প্রাপ্তিঃ (অন্য দেহ লাভও) [ভবতি] (ঘটে) ধীরঃ (ধীর ব্যাক্তি) তত্র (তাহাতে) ন মুহ্যতি (মোহপ্রাপ্ত হন না) ॥১৩॥

যেমন দেহধারী জীবের বর্ত্তমান দেহে ক্রমান্বয়ে কৌমার, যৌবন ও জরা প্রাপ্তি ঘটে সেইরূপ অপর দেহ প্রাপ্তিও ঘটিয়া থাকে । কিন্তু তাহাতে পণ্ডিতগণ কখনও মোহ প্রাপ্ত হন না ॥১৩॥

মাত্রাস্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ ।
আগমাপায়িনোঽনিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত ॥১৪॥

[হে] কৌন্তেয় ! (হে কুন্তীপুত্ত্র অর্জ্জুন !) মাত্রাস্পর্শাঃ তু (বিষয়ের সহিত মিলিত ইন্দ্রিয়বৃত্তি সকল ) শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ (শীত, উষ্ণ, সুখ ও দুঃখাদি প্রদানকারী) [তে] (তাহারা) আগমাপায়িনঃ (উৎপত্তি-বিনাশ-শীল) অনিত্যাঃ (ও অনিত্য) [অতএব] [হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) তান্ (তাহাদিগকে ) তিতিক্ষস্ব (সহ্য কর) ॥১৪॥

হে কৌন্তেয় ! ইন্দ্রিয়বৃত্তির সহিত বিষয়ের সংযোগই শীতগ্রীষ্ম, সুখদুঃখ, দান করিয়া থাকে । কিন্তু উহারা গমনাগমনশীল, অনিত্য । অতএব হে ভারত ! তাহা সহ্য কর ॥১৪॥

যং হি ন ব্যথয়ন্ত্যেতে পুরুষং পুরুষর্ষভ ।
সমদুঃখসুখং ধীরং সোঽমৃতত্বায় কল্পতে ॥১৫॥

[হে] পুরুষর্ষভ ! (হে পুরুষশ্রেষ্ঠ !) এতে (এই সকল) [মাত্রাস্পর্শাঃ] (বিষয়ের সহিত মিলিত ইন্দ্রিয় বৃত্তি) সমদুঃখসুখং (দুঃখ-সুখে সমভাবাপন্ন) যং ধীরং পুরুষং (যে বিবেকী ব্যক্তিকে) ন ব্যথয়ন্তি (বিচলিত করিতে পারে না) সঃ হি (তিনিই) অমৃতত্বায় (মোক্ষলাভে) কল্পতে (যোগ্য হন) ॥১৫॥

হে পুরুষশ্রেষ্ঠ ! সুখে দুঃখে সমভাবাপন্ন যে ধীর ব্যক্তিকে এই সকল মাত্রাস্পর্শ (অর্থাৎ ইন্দ্রিয় বৃত্তির দ্বারা বিষয়ানুভব) ব্যথিত করিতে পারে না ; তিনি মোক্ষ লাভের যোগ্য হন ॥১৫॥

নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ ।
উভয়োরপি দৃষ্টোঽন্তস্ত্বনয়োস্তত্ত্বদর্শিভিঃ ॥১৬॥

অসতঃ (অনিত্য বস্তুর) ভাবঃ (বিদ্যমানতা) ন বিদ্যতে (নাই) সতঃ (নিত্য বস্তুর) অভাবঃ (নাশ) ন বিদ্যতে (নাই) । তত্ত্বদর্শিভিঃ (তত্ত্বদর্শিগণ কর্ত্তৃক) অনয়োঃ উভয়োঃ অপি (এই দুইয়েরই) তু (কিন্তু) অন্তঃ (শেষ) দৃষ্টঃ (পর্য্যালোচিত হইয়াছে) ॥১৬॥

অসৎ অর্থাৎ পরিণামশীল দেহাদি নশ্বর বস্তুর নিত্য স্থায়িত্ব নাই ; এবং সৎ অর্থাৎ নিত্যবস্তু আত্মার কখনও পরিণতি বা বিনাশ নাই । অত্ত্বদর্শীগণের দ্বারা এইরূপে (পৃথক্ করিয়া) সৎ ও অসতের তত্ত্ব বিচারিত হইয়াছে ॥১৬॥

অবিনাশি তু তদ্বিদ্ধি যেন সর্ব্বমিদং ততম্ ।
বিনাশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিৎ কর্ত্তুমর্হতি ॥১৭॥

যেন (যাঁহার দ্বারা) ইদং সর্ব্বম্ (এই সকল শরীর) ততম্ (ব্যাপ্ত) তৎ (সেই জীবাত্মাকে) তু (কিন্তু) অবিনাশি (বিনাশ রহিত) বিদ্ধি (জানিবে) । কশ্চিৎ (কেহই) অব্যয়স্য অস্য (নাশরহিত এই জীবাত্মার) বিনাশং কর্ত্তুম্ (বিনাশ করিতে) ন অর্হতি (সমর্থ হন না) ॥১৭॥

যিনি এই সর্ব্বশরীর ব্যাপিয়া আছেন সেই আত্মাকে অবিনাশী বলিয়া জানিও । তিনি অব্যয় অর্থাৎ নিত্য, সেই আত্মাকে কেহ বিনাশ করিতে পারে না ॥১৭॥

অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ ।
অনাশিনোঽপ্রমেয়স্য তস্মাদ্­যুধ্যস্ব ভারত ॥১৮॥

নিত্যস্য (সদা একরূপ) অনাশিনঃ (নাশ রহিত) অপ্রমেয়স্য (অতি সূক্ষ্ম হেতু পরিমাণের অতীত) শরীরিণঃ (জীবাত্মার) ইমে দেহাঃ (এই সকল দেহ) অন্তবন্তঃ (নাশশীল) উক্তাঃ (বলিয়া কথিত হয়) । [হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) তস্মাৎ (সেই হেতু) যুধ্যস্ব (যুদ্ধ কর) ॥১৮॥

নিত্য, নাশরহিত, অপ্রমেয় যে জীবাত্মা তাহার এই দেহগুলিই নাশশীল । অতএব হে ভারত ! তুমি স্বধর্ম্ম পরিত্যাগ না করিয়া যুদ্ধ কর ॥১৮॥

য এনং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম্ ।
উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে ॥১৯॥

যঃ (যে ব্যক্তি) এনং (এই জীবাত্মাকে) হন্তারং (বিনাশ কর্ত্তা) বেত্তি (মনে করে) যশ্চ এনং (এবং ব্যক্তি ইহাকে) হতং ( বিনষ্ট) মন্যতে (মনে করে), তৌ উভৌ (তাহারা উভয়েই) ন বিজানীতঃ (অজ্ঞ) [যষ্মাৎ] (যেহেতু) অয়ং (এই জীবাত্মা) ন হন্তি (কাহাকেও বধ করে না) ন হন্যতে (এবং কাহার দ্বারা নিহতও হয় না) ॥১৯॥

যে ব্যক্তি এই আত্মাকে হননকর্ত্তা মনে করে এবং যে ব্যক্তি ইহাকে হত মনে করে, তাহারা উভয়েই আত্মার স্বরূপ সম্বন্ধে কিছুই জানে না । যেহেতু আত্মা কাহাকেও হনন করে না বা কাহার দ্বারা হত হয় না ॥১৯॥

ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্ নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঽয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥২০॥

অয়ং (এই জীবাত্মা) কদাচিৎ (কখনও) ন জায়তে (জন্মে না) বা ন ম্রিয়তে (কিম্বা মরে না) ভূত্বা বা (অথবা উৎপন্ন হইয়া) ভূয়ঃ (পুনর্ব্বার) ন ভবিতা (উৎপন্ন হইবে না) । অয়ং অজঃ (এই জীবাত্মা জন্মবিহীন) নিত্যঃ (সর্ব্বদা সমভাবেস্থিত) শাশ্বতঃ (অপক্ষয়শূন্য) পুরাণঃ (ষড়্বিকার রহিত) [অপি চ] (অথচ) শরীরে হন্যমানে (দেহ বিনষ্ট হইলেও) অয়ং (জীবাত্মা) ন হন্যতে (বিনষ্ট হয় না) ॥২০॥

এই আত্মা কখনও জন্মে না বা কখনও মরে না । অথবা পুনঃ পুনঃ তাহার উৎপত্তি বৃদ্ধি হয় না । কারণ আত্মা জন্মরহিত, নিত্য, অপক্ষয়রহিত অর্থাৎ নিত্য নবীন অথচ পুরাতন ; জন্ম-মরণশীল শরীর বিনষ্ট হইলেও আত্মার বিনাশ নাই ॥২০॥

বেদাবিনাশিনং নিত্যং য এনমজমব্যয়ম্ ।
কথং স পুরুষঃ পার্থ কং ঘাতয়তি হন্তি কম্ ॥২১॥

[হে] পার্থ ! (হে অর্জ্জুন !) যঃ (যে ব্যক্তি) এনং (এই জীবাত্মাকে) নিত্যং (বৃদ্ধিশূন্য) অজম্ (জন্মাদি রহিত) অব্যয়ম্ (ক্ষয়শূন্য) অবিনাশিনং (এবং ধ্বংসশূন্য) বেদ (জানেন), সঃ পুরুষঃ (সেই ব্যক্তি) কথং (কি প্রকারে) কং (কাহাকে) ঘাতয়তি (বধ করান ?) [বা] কং (অথবা কাহাকে) হন্তি (বধ করেন ?) ॥২১॥

হে পার্থ ! যে ব্যক্তি জীবাত্মাকে অবিনাশী, নিত্য, অজ ও ক্ষয়রহিত অব্যয় বলিয়া জানেন, সে পুরুষ কি রূপে কাহাকে হত্যা করায় বা হত্যা করে ॥২১॥

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্ণাতি নরোঽপরাণি ।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ॥২২॥

নরঃ (মনুষ্য) যথা (যেমন) জীর্ণানি বাসাংসি (ছিন্ন বস্ত্র সকল) বিহায় (পরিত্যাগ করিয়া) অপরাণি নবানি (অন্য নূতন বস্ত্র সমূহ) গৃহ্ণাতি (ধারণ করে) তথা (তদ্রূপ) দেহী (আত্মা) জীর্ণানি (জরাগ্রস্থ) শরীরাণি (শরীর সকল) বিহায় (পরিত্যাগ করিয়া) অন্যানি নবানি (অন্য নূতন শরীর সমূহ) সংযাতি (পরিগ্রহ করে) ॥২২॥

মানুষ, যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া অপর নববস্ত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ দেহী (জীবাত্মা) ও জীর্ণ দেহ পরিত্যাগ করিয়া পুনরায় নূতন একটি শরীর ধারণ করিয়া থাকে ॥২২॥

নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ ॥২৩॥

শস্ত্রাণি (অস্ত্র সকল) এনম্ (এই আত্মাকে) ন ছিন্দন্তি (ছেদন করিতে পারে না) পাবকঃ (অগ্নি) এনং (এই আত্মাকে) ন দহতি (দগ্ধ করিতে পারে না) আপঃ (জল) এনং (এই আত্মাকে) ন ক্লেদয়ন্তি (আর্দ্র করিতে পারে না) চ (এবং) মারুতঃ (বায়ু) ন শোষয়তি (শুষ্ক করিতে পারে না) ॥২৩॥

এই আত্মাকে শস্ত্রাদি ছেদন করিতে পারে না ; অগ্নি দগ্ধ করিতে পারে না ; জল সিক্ত করিতে পারে না ; এবং বায়ু ইহাকে শুষ্ক করিতে পারে না ॥২৩॥

অচ্ছেদ্যোঽয়মদাহ্যোঽয়মক্লেদ্যোঽশোষ্য এব চ ।
নিত্যঃ সর্ব্বগতঃ স্থাণুরচলোঽয়ং সনাতনঃ ॥২৪॥
অব্যক্তোঽয়মচিন্ত্যোঽয়মবিকার্য্যোঽয়মুচ্যতে ।
তস্মাদেবং বিদিত্বৈনং নানুশোচিতুমর্হসি ॥২৫॥

অয়ম্ (এই আত্মা) অচ্ছেদ্যঃ (ছেদনের অযোগ্য) অয়ম্ (এই আত্মা) অদাহ্যঃ (দাহনের অযোগ্য) অয়ম্ (এই আত্মা) অক্লেদ্যঃ (সিক্ত হইবার অযোগ্য) অশোষ্য এব চ (এবং অশোষনীয়) । অয়ম্ (এই আত্মা) নিত্যঃ (চিরকাল বর্ত্তমান) সর্ব্বগতঃ (স্বকর্ম্মবশে দেবাদি সর্ব্ব দেহে গমন যোগ্য) স্থাণুঃ (স্থিরস্বভাব) অচলঃ (অচল) সনাতনঃ (অনাদি) । অয়ম্ (এই আত্মা) অব্যক্তঃ (অতি সূক্ষ্মত্বহেতু চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য) অয়ম্ (এই আত্মা) অচিন্ত্যঃ (অতর্ক্য) অয়ম্ (এই আত্মা) অবিকার্য্যঃ (জন্মাদি ষড়্ভাব বিকারশূন্য) উচ্যতে (বলিয়া কথিত হন), তস্মাৎ (অতএব) এনম্ (এই আত্মাকে) এবং (এইরূপ) বিদিত্বা (জানিয়া) অনুশোচিতুম্ ন অর্হসি (তদ্ধেতু শোক প্রকাশ করা উচিৎ নহে) ॥২৪–২৫॥

এই জীবাত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য, এবং অশোষ্য । ইনি নিত্য, সর্ব্বত্রগামী, স্থির ও অবিচলিত এবং সনাতন অর্থাৎ সদাবিদ্যমান । এই আত্মা অব্যক্ত, অচিন্ত্য এবং জন্মাদি ষড়্বিকার* রহিত বলিয়া কথিত হন । অতএব এই জীবাত্মাকে এইপ্রকার অবগত হইয়া তুমি আর শোক করিতে পার না ॥২৪–২৫॥
*ষড়্বিকার যথা—জন্ম, অস্তিত্ব, বৃদ্ধি, পরিণতি, অপক্ষয় ও বিনাশ

অথ চৈনং নিত্যজাতং নিত্যং বা মন্যসে মৃতম্ ।
তথাপি ত্বং মহাবাহো নৈনং শোচিতুমর্হসি ॥২৬॥

[হে] মহাবাহো ! (হে বীরশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন !) অথ চ (আর যদিও) এনং (এই আত্মাকে) নিত্যজাতং (সতত উৎপন্ন) বা (অথবা) নিত্যং মৃতম্ (সতত বিনাশশীল) মন্যসে (মনে কর) তথাপি (তাহা হইলেও) ত্বং (তুমি) এনং (ইহার জন্য) শোচিতুং ন অর্হসি (শোক করিও না) ॥২৬॥

হে মহাবাহো ! যদি জীবাত্মাকে নিত্যজাত ও নিত্যমৃত বলিয়া মনে কর, তথাপিও তুমি ইহার জন্য শোক করিতে পার না ॥২৬॥

জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ ।
তস্মাদপরিহার্য্যেঽর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি ॥২৭॥

হি (যেহেতু) জাতস্য (জাত ব্যক্তির) মৃত্যুঃ (মৃত্যু) ধ্রুবঃ (নিশ্চিত) মৃতস্য চ (মৃত ব্যক্তিরও) জন্ম (কর্ম্মফলভোগের জন্য জন্ম) ধ্রুবং (নিশ্চিত) তস্মাৎ (অতএব) অপরিহার্য্যে অর্থে (অবশ্যম্ভাবী বিষয়ে) ত্বং (তুমি) শোচিতুং (শোক করিতে) ন অর্হসি (পার না) ॥২৭॥

যেহেতু জাত ব্যক্তির মরণ সুনিশ্চিত এবং মৃত্যু হইলে কর্ম্মফল ভোগের জন্য পুনরায় জন্মও সুনিশ্চিত । সুতরাং এই অপরিহার্য্য বিষয়ে তোমার শোক করা অনুচিত ॥২৭॥

অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত ।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা ॥২৮॥

[হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) ভূতানি (প্রাণিগণের) অব্যক্তাদীনি (জন্মের পূর্ব্বাবস্থা অজ্ঞাত) ব্যক্তমধ্যানি (জন্মবধি মৃত্যু পর্য্যন্ত মধ্যকাল জ্ঞাত) অব্যক্তনিধনানি এব (এবং মৃত্যুর পরবর্ত্তী কালও অজ্ঞাত) তত্র (তদ্বিষয়ে) কা পরিদেবনা (শোকের কারণ কি আছে ?) ॥২৮॥

হে ভারত ! যখন ভূতসকল উৎপত্তির পূর্ব্বে অপ্রকাশিত ; ও জন্ম হইতে মরণ পর্য্যন্ত প্রকাশিত । এবং নিধন প্রাপ্ত হইলেই আবার অপ্রকাশিত বা অব্যক্ত হইয়া থাকে, তখন তার জন্য পরিবেদনা কি আছে ? (যদিও উক্ত মতটি সাধু সস্মত নহে তথাপি বিচার স্থলে স্বীকার করিলেও তোমার পক্ষে স্বধর্ম্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধ করাই কর্ত্তব্য) ॥২৮॥

আশ্চর্য্যবৎ পশ্যতি কশ্চিদেনম্ আশ্চর্য্যবদ্বদতি তথৈব চান্যঃ ।
আশ্চর্য্যবচ্চৈনমন্যঃ শৃণোতি শ্রুত্বাপ্যেনং বেদ ন চৈব কশ্চিৎ ॥২৯॥

কশ্চিৎ (কেহ কেহ) এনম্ (এই আত্মাকে) আশ্চর্য্যবৎ (বিস্মিতভাবে) পশ্যতি (দর্শন করেন) তথা এব (তদ্রূপ) অন্যঃ চ (অপরেও) এনম্ (এই আত্মাকে) আশ্চর্য্যবৎ (বিস্ময়জনকভাবে) বদতি (বর্ণনা করেন) অন্য চ (ও অপর ব্যক্তি) এমন্ (ইহাকে) আশ্চর্য্যবৎ (বিস্মিত হইয়া) শৃণোতি (শ্রবণ করেন) কশ্চিৎ চ (কেহও) শ্রুত্বা অপি (শুনিয়াও) এনং (এই আত্মাকে) ন বেদ (জানিতে পারেন না) ॥২৯॥

কেহ কেহ জীবাত্মাকে আশ্চর্য্যবৎ দর্শন করেন কেহ কেহ আশ্চর্য্য ভাবে বর্ণনা করেন, এবং কেহ কেহ আশ্চর্য্যজ্ঞানে শ্রবণ করেন, আর কেহ কেহ শুনিয়াও তাঁহাকে বুঝিতে পারেন না ॥২৯॥

দেহী নিত্যমবধ্যোঽয়ং দেহে সর্ব্বস্য ভারত ।
তস্মাৎ সর্ব্বাণি ভূতানি ন ত্বং শোচিতুমর্হসি ॥৩০॥

[হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) অয়ং দেহী (এই আত্মা) সর্ব্বস্য (সকল প্রাণীর) দেহে (শরীরে) নিত্যম্ (সর্ব্বদা) অবধ্যঃ (অবধ্যরূপে বিরাজিত) । তস্মাৎ (অতএব) ত্বং (তুমি) সর্ব্বাণি ভূতানি (সকল ভূতের নিমিত্ত) শোচিতুং ন অর্হসি (শোক করিতে পার না) ॥৩০॥

হে ভারত ! বস্তুতঃ সর্ব্বপ্রাণীর দেহস্থিত দেহধারী এই জীবাত্মা সর্ব্বদা অবধ্য । অতএব তুমি কোন প্রাণীর জন্যই শোক করিতে পার না ॥৩০॥

স্বধর্ম্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি ।
ধর্ম্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োঽন্যৎ ক্ষত্ত্রিয়স্য ন বিদ্যতে ॥৩১॥

অপি (এমন কি ) স্বধর্ম্মং (ক্ষাত্ত্রিধর্ম্ম) অবেক্ষ্য চ (পর্য্যালোচনা করিয়াও) বিকম্পিতুম্ (ভয় করিতে) ন অর্হসি (পার না) । হি (যেহেতু) ক্ষত্ত্রিয়স্য (ক্ষত্ত্রিয়ের পক্ষে) ধর্ম্ম্যাৎ যুদ্ধাৎ (ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ অপেক্ষা) অন্যৎ শ্রেয়ঃ (অপর শ্রেয়স্কর কর্ম্ম) ন বিদ্যতে (নাই) ॥৩১॥

আর স্বধর্ম্মের* প্রতি লক্ষ্য করিলেও তোমার বিকম্পিত হইবার কিছুই নাই । কেননা ক্ষত্ত্রিয়ের ধর্ম্মযুদ্ধাপেক্ষা শ্রেয়স্কর ধর্ম্ম আর নাই ॥৩১॥
*মন্তব্য— স্বধর্ম্ম জীবের মুক্ত ও বদ্ধ দশা ভেদে দ্বিবিধ । মুক্তাবস্থায়, স্বধর্ম্ম-উপাধি রহিত ; বদ্ধাবস্থায়, স্বধর্ম্ম উপাধিযুক্ত । মুক্ত জীব সর্ব্বোতোভাবে ভগবৎ-সেবন-চেষ্টারূপ ধর্ম্মনিরত এবং তাহাই শুদ্ধ-স্বধর্ম্ম । আর বদ্ধজীব যখন কর্ম্মফলে চুরাশী লক্ষ যোনি ভ্রমণ করিতে করিতে পুণ্যবলে মনুষ্যদেহ প্রাপ্ত হয়, তখন মুক্তাবস্থার শুদ্ধ স্বধর্ম্ম সাধনানুকূলে দৈব বর্ণাশ্রম ধর্ম্মে থাকিয়া যে নিজ নিজ স্বভাব ও চেষ্টা প্রকাশ করে ; তাহাকে স্থূলভাবে স্বধর্ম্ম বলা হইয়া থাকে । অর্থাৎ ধূম্রাবৃত বহ্নিকে যে প্রকার বহ্নি বলা হয়, তদ্রূপ নিরুপাধিক আত্মার স্বধর্ম্ম—যে স্বল্প উপাধিযুক্ত অবস্থায় অনুভূত হইতে পারে তাহাকেই বর্ণাশ্রম বিচারে স্বধর্ম্ম সংজ্ঞায় সংজ্ঞিত করা হয় ॥৩১॥

যদৃচ্ছয়া চোপপন্নং স্বর্গদ্বারমপাবৃতম্ ।
সুখিনঃ ক্ষত্ত্রিয়াঃ পার্থ লভন্তে যুদ্ধমীদৃশম্ ॥৩২॥

[হে] পার্থ ! (হে অর্জ্জুন !) সুখীনঃ (সৌভাগ্যবান্) ক্ষত্ত্রিয়াঃ (ক্ষত্ত্রিয়গণ) যদৃচ্ছয়া (অপ্রার্থিতভাবে) উপপন্নম্ (উপস্থিত) অপাবৃতম্ স্বর্গদ্বারম্ চ (এবং উদ্ ঘাটিত স্বর্গদ্বাররূপ) ঈদৃশম্ (এরূপ) যুদ্ধম্ (যুদ্ধ) লভন্তে (লাভ করে) ॥৩২॥

হে পার্থ ! যদৃচ্ছাক্রমে উপস্থিত উন্মুক্ত স্বর্গদ্বার স্বরূপ এইরূপ যুদ্ধ, সৌভাগ্যবান্ ক্ষত্ত্রিয়গণেরই লভ্য হইয়া থাকে ॥৩২॥

অথ চেৎ ত্বমিমং ধর্ম্ম্যং সংগ্রামং ন করিষ্যসি ।
ততঃ স্বধর্ম্মং কীর্ত্তিঞ্চ হিত্বা পাপমবাপ্স্যসি ॥৩৩॥

অথ (পক্ষান্তরে) চেৎ (যদি) ত্বম্ (তুমি) ইমং ধর্ম্ম্যং সংগ্রামং (এই ধর্ম্ম সঙ্গত যুদ্ধ) ন করিষ্যসি (না কর) ততঃ (তাহা হইলে) স্বধর্ম্মং কীর্ত্তিং চ (ক্ষত্ত্রিয় ধর্ম্ম ও কীর্ত্তি) হিত্বা (ত্যাগ করিয়া) পাপম্ (পাপ) অবাপ্স্যসি (লাভ করিবে) ॥৩৩॥

প্রকৃত পক্ষে তুমি যদি এই ধর্ম্মযুদ্ধ না কর তবে স্বধর্ম্ম ও কীর্ত্তি ভ্রষ্ট হইয়া পাপগ্রস্ত হইবে ॥৩৩॥

অকীর্ত্তিঞ্চাপি ভূতানি কথয়িষ্যন্তি তেঽব্যয়াম্।
সম্ভাবিতস্য চাকীর্ত্তির্মরণাদতিরিচ্যতে ॥৩৪॥

ভূতানি চ (সকল লোকও) তে (তোমার) অব্যয়াম্ (চিরস্থায়িনী) অকীর্ত্তিম্ অপি (অকীর্ত্তিও) কথয়িষ্যন্তি (বলিবে) । সম্ভাবিতস্য চ (সম্মানিত ব্যক্তির কিন্তু ) অকীর্ত্তিঃ (অখ্যাতি) মরণাৎ (মৃত্যু অপেক্ষা) অতিরিচ্যতে (অধিক হয়) ॥৩৪॥

আর লোকে চিরদিন তোমার অকীর্ত্তি ঘোষণা করিবে । সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির অপযশ মৃত্যু অপেক্ষাও অধিক ॥৩৪॥

ভয়াদ্রণাদুপরতং মংস্যন্তে ত্বাং মহারথাঃ ।
যেষাঞ্চ ত্বং বহুমতো ভূত্বা যাস্যসি লাঘবম্ ॥৩৫॥

মহারথাঃ (দুর্য্যোধনাদি মহারথগণ) ত্বাং (তোমাকে) ভয়াৎ (ভয়হেতু) রণাৎ (যুদ্ধ হইতে) উপরতং (বিরত) মংস্যন্তে (মনে করিবে) । চ (এবং) ত্বং (তুমি) যেষাং (যাহাদিগের) বহুমতঃ ভূত্বা (বহু সম্মানের পাত্র হইয়াছ) [তেষাং] (তাহাদিগের নিকট) লাঘবম্ যাস্যসি (অশ্রদ্ধার পাত্র হইবে) ॥৩৫॥

যাহারা তোমাকে বহুমানন করিয়া থাকেন সেই মহারথগণ ‘তুমি ভয়ে যুদ্ধ করিতেছ না’ এই মনে করিয়া তোমাকে অত্যন্ত লঘু জ্ঞান করিবেন ॥৩৫॥

অবাচ্যবাদাংশ্চ বহূন্ বদিষ্যন্তি তবাহিতাঃ ।
নিন্দন্তস্তব সামর্থ্যং ততো দুঃখতরং নু কিম্ ॥৩৬॥

তব অহিতাঃ (তোমার শত্রুগণ) তব সামর্থ্যং (তোমার সামর্থ্যের) নিন্দন্তঃ (নিন্দা করতঃ) বহূন্ অবাচ্য বাদান্ চ (বহুবিধ অকথ্য বাক্য সমূহও) বদিষ্যন্তি (কহিবে) । নু (ওহে অর্জ্জুন !) ততঃ (তাহা অপেক্ষা) দুঃখতরং (অধিক দুঃখকর) কিম্ (কি হইতে পারে ?) ॥৩৬॥

তোমার শত্রুপক্ষ তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করিয়া বহুপ্রকার কটূক্তি করিবে, তাহা হইতে অধিক দুঃখতর আর কি আছে ? ॥৩৬॥

হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্ ।
তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ ॥৩৭॥

হতঃ বা (যদি যুদ্ধে হত হও) স্বর্গং প্রাপ্স্যসি (স্বর্গ লাভ করিবে) জিত্বা বা (কিম্বা জয়লাভ করিয়া) মহীং (পৃথিবী) ভোক্ষ্যসে (ভোগ করিবে) । [হে] কৌন্তেয় ! (হে অর্জ্জুন !) তস্মাৎ (অতএব) যুদ্ধায় (যুদ্ধার্থে) কৃতনিশ্চয়ঃ [সন্] (কৃতনিশ্চয় হইয়া) উত্তিষ্ঠ (উত্থিত হও) ॥৩৭॥

হে কৌন্তেয় ! যদি তুমি হত হও, স্বর্গ লাভ করিবে, আর বিজয়ী হও, পৃথিবী ভোগ করিবে । অতএব কৃতনিশ্চয় হইয়া যুদ্ধার্থে উত্থিত হও ॥৩৭॥

সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ ।
ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্স্যসি ॥৩৮॥

সুখদুঃখে (সুখ ও দুঃখ) লাভালাভৌ (লাভ ও অলাভ) জয়াজয়ৌ [চ] (এবং জয় ও পরাজয়) সমে (সমান) কৃত্বা (করিয়া অর্থাৎ তুল্য দৃষ্টিতে দেখিয়া) ততঃ (তৎপরে) যুদ্ধায় (যুদ্ধার্থ) যুজ্যস্ব (প্রবৃত্ত হও) এবং (এই প্রকারে) পাপং (পাপ) ন অবাপ্স্যসি (প্রাপ্ত হইবে না) ॥৩৮॥

সুখ ও দুঃখ, লাভ ও অলাভ, জয় ও পরাজয়কে সমান জ্ঞান করিয়া যুদ্ধ কর, তাহা হইলে পাপভাগী হইবে না ॥৩৮॥

এষা তেঽভিহিতা সাংখ্যে বুদ্ধির্যোগে ত্বিমাং শৃণু ।
বুদ্ধ্যা যুক্তো যয়া পার্থ কর্ম্মবন্ধং প্রহাস্যসি ॥৩৯॥

[হে] পার্থ ! (হে কুন্তীপুত্ত্র !) সাংখ্যে (আত্মতত্ত্ব বিষয়ে) এষা বুদ্ধিঃ (এই জ্ঞান) তে অভিহিতা (তোমাকে কহিলাম) । যোগে তু (ভক্তি যোগেও) ইমাং (এই বুদ্ধি) শৃণু (শ্রবণ কর) । যয়া বুদ্ধ্যা যুক্তঃ [সন্] (যে ভক্তি-যোগবিষয়িণী বুদ্ধি দ্বারা যুক্ত হইলে) কর্ম্মবন্ধং (কর্ম্ম বন্ধনরূপ সংসারকে) প্রহাস্যসি (প্রকৃষ্টরূপে ত্যাগ করিতে পারিবে) ॥৩৯॥

ইহা বস্তুতত্ত্ব জ্ঞান-সম্বন্ধিনী বুদ্ধির কথা তোমাকে বলিলাম । এখন ভক্তিযোগ সম্বন্ধিনী বুদ্ধির কথা শ্রবণ কর । হে পার্থ ! যে বুদ্ধিযুক্ত হইলে তুমি কর্ম্মবন্ধন সম্পূর্ণ ছেদন করিতে পারিবে ॥৩৯॥ *
*মন্তব্য—“পরে প্রদর্শিত হইবে যে, বুদ্ধি-যোগ একটি মাত্র ; যখন সেই বুদ্ধি-যোগ কর্ম্মের অবধিকে সীমা করিয়া লক্ষিত হয় তখন তাহাকে ‘কর্ম্ম-যোগ’ বলে ; যখন কর্ম্মসীমাকে অতিক্রম করিয়া জ্ঞান সীমার অবধি পর্য্যন্ত ব্যাপ্তি লাভ করে, তখন তাহাকে ‘জ্ঞান-যোগ’ বা ‘সাংখ্য-যোগ’ বলে ; যখন তদুভয় সীমা অতিক্রম করতঃ ভক্তিকে স্পর্শ করে, তখন তাহাকে ‘ভক্তি-যোগ’ বা ‘বিশুদ্ধ ও সম্পূর্ণ বুদ্ধি-যোগ’ বলে ।” —শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর ॥৩৯॥

নেহাভিক্রমনাশোঽস্তি প্রত্যবায়ো ন বিদ্যতে ।
স্বল্পমপ্যস্য ধর্ম্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ ॥৪০॥

ইহ (এই ভক্তি-যোগে) অভিক্রমনাশঃ (আরম্ভের নাশ) ন অস্তি (নাই) প্রত্যবায়ঃ [চ] (প্রত্যবায়ও) ন বিদ্যতে (নাই) অস্য ধর্ম্মস্য (এই ভক্তি-যোগের) স্বল্পমপি (কিঞ্চিৎমাত্র অনুষ্ঠানও) মহতঃ ভয়াৎ (মহাভয়জনক সংসার হইতে) ত্রায়তে (পরিত্রাণ করে) ॥৪০॥

এই ভক্তিযোগের আরম্ভমাত্র করিলেও বিফল হয় না । ইহাতে প্রত্যবায়ও নাই । এই ভক্তিযোগের কিঞ্চিৎমাত্র অনুষ্ঠানও সংসারাদি মহাভয় হইতে পরিত্রাণ করে ॥৪০॥

ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিরেকেহ কুরুনন্দন ।
বহুশাখা হ্যনন্তাশ্চ বুদ্ধয়োঽব্যবসায়িনাম্ ॥৪১॥

[হে] কুরুনন্দন ! (হে কুরুবংশধর অর্জ্জুন !) ইহ (এই ভক্তি-যোগ বিষয়ে) ব্যবসায়াত্মিকা (নিশ্চয়াত্মিকা) বুদ্ধিঃ (বুদ্ধি) একা [এব] (একটী মাত্র), [কিন্তু] অব্যবসায়িনাং (কামী ব্যক্তিদের) বুদ্ধয়ঃ (বুদ্ধি সকল) অনন্তাঃ (অসংখ্য) বহুশাখাঃ চ (এবং বহু শাখাযুক্ত) হি (সুনিশ্চিত) ॥৪১॥

হে কুরুনন্দন ! অনন্য ভক্তিযোগ সম্বন্ধিনী বুদ্ধি নিশ্চয়াত্মিকা । আমিই তাহার একমাত্র লক্ষ্য, অতএব তাহা একনিষ্ঠ । কিন্তু মদেকনিষ্ঠতা-রহিত অব্যবসায়িগণের বুদ্ধি কাম্যকর্ম্ম বিষয়িণী হওয়ায় তাহা অনেক বিষয়-নিষ্ঠত্বহেতু বহু শাখাময়ী ও অনন্ত-কামনা-লক্ষিণী ॥৪১॥

যামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতঃ ।
বেদবাদরতাঃ পার্থ নান্যদস্তীতি বাদিনঃ ॥৪২॥
কামাত্মানঃ স্বর্গপরাঃ জন্মকর্ম্মফলপ্রদাম্ ।
ক্রিয়াবিশেষবহুলাং ভোগৈশ্বর্য্যগতিং প্রতি ॥৪৩॥
ভোগৈশ্বর্য্যপ্রসক্তানাং তয়াপহৃতচেতসাম্ ।
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিঃ সমাধৌ ন বিধীয়তে ॥৪৪॥

[হে] পার্থ ! (হে অর্জ্জুন !) অবিপশ্চিতঃ (মুর্খ সকল) বেদ-বাদরতাঃ (বেদের অর্থবাদে আসক্ত) অন্যৎ (পশু অন্ন পুত্ত্র স্বর্গাদি ব্যতীত অন্য ঈশ্বর তত্ত্ব) ন অস্তি (নাই) ইতি বাদিনঃ (এই রূপ উক্তিকারী) কামাত্মানঃ (কামাকুলিত চিত্ত) স্বর্গপরাঃ (স্বর্গকেই প্রধান পুরুষার্থ জ্ঞানকারী) জন্ম-কর্ম্মফল-প্রদাম্ (জন্ম-কর্ম্মফল প্রদানকারী) ভোগৈশ্বর্য্যগতিং প্রতি (ভোগ ও ঐশ্বর্য্য সাধক) ক্রিয়াবিশেষবহুলাং (নানাবিধ ক্রিয়া বিশেষ বৃদ্ধিকারী) যাম্ ইমাং (যে সকল) পুষ্পিতাং (আপাতকর্ণ সুখকর) বাচং (বাক্য) প্রবদন্তি (এই বেদ বাক্যগুলিই সর্ব্বপ্রকারে শ্রেষ্ঠ এরূপ বলে) তয়া (সেই পুষ্পিত বাক্যের দ্বারা) অপহৃতচেতসাং (বিমোহিত চিত্ত) ভোগৈশ্বর্য্যপ্রসক্তানাং (ভোগ ও ঐশ্বর্য্যে আসক্ত ব্যক্তিদিগের) ব্যবসায়াত্মিকা (নিশ্চয়াত্মিকা) বুদ্ধিঃ (বুদ্ধি) সমাধৌ (পরমেশ্বরে) ন বিধীয়তে (একনিষ্ঠতা লাভ করে না) ॥৪২–৪৪॥

হে পার্থ ! সেই অব্যবসায়ী অনভিজ্ঞগণ সর্ব্বদা বেদের মুখ্য তাৎপর্য্য যে পরমার্থ, তাহা না জানিয়া কেবল গৌণ অর্থবাদে রত থাকিয়া ‘ইহা ছাড়া জ্ঞাতব্য আর নাই’ এইরূপ বলিয়া থাকে । যাহার কাম্যকর্ম্মের ফলাকাঙ্ক্ষী, স্বর্গপ্রার্থী, যে মূঢ়গণ ভোগ ও ঐশ্বর্য্য সাধক জন্ম-কর্ম্মফল প্রদানকারী কর্ম্মকাণ্ডীয় যজ্ঞাদি ক্রিয়া-বাহুল্যবিশিষ্ট বেদের আপাত রমণীয় (পরিণাম বিষময়) বাক্যে অনুরক্ত, তাদৃশ ভোগ ও ঐশ্বর্য্য প্রসক্ত পুষ্পিত বাক্যে হৃতচিত্ত সেই অবিবেকিগণের বুদ্ধি সমাধিতে অর্থাৎ ভগবানে একনিষ্ঠতা লাভ করে না ॥৪২–৪৪॥

ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুণ্যো ভবার্জ্জুন ।
নির্দ্বন্দ্বো নিত্যসত্ত্বস্থো নির্যোগক্ষেম আত্মবান্ ॥৪৫॥

[হে] অর্জ্জুন ! (হে অর্জ্জুন !) বেদাঃ (বেদ সকল) ত্রৈগুণ্যবিষয়াঃ (ত্রিগুণাত্মক) [ত্বং] (তুমি) নির্দ্বন্দ্বঃ (গুণময় মানাপমানাদি রহিত) নিত্যসত্ত্বস্থঃ (নিত্যপ্রাণিদিগের অর্থাৎ মদ্ভক্তের সহিত অবস্থিত) নির্যোগক্ষেমঃ (অলব্ধ বস্তুর লাভ ‘যোগ’ তাহার রক্ষা ‘ক্ষেম’ তদ্ রহিত) আত্মবান্ [চ] (এবং মদ্দত্ত বুদ্ধিযোগে যুক্ত) [সন্) (হইয়া) নিস্ত্রৈগুণ্যঃ (জ্ঞান কর্ম্ম হইতে বিরত হইয়া বেদোক্ত ভক্তি বিধিমাত্রের অনুষ্ঠাতা) ভব (হও) ॥৪৫॥

হে অর্জ্জুন ! কর্ম্মজ্ঞানাদির প্রতিপাদক বেদ ত্রিগুণাত্মক । কর্ম্মজ্ঞানাবৃত বুদ্ধি অজ্ঞগণ তাহাতেই নিষ্ঠাযুক্ত হওয়ায় বেদের যে মুখ্য উদ্দিষ্ট নির্গুণ তত্ত্ব তাহা জানে না । কিন্তু তুমি দ্বন্দ্বশূন্য এবং নিত্যসত্ত্বস্থ হইয়া যোগক্ষেমানুসন্ধান পরিত্যাগ পূর্ব্বক, বুদ্ধিযোগ সহকারে সেই নির্গুণ তত্ত্বরূপ উদ্দিষ্টতত্ত্ব লাভ করিয়া নিস্ত্রৈগুণ্য হও, অর্থাৎ জ্ঞান কর্ম্ম হইতে বিরত হইয়া বেদোক্ত ভক্তিবিধি মাত্র অনুষ্ঠান কর ॥৪৫॥

যাবানর্থ উদপানে সর্ব্বতঃ সংপ্লুতোদকে ।
তাবান্ সর্ব্বেষু বেদেষু ব্রাহ্মণস্য বিজানতঃ ॥৪৬॥

উদপানে (ক্ষুদ্র জলাশয়ে বা কূপে) যাবান্ অর্থঃ (যে যে প্রয়োজন) সর্ব্বতঃ (সকল কূপ হইতে) [সিধ্যতি] (সিদ্ধি হয়), সংপ্লুতোদকে (মহাজলাশয়ে বা সরোবরে) তাবান্ [এব অর্থঃ] (সেই সমস্ত কার্য্যই) [ততোঽপি বৈশিষ্ট্যেন] (তাহা হইতে বিশেষ ভাবে) [সিধ্যতি] (সিদ্ধ হইয়া থাকে) [এবং] সর্ব্বেষু বেদেষু (এই প্রকার সকল বেদোক্ত তত্তৎ দেবতারাধনে) [যাবান্ অর্থঃ সিধ্যতি] (যে সকল প্রয়োজন সিদ্ধ হয়) ব্রাহ্মণস্য বিজানতঃ (বেদ তাৎপর্য্য ভক্তিকেই বিশেষ ভাবে যিনি অবগত হইয়াছেন তাদৃশ ব্রাহ্মণের) [তাবান্ অর্থঃ ভগবদারাধনে এব] (সেই সকল প্রয়োজন একমাত্র ভগবদারাধনেই) [সিধ্যতি] (সিদ্ধ হয়) ॥৪৬॥

যেমন উদপান অর্থাৎ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলাশয়ে বা কূপে যে সকল প্রয়োজন সিদ্ধি হয়, একমাত্র সুবৃহৎ জলাশয়ে সেই সমস্ত প্রয়োজনই কুপোদক হইতেও বিশেষভাবে সিদ্ধি হইয়া থাকে ; তেমনি বেদশাস্ত্রের একদেশে লিখিত এক একটি দেবতার উপাসনার দ্বারা যে ফল লাভ হয়, বেদের একমাত্র উদ্দিষ্ট আমার ভজনা দ্বারা সেই সমস্ত ফলই তাহা হইতেও বিশেষভাবে লাভ হইয়া থাকে । এইরূপ বেদতাৎপর্য্যবিৎ ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তির সমস্ত প্রয়োজন একমাত্র ভগবদারাধনেই সিদ্ধি হইয়া থাকে ॥৪৬॥

কর্ম্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন ।
মা কর্ম্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোঽস্ত্বকর্ম্মণি ॥৪৭॥

তে (তোমার) কর্ম্মণি এব (কর্ম্মেই) অধিকারঃ (অধিকার) কদাচন (কখনও যেন) ফলেষু (ফলে) [আকাঙ্ক্ষা] মা [ভূঃ] (হয় না) । [ত্বং] (তুমি) কর্ম্মফলহেতুঃ (কর্ম্মফলের কামনাযুক্ত) মা ভূঃ (হইও না) অকর্ম্মণি (স্বধর্ম্মের অননুষ্ঠানে) তে (তোমার) সঙ্গঃ (আসক্তি) মা অস্তু (না হউক) ॥৪৭॥

এক্ষণে নিষ্কাম কর্ম্মযোগ বলিতেছেনঃ—স্বধর্ম্ম বিহিত কর্ম্মেই তোমার অধিকার, কিন্তু কোন কর্ম্মফলে তোমার অধিকার নাই । তুমি কর্ম্মফলাকাঙ্ক্ষী হইয়া কর্ম্ম করিও না । তাই বলিয়া যেন স্বধর্ম্ম অকরণেও তোমার আসক্তি না হয় ॥৪৭॥

যোগস্থঃ কুরু কর্ম্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ধনঞ্জয় ।
সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে ॥৪৮॥

[হে] ধনঞ্জয় ! (হে অর্জ্জুন !) যোগস্থং (চিত্ত সমাধান পূর্ব্বক) সঙ্গং (কর্ত্তৃত্বাভিনিবেশ) ত্যক্ত্বা (ত্যাগ করিয়া) সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ (জয়-পরাজয়ে) সমঃ ভূত্বা (তুল্য বুদ্ধি হইয়া) কর্ম্মাণি (কর্ম্ম সকল) কুরু (কর) । [যতঃ] (যেহেতু) সমত্বং (জয় পরাজয়ে সম বুদ্ধিই) যোগঃ (যোগ বলিয়া) উচ্যতে (কথিত হয়) ॥৪৮॥

হে ধনঞ্জয় ! ফলকামনা পরিত্যাগপূর্ব্বক ভক্তিযোগস্থ হইয়া সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে তুল্য ভাবাপন্ন হইয়া স্বধর্ম্মবিহিত কর্ম্মাচরণ কর । কর্ম্মের ফলসিদ্ধি ও ফলের অসিদ্ধি বিষয়ে যে সমবুদ্ধি তাহাকেই যোগ বলে ॥৪৮॥

দূরেণ হ্যবরং কর্ম্ম বুদ্ধিযোগাদ্ ধনঞ্জয় ।
বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ ॥৪৯॥

[হে] ধনঞ্জয় ! (হে ধনঞ্জয় !) হি (যেহেতু) বুদ্ধিযোগাৎ (সমত্বরূপ নিষ্কাম কর্ম্মযোগ হইতে) কর্ম্ম (কাম্য কর্ম্ম) দূরেণ অবরম্ (অতি নিকৃষ্ট) । [অতঃ] (অতএব) বুদ্ধৌ (নিষ্কাম-কর্ম্মযোগের) শরণম্ (আশ্রয়) অন্বিচ্ছ (প্রার্থনা কর) । ফলহেতবঃ (ফলকামী) কৃপণাঃ (দীন) ॥৪৯॥

হে ধনঞ্জয় ! কাম্যকর্ম্ম, বুদ্ধিযোগ হইতে অত্যন্ত নিকৃষ্ট । যাহারা ফলকামী তাহারা কৃপণ অর্থাৎ দীন (অভাব ময়) । অতএব তুমি নিষ্কাম কর্ম্মলক্ষণা বুদ্ধির আশ্রিত হও ॥৪৯॥

বুদ্ধিযুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃত-দুষ্কৃতে ।
তস্মাদ্­যোগায় যুজ্যস্ব যোগঃ কর্ম্মসু কৌশলম্ ॥৫০॥

বুদ্ধিযুক্তঃ (নিষ্কাম কর্ম্মী) সুকৃত-দুষ্কৃতে (পুণ্য বা পাপ) উভে (উভয় কর্ম্মকে) ইহ (এই জন্মেই) জহাতি (পরিত্যাগ করে) । তস্মাৎ (অতএব) যোগায় (নিষ্কাম কর্ম্মযোগের জন্য) যুজ্যস্ব (যত্ন কর) । কর্ম্মসু (সকাম-নিষ্কাম কর্ম্মের মধ্যে) যোগঃ (নিষ্কামভাবে কর্ম্ম করাই) কৌশলম্ (নৈপুণ্য) ॥৫০॥

নিষ্কাম বুদ্ধিযুক্ত ব্যক্তি সংসার অবস্থাতেই পাপ-পূণ্য উভয়ই পরিত্যাগ করেন । সুতরাং তুমি নিষ্কাম কর্ম্মযোগে যুক্ত হও । যেহেতু বুদ্ধিযোগই কর্ম্মের কৌশল ॥৫০॥

কর্ম্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত্বা মনীষিণঃ ।
জন্মবন্ধবিনির্ম্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্ ॥৫১॥

হি (যেহেতু) বুদ্ধিযুক্তাঃ (সমত্ব বুদ্ধিবিশিষ্ট) মনীষিণঃ (মনীষিগণ) কর্ম্মজং (কর্ম্মজাত) ফলং (ফল) ত্যক্ত্বা (ত্যাগ করিয়া) জন্মবন্ধ-বিনির্ম্মুক্তাঃ [সন্তঃ] (জন্ম বন্ধন হইতে বিনির্ম্মুক্ত হইয়া) অনাময়ম্ (সর্ব্বোপদ্রবরহিত) পদং (পরমপদ) গচ্ছন্তি (লাভ করেন) ॥৫১॥

বুদ্ধিযুক্ত মনীষিগণ কর্ম্মজাত ফল ত্যাগ দ্বারা জন্মবন্ধ-বিনির্ম্মুক্ত হইয়া ভক্তদিগের লভ্য অবস্থা অর্থাৎ পরাশান্তি লাভ করেন ॥৫১॥

যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি ।
তদা গন্তাসি নির্ব্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ ॥৫২॥

যদা (যখন) তে (তোমার ) বুদ্ধিঃ (অন্তঃকরণ) মোহকলিলং (দেহাত্মবোধরূপ দুর্গম মোহকে) ব্যতিতরিষ্যতি (অতিক্রম করিবে) তদা (তখন) [ত্বং] (তুমি) শ্রোতব্যস্য (পরে শ্রবণযোগ্য) শ্রুতস্য চ (এবং পূর্ব্বে শ্রুত বিষয়ে) নির্ব্বেদং (বৈরাগ্য) গন্তাসি (প্রাপ্ত হইবে) ॥৫২॥

এইরূপে যখন তোমার বুদ্ধি মোহরূপ গহনকে সম্পূর্ণ অতিক্রম করিবে, তখন তুমি শ্রোতব্য ও শ্রুত বিষয়ের তুচ্ছ ফলে নির্ব্বেদ লাভ করিবে ॥৫২॥

শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্যতি নিশ্চলা ।
সমাধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাপ্স্যসি ॥৫৩॥

যদা (যে সময়ে) তে (তোমার) অচলা (অবিচলিত) বুদ্ধিঃ (বুদ্ধি) শ্রুতিবিপ্রতিপন্না [সতী] (বেদের নানারূপ অর্থবাদ দ্বারা বিরক্ত হইয়া) সমাধৌ (পরমেশ্বরে) নিশ্চলা (অচঞ্চলা) স্থাস্যতি (থাকিবে), তদা (তখনই) যোগম্ (তত্ত্বজ্ঞান বা ভক্তিযোগ) অবাপ্স্যসি (লাভ করিবে) ॥৫৩॥

অতঃপর যখন তোমার বুদ্ধি শ্রুতির বিভিন্নার্থে আর বিচলিত হইবে না, তখন সহজ সমাধিতে উহা অচলা হইয়া বিশুদ্ধ-ভক্তিযোগ লাভ করিবে ॥৫৩॥

অর্জ্জুন উবাচ—
স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা সমাধিস্থস্য কেশব ।
স্থিতধীঃ কিং প্রভাষেত কিমাসীত ব্রজেত কিম্ ॥৫৪॥

অর্জ্জুনঃ উবাচ (অর্জ্জুন বলিলেন) [হে] কেশব ! (হে কেশব !) স্থিতপ্রজ্ঞস্য (অচলা বুদ্ধি বিশিষ্ট) সমাধিস্থস্য (সমাধিস্থ ব্যক্তির) কা ভাষা ( কি লক্ষণ ?) স্থিতধীঃ (স্থির বুদ্ধি ব্যক্তি) কিং প্রভাষেত (সুখ দুঃখাদি সমুপস্থিত হইলে স্পষ্ট বা স্বগত কি বলেন) কিমাসীত ব্রজেত কিম্ (ইন্দ্রিয় সকলের বাহ্যবিষয়ে গমন-ভাব কিরূপ ?) ॥৫৪॥

অর্জ্জুন কহিলেন—হে কেশব ! স্থিতপ্রজ্ঞ, সমাধিস্থ বা স্থিতধীগণের লক্ষণ কি ? তাঁহারা কিরূপ বলেন ; বাহ্য বিষয় ভোগ-সম্বন্ধে কি প্রকারই বা আচরণ করেন, তাহাদের গমন-ভাব অর্থাৎ চেষ্টাই বা কিরূপ তাহা জানিতে ইচ্ছা করি ? ॥৫৪॥

শ্রীভগবান্ উবাচ—
প্রজহাতি যদা কামান্ সর্ব্বান্ পার্থ মনোগতান্ ।
আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে ॥৫৫॥

শ্রীভগবান্ উবাচ (শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন) [হে] পার্থ ! (হে কুন্তীনন্দন !) [জীবঃ] (জীব) যদা (যখন) সর্ব্বান্ (সমস্ত) মনোগতান্ (মনোগত) কামান্ (কাম সকল) প্রজহাতি (পরিত্যাগ করেন), আত্মনি (ও প্রত্যাহৃত মনে) আত্মনা এব (প্রাপ্ত যে আনন্দ তদ্দ্বারাই) তুষ্টঃ (তুষ্ট অর্থাৎ আত্মারাম) [ভবতি] (হন), তদা (তখন) [সঃ] (সেই জীব) স্থিতপ্রজ্ঞঃ (‘স্থিতপ্রজ্ঞ’ বলিয়া) উচ্যতে (কথিত হন) ॥৫৫॥

শ্রীভগবান্ বলিলেন—হে পার্থ ! যখন জীব মনোগত কাম সমূহ পরিত্যাগ করিয়া প্রত্যাহৃত মনে আনন্দস্বরূপ আত্ম-দর্শনে পরিতৃপ্ত হন, তখন তাঁহাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হইয়া থাকে ॥৫৫॥

দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে ॥৫৬॥

দুঃখেষু (শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ক্লেশ উপস্থিত হইলেও) অনুদ্বিগ্নমনাঃ (যাঁহার মন উদ্বিগ্ন হয় না), সুখেষু (তত্তৎ বিষয়ে সুখ উপস্থিত হইলেও) বিগতস্পৃহঃ (যাঁহার তাহাতে স্পৃহা হয় না) [চ] (এবং) বীতরাগভয়ক্রোধঃ (যিনি অনুরাগ, ভয় ও ক্রোধ হইতে বিমুক্ত) মুনিঃ (আত্ম-মননশীল) [সঃ এব] (তিনিই) স্থিতধীঃ (স্থিতপ্রজ্ঞ বলিয়া) উচ্যতে (কথিত হন) ॥৫৬॥

যিনি আধ্যত্মিকাদি সমুদ্ভূত দুঃখাদিতে অনুদ্বিগ্নচিত্ত, সুখাদিতেও স্পৃহাহীন, যিনি অনুরাগ, ভয় ও ক্রোধ হইতে বিমুক্ত তিনিই স্থিতধী বা স্থিতপ্রজ্ঞ ॥৫৬॥

যঃ সর্ব্বত্রানভিস্নেহস্তত্তৎ প্রাপ্য শুভাশুভম্ ।
নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥৫৭॥

যঃ (যিনি) সর্ব্বত্র (সমস্ত জড় বিষয়ে) অনভিস্নেহঃ (ঔপাধিক স্নেহশূন্য) তত্তৎ (সেই সেই) শুভাশুভম্ (সন্মান-ভাজনাদি বা অনাদর-প্রহরাদি) প্রাপ্য (লাভ করিয়া) ন অভিনন্দতি (প্রশংসা করেন না) ন দ্বেষ্টি (অভিসম্পাতও করেন না) তস্য (তাঁহারই) প্রজ্ঞা (বুদ্ধি) প্রতিষ্ঠিতা (সমাধিতে অবস্থিত অর্থাৎ তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ) ॥৫৭॥

যিনি সর্ব্বত্র মায়িক স্নেহশূন্য ; জড়ীয় শুভাশুভ প্রাপ্তিতে অনুরাগ বা বিদ্বেষহীন, তাঁহারই প্রজ্ঞা সমাধিতে প্রতিষ্ঠিত ॥৫৭॥

যদা সংহরতে চায়ং কূর্ম্মোঽঙ্গানীব সর্ব্বশঃ ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥৫৮॥

যদা চ (যখন) অয়ং (এই যোগী) কূর্ম্মঃ অঙ্গানি ইব (কচ্ছপের অঙ্গ সমূহ চালনের ন্যায়) ইন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ (ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় শব্দাদি হইতে) ইন্দ্রিয়াণি (চক্ষু, কর্ণাদিকে) সর্ব্বশঃ সংহরতে (সম্যক্­রূপে প্রত্যাহার করেন) [তদা] (তখন) তস্য (তাঁহারই) প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা (অর্থাৎ তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ) ॥৫৮॥

কচ্ছপ যেমন স্বীয় অঙ্গ সমূহ স্বেচ্ছানুসারে দেহাভ্যন্তরে গ্রহণ করে, সেইরূপ ইনি যখন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় হইতে ইন্দ্রিয়গণকে ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করেন তখন তাঁহার প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত ॥৫৮॥

বিষয়া বিনিবর্ত্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ ।
রসবর্জ্জং রসোঽপ্যস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ত্ততে ॥৫৯॥

নিরাহারস্য (ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বিষয়-অগ্রহণকারী) দেহিনঃ (দেহাভিমানী অজ্ঞ ব্যক্তির) বিষয়াঃ (বিষয় সকল) বিনিবর্ত্তন্তে (উপবাসাদি হেতু নিবৃত্ত হয় বটে) [কিন্তু] রসবর্জ্জং (তাহা কেবল বাহ্য ত্যাগ মাত্র, বিষয়-তৃষ্ণা নিবৃত্ত হয় না) । রসঃ অপি (বিষয় পিপাসাও) অস্য (এই স্থিতপ্রজ্ঞের) [তু] (কিন্তু) পরং (পরমাত্মাকে) দৃষ্ট্বা (দেখিয়া) নিবর্ত্ততে (নিবৃত্ত হয়) ॥ ৫৯॥

বাহ্যতঃ বিষয়বর্জ্জনকারী দেহিগণের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলি দূরে থাকিলেও অন্তরের বিষয় পিপাসার নিবৃত্তি হয় না । কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি পরমতত্ত্বের সৌন্দর্য্য দর্শন পূর্ব্বক তাহাতে আকৃষ্ট হওয়ায়, তাঁহার আভ্যন্তরীণ বিষয়াসক্তি স্বতঃই নিবৃত্ত হইয়া থাকে ॥৫৯॥

যততো হ্যপি কৌন্তেয় পুরুষস্য বিপশ্চিতঃ ।
ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথীনি হরন্তি প্রসভং মনঃ ॥৬০॥

[হে] কৌন্তেয় ! (হে অর্জ্জুন !) হি (যেহেতু) যততঃ (মোক্ষার্থে যত্নবান্) বিপশ্চিতঃ পুরুষস্য অপি (বিবেকী ব্যক্তিরও) প্রমাথীনি (মনের ক্ষোভকারী) ইন্দ্রিয়াণি (ইন্দ্রিয় সকল) প্রসভং (বল পূর্ব্বক) মনঃ (মনকে) হরন্তি (হরণ করে) ॥৬০॥

হে কৌন্তেয় ! মনঃক্ষোভকর ইন্দ্রিয় সকল মোক্ষার্থ যত্নশীল বিবেকী পুরুষেরও মন বলপূর্ব্বক হরণ করে (কিন্তু আমাতে আকৃষ্ট চিত্তের সে সম্ভাবনা নাই) ॥৬০॥

তানি সর্ব্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত মৎপরঃ ।
বশে হি যস্যেন্দ্রিয়াণি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥৬১॥

তানি সর্ব্বাণি (সেই সকল ইন্দ্রিয়কে) সংযম্য (সংযত করিয়া) মৎপরঃ (ভগবন্নিষ্ঠ) [সন্] (হইয়া) যুক্তঃ আসীত (একাগ্রচিত্তে থাকা উচিত) । হি (যেহেতু) যস্য (যাঁহার) ইন্দ্রিয়াণি (ইন্দ্রিয় সকল) বশে (বশীভূত) তস্য (তাঁহার) প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা (অর্থাৎ তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ) ॥৬১॥

ভক্তিযোগী আমার প্রতি উত্তমা ভক্তি আচরণ করতঃ ইন্দ্রিয় সকলকে যথাস্থানে নিয়ন্ত্রিত করেন । ইন্দ্রিয়গণ যাহার বশীভূত তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ ॥৬১॥

ধ্যায়তো বিষয়ান্ পুংসঃ সঙ্গস্তেষূপজায়তে ।
সঙ্গাৎ সংজায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধোঽভিজায়তে ॥৬২॥

বিষয়ান্ (ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় সকল) ধ্যায়তঃ (চিন্তা করিতে করিতে) পুংসঃ (পুরুষের) তেষু (ঐ সকল বিষয়ে) সঙ্গঃ (আসক্তি) উপজায়তে (জন্মে), সঙ্গাৎ (আসক্তি হইতে) কামঃ (অভিলাষ) সংজায়তে (সমুৎপন্ন হয়), কামাৎ (কাম হইতে) ক্রোধঃ (ক্রোধ) অভিজায়তে (উপস্থিত হয়) ॥৬২॥

পক্ষান্তরে ভক্তিশূন্য বৈরাগ্য মার্গের বৈরাগ্য চেষ্টায় যে সময় পুরুষের বিষয়ধ্যান উপস্থিত হয়, তখন ক্রমশঃ বিষয়ে সঙ্গ অর্থাৎ স্পৃহ্যা জন্মে । সঙ্গ হইতে কামনা সঞ্জাত হয়, এবং কামনা প্রতিহত হইলেই ক্রোধ আসিয়া উপস্থিত হয় ॥৬২॥

ক্রোধাদ্ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ ।
স্মৃতিভ্রংশাদ্ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি ॥৬৩॥

ক্রোধাৎ (ক্রোধ হইতে) সম্মোহঃ (কার্য্যাকার্য্য-বিবেকাভাব) ভবতি (উপস্থিত হয়), সম্মোহাৎ (সম্মোহ হইতে) স্মৃতিবিভ্রমঃ (শাস্ত্রোপদিষ্ট নিজ স্বার্থের বিস্মৃতি ) [ভবতি] (হয়) । স্মৃতিভ্রংশাৎ (স্মৃতিভ্রষ্ট হইতে) বুদ্ধিনাশঃ (সৎ ব্যবসায়ের নাশ) বুদ্ধিনাশাৎ (বুদ্ধি নাশ হইতে) [পুমান্] (মনুষ্য) প্রণশ্যতি (সংসার কূপে পতিত হয়) ॥৬৩॥

ক্রোধ হইতে মোহ, মোহ প্রবল হইলে স্মৃতি-বিভ্রম, স্মৃতি-বিভ্রম হইতে বুদ্ধিনাশ, এবং বুদ্ধিনাশ হইতে সর্ব্বনাশ হয় ॥৬৩॥

রাগদ্বেষবিমুক্তৈস্তু বিষয়ানিন্দ্রিয়ৈশ্চরন্ ।
আত্মবশ্যৈর্বিধেয়াত্মা প্রসাদমধিগচ্ছতি ॥৬৪॥

রাগদ্বেষবিমুক্তৈঃ (আসক্তি ও বিদ্বেষ শূন্য) আত্মবশ্যৈঃ (আত্মবশীভূত) ইন্দ্রিয়ৈঃ (ইন্দ্রিগণের দ্বারা) বিষয়ান্ (বিষয় সকল) চরন্ (গ্রহণ করিয়াও), বিধেয়াত্মা (বচনানুরূপ কার্য্যকারী) তু (কিন্তু) প্রসাদম্ (চিত্ত-প্রসন্নতা) অধিগচ্ছতি (লাভ করেন) ॥৬৪॥

কিন্তু যুক্তবৈরাগ্য অবলম্বনকারী রাগদ্বেষ ত্যাগ-পূর্ব্বক আত্মবশীভূত ইন্দ্রিয়গণের দ্বারা জড়বিষয় গ্রহণ করিয়াও চিত্তপ্রসাদ লাভ করেন ॥৬৪॥

প্রসাদে সর্ব্বদুঃখানাং হানিরস্যোপজায়তে ।
প্রসন্নচেতসো হ্যাশু বুদ্ধিঃ পর্য্যবতিষ্ঠতে ॥৬৫॥

প্রসাদে [সতি] (চিত্ত প্রসাদ লাভ হইলে) অস্য (ইহার অর্থাৎ নিগৃহীত-চিত্ত ব্যক্তির) সর্ব্বদুঃখানাং (আধ্যাত্মিকাদি সকল দুঃখের) হানিঃ (অবসান) উপজায়তে (হয়), হি (যেহেতু) প্রসন্নচেতসঃ (প্রসন্নচিত্ত পুরুষের) বুদ্ধিঃ (বুদ্ধি) আশু (শীঘ্রই) পর্য্যবতিষ্ঠতে (স্বাভীষ্টের প্রতি সর্ব্বতোভাবে স্থির হইয়া থাকে) ॥৬৫॥

চিত্ত প্রসাদ লাভ হইলে সর্ব্বপ্রকার দুঃখ নাশ হয় । প্রসন্নচেতারই বুদ্ধি শীঘ্রই স্বীয় অভীষ্টের প্রতি সর্ব্বতোভাবে স্থিরা হয় । অতএব ভক্তিদ্বারাই চিত্ত প্রসাদ সম্ভব ॥৬৫॥

নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা ।
ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্ ॥৬৬॥

অযুক্তস্য (অবশীকৃত-চিত্তের) বুদ্ধিঃ (আত্মবিষয়িণী প্রজ্ঞা) ন অস্তি (নাই), অযুক্তস্য (তাদৃশ প্রজ্ঞা রহিতের) ভাবনা চ (পরমেশ্বর ধ্যানও) ন [অস্তি] (নাই), অভাবয়তঃ (অকৃতধ্যান ব্যক্তির) শান্তিঃ চ (শান্তিও) ন [অস্তি] (নাই), অশান্তস্য (শান্তি রহিত ব্যক্তির) সুখম্ (সুখ) কুতঃ (কোথায় ? অর্থাৎ সুখও নাই) ॥৬৬॥

অজিতেন্দ্রিয়ের বিচার শক্তি নাই ভাবধারাও অর্থশূন্য, শুদ্ধভাবধারা শূন্য ব্যক্তির শান্তি লাভ হয় না । অশান্ত ব্যক্তির পরম সুখ লাভের আশা কোথায় ? ॥৬৬॥

ইন্দ্রিয়াণাং হি চরতাং যম্মনোঽনুবিধীয়তে ।
তদস্য হরতি প্রজ্ঞাং বায়ুর্নাবমিবাম্ভসি ॥৬৭॥

হি (যেহেতু) বায়ুঃ (প্রতিকূল বায়ু) অম্ভসি (সমুদ্রে) নাবম্ ইব (যেমন নৌকাকে) [হরতি] (বিচালিত করে), [তদ্­বৎ] (সেইরূপ) চরতাং (স্ব স্ব বিষয়ে বিচরণকারী) ইন্দ্রিয়াণাং (ইন্দ্রিয়গণের মধ্যে) যৎ (যে একটি ইন্দ্রিয়) মনঃ (মনকে) অনুবিধীয়তে (অনুগমন করে) তৎ (সেই একটী ইন্দ্রিয়ই) অস্য (এই মনের বা অজিতেন্দ্রিয় পুরুষের) প্রজ্ঞাং (বুদ্ধিকে) হরতি (হরণ করে অর্থাৎ বিষয়ে আকৃষ্ট করে) ॥৬৭॥

যেহেতু সমুদ্রস্থিত নৌকাকে প্রতিকূল বায়ু যেরূপ ইতস্ততঃ সঞ্চালিত করে, সেইরূপ বিষয়ে বিচরণশীল ইন্দ্রিয়ের পশ্চাৎধাবনকারী মনও অযুক্ত পুরুষের প্রজ্ঞাকে হরণ করে ॥৬৭॥

তস্মাদ্ যস্য মহাবাহো নিগৃহীতানি সর্ব্বশঃ ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥৬৮॥

[হে] মহাবাহো ! (হে শত্রু নিগ্রহকারী !) তস্মাৎ (সেই হেতু) যস্য (যাঁহার) ইন্দ্রিয়াণি (ইন্দ্রিয়গণ) ইন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ (ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় হইতে) সর্ব্বশঃ (সর্ব্বপ্রকারে) নিগৃহীতানি (নিগৃহীত হইয়াছে), তস্য (তাঁহারই) প্রজ্ঞা (বুদ্ধি) প্রতিষ্ঠিতা (প্রতিষ্ঠিত বলিয়া জানিবে) ॥৬৮॥

অতএব হে মহাবাহো যাহার ইন্দ্রিয় সকল যুক্তবৈরাগ্য দ্বারা বিষয় হইতে সর্ব্বতোভাবে নিগৃহীত হইয়াছে তাহারই প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত জানিবে ॥৬৮॥

যা নিশা সর্ব্বভূতানাং তস্যাং জাগর্ত্তি সংযমী ।
যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশ্যতো মুনেঃ ॥৬৯॥

সর্ব্বভূতানাং যা নিশা (বুদ্ধি দুই প্রকার—আত্ম-প্রবণা ও বিষয়-প্রবণা—যে আত্মা-প্রবণা বুদ্ধি সর্ব্বভূতের নিশা স্বরূপ, জড়মুগ্ধ জীবসকল ঐ রাত্রিতে নিদ্রিত থাকায় তাহাতে প্রাপ্য বস্তুর জ্ঞান লাভ করিতে পারে না) । তস্যাং (সকল প্রাণীর আত্মা-প্রবণ বুদ্ধিরূপ রাত্রিতে) সংযমী (স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি) জাগর্ত্তি (জাগ্রত থাকেন অর্থাৎ আত্মবুদ্ধিনিষ্ঠ আনন্দকে সাক্ষাৎ অনুভব করেন) । যস্যাং (যে বিষয়-প্রবণা বুদ্ধিতে) ভূতানি (সর্ব্বপ্রাণী) জাগ্রতি (জাগ্রত থাকে অর্থাৎ বিষয়নিষ্ঠ সুখ-দুঃখ, শোক-মোহাদি অনুভব করে), সা (সেই বিষয়-প্রবণা বুদ্ধিই) পশ্যতঃ (সংসারী-লোকের বিষয়নিষ্ঠতার পরিণামদর্শী) মুনেঃ (স্থিতপ্রজ্ঞের) নিশা (রাত্রি অর্থাৎ বিষয়নিষ্ঠ সুখ-দুঃখাদিতে তিনি উদাসীন থাকেন) ॥৬৯॥

জড়মুগ্ধ জীবের আত্মনিষ্ঠ-বুদ্ধিরূপ নিশাতে স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি জাগ্রত থাকেন অর্থাৎ আত্মবুদ্ধিনিষ্ঠ আনন্দ সাক্ষাৎ অনুভব করেন ; পক্ষান্তরে যে বিষয়-প্রবণ বুদ্ধিতে জড়মুগ্ধ জীবগণ জাগ্রত থাকে, স্থিতপ্রজ্ঞের তাহা রাত্রিস্বরূপ অর্থাৎ তাহাতে তিনি সম্পূর্ণ উদাসীন । স্থিতপ্রজ্ঞ জড়ে উদাসীন কিন্তু চিদ্বিলাসী, আর সাধারণ জীব জড়বিলাসী কিন্তু চিদানন্দহীন । (ইহাই ভাবার্থ) ॥৬৯॥

আপূর্য্যমাণমচলপ্রতিষ্ঠং সমুদ্রমাপঃ প্রবিশন্তি যদ্­বৎ ।
তদ্­বৎ কামা যং প্রবিশন্তি সর্ব্বে স শান্তিমাপ্নোতি ন কামকামী ॥৭০॥

আপূর্য্যমাণম্ (নানা নদ-নদী দ্বারা নিয়ত পরিপূর্ণ হইলেও) অচলপ্রতিষ্ঠং (অচলভাবে অবস্থিত) সমুদ্রম্ (সমুদ্র মধ্যে) যদ্­বৎ (যেমন) আপঃ (অন্য বর্ষার জলরাশি) প্রবিশন্তি (প্রবেশ করে, কিন্তু তাহার বেলাভূমি অতিক্রম করিতে পারে না) । তদ্­বৎ (তদ্রূপ) সর্ব্বে কামাঃ (সমস্ত ভোগ্য বিষয়) যং প্রবিশন্তি (ভোগার্থ যে মুনির নিকট আসে, কিন্তু তাঁহার চিত্তের ক্ষোভ জন্মাইতে পারে না) ; সঃ (তিনিই) শান্তিম্ (শান্তি) আপ্নোতি (লাভ করেন) । [তু] (কিন্তু) কাম-কামী (ভোগ-কামনাশীল ব্যক্তি) ন [আপ্নোতি] (সেই শান্তি প্রাপ্ত হয় না) ॥৭০॥

যেমন বহু নদনদী স্বয়ং পরিপূর্ণ ও গম্ভীর সমুদ্রে প্রবিষ্ট হয় কিন্তু ক্ষোভিত করিতে পারে না, তদ্রূপ কাম্য বিষয়সমূহ স্থিরপ্রজ্ঞ পুরুষে প্রবিষ্ট হয় কিন্তু ক্ষোভ জন্মাইতে পারে না । অতএব তিনিই শান্তি লাভ করেন । কিন্তু কামকামী কখনই শান্তি পায় না ॥৭০॥

বিহায় কামান্ যঃ সর্ব্বান্ পুমাংশ্চরতি নিস্পৃহঃ ।
নির্ম্মমো নিরহঙ্কারঃ স শান্তিমধিগচ্ছতি ॥৭১॥

যঃ পুমান্ (যে ব্যক্তি) সর্ব্বান্ কামান্ (সমস্ত কামনা) বিহায় (পরিত্যাগ করিয়া) নিস্পৃহঃ (স্পৃহাশূন্য) নিরহঙ্কারঃ নির্ম্মমঃ (স্বদেহ এবং দেহ সম্বন্ধীয় স্ত্রী-পুত্ত্রাদিতে অহংতা ও মমতাশূন্য হইয়া) চরতি (বিচরণ করেন) সঃ (তিনিই) শান্তিম্ (শান্তি) অধিগচ্ছতি (লাভ করেন) ॥৭১॥

যিনি ভোগবাসনাসমূহ পরিত্যাগ পূর্ব্বক সকল বিষয়ে অনাসক্ত, অহঙ্কারশূন্য ও মমতাহীনভাবে অর্থাৎ পরতত্ত্ব সম্বন্ধযুক্ত হইয়া বিচরণ করেন তিনিই শান্তি লাভ করেন ॥৭১॥

এষা ব্রাহ্মী স্থিতিঃ পার্থ নৈনাং প্রাপ্য বিমুহ্যতি ।
স্থিত্বাস্যামন্তকালেঽপি ব্রহ্মনির্ব্বাণমৃচ্ছতি ॥৭২॥

[হে] পার্থ ! (হে অর্জ্জুন !) এষা ব্রাহ্মী স্থিতিঃ (এই প্রকার স্থিতিকেই ব্রাহ্মীস্থিতি অর্থাৎ ব্রহ্ম-প্রাপিকা জ্ঞাননিষ্ঠা বলে) এনাং প্রাপ্য (ইহাকে প্রাপ্ত হইলে) [নরঃ] (মানব) ন বিমুহ্যতি (পুনরায় সংসার-মোহ প্রাপ্ত হয় না), অন্তকালে অপি (মৃত্যু সময়েও) অস্যাং (এই ব্রাহ্মী নিষ্ঠাতে) স্থিত্বা (অবস্থিত হইয়া) ব্রহ্ম নির্ব্বাণম্ (ব্রহ্মনির্ব্বাণ অর্থাৎ জড় মুক্তি) ঋচ্ছতি (লাভ করেন) ॥৭২॥

হে পার্থ ! ইহাকে ব্রাহ্মীস্থিতি কহে । ইহা লাভ করিলে আর সংসার মোহ প্রাপ্ত হইতে হয় না । মৃত্যুকালেও এই অবস্থা ক্ষণকাল লাভ করিলে চিম্ময়ধাম লব্ধ হয় ॥৭২॥

ইতি শ্রীমহাভারতে শতসাহস্র্যাং সংহিতায়াং বৈয়াসিক্যাং
ভীষ্মপর্ব্বণি শ্রীমদ্ভগদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জ্জুনসংবাদে সাংখ্যযোগো
নাম দ্বিতীয়োঽধ্যায়ঃ ॥২॥

ইতি দ্বিতীয় অধ্যায়ের অন্বয় সমাপ্ত ॥

                                                                                                   গ্রন্থ-সম্পাদক—
                                                                                       ত্রিদণ্ডিভিক্ষু—শ্রীভক্তিরক্ষক শ্রীধর
                                                                                         শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ, নবদ্বীপ
                                                                                        শ্রীজন্মাষ্টমী বঙ্গাব্দ ১৩৬৮ সাল


১) দয়া ও কৃপা স্বতন্ত্র ভাব :
দয়া = লোকের দুঃখে দুঃখিত হইয়া দুঃখমোচনের প্রবল প্রবৃত্তি ।
কৃপা = পরের দুঃখচিন্তায় বা দুঃখদর্শনে কাতর হওয়া ।
‘কাতরতা দয়া নহে, কৃপা । দয়া বলবানের ধর্ম, কৃপা দুর্বলের ধর্ম ।’ – শ্রীঅরবিন্দ ।
৩) ‘যে কৃপার বশে (কাতর হইয়া) অস্ত্র পরিত্যাগ করে, ধর্মে পরানঙ্মুখ হয়, কাঁদিতে বসিয়া ভাবে আমার কর্তব্য করিতেছি, আমি পুণ্যবান – সে ক্লীব ।’ … “শ্রীকৃষ্ণ দেখিলেন, অর্জুন কৃপায় আবিষ্ট হইয়াছেন, বিষাদ তাঁহাকে গ্রাস করিয়াছে । এই তামসিক ভাব অপনোদন করিবার জন্য অন্তর্যামী তাঁহার প্রিয়সখাকে ক্ষত্রিয়োচিত তিরস্কার করিলেন, তাহাতে যদি রাজসিক ভাব জাগরিত হইয়া তমঃকে দূর করে ।’ – শ্রীঅরবিন্দ ।
৭) পুত্র বা শিষ্যরূপে জিজ্ঞাসু না হইলে গুরু তত্ত্বোপদেশ দেন না, কাজেই তত্ত্বজিজ্ঞাসু-অর্জুন লৌকিক ‘সখ্য’-ভাব ত্যাগ করিয়া ভগবানের ‘শিষ্যত্ব’ স্বীকার করিলেন । একান্ত শ্রদ্ধার বশে সম্পূর্ণভাবে ভগবানের শরণাগত হওয়াই গীতার প্রধান শিক্ষা । ইহাই আত্মসমর্পণ । এই শ্রদ্ধাবলেই অর্জুন গীতোক্ত-শিক্ষার শ্রেষ্ঠপাত্র বলিয়া গৃহীত ।
১১) অর্জুনের মোহ :
এই স্থলেই প্রকৃতপক্ষে গীতা আরম্ভ । গীতোক্ত ধর্ম কি তাহা বুঝিতে হইলে, কি উপলক্ষে এই ধর্মের প্রচার হইয়াছিল তাহা স্মরণ রাখা প্রয়োজন । পাঠক মনে রাখিবেন, অর্জুন পূর্বাপরই যুদ্ধার্থে উদ্যোগী ছিলেন, যুদ্ধের কর্তব্যতা সম্বন্ধে কখনও তাঁহার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয় নাই । বরং শ্রীকৃষ্ণ যুদ্ধ অনিবার্য জানিয়াও যুদ্ধ নিবারণার্থ যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিলেন – এমন কি স্বয়ং দৌত্যকার্য্যে ব্রতী হইয়াছিলেন । সেই যুদ্ধ যখন আসন্ন, শস্ত্র-সম্পাত যখন আরম্ভ হইয়াছে, তখন অর্জুনের বিষম নির্বেদ উপস্থিত, তিনি যত ধর্মশাস্ত্র খুঁজিয়া-খুঁজিয়া যুদ্ধের অকর্তব্যতা প্রতিপাদ্য করিতে উন্মুখ । অর্জুনের মনোরম বাক্যগুলি শুনিয়া আমাদের মনে হয়, কি উচ্চ অন্তঃকরণের কথা । কি উদার নিঃস্বার্থ ভাব ! কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ কি বলিতেছেন ? ভগবান একটু হাসিয়া বলিলেন, এগুলি জ্ঞানীর ভাষায় মূর্খের কথা । তোমার এ-মোহ কোথা হইতে উপস্থিত হইল ?
অর্জুনের এই মোহ দূরীকরণের চেষ্টাতেই গীতাশাস্ত্রের উদ্ভব । অর্জুনের মোহ উপলক্ষ্য করিয়া ভগবান সমগ্র মানব-জাতির অশেষ কল্যাণকর এই অপূর্ব ধর্মতত্ত্ব জগতে প্রচার করিলেন ।
১৩) জন্মান্তরবাদ : খ্রীষ্টীয় বনাম হিন্দু মত
বাল্যাবস্থার পরে যৌবনাবস্থা উপস্থিত হয়, উহা অবস্থান্তরমাত্র । সেইরূপ এক দেহ ত্যাগ করিয়া অন্য দেহ গ্রহণও জীবাত্মার একটি অবস্থান্তর মাত্র । এখানে ‘মৃত্যু’ না বলিয়া বলা হইয়াছে, ‘দেহান্তর-প্রাপ্তি’, সুতরাং মানিয়া লওয়া হইল মরিলেই জন্ম হয় । ইহাই জন্মান্তরবাদ । আত্মার অবিনাশিতা ও পুনর্জন্ম হিন্দুধর্মের এই দুইটি প্রধান তত্ত্ব । বৌদ্ধধর্মেরও ইহাই মূলতত্ত্ব । খ্রীষ্টীয় ধর্ম আত্মার অবিনাশিতা স্বীকার করেন, কিন্তু পুনর্জন্ম স্বীকার করেন না । এখন প্রশ্ন এই – আত্মা যদি অবিনাশী, তবে দেহনাশের পরে ইহার কি গতি হয় ?
এ-সম্বন্ধে খ্রীষ্টীয় ধর্মের মত এই যে – পরমেশ্বর বিচার করিয়া জীবের সুকৃতি ও দুষ্কৃতি-অনুসারে দেহান্তে পুণ্যবানকে অনন্ত স্বর্গে ও পাপীকে অনন্ত নরকে প্রেরণ করেন । এই ধর্মমতের অনুকূলে যুক্তি বেশী কিছু নাই । বিশ্বাসই ইহার মূল ভিত্তি । কিন্তু ইহার প্রতিকূলে প্রধান আপত্তি এই যে, ঈশ্বরের এই যে বিচার, ইহা অবিচার বলিয়াই বোধ হয়; কেননা এই সংসারে কেহই কেবল পুণ্য বা কেবল পাপ করে না । সকলে কিছু-না-কিছু পুণ্যকর্মও করে, পাপকর্মও করে । সুতরাং যাহার জন্য অনন্ত স্বর্গবাসের ব্যবস্থা হইল, তাহার পাপের শাস্তি হইল না; পক্ষান্তরে যাহার পক্ষে অনন্ত নরকবাস লখিত হইল, তাহার পুণ্যের পুরস্কার হইল না । বলিতে পার, প্রত্যেক জীবের পাপ-পুণ্যের হিসাব-নিকাশ করিয়া পাপ ও পুণ্যের আধিক্য-অনুসারে অনন্ত নরকবাস বা স্বর্গবাসের ব্যবস্থা হয়, কিন্তু অনন্তকালের তুলনায় মানুষের এই জীবনকাল কতটুকু ? ক্ষণস্থায়ী এই জীবনের পাপাধিক্য বা পুণ্যাধিক্যের জন্য অনন্তকাল ব্যাপিয়া নরকবাস বা স্বর্গবাসের ব্যবস্থা, ইহাতে কি একপক্ষে অতি-নিষ্ঠুরতা, অপর পক্ষে অতি-উদারতা প্রকাশ পায় না ?
এ-সম্বন্ধে হিন্দুমত এই যে – স্বর্গ বা নরকভোগ জীবের চরম গতি নয় । যাহা হইতে জীবের উদ্ভব, সেই পরব্রহ্মে লীন হওয়া বা ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়াই জীবের পরম লক্ষ্য ও চরম গতি । যে-পর্যন্ত জীব তাহার উপযোগী না হয়, সে পর্যন্ত তাহাকে কৃতকর্মানুসারে পুনঃপুনঃ দেহ ধারণ করিয়া কর্মফল ভোগ করিতে হয় । ভোগ ভিন্ন প্রারব্ধ কর্মের ক্ষয় হয় না । জীবের এই যে জন্মমৃত্যু-চক্রে পরিভ্রমণ, ইহারই নাম সংসার (সং-সৃ=গমন করা) । এই সংসার ক্ষয় হইয়া কিরূপে জীবের ব্রহ্মনির্বাণ বা ভগবৎ-প্রাপ্তি হইতে পারে, তাহাই সমগ্র হিন্দুদর্শন ও হিন্দুশাস্ত্রের প্রতিপাদ্য বিষয় । অবশ্য হিন্দুশাস্ত্রে, জীবের কৃতকর্মানুসারে স্বর্গাদি-ভোগের ব্যবস্থাও আছে, কিন্তু তাহা অনন্তকালের জন্য নহে । যে-কর্মবিশেষের ফলে স্বর্গাদি লাভ হয়, সেই কর্মের ফলভোগ শেষ হইলে তাহাকে আবার জন্মগ্রহণ করিতে হয় । মোক্ষ বা ভগবৎ-প্রাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত জন্মকর্মের নিবৃত্তি নাই ।
১৪) তিতিক্ষা = শীতোষ্ণ, সুখদুঃখ, মান-অপমানাদি দ্বন্দ্ব-সহিষ্ণুতা । ইহা মহাফলপ্রদ, ইহা জীবনকে মধুময় করে, মানবকে অমৃতত্ত্ব প্রদান করে ।
১৫) অমৃতত্ত্ব :
এই স্থূল শরীর লইয়া চিরকাল বর্তমান থাকাকে অমৃতত্ত্ব বা অমরত্ব বলে না; তাহা কেহ থাকিতে পারে না; কারণ ভৌতিক দেহ বিনাশশীল, মৃত্যুর অধীন [গী|২|২৭] । মৃত্যুর পর সূক্ষ্ম শরীরে বিদ্যমান থাকাকেও অমৃতত্ত্ব বলে না, উহা সকলেই থাকে [গী|১৫|৮-৯] এবং পুনরায় দেহ গ্রহণ করে । এই জন্মমৃত্যুর চক্র হইতে নিষ্কৃতি লাভই অমৃতত্ত্ব লাভ,ইহাকেই মোক্ষ বলা হয় ।
দেহাত্মবোধ : দেহটাকেই ‘আমি’-বোধ করা । আমরা এই অনিত্য দেহটা লইয়াই ‘আমি’ ‘আমি’ করি, কিন্তু দেহের মধ্যে যে দেহী (আত্মা) আছেন, তাঁহার খোঁজ লই না ।
দেহাত্মবিবেক : আত্মা দেহ হইতে পৃথক বস্তু – এই জ্ঞান । এই জ্ঞানলাভের নামই অমৃতত্ত্ব (আত্মানন্দ, নিত্যানন্দ, ব্রহ্মানন্দ, প্রেমানন্দ) লাভ ।
এক তত্ত্বই ব্রহ্ম, আত্মা, ভগবান, এই ত্রিবিধ নামে অভিহিত হন এবং সাধকের ভাব-বৈশিষ্ট্যহেতু ত্রিবিধ ভাবে প্রকাশিত হন । সাধক যখন এই দেহচৈতন্যের ঊর্ধ্বে উঠিয়া ব্রহ্মচৈতন্যে [গী|৬|২৮] অথবা আত্মচৈতন্যে [গী|৬|২৯] অথবা ভাগবত-চৈতন্যে [গী|৬|৩০] অবস্থান করেন, তখন তিনিই অমৃতত্ত্ব লাভ করেন ।
এই শ্লোকে বলা হইল, যাঁহার সুখদুঃখে সমভাব, তিনি অমৃতত্ত্ব লাভ করেন । এই সমতা বা সাম্যবুদ্ধির কথা পরেও আমরা পাইব, শ্রীগীতায় ইহাকেই যোগ বলা হইয়াছে [গী|২|৪৮,৫০; ৬|৩৩] । সুখদুঃখে সাম্যভাব সমতাযোগের একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত মাত্র ।
ত্যাগ : গীতাশাস্ত্র বলেন ত্যাগ অর্থ আসক্তি ত্যাগ, কামনা-বাসনা ত্যাগ । আসক্তিই সুখদুঃখাদি-চিত্তচাঞ্চল্যের কারণ । সংসার-আসক্তি ত্যাগ করিয়াও সংসার করা যায়, বিষয়-কামনা না করিয়াও বিষয় ভোগ করা যায়, ফল কামনা না করিয়াও কর্ম করা যায় এবং শ্রীগীতার উপদেশ, তাহাই কর্তব্য ।

হৃদয়গ্রন্থি : শাস্ত্রমতে কামনাই হৃদয়গ্রন্থি, যাহা ছিন্ন করিতে পারিলেই মরণশীল মানুষ অমর হইতে পারে । ‘জীবিতাবস্থায়ই (ইহ) যখন হৃদয়ের গ্রন্থিসকল (কামনাসমূহ) বিনষ্ট হয়, তখন মরণশীল মানুষ অমর হয়, এইটুকুই সমগ্র বেদান্তশাস্ত্রের সারকথা [কঠোপনিষদ |২|৩|১৫] । একমাত্র শ্রীকৃষ্ণের শরণ লইলে, তাঁহার কৃপায় হৃদয়গ্রন্থি ক্রমে শিথিল হয় ।
পরাভক্তি : ভক্তিশাস্ত্রে ইহাই অমৃতস্বরূপ, উহা পাইলেই সাধক সিদ্ধ হন, অমর হন, তৃপ্ত হন – আর কিছু পাইবার আকাঙ্ক্ষা থাকে না, মোক্ষেরও না । [ভক্তিসূত্র]
১৬) অস্‌ (থাকা) + শতৃ = সৎ, যাহা থাকে, নিত্য তাহাই সৎ । যাহা থাকে না, আসে যায়, তাহা অসৎ, অনিত্য । আত্মাই সৎ; জগৎপ্রপঞ্চ, দেহাদি ও তৎসংসৃষ্ট-সুখদুঃখাদি অসৎ । সুতরাং অর্থ হইল – ‘আত্মার বিনাশ নাই, দেহাদি ও সুখদুঃখাদির স্থায়িত্ব বা অস্তিত্ব নাই ।’ এখন দেহাদির স্থায়িত্ব নাই, একথা বুঝা গেল, কিন্তু ‘দেহাদির অস্তিত্ব নাই’, এ-কথার অর্থ কি ?
যাঁহারা মায়াবাদী, তাঁহারা বলেন, এক আত্মাই (ব্রহ্মই) সত্য, জগৎ মিথ্যা – মায়া-বিজৃম্ভিত । ব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয়, ব্রহ্ম ভিন্ন আর-কিছুর পারমার্থিক সত্তা নাই । কিন্তু জগৎ যে মিথ্যা, এই মতবাদ অনেকেই স্বীকার করেন না এবং গীতাও এ-মত সমর্থন করেন বলিয়া বোধ হয় না । সুতরাং তাঁহারা ‘নাসতো বিদ্যতে ভাবো’ এই শ্লোকাংশের অন্যরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছেন ।
শ্রীমৎ শ্রীধরস্বামী বলেন – এই শ্লোকের সদসৎ-বস্তুর স্বরূপ-বর্ণনায় আত্মার নিত্যতা এবং সুখ-দুঃখাদির অনিত্যতা ও অনাত্মধর্মিতাই লক্ষ্য করা হইয়াছে, ইহাই টীকাকারের অভিপ্রায় ।
সুখদুঃখের অনাত্মধর্মিতা :
সুখদুঃখ আত্মার ধর্ম নহে, উহা অন্তঃকরণের ধর্ম । অন্তঃকরণ = মন + বুদ্ধি + চিত্ত + অহঙ্কার । হিন্দু-দার্শনিকগণ মনস্তত্ত্বের যে সূক্ষ্মানুসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করিয়াছেন তাহার সম্যক আলোচনা এ-স্থলে সম্ভবপর নহে । স্থূলত এইটুকু স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, এ-সকলই প্রকৃতির বিকৃতি বা পরিণাম; পুরুষ বা আত্মার সহিত উহাদের কোনো নিত্য সম্বন্ধ নাই ।
জ্ঞানান্মুক্তি/ত্রিগুণাতীত অবস্থা : প্রকৃতির সংযোগবশত আত্মা সুখদুঃখের ভোক্তা বলিয়া প্রতীয়মান হন । সৃষ্টিকালে পুরুষ ও প্রকৃতি পরস্পর-সংযুক্ত থাকাতে পুরুষের ধর্ম প্রকৃতিতে ও প্রকৃতির ধর্ম পুরুষে উপচরিত হয় । এই কারণেই বস্তুত অচেতন হইলেও প্রকৃতিকে চেতন বলিয়া মনে হয় এবং বস্তুত অকর্তা হইলেও আত্মাকে কর্তা-ভোক্তা বলিয়া বোধ হয় । পুরুষ (আত্মা) ও প্রকৃতির পার্থক্য যখন উপলব্ধি হয়, তখন আর এ-অজ্ঞান থাকে না । এই প্রকৃতি ও পুরুষের পার্থক্য-জ্ঞান’ই সাংখ্যদর্শনের ‘জ্ঞানান্মুক্তি’ – জ্ঞান হইতে মুক্তি । গীতাতে ইহাই ত্রিগুণাতীত অবস্থা বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে । এই অবস্থায় সুখদুঃখের পরানিবৃত্তি । বিশদ
সৎকার্যবাদ : ‘নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ’ – এ-কথায় এই বুঝায় যে, যাহা নাই তাহা হইতে পারে না এবং যাহা আছে তাহার অভাব হয় না অর্থাৎ কোনো পদার্থই নূতন উৎপন্ন হয় না এবং কোনো কিছুই বিনষ্ট হয় না, পরিবর্তন হয় মাত্র । ইহা সাংখ্যদর্শনের একটি প্রধান সিদ্ধান্ত যাহার উপরেই সাংখ্যের প্রকৃতিবাদ ও সৃষ্টিতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত । ইহাকে বলে সৎকার্যবাদ ।
১৭) অব্যয় = যাহার উপচয় (বৃদ্ধি) ও অপচয় (ক্ষয়) নাই, যাহা সর্বদাই একরূপ ।
মূলতত্ত্ব : সাধন-ভেদে একেরই তিন রূপ বা বিভাব । যে তাঁহাকে যে-ভাবে চিন্তা করে তাহার নিকট তিনি তাহাই । জ্ঞানীর নিকট তিনি জ্যোতির্ময় ব্রহ্ম, যোগীর নিকট তিনি চিদাত্মস্বরূপ পরমাত্মা, ভক্তের নিকট তিনি সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ ভগবান । বিশদ
অদ্বয় জ্ঞান তত্ত্ব কৃষ্ণের স্বরূপ । ব্রহ্ম, আত্মা, ভগবান তিন তাঁর রূপ ।।
জ্ঞান, যোগ, ভক্তি তিন সাধনার বশে । ব্রহ্ম, আত্মা, ভগবান ত্রিবিধ প্রকাশে ।। [শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত]

অদ্বৈতবাদ : ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা । জীবাত্মা ও পরমাত্মা অভিন্ন, যেমন ঘটাকাশ ও মহাকাশ । পাঁচটি শূন্য ঘটে যে-আকাশ আছে, উহা আধারভেদে বিভিন্ন বোধ হইলেও মূলত একই । ঘট পাঁচটি ভাঙিয়া দিলে আর ভেদ থাকে না, তখন সকলেই এক মহাকাশ । এইরূপ বিভিন্ন দেহাধিষ্ঠিত আত্মা দেহভেদে ভিন্ন বোধ হইলেও স্বরূপত অভিন্ন । দেহবন্ধন-বিমুক্ত হইলেই উহার স্ব-স্বরূপ পরমাত্মরূপ প্রতিভাত হয় । এই যে দৃশ্য জগৎ প্রত্যক্ষ হইতেছে, উহা ভ্রমমাত্র; যেমন রজ্জুতে সর্পভ্রম, শুক্তিতে রজতভ্রম, সূর্য-রশ্মিতে মরীচিকাভ্রম । মায়াবাদীর মতে এই ভ্রম হয় ব্রহ্মের ‘অঘটন-ঘটন-পটীয়সী’ মায়াশক্তির প্রভাবে । তত্ত্বজ্ঞান জন্মিলে এই মায়া কাটিয়া যায়, তখনই ‘সোহহম্‌’ ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’এইরূপ আত্মস্বরূপ অধিগত হয় । অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম নির্বিশেষ, নির্বিকল্প, নিরুপাধি, নির্গুণ; সুতরাং অজ্ঞেয়, অচিন্ত্য, অমেয় – মনোবুদ্ধির অগোচর ।

বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ : ব্রহ্ম ও জীব স্বতন্ত্র বস্তু । জগৎ মিথ্যা নহে, উহা ব্রহ্মের মায়াশক্তি-প্রসূত । জগৎ ব্রহ্মেরই শরীর । ব্রহ্ম সগুণ, তিনি জগতের কর্তা ও উপাদান । এই মতকে অনেকে দ্বৈতবাদও বলেন ।

শুদ্ধদ্বৈতবাদ : ব্রহ্ম, জীব ও জগৎ তিনই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও পৃথক তত্ত্ব ।

২০) ষড়বিধ বিকার : (i)জন্ম, (ii)অস্তিত্ব, (iii)বৃদ্ধি, (iv)বিপরিণাম, (v)অপক্ষয়, (vi)বিনাশ – লৌকিক বস্তুর বিকার । জন্মের পর যে বিদ্যমানতা তাহার নাম অস্তিত্ব-বিকার ।
পুরাণ = সনাতন ।
অহং অর্থাৎ আত্মা অকর্তা হইলেও অহঙ্কার (আমি করিতেছি এই বুদ্ধি) যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ কর্মের বন্ধন যায় না । সুতরাং আত্মা অকর্তা বলিয়া যে অর্জুনের হত্যাজনিত পাপ হইবে না তাহা নহে । যদি অর্জুনের এই জ্ঞান জন্মে যে, আমি অকর্তা, আমি কিছুই করিতেছি না, প্রকৃতিই প্রকৃতির কাজ করিতেছে; আমি নিঃসঙ্গ, নির্লিপ্ত, তবেই তাহার ফলভোগ নিবারিত হইবে । এইরূপ জ্ঞানই, এই কর্তৃত্বাভিমান-ত্যাগই গীতায় পুনঃপুনঃ উপদিষ্ট হইয়াছে ।
৩৯) সংখ্যা = বস্তুতত্ত্ব সম্যক প্রকাশিত হয় যাহা দ্বারা অর্থাৎ সম্যক জ্ঞান ।
সাংখ্য = সংখ্যায় প্রকাশমান আত্মতত্ত্ব অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞান ।
‘সাংখ্য’ ও ‘যোগ’-শব্দের বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার :
সনাতন ধর্মে অতি প্রাচীন কাল হইতেই দুইটি সাধনমার্গ বা মোক্ষপথ প্রচলিত আছে – (i)সাংখ্য বা জ্ঞানমার্গ, (ii)কর্মমার্গ । জ্ঞানমার্গ-অবলম্বিগণ প্রায় সকলেই কর্মত্যাগী, কর্ম হইতে নিবৃত্ত, এইজন্য ইহাকে সন্ন্যাসমার্গ বা নিবৃত্তিমার্গও বলে । কর্মমার্গ-অবলম্বীরা জ্ঞানলাভ করিয়াও কর্মের যোগ ছেদন করেন না, কর্মে প্রবৃত্ত থাকেন, এইজন্য ইহাকেপ্রবৃত্তিমার্গ বলে (‘প্রবৃত্তিলক্ষণো যোগো জ্ঞানং সন্ন্যাসলক্ষণম্‌’ – অনুগীতা) ।
কর্ম দ্বিবিধ – (i)সকাম, (ii)নিষ্কাম । বৈদিক কর্মযোগ = যাগযজ্ঞাদি কাম্য কর্ম; বৈদান্তিক কর্মযোগ = নিষ্কাম কর্মযোগ ।
গীতায় জ্ঞানমার্গ বুঝাইতে ‘সাংখ্য’ শব্দ ও নিষ্কাম কর্মযোগ বুঝাইতে ‘যোগ’ শব্দ পুনঃপুনঃ ব্যবহৃত হইয়াছে ।
জ্ঞানমার্গেরই একটি বিশিষ্ট প্রাচীন স্বরূপ মহর্ষি কপিলদেব-প্রণীত পুরুষ-প্রকৃতি-বিবেক বা সাংখ্যদর্শনে বিবৃত হইয়াছে । কিন্তু এ-স্থলে সাংখ্য-শব্দে সাংখ্যদর্শন বুঝায় না ।
যোগ বলিতে সাধারণত আসন-প্রাণায়ামাদি, পাতঞ্জল দর্শনোক্ত অষ্টাঙ্গযোগ বা সমাধিযোগ বুঝায় । এ-স্থলে যোগ-শব্দ এই অর্থে ব্যবহৃত হয় নাই । গীতায় সমাধিযোগ ও সাংখ্যদর্শনেরও অনেক তত্ত্ব সন্নিবিষ্ট আছে । সুতরাং ‘যোগ’ ও ‘সাংখ্য’-শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়, তাহা স্মর্তব্য ।
৪০) কর্মবন্ধ : শত কোটি-কল্পেও ভোগ ভিন্ন কর্মক্ষয় হয় না, কৃতকর্মের শুভাশুভ ফল অবশ্যই ভোগ করিতে হইবে । এই কর্মফল ভোগের জন্য আমাদিগকে পুনঃপুনঃ জন্মমৃত্যু-জরাব্যাধি-সঙ্কুল সংসার-বন্ধনে আবদ্ধ হইতে হয় । ইহাই কর্মবন্ধন । আমরা যদি ফল ত্যাগ করিয়া সিদ্ধি ও অসিদ্ধি সমজ্ঞান করিয়া কর্তৃত্বাভিমান বর্জন করিয়া কর্ম করিতে পারি তবে সেই নিষ্কাম কর্মে বন্ধন হয় না ।
৪১) বুদ্ধি (intelligent will), মন (mind), বাসনা (desire)
গীতার ‘বুদ্ধি’ শব্দের যথাযথ ইংরেজী অনুবাদ করিতে গেলে বলিতে হয়, ‘intelligent will’ (Sri Aurobindo) । সাধারণভাবে ‘বোধ’, ‘জ্ঞান’ অর্থে বুদ্ধি-শব্দের প্রয়োগ হয় । দার্শনিক পরিভাষায় বুদ্ধিকে বলে ব্যবসায়াত্মিকা বা নিশ্চয়াত্মিকা মনোবৃত্তি বা অন্তরিন্দ্রিয় । বিষয়ের সহিত ইন্দ্রিয়-সংযোগে মনে নানারূপ জ্ঞান বা সংস্কার জন্মে এবং ইহার কোনটি ভাল, কোনটি মন্দ, কোনটি গ্রাহ্য, কোনটি ত্যাজ্য, ইহা এই প্রকার, না ঐ প্রকার, মনে এইরূপ সঙ্কল্প-বিকল্প উপস্থিত হয় । তখন বুদ্ধি, বিচার করিয়া কোনটি গ্রাহ্য বা কর্তব্য তাহা নির্ণয় করিয়া দেয় । এই হেতু মনকে সঙ্কল্প-বিকল্পাত্মক এবং বুদ্ধিকে ব্যবসায়াত্মিকা ইন্দ্রিয় বলে । সংস্কৃতভাষায় এইরূপ কার্যাকার্য-নির্ণয় করার ব্যাপারকেই ‘ব্যবসায়’ কহে ।
‘বুদ্ধি’ কিছু স্থির নিশ্চয় করিয়া দিলে মন আবার সেই দিকে ধাবিত হয়, সেই কার্যে আসক্ত হয় । ইহাকেই ‘বাসনা’ বলে, ইহাকে অনেক সময় ‘বাসনাত্মিকা বুদ্ধি’ বলা হয় । এই শ্লোকে প্রথম পংক্তিতে ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিরই স্পষ্ট উল্লেখ আছে, কিন্তু দ্বিতীয় পংক্তিতে ‘বুদ্ধয়ঃ’ শব্দে বুঝায় বাসনাত্মিকা বুদ্ধি বা বাসনাতরঙ্গ । বস্তুত জ্ঞান, বিচার, ব্যবসায় (perceptive choice), বাসনা (will), উদ্দেশ্য (motive) – এই সকলই গীতায় স্থলবিশেষে এক ‘বুদ্ধি’-শব্দদ্বারাই প্রকাশিত হয়, ইহা মনে রাখা কর্তব্য ।
৪২-৪৪) বেদের কর্মকাণ্ড :
বেদের চারি ভাগ – (i)সংহিতা, (ii)ব্রাহ্মণ, (iii)আরণ্যক ও (iv)উপনিষদ । সংহিতা ও ব্রাহ্মণ-ভাগ লইয়া কর্মকাণ্ড এবং আরণ্যক ও উপনিষদ-ভাগ লইয়া জ্ঞানকাণ্ড । কর্মকাণ্ডে বিবিধ যাগযজ্ঞাদির ব্যবস্থা আছে এবং বিহিত প্রণালীতে ঐ সমস্ত কর্ম সম্পন্ন হইলে স্বর্গাদি লাভ হয়, এইরূপ ফলশ্রুতিও আছে । সাধারণত ‘ধর্মকর্ম’ বলিতে লোকে এই সকল কর্মকেই বুঝিয়া থাকে । শ্রীভগবান বলিতেছেন, ঐ সকল কাম্যকর্মে ভোগ-বাসনা বিদূরিত হয় না, বরং আরো বর্ধিত হয় ।
৪৫) নির্যোগক্ষেম = যোগ-ক্ষেম-রহিত; যোগ = অলব্ধ বস্তুর উপার্জন; ক্ষেম = লব্ধ বস্তুর রক্ষণ । অর্থ এই – তুমি উপার্জন ও রক্ষা এই উভয় বিষয়েই চিন্তা ত্যাগ কর ।
৪৬) লোকমান্য তিলক, বঙ্কিমচন্দ্র-প্রমুখ আধুনিক ব্যাখ্যাকর্তৃগণের অনেকেই এই শ্লোকের নিম্নোক্তরূপ ব্যাখ্যা করেন । –
সকল স্থান জলে প্লাবিত হইলে কূপাদি ক্ষুদ্র জলাশয়ের যে প্রয়োজন, তত্ত্বজ্ঞ ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষের সমস্ত বেদেও সেই প্রয়োজন । অর্থাৎ সকল স্থান জলে প্লাবিত হইলে যেমন কূপাদি ক্ষুদ্র জলাশয়ে কোনো প্রয়োজন হয় না, তদ্রূপ ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষের বেদে কোনো প্রয়োজন নাই । কেননা যিনি ব্রহ্মজ্ঞ, যিনি ঈশ্বরকে জানিয়াছেন, তাঁহার আর বেদে কি প্রয়োজন ?
ইহা স্পষ্টই বেদ-নিন্দার মত শুনায় । ব্রহ্মজ্ঞই হউন আর যাহাই হউন বেদে কাহারও প্রয়োজন নাই, এরূপ কথা যাহাতে না বলা হয়, প্রাচীন ব্যাখ্যাকর্তৃগণ কষ্টকল্পনা করিয়া সেরূপ ব্যাখ্যারই অন্বেষণ করিয়াছেন ।
রহস্য – গীতা ও বেদের আপাতবিরোধ
সনাতন ধর্ম = যাহা বেদমূলক তাহাই ধর্ম; কিন্তু বেদের ‘জন্মকর্মফলপ্রদ’ কাম্যকর্মাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরোধী বলেই গীতাশাস্ত্রকে মনে হয় ।
বেদের প্রকৃত তাৎপর্য কি তাহা আমরা বুঝি না । অতি প্রাচীনকালে বেদের গূঢ়ার্থ গুরু-শিষ্য-পরম্পরাক্রমে অধিগত হইত, উহা লিপিবদ্ধ হইত না । উহা বহু পূর্বেই লুপ্ত হইয়া গিয়াছিল । পরে বেদার্থ যিনি যেরূপ বুঝিয়াছেন তিনি সেইরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছেন এবং তদনুসারে নানা মতবাদের সৃষ্টি হইয়াছে । দর্শন ও ধর্মশাস্ত্রাদি বেদ শিরোধার্য করিয়াও পরস্পর বিরুদ্ধ-মতাবলম্বী ।
বেদবাদ : দ্বাপরযুগের শেষকালে একটি কাম্যকর্মবাদী ধর্মমত (বা অধর্মমত) বড় প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল । ইহাকেই বেদবাদ বলা হইয়াছে । কাম্যকর্মবাদী বলেন, বেদের কর্মকাণ্ডই সার্থক, যাগযজ্ঞাদিই একমাত্র ধর্ম, স্বর্গই একমাত্র পুরুষার্থ, উহাতেই সমস্ত দুঃখনিবৃত্তি, এতদ্ব্যতীত ঈশ্বরতত্ত্ব বলিয়া আর-কিছুই নাই । এই আপাত-মনোরম কর্মমার্গ, যাহা ইহকালে ধনৈশ্বর্য, পরকালে উর্বশী-পারিজাতাদির আশাপ্রদ, তাহা যে লোকপ্রিয় হইবে তাহা বলাই বাহুল্য । ফলে যাগযজ্ঞাদির ঘটা বাড়িয়া গেল । অশ্বমেধ, গো-মেধ, নরমেধাদি ‘মেধে’র মাত্রা বৃদ্ধি পাইল, প্রাণি-বধই ধর্মে পরিণত হইল ।
এইরূপে যখন বিষম ধর্মবিপ্লব উপস্থিত হইল – ধর্মের গ্লানি, অধর্মের অভ্যুত্থান, তখনই ধর্ম-সংস্থাপনার্থ শ্রীভগবানের গীতা-প্রচার । তাই শ্রীভগবান বলিতেছেন – ‘এই বেদবাদী, মূঢ়গণের কথায় মুগ্ধ হইও না, ও-পথে যাইও না, উহাতে বুদ্ধি ঈশ্বরে একনিষ্ঠ হয় না । ইহা বেদ-নিন্দা নহে, বেদের অপব্যাখ্যাকারী কাম্যকর্মবাদিগণের নিন্দা ।
তবে ত্রিগুণাত্মক কর্মকাণ্ডের কি প্রয়োজন ?
ব্রহ্মজ্ঞের ইহাতে কোনো প্রয়োজন নাই । কিন্তু জগৎ ত্রিগুণাত্মক, সংসার ত্রিগুণাত্মক, দেহাভিমানী জীব ত্রিগুণে অভিভূত – সে ত্রিগুণ ত্যাগ করিতে না পারিলে, নিবৃত্তি-মার্গ অবলম্বন করিতে না পারিলে – কোন ধর্ম লইয়া থাকিবে ? তাহার উচ্ছৃঙ্খল কামনা বিধিবদ্ধ না করিলে সংসার রক্ষা পাইবে কিরূপে ? কামনা-পূরণার্থ যাগযজ্ঞ ও দেবার্চনাদির ব্যবস্থা, স্বর্গের প্রলোভন, প্রবৃত্তির প্রতিরোধার্থ নরকাদির ভয়, প্রায়শ্চিত্তাদির বিধান, এই সকল না থাকিলে কামনাকুল জীব স্বেচ্ছাচারী হইয়া আত্মঘাতী হইয়া উঠিত । তাই লোকবৎসল বেদ – অজ্ঞ ও নিম্ন অধিকারীর জন্য এই সকল ব্যবস্থা করিয়াছেন এবং উহাতে রুচি জন্মাইবার জন্য স্বর্গফলাদির বর্ণনা করিয়াছেন । উচ্চাধিকারী ব্যক্তি ঐ সকল কর্ম ঈশ্বরার্পণ-বুদ্ধিতে ফলাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করিয়া করিবেন, উহাতেই কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া সিদ্ধিলাভ করিবেন ।
৪৭) রহস্য – নিষ্কাম কর্ম কি সম্ভবপর ?
ফলাকাঙ্ক্ষা না থাকিলে কর্ম করিবে কেন ? উদ্দেশ্য (motive) ভিন্ন কর্ম হয় না । কিন্তু ফলাফলে উদাসীনতা ও উদ্দেশ্যহীনতা এক কথা নহে । নিষ্কাম কর্মও উদ্দেশ্যহীন নহে; ‘লোক-সংগ্রহ’, ভগবানের সৃষ্টিরক্ষাই উহার উদ্দেশ্য; উহা ভগবানের কর্ম । বস্তুত, ইহা ভগবানের অর্চনা । যখন ভাগবত ইচ্ছা ও কর্মীর ইচ্ছা এক হয়, তখনই প্রকৃত নিষ্কাম কর্ম সম্ভবপর; তখন কর্তার ব্যক্তিত্ব থাকে না । এরূপ অবস্থায় ফলাফলে সমত্ব-বুদ্ধি অসম্ভব ব্যাপার তো নহেই, ফলত উহা স্বাভাবিকই হইয়া উঠে ।
প্রশ্ন – এইরূপ যন্ত্রচালিত পুতুলের (mechanical) ন্যায় কর্মের কোনো নৈতিক মূল্য (moral value) কি আছে ?
উত্তর – গীতার অধ্যাত্ম-তত্ত্ব ঐ নৈতিক মূল্যের অনেক উপরে । ঐ নৈতিক মূল্যটিকে অর্থাৎ ঐ কর্মফলের দায়িত্বটা ত্যাগ করাই নিষ্কাম কর্মীর লক্ষ্য । উহাই কর্মবন্ধ । উহার ফল স্বর্গ বা নরক বা পুনর্জন্ম । হিন্দু-সাধক ইহার কোনোটিই চাহেন না । তিনি জানিতে চাহেন তাঁহাকে, যাঁহা হইতে তাঁহার উদ্ভব, যাঁহা হইতে তাঁহার কর্ম-প্রবৃত্তি । সুতরাং তিনি নিজেকে যন্ত্রস্বরূপ মনে করিয়া সেই যন্ত্রীর নিকটই আত্মসমর্পণ করেন ।
৬১) ভগবচ্চিন্তাই ইন্দ্রিয়-সংযমের মহৌষধ । ভগবানকে হৃদয়ে ধারণ করিলে যেরূপ আত্যন্তিক চিত্তশুদ্ধি হয়, দেবতা-উপাসনা, তপ, বায়ুনিরোধ-যোগ, মৈত্রী, তীর্থস্থান, ব্রত, দান, বিদ্যা ও জপের দ্বারা তাহা হয় না ।
৬৪) নির্লিপ্ত সংসারী :
‘তুমি সংসারে থাক তাহাতে দোষ নাই, সংসার তোমাতে না থাকিলেই হয় । জলের উপর নৌকা থাকিতে পারে, কিন্তু নৌকায় জল উঠিলেই ডুবিয়া যায় ।’ – শ্রীরামকৃষ্ণ ।
‘যেমন গৃহস্তের বাটীর দাসীরা সংসারের যাবতীয় কার্য করিয়া থাকে, সন্তানদিগকে লালন-পালন করে, উহারা মরিয়া গেলে রোদনও করে, কিন্তু মনে জানে যে, ইহারা তাহাদের কেহই নহে ।’ – শ্রীরামকৃষ্ণ ।
__________________________

সংগ্রহঃ ০১। sanatandharmatattva.wordpress.com
             ০২। http://www.scsmathinternational.com



Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।